BDBOYS...
BDBOYS...
সবচেয়ে সাম্প্রতিক খবর ও পোস্টসমূহ
ওপরের ঘরটায় পলা (উৎপলা) আর মনু শোয়। একতলার ঘরে মাল্যবানের বিছানা বৈঠক—সমস্ত। এইখানেই সে থাকে, কথা বলে, কাজ করে, বই পড়ে, লেখে, ঘুমোয়। নিজে ইচ্ছা করে স্ত্রীর কাছ থেকে এ-রকম ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়নি সে। দোতলায় ঐ একটা ঘরেই পলার ভালো করে কুলিয়ে ওঠে তেমন : কাজেই সে স্বামীকে নীচের ঘরে গিয়ে শোবার ব্যবস্থা করতে বলেছে। অথচ দোতলার ঘরটা একতলার ঘরের চেয়ে ঢের বড়ো-আলো বাতাস রৌদ্র নীল আকাশের আনাচ-কানাচ-কিনারা, মূল আকাশেররা বড়ো নীলিমার বেশ মুখোমুখি প্রকৃতির সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে; একতলার পাশেই প্রকাণ্ড ছাদের একটা আশ্চর্য প্রসূতি রয়েছে, সিঁড়িটার দু-পাশ মাত্র নেমে গেলেই একতলার সমস্ত ছাদটা আকাশ বোদ কলকাতার শহরটাই তোমার; যদি ভেবে নিতে পার তাহলে পৃথিবীর নগরনাগরের ইতিহাস বারানবত বেবিলনও তোমার চোখে ফুটে উঠছে।দুটি প্রাণী—ওপরে নিচে এই দুটি ঘরে আলাদা রয়েছে। মালাবানের বিয়ে হয়েছে প্রায় বারো বছর হল। বিয়ের পর দুতিন বছর পলা ঘুরে ফিরে বাপের বাড়িতেই প্রায়ই থাকত; তারপর শ্বশুরবাড়িতে বছরখানেক থাকে, মনু হয়, মনুর ছ-মাস বয়েসের সময়েই বাপের বাড়ি চলে যায় আবার, সেখানে বাবার মৃত্যু পর্যন্ত বছর-দুই আরো কাটিয়ে এই বছর-সাতেক ধরে কলকাতায় স্বামীর কাছেই রয়েছে।রাত একটা। ডান কাৎ ফিরে মালাবান একটু ঘুমুতে চেষ্টা করল; নানারকম কথা মনে হয়—ঘুম দুরে সরে থাকে। তারপর আস্তে আস্তে বাঁ কাৎ ফিরে মনে হল এইবারে ঘুম এলে বেশ ভালো লাগবে। কিন্তু ঘড়িতে দেড়টা বাজল, তারপরে দুটো, ঘুম এলো না; এক-একটা রাত এ-রকম হয়।কম্বলটা ঠোঁট অব্দি টেনে নিয়ে চোখ বুজে আবার পাশ ফেরা গেল। কলকাতার রাস্তায় নানারকম শব্দ কানে আসে; রাত তো দুটো, শীতও খুব হুজুতে, কিন্তু কাদের ফিটন যেন রাস্তার ওপর দিয়ে খটখট করে চলেছে: গাড়ির ভেতর মেয়েদের হাসি, বুড়ো মানুষের মোটা গলা, ছোটোদের চেঁচামেচি। মাল্যবান কম্বলের নীচে ফলিকাৎ হয়ে থাকতে থাকতে ভাবছিল: তাই-তো, কোথায় যাচ্ছ তোমরা মুনশীরা, ফিরছ, কোত্থেকে? ঘোড়ার খুরের আওয়াজ অনেক দূর অব্দি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল, এমন সময় এঞ্জিনের বিকট তড়পানিতে চারদিকের সমস্ত শব্দ গিলে খেল, এল, চলে গেল একটা লরি। মাল্যবানের মনে হল লরির এই লবেজান আওয়াজেরও এক সার্থকতা আছে: যেমন বালির থেকে তেল বার করতে পারা যায়, সে রকম; একে যদি চাকা-টায়ারের শব্দ না মনে করে বাদলরাতের ঝমঝম আওয়াজ ভেবে নেওয়া যায় তবে বেশ লাগে লরির-খানিকটা চুণবালি খসে পড়ল চাতালের থেকে মাল্যবানের নাকে মুখে; বাড়িটার ভিৎকাপিয়ে দিয়ে বাপরে, একেবারে নিপ্পনের টাইডাল ওয়েভের মতো ছুটে গেছে লরিটা: নাকমুখ থেকে চুণকাম ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে মাল্যবান ভাবছিল। রাস্তা দিয়ে কাহার-মাহাতোরা একটা মড়া নিয়ে যাচ্ছে। কার যেন প্রাইভেট মোটর মাল্যবানদের বাড়ির কাছেই এসে থামল—গাড়িটা কী রকম বিগড়ে গেছে যেন; দুচারজন মিস্ত্রি সেটা মেরামতের চেষ্টায় আছে; মবিল-অয়েলের গন্ধ মাল্যবানের নাকে ঢুকল, মন্দ লাগল না তার; একটা ষাঁড় ফুটপাথ দিয়ে যেতে-যেতে ঘঁগ-ঘড়ম করে উঠল একবার; সামনেই কাদের যেন দোতলার থেকে একটা বড়ো, অস্পষ্ট কান্না ও ঝগড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে; মাল্যবানের ঘরের পাশেই ড্রেনের কাছে একটা নেড়ি কুকুর সুর-ধুর করে রাবিশের ভেতর থাবা নখ চালিয়ে বালি ঘড়ির বাজনা বাজিয়ে চলেছে যেন অনেকক্ষণ থেকে; কী চায় সে? কী পাবে? খানিকটা দূরে একটা বাড়ির ভেতর মহলে হয়তো কলতলায়, ভাড়ার ঘরে, গুদোমে দুটো বেড়াল মরিয়া হয়ে ঝগড়া ছে অনেকক্ষণ ধরে; তাদের একটি নর ও একটি মাদী নিশ্চয়ই; এই শীত রাতে এই আশ্চর্য শীতে নিদারুণ কপট ঝগড়ার আড়ালে হুলো আর মেনির এই অত্যদ্ভুত রক্তোচ্ছ্বাস কাম নিয়ে জীবনের যৌনঋতুর; যৌন আগুনের এই প্রাণান্তকর দৌরাত্ম্যে-মাল্যবান দাঁত ফাঁক করে ভাবছিল, বেড়ালের লুটোপুটি ঝুটোপুটি কান্নাকাটি করে; বেশি বয়সে বিয়ে করেছিল, একজন সাদা দাড়িঅলা বুড়ো প্রফেসরকে ঠিক এই রকমই করতে দেখেছিল মাল্যবান প্রায় বছর-সাতেক আগে—সন্ধ্যারাতেই;—গলাখাকারি না দিয়ে প্রফেসরমশাইর ঘরে রবারসোল জুতো পায়ে ঢুকে পড়েছিল মাল্যবান: কিন্তু এ-রকম মইমারণ হইমারণ ব্যাপার যে হতে তা তো ধারণা করতে পারেনি সে; কিন্তু সেই থেকে উপলব্ধি করেছে মাল্যবান যে সমস্ত ইতর প্রাণীকে বিশ্লেষণ করে যে মহৎ সংশ্লেষে উপস্থিত হওয়া যায় তারি আশ্চর্য সন্তাপ উচ্ছ্বাস ও পুঙ্খানুপুঙ্খ ইতরতাকে ভাঙিয়ে চারিয়ে জ্বালিয়ে নাচিয়েই মানুষ তো হয়েছে মানুষ। ভাবতে ভাবতে অবসন্ন হয়ে মাল্যবান কাৎ হয়ে শুয়ে পড়ল আবার। ঘড়িতে বাজল আড়াইটে, কিন্তু ঘুম তো এল না।আজ ছিল তার জন্মদিনের তারিখ। বেয়াল্লিশ বছর আগে—এম্নি অঘ্রাণ মাসের বিশ তারিখে কলকাতার থেকে প্রায় দেড়শো মাইল দুরে বাংলাদেশের একটা পাড়াগাঁয়ে সে জন্মেছিল। সেখানে খেজুরের জঙ্গল বেশি, তালের বন কম, শুপুরীর গন্ধ হয়তো সবচেয়ে বেশি। এম্নি শীতে খেজুরগাছের মাথা চেঁছে একটা নল বসিয়ে গলায় হাঁড়ি বেঁধে দেওয়া হয়, সমস্ত শীতের রাতে ফোঁটা ফোঁটা রস ঝরতে থাকে, মাছি-মৌমাছি ছোটো ছোটো রেতো প্রজাপতি, বড়োগুলোও সেই হাঁড়ির রসে সাঁতার কাটছে, পাখনা নাড়ছে, মরে আছে; কুয়াশা নির্জন ঠাণ্ডা নিবিড় শেষ রাতে দেখা যায় এই সব। এম্নি শীতের রাতে ধানের ক্ষেত শূন্য হয়ে পড়ে আছে—হলদে নাড়ার গ্যাজে সমস্ত মাঠ রয়েছে ছেয়ে, শীত পেয়ে দু-একটা বাঘ নেমে আসে; এম্নি উদাস রাতে ফেউগুলো অন্তত খুব হাঁকড়ায়; শ্মশানে হরিবোল যেন কোন দূর কুয়াশপুরুদের রলরোল বলে মনে হয়; লক্ষ্মীপেঁচা ডাকতে থাকে, ঘুম ভেঙে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালে দেখা যায় শীতের কুয়াশার সে কোন অন্তিম পোচড়ের ফাঁকে-ফাঁকে বৃহস্পতি কালপুরুষ অভিজিৎ সিরিয়াস যেন লণ্ঠন হাতে করে এখান থেকে সেখানে, সেখান থেকে এখানে কোন সুদুরযানের পথে চলেছে, কেমন একটা আশ্চর্য দুর পরলোকের নিক্কণ শোনা যায় কেন?। কোনোদিন কুয়াশা কম—সাদা মেঘ আছে—একফালি গড়ানে মেঘের পাশে—নিজের কেমন যেন একটা বৃহৎ আলোর শরীর নিয়ে থেমে আছে চাদ। পঁচিশ সাতাশ বছর বয়স পর্যন্ত পাড়াগাঁয় সে ফিরে ফিরে যেত, এই সব তার দেখবার শোনবার জিনিস ছিল, কিন্তু তার পর পনোরোটা বছর কেটে গেল এই শহরই হল তার আস্তানা, একটা কঁচপোকা মৌমাছি শামকল মৌচুষকি জোনাকির কথা মনেও পড়ে না তার, আকাশের নক্ষত্রগুড়িগুলোর দিকে ফিরেও তাকায় না সে।ভাবতে ভাবতে আকাশের রুপালি সবুজালি আগুনগুড়িগুলোর কথা ভুলে গেল সে। পনেরো বছর চাকরির পর গত মাসে আড়াইশো টাকা মাইনে হয়েছে, এর আগে মাইনে ছিল একশো পাঁচানব্বই; প্রায় পাঁচ বছর ধরে একশো পঁচানব্বই টাকাই মাইনে ছিল; তার আগে মাইনের ব্যাপারে বড়ো গরমিল ছিল। সাহেবদের অফিস বটে, কিন্তু এক সময় অফিসের অবস্থা এত খারাপ ছিল যে, যে নামমাত্র মাইনেয় মাল্যবান ঢুকেছিল অনেক বছর পর্যন্ত তার দুর্ভোগ তাকে সহ্য করতে হয়েছে। এই সময় কোনো কোনো কেরানী অফিস ছেড়ে চলে গিয়েছিল, কিন্তু মাল্যবান যায়নি, বরং যত্ন করে এই অফিসেই খেটেছে সে; আজ রাতে তার মনে হয় তার অনেক দিনের খিদমদগারির পুরষ্কার সে পেয়েছে।খিদমদগারি? কী আর বলবে সে। পূর্বপুরুষেরা তাকে যেমন শক্তি সুযোগ দিয়েছেন তাতে দেশের, মানুষের, আইনের, চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য, এমন কি পড়াশোনায়ও নিজেকে উৎসর্গ করবার কোনো পথ আর নেই। সে সব পথে যদি যেত কেউই তাকে মানত না; মানত কি? লক্ষ্য উচু রাখলেও যে নিচে পড়ে ল্যাংচায় কে মানে তাকে? কাজেই এই পনেরোটি বছর বসে ধীরে ধীরে বটমলি বিগল্যাণ্ড ব্রাদার্সের অফিসের জন্য খেটেছে; কী করবে সে আর কী করতে পারে?বি.এ. পাশ করে আইন পড়েছিল, কিন্ত তখনই এই অফিসের চাকরিটা পায়; চাকরিটা নিল সে।মাঝে-মাঝে মনটা ঝুমুর দিয়ে ওঠে বটে : উকিল হলে মন্দ হত না হয়তো, বেশ স্বাধীন ভাবে থাকতে পারত, কারু তাই রাখতে হত না, ব্যবসায়ে উন্নতি করতে পারলে মানুষের কাছ থেকে ঢের মর্যাদাও পাওয়া যেত। মনে হয় এক-এক সময়ে এই সব। কিন্তু মফস্বলের বার-লাইব্রেরীগুলোর দিকে তাকিয়ে….কলকাতার বড়ো-বড়ো এম.এ, ডি. এল. কী করে টাকা রোজগারের বাপারে জেলা শহরের কমিটি পাশ পি. এল-এর কাছে হেরে যাচ্ছে কোথাও কোথাও-দেখে-শুনে মনে-মনে মাঝে-মাঝে হাসে—অহঙ্কারে নয়, আত্মসৌকর্যে নয়, কিন্তু নিজের ক্ষমতার খবৰ্তা হাড়ে-হাড়ে অনুভব করে। মাল্যবান বুঝতে পেরেছে যে-কাজ সে করছে এর চেয়ে খুব বেশি ভালো-কিছু কোনোদিনই সে করতে পারত না; হয়তো নিমকির দারোগা হত কিংবা সুপারিনটেন্ডেন্ট, গভর্ণমেন্টের চাকরির ছকে পড়ে গেলে একেবারে সবচেয়ে বড়ো কেরানীসাহেবও যে সে হতে পারত তা নয়; টাকার দিক দিয়ে খানিকটা লাভ হত বটে, টাকা সে চায়ও, খুবই চায়, কিন্তু আরো অনেক জিনিস চেয়েছিল সে: বিদ্যা সবচেয়ে আগে: অনেক দূর পর্যন্ত লেখাপড়া করবার সাধ ছিল, অনেক জিনিস শিখতে ইচ্ছা, বুঝতে ইচ্ছা; নিজের মনটা যে নেহাৎ কোরানীর ডেস্কে-আঁটা নিখেট, নিরেস কিছু নয়, মানুষকে সেটা বোঝাবার ইচ্ছা। নানা রকম ইচ্ছা—মনে অনেক রকম ভালো সুশৃঙ্খল কাটকাঠামের কথা জেগে ওঠে যে তার, মানুষকে সে তা জানাতে চায়; এক-এক সময় মনে হয় অফিসের কাজ ছেড়ে নিজের জীবনটাকে সে কোনো মহৎ কাজের ফেনশীর্ষে-ধরো কোনো উত্তেজনাময় কর্মিসংঘের মধ্যে নিয়ে ফেলুক; জীবনটাকে এ-রকম অফিসে চেপে সাপটে মেরে লাভ কী? টাকা পারিবারিক সচ্ছলতা—এগুলোকে এমন ঘাসের বিচি, ধুন্দুলের বিচি, রামকাপাসের আঁটি বলে মনে হয় এক-এক সময়! স্টিক হাতে নিয়ে গোল দীঘিতে ঘুরতে ঘুরতে মনে হয় একটা বড়ো বাজপেয়ে সভায় বেশ মার্জিত ভঙ্গিতে আবেগের বিরাট অকুলপাথারে নিজেকে আশ্চর্যভাবে নিয়ন্ত্রিত করে বক্তৃতা দেবার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে তার: পোলিটিকসে বাঙালীরা আজকাল গুজরাট মারাঠি ইউ-পিওলাদের কাছে পদেপদে ভুডু খেয়ে ফিরছে—ভাবতে ভাবতে রক্ত কেমন যেন হয়ে ওঠে তার, বাঙালীর মান। সম্মান ফিরিয়ে আনবার জন্য বড়ো নয়াল আগুনের মতো দাউদাউ করে উঠতে ইচ্ছা করে তার বিপ্লবের থেকে বিপ্লবে—ফ্রান্স রুশ স্পেন চীন সমস্ত বিপ্লবেরইয়ে—স্তনাগ্রচুড়ায় নতুন দুগ্ধের উল্লাসে নবীন পৃথিবীর জন্যে। ভাবতে ভাবতে বাঙালীর কথা ভুলে যায় সে। অনেকক্ষণ পরে মাল্যবানের মাথা ঠাণ্ডা হয়; গোলদীঘির একটা বেঞ্চিতে ধীরে-ধীরে চুপ করে গিয়ে বসে সে তখন; একটা বিড়ি জ্বালায়। ক্ষিধে পেয়ে ওঠে, বাড়ির দিকে রওনা হয়।একটা কথা ঠিক : মাটি নিচে গেঁড় আর কন্দ খাওয়া শুয়োরের মতো (আপার গ্রেডের) অফিসগিরিই তার সব নয়; এক জোড়া রেশমী স্টকিঙ, বার্ণিশকরা নিউকাট, তসরের কোট, পরিপাটি টেরি, সিগারেটকেস ও ফুটবলগ্রাউণ্ডের বেঞ্চি দিয়ে নিজেকে চোখঠার দিতে সে ভালোবাসে না। এই সবের চেয়ে সে আলাদা।খবরের কাগজ সে রোজই পড়ে; কিন্তু স্পোর্টস রেস রাহাজানির দিকে একটু বেশি ঝুঁকে পক্ষে নয়; কোথাকার অন্তঃপুরে, আদালত কী রকম হাঁড়ি ভাঙল, বায়োস্কোপে কি থিয়েটারে কী আছে–এসব সম্বন্ধে কোনো আগ্রহ বা আস্বাদ এ বেয়াল্লিশ বছরে মধ্যে এখনও সে তৈরি করে নিতে পারেনি। খবরের কাগজে তবুও সে আশাতীত প্রয়োজনীয় নানা জিনিস খুঁজে পায়। অফিসের থেকে ফিরে চুরুট জ্বালিয়ে অনেকক্ষণ সে খবরের কাগজ নিয়ে বসে থাকে; একে একে মনের ভেতর নানা রকম সাধ-সংকল্প খেলা করে যায়; ভেঙে চুরমার হয়। তারপর অবসন্ন হয়ে পেপারটা সে রেখে দেয়; মনে থাকে না বিশেষ কিছু : কোনো কিছু সত্যিই শিখেছে বলে উপলব্ধি করতে পারে না। বিছানায় শুয়েশুয়ে ভাবে নিজে সে অবিশ্যি পার্নেল বা চিত্তরঞ্জন হতে পারবে না—কোনোদিনও না—কোনো প্রক্রিয়ায়ও না—কিন্তু পার্নেল বা চিত্তরঞ্জন বাঙালীর মধ্যে আজকালই যদি না জন্মায় তাহলে এ-জাতের ভরসা খুব কম। উনিশ-শো-ঊনত্রিশ সালের একটা রাত্তির শুয়েশুয়ে এই সব কথা ভাবছিল যখন মাল্যবান; সেই জন্যই সে এই রকম ভাবছিল।ঘড়িতে প্রায় সাড়ে তিনটে বাজল মাল্যবান দেখল বিছানায় চিৎ কাৎ হয়ে ভেবেই চলেছে ক্রমাগত; এত ভাবায় হৃদয় শুকিয়ে যায় শুধু, কোনো তীরতট পাওয়া যায় না, আসে না চোখে এক পলক ঘুম। আস্তে আস্তে সে উঠে বসল; বিছানায় ছারপোকা আছে—কিন্তু ঘুমের ব্যাঘাত ছারপোকার জন্য নয়; এর চেয়ে ঢের বেশি আরশোলা ইদুর মশা পিসুর ঘাঁটিতে লম্বা নির্বিবাদ চৌকশ ঘুমে কত রাত কাটিয়ে দিয়েছে। রাস্তার একটা গ্যাস ল্যাম্পের আলো ঘরে ছিটকে পড়েছিল খানিকটা; স্লিপার খুঁজে নেওয়া গেল, পায়ে দিয়ে লাল-নীল-চেককাটা কম্বলে সমস্ত শরীরটা মুড়ে সে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় গিয়ে উঠল—নিঃশব্দে খানিকটা এগিয়ে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখল নেটের মশারীর ভেতর মনু ও পলা কেমন নিশ্চিন্ত ভাবে ঘুমুচ্ছে—কেমন শান্ত প্রীত নিঃশ্বাস তাদের। একটা ভারি নিঃশ্বাস প্রাণের ভেতর প্রচুর চুম্বনে টেনে নিল সে; সমস্ত শরীরকে আস্বাদস্নিগ্ধ করে আস্তে আস্তে নিঃশ্বাস ছাড়তে লাগল সে; ভালো লাগল তার। ভালোই লাগল তার ঘুমন্তদের দিকে তাকিয়ে : স্ত্রী সন্তানকে সচ্ছলতায় রাখা, তাদের জীবনে খানিকটা সুখ সুবিধে শান্তির ব্যবস্থা করা-মাঝারি জীবনের এ উদ্দেশ্য এ শীত রাত মাল্যবান সিদ্ধ দেখছে বলে। নিজের ঘুম হচ্ছিল না তার—এরাই বা এই শীতের মধ্যে কী করছে ঘুমিয়ে? জেগে? দেখবার জন্যই সে ওপরে এসেছিল। দেখা হল। মাল্যবান সুস্বাদ পেল, কেমন স্নিগ্ধ শারীরিক মনে হল তার রাত্রিটাকে, রাত্রির এই নিঝের সময়টাকে। এখন নীচের ঘরে যেতে হয়। কিন্তু তবুও মাল্যবান গেল না সহসা। মশারীর খুঁট তুলে এদের খাটের পাশে দাড়াগাঁর পউষরাতের নিশ্ৰুপ ডানার পাখির মতো এসে স্নিগ্ধ নৈঃশব্দে—এদের জাগিয়ে?—বসে থাকতে চায়। কিংবা বসবেও না মনুর কপালে আলতো হাত বুলিয়ে দেবে-কম্বলটা স্ত্রীর বুক থেকে সরে গেছে, তুলে গুছিয়ে দেবে আলতো। তারপর নিজের ঘরে চলে যাবে সে।কিন্তু নেটের মশারী তুলতেই ব্যাপারটা হল অন্যরকম। উৎপলা জেগে উঠে প্রথম খুব খানিকটা ভয় খেলে; তারপর বিছানার ওপর উঠে বসে তার সমস্ত সুন্দর মুখের বিপর্যয়ে—মুহূর্তেই সে ভাবটা কাটিয়ে উঠে মরা নদীর বালির চেয়েও বেশি বিরসতায় বললে, তুমি!এসেছিলাম।এ সময় তোমাকে কে আসতে বললে।দেখতে এলাম, তোমরা কী করছ।যাও, তোমার মেয়ে নিয়ে যাও, কাল থেকে এ আমার সঙ্গে আর শোবে না। মেয়েটার দাবনা ঘেঁষে, বাপ রে, একটা ডান যেন।কে আমি? মাল্যবান দাঁড়িয়ে থেকে বললে। খাটে বসল না, একটা কৌচে বসে বললে, না, মেয়েটিকে শুধু দেখতে আসিনি, আমি—আ, গেল যা! বসলে! রাত দুপুরে ন্যাকড়া করতে এল গায়েন। হাত পা পেটে সেঁধিয়ে কম্বল জড়িয়ে এ কোন ঢঙের বলির কুমড়ো সেজে বসেছে দেখ। ও মা! ও মা! বেরোও! বেরোও বলছি!তুমি ঘুমুচ্ছিলে—তোমার ঘুম ভাঙাতে আসিনি তো আমি—বলি, বলির কুমড়ো, দুফাঁক হবে, না এখানে থাকবে?ঘুমোচ্ছিলে, ঘুমোও।ঘুমোচ্ছিলে, ঘুমোও! আর, গোঁসাইয়ের কুমড়ো–কেন, কুমড়ো-কুমড়ো করছ, উৎপলা—এখানে বসে থাকা চলবে না এখন।আমি একটু বসে আছি,–তোমার ঘুমের ব্যাঘাত হবে না। আমি এই কৌচে বসে আছি; মনু ঘুমুচ্ছে; ঘুমিয়ে পড়।উৎপলা গলাটা পরিষ্কার করে নিল; একটানা ছঘণ্টা ঘুমিয়ে বেশ সজীব সুস্বাদ হয়েছে শরীর; সরস কঠিন গলায় বললে, দরমুজ নিয়ে ইদুর মেরে ফেলেছি সব আমার ঘরের। তবুও যদি এক-আধটা থাকে জার্মান কল পেতে রেখেছি। ও-সব চালাকি চলবে না। ঘুম বড়ো বালাই আমার। ভালো চাও তো নিচে চলে যাও।মাল্যবান চুপ করে বসেছিল। সে চলে গেছে না কৌচে বসে আছে সে-দিকে না তাকিয়ে অন্ধকারে কিছু না বুঝতে পেরে উৎপলা বললে, ইশ, একেবারে ঘুম ভাঙতেই চেয়ে দেখি মস্ত বড়ো একটা ড্যাকরা মিনসে কম্বল জড়িয়ে খাটের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সমস্ত বুকের রক্ত ঝিম ঝিম ঝাকর-ঝিম করে উঠল আমার।কিন্তু দেখলে তো, আমি দাঁড়িয়ে আছি।এ-রকম ভাবে ফের যদি আমাকে ভয় দেখাতে আস—ভয় দেখাতে তো আমি আসিনি, উৎ–না, এসেছেন রূপ দেখাতে। ফের আমার ঘরের ভেতর ঢুকেছ কি রাত বিরেতে—দাঁতের ওপর দাঁত চেপে কেমন একটা অদ্ভুত নিরেট নিগ্রহময়তায় বললে উৎপলা।মাল্যবান শীতের রাতে নিঃশব্দতা ও অতিদীর্ঘতা, যে-দীর্ঘতা নিঃশব্দতা, যে নিঃশব্দতা স্নিগ্ধতা (হতে পারত; কতবার পাড়াগাঁর রাতে হয়েছিল) সে-সব সুর কেটে যাচ্ছে উপলব্ধি করে, উৎপলা যে গুমোটের সৃষ্টি করেছে সেটাকে হাল্কা করে দেবার জন্য সরু গোঁফে তা দিয়ে একটু হেসে বললে, রাত বিরেতে ওপরে চলে এলে উচ্চিংড়ের কাবাব বানিয়ে দেবে নাকি আমাকে, পলা! বলে নিজেই হাসল মাল্যবান; হাসিটা এক বগগা টের পেয়ে থেমে গেল; খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে শেষে বললে, আমি আজ এসেছিলাম—আমার আজ কেমন ঘুম চটে গেল—আমার আজ ঘুম হচ্ছিল না কিনা—ঘুম হচ্ছে না বলে পরের ঘুমের নিকুচি করতে হবে?তা নয়।তবে আবার কী।আমি এসেছিলাম— মাল্যবান মাথা হেঁট করে খতিয়ে কী বলবে,অনায়াসে সেটা স্থির করতে না পেরে কিছু বলতে গেল না আর।উৎপলা বললে, এই যে আমার ঘুমটুকু নষ্ট করে গেলে এর ঝক্কি পোয়াতে আমি বেলা আটটা-নটার আগে উঠতে পারব না।তা উঠো। যখন ঘুম পোষাবে তখন উঠবে, এর আর কি কথা।কাল সমস্তটা দিন মাথা ধরে থাকবে।সকালে উঠে গরম-গরম চা খেয়ো।চা খেলেই ধরা সেরে যায়? এমন বেকুব!তোমার তো স্মেলিং সল্ট আর মনেথল রয়েছে—তাইতেই মাথা ধরা সারে! হুঁ! ঘানিগাছে ঘুরতে ঘুরতে মুখ ফাঁক করে বলেছে বুঝি জয়নাথের বলদটা?উৎপলার গায়ের ঝালে মশারীর ভেতরটা বেশ গরম হয়ে আছে, খড়ের উমের ভেতর যেন শুয়ে আছে মনু আর পলা; মানুষ না হয়ে সে যদি সারস হত তাহলে কৌচে না বসে কোন যুগে ওদের ঐ নীড়ে জাপটে বসে থাকত সে; ভাবছিল মাল্যবান।এক-আধটা এ্যাসপিরিন খেয়ো; কিন্তু ওগুলো বিষ ভালো জিনিস নয়, না খেলেই ভালো।এই যে ঠাণ্ডা লাগল আমার তরাসে যাতে জেগে উঠে, কতগুলো ন্যাকড়া ছিড়ে ছোটো ছোটো সলভের মতো পাকিয়ে নাকের ভেতর সেঁধিয়ে হাঁচতে হবে; কাল সমস্তটা দিন এই আমার কাজ; ভাবতে গেলেও মনটা খিচড়ে যায়; ছোঃ!মাল্যবান কৌচের থেকে উঠে এসে খাটের পাশে ভাঙা হাতলের হাল্কা চেয়ারটা টেনে চুপ করে বসল গিয়ে।অ্যাসপিরিনের কৌচের থেকে উঠে এসে খাটের পাশে ভাঙা হাতলের হাল্কা চেয়ারটা টেনে চুপ করে বসল গিয়ে।অ্যাসপিরিনের শিশিটাও তো ফুরিয়ে গেছে, একটা পিলও যদি থাকে—কাল এক ফাইল কিনে আনতে হবে।কাল সকালে চা আমাকে করে দিতে হবে।করে দেব।তিন চার কাপ চা লাগবে আমার।গরম গরম চা সর্দি মাথাধরার বেশ কাজ করে।হ্যাঁ, সর্দি জমেই তো এই মাথাধরা।এখনই ধরল?না, তত ধরেনি; তবে ভোরের বেলা হবে, খোয়া পাথরের ওপর হাতুড়ি পেটাচ্ছে যেন ঝগড়ুর বৌ—সেই কালো হয়ে লম্বা হয়ে সোমথ মাগীটা। বাবা রে! আড়ামোড়া ভাঙতে ভাঙতে আশ্চর্য আরাম বোধ করে আক্ষেপে চেঁচিয়ে-মেচিয়ে উঠে উৎপলা বললে, হাতুড়ি পেষাবে মাথার ভেতর, এই হয়ে এল আর কী। আমি বিছানার থেকে উঠতে পারব না। তুমি চা এনে আমার খাটের পাশে রেখে দিয়ে তো বাপু।মনু কি ঘুমিয়ে আছে?ঘুমিয়ে আছে ওর ঠাকুরের থানে।তার মানে?ঠাকুরের থানে দশায় পড়ে আছে।জেগে আছে? মাল্যবান বললে, ভাকব মনুকে? কিন্তু মনুকে ডেকে দেখবার কোনো চেষ্টা না করে মাল্যবান বললে, আজ সারারাত ঘুমের টিপই এল না আমার চোখে; কেমন যেন হয়ে গেল; এক ফোঁটা ঘুম হল না।কাল তোমার কটার সময় অফিস?সাড়ে দশটায়।আমি তো উঠব খুব দেরি করে : হয়তো আটটা-নটা; তখন আমাকে চা করে দিতে পারবে?ঠাকুর দেবে। আমি দেব না হয়।উৎপলা সমস্ত শরীরে লেপ মুড়ি দিয়ে বালিশে মাথা পেতে বললে, নাও, মশারীটা গুঁজে দাও তো মনুর পায়ের দিকে।মশা তো নেই, মশারী টাঙাবার এক বাতিক তোমার।মশা নেই, ইঁদুর আছে, মশারী না গুঁজলে পা কেটে খেয়ে যাবে।মশারী ঠিক করে দিয়ে মাল্যবান চেয়ার থেকে উঠে দূরে একটা ময়লা তেলচিটে সোফায় গিয়ে বসল। উৎপলা বালিশে মাথা গুঁজে হাত পা খিচিয়ে আলসেমি ঝেড়ে হাই তুলল, তুড়ি দিল, লেপটা ভালো করে জড়িয়ে নিল সর্বাঙ্গে। তারপর মাল্যবানের দিকে আন্দাজি নজরে একবার তাকিয়ে নিয়ে বললে, বসলে? বসলে যে বড়ো?