BDBOYS...
BDBOYS...
সবচেয়ে সাম্প্রতিক খবর ও পোস্টসমূহ
হাওরে বিশাল জলরাশি। কখনো ঢেউয়ে উথাল-পাতাল, আবার কখনো মৃদু বাতাসে জলের ওপর চাঁদের প্রতিচ্ছবির খেলা। নৌকা বাজারের দিকে যাওয়ার পথ ধরেছে। তাই মোর্শেদ নিস্তব্ধ বৈঠক ভেঙে বৈঠা নিয়ে বসেন, নৌকা নিয়ন্ত্রণে এনে যেতে থাকেন রাধাপুর হাওড়ের দিকে। ওড়নার ঘোমটার আড়ালে কখন খোঁপা খুলে গেছে, পদ্মজা খেয়াল করেনি। হেমলতা দেখেন পদ্মজার চুল হাওড়ের জলে ডুবে আছে। তিনি মৃদু স্বরে পদ্মজাকে বললেন, ‘চুল ভিজে যাচ্ছে পদ্ম।’পদ্মজা দ্রুত সামলে নিলো। খোঁপা করে ঘোমটা টেনে নিয়ে বলল, কখন খুলে গেছে খেয়াল করিনি।’অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। হেমলতা চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছেন একমনে।পদ্মজা ডাকল, ‘আম্মা?’হেমলতা অশ্রুভরা চোখে তাকালেন। পদ্মজা কিছু বলার আগে তিনি বললেন, ‘পূর্ণা গল্প শুনবি?’পূর্ণা গল্প বলতে পাগল, শুনতে খুব ভালোবাসে। খুশিতে বাকবাকুম হয়ে বলল, ‘শুনব।’‘কষ্টের গল্প কিন্তু।’‘গল্প হলেই হলো।’হেমলতা হাসলেন। পদ্মজা নড়েচড়ে বসল। সে আন্দাজ করতে পারছে তার মা কোন গল্প বলবে। হেমলতা দুই হাতে জল নিয়ে মুখ ধুয়ে নিয়ে একবার মোর্শেদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন। পেছন ঘুরে বসে প্রশ্ন করলেন ‘মুখ না দেখে গল্প শুনতে ভালো লাগবে?’পূর্ণা মুখ গোমড়া করে না বলতে যাচ্ছিল। পদ্মজা এক হাতে খপ করে ধরে আটকে দিল। মাকে বলল, ‘যেভাবে ইচ্ছে বলো।’হেমলতা বড়ো করে দম নিয়ে বলা শুরু করলেন, আব্বার প্রথম স্ত্রী মারা যায় অল্প বয়সে। আব্বা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন; একজন বুদ্ধিমান, উদার মনের মানুষ। অন্যদিকে আম্মাকে যৌতুকের জন্য মুখে তালাক দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল তার প্রথম স্বামী। বাপের সংসারে এসে সমাজের তোপে পড়তে হয় আম্মাকে। আব্বার উদার মন ছিল, তাই তিনি অবলা-অসহায় আম্মাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। আমার নানার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেন। নানা সানন্দে রাজি হয়ে যান। রাজি হবেনই না কেন? স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া বিবাহিত নারীকে কে-ই বা বিয়ে করতে চায়? আম্মা-আব্বার বিয়ের বছর দেড়েক হতেই হানি আপার জন্ম হয়। তার দুই বছরের মাথায় আমার আগমন ঘটে।’কথার মাঝে পদ্মজা পুলকিত হয়ে বলল, ‘সেদিন নিশ্চয় গাছে গাছে ফুল মাঝে ফুটেছে?’হেমলতা ম্লান হেসে বললেন, ‘শুনেছি আমার গায়ের রং দেখে আম্মা নাক কুঁচকেছিল। আমার বয়স যখন তিন মাস, তখন আম্মার আগের স্বামী আম্মাকে ফিরিয়ে নিতে আসে। আব্বার তখন আর্থিক সমস্যা ছিল। দিনে দুইবেলা খাওয়াতেও হিমশিম খেতেন।‘তাই বিপদে পাশে থাকা আব্বাকেসহ আমাদের দুই বোনকে ছেড়ে স্বার্থপর মা পালিয়ে যায় তার প্রথম স্বামীর কাছে। আব্বা ছোটো ছোটো দুই মেয়েকে নিয়ে মাঝ নদীতে পড়েন। কিন্তু আল্লাহ সহায় ছিলেন। আব্বার ফুফু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন, চলে আসেন আমাদের কাছে; আপা আর আমার দায়িত্ব নেন। হুট করেই আব্বার আর্থিক অবস্থা উন্নত হতে থাকে। গৃহস্থিতে রহমত ঝরে পড়ে। পাঁচ বছর পর আম্মা ফিরে আসে। বিধ্বস্ত অবস্থা, ফরসা মুখ মারের চোটে দাগে দাগে বিশ্রি হয়ে গেছে। তবে একা আসেনি, দুই বছরের এক ছেলে নিয়ে ফিরে এসেছে। তখন আমাদের কুঁড়ে ঘরের বদলে বিশাল বাড়ি হয়েছে। আব্বা প্রথম মানেননি। আম্মা আব্বার পায়ে পড়ে কাঁদে, ক্ষমা চায়। আব্বা আবার আগের ভুল করেন। মেনে নেন আম্মাকে। আম্মার ছেলের নাম বিনোধ ছিল, আব্বা নতুন নাম দেন হানিফ। আম্মা আমাকে সহ্য করতে পারত না। কিন্তু আব্বার চোখের মণি ছিলাম। আব্বার আড়ালে আম্মার দ্বারা নির্যাতিত হয়েছি প্রতিদিন। ছয় বছর হতেই স্কুলে ভরতি করে দেন আব্বা। হানি আপা তখন স্কুলে পড়ে। আমি…’‘থামলে কেন, আম্মা?’ অধৈর্য হয়ে বলল পদ্মজা।হেমলতা ভ্রুকুটি করে বললেন, ‘আম্মার ব্যাপারে আর বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। সে এখন অনুতপ্ত। আফসোস করে, কাঁদে। বলতে ভালো লাগছে না।’শীতল বাতাসে সবার শরীর কাঁটা দিচ্ছে। চাঁদটা ছোটো হয়ে গেছে অনেক। মোর্শেদ এক ধ্যানে বৈঠা দিয়ে জল ঠেলে নৌকা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন সামনে। হেমলতা আবার বলতে শুরু করলেন, ‘মেট্রিক দেয়ার পর আম্মা পড়াতে চাচ্ছিল না। আব্বার জন্য ঢাকার কলেজে পড়ার সুযোগ পাই হোটেলে উঠি। আব্বা নিয়মিত টাকা পাঠাতেন। জানিস পদ্ম, কলেজে আমি সবার ছোটো ছিলাম। সবাই হাঁ করে তাকিয়ে থাকত। শাড়ি পরতাম বলে একটু বড়ো লাগত অবশ্য। সবসময় সুতি শাড়ি পরে বেণী বেঁধে রাখতাম। কারো সঙ্গে মিশতাম না। ভীষণ ভীতু ছিলাম। রিমঝিম নামে খ্রিষ্টান এক মেয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়। মেয়েটা এত সুন্দর ছিল দেখতে, ঠিক তোর মতো সুন্দর। চোখের মণি ছিল ঘোলা। তার নাকি শ্যামলা মানুষ ভালো লাগে; তাই নিজে যেচে আমার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে। কয়েকদিনের ব্যবধানে আমরা খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ি। ইংলিশে যাকে বলে বেস্ট ফ্রেন্ড। রিমঝিমের সঙ্গে মাঝে মাঝে ওর বড়ো ভাই আসত। নাম ছিল—যিশুযিশু একদম রিমঝিমের আরেক রূপ। চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য ছিল দুই ভাই-বোনের। যিশু ভাইয়া বলে ডাকতাম তাকে। যিশু ভাইয়া মজা করে বলতেন, ধর্ম এক হলে হেমলতাকেই বিয়ে করতাম। পদ্মজা-পূর্ণা খারাপ লাগছে শুনতে?’‘না, আম্মা, এক স্বরে বলল দুজন।পদ্মজা বলল, ‘পরে কী হলো?’‘তখন অলন্দপুর থেকে রাজধানীতে চিঠি পৌঁছাতে দুই সপ্তাহ লাগত। একদিন কলেজ ছুটির পথে হানি আপার চিঠি পেলাম। পাশে রিমঝিম ছিল যিশু ভাই সবেমাত্র এসেছেন রিমঝিমকে নিয়ে যেতে। চিঠি পড়ে জানতে পারি, আব্বা হাওড়ে গিয়েছিলেন মাছ ধরতে। আব্বার নৌকার চেয়ে কয়েক হাত দূরের নৌকায় সুজন নামে এক ছেলে ছিল। তখন ভারি বর্ষণ হচ্ছিল। বজ্রপাত হচ্ছিল একটার পর একটা। একটা বজ্রপাত সুজনের ওপর পড়ে, সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটা ঝলসে যায়। আব্বা ছিটকে পড়েন জলে। দূর থেকে এক দল জেলে ঘটনাটি দেখতে পায়। তারা আব্বাকে তুলে নিয়ে যায় বাড়িতে। এরপর থেকেই আব্বা কানে শুনতে পান না, ঠিক করে হাঁটতে পারেন না; মস্তিষ্ক অচল হয়ে পড়ে। এই খবর শোনার পর হাউমাউ করে কান্না শুরু করি। কখনো একা অলন্দপুর আসিনি, আব্বা গিয়ে আনতেন। খুব অসহায় হয়ে পড়ি, কী করে বাড়ি যাব? যিশু ভাই সব শুনে, আমার কান্না দেখে বললেন, বিকেলের ট্রেনে অলন্দপুর নিয়ে যাবেন। আমি তখনো কাঁদছিলাম। একবার শুধু অলন্দপুর যেতে চাই। আব্বাকে দেখতে চাই। যদিও জানতাম, অনেকদিন হয়ে গেছে এই দুর্ঘটনার।‘আটপাড়া পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক রাত হয়ে যায়। বাড়ি এসে দেখি সদর ঘরের দরজায় তালা মারা, কেউ নেই বাড়িতে। মুরগি আর গরু-ছাগল ছাড়া। বারান্দার ঘরে দরজা ছিল না। শুধু একটা চৌকি ছিল। বড্ড ক্লান্ত ছিলাম। চৌকিতে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম ভাঙে আম্মার চেঁচামেচিতে। যিশু ভাইও নিজের অজান্তে আমার পাশে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল বুঝতে পারেনি। দীর্ঘ যাত্রার কারণে আমার মতোই তিনি ক্লান্ত ছিলেন। আমার জন্মদাত্রী মা গ্রামবাসী ডেকে চেঁচাতে থাকেন, যেন হাতেনাতে চোর ধরেছেন। অবস্থা বেগতিক দেখে ভড়কে যাই। কিছু বলতে পারিনি। যিশু ভাই সবাইকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করে, কেউ বুঝেনি। তখন নিয়ম খুব কঠিন ছিল। যিশু ভাই খ্রিষ্টান শুনে সবাই আরো ক্ষেপে যায়। আব্বার সামনে গ্রামবাসী আমাদের দুজনের মাথা ন্যাড়া করে দিল। কোমর সমান চুল ছিল আমার। মাথা ন্যাড়া করতে গিয়ে মাথার চামড়া ছিঁড়ে ফেলে। রক্ত বের হতে থাকে গলগল করে। আমার করুণ অবস্থা দেখে আম্মার তখন হুঁশ আসে। গ্রামবাসীর হাত থেকে আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করে কিন্তু পারেনি। গায়ের রং কালো, তার ওপর রক্তাক্ত ন্যাড়া মাথা। কী যে বিশ্রি রূপ হয়েছিল!‘আমি আমার একমাত্র ভরসার আব্বাকে চিৎকার করে ডেকে কেঁদেছিলাম। আব্বা শোনেননি, আমার দিকে শুধু হাঁ করে তাকিয়েছিলেন। কিছু লোক যিশু ভাইকে অনেক মারধর করে। সেদিন রাতেই উনাকে রক্তাক্ত অবস্থায় ছুঁড়ে ফেলে আসে নদীর পাড়ে। গরুর ঘরে গোবরের ওপর বেঁধে রাখে আমাকে। দূরদূরান্তরের মানুষ দেখতে আসে। আমি তখন নিশ্বাসে নিশ্বাসে নিজের মৃত্যু কামনা করেছি। একবার বাঁধনছাড়া হতে পারলে আত্মহত্যা করব বলে পণ করি। হাত বাঁধা ছিল, তাই দাঁত দিয়ে নিজের হাঁটুতে বোকার মতো কামড় দিতে থাকি একটার পর একটা…যাতে মরে যাই। যেই দেখতে আসত সেই বিশ্রি গালি দিয়ে যেত। কেউ কেউ লাথি দিয়েছে। রাধাপুরের হারুন রশীদ আছে না? উনার আব্বা তখন অলন্দপুরের মাতব্বর ছিলেন। উনার গোয়ালঘরেই বন্দি ছিলাম। দুই দিন পর আমাকে ছাড়ে। ছাড়া পেয়েই ইচ্ছে হচ্ছিল, গলায় কলসি বেঁধে ছুটে গিয়ে নদীতে ঝাঁপ দেই। কিন্তু পারিনি। শরীরে একটুও শক্তি ছিল না। দৌড়ে পালাতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ি গোয়ালঘরের বাইরে। ধারাল কিছু একটা ছিল মাটিতে। মাটিতে পড়তেই হাতের বাহু ছিঁড়ে গলগল করে নামে রক্তের ধারা। এই যে আমার বাহুর দাগটা, এটা সেদিনই হয়েছে।’হেমলতা মেয়েদের দাগটা দেখানোর জন্য ঘুরে তাকান। দেখেন তার দুই মেয়ে মুখে হাত চেপে কাঁদছে।হেমলতা হাসার চেষ্টা করে বললেন, ‘তোরা মরাকান্না শুরু করেছিস কেন?’হেমলতার কথা শেষ হতেই ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুই মেয়ে ছুটে আসে তার দিকে। নৌকা দুলে ওঠে। হেমলতা চমকে গিয়ে দ্রুত নৌকা ধরে নিজের ভারসাম্য রক্ষা করলেন। চিৎকার করে ওঠেন, ‘আরে…’কথা শেষ করার পূর্বেই বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে দুই মেয়ে। জড়িয়ে ধরেই আম্মা আম্মা বলে কাঁদতে থাকে। দুই মেয়ে এত শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে যে হেমলতার মনে হচ্ছে এখনি দম বেরিয়ে যাবে। তাদের কান্না থামার কোনো লক্ষণ নেই। হেমলতা দুজনের পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেন। কিছুতেই কিছু হলো না।তারা কেঁদেই চলেছে।হেমলতা কঠিন স্বরের ভান করে মোর্শেদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘নৌকা ঘুরাও। এদের আর কিছু বলব না।’পদ্মজা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকে বলল, ‘আর কাঁদব না। পূর্ণা আর কাঁদিস না। তোমাকে শুধু জড়িয়ে রাখি?’হেমলতা পদ্মজার মাথায় চুমু দিয়ে বললেন, ‘রাখ।’পূর্ণা নাক টানছে। হেমলতা বলছেন, ‘আমাদের এক ঘরে করে দেওয়া হলো। বাজারে ভেষজ উপায়ে আব্বার চিকিৎসা চলছিল। সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। কেউ পরিবারের মুখও দেখতে চায় না। দেখলেই এটা-ওটা ছুঁড়ে দিত। বলা হয়নি, সেদিন রাতে আব্বা-আম্মা মামার বাড়ি ছিল। ওই বাড়ির পাশে এক ডাক্তার থাকত, আব্বাকে দেখাতে গিয়েছিল। হানি আপার বিয়ে দেয়ার জন্য আম্মা উঠেপড়ে লাগে। তখন হিমেল আম্মার পেটে, সাত মাস চলে। আমার ওপর আম্মার মার প্রতিদিন চলতেই থাকে। আমার জন্য পরিবারের এত ক্ষতি হলো…হানিফ স্কুলে যেতে পারে না…সবাই দূর দূর করে…হানি আপার বিয়ে হয় না…আব্বার চিকিৎসা হয় না… বিপদ-আপদে কেউ পাশে আসে না…ওদিকে হিমেল আসার সময় ঘনিয়ে এসেছে…কোনো দাত্রী আসেনি।‘আম্মা একা যুদ্ধ করে হিমেলকে জন্ম দেয়। সব মিলিয়ে আমাদের জীবন নরক হয়ে ওঠে। বছর দুয়েকের মধ্যে আব্বা কিছুটা সুস্থ হন আল্লাহর রহমতে, হাঁটাচলা করতে পারেন…আগের মতো সবকিছু না বুঝলেও মোটামুটি বুঝতেন। হানি আপার বিয়ে ঠিক হলো। বনেদি ঘর থেকে প্রস্তাব এসেছিল। শর্ত একটাই—পাঁচ বিঘা জমি দিতে হবে। আমাদের জমি ছিল সাড়ে পাঁচ বিঘা। আম্মা পাঁচ বিঘা জমি দিয়েই হানি আপার বিয়ে দিলেন। সবকিছু স্বাভাবিক হলো। যদিও মাঝে মাঝে অনেকে কথা শুনিয়েছে। একসময় আমার বিয়ের প্রস্তাবও এলো। তোদের আব্বার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যে জানতে পারি তোদের আব্বার দ্বিতীয় স্ত্রী আমি।’শেষ কথাটা হেমলতা মোর্শেদের দিকে তাকিয়ে বললেন। মোর্শেদ চোখের দৃষ্টি নত করে ফেলেন। পূর্ণা খুব অবাক হয়ে তাকাল মোর্শেদের দিকে। হেমলতা পূর্ণাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘তোর আব্বাকে ভুল বুঝিস না মা। ভালোবাসার ওপর কিছু নেই। সে তার প্রেমিকাকে ভালোবেসে লুকিয়ে বিয়ে করেছিল। কাউকে জানতে দেয়নি আমাকে তার পছন্দ ছিল না। একসময় বিরক্ত হয়ে অনেক মারধোর করে। ভীষণ বদমেজাজি আর জেদি ছিল তোদের আব্বা। জোর করে তোদের দাদা বিয়ে করিয়েছিলেন, তাই রাগ মেটাত আমার উপর। বাদ সেসব কথা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। জান বাঁচানোর তাগিদে মানুষ যেদিকে পারে পালাতে থাকে। অলন্দপুরে পাকিস্তানি ক্যাম্প তৈরি হয়। শহর থেকে একটা দল আসে, যারা যুদ্ধ করতে চায় তাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করতে। তোদের আব্বা তার প্রথম স্ত্রীর কাছে বেশি থাকত। আবার তোর দুই চাচা যুদ্ধে চলে যায়। আমি একা ছিলাম খালি বাড়িতে। চারিদিকে অত্যাচার, জুলুম। ইচ্ছে করে দেশের জন্য কিছু করতে। মনে সাহস নিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি কমান্ডার আবুল কালামের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। প্রধান শিক্ষক গোপনে গ্রামের যুবক-যুবতীদের অনুপ্রেরণা দিতেন যুদ্ধের জন্য। এ খবর একসময় পাকিস্তানিরা পেয়ে গেল। তিনি শহিদ হলেন।‘ট্রেনিং-এ অংশ নিয়ে হয়ে উঠলাম একজন মুক্তিযোদ্ধা। প্রথম অপারেশনে আমরা সফল হই, উড়িয়ে দিই অলন্দপুরের ক্যাম্প। এরপর চলে যাই আরেক এলাকায়। হাতে রাইফেল নিয়ে পরবর্তী অপারেশনে নামি। তখন ধরা পড়ে যাই পাকিস্তানিদের হাতে। বন্দি করে কারাগারে। স্বচক্ষে দেখি ধর্ষণ, শারিরীক অত্যাচার। কী বর্বরতা তাদের! রড দিয়ে পিটিয়েছে। পিঠের দাগগুলো এখনো আছে। আরো কয়দিন থাকলে হয়তো আমিও ধর্ষিত হতাম। তার আগেই আবুল কালামের বুদ্ধির কাছে হেরে গেল তারা। ফেরার আগে চোখ বন্ধ করে এক নিশ্বাসে দুইজনকে ছুরি দিয়ে হত্যা করে আসি।‘দেশ স্বাধীন হয়। চারিদিকে স্বাধীনতার উল্লাস। আমি তখন হাসপাতালে, চিকিৎসাধীন। আরো অনেকে ছিল। সেই হাসপাতালেই যিশু ভাইয়েরও চিকিৎসা চলছিল। তিনিও একজন মুক্তিযোদ্ধা। রিমঝিমের সঙ্গে ফের দেখা হলো। এক মাস লাগল সুস্থ হতে। ফেরার সময় সঙ্গে আসে রিমঝিম আর যিশু ভাই। পথে বার বার করে বললাম, তোমাদের মতো দেখতে যেন আমার একটা মেয়ে হয়। অলন্দপুরের বাজারে নামিয়ে দিয়ে ওরা আর আসেনি, ফের যদি গ্রামের লোক দেখে ফেলে। কিন্তু আমার আশঙ্কাই ঠিক হলো। অনেকে যিশু ভাইয়ের সঙ্গে আমাকে দেখে ফেলে। বাড়িতে ফিরে দেখি তোদের আব্বা এসেছে। তিন মাস পর জানতে পারি আমি মা হব। মনে প্রাণে একটা সুন্দর মেয়ে চাইতে থাকি আল্লাহর কাছে। ঘুমালে স্বপ্ন দেখি রিমঝিমকে। আমার মন খুব চাইত রিমঝিমের মতো সুন্দর মেয়ে। ঠিক তাই হলো।‘কিন্তু রটে গেল বদনাম। অনেকে বলে তারা যিশুর সঙ্গে আমাকে দেখেছে, এতদিন যিশুর কাছে ছিলাম; তারই সন্তান পদ্মজা। সেজন্যই এত সুন্দর। আর এত মিল! তোদের আব্বাও বিশ্বাস করল। আল্লাহ চাইলে সব পারে কেউ বিশ্বাস করল না। কিন্তু জানিস, পদ্ম? তোর জন্মের পর থেকেই আমি অলৌকিকভাবে খুব শক্ত আর কঠিন হয়ে পড়ি। কেউ কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিয়ে দেই। তোর সম্পর্কে কেউ কিছু বলতে আসলে দা নিয়ে তেড়ে যাই। এ খবর ছড়িয়ে পড়ে সব জায়গায়। তার মধ্যে কমান্ডার আবুল কালাম আসেন অলন্দপুরে। গ্রামের অনেকে যুদ্ধে গিয়েছিল। আমি ছাড়া আর একজন ফিরেছিল, বদর উদ্দিন নাম। বদর উদ্দিন এবং আবুল কালামের কাছ থেকে গ্রামবাসী জানতে পারে আমিও যুদ্ধ করেছি। হেমলতা একজন মুক্তিযোদ্ধা। এ খবর শোনার পর থেকে সবাই মোটামুটি সমীহ করে চলতে থাকে। একটা শক্ত জায়গা দখল করে বাঁচতে থাকি। প্রতিটি ঘটনা আমাকে ভেতরে ভেতরে শক্ত করেছে। তুই জন্মের পর বুঝেছি, আমি অনেক কিছু পারি। একা চলতে পারি।’কথা শেষ করে হেমলতা হাঁফ ছাড়েন। চাঁদ ডুবে গেছে অনেকক্ষণ আগে। কিছুক্ষণের মধ্যে ফজরের আজান পড়বে। পদ্মজা-পূর্ণা স্তব্ধ।‘এই দুনিয়ায় বাঁচার দুটি পথ—চুপ থাকো, নয় প্রতিবাদ করো। কিন্তু আমার নিয়ম বলে, সামনে চুপ থেকে আড়ালে আবর্জনাটাকে ছুঁড়ে ফেলে দাও। যাতে এই আবর্জনার প্রভাবে আর কিছু না পঁচে।’হেমলতার শেষ কথাগুলো পদ্মজার রগে রগে শিহরণ জাগাল। সে দূরে চোখ রেখে কিছু ভাবতে থাকে। মানুষের জীবনে কত গল্প! কত যন্ত্ৰণা! হেমলতা নৌকা ঘোরাতে বললেন। মোর্শেদ তাই করলেন, বাড়ি ফিরতে হবে। আজ পদ্মজার গায়ে হলুদ। নৌকা চলছে ঢেউয়ের তালে তালে। আগের উত্তেজনাটা আর কাজ করছে না। একটা ইঞ্জিন ট্রলারের শব্দ পাওয়া গেল। চারজন চকিতে তাকাল সেদিকে। ট্রলারে একজন লোক, একজন ভেতর থেকে সাদা কাপড়ে মোড়ানো কিছু একটা নিয়ে বেরিয়ে এলো। আবছা আলোয় সাদা কাপড়ে মোড়ানো বস্তুটি দেখে পিলে চমকে উঠল পূর্ণার। মানুষ মরার পর সাদা কাপড়ে যেভাবে মোড়ানো হয়, ঠিক তেমন। এক মুহূর্তে পরেই লোক দুটি মোড়ানো বস্তুটি ছুঁড়ে ফেলে পানিতে।মোর্শেদ চেঁচিয়ে ওঠেন, ‘কে রে?’লোক দুটি একবার মোর্শেদের নৌকাটির দিকে দৃষ্টিপাত করে দ্রুত ট্রলারের ভেতর চলে গেল। মোর্শেদ তড়িঘড়ি করে বৈঠা চালিয়েও তাদের ধরতে পারল না। ট্রলারটি চোখের সামনে অদৃশ্য হয়ে গেল। যেখানে সাদা কাপড়ে মোড়ানো বস্তুটি ফেলা হয়েছে, সেখানে মোর্শেদের নৌকাটি পৌঁছাতেই হুট করে হেমলতা ঝাঁপিয়ে পড়েন পানিতে।পদ্মজা আকস্মিক ঘটনায় চমকে গেল। আতঙ্ক নিয়ে ডাকল, ‘আম্মা!’হেমলতার দেখা নেই। পদ্মজা নৌকা থেকে ঝাঁপ দিতে যাবে তখনি হেমলতা ভেসে উঠলেন। হাতে সাদা কাপড়ে মোড়ানো বস্তুটি। হেমলতা মুখ তুলে মোর্শেদ ও মেয়েদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘লাশ।’পূর্ণা লাশ শুনেই কাঁপতে থাকে। অথচ পদ্মজা স্থির, ঠান্ডা।অন্যদিকে হেমলতা এই শেষ রাত্রিরে নদীর জলে ভেসে আছেন দুই হাতে মৃত মানুষ জড়িয়ে ধরে!
লাশটি নৌকায় তুলতেই পূর্ণা ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে মোর্শেদের পাশ ঘেঁষে বসল। তার মনে হচ্ছে চারিদিক থেকে প্রেতাত্মারা তাকিয়ে আছে, যে কোনো মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘাড় মটকে দেবে। ঘাড় মটকানোর কথা ভাবতেই পূর্ণার ঘাড় শিরশির করে উঠল। ‘ভূত, ভূত’ বলে চেঁচিয়ে উঠল সে। হঠাৎ পূর্ণার চিৎকার শুনে মোর্শেদ ভয় পেয়ে যান। এমনিতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে লাশ দেখে।তিনি পূর্ণাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘কোনহানে ভূত? ডরাইস না।’মাথার কাছে বাঁধা দড়িটা খুলে কাপড় সরাতেই একটা মৃত মেয়ের মুখ দেখা গেল। হেমলতা আর পদ্মজা দুজনই ভেতরে ভেতরে চমকে উঠল। হেমলতা এদিক-ওদিক তাকিয়ে মানুষের উপস্থিতি দেখে নিলেন। এরপর কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলেন, ‘চিনি না তো। তুই চিনিস?’পদ্মজা মাথা নাড়িয়ে জানাল, সে চেনে না। পরপরই মোর্শেদকে ডাকল পদ্মজা, ‘আব্বা, দেখেন তো আপনি চিনেন নাকি?মোর্শেদ উঠে আসতে চাইলে পূর্ণা ধরে রাখে। মোর্শেদ পূর্ণাকে নিয়েই এগিয়ে আসেন। মৃত মেয়েটার মুখ দেখে বললেন, ‘না, এরে চিনি না।’হেমলতা চিন্তায় পড়ে যান, শরীরের পশম কাঁটা দিচ্ছে। চারিদিক অন্ধকারে ঢাকা, হীমশীতল বাতাস; আর সামনে সাদা কাপড়ে মোড়ানো এক মেয়ের লাশ।তিনি ব্যথিত কণ্ঠে বললেন, ‘কোন মায়ের বুক খালি হলো কে জানে!’পদ্মজা বিড়বিড় করে, ট্রলারের এক জনকে চেনা চেনা লাগছিল আম্মা।হেমলতা ধৈর্যহারা হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কে? চিনেছিস? নাম কী? জানিস?’পদ্মজা ভাবছে। গভীর ভাবনায় ডুবে কিছু ভাবছে। হেমলতার প্রশ্নের জবাবে বলল, ‘নাম জানি না। দাঁড়াও, আমি বলি লোকটা কেমন!পদ্মজা চোখ খুঁজে ফিরে গেল কিছুক্ষণ আগের মুহূর্তে। চোখ বোজা অবস্থাতেই বলল, ‘আব্বা যখন বলল, কে রে? তখন একটা লোক আমাদের দিকে তাকিয়েছিল। লোকটার চোখগুলো ভীষণ লাল। অনেক মোটা, খুব কালো। মাথার চুল ঝুটি বাঁধা ছিল। এমন একজন লোক আমি স্কুল থেকে ফেরার পথে অনেকবার দেখেছি।’ কথা শেষ করেই পদ্মজা চোখ খুলে খুশিতে গদগদ হয়ে বলল, ‘লোকটার দেখা পেলে আমি ঠিক চিনে ফেলব আম্মা।’‘চিনে কী হবে? প্রমাণ তো নেই। আর মেয়েটা মারা গেছে নাকি খুন সেটা তো জানি না।’‘প্রমাণ নেই তা ঠিক। কিন্তু মেয়েটা খুন হয়েছে, আম্মা। এই দেখো, মেয়েটার গলায় কদাগ। আর পেটের কাছে দেখো রক্তের দাগ। নদীর পানি পুরোটা রক্ত মুছে দিতে পারেনি।’হেমলতা অবাক হয়ে পদ্মজার কথামতো খেয়াল করে দেখেন। সত্যি তো! তিনি বিস্ময় নিয়ে বললেন, ‘একটার পর একটা খুন! হানিফের পর প্রান্তর বাপ…এরপর এই মেয়ে। আমি বুঝতে পারছি না, কে বা কারা এমন করছে।’‘ওই লোকটার দেখা যদি আরেকবার পাই—আমি ঠিক এর রহস্য বের করব,’ বলল পদ্মজা।মৃত মেয়েটার মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলেন হেমলতা। এরপর দড়ি দিয়ে আগের মতো বেঁধে মোর্শেদকে বললেন, ‘কলাপাড়ার দিকে যাও।’‘ওখানে কিয়ের কাম?’ বললেন মোর্শেদ।হেমলতা শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘কলা গাছের ভেলা বানিয়ে লাশ ভাসিয়ে দেব। পানিতে ফেললে কেউ পাবে না। ভাসিয়ে দিলে কেউ না কেউ পাবে। হয়তো মেয়েটার পরিবারও খুঁজে পাবে! আমাদের বাড়িতে এখন লাশ নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। অনেক মানুষ আছে। সবাই ভয় পাবে। বিয়ের আমেজটা চলে যাবে। তাড়াতাড়ি যাও, কলাপাড়ার দিকে নৌকা ঘুরাও।’.সকাল সকাল গায়ে হলুদ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বউ এখনো ঘুমে আচ্ছন্ন। বাড়ি ভরতি মানুষ। কলাগাছের ছাদ বানিয়ে সবাই অপেক্ষা করছে নতুন বউয়ের জন্য। হেমলতা কিছুতেই পদ্মজাকে ডাকতে দিচ্ছেন না। দুপুরের আজান পড়তেই পদ্মজা চোখ খোলে। যখন মনে পড়ল আজ তার গায়ে হলুদ তখন সে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। সেই কাকডাকা ভোরে বাড়ি ফিরে ঘুমিয়েছিল। তারপর আর কিছু মনে নেই। বালিশের পাশে হলুদ শাড়ি রাখা। পদ্মজা দ্রুত শাড়িটি পরে নিয়ে ডাকল পূর্ণাকে। বাইরের কোলাহল শোনা যাচ্ছে। পদ্মজা দরজা খুলতেই নয় বছর বয়সি একটা মেয়ে চেঁচিয়ে বাইরে খবর দিল, ‘পদ্ম আপার ঘুম ভাঙছে।’হেমলতা রান্নাঘরের সামনে বসে মুরগি কাটছিলেন।হানি উঠান থেকে হনহনিয়ে হেঁটে এসে হেমলতাকে শ্লেষাত্মক কণ্ঠে বললেন, ‘এবার তোর চাঁদকে নিয়ে যেতে পারি?’হেমলতা হেসে অনুমতি দিলেন, ‘যাও।’হানি, মনজুরাসহ সম্পর্কে ভাবি হয় এমন আরো দুজন পদ্মজাকে নিয়ে ঘর থেকে বের হলো। গান গাওয়ার জন্য ‘গীত গাওনি’ মহিলাদের খুব সমাদর করে আনা হয়েছে।গ্রামের মহিলারা মিলে গোলাকার হয়ে বসে গানের জলসা তৈরি করেছে। যারা যারা গান গাইতে পারে, তারা চারপাশে ঘুরে ঘুরে গাইছে।পদ্মজাকে দেখে সবার মনোযোগ তার দিকে চলে গেল। গায়ে হলুদের স্থান বাড়ির পেছনে। মোর্শেদ পথ আটকে গামছা কোমরে বাঁধতে বাঁধতে বললেন, ‘আমার ছেড়িরে আমি লইয়া যামু।’কথা শেষ করে মোর্শেদ পদ্মজাকে পাঁজকোলা করে তুলে নিলেন। হানি চেঁচিয়ে উঠে বললেন, ‘আরে মিয়া করেন কী! দুলাভাইরা কোলে নেয় তো।’‘বাপ নিলে বিয়া অশুদ্ধ হইয়া যাইব না।’পদ্মজা লজ্জায় শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল। অজানা অনুভূতিতে তার হাত পা কাঁপছে। উপস্থিত মানুষের উচ্ছ্বাস দ্বিগুণ বেড়ে যায়। প্রেমা-প্রান্ত অন্যান্য শিশুদের নিয়ে খুশিতে লাফাচ্ছে, একজন আরেকজনকে রং মাখিয়ে দিচ্ছে। কলা গাছের ছাদের নিচে খাটের ছোটো চৌকি রাখা। সেখানে পদ্মজাকে দাঁড় করিয়ে দেন মোর্শেদ। সামনে সাতটি বদনা, দশটি কলসি ভরতি পানি। একটি কুলোয় রাখা দূর্বা, ধান, হলুদ বাটা, হলুদ শাড়ি, ব্লাউজ, তোয়ালে ও সাবান।গীত গাওনিরা নেচে নেচে গীত গাইছে। শোনা যাচ্ছে—‘কালা বাইগুনের (বেগুনের) ধলা ফুল রুমালে গাঁথিয়া তুলকইনা লো তোর দয়াল বাবাজির মায়া তুল।বরির (বরইয়ের) গাছে কুমড়ার ফুলরুমালে গাঁথিয়া তুলকইনা লো তোর দয়া চাচাজির মায়া তুল।’‘কন্যা ডাক দেও তোর জননী না মাইরেমাও দিয়া যাওক সোনা মুখে হলদিরেহলুদা, ডাক দেও তোর জনমদাতা বাপেরেবাবা দিয়ে যাউক তোর সোনা মুখে হলদিরে।’গীতের তালে তালে ছেলেমেয়েরা একজন আরেকজনকে জোর করে ধরে হলুদ মাখিয়ে দিচ্ছে। পদ্মজার জন্য রাখা হলুদ অনেকেই নেয়ার জন্য ওঁত পেতে আছে, হানির জন্য পারছে না। হানি পাহারাদার হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ছেলে অনন্ত এসে হলুদ চাইলে হানি মার দেবেন বলে তাড়িয়ে দিলেন। হেমলতা ভিড় কমিয়ে চারিদিক পর্দা দিয়ে ঘিরে ফেলেন। মানুষে গিজগিজ করছে বাড়ি, অথচ দিন কয়েক আগে এরাই পদ্মজার সম্মান লুটে নিতে দেখেছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। এই গ্রামবাসীর প্রতি কোনো সহানুভূতি নেই তার। ছয়-সাত জন মহিলাকে নিয়ে হলুদের গোসল শেষ করলেন। অন্যান্য মহিলাদের না নেয়াতে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়ে গেল! গায়ে হলুদ করতে হয় সবাইকে নিয়ে, সবার সামনে…আনন্দ করতে করতে। হেমলতা কেন শুধুমাত্র ছয়-সাত জন নিয়ে করছেন? তিনি অবশ্য কারো কোনো কথার জবাবই দিলেন না।গোসল শেষ করে পদ্মজাকে হলুদ মসলিন শাড়ি পরানো হলো। কানের কাছে মনজুরা গুনগুন করে কাঁদছেন। পদ্মজার শুনতে ভালো লাগছে না। বিয়ে হলে নাকি এক সপ্তাহ আগে থেকে কান্নাকাটি শুরু হয়। গায়ে হলুদের দিন আত্মীয়রা কাদায় গড়াগড়ি করে কাঁদে। অথচ পদ্মজা, হেমলতা শান্ত!পদ্মজাকে গায়ে হলুদের খাবার দেয়া হলো। বিশাল এক থালা; তাতে কয়েক রকমের পিঠা, আস্ত একটি মুরগি, পোলাও, শাকসহ নানা পদ। পদ্মজা খা আগে অন্যরা কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে। লোক সমাগম কমতেই হেমলতা আলাদা করে প্লেটে করে ভাত আর মুরগির মাংস নিয়ে আসেন, নিজ হাতে খাইয়ে দেন মেয়েকে।খাওয়ার মাঝে পদ্মজার মনে পড়ে মনজুরা তখন বলেছিলেন, ‘বিয়ের পর মেয়েরা পর হয়ে যায়। মা-বাবা পর হয়ে যায়। স্বামী আর স্বামীর বাড়িই সব। মা-বাপের সঙ্গে দেখা করতেও তাদের অনুমতি লাগে।’পদ্মজা হেমলতার দিকে তাকিয়ে ভাত চিবোয়। হেমলতা খেয়াল করে দেখেন, পদ্মজা তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। চোখের পলক ফেলছে না। চোখজুড়ে চিকচিক করছে জল।তিনি শান্ত স্বরে বললেন, ‘খাওয়ার সময় কাঁদতে নেই।’আকস্মিক পদ্মজা ফোঁপাতে শুরু করল। হেমলতা সান্ত্বনা পর্যন্ত দিলেন না, পরবর্তী লোকমা মুখে তুলে দিলেন। ফোঁপাতে ফোঁপাতে খাবার শেষ করল পদ্মজা। চোখের জলে বুক ভিজে একাকার। হেমলতা মেয়ের সামনে শক্ত থাকলেও, ঘরের বাইরে এসে হাতের উলটো পাশ দিয়ে চোখের জল মুছতে লাগলেন। কী যে যন্ত্রণা হচ্ছে বুকে! কাঁদতে পারলে বোধহয় ভালো হতো। কিন্তু কাঁদার সময় কোথায়? সবার সামনে তো আর কাঁদতে পারেন না। ভিড় কমলে কাঁদবেন, অনেক কাঁদবেন, জীবনে শেষ বারের মতো কাঁদবেন। এরপর আর কখনো কাঁদবেন না ……কোনোদিনও না।পদ্মজার দুই হাতে গাছের মেহেদি লাগানো হচ্ছে। উঠানে বড়ো চৌকি পেতে তার চারিদিকে রঙিন পর্দা টাঙানো হয়েছে। কাগজের ফুল মাথার উপর ঝোলানো। চারিদিকে ঘিরে রয়েছে মেয়েরা। সামনের খালি জায়গায় চলছে নাচ।ঠিক তখনই সেখানে উপস্থিত হলো হাওলাদার পরিবার—লাবণ্য, রানি এবং তাদের আত্মীয়স্বজন; সঙ্গে নিয়ে এসেছে বউয়ের বেনারসি, গহনা। হানি ছুটে এসে সবার আপ্যায়নের ব্যবস্থা করলেন। সবার শেষে বাড়িতে ঢুকল আমির। বিয়ের আগের দিন রাতে বরের আগমন সবাইকে খুব হাসাল। কেউ কেউ বলল, এত সুন্দর বউ দূরে রাখার আর তর সইছে না তাই চলে এসেছে। আমির সেসব পাত্তা দিল না। সোজা হেমলতার কাছে গেল। গিয়ে বলল, ‘আম্মা, পদ্মজার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।’আমিরের অকপট অনুরোধ। হেমলতা ভীষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। এমন ছেলে তিনি দুটো দেখেননি।আমির আবার বলল, ‘বেশিক্ষণ না, একটু সময় চাইছি।’ আমিরের কণ্ঠ পরিষ্কার। মাথা নিচু। পরিবারের ভালো শিক্ষাই পেয়েছে। তবে লাজলজ্জা একদমই নেই।হেমলতা মৃদু হেসে বললেন, ‘ঘরে গিয়ে বসো। পদ্ম আসছে।’আমির হেমলতার পা ছুঁয়ে সালাম করে পদ্মজার ঘরের দিকে চলে গেল। হেমলতা পদ্মজাকে ডেকে নিয়ে এসে বললেন, আমির কথা বলতে চায়। ব্যাপারটা দৃষ্টিকটু, কিন্তু না তো করা যায় না। কোনো বিশেষ দরকার হয়তো।’পদ্মজা ঘরের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। পেছন ফিরে তাকাতেই হেমলতা ইশারায় যেতে বললেন। পদ্মজা ঘরে ঢুকে ডাগর ডাগর চোখ মেলে আমিরের দিকে তাকাল। আমিরকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে, মনে হচ্ছে কিছু নিয়ে খুব চিন্তিত। আমির পদ্মজাকে দেখেই হাসল। বলল, ‘বসো।’পদ্মজা বিছানার এক পাশে বসে। অন্য পাশে আমির বসে প্রশ্ন করে, ‘যা প্রশ্ন করি সত্যি বলবে।’পদ্মজা দৃঢ়কণ্ঠে বলল, ‘আমি মিথ্যে বলি না।’আমির অসহায়ের মতো বলল, ‘তুমি কি মন থেকে এই বিয়েতে রাজি?’পদ্মজা চকিতে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গেই চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল, ‘আম্মা যখন যা করেছেন তাই আমি মন থেকে মেনে নিতে পেরেছি।’আমির বলল, ‘লিখন শাহ তো তোমাকে পছন্দ করে।’‘জানি। আর আপনি জানেন সেটাও জানি।’আমি আমাদের বিয়ে ঠিক হওয়ার পর জেনেছি। তুমি…তুমি মনে কিছু নিয়ো না, বলতে চাইছি, যদি তোমার আমাকে অপছন্দ হয় আর লিখন শাহকে ভালোবেসে থাকো বলতে পারো। আমি বিয়ে ভেঙে দেব।’পদ্মজা অপমানে লাল হয়ে গেল। থমথমে গলায় বলল, ‘অবিশ্বাস থাকলে বিয়ে না হওয়াই ভালো। আপনি ভেঙে দিতে পারেন।’আমিরের চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। পদ্মজা ধারালো স্বরেও কথা বলতে পারে! আমির ইতস্তত করে বলল, ‘আমার কোনো অবিশ্বাস নেই। তোমার মনে কেউ না থাকলে বিয়ে আমার সঙ্গেই হবে। আর কারোর সঙ্গে হতে দেব না।’পদ্মজা কিছু বলল না। উঠে যেতে চাইলে আমির অনুনয়ের সঙ্গে বলল, ‘একবার হাত ধরা যাবে?’‘আজ নয়, আগামীকাল।’ বলার সময় পদ্মজার ঠোঁটে দেখা গেল হাসির রেখা।আমির সেটা খেয়াল করে মুগ্ধস্বরে বলে উঠল, ‘সুবহানআল্লাহ।’.বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে অনেকক্ষণ আগে। পদ্মজা বধূ সেজে বসে আছে। দুই পাশে বসে আছে পূর্ণা ও প্রেমা। কাজী বিয়ে পড়াচ্ছেন। অনেকক্ষণ ধরে পদ্মজাকে কবুল বলতে বলছেন। পদ্মজা কিছুতেই বলছে না। সে একমনে হেমলতাকে খুঁজছে। বউ কবুল বলছে না শুনে অনেকে ভিড় জমিয়েছে। হেমলতা সেই ভিড় ভেঙে ঘরে ঢুকলেন। হেমলতাকে দেখে পদ্মজার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল, ছলছল চোখ নিয়ে তিনবার কবুল বলল সে। হেমলতার দুই চোখে পানি, ঠোঁটে হাসি। পদ্মজাকে বধূ সাজাবার পর এই প্রথম দেখলেন তিনি। লাল বেনারসিতে পদ্মজার রূপ যেন গলে গলে পড়ছে। পাশের ঘরে কে যেন কাঁদছে! হেমলতা দেখতে গেলেন।আয়না দেখানো পর্ব শুরু হয়। আয়নায় তাকাতেই আমির চোখ টিপল। পদ্মজা লজ্জা পেয়ে সরিয়ে নিলো দৃষ্টি। আমির সবার চোখের আড়ালে খপ করে ধরে ফেলল পদ্মজার এক হাত। স্বামীর অধিকার নিয়ে ধরা প্রথম স্পর্শে কেঁপে উঠে পদ্মজা। অদ্ভুত এক অনুভূতিতে তলিয়ে যেতে থাকে সে।আমির ফিসফিস করে বলল, ‘এই যে ধরলাম, মৃত্যুর আগে ছাড়ছি না।’ বিয়ে বাড়ির কোলাহল কমে গেছে। বিদায়ের পালা চলছে। করুণ কান্নার স্বরে চারিদিক হাহাকার করছে। মনজুরা, হানি কেঁদে কুল পাচ্ছে না। মোর্শেদ নদীর ঘাটে বসে গোপনে চোখের জল ফেলছেন। পূর্ণা পদ্মজার গলা জড়িয়ে সেই যে কান্না শুরু করেছে থামছেই না। কাঁদছে প্রেমা ও প্রান্ত। একটা মেয়ের বিয়ের বিদায় পর্ব কতটা কষ্টের তা শুধু সেই মেয়ে আর তার পরিবার জানে। পদ্মজা পূর্ণার মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বার বার বলছে, ‘বোন, বোন আমার। মন খারাপ করে থাকবি না কিন্তু। একদম কাঁদবি না। আমি আসব। তুইও যাবি। আমার খুব কষ্ট হবে রে বোন। আর কাঁদিস না। এভাবে কাঁদলে অসুস্থ হয়ে যাবি।একজন তাড়া দেয়, সন্ধে হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি করুন।’পদ্মজা আকুল হয়ে কেঁদে ডাকল, ‘আম্মা…আমার আম্মা কোথায়? আম্মা, ও আম্মা।’হেমলতা লাহাড়ি ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পদ্মজার ডাকে সাড়া দিতে সামনে এগোতে থাকেন। প্রতি কদমে কদমে বুক ব্যথায় চুরমার হয়ে যাচ্ছে। তবুও হাসার চেষ্টা করছেন। কিন্তু পারছেন না। যে মেয়ের জন্য তিনি নতুন করে জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছিলেন সেই মেয়ের আজ বিদায়! সারাজীবনের জন্য অন্যের ঘরে চলে যাবে। হেমলতাকে দেখেই পদ্মজা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। হেমলতা দ্রুত চোখের জল মুছে, পদ্মজাকে আদুরে কণ্ঠে বললেন, ‘এভাবে কাঁদতে নেই মা। বিয়ে তো হবারই কথা ছিল।’‘আম্মা, তোমাকে ছাড়া কেমন করে থাকব?’‘সবাইকেই থাকতে হয়। আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে মা।হেমলতা পদ্মজার চোখেমুখে কপালে চুমু খেয়ে, দুই চোখের জল মুছে দিয়ে বললেন, শ্বশুর বাড়ির সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকবি। নিজের খেয়াল রাখবি।’পদ্মজা হাউমাউ করে কাঁদছে। হেমলতাকে জোরে চেপে ধরে বলল, ‘আম্মা আমি যাব না। আম্মা যাব না আমি।’হেমলতা পদ্মজার মুখের দিকে চাইতে পারছেন না। ভাঙা গলায় আমিরকে ডেকে বললেন, ‘বাবা, নিয়ে যাও আমার মেয়েকে। ওর খেয়াল রেখো। ওর আব্বা ঘাটে বসে আছে। ডাকতে হবে না, একা থাকুক। তোমরা পদ্মকে নিয়ে যাও। সন্ধে হয়ে যাচ্ছে।’আমির নম্রকণ্ঠে বলল, ‘পদ্মজাকে সারাজীবন আগলে রাখব। আপনি চিন্তা করবেন না।হেমলতা কৃতজ্ঞচিত্তে তাকিয়ে রইলেন শুধু কিছু বলতে পারলেন না। চোখ বেয়ে টুপটুপ করে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে মাটিতে পদ্মজার বেনারসিতে।আমির পদ্মজাকে পাঁজকোলা করে নেয়। পদ্মজা আকুতিভরা কণ্ঠে হেমলতাকে ডেকে অনুরোধ করে, ‘আম্মা আমাকে ধরো। ওরা নিয়ে যাচ্ছে, আম্মা…’হেমলতা মুখ ঘুরিয়ে নেন। পূর্ণা দুই হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। পদ্মজাকে পালকিতে বসিয়ে তার গালে দুই হাত রেখে আমির বলল, ‘কেঁদো না আর। একদিন পরই আসব আমরা।’পদ্মজা দুই হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠে। সব কিছু শূন্য লাগছে। মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে গেছে। পালকি ছুটে চলছে শ্বশুরবাড়ি।পূর্ণা হেমলতাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আম্মা কেন বিয়ে দিলে আপার? তোমার কি কষ্ট হচ্ছে না?’হেমলতা হাঁটুভেঙে মাটিতে বসে পড়েন। পূর্ণাকে জড়িয়ে ধরে গগন কাঁপিয়ে চিৎকার করে কেঁদে ওঠেন। উপস্থিত সবার কান্না থেমে যায়। তিনি বলেন, ‘আমি যদি পারতাম তাহলে আমার পদ্মর বিয়ে দিতাম না পূর্ণা। ও যে আমার সাত রাজার ধনের চেয়েও বেশি।’হানি বরাবরই কাঁদুক স্বভাবের। হেমলতা কখনো কাঁদে না। সেই হেমলতাকে এভাবে কাঁদতে দেখে তিনি নিজেও কান্না লুকিয়ে রাখতে পারলেন না।হেমলতার মাথা বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে ভেজা কণ্ঠে বললেন, ‘এটাই তো নিয়ম। কেঁদে আর কী হবে?’হেমলতা মুহূর্তে ছোটো বাচ্চা হয়ে গেলেন। হানিকে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। বললেন, ‘আপা, আপা ওরা আমার মেয়ে নেয়নি। আমার কলিজা ছিঁড়ে নিয়ে যাচ্ছে। আপা, কেন বিয়ে দিতে হলো আমার পদ্মর?’মনজুরা হেমলতার মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দেন, ‘দেখিস পদ্ম খুব ভালো থাকবে। ও খুব ভালো মেয়ে।’হেমলতা হানিকে ছেড়ে মনজুরাকে জড়িয়ে ধরলেন। হাত পা ছুঁড়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আম্মা, আম্মা তুমি কখনো আমাকে কিছু দাওনি এইবার আমার এই মরণ কষ্টটা কমিয়ে দাও। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আম্মা, আমার পদ্মকে ছাড়া আমি কীভাবে থাকব?মনজুরার বুক ধুকপুক করছে। জন্মের পর হেমলতা কী কখনো এভাবে কেঁদেছে? মনে পড়ছে না। তিনি পারেননি হেমলতার এই কষ্ট কমাতে। শুধু বুকের সঙ্গে চেপে ধরে রাখলেন। এভাবে যদি ছোটো থেকে আগলে রাখতেন, হেমলতার জীবনটা এত কষ্টের হতো না।.পদ্মজা ছটফট করছে। কিছু ভালো লাগছে না। ইচ্ছে হচ্ছে ছুটে যেতে মায়ের কাছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। এখুনি মারা যাবে হয়তো। পদ্মজা হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, ‘থামো তোমরা, থামো। আল্লাহর দোহাই লাগে থামো।’পদ্মজার চিৎকার শুনে আমির ভড়কে যায়, বেয়াড়াদের দ্রুত থামতে বলে। পালকি থেমে যায়। পদ্মজা পালকি থেকে মাটিতে পা রেখেই মোড়ল বাড়ির দিকে ছুটতে থাকল। কেউ আটকে রাখতে পারল না। সবাইকে ধাক্কা দিয়ে দূরে ঠেলে ছুটে চলেছে সে মায়ের বুকে। আমির শুধু চেয়ে রইল। সন্ধ্যা নামার পূর্ব মুহূর্তে একটা লাল বেনারসি পরা অপরূপ সুন্দরী মেয়ে ছুটছে। দেখতেও ভালো লাগছে।
‘আম্মা…’পদ্মজার কণ্ঠে আম্মা ডাকটি হেমলতার অস্তিত্ব মাড়িয়ে দিয়ে যায়। হেমলতা থমকে গিয়ে ঘুরে তাকান। উঠে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত হতেই পদ্মজা ঝাঁপিয়ে পড়ে বুকে। হেমলতা টাল সামলাতে না পেরে আবার মাটিতে বসে পড়েন। পদ্মজা নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাঁদতে থাকল। হেমলতা সীমাহীন আশ্চর্য হয়ে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। নির্বাক, স্তব্ধ থেকে শুধু পদ্মজার কান্না অনুভব করছেন। কান্নার দমকে পদ্মজার শরীর ঝাঁকি দিচ্ছে বারংবার।পূর্ণা পদ্মজাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আপা… আর যেয়ো না।’পদ্মজা অনুরোধ স্বরে হেমলতাকে বলল, ‘আম্মা আমি যাব না।’হেমলতার দুই চোখ বেয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। প্রতি ফোঁটা জল পদ্মজার বুকে সাইক্লোন, টর্নেডোসহ সব ধরনের দুর্যোগ বইয়ে দিচ্ছে। হেমলতা শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন পদ্মজাকে। অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘কোথাও যেতে হবে না তোর।’হেমলতার এহেন কথা শুনে হানি, মনজুরার মাথায় বাজ পড়ল। সে কী কথা! হেমলতা একবার যখন বলেছে তাহলে সত্যি যেতে দিবে না। তাহলে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কী দরকার ছিল! হানি শক্ত কিছু কথা শোনানোর জন্য প্রস্তুত হয়। তখনই হেমলতা পদ্মজাকে সরিয়ে দেন নিজের কাছ থেকে। চোখে মুখ শক্ত করে কাঠ কাঠ কণ্ঠে বললেন, ‘এটা ঠিক করিসনি পদ্ম! এভাবে চলে আসা মোটেও ভদ্রতা নয়। আবেগকে এত প্রশ্রয় দিতে নেই। বিয়ে দিয়েছি এবার শ্বশুর বাড়ি যেতেই হবে। ওই তো আমির এসেছে।’হেমলতা হাত ঝেড়ে মাটি থেকে উঠে দাঁড়ান। হঠাৎ মায়ের রূপ পালটে যাওয়াতে পদ্মজা স্তব্ধ হয়ে যায়। হাঁ করে তাকিয়ে আছে। সে ভাবছে, চোখের পলকে আম্মা পালটে গেল কেন? এই তো মাত্রই কাঁদছিল!.পদ্মজা নিজের চুলে আঙুল পেঁচাতে পেঁচাতে হাসছে। তুষার রয়ে সয়ে প্রশ্ন করল, ‘হাসছেন কেন?’পদ্মজা নাটকীয়ভাবে ব্যথিত স্বরে বলল, ‘আপনি কাঁদছেন তাই।’তুষার দ্রুত চোখের জল মুছল। মৃদু হেসে বলল, ‘কাঁদছি নাকি!’পদ্মজা হঠাৎ গুনগুনিয়ে কাঁদতে শুরু করল। তুষার জানতে চাইল, ‘আপনি কাঁদছেন কেন?’মুহূর্তে পদ্মজা দাঁত কেলিয়ে হেসে উঠে। চোখে জল ঠোঁটে হাসি নিয়ে বলল, ‘মনে চাইল তাই। আম্মা বলতেন, যখন যা ইচ্ছে হয় করে ফেলতে। তাতে কারো ক্ষতি বা নিজের কোনো ক্ষতি না হলেই হলো।’‘আপনার মায়ের খবরটা গতকাল শুনলাম। জানেন সারারাত ঘুমাতে পারিনি।’‘আপনার মনটা খুব নরম, স্যার। কিন্তু কঠিন ভাব নিয়ে থাকেন, আমার আম্মার মতো।’‘তারপর কী হলো?’পদ্মজা চেয়ার ছেড়ে মেঝেতে বসে শিশুসুলভ ভঙ্গিতে বলল, ‘আর তো বলব না।’তুষার শ্বাসরূদ্ধকর কণ্ঠে প্রশ্ন করল, ‘কেন?’পদ্মজা ঘাড়ে এক হাত রেখে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বলল, ‘এমনি।’‘হেয়ালি করবেন না, পদ্মজা। আপনি ছাড়া এই রহস্যের কিনারা অসম্ভব। আপনার পুরো গ্রাম আপনার বিপক্ষে। খুনের কারণ ও কেউ বলতে পারছে না। আমরা তদন্ত করেও কুল পাচ্ছি না।’পদ্মজা চোখ গরম করে তাকাল। কটমট করে বলল, ‘বলব না মানে বলব না।’তুষার দ্বিগুণ গলা উঁচিয়ে বলল, ‘তাহলে এতটুকু কেন বললেন?’‘আমার ইচ্ছে হয়েছে তাই।’‘আপনার ইচ্ছায় সব হবে না।’‘যা খুশি করে নিতে পারেন।’পরিস্থিতি বিগড়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামলাতে তুষার দুই হাতে মুখ ঢেকে রাগ নিয়ন্ত্রণ করে। এরপর ধীরেসুস্থে বলল, ‘দেখুন যদি সব খুলে না বলেন, তাহলে আমি আপনাকে আইনের হাত থেকে বাঁচাতে পারব না। নির্দোষ প্রমাণ করতে পারব না। আর আমার মন বলছে, আপনি দোষ করতে পারেন না।’‘সবসময় মন সঠিক কথা বলে না।’‘তাহলে বলছেন, আপনি নির্দোষ না?’পদ্মজা চোখ সরিয়ে নিলো। হাসল। কী যন্ত্রণা! কত কষ্ট সেই হাসিতে! চোখ ভরতি জল নিয়ে আবার তাকাল তুষারের দিকে। বলল, ‘আমি খুন করেছি। একই রাতে, একই প্রহরে, একই জায়গায় একসঙ্গে পাঁচ জনকে। আপনার আইন যা শাস্তি দেয়—তা আমি মাথা পেতে নেব।’তুষার অধৈর্য হয়ে বলল, ‘আপনার ফাঁসির রায় হবে—পদ্মজা। আপনি বুঝতে পারছেন না। আমার আপনাকে বাঁচাতে ইচ্ছে হচ্ছে।’‘ওপারে যাওয়া আমার জরুরি। আমি সব রায় মেনে নেব।’‘আমি মানতে পারব না,’ তুষারের অকপট স্বীকারোক্তি। কথাটা মুখ থেকে বের হওয়ার পর তুষার বুঝল সে অচেনা এবং ভয়ংকর অনুভূতি নিয়ে খেলছে। পদ্মজার দিকে চেয়ে অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। পদ্মজা তুষারকে পরখ করে নিয়ে হাসল। শান্ত ভঙ্গিতে বলল, এত ব্যকুল কেন হচ্ছেন? আমার প্রেমে পড়ে যাননি তো?তুষার থতমত খেয়ে গেল, বেশ অনেকক্ষণ বসে রইল গাঁট হয়ে। ওপর থেকে আদেশ এসেছে—পদ্মজা কেন এতগুলি খুন করেছে, সেই রহস্য উদঘটন করতে। না পারলে চাকরি চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।চাকরি চলে যাক সমস্যা নেই, নিজের শান্তির আর আত্মতৃপ্তির জন্য হলেও পদ্মজার পেছনের ছয়টি বছরের গল্প জানতেই হবে। এই কেস হাতে পাওয়ার পর থেকে তার ঘুম হচ্ছে না রাতে। সারাক্ষণ মস্তিষ্ক কিলবিল করে। এত জটিল কেস কখনো ফেস করতে হয়নি। অলন্দপুর পুরোটা ঘেঁটেও কিছু জানা যায়নি। যারা খুন হয়েছে তারা আর পদ্মজা ছাড়া হয়তো কেউ জানেও না। তুষার আবার বলল, ‘আপনার বিরুদ্ধে সব প্রমাণ। আপনার বিরুদ্ধে সবাই সাক্ষী দিচ্ছে। আপনি কী…’কথার মাঝপথে তুষারকে থামিয়ে দিয়ে পদ্মজা বলল, ‘খুনগুলো তো সত্যি আমি করেছি। তাহলে প্রমাণ আমার বিরুদ্ধেই তো থাকবে।’তুষারের মন বিরক্তে তেঁতো হয়ে যায়। পদ্মজার সামনে কয়েকবার পায়চারি করে বেরিয়ে গেল সে, সিগারেট ফুঁকে মাথা ঠান্ডা করল। চা নিয়ে এলো ফাহিমা। তুষার শুধাল, ‘মেয়েটাকে তোমার অপরাধী মনে হয়?‘আমি কিছু ভাবতে পারছি না, স্যার। মেয়েটাকে দেখলে আমার হাত- পা অবশ হয়ে পড়ে। এত মেরেছি কিছুতেই ঢুঁ শব্দটাও করেনি! এরপর থেকে আমি রাতে ভয়ংকর স্বপ্ন দেখি।’‘পৃথিবীটা রহস্যে ঘেরা, ফাহিমা। একজন নারী পাঁচ জনকে কীভাবে খুন করতে পারে? আবার একসঙ্গে? সেই সাহস কী করে পেল?’‘সেটা আমিও ভাবছি, স্যার। কীভাবে খুন করেছে সেটা ধারণা করা যাচ্ছে। কিন্তু এত সাহস, ধৈর্য কীভাবে কোনো নারীর থাকতে পারে!‘নারীরা চাইলে সব পারে কথাটা শুনে এসেছি। এবার স্বচক্ষে দেখছি।’‘জি, স্যার।’‘কত আসামি পায়ে পড়ে জীবন ভিক্ষা চেয়েছে। কিছুতেই মন গলেনি। মন কাঁদেনি। এই মেয়েটা জীবন চায় না; তবুও আমার ইচ্ছে হচ্ছে নতুন একটা জীবন পাবার সুযোগ করে দিতে, নির্দোষ প্রমাণ করতে।’ফাহিমা অবাক হয়ে তাকাল তুষারের দিকে। তুষার কখনও হু, হ্যাঁ-এর বাইরে কিছু বলে না। খুব কঠিন, কাঠখোট্টা একটা মানুষ। অনুভূতি বলতে কিছু নেই। তার মুখে এই ধরনের আবেগী কথাবার্তা শুনে অবাক হচ্ছে ফাহিমা।‘পরিস্থিতি হাতের বাইরে। পদ্মজার ফাঁসি দেখার জন্য দেশ উতলা হয়ে আছে।‘কেন এমন হচ্ছে, ফাহিমা?’‘আজ যদি হেমলতা উপস্থিত থাকতেন গল্পটা অন্যরকম হতো, স্যার।’ তুষার আবার ফিরে এসে পদ্মজার সামনের চেয়ারে বসল। ধীরকণ্ঠে বলল, ‘আজই শেষ দিন। এরপর আর আমাদের সাক্ষাৎ হবে না।’পদ্মজা চমকে তাকাল। দ্রুত তুষারের পায়ের কাছে বসে বলল, ‘আপনার আম্মা কি আপনাকে বিয়ের জন্য খুব চাপ দেয়?’‘আপনি কী করে জানলেন?’‘সেদিন দেখলাম ফোনে কাউকে আম্মা ডেকে রেগে বিয়ে না করার কথা বলছিলেন।’‘আমি তো অনেক দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলাম। আপনার শ্রবণ শক্তি তো প্রখর,’ তুষার বলল। লম্বা নিশ্বাস নিয়ে আবার যোগ করল, ‘কোন কথাটা লুকিয়ে আপনার মা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন?’‘আপনি জানলেন কী করে?’‘কিছু তথ্য পেয়েছি গতকাল। এইটুকুর জন্য বিশ্বাসঘাতক অপবাদ দিতে পারেন না। উনি আপনার ভালোর জন্যই…’পদ্মজা চুপ থেকে হুট করে ফোঁস করে জ্বলে উঠে বলল, ‘আপনি বুঝবেন না আমার কষ্ট। না পাওয়া দামি সময়টাকে আমি কতবার মনে করে বুক ভাসিয়ে কেঁদেছি—বুঝবেন না আপনি।’পদ্মজা কাঁদতে কাঁদতে হেসে উঠল। আবার পরক্ষণেই কান্না শুরু করল করুণস্বরে, গা কাঁপিয়ে তোলার মতো কান্না। মনে হয় কোনো অশরীরী কাঁদছে। কী বিশ্রি, ভয়ংকর সেই কান্নার ছন্দ।তুষারের কান ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে। চিন্তায় মাথার রগ দপদপ করছে। আগামীকাল ভোরে পদ্মজাকে কোর্টে তোলা হবে, রায় হবে। পদ্মজার ফাঁসি চাই বলে রাস্তায় রাস্তায় মিছিল হচ্ছে, রেডিয়োতে চলছে আন্দোলন। কিন্তু তুষারের মন যে কিছুতেই মানতে পারছে না। এমন নিষ্পাপ মনের, অপরূপ সুন্দরীর বিরুদ্ধে পুরো পৃথিবী!কী আশ্চর্য!বাঁকা রাস্তা পেরিয়ে পালকি চলছে ধীরে ধীরে। সন্ধ্যার আজান পড়েছে কিছুক্ষণ আগে। দিনের আলো কিছুটা এখনও রয়ে গেছে। দক্ষিণ দিক থেকে ধেয়ে আসছে হাওয়া। শীতল, নির্মল পরিবেশ। পদ্মজার বুক ধুকপুক করছে। নতুন মানুষ নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারবে তো! একবার সে হাওলাদার বাড়ি গিয়েছিল। অন্দরমহল নামে এক বিশাল বাড়ি আছে। সেই বাড়িতে মেয়ে-বউরা থাকে। এখন কী সেও থাকবে? পদ্মজা পর্দার ফাঁকফোকর দিয়ে বাইরে চোখ মেলে তাকাল। আমির হাতে পাগড়ি নিয়ে তার বড়ো ভাইয়ের সঙ্গে আলোচনা করছে। চোখেমুখে উপচে পড়ছে খুশি। পদ্মজা চোখ সরিয়ে নিলো। মায়ের কথা, পূর্ণার কথা খুব মনে পড়ছে।অন্দরমহলে মেয়েরা অপেক্ষা করছে নতুন বউয়ের জন্য। আমির গেটের সামনেই পালকি থামিয়ে দিয়েছে। জাফর বিরক্তিতে ‘চ’-এর মতো শব্দ করে বলল, ‘এইখানে আবার থামালি কেন?’আমির পাগড়ি রিদওয়ানের হাতে দিয়ে বলল, ‘আমার বউ আমার কোলে চড়ে অন্দরমহলে যাবে।’পদ্মজা কথাটা শুনেই কাঁচুমাচু হয়ে চুপসে গেল। আমির পালকির পর্দা সরিয়ে হাত বাড়িয়ে নামতে ইশারা করল। পদ্মজার নাক অবধি টানানো ঘোমটা। আমির সরাতে গিয়েও সরাল না। মুখে বলল, ‘কী হলো? নেমে আসো।’পদ্মজা লজ্জায় জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছে। সে গাঁট হয়ে বসে রইল। আমির হেসে নিজের কপাল চাপড়াল এক হাতে, এরপর নিজেই টেনে নামাল পদ্মজাকে। তখনো পদ্মজার নাক অবধি ঘোমটা। আমির চট করে তাকে পাঁজকোলা করে নেয়। কুঁকড়ে গেল পদ্মজা, ভয়ে দুহাতে জড়িয়ে ধরল আমিরের গলা। আমির যত এগোচ্ছে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তার গায়ের উষ্ণতা পদ্মজার শাড়ি ভেদ করে সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে। অচেনা, অজানা অনুভূতিরা যেন জেঁকে বসেছে চারিদিকে।মরণ প্রেমের সূত্রপাত এখান থেকেই শুরু হয়!
অন্দরমহলের সদর দরজায় গ্রামের মেয়েদের ভিড় জমেছে, সবাই দেখতে এসেছে নতুন বউকে। আমিরের কোলে পদ্মজাকে দেখে মিটিমিটি হাসছে। ফিসফিসিয়ে একজন আরেকজনকে কিছু বলছে। ফরিনা ধমক দিয়ে কোলাহল থামিয়ে দিলেন। আমির দরজার সামনে উপস্থিত হতেই আনিসা বলল, ‘এইবার বউকে নামান ছোটো ভাই। বড়ো আম্মার পা ছুঁয়ে সালাম করে এরপর ঘরে ঢুকেন।’আনিসা আমিরের চাচাতো ভাইয়ের বউ, জাফরের স্ত্রী। দেশের বাইরে থাকে। ঢাকার স্বনামধন্য এক ভার্সিটির প্রফেসরের মেয়ে আনিসা। বিয়ের পরপরই স্বামী নিয়ে দূর-দূরান্তে পাড়ি জমিয়েছিল। দুই সপ্তাহ আগে ছুটি কাটাতে শ্বশুরবাড়ি এসেছে। আনিসার কথামতো আমির পদ্মজাকে কোল থেকে নামিয়ে দিল। এরপর দুজন নত হয়ে সালাম করল ফরিনাকে। ফরিনা হেসে ছেলে এবং ছেলের বউকে চুমু খেলেন। আবেগে আপ্লুত হয়ে বললেন, ‘সুখী হ, বাবা। বউয়ের খেদমতে জীবনভর ভালা থাক। আমার কইলাম বছরের মধ্যেই নাতি চাই।’লাবণ্য ফোড়ন কাটল, ‘পদ্ম আমার লগে শহরে যাইব আম্মা। আমরা একলগে কলেজে পড়াম। নাতি-টাতি পরে পাইবা।’ফরিনা ক্ষুধার্ত বাঘিনীর মতো তেড়ে এসে লাবণ্যর গালে চড় বসিয়ে দিয়ে উঁচু কণ্ঠে বললেন, ‘আমার কথার পিছে কথা কওনের সাহস দেখাবি না।’আকস্মিক ঘটনায় সবাই হকচকিয়ে যায়। পদ্মজা অবাক চোখে তাকাল। সামান্য কথার জন্য কোনো মা এত মানুষের সামনে যুবতী মেয়েকে মারে? লাবণ্য লজ্জায়-অপমানে কাঁপতে লাগল, চোখে টলমল জল নিয়ে পালিয়েই গেল একরকম। ফরিনার চোখেমুখে কাঠিন্য ফুটে আছে। পদ্মজা ভয়ে চোখের দৃষ্টি মাটিতে রাখে। ফরিনা পদ্মজার হাতে ধরে ভেতরে নিয়ে যেতে যেতে বললেন, ‘মুখে মুখে কথা কইবা না কুনুদিন। যা কই মাইন্যা চলবা। শ্বশুর বাড়ির সব মানুষ হইতাছে গিয়া দেবতার লাহান। তাগোরে সেবা করলেই জান্নাত পাওন যাইব। নইলে কুনুদিন জান্নাতে পাও দিতে পারবা না। হুনছি তো তুমি হইছো গিয়া অনেক বাধ্য ছেড়ি। কামে-কাজেও হেইডা দেখাইবা। আমার কথা গুলান মনে রাখবা।’পদ্মজা মাথা নাড়ায়। মুসলমানদের দেবতার সঙ্গে তুলনা করাটা পদ্মজার ভালো লাগেনি। কিছু কথা গলায় এসেও আটকে গেছে। বলার সাহস পাচ্ছে না।ফরিনা আবার বললেন, ‘হুনো বউ, স্বামীর উপরে কিচ্ছু নাই। স্বামীরেই দুনিয়া ভাববা, মা-বাপ, ভাই-বোন হইছে গিয়া পর। স্বামী আপন। স্বামীর বাইরে কিছু ভাববা না। স্বামী যা কয় তাই মানবা। নিজের হাতে স্বামীর পা ধুইয়া দিবা। স্বামী বইতে কইলে বইবা, উঠতে কইলে উঠবা, হুত্তে কইলে হুইবা। স্বামী যহন কাছে ডাকব না করবা না। আল্লাহ বেজার হইব। ফেরেশতারা অভিশাপ দিব। দুনিয়াত স্বামীর আদরের থাইকা মধুর আর কিছু নাই।’পদ্মজা অপ্রতিভ হয়ে উঠেছে। লজ্জায়, আড়ষ্টতায় সারা শরীর ঘামছে। আনিসা ফরিনাকে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘বড়ো আম্মা, অনেক মানুষ আছে তো। এসব পরেও বলতে পারতেন।’আনিসার কথা পুরোপুরি উপেক্ষা করলেন ফরিনা। তিনি পদ্মজাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে আবারও বলতে শুরু করলেন, ‘খালি স্বামী লইয়াও পইড়া থাহন যাইব না। তোমার শ্বশুর-শাশুড়ি জীবিত আছে। তাগোর সেবা করবা। যহন যা করতে কই, করবা। না পারলে কইবা, শিখাইয়া দিয়াম। হত্তিদিন ভোরে উঠবা। নামাজ পইড়া রান্ধাঘরে যাইবা। তহন বাকিসব ভুইলা রান্ধনে মন দিবা।’আমির কপালের চামড়া কুঁচকে মায়ের কথা শুনছিল। এবার সে ধৈর্যহারা হয়ে বলল, ‘রান্নাবান্না করার জন্য অনেক মানুষ আছে আম্মা। পদ্মজা রাঁধতে হবে না। আর আমার এত সেবাও লাগবে না। বড্ড ক্লান্ত লাগছে। ভিড় কমাও। আর নিয়মনীতি শেষ করো। এরপর আমার বউ আমার ঘরে ছেড়ে দাও।’আমিরের কথা শেষ হতেই হাসির রোল পড়ে যায়। পদ্মজা ঠোঁট টিপে হাসি আটকায়। ফরিনা কিছু কঠিন কথা বলতে প্রস্তুত হোন।আনিসা রসিকতা করে বলল, ‘আজ তো একসঙ্গে থাকা যাবে না। আরো একদিন ধৈর্য ধরুন।’আমির প্রবল বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কেন? বিয়ে তো হয়ে গেছে।’কেউ আমিরের জবাব দিল না। উলটো সবাই হাসতে থাকল।‘আইজ কাইলরাত্রিরে হতচ্ছাড়া!’ বলল শাহানা। জাফরের বড়ো বোন। আমিরের বিয়ে উপলক্ষে বাপের বাড়ি এসেছে। সঙ্গে নিয়ে এসেছে পুরো শ্বশুরবাড়ি। আমির শাহানাকে প্রশ্ন করল, ‘কালরাত্রি তো হিন্দুদের নিয়ম। আমি মানি না। আমার বউ আমার ঘরে দিয়ে আসা হোক।’‘সবসময় ত্যাড়ামি করিস কেন? আমরাও তো নিয়ম মেনেছি,’ বলল জাফর। কণ্ঠে তার গাম্ভীর্য। তাতেও লাভ হলো না। আমির কিছুতেই এই নিয়ম মানবে না। ফরিনা, শাহানা, শিরিন, আনিসা, আমিনাসহ অনেকে আমিরকে মানানোর চেষ্টা করল। কারো কথা আমিরের কর্ণগোচর হলো না। এর মধ্যে রিদওয়ান আমিরের সঙ্গে তাল দিয়ে বলল, ‘কালরাত্রি-টাত্রি বাদ। এসব নিয়ম মেনে লাভটা হবে কী? যার বউ তাকে তার বউ দিয়ে দেও।’‘তুই চুপ থাক। আগুনে ঘি ঢালবি না,’ বললেন আমিনা।রিদওয়ান চুপসে গেল। থামলো না শুধু আমির। ফরিনাও জেদ ধরে বসে আছেন। তিনি আমির-পদ্মজাকে আজ কিছুতেই একসঙ্গে থাকতে দিবেন না। যেমন মা তেমন তার ছেলে। মজিদ হাওলাদার অনেকক্ষণ যাবৎ এসব দেখছেন। চেঁচামিচি আর নেয়া যাচ্ছে না। তিনি ওপর থেকে নেমে আসেন। অন্দরমহলটি তিন তলা নিয়ে তৈরি। তৃতীয় তলায় কেউ থাকে না। শুধু ছাদ আছে। ঘর বানানো হয়নি। অসমাপ্ত ইটের পুরনো বাড়ি। চিন্তাভাবনা চলছে তৃতীয় তলাটা থাকার জন্য উপযুক্ত করার। মজিদকে দেখে সবাই থেমে গেল। তিনি পদ্মজার পাশে চেয়ার নিয়ে বসেন। পদ্মজা একটু নড়েচড়ে বসে। মজিদ পদ্মজাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুর্কি কী চাও মা? আজ শাশুড়ির সঙ্গে থাকবে? নাকি আমার পাগল ছেলের সঙ্গে? ভেবে বলো। তুমি যা বলবে তাই হবে।পদ্মজা উসখুস করতে করতে বলল, ‘জি, আম..আম্মার সঙ্গে থাকব।’ফরিনার ঠোঁটে বিশ্বজয়ের হাসি ফুটে উঠে। তিনি আমিরের দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গ করে হাসেন। পরপরই পদ্মজার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। চুমুতে চুমুতে পদ্মজা গাল ভরিয়ে দেন।একবার আড়চোখে আমিরকে দেখল পদ্মজা। আমির তাকিয়েই ছিল। পদ্মজা তাকাতেই আমির চোখ রাঙানি দিয়ে হুমকি দিল। সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো পদ্মজা। বিয়ের বাকি সব নিয়ম শুরু হলো, ওপর থেকে নেমে এলেন নুরজাহান। তিনি এই বাড়ির প্রধান কর্ত্রী, মজিদ হাওলাদারের জন্মদাত্রী। তিনি হইহই করে নামলেন, ‘কইরে…কইরে আমার নাত বউডা কই?’ বলতে বলতে ছুটে আসেন তিনি। উপস্থিত সবাই দৃষ্টি ঘুরিয়ে নুরজাহানের দিকে তাকাল। নুরজাহান পদ্মজার সামনে এসে বসলেন। পদ্মজার মুখখানা দুই হাতে ধরে দেখে মুগ্ধ হয়ে বললেন, ‘বাবু দেহি চাঁদ লইয়া আইছে! এই ছেড়ি তোর জন্যি আমার জামাই তো এহন আমার দিকে চাইবোই না।’নুরজাহান কেন এ কথা বললেন, পদ্মজা ঠাওর করতে পারল না। আমির যখন হেসে বলল, ‘আরে বুড়ি, তুমি তো আমার প্রথম বউ। ভুলি কীভাবে?’ তখন পদ্মজা নুরজাহানের কথার মানে বুঝতে পেরে ঠোঁট চেপে হাসল। নুরজাহান আমিরের থুতনিতে চিমটি দিয়ে ধরে বললেন, ‘আমার চান্দের টুকরা। বউরে আদর কইরো ভাই। বকাঝকা কইরো না। ছেড়িড়া জন্ম ঘর ছাইড়া আইছে। তুমি এখন সব। তুমি যেমনে রাখবা তেমনেই থাকব। স্বামী হাত ছাইড়া দিলে শ্বশুরবাড়ির আর কেউই বউদের আপন হয় না। বুঝছো ভাই?’আমির নুরজাহানের পা ছুঁয়ে সালাম করে বলল, ‘বুঝছি জান।’নুরজাহান মন খারাপের নাটক করে বললেন, ‘এইডা ঠিক না ভাই।’‘কোনটা?’‘এহন থাইকা জান ডাকবা বউরে। আমি হইলাম দুধভাত।’আমির একটু জোরেই হাসল। সঙ্গে আরো অনেকে হাসল। পদ্মজা নত হয় নুরজাহানের পা ছুঁয়ে সালাম করার জন্য। নুরজাহান দ্রুত পদ্মজাকে আটকালেন। জড়িয়ে ধরে পিঠে হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন, ‘রূপে যেমন গুণেও তেমন থাইকো বইন।’‘রাইত বাড়তাছে। সব নিয়ম তো শেষ। যাও যের ঘরে যাও। এই তোরা বাড়িত যাইতে পারবি? রাইতের বেলা আইছিলি কেন? বউ তো কাইলও দেহন যাইত। জাফর ছেড়িগুলারে দিয়া আইতে পারবি? মদন কই? মগা কই? কামের বেলা দুইডারে পাওন যায় না,’ কথাগুলো একনাগাড়ে বললেন ফরিনা বেগম। তিনি নুরজাহানের উপস্থিতি যেন উপেক্ষা করতে চাইছেন। মদন ছুটে আসে বাইরে থেকে। মাথা নত করে ফরিনাকে বলল, ‘আইছি, খালাম্মা।’‘থাহস কই? যা এদের দিয়া আয়। আমরার বাড়িত যহন আইছে এরা এহন আমরার দায়িত্বে। সুন্দর কইরা বাড়িত দিয়া আইবি।’‘আচ্ছা খালাম্মা। আপারা চলেন!’মেয়েগুলো সারাক্ষণ হাসছিল। যাওয়ার সময়ও হাসতে হাসতে গেল। মেয়েগুলোর উদ্দেশ্যে রানি ঠোঁট বাঁকাল, তা খেয়াল করে রিদওয়ান রানির মাথায় গাঁট্টা মেরে বলল, ‘সারাক্ষণ মুখ মুরাস কেন? একদিন দেখবি আর মুখ সোজা হচ্ছে না। বিয়েও হবে না।’‘না হলে নাই। ছেড়িগুলারে দেখছ বড়ো ভাই? কেমনে হে হে কইরা হাসতাছিল।’‘তাতে তোর কী?’নুরজাহান পদ্মজাকে বললেন, ‘ই মেলা রাইত হইছে। আইয়ো বনু আমার ঘরে আইয়ো। আইজ আমার লগে থাকবা।’‘আপনার লগে ক্যান? পদ্মজায় আমার লগে আমার ঘরে থাকব। হেইডাই তো কথা হইছে। পদ্মজায়ও এইডাই চায়।’‘দেহো বউ তর্ক কইরো না। নাত বউ আমার পছন্দ হইছে। আমি আমার লগে রাখুম।’‘এই পদ্মজা তুমি কার লগে থাকবা?’ ফরিনা কিঞ্চিৎ রাগান্বিত স্বরে প্রশ্ন করলেন। পদ্মজার অবস্থা দরজার চাপায় পড়ার মতো। এ কোন জগতে এসে পড়ল সে! পদ্মজা গোপনে ঢোক গিলল। নুরজাহান আমিরকে আদেশ করলেন, ‘খাড়ায়া রইছস কেন? বউরে কোলে লইয়া আমার ঘরে দিয়া যা।’আমির পদ্মজাকে কোলে তুলতে গেলে ফরিনা বললেন, ‘বাবু আমি তোর মা। তোরে জন্ম দিছি আমি। আমার কথাই শেষ কথা। আমার ছেড়ার বউ আমার ঘরে থাকব। আমার কথা অমান্য করলে জান্নাত পাইবি না।’নুরজাহান পদ্মজাকে উদ্দেশ্যে করে বললেন, ‘দেখছোনি বনু? এমন কইলজা বড়ো বউ কেউ ঘরে রাহে? আমি মানুষ ভালা বইলা এই বউরে বাইর কইরা দেই নাই। সহ্য কইরা কইরা এহন মরার পথে আছি।’‘তোমাদের কারোর সঙ্গে থাকতে হবে না। আমার বউ আমার ঘরেই চলুক,’ বলল আমির। কণ্ঠে তার খুশির মেলা। সুযোগ বুঝে নিজের জিনিস নিজে বুঝে নিতে চাইছে। ফরিনা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে আমিরের দিকে তাকিয়ে নুরজাহানকে বললেন, ‘আপনার ঘরেই লইয়া যান।’ফরিনার কথা শুনে আমিরের মুখটা ফাটা বেলুনের মতো চুপসে যায়। নুরজাহান বিজয়ের হাসি হেসে বললেন, ‘ভাই, বউরে কোলে লও। লইয়া আও আমার ঘরে।’পদ্মজা দ্রুত মিনমিনিয়ে বলল, ‘আমি হেঁটে যেতে পারব।’‘আইচ্ছা তাইলে হাঁটো। ধরো আমার হাত ধরো, নুরজাহান হাত বাড়িয়ে দেন। পদ্মজা নুরজাহানের হাত শক্ত করে ধরে মৃদু করে হাসল। তাদের পিছু নিলো আমির। সে দাদির ঘর অবধি যাবে।পদ্মজাকে তার মোটেও ছাড়তে ইচ্ছে করছে না।.নুরজাহানের ঘরে যাওয়ার পথে পদ্মজা কান্নার সুর শুনতে পেল। কে কাঁদছে? কী করুণ সেই কান্নার স্বর! এদিক-ওদিক দৃষ্টি মেলে তাকাল সে। আরেকটু এগোতেই খুব কাছে জোরে একটা আওয়াজ হলো, কেঁপে উঠে দ্রুত সেদিকে তাকাল পদ্মজা। মাত্র দুই হাত দূরে একটা দরজা। ভেতর থেকে কেউ দরজা ধাক্কাচ্ছে আর কাঁদছে। পদ্মজাকে ভয় পেতে দেখে আমির বলল, ‘ভয় পাচ্ছো?’পদ্মজা ভয়ে ভরা ব্যথিত কণ্ঠে বলল, ‘কে ওখানে? এভাবে কাঁদছে কেন? দরজাটা খুলে দিন না!তার কথায় আমির বা নুরজাহান কারো কোনো ভাবান্তর হলো না। পদ্মজাকে নিয়ে পাশ কেটে চলে গেল।
নুরজাহান শক্ত করে পদ্মজার হাত চেপে ধরে ক্ষীণ স্বরে বললেন, ‘ঘরে আহো, পরে কইতাছি।’কান্নার শব্দ ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। নুরজাহান পদ্মজাকে নিয়ে নিজের ঘরে প্রবেশ করলেন। আমির চেয়ার টেনে বসার জন্য প্রস্তুত হতেই নুরজাহান হইহই করে উঠলেন, ‘তুই বইতাছস ক্যান?’আমির হকচকিয়ে গিয়ে বলল, ‘মানে?’‘বউয়ের ধারে আর থাহন যাইবো না। আইজ কাইলরাত্রি।’‘মুসলমানদের কালরাত্রি পালন করতে নেই। গুনাহগার হবেন,’ বলল পদ্মজা। তার মাথা নত। প্রথম দিন এসেই কথা বলা ঠিক হলো নাকি ভাবছে।মুখের ওপর কথা শুনে নুরজাহান কড়া চোখে তাকালেন। পদ্মজা দেখার আগেই, কয়েকের সেকেন্ড মধ্যে চোখের দৃষ্টি শীতল রূপে নিয়ে এলেন। পদ্মজাকে প্রশ্ন করলেন, ‘গেরামের রেওয়াজ ফালাইয়া দেওন যাইব?’নুরজাহানের কণ্ঠ স্বাভাবিক। পদ্মজা নির্ভয়ে চোখ তুলে তাকাল। বলল, যা পাপ তা করতে নেই দাদু। জেনেশুনে ভুল রেওয়াজ সারাজীবন টেনে নেওয়া উচিত না। আমার কথা শুনে রাগ করবেন না।’তুমি কী আইজ জামাইয়ের লগে থাকতে চাইতাছ?’ নুরজাহানের কণ্ঠ গম্ভীর। এমন প্রশ্নে পদ্মজা লজ্জায় আরক্ত হয়ে উঠে। আমতা আমতা করে বলল, ‘ন…ন…না! তে…তেমন কিছু না।’পদ্মজা আড়চোখে আমিরকে দেখে আবার চোখের দৃষ্টি নত করে ফেলল। আমির নুরজাহানকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি যাচ্ছি বুড়ি।’ এরপর পদ্মজার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে কোমল কণ্ঠে বিদায় জানাল, ‘আল্লাহ হাফেজ পদ্মবতী।’পদ্মজা নতজানু অবস্থায় মাথা নাড়াল। আমির বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। পদ্মজা ধীরে ধীরে মাথা উঁচু করে নুরজাহানকে দেখল।ঢোক গিলে বলল, ‘রাগ করেছেন দাদু?’নুরজাহান হাসলেন। পদ্মজার এক হাত ধরে বিছানার কাছে নিয়ে বললেন, ‘আমার বইনে তো ঠিক কথাই কইছে। গুসা করতাম কেরে?’পদ্মজা স্বস্তির নিশ্বাস নিলো। নুরজাহান বললেন, তুমি বও। আমি লতুরে ভাত দেওনের কথা কইয়া আইতাছি।’‘আমি খেয়েছি দাদু। তখন খাওয়ালেন আম্মা।’‘ব্যাগডা কই? শাড়িডা খুইলা আরেকটা পরো। সিঁদুর রঙেরডা পরবা।’ বলতে বলতে নুরজাহান ব্যাগ থেকে সিঁদুর রঙের শাড়ি বের করে এগিয়ে দিলে, পদ্মজা হাত বাড়িয়ে শাড়িটা নিলো। জানতে চাইল, ‘কোথায় পালটাব?’‘খাড়াও দরজা লাগায়া দেই। ঘরেই পাল্ডাও। আমারে শরমাইয়ো না, বইন। তোমার যা আমারও তা।’পদ্মজা শাড়ি হাতে নিয়ে চারপাশে চোখ বুলিয়ে শাড়ি পালটানোর মতো উপযুক্ত জায়গা খুঁজতে থাকল। পালঙ্কের পেছনে চোখ পড়ায় সেদিকে গিয়ে শাড়ি পালটে নিলো। এরপর নুরজাহানের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, ‘দাদু তখন কাঁদছিল কে?’নুরজাহান বিছানায় বসতে বসতে জবাব দিলেন, ‘আমার খলিলের বড়ো ছেড়ার বউ।’পদ্মজা দুই কদম এগিয়ে আসে।আগ্রহভরে জানতে চায়, ‘কেন কাঁদছিল? উনাকে কি ঘরে আটকে রাখা হয়েছে?’‘বও। আমার ধারে বও।’পদ্মজা নুরজাহানের সামনে ঝুঁকে বসে। নুরজাহান বললেন, ‘তোমার চাচা হউরের (শ্বশুর) বড়ো ছেড়ার বউ রুম্পার গত বৈশাখো আচম্বিক মাথা খারাপ হইয়া যায়। এরে-ওরে মারতে আহে। কেউরে চিনে না। নিজের সোয়ামিরেও না। আলমগীর তো এহন ঢাহাত থাহে। আমির তো গেরামে আইছে অনেকদিন হইলো। আলমগীর শহরে আমিরের কামডা করতাছে। এর লাইগগাই তো আলমগীর বিয়াতে আছিল না। রুম্পা তোমার হউরিরে দা নিয়া মারতে গেছিল।‘এজন্য আপনারা ঘরে আটকে রাখেন উনাকে? হুট করে কেন এমন হলেন?’ পদ্মজা আঁতকে উঠে জিজ্ঞাসা করল।নুরজাহান এদিক-ওদিক তাকিয়ে কী যেন দেখলেন! এরপর সতর্কতার সঙ্গে ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘বাড়ির পিছে বড়ো জঙলা আছে। দোষী জায়গা। ভুলেও ওইহানে যাইয়ো না। রুম্পা শনিবার ভরদুপুরে গেছিল, এর পরেরদিন জ্বর উডে। আর এমন পাগল হইয়া যায়। এগুলো তেনাদের কাজ! রাতে নাম লওন নাই। তুমি মাশাল্লাহ চান্দের টুকরা। ভুলেও ওইদিকে যাইয়ো না। ক্ষতি হইব।’নুরজাহানের কথা শুনে পদ্মজার গায়ের পশম দাঁড়িয়ে পড়ে। মনে মনে ভাবে, অবিশ্বাস্য! ভয় পেয়ে কারো মাথা খারাপ হয়ে যায়?পদ্মজা উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘উনাকে ডাক্তার দেখানো হয়েছে?’‘হ। দেহানি হইছে। শহরে দুইবার লইয়া গেছে। কবিরাজ আইল। কেউই ভালা কইরা দিতে পারে নাই। আইচ্ছা এসব কথা বাদ দেও এহন। এই বাড়িত যহন বউ হইয়া আইছো সবই জানবা। খালি বাইরে কইয়ো না এই খবর। গেরামের কেউ জানে না। রাইত অইছে ঘুমাও।’ নুরজাহান শুতে শুতে বললেন, ‘হুনো জামাইয়ের কাছে কইলাম যাইবা না।’‘না, না…যাব না।’‘বুঝলা বইন, তোমার দাদা হউরে বিয়ার প্রত্তম রাইতে লুকাইয়া আমারে তুইলা নিজের ঘরে লইয়া গেছিল। আদর-সোহাগ কইরা ভোর রাইতে পাড়াইয়া দিছিল। আমি ছুডু আছিলাম। তাই ডরে কইলজা শুকায়া গেছিল।’বলতে বলতে নুরজাহান জোরে হেসে উঠলেন। পদ্মজা মৃদু করে হাসে। নুরজাহান ডান দিকে কাত হয়ে শুয়ে পড়েন। পদ্মজা ধীরে ধীরে এক কোণে কাঁচুমাচু হয়ে শুয়ে পড়ে।কী অদ্ভুত সব! সাধারণত বিয়ের রাতে নতুন বউরা ঘুমানোর সুযোগ পায় না। জামাইয়ের বাড়ির মানুষেরা সারাক্ষণ ঘেঁষে থাকে। পদ্মজা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। হারিকেনের আগুন নিভু নিভু করে জ্বলছে, নিভে যাবে যেকোনো মুহূর্তে। কেটে গেল অনেকক্ষণ। ঘুম আসছে না। দেহ এক তীব্র অনুভূতিতে ছেয়ে যাচ্ছে। আচমকা পদ্মজা ভ্রু কুঁচকে ফেলে। কান খাড়া করে ভালো করে শোনার চেষ্টা করে। আবার কাঁদছে! রুম্পা মিনমিনিয়ে কাঁদছে। পদ্মজা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে, সে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। সঙ্গে সঙ্গে নুরজাহান পদ্মজার দিকে ফেরেন। জানতে চান, ‘ডরাইতাছো?’‘উনি আবার কাঁদছেন।’‘সারাবেলাই কান্দে। এইসবে কান দিয়ো না। ঘুমাইয়া পড়ো।’পদ্মজা উসখুস করতে করতে শুয়ে পড়ল, নিভে গেল হারিকেন। নুরজাহান নাক ডাকছেন, ঘুমিয়ে পড়েছেন। নাক ডাকার তীব্রতা অনেক, যা পদ্মজার বিরক্তি বাড়িয়ে তুলছে। পদ্মজা ঘুমানোর চেষ্টা করল, হাজার ভাবনার ভিড়ে একসময় ঘুমিয়েও পড়ল। শেষ রাতে ঘুমের ঘোরে অনুভব করল, হাঁটুতে কারো হাতের ছোঁয়া। পদ্মজা চটজলদি চোখ খুলে ফেলল। মুখের সামনে কেউ ঝুঁকে রয়েছে। পদ্মজা ধড়ফড়িয়ে উঠে চিৎকার করে উঠল, ‘কে?’সঙ্গে সঙ্গে পুরুষ অবয়বটি ছুটে বেরিয়ে যায়। পদ্মজার শরীর কাঁপছে, শরীর বেয়ে ছুটছে ঘাম। ভয়ে ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।সে নুরজাহানকে ভয়ার্ত স্বরে ডাকল, ‘দাদু… দাদু।’নুরজাহান একটু নড়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। পদ্মজা আর ডাকল না। সে ঘন ঘন নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল, চোখের দৃষ্টি দরজার বাইরে। দরজা তো লাগানো ছিল। বাইরে থেকে কেউ কীভাবে ঢুকল? নাকি এর মাঝে দাদু টয়লেটে গিয়েছিলেন? পদ্মজার বুক হাঁপড়ের মতো ওঠানামা করছে। সে জিহ্বা দিয়ে শুকনা ঠোঁট ভিজিয়ে নিলো। একটু ভয় ভয় করছে। কে এসেছিল! এভাবে গায়ে হাত দিচ্ছিল কেন?পদ্মজা চোখ-মুখ খিঁচে ছি বলে আগন্তুকের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে। বাকি রাতটুকু আর ঘুম হলো না তার। ভয়টা কমেছে। এই জায়গায় পূর্ণা থাকলে হয়তো পুরো বাড়ি চেঁচিয়ে মাথায় তুলে ফেলত। পদ্মজা মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, এরকম ঘটনা পূর্ণার জীবনে যেন না আসে। একদম গুঁড়িয়ে যাবে। উঠে দাঁড়াতে পারবে না। পূর্ণার কথা মনে পড়তেই পদ্মজার বুকটা হু হু করে উঠল। ভীষণ কান্না পাচ্ছে। অন্যদিন পাশে পূর্ণা থাকে। আজ নেই!ফজরের আজান পড়তেই নুরজাহান চোখ খুললেন। বিছানা থেকে নেমে দেখেন, পদ্মজা জায়নামাজে দাঁড়িয়েছে মাত্র। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘ওজু করলা কই?’‘কলপাড়ে।’‘চিনছো কেমনে?’পদ্মজা হাসল। বলল, ‘খুঁজে বের করেছি।’নুরজাহান চোখ-মুখ শক্ত করে বললেন, ‘নতুন বউ রাইতের বেলা একলা ঘুরাঘুরি কইরা কল খোঁজার কী দরকার আছিল? আমারে ডাকতে পারতা।’পদ্মজার মাথা নত করে অপরাধী স্বরে বলল, ‘ক্ষমা করবেন, দাদু।’‘কি কাল আইল। আইচ্ছা, পড়ো এহন। নামাজ পড়ো।’নুরজাহান অসন্তুষ্ট ভাব নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান।পদ্মজার দুই চোখ ছলছল করে উঠে। যখন টের পেল এখুনি কেঁদে দিবে, দ্রুত ডান হাতের উলটোপাশ দিয়ে চোখের জল মুছে ফেলল।.পদ্মজাকে কাতান শাড়ি পরানো হয়েছে। বউভাতের অনুষ্ঠান চলছে। সে এক বিশাল আয়োজন। বিয়ের চেয়েও বড়ো করে বউভাতের অনুষ্ঠান হচ্ছে। অলন্দপুরের বাইরে থেকেও মানুষ আসছে পদ্মজাকে দেখার জন্য। আটপাড়ার প্রতিটি ঘরের মানুষ তো আছেই। পদ্মজার চারপাশে মানুষ গিজগিজ করছে। রাতে ঘুম হয়নি। পরনে ভারি শাড়ি-গহনা। এত মানুষ চারিদিকে। সব মিলিয়ে পদ্মজার নাজেহাল অবস্থা। মাথা নত করে বসে আছে সে।‘আপা।’পূর্ণার কণ্ঠ শুনে মুহূর্তে পদ্মজার ক্লান্তি উড়ে গেল, চোখ তুলে তাকাল চকিতে। পূর্ণা-প্রেমা-প্রান্ত ঝাঁপিয়ে পড়ল পদ্মজার ওপর। পূর্ণা আওয়াজ করে কেঁদে উঠে বলল, ‘রাতে আমার ঘুম হয়নি আপা।পদ্মজার গলা জ্বলছে। প্রেমা-পূর্ণা-প্রান্তকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে চাপা কণ্ঠে বলল, ‘আমারো ঘুম হয়নি বোন।’‘আপা, বাড়ি চল।’পেছন থেকে লাবণ্য বলল, ‘কাইল যাইব। আইজ না। এহন পদ্মজা আমরার বাড়ির ছেড়ি।’সে পদ্মজার জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। পূর্ণা রাগ নিয়ে বলল, ‘আমার বোন আমি নিয়ে যাব।’‘আমাদের আপা আমরা নিয়ে যেতে এসেছি।’ বলল প্রান্ত।রানি প্রান্তর কান টেনে ধরে বলল, ‘পেকে গেছিস তাই না?’‘উ! ছাড়ো, রানি আপা। ব্যথা পাচ্ছি।’‘ওরেম্মা! তুই শুদ্ধ ভাষাও কইতে পারস?’রানি অবাক হয়ে জানতে চাইল।প্রান্ত অভিজ্ঞদের মতো হেসে ইংরেজিতে বলল, ‘ইয়েস।’যারা যারা প্রান্তকে চিনে সবার চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। প্রান্ত ইংরেজি বলেনি, যেন মাত্রই এখানে বজ্রপাত ঘটাল। রানি চোখেমুখে বিস্ময়ভাব রেখে বলল, ‘এইটা মুন্না না অন্য কেউ।‘আমি মুন্না না আমি প্রান্ত, প্রান্ত মোড়ল।’ প্রান্তের বলার ভঙ্গী দেখে সবাই হেসে উঠল। পদ্মজা হাসতে হাসতে রানিকে বলল, ‘প্রান্ত অনেকগুলো ইংরেজি শব্দ শিখেছে।’‘বউ মানুষ কেমনে দাঁত বাইর কইরা হাসতাছে দেখছ? বেহায়া বউছেড়া।’ কথাটি দরজার পাশ থেকে কেউ বলল। অন্য কেউ শুনতে না পেলেও পদ্মজা শুনতে পেল। সে সেদিকে তাকাল। অল্পবয়সি দুজন মহিলা এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন পদ্মজাকে চোখ দিয়ে গিলে খাবে। তাদের উদ্দেশ্যে কেবল হাসল পদ্মজা।পদ্মজার হাসি দেখে থতমত খেয়ে গেল মহিলা দুজন। একে-অন্যেও দিকে চাওয়াচাওয়ি করে, আবার পদ্মজার দিকে তাকাল। পদ্মজা ততক্ষণে চোখ সরিয়ে নিয়েছে।অতিথি আপ্যায়ন চলছে ধুমধামে। রমিজ আলী, কামরুল, রজব সবাই উপস্থিত হয়েছে। খাওয়া শেষে তারা আড্ডা শুরু করে।রমিজ বললেন, ‘মনজুর ছেড়া, জলিল, ছইদ এরা কি আইছে?’কামরুল দাঁতের ফাঁক থেকে যত্ন করে গরু মাংস বের করে উত্তর দিলেন, ‘না আহে নাই। হেদিন ছইদের বাপে আমার কাছে গেছিল।’‘কেরে গেছিল?’‘ছইদরে যাতে মাতব্বরের হাত থাইকা বাঁচায়া দেই।’‘হেরা এহন কই আছে?’‘আছে কোনহানে। কয়দিন পরপরই তো উধাও হইয়া যায়। এহনের ছেড়াদের দায়-দায়িত্ব নাই বুঝলা। আমার যহন দশ বছর তহন খেতে কাজ করতে যাইতাম।’কামরুলের কথা উপেক্ষা করে রমিজ অন্য প্রসঙ্গ তুললেন, ‘ক্ষমতা যার বেশি হের সুখ বেশি। আমার মাইয়াডা নির্দোষ আছিল। তবুও কেমনডা করছিল সবাই? আইজ মাতব্বরের ছেড়া বলে কিছুই হইল না। বদলা আমরা বিয়া খাইতে আইছি।’রমিজের অসহায় মুখখানা দেখে কামরুল, রজব, মালেক হো হো করে হেসে উঠলেন। রমিজের দৃষ্টি অস্থির। পেট ভরে খাওয়ার লোভে এসেছে সে, নয়তো আসার এক ফোঁটাও ইচ্ছে ছিল না।.পদ্মজা কিছুতেই খেতে পারছে না। অথচ পেট চোঁ চোঁ করছে ক্ষুধায়। চোখের সামনে এত মানুষ থাকলে কী খাওয়া যায়? পূর্ণা ব্যাপারটা ধরতে পেরে লাবণ্যকে বলল। লাবণ্য সবাইকে বেরিয়ে যেতে বলল বটে, তবে কেউই তার কথা গ্রাহ্য করল না। তাই সে ফরিনা বেগমকে নিয়ে এলো। ফরিনা বেগম সবাইকে বের করে, দরজা ভিজিয়ে দিয়ে যান।ঘরে শুধু রানি, লাবণ্য, পদ্মজা, প্রেমা, পূর্ণা এবং প্রান্ত। খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো পদ্মজা।পূর্ণা উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল, ‘আপা আমি খাইয়ে দেই?’পদ্মজা মায়াময় দৃষ্টি নিয়ে তাকাল। ঠোঁটে ফুটে মিষ্টি হাসি। পূৰ্ণা অনুমতির অপেক্ষা না করে বাড়িয়ে দিল এক লোকমা ভাত। ছলছল করে উঠল পদ্মজার দুই চোখ। পূর্ণা কখনো খাইয়ে দেয়নি। এই প্রথম খাওয়াতে চাইছে। হাঁ করল পদ্মজা। লাবণ্য হেসে বলল, ‘আমার এমন একটা বইন যদি ত‘আমি তোর বইন না?’ বলল রানি।লাবণ্য চোখ-মুখ শক্ত করে বলল, ‘জীবনে খাইয়ে দিছস? আবার বইন কইতে আইছস যে।’‘তুই খাইয়ে দিছস? পূর্ণা তো ছুটু। তুইও তো ছুটু।’‘আগে পদ্মজা খাওয়াইছে। এরপর পূর্ণা।’‘আইচ্ছা ভাত লইয়া আয়। খাওয়াই দিমু।’ রানি বলল।‘এহন পেট ভরা।’‘হ, এহন তো তোর পেট, নাক, মাথা সবই ভরা থাকব।’দুই বোনের ঝগড়া দেখে পূর্ণা, পদ্মজা হাসল। কী মিষ্টি দুজন। ঝগড়াতেও ভালোবাসা রয়েছে। লাবণ্যের চেয়ে রানি বেশি সুন্দর। তবে লাবণ্যকে দেখলে বেশি মায়া লাগে। লাবণ্য যে রাগী দেখলেই বোঝা যায়। গতকাল কী রাগটাই না দেখাল! ঘরে ঢুকল আমির। আমিরকে দেখেই পদ্মজা সংকুচিত হয়ে গেল। রানি প্রশ্ন করল, ‘এইহানে কী দাভাই?’‘পদ্মজাকে নিয়ে যেতে হবে। ওহ খাচ্ছে। আচ্ছা, খাওয়া শেষ হলে নিয়ে যাব।’ বলতে বলতে আমির পদ্মজার সামনে বসল। লাবণ্য জিজ্ঞাসা করল, ‘কই নিয়ে যাবা?’‘আম্মার ঘরে।’‘কেন?’‘আম্মা বলছে নিয়ে যেতে।’‘আম্মা একটু আগেই দেইখা গেল।’আমির হকচকিয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল, ‘ওহ তাই নাকি?’ রানি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমিরকে পরখ করে নিয়ে বলল, ‘দাভাই, মিথ্যে বলছ কেন?’‘মি…মিথ্যে আমি? অসম্ভব। আম্মা না দাদু বলছে নিয়ে যেতে। এই তোরা যা তো। তোদের বান্ধবিরা আসছে। যা। হুদাই ঘ্যানঘ্যান শুরু করেছিস।’লাবণ্য কথা বাড়াতে চাচ্ছিল। রানি টেনে নিয়ে যায়। প্রেমা-প্ৰান্তও বেরিয়ে যায়। তারা বাড়ি থেকে পরিকল্পনা করে এসেছে, একসঙ্গে পুরো হাওলাদার বাড়ি ঘুরে দেখবে। পূর্ণা খাইয়ে দিচ্ছে। পদ্মজা আমিরের উপস্থিতিতে বিব্রত হয়ে উঠেছে। খাবার চিবোতে পারছে না। আমির পদ্মজাকে বলল, ‘বড়ো ভাবি বলল রাতে নাকি ঘুমাওনি।‘না… হ্যাঁ। আসলে ঘুম আসেনি।’‘ঘুমাবে এখন?’‘না, না। কী বলছেন? বাড়ি ভরতি মানুষ।’আমিরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল পদ্মজা। আমিরের পলকহীন দৃষ্টি দেখে চোখ নামিয়ে নিলো।আমির বলল, ‘আচ্ছা খাও। আমি আসছি।’‘আপনি কি রাতে দাদুর ঘরে এসেছিলেন?’আমির চলে যাওয়ার জন্য দাঁড়িয়েছিল। এই কথা শুনে চমকে তাকাল পদ্মজার দিকে ঝুঁকে জানতে চাইল, ‘কেন? কেউ কি তোমার ঘরে এসেছিল?’আমিরের এমন ছটফটানি দেখে পদ্মজা খুব অবাক হলো। সে অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘হ্যাঁ, এসেছিল। শেষ রাতে।’‘আচ্ছা,’ বলেই হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেল আমির। পদ্মজা পেছনে ডাকল, শুনল না আমির। হুট করে লোকটার পরিবর্তন পদ্মজাকে ভাবাতে লাগল।
পদ্মজাকে নতুন করে পুনরায় সাজানো হয়েছে। বাসর রাত নিয়েও হাওলাদার বাড়ির হাজারটা রীতি। সেসব পালিত হচ্ছে। পদ্মজা নিয়ম-রীতি পূরণ করছে ঠিকই, তবে মন অন্য জায়গায়। বিকেলে সে দেখেছে, আমির রিদওয়ানের পাঞ্জাবির কলার দুই হাতে ধরে কিছু বলছে। খুব রেগে ছিল। তবে কি রিদওয়ানই এসেছিল রাতে?‘ও বউ উডো। এহন ঘরে গিয়া খালি দুইজনে মিললা দুই রাকাত নফল নামাজ পইড়া লইবা। আনিসা যাও লইয়া যাও। দিয়া আও ঘরে,’ বললেন ফরিনা। পদ্মজা কল্পনার জগত থেকে বেরিয়ে বাস্তবে ফিরে আসে। খলিল হাওলাদারের দুই মেয়ে শাহানা, শিরিন এবং আনিসা পদ্মজাকে নিয়ে দ্বিতীয় তলায় ওঠে। আমিরের ঘরে ঢুকতে আর কয়েক কদম বাকি। পদ্মজা ঘোমটার আড়াল থেকে চোখ তুলে তাকাল। দরজা গোলাপ ফুল দিয়ে সাজানো, টকটকে লাল গোলাপ; হাওলাদার বাড়ির গোলাপ বাগান অলন্দপুরে খুবই জনপ্রিয়। পদ্মজার শুভ্র, শীতল অনুভূতি হয়। ঘরে ঢুকতেই তাজা গোলাপ ফুলের ঘ্রাণে শরীর-মন অবশ হয়ে আসে।শুধু বিছানা নয়, পুরো ঘর লাল গোলাপ দিয়ে সাজানো।শাহানা পদ্মজাকে বিছানায় বসিয়ে দিল। এরপর বলল, ‘ডরাইবা না। রাইতটা উপভোগ করবা। এমন রাইত জীবনে একবারই আহে।’পদ্মজার লজ্জায় মরিমরি অবস্থা! সারা দেহ থেকে যেন গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। আনিসা সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখছে। একসময় বলল, ‘আমার বাসর রাতটাও হুবুহু এই রকম ছিল। চারিদিকে গোলাপের ঘ্রাণ। ফুলের ঘ্রাণে ভালোবাসা আরো জমে উঠেছিল।’‘এই বাড়ির বউদেরই কপাল। আমরা এই বাড়ির ছেড়ি হইয়াও জামাইর বাড়িত গিয়া কাগজের ফুলের বাসর পাইছি,’ বলল শিরিন।আনিসা দেমাগি স্বরে বলল, ‘এসব পেতে যোগ্যতা লাগে। যোগ্যতা ছাড়া ভালো কিছু পাওয়া যায় না। আমি উচ্চশিক্ষিত এবং সুন্দরী ছিলাম। ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য ছিলাম তাই পেয়েছি। আর পদ্মজা যথেষ্ট সুন্দরী, গ্রামে থেকেও পড়ালেখায় খুব ভালো। তাই সেও যোগ্য। তোমাদের না আছে পড়াশোনা না আছে কোনো ভালো গুণ। গায়ের রঙও ময়লা। কাগজের ফুলই তোমাদের জন্য ঠিক ছিল।’আনিসার কথাগুলো শুনতে পদ্মজার খুব খারাপ লাগে। কোনো মানুষকে এভাবে বলা ঠিক নয়। শিরিন হইহই করে উঠল, ‘এই রূপ বেশিদিন থাকব না ভাবি। এত দেমাগ ভালা না। বিয়ার এতদিন হইছে একটাও বাচ্চা দিতে পারছ? পারো নাই। তাইলে এই গরিমা দিয়া কী হইব? সন্তান ছাড়া নারীর শোভা নাই।’আনিসা রেগেমেগে ফুঁসে উঠে গলা উঁচু করে বলল, ‘সমস্যা আমার নাকি তোমাদের পেয়ারের ভাইয়ের সেটা খোঁজ নাও আগে। আমি এখনই জাফরকে সব বলছি। এতদিন পর বাড়িতে এসেছি এসব নোংরা কথা সহ্য করতে? অপমান সহ্য করতে? কালই চলে যাব আমি।’আনিসা রাগে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যায়। পদ্মজা হতবাক। শাহানা শিরিনকে ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘এত কিছু কেন কইতে গেলি? জানস না, এই ছেড়ি কেমন? আমি হের বড়ো হইয়াও হেরে কিছু কই না। এহন আরেক ভেজাল হইব।’‘যা হওয়ার হইয়া যাক। আমরারে কেমনে পায়ে ঠেলতাছিল দেহো নাই? এইডা তো আমরার বাপের বাড়ি। এত কথা কেন হুনতে হইব?’ শিরিনের কণ্ঠ কঠিন। সে আজ এর শেষ দেখেই ছাড়বে।‘নতুন বউডার সামনে এমনডা না করলেও হইত! ও পদ্ম তুমি বেজার হইয়ো না। এরা সবসময় এমনেই লাইগা থাহে।’পদ্মজা হাসার চেষ্টা করে। শাহানা দরজার বাইরে তাকিয়ে দেখে আমির আসছে কি না! রাত তো কম হলো না। শাহানা আরো অনেকক্ষণ সময় নিয়ে পদ্মজাকে বুঝাল, কী কী করতে হবে, কীভাবে স্বামীকে আঁচলে বেঁধে রাখতে হয়।পদ্মজা সব মনোযোগ সহকারে শুনে নিলো।আমির ঘরে ঢুকতেই শাহানা-শিরিন বেরিয়ে গেল। দরজা লাগিয়ে পালঙ্কের পাশে এসে দাঁড়াল আমির। পদ্মজা পালঙ্ক থেকে নেমে আমিরের পা ছুঁয়ে সালাম করে, আমির দুই হাতে পদ্মজাকে আঁকড়ে ধরে দাঁড় করায়। অনুভব করে—পদ্মজা কাঁপছে; প্রচণ্ড শীতে মানুষ যেভাবে কাঁপে, ঠিক সেভাবে। আমির দ্রুত ছেড়ে দিল তাকে। বলল, ‘পানি খাবে?’পদ্মজা মাথা নাড়িয়ে জানাল, খাবে। আমির এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিল। এক নিশ্বাসে ঢকঢক করে পানি শেষ করল পদ্মজা। সারা শরীর কাঁপছে। শাহানা, শিরিন বের হতেই বুকে হাতুড়ি পেটা শুরু হয়েছে। ঘরে চারটা হারিকেন জ্বালানো। যেদিকে চোখ যায় সেখানেই গোলাপ ফুল। ফুলের ঘ্রাণে চারিদিক মউ মউ করছে। এমন পরিবেশে বিয়ের প্রথম রাতে পরপুরুষকে স্বামী রূপে দেখা কোনো সহজ অনুভূতি নয়। আমির গ্লাস নিতে এগিয়ে আসলে পদ্মজা আঁতকে উঠে এক কদম পিছিয়ে গেল। তা দেখে আমির একটু শব্দ করেই হাসল। ভীতু ভীতু চোখে সেদিকে তাকাল পদ্মজা। আমির বলল, ‘হাতে গ্লাস নিয়ে সারারাত কাটাবে নাকি? দাও আমার কাছে।গ্লাসটি পদ্মজার হাত থেকে নিয়ে টেবিলের ওপর রেখে এলো আমির। পদ্মজা পালঙ্কের এক কোণে চুপটি করে বসে আছে, অনবরত কাঁপছে তার ডান পা। মনে মনে দোয়া করছে—মাটি যেন ফাঁক হয়ে যায়। আর সে তার ভেতর ঝাঁপ দিয়ে পাতালে হারিয়ে যেতে চায়। নয়তো লজ্জা, আড়ষ্টতায় প্রাণ এখনি গেল বুঝি! আমির দূরত্ব রেখে পদ্মজার সোজাসুজি বসে। পদ্মজার এক পা যে কাঁপছে সেটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তার দৃষ্টিও অস্থির। বার বার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। আমির মজা করে জানতে চাইল, ‘পালানোর পথ খুঁজছো নাকি?’‘না…না তো,’ বলল পদ্মজা।‘তাহলে কী খুঁজছ?’পদ্মজা নিরুত্তর রইল। আমির পদ্মজার আরো কাছে এসে বসে। পদ্মজার এক হাত ছুঁতেই ‘ও মাগো!’ বলে চিৎকার করে ওঠে। আমির পদ্মজার আকস্মিক চিৎকারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। ভয়ে ঢোক গিলল পদ্মজা, সময়টা যাচ্ছেই না। সে যদি পারত পালিয়ে যেতে…চারিদিকে ভয়ংকর অনুভূতিদের খেলা! আমির হাঁ করে পদ্মজার দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে রইল, এরপর দূরে সরে বসে পদ্মজাকে বলল, ‘আমার সঙ্গে সহজ হওয়ার চেষ্টা করো। আমার দিকে ফিরে বসো। গল্প করি।’পদ্মজা আমিরের দিকে ফিরে বসল, দৃষ্টি বিছানার চাদরে নিবদ্ধ।আমির প্রশ্ন করল, ‘আমার সম্পর্কে কতটুকু জানো?’‘খুব কম,’ মিনমিনিয়ে বলল পদ্মজা।‘আমি তোমার চেয়ে বারো বছরের বড়ো। জানো?’‘এখন জানলাম। তবে আপনার আচরণ ছোটোদের মতো।’ পদ্মজা মৃদু হেসে আমিরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল। আমির বলল, ‘আমার চরিত্রের আরো বৈশিষ্ট্য আছে।’‘বুঝতে পেরেছি। আপনার কথাবার্তা এখন বড়োদের মতো মনে হচ্ছে। ‘ঢাকা আমার ব্যাবসা আছে।’‘শুনেছি।’‘আমার সঙ্গে তোমাকেও ঢাকা যেতে হবে।’‘আচ্ছা।’‘এই বাড়ির চেয়েও বিশাল বড়ো বাড়িতে আমি একা থাকি। যতক্ষণ বাইরে থাকব তোমাকে একা থাকতে হবে। ভয় পাওয়া যাবে না।’‘আমি ভয় পাই না।’‘আমাকে তো ভয় পাচ্ছো।’ আমির হেসে বলল। পদ্মজা নিরুত্তর। ‘কথা বলো।’‘কী বলব?’‘আচ্ছা, আসো একটা মজার খেলা খেলি।’পদ্মজা উৎসুক হয়ে তাকাল। আমির বলল, ‘দুজন দুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকব। যার চোখের পলক আগে পড়বে সে হেরে যাবে।’পদ্মজা খেলতে রাজি। এই খেলাটা সে পূর্ণার সঙ্গেও খেলেছে। পদ্মজা অনেকক্ষণ এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকতে পারে। তাই তার আত্মবিশ্বাস আছে, সেই জিতবে। বরাবরই জিতে এসেছে। আমির এক-দুই-তিন বলে খেলা শুরু করে দিল। একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে রইল একধ্যানে। পদ্মজা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমিরকে পরখ করে। আমিরের চুল খাড়া করে উলটো দিকে আছড়ে রাখা, থুতনির নিচে কাটা দাগ। গালে হালকা দাড়ি, শ্যামলা গায়ের রং। ঘন ভ্রু, চোখের পাঁপড়ি। পরনে সাদা পাঞ্জাবি। এত বেশি ভালো লাগছে দেখতে। আমির পদ্মজার রূপে আগে থেকেই দিওয়ানা। তার ওপর এতক্ষণ তাকিয়ে থেকে অনুভূতির দফারফা অবস্থা। সে মুগ্ধ হওয়া কণ্ঠে বলল, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী আমার বউ। কী ভাগ্য আমার!’‘আপনিও সুন্দর,’ কথাটা মুখ ফসকে বলে উঠল পদ্মজা। যখন বুঝতে পারল লজ্জায় মাথা নত করে ফেলল। আমির খুশিতে বাকবাকুম হয়ে বলল, ‘তোমার পলক পড়েছে। আমি জিতে গেছি।’পদ্মজা লজ্জায় নখ খুঁটতে থাকে। আমির নিজের চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, ‘আমি জানি আমি কতটা সুন্দর! রংটা একটু কালো হতে পারে। তবে আমি সুন্দর। তোমার মুখে শোনার পর থেকে ধরে নিলাম, পৃথিবীর সেরা সুন্দর পুরুষের নাম আমির হাওলাদার।’পদ্মজার দুই ঠোঁট নিজেদের শক্তিতে আলগা হয়ে গেল। সে আমিরের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, মানুষ এত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের প্রশংসা নিজে কীভাবে করতে পারে? আমিরের ভাব দেখে মনে হচ্ছে, সে সত্যিই পৃথিবীর সেরা সুন্দর পুরুষ। পদ্মজা ফিক করে হেসে দিল। আমির তাকাল। বলল, ‘হাসছো কেন?’পদ্মজা হাসি চেপে বলল, ‘কোথায়? না তো। আপনার আম্মা বলেছিলেন, দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করতে।’‘আমার আম্মা তোমার আম্মা না?’‘হুম।’‘এখন থেকে আপনার আম্মা না শুধু আম্মা বলবে। গয়নাগাটি নিয়েই নামাজ পড়বে? অস্বস্তি হবে না? খোলো এবার।’পদ্মজা অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘শিরিন আপা বললেন, গয়নাগাটি নাকি স্বামি খুলে দেয়। তাহলে?’আমির তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। ঠোঁটে বাঁকা হাসি নিয়ে বলল, ‘তাই নাকি? দাও খুলে দেই।’পদ্মজা দ্রুত দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল, ‘এ…এটা বোধহয় নিয়ম না। তাই আপনি জানতেন না। আমি…আমি পারব।’দুই রাকাত নফল নামাজের সঙ্গে তাহাজ্জুদের নামাজও আদায় করে নিয়েছে দুজন। আমির তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম জানে না। পদ্মজা হাতে কলমে শিখিয়েছে। আমিরও মন দিয়ে শিখেছে এবং নামাজ পড়েছে। এরপর পদ্মজা জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।জানালার সামনে বিশাল বড়ো জঙ্গল। সে আমিরকে প্রশ্ন করল, ‘এই জঙ্গলে নাকি কী একটা আছে?’আমির পদ্মজার প্রশ্ন শোনেনি। সে পেছন থেকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে নিজের বধূর দিকে। পদ্মজার গায়ে কোনো অলংকার নেই। খোলা চুল কোমর অবধি এসে থেমেছে। মধ্য রাতের বাতাসে তার চুল মৃদু দুলছে। আমির অনুভূতিকে প্রশ্রয় দিল। পদ্মজার কোমর পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল দুই হাতে, পদ্মজার কেঁপে ওঠে বড়ো করে নেয়া নিশ্বাস অনুভব করে গভীরভাবে। পদ্মজার হৃৎপিণ্ড থমকে গেল, শিরশির করে উঠল পায়ের তলার মাটি। তবে, অদ্ভুত বিষয় হলো…শুরুর মতো আমিরের স্পর্শ অস্বস্তি দিচ্ছে না তাকে। বরং ধারাল কোনো অজানা অনুভূতিতে তলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমির পদ্মজার ঘাড়ে থুতনি রেখে বলল, ‘প্রথম যেদিন তোমাকে দেখি সেদিনই মনে মনে পণ করি তোমাকেই বিয়ে করব। তবে ভাবিনি প্রথম দিনই আমার কারণে এতটা অপদস্থ হতে হবে তোমাকে। অনেক চেষ্টা করেছি সব আটকানোর, পারিনি। সেদিনই বাড়ি ফিরে আব্বাকে বলি, আমি বিয়ে করতে চাই পদ্মজাকে। প্রথম প্রথম কেউ রাজি হচ্ছিল না। পরে রাজি হয়ে যায়। মনে হচ্ছে, চোখের পলকে তোমাকে পেয়ে গেছি।’পদ্মজা নিশ্চুপ। ভাবছে—অবাধ্য, অজানা অনুভূতিদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে…নাকি সখ্যতা করবে? আমির পদ্মজাকে ঘুরিয়ে নিজের দিকে ফেরাল। মেয়েটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। আমির বলল, ‘তোমায় আমি পদ্ম ফুল দিয়ে একদিন সাজাব। নিজের হাতে।পদ্মজা কিছুই যেন শুনছে না। সে কাঁপছে। আমির বলল, ‘কথা বলো। আল্লাহ, আবার কাঁপছো! আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরো, স্থির হতে পারবে। এই কী হলো?’পদ্মজা শরীরের ভার ছেড়ে দিয়েছে আমিরের ওপর। আমির দুই হাতে শক্ত করে ধরে রাখে তাকে। সেদিন রাতে জান্নাতের সুবাস এসেছিল ঘরে। পদ্মজা নিজের অস্তিত্বের পুরো অংশ জুড়ে স্বামীরূপে একজন পুরুষকে অনুভব করে। ভালোবাসাটা শুরু হয় সেখান থেকেই। মন মাতানো ছন্দ এবং সুর দিয়ে শুরু হয় জীবনের প্রথম প্রেম……প্রথম ভালোবাসা।
সকাল থেকে বাতাস বইছে। কাছাকাছি কোথাও বৃষ্টি হয়ে গেছে, এমন আমেজ সেই বাতাসে। একটু শীতল চারপাশ। গরু গাড়ি চড়ে পদ্মজা যাচ্ছে বাপের বাড়ি। পাশে আছে আমির এবং লাবণ্য। পদ্মজার পরনে সবুজ শাড়ি, ভারি সুতার কাজ; গা ভরতি গহনা। এসব পরে থাকতে অস্বস্তি হচ্ছে। ফরিনা বেগমের কড়া নিষেধ, কিছুতেই গহনা খোলা যাবে না। আমির পদ্মজার এক হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে, ছেড়ে দিলেই যেন হারিয়ে যাবে। আমিরের এহেন পাগলামি পদ্মজাকে বেশ আনন্দ দিচ্ছে।সে চাপা স্বরে বলল, ‘কোথাও চলে যাচ্ছি না, আস্তে ধরুন।’আমির নরম স্পর্শে পদ্মজার হাত ধরল। পদ্মজা বলল, ‘মনে আছে তো কী বলেছিলাম?’‘কী?’সঙ্গে সঙ্গে পদ্মজা হায় হায় করে উঠল, ‘ও মা! ভুলে গেছেন?’আমির শূন্যে তাকিয়ে মনে করার চেষ্টা করল। সকালে ঘুম ভাঙার পর দেখে ছিল পদ্মজা নতুন শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে। আমির মিষ্টি করে হেসে ডেকেছিল, ‘এদিকে আসো।’পদ্মজা ছোটো ছোটো করে পা ফেলে আমিরের পাশে দাঁড়াল। আমির খপ করে পদ্মজার হাত ধরে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বলল, ‘কখন উঠেছ?’‘যেভাবে টান দিলেন। ভয় পেয়েছি তো।’‘এত ভীতু?’‘কখনোই না।‘তা অবশ্য ঠিক।’‘উঠুন। আম্মা আপনাকে ডেকে নিয়ে যেতে বলেছেন।’‘কেন? জরুরি দরকার নাকি?’‘আমি জানি না। উঠুন আপনি।’‘এই তুমি তো কম লজ্জা পাচ্ছো।’পদ্মজার মুখ লাল হয়ে উঠে। সে বিছানা থেকে দূরে সরে দাঁড়াল। মাথা নত করে বলল, ‘আপনি লজ্জা দিতে খুব ভালোবাসেন।’আমির হাসতে হাসতে বিছানা থেকে নামল। বলল, ‘তোমার চেয়ে কম ভালোবাসি। আচ্ছা, তুমি কবে ভালোবাসবে বলো তো?’পদ্মজা পূর্ণ-দৃষ্টিতে আমিরকে দেখল। আমির আবার হাসল। পদ্মজার দিকে এগিয়ে এসে বলল, ‘যেদিন মনে হবে তুমিও আমাকে ভালোবাসো, বলবে কিন্তু। সেদিনটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় হবে।’পদ্মজা তখনো একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। আমির হাত নাড়িয়ে পদ্মজার পলক অস্থির করে বলল, ‘কী ভাবছো?’‘কিছু না।’‘কিছু বলবে?’‘আমরা আজ ওই বাড়ি যাব।’‘এটাই তো নিয়ম।’‘আপনি একটু বেশরম।’আমির আড়চোখে তাকাল। পদ্মজা ঠোঁট টিপে হেসে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়। আমির আমতা আমতা করে বলল, ‘তা..তাতে কী হয়েছে?’‘কিছু না।’‘কী বলতে চাও, বলো তো।’‘বড়োদের সামনে আমাকে নিয়ে এত কথা বলবেন না। মানুষ কানাকানি করে। আপনাকে বেলাজা, বেশরম বলে। শুনতে ভালো লাগে না আমার।’‘আমার বউ নিয়ে আমি কী করব, আমার ব্যাপার।‘কিন্তু আমাকে অস্বস্তি দেয়।’ পদ্মজা করুণ স্বরে বলল।আমির নিভল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করব।’সত্যি? আমার আম্মার সামনে ভুলেও পদ্মজা, পদ্মজা করবেন না।’‘ইশারা দিতেই চলে আসবে। তাহলে ডাকাডাকি করব না।’পদ্মজা হাসল। আমির ইষৎ হতচকিত। বলল, ‘হাসছো কেন?‘এমনি। মনে রাখবেন কিন্তু।’‘তুমিও মনে রাখবে।’সকালের দৃশ্য থেকে বেরিয়ে আমির বলল, মনে আছে। তোমার অস্বস্তি হয় এমন কিছুই করব না।’আমিরের কথায় পদ্মজা সন্তুষ্ট হলো। নিজেকে আজ পরিপূর্ণ মনে হচ্ছে। উত্তেজনায় কাঁপছেও। দুই দিন পর মা-বাবা, ভাইবোনকে দেখবে। দুই দিনে কী কিছু পালটেছে? পদ্মজা মনে মনে ভাবছে, আম্মা বোধহয় শুকিয়েছে। আমাকে ছাড়া আম্মা নিশ্চয় ভালো নেই।পদ্মজার খারাপ লাগা কাজ করতে থাকে। ছটফটানি মুহূর্তে বেড়ে যায়। আমির জানতে চাইল, ‘পদ্মজা, শরীর খারাপ করছে?’‘না।’‘অস্বাভাবিক লাগছে।’‘আম্মাকে অনেকদিন পর দেখব।’‘অনেকদিন কোথায়? দুই দিন মাত্র।’‘অনেকদিন মনে হচ্ছে।’‘এই তো চলে এসেছি। ওইযে দেখো, তোমাদের বাড়ির পথ।’আমির ইশারা করে দেখাল। আমিরের ইশারা অনুসরণ করে সেদিকে তাকাল পদ্মজা। ওই তো তাদের বাড়ির সামনের পুকুর দেখা যাচ্ছে। আর কিছু সময়, এরপরই সে তার মাকে দেখবে। পদ্মজা অনুভব করে তার নিশ্বাসের গতি বেড়ে গেছে। হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে। সে আমিরের এক হাত শক্ত করে ধরে বাড়ির দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইল।হেমলতা নদীর ঘাটে মোর্শেদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, সকালে মোর্শেদকে বাজারে পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মোর্শেদ কিছু জিনিস ভুলক্রমে আনেননি। তা নিয়েই আলোচনা চলছে। ঠিক আলোচনা নয়। হেমলতা বকছেন আর মোর্শেদ নৌকায় বসে শুনছেন। তিনি কথা বলার সুযোগই পাচ্ছেন না। হেমলতা নিশ্বাস নেয়ার জন্য থামতেই মোর্শেদ বললেন, ‘অহনি যাইতাছি। সব লইয়া হেরপর আইয়াম।’‘এখন গিয়ে হবেটা কী? হঠাৎ ওরা চলে আসবে।’‘আমি যাইয়াম আর আইয়াম,’ বলতে বলতে মোর্শেদ নৌকা ভাসিয়ে দূরে চলে যান। হেমলতা ক্লান্তি ভরা দৃষ্টি নিয়ে স্বচ্ছ জলের দিকে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। আচমকা পূর্ণার চিৎকার ভেসে এলো কানে। তিনি চমকে ঘুরে তাকালেন। আপা আপা বলে চেঁচাচ্ছে পূর্ণা। হেমলতা বিড়বিড় করলেন, ‘পদ্ম এসে গেছে!’ব্যস্ত পায়ে হেঁটে বাড়ির উঠোনে চলে এলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে ফুলের মতো সুন্দর মেয়েটি হামলে পড়ে বুকের ওপর। আম্মা, আম্মা বলে জান ছেড়ে দিল। হেমলতার এত বেশি আনন্দ হচ্ছে যে, হাত দুটো তোলার শক্তি পাচ্ছেন না। চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি দুই হাতে শক্ত করে পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরলেন। শূন্য বুকটা চোখের পলকে পূর্ণ হয়ে উঠেছে। পদ্মজা নিশ্চয় বুঝে যাবে, দুই রাত তার আম্মা ঘুমায়নি, চোখদ্বয় নিশ্চিন্তে আরাম করতে পারেনি। বুঝতেই হবে পদ্মজাকে। পদ্মজা ঘন ঘন লম্বা করে নিশ্বাস টানছে। স্পষ্ট একটা ঘ্রাণ পাচ্ছে সে, মায়ের শরীরের ঘ্রাণ! পারলে পুরো মাকেই এক নিশ্বাসে নিজের মধ্যে নিয়ে নিত।হেমলতা পদ্মজার মাথায় আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে বললেন, আর কাঁদিস না। এই তো, আম্মা আছি তো।’‘তোমাকে খুব মনে পড়েছে, আম্মা।’‘আমারও মনে পড়েছে,’ হেমলতার চোখের জল ঠোঁট গড়িয়ে গলা অবধি পৌঁছেছে। তিনি অশ্রুমিশ্রিত ঠোঁটে পদ্মজার কপালে চুমু দেন। আমির হেমলতার পা ছুঁয়ে সালাম করতে নেয়। হেমলতা ধরে ফেলেন। আমিরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘লাগবে না, বাবা।’আমির বিনীত কণ্ঠে বলল, ‘ভালো আছেন, আম্মা?’‘ভালো আছি। তুমি ভালো আছো তো? আমার মেয়েটা কান্নাকাটি করে জ্বালিয়েছে খুব?’‘ভালো আছি আম্মা। একটু-আধটু তো জ্বালিয়েছেই।’ কথা শেষ করে আমির আড়চোখে পদ্মজার দিকে তাকাল।ফোঁপাচ্ছে পদ্মজা। হেমলতা অনেকক্ষণ চেষ্টা করে পদ্মজাকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। বাড়িতে মনজুরা, হানিসহ হানির শ্বশুরবাড়ির অনেকেই ছিল। তারা আগামীকাল ঢাকা ফিরবে। জামাই স্বাগতমের বিশাল আয়োজন করা হয়েছে। পূর্ণা পদ্মজা ও লাবণ্যকে টেনে নিয়ে গেল ঘরে। হানির স্বামী আমিরকে নিয়ে গল্পের আসর জমালেন। আমির আসার সময় গরুগাড়ি ভরে বাজার করে নিয়ে এসেছে। হেমলতা সেসব গোছাচ্ছেন। তিনি বার বার করে মজিদ মাতব্বরকে বলে দিয়েছিলেন, ফের যাত্রায় বাজার না পাঠাতে। তবুও পাঠিয়েছেন। ফেলে তো দেওয়া যায় না।.রাতের খাবার শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ। পূর্ণাকে আমির ছোটো আপা বলে ডাকছে, শালির চোখে একদমই দেখছে না। তেমন রসিকতাও করছে না। আমিরের ব্যবহারে পূর্ণা ধীরে ধীরে ওকে বোনজামাই হিসেবে পছন্দ করে নিচ্ছে। না হোক নায়কের মতো সুন্দর, মন তো ভালো। লাবণ্য, আমির আর পূর্ণার সঙ্গে লুডু খেলছে হানির বড়ো ছেলে। পদ্মজা কিছুক্ষণ খেলে উঠে এসেছে। হেমলতা, মোর্শেদ বারান্দার বেঞ্চিতে বসে ছিলেন। পদ্মজা দরজার পাশে এসে দাঁড়াল। মোর্শেদ দেখতে পেয়ে ডাকলেন, ‘কী রে মা? আয়।’ পদ্মজাকে টেনে এনে দুজনের মাঝখানে বসিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করলেন, হউরবাড়ির মানুষেরা ভালা তো?’পদ্মজা নতজানু হয়ে জবাব দিল, ‘সবাই ভালো।‘একটু আধটু সমস্যা থাকবেই, মানিয়ে নিস। জয় করে নিস। সব কিছুই অর্জন করে নিতে হয়।’ বললেন হেমলতা। পদ্মজা হেমলতার দিকে তাকিয়ে মৃদু করে হাসল। হেমলতা আবার বললেন, ‘তোর শাশুড়ি একটু কঠিন তাই না? চিন্তা করিস না। যা বলে করবি। পছন্দ-অপছন্দ জানবি সেই মতো কাজ করবি। দেখবি, ঠিক মাথায় তুলে রেখেছে।‘আচ্ছা, আম্মা।’ বলল পদ্মজা।‘সব শাশুড়ি ভালো হয় না লতা। আমার শাশুড়িরে আজীবন তেল দিলাম। কোনো পরিবর্তন হয়েছে? হয়নি।’ বললেন হানি। তিনি ঘর থেকে সব শুনছিলেন। কথা না বলে পারলেন না।হেমলতা এক হাতে পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর হানির উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আমার পদ্মর কপাল এত খারাপ নিশ্চয় হবে না।’‘পদ্মর অবস্থা আমার মতো হয়েছে যদি শুনি, ওরে তুলে নিয়ে যাব আমার কাছে। তুই মিলিয়ে নিস।’‘আহ! থামো তো আপা। আমির-লাবণ্য শুনবে। কী ভাববে?’হানি আর কিছু বললেন না। চারজন মানুষ নিশ্চুপে বসে রইল একসময় হেমলতা রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। রান্নাঘর গুছানো হয়নি। নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন মোর্শেদ, সারাদিন অনেক ধকল গেছে। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে। হানি পদ্মজার পাশে বসে বললেন, ‘শোন মা, শাশুড়িরে বেশি তেল দিতে গিয়ে নিজের জীবন নষ্ট করবি না। তোর মায়ের অনেক জ্ঞান, অভিজ্ঞতা মানি। কিন্তু লতাকে শাশুড়ি নিয়ে সংসার করতে হয়নি তাই সে জানে না। আমি জানি শাশুড়িরা কেমন কালসাপ হয়। এরা সেবা নিবে দিনরাত। বেলাশেষে ভুলে যাবে। নিজের কথা আগে ভাববি। শাশুড়ি ভুল বললে জবাব দিবি সঙ্গে সঙ্গে। নিজের জায়গাটা বুঝে নিবি। পড়াশোনা থামাবি না। পড়বি আর আরামে থাকবি। আমরা বান্দি পাঠাইনি। সাক্ষাৎ পরি পাঠাইছি। শুনছি, আমিরের টাকাপয়সা, জমিজমা অনেক আছে। তাহলে তোর আর চিন্তা কীসের? জামাই হাতে রাখবি। তাহলে পুরো সংসার তোর হাতে থাকবে। আমার কপালে এসব ঠেকেনি। বিয়ের পর থেকে শ্বশুরবাড়ির মানুষের মন রাখতে রাখতে কখন বুড়ি হয়ে গেছি বুঝিনি। বুঝছিস তো?’পদ্মজা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। প্রসঙ্গ পালটাতে বলল, ‘মেজো আপা আসেনি কেন? বিয়ে কবে আপার?’‘ওর তো পরীক্ষা সামনে। পড়াশোনা শেষ করুক। এরপর বিয়ে দেব।’‘বিয়ে না ঠিক হওয়ার কথা ছিল। হয়নি?’‘কবে?’ আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন হানি। পদ্মজা হানির প্রশ্নে অবাক হলো। কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল, ‘আম্মা না কয়দিন আগে তোমাদের বাড়ি গেল। বড়ো আপার বিয়ে ঠিক করতে।’হানি হাঁ হয়ে চেয়ে রইলেন পদ্মজার দিকে। তিনি কিছুই বুঝছেন না। তার মেয়ের বিয়ে আবার কবে ঠিক হওয়ার কথা ছিল? পদ্মজা বিয়ে করে কী আবোলতাবোল বকছে! তিনি বললেন, ‘কী বলিস?’হানির সহজ সরল মুখখানার দিকে পদ্মজা একদৃষ্টে চেয়ে রইল। সে ছে: আম্মা রাজধানীতে তাহলে কেন গিয়েছিল? মিথ্যে কেন বলেছে? সেদিন রাজধানীতে গিয়েছিল বলেই এত বড়ো অঘটন ঘটেছিল। না! অঘটন ভাগ্যেই লেখা ছিল। কিন্তু মিথ্যে কেন বলল আম্মা?
মাদিনী নদীর বুকে কুন্দ ফুলের মতো জোনাকি ফুটে রয়েছে। পদ্মজা তা এক মনে চেয়ে দেখছে। রাত অনেকটা। আমির ঘুমাচ্ছে। তিন দিনে আমিরের সঙ্গে পূর্ণা-প্রেমার খুব ভাব হয়েছে। সারাক্ষণ আড্ডা, লুডু খেলা। পদ্মজা যত দেখছে তত আমিরের প্রেমে পড়ছে। আমিরের ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে পদ্মজার মনে পড়ল, আগামীকাল ফিরে যেতে হবে শ্বশুরবাড়ি। মা-বাবা, ভাই-বোন সবাইকে ছেড়ে আবার চলে যেতে হবে—ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে আসে। মন ভালো করতে চলে আসে নদীর ঘাটে। জোনাকিদের কুরুক্ষেত্র দেখতে দেখতে কেটে যায় অনেকক্ষণ। আঁধার ভেদ করে একটা আলোর ছোঁয়া লাগে চারপাশে। এসময় কে এলো? পদ্মজা ঘাড় ঘুরে তাকাল, মাকে দেখে হাসল একগাল। হেমলতা হারিকেন হাতে নিয়ে এগিয়ে আসেন। কিঞ্চিৎ রাগ নিয়ে বললেন, ‘এত রাতে একা ঘাটে এসেছিস কেন? মার খাসনি অনেকদিন। বিয়ে হয়েছে বলে আমি মারব না নাকি?’হেমলতার ধমকে পদ্মজা মেরুদণ্ড সোজা করে থতমত হয়ে দাঁড়াল। মা শেষ কবে মেরেছেন, পদ্মজা মনে করতে পারছে না। তিনি যেভাবে বললেন মনে হলো, না জানি কত মেরেছেন। তাই পদ্মজাও ভয় পাওয়ার ভান ধরল। বলল, ‘যাচ্ছি ঘরে।’‘কী জন্য এসেছিলি? ঘুম আসছে না?’ হেমলতার কণ্ঠটা নরম শোনাল।‘কাল চলে যেতে হবে তাই মন খারাপ হচ্ছিল।’হেমলতা হারিকেন মাটিতে রাখেন। তারপর দুহাতে পদ্মজাকে বুকে টেনে নেন। বাঁধন ছেঁড়া হলো পদ্মজার কান্নারা। মায়ের বুকে মুখ চেপে পিঠটা বারংবার ফুলে ফুলে উঠতে লাগল। কিছুক্ষণ পার হলো এভাবেই। ‘এত সহজে কাঁদিস কেন? মা-বাবার কাছে সারাজীবন মেয়েরা থাকে না রে মা।’‘তুমি সঙ্গে চলো।’‘পাগল মেয়ে! বলে কী! কান্না থেমেছে?’পদ্মজা দুহাতের উলটো পাশ দিয়ে চোখের জল মুছে বলল, ‘হুঁ।’আমির তো ঘুমে। তুইও ঘুমিয়ে পর গিয়ে।’পদ্মজা মাথা নাড়াল। দুই কদম এগিয়ে আবার চটজলদি পিছিয়ে আসে। মাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘তুমি ঘুমাবে না আম্মা?’‘ঘুমাব, চল।’‘আম্মা?’হেমলতা হারিকেন হাতে নিয়ে পদ্মজার চোখের দিকে তাকালেন। পদ্মজা বলল, ‘তোমার জীবনের সবটা আমাকে বলেছো। কিছু আড়ালে থাকলে সেটাও বোলো, আম্মা।’‘কেন মনে হলো, আরো কিছু আছে?’ হেমলতার কণ্ঠটা অন্যরকম শোনাল।‘মনে হয়নি। এমনি বলে রাখলাম।’পদ্মজা নতজানু হয়ে নিজের নখ খুঁটছে। হেমলতা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কেটে গেল অনেকটা সময়। তিনি ঢোক গিলে গলা ভিজিয়ে বললেন, ‘তাই হবে।পদ্মজা খুশিতে তাকাল। নিশ্চয় এখন সব বলবে আম্মা। হানি খালামনির বাড়ির কথা বলে সেদিন কোথায় গিয়েছিলেন? এখনই জানা যাবে।হেমলতা আশায় পানি ঢেলে দিলেন, ‘এখন ঘুমাতে যা। অনেক রাত হয়েছে।’পদ্মজার চোখমুখের উজ্জ্বলতা নিভে গেল। মা কাঙ্ক্ষিত প্রসঙ্গটি কেন এড়িয়ে যাচ্ছেন? পদ্মজা সরাসরি জিজ্ঞাসা করার অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু পারছে না। জড়তা ঘিরে রেখেছে তাকে। মা সবসময় নিজ থেকে সব বলেন। নিশ্চয় কোনো কারণে এই বিষয়ে চুপ আছেন। পদ্মজা মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিল, ‘একদিন আম্মা বলবে।’কালো মেঘে ঢাকা আকাশ। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। লাহাড়ি ঘরের বারান্দায় হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছেন হেমলতা। সন্ধ্যার আজান পড়বে। চারপাশে এক মায়াবী ঘনছায়া। মন বিষাদময়। পদ্মজা দুপুরে মোড়ল বাড়ি ছেড়েছে। বিদায় মুহূর্তটা একটুও স্বস্তির ছিল না। মেয়েটা এত কাঁদতে পারে! তবে হেমলতার চোখ শুকনো ছিল। মায়ের চোখ শুকনো দেখে কি পদ্মজা কষ্ট পেয়েছিল? কে জানে! হেমলতা বারান্দা ছেড়ে উঠতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন শক্তির অবস্থান শূন্যে। তিনি আবার বসে পড়লেন। হেসে ফেললেন, পদ্মজা ছাড়া এত দুর্বল তিনি! এটা ভাবতে অবশ্য ভালো লাগে। হেমলতা আকাশের দিকে তাকালেন। চোখ দুটি জ্বলছে। জলভরা চোখ নিয়ে আবার হাসলেন। কী যন্ত্রণাময় সেই হাসি! মাটিতে হাতের ভর ফেলে উঠে দাঁড়ান তিনি। এলোমেলো পায়ে লাহাড়ি ঘর ছাড়েন। উঠোনে এসে থমকে দাঁড়ান। বাড়ির গেট খোলা ছিল। পাতলা অন্ধকার ভেদ করে একটি নারী অবয়ব এগিয়ে আসছে বাড়ির দিকে। হেমলতা নারী ছায়াটির স্পষ্ট মুখ দেখার জন্য অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকেন। গেটের কাছাকাছি আসতেই হেমলতা আন্দাজ করতে পারেন কে এই নারী! তিনি মৃদু হেসে এগিয়ে যান।‘অনেক দেরি করলেন আসতে।’বাসন্তী উঠোনে পা রেখে বললেন, ‘আপনি আমাকে চিনেন?’হেমলতা জবাব না দিয়ে বাসন্তীর ব্যাগ নিতে হাত বাড়ালেন। বাসন্তী ব্যাগ আড়াল করে ফেললেন, তিনি খুব অবাক হচ্ছেন। মনে যত সাহস নিয়ে এসেছিলেন, সব ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। হেমলতা বললেন, ‘আপনি এই বাড়িতে নির্দ্বিধায় থাকতে পারেন। আমি বা আমার সন্তানদের পক্ষ থেকে আপত্তি নেই।’‘আ…আপনি আমাকে চিনলেন কীভাবে?’‘সে যেভাবেই চিনি। জেনে কি লাভ আছে? আপনি প্রথম দিনই একা আসতে পারতেন। লোকজন না নিয়ে।’বাসন্তীর এবার ভয় করছে। শরীর দিয়ে ঘাম ছুটছে। একটা মানুষ সতিন দেখে এত স্বাভাবিক কী করে হতে পারে? তিনি তো ভেবেছিলেন যুদ্ধ করে স্বামীর বাড়িতে বাঁচতে হবে। বাসন্তীর ধবধবে সাদা চামড়া লাল বর্ণ ধারণ করেছে। হেমলতার কথা, দৃষ্টি এত ধারাল মনে হচ্ছে তার! হেমলতা বাসন্তীকে চুপ দেখে বললেন, ‘আপনি বিব্রত হবেন না। এটা আপনারও সংসার। আসুন।’হেমলতা আগে আগে এগিয়ে যান। বারান্দা অবধি এসে পেছনে ফিরে দেখেন, বাসন্তী ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন। হেমলতা কথা বলার জন্য প্রস্তুত হোন, তখনই একটা পুরুষালি হুংকার ভেসে এলো, ‘তুমি এইহানে আইছো কেন?’মোর্শেদের কণ্ঠ শুনে বাসন্তী কেঁপে উঠলেন। মোর্শেদকে এড়িয়ে একজন বনেদি লোকের প্রতি ক্ষণিকের জন্য আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলেন বাসন্তী। এরপর থেকেই মোর্শেদ এবং তার সম্পর্কে ফাটল ধরে। মোর্শেদ ত্যাগ করেন তাকে। কিন্তু তিনি এক সময় বুঝতে পারেন, কোনটা ভুল কোনটা সঠিক। সংসারের প্রতি টান অনুভব করে ফিরে আসতে চান। মোর্শেদ জায়গা দিলেন না। ততদিনে মোর্শেদ দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা উপলব্ধি করেন, মোহ ছেড়ে ফিরে আসেন সংসারে হেমলতার কাছে।‘বাইর হইয়া যাও কইতাছি। বাইর হও আমার বাড়ি থাইকা।’মোর্শেদ বাসন্তীকে ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে যেতে বললেন। বাসন্তী হুমড়ি খেয়ে পড়তে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলেন। চোখ গরম করে মোর্শেদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এইটা আমারও ছংছার। আমি যাব না।’‘বাসন্তী, ভালাই ভালাই কইতাছি যাও এন থাইকা। নইলে তোমার লাশ ফালায়া দিয়াম আমি।’বাসন্তী কিছু কঠিন কথা শোনাতে গিয়েও শুনালেন না। হেমলতা উঠোনে নেমে আসেন, ‘যখন বিয়ে করেছো তখন হুঁশ ছিল না! এখন সংসার দিতে আপত্তি?’‘তুমি জানো না লতা, এই মহিলা কত্তডা খারাপ। এই মহিলা লোভী। লোভখোরের বাচ্চা। মাদারির বাচ্চা।’‘কী সব বলছো? মুখ সামলাও।’মোর্শেদের কপালের রগ দপদপ করছে। নিশ্বাস ঘন হয়ে এসেছে। বাসন্তীকে পেটাতে হাত নিশপিশ করছে। তবুও হেমলতার কথায় তিনি থামলেন। কিন্তু তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলেন বাসন্তীর দিকে। হেমলতা বললেন, ‘আপনি ঘরে যান। এই ঘর আপনারও। উনার কথা মনে নিবেন না।’‘আমার ঘরে এই মহিলায় ঢুকলে খারাপি হইয়া যাইব।’হেমলতা মোর্শেদের চোখের দিকে তাকিয়ে ইশারায় কিছু একটা বললেন। এরপর বাসন্তীকে বললেন, ‘আপনি যান। সদর ঘরের ভেতরের দরজার বাঁদিকে যে ঘরটা সেখানেই যান। দেখিয়ে দিতে হবে?’বাসন্তী কিছু না বলে গটগট আওয়াজ তুলে বারান্দা পেরিয়ে সদর ঘরে ঢুকে পড়েন। হাত-পা কাঁপছে তার। হেমলতার ব্যবহার স্বাভাবিক হলেও অস্বাভাবিক ঠেকছে। সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে ফেরার জন্য জ্বরে বিছানায় পড়ে যান। গত কয়দিন জ্বরে এতই নেতিয়ে গিয়েছিলেন যে, ওঠার শক্তিও ছিল না। শরীরটা একটু চাঙ্গা হতেই আবার চলে এসেছেন। এত সহজে সব পেয়ে যাবেন জানলে জ্বর নিয়েই চলে আসতেন। মোর্শেদ অসহায় চোখে তাকালেন হেমলতার দিকে। বললেন, ‘কেন এমনডা করলা? আমি বাসন্তীর লগে থাকবার চাই না।’‘ঠান্ডা হও তুমি। তুমি কিছুই জানো না, যেদিন আমরা ঢাকা থেকে ফিরি সেদিন উনি এসেছিলেন। লোকজন নিয়ে এসেছিলেন। এরপরই আমার মেয়েদের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। পরিস্থিতি হাতের নাগালে চলে যাওয়াতে উনি সেদিন ফিরে গিয়েছিলেন। বিয়ের দিন বেয়াই সব বললেন। বেয়াইয়ের কাছে কামরুল মিয়া অভিযোগ করেছিলেন। বেয়াই কামরুল ভাইকে বলেন, ব্যাপারটা এখন ছড়াছড়ি না করতে। এতে উনার সম্মান নষ্ট হবে। যে বাড়িতে ছেলের বিয়ে দিচ্ছেন সেই বাড়ির কর্তার প্রথম বউ আছে, বউ আবার একজন পরনারীর মেয়ে। অধিকার নিতে লোকজন নিয়ে বৈঠক বসাবে—এসব সত্যিই অসম্মানজনক। তিনি আমাকে অনুরোধ করেছেন, ব্যাপারটা যেন নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নেই। আর বাসন্তী আপার তো দোষ নেই। সবচেয়ে বড়ো কথা, আমার সংসারের হাল ধরার জন্য একজন দরকার। খুব দরকার।’ হেমলতার শেষ কথাগুলো করুণ শোনাল। মোর্শেদ বিস্ময়ে তাকিয়ে আছেন। বাসন্তী এত কিছু করেছে তা ভাবতে পারছেন না। মোর্শেদ কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বললেন, ‘তারে আমি মানতে পারতাছি না। বুঝায়া শুনায়া বাইর কইরা দেও।’‘তুমি আমার কথাগুলো শোনো, থাকতে দাও উনাকে। ক্ষমা করে দাও। আমি জানি না সে কী করেছে। যাই করুক, ক্ষমা করে দাও।’মোর্শেদের মাথায় খুন চেপেছে। তিনি কী করবেন, কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। ক্রোধে-আক্রোশে ফুলতে ফুলতে বাড়ির পেছনে চলে যান। নৌকা নিয়ে বের হবেন। রাতে বোধহয় ফিরবেন না আজ। আজান পড়ছে, বৃষ্টির বেগ বেড়েছে। হেমলতা ব্যস্ত পায়ে হেঁটে যান বারান্দায়। গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। বুক মুচড়ে একটা কান্না ছিটকে এলো গলায়, সেইসঙ্গে চোখ ছাপিয়ে জল। কোন নারী সতিন মানতে পারে? বাধ্য হয়ে মানতে হচ্ছে, ভাগ্য বাধ্য করছে। নয়তো তিনি এত উদার নন। কখনোই অন্যকে নিজের সংসারের ভাগ দিতেন না। সেই প্রথম থেকে মনে পুষে রেখেছেন, কখনো মোর্শেদের স্ত্রী এই সংসার চাইলে মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেবেন। যার জন্য তিনি একাকীত্বে ধুঁকেছেন, যার জন্য মোর্শেদের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, যার জন্য মোর্শেদের মার খেয়েছেন—তাকে কখনোই এত সহজে সুখ দিতেন না। কখনোই না। হেমলতার শরীরে কাঁটা ফুটছে। তিনি কোনমতে কান্নাটাকে গিলতে চাইলেন। বাসন্তীর গলা কানে এলো, ‘আপনি কাঁদতাছেন?’হেমলতা চমকে তাকালেন। লজ্জায় চোখের জল মোছার সাহস পেলেন না। চোখে জল নিয়েই হাসলেন। বাসন্তী হতবাক! কী অসাধারণ নারী!বাসন্তী প্রসঙ্গ পালটে জানতে চাইলেন, ‘ছেলেমেয়েরা কই?’‘বড়ো মেয়েটার বিয়ে হয়েছে। শ্বশুরবাড়িতে আছে। আজই ফের যাত্রা শেষ করে শ্বশুর বাড়ি গেল। মেজো আর ছোটোটা তাদের নানাবাড়ি গেছে। বড়োটার জন্য কান্নাকাটি করছিল তাই আম্মা নিয়ে গেছে।’‘ঘরে একটা ছোটু ছেড়া ঘুমাইতাছে। কে ছে?’‘প্রান্ত। আমারই ছেলে।’‘চুনছিলাম তিন মেয়ে ছুধু ‘হেমলতা আর কথা বাড়ালেন না। রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বললেন, ‘আপনি কলপাড়ে যান। কাপড় পালটে নেন। আমি খাবার বাড়ছি।’.পদ্মজা মুখ ভার করে বসে আছে। রাতের খাবারের সময় ফরিনা বেগম কথা শুনিয়েছেন। কঠিন স্বরে বলেছেন, ‘বাপের বাড়ির আহ্লাদ মিটায়া আইছো তো? আর কোনোদিন যাইতে কইবা না। এইডাই তোমার বাপের বাড়ি, স্বামীর বাড়ি। আর তোমার ভাই-বইনদের কইবা সবসময় আনাগোনা না করতে। বাড়ির কাছে বইলা সবসময় আইতে হইব এইডা কথা না। চোক্ষে লাগে।পদ্মজা বুঝতে পারছে না, তার ভাই বোন তো শুধু বৌভাতের দিন এসেছে। দাওয়াতের আমন্ত্রণ রক্ষার্থে। এজন্য এভাবে কেন বলতে হবে। কান্না পাচ্ছে খুব। আম্মার কথা মনে পড়ছে। পূর্ণা কী করছে? আসতে তো নিষেধ দিয়ে দিল। তাহলে কীভাবে দেখা হবে? আমির ঘরে ঢুকতেই পদ্মজা দ্রুত চোখের জল মুছল। পদ্মজার ফ্যাকাসে মুখ দেখে আমির প্রশ্ন করল, ‘আম্মা কিছু বলছে?’পদ্মজা দ্রুত বলল, ‘না, না।’‘তাহলে কাঁদছ কেন?’‘আম্মার কথা মনে পড়ছে।’‘যেতে চাও? চলো।’‘ওমা কী কথা! এত রাতে। আর দুপুরেই না আসলাম।’‘তাহলে মন খারাপ করো না। আমরা আবার যাব। কয়দিনের মধ্যে।’ বাইরে অনেক হাওয়া বইছে। পদ্মজা জানালা লাগাতে গেল। তখন একটা চিৎকার শুনতে পেল। আমির তা লক্ষ করে বলল, ‘বড়ো ভাবির চিৎকার। রুম্পা ভাবি। পাগলের মতো আচরণ তার। পাগলই বলে সবাই।পদ্মজা কৌতূহল নিয়ে আমিরের সামনে এসে দাঁড়াল, ‘আপনার মনে হয় কেউ ভয় পেয়ে মানসিক ভারসাম্য হারাতে পারে?’‘অসম্ভবের কী আছে?’‘আমার কাছে খটকা লাগছে। উনার সঙ্গে অন্য কিছু হয়েছে?’‘আমি তো এতটুকুই জানি,’ আমির চিন্তিত হয়ে বলল।পদ্মজা বলল, ‘উনার সঙ্গে আমার দেখা করিয়ে দিবেন?’আমির উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘ভাবি তোমাকে আঘাত করবে।’‘বাঁধাই তো থাকে। অনুরোধ করছি।’পদ্মজাকে হাতজোড় করে অনুরোধ করতে দেখে আমির সায় দিল, ‘আচ্ছা, ভোরে নিয়ে যাব। তখন সবাই ঘুমে থাকে।’‘আপনাদের এই বাড়িটা খুব রহস্যজনক।’‘সত্যি নাকি? আমার তেমন কিছু মনে হয় না।’‘আপনি তো কয়দিনের জন্য গ্রামে আসেন। আর এসব সবাই বুঝে না।’‘ওরে আমার বুঝদার। তবে জিন আছে শুনেছি। আমার এক ফুফু বাড়ির পেছনের পুকুরে ডুবে মরেছিলেন। এছাড়া চাচিকে মাঝেমধ্যেই জিনে ধরে।’‘সে কী!’‘তবে আমি বিশ্বাস করি না এসব। তুমি বিশ্বাস করো?’‘না। আচ্ছা…’পদ্মজা কথা শেষ করতে পারল না। আমির পদ্মজাকে টেনে বিছানায় নিয়ে এলো। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আর কথা না। ঘুমাও।’‘আমি ভর্তা হয়ে যাচ্ছি।’‘এই যে আস্তে ধরলাম।’‘শুনুন না?’‘কী?’‘আমি পড়তে চাই।’‘পড়বে।’‘আম্মাকে অসন্তুষ্ট রেখে জোর করে পড়তে মন মানবে না।’‘আম্মাকে রাজি করাব।’পদ্মজা খুশিতে গদগদ হয়ে উঠল।সে ও আমিরকে এক হাতে জড়িয়ে ধরল।
আজানের ধ্বনিতে জেগে ওঠে পৃথিবী, জেগে ওঠে পদ্মজা। বিছানা থেকে উঠতে গিয়েও উঠতে পারল না। আমির দুই হাতে জাপটে ধরে রেখেছে তাকে। পদ্মজা আমিরকে মৃদু কণ্ঠে ডাকল, ‘এই যে, শুনছেন?’আমির সাড়া দিল না। আবার ডাকল পদ্মজা। আমির ঘুমের ঘোরে কিছু একটা বিড়বিড় করে পুনরায় ঘুমে তলিয়ে যায়। এবার পদ্মজা উঁচু স্বরে ডাকল, ‘আরে উঠুন না। ফজরের নামাজ পড়বেন। এই যে…’আমির পিটপিট করে চোখ খুলে তাকাল। দুই হাতের বাঁধন আগলা করতেই পদ্মজা আমিরকে ঠেলে দ্রুত উঠে বসে। বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল, ‘অজু করতে আসুন। আপনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন আজ থেকে নামাজ পড়বেন।পদ্মজা দ্রুত কলপাড়ের দিকে যেতে থাকে। সে সবসময় আলো ফোটার আগে ফজরের নামাজ আদায় করার চেষ্টা করে। কলপাড় থেকে অজু করে এসে দেখে, আমির বালিশ জড়িয়ে ধরে আয়েশ করে ঘুমাচ্ছে। সে মৃদু হেসে কপাল চাপড়ায়। আমিরের পাশে গিয়ে তার চুলে বিলি কেটে দিয়ে কোমল কণ্ঠে বলল, ‘উঠুন না। নামাজ পড়ে আবার ঘুমাবেন। মসজিদে যেতে হবে না, আমার সঙ্গেই পড়ুন। এই যে, শুনছেন? এই যে, বাবু…’পদ্মজা দ্রুত জিভ কাটল। মুখ ফসকে আমিরের ডাক নাম ধরে ডেকে ফেলল! পদ্মজা সাবধানে পরখ করে দেখল, আমির শুনল কি না! না শোনেনি। পদ্মজা হাঁফ ছেড়ে আরো এক দফা ডাকার পর আমির উঠে বসে। কাঁদো কাঁদো হয়ে অনুরোধ করে, ‘কাল থেকে পড়ব। দয়া করে, আজ ঘুমাতে দাও।’পদ্মজা তার কথা শুনল না। বরং স্ত্রীর অনুনয়ের কাছে হেরে গেল আমির। সহধর্মিণী যদি এত সুন্দরী হয় তার অনুরোধ কি ফেলা যায়? আমির অনিচ্ছা সত্ত্বেও কলপাড় থেকে অজু করে আসে। পাশাপাশি জায়নামাজে বসে নামাজ আদায় করল দুজন।নামাজ শেষ হতেই পদ্মজা তাড়া দিয়ে বলল, ‘এবার চলুন।’আমির টুপি বিছানার ওপর রেখে অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘কোথায়?’অভিমান হলো পদ্মজার, ‘এমনভাবে বলছেন যেন জানেন না!’আমিরের সত্যি কিছু মনে পড়ছে না। চোখে এখনো ঘুম ঘুম ভাব। সে শুধু ঘুমাতে চায়। পদ্মজার অভিমানী মুখ দেখে মনে করার চেষ্টা করল। মনে পড়তেই বলল, ‘ওহ! দাঁড়াও, চাবি নিয়ে আসছি।’আমির ঘরের বাইরে চলে যায়। পদ্মজা প্রবল উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করছে। জানালার পাশে দাঁড়াতেই ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে সর্বাঙ্গ চাঙ্গা হয়ে উঠে। বাইরে সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটেছে। পদ্মজা মুগ্ধ নয়নে দেখছে বাড়ির পেছনের জঙ্গল। কী সুন্দর সবকিছু! এত এত গাছ। অযত্নে গড়ে ওঠা বন-জঙ্গল বোধহয় একটু বেশি আকর্ষণীয় হয়।প্রকৃতির রূপ দেখতে দেখতে আচমকা চোখের তারায় দৃশ্যমান হয় রানি। রানির পরনে আকাশি রঙের সালোয়ার-কামিজ। সে জঙ্গলের ভেতরে যাচ্ছে। চোর চুরি করার সময় যেভাবে চারপাশ দেখে দেখে এগোয় ঠিক সেভাবে চারপাশ দেখে দেখে এগোচ্ছে রানি। পদ্মজা নিশ্বাস বন্ধ করে পুরো দৃশ্যটা দেখল। রানি জঙ্গলের ভেতরে চলে যায়।পেছন থেকে আমির ডাকল, ‘পদ্মবতী?’হঠাৎ ডাক শুনে পদ্মজা মৃদু কেঁপে উঠল।আমির কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল, ‘কিছু কী হয়েছে?’‘না! কী হবে? চলুন আমরা যাই।’ পদ্মজা হাসার চেষ্টা করল।পদ্মজা যে কিছু একটা এড়িয়ে যাচ্ছে তা বেশ বুঝতে পারছে আমির। তবে প্রশ্ন করল না। রানির কথা তুলতে গিয়েও তুলল না পদ্মজা। সে ভাবছে, ‘আগে রানি আপাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে। এখনই উনাকে বলা ঠিক হবে না। কী ভাবেন আবার!’রুম্পার ঘরের দরজা খুলতেই ক্যাচক্যাচ আওয়াজ হলো। ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে নাকে দুর্গন্ধ ঠেকে। পদ্মজা প্রথমে জানালা খুলে দিল। পালঙ্কের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল, সেটি শূন্য। আমিরের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে, আমির ইশারা করল পালঙ্কের নিচে দেখতে। পদ্মজা ঝুঁকে পালঙ্কের নিচে দেখে কেউ একজন নিথরের মতো শুয়ে আছে, যেন মৃত লাশ। জট লাগা চুল দিয়ে মুখ ঢাকা, হাতে-পায়ে বেড়ি।আমির পদ্মজার পাশে বসে জানাল, ‘উনিই রুম্পা ভাবি।’পদ্মজা ধীর কণ্ঠে অনুরোধ করে, ‘উনাকে একটু ডাকবেন?’‘রেগে যায় যদি?’‘তবুও ডাকুন।’আমির লম্বা করে নিশ্বাস নিয়ে ডাকল, ‘ভাবি? ভাবি? শুনছেন ভাবি?’রুম্পা নড়েচড়ে চোখ খুলে। দেখতে পায়, দুই হাত দূরে একটা ছেলে ও মেয়ে বসে আছে। তাদের মুখ স্পষ্ট নয়। আলো তখনো ভালো করে ঘরে ঢোকেনি। রুম্পা শান্ত চোখে চেয়ে রইল অনেকক্ষণ। পদ্মজা হাত বাড়িয়ে বলল, ‘আমার হাতে ধরে বেরিয়ে আসুন।’রুম্পা বাঁধা দুই হাতে পদ্মজার হাত ধরার চেষ্টা করে, পারল না। পদ্মজা নত হয়ে রুম্পার দুই হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে এলো। রুম্পা কাছে পৌঁছাতেই দুর্গন্ধে বমি চলে আসে পদ্মজার। গলা অবধি এসে বমি আটকে গেছে। না জানি রূম্পা ভাবি কতদিন গোসল করেনি, দাঁত মাজেনি। এই বাড়ির কেউ কী একটু পরিষ্কার করে রাখতে পারে না? প্রস্রাবের গন্ধও পাওয়া যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ঘরেই পায়খানা-প্রস্রাব করে, নয়তো এত বিশ্রী গন্ধ হতো না।রুম্পা মলিন মুখে চেয়ে আছে পদ্মজার দিকে। শান্ত, স্থির দৃষ্টি। আমি গর্ব করে রুম্পাকে বলল, ‘আমার বউ। বলছিলাম না, সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটা আমার বউ হবে। দেখিয়ে দিলাম তো?’রুম্পা হাসল। আশ্চর্য মায়া সেই হাসিতে! পদ্মজা মুগ্ধ হয়ে দেখল। ময়লাটে মলিন মুখের হাসি বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর হাসি। অনেকদিন গোসল না করার কারণে চেহারা-হাত-পা ময়লাটে হয়ে গেছে। নখগুলোও বড়ো বড়ো। নখের ভেতর ময়লার স্তূপ। ঠোঁট ফেটে চৌচির। টলমল করা চোখ। দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুনি চোখ দিয়ে বর্ষণ বইবে।রুম্পা পদ্মজাকে শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘এ তো ম্যালা সুন্দর ছেড়ি। তোমার নাম কী গো?’পদ্মজা এক পলক আমিরকে দেখে জবাব দিল, ‘উম্মে পদ্মজা।’‘ছুডু ভাই, এত সুন্দর ছেড়ি কই পাইলেন? এ…এ যে চান্দের লাকান মুখ।’রুম্পার আরো কাছে গিয়ে বসে পদ্মজা। দুর্গন্ধটা আর নাকে লাগছে না। মানুষটাকে তার বেশ লাগছে। রুম্পার কুচকুচে কালো, লম্বা চুল। মাটিতে পাঁচ-ছয় ইঞ্চি চুল লুটিয়ে আছে। অনেকদিন না ধোয়ার কারণে জট লেগে আছে, কিন্তু সৌন্দর্যের অস্তিত্ব এখনো বোঝা যায়। সুস্থ অবস্থায় নিশ্চয় অনেক বেশি সুন্দর চুলের অধিকারিণী ছিল।পদ্মজা শুধাল, ‘আমি আপনাকে তুমি করে বলি?’রুম্পা দাঁত বের করে হেসে মাথা নাড়াল।পদ্মজা হেসে বলল, ‘কিছু বলবেন?’রুম্পা হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে থাকে পদ্মজার দিকে। কোনো জবাব দেয় না। সেকেন্ড কয়েক পর রুম্পার চোখের দৃষ্টি এদিক-ওদিক ছুটতে থাকে। হাসি মিলিয়ে মুখে নেমে আসে আঁধার। হঠাৎই যেন চাঁদের মতো ঝকঝক করা মুখ কলঙ্কে লেপটে দিয়েছে কেউ। পদ্মজা অবাক হয়ে রুম্পার পরিবর্তন দেখতে লাগল।আকস্মিক তাকে আক্রমণ করে বসল রুম্পা, খামচে ধরল পা। আমির লাফিয়ে উঠে রুম্পার হাত থেকে পদ্মজাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। রুম্পা পা ছেড়ে এবার কামড়ে ধরল পদ্মজার শাড়ি। মুখ দিয়ে ক্ষোভে-আক্রোশে ভাষাহীন শব্দ করতে থাকল।আমির ধমকে ওঠে, ‘ভাবি ছাড়ো বলছি। পদ্মজা তোমার ক্ষতি করতে আসেনি। ভাবি ছাড়ো।’পদ্মজা স্তব্ধ হয়ে দেখছে রূম্পাকে। তার চোখেমুখে কোনো ভয়ভীতি নেই। কিছু যেন খুঁজছে রুম্পার মধ্যে। খুঁজে কূলকিনারা পাচ্ছে না। রুম্পা শাড়ি ছেড়ে দিতেই পদ্মজা একটু পিছিয়ে গেল, দরজার ওপর পড়ল চোখ। দেখতে পেল: কেউ সরে গেল যেন। অদ্ভুত কারণে পদ্মজার বুক কাঁপতে থাকে। নুরজাহান নিজ ঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন। আমির- পদ্মজাকে দেখে তার চক্ষু চড়কগাছ! তিনি বাজখাঁই কণ্ঠে বললেন, ‘তালা খুলছে কেডায়? বাবু, নতুন বউরে নিয়া এইহানে আইছোস কেন?’আমির দ্রুত রুম্পার কাছ থেকে সরে আসে। নুরজাহানকে কৈফিয়ত দেয়, ‘ভাবলাম, বাড়ির সবাইকে পদ্মজা দেখেছে। রুম্পা ভাবিকেও দেখুক। ভাবতে পারিনি ভাবি এমন কাজ করবে। ভাবি তো এখন আরো বেশি বিগড়ে গেছে, দাদু।’‘তুই আমারে কইয়া আইবি না? তোর চিল্লানি হুইননা আমার কইলজাডা উইড়া গেছিল। বউ, তোমারে দুঃখ দিছে এই ছেড়ি?’পদ্মজা দ্রুত বলল, ‘না, না। কিছু করেনি।’আমির চেঁচিয়ে উঠল, ‘কী বলছ? কিছু করেনি মানে? হাত দেখি?’আমির পদ্মজার দুই হাত টেনে নিয়ে দেখে, বাঁ-হাতে নখের জখম।আমির ব্যথিত স্বরে বলল, ‘ইস! কতটা আঘাত পেয়েছ। ঘরে চলো। দাদু এই নাও চাবি। তালা মেরে দিয়ো।’আমির পদ্মজাকে টেনে নিয়ে বেরিয়ে যায়। বেরোবার আগ মুহূর্তে পদ্মজা রুম্পার দিকে তাকাল। দেখতে পেল, রুম্পা আড়চোখে তাকে দেখছে। সে চোখে স্নেহ, মমতা! একটু হাসিও লেগে ছিল। পদ্মজার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল।কী হচ্ছে এসব!ঘরে এসে আমিরকে বলল, ‘উনার যত্ন কেউ নেয় না কেন?’‘দেখোনি কী রকম করল? এই ভয়েই কেউ যায় না। শুরুতে তোমাকে দেখে যদি রেগে যেত তখনই তোমাকে নিয়ে চলে আসতাম। সবাইকে ভাবি তুই করে বলে। তোমাকে তুমি বলে সম্বোধন করতে দেখে ভেবেছি, বোধহয় তোমাকে পছন্দ হয়েছে। তাই আঘাত করবে না। কিন্তু সেই ধারণা ভুল হলো।‘আপনি অকারণে চাপ নিচ্ছেন। নখের দাগ বসেছে শুধু।’‘রক্ত চলে এসেছে।’‘এইটুকু ব্যাপার না।’আমির তুলা দিয়ে পদ্মজার হাতের রক্ত মুছে দিয়ে বলল, ‘আর ওইদিকে পা দিবে না।’‘আম্মার কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে।’‘লাবণ্যকে ঘুম থেকে তুলছে। ও ফজরে উঠতেই চায় না।’ আমির হেসে ফেলল।‘আমি যাই।’‘কোথায়?’‘আম্মা সকাল সকাল রান্নাঘরে যেতে বলেছিলেন।’‘তুমি রান্না করবে কেন?‘অনুরোধ করছি এমন করবেন না। আমি আমার বাড়িতেও রান্না করেছি। টুকটাক কাজ করেছি। এখন না গেলে আম্মা রেগে যাবেন। রাগানো ঠিক হবে না।’‘এসব ভালো লাগে না, পদ্মজা।’‘আমি আসছি।’আমিরকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে পদ্মজা ব্যস্ত পায়ে বেরিয়ে যায়। আমির শুধু চেয়ে থেকে দেখল।
বাইরে বিকেলের সোনালি রোদ, মন মাতানো বাতাস। লম্বা বারান্দা পেরিয়ে নুরজাহানের ঘরের দিকে যাচ্ছে পদ্মজা। বাতাসের দমকায় সামনের কিছু চুল অবাধ্য হয়ে উড়ছে। এতে সে খুব বিরক্ত বোধ করছে। তার এক হাতে দই অন্য হাতে পিঠা। চুল সরাতেও পারছে না। তখন কোথেকে উড়ে এলো আমির। এক আঙুলে উড়ন্ত চুলগুলো পদ্মজার কানে গুঁজে দিয়ে আবার উড়ে চলে গেল। চমৎকার করে হাসল পদ্মজা। আমিরের চলে যাওয়া দেখে মনে মনে বলল, ‘কী চমৎকার মানুষ আপনি!’নুরজাহানের ঘরের সামনে এসে দেখে, দরজা ভেজানো। পদ্মজা অনুমতি না নিয়ে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকেই এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখে তার চোখের আকৃতি গোল গোল হয়ে যায়। পালঙ্কে ভুরি ভুরি সোনার অলংকার জ্বলজ্বল করছে। চোখ ধাঁধানো দৃশ্য! পদ্মজাকে দেখে নুরজাহান অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। তা পদ্মজার দৃষ্টিগোচর হলো। নুরজাহান ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠেন, ‘তুমি এইনে কেরে আইছো? আমি কইছি আইতে?’নুরজাহানের ধমকে থতমত খেয়ে গেল পদ্মজা। বিচলিত ভঙ্গিতে দইয়ের মগ, পিঠার থালা টেবিলের উপর রেখে বলল, ‘আম্মা বললেন দই, পিঠা দিয়ে যেতে।’‘তোমার হউরি কইলেই হইব? আমি কইছি? আমারে না কইয়া আমার ঘরে আওন মানা হেইডা তোমার হউরি জানে না?’‘মাফ করবেন।’ মাথা নত করে বলল পদ্মজা।‘যাও, বাড়াইয়া যাও।’পদ্মজা চঞ্চল পায়ে বেরিয়ে গেল। দরজার বাইরে এসে থমকে দাঁড়াল। সে ভাবছে, ছোটো কারণে এত ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া কেন দেখালেন তিনি? মাথায় ঢুকছে না।পদ্মজা আনমনে হেঁটে নিজের ঘরে চলে আসে। এই বাড়িতে আসার পর থেকে কী কী হয়েছে সব ভাবছে। প্রথম রাতে কেউ একজন তার ঘরে এসেছিল, নোংরা স্পর্শ করেছে। সেটা যে আমির নয় সে শতভাগ নিশ্চিত 1 এরপর ভোরে রানিকে দেখল চোরের মতো বাড়ির পেছনের জঙ্গলে ঢুকতে। রুম্পা ভাবির সঙ্গে দেখা হলো, তিনি শুরুতে স্বাভাবিক ছিলেন। শেষে গিয়ে পাগলামি শুরু করলেন। দরজার ওপাশে কেউ ছিল। পদ্মজা ভ্রুকুটি করে মুখে ‘চ’ কারান্ত শব্দ করল। সব ঝাপসা লাগছে।ফরিনা বলেছিলেন দই-পিঠা দিয়েই রান্নাঘরে যেতে। পদ্মজা বেমালুম সে কথা ভুলে গিয়েছে। যখন মনে পড়ল কেটে গিয়েছে অনেকটা সময়। সে দ্রুত আঁচল টেনে মাথা ঘুরে ছুটে গেল রান্নাঘরের দিকে। এসে দেখে ফরিনা ও আমিনা মাছ কাটছেন। পদ্মজা পা টিপে টিপে রান্নাঘরে ঢুকে। ভয়ে বুক কাঁপছে। কখন না কঠিন কথা শোনানো শুরু করে দেন।‘অহন আওনের সময় হইছে তোমার? আছিলা কই?’ বললেন ফরিনা।‘ঘরে।’ নতজানু হয়ে বলল পদ্মজা।‘আমির তো বাইরে বাড়াইয়া গেছে অনেকক্ষণ হইল। তুমি ঘরে কী করতাছিলা? স্বামী বাড়িত থাকলে ঘরে থাহন লাগে। নাইলে বউদের খালি রান্ধাঘরে শোভা পায়। এই কথা কী তোমার মায় কয় নাই?’চুলার থেকে কিছুটা দূরত্বে কয়েকটা বেগুন পড়ে আছে। এখানে আসার পর থেকে সে দেখছে প্রতিদিন বেগুন ভাজা করা হয়। পদ্মজা দা নিয়ে বসে বেগুন হাতে নিতেই ফরিনা বললেন, ‘বেগুন লইছো কেরে?’‘আজ ভাজবেন না?’‘জাফর আর হের বউ তো গেলোই গা। এহন কার লাইগা করাম? আর কেউ বেগুন খায় না।’পদ্মজা বেগুন রেখে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল, ‘কী করব?’ফরিনা চোখ-মুখ কুঁচকে মাছ কাটছেন। যেন পদ্মজার উপস্থিতি তিনি নিতে পারছেন না। অনেকক্ষণ পর কাঠ কাঠ গলায় পদ্মজার প্রশ্নের জবাব দিলেন, ‘ঘরে গিয়া বইয়া থাহো।’পদ্মজার চোখ দুটি জলে ছলছল করে ওঠে। ঢোক গিলে বলল, ‘আর হবে না।’‘তোমারে কইছে না এইহান থাইকা যাইতে? যাও না কেরে? যতদিন আমরা আছি তোমরা বউরা রান্ধাঘরের দায়িত্ব লইতে আইবা না।’ আমিনার কণ্ঠে বিদ্রুপ।পদ্মজা আমিনার কথায় আহত হলো। সে কখন দায়িত্ব নিতে চেয়েছে? আমিনার কথা শুনে ফরিনা চোখ গরম করে বললেন, ‘আমার ছেড়ার বউরে আমি মারাম, কাটাম, বকাম। তোমরা কোনোদিন হের লগে উঁচু গলায় কথা কইবা না। বউ, তুমি ঘরে যাও।’পদ্মজার সামনে এভাবে অপমানিত হয়ে আমিনা পাথর হয়ে যান। তিনি সেই শুরু থেকে ফরিনাকে ভয় পান। তাই আর টু শব্দ করলেন না। পদ্মজা ফরিনার দিকে অনুসন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে তাকাল। মনে হচ্ছে এই মানুষটারও দুই রূপ আছে। এই বাড়ির প্রায় সবাইকে তার মুখোশধারী মনে হচ্ছে। কেউ ভালো, কিন্তু খারাপের অভিনয় করে। আর কেউ আসলে শয়তান, কিন্তু ভালোর অভিনয় করে। কিন্তু কেন? কীসের এত ছলনা!কে ভালো? আর কে শয়তান?‘খাড়াইয়া আছো কেন? যাও, ঘরে যাও।’‘গিয়ে কী করব আম্মা? কোনো সাহায্য লাগলে বলুন না।’ পদ্মজা কাজে সাহায্য করার জন্য রীতিমতো অনুরোধ করছে। কিন্তু ফরিনার এক কথা, ‘তোমারে যাইতে কইছি। যাও তুমি, ঘরে যাও।’পদ্মজা আর কথা বাড়াল না, ধীর পায়ে জায়গা ত্যাগ করল। এদিক- ওদিক হেঁটে ভাবতে লাগল—কার ঘরে যাবে। লাবণ্যের কথা মনে হতেই এগিয়ে গেল সেদিকে, বিকেলে টিভি দেখে মেয়েটা; নিশ্চয়ই এখনও দেখছে। লাবণ্যের ঘরে ঢুকতেই লিখন শাহর কন্ঠ শ্রবণপথে প্রবেশ করে। পদ্মজা টিভির দিকে তাকাল। লিখন শাহ অভিনীত ছায়াছবি চলছে। পদ্মজা চলে যেতে ঘুরে দাঁড়াল। লাবণ্য ডাকল, ‘ওই ছেমড়ি যাস কই? এইদিকে আয়।’পদ্মজা লাবণ্যর পাশের পালঙ্কে বসল। লাবণ্য দুই হাতে পদ্মজার গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘সারাদিন দাভাইয়ের সঙ্গে থাকস কেন? আমার ঘরে একবার উঁকি দিতে পারস না?’‘তোর দাভাই আমাকে না ছাড়লে আমি কী করব?‘ঘুসি মেরে সরাইয়া দিবি।’‘হ্যাঁ, এরপর আমাকে তুলে আছাড় মারবে।’‘দাভাইকে ডরাস?’‘একটুও না।’‘সত্যি?’‘মিথ্যে বলব কেন?’‘একদিন রাগ দেখলে এরপর ঠিকই ডরাইবি।’‘আমি রাগতেই দেব না।’লাবণ্য হাসল। টিভির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘লিখন শাহর মতো মানুষরে ফিরাইয়া দেওনের সাহস খালি তোরই আছে। আমার জীবনেও হইত না।’পদ্মজা কিছু বলল না। লাবণ্যই বলে যাচ্ছে, ‘এই ছবিটা আমি এহন নিয়া ছয়বার দেখছি। লিখন শাহ তার নায়িকারে অনেক পছন্দ করে। কিন্তু নায়িকা পছন্দ করে অন্য জনরে, তারে বিয়া করে। বিয়ার অনেক বছর পর লিখন শাহর প্রেমে পড়ে নায়িকা। ততদিনে দেরি হয়ে যায়। লিখন শাহ মরে যায়। এই হইলো কাহিনি। আইচ্ছা পদ্মজা, যদি এমন তোর সঙ্গেও হয়?’পদ্মজা আঁতকে উঠে বলল, ‘যাহ কী বলছিস! বিয়ের আগে ভাবতাম যার সঙ্গে বিয়ে হবে তাকেই ভালোবাসব। কিন্তু এখন আমার তোর ভাইকেই দরকার।’‘ও বাবা! লাইলি আসছে। যাহ, আমি মজা করছি। আমি কেন চাইব আমার ভাইয়ের বউ অন্যজনরে পছন্দ করুক। লিখন শাহ আমার। শয়নে স্বপনে তার লগে আমি সংসার পাতি।’পদ্মজা হাসল। লাবণ্যর পিঠ চাপড়ে বলল, ‘আব্বাকে বল, লিখন শাহকে ধরে এনে তোর গলায় ঝুলিয়ে দিবে।’‘বিয়া এমনেও দিয়া দিব। কয়দিন পর মেট্রিকের ফল। আমি যে ফেল করাম এই খবর আমি তো জানি, পুরা গেরামও জানে।’‘কিছু হবে না। পাশ করবি। রানি আপা কোথায়?’‘কী জানি কই বইয়া রইছে। চুপ থাক এহন। টিভি দেখ। দেখ, কেমনে কানতাছে লিখন শাহ। এই জায়গাটা আমি যতবার দেহি আমার কাঁনতে মনে চায়,’ বলতে বলতে লাবণ্য কাঁদতে শুরু করল। ওড়নার আঁচল দিয়ে তার চোখের জল মুছে দিয়ে টিভির দিকে তাকাল পদ্মজা। দৃশ্যে চলছে, লিখন শাহ ঠোঁট কামড়ে কাঁদছে। তার ঘোলা সুন্দর চোখ দুটি আরো ঘোলা হয়ে উঠেছে, ভাংচুর করছে ঘরের জিনিসপত্র। তার মা-বোন-ছোটো ভাই ভয়ে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে। এক টুকরো কাচ ঢুকে পড়ল লিখন শাহর পায়ে, আর্তনাদ করে ফ্লোরে বসে পড়ল সে। তার মা দৌড়ে এসে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে পাগলামি থামাতে বলল। লিখন শাহ আর্তনাদ করে বলছে, ‘তুলির বিয়ে হয়ে যাচ্ছে আম্মা। আমি কী নিয়ে বাঁচব? কেন তুলি আমাকে ভালোবাসল না? আমি তো সত্যি ভালোবেসে ছিলাম।’পদ্মজা বাকিটা শুনল না। মনোযোগ সরিয়ে নিলো। তার কানে বাজছে, ‘পদ্মজার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে আম্মা। আমি কী নিয়ে বাঁচব? কেন পদ্মজা আমাকে ভালোবাসল না? আমি তো সত্যি ভালোবেসেছিলাম।’চোখের কোনায় অশ্রু জমল পদ্মজার। সে অশ্রু আড়াল করে লাবণ্যকে বলল, ‘তুই দেখ। আমি যাই।’লাবণ্যের কানে পদ্মজার কথা ঢুকল না। সে টিভি দেখছে আর ঠোঁট ভেঙে কাঁদছে। পদ্মজা আর কিছু না বলে উঠে যায়। দরজার সামনে আমিরকে দেখতে পেয়ে ধক করে উঠল তার বুক। পরে মনে হলো, সে তো কোনো অপরাধ করেনি। তাহলে এত চমকানোর কী আছে? আমির কাগজে মোড়ানো কিছু একটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ঘরে, রান্নাঘরে কোথাও পেলাম না। মনে হলো লাবণ্যর ঘরেই আছো। টিভি দেখছিলে নাকি?
বাসন্তী ঠোঁটে লাল রঙের লিপস্টিক মাখছেন। প্রেমা-প্রান্ত বেশ আগ্রহ নিয়ে দেখছে। তারা দুজন বাসন্তীকে মেনে নিয়েছে। বাসন্তীর কথাবার্তা আর চালচলন আলাদা, যা ছোটো দুটি মনকে আনন্দ দেয়। তারা আগ্রহভরে বাসন্তীর কথা শোনে। লিপস্টিক লাগানো শেষ হলে বাসন্তী প্রেমাকে বললেন, ‘তুমি লাগাইবা? ‘বাসন্তীর আরো কাছে ঘেঁষে বসল প্রেমা। বাসন্তী প্রেমার ঠোঁটে টকটকে লাল লিপস্টিক গাঢ় করে ঘষে দিয়ে প্রান্তকে বললেন, ‘তুমিও লাগাইবা আব্বা?’‘জি,’ বলল প্রান্ত। প্রেমাকে লিপস্টিকে সুন্দর লাগছে। তাই তারও ইচ্ছে করছে ঠোঁটে লিপস্টিক দিতে।বাসন্তী প্রান্তর ঠোঁটে লিপস্টিক দেওয়ার জন্য উঁবু হোন। পূৰ্ণা বেশ অনেকক্ষণ ধরে এসব দেখছে। এই মহিলাকে সে একটুও সহ্য করতে পারে না। মহিলার উপস্থিতি অসহনীয় যন্ত্রণা দেয়। এক তো সৎ মা, বাপের আরেক বউ। তার ওপর এই বয়সেও এত সাজগোজ করে! প্রান্তকে লিপস্টিক দিচ্ছে দেখে তার গা পিত্তি জ্বলে উঠল। ঘর থেকে দপদপ করে পা ফেলে ছুটে আসে। প্রান্তকে টেনেহিঁচড়ে দাঁড় করিয়ে বলল, ‘তোর হিজরা সাজার ইচ্ছে হচ্ছে কেন? কতবার বলেছি এই বজ্জাত মহিলার কাছে না ঘেঁষতে?পূর্ণাকে বাসন্তী ভয় পান। মেয়েটা খিটখিটে, বদমেজাজি। হেমলতা বলেছেন, সেদিনের দুর্ঘটনার পর থেকে পূর্ণা এমন হয়ে গেছে। হুটহাট রেগে যায়, কথা শোনে না। পদ্মজা যাওয়ার পর থেকে আরো বিগড়ে গেছে। এজন্য তিনি যথাসম্ভব পূর্ণাকে এড়িয়ে চলেন। তবুও এসে আক্রমণ করে বসে। গত দুই সপ্তাহে মেয়েটা তার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। তিনি কাটা কাটা গলায় পূর্ণাকে বললেন, ‘এই ছিক্ষা পাইছ তুমি? গুরুজনদের সঙ্গে এমনে কথা কও!‘আপনি চুপ থাকেন। খারাপ মহিলা। বুড়া হয়ে গেছে এখনও রং-ঢং করে।’ চোখ-মুখ বিকৃত করে বলে পূর্ণা।কথা মাটিতে পড়ার আগে তীব্র থাপ্পড়ে মাটিতে উলটে পড়ল সে। চোখের দৃষ্টি গরম করে ফিরে তাকাল, কে মেরেছে দেখার জন্য! দেখল হেমলতাকে! হেমলতা অগ্নি চোখে তাকিয়ে আছেন, চোখের দৃষ্টি দিয়েই পূর্ণাকে পুড়িয়ে ফেলবেন। পূর্ণার চোখ শিথিল হয়ে আসে। সে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। হেমলতা বললেন, ‘নিজেকে সংশোধন কর। এখনও সময় আছে।’পূর্ণা নতজানু অবস্থায় বলল, ‘আমি এই মহিলাকে সহ্য করতে পারি না আম্মা।’‘করতে হবে। উনার এই বাড়িতে অধিকার আছে।’‘আমি খুন করব এই মহিলাকে।’ রাগে তার শরীর কাঁপছে।পূর্ণার অবস্থা দেখে হেমলতা অসহায়বোধ করছেন। পূর্ণা কেন এমন হলো? তিনি কি এক মেয়ের শূন্যতার শোক কাটাতে গিয়ে আরেক মেয়েকে সময় দিচ্ছেন না? বুঝিয়ে-শুনিয়ে পূর্ণাকে আবার আগের মতো করতে হবে। তিনি কণ্ঠ নরম করে কথা বলার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এরপর পূর্ণা যা বলল তাতে তিনি আর রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না। পূর্ণা বাসন্তীকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘বেশ্যার মেয়ে বেশ্যাই হয়। আর বেশ্যার সঙ্গে এক বাড়িতে থাকতে ঘেন্না লাগে আমার।’এই কথা শুনে রাগে-দুঃখে হেমলতা শরীর কাঁপতে শুরু করে। তিনি ছুটে যান বাঁশ বাগানের দিকে। বাঁশের কঞ্চি নিয়ে ফিরে আসেন। রাগান্বিত হেমলতাকে কঞ্চি হাতে দেখে বাসন্তী দ্রুত পূর্ণাকে আগলে দাঁড়ান। হেমলতাকে অনুরোধ করে বললেন, ‘এত বড়ো ছেড়িডারে মাইরো না। ছোটো মানুছ, বুঝে না।’‘আপা আপনি সরেন। ও খুব বেড়ে গেছে।’বাসন্তীর স্পর্শ পূর্ণার ভালো লাগছে না। সে ঠেলে তাকে সরিয়ে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে হেমলতা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে পূর্ণার পিঠে বাড়ি দিলেন। পূৰ্ণা আর্তনাদ করে শুয়ে পড়ল। হেমলতা আবার মারার জন্য উদ্যত হতেই বাসন্তী পূর্ণাকে আগলে দাঁড়িয়ে অনুরোধ করে বললেন, ‘যুবতি ছেড়িদের এমনে মারতে নাই। আর মাইরো না। আজকে ছাইড়া দাও।’প্রেমা-প্রান্ত ভয়ে গুটিয়ে গেছে। হেমলতার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। তিনি বাঁশের কঞ্চি ফেলে লাহাড়ি ঘরে চলে গেলেন। বারান্দায় বসে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মনে মনে মোর্শেদের ওপর ক্ষেপে গেলেন। মোর্শেদ চিৎকার করে বাসন্তীর সম্পর্কে সব বলেছে বলেই তো পূর্ণা জেনেছে। তাই এখন পূর্ণা কারো অতীত নিয়ে আঘাত করার সুযোগ পাচ্ছে। মোড়ল বাড়ির ছোটো সংসারটা কেমন ওলটপালট হয়ে গেছে!হেমলতা আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁ করে নিশ্বাস নেন। সব কষ্ট, যন্ত্রণা যদি উড়ে যেত! সব যদি আগের মতো হতো। সব কঠিন মানুষেরাই কী জীবনের এক অংশে এসে এমন দুর্বল হয়ে পড়ে? কোনো দিশা খুঁজে পায় না?.আমির বিছানায় বসে উপন্যাস পড়ছে। ছয়দিন পর পদ্মজার মেট্রিকের ফলাফল। এরপরই ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবে। যদিও ফরিনা বেগম এই সিদ্ধান্তে রাজি নন। কিন্তু আমির মনে মনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, সে পদ্মজাকে রাজধানীতে নিয়েই যাবে। পদ্মজার কথা মনে হতেই আমির বই রেখে গোসলখানার দরজার দিকে তাকাল। তার ঘরের সঙ্গে আগে গোসলখানা ছিল না। পদ্মজার জন্য করা হয়েছে। সে বই রেখে সেদিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল, তখনি পদ্মজা চিৎকার করে উঠল। আমির দৌড়ে ভেতরে ঢুকল দরজা ঠেলে। পদ্মজা শাড়ি দিয়ে শরীর ঢেকে রেখেছে, কাঁপছে কিছুটা। আমির দ্রুত কাছে এসে বলল, ‘কী হয়েছে?’‘ওখানে, ওখানে কে যেন ছিল। আ…আমাকে দেখছিল।’পদ্মজার ইঙ্গিত অনুসরণ করে আমির সেদিকে তাকাল। গোসলখানার ডান দেয়ালের একটা ইট সরানো। সকালে তো সরানো ছিল না! পদ্মজা কাঁদতে থাকল। কাপড় পালটাতে গিয়ে হঠাৎ চোখ পড়ে দেয়ালে। আর তখনই দুটি চোখ দেখতে পায়। সে তাকাতেই সরে গেল চোখ দুটি! পদ্মজার পিলে চমকে ওঠে। আমির পদ্মজার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘শুকনো কাপড় পরে আসো। কেঁদো না।’কথা শেষ করেই সে বেরিয়ে যায়। যাওয়ার তাড়া দেখে মনে হলো, অজ্ঞাত আগন্তুক হয়তো আমিরের পরিচিত! সে অবগত মানুষটি সম্পর্কে! পদ্মজা দ্রুত কাপড় পরে আমিরকে খুঁজতে থাকল।আমির সোজা রিদওয়ানের ঘরের দিকে যায়। রিদওয়ান পানি পান করছিল। আমির গিয়ে রিদওয়ানের বুকের শার্ট খামচে ধরে চিৎকার করে বলল, ‘তোকে সাবধান করেছিলাম। দ্বিতীয় সুযোগ দিয়েছিলাম।’‘শার্ট ছাড়।’‘ছাড়ব না। কী করবি? তুই আমার বউয়ের দিকে কু-নজর দিবি আর আমি ছেড়ে দেব?’‘প্রমাণ আছে তোর কাছে?’‘কুত্তার বাচ্চা প্রমাণ লাগবে? আমি জানি না?’‘আমির মুখ সামলা। গালাগালি করবি না। ‘‘করব। কী করবি তুই?’‘আবার বলছি, শার্ট ছাড়।’রিদওয়ানের নাকে-মুখে ঘুসি মেরে বসল আমির। টাল সামলাতে না পেরে পালঙ্কের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল রিদওয়ান। দুজনের চিৎকার, চেঁচামিচি শুনে বাড়ির সবাই ছুটে এলো রিদওয়ানের ঘরে।
পদ্মজা ঘরের চৌকাঠে পা দিয়েছে মাত্র। আমির রিদওয়ানকে টেনে হিঁচড়ে তুলে বলল, ‘তোকে না করেছিলাম। বার বার না করেছি। তবুও শুনলি না।’রিদওয়ান দুই হাতে আমিরকে ধাক্কা মেরে দূরে ছুঁড়ে ফেলে। আমির আলমারির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আরো হিংস্র হয়ে রিদওয়ানের দিকে তেড়ে আসে। নুরজাহান দৌড়ে এসে পথ রোধ করে দাঁড়ান। চিৎকার করে বললেন, ‘কী অইছে তোদের? তোরা এমন করতাছস কেন?’‘দাদু, সরে যাও। মাদা** বাচ্চারে আমি মেরে ফেলব।’‘তুই কি ভালা মানুষের বাচ্চা?’ তেজ নিয়ে বলল রিদওয়ান।আমির নুরজাহানকে ডিঙিয়ে রিদওয়ানকে আঘাত করতে প্রস্তুত হয়।তখন মজিদ হাওলাদারের কর্কশ কণ্ঠ ভেসে আসে, ‘যে যেখানে আছো, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকো।’আমির মজিদ হাওলাদারকে এক নজর দেখে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করল। পরেই জ্বলে উঠে বলল, ‘আব্বা আপনি জানেন না ও কী করছে? পদ্মজা গোসল করছিল আর ও লুকিয়ে লুকিয়ে সেটা দেখছিল।’ আমিরের কণ্ঠ থেকে যেন আগুন ঝরছে।ফরিনা, আমিনা, রানিসহ হাওলাদার বাড়িতে কাজ করা দুজন মহিলা ছি ছি করে উঠল। রিদওয়ান সাবধানে প্রশ্ন করল, ‘তোর কাছে কী প্রমাণ আছে?’‘প্রমাণ লাগবে? আমি জানি এটা তুই ছিলি। বিয়ের রাতেও তুই পদ্মজার কাছে গেছিলি।’‘অপবাদ দিবি না।’‘তুই ভালো করেই জানিস আমি অপবাদ দিচ্ছি না।’‘তুমি কী করে নিশ্চিত যে, ছেলেটা রিদওয়ানই ছিল? পদ্মজা দেখেছে? নাকি তুমি?’ বললেন মজিদ।‘কেউ দেখেনি। কিন্তু আমি নিশ্চিত ওই চরিত্রহীনটা রিদু। কারণ, আমার আগে থেকে ও পদ্মজাকে পছন্দ করত।পদ্মজা বিস্ময়ে তাকাল। কী হচ্ছে, কী সব শুনছে? ফরিনার দুই ঠোঁট হাঁ হয়ে গেল। মুখে হাত দিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। আমিনা বললেন, ‘আপা, আমি আগেই কইছিলাম এই ছেড়ি বিনাশিনী। এই ছেড়ির রূপ আগুনের লাকান। এই ছেড়ির জন্য এখন বাড়ির ছেড়াদের ভেজাল হইতাছে।’আমির আমিনার কথা শুনেও না শোনার ভান করল। মজিদকে বলল, ‘আব্বা, আপনি এর বিচার করবেন? না আমি ওরে মেরে ফেলব? আর আম্মা, এরপরও বলবা পদ্মজাকে এই বাড়িতে রেখে যেতে? আমাকে তো ফিরতেই হবে ঢাকা। মনে রেখো, পদ্মজাকে রেখে আমি কিছুতেই যাব না। আব্বা, তুমিও কথাটা মনে রেখো, আমি তোমার ব্যবসায় আর নেই…যদি পদ্মজা আমার সঙ্গে ঢাকা না যায়।’‘তুমি যেখাবে যাবা তোমার বউ তো সেখানেই যাবে। বউ রেখে যাবা কেন? আর রিদওয়ান তুমি আমার সঙ্গে আসো। তোমার সঙ্গে আমার বোঝাপড়া আছে।’মজিদ হাওলাদার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান। আমির পদ্মজার হাতে ধরে বলল, ‘কসম, আর কখনো তোমাকে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে দেব না।’খুশিতে পদ্মজার চোখের তারায় অশ্রু জ্বলজ্বল করে উঠে। সে আমিরের এক হাত শক্ত করে ধরে বোঝায়, ‘আমি আপনাকে ভালোবাসি। বিশ্বাস করি।’.সন্ধ্যার ঠিক আগমুহূর্ত। এমন সময় হাওলাদার বাড়ির রাতের রান্না করা হয়। মগা এক ব্যাগ মাছ দিয়ে গেছে। লতিফা মাছ কাটছে। লতিফা এই বাড়ির কাজের মেয়ে। সবাই ছোটো করে লুতু ডাকে। ফরিনা ভাত বসিয়েছেন। আর অনবরত বলে চলেছেন, ‘আমি এই বাড়ির বড়ো বান্দি। দাসী আমি। বাবুর বাপ দাসী পুষে রাখছে। দাসী পালে। সারাদিন কাম করি। অন্যরা হাওয়া লাগাইয়া ঘুরে। মরণ হয় না কেন আমার? মরণই আমার একমাত্র শান্তি।’পদ্মজা গুনগুন করে গান গাচ্ছে আর রান্নাঘরের আশপাশে ঘুরছে। ফরিনার সব কথাই তার কানে আসছে। তার গায়ে লাগছে না। বরং হাসি পাচ্ছে। সে বহুবার রান্নাঘরে গিয়েছে কাজ করার জন্য। ফরিনা তাড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, কাজ করতে হবে না। আর এখন বলছেন, কেউ সাহায্য করে না! পদ্মজা পা টিপে টিপে রান্না ঘরে ঢুকে বলল, ‘আম্মা, আমি সাহায্য করি?’‘এই ছেড়ি তুমি এত বেয়াদব কেরে? কতবার কইছি তোমার সাহায্য করতে হইব না।’‘না…মানে আপনি বলছিলেন, কেউ সাহায্য করে না।’‘তোমারে তো বলি নাই। তোমার গায়ে লাগে কেন?’‘মেঝে ঝাড়ু দিয়ে দেই?’‘তোমারে কইছি আমি? তুমি যাও এন থাইকা। যাও কইতাছি।’অগত্যা পদ্মজা বেরিয়ে যায়। বাসায় লাবণ্য নেই, আমির নেই। কার কাছে যাবে? রানি আছে! রানির কথা মনে হতেই পদ্মজা রানির ঘরের দিকে এগোল। যাওয়ার পথে কানে সন্ধ্যার আজান ভেসে আসে। তাই আর সেদিকে এগোল না, ফিরল নিজের ঘরে। নামাজ আদায় করতে হবে।প্রার্থনা সম্পন্ন করে সুরা ইয়াসিন পড়ল একবার। জানালা লাগাতে গিয়ে দেখতে পেল রানিকে, সেদিনের মতো জঙ্গলের ভেতর ঢুকছে। আর কিছুক্ষণ পরেই চারিদিক রাতের গাঢ় অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। এমন সময় রানি আপা কী করতে ওখানে যাচ্ছে? এত সাহসই কী করে হয়? পদ্মজা হুড়মুড়িয়ে ঘর থেকে বের হয়। আজ সে এর শেষ দেখে ছাড়বে। লাবণ্য সবে মাত্র সদর ঘরে ঢুকেছে।পদ্মজাকে তাড়াহুড়ো করে কোথাও যেতে দেখে বলল, ‘কী রে, কই যাস?’পদ্মজা চমকে উঠল। বলল, ‘এই তো…এইখানেই। কোথায় ছিলি? আচ্ছা, পরে কথা বলব। আসি এখন।’লাবণ্য ঠোঁট উলটে পদ্মজার যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে ধরে নেয়, পদ্মজা দুই তলা থেকে হয়তো দাভাইকে আসতে দেখেছে তাই এগিয়ে আনতে যাচ্ছে। সে নিজ ঘরের দিকে চলে গেল। পদ্মজা কখনো বাড়ির পেছনের দিকে যায়নি, এই প্রথম। বাড়ির ডান পাশে বিশাল পুকুর। কালো জল। কিন্তু বাড়ির সামনের পুকুরের জল স্বচ্ছ।দুই মিনিট লাগে শাক-সবজির খেত পার হতে। বাড়ির পেছনে এরকম শাক-সবজির বাগান আছে সে জানত না। এরপর পৌঁছাল জঙ্গলের সামনে। সেখান থেকে অন্দরমহলের দিকে তাকাল। ওই তো তাদের ঘরের জানালা দেখা যাচ্ছে। আরেকটা জানালাও দেখা যাচ্ছে। পদ্মজা কপাল কুঁচকে খেয়াল করল, সেই জানালার গ্রিল ধরে কেউ তাকিয়ে আছে। পদ্মজা ঠাওর করার চেষ্টা করল এটা কার ঘর। মনে হতে বেশি সময় লাগল না—রূম্পা ভাবির! তবে কী তিনিই তাকিয়ে আছেন? পদ্মজা আবার তাকাল। রূম্পা জানালার পর্দা সরিয়ে হাত নাড়াল, মৃদু হেসে পালটা হাত নাড়াল পদ্মজাও। দূর থেকে রুম্পার মুখটা দেখে মনে হচ্ছে, সে কিছু বলতে চায় পদ্মজাকে। তার ভেতর লুকানো আছে কোনো এক রহস্যময় গল্প।.‘ভাবি এইনে রাইতের বেলা কী করেন?’ভূমিকম্পে ভূমি যেভাবে কেঁপে উঠে, পদ্মজা ঠিক সেভাবেই কেঁপে উঠল। তাকিয়ে দেখল মদনকে। সে জঙ্গলের ভেতর থেকে এসেছে। পদ্মজা আমতা আমতা করে বলল, ‘হাঁ…হাঁটতে এসেছিলাম।’‘এই রাইতের বেলা?’‘বিকেল থেকেই। এখন ফিরে যাচ্ছিলাম।’‘চলেন এক সঙ্গে যাই। জায়গাডা ভালা না ভাবি। আপনি হইছেন সুন্দরমানুষ। জিন, ভূতের আছর পড়ব।’‘আপনি যান। আমি আসছি।’‘আর কী করবেন এইহানে?’পদ্মজা জঙ্গলের দিকে তাকাল। শিরশিরে অনুভূতি হলো একটা! সব জঙ্গল অযত্নে বেড়ে উঠলেও এই জঙ্গল যেন যত্নে বেড়ে ওঠা। সে অন্ধকারে খোঁজার চেষ্টা করল রানিকে। পেল না। এদিকে মদনের সঙ্গে না গেলে সে বাড়িতে যদি বলে দেয়! তাহলে অনেকের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। আর একটার পর একটা মিথ্যে বলতে হবে। পদ্মজা মনে মনে পরিকল্পনা করে, মদনের সঙ্গে বাড়ি অবধি গিয়ে আবার চলে আসবে।
মদন পদ্মজাকে রেখে কিছুতেই যাচ্ছে না। আবার পদ্মজাও অন্দরমহলের ভেতর ঢুকতে চাইছে না। সে বার বার বলছে, ‘আমি একটু হাঁটব এদিকে। আপনি যান।’‘রাইতের বেলা একলা থাকবেন! আমার কামই আপনারারে দেইখা রাখা।’‘এদিকে তো আলো জ্বলছে। উনিও এখন আসবেন। আপনি যান। আর আপনার পা তো কাদায় মাখা। বেশিক্ষণ এভাবে না থেকে ধুয়ে আসুন।’মদন পায়ের দিকে তাকাল। লুঙ্গি হাঁটু অবধি তুলে বেঁধে রাখা। সে হেসে বলল, ‘আইচ্ছা তাইলে আমি ধুইয়া আইতাছি। বেশিখন (বেশিক্ষণ) লাগব না।’‘আচ্ছা, আসুন।’মদন চলে যেতেই পদ্মজা ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলল। গলার মাঝে যেন এতক্ষণ কাঁটা বিঁধে ছিল। বাড়ির পেছনে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই দেখলে পেল আমিরকে। আমির আলগ ঘর পেরিয়ে এদিকেই আসছে। পদ্মজা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারল না, আলগ ঘরের দিকে চেয়ে রইল। পদ্মজাকে দেখতে পেয়ে লম্বা করে হাসল আমির। বলল, ‘পদ্মবতী কী আমার জন্য অপেক্ষা করছে?’‘বোধহয় করছি।’আমির ভ্রুকুটি করে বলল, ‘বোধহয় কেন?’‘ঘরে একা ভালো লাগছিল না। তাই হাঁটতে বের হয়েছিলাম। আপনিনামাজ পড়েছেন?’‘এই যে মাথায় টুপি। মসজিদ থেকে আসলাম।’পদ্মজা আড়চোখে অন্দরমহলের ডান দিকে তাকাল। ভাবছে, রানি আপা কোথায় গেল? উসখুস করতে থাকল সে।ঠিক তখনই পদ্মজাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল আমির। স্বামীর কাজে পদ্মজা হতভম্ব হয়ে দ্রুত এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল, কেউ আছে নাকি! এরপর আমিরের হাতের বাঁধন ছুটানোর চেষ্টা করতে করতে বলল, ‘ছাড়ুন, কেউ দেখবে।’‘কেউ দেখবে না। এদিকে কেউ নেই,’ আমিরের কণ্ঠ মোহময়। সে পদ্মজার ঘাড়ে থুতনি রাখল। ওর ঠোঁটের ছোঁয়া লাগাতেই পদ্মজার গা জুড়ে শুরু কাঁপুনি এলো। জোর করে আমিরের হাতের বাঁধন থেকে ছুটে গিয়ে বলল, ‘আপনি ঘরে যান।’আমির হতাশ ভঙ্গিতে বলল, ‘আচ্ছা চলো।’‘আপনি যান আমি আসছি।’‘কেন? তুমি কোথায় যাবে?’পদ্মজা নিচের ঠোঁট কামড়ে কিছু ভাবল। বলল, ‘আলগ ঘরে যাব। আপনি ঘরে যান। নয়তো আম্মা আমাকে খুঁজবে। আমি কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসব। এরপর সব বলব।’‘আরে, কী করবে বলবে তো।’‘আপনি যান না।’পদ্মজা ঠেলে আমিরকে অন্দরমহলের দিকে পাঠিয়ে দিল। আমির অসহায় মুখ করে জিজ্ঞাসা করল, ‘আমিও থাকি?’‘আপনি ঘরে গিয়ে বসেন, আমি যাব আর চলে আসব।’পদ্মজার অনুরোধ ফেলা যাচ্ছে না। আমির না চাইতেও অন্দরমহলে চলে গেল। সেই সুযোগে এক নিশ্বাসে দৌড়ে অন্দরমহলের ডান পাশে চলে এলো পদ্মজা। সঙ্গে সঙ্গে সামনে পড়ল রানি। দুজন দুজনকে হঠাৎ চোখের সামনে দেখে চমকে উঠল, অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। রানিই আগে কথা বলল, ‘রাইতের বেলা এমনে ছুটতাছো কেন?’পদ্মজার মাথা থেকে ঘোমটা পড়ে গেছে সেই কখন। দৌড়ে আসাতে চুলের খোঁপাও খুলে গেছে। গাছ-গাছালির বাতাসে তিরতির করে তার চুল উড়ছে। তবুও সে ঘামছে। আমতা আমতা করে বলল, ‘আ…আমি তো হাঁটতে বের হয়েছি। জোনাকি দেখলাম এদিকে। তাই নিতে এসেছি।’‘ওহ। কই জোনাকি। নাই তো।’‘একটু আগেই ছিল।’‘এহন তো নাই। রাইতের বেলা একলা থাকবা কেন? আসো ঘরে যাই।’‘তুমি কোথায় গিয়েছিলে আপা? সন্ধ্যার আগে তোমার ঘরে গেলাম কিন্তু পেলাম না। এদিক দিয়ে কোথাও ছিলে? কিন্তু এদিকে তো ঝোপঝাড়, জঙ্গল।’পদ্মজার প্রশ্নে রানির মুখ রক্তিম হয়ে উঠল, কেমন অস্বাভাবিক দেখাল তার চাহনি; হাসল অপ্রস্তুতভাবে। কী বলবে খুঁজছে যে তা স্পষ্ট। পদ্মজা অপেক্ষা করছে, রানি কী বলে শোনার জন্য।পদ্মজা ডাকল, ‘আপা?’‘আরে আমি ওষুধ খুঁজতে আসছিলাম।’‘কী ওষুধ?’‘তুমি চিনবা না। আসো বাড়িত যাই। মেলা রাইত হইয়া গেছে।’পদ্মজাকে পিছনে রেখেই রানি চলে যাচ্ছে। এটাকে পালিয়ে যাওয়া বলে। পদ্মজা আর থেকে কী করবে! সেও রানির পিছু পিছু অন্দরমহলে চলে আসে।ঘরে ঢুকতেই আমির হামলা করে, ‘কাহিনি কী বলো তো।’‘বিশ্বাস করবেন?’‘তোমার কথা বিশ্বাস করব না, এ হয়?’‘রানি আপা প্রায় জঙ্গলের ভেতর যায়। আমি জানালা থেকে দেখি। এমন ভাবে যায় যেন চুরি করতে যাচ্ছে।’আমির শুনে অবাক হলো। চাপা স্বরে প্রশ্ন করল, ‘সত্যি! প্রায়ই যায়?’‘আমি সত্যি বলছি।’আমির চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ে দুশ্চিন্তা, কপালের চামড়া পর্যন্ত কুঁচকে গেছে। গভীর ভাবনায় বিভোর সে। পদ্মজা বলল, ‘আমি আজ অনুসরণ করে জঙ্গল অবধি গিয়েছিলাম। মদন ভাইয়ার জন্য ভেতরে ঢুকতে পারিনি। এরপর আপনি এলেন। পরে আবার যেতে চেয়েছি। কিন্তু ততক্ষণে রানি আপা চলে এসেছে। সরাসরি প্রশ্নও করেছি, কেন জঙ্গলে গিয়েছিল। বলল, ওষুধ আনতে। মানে কোনো ঔষধি পাতা। কিন্তু আমার বিশ্বাস হয়নি। প্রায়ই কেন কেউ ঔষধি পাতা আনতে যাবে? তাও আবার ভোরে আর রাতে।’পদ্মজা এক দমে কথাগুলো বলল। আমির জবাবে বলল, ‘আব্বাকে বলতে হবে।’‘আগে আমার কথা শুনুন।’‘বলো?’‘এখন কাউকে বলবেন না।’‘বলা উচিত। ব্যাপারটা জটিল মনে হচ্ছে।’‘আমরা আগে বের করি, কী হয়েছে…আপা কী করতে যায়? এরপর নিজেরা সমাধান করতে পারলে করব। নয়তো বড়োদের বলব। যদিও আমরা নিশ্চিত না কোনো সমস্যা আছে।’‘অবশ্যই সমস্যা আছে। তুমি জানো, ওদিকে কোনো মহিলা ভয়ে ভুলেও যায় না। অথচ রানি যায়। বড়ো কোনো কারণ নিশ্চয়ই আছে।’‘সেটা আমরা দুজন মিলে বের করি?’‘কীভাবে?’‘আমার মনে হচ্ছে আবার যাবে, কাল-পরশুর মধ্যে। আমরা পিছুপিছু যাব।’‘খারাপ বলোনি।’‘কাউকে বলবেন না এখন, অনুরোধ।’আমির হাসল। পদ্মজার কোমর পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘বলব না।’‘আপনি কারণে-অকারণে ছোঁয়ার বাহানা খুঁজেন।’‘এতে পাপ তো নেই।’‘খাওয়ার সময় হয়েছে, চলুন। ঠিক সময়ে না গেলে আম্মা রেগে গিয়ে চেঁচামেচি করবেন।’‘আম্মারা চেঁচামেচি করেই। তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।’‘কী?’‘তোমাকে খয়েরি রঙে বেশি সুন্দর লাগে।’‘আমি তো খয়েরি শাড়ি পরিনি।’‘পুরো কথা বলতে দাও।’‘আচ্ছা, বলুন।’আমির পদ্মজার কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘আর কালো রঙে আবেদনময়ী লাগে।’পদ্মজার কানে-ঘাড়ে আমিরের নিশ্বাস ছিটকে পড়ে। সে ঘুরে আমিরের দিকে তাকাল। আবার চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল, ‘কিন্তু আপনি সবসময় আকর্ষণীয়।’আমির হইহই করে উঠল, ‘সত্যি? কত…কত দিন পর একটু প্রশংসা করলে। ইয়া আল্লাহ!’পদ্মজা মৃদু আওয়াজ করে হাসল। বলল, ‘প্রশংসা শুনতে খুব ভালোবাসেন?’‘অবশ্যই। তবে বউয়ের প্রশংসা করতে আরো বেশি ভালোবাসি।’ আমির আরো শক্ত করে পদ্মজার কোমর আঁকড়ে ধরল। আমিরের দুই হাতে ধরে পদ্মজা বলল, ‘আপনি সবসময় এত শক্ত করে ধরেন কেন? গায়ের জোর দেখান?’‘কেন? ভালো লাগে না?’‘মোটেও না। আদর করে ধরবেন। ‘আমির হাতের বাঁধন কোমল করে দিয়ে বলল, ‘লজ্জার ছিটেফোঁটাও গিলে ফেলেছ দেখছি।’‘বিয়ের এতদিন পরও কোন মানুষটা লজ্জা পায়, তা আমাকে দেখাবেন। আমি অত ভং ধরতে পারব না।’‘কী ঝাঁঝ কথায়!’‘এবার ছাড়ুন‘ইচ্ছে হচ্ছে না।’‘আবার শক্ত করে ধরেছেন।’‘যদি দৌড়ে পালাও?’‘পালিয়ে আর কোথায় যাব?’আমির পদ্মজাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে এক হাতে কোমর চেপে ধরে অন্য হাত গালে রাখল। তখনই হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল লতিফা। পদ্মজা, আমির দুজন দুদিকে ছিটকে গেল। আমির ধমকে উঠল, ‘লুতু কতবার বলেছি না বলে ঘরে ঢুকবি না। আমাদের তো নতুন বিয়ে হয়েছে, নাকি?’পদ্মজা খেয়াল করল আমির কথাগুলো রাগে বলার চেষ্টা করলেও, ঠিক রাগত শোনাল না। হাসি পেল তার। ওদিকে লতিফার মুখের অবস্থা দরজার চিপায় পড়ার মতো। সে আমিরকে ভীষণ ভয় পায়। কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘খালাম্মা খাইতে যাইতে কইছে।’
পদ্মজা ভক্তির সঙ্গে নুরজাহানের পা টিপে দিচ্ছে। তার মূল উদ্দেশ্য রুম্পার ঘরে যাওয়া। সকাল থেকে বারংবার রুম্পার ঘরে ঢোকার চেষ্টা করেছে, পারেনি। মদন কিছুতেই ঢুকতে দেয়নি। তার এক কথা, নুরজাহান না বললে ঢুকতে দিবে না। অগত্যা পদ্মজা নিরাশ হয়ে নুরজাহানের ঘরে এসে পা টেপা শুরু করেছে…যদি একটু পটানো যায়। ঘণ্টাখানেক ধরে সে নুরজাহানের পা টিপছে। হাত টনটন করছে ব্যথায়। নুরজাহান আয়েশ করে ঘুমাচ্ছেন। কখন যে ঘুম ভাঙবে! এভাবে কেটে যায় আরো অনেকটা সময়। নুরজাহান চোখ মেলে তাকান। ঘুমকাতুরে কণ্ঠে পদ্মজাকে বললেন, ‘এহনো আছো?’পদ্মজা মৃদু হাসল। নুরজাহান বললেন, ‘অনেকক্ষণ হইছে। যাও, এহন ঘরে যাও।’পদ্মজার চোখে মুখে আঁধার নেমে আসে। পরক্ষণেই মিষ্টি করে হেসে বলল, আপনার ভালো ঘুম হয়েছে?’‘সে হয়েছে।’‘দাদু একটা প্রশ্ন করি?‘করো।’‘রুম্পা ভাবিকে যেদিন দেখেছিলাম অনেক নোংরা দেখাচ্ছিল। উনাকে পরিষ্কার করে রাখার জন্য একটা মেয়ে দরকার। কিন্তু সবসময় মদন ভাইয়া পাহারা দেন।’‘ষাঁড়ের লাহান শক্তি ওই ছেড়ির। হের লগে ছেড়িরা পারব না। সবাই ডরায়।‘তাই বলে এভাবে অপরিষ্কার থাকবে সবসময়!’‘সবাই ডরায়। কেউ যাইব না সাফ কইরা দিতে। তুমি বেহুদা কথা বলতাছো।’নুরজাহানের কঠিন কণ্ঠের সামনে পদ্মজার আসল কথাটাই মুখে আসছে না। সে মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়ে বলল, ‘আমার মনে হয় আমি পারব। ভাবি আমাকে আঘাত করবে না। আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিতেন যদি।’‘পাগল হইছো ছেড়ি? কেমনে খামচাইয়া ধরছিল মনে নাই? আর কথা কইয়ো না। যাও এন থাইকা।’পদ্মজা আর কিছু বলার সাহস পেল না। সে ঘর ছেড়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। দুই তলার বারান্দা থেকে আলগ ঘরের সামনের খালি জায়গা দেখা যাচ্ছে। সেখানে গ্রামের মানুষের ভিড়। মজিদ হাওলাদার তার লোকজন নিয়ে গ্রামের মানুষদের সমস্যা শুনছেন। কাউকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করছেন, কাউকে বা ধান দিয়ে। এই ব্যাপারটা প্রায়ই ঘটে। পদ্মজার খুব ভালো লাগে। গর্ব হয়।.পূর্ণা ঘাটে বসে আছে। মাদিনী নদীর স্রোতে তার দৃষ্টি স্থির। প্রান্ত-প্রেমা স্কুলে গিয়েছে। সে যায়নি। ইদানীং সে স্কুলে যায় না একদমই। ভালো লাগে না। পদ্মজা যাওয়ার পর থেকে সব থমকে গেছে। পদ্মজার শূন্য জায়গাটা কিছুতেই পূর্ণা মানতে পারছে না। বাড়ির প্রতিটি কোণে সে পদ্মজার স্মৃতি খুঁজে পায়। এই তো এই ঘাটে বসে দুজন কত সময় পার করত, কত গল্প করত; আজ পদ্মজার জায়গা শূন্য। পূর্ণা অনুভব করে, সে তার মায়ের চেয়েও বেশি ভালোবাসে পদ্মজাকে। পদ্মজার প্রতিটি কথা কানে বাজে। এতদিন হয়ে গেল তবুও এই শোক, এই শূন্যতা কাটিয়ে উঠতে পারছে না সে। পূর্ণার চোখ দুটি ছলছল করে উঠে। সে নিচের ঠোঁট কামড়ে দুইবার ডাকল, ‘আপা…আপারে।’বাসন্তী দূর থেকে পূর্ণাকে দেখতে পেলেন। জুতা খুলে পা টিপে হেঁটে এসে পূর্ণার পাশে বসেন। পূর্ণা এক ঝলক বাসন্তীকে দেখে দ্রুত চোখের জল মুছল। এরপর বলল, ‘আপনি এখানে এসেছেন কেন?’প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে পূর্ণা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে বাসন্তীর দিকে তাকাল। দেখতে পায়, বাসন্তীকে আজ অন্যরকম লাগছে। আরেকটু খেয়াল করে বুঝতে পারল অন্যরকম কেন লাগছে। আজ বাসন্তীর ঠোঁটে লিপস্টিক নেই, কপালে টিপ নেই, চোখে গাঢ় কাজল নেই। থুতনির নিচে সবসময় কালো তিনটা ফোঁটা দিতেন সেটাও নেই। পূর্ণা বাসন্তীর হাতের দিকে তাকাল। হাতেও দুই-তিন ডজন চুড়ি নেই। দুই হাতে শুধু দুটো সোনার চিকন চুড়ি।পূর্বের প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষা না করে পূর্ণা পালটা প্রশ্ন করল, ‘আপনি আজ সাজেননি কেন?’‘না ছাজলে কি আমারে ভালা লাগে না?’ বেশ আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলেন বাসন্তী।পূর্ণা বাসন্তীর চোখেমুখে স্নিগ্ধতা খুঁজে পেল। মহিলা মায়াবী চেহারা পেয়েছে! প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। চকচকে গাল। বয়স চল্লিশের উপর মনেই হয় না। কিন্তু মুখে পূর্ণা কিছু বলল না। সে চোখ সরিয়ে নিলো। বাসন্তী বললেন, ‘আমার সঙ্গে গপ করবা?’‘আমার ঠেকা পড়েনি।’ পূর্ণার ঝাঁঝাল স্বর।বাসন্তী পূর্ণার পাশ ঘেঁষে বসেন। পূর্ণা বিরক্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল। কিছু কঠিন কথা শোনানোর জন্য প্রস্তুত হলো সবেমাত্র। তখন বাসন্তী বললেন, ‘আম্মা, আমি তোমার আব্বারে ভালোবাছছিলাম ছত্যি। তবুও ছেছ বয়ছে আইছছা একটা ভুল করে ফেলি। ভুল যখন বুঝতে পারি তোমার আব্বারে বলি। কিন্তু তোমার আব্বা মুখ ফিরাইয়া নেয়। আমার তোমার আব্বা ছাড়া আর গতি ছিল না। তাই গ্রামের মানুছ নিয়া আছছিলাম। আমার এই কাজের জন্য তোমাদের এত বড়ো ক্ষতি হবে জানলে এমন করতাম না। যাক গে ছেছব কথা। তোমার আব্বা আমারে আজও মাইনা নেয় নাই। তাতে আমার দুঃখ নাই। তোমার আম্মার মতো একটা ছোটো বইন পাইছি। তোমার দুইডা ভাই-বইনের মতো ছন্তান পাইছি। আমি নিঃছন্তান। আমার কোনো ছন্তান নেই। কখনো হবেও না। ছন্তানের চূন্যতা আমাকে খুঁড়ে খুঁড়ে খায়। তোমাদের বাড়িতে আছার পর থেকে সেই দুঃখ ঘুচে গেছে। প্রান্ত-প্রেমা যখন আমারে বড়ো আম্মা কইয়া ডাকে, আমার খুছিতে কান্দন আইছছা পড়ে। ছুধু ভালো লাগে না তোমার গুমট মুখটা। বিছ্বাস করো আম্মা, তোমার মারে আমি তাড়াতে আছি নাই। ছে হইছে গিয়া হীরার টুকরা। তার মতো মানুছ হয় না। আমি যা চেয়েছি তার চেয়েও বেছি পাইছি। ছেটা তোমার আম্মা দিছে। আমি চাই না আমার জন্য তুমি কছ্ট পাও। আমি তোমারে বলব না আমারে আম্মা ডাকতে। আমি ছুধু চাই তুমি আমারে মাইনা নাও। ভালো থাকো। হাছিখুছি থাকো। আমি তোমার বন্ধু হইতে চাই। তোমরা যেমনে বলবা আমি তেমনেই চলব। এই যে দেখো, তোমার ছাজগোজ পছন্দ না বলে আমি আজ ছাজি নাই। আর কোনোদিনও ছাজব না। আমি কী কম ছুন্দর নাকি যে ছাজতেই হবে!’ শেষ বাক্যটি রসিকতা করে হেসে বললেন তিনি।বাসন্তীর কথাগুলো পূর্ণার মন ছুঁয়ে যায়। পূর্ণা বরাবরই কোমল মনের। তবুও শক্ত কণ্ঠেই বলল, ‘আমি আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করব না। আপনি আপনার মতো থাকুন প্রেমা-প্রান্তকে নিয়ে। আমি আমার মতো থাকব আমার মাকে নিয়ে। আমার আর কারোর বন্ধুত্বের দরকার নেই। ‘বাসন্তীর চোখ ছলছল করছে। তবুও তিনি হাসতে কার্পণ্য করলেন না। বললেন, ‘তোমার চুল অনেক চুন্দর আর লম্বা। এখন তো ভরদুপুর। বাইন্ধা রাখো।’পূর্ণা চুলগুলো হাত খোঁপা করে নিয়ে বলল, ‘আম্মা এখনও ঘুমে?‘হ।’‘আম্মার কী যে হয়েছে! কখনো একদমই ঘুমায় না। আর কখনো ঘুম ছেড়ে উঠতেই পারে না।’‘পদ্মজার জন্য কান্ধে দেখি। ছরীর দুর্বল হয়ে পড়ছে। এজন্য ঘুমায়।’পূর্ণা উঠে দাঁড়াল। বাসন্তী বললেন, ‘আমি রানছি বলে ছকালে খাইলা না। এখন নিয়া আছি ভাত?’‘পরে খাব।’ বলে পূর্ণা দ্রুত পায়ে বাড়ির ভেতর চলে গেল।মায়ের ঘরে এসে দেখল, তিনি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। চুল ছড়িয়ে আছে বালিশে। কেমন শুকিয়ে গেছেন। এতক্ষণ না খেয়ে থাকলে তো আরো শুকাবেন। ডেকে খেতে বলা উচিত। আপা থাকলে কত যত্ন করত!পূর্ণা ডাকল, ‘আম্মা…আম্মা।’হেমলতা সাড়া দিলেন না। পূর্ণা ঝুঁকে হেমলতার গায়ে হাত দিয়ে ডাকল, ‘ও, আম্মা। উঠো এবার। দুপুর হয়ে গেছে। আম্মা…ও আম্মা।’হেমলতা চোখ খুললেন, চোখের মণি ফ্যাকাসে। তিনি উঠতে চাইলে হুট করে হাত কাঁপতে থাকল।পূর্ণা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, ‘কী হয়েছে আম্মা?’হেমলতা কিচ্ছুটি বললেন না। পূর্ণা হেমলতাকে ধরে ওঠাল।হেমলতা পূর্ণার দিকে চেয়ে থেকে ক্ষীণ স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘কে তুমি?’
হেমলতার এহেন প্রশ্নে চমকে উঠল পূর্ণা। চাপা স্বরে অবাক হয়ে উচ্চারণ করল, ‘আম্মা!’সেকেন্ড কয়েক পর তার উপর থেকে হেমলতা চোখ সরিয়ে নিলেন। পূর্ণা বলল, ‘আমাকে চিনতে পারছ না?’হেমলতা বিছানা থেকে নামতে নামতে বললেন, ‘ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল। তাই এমন হয়েছে। সবার খাওয়াদাওয়া হয়েছে?’পূর্ণা তখনো অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। হেমলতা পূর্ণার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী রে? কিছু জিজ্ঞাসা করেছি না?’‘হয়েছে। দুপুরের আজান পড়বে।’‘এতক্ষণ ঘুমিয়েছি! আরো আগে ডাকতে পারলি না?’‘ঘুমাচ্ছিলে আরাম করে। তাই ডাকিনি।’‘ফজরের নামাজটা পড়া হলো না। এখন কাজা পড়তে হবে। তুই নামাজ পড়েছিলি তো?’‘পড়েছি।’‘খেয়েছিস?’‘না।’‘এরকম করে আর কতদিন চলবে? যা খেয়ে নে।’পূর্ণা বাধ্য মেয়ের মতো হেঁটে চলে গেল রান্নাঘরে। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। কতক্ষণ না খেয়ে রাগ করে থাকা যায়? হেমলতা খোলা চুল হাত খোঁপা করে নিয়ে কলপাড়ের দিকে যান। অজু করে ঘরে ঢোকার সময় দেখেন, পূর্ণা খাচ্ছে। তিনি পূর্ণার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘খাওয়া শেষ করে ঘরে আসিস।’পূর্ণা খেয়েদেয়ে থালা ধুয়ে গুছিয়ে রাখল। রান্নাঘর থেকে বের হয়ে দেখে, চারা গাছ লাগানোর জন্য বাসন্তী উঠানের এক কোণে বসে মাটি খুঁড়ছেন। পূর্ণা দৃষ্টি সরিয়ে হেমলতার ঘরে চলে এলো। এসে দেখে হেমলতা জায়নামাজে অসম্ভব উদ্বিগ্ন হয়ে বসে আছেন।পূর্ণা মৃদুকণ্ঠে ডাকল, ‘আম্মা?’হেমলতা চমকে তাকান। পূর্ণা দ্বিতীয়বারের মতো অবাক হয়। চমকানোর কী এমন হলো? হেমলতা দ্রুত নিজের অভিব্যক্তি লুকিয়ে স্বাভাবিক হয়ে জায়নামাজ ভাঁজ করলেন ধীরেসুস্থে। এরপর পূর্ণাকে কাছে এসে বসতে বললেন। পূর্ণা পাশে এসে বসে। হেমলতা ভারি কণ্ঠে বললেন, ‘আপার (বাসন্তী) প্রতি তোর এত রাগ কেন? আম্মাকে বল?’‘এখন রাগ নেই।’‘প্রেমা-প্রান্তের মতো মিলেমিশে থাকতে পারবি না? ওরা বড়ো আম্মা ডাকে। তুই শুধু খালাম্মা ডাকবি।’‘মাত্র উঠলে ঘুম থেকে। আগে খাও। এরপর কথা বলব।’‘আমি এখনই বলব। কথাগুলো বলব বলব করে বলা হয়নি। দেখ পূৰ্ণা, আপা অন্য পরিবেশে বড়ো হয়েছে, থেকেছে তাই একটু অন্যরকম। তাই বলে মানুষটা তো খারাপ না। আপা সত্যি একটা সংসার চায়। পরিবারের একজন সদস্য ভাবতে দোষ কোথায়? বাকি জীবনটা কাটাক না আমাদের সঙ্গে। আমার কাজকর্মের একজন সঙ্গীও হলো। বয়স তো হচ্ছে, একা সব সামলানো যায়? আপারও বয়স হচ্ছে। কিন্তু দুজনে মিলে তো কাজ করতে পারব। কয়দিন পর তোর বিয়ে হবে, প্রেমার বিয়ে হবে। শ্বশুরবাড়ি চলে যাবি। তখন আমার একজন সঙ্গী থাকল। আর এমন নয় যে, আপার মনে বিষ আছে। আপারও দরকার ভালো সঙ্গ, ভালো পরিবেশ, ভালো সংসার। আমি দেখেছি, আপা কত সুখে আছে এখানে। প্রেমা-প্রান্তর জন্য জান দিয়ে দিতে প্রস্তুত। নিঃসন্তান বলেই হয়তো এত মায়া বাচ্চাদের জন্য। আপা কিন্তু এখন আমাদের ছাড়া অসহায়। তার মা মারা গেছে। বাবা তো নেই। আত্মীয়-স্বজন নেই। এই বয়সে যাবে কোথায়? আমরা একটু মানিয়ে গুছিয়ে নিতে পারি না? সতিন হলেই সে খারাপ হবে, সৎ মা হলেই সে খারাপ হবে এমন কোনো বাণী আছে?’পূর্ণা বেশ অনেকক্ষণ চুপ রইল। এরপর বলল, কিন্তু উনি অনেক সাজগোজ করেন। যদিও আমাকে কিছুক্ষণ আগে বলেছেন, আর সাজবেন না। তবে উনার কথার ধরন আমার ভালো লাগে না। স কে ছ উচ্চারণ করেন, শুদ্ধ-অশুদ্ধ মিলিয়ে জগাখিচুড়ি বানিয়ে কথা বলেন।’হেমলতা পূর্ণার কথায় হাসলেন। পূর্ণা ওড়নার আঁচল আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। হেমলতা পূর্ণার মাথায় হাত রেখে বললেন, ‘তোর আপা যদি প্রান্তকে শুদ্ধ ভাষা রপ্ত করিয়ে দিতে পারে। তুই তোর বাসন্তী খালাকে স উচ্চারণ শিখাতে পারবি না?’‘উনি শিখবেন?’‘বললে অবশ্যই শিখবেন।‘সত্যি?’‘বলেই দেখ।’‘এখন যাব?’‘যা।’‘যাচ্ছি।’পূর্ণা ছুটে বেরিয়ে গেল। হেমলতা মৃদু হেসে বারান্দায় বেরিয়ে আসেন। সেলাই মেশিনের সামনে বসেন। অনেকগুলো কাপড় জমেছে। সব শেষ করতে হবে।.উঠানে বাসন্তীকে পেল না পূর্ণা। এদিক-ওদিক তাকিয়ে খুঁজতে থাকল। বাসন্তী কলপাড় থেকে হাত পা ধুয়ে বেরিয়ে এসেছেন। পূর্ণা কথা বলতে গিয়ে দেখে জড়তা কাজ করছে। দুই-তিনবার ঢোক গিলে ডাকল, ‘শুনুন?’বাসন্তী দাঁড়ালেন। পূর্ণাকে দেখে হাসলেন। পূর্ণা এগিয়ে এসে বলল, ‘আপনাকে আমি পড়াব।’‘কী পড়াইবা?’‘লাহাড়ি ঘরের বারান্দায় আসেন আগে।’বাসন্তী কিছু বুঝে উঠতে পারছেন না। তবুও পূর্ণার পিছু পিছু গেলেন। বারান্দার চৌকির উপর পূর্ণা বসল। পূর্ণার সামনে বাসন্তী উৎসুক হয়ে বসলেন। পূর্ণা গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘আপনাকে আমি দন্ত-স উচ্চারণ শেখাব।’‘দন্ত-ছ উচ্চারণ তো আমি পারি।’‘আপনি দন্ত-স না বলে দন্ত-ছ বলেন। শুনতে ভালো লাগে না। বলুন, দন্ত-স।’বাসন্তী চোখ ছোটো ছোটো করে বললেন, ‘দন্ত-ছ।’‘হয়নি। বলুন, দন্ত-স।’‘দন্ত-ছ।’‘আবারও হয়নি। আচ্ছা বলুন, সংসার।’‘ছংছার।’‘স-ং-সা-র।’‘ছ…সওও-ং-চ…সার।সংসার উচ্চারণ করতে করতে পূর্ণার মুখের সামনে ঝুঁকে পড়েছেন বাসন্তী। পূর্ণা কপাল কুঁচকে বলল, ‘ওপরে চলে আসছেন কেন? দূরে বসুন। ‘ বাসন্তী দ্রুত সোজা হয়ে বসলেন। পূর্ণা বলল, ‘এবার বলুন, সন্তান।’‘স…সন্তান।’‘ফাটাফাটি! হয়ে গেছে। এবার বলুন, আসছে।’‘আছছে।’‘আরে, আবার ছ উচ্চারণ করছেন কেন? বলুন, আসছে। আ-স-ছে।’‘আ-স-ছে।’‘হয়েছে। এবার বলুন, সাজগোজ।’‘সাজগোছ।’.দুপুরের খাবার খেতে হাওলাদার বাড়ির পুরুষেরা একসঙ্গে বসেছে। আলমগীর, খলিল সবাই আজ উপস্থিত। আমির দুই দিন পর শহরে ফিরবে, তাই চলে এসেছে আলমগীর। অতিরিক্ত গরম পড়েছে। বাড়ির চারপাশে এত গাছপালা তবুও একটু বাতাসের দেখা নেই। আমিনা, লতিফা হাত পাখা দিয়ে বাতাস করছে অনবরত। খাবার পরিবেশন করছে পদ্মজা, ফরিনা আর রিনু। পদ্মজা আমিরের থালায় গোশত দিতেই আমির বলল, ‘তুমি কখন খাবে?’পদ্মজা চোখ তুলে তাকিয়ে বলল, ‘আম্মার সঙ্গে।’‘এখন বসো না।’‘জেদ ধরবেন না। অনুরোধ।’ ফিসফিসিয়ে বলল পদ্মজা।মাছের তরকারি আনার জন্য রান্না ঘরে গেল সে, বাটিতে করে মাছের ঝোল নিয়ে ফিরে এলো। আমিরের দিকে চোখ পড়তেই আমির চোখ টিপল। ঠোঁট কামড়ে হাসল পদ্মজা। আলমগীরের থালায় মাছের ঝোল দেওয়ার সময় খেয়াল করল, আলমগীর বেশ ফূর্তিতে আছে। বয়স পঁয়ত্রিশ হবে। এসে একবারও রুম্পার কথা জিজ্ঞাসা করল না। বিস্ময়কর! বউয়ের প্রতি বিন্দুমাত্র মায়া-ভালোবাসা যে নেই তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।রানি, লাবণ্য ছুটে এসে বাপ-চাচার মাঝে বসল। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে সবাই বিভিন্ন রকম আলোচনা করছে। রানির বিয়ে নিয়ে বেশি কথা হচ্ছে। খুব দ্রুত রানির বিয়ে দিতে চায় তারা। আচমকা রানি গড়গড় করে বমি করতে আরম্ভ করল। বিরক্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলল সবাই। প্রতিটি খাবারের থালা নষ্ট হয়ে যায়। আমিনা দ্রুত রানিকে ধরে কলপাড়ে নিয়ে যান। লাবণ্য, পদ্মজা, নুরজাহান, ফরিনা ছুটে গেল পিছু পিছু। বাড়ির পুরুষেরা হাত ধুয়ে উঠে পড়ে। মুহূর্তে একটা হইচই লেগে যায়।রানি বমি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ল কলপাড়েই। আমিনা হায় হুতাশ করে বিলাপ করছেন, ‘আমার ছেড়িড়ার কী হইল? কয়দিন ধইরা খালি বমি করতাছে। জিনের আছড় লাগল নাকি! কতবার কইছি যহন তহন ঘর থাইকা বাইর না হইতে।’লাবণ্য তথ্য দিল, ‘আপা রাতেও ছটফট করে। ঘুমাতে পারে না।’আমিনা কেঁদে কূল পাচ্ছেন না। রানির চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে। তিনি রানিকে প্রশ্ন করলেন, ‘আর কী কষ্ট হয় তোর? ও আম্মা কবিরাজ ডাকেন। আমার ছেড়িডার কী হইল?’রানি ক্ষীণ স্বরে বলল, ‘মাথাডা খালি চক্কর মারে।’নুরজাহান চোখ দুইটি বড়ো বড়ো করে প্রশ্ন করলেন, ‘এই ছেড়ি তোর শরীর খারাপ শেষ হইছে কবে?’‘দুই মাস হবে,’ কথাটা বলে রানি চমকে উঠল। সবাই কী ধারণা করছে? সে চোখ তুলে ওপরে তাকাল। সবাই উৎসুক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেমন করে তাকিয়ে আছে! রানির শরীর কাঁপতে থাকে। আমিনা মেয়েকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘এমন কিছু হয় নাই, আম্মা। আপনি ভুল বুঝতাছেন। আমার ছেড়ি এমন না।’‘হেইডা কবিরাজ আইলে কওয়া যাইব। এই ছেড়ির জন্য যদি এই বাড়ির কোনো অসম্মান হয় কাইট্টা গাঙে ভাসায়া দিয়াম। মনে রাইখো বউ।’ নুরজাহানের রাগী স্বর। রানির গলা শুকিয়ে কাঠ! হৃৎপিণ্ড দ্রুত গতিতে চলছে। শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। একসময় মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেল আমিনার কাঁধে। আমিনা চিৎকার করে উঠলেন, ‘ও রানি…’