BDBOYS...
BDBOYS...
সবচেয়ে সাম্প্রতিক খবর ও পোস্টসমূহ
গল্পঃ আমৃত্যু ভালোবাসি তোকেলেখিকাঃ সালমা চৌধুরী.................................................................................................................................................................মাহমুদা খানের ধমক খেয়ে মেঘ কেঁপে ওঠে, ভয়ে সঙ্গে সঙ্গে কল কেটে দিয়েছে৷ মেঘ ভয় পেলেও আবিরের মনে কিঞ্চিৎ ভয় বলতে নেই। ফুপ্পির ঝা*ড়ি খেয়েও আবির কল দিয়েই যাচ্ছে। মেঘ ফোন সাইলেন্ট করে রেখেছে ঠিকই কিন্তু আবিরের অনাবশ্যক কলে বুকের ভেতরটা অবিচ্ছিন্নভাবে কম্পিত হচ্ছে। বাহির থেকে আলোকসজ্জার ঝলমলে আলো রুমে প্রবৃত্ত হচ্ছে। মেঘ ঘাড় ঘুরিয়ে বন্যার দিকে একপলক তাকালো, বন্যা গভীর ঘুমে নিমগ্ন পরপর তাকালো ফুপ্পির দিকে, ফুপ্পির ভারী নিঃশ্বাসের শব্দে বুঝা যাচ্ছে ওনিও ঘুমে। মেঘ বুকের উপর ফোন চেপে অতি সন্তর্পণে বন্যার পাশ দিয়ে নেমে উদগ্রীব পায়ে বারান্দায় গিয়ে কল রিসিভ করল। আবির তৎক্ষনাৎ অনচ্ছ কন্ঠে শুধালো,” তোর কি আমার জন্য একটু মায়াও হয় না?”আবিরের কথা শুনে মেঘ বিহ্বল, ভড়কে গেছে কিছুটা। কপাল কুঁচকে ভারী স্বরে বলল,” আমি কি করলাম!”” সন্ধ্যা থেকে কেউ আমাকে একটা কল পর্যন্ত দিল না। কেউ না দিলেও তুই তো একটা কল দিতে পারতি নাকি?”” আমি তো আপনার কলের অপেক্ষায় ছিলাম। অপেক্ষা করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পরেছি বুঝতেই পারি নি।”“বাহ! কি দায়িত্বশীল বউ আমার। ”মেঘ সহসা ঠোঁট বাঁকালো, সদাজাগ্রত চোখে আলোকসজ্জার লাল, নীল আলোর পানে তাকিয়ে মোলায়েম কন্ঠে শুধালো,” বাসায় কখন আসছেন? খেয়েছেন?”“কিছুক্ষণ আগে। আমার শ্বশুর বিয়েতে যে পরিমাণ জামাই আদর করেছে রাতে আর কিছু খেতে হবে না।”“কোথায় গিয়েছিলেন?”“এখন বলবো না। ”“আচ্ছা, ঘুমান তাহলে। ”“শুন”“জ্বি”“চল ছাদে যাই।”“না।”“কেনো?”” আম্মুরা বলেছে বিয়ের রাতে বড় জামাইয়ের মুখ দেখতে নেই, এতে নাকি জামাইয়ের অমঙ্গল হয়।”” ঠিক আছে, দেখলাম না মুখ। একটু কথা তো বলতে পারি। ”“আব্বাজান নিষেধ করেছেন, দেখাসাক্ষাৎ ও করা যাবে না। ”আবির ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,“কেউ আমাকে কিছু বলতে পারছে না তাই তোকে কুসংস্কার বুঝাচ্ছে আর তুইও বোকার মতো সেসব মানতেছিস।”মেঘ নিশ্চুপ, আবির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করে আহ্লাদী কন্ঠে বলল,” চল না ছাদে।”মেঘ অত্যন্ত ধীর কন্ঠে বলল,” একটু বুঝার চেষ্টা করুন,আমি যেতে পারবো না। আপনি যেন রুমে না আসেন তারজন্য আব্বাজান ফুপ্পিকে আমার সাথে থাকতে বলেছেন। এখন আমি বের হলে খবরই আছে। আপনি ঘুমান, প্লিজ।”আবির ঢোক গিলে ভ্রু বাঁকিয়ে আবেগতাড়িত কন্ঠে বলল,“I miss you. I need you. Believe me, I badly want you, Sparrow.”আবিরের কন্ঠে আবেগপ্রবণ, অস্বাচ্ছন্দ্যকর কথাগুলো শুনে মেঘের গা শিউরে উঠছে। এ যাবৎ কালে আবিরকে এতটা ব্যাকুল হতে কখনো দেখেনি সে। মেঘ নিস্পৃহায় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঠোঁট কামড়ে বিড়বিড় করল,“আমাকে তো খুব বলতেন সহিষ্ণু হতে হবে, ধৈর্যশীল হতে হবে তাহলে আজ আপনার এই অবস্থা কেনো?