কী করব?যাও—নীচে যাও।সেখানে গিয়ে কী হবে?এরকম কতক্ষণ বসে থাকবে শুনি—তোমার সঙ্গে কথাবার্তা বলব—দাঁতে ঠেকে যাবে জিভ বেশি কথা বলতে গেলে। দাঁতকপাটি হয়ে যাবে। দাঁতে চামচ ঢুকিয়ে চাড় দিয়ে-পেঁকির পাড় দিয়েও খুলতে পারা যাবে না আর—নাও,সুড় সুড় করে সরে পড় দিকিনি–উৎপলা পাশ ফিরে শুল।মাল্যবান বসে রইল কনকনে ভিজে শীতে কেমন ন্যাতাজোবরার মতো। কাজ নেই, কথা নেই, চোখ বোজা নেই, নড়াচড়া নেই; কোনো কথা সে ভাবছিল বলে মনেও হচ্ছিল না।কী রকম মানুষ তুমি!বসে তো রয়েছি শুধু।এতে আমার ঢের অস্বস্তি।কী করতে হবে তাহলে?চলে যাও।ঘুমোবে এখন?মুখে নুড়ো ঠেলে দেব আমি বেহায়া মড়াদের! ঘুমোবে? ঘুমোবে? রাত তিনটের সময়—কেঁদে ফেলল হয়তো উৎপলা। কিন্তু তবুও সে তো বালিকা বধু নয়—প্রায় তিরিশ পেরিয়ে গেছে। মাল্যবান একটা দমে যাওয়া নিঃশ্বাস ফেলে বললে, যা–ই।একটু পরে ফিরে তাকিয়ে চড় খেয়ে সেঁটে চড়িয়ে দেবার মতো গলায় উৎপলা বললে, তবুও বসে রইলে!কৈ, তোমার চোখেও তো ঘুম নেই আর।তোমার জিভে আছে; নিচে নেমে যাও শীগগির; যাও—নামো—যাচ্ছি, কিন্তু রাত তো ফুরিয়ে গিয়েছিল প্রায়।উৎপলা বিছানার ওপর উঠে বসল। এবার সে কথা বলবে না আর, একটা বিষম-কিছু করে বসবে মনে হল। কিন্তু মাল্যবান নিজের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল; উত্তরপক্ষ কী করছে না করছে দেখল না সে, চোখেই পড়ল না তার কিছু। বললে মাল্যবান, কাল বিশে অঘ্রাণ গেল; ঠিক এই অঘ্রাণ মাসের বিশ তারিখে আমার জন্ম হয়েছিল। তোমাকে হয়তো এক-আধবার বলেছি—মনে আছে তোমার? নিজেরি বলি কিছু মনে থাকে না। এই দিনটায় ঢের ভাববার কথা ছিল; বেয়াল্লিশটা বছর চলে গেল জীবনে। সুবাতাস আর কুবাতাসের কত কাটাকাটি হল। কাটাকাটি এখনও চলছে চলবে যে পর্যন্ত না মাটিতে মাথা রাখি। কিন্তু লালকমল নীলকমল কালোবাতাস সাদাবাতাস মনপবন আর চাঁদের বুড়ি মিলে কেমন যেন অপার্থিব করে তুলেছে জীবনটাকে। আমি মাটির মানুষ তো—মাটি ছাড়া টাল সামলতে পারব না–হাওয়ার চেয়ে সোনার শরীর ভালো, তার চেয়ে মাটির শরীর; চালে গুড়ে, নারকোলের ঝঝে, কপ্পূরে ফোঁপড়ায় নবান্নের গন্ধে নবান্নের মতো। তুমি আর আমি; তোমার কাছে এসেছি তাই। বসেছি তাই। দাও, দেবে না?একেবারেই দিতে যে না পারে উৎপলা তাও নয়, দিয়েছে মাঝে মাঝে, গোড়ার দিকে খুব মন মজিয়েও দিয়েছে বটে, কিন্তু তারপরে টান কমে গেছে, খুব বেশি কমে গেছে—দুদিক থেকে সমান অনুপাতে যদিও নয়;-উৎপলা জানে সব; মাল্যবানও জানে দাম্পত্যজীবনের অনেকগুলো দিক না হলেও চলে আজ উৎপলার, শাড়ি গয়না খাওয়া-দাওয়া আরাম-বিরাম ফেলা-ছড়া বিলাস-স্বাধীনতা হলেই হল তার, মাল্যবানের কিন্তু কোনো কোনো বিশেষ দিক এখনও চাই-ই যেন, অনেক দিনের ভেতরে এক-আধ দিন অন্তত চাই, মাটির দিকটাই চাই, সোনার দিকটাও নয়, মাটিই চাই, কিন্তু নিজের সোনার ঝিলিক মাঝে-মাঝে মাল্যবানকে দেখালেও গত পাঁচ ছয় বছর ধরে মাটির সঙ্গে কোনো যোগ নেই উৎপলার—সে তো আকাশের মেঘ জলভরানত নীল মেঘ নয়—সাদা কড়কড়ে মেঘ-দূরতম আকাশের।উৎপলা চুলের সিথি অব্দি লেপ টেনে শুয়ে পড়ল। মাথায় রক্ত উঠেছিল তার, কিন্তু মাথাটা ঠাণ্ডা রাখতে হবে—ঘুমোতে হবে। নায়েব গোমস্তা চাকর বাকর রাক্ষস খোক্ষস লালকমল নীলকমল ভ্যাক-ভ্যাক করেছে—তার ভেতর সে ঘুমিয়ে পড়েছে—এরকম ব্যাপার কতবার তো ঘটেছে তার জীবনে। আজো ঘুমোতে হবে।আজ বিশে অঘ্রাণ, মাল্যবান বললে, পিতৃলোক মাতৃগণ মিলে জন্ম তো দিলেন; ঢের ভালো ব্যবহার হতে তো পারে জীবনের; তা হয়েছে? হয়নি? হবে? বোঝা কঠিন; মাঝে-মাঝে তুচ্ছ বেনে-বৌ পাখির চেয়েও বেশি বনেতি বলে মনে হয় সব; খাচ্ছি দাচ্ছি সংসারের বেনেগিরি করছি। আছে অনেক ফাঁক, আলো, নানা রকম বড়ো আকাশ ঘাস ও-সব পাখিদেরও; কিন্তু সালতামামি আর সালপাহলির গোলকধাঁধা ছাড়া কিছু কি আছে মানুষের?….এই সব, আরো অনেক সব বলতে চাইল মাল্যবান; কিন্তু বলাটা তার না হল সাহিত্যের ভাষা না হল নিজেদের মুখের ভাষা; মানুষের জল রক্ত অশ্রু ঘামের মধুসুধার ভাষা তো এরকম নয়। মাল্যবান টের পেল। এবারে সে না সাজিয়ে গুছিয়ে একেবারে রক্ত ঘাম সুধা স্বাভাবিক প্রাণের ভাষায় কথা বলবে। কিছুক্ষণ দেঁতো কথা ছেঁদো কথার পর সত্যিই যখন বারোয়ারী,বাজার বাসরঘরের কথা মুখে এল তার, নাক ডাকার শব্দ শুনে মাল্যবান টের পেল উৎপলাকে নিয়ে তার চলবে না কিছুতেই, তবুও চালাতে হবে মৃত্যু পর্যন্তই। বাংলাদেশের শতকরা নব্বই জন স্বামী-স্ত্রীর জীবনেই এই নিস্ফলতা, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই স্বামী-স্ত্রীরাই সেটা ঠিক মাল্যবানের মতো উপলব্ধি করতে পারে না; যেসব স্ত্রী-স্বামীরা সেটা করে, একটা ভাঙা গেলাসের কাচগুলোকে জড়ো করে জোড়াতাড়া দিয়ে প্রত্যেকবারই জল খেতে হয় তাদের : নারী-পুরুষের সম্বন্ধ স্বামী-স্ত্রী ব্যাপার বিয়ে জিনিসটা শ্রেষ্ঠ কারিগরের কাচের গেলাসের মতো সহজ ও কঠিন; ভাঙবেই; জল খেতে হবেই; একটার বেশি গেলাস কাউকে দেওয়া হবে না; সে যদি তা জোর করে বা চুরি করে নেয় সেটা অসামাজিকতা হল। দর্শনী বিজ্ঞানীরা মাথা ঘামিয়ে বিয়ে রদ, বিয়ে খণ্ডন করে আবার বিয়ে, যদৃচ্ছা বিয়ে করবার কথা পেড়ে যাচ্ছেন বটে, কিন্তু টাকাওয়ালা জাতিগুলোর টাকাওয়ালা মানুষদের সম্পর্কে এ-সব সমাধানের কিছু কিছু মানে থাকলেও বেশি কোনো মানে নেই, মাল্যবানদের মতো গরীবজাতির গরীবদের পক্ষে কোনো মানেই নেই কেবলি বিয়ে-খণ্ডন ও যদৃচ্ছা বিয়ের। গরীব জাতিদের সমাজগুলো মজন্তালি সরকারের মতো হেসে পেট ফাটিয়েই মরে যাবে কেবলি বিয়ে খসিয়ে নতুন বিয়ে-সম্পর্কের ভেতর মানুষকে ঢুকে পড়তে দেখলে, কিংবা বিবাহসম্পর্ক তুলে দিয়ে মেয়েপুরুষের স্বাধীন সেয়ানা মেলামেশায় রাষ্ট্রকে হিতার্থী বিজ্ঞানধর্মী পরিচালক হিসেবে ঘুরে বেড়াতে দেখলে। সেয়ানা স্বাধীন মেলমেশার অন্ত খুঁজে পাবে কি বিজ্ঞান—আকাশের তারা পাতালের বালি যদিও গুণে ঠিক করেছে বিজ্ঞান। সেয়ানা স্বাধীন মেলামেশার কল্যাণের অন্ত খুঁজে পাবে হিতার্থ বিজ্ঞানী রাষ্ট্র? কোনোদিনও না। কিন্তু সেরকম হিতার্থ বিজ্ঞানী রাষ্ট্রই বা আসছে কোথায়? কোনো দিকেই না। খুব। একটা গরীব জাতের গরীব মানুষ মাল্যবান। তার চেয়ে ঢের দুঃস্থ নিষ্পেষিত মানুষ আছে; তাদের অবস্থা আরো ঢের খারাপ—কিন্তু তাদের পেটের সমস্যা এ-স সমস্যাকে অনেকটা চেপে রেখেছে; এ-সব সমস্যার সমাধানেও তাদের সেই বেপরোয়া বা মরিয়া বা সাহসিক স্বচ্ছলতা আছে—যেমন অন্য এক হিসেবে উঁচু শ্রেণীর ভেতরে আছে। কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে মাল্যবানের মতো মধ্যশ্রেণীর মানুষদের নিয়ে। মাল্যবান কি নিম্নমধ্যশ্রেণীর—না, মধ্যমধ্যশ্রেণীর? খুব সম্ভব নিম্নমধ্য বিভাগের লোক সে। কিন্তু সমস্যাটা সমস্ত মধ্য শ্রোণীতে কেমন দুর্বিসহভাবে পরিব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে, অথচ বাঙালী মধ্যশ্রেণীরা অন্তত ভাতকাপড় পেলে কেমন সুখে শান্তিতে ঘরকন্না করতে পারে দেখবার জিনিস। স্বামী-স্ত্রীর সম্বন্ধ তো দূরের কথা—স্ত্রী-পুরুষের সম্বন্ধ সম্পর্কেও সৃষ্টির কারণকরণশালিকার ভেতর কোনো সুখশান্তির নির্দেশ নেই তো। কিন্তু বাঙালী স্বামী-স্ত্রীদের প্রেম ও যৌন জীবনে সুখ আছে, শান্তি আছে শতকরা একশো জনেরই তো : ভাবছিল মাল্যবান একটু বিষণ্ণ শ্লেষে হেসে উঠে। উৎপলা শীত রাতের কী এক পরমত্বের ভেতর ডুবে গিয়ে নাক ডাকাচ্ছে—মাল্যবানকে কেমন সহজ দিব্যােয় বিদায় দিয়ে, অথচ মাল্যবানকে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে, রুচির বিরুদ্ধে অপ্রেমে, কামনার টানে, বেশি লালসায় রিরংসায় উৎপলার মতন একজন ভালো বংশের সুন্দর শরীরের নিচু কাণ্ডজ্ঞানের নিরেস মেয়েমানুষের কাছে ঘুরে-ফিরে আসতে হবে নিজের মৃত্যু পর্যন্ত কী নিদারুণ ভাবে, কেমন অধমের মতো, কেমন হাতে পায়ে ধরে মেয়েটির কখনো-বা ঘরের শান্তি কখনো-বা বাইরের সুনাম রক্ষা করবার জন্যে, কখনো-বা লালসা অতিকিচিৎ প্রণয় এসে উৎপলার দিকে মাল্যবানকে হিঁচড়ে টানছে বলে।আকাশে অনেক তারা, বাইরে অনেক শীত, ঘরের ভেতর প্রচুর নিঃশব্দতা, সময়ের কালো শেরওয়ানীর গন্ধের মতো অন্ধকার; বাইরে শিশির পড়ার শব্দ, না কি সময় বয়ে যাচ্ছে; কোথাও বালুঘড়ি নেই, সেই বালুঘড়ির ঝিরিঝিরি শিরি-শিরি ঝিরিঝিরি শব্দ : উৎপলার ঠাণ্ডা সমুদ্রশঙ্খের মতো কান থেকে ঠিকরে–মাল্যবানের অন্তরাত্মায়।
দোতলার ঘরটার লাগাও বাথরুম ছিল। বাথরুমটার থেকে বেরিয়ে বেশ খানিকটা ছাদ পাওয়া যায়। সমস্ত ছাদটা বড়ো মন্দ নয়। কিন্তু অন্য ভাড়াটে পরিবারটি ছাদের বেশির ভাগটাই প্রায় নিজেদের জন্য আলাদা করে রেখে দেওয়া দরকার মনে করেছে। কয়েকটা বেশ সুন্দর সবুজ তাণ্ডুলিন টাঙিয়ে চমৎকার একটা পার্টিশন করা হয়েছে। পার্টিশনের ওদিকে থাকে ওরা; এদিকে একটা ডেকচেয়ার, গোটা-দুই বেতের চেয়ার, তেপয়, জলচকি, সেলাইয়ের কল, মনুর পড়াশুনার বই। কোনো তিন বা একটা হারমোনিয়ম বা সেতার নিয়ে সমস্ত সকালবেলাটা গড়িমসি করে কাটিয়ে দিল উৎপলা।এ-জায়গাটা তার খুব ভালো লাগে।দুপুরবেলা রোদ খুব চড়চড় করে ওঠে বলে খানিকটা সময় বাধ্য হয়ে তাকে ঘটে। ভেতর থাকতে হয়। কিন্তু সূর্যটা যেই একটু হেলে পড়তে থাকে তার্পুলিনের ছায়ায় ডেকচেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে গিয়ে উৎপলা: গুন গুন করে, অথবা সেলাই; পড়ে নভেল, মনুকে পড়ায়, এস্রাজ বাজায়।মাল্যবান সন্ধের সময় মাঝেমাঝে ছাদে আসে; একটা চেয়ারে এসে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। মাঝেমাঝে মনুকে ডেকে ইতিহাস ভূগোল পৃথিবীর কথা ধর্মের কথা মনুষ্যত্ব মানুষের জীবনের মানে—প্রথম মানে—মাঝারি মানে—বিশেষ করে অন্তিম অর্থ সম্পর্কে অনেক জিনিস একে একে শেখাতে যায় সে। মেয়েটির সব সময়ই সে-সব ভালো লাগে না—মেয়েটিও ভালা লাগে না মাল্যবানের; কিন্তু অনেক সময়ই মেয়েটি খুব নিরিবিলি শোনে; ভাসা ভরা চোথ তুলে কীভাবে কেউ কি তা বলতে পারে। উৎপলা বলে : মেয়েটা একেবারে বাপের গোঁ পেয়েছে। শুনে ভালো লাগে মনুর। কিন্তু নিজে মাল্যবান মেয়েকে যে মাত্রাতিরক্ত ভালোবাসে তা নয়; স্ত্রীর জন্যও প্রমাণ শ্রদ্ধা ভালোবাসা রয়েছে তার। কিন্তু এদের জন্যই সে প্রাণে বেঁচে ফির সার্থক হয়ে রয়েছে; সে কথা ভাবা হয়তো ভুল। মনটা তার অনেক সময়ই একটা মুনিয়ার বা মেঠো ইঁদুরের মতো আকাশে আকাশে ফসলে ফসলে ভেসে যেতে চায়। বেশিক্ষণ এ-ছাদে বসে না সে; ধুতি চাদর পরে বেরিয়ে যায়—ময়দানে গেলেই ভালো হত; কিন্তু গোলদীঘিতেই যায়; ছড়ি হাতে করে অনেক রাত অব্দি পাক খায় সে—অনেক কথা ভাবে—কেরানীর ডেস্ক ও উৎপলার স্বামীত্ব থেকে নিজেকে ঘুচিয়ে—(কিন্তু কোনোটাই খুব নির্বিশেষে দানা বাঁধা নয়)—সে অনেক রকম আলতো জীবন যাপন করে। তারপর অবসন্ন হয়ে একটা বেঞ্চিতে গিয়ে, একটা চুরুট জ্বালায়; ক্ষিদে পায়; বাড়িতে ফিরে আসে।দোতলার বাথরুমে মাল্যবানকে চান করতে দেয় না উৎপলা।অফিসে যাবার সময় সাত-তাড়াতাড়ি চান করে তুমি জল ময়লা করে ফেল—তুমি বাপু নিচের চৌবাচ্চায়ই নাইবে—কিন্তু যে-দিন অফিস নেই?হা, সে-দিনও।অতএব নিচেই চান করে মাল্যবান। এক-একদিন তবু গামছা কাপড় নিয়ে দোতলার স্নানের ঘরের দিকে যায়।এক টব আন্দাজ জল ধরে রেখেছি-ও-সব ফুরিয়ে যাবে–এখনও তো কলে জল আছে। বলে মাল্যবান।এই তো এখুনি মনু চান করতে যাবে।আচ্ছা, বেশ, সে তৈরি হয়ে নিক, ওর মধ্যেই আমার হয়ে যাবে।নিচের চৌবাচ্চার কী হল?কেন, পাশের ভাড়াটেরাও তো সেখানে চান করে না, দোতলায় তাদের একটা বাথরুম আছে, সেখানেই তো তাদের সকলের কুলিয়ে যায়।আরে বাবা, ঢেঁকির সঙ্গে তর্ক। তাদের তো পুকুরের মতো বাথরুম। তাদের আর আমাদের।লোকও তো তাদের অনেক; কিন্তু নিচের চৌবাচ্চায় তবুও তো কেউ চান করতে যায় না।ওদের বাড়িতে পুরুষ মানুষ আছে যে যাবে? যে-কটি আছে, তাও তো মেয়েদের পাশে-পাশে ফেরে। না হলে মেয়েমানুষের গোসলখানায় কখনো মিনসেরা ঢোকে?মাল্যবান একটু উইঢুই করে নিচের চৌবাবচ্চায় চলে গেল।একদিন আবার স্নানের সময় উৎপলাকে বললে, দেখ, নিচের জল বড়ো ঠাণ্ডা।এত শীতে জল গরম পাবে কোথায় তুমি। বললে উৎপলা, ঠাকুরই তো রয়েছে, তাকে দিয়ে এক কেটলি জল গরম করিয়ে নিতে পার না?তা পারি বটে, মাল্যবাণ অবসর মতো একটু ভেবে নিয়ে বললে, কিন্তু ও-রকমভাবে গরম জলে চান করলে বড্ড বদ অভ্যেস হয়ে যায়। শরীর ও খারাপ হয়।কী চাও তাহলে।তোমাদের টবের জল আমি একটুও ছোঁব না, ট্যাপের নিচে একটু বসব।দিক কোরো না বাপু, মনু এই চানে যাচ্ছে–তা আসুক না, আমার সঙ্গেই আসুক।তোমার সঙ্গে আসবে!উৎপলার চোখ দুটো পাক খেয়ে ঠিকরে উঠল, বুড়ো বাড়ির দেইজিপনা দেখ। না, না, ও-সব হবে না। নিচে যাও–নিচে যাও তুমি?এই কথা বলো তুমি?মাল্যবান একটু চুপ করে দাঁড়িয়ে নিচে চলে গেল। অফিস যাওয়া পর্যন্ত স্ত্রীর সঙ্গে একটা কথা বলতে গেল না—অফিস থেকে ফিরে এসেও না। কিন্তু দেখা গেল তাতে কারুরই কিছু এসে যায় না। কাজেই বাধ্য হয়ে তাকে আড়ি ভাঙতে হল। আড়ি ভাঙতে গিয়েও দেখে স্ত্রীর মানই বেশি। কাজেই আড় ভাঙবারও প্রয়োজন হয়ে পড়ল।মাল্যবানের তবুও পথ কাটা হয় না।ছুটির দিন একদিন বললে, নাঃ, নিচে আমি আর চান করতে পারব না।উৎপলা সে-কথায় কানও দিতে গেল না।পঁচিশ দিনের মধ্যে একদিনও যদি জল বদলানো হয় নিচের চৌবাচ্চার। পচা জলে চান করে অসুখ করবে আমার।শলগ্রামের কথা শোনো, উৎপলা বললে, কানে ধরে কাজ করিয়ে না নিলে পচা জল বেনো জল সাত ঘাটের জল এসে খায় মানুষকে। চোখ কান বুজে ঠাকুর-চাকরের ঘাড়ে চান করা চলে কি? ফাঁকি দেওয়ার অভ্যেস তো ওদের আঁতুরের থেকে। জল কেন বদলাবে, কী দায় ওদের!আমি নিজে তবে বাসি জল খালাস করে চৌবাচ্চায় ঝাড়ু লাগাব রোজ? নতুন। জল রাখব?চাকরকে নাই দিলে তাই করতে হয়। এটা তো কোনো অপমানের কাজ নয়—উৎপলা সেলাই করতে করতে বললে, তোমার নিজেরই তো সুবিধে।কিন্তু এ-দু-বাড়ির এত চাকর-ঝির সামনে চৌবাচ্চার বাসি জল নিকেশ করব আমি চৌবাচ্চার ছ্যাঁদার ন্যাতা খসিয়ে? মাল্যবান পায়চারি করতে করতে থেমে দাঁড়িয়ে একটু বিলোড়িত হতে উঠে বললে।খসাবে তো।ঝিগুলো দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে হাসবে?কেন, বলো তো? এরকম হ্যাংলা ঝি কোথায় দেখলে তুমি!আমি দেখেছি। তুমি দেখবে কী করে! সংসারের তুমি বড়ো জান কি না। কত রকম জীব আছে! কী দেখেছ তুমি!থাক, ও-সব জেনে আমার কী দরকার!মাল্যবান বললে, তাই বুঝি? সংসারের বার তুমি?উৎপলা শেমিজ টাকতে-টাকতে কোনো উত্তর দিল না।এই যে আমি নিচে চান করি, মাল্যবান আবার পায়চারি করতে করতে বললে, তুমি মনে কর এতে তোমার খুব নামডাক?উৎপলা ঠোঁটের ভেতর সূঁচ গুঁজে শেমিজটা নেড়ে-চেড়ে দেখছিল; বললে, বড্ড ছিঁচকে তুমি।আমি?একটা কথা নিয়ে এত বাড়াতে পার–ওপরে কল রয়েছে, বাথরুম রয়েছে, অথচ আমি চৌবাচ্চায় চাকর-বাকরদের মতো নিদের পর দিন চান করি—ও-দিকের ভাড়াটেরাই বা কী মনে করে।উৎপলা ঠোঁটের থেকে সূঁচ নামিয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললে, এ সব ন্যাকড়া তারা দেখতেও যায় না। বড়ো মন নিয়ে পৃথিবীতে জন্মেছে। একটা ঢ্যাঙা মিনসেকে চৌবাচ্চায় সামনে দাঁড়াতে দেখলেই তারা হেসে শুয়ে পড়বে? নিজের বাপকে দেখে চোখ ওল্টাবে?মাল্যবান পায়চারি করতে করতে এক জায়গায় থেমে দাঁড়িয়ে বললে, সে-দিন শুনলাম মেজগিন্নি বলছেন, চাকরবাকরদের চৌবাচ্চায় কেরাণীবাবুটি চান করেন, জল না-কি কলকাতায় সোনার-দরে বিকোয় নাকি মেজদি—এই সব, এই সব, ছ্যাঃ, শুনে চন করে উঠে মাথার নোম খাড়া হয়ে পড়ে—কে বলছিল এই কথা?মেজোঠাকরুণ।তা সৎগুষ্টির মেয়ে তো এই রকমই বলবে।ঠিকই তো বলেছিল।ঠিকই যদি বলেছিল, তুমি মুখে কোঁচা গুঁজে চোরের মত চলে এলে যে!আমি কী করতে পারি। পরের বাড়ির ঝি-বৌদের সঙ্গে ঝগড়া করতে যাব? কী বল তুমি, উৎপলা?উৎপলা সেলাই করে চলেছিল, চটা আবার ঠোঁটে-দাঁতে আটকে নিয়েছে, বললে, পরের বাড়ির বৌ তো বললে, কিন্তু পরের বাড়ির ভাতার-ভাসুরদের শুনিয়ে যারা এই রকম কথা বলে—মুখের কথা না শেষ করে থেমে গেল উৎপলা।মাল্যবান এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়েছিল, একটা ছেড়া তেলেময়লায় ঘামনো-চোবানো কৌচে বসল সে, আস্তে আস্তে বললে, যাক। আসল কথা হচ্ছে এক গা নোম নিয়ে খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে বৌ-ঝিদের আনাগোনা চোখমারা মুখটেপার ভেতর চান করতে জুৎ লাগছে না আমার। এক-একটা বৌ ওপরে রেলিঙে ভর দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আমার চান দেখে; যেন শিবলিঙ্গের কাকন হচ্ছে—সমুদ্রস্নান হচ্ছে।উৎপলা কল চালাতে চালাতে বললে, তাহলে কি বলতে চাও, দরজা-জানালা বন্ধ করে এক হাত ঘোমটা টেনে তুমি ওপরের বাথরুমে গিয়ে ঢুকবে আর মেয়েমানুষ হয়ে আমি নিচের চৌবাচ্চায় যাব—ওপরের বারান্দায় ভিড় জমিয়ে দিয়ে ওদের মিনসেগুলোকে কামিখ্যে দেখিয়ে দিতে?না, তা কেন? ছেড়া সেটির ছারপোকার কামড় খেতে খেতে একটা বেশি কামড়ে যেন অস্বস্তি বোধ করে মাল্যবান বললে।হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেই রকম হলেই তো ভালো হত।আমার কথাটা তুমি বুঝলে না।আরে বাবা, সব বুঝি আমি। দেখেছি অনেক জমিদারের ছেলেদের আমি, আঘন পোষের শীতে একটা পুকুর-ডোবা পেলেই ঝাঁপিয়ে জাপটে চান করছে। চোখ জুড়িয়ে গেছে দেখে। এক ফোঁটা জলের জন্য মেয়েমানুষের কাছে এসে হামলা!মাল্যবান উশখুশ করে উঠে গেল।ছুটির দিন ছিল। চৌবাচ্চা ছাড়া আরো অনেক কথা বলবার ছিল। কিন্তু বলবে কাকে? শোনবার লোক কই? অনুভুতির সমতা নেই, সরসতা নেই; ছাদে খানিকক্ষণ চুইমুই চুইমুই করে হেঁটে থেমে—বসে থেকে মাল্যবান ঘরের ভেতর ঢুকল। একটা চেয়ারে বসে বললে, জীবনের সাতাশ-আটাশ বছর আমিও তো পুকুরে চান করেছি।বেশ করেছ।জমিদারের ছেলেদের কথা বললে কিনা। কিন্তু কলকাতায় পুকুর পাব কোথায় বলো তো দেখি।চৌবাচ্চাই কলকাতার পুকুর।বলেছ। কিন্তু গামছা পরে চান করতে হয়—চারদিকে মেয়েরা থাকে—হাঁচতে কাশতে রূপও বেরিয়ে পড়ে রূপলালবাবুর। মেয়েরা হেঁসেলের ছ্যাচড়া পুড়িয়ে আড়ি পেতে থাকে রূপলালবাবুকে দেখবার জন্য। হেঁসেলে দুধ ধরে যায়—গায়ে গায়ে ঠাসঠাসি মাছপাতরি হয়ে রূপই দেখে মেয়েরা রূপসাগরেরমাল্যবান আস্তে আস্তে নিচে নেমে গেল। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবল: আজ অফিস ছুটি ছিল, কথা বলবার ছিল ঢের, কিন্তু উৎপলা মনে করবে, ঝুড়ি খুলে বসেছি—পুরুষমানুষ হয়ে। মেয়েমানুষ—পুরুষমানুষের অন্তঃসার ও ইতিকর্তব্য সম্বন্ধে ধারণাও বটে এই মেয়েটির! কোথায় পেল সে এ ধারণা? কে শিক্ষা দিয়েছে তাকে? অপ্রেম-হয়তো অপ্রেমই শিখিয়েছে উৎপলাকে।একটা চুরুট জ্বালিয়ে মাল্যবান ভাবল, পুরুষমানুষ হয়ে এসব মেয়েদের কাছে জীবনের বড়ো বড়ো হোমদড়াম কথা ছাড়া কোনো মিহি কথা বলতে যাওয়া ভুল। কোনোদিন যদি তারা সেধে শুনতে আসে সেই অপেক্ষায় থাকতে হয়। সেটা সুফলা জিনিস হয়। হয়? চুরুটে কয়েকবার টান দিয়েই মাল্যবান ভাবল : কিন্তু সেরকম ভাবে উৎপলা আসবে না কোনোদিন। বারোটা বছর তো দেখা গেল। এই স্ত্রীলোকটি মিষ্টি হোক, বিষ হোক, ঠাণ্ডা হোক, আমার জীবনের রাখা ঢাকা সবুজ বনে আতার ক্ষীরের মতো কথাগুলো অতার ক্ষীরের মতো কথাগুলো শুনতে আসবে সে-পাখি ও নয়। ওর চেহারা যদি কালো, খারাপ হত, তাহলে তো চামারের মেয়েরও অযোগ্য হত। একটা মোদ্দাফরাসকে নিয়ে ঘর করছি আতাবনের পাখির মতো নেই সেই পাখিনীকে চেয়ে আমি—কিন্তু নিজের চিন্তাধারণা ও উপমার কেমন একটা আলঙ্কারিক অসহজতায়— অস্বাভাবিকতায়ও বিরক্ত বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠল মাল্যবানের মন। জিনিসটা ঠিক এই রকম নয়—অন্য একরকম। কিন্তু কী রকম? যে রকমই হোক, কোনো সহজ স্বাদ নেই জীবনে—খাওয়া দাওয়া শোয়া ঘুমোনোর স্থূল স্বাদগুলোকে সূক্ষ্ম হতে চেয়ে গোলমাল করে ফেলল।
তোমার মাইনে তো আড়াই শো টাকা হল—এখন একটা কেলেঙ্কারি ঘোচাও তো।কী করতে হবে?ছাদে পাৎপিঁড়ি পেতে খাওয়ার পক্ষপাতী আমি নই। উৎপলা বললে।দিব্যি তো গায়ে বাতাস লাগিয়ে আলোয় আলোয় মাছের কাঁটা বেছে খাওয়া হয়, মাল্যবান যেন নাকের আগায় চশমা ঝুলছে তার, এম্নিভাবে, একদৃষ্টে, সনির্বন্ধতায় উৎপলার দিকে তাকিয়ে বললে, আন্ধি ঘুপসির থেকে বাঁচোয়া না ছাদের আলোয়? ছাদে খাওয়াটা তো বেশ। আমার তো বেশ ভালো লাগে।ছাদটা একটা আস্তাকুঁড় হয়ে থাকেসে আর কতক্ষণ?নিজে তো অফিসের মখে দিব্যি চাকলা গিয়ে হুট করে গাছের মাথায় চড় গিয়ে কিনা–কী দিয়ে কী হয়-ঝামেলা হামলা আমি একা বসে পোয়াই আর কী।এঁটো গড়াতে থাকে অনেকক্ষণ?ঠাকুরের সঙ্গে ঝি পীরিত করবে, ঝির হাতে ঠাকুর খইনি টিপবে— তারপরে তো এঁটোর কথা মনে পড়ে—এই রকম? মাল্যবান মুখে দু-একটা কালমেঘ ঘনিয়ে এনে বললে, কতক্ষণ ফেলে রাখে? দু-তিনঘণ্টা? একটু চুপ থেকে মাল্যবান বললে বড়ো বেয়াদব তা হলে আবার খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে কথা ভেবে ঠিক করে নিয়ে মাল্যবান বললে, এ-ঝিটাকে উঠিয়ে দিলে হয়।না, সে সবের কোনো দরকার নেই।এই না বললে ঠাকুরের সাথে পীরিত করে?তা করুক, আমাদের তাতে ক্ষতি কী?কিন্তু সে সব ভালা নয় তো।আমাদের কাজ নিয়ে কথা; ওদের অন্তর্জলীর ভেতর নাক ঢোকাতে যাব কেন?কিন্তু ভাদুরানীর স্বামী রয়েছে—তবুও ঠাকুরের সঙ্গে এই রকম।তুমি তো আচ্ছা বেকুব দেখছি।কেন?ছোটো জাতের ভেতর কত রকম কাণ্ড হয়।ছোটো জাত? ভাদরানী তো বামুনের মেয়ে।তা হবে। বেশ তো–ঠাকুরও তো বামুন—ঠাকুরও বামুন মাল্যবানের কাছে ব্যাপারটা এক মুহূর্তের জন্য চীনে প্রবাদের মতো সরল অথচ কঠিন, কঠিন অথচ সরল বলে মনে হল। কী যে এই সহজ ব্যাপারটা কী এর মানে কিছুই ঠাহর করে উঠতে পারল না। তামাকের ধোঁয়ায় নোংরা দাঁতগুলো বের করে—সেই দাঁতগুলোর মতো আকাট অবর্ণনীয়তায় উৎপলার দিকে তাকিয়ে রইল সে।ছাদে না খেয়ে এখন থেকে ছাদের উত্তরদিকের ঘরটায় খেলে হয়— বেশ ফটফটে ঝরঝরে ঘরটা—কিন্তু ওটা তো ও-ভাড়াটেদের—না গো, ওরা ও-ঘরটা ছেড়ে দিয়েছে।কবে ছেড়ে দিল?কাল।মাল্যবান একটু ভেবে বললে, ওটার ভাড়া তো কম হবে না–পঁচিশ টাকা চায়—আমি বলে-কয়ে কুড়ি টাকা করতে পারব। বলে একটু ঝিকমিক করে হেসে মাল্যবানের দিকে তাকাল।মাল্যবান ভুরু উঁচকে বললে, কুড়ি টাকা অতিরিক্ত খরচ আবার।কিন্তু তোমার মাইনেও তো বেড়েছে।কিন্তু দশ রকম খরচও তো বেড়েছে। এটা আবার কেন?কিন্তু ছাদে খাওয়া অসম্ভব–মাল্যবান ভাবছিল; নাকের আগায় যেন তার চশমা ঝুলে পড়েছে, এরকম কেমন এক অথই শূন্যতার ভেতর থেকে নিশ্চুপ একনিষ্ঠতায় ও সনিবন্ধতায় উৎপলার দিকে। তাকিয়ে।খেয়ে উঠতে না-উঠতেই কাক চড়াই এসে সমস্ত এঁটো চারদিকে ছড়াবে, ছাদে যে কাপড়গুলো শুকোতে দিই তার ওপর মাছের কাটা, আলু মশলার হলুদের ছোপ, পাখির বিষ্ঠা; রাধার কলঙ্কের চেয়ে কেষ্টোর কলঙ্ক বেশি: কাঁকড়ার গাঁধি চিংড়ির দাঁড়া ছিবড়ে পিঁপড়ে মাছি সমস্ত ছাদে মই-মই করছে রে বাবা!রান্না ঘরে গিয়ে খেলে হয় না?উৎপলা ডান হাতের চাটি মেরে বাঁ গালের জুলপির ভেতরে একটা মশা না কী পিষে ফেলে বললে, কুঁড়ি টাকা ভাড়া যাচ্ছে, ঝনাৎ করে টাকাটা ফেলে দেবে, না কি ফড়ের মতো কথা বলছ তুমি। রান্নাঘর হয়ে এসেছে কোনো দিন?না, কী আছে ওখানে?আমার বাজু আছে আর তোমার পায়ের মল।এক সারি ননাংরা দাঁত কেলিয়েই মুখ বুজে ফেলল তৎক্ষণাৎ মাল্যবান; হাসল এক ঝিলিক, না, নাক সিটকাল বুঝতে পারা গেল না।ছাদের উত্তরের দিকের ঘরটা ভাড়া করা গেল। চুণকাম করা ধবধবে সুন্দর দেয়াল, নতুন সবুজ রঙ মাখানো জানালা দরজা–দিব্যি।তোমার মেজোশালার তত কলকাতায় আসবার কথা; যদি আসে, তাহলে এই ঘরটায় আমি আর মনু থাকতে পারি-বড়ো ঘরটা তাদের ছেড়ে দিতে পারি।মাল্যবান ঠোঁটের ওপর ছাঁটা গ্যাঁজে আঙুল বুলিয়ে কথা ভেবে নিচ্ছিল কোনো উত্তর দিল না।আপাতত একটা লম্বা টেবিল এই ঘরটার মাঝখানে এনে রাখা হল— চারদিকে তিন-চারটে চেয়ার। সকালের চায়ের ধেকে শুরু করে রাতের খাওয়া অব্দি সবই এই টেবিলে চলছিল।উৎপলা একদিন একটা চিলতি চিঠি পড়েতে পড়তে বললে, মেজদা আসবেন।কবে?আসতে অবিশ্যি দেরি আছে।এ-মাসে?চিরকুটটা রেখে দিয়ে উৎপলা বললে, মাস-দেড়েকের মধ্যেই; পরিবার নিয়ে।মেজোশালার ছেলেমেয়ে কটি?তিনটি।তিনটিই তো বেশ বড়ো-বড়ো।হ্যাঁ।তাহলে জায়গার টানাটানি হবে তো।ঐ খাবার ঘরটায় গিয়ে আমরা থাকব।তুমি আর মনু?আমরা দুজন তো বটেই, উৎপলা সমীচীন কচ্ছপের চাড়ার মতো কঠিন একটা ভাব দেখিয়ে তবুও বললে তুমিও আসতে পার দেখি কী হয়।মাল্যবান খুব অগ্রহে একটা কথা পাড়তে গিয়ে নিজেকে শুধরে নিয়ে অন্য কথা পেড়ে বললে, অতটুকু ঘরে তিনজন কী করে আঁটবে?তা আমি বন্দোবস্ত করে দেব। দুটো খাট পড়লেই তো আমাদের তিনটি প্রাণীর হয়ে যায়। আমাদের একটা সেলের মতো ঘর হলেই হয়ে যায়। দেখেছ তো দমদম জেলে।সত্যাগ্রহের আসামী মনে করে একটা বিশৃঙ্খলা ভিড়ের ভেতর থেকে অন্য অনেকের সঙ্গে মাল্যবান ও উৎপলাকে গ্রেপ্তার করে জেলে আটকে রাখা হয়েছিল—দিন দুইমাস ছয়েক আগে।দেখেছি তো, মাল্যবান বললে। কিন্তু দোতলার বড়ো ঘরটায় এতদিন মাল্যবানকে কী—একটা ক্যাম্পখাট অব্দি পাততে দেওয়া হয়নি কেন? না হোক, উৎপলার অত বড়ো খাট মাল্যবানকে শুতে দেওয়া হয়নি কেন?মাল্যবান নিজের দাম্পত্যজীবনের আকাশ প্রমার ব্যর্থতাকে তিল প্রমাণের ভেতর মজিয়ে এনে তিলের ভেতরে তবুও ব্রহ্মাণ্ড দেখতে দেখতে একটু বিষণ্ণ ভাবে হেসে ভাবছিল, কাঁকড়েশ্বরী পরমেশ্বরী, জেলে তো কাঁকড়ার গর্তেও আমাদের এঁটে গেছে, তোমরা মেজদা এলে খাবারের ঘরটায়ই হয়ে যাবে, কিন্তু তুমি আর আমি শুধু থাকি যখন এ-বাড়িতে, দোতলার এই বড়ো ঘরটায় আমর জায়গা হয় না কেন? নিচের ঘরে বকনাবাছুর রামছাগলের কান টানে, কান-টানে না, প্রাণ-টানের খুঁটে আমাকে না বেঁধে রাখলে তোমার রাখালী ঘুমটা পাকে না বুঝি ওপের তলায়?ঠিক হয়ে গেল ছাদের উত্তর দিকের খাবারের ঘরে এরা তিনজনে থাকবে, বাকি দুটো বড়ো-বড়ো ঘরই মেজদা আর তার পরিবারকে ছেড়ে দেবে।মেজোবৌঠান মানুষ মন্দ নয়, উৎপলা বললে, কিন্তু আমি ভাবি মেজদার জন্য। মেজদা একটু সুখী মানুষ কিনা—পদ্মার ইলিশের মতো সুখী বটে তোমার মেজদা।কী রকম?সূর্যের একটা ঝিলিক দেখলেই লাট খেয়ে পড়ে মাছ—আচ্ছা, আচ্ছা, হয়েছে উৎপলা বললে, আমি যা বলছিলাম, একটা আড়ে-দীঘে প্রমাণ ঘর নিজের জন্য না পেলে মেজদার চলবে না।মাল্যবান বললে, ঐ দোতলার বড়ো ঘরটায় তিনি একাই থাকবেন বুঝি? ঘরটা বেশ বড়ো—আলো-হাওয়াও খুব। থাকুন।ঐ ঘরটাই দেব দাদাকে—তোমার বৌঠান থাকবেন কোথায়?তিনিও ঐ ঘরেই।তোমার দাদার সঙ্গেই।শোন কথা, রামকানাইয়ের সঙ্গে তবে?মেজদি তো নিচের ঘরে থাকলেও—বৌঠান নিচের ঘরে থাকবেন? কেন? তোমার খচখচ করছে কোথায়?মাল্যবান বললে, যে-রকম সুখী মানুষ তোমার দাদা তাঁকে একটা ঘর ছেড়ে দিয়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে অন্য এক ঘরে শোবার ব্যবস্থা যদি করেন বৌঠান, তাহলে সারাটা দিন দাদা তো তার কাছে গিয়ে থাকতে পারেন, কিংবা তিনি দাদার কাছে এসে বসতে পারেন। এতে তো কোনো অসুবিধে হয় না কারুকিন্তু রাতের বেলা?তখন অবিশ্যি যে যাঁর ঘরে গিয়ে শোবেন।তা হয় না।কেন?বৌঠান কাছে না থাকলে মেজদার ঘুম হয় না। এ নিয়ে মেজদার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাকে ঠাট্টা করে।ঠাট্টা চলে বটে।কী রকম? বললে উৎপলা। তার মুখের আত্মতুষ্টির ঝিলিক নিভে গেল।কোনো অসুখ আছে মেজদার?কিছু নেই।সুস্থ মানুষ?মেজদা-মেজদি দুজনেই। ওরা এক জোড়! প্রথম থেকেই হয়ে এসেছে। তুমি এখন ভাঙবে?খুব ভালো শাখার ব্যবসায়ী ছিলাম আমি, মাল্যবান একটু হেসে বললে, তোমার হাতও ননীর মতো নরম ছিল, কিন্তু কোনো শাখাই পরাতে পারলাম না কেন?মাল্যবানের কথা উৎপলার কানে অপ্রাসঙ্গিক চরিত্রের স্বগতোক্তির মতো শোনাল। ও-রকম গোপনীয়তার ছায়া মাড়াতে চাইল না যে। শোনেনি যেন মাল্যবানকে, নিজের কথার জের টেনে উৎপলা বললে, এক চিলতি চিঠি এসেছে তো মেজদির কাছ থেকে পণ্ডিচেরী থেকে। দেড়মাস পরে পণ্ডিচারীর থেকে আসবেন মেজদা-মেজদি; ছেলেমেয়েরা পণ্ডিচারী নেই—কাছেই আছে–সেখান থেকে তাদের কুড়িয়ে নিয়ে আসবেন। আমাদের বাড়িঘর চুনকাম করিয়ে নিলে কেমন হয়।মাল্যবান চুপ করে ছিল; তার খুব তাজা কথাটার কোনো উত্তরই দিল না উৎপলা; কথাটা শুনেছে বলেও স্বীকার করল না।জানালা দরজা সব আগে থাকতেই বেশ রঙ করিয়ে নিলে ঠিক হবে। উৎপলা বললে।আমাদের নিজেদের খরচে?তবে আবার কার খরচে? বাড়িওয়ালার?না, না, সে তো তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখবে আর হাসবে!হাসবে?জামাই-এর শালা আসছে বলে শালার বোনাই গরাদে স্বয়ং মাখছে। হাসবে না? চুনকাম রং করিয়ে নিতে খরচের ঠ্যালা আছে। ওসব জিেিনসর দরকারও নেই এখন। দেয়ালগুলো বেশ পরিষ্কার, দরজা-কপাটএ খারাপ নয়। এসব জিনিস নিয়ে মাথা খারাপ করবার মতো বেশি টাকার রস মাল্যবানের নেই এখন; কিন্তু উৎপলাকে কিছু বলতে গেল না সে। বললে বুঝবে না। মেজদা এলে তাকে দিয়ে বলালে বুঝবে। বটে কিংবা মেজদিকে দিয়ে; তাদের মাথা ঠাণ্ডা আছে; প্লাগটাগও বেশ ভালোই কাজ করছে তাদের অন্তরেন্দ্রিয়ের এঞ্জিনের। বেশ চমৎকার দাম্পত্য জীবনই জমিয়ে বসেছে বটো মাল্যবানেরা; কুয়াশার ভেতর থেকে কুয়াশার দিকে তাকিয়ে যেন উৎপলার দিকে তাকিয়ে রইল মাল্যবান।তাহলে এরা দুজনেই এই বড়ো ঘরে থাকবে শোবে?হ্যাঁ।আর ছেলেমেয়েরা?নিচে শোবে।একা-একা নিচে থাকবে?দরজা-জানালা বন্ধ করে দিলে ভয় নেই কিছু।মাল্যবান কুয়াশার দিকে তাকিয়ে বললে, আমি গিয়ে সেখানে শুতে পারি না?ছেলেপুলেদের মধ্যে?হ্যাঁ।উৎপলার মুখের অসাধ দেখা দিল সময়ের শূন্যতার ভেতর একটা ছ্যাঁদার মতো যেন।না, অত আটবে কী করে? অত ঘুজিঘুজিতে ওদের কষ্ট হবে।তাহলে তুমি তো পার শুতে ওদের সঙ্গে। মাল্যবান বললে।আমি অবিশ্যি শুতে পারি গিয়ে। তাই করতে হবে হয়তো। বৌঠান তো রাত হলে ওপরের থেকে আর নামতে পরবেন না।একটা কীর্তনের সুর গাসতে গাইতে উৎপলা ছাদের দিকে চলে গেল। মাল্যবান খানিকটা হতচকিত, আড়ষ্ট, তারপরে অরহিত হয়ে অনেকক্ষণ ঘরের ভেতর বসে রইল। দুটো কীর্তন সাঙ্গ হল; তারপরে মাল্যবানের বাঁশ বনে ডোম কানা ভাবটা কেটে গেল অনেকখানি। কীর্তন শুনে অবিশ্যি নয়। এম্নিই।একটা ভারি নিঃশ্বাস ফেলে সে গোলদীঘির দিকে চলে গেল।দীঘির চারপাশে পাক খেতে খেতে সে অনেক কথা ভাবল, তারপর বেশি কথা ভাবতে ভাবতে চারদিকের নটেগাছগুলোকে ঠুঁটো হয়ে মুড়োতে দেখে একটা বেঞ্চিতে এসে চুরুট জ্বালাল।
দু-তিন দিন পর মাল্যবান বললে, তোমার মেজদারা তো থাকবেন অনেক দিন।হ্যাঁ।বছর খানেক?না, মাস দুয়েক।একটা কথা আমার মনে হয়, মাল্যবান বললে, এ-বাড়িটা ছেড়ে দিয়ে একটা নতুন বাড়ি দেখলে মন্দ হয় না। দোতলা কিংবা তেতলায় বড়ো বড়ো কয়েকখানা ঘর থাকবে।শুনে উৎপলা নাকে-চোখে খুব খুশি হয়ে বললে, তাহলে তো খুব ভালো হয়। গুনগুন করে গাইতে গাইতে বললে, তুমি সে রকম বাড়ি দেখেছ কোথাও?না।পাওয়া বড্ড শক্ত।আমি খুঁজছি।পঞ্চাশ টাকা ভাড়ার মধ্যে পেতে হবে তো?ধরো, গোটা দশেক বেশিই না হয় দিলাম।কয়েকদিন পরে মাল্যবান এসে বললে, একটা বাড়ির খোঁজ পেয়েছি।কোথা?পাথুরেঘাটার দিকে।বাবা, অদ্দূরে গেলে?কিন্তু বাড়িটা বেশ।কটা ঘর আছে?পাঁচটা। দোতলার চারটে, তিনতলার একটা। বেশ বড়ো?হ্যাঁ।কত চায়?পঞ্চাশ।তা পঞ্চাশ টাকা বড্ড বেশি।কিন্তু পাঁচটা ঘর।তা বুঝলাম–ঠোঁটে পানের রং শুকিয়ে ভারি সুন্দর দেখাচ্ছিল উৎপলার ঠোঁট। ঠোঁট নেড়ে সে বললে, কিন্তু মেজদার কাছ থেকে কিছু তো চাওয়া যায় না।তা আমি জানি।এমন-কি সেধেও যদি কিছু দেন, তাহলেও তা নিতে পারি না আমরা।সে বিষয়ে মাল্যবানের খানিকটা মতভেদ ছিল।একটা হাই তুলে মাল্যবান বললে, তাই তো, আড়াই শো টাকায় চলে কী করে পঞ্চাশ টাকাই যদি বাড়ি ভাড়ায় দিয়ে ফেলি–উৎপলা চাপা গলায় ভরসা দিয়ে বললে, চালাতে পারি আমি অবিশ্যি—নাঃ, সে আর তুমি কী করে পার! লোকও তো কম নয়—তোমার সোনার ঘড়িটা যদি বিক্রি করে ফেল, তাহলে টেনে মেনে এক রকম চলে—আমার সোনার ঘড়িটা বিক্রি করে ফেলব! মাল্যবান দম ছাড়বার আগে দম ছাড়তেই পারবে না যেন সে আর এম্নি ভাবে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।ঐ বিয়ের সময় যেটা পেয়েছিলে–মাল্যবানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে উৎপলা।কিন্তু মাল্যবানের আরেক রকম—কেমন যেন পাট ভেঙে গেছে, এই ছিল এই এখুনি ইস্ত্রি লাট হয়ে গেছে এরকম মুখের দিকে তাকিয়ে বিশ্রী লাগল উৎপলার-বিরক্তি বোধ করল সে।বাবা তিন শো টাকা দিয়ে তোমাকে ওটা কিনে দিয়েছিলেন। সেই বাপের জন্য আমি তোমাকে বিক্রি করতে বলছি আমার ভাইয়ের সুবিধের জন্য। এ না করে এ-ঘড়ি দিয়ে কাঁচাপাকা টিপ পরবে তুমি!আয় রোদুর হেনে ছাগল দেব মেনে-র মতো বিলোড়িত মন্ত্রে যেন উৎপলার চোখ রৌদ্রের মতো হেনে পড়ল মাল্যবানের চোখে; কথা বলতে বলতে এগোতে এগোতে মাল্যবানের মুখের ওপর প্রায় পড়ল গিয়ে উৎপলা।আস্তে আস্তে নিচে নেমে গেল, পুরোটা চা খাবার জন্যও ওপরে ফিরে এল না আর মাল্যবান।খানিকক্ষণ পরে মনু নিচের থেকে ফিরে এসে বললে, বাবা বেরিয়ে গেছেন, মা।চা না খেয়েই গেল যে। বলে চায়ের বাটিটা একটু কাৎ করে চাটুকু ছাদের এক কিনারে ঢেলে দিল।মনুকে বললে, পরোটা খাবি?এতটুকু বয়সেই তোদের অম্বল হয় শুনলেও হাসি পায়। পরোটা দুটো ছাদের ওপরে গোটা তিনেক কাকের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে ফেলে দিল উৎপলা। মনুর দিকে ফিরে তাকিয়ে বললে অম্বল! কথাটা শেখানো কে তোকে—বুক জ্বলে যে।তাকে অম্বল বলে তা ঠিক। কিন্তু কার কাছে শুনলে?কেন, তোমরাই তো অনেক সময় বলো।আমি বলেছি?মনুর দিকে চোখ শানিয়ে তাকিয়ে উৎপাল বললে, আমার বাপের বাড়ি কারু কোনো দিন অম্বল হয়েছে যে বলব।মনু চুপ করে রইল।ঠিক করে বল তো কোথায় শুনেছিস কথাটা?ধ্বেৎ, আমার অত মনে নেইমনে নেই! এলি গেলি বাপের বিদ্যেয় বর্তালি, মনে নেই। যেমন দেখতে, তেমন লিখতে, কী যে বাপের গোঁই পেয়েছ, বাছা।মাল্যবান যতই অভিমান করুক না কেন, যাতে খাবার সময় ঠিক হাজির হল। উৎপলা তিন জনের ভাত সাজাতে সাজাতে বললে, তোমার বড্ড ক্ষুদে মন—ক্ষুদিরামের মতন—ফাঁসির ক্ষুদিরাম নয়—ভারি নচ্ছাড় মন তোমার–আমার?চা না খেয়ে বেরিয়ে গেলে যে বড়ো?ওঃ—চা–মাল্যবানের নাকের ভেতর দিয়ে খানিকটা হাসল—যেন কিছুই হয় নি; চায়ের কথাটা কিছুই মনে ছিল না যেন তার।চা পরোটা পড়ে রইল—শেষে কুকুর-বেড়ালে খায়, গতর খায় গতরখেকোর রাগ।না, না, রাগ নয়—খাবারের ওপর মানুষে আবার রাগ করে না-কি—অত আহাম্মক আমি নই? বলে মাল্যবান বুদ্ধিমান নীরাগীর মত ভাব দেখিয়ে পাঞ্জাবীর আস্তিন খানিকটা গুটিয়ে বললে, দেখি ভাতের থালাটা—উৎপলা ছুরি দিয়ে একটা লেবু কাটতে কাটতে বললে, অহাম্মক হবার বাকিও রাখনি কিছুমনুর মাথায় একটা চাটি মেরে উৎপলা বললে, ট্যালার মতো এই খাবারের জিনিসগুলোর কাছে থুবড়ি খেয়ে পড়ে আছিস যে! হাভাতে মেয়ে, বোস গিয়ে—ট্যাক-ট্যাক করে তাকিয়ে আছে। গুষ্টির খাই এখন থেকেই দমকে দমকে চাড় দিয়ে উঠছে পেটে।মাল্যবানের ইচ্ছা হচ্ছিল এবারও সে উঠে যায়। কিন্তু তাতে কারু শিক্ষা হবে না। যে যা হবে না, তাকে তা করা যাবে না। মাঝখান থেকে না খেয়ে উঠে গেলে ক্ষিধের পেটে নিজেরও কোনো লাভ হবে না। মাল্যবানের সঙ্গে উৎপলা যদি টিকে থাকে মাল্যবানের মৃত্যু পর্যন্ত—এই রকম ভাবেই টিকে থাকবে; কোনো সংশোধনী বিজ্ঞানী বিদ্যে নেই এসব স্ত্রীলোকদের শোধরাবে—আমেরিকা বা রাশিয়ার হাতেও; কোনো লক্ষ কোটি অব্যয় কাল নেই ব্যক্তি মানুষের হাতে কয়লাকে যা হীরে করে দিতে পারে।মনু চেয়ারে এসে বসল বাপের মুখোমুখি। মাল্যবান তাকে সান্ত্বনা দেবার কোনো ভরসা পাচ্ছিল না। মেয়েটির দিকে তাকাতে গেল না সে। মেয়েটির পাশে বসে আছে—কেমন কানাভাঙা খখানা খেমটা উত্তেজের অবসাদে মাল্যবানের মন ভারী হয়ে উঠতে লাগল। নিজে সে বাপ হয়েছিল বিয়ে করেছিল—হীন কুৎসিৎ উছুণ্ডে জীবনবীজ ছড়িয়েছিল ভাবতে ভাবতে মন তার চড় চড় করে উঠল। একটা পাখি সৃষ্টি করে তাকে যদি দারার অন্ধকারে ফেলে দেওয়া হয়—কেমন ছটফট করে উঠ লাগল মাল্যবানের ভেতরটা। মাল্যবান ভাবছিল উচিত ছিল তার একা থা.., খবরের কাগজ পড়ত, অফিসে যেত, গোলদীঘিতে বেড়াত, সভা সমিতিতে সামনের বেঞ্চে গিয়ে বসত, বেশি করে যেত থিওজফির সভায়, ফ্রীম্যাসনও হত, রাত জেগে ডিটেকটিভ উপন্যাসের থেকে কলকাতা ইউনিভার্সিটির মিনিট, নানা রকম কমিশনের রিপোর্ট, ব্ল বুক হাতের কাছে যা-কিছু আসত, তাই পড়ত, ভাবত, উপলব্ধি করত—কেমন চমৎকার হত জীবন তাহলে।জীবনের সঙ্গে একজন স্ত্রীলোককে জড়িয়ে নিয়ে—এ-জড়িয়ে-নেওয়ার সমস্ত নিহিতার্থের ছোব পোচড় গায়ে মেখে দধিতে কাদায় মুখতায় ওগরানো অম্বলে আগুনেঅতৃপ্তিতে মণ্ডিত হয়ে কী হল সে।খানিকক্ষণ থালায় বাটিতে চুপচাপ ভাত ডাল তরকারী সাজিয়ে উৎপলা পরে বললে, ছোটবেলায় বাপ-মা তোমাকে শিক্ষাদীক্ষা দিয়েছিল বেশকেন, কী হয়েছে, কী দেখলে তুমি?না হলে এ-রকম হ্যাংলামো কেউ করে?হ্যাংলামো? ভাতের থালাটা উৎপলার গায়ে ছুঁড়ে মারতে গিয়ে কোন্ বৈষ্ণবী শক্তির জোরে যে বিরত হল মাল্যবান দু-এক মিনিট খুন চাপা রক্ত চড়া মাথায় কিছুই বুঝতে পারল না সে।আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হচ্ছিল তার মন।তা নয়তো কী—উৎপলা বললে।কী করেছি আমি?খুব যে আস্তিন টেনে ভাতের থালা কিলিয়ে পাকাচ্ছিলে—দেখছিলেই তো ভাত ডাল তরকারি মাছের বাটি তখনো তৈরি হয়নি। ঘাড়ের রোঁ সাদাটে মেরে গেল, এখনও নালা কুকুরের মতো খুব যে গুই গাঁই—খুব যে-ই গাই।মাল্যবানের এক রাশি কথা বলবার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু খুব অল্পে সেরে দিয়ে সে বললে, আমার ক্ষিধে পেয়েছিল, থালাটা চেয়েছিলাম তাই।ক্ষিধে তো ঘোড়ারও পায়; তাই বলে মানুষের টেবিলটাকে আস্তাবল করে তুলতে হবে। ভাতের থালাটা মাল্যবানের দিকে ঠেলে দিয়ে উৎপলা বললে, কুড়ি-পঁচিশ পেরিয়ে গেলেই সব কাপ্তেনী ফুরিয়ে যায়—ব্যাটাচ্ছেলেরা দিব্যি পুরুষ মানুষ হয়ে ওঠে—দিব্যি। সতেরো আঠারো বছর বয়সেই মেয়েরা স্ত্রীলোক হয়—কিন্তু বেয়াল্লিশ বছর বয়সেও ঢেস্কেলে কী থাকবে আর চেঁকি ছাড়া।মাল্যবান ঘাড় ঝুঁকিয়ে খানিকটা দক্ষিণায়নে রেখে যাচ্ছিল।উৎপলা এক গেরাস মুখে তুলে বললে, কপালে যদি হবার নয় লেখা থাকে তাহলে সে-লেখা কপালের ঘামে মুছে যাবার নয় তো ও-সব লেখা ঘামে রক্তে মোছে না।মনু বুঝছিল না বিশেষ কিছু; মাল্যবান বলছিল না কথা কিছু খাবার ঘরে নিস্তব্ধতা খানিকক্ষণ; যে যার মনে নুন মাখিয়ে, লেবু টিপে, জলের গেলাস মুখে তুলে, তরকারীর বাটি কাৎ করে খেয়ে যাচ্ছিস।কিন্তু অফিস থেকে এসে কী হয়েছিল শুনি? বললে উৎপলা; গায়ের ঝালটা কিছুতেই মরছিল না যেন তার।মাল্যবান খাওয়ার ধরণ-ধারণ খানিকটা বদলে ফেলে একটু ভদ্রভাবে খেতে খেতে বললে, কিছু হয়নি।ঝপ করে ওম্নি মিথ্যে কথা!কী হবে আবার।চা না খেয়ে চলে যাওয়া হয়েছিল যে।চা আমি বাইরে খেয়েছিলাম।কোথায়?দোকানে।কে খাওয়াল?কে খাওয়াবে আবার—গাঁটের পয়সা ভেঙে খেলে তো?সেই রকম খেতেই আমি ভালোবাসি–তোমার বন্ধুদেরও আশান হয়। কে আবার ট্যাঁকের পয়সা খরচ করে ডিমের বড়া খাওয়াবে ধরা গণেশকে। উৎপলা বললে, পয়সা খরচ করে তারা—খুব খরচ করে কিন্তু মানুষ বুঝে-মুখের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখো।উৎপলা কঠিন নিঃশব্দ দৃষ্টিতে মাল্যবানের আপদমস্তক কিছুক্ষণ প্রদক্ষিণ করে। দেখল।এক পেয়ালা চা নিয়ে সাধে না; কেন, ঘরের বাইরে জলচল নেই তোমার?চা নিয়ে সাধে না বাবাকে, মনু বললে, দই মিষ্টি?মাল্যবান নিঃশব্দে একটা আলু টিপছিল।আহ্বান যা আসে তাও শ্বশুরবাড়ির থেকে। লোচনা ডোমেরও জামাইষষ্ঠী হয়—সেইরকম আর কি। বেয়াল্লিশটা বছর বসে এত বড়ো পৃথিবীর ভেতরে থেকে মানুষসমাজে মানুষটা কানা—একেবারে ছুঁচো চামচিকের পারা উৎপলা খানিকটা জলে গলা ভিজিয়ে নিল, বললে, কোথাও ডাক নেই, কেউ পোঁছে না, হৈ-হল্লা নেই, ঘরে আড্ডা-মজলিশ নেই—খোল করতাল কেত্তন মুজরোর বালাই নেই—কোনো মানুষই আসে না—ডাকলেও আসে না। কিন্তু বয়ড়াকে কানে শোনাবে কে? ড্যাবড়াকে ডান হাত দেখিয়ে দিলে লাভ আছে।মাল্যবান খাচ্ছিল। মনু শুনছিল, হাসছিল, ভুলে যাচ্ছিল, মানে বুঝছিল না, ফেলাছড়া করে অরুচি মুখে মাঝে মাঝে আদা খুঁটছিল খাচ্ছিল—সেই বিয়ের পর থেকেই দেখছি কেরানীবাবুর নিচের তলার ঘরটিতে দুটো চেয়ার; একটাতে তিনি নিজে বসেন, আর একটাতেও তিনি নিজে বসেন। হাফ অখড়াই কে যেন আসতে মাঝে মাঝে-ওঃ, অভিরাম সারখেল; হামলা হচ্ছে বলে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হল।একটা ঘোলা নিশ্বাস ফেলল উৎপলা। কিন্তু ব্যথাটা লাগল মাল্যবানের বুকে গিয়ে বেশি-বন্ধুবান্ধব নেই বলে নয়—মাল্যবানের জীবনের নিঃশব্দতার খানিকটা যে সূক্ষ্ম মানে আছে, তার ওপর এরকম খিঁচুনি খোঁচা এসে পড়ল বলে। অথচ উৎপলা মেজাজে থাকে না যখন আর, স্থির হয়—তখন আজীবন যেসব বিচিত্র বেচাল কথা বকে গেছে সে সবের বেকুবি তাকে নিঃশব্দ করে রাখে—এমনই নিঃশব্দ, মনে হয় যেন সমুদ্রের ওপারে পৃথিবীর পারে সকলের নাগালের বাইরে অন্তহীন হচ্ছি হব পেরিয়ে কেমন শাশ্বত হয়েছির নিবিড়তার ভেতর বসে আছে সে। কিন্তু এখন অন্যরকম উৎপলার : দুঃখের বিষয়, এইটেই তার আটপৌঁরে রকম।একটা কাচের রেকাবী থেকে এক টুকরো লেবু নিয়ে ডালের সঙ্গে টিপতে টিপতে অসাধ অসফলতার বাহনের মতো কেমন একটা নিঃশ্বাস ফেলল উৎপলা; নিঃশ্বাসটা নিজের নিয়মে ঠিক—এত নিরাভরণ ভাবে ঠিক, যে মনে হয় অনেক অতল থেকে উঠে এসে নিজেকে মোটা ব্যবহারে খরচ করবার আগেই মিলিয়ে যায় সে; শুনলে মানুষের প্রাণ কেঁপে ওঠে।পাতের কিনারে কাঁচালঙ্কাটা ফোঁড়ে ঘষে ডালের স্বাদ বাড়াবার চেষ্টা করতে গেল মাল্যবান আর। খাওয়া এখন অপ্রাসঙ্গিক। এই নারীটিকে নিয়ে কী সে করবে! উৎপলার এই সব ফাড়ন শূন্যতা দীর্ঘ নিঃশ্বাস, আড়াআড়ি মাল্যবানের নিস্ফলতা ও অব্যয় নিঃশ্বাস (মাল্যবানেরটা মারাত্মক কফের মতো বুকের ভেতর বসে গেছে, বাইরে তার প্রকাশ নেই, উৎপলা কোনো সময়ও টের পায় না) ঘরদোরের নিশ্ৰুপ বাতাসে ঘাই মেরে ফিরছে। কী হবে এই বাতাস ঘরদোর দিয়ে। এই নারী নিয়ে কী করবে সে।যে-দু-চার জন লোক তোমার কাছে আসে, তাদের মুখের দিকে তাকাতে পারা যায় না।কেন?দেখতে তারা খুব খারাপ নয়, কিন্তু চুনো গন্ধ আসে রক্তের ভেতর থেকে। কোনো বিহিত-টিহিত নেই?জানি না।আমি তাদের সঙ্গে কথা বলি না তাই।মানকচুর পাতার আড়ালে বসে আমার সঙ্গে কথা বলে ওরা। তোমাকে কোনো দিন দেখেছে বলে মনে হয় না।উৎপলা বললে, মানকচুর পাতার আড়ালেই বর্ষাকালটা তোমার জমে বেশ দু-চারটে ক্যাকড়া চড়িয়ে। ওদেরি মত তুমি। নিজের স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে তোমার আলাপন আছে?কী হবে আলাপ করে?আমি তা জানতাম। তোমার বন্ধুদের সম্পর্কে আমি যা ভাবি, পরের স্ত্রীরাও হয়তো তোমার সম্বন্ধে সেই কথাই ভাবে। বলে উৎপলা এঁটো হাত দিয়ে জলের গেলাসটা ঘাঁটতে-ঘাঁটতে বললে, ছি, কী ঘেন্না!না, এমন ঘেন্নার কিছু নয়—আমাদের দুজনের জীবন দুই রকম, এই যা।এত বড়ো পৃথিবীতে একজন মেয়েলোকও তোমার সঙ্গে খাতির করা দরকার মনে করল না, না ভলোবাসা, না স্নেহশ্রদ্ধা, না মমতা-সহানুভূমি-কোনো কিছু কেরানীবাবুটিকে দেবার মতো নেই কারু। ওঃ, আমার একারই বুঝি দিতে হবে সব। লক্ষ্মীর ঝাঁপি উৎপলা বলে; বলতে বলতে বলার মাথায় উৎপলা গলা চড়িয়ে দিয়ে বললে, একজন বেশ্যার সঙ্গেও যদি সমাভাগে তোমার সম্পর্কে আমর দায়িত্ব ভাগ করে নিতে পারতাম, তাহলে এতটা দম আটকে আসত না আমার—শুনে মাল্যবান চমকে উঠল না, হেসেও উঠল না; ক্ষিধে ছিল; মাল্যবানকে খেতে দিতে চায় না উৎপলা; কিন্তু অবস্থা তো এইরকম। টেবিলে যা জিনিস আছে, তাকে চার-পাঁচটি জনে খেতে পারে, কিন্তু মনু নিজেরটুকুই খেয়ে উঠতে পারছে না; আর দু-জনের তো খাওয়া বন্ধ; চমৎকার কবিয়ালী লড়াই শুরু করেছে সময় বুঝে তারা।টেবিলে মাথা রেখে মনু ঘুমিয়ে পড়ছিল। মাল্যবান একটা লেবুর খোসা নিয়ে আঁক কাটছিল থালার ওপর চুপচাপ।আমি হিন্দুঘরের মেয়ে, বাধ্য হয়ে অনেক কথা আমাকে বিশ্বাস করতে হয়—মাল্যবান লেবুর খোসা দিয়ে থালার ওপর স্বস্তিকা আঁকছিল—একটা-দুটোতিনটে—কোনো কথা বললে না।বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ব্যাপার সব মানুষই স্বাধীন—কিন্তু এমন পাকা ঘরে জন্মে বেটপকা ঘরে পড়েছি যে সে স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেছি–বাধ্য হয়ে কী বিশ্বাস করতে হয় তোমাকে?এ বিয়ে আমার হত, কিছুতেই ঠেকাতে পারতাম না, এই বিশ্বাসওঃ এই বিশ্বাস থালার স্বস্তিকাগুলো মুছে ফেলে জেঙ্গিস খাঁর নিশানের বারোটা পুচ্ছ—ইয়াকের উদ্যত পুচ্ছ আঁকবার চেষ্টা করেছিল মাল্যবান।কিন্তু এটা সংস্কার, উৎপলা বললে, সত্য নয়। কিছুতেই সত্য নয়।যেন গ্যালিলিও বলছে, আমি কিছুতেই বিশ্বাস করি না পৃথিবীটা চৌকো, আমি কিছুতেই বিশ্বাস করি না পৃথিবীটা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জেঙ্গিসের ইয়াকের লেজ আঁকতে আঁকতে একবার মুখ তুলে অনবনমিত গ্যালিলিওর দিকে তাকিয়ে চমৎকৃত লাগল মাল্যবানের—কেমন-একটা আভা যেন উৎপলাকে ঘিরে—বিজ্ঞানের পরা সত্যের জন্য তপস্যা করছে সে–সংগ্রাম করছে।তোমাকে আমি না বিয়ে করেও পারতাম। সেইটেই সত্য। উৎপলা বললেআমারও তো তাই মনে হয়। পাখিটাকে ফাঁদে ফেলে সেই ফঁদটাকে সত্য বলে নির্দেশ দেবার কোনো অর্থ হয় না। আকাশ সত্য নীড় সত্য পাখির কাছে।উৎপলা এবার ভাত-তরকারীর দিকে মন দিয়ে বললে, আমি তাই বলছিলাম—দু-এক গ্রাস খেয়ে সে বললে, অনুপম মহলানবীশকে তো বিয়ে করতে পারতাম আমি—লেবুর ধোসা দিয়ে নখ দিয়ে জেঙ্গিসের ইয়াক-লাঙ্গুল-লাঞ্ছিত নিশান এঁকে ফেলেছে মাল্যবান—বারোটা লেজই এঁকেছে—থালার ওপর; চোখ তুলে তাকিয়ে বললে, কে অনুপম মহলানবীশ?ঐ রকম একজন লোককেই বিয়ে করার কথা আমার। সেইটেই সত্য হত। কিন্তু পৃথিবীতে সত্যের মুখ দেখতে পাওয়া কঠিন।থালার ওপর জেঙ্গিসের লাঙ্গুলের দিকে তাকিয়ে মাল্যবান বললে, ও, হ্যাঁ, অনুপম মহলানবীশ; মহানবীশের কথা শুনেছি আমি। অনুপম মহলানবীশ, ধীরেন ঘোষাল, নসু চৌধুরী—যেন বালেশ্বর যুদ্ধের, মেছোবাজার বোমার, কাকোরি মামলার, চাটগাঁ আরমারি রেডের শহীদ সব; কিন্তু তা নয়, এরা অন্য লোক, বিষয়ী লোক—এদের কথা আমাকে অনেক বার বলেছ তুমি। এদের কারুর সঙ্গে তোমার বিয়ে হলে ঠিক হত, দাঁড়িয়ে যেত। কিন্তু তা হয়নি। কিন্তু তাই বলে, তুমি হিন্দুঘরের মেয়ে বলে যা হল না সেটা সংস্কার, যা হয়েছে সেটা সত্য—এটা তুমি না মেনে পারছ বলছ।খাবার থালার থেকে মুখ তুলে উৎপলার দিকে তাকিয়ে মাল্যবান বললে, না মেনে পারছ না বলছ। কিন্তু সত্যিই মানছ না। তোমার রক্তের ব্যাধিবীজাণুগুলো হয়তো মানছে, কিন্তু শ্বেতকণিকাগুলো না, তোমার আত্মা মানছে না।উৎপলা একটা ভালো নিঃশ্বাস ছেড়ে বলতে বলতে গিয়ে বললে না কিছু। মাল্যবান পার্শে মাছের ঝোল দিয়ে ভাত চটকে লেবুর রস নিংড়ে নিচ্ছিল, লেবুর খোসাটা ফেলে দিয়ে বললে, হিন্দু বৌদের বোঝাবে কে যে এর চেয়ে স্থির বৈজ্ঞানিক সত্য নেই কিছু আর। এক হাজার বছর কেটে গেলেও বুঝবে কি তারা?মীমাংসাটা ভালো লাগল উৎপলার, বললে, টেররিস্ট বলত সবাই অনুপম মহলানবীশকে। ডাকগাড়ি রেলগাড়ি লুট, ব্যাঙ্ক লুট, আর্মারি লুট, কত কী করেছে। অনুপম-কত জেলে পচেছে দেশকে স্বাধীন করতে; একবার ফাঁসির হুকুম হয়ে গিয়েছিল অনুপমের, কিন্তু কী করে তা বাতিল হল টেররিস্টদের দলে থেকে আমিও তা টের পেলাম না।জেঙ্গিস খুব বড়ো খাঁ ছিল, ভাবছিল মাল্যবান, দুর্দান্ত লোক ছিল মঙ্গোলগুলো, কিন্তু কারণকর্দমের ভেতর মৃণালের মতো ছিল কুবলাই খাঁ।কৈ, কখনো বলোনি তো আমাকে তুমি সন্ত্রাসষড়যন্ত্রের ভেতরে ছিলে।বলে কী হবে, উৎপলা বললে, এখন তো আর নেই। ছিলাম অনেক আগে।ফাঁসি বাতিল হয়ে গেল অনুপমবাবুর? আন্দামান হল?না।তাও হল না? তা কী করে হয়?তা ইণ্ডিয়া-সেক্রেটারি বলতে পারেন। জেলও তো হল না।জেলও হল না? থালার ওপর থেকে সমস্ত লাঞ্ছনা মুছে ফেলে পার্শে মাছের ঝোল ভাত খেয়ে খেয়ে শেষ করে এনেছিল প্রায় মাল্যবান; থালাটা আবার পরিষ্কার হয়ে এসেছে প্রায়; আবার ছবি আঁকা যাবে—আর একজন বড়ো খাঁর ছবি আঁকবে সে-কুবলাইয়ের ছবি।আমি জানি না।জেলও হলো না, অ্যাপ্রুভার হয়েছিল বোধহয় অনুপমবাবু?আমি জানি না—কিন্তু অ্যাপ্রুভার হয়েছিল বলে তার জন্য টান কমেনি তোমার?উৎপলা ঘাড় বাঁকিয়ে ছুরি দিয়ে একটা লেবু কাটতে-কাটতে বললে, টেররিস্টরা বলেছে অনুপম স্পাই ছিল। হয়তো ছিল। হয়তো ফাঁসি হল না বলে ঐ কথা বলেছে।স্পাই? মাল্যবান একটু বিলোড়িত হয়ে বললে, সে তো অ্যাপ্রুভারের চেয়েও খারাপ না কি অ্যাপ্রুভার স্পাইয়ে চেয়ে খারাপ স্পাই?অনুপম স্বদেশী করছে, না স্বদেশীতের লাটের কিস্তিতে চড়াচ্ছে, সে সব ভেবে তাকে ভালোবাসিনি আমি। সে স্পাই বুঝি? উৎপলা নিজের দৃষ্টির ভেতর থেকে কুয়াশা সরিয়ে নিয়ে পরিষ্কার চোখে মাল্যবানের দিকে তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিয়ে একটু ঠাট্টা, বিষণ্ণতা ছিটিয়ে হেসে বললে, হবে স্পাই। অ্যাপ্রুভার হলে হবে। আমার তাতে কিছু এসে যায় না। মানুষের সঙ্গে সম্বন্ধ পাতানোর নিয়ম আমার আর এক রকম। জল নিয়ে কথা নয়, পুকুর নদী সাগরে ঢাউস জল তো আছে; কিন্তু সেই জল কি আছে—ফটিক জল?না, তা নেই। অনুপম অ্যাপ্রুভার বলে নয়, অনুপম বলেই মেঘজল। মাল্যবান মাথার ওপরে খুব বেশি পাওয়ারের আলোটার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে ভাবছিল, বাঙালী হিন্দু পরিবারে উৎপলা আর সে রয়েছিল বলে; দু-জনের এই দাম্পত্য সম্পর্ক টিকল বারো বছর। এই বরোটা বছর উৎপলার অনিচ্ছা অরুচির বঁইচি-কাঁটা চাদা-কাটা বেত-কাটার ঠ্যাসবুনোনো জঙ্গলে নিজের কাজকামনাকে অন্ধ পাখির মতো নাকে দমে উড়িয়েছে মাল্যবান। কত যে সজারুর ধাষ্টামো, কাকাতুয়ার নষ্টামি, ভোদরের কাতরতা, বেড়ালের ভেংচি, কেউটের ছোবল আর বাঘিনীর নখ এই নারীটির। কিন্তু সে খাবার সামনে হরিণ বা বনগোরু না হয়ে রায়বাঘের মতো রুখে দাঁড়ালে ময়ূরীর মতো উড়ে যায় ডাল থেকে ডালৈ অদৃশ্যলোকের ঘনপাতার ভেতর কোন এক জাদুর জঙ্গলে এই মেয়েটি; না হলে ময়নার মতো পায়ের কাছে মরে পড়ে থাকে-হলুদ ঠ্যাং দুটো আকাশের দিকে। জীবনটা আমার যা চেয়েছিলাম তা হল না, যা ভয় করেছিলাম তার চেয়ে বেশি ভয়ে, বেশি শোকে গড়িয়ে পড়ল—ভাবছিল মাল্যবান। কিন্তু আমি—ভেবে-চিন্তে—আমি পুরুষমানুষ একটা পথ কেটে নিতে পারি, কিন্তু একটা দার্শনিক প্রস্থানে আমি পৌঁছতে পারি বলেই নয়—এম্নিই, উৎপলার জীবনের বিতিকিচ্ছিরি নিস্ফলতা, ব্যথা আমি পাইনি।মনু ও উৎপলা খেয়ে মুখ ধুয়ে টেবিল পরিষ্কার করে চলে গেল। মাল্যবান একটা চুরুট জ্বালাল। খাবার ঘর ছেড়ে হাঁটতে হাঁটতে-ছাদের ওপর দু-মুহূর্ত দাঁড়িয়ে শীত রাতের আকাশের আগ্নেয় গুড়িগুলোকে এক নজরে একটা সুপরিসর চিলদৃষ্টির ভেতর কবলিত করে—উৎপলার ঘরে গিয়ে ঢুকল। টানতে টানতে চুরুটটা যখন বেশ জ্বলে উঠেছে, খুব ধোঁয়া উড়ছে, রাশি রাশি ধোঁয়া বেরুচ্ছে মাল্যাবেনর নাকমুখের ভেতর থেকে—মাল্যবানের মন কোথায় যেন চলে গিয়েছিল, এখন আবার অবহিত হয়ে উঠল। দেখল স্ত্রীর ঘরের বাতি নিভে গেছে—চারদিক অন্ধকার; মশারী টাঙিয়ে উৎপলা শুয়ে পড়েছে, ঘুমিয়ে পড়েছেও হয়ত। উৎপলার মশারীর ভেতর লেপের ভেতর শুয়ে পড়তে ইচ্ছা করছিল মাল্যবানের। কিন্তু এ-ঘরের চমৎকার শীত ও অন্ধকার ছেড়ে নিচেই যেতে হবে তাকে।চুরুটের মুখে ছাই জমেছে, টোকা দিয়ে ঝেড়ে নিচে নেমে গেল।পরদিন সকালে টেবিলে চা খাওয়ার সময় উৎপলা মাল্যবানকে বললে, কাল চায়ের দোকানে কী খেলে?চা আর বিস্কুট।আর কিছু না?না।বাবা যে সোনার ঘড়িটা তোমাকে দিয়েছিলেন, তার দাম তিন শো নয়—চার শো টাকা, আমার নোটবুকে লেখা ছিল দামটা, দেখছিলাম। আজকাল সোনার দাম বেড়ে গেছে—হয়তো দুশো টাকায় বিকোবে। টাকাগুলো হাতে থাকলে—মেজদাদারা আসছেন—সুবিধে হত তাদেরও, আমাদেরও। কিন্তু তবুও তুমি তো নিজের চেঁকি ছাড়া পাড় দেবে না।উৎপলা এতক্ষণ চায় চুমুক দেয়নি। এবার চার-পাঁচটা চুমুকে আধ পেয়ালা চা শেষ করে পেয়ালাটা একটু সরিয়ে রেখে বললে, শুধু কি তাই, ঘড়িটা তোমাকে বেচে দিতে বলেছিলাম, তাই রাগ করে চায়ের দোকানে গিয়ে খেলে। এ আবার কী রকম—হিগলে পিগলে—হিগলে পিগলে–মেয়েমানুষের মতো নোলা ছব ছব করছে ঘড়িটা বিক্রি করার কথা পেড়েছিলাম বলে—এ আবার পুরুষ? কী রকম পুরুষ তাহলে। এসব পুরুষমানুষের ভরার মেয়ে মেয়ে বিয়ে করা উচিত।ঠাণ্ডা শান্ত করুণ ভাবে কথা বলছিল উৎপলা। একটা চাপা ঝঝ যে না ছিল তা নয়। মাল্যবানের চোখে ভাব এল; উৎপলার হৃদয়টা বাস্তবিকই বেশ, ভাইয়ের জন্য এই সুচিন্তাটুকু আগাগোড়াই সৎ; আমার বদলে অন্য কোনো মানুষকে—উৎপলার সাদা রক্তকণিকা যাকে চায়, তাকে যদি পেত সে তাহলে নারীটির মনের প্রাণের স্পষ্ট প্রবণতাগুলো শত পথে খুলে যেত যেন—সফতলায়, সফলতায়–ভাবতে ভাবতে মাল্যবান চোখ বুজে কেমন এক শামকল পাখির মতো মুখে নিগূঢ় হয়ে বসে রইল অনেক মন্ত্রগুপ্তি রয়েছে যার, সোনার ঘড়িটা কিছুতেই হাতছাড়া করবে না সে। নিজেকে যে এই রকম দেখাচ্ছে, তাও টের পেল মাল্যবান।আমার সোনার নেকলেসটাই বিক্তি করতে হবে। বাপের বাড়ির মানুষদের আমাদের রকম এই যে, দশ জনের কাজে লাগলে কোনো জিনিসকেই পুঁজি করে রাখি না আমরা : ছড়িয়ে দিই চারিয়ে দিই। কিন্তু অন্য রকম হয়ে যাচ্ছি। বারো বছর বাপের ঘর ছাড়া। গোরুর মূত লেগেছে দুধে—কেন কাটবে না?মাল্যবানের ভাবপ্রাধান্য—যা তাকে আবেশ দিয়েছিল-সময় মতো ভাটার টানে সেটা পড়ে যাচ্ছিল আবার; উৎপলা যা বলছিল, কিছু তার কানে ঢুকছিল শব্দ তরঙ্গের মতো; মন উৎকর্ণ হয়েছিল—উৎপলা নয়, মাল্যবান নিজেও নয়,—কিন্তু মাল্যবানের মনের অবচেতনা নিঝুমের দিকে : কী বলছে সে? ঘড়িটা বিক্রি করো না, ঘড়িটা বিক্রি করো, কোরো না বিক্রি করে দাও। কোরো না, করে দাও করে দাও। ঘড়িটা কি আজ বিক্রি করেছে সে? প্রায় তিন বছর আগে উৎপলারই একটা টাকার খাই মেটাবার জন্য বিক্রি করতে হয়েছিল ঘড়িটাকে। উৎপলা খুব ভালো করেই জানে তা। কিন্তু তবুও না জানবার ভান করে—সোনার দর বাড়লেই সেই সোনার ঘড়িটাকে বিক্রি করবার জন্য তোলপাড় করে তোলে, অন্য কোনো মানিকজোড়ের থেকে বিচ্ছিন্ন পাখিনীর মতো এমনই বিজোড় এই মেয়েমানুষটি মাল্যবানের জীবনে।হাতে আর-একটা ঘড়ি আছে বটে মাল্যবানের, সেটা সোনার নয়। সেটা বিক্রি করতে হবে? না, তা ঠিক নয়। শ্বশুর যে সোনার ঘড়ি দিয়েছিল জামাইকে, সেইটাই বারবার বিক্তি করে শ্বশুরের ছেলে পরিবারকে একটু তরিবতে রাখতে হবে মাল্যবানের বাড়িতে, শ্বশুরের মেয়ের বাপের টাকাতেই যে সব হচ্ছে, সে উপলব্ধি নির্বিশেষে ভোগ করতে দিতে হবে শ্বশুরের মেয়েকে।ব্যাপারটা এই রকম তো? একে কী বলে? পিতৃগ্রন্থি? না কি জোড়ভাঙা পাখি কূল পাচ্ছে না অথই শূন্যের ভেতর, তাই সামাজিক সাক্ষীগোপালটির চেয়ে ভাইকে নিকট মনে হয়—পিতৃগ্রন্থি সক্রিয় হয়ে ওঠে? না : তা ঠিক নয়, মাল্যবান ভাবছিল; কোনো বিজ্ঞানের ছকে ধরা যায় না, উৎপলা বিজ্ঞানাতীত।
পাথুরেঘাটার বাড়িটা উৎপলা নিজেই একদিন মাল্যবানের সঙ্গে গাড়িতে চড়ে দেখতে গেল। দেখে পছন্দ হল না তার। অন্য কোনো বাড়িও সুবিধেমতো পাওয়া যাচ্ছিল না। কাজেই ঠিক হল, মেজদার পরিবার এলে মাল্যবান নিজে কিছু কাল মেসে গিয়ে থাকবে।মাল্যবান তার হাতের অবশিষ্ট ঘড়িটা, ককতগুলো সোনার বোতাম (লুকিয়ে রেখেছিল বাক্সের ভেতর) বিক্রি করে শ-চারেক টাকা উৎপলাকে দিল। সোনার নেকলেসটা তাই আর বিক্রি করতে হল না।এই সব নানা ব্যাপারে উৎপলার মনটা খুশি হয়েছিল। এক দিন রবিবার সে মাল্যবানকে বললে, মনু অনেক দিন থেকেই বলছে চিড়িয়াখানা দেখতে খুব ইচ্ছে করে তার। আমিও তো শীগগির যাইনি। চলো-না আজ যাই।তিন জনে ট্রামে উঠল। খিদিরপুরের ব্রিজের কাছে এসে মাল্যবান তার পরিবার নিয়ে ট্রাম থেকে নামল।বাঃ, আলিপুর বা কোথায়, তুমি পথের মাঝখানে নেমে পড়লে যে—এই বাজারটুকুর ভেতর দিয়ে যেতে হবে, মিনিট তিনেকের পথ।খিদিরপুর-বাজারের পথ দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে উৎপলা নাক সিটকে বললে, ছি, মুর্গি খাসী বাজারের ভেতর দিয়ে। কলকাতা শহরে কি আর পথ ছিল না!মনু বললে, রামছাগলের বোঁটকা গন্ধ বেরুচ্ছে, বাবা। ইস, কী পেচ্ছাপের গন্ধ, ছ্যাঃ! ঐ দ্যাখ এক ছাগল কাটছে—ও-দিকে তাকিয়ো না মনু–আমাদের যদি একটা ছোটো অস্টিন গাড়িও থাকত, তাহলে এই নালা নর্দমা পচা কাদা আর মূতের গন্ধ কি আমাদের নাগাল পেত, মনু?আমি বড় হলে বাবা গাড়ি কিনবে। মনু বলল।একেবারে চিড়িয়াখানর গেটের কাছে গিয়ে গাড়ি দাঁড়াত, উৎপলা বলল, সেইখানে নামতাম। উৎপলা একটা নিঃশ্বাস ফেলল, কিন্তু এ নিঃশ্বাসটা চিংড়ি মাছ ঠোকরালে ফানা যেরকম করে নড়ে, তেম্নি হালকা আলতো উদ্দেশ্যহীন। চিড়িয়াখানার ভেতর ঢুকে উৎপলা বললে, এমন ঠাণ্ডা কেন গো, একেবারে হাড়গোড় কেঁপে ওঠে যেন।শালের ভাঁজ খুলে ভালো করে জড়িয়ে নাও, পলা।না, এ পাট-করা শালটা হাতেই থাক। শাল গায়ে দেবার মতো শীত দুপুরবেলা কলকাতায় কোথাও পড়ে না। হাঁটতে হাঁটতে বললে, এসব জিনিসের বাজে খরচ করতে হয় না। কেনই বা এনেছিলাম, হারিয়ে যায় যদি!আমার হাতে দাও।না, থাক আমার কাছে।মনুর দিকে ফিরে উৎপলা বললে, বাঁদর দেখবি, মনু—ঝাকড়া মাথাটা নেচে উঠল, হ্যাঁ, দেখব।তুই নিজেই তো একটা বাঁদর। তোকে এবার খাঁচায় আটকে রাখতে হবে। মনু, তুই আমার মেয়ে হয়ে জন্মালি রে!মাল্যবানকে বললে, চলো, বাঁদরের ঘরে যাই।গেল সকলে মিলে সেখানে।মনু বললে, দেখেছ মা, কলার জন্য হাত পাতছে; মা, কিনে দাও।কলা দেবে না হাতি। যা খাচ্ছে, তাই হজম করে নিক।কেন হজম করতে পারে না? অম্বল হয়?উৎপলা মাল্যবানকে বললে, এ জানোয়ারগুলোর মুখ তো নড়ছেই—নড়ছেই, পেটে আলসার-টালসার হয় না?কি জানি!মনু খুব অনুভাবাক্রান্ত হয়ে বাঁদরের খাঁচাগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল; হঠাৎ উৎপলা মেয়েটার চুলের ঝুঁটি ধরে টান মেরে বললে, তোকে এর মধ্যে পুরে দিলে বেশ ভালো হয়।আর একবার একটা হ্যাচকা টান দিয়ে বললে, মানুষের পেটে জন্মেছিলি কেন বল তো দেখি।মাল্যবানের দিকে ফিরে উৎপলা বললে, চলো, বাঘ দেখতে যাই।কিন্তু দুর্গন্ধে বাঘের খাঁচার থেকে অনেক পিছিয়ে রইল সে। বাঘগুলোর দিকে তাকাতেও গেল না। নাড়ি উল্টে বমি আসছিল উৎপলার। বললে, চিড়িয়াখানর ঢের হয়েছে। চলো, এখন বেরিয়ে যাই।মনু বললে, বাঘ আমার মোটেই দেখা হল না। বাঘ দেখতেই তো এসেছিলাম চিড়িয়াখানায়।কিন্তু, তার কথা কেউই গ্রাহ্য করল না।মাল্যবান স্ত্রীকে বললে, এই তত এলে চিড়িয়াখানায়; এখুনি বেরিয়ে যাবে? চলো, পাখি দেখে আসি।পাখি আবার একটা দেখে নাকি। ও তো দিনরাত দেখছি।না, না সে রকম পাখি নয়—পাখি আমি সব দেখে ফেলেছি। ও আমার দেখবার পিবিত্তি নেই।কলকাতায় তো দ্যাখ কাক আর চড়াই : সরাল তিতির কাকাতয়া মাকও, কতো রকম হাঁস, বক, ফ্ল্যামিঙ্গো, ধনেশ, শামকল—দেখবে এসো—দেখবে এসো—যে ধনেশ দ্যাখাচ্ছ তুমি দিনরাত।আমি?আরশোলা যেরকম কাঁচপোকা হয়, তেম্নি শামকল হয়ে যচ্ছে তো ধনেশটা— বলে ফির-ফির ফুর-ফুর ফিঃ-ফিঃ ফুঃফুঃ করে হেসে উঠল উৎপলা।তিনজনে মিলে সিন্ধুঘোটক দেখেতে গেল।মনু অত্যন্ত কাতর হয়ে বললে, সিংহ দেখা হল না আমার। বার-বার মরিয়া হয়ে বাপ-মাকে সে তার আবেদন জানাতে লাগল, সিংহ দেখব। সিংহ কোথায়? ঐ যে সিঙ্গি ডাকছে।কিন্তু কেউ তার কথা কানেও তুলতে গেল না।সিন্দুঘোটকগুলো রয়েছে একটা পুকুরের মধ্যে—ঢের নিচে। চারদিকে দেয়াল। একজন সাহেব ছুঁড়ে-ছুঁড়ে হেরিং মাছ, না, কী দিচ্ছিল তাদের। উৎপলা চেঁচিয়ে বললে, উঃ, কতো মাছ খাচ্ছে।তা খাবে না—হাতির মতো গতর।গা কেমন কেমন করে ওঠে যেন।কেন?এ যে বালতি-বালতি মাছ খেয়ে ফেলল।তা খাবে বৈকি।ডিসপেপসিয়া হবে না?মাল্যবান ঠোঁট চুমড়ে একটু হেসে বললে, হ্যাঁঃ, ডিসপেপসিয়া!মনুর মাথা দেয়ালের নিচে পড়ে থাকে; সে কিছু দেখতে পাচ্ছিল না। বার বার নাকি সুরে বাবা-মা-কে ডেকে বলছিল, কৈ, মাছ কোথায়? কী রকম করে মাছ খায়? কুমীরের মত নাকি সিন্ধুঘোটক? কৈ, সিন্ধুঘোটক কোথায়?কিন্তু, রাজঘোটকে যাতের বিয়ে হয়েছিল, সেই বাপ-মা এই মেয়েটির কোনো কথা খেয়ালের ভেতর আনল না।উৎপলার, কপালে গালে এমন সব খাঁজ ফুটে উঠল যে, কুৎসিং দেখাতে লাগল তার সুন্দর মুখটাকে বোঝা গেল, তার বয়েস হয়েছে; অবসাদে বললে এই তোমার চিড়িয়াখানা!কেন, মন্দ কী?নাঃ, এখানে আর কোনোদিনও আসা হবে না।আমার তো বেশ লাগে।দেখবার ভেতর দেখতে চেয়েছিলাম তো বাঘ আর সিংহ। তাও, বাবা, কী ভক-ভক করে গন্ধ আসে—কে এগোতে পারে!বাঘ কেন, দেখতে হয় পাখি।তোমার রুচি তো আমার নয়। শামকল পাখির চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখব আমি? তাহলে তো পাখিই সবচেয়ে ভালো মনে হত—সবচেয়ে ভালো লাগত শামকল পাখি—তাহলে মন্দ হত কি? প্রতীক পৃথিবীর সে-এক আলাদা নিগুঢ়তার ভেতররে যেন দাঁড়িয়ে বললে মাল্যবান বস্তুপৃথিবীর নারীকে।হল না তো।আসছে জন্মে হবে।আসছে জন্মে আবার শামকল! ওরে বাবা! উৎপলা ধড়ফড় করে কেঁপে উঠে বললে, না রে বাবা, তার চেয়ে কোনো জন্ম না পাওয়াও ভালো। জন্ম নিলে ময়ুর হয়ে উড়ে যাব আমি সেই গোরক্ষপুরের দিকে জঙ্গলে–সেখানে সরবতী দই বিক্রি করছেন বুঝি মহলানবীশ-মশাই। বেশ, বেশ, যেয়ো। চলো, চন্দনা তিতির দেখে আসি–মনু বললে, তিতির কী বাবা?মাল্যবান কোনো উত্তর দিল না, উৎপলার দিকে তাকিয়ে বললে, চলো, দাঁড়িয়ে যে, চলো। ডাকপাখি, বাজ, শিকরে বাজ, খানদানী শামকল দেখে আসি সব—দেখে আসি সব।কিন্তু একেবারেই কোনো তাড়া ছিল না উৎপলার। মাল্যবানের দিকেও তাকাতে গেল না সে। আমার একটু জিরোতে হবে রে বাবা। পা দুটো ধরে গেছে—মাজা ভেঙে গেছে—বাপরে!তিনজনে একটা গাছের নিচে ঘাসের চাবড়ার ওপর বসল।বসতেই উঠে দাঁড়িয়ে বললে, ঘাসের ওপর যে বড় বসলে সবাইকে নিয়ে; ঐ তত বেঞ্চি ছিল।বেঞ্চির চেয়ে ঘাসে বসতেই ভালো লাগে আমার।ঘাসে আমার কুটকুট করে, উৎপলা বললে;-বেঞ্চিতে গিয়ে একাই বসলে সে। বসে বললে, কত লোক তো বেঞ্চিতে বসে আছে; বসতে ভালো লাগে বলেই তো। উৎপলা নিজের মনেই তারপর বললে, এত সব লোক চারদিকে; তাদের সঙ্গে বেশ তো খাপ খায় আমার, অথচ ঘরের মানুষদের সঙ্গেই ষাঁড়াষাড়ির কোটাল। ঘাসে গা ছড়ে যায়, আমার শাড়ি নোংরা হয়, মুচি-মোচলমানের চন্নামৃতে গড়াগড়ি খেতে হয়—অথচ ঘেসুড়ে সেজে বসেছেন সব ওঁরা-ঘাস!—ঘাস না হলে হবে না। আঁটি আঁটি ঘাস বাঁধবে না-কি তোমরা বাপ-বেটিতে মিলে কথা বলে যেতে লাগল উৎপলা–মাল্যবানের থেকে উৎপলা হাত দশেক দুরে একটা বেঞ্চিতে বসেছিল, কিন্তু প্রতি মুহূর্তেই মাল্যবানের মনে হতে লাগল: এইটুকু ব্যবধান ঘোচাতে হলে—সত্যিই যদি ঘোচাতে পারা যায়-উৎপলার তরফ থেকে আহ্বান আসবে না কোনো দিন। তা ছাড়া, বেঞ্চিতে তো ঘাসের ভেতরে ঘাস নয় : মনু আর আমি ঘাস—ঘাসের ঢেউয়ে; বেঞ্চিটা ঘাসগাছের কাঠেও তৈরি নয়—ধানগাছের কাঠেও নয়; সে রকম কাঠ নেই কোথাও; কেঠো কাঠ আছে; এত ঘাস থাকতে কী ভীষণ কেঠো কাঠের বেঞ্চি চার দিকে সব।উপলা বললে, চলো, এই বেলা বেরিয়ে পড়ি; প্রকাশবাবুর আজ সন্ধ্যের সময়ে আসার কথা ছিল।পাখি দেখবে না?আমি সিংহ না দেখে যাব না। মনু বললে।আচ্ছা, ঐ যে একটা টেবিলের চারদিকে বসে কয়েকটি লক্কা মেয়ে চা খাচ্ছে, ওরা কারা?চিনিনা তো, দেখিনি কোনো দিন। মেয়েদের দিকে না তাকিয়েইমাল্যবান বললে।কেমন এক বিঘৎ পেট বার করে শাড়ি পরেছে; কেমন কানের পাশে জুলপি ঝোলাবার কায়দাটুকু। নিশ্চয়ই আইবুড়ো এরা সব। বাস্তবিক, যার বিয়ে করেনি, তাদেরই রগড়— বলে উৎপলা মুখ ফিরিয়ে চোখ দিয়ে গিলতে লাগল যেন মেয়ে কটিকে।মাল্যবানের ভালো লাগল না। ওদের দিকে চোখ দিয়ো না, বাপু। ওরা চা আর স্কোন খাচ্ছে। কেন চোখ লাগাচ্ছ পলা।মাল্যবান কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ হয়ে ঘাসের শিষের সাদার দিকে তাকিয়ে রইল; কিছুক্ষণ মনুর কোঁকড়া চুল নিয়ে খেলা করল; তারপর উৎপলার দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখল, তেম্নি করেই মেয়ে, কটির দিকে গোগ্রাসে চেয়ে আছে সে।এখানে এসে বোসসা তুমি—এই নরম ঘাসে।চলো, এখন উঠি।কোথায় যাবে?এখানে বসে কী আর লাভ।তোমার পা ব্যথা করছে, বলছিলে—চা খাবে?না। ব্যথা কমে গেছে।চলো-না, ঐ মেয়েদের পাশে আর-একটা টেবিল খালি আছে–না, তুমি আমাকে আর এক দিকে নিয়ে চলো। মেয়ে কটির দিকে পিছন ফিরে হাঁটতে-হাঁটতে উৎপলা বললে,ভেবেছিলাম, আজ কপালে সিঁদুর-টিপ পরে আসব না—কেন?সব সময়ই এ-সবের কী দরকার।হ্যাঁঃ, রেওয়াজ উঠে গেছে,মাল্যবান বললে, ওসব টিপ-টাপ ফেঁদে কী হবে।যদি না সিঁদুর ধেবড়ে আসতাম, তাহলে এই মেয়েরা কী মনে করত, বলো তো দেখি–মাল্যবান একথা সে-কথা ভাবছিল, বললে, মনে করত একটা কিছু। মনে করার বালাই নিয়ে মরি আমি।তোমাকে হয়তো মনে করত আমার মেসো কিংবা মামাশ্বশুর—আমাকে যদি ওরা তোমাদের বাড়ির খাজাঞ্চি কিংবা সরকার মনে করতে পারত, তাহলে হয়তো খানিকটা লাভ ছিল—মাল্যবান হাঁটতে হাঁটতে একটা চোরকাটা ছিড়ে খড়কে বানিয়ে বললে, সেই যে বিলেতে গিয়ে মাখন ভোলা শিখে এসেছে—সব সময়ে সাহেবি পোশাকে থাকে, সাহেবি করে বেড়ায় সেই যে মাখন তোলার সাহেব আমাদের মতীন চৌধুরী গো—তাকে যদি সঙ্গে করে আনতে পারতে, তাহলে তোমাকে ওরা ছো-ছো করে চিলের চোখ দিয়ে দেখে নিত বটে। ওদের ঐ রকমই তো স্বভাব। আমার মত ধনকৃষ্ণের সঙ্গে চিড়িয়াখানা রোঁদ দিতে এসেছ-এ আবার একটা দেখবার কী। চোখ তুলে তাকিয়ে দেখবে কে!মতীন চৌধুরী কে?আহা, বললাম যে বিলেত থেকে মাখন তুলতে শিখে এসেছে।দুধের থেকে মাখন তুলতে?হ্যাঁ, হ্যাঁ, মাখন তোলার সাহেব—তার সঙ্গে আমি চিড়িয়াখানায় আসতাম—মানে?এম্নি বলছি—কথার কথা—তুমি বড্ড বেকুব।আমি একটা দৃষ্টান্ত দিচ্ছিলাম—কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে চলছিল না তারা কোন দিকে যাচ্ছিল খেয়াল ছিল না, এম্নি শীতের বিকেলে ঘুরে বেড়াচ্ছিল চিড়িয়াখানার চিলতি-চিলতি মাঠ ঘাসের ভেতর-রাস্তায়-বেরাস্তায়।তোমার মাইনে তো আড়াই শো হল। রিটায়র করবার আগে কতো হবে?দু শো পঁচাত্তার–তিন শো—এর বেশি না?না।উৎপলা ভাবছিল। চিন্তার মাঝপথে থেমে বললে, আড়াই শো টাকা মাইনেতে কি গলাবন্ধ কোট ছাড়া আর কিছু পরা যায় না?কেন যাবে না? ধুতি-পাঞ্জাবি পরা যায়। আজকাল অনেকেই তো তা পরছে।তা নয়, আমি বলছিলাম হ্যাট-টাইয়ের কথা। কেন পর না তুমি? পরলে মানায় না বটে তোমাকে। কেমন যেন খাপছাড়া দ্যাখায়! এরকম হল কেন?কেন হল? মাল্যবান তার হাতের ঘাসের শিষটা দাঁত দিয়ে কাটতে-কাটতে বললে, চিনি মিষ্টি, আর নুন নোতা কিনা উৎপলা—সেই জন্য হল।খানিকটা দুর নিঃশব্দে এগোল তারা। মনুর কথায় কেউ কান দেয় না, নালিশ কেউ শোনে না, সেই জন্য সে অনেকক্ষণ থেকেই চুপ মেরে গিয়েছিল।উৎপলা বললে, খোঁচা-খোঁচা দাড়ি—কেমন দ্যাখাচ্ছে তোমাকে-চেঁচে এলে না কেন?হঠাৎ তোমরা সকলে বললে, চিড়িয়াখানা দেখবে—সময় পেলাম কোথায়?তাই তো! কী দিয়ে চাঁচবে—জিনিস পাবে কোথায়!দাড়ি যারা সত্যিই চাচে, প্রথম পক্ষের মাগীকে শ্মশানে পোড়াতে পোড়াতে গালে হাত বুলিয়ে নেয়—তাই নেয় বুঝি।দাড়িটা কামানো হল কি না দেখে নেয়।চিড়িয়াখানার থেকে বেরুচ্ছে না কিছু দেখছে না—বসছে না কোথাও—পায়চারি করার মতো আস্তে-আস্তে হাঁটছে—ঘাসের ওপর দিয়েই বেশি। কোথায় চলছে—কেন চলেছে—খেই-খেয়াল না হারালেও শুধোচ্ছে না কেউ কাউকে। মনু কোনো কথা বলছিল না। তার পা টাটাচ্ছিল বুক ধড়ফড় করছিল, জিভ শুকিয়ে আছে অনেকক্ষণ। কিন্তু তার কোনো কথায়ই কেউ সাড়া দেয় না, সায় দেয় না বলে কাউকেই সে কিছু বলতে পারছিল না। মনু খানিকটা পিছে পড়ে গিয়েছিল; তার জন্য দুজনে খানিকক্ষণ থেমে দাঁড়াল। মনু এল।মাল্যবান ঠিক উৎপলার মনের মতো ঠাটে পা ফেলে হাঁটতে পারছিল না। পা দুটো কিছুতেই আড় ভাঙতে চায় না যেন, উৎপলা যা চায় মাল্যবানের পায়ে—পদক্ষেপে সে সৌন্দর্য, মাত্রা, দৃঢ়তা কিছুতেই ধরা পড়ে না। হাঁটতে হাঁটতে তারা বাঘের ঘরের কাছে এসে পড়ল আবার। খাঁচার ওপর থেকে থপাস-থপাস করে ছুঁড়ে কাচা মাংস দেওয়া হচ্ছিল জানোয়ারগুলোকেকী রকম করে এরা মাংস খায়, দেখবো এসো।উৎপলা মাথা নেড়ে বললে, এখন বেরিয়ে যাব।হাঁটতে হাঁটতে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে উৎপলা বললে, আমার দাদা মেজদা ছোড়দা এ-রকম নয়। কখনো ন্যাং ন্যাং করে হাঁটে না তারা।সামনে তাকিয়ে দেখল দুটো মস্ত হাতি দাঁড়িয়ে রয়েছে-আশে পাশে অনেক ডাল পালা কেটে রাখা হয়েছে, হাতিগুলো ক্রমাগত শুড় দিয়ে সেগুলো টেনে টেনে খাচ্ছে। মনু বললে, দেখলে বাবা, কী রকম শুড় দিয়ে কলা টেনে নিয়ে মুখের মধ্যে ফেলে দ্যায়।একটি মুসলমান ছেলে কলা দিচ্ছিল—পাঁচ-ছ-টা হাতি, কিন্তু কলা মাত্রর দশ-বারোটা; কিন্তু হাতিগুলোর হায়া আছে, নিয়ম মেনে চলাটা দেখবার মতো; পাশাপাশি কটাতে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু কেউ কারু ভাগ নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে না, যার কপালে যেটুকু প্রসাদ পড়ছে, তাই নিয়েই তৃপ্ত; তারপর ডালপালার দিকে মন।মাল্যবান বিমুগ্ধ হয়ে দেখছিল; বললে, মানুষের চেয়ে জীবনটাকে এরা বেশি বোঝে। জীবনের কষ্ট ও একঘেয়েমি সহ্য করবার ক্ষমতাও এদের চীনের বা ভারতের জ্ঞানবিষ্ণুদের মতো। বাস্তবিক, হাজার দুহাজার বছর আগে এরা ভারতে চীনে সমাজের বড়-বড় জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখেছে শুনেছে রক্ষা করেছে—ধর্ম কর্মের বিধান দিয়েছে বলে মনে হয়।শুনে উৎপলা কোনো সান্ত্বনা পেল না। হাতির কুলোর মতো কান ও বুড়ো দিদিমার মতো মুখ দেখে কেমন যেন কৌতুক, অসাধ, নিরেস অস্বস্তি বোধ করছিল সে। বললে, থাক, অনেক হয়েছে; এখন চলো।হাঁটতে হাঁটতে মাল্যবান বললে, একবার বেরিয়ে গেলে ঢুকতে পারবেনা কিন্তু আর।আমি ঢুকতে চাইও না আর। এ-জায়গায় কোনো দিনও আর আসা হবে বলে মনে হয় না।চলো, ছোলা কিনে নিয়ে কাকাতুয়ার ঘরে যাই; দানা খাবে আর পড়বে কা-কা-তু-য়া।এক-আধটা পাখি বেশ পড়ে। সবগুলোই পারে?পড়ালেই পারে। চলো।থাক।নানা রঙের কাকাতুয়া আছে, বেশ পশমের মতো পালক; ডানার দিকে তাকিয়ে মনে হয় যেন আগুনের থেকেই উৎপত্তি হয়েছে ওদের সব—আগুনের ভেতর খেলা করছে সব—আগুনে আগুনে খেলা করে একদিন আকাশে নীলিমায় মিলিয়ে যাবে-চলো—চলো—উৎপলা দাঁড়িয়ে রইল; আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে বললে, ঐ তো টেবিলটা, সেই মেয়ে চারটি ওখানেই বসেছিল? ওখানে?মাল্যবান কিছু বলবার আগে উৎপলা বললে, কোথায় গেল তারা?চলে গেছে।চিড়িয়াখানার ভেতরে কোথাও তো তাদের দেখলাম না।এত তাড়াতাড়ি বেরুল যে?ঢুকেছিল আমাদের ঢের আগে। দেখাশোনা মজা-মারা হয়ে গেল-বসে থাকবে কেন। বেশ্যের ছেলের অন্নপ্রাশন কি সারাদিন বসে খাবে?মাল্যবানের অন্নপ্রাশনের কথাটা কোনো কথা নয়; একবার দাঁত দিয়ে চিবিয়ে চোয়াল শক্ত করে কথাটা তারপর ঝেড়ে ফেলে দিল উৎপলা; বললে, দেখলাম, মেয়ে কটির প্যাচে প্যাচে বেশ জিলিপির রস। হাত তুলে ফুর্তি করছে। আগা-পাস্তলা মিঠিয়ে ঝিকিয়ে কী ফুৰ্ত্তির তোেড়—সারাটা সময়; কেঁসে যাচ্ছে না তো—আমার ও-রকম হয় না তো।বেঁচে যেতে বুঝি ওদের মতো ফুৰ্ত্তি করতে পারলে?হলে কেমন হত? একটা বীতকাম নিঃশ্বাস ছেড়ে উৎপলা বললে।ফুৰ্ত্তি মানে আমোদ—আমোদ বলছ তুমি—সত্যিকারের আমোদ–মানে, আনন্দ?মাল্যবান ঘাসের ওপর পিছ কেটে বললে, ওঃ, ঐ সব মেয়ে! ওরা তো ছেনাল—আনন্দ-আমোদের ইস্টকুটুম আমার সব। ওদের কথা ভাবে মানুষে! ওদের খাঁটিয়ে আবার কথা বলোমাল্যবান দাঁত-মুখখিচিয়ে পিচকাটল ঘাসের ওপর আবার।তবে কী; ছাগল দিয়ে ধান মাড়িয়ে দশ মুখ করে সেই ছাগলের কথা বলে বুঝি?চলতে-চলতে মাল্যবান থেমে গেল।কোথায় যেতে চাচ্ছ তুমি?এবারে চিড়িয়াখানা থেকে বেরিয়ে যাব। উৎপলা বলল।আমি তা বলছি না। তুমি রাখালী করে ধান খেতে চাচ্ছ তো ছাগলকে সরিয়ে। দিয়ে। ঐ মেয়েগুলোর মতো পাটে এসে বসতে চাচ্ছ তো—কে না চায় পেতে বসবার পাট। কিন্তু দেবার ভার তো শামকলের ওপর নয়। মনু, এদিকে আয়। কেউ কারু ওপর বরাত দিতে পারে না। ধনেশ পাখি ঠোঁট কেলিয়ে বসে থাকবে—মাড়োয়ারী কবে তার তেল নিতে আসবে, সেই জন্যে-চন্দনা নিজের পাটে উড়ে যাবে। মনু!মাল্যবান চিড়িয়াখানার থেকে বেরিয়ে যাবার গেট এড়িয়ে অন্য পথ ধরে চলতে লাগল। উৎপলা বুঝতে পারল না। অনেকক্ষণ হোঁটে বললে, কৈ, এ-গোলক ধাঁধা ফুরোয় না দেখছি।বেরুতে চাও?মনু কোথায় গেল—চলো ঘুরি।ঘোরো তুমি।তুমি কী করবে?একা তো বেরিয়ে যেতে পারবে না। কাছে একটা বেঞ্চিতে গিয়ে চোখ বুজে বসল উৎপলা।পা টাটাচ্ছে?একটা খালি বেঞ্চি—আলগোছে তার এক কিনারে বসে পড়েছে। উৎপলা—একটা হাত তার বুকে—আর একটা কোলের ওপর ভাটার টানে সমুদ্র সরে গেলে ভিজে ঝিনুক, পরগাছার ঠাণ্ডার মতো করুণ হয়ে পড়ে আছে। খানিকক্ষণ এদিক সেদিক উঁচু উঁচু গাছের মাথায় আকাশের মেঘ আলোর দিকে তাকিয়ে কী যেন কেমন একটা অন্তিমপ্রতিম অর্থ অবধান করে তারি কাছে শান্ত নিস্তব্ধ হয়ে নিজেকে নির্বিশেষে ছেড়ে দিল উৎপলা; একটু কাৎ হয়ে ডান হাতের ওপর মাথা পাতল; চোখ বুজে এল।মনুও ঘাসের ওপর ঘুমিয়ে পড়েছে।
পরদিন উৎপলা আগ বাড়িয়ে বললে, সিনেমায় চল।অফিস ছুটি ছিল সে-দিনও তিনটের শো-তে গেল তারা। ট্রাম থেকে নেমে উৎপলা বললে, বক্সে বসবে তো?না, সে ঢের খরচ।তাহলে কোথায় যাবে আবার। ছবিতে বক্সে না বসলে ভালো লাগে না।কেন, নিচের গদিতে বসেও তো বেশ আরাম।আরামের জন্যে বলছি না আমি—তবে?বক্সে বসলে নিচের লোকেরা হাঁস-হাঁসিনের মতো ঘাড় বাঁকিয়ে আমাদের দিকে তাকায়, দেখতে বেশ লাগে।মাল্যবান হেসে বললে, ওঃ সেই। তন ঘণ্টার জন্যে তো শুধু, তারপর সিনেমা ভেঙে গেলে কেউ কি আর বক্সের মানুষদের কথা মনে রাখে।তা রাখে বৈ কি। যদি কোনো চেনা মানুষ নিচের থেকে আমাদের দেখতে চায়, তাহলে জনে-জনে বলে বেড়াবে কথাটা। আচ্ছা রগড়ই হবে! খুব কি খারাপ জিনিস হবে কথাটা চার হাত-পায়ে চতুর্দিকে ছুটে বেড়াবেকেমন যেন নির্দোষ শয়তান মেয়ের মতো হাসি-ভেঁপো ইশকুলের উৎপলার পাউডার -ক্রিম মাখানো চমৎকার মুখখানাকে আঁকড়ে ধরল। হি-হি করে হাসতে লাগল সে।মাল্যবান আড়চোখে একবার উৎপলার দিকে তাকিয়ে বললে, না, তা নয়—তবে এতে আমাদের কী আর লাভ।বেশ রগড় হয়।এ-রকম রগড়ের কী আর মূল্য আছে।মূল্য নেই? তুমি বললেই হল নেই? নিশ্চয়ই আছে। না থেকে পারে না।হাঁটতে—হাঁটতে উৎপলা বললে, সে দিন তো সোনার ঘড়ি বেচে তিন শো পঁচাত্তর টাকা পেলে-বক্সের টিকিট কিনতে তোমার এত ভয়—মিছেমিছি পয়সাবাজি করে কী লাভ।মিছিমিছি হল?চেনা মানুষ কে এমন থাকবে নিচে যে, বক্সে আমাদের দেশে ঈর্ষায় রাতে ঘুমোতে পারবে না আর। বলেই মাল্যবান একটু দাঁত বার করে হাসল।উৎপলা বললে, ঝপ করে মিথ্যে কথা বলে ফেললে।কেন, মিছে কথা কী হল?ঈর্ষার কথা বলেছিলাম আমি?বেশ মজা হবে, বেশ পাঁয়তাড়া কষা হবে, বলেছিলে তুমি। তা তো হবে, কিন্তু অন্যেরা ঈর্ষায় না পুড়লে রগড় ফলাও হয় কী করে?বেশ তো, পুড়ুক হিংসায়।বেশ। পুড়ুক। মাল্যবান টিকিট-ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।মাল্যবান অবিশ্যি সেকেন্ড ক্লাসের টিকিট কাটল—ম্যাটিনির সময়ে আর্ধেক দামে পেলে—তিন-চার টাকাও খরচ হল না তার।যাক, আমি বাড়ি ফিরে যাই— উৎপলা প্লাগ ঢোকাতে গিয়ে বিদ্যুতের ঘা খেয়ে যেন বললে।কেন?দেখব না সিনেমা।তুমিই তো সকাল থেকে তাড়া দিলে সিনেমায় আসবার জন্যে।ঢের হয়েছে, আর কোনোদিন আসতে চাইব না।কিন্তু এখন তো চলো।তুমি আর মনু যাও।আর তুমি?ঠিক আছে। যাও তোমরা।হুশ, এ-রকম ছেলেমানুষি করে নাকি, পলা।কী টিকিট কিনেছ, দেখেছি আমি, ঝামটা মেরে উৎপলা বললে, ছেলেমানুষি? আমার? নাম ডোবালে তুমি। ধনবান খোয়ালে টিকিট কিনে। ওমা, থার্ড ক্লাসের টিকিট।কে বললে তোমাকে? টিকিটগুলো উৎপলার চোখের সামনে ধরে মাল্যবান বললে, সেকেন্ড ক্লাসতবে দেড় টাকা নিয়ে কেন—সেকেন্ড ক্লাসে তো তিন টাকা দুআনা নেবার কথা—ম্যাটিনিতে অনেক দিন পরে এলাম, তাই ভুলে গ্যাছ দর-দস্তুর সব। এটা ম্যাটিনি—আদ্ধেক দাম—উৎপলা দুএক পা হেঁটে মুখিয়ে এসে বললে, তাহলে ফার্স্ট ক্লাস করলেই পারতে।ভেবেছিলাম, কিন্তু তাতে সীট বড় পেছনে পড়ে যেত।আ মল! সিনেমায় পেছনে বসেই তো ভালো দেখা যায়—কিন্তু, তুমি চোখে তো কম দ্যাখ—কে, আমি? উৎপলা মাল্যবানের দিকে সাঁ করে তার গালে চড় মারবার মতো চোখ তুলে তাকাল, আমি চোখে কম না দেখলে সেকেন্ড ক্লাসের টিকিট কেনার ওজোর টেকে না? না-কি?তাই বুঝি তাই? গত বার যখন তোমাকে ফার্স্ট ক্লাসে নিয়ে গেলাম, তুমি সমস্তটা সময় আমাকে বললে, কিছু দেখছ না, ঝাপসা দেখছ—তুমি তো সামনে এগিয়ে বসতে চাইছিলে সেদিন।— বলতে বলতে মাল্যবান উৎপলার দিকে সোজাসুজি মুখ ফিরিয়ে তাকিয়ে বললে, দাঁড়িয়ে রইলে যে—আমি বড় রাস্তার মোড়ে গিয়ে একটা বাস ধরে চলে যাব।ছবি দেখবে না?উৎপলা মুখ ফিরিয়ে রইল।মাল্যবান বললে, বেশ, বাড়ি চলো তাহলে—এ-টিকিটগুলো পাল্টে টাকা নিয়ে এসো।এখন ফেরৎ নেবে কেন?তাহলে বিক্রি করে দাও কারু কাছে।কে কিনবে?গলাবন্ধ ছিট, খোঁচা দাড়ি দেখলে কেউ কিনবে না বটে?আজ অবিশ্যি মাল্যবান একটা তসরের পাঞ্জাবী গায়ে দিয়ে এসেছিল—দাড়িও কামিয়ে ছিল।একটু কাঠ মেরে গিয়ে, হেসে, হাসিমাখা দাঁতে কুণ্ঠায় সঙ্কোচে মাল্যবান ইতস্তত তাকাতে লাগল কার কাছে টিকিট বিক্রি করা যায়। দু-চার জায়গা ঘুরে সুবিধে হল না। তারপর একজন ভদ্রলোক টিকিট নেড়ে-চেড়ে বললেন, আজকের তারিখ তো? কলকাতা শহরে নানা রকম চোট্টা থাকে; যাক, তারিখটা আজকেরই; হ্যাঁ, এই সেন্টারের সীটই আমি চেয়েছিলাম আমি আর আমার দুই মেয়ে। তা বেশ, টিকিটের মাথায় চেয়েছিলাম—আমি আর আমার দুই মেয়ে। তা বেশ, টিকিটের মাথায় দুআনা দুআনা কম নেবেন,—একুনে ছ গণ্ডা পয়সা কমিয়ে দিতে হবে। আপনার তো সবই ভাগাড়ে গড়াচ্ছিল–পকেট থেকে ব্যাগ বার করে ভদ্রলোক বললেন, আট আনার টিকিট ফুরিয়ে গেছে কিনা সব। এসেছিও সেই চেলার থেকে কলকাতায় ছবি দেখতে। ফিরে যেতে তো আর পারি না; নইলে আমি ও হাতির শুড় ব্যাঙের লেজ সব অফিস থেকেই কিনি। তা এই একটা টাকা নিন, টিকিট তিনটে দিয়ে দিন আর-কি।উৎপলা মাল্যবানের পাঞ্জাবীর ঝুল ধরে এক টান মেরে বললে, কৈ, ভেতরে তো ঘণ্টা পড়ে গেছে। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে পা ব্যথা হয়ে গেল, তবুও তোমার ন্যাকড়া ফুরায় না দেখি।শুনে মাল্যবানেরা পা চালাতেই ভদ্রলোকটি বললেন, ও মশাই, ও মশাই, শুনছেন দেড় টাকাই দিচ্ছি, নিন, আসুন, নিন। ও মশাই, ও দাদা!আর ও দাদা! তিন জনে ভেতরে ঢুকল। মনু মাঝখানে, দুপাশে দুজন; গদি-আঁটা চেয়ারে অন্ধকারের মধ্যে বেশ লাগছিল মনুর—মাল্যবানেরও। বই আরম্ভ হয়ে গেছে।উৎপলা পর্দাটাকে অগ্রাহ্য করে ওপরের দিকে তাকাতে লাগল বেশি। বক্সে কে কোথায় বসেছে ঠাহর করতে পারা যায় কি-না, কোনো চেনা মুখ চোখে পড়ে কি-না; ফাস্ট-ক্লাসের সীটের বা কারা; এই সব নিয়ে অনেক কটা মুহূর্ত কেটে গেল তার। কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে বিশেষ কিছু বুঝল না সে। তারপর নিঃশ্বাস ফেলে অবসন্ন হয়ে ছবির দিকে তাকাল। একজন অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান পুরুষ উৎপলার পাশের সীটে বসে সিগারেট টানছিল; মন তার বিচ্ছিরি লাগছিল তাতে।মাল্যবানকে বললে, তুমি এখানে এসো, আমি তোমার চেয়ারে গিয়ে বসি।সীট বদলে যখন বসেছে, উৎপলা দেখল তার পাশে একটি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান মেয়ে চকোলেট খাচ্ছে আর কাশছে–অনবরত কাশছে—ব্যতিব্যস্ত বোধ করল উৎপলা, পর-পর চার-পাঁচটি ফিরিঙ্গি মেয়ে বসে গেছে। উৎপলা মাল্যবানকে বললে, এ পাঁচ জন কি বি.এন.আর.-এর মেয়ে নাকি টেলিফোনের–আস্তে।মেয়ে কটি নিজেদের বাড়ির খবর হাঁড়ির খবর, মাঝে-মাঝে ছবির তাৎপর্য নিয়ে গলা ছেড়ে হাঁকড়াবার জন্যেই হাজির হয়েছিল। যখনই ঘরোয়া কথা বলবার তাগিদ জুড়িয়ে যাচ্ছিল, হেসে, হল্লা করে চিৎকার পেড়ে, পর্দার ছবিটাকে তারাই তো জীইয়ে রাখছিল—কিছু জানে না, বোঝে না, কলির সন্ধ্যায় কী করবে আর, চ্যাঁচাচ্ছে–একটু নড়ে-চড়ে বসে কৌতুকে ও বিমর্ষতায় বিমিশ্র একটা নিঃশ্বাস ফেলে উৎপলা বললে।কাদের কথা বলছ?ফিরিঙ্গি মেমদের : গুল ছাড়ছে শুনছ না?কেন ঘাঁটাচ্ছ ওদের? মাল্যবান উৎপলার কাঁধের ওপর এক বার হাত রেখে হাত সরিয়ে নিয়ে বললে।কিন্তু, তবুও, কথা বলবার দরকার আছে ঢের উৎপলার। চাপা গলায় বললে, ছবি তো আমরাও দেখছি, বাপু, তোমরাও দেখছ। ছবি তো চিত্তির: তা তো দেখছিই! কিন্তু তাই বলে দিক-বিদিকে নয়া আণ্ডা ছুঁড়ে একেবারে ঝোল বের করে দেবে না-কি? পর্দায় এক জনে একটা ছেড়া ট্রাউজার পরে এসেছে—-ওম্নি হি-হি করে হাসি; একটা গাধা দৌড়ে গেল—ওমি হু-হু-হু-হু; পকেটের থেকে একজনে এক জোড়া নকল গোঁফ বের করল—ওমি ফ্যা-ফ্যা; বাস্কেটের থেকে একটা হাঁদুর লাফিয়ে পড়ল তো আমাদের মাথায়ও চাতাল ফাটল। হাতিবাগানে আগুন লেগেছে, না-কি দমকল ছুটেছে, না-কি শোভাবাজারের দামোদর বাবুরা সব খুন হয়ে গেল—এ কী-সব মাগীদের কোলে করে বসেছি আমি।মাল্যবান ঘাড় কাৎ করে একটা সিগারেট জ্বেলে নিল। উৎপলা বা অ্যাংলোইণ্ডিয়ান মেয়েদের দিকে সে ফিরে তাকাল না। ছবিটা তাকে আকৃষ্ট করেনি। মাল্যবান ছবি দেখতে-দেখতে নিজের সত্তার ভেতরের অঙ্গারশিল্প ও কাঠখোদাইয়ের আবছায়া-মতন অনুপম ছবিগুলো দেখে নিচ্ছিল—চোখ বুজে। বাস্তবিকই চোখ বুজে ছিল সে।..ঘুমোচ্ছিল না, কথা ভাবছিল; কারা যেন কোথায়—অনেক দূরে সঙ্গত করছে। এক-মনে শুনছিল সে।মাল্যবানকে একটা ধাক্কা দিয়ে উৎপলা বললে, রেলী ব্রাদার্সের, না, পোর্ট কমিশনের বিয়ে করেছে, না রাঁড়ি?মাল্যবান যেন অপারেশন টেবিলের ক্লোরোফর্মের ঘোর আস্তে আস্তে কাযিয়ে উঠতে উঠতে চোখ মেলতে মেলতে বললে, কে?এই যে মেমসাহেব কটি : আমার পাশে যারা বসে আছে?ওরা? মাল্যবান অনেকখানি জেগে উঠে আরো জেগে উঠতে চেয়ে, তারপরে বললে, ওদের দিয়ে তুমি কী করবে?আমাকে ছবিটা দেখতেই দিচ্ছে না।ওদের মনে ওরা থাক। ছবি দেখতে দিচ্ছে না বলছ। দ্যাখ ছবি; দেখলেই তো দেখা হল।বলে দিল কথা! আর বাপু, কী রকম গুল মারছে শুনছ না। হাড়হদ্দ ঘাঁটিয়ে বার করছে।কীসের?না কীসের?ওদের কথায় কান দিয়ো না।কান টেনে মাথা টেনে নিয়ে যায় যে—বাপ রে, উৎপলা ধড়ফড় চন মন করে উঠল, আমাকে চেপে বসেছে। ধরছে—উঃ!দ্যাখ-না, ছবিটা দ্যাখ–এই জন্যেই আমি বলেছিলাম বক্সের কথা। উঃ! ধরধর-হাতিমুখো গণেশ এসে আমার কোল ঠেসে বসেছে রে বাবা—গেল—গেল—হয়ে গেল—হয়ে গেল আমার—ছবিটা দ্যাখ, ছবিটা দ্যাখ মাল্যবানের সীটে এসে বসল উৎপলা। মাল্যবানকে যেতে হল তার স্ত্রীর চেয়ারে। সেই অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পুরুষটি রইল উৎপলার পাশে। কিন্তু লোকটা চুপচাপ, উৎপলার কোনো অসুবিধে হবার কথা নয়।খানিকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে উৎপলা বললে, খুব, হিজিবিজি বই, না?ছবিটা ভালো মনে হচ্ছে না।খারাপও লাগছে না তোমার। আড়ি পেতে তাকিয়ে আছ তো বাপু।কী করব, আট গণ্ডা পয়সা দিয়েছি—মনু ঘুমোচ্ছিল।উৎপলা তার মাথায় একটা গাঁট্টা মেরে বললে, দ্যাখ, ছবি দ্যাখ—তোর জন্যেই তো গচ্চা গেল দেড় টাকা। খা-খা—গঙ্গার ইলিশ খা–না খাবি তো সুঁটকি মাছ খা। চার দিকে সব বকনা বাছুর হা করে তাকিয়ে আছে। তাদের কানে ডাঁশ উড়ছে। কী খাবি খা—কী খাবি খা— বলে গাঁট্টা মারতে মারতে মনুকে জাগিয়ে দিল উৎপলা।মনু চোখ কচলাতে-কচলাতে এ-দিক সেদিক তাকিয়ে অবশেষে ছবির দিকে ফিরে চুম্বক পাহাড়ের দিকেই ফিরল যেন;—এমনই লেপটে রইল ছবির গায়ে যে, কিছুই দেখল না আর। দেখে-শুনে তবুও গাঁট্টা মারতে গেল না আর মনুর মাথায় উৎপলা। সময়ের ভিতরে নয়—নিঃসময়ে নয়, নিজের প্রাণে অথবা হৃদয়েও নয়—অথচ এই সবেরই পরিচিত-আধোপরিচিত কেমন একটা আপতিত নিরবচ্ছিন্নতার ভেতর ঘাড় হেঁট করে ডুবে যেতে লাগল উৎপলা অনুপম অপর দেশের অপর জীবন অন্ধকার মৃত্যু নিৰ্দায়ের ভেতর।
চার-পাঁচ দিন পরে উৎপলা পিওনের হাত থেকে একটা কার্ড নিয়ে পড়তে-পড়তে উৎফুল্ল হয়ে বললে, বড় বৌঠানের সংবাদ লিখেছে।মাল্যবান সর্ষের তেল গায়ে মাখছিল, এই বয়েসে আবার সংবাদ— বলে নিরেস চোখে-মুখে তেল মাখতে লাগল আবার।তা হবে তো। কেন হবে না?বড় বৌঠানের বয়স না কত?চুয়ান্ন।এ-রকম বুড়ো গিন্নিদের যে ছেলেপুলে হয়, তা আমি জানতাম না।উৎপলা কার্ডটা ব্লাউজের ভেতর গলিয়ে দিয়ে বললে, তুমি কি বলতে চাও ভেঙে বলো তো দিকি–তা নয়, আমি বলছিলাম–মাল্যবান চুপচাপ তেল মাখতে লাগল।না বললেও বুঝেছি আমি, পেটে-পেটে তুমি কী বলতে চাওনা, না আমি ভাবছিলাম–মাল্যবান-থেমে গিয়ে হঠাৎ এক ফাঁকে ঝপ করে বলে ফেলল, আবার এই বয়েসে ছেলেপুলে—সে কি বাবা, ছেলেটা না আসতেই মারমুখো হয়ে আটকে দাঁড়াবে না-কি?আমি দাঁড়ালেই—শোনে কে— দাঁতে কেটে-কেটে হাসতে হাসতে মাল্যবান বললে।উৎপলা গুনগুন করে গাইতে-গাইতে ছাদের দিকে গেল—বড় বৌঠানের সন্তান হবে বলে ছায়ানট-ছায়ানটের পরে ভীমপলাশী-তারপরে বাগেশ্রী—কিন্তু প্রত্যেকটা গানেরই এক-আধ লাইন মাত্র। পিঠে তেল মাখতে-মাখতে মাল্যবান ভাবছিল : নিজের বেলা তো উৎপলা এই বারো বছর ধরে ষষ্ঠীকে # দেখিয়ে গেল, একটি সন্তান যা হল, তাও মেয়ে; এই প্রথম, এই-ই শেষ; বংশে ছেলে না হলে না-ই বা হল—এই তো ভাবে উৎপলা। কিন্তু পরের বেলা যে তেরোটির পর চৌদ্দটিকে দ্যাখ কেমন বেহাগ ভৈরবী কীর্তনের সুরে ফলাও করে ফলাচ্ছে ছাদে-ছাদে। এটা কী কাজ করছে উৎপলা, ঠিক কাজ করছে? ঠিক নয় অবিশ্যি। মোটেই ঠিক নয়। কিন্তু, তবুও, এইটেই ঠিক।পায়ে তেল মাখতে-মাখতে মাল্যবানের মনে হল : কি জানি, আমার বদলে অন্য কোনো দশাসই পুরুষের স্ত্রী হলে এত দিনে উৎপলাও আট-দশটি সন্তানের মা না হয়ে ছাড়ত না হয়তো।মাথায় তেল মাখতে-মাখতে কড়া রোদের আকাশটার দিকে তাকিয়ে ভাবছিল মাল্যবান : আমার প্রতি যে যতখানি বিমুখ, অন্য কোনো পুরুষ-মানুষের জন্যের ঠিক ততখানি আগ্রহ তার থাকতে তো পারত; তাহলে কী হত? বেশ ঝরঝরে নদীর পাশে তরতাজা সবুজে-সবুজে ফন-ফন করে উছলে উঠত পানের বন, তাহলে উৎপলার ধানের বন নীল কালো সাপশিষের মতো রোদে বাতাসে—হাওয়া বৃষ্টির নিঝোর ঝলসানির ভেতর।উৎপলা কীর্তন গাইতে গাইতে ছাদের থেকে ফিরে এল—তোমার দাদার বয়েস কতত হল এবারে?চৌষট্টি।চৌষট্টি!তা তিনি কি আজকে জন্মেছেন—খুব বুড়ো হয়ে গেছেন তোতা তাহলে,–আজকের মানুষ তো নয়—তাই তো, খুব বড়ো তো–বুড়ো-বুড়ো করে মুখে গাজলা উঠল যে বুড়ো খোকার আমার। ঢং। উৎপলা বললে, নাও, এখন বড় বৌঠানের জন্যে কী জিনিস পাঠাবে বলো।মাল্যবান গায়ে তেল পায়ে তেল মাথায় তেল মেখে ভরা রোদে একটা বিচিত্র সরীসৃপের মতো চিকচিক করছিল। ছাদের রোদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ধাঁধিয়ে উঠছিল উৎপলার চোখ; সরীসৃপকে সে একবার দেখছিল ঝিকমিক আঁশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, নুয়ে পড়ছে, হাত নাড়ছে, চোখ পাঁজলাচ্ছে, আর একবার মিলিয়ে যাচ্ছিল সব—অফুরন্ত রৌদ্রের অনন্ত অন্ধকারের ভেতর কাউইে কিছুকেই আর দেখছিল না উৎপলা।মাল্যবানকে যথেষ্ট হিংস্র, অথচ আপাতদৃষ্টিতে তেমন কিছুই না, বরং বেশ চকচকে মনে হচ্ছিল হয়তো উৎপলার; ঠিক বুঝতে পারছিল না। কিন্তু তার মানে হয়তো এই নয় যে, উৎপলার বেশ কাতর হয়ে পড়ছিল; এবং মাল্যবান বেশ প্রখর হয়ে উঠছিল। হলে হয়তো ভালো হত না।আমার মনে হয়, যদি কিছু দিতে যাও, তাহলে তারা লজ্জা পাবেন।কেন?এ-রকম ব্যাপার যে হচ্ছে, এতে এখুনি লজ্জা পাচ্ছেন–তুমি যখন তোমার মায়ের পেটে ছিলে, লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে পড়েছিলেন তিনি! না কি? ম্যাদা মাদার ঠেলে বেরুল তো তবু লজ্জাবতীর ঝাড় থেকে। বেরুল তো! কী হল তাতে? ইঁদুরের গর্তে ঢুকে পড়ল পৃথিবীর জনমনিষ্যি সব! লজ্জা! লজ্জা! লজ্জা!মনের বিষ ঝেড়ে কথা বলে ছাদে এক চক্কর ঘুরে এসে উৎপলা বললে, তেমন হোক-না-হোক, একটা বেনারসী শাড়ি অন্তত কিনে দিতে হবে পঞ্চাশ-ষাট টাকার মধ্যে। আর রুপোর সিঁদুরকৌটো একটা। আমর ইচ্ছে ছিল সোনার কৌটো দিই একটা। চল্লিশ বছর স্বামীর সঙ্গে ঘর করল তো পয়মন্ত এয়োতি—এই চুয়ান্নতেও তো ফল দিচ্ছে—তোতাপুরি আমের গাছটা? মাল্যবান খ্যাক করে একটু হেসে, বেশি হাসির চাড় সামলে নিয়ে একটু সরে দাঁড়িয়ে বললে, বড় বৌঠানকে চিনি আমি–কেমন, বেনারসীতে তাকে মানাবে না।তা আমি বলছি না মাল্যবান তেলের বাটিটার কাছে ফিরে এসে বাটিটার দিকে এক নগর তাকিয়ে বললে, এ-রকম একটা ব্যাপার নিয়ে কেউ যে ঘটা করে, সে-ইচ্ছে তার একটুও আছে বলে মনে হয় না।দূরের রৌদ্রে সরীসৃপটা চিকচিক করে জ্বলে উঠেছে। উৎপলা পুডিঙের কামড়ে কঠিন কংক্রিটের মতো হয়ে গিয়ে তাকিয়ে দেখল একবার। মিলিয়ে গেল ছবিটা;রোদে বিহুলতায় চোখ ছটফট করে উঠেছে উৎপলার; অন্তশ্চক্ষু উপড়ে পড়ছে যেন অন্য রকম আগুনে—রৌদ্রে।আসল কথা হচ্ছে, কিছু খসাতে চাও না তুমি; আপন লোককে পর মনে করো। শাক দিয়ে মাছ ঢাকবার ভঁড়ামো, চিনি নে আমি তোমাকে! তেলের বাটিটা উৎপলা ছাদের ওপর ছুঁড়ে ভাঙল!তেল পড়েছে, টাকা আসবে, মাল্যবান হেসে বললে, যাই চান করি গে।অফিস থেকে ফিরে এসে সে বললে, চলো, বেরোই।কোথায়?কী কিনতে কাটতে হবে, চলো দেখি গিয়ে–উৎপলার মনের থেকে কিছুটা ধোঁয়া কেটে গেল, তা তো বলেছিই বেনারসী—কিন্তু আমি ও-সব জিনিস একা কিনতে ভরসা পাই না। এসো, আমার সঙ্গে—ষাট সত্তরের কমে হবে না শাড়ি; যে তিন শো পঁচাত্তর টাকা মেজদার বাবদ আমার কাছে আছে, তার থেকে কিছু তো খরচ করতে পারি নে—তার দরকার নেই—মাল্যবান রুমালে মুখ মুছে বললে।তবে কোথায় পাবে টাকা?প্রভিডেন্ট ফাণ্ড থেকে তুলে এনেছি।কতো?পঁচাত্তর–নাক-মখের চেকনাইয়ে চনমন করে—হেসে উঠে উৎপলা বললে, বাঃ, বেশ গুড বয় তো তুমি। সত্যিই এমন না হলে—আ গেল, তুমি তো চাও খেলে না।চায়ের প্রতীক্ষায় মাল্যবান চেয়ারে বসল গিয়ে। খানিকক্ষণ পরে উৎপলা ফিরে এল পরোটা ও চা নিয়ে নয়, মার্কেট যাবার জন্যে পোশাক-আশাকে তৈরি হয়ে।মাল্যবান একটু হতচকিত হয়ে বললে, চা খেয়ে গেলে হত না।ঠাকুরটা আজ বড় দেরি করে এসেছে, উৎপলা মাল্যবানের ছাড়া চেয়ারে ডান পা টা চড়িয়ে দিয়ে জুতোর পালিশে যে কিউটিকিউরা ট্যালকামের গুঁড়ি পড়ে ছিল, রুমাল দিয়ে তা ঝেড়ে ফেলতে ফেলতে বললে, আমিই ভাত চড়িয়ে দিতে বললাম তাই। সকালবেলার সেই পরোটাগুলো ঠাণ্ডা মেরে গেছে—লোনার মাকে দিয়ে দিলাম; ওর ছেলের কুষ্ঠ হয়েছে, কিছু খেতে চায় না।
উৎপলার সেলাইয়ের কলটা অনেক দিন ধরে পড়ে ছিল-অবিশ্যি অযত্নে নয়—জিনিসের যত্ন করে সে কিন্তু অব্যবহারে। কলটার ঢাকনি সাফ করা, ঢাকনি খুলে ঝেড়েপুছে ঝকঝক করে রাখা—হাতে কাজ না থাকলে এটা তার খুবই সোহাগের কাজ।এক দিন সকালবেলা পাশের ভাড়াটেদের একটি ছোট্ট মেয়ে এসে বললে, পলা মাসিমা, আপনার সেলায়ের কল আছে?আমি যে তোমার মাসিমা, তা তোমাকে কে বললে?মেয়েটি উৎপলার দিকে টলটল করে তাকিয়ে রইল–কোনো কথা বললে না।মাল্যবান বললে, আঃ, ওকে আর ও-রকম শুখোচ্ছ কেন?কোনো দিন এদের গাজও দ্যাখ্যা যায় না, উৎপলা বললে, আজ কল নেবার সময় পলা মাসিমা! আচ্ছা।মেয়েটি ঘাড় ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ফ্রকের কাপড় তুলে চিবোতে লাগল।তুমি কার মেয়ে গা?মেয়েটি তার বাবার নাম বললে।ও, সেজোগিন্নির মেয়ে তুমি বুঝি? মেয়েটি চিবোনো কাপড়ের এক কিনার থেকে দাঁত বের করে বললে, হ্যাঁ।উৎপলা মাল্যবানের দিকে তাকিয়ে বললে, সব জল ভরে গড়ায় কি-না। ওপরওয়ালার কল এমিই নড়ে। এই সেজো গিন্নিই তো এক দিন বলেছিলেন, কলকাতার জল সোনার দরে বিকোয় না-কি। খুব মনে আছে আমার। সে-কথা আমি ভুলব কোনো দিন।কী লাভ ও-সব মনে রেখে!না, না, তুমি কেন মনে রাখতে যাবে। তোমার দরদে তো মলম ঘষা হচ্ছিল সেজো বৌয়েয় সেদিন আমাকে তাবায় চড়িয়ে–তাঁবায় চড়ালেই কি ফোস্কা পড়ে?তা আমাদের পড়ে! এই রকম কথা শুনলে গায়ে জলবিছুটির জ্বালা হয়। ইশ!মেয়েটির দিকে তাকিয়ে উৎপলা বললে, তোমরা কে হে বাপু, পাশের ভাড়াটে ঘরে থাকো; তোমাদের আমরা খাই না পরি, তোমাদের তেউড়ি খেসারির খেত মাড়াই, না, বকের বিষ্ঠা দিয়ে বড়ি-খেসারি মেখে দিয়ে ভোগা দিই—তোমার মা যে–মাল্যবান উৎপলাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে ছোট্ট মেয়েটির পিঠে-ঘাড়ে গোটা দুই চাপড় মেরে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললে, তুমিও পারো বাপু! ও কী জানে। ওকে নিয়ে ঘাঁটানো কী হবে।কিন্তু কল আমি দেব না।সে হল আলাদা কথা।আর ঐ সেজো গিন্নি বড্ড অপয়া। পর-পর চারটি মেয়ে বিয়োল। পর-পর চারটি মেয়ে বিয়োল—ছোট্ট মেয়েটি ফ্রক কামড়াচ্ছিল; আরো জড়োসড়ো হয়ে কামড়াতে লাগল।সে-দিন তোমার একটি বোন হয়েছে, না খুকি?হ্যাঁ।তা আমি জানি। সাধে আমাদের বললে না। অথচ দশ মাইল দূর থেকে লোক ডেকে খাইয়েছে। মানুষ যে কী রকম বোকা শয়তান হতে পারে।উৎপলা কথা শেষ করতে-না করতেই মাল্যবান বললে, খুকি তো দাঁড়িয়ে রইল, ওকে যা দেবার দাও। নাহলে বলে দাও—অথচ এক ফালি বাড়ির ভেতর পাশাপাশি দুপরিবার থাকি—তবুও এটুকু গোয়ালার আক্কেল নেই।তুমিও কি ওদের ডাকো-টাকো না-কি কোনো কাজ-কম্মে?কেন ডাকব? ওরা ঝিনুক ভরে মধু নিয়ে সুর করে ডাকছে দিনরাত—এক পক্ষকে প্রথমে শুরু করতে হবে তো–আমি একা মানুষ, গুষ্টি ডেকে খাওয়াব? ওদেরই তো বরং উচিত আমাদের তিনটিকে ডেকে একটু মিষ্টিমুখ করানো অন্তত। এই মনুকেও তো একদিন ডেকে জিবেগজা শোনপাপড়ি যা-হোক একটা-কিছু হাতে তুলে দিতে পারত। আমরা তো দিই ওদের ছেলেমেয়েদের, ওরা একটা পিপারমিন্ট লজেনচুসও দিতে পারে না?যাক গে, মরুক গে, তুমি এখন–অথচ কতো বড় পরিবার; জমজম করছে; কাকে খাচ্ছে, ঘুনে খাচ্চে, ফোঁপড়ায় খাচ্ছে; চোট্টা শয়তান ওপর পড়া হয়ে খাট মেরে উজোড় করে দিচ্ছে সব।কলটা দেবে না-কি দিয়ে দাও।কিন্তু মনটা ওদের লাউয়ের মাচায় কেলে হাঁড়ির মতো। সে হাঁড়িতে তো ভাত ফোটে না, বালি তাতে; জনপ্রাণী পাখপাখালী পালিয়ে যায় সে-হাঁড়ি দেখলে। ভালো কেলে হাঁড়ি পেতে বসেছে বটে সেজো বৌরা—এই মেয়েটির সামনে তুমি অনেক কথাই তো বললে—শুনিয়েই বললাম, যাতে ওদের আঁতে লাগে!মেয়েটি তখনও দাঁড়িয়ে ছিল।মাল্যবান বললে, খুকি, তুমি ফ্রক চিবিয়ো না আর।ফ্রকটা সে মুখের থেকে ফেলে দিল। দেখা গেল, দাঁত দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে।মনু বললে, পানসে দাঁত।তোমার পানসে দাঁত, উৎপলা বললে, তোমার বাপ-মা ডাক্তার দেখিয়েছেন?না। মেয়েটি (উৎপলার কেন যেন মনে হল) শামকলের বাচ্চার মতো মাথা নেড়ে বললে।না? উৎপলা মাল্যবানের দিকে তাকিয়ে বললে, কেমন ফ্রক চিবুচ্ছে দেখছ, সোথ হয়েছে এই মেয়েটার শরীরের চুণখড়ি নেই; অথছ বছর-বছর না বিয়োলেও চলবে না। ওদের বারো মাসই কার্ত্তিক মাস, বাবা!মেয়েটি নিজের অজান্তেই আবার ফ্রক চিবুকে শুরু করেছিল; উৎপলা ফ্রকে একটা হাঁচকা টান মেরে বললে, দূ ধূমসি, খাসির রক্তে মাখিয়েছিস—মেড়েছিস—দূ—দূ–মেয়েটি আস্তে-আস্তে হেঁটে চলে যাচ্ছিল।শোন খুকি, ডাক দিল উৎপলা।এসে দাঁড়াল মেয়েটি।সর্ষের তেল আর নুন দিয়ে দাঁত ভালো করে ঘষে-ঘষে মেজো দিকিন রোজ। মাজবে?শামকলের বাচ্চার মতন তুড়বুড় মাথা নেড়ে মেয়েটি বললে, হ্যাঁ।তোমাদের তিনটি বোনকেই তো দেখি আমি, একেবারে লিকপিক করছে; বাঁশপাতা মাছের মতন; চেহারাও তেম্নি বিচ্ছিরি। তোমাদের ছোট বোন কেমন হল দেখতে?বেশ সুন্দর।রং কেমন?খুব ফর্সা।কালো ফর্সা তো কথা নয়, বড় শামকলটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট দিয়ে লাল লঙ্কা কেটে খেতে খেতে বললে যেন চন্দনা, মগরাহাটার কুচো চিংড়ির মতো হল তো দেখতে। মনে হয় যেন গলার নলি শুকিয়ে থোড়ের আঁশের মতো হয়ে রয়েছে। বড্ড দুঃখ করে। বাস্তবিক মানুষের পেটে এ কী টোনা টেংড়ি বলো তো দিকি—মনু একটু ফিক করে হেসে উঠল।যে-ফর্সা রং বলছ খুকি, ও তোমার বোনের গায়ে রক্ত নেই বলে। দুধে-আলতায় রং—সে আরেক রকম।আবার শামকলের ছা মাথা নাড়ল, না, আমার বোনের রক্ত আছে।আছে? তবুও শাদা?খুব শাদা।তাহলে ন্যাবা হয়েছে।না, ন্যাবা হয় নি; ফর্সা রং! কেমন সুন্দর দেখতে! ইশ, ন্যাবা হবে আমার বোনের।উৎপলা বললে, কই, দ্যাখালেও না তো তোমার বোনকে।আসুন-না, দেখে যান।এখন দেখতে যাব কেন। খাইয়েছিল? সাধে? যে-দিন হয়েছিল সে-দিন খবর পাঠিয়েছিল?মাল্যবান একটু জ্বলে উঠে বললে, আ মল যা! ভালো বিপদেই পড়া গেছে দেখছি। সোমত্ত গাইগোরুর মতো একটা বাছুরের ঘাড় মটকাবার জন্যে চাট মারছ সেই থেকে! কী হল তোমার!মেয়েটির চোখের ভেতরে যেন তলিয়ে গিয়ে তাকিয়ে থেকে উৎপলা বললে, কিন্তু, সেলয়ের কল নেবার সময়ে ঠিক মতন হাজির হয়েছ তো—শামকলের বাছা।শুনে সচকিত হয়ে কেমন চমকে উঠে তাকাল মেয়েটির দিকে উৎপলার দিকে মাল্যবান।তোমার বোন যে-দিন হল, সেদিন চারটে উলু দিলে কেন?আমি তো দিইনি উলু।উলুর যা ঘটা! ভাবলাম, এবার বুঝি রাজপুত্তর এসেছেন।মেয়েটি শুকনো রৌদ্র ডাঙায় পাখির বাচ্চার মতো এক-আধ ফোঁটা মেঘের জল পেয়ে তিড়বিড় করে উঠল উৎপলার কথা শুনে।তোমার মা কল চেয়েছেন কার কাছে?আপনার কাছে।কী বলে দিয়েছেন?বলেছেন, তোর পলা মাসির কাছ থেকে সেলায়ের কলটা চেয়ে নিয়ে আয় তো—উৎপলার খানিকটা ভালো লাগল, জ্যৈষ্ঠের মাটিতে কিছু আষাঢ়ের মেঘের রস এসেছে যেন, এম্নি ভাবে মেয়েটির কোঁকড়া চুল নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বললে, মাসি হলাম কোন সুবাদে?মা বলে দিলেন তো।তোমার চুলের ভেতর ঢের উকুন, খুকি।হ্যাঁ, দিদির মাথার থেকে এসেছে।কেউ বাছে না তোমার মাথার উকুন?না।উৎপলা বুড়ো আঙুলের নখে একটার পর একটা উকুন টিপে মারতে মারতে বললে, এই যে মাথা বেছে দিচ্ছি তোমার, বেশ আরাম পাচ্ছ, না?মেয়েটি উৎপলার কোলে মাথা ছেড়ে দিয়ে চোখ বুজে রইল।তোমার মা কল দিয়ে কী করবেন?জামা সেলাই।কার জন্যে?ছোড়দি, আমি, বোন—তিন জনের জামা।তা, তোমার মা এখনও তো আঁতুর ঘরে।না, বেরিয়েছেন।কবে? এই তিন চার দিন হল—নাড় তো এখনও বড্ড ফাঁচা, সেলাই করবেন কী করে? নাড়ি টনটন করে উঠবে যে।চাইলেন তো।লক্ষ্মীকান্তপুর থেকে ক্ষীর এসেছে—খাবে খুকি?মেয়েটি মাথা নেড়ে বললে, খাব। শামকল শাবকের মাথা কেমন তুড়বুড় করছে, চাদির ওপর জলের ফোঁটা রোদে শুকিয়ে গেছে যেন।উৎপলা হাত ধুয়ে এসে মেয়েটিকে খানিকটা ক্ষীর দিল। তারপর কলটা ভালো করে দেখে মুছে মনুকে বললে, যা মনু, কলটা সেজো মাসিকে দিয়ে আয়। তোমার ক্ষীর খাওয়া হয়েছে, খুকি?হ্যাঁ।কেমন লাগল?বেশ—তোমার নাম কী?নোরা। নোড়া, ভেঙে দেব দাঁতের গোড়া।কী পড়?আমি এখনও—ক অক্ষর—বলে এঁটো হাত জামায় মুছতে মুছতে মেয়েটি দৌড় দিল।
পাশের বাড়ির ছোট্ট মেয়েটি আঁতুড়েই মারা গেল।আমি তো তখনই বলেছিলাম, এই রকম হবে—দুতিন দিন উৎপলা কেমন একটা শোকগ্রাহিতায় আচ্ছন্ন (না, বিমুগ্ধ?) হয়ে কাটাল।বললে, আমি একটু দেখতেও পারলাম না, আমাকে একটু ডেকে দেখালও না।কী করতে তুমি দেখে?এই তো পাশাপাশি বাড়ি-মানুষ জন্মায়—মরে যায়—যেন ঘড়ির কাটা ঘুরে চলে, মরবার সময়ে একবার ডাকলেও তো পারত। পরশু রাত তিনটের সময়ে মারা গেছে বললে?হ্যাঁ।কী করছিলাম তখন আমি?ঘুমুচ্ছিলে!মাল্যবান বললে, কতো শিশুরাই তো মরে যাচ্ছে।খুব কেঁদেছিলেন সেজো গিন্নি? উৎপলা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেয়ালে ঠেস দিয়ে হাত-পা নিঝুম করে ছাদের এ-পারে ও-পারে পরপারে শূন্যতার বড় একটা রৌদ্রচাঙাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল।বড় বৌকে শাড়ি পাঠালে—কোনো খবর-টবর দিল না তো। মাল্যবান বললে।খবর দেবার সময় হয়েছে কি?বাঃ, দশ-পনেরো দিন হয়ে গেল।দাদা নিশ্চয় জবাব দিয়েছিলেন, উৎপলা বললে, কিন্তু পথে চিঠি মারা গেছে।তা নয়, মাল্যবান একটু কঁধ নাচিয়ে বললে, পোস্ট অফিসের চিঠি ওঝার বাটির মতো চলে। তিন পয়সার একটা পোস্টকার্ড ঝেড়ে দিলে যে-মল্লুকে পাঠাও, ঠিক গিয়ে পৌঁছুবে।বড় শামকল কেমন ঘাড়ের রোঁ ফুলিয়ে ফুলিয়ে কথা কইছে শোন—মাল্যবানের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল উৎপলা। কিন্তু চিঠি সম্পর্কে কথা বাড়াতে গেল না সে আর।আঁতুড়ের মেয়েটাকে বাক্স করে শ্মশানে নেওয়া হয়েছিল?হ্যাঁ।কী রকম বাক্স?প্যাকিং বাক্স—পাইন কাঠের—ভেতরে আটকে নিলে? পেরেক ঠুকে?তবে কি বাক্সের বাইরে লেপটে নেবে গদের আঠা দিয়ে লেবেল মেরে?কী করলে তারপর?শ্মশানে নিয়ে গেল—দাহ তো হয় না ছোটদের?না।না।পুঁতে ফেললে তবে?হ্যাঁ।তারপর কী হবে?কীসের পরে?আমি বলছি, মাটির নিচে কী হবে ওর?মাল্যবান এবার চুরুট জ্বালিয়ে নিয়ে বললে, ও-সব কথা কেউ ভাবে না। হবেই একটা কিছু। শেয়ালে মাটি খুঁড়ে না খেলে পচে গলে যাবে–কৃমি হবে।কলকাতায় শেয়াল কোথায়? পচে মাটি হয়ে যাবে–শুনতে-শুনতে সামনের চেয়ারটায় না বসে মেঝের ওপরই ঝুপ করে বসল উৎপলা, দেয়ালে ঠেস দিয়ে, পা ছড়িয়ে, বসে রইল।মাল্যবান চুরুট টানতে-টানতে ভাবছিল কী বোেকা! কী বোকার মতো কথা জিজ্ঞেস করে। কতো রাজ্যি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, উৎপলা ফ্যাকড়া নিয়ে বসে আছে। তারপর কী হবে? মাটির নিচে কী হবে ওর? হুশ! কিন্তু, তবুও, বোকা নয় ও, বোেকা একেবারেই নয়; একটি সন্তানের মা হয়েও যেমন ভাবে মা হতে চেয়েছিল বহু সন্তানের, তা হতে পারেনি; সেই সব নিহিত তেজ উৎপলার আপাতমুখতার অতৃপ্তিতে ঝরে পড়ছে।আচ্ছা, মরে যাওয়ার পর বড়-বড় মেয়েদের মাটিতে পুঁতলে তারপর কী হয়?মাটিতে পুঁতবে কেন? দাহ হয়।না, আমি বলছি, যাদের ভেতর দাহ-টাহ করার চল নেই, তাদের কথা—ওঃ, মাল্যবান একটু পুরুষ চিল-তীক্ষ্ণ ভাবে উৎপলার দিকে তাকাল।আমি শুনেছি, একজন খুব রূপসী কুড়ি-একুশ বছর বয়সেই সুস্থ শরীরে হঠাৎ কেন যেন মারা গেল। বিকেলবেলাতে তাকে মাটি দেওয়া হল। তারপর সবাই চলে গেল যে যার গাঁয়ে। সেখানে আট-দশ মাইলের মধ্যে জনমানব কেউ ছিল না। সন্ধ্যের পরেই একটা লোক এসে মাটি সরিয়ে সেই মড়াতে চুরি করে নিয়ে গেল। কেন নিল, বলো তো?কুড়ি-একুশ বছরের মেয়ে মানুষ?হ্যাঁ, বেশ সুন্দরী ছিল, বেশ সোমত্ত; শবটাকে মাটি খুঁড়ে বার করবার পরও গা ফুটে রূপ বেরুচ্ছে; আর গতরের সেকীপুষ্টতা।এই জন্যেই চুরি করা হয়েছিল—মাল্যবান বললে।মাল্যবানকে খুব বেশি জাগিয়ে দিয়েছে উৎপলা, কথায়-কথায় নিজেও খুব বেশি জেগে পড়েছে আজ।নিচের ঘরে আর যেতে দেওয়া হল না মাল্যবানকে আজ রাতে।এ-রাতটা মালাবান ও উৎপলার বেশ নিবিড় ভাবেই কাটল।—সমস্ত রাত—সমস্তটা শীতের রাত।
মাল্যবান যা-ই মনে করুক না কেন, স্ত্রী সন্তানের পাট চুকিয়ে দিয়ে একা-একা আইবুড়ো থেকে জীবন কাটানো খুব শক্ত হত তার পক্ষে! গোল-দীঘিতে ঘুরে-ঘুরে বারো-চৌদ্দ বছর সে অনেক হাওয়াই ফসল ফলিয়ে গেছে; সমাজসেবা, দেশস্বাধীনতার জন্যে চেষ্টা, বিপ্লবের তাড়না-তেজ, নিবৈপ্লবিক মনের চারণা, উনিশ শতকের নিশায়মান সমুদ্রতীর : সাহিত্যের ধর্মের মননের : বিশ শতকের উপচীয়মান আবহমান রক্ত রৌদ্র ছায়া জ্বালা সমুদ্রসঙ্গীত—নানা রকম অপর রকম জীবনের অর্থ ও উদ্দেশ্যকে ঈর্ষা করেছে–নিজের জীবনটাকে অনেক সময়েই অসার ও নিষ্ফল মনে হয়েছে তার। কিন্তু, তবুও, এই পাকা চাকরিটুকু, স্ত্রী ও মেয়ে, কলেজ স্ট্রীটের ঘর তিনখানা এর চেয়ে অন্য কোনো সাফল্যের উত্তমর্ণনাত তার জীবনে কোনো দিন ঘটে উঠত কি?সে নিজে যখন খুব স্থির হয়ে ভাবে, বোঝে—জীবনের কাছ থেকে যথাযথ প্রাপ্য সে পেয়েছে। সে জানে, জীবনটা তার এর চেয়ে ঢের খারাপ হতে পারত। যদিও মৃগনাভির গন্ধে মাঝে-মাঝে অধীর হয়ে উঠে গোলদীঘিতেই এবং নিজের একতলার ঘরের রাতের বিছানায়ই সে পাক খেয়েছে সবচেয়ে বেশি, কিন্তু তবুও সে বুঝেছে যে, তার নিজের সাংসারিক জীবনটা কস্তুরীমৃগ নয়, বে-সংসারীও নয়; সাংসারিক সফলতার চূড়ান্তে উঠেযে-সব লোক টাকাকড়ি যশ মদ মেয়েদের নিয়ে সন্তপ্ত হয়ে আছে দিনরাত, তারা কি জানে তারা কী–কে—চলেছে কোথায়! তারা জানে না! তাদের অন্তঃশীলা আত্মা ঠিক নয়—তাদের নিম্ননাভির গন্ধ এ-দিকে সেদিকে ফেলে দিচ্ছে তাদের; মাঝে-মাঝে মাল্যবানের মতন পথের পাশের একজন লোককেও সচকিত-আলোড়িত করে তুলছে। কিন্তু মাল্যবান জানে, এ-নাভি তার নিজের নয়—এ-সব ওদের।এক দিন মা বেঁচেছিলেন। মা খুব স্নেহ সরসতার মানুষ ছিলেন; কিন্তু তখনই কলকাতায় প্রথম চাকরি শুরু করে মার সঙ্গে শ্যামবাজারের একটা একতলা বাড়িতে এক কোঠায় যে-দিনগুলো কাটিয়েছে সে-প্রত্যেকটা দিনের কথা মনে আছে তার: সহজ কঠিন মৃদু নিরেস, কেমন নির্জনলা জলীয় দিনগুলো জীবনের। ভাবত, মাকে মানুষ সূতিকাঘরের থেকেই পায় কি-না—রোজই পায়-অনেক পায়—জননীগ্রন্থি কেটে যায় তাই শীগগিরই—নতুনত্ব হারিয়ে যায়। ভাবত, মানুষের জীবনে এমন একটা সময় আসে, যখন মায়ের মমতা সজলতা এত স্বাভাবিক বলেই অনোজলবাতাসের মতো সুলভ মনে হয়; একজন অপরিচিত মেয়েকে মনে ধরলে তার সহজ ভেবে নিতে সময় লাগে; কাছে থাকলেও দূর—তার স্বচ্ছ সরল প্রকাশ ভানুমতীর খেলার মতোই আপতিত হচ্ছে কী সহজে—কিন্তু তবুও কী রকম আঁধার, কঠিন, নিবিড়!এই সব ভেবে-ভেবে কেমন কুণ্ঠিত হয়ে পড়ত মাল্যবানের মন; মার কাছে ঘাট হয়েছে বলে তার প্রতি শ্রদ্ধায়, পথে-ঘাটে-মনে-ধরে-গেছে নারীটির প্রতি উদাসীনতায় এবং নিজের প্রতি ধিক্কারে নিজেকে সে সজাগ করে রাখত।মাল্যবান যখন বিয়ে করেনি, নিজের অফিসের বিবাহিত কেরানীদের হপ্তাকাবারী অভিযান দেখে এমন গুমড়ে উঠত তার! উৎপলাকে নিজের ঘরে আনার থেকে আজ পর্যন্ত যখনই কোনো মানুষের স্ত্রীবিয়োগের কথা শুনেছে, মাল্যবান, সে-মানুষটিকে জাদুঘরের কুলকিণারায় দেখা অতীব মৃত জিনিসের মতো অতীতের আনন্ত্যের কুয়াশা-ঘরে লীন হয়ে থাকতে দেখেছে সে—অনুভব করেছে, ও-মানুষের কোনো ভবিষ্যৎ নেই; সে-জীবনের শূন্যতা কল্পনা করে অস্বস্তি বেদনার অভিজ্ঞতায় কেমন যেন অন্য আর এক রকম ধার শানিয়ে উঠেছে তার। নিজের স্ত্রী যে বেঁচে আছে, এ-সান্ত্বনা ভেতরে-ভেতরে গুছিয়ে নিয়ে সারাদিন অফিসের ডেস্কে, সারারাত নিচের ঘরের বিছানায় কম্বলের নিচে নিশ্ৰুপ শান্তির ভেতর একটার-পর একটা বিদায় দিয়েছে—গ্রহণ করেছে।এই সব হচ্ছে মাল্যবানের জীবনের ভিতের কথা, ভিত্তিচিত্রের কথাও। সে একা থাকতে পারে না, মার সঙ্গে থাকে তাই; কিন্তু তবুও মায়ের ভালোবাসা সান্নিধ্য তার কাছে কালক্রমে একা থাকার সামিল বলে মনে হয়; বিয়ে না করলে তার চলে না; স্ত্রীকে ঘুচিয়ে দিয়ে একা পথ চলবার কোনো শক্তিই তার নেই।কিন্তু জীবনের খুঁটিনাটি ব্যাপারে এই দাম্পত্যজীবনেরও নানা রকম খাব সে। ঝড়তি-পড়তি নষ্ট ফসল পচা হাড়মাংসের গন্ধে ভরে উঠছে সব। উৎপলার উদাসীনতা ঠিক নয়, খুব সম্ভব অপ্রেম-দিনের-পর-দিন স্বচ্ছ হয়ে আসছে যেন, অতল স্বচ্ছতায় যে-রূপ দেখা যাচ্ছে তার তাতে মনে হচ্ছে, কোনো দিনই প্রেম-প্রীতি ছিল না মাল্যবানের জন্যে উৎপলার। না থাকলে না থাকবে। অন্যদের জন্যে প্রীতি? অন্য কারু জন্যে প্রেম? তাই হোক। কিন্তু তবুও উৎপলাকে বহন করে বেড়াতে হবে মৃত্যু পর্যন্ত? উৎপলাও তাকে তাই করবে বুঝি? চোখের সামনে অন্যদের প্রতি উৎপলাকে স্পষ্ট অনুরক্ত হয়ে পড়তে দেখে—সে-জায়গা থেকে একটু গা বাঁচিয়ে সরে যেতে হবে বুঝি মাল্যবানকে? আলখাল্লাপরা একজন চীন, একজন গ্রীক দার্শনিকের মতো আকাশের তারার পাতালের বালি মানুষের জীবনের মিছে সমারোহকে যে নিমেষেই গ্রাস করে চলেছে, সেই উপলদ্ধিতে স্থির হয়ে নিতে আবার—তারপরে বেশি রাত হলে টেবিলে খেতে বসে খোশগল্প করতে হবে স্ত্রীর সঙ্গে আর মেয়ের সঙ্গে?বিয়ের আগের দিনগুলোকে তার শীতের আগে হেমন্তের, হেমন্তের আগে শরতের ক্ষেতে মাঠে রোদে মানুষের মুখে পাখির কথায় যে অবিনেশ্বর সম্ভাবনা থাকে হেমন্তের, যে মহাপ্রাণ কুহক থাকে আসন্ন শীতের রাতের, সেই রকম মনে হয়েছে–চলে যেতে পারে সে কি আবার বিয়ের আগের সেই পৃথিবীর দেশে? প্রশ্নটা পাড়া-মাত্রই তার উত্তর মেলে: মানুষ তো মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছে, পিছে ফিরে যেতে পারে না তো সে আর। তবে উৎপলা মনুকে বাদ দিয়ে মৃত্যুর দিকে এগোতে পারা যায় বটে—একা। মার আমলে পারেনি, কিন্তু বৌ পায়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে তাকে; সজ্ঞানে হেঁটে চলে যেতে পারে সে অন্ধকারে ভেতর দিয়ে–অজ্ঞান মৃত্যুর দিকে। পারে।কিন্তু সাময়িক এই সব ইচ্ছা চিন্তা। মাল্যবানের মনের ভেতর কোনো পৃথিবী ঘুরে বিদ্রোহী বা ভাবুক নেই যে তা নয়; শয়তান জোচ্চোর অমানুষও রয়েছে, কিন্তু সবের ওপরে মানুষ সত্য হয়ে রয়েছে একজন সাধারণ ধর্মভীরু ও ভীরু মানুষ। একটি সাধারণ স্নেহশীল ধর্মভীরু ভীরু বৌ যদি সে পেত, তাহলে এ-দুটি সাদাসিধে জীবন পৃথিবীকে বিশেষ কোনো সফলতা বা নিস্ফলতার দান না রেখে শান্ত ভাবে শেষ হয়ে যেতে পারত এক দিন। কিন্তু তা তো হল না, নষ বশ্য ঘরজোড়া স্নিগ্ধতা হল না, খড়খড়ে আগুন খড়ের চমৎকার অগ্নি-ডাইনীর মতো হল মাল্যবানের বিয়ে আর বৌ আর বিবাহিত জীবন।উৎপলা দেখতে বেশ; শুধু বেশ বললে হয় না—এমনিই বেশ। সুস্থ। রুচি ও বুদ্ধির ধার মাঝে-মাঝে বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে; হৃদয়ের বিমুখতা ও কঠিনতাও তার এক-এক জায়গায় এক-এক জন মানুষের তাপ বা জ্ঞান-পাপের ছোঁয়ায় মোমের মতো গলে দাম্পত্য আবহে ফিরে এসে মোমের মতো শক্ত ঠাণ্ডা হয়ে ওঠে আবার। কুমারী হিসেবে এই মেয়েটির বেশ দাম ছিল—নারী হিসেবেও। কিন্তু মাল্যবানের মতো এ-রকম একজন লোকের বৌ হয়ে ঠিক হল না তার। উৎপলার বন্ধুবান্ধবের অভাব নেই। বাপের বাড়ির দেশের ঢের লোক তাকে চেনে—ভালোবাসে—কাছে আসে তার; কলকাতায় এসে এদেরই মারফৎ আরো অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে তার; দশ-পঁচিশ মিনিট উৎপলা, উৎ, পলা, ইত্যাদির সঙ্গে এক শো রকম মানুষ এক শো রকম ভাবের কথা বলে যাবার প্রয়োজন প্রায়ই বোধ করে; এই সব বিমিশ্র ভিড় এক সময় খুব বেশি আসত; আনাগোনা এখন খানিকটা কমেছে বলে মনে হচ্ছে; শীগগিরই বাড়বে আবার তাও মনে হচ্ছে। যারা যাওয়া-আসা করে এ বাড়িতে—কেউ থাকে পনেরো মিনিট, কেউ দু তিন ঘণ্টা। সটান দোতলায় উৎপলার কাছে চলে যায় প্রায় সকলেই তারা; মাল্যবান নিচের ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছে, চুরুট টানছে, দেখে বা না দেখে তারা সবটুকু দেখে নিয়েছে, অনুভব করে কৌতুক বা ক্লান্তি বা কঠিনতা বোধ করে। কিন্তু মাল্যবানের সঙ্গে বিশদ আলাপচারির আবশ্যকতা কেউই বড় একটা বোধ করে না। কেউ কেউ এও জানে যে, এ-মানুষটাকে এর স্ত্রী একেবারেই গ্রাহ্য করে না। এ-রকম উপলব্ধির পর সময়ের—পৃথিবীর স্তনাগ্রচুড়ায় অনতিদূর শঙ্খিনীকে চের বেশি সরস বলে মনে হয়—ভীরু দুরুদুরু বুকের সাহস ও কাম নিয়ে তার দিকে এগিয়ে যেতে-যেতে। মাল্যবান দেখেছে, জেনেছে, উপলব্ধি করে দেখেছে সব। দেখেছে, তার চেনা-আধোচেনা মানুষেরা কী রকম অনিমেষ বিদ্যায় ওপরে চলে যাচ্ছে তাদের কী রকম তাগিদ—কতো তাড়া! সে যে নিজে একজন প্রাণী নিচের ঘরে রয়েছে—এ বাড়িটাও সে তার সেটা কোনো কথা নয়——কথাটা সত্যিই খুব ঠিক।যারা ওপরে যায়, তারা কেউ লজ্জিত হয়েও ফিরে আসে না তো। কেউ কেউ অনেকক্ষণ তো বৈঠক জমায়; হাসি তামাশা রগড় গুণা ছিটে ফোঁটায় ফেনায় ছিটকে আসে নিচের ঘরে। মাল্যবান মাঝে-মাছে অবাক হয়ে ভাবে—কথা ভাবে। কথা ভাবা কালো ধুমসো পাখিদের নীড় তার মাথাটা। আচমকা একটা সিগারেট জ্বালিয়ে বা দড়াম করে জানালার কপাটটা খুলে ফেলে পাখিগুলোকে উড়িয়ে দেয় সে। যারা ওপরে যায়, তাদের পেছনে পেছনে সে ওপরে যায় না কোনো দিন; কাউকেই কিছু বলতে যায় না। যখন দোতলার ঘরে আসর খুব জমে উঠেছে, তখনও ওপরে যেতে কেমন দ্বিধা বোধ হয় তার; যখন রাত বেশি, উৎপলার ঘরে লোক কম—দুটি কি একটি——খুব সম্ভব একটি—তখন সে কিছুতেই ওপরে যায় না : মন দিয়ে করেছে, চোখ দিয়ে সকলের জীবনের সব তলানি আবিস্কার করতে চায় না।চৌবাচ্চায় স্নান করে—ঠাকুরের কাছ থেকে ভাত নিয়ে খেয়ে সে অফিসে চলে যায়। কিংবা সন্ধ্যেবেলা যখন ওপরের আড্ডা জমে, তখন আস্তে-আস্তে স্টিক হাতে গোলদীঘির দিকে চলে যায়। হাঁটতে-হাঁটতে ভাবে : কটা দিন আর? এই স্কোয়ারে পাক খাচ্ছি—চোখের পলকেই কুড়িটা বছর শাঁ করে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাবে আমার, উৎপলার; দেখতে-দেখতে চুল পেকে যাবে ওর, দাঁত পড়ে যাবে, তারপরে সব ভেঁ-ভাঁ। ভাবতে-ভাবতে কুড়ি বছরের পাল্লা সত্যিই, দ্যাখ, পেরিয়ে গেছে, সে—জীবনটা এখন বেশ নিরালা, নিঃশব্দ; একটা অতিরিক্ত কাক, একটা ওপরপড়া বেড়াল নেই কোথাও; রোদে বাতাসে নির্ভাবনা ছড়িয়ে আছে চারদিকে; যত চাও, ততো! কতো নেবে? ভাবতে-ভাবতে ক্ষমার ক্ষমতায় বোশেখ-জ্যৈষ্ঠের মাটির শিরায় শিরায় শ্রাবণের রস এসে পড়ে যেন। চুরুট জ্বালিয়ে নেয় মাল্যবান।কুড়ি বছর তো পেরিয়ে গেছে সে আর উৎপলা। গত কুড়ি বছর যে-সব আতিশয্যচক্র হয়ে গেছে উৎপলার জীবনে, তা নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় নেই এখন আর। গোলদীঘির রাতে শীতে মাল্যবানের চুরুট তার মনের ভেতরে সেই ছেলেবেলার শীত রাতে শান্তর মার আগুনের খাপড়ার মতো কেমন একটা নিঃশব্দতা নিশ্চয়তা শান্তির অবতারণা করছিল। বাড়ির দিকে হাঁটতে-হাঁটতে বাড়ির খুব কাছাকাছি এসে পড়ে মাল্যবান বলছিল, কাকে যেন বলছিল, কাকে যেন বলছিল কি গো, গোলামরা সব চলে গেছে—রঙের গোলামও-বলো! বিশটা বছর হসকে গেছে চোখ না পাজলাতেই। মনু শ্বশুরবাড়ি, আর আমাদের বাড়ি সায়েব বিবি ওপরের ঘরে—বলো! বিছানাটা বেশ দুজনের মতন উম-উম, কুসুম-কুসুম, শীত রাত আর শেষ নেই বলো। দুপুর-রাতে ঠাণ্ডা নদীর পারে শামকলের মাথাটা যেন ভেঁকির পাড়ের মতো উঠছিল পড়ছিল যখন বলো-বলো! বলছিল মাল্যবান। কথা বলতে-বলতে মাল্যবান হি-হি করে নিজের ঘরে ঢুকে লেপ টেনে নেয়; খুব বেশি অন্ধকারে খুব বেশি ঘুমের ভেতরে মানুষের শরীর বলে কোনো জিনিস থাকে না, মনটাও কাঠ হয়ে যায়, হঠাৎ জেগে উঠলে কাঠে আগুন লেগে যায়; আচমকা জেগে-জেগে উঠে সারারাত, পুড়তে-পুড়তে সকালবেলা মাল্যবান জাগ্রত চেতনার অন্য আরেক রকম আগুনের ভেতর জেগে উঠল। এখানে বলো-বলো!-র চালাকি চলরে না শামকল শালার; প্রতিটি সেকেন্ড-মিনিট গুণে-গুণে, অগ্নিকৃকলাসকে রূপকের মিথ্যে বলে বিদায় নিয়ে, আগুনকে সত্যিই আগুন বলে গ্রাহ্য করে পদে-পদে এগিয়ে যেতে হবে। এছাড়া কোনো উপায় নেই, কোনো পথ নেই আর।একদিন মাল্যবান অফিসে গিয়ে শুনল যে, অফিসের কেরানী মনোমোহনবাবুর স্ত্রীর ভয়ঙ্কর অসুখ–মেডিক্যাল কলেজের হাসপাতালে তাকে আনা হয়েছে।ঘাবড়াবেন না মনোমোহনদা, সেরে যাবে–বললে মাল্যবান।কিন্তু সেদিন সমস্তটা দিন অফিসে মনটা তার উৎপলার জন্যে কেমন অসুবিধে অস্বস্তি বোধ করতে লাগল।সন্ধ্যের সময়ে বাসায় গিয়ে পোশাক না ছেড়েই সে ওপরের ঘরে চলে গেল। গিয়ে দেখল, উৎপলা আর মন ছাদে বসে আছে—কার অসুখ, কোথায়?তুমি ভালো আছ তো, উৎপলা? আমাদের অফিসের মনোমোহন বাবুর স্ত্রীর বড় অসুখকী অসুখ, বাবা? মনু জিজ্ঞেস করল।সে কী এক রকম অসুখ, স্টোন হয়েছে—সে আবার কী?কী জানি।মাল্যবান খানিকক্ষণ আলো-আবছা চোখে বাইরের দিকে তাকিয়ে ভারি ভাবুক হয়ে পড়ল; একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললে, মনু, যা আমরা খাই, তার ভেতরে নানারকম জিনিস থাকে, হজম হয় না, ভেতরে-ভেতরে স্টোন হয়পেটে হয় স্টোন?না, পেটে না, কিডনিতে হতে পারে—গল-ব্লাডারে হতে পারে—কিডনি কী, গল-ব্লাডার কী?–জিজ্ঞেস করাতে মাল্যবান হাত দিয়ে নিষেধ জানিয়ে বললে, ও-সব তোমার জনাবার দরকার নেইভাতের ভেতরে যে কাঁকর থাকে, সেগুলো জমে গিয়ে বুঝি কিডনিতে? মনু বললে।না, তা নয়, তা ঠিক নয়—ও তো আমার পেটেও হতে পারে— উৎপলা বললে।না, তা কী করে হবে, উৎপলা—মাল্যবান শিশুর মুখে ভূতের গল্প শুনে একটু হেসে উড়িয়ে দিয়ে বললে।হবে না? তোমার ঠাকুর খুব দেখে-শুনে চাল ধোয় আর ভাত রাঁধে, উৎপলা বললে, এক-এক দিন খেতে বসে দেখি কাঁকর পাথরের কাড়ি। গেরাসে-গেরাসে পেটে হড়কাচ্ছে, স্টোন হবে না তো কী হবে—ওতে স্টোন হয় না-ওটা–যা-হোক্, মাল্যবান ঠাকুরকে ডাক দিল।ভাতে কাঁকর থাকে কেন?ঠাকুর আপত্তি করতে যাচ্ছিল, মাল্যবান বললে, ফের যদি কাঁকর পাথর নুড়ি কুচি কিছু দেখি, তাহলে তোমার মাইনে কেটে তোমাকে তাড়িয়ে দেব আমি। খবরদার!ঠাকুর চলে গেলে উৎপলা বললে, ওকে বকে কী লাভ। যারা চাল নিয়ে বজ্জাতি করে সে-সব ওপরওয়ালাদের পেটের ভাত চাল করে ছাঁকব আমাদের চালুনিতে; নাও, সে-সব পেটোয়া চাল কয়েক বস্তা নিয়েসো দিকি। পারবে? মাঝখান থেকে ঠাকুরটাকে ঝাড়লে। কী রকম বেকুব তুমি।এবারে আমি চালওয়ালাকে কড়কে দেব। অফিসের ধরাচুড়া-পরা মাল্যবান একটা হাই তুলে বললে।যে-আগ্রহ ও উদ্বেগ নিয়ে উৎপলাকে সে দেখতে এসেছিল, তা তার ধীরে-ধীরে ধোঁয়ার ভেতর মিলিয়ে যেতে লাগল যেন। মনোমোহনের স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছে বলে সমস্তটা দিন অফিসের কাজকর্মের ভেতর উৎপলার জন্যেও যে-দুশ্চিন্তা হয়েছিল, বৌয়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ খিটিমিটি করে সে বিষণ্ণ, ভালো জিনিসটা নষ্ট হয়ে গেল একেবারে। খারাপ হল-খুব খারাপ হয়ে গেলসব। অফিসের থেকে এরকম হাঁচকা ছুটি নিয়ে বাড়িতে না এলেই ভালো হত।স্টোন হয়েছে–তারপর কী হল—মরে গেল?না, মরবে কেন? তাহলে বেচারির চলবে কী করে?কোন বেচারির?মনোমোহনদার।মনোমোহনবাবু তোমাদের অফিসের কেরানী?হ্যাঁ, নিচের দিকের; মাইনে পঞ্চান্ন টাকা; বড্ড মুস্কিল মনোমোহনদার।মনোমোহনবাবুর বৌয়ের জোর কপাল বলো—কেন?পারানির দিকে চলেছে—বৈকুণ্ঠে যাবে—কেরানীর টাকায় টিকছে না আর—উৎপলা হাঁসফাস করে বললে, পেটে আমার কী যেন হয়েছে, মনে হয়—কী হল?টিউমার হয়েছে, মনে হয়—কে বললে?বলবে আবার কে? টের পাচ্ছি। এর অষুধ কী? অপারেশন করতে হবে?মাল্যবান সন্ধিগ্ধ চোখে তার স্ত্রীর দিকে তাকাল সত্য কথা বলছে? কি করে বুঝবে, কথাটা অসত্য? সুবিধের লাগছিল না তার। কোনো কিছু স্থির করে নয়, এমনিই কথা একটা-কিছু বলতে হবে বলেই মাল্যবান বললে, ও টিউমার নয়। ও কিছু নয়। ও তোমার মনের ধোঁকা।উৎপলা কথা খরচ করতে গেল না আর। মেঝের ওপর বসে ছিল–বসে-বসে হাঁসফাস করতে লাগল; উঠে দাঁড়িয়ে হাঁসফাস করতে লাগল।
চার-পাঁচ দিন কেটে গেছে। মাল্যবানের কেমন যেন—কেন যেন কিছুই ভালো লাগছিল না।চলো, আজ একটু বেড়িয়ে আসি—কোথায়?চলো আজ একটু গড়ের মাঠের দিকে যাই—মাল্যবান বললে।থাক।চলো, ভরসাঁঝে এ-রকম একা-একা বসে থাকলে মন খারাপ লাগবে—উৎপলা হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বড় বাতাসে ফুল ধরা বাবলার মতো হুড়মুড় করে কেঁপে পাক খেয়ে হেসে উঠে বললে, এই যে ছিরঙ্গ-ঠাকুরপো একটা বেহালা এনেছ দেখছি—শ্রীরঙ্গ এসে বললে, হা, কিছুদিন থেকে শিখছি—আচ্ছা, দ্যাখ, কেমন বাজাই।আমি এক-আধটা কেত্তন গাইতে পারি—বেহালার কী বুঝি।আচ্ছা, কেত্তনের সুরই ধরছি।কোচে বোসো ঠাকুরপো। বাঃ, দাঁড়িয়ে কেন?আমি দাঁড়িয়েই সুবিধে পাই; দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে নবনী মল্লিক বেহালা বাজায়। আমায় শিখিয়েছে সে।নবনী? পুরুষ, না, মেয়ে? মাল্যবান জিজ্ঞেস করল।অবনী যদি পুরুষ হয়, তাহলে নবনী কী হবে? আড় চোখে মাল্যবানের দিকে একবার তাকিয়ে বিদ্যুতের ভরা ব্যাটারির মতো সম্পন্ন সফল দৃষ্টিতে উৎপলার দিকে তাকাল শ্রীরঙ্গ।অবনী নবনী দুভাই? নবনীবাবু আপনার দাদা? মাল্যবান বললে।আমি তো মল্লিক নই।তবে?পলা-বৌদি জানে আমার কূলের খবর—ওরা রামবাগানের দত্ত। উৎপলা বললে।উৎপলা শ্রীরঙ্গকে জিজ্ঞেস করলে, নবনী কি মল্লিকবাড়ির মেয়ে, রাজেন মল্লিকের–হবে এক মল্লিকের; ব্যাটা ছেলে নয় নবনী, মেয়ে বটে। পলা-বৌদি, বেহালাটা বাজাই তাহলে? ঘাড় কাত্ করে গোলাপজাম কামরাঙা লটকান বনের কেমন এক অমায়িক হলুদ পাখির মতো জিজ্ঞেস করল শ্রীরঙ্গ।বাজাও বাজাও।কেত্তনের সুর?বাজাও।না, কেত্তনের সুর নয়—উৎপলা নিজেকে তাড়াতাড়ি শুধরে নিয়ে বললে।কেন?বেহালায় তা বাজবে না। তুমি একটা অন্য সুর বাজাও শ্রীরঙ্গ-ঠাকুরপো। যাকে বলে বেহালার সুর—শ্রীরঙ্গ বেহলা কাঁধে গুণীর মতো দাঁড়িয়েছিল। এবারে এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াল-বাঁ পা পিছনের দেয়ালে ঠেকিয়ে। বায়লার সুর মানে?মনোমোহন বায়লাদারকে চিনতে তুমি? উৎপলা বললে।না তো। কোথাকার?চব্বিশ পরগণার। আমি তাকে একটা চমৎকার সুর ভাঁজতে বলতাম। কোনো গানের সুর সেটা নয়। সেটা বায়লার সুর। মনোমোহন মন্ত্রী লোকটার নাম।ঐ একই সুর বাজাত?একই সুর।বরাবর?বারো মাস। আমাদের দেশের বাড়িতে শীত পৃড়লে আসত। কার্তিক মাসটা কাটিয়ে যেত। লোকটার নাম যা বললাম, মনে আছে তোমার?একটা শামুক, না, কী যাচ্ছে, দেখবার জন্যে হাঁসের মতো ঘাড় কাত্ করে শ্রীরঙ্গ ঘাড়টাকে আবার সোজা করে নিয়ে বললে, মনে আছে : মনোমোহন মন্ত্রী। এইবার বাজাই?বাজাও। বাজাও। আয় মনু, আয়। নবনী মল্লিক রাজেন মল্লিকের বাড়ির, না?না।তবে?ওদের বাড়ি জলপাইগুড়ি না, কোথায় যেন ছিল; এখন কলকাতায়ই থাকে। ও হল কেষ্ট মল্লিকের মেয়ে, টালিগঞ্জের।বড়-সড় মেয়ে?মনুর চেয়ে বড়, তোমার চেয়ে ছোট, বেশ সোমখ মেয়ে। ভারি সুন্দর। টলমলে মাকালের মতো যেন তেল চুয়ে পড়ছে চামড়ার থেকে; হাত বুলিয়ে নিলে ঘাসের শিশির উঠে আসে যেন ভোরবেলায়। ভালো বাজিয়ে। মোক্ষম গাইয়ে, মাইরি। আমি ওকে আমার গাইয়ে-বৌ বলি—ওকে বিয়ে করেছ তুমি?না। এম্নিই মস্করা করে বলি।শ্রীরঙ্গ বললে, বেয়ালার আর্টিস্ট কাউকে বিয়ে করে না। অবিশ্যি তোমার মতন। কাউকে পেলে বিয়ে করে, কি, না করে—বছরে কত দিন শনি-মঙ্গলবার নিয়ে টের পাইয়ে দিত আমাকে—কিন্তু কাউকে কোথাও পেলুম না—দেখলুম না তো তোমার মত।এরকম কথা শুনে নাক-মুখ লাল হবার বয়েস না থাকলেও সেই বয়েসের যে রক্ত এখন আছে উৎপলার; চলকে উঠছিল।সেই মাঠকোঠা নেবুতলা শোভাবাজার পাথুরেঘাটা কুমারটুলি আহিরিটোলা বৌবাজার চিৎপুর হাতিবাগান রাজাবাজার ধর্মতলা—সমস্ত কলকাতা আমার পায়ের নিচে পলা বৌদি—কিন্তু তোমার মতন এমন হাতি খেতে কাউকে তো দেখলুম না।উৎপলা এক হাত পেছিয়ে চমকে উঠে বললে, হাতি খেতে?হ্যাঁ, সেই অনেক দুরের সমুদ্রে শ্ৰীমন্ত সদাগর যেমন দেখেছিলেন—উৎপলা খানিকটা বিলোড়িত হয়ে উঠে বললে, তুমি বুঝি শ্ৰীমন্ত সদাগর?বেহালায় একবার ছড়ি টেনে উৎপলার দিকে চোখ তুলে শ্রীরঙ্গ বললে, আর তুমি দাঁড়িয়ে আছ পথের ওপরে, কিন্তু হাতি খাচ্ছ কেন, বলো তো কামিনীকমলে কামিনী বলো, উৎপলা ফোড়ন দিয়ে বললে। কামিনী নয়। কামিনী নয়। দেখছ না ওঁরা সব দাঁড়িয়ে আছেন—একটু এগিয়ে চাপা গলায় বললে শ্রীরঙ্গকে।শ্রীরঙ্গ বেহালায় এবার একটা সুরই ভাজতে লাগল—খুব মন দিয়ে, কিন্তু তার চেয়েও নিবিদ নিবেশে মননের অপর বস্তুতে লেগে থাকতে চেয়ে; বুঝছিল উৎপলা; অনুভব করছিল অপর বস্তুতে লেগে থাকতে চেয়ে; বুঝছিল উৎপলা; অনুভব করছিল একটু দুরে দাঁড়িয়ে থেকে মাল্যবান। কিন্তু বাজাতে-বাজাতে হঠাৎ মাঝখানে থেমে গেল শ্রীরঙ্গ।অনেক দুরের এক সাগর; দেখা যাচ্ছে নিরালা জল, রোদ। সেখানে পদ্মের ওপর দাঁড়িয়ে আছে : শ্ৰীমন্ত সদাগর দেখলেন। শ্রীরঙ্গ চোখ বুজতে-বুজতে চোখ মেলে ভালো করে তাকিয়ে একটু উত্তেজিত হয়ে বলল, কিন্তু তুমি হাতি খাচ্ছ কেন, পলা?কী খাব তাহলে? শীরঙ্গের দিকে তাকিয়ে, মাল্যবান যে দাঁড়িয়ে আছে, সেটা জানতে না চেয়ে নিজেকে একটু বেশি ছেড়ে দিয়ে বললে যেন উৎপলা।শ্রীরঙ্গ হঠাৎ চারিদিকে চোখ ফিরিয়ে বললে, ওঃ, এই যে মাল্যবানবাবুর; এখানে দাঁড়িয়ে আছেন দেখছি; আমার চোখেই পড়েনি। আচ্ছা, আমি বাজাই বেশ দুর্দান্ত একটা গৎ। শো-মনু, শোনো মনুর-মা, শুনুন মাল্যবানবাবু।
রাত দুটোর সময় খুবই কাছাকাছি কোন্ একটা বাড়ির ভেতর বড় কান্নাকাটি পড়ে গেল; মাল্যবানের ঘুম গেল ভেঙে। তাড়াতাড়ি বিছানার থেকে উঠে কম্বল গায়ে দিয়ে সে দরজা খুলে রাস্তায় নামল। তাকিয়ে দেখল ধীরেনবাবুদের সদর দরজার কাছে ভিড় জমে গেছে। ঢুকে দেখল, একটি মেয়েমানুষের শব নিচে নামানো হয়েছে—মেয়েটির বয়েস পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে হয়তো, এমন সুন্দর শান্ত নিরিবিলি মুখ-কপাল চুল সিন্দুরে মাখা-মাখা—দেখে তার প্রাণের ভেতর কেমন যেন করতে লাগল! অন্ধকার শীতের ভেতরে সে চুপে-চুপে নিজের ঘরে ফিরে এল আবার; খানিকটা সময় অবসন্ন হয়ে নিজের বিছানার ওপর বসে রইল;—তারপর আস্তে আস্তে সিঁড়ি ভাঙতে-ভাঙতে ওপরে গিয়ে দাঁড়াল।মাল্যবান দেখল, উৎপলা আর মন বিছানায় উঠে বসে আছে। একটা চেয়ারে। বসে মাল্যবান বললে, আমিও ভেবেছিলাম, তোমাদের ঘুম ভেঙে যাবেকারা কাঁদছে?ঐ ধীরেনবাবুদের বাড়ি—কী হল?সত্যেনের স্ত্রী মারা গেছে।আহা, সেই রমা!হ্যাঁ।কীসে মরল?জানি না তো।বাঃ, আমরা জানতে পারলাম না।হঠাৎ হয়তো মারা গেছে—কোনো রোগ হয়েছে বলে শুনিনি তো।হার্ট-ফেল করল। কিন্তু ওর স্বামী তো পুরুষমানুষ যাকে বলে। গলায় গামছা দিয়ে মেয়েমানুষকে ও-রকম জামাই টেনে আনতে দেখিনি তো কোথাও—অনেক জামাইষষ্ঠী তো দেখলুম–উৎপলা বললে।এবারকার জামাইষষ্ঠী হয়ে গেছে, মা? কী মাসে জামাইষষ্ঠী হয়, মা?মনুকে কনুই দিয়ে ঠেলে ফেলে উৎপলা বললে, সুখের পায়রার ঘাড়ে সোহাগের পায়রা করে রেখেছিল তো বৌকে। মেয়েটা এ-রকম ভিরমি খেল কেন গা।কীসে কী হয়েছে, কে জানে। চানের সময় সমস্ত মুখে সাবান মাখতে-মাখতে যেন সংক্ষেপে কথা সারে, তেম্নি ভাবে বললে মাল্যবান।আহা, দুটো কচিকাচা মেয়েও তো রয়েছে, ওদের কী হবে। সকলে মিলে দেখবে। অমন বাবা আছে। ঠাকুমা, পিসিমারা রয়েছে। যেন চোখে সাবান না যায় সেদিকে দৃষ্টি রেখে কটাকট-কটাকট কথা বলছে মাল্যবান—চানের সময় যেন মনে হচ্ছিল।তা পাড়াপড়শী মরেছে, যেতে নেই?আমি গিয়েছিলাম।গেলে তো চোরের মতো, চলে এলে আবার?তোমাদের একা ফেলে এ-রকম অবস্থায় বেশিক্ষণ তো সেখানে থাকা যায় না!আহা-হা, শিমূলের তুলো উড়তে উড়তে মাদারকাটার গিয়ে ঠেকেছি আমরা। ধনেশপাখি এসে ঠোঁট নেড়ে খসিয়ে দেবেন— উৎপলা এক গা জ্বালাতন ঝেড়ে দাঁতে দাঁত ঘষে বললে।আহা-হা!—আহা-হা! বলতে লাগল উৎপলা।বিছানার থেকে নেমে আলনার থেকে একটা বোসা পেড়ে গায়ে বেশ আঁটসাটো জড়িয়ে নিয়ে উৎপলা বললে, আয় তো, মনু, কোটটা গায়ে দিয়ে।মনুকে নিয়ে ধীরেনবাবুর বাড়ির দিকে রওনা দিল সে।লৌকিকতা রক্ষা করছে, ভালোই; ভাবছিল মাল্যবান; কিন্তু মনুকে সঙ্গে নিচ্ছে? কেন? সামাজিকতা রক্ষার জন্যই শুধু যাচ্ছে না উৎপলা—যাচ্ছে দশ-পাঁচ রকম দেখবে বলে; হৃদয় আধার উৎপলার, বাইরের পৃথিবীটাও খুব সক্রিয় (আজ দুপুর-রাতেও), কয়েক ঘন্টার খোরাক জুটল উৎপলার। মাল্যবান অন্ধকারের ভেতর একটা বিড়ি জ্বালাল। কিন্তু তৎক্ষণাৎ সেটা ফেলে দিয়ে নিচে নেমে সদর দরজায় তালা মেরে ধীরেনবাবুদের বাড়িতে যাবার মাঝরাস্তায় উৎপলাকে পেয়ে বললে, এই নাও চাবি।চাবি আমি কী করব?নাও। আমি শ্মশানে যাচ্ছি।উৎপলা ঠোঁট বসিয়ে বললে, পাড়ায় আর বামুন নেই, কাশীঠাকুর চিঁড়ে খাবে–নাও, চাবিটা নাও, ধরো-মাল্যবান চাবিটা গছিয়ে দিয়ে বললে।শ্মশানে যাবে মশানে যাবে, সেই একদিন যাবে, যাবে তো। নাও, পথ ছাড়ো—পথ ছাড়ো দিকিন, চৌখুপ্পী কম্বল জড়িয়ে রমাদের বাসায় ব্ল-অলা রাঘব বোয়ালের মতো হোঁৎ করে উজিয়ে উঠবার কোনো দরকার নেই তোমারকতা শোনোকতা। মনটা একটু রঙে চড়ে ছিল বলে মাল্যবান থ-কে ত বানিয়ে দিয়ে বললে, রাঘববোয়াল আবার রঁ-অলা হয় না-কি। কতা শোনো! কতা! হি-হি করে কাঁপতে-কাপতে এগিয়ে গেল সে যেন বীরজননীর ছেলে-দেশের শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাচ্ছে; এ না হলে উৎপলাকে চমৎকৃত করে দেওয়া যাবেকেমন যেন একটা প্রবল ছেলেমানুষি বীরপুরুষি ঝাপটা পেয়ে বসল তাকে; চমৎকৃত করে দেবার কী দরকার, ভাবতে গেল না সে; তার চেয়ে শীতরাতে নিচের ঘরের বিছানা-কম্বল যে সত্যিই ঢের পরিচ্ছন্ন সত্য শান্ত-মূল্য, মীমাংসার পৃথিবীতে সেটা ভুলে গেল।
মড়া পুড়িয়ে বেলা দুটোর সময়ে বাড়িতে ফিরে এলে উৎপলা বললে, আজকে অফিসটা বাদ দিলে তাহলে?কী করব, পাড়াপড়শী যদি মরে যায়।কী করলে শ্মশানে গিয়ে।যাই, চৌবাচ্চায় চান করে আসি–বলে, মাল্যবান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পিঠে গামছা ঘষতে লাগল।সত্যেনবাবু গিয়েছিলেন শ্মশানে?ও মা, তিনি যাবেন না।ও মা, চোখ পাল্টালে যে! শুদোচ্ছি। কতোক্ষণ ছিলেন তিনি?কোন এক সময়ে কেটে পড়লেন, টের পেলাম না।কেটে পড়লেন। কথার রকম দ্যাখ। ওকে তো সবাই ধরাধরি করে শ্মশান থেকে নিয়ে এসেছে। খেদার হাতির মতো কেমন অবোলা উতলা হয়ে পড়েছিলেন শুনলাম। খুব কেঁদেছেন?হ্যাঁ, কেঁদেছেন বটে। দু-চার বাটি।খুব লেগেছে ভদ্রলোকের, উৎপলা বললে, তবু পুরুষমানুষ তো। লেজ দিয়ে ডাঁশ উড়িয়ে আবার কলাগাছ খেতে শুরু করবে; এই তো হয়ে এলে বলে। বনের হাতি পোষা হাতি হবে এবার দোজবরে সত্যেনের বৌয়ের বিয়ের নেমন্তন্নে কলার পাৎ পড়ল বলে।এ, বৌ তোমার বাপের বাড়ি দেশের বুঝি? নিত্ কনে হয়ে আসর আঁকিয়ে বসবার শখ? মাল্যবান শরীরটাকে, মুখটাকে (যেন তা ফোকলা হয়ে গেছে) একটু নাচিয়ে হাসিয়ে বললে। সত্যেনের বিয়েতে কলার পা দিয়ে করবে কী তুমি। হাতি হয়ে সত্যেন কলাগাছ খাবে, বলছিলে তো তুমি; কামিনী হয়ে সেই হাতিকেই খাবে তো তুমি। বাঃ, কেমন কামিনীর মতো পদ্মের ওপর দাঁড়িয়ে আছে উৎপলা।উৎপলা উঠে দাঁড়িয়েছিল। আড়মোড়া ভাঙতে-ভাঙতে বললে, বেশ তিরিখ-তিরিখ জবাব দিচ্ছ তো তুমি, যে যাই বলুক, এই ভর-সন্ধ্যেবেলা। নাও, চান করে এসো, চা খাবে এসো।একটি মৃতা—খুব অল্প বয়সেই—দগ্ধ হয়েষছ শ্মশানে। একটি স্বামীর শোক খুবই জায়াকেন্দ্রিক, এখনও গভীর। কিন্তু এখনই তরল হয়ে যাচ্ছে সব; সচ্ছল সফল সময় ব্যথা, বাচালতা, সরসতা, নষ্টামি, ভয়, রক্ত, বিরংসা, অনাথ অন্ধকার ও গভীরতার ভেতর মৃত্যু নয়, শূন্য নয়, ব্যক্তি জীবন নয়, অফুরন্ত অনির্বচনীয় সময়,–সময় শুধু।
রমা মারা যাওয়ার পর থেকেই মাল্যবান মাঝে-মাঝে কেমন সব মৃত্যু ও দাহের স্বপ্ন দেখত রাতের বেলা। একদিন সে দেখল, নিজে মরে গেছে, তাকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হল: সেখানে সে খুব অমায়িক ভাবে সকলের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে, সকলকে নমস্কার জানাচ্ছে, বিদায় নিচ্ছে, বলছে; আপনাদের সঙ্গে আর তো দেখা হবে না, কোথায় যাই, কে জানে।জেগে উঠে তার মনে হল; এ কী অদ্ভুতঃ। হলই বা স্বপ্ন, কিন্তু স্বপ্নের ভেতরেও মরে তো গিয়েছিল সে; মরে গিয়ে মানুষ আবার বসে-বসে জীবিত মানুষদের সঙ্গে কথা বলে কী করে! বাস্তবিক, স্বপ্ন এমন হিজিবিজি-মানুষের বুদ্ধি বিচার চেতনার দুকান কেটে ছেড়ে দেয়। অনেকে বলে স্বপ্ন সত্য হয়। বাস্তবিক, মরে যাবে কি সে? শীতের গভীর রাতে অন্ধকারকে মিশকালো করে দিয়ে বেশি অন্ধকারের প্রবাহের ভেতর —ভাবতে-ভাবতে-ভাবতে গিয়ে কেমন যেন ন্যাতা জোবড়ার মতো হয়ে পড়ল সে। নিজের জন্যে ততটা নয়—কিন্তু সে মরে গেলে উৎপলার উপায় হবে কী? মনু আর উৎপলার জন্যে মনটা তার নিজের চেয়ে ঢের বুড়ো মানুষের মতো গুইগাঁই করে উঠল। বিছানায় উঠে বসল; চটি পায়ে দিয়ে কম্বল জড়িয়ে আস্তে-আস্তে ওপরের ঘরে গেল সে। গিয়ে দেখল, উৎপলা ঘুমিয়ে আছে—পাশে মনু—সেও ঘুমিয়ে। বেশ শান্ত নিরাময় নিঃশ্বাস তাদের। ওরা অন্তত কোনো দুষ্ট স্বপ্ন দেখেনি। বেশ। এদের দিকে তাকালে আশ্বাস পাওয়া যায়। কিন্তু তবুও এর স্বামী আর ওর বাবা যদি মরে যায়, তাহলে এ-রকম করে এরা দুজনে ঘুমোতে পারবে কি আর? জেগেও উঠতে পারবে না আর জাগরীতে ঘুরে-ফিরে বেড়াতে পারবে না আর সহজ সফল ভাবে।কিন্তু, তবুও শেষ পর্যন্ত সত্যিই মরে সে তো যায়নি, বেশ সুস্থ হয়ে বেঁচে আছে। আছে। আমাদের জীবনের নদীর নাম অনুত্তরণ, মাল্যবান ভাবছিল, কোথাও কেউ উত্তীর্ণ হতে পারে না, কোনোদিন এ-নদীর পথে; কিন্তু, তবুও, কতো লোক ব্যথা বিপদ বিফলতা মৃত্যুর বলে প্রতিদিন ওড়াচ্ছে; উৎপলা, মনু পারবে না কেন? মানুষ হয়ে জন্মালে নানারকম দুর্নিবার শাস্তি ভোগ করতে হয়—করতেই হয়; মনু উৎপলা বাদ যাবে না; মাল্যবান মরে গেলে মানুষের সে-পাওনা বুঝে নিতে হবে স্ত্রী-সন্তানকে; কিন্তু বেশি দিনের জন্যে নয়; চুপ হয়ে যায় সব, শান্ত নিশ্ৰুপতা রয়েছে। প্রথমে মাল্যবানের মৃত্যু—তারপরে অনেকদিন পরে হয়তো তার স্ত্রী আর সন্তানের মৃত্যু; এই ত্ৰিমৃত্যুতে নিস্তব্ধ হয়ে যাবে সব। সময়ের কাছে মাল্যবানের দায়িত্ব ফুরিয়ে যাবে। ভাবতে-ভাবতে এখনই যেন ফুরিয়ে যাচ্ছিল সব—এই রকম একটা অনুভাব ঘিরে রাখছিল মাল্যবানকে।কিন্তু, আরেক দিনের স্বপ্ন সবচেয়ে ব্যথা দিল তাকে। দেখল, উৎপলা মরে গেছে। স্বপ্নের ভেতর মনে হল, উৎপলা সত্যেনবাবুর স্ত্রী—সমস্ত পৃথিবীই তা জানে—মাল্যবান নিজেও খুব ভালো করেই জানে যে, দশ-বারো বছর ধরে এরা পরস্পরের বৈধ স্ত্রী স্বামী; এদের এ-রকম সম্পর্ক নিয়ে কোনো খটকার বাষ্প নেই মাল্যবানের মনে। কিন্তু, তবুও, সেই সঙ্গে সেই স্বপ্নেই উৎপলা মাল্যবানের স্ত্রী-ই—আর কারু কিছু নয়; এ-রকম সব খাপছাড়া জিনিস স্বপের ভেতরে খুব সত্য ও স্বাভাবিক বোধ হচ্ছিল। দেখল গেল, উৎপলা মরে কাঠ হয়ে পড়ে রয়েছে—সমস্তু চুল এলোমেলো, কপালে মাথায় সিঁদুর ধ্যাবড়া, পরনে—আশ্চর্য!—বিধবার থান। মড়ার খাটিয়ার ওপর শুয়ে মড়া নারী মনের, মাংসপেশীর নানা রকম নম্র, উদ্দাম আক্ষেপে নিজের মৃত্যুর বেদনা সত্যেনকে জানাচ্ছে, কিন্তু শুন্যতা ও হাহাকার বিঁধছে মাল্যবানকে, মরমস্নায়ুতে।ঘুম ভেঙে গেল তার।তখন শেষ রাত।কম্বলের নিচে সমস্ত শরীর ঘেমে গেছে মাল্যবানের। সে তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে খালি পায়ে ওপরে ঘরে চলে গেল। গিয়ে দেখল, মনু বিছানায় উঠে বসে আছে—উৎপলা নেই। নেই, থাকবে না বলে দিয়েছে তো স্বপ্ন। তার সঙ্গে গাঁথা এই নাস্তিত্বটা বুঝি। নেই।তোর মা কোথায়, মনু?বাথরুমে গেছে।আছে তাহলে; কিংবা হয়তো নেই; কী মানে আছে এত বেশি শীতে শূন্যতায় প্ৰপন্ন রাতে দূর বাথরুমের অন্ধকারে মানুষের অস্তিত্বের মনুর মুখের বাথরুমে গেছে নির্দেশের।কখন গেল?এই তো, এখুনি।এতক্ষণ বিছানায় শুয়ে ঘুমোচ্ছিল?হ্যাঁ।কোনো অসুখ-টসুখ করেনি তো?কার? মার? মনু মাথা নেড়ে বললে, না তো।কোনো অসুবিধে হয়েছিল? কাঁদাকাটি করেছিল?চোখের ওপর থেকে চুলের গোছা সরিয়ে নিয়ে মনু বললে, না তো। আমি দেখছি, কাদেনি। কে বললে মাকে—তুমি বলেছ কাঁদতে?না রে। মাল্যবান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল, চেয়ারে বসল এবার।মাল্যবান সদ্য স্বপ্নছুট বির্তকাসক্ত মনকে বলছিল, সত্যেনবাবুর কাছে খিচে-দুমড়ে দীনতায় দাবনা কাপিয়ে সে কী আক্ষেপ, কান্না;—নিজে মরে গেছে বলে। বাস্তবিক, স্বপ্ন বড় ফিচেল—নিরেট জিনিস; খাট মেরে বদহজম হলে ও-সব বিলকি ছিলকি স্বপ্ন দেখা যায়, এই যারা ভাবে, তারা কি কিছু জানে? স্বপ্ন হচ্ছে অন্তিম জিনিস—এরপর আর কিছু নেই; ছোট অন্ধকার আর বড় অন্ধকারের টানা পোডেনে রাতের আলোয় অন্তিম ঘনিয়ে উঠলে স্বপ্ন দেখা যায়—দুঃস্বপ্ন; ভালো স্বপ্নও, আশ্চর্য রকমের স্নিগ্ধ স্বপ্ন সব—এখন, কটা, বাবা? ভোর হয়ে গেছে? না?না। ঘুমবে না-কি? ঘুমোও, ঘুমোও।ময়লার গাড়িগুলো ঘিনঘিন করছে; ওগুলো ময়লার গাড়ি, না? কাক ডাকছে তো। এখন কটা রাত, বাবা?কটা রাত? বলছি তোমাকে। মাল্যবান বললে। কিন্তু ধারাপাত প্রথম ভাগ নিয়ে মন তার বসে পড়তে যাচ্ছিল না। অমেয় অব্যয় স্বপ্নকুটও জ্ঞাননিজ্ঞানগ্রন্থি নিয়ে খুব চিন্তিত হয়ে ছিল তার মন—বৃহত্তর উৎপলা গ্রন্থির পরিধির ভেতর। সব রকম গ্রন্থিকে অতিক্রম করে একটা স্বাভাবিক তার মহত্বে পৌঁছুবার জন্যে।উৎপলা বাথরুম থেকে ফিরে এসে বললে, তুমি এখানে বসে যে—তুমি এখন ঘুমুবে?মতলবটা কী তোমার?না, কিছু না। মনে হলে, কোনো অসুখ-টসুখ করল না-কি?কার? আমার?সারারাত বেশ ঘুম হল?মাল্যবানের পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার তাকিয়ে নিয়ে উৎপলা বললে, এখানে এখন কীসের জন্যে?এমিই এসেছিলাম। রাতে অনেকক্ষণ বই-টই পড় বুঝি? অনেক কাজ করি—তুমি মনে কর, আমি বুঝি তোমার কাজের ফর্দ চাইতে এসেছি। না, তা নয়, এম্নি কথাবার্তা বলতে এলুম।এখন আমার সময় নেই, উৎপলা বললে, ভালো মানুষের মতো নিচে গিয়ে ঘুমোও তো।তুমি এখন আর-এক দমক ঘুমিয়ে নেবে বুঝি?আমার আজ উঠতে দেরি হবে। নিজে চা করে নিয়ো।নেব। দোকানেও খেয়ে আসতে পারি। আজ রাতে তোমার ঘুম হয়েছিল ভালো? আমি কেমন বিদকুটে স্বপ্ন দেখেছিলুম সারাটা রাত।উৎপলা লেপের ভেতর চলে গিয়েছিল; শেষ রাতে আর-একটা ঘুম জড়িমার আশ্চর্য ঢেউ এসে পড়েছিল ঠিক বাথরুমে যাবার আগে; এখনও আবেশটা কেটে যায়নি; কিন্তু নিচের থেকে মানুষটা ঠিক এই সময়েই উঠে এল বাদ সাধবার জন্যে।তুমি যাও।আজকে রাতে স্বপ্ন দেখেছিলুম, তুমি মরে গেছ।তুমি নিচে যাবে?নিচে আমি যাব বটে, মাল্যবান কম্বলটা আঁট করে জড়িয়ে নিয়ে বললে, নিচে যেতে হবে। কিন্তু বিচ্ছিরি সব স্বপ্ন দেখছিলুম সারারাত। পোষ মাসের রাত; পোলা বলে পাড়াগাঁয়—ধূম পড়ে গেছে সব। পোষলার গাঁজলা বলেন স্বপ্নকে ফ্রয়েড। কিন্তু কী জানেন স্বপ্নের ফ্রয়েড? জ্বিয়েনার যত মৃগী রুগী আসত তো তার কাছে; তাদের কফিসেদ্ধর গরম-গরম সুরুয়া বানিয়ে তো আর মানবজীবনের তত্ত্ব বেরোয় না।মনু বললে, মা মরে গেছে, এই স্বপ্ন দেখেছিলে রাত্রে?আমি স্বপ্ন দেখেছিলাম, তোর বাবা উল্টোপাধায় চড়ে সিধে নিয়ে চলেছে-বাজেশিপুরের ব্রহ্মমোহনবাবুকে দেবে। চলেছে—চলেছে—চলার আর শেষ নেই—উল্টোগাধায় চড়ে চলেছে কোথায়? বাজেশিবপুরের নকড়ি খোসাল বটব্যালের কাছেমনু ফিক-ফিক করে হেসে উঠল, বললে, ভোম্বা! বাজেশিবপুর—বা-জে-শি-ব ন-ক-ড়ি খো-সা-ল—অন্ধকারের ভেতর একটা বিড়ি জ্বালিয়ে নিয়ে মাল্যবান ঠোঁট ভেঙে হাসছিল। বেশ ভালো লাগছিল তার; চারদিক অন্ধকার—হয়তো একটু পাতলা হয়ে এসেছে; তবুও বেশ ভালো, নিশ্রুপ, উচ্ছিষ্ট অন্ধকারে ভরে আছে ঘরটা; খুব শীত; গায়ে গরম পন্টুর ওপর বেশ চৌখুপ্পী কম্বল জড়িয়ে বসেছে সে শীতের ভেতর। ডিমপাড়া নীচের দুটো কোলঘেঁষা পাখির মতন উষ্ণ হয়ে রয়েছে যেন তার একামানুষের শরীর। বাইরে জীবনের সাড়া চলালচল আরম্ভ হয়ে গেছে—তবুও মুখের নিস্তব্ধ অমরতাও অনেকখানি। ঘরের ভেতর লেপমুড়ি দিয়ে ভারি আরামেই শুয়ে আছে উৎপলা আর মনু; মরেনি পলা, মনু বেশ ভালোই আছে; উল্টোগাধার পিঠে চড়ে বাজে-শিবপুরে যাওয়ার কথাটা পলা যা বলেছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে—এই-ই তো বোঝা যাচ্ছে যে, স্থির ঠাণ্ডা তার মাথা। যাক, ভালো আছে ওরা। রাত পোহাতে বাকি আছে খানিকটা সময়। ঘুমোক। মাল্যবান উঠবে, ভাবছিল, বিড়িটাও ফুরিয়ে এল। নিচে গিয়ে চুরুট জ্বালিয়ে বসবে এবার।
পরদিন সন্ধ্যের সময় আফিস থেকে ফিরে চা-জলখাবার খেয়ে মাল্যবান ওপরে এল।সে-দিন সেই পরোটাগুলো কাকে দিয়েছিলে?কোন দিন?ঐ যে-দিন বৌঠানের জন্যে বেনারসী কিনতে গেলাম?ওঃ, লোনার মাকে।লোনার মা এসেছিল আর?না।তার ছেলের কী হয়েছে যেন?কুষ্ঠ।উৎপলা বললে, কেন জিজ্ঞেস করছ?কুষ্ঠরুগী-তাই ভাবছি—লোনার মাকে আমি বলেছিলাম রোজ এসে ভাত ডাল মাছ নিয়ে যেতে।তা বলেছ, ভালোই করেছ, উনুনের আগুনে নিজেকে জ্বালিয়ে তবে এসব মানুষকে হাঁড়ির ভাত সেদ্ধ করতে হয়। বড় সন্তাপ এদের–কৈ, এল না তো আর।কুণ্ঠরুগী কি-না, কী হয়েছে—না, বুড়ির কোনো রোগ হয়নি, উৎপলা বললে।আমি বলেছি, ছেলের কথা—তা অবিশ্যি, হয়তো কোনো আশ্রমে গেছে।তা হতে পারে!বেশি নয়—একটু—আলোড়িত হয়ে উঠেছে বলে মনে হচ্ছিল মাল্যবান। ঘন-ঘন কয়েকবার চোখের পলক ফেলে বললে, আমাকে সে-দিন উপোসী রেখে লোনার মাকে পরোটা তো দিয়েছ—।চেয়েছিল, কেন দেব না?দিয়েছ, ঠিক করেছ। ভালোই করেছ। ভালোই করেছ–মাল্যবান আর কথা বাড়াবে না, ভাবছিল। সে-দিনকার সেই পরোটার কথা বলবার জন্যেও প্রধানত আসেনি সে; অন্য সব বিশেষ অন্তরঙ্গ কথা বলার তাগিদ, কিন্তু তবুও বললে, ওকে দিয়েছ, ভালোই করেছ, কিন্তু আমাকেও কিছু দিলে পারতে, সমস্ত দিন অফিস খেটে আসি–কবেকার পরোটার কথা কপচাতে এসেছে মাল্যবান, উৎপলার গলায় ঝঝ এল, বললে, তুমি বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে নিলেই পারতে–ভবিষ্যতে আনাতেই হবে। নাহলে আমি ঠকব। কিন্তু তোমাকে বলছিলাম—আমার শুনে দরকার নেই।মাল্যবান একটু কঠিন হয়ে বললে, কেন, তোমার মাথার দুদিকে দুটো তো কান।কঠিনতর হয়ে মাল্যবানের স্ত্রী বললে, আমার কান সকলের যা-তা কথা শোনবার জন্যে নয়।মাল্যবানের মনে হল, স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে-বলতে সে ভুল পথে চলেছে। সে হেসে উড়িয়ে দেবার ভঙ্গি করে বললে, যা বলতে চাই, তা বলা হয় না। অন্য পাঁচ রকম বলে ফেলি। নিজেকে ঠিকভাবে প্রকাশের শক্তি আমার নেই। তুমি কিছু মনে কোরো না।উৎপলা একটা চিরুণী তুলে নিয়ে চুল আঁচড়াচ্ছিল—চুল বাঁধবে বলে নয়—এমিই। চুল আঁচড়াতে-আঁচড়াতে সে চুপ করে রইল।সে-দিনের মতো ঘরোয়া আলাপ শেষ হয়ে গেল। নিচে চলে গেল মাল্যবান। কিন্তু সেদিনকার বিকেলের পরোটা-জলখাবারের কথা নিয়ে বেঁকিতে পাড় দিতে সে চায়নি তো; অভিপ্রায় ছিল তার সূক্ষ্ম গভীরতর অনেককিছুর কিনার ঘেঁষে কথা বলার।কথা শেষ হলে স্বাদ। অন্য সফলতা।কিন্তু হল না কিছুই।