এত অধৈর্য হয়ে উঠেছেন কেনো আপনি?”” আর কত ধৈর্য ধরবো? এতদিন যাবৎ অফিসিয়াল বিয়ের অপেক্ষায় ছিলাম, করলাম তো অফিসিয়াল বিয়ে। আত্মীয় স্বজন, এলাকাবাসী সবাই জানলো তো। তাহলে এখন আমার বউ আমাকে দিচ্ছে না কেনো? মানলাম কাল অনুষ্ঠান শেষে বাসর হবে। কিন্তু দেখা তো করতে দিবে! কথা তো বলতে দিবে! আমাদের মাঝে কংক্রিটের দেয়াল সৃষ্টির কি দরকার ছিল? ”“জানি না। আমার ঘুম পাচ্ছে, ঘুমাবো। আপনিও ঘুমান।”“বুকের ভেতর আগুন জ্বললে ঘুমাবো কিভাবে?”মেঘ মুচকি হেসে বলল,” এক বোতল ঠান্ডা পানি খেয়ে ঘুমিয়ে পরেন ।”মেঘ কল কেটে রুমে চলে গেছে। আবির কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে বিড়বিড় করল,” এত কাহিনী করবে জানলে কমিউনিটি সেন্টার থেকেই পালাতাম৷ ”মেঘ ভোরবেলা উঠে আবারও ঘুমিয়েছে তাই সকালে ঘুম একটু দেরিতে ভেঙেছে। আশেপাশে বন্যা, ফুপ্পি কেউই নেই। আবিরের কথা মনে পড়তেই সঙ্গে সঙ্গে ফোন হাতে নিল। মেঘ আনমনেই নেট অন করে ফেসবুকে ঢুকলো। অকস্মাৎ আবিরের পোস্ট দেখে চমকে উঠল। গতকাল বিয়ের বেশকয়েকটা ছবি আবির রাতেই তার আইডি থেকে পোস্ট করে ক্যাপশন লিখেছে,প্রিয় সহধর্মিণী,আমার অলীক কল্পনার সঙ্গী তুমি, গোধূলি লগ্নে বাড়ি ফেরার একান্ত অভিপ্রায়। তুমি আমার স্নিগ্ধ সকালের সুললিত গন্ধরাজ, পড়ন্ত বিকেলের একগুচ্ছ বাগানবিলাস। আমার শূন্য হৃদয়ের পূর্ণতা তুমি, ব্যাকুল হৃদয়ের নির্জন নির্মলা। নীল দিগন্তের উড়ন্ত মেঘেরা জানে, কত স্বপ্ন উড়িয়েছি বেনামি খামে। তোমার মায়াবী মুখের পানে চেয়ে, ভুলেছি সব যাতনা আনমনে। তোমার ঠোঁটের ঐ স্নিগ্ধ হাসি দেখে, আমার হৃদয়ের অন্তরালে নিরবচ্ছিন্ন বিক্ষোভ চলে। তুমি আমার অবসন্ন মস্তিষ্কের প্রবলতা, নব্য স্বপ্ন দেখার অদম্য স্পৃহা। তোমাকে হাসাতে চেয়ে, বহুবার কেঁদেছি আড়ালে। তুমি আমার অপেক্ষার শেষ প্রহর, ১৬ বছরের প্রতীক্ষার অমূল্য পুরস্কার। তোমাকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয় নি আমি, দিয়েছি আবিরের বউয়ের স্বীকৃতি। আমি তোমাকে ভালোবেসেছি, ভালোবাসি আর আমৃত্যু ভালোবেসে যাব।ইতি,তোমার আকাঙ্ক্ষিত স্বামীমেঘ ক্যাপশন পড়ে ৫ মিনিটের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। ৫ মিনিট পর মনোযোগ দিয়ে ছবিগুলো দেখতে লাগল। গতকাল পার্লার থেকে সেজে যাওয়ার পর থেকে নিজেকে কেমন লাগছে সেটা দেখার সুযোগ ই পায় নি, বিয়ের ছবি পর্যন্ত দেখে নি তবে কয়েক ঘন্টায় আবিরের মুখ থেকে হাজারখানেক প্রশংসা সহ আবিরের দুর্বৃত্ত কথা শুনতে হয়েছে। সুযোগ পেলেই মেঘের কানের কাছে ফিসফিস করে নিজের অব্যক্ত অনুভূতি জাহির করেছে আর মেঘ শুধু আবিরের পাগলামিই দেখে গেছে। এমনকি কবুল বলার সময় আবিরের অস্থিরতা দেখে মেঘ নির্বাক ছিল, নিষ্পলক চোখে কেবল তাকিয়েই ছিল। মিনিমাম লাজলজ্জা বিসর্জন দিয়ে আবির উচ্চশব্দে বলছিল,“পৃথিবীর যা কিছুর বিনিময়েই হোক, আমি সবকিছু দিতে রাজি হয়েই মেঘকে বউ হিসেবে কবুল করলাম।আলহামদুলিল্লাহ কবুল, কবুল কবুল।”যেখানে একবার কবুল করলাম কিংবা আলহামদুলিল্লাহ কবুল বললেই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায় সেখানে আবির বলেই যাচ্ছিলো। আবিরের কাণ্ড দেখে কাজী সাহেবও না হেসে পারলেন না। কাজীর মুখে হাসি দেখে আবির পরপর উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,” আমাদের বিয়ে হয়েছে তো?”কাজী সাহেব উঠে যেতে যেতে বললেন,” আলহামদুলিল্লাহ, এতদিনে পরিপূর্ণ হয়েছে।”“আলহামদুলিল্লাহ। ”কাজী চলে যেতেই আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠল,“এই ভরাট মজলিসে সবাইকে সাক্ষী রেখে আমি আবির তার মেঘকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছি। মেঘ কি আবিরকে স্বামী হিসেবে কবুল করছে?”মেঘ আবিরের ঝলমলে চোখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে হেসে মোলায়েম কন্ঠে জবাব দিয়েছিল,” কবুল করলাম, আলহামদুলিল্লাহ কবুল, কবুল কবুল।”আবিরের পাগলামি সেখানেই থামেনি। গতকাল বাসায় ফেরার সময় আবির হঠাৎ ই মেঘের কানে ফিসফিস করে বলছিল,” চিরদিনের জন্য শ্বশুর বাড়িতে চলে যাচ্ছিস এবার একটু কান্না কর। মানছি একই বাড়িতে যাচ্ছিস তাই বলে কাদঁবি না?”মেঘ ভেঙচি কেটে বলেছিল,“আপনার যদি এতই শখ থাকে তাহলে আপনি কান্না করেন।”প্রতিত্তোরে আবির বলেছিল,“তুই নববধূর মতো কান্নায় ভেঙে পড়বি, নতুন জামাইদের মতো আমি তোকে সান্ত্বনা দিব। এটা আমার জীবন থেকে মিস হয়ে গেল। এক কাজ করি, চল দুজন একসঙ্গে কান্না শুরু করি।”গতকাল আবিরের আজগুবি কথা শুনে মেঘ কপাল কুঁচকালেও আজ কথাগুলো মনে করে আনমনে হেসে ফেলল। পুনরায় ছবি দেখায় মনোযোগ দিল। নিজের পড়নের মেরুন রঙের বিয়ের বেনারসি, গা ভর্তি ভারী গহনা, মাথায় ঘোমটা সহ চোখধাঁধানো আড়ম্বরপূর্ণ সাজসজ্জা দেখে মেঘ নিজেই লজ্জায় পড়ে যাচ্ছে। সেই সাথে রাজোচিত শেরওয়ানিতে আবিরকে যেন রাজপুত্রের মতো লাগছে। গতকাল আবিরের অযাচিত দুষ্টামির জন্য সামনাসামনি ঠিকমতো দেখতেই পারে নি তবে আজ ছবিগুলো খুব ভালো করে দেখছে। আয়নায় দু’জনের মুখ দেখা, মেঘের কপালে আবিরের চুমু দেয়া, একে অপরের চোখে চোখ রেখে নিগূঢ় ঘোরে বন্দি থাকা, বরণের ছবি সহ আরও ২-৩ টা ছবি আপলোড করেছে। মেঘ সবগুলো ছবি দেখা শেষে কৌতূহল বশত কমেন্টস দেখতে গেল। আবিরের বন্ধু, ছোট ভাই, বড় ভাই, রাকিব, সাকিব, তানভির, মাইশা আপু সহ সবাই নিজেদের মতো অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি উস্কানিমূলক মন্তব্যও করেছে। কারো কারো মন্তব্য দেখে মেঘ বেশ বিস্মিত হচ্ছে। এরমধ্যে বন্যা আসছে। মেঘের লাজুক হাসি দেখে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল,“হাসছিস কেন? ভাইয়ার পোস্ট দেখে?”মেঘ কপাল কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,” তুই কিভাবে জানিস?”” শুধু আমি না বাড়ির সবাই এখন ভাইয়ার পোস্ট নিয়ে গবেষণা করছে, নিচে গেলেই বুঝতে পারবি।”মেঘ শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,” তুই খেয়েছিস?”“না। তোকে ডাকতেই আসছিলাম, তুই ফ্রেশ হয়ে আয় একসাথে খাব।”“আচ্ছা। ”বন্যা মীমের রুমে চলে গেছে। ইদানীং মেঘ ব্যস্ত থাকায় বন্যার মীম আর আইরিনের সাথে খুব ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে। দু’জনেই তানভিরের কথা জানে তাই তানভিরের হাত থেকে বন্যাকে সবসময় প্রটেক্ট করে। ড্রয়িং রুমে সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে আবির। রান্না ঘরে রান্নার আয়োজন চলছে, ইকবাল খান ছাদ থেকে নেমে আবিরকে এভাবে বসে থাকতে দেখে কিছুটা উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,“কিরে আবির, এভাবে বসে আছিস কেন?”আবির চোখ খুলে কাকামনিকে একপলক দেখে পূর্বের অবস্থায় থেকে উত্তর দিল,” আমার মনটা খুব খারাপ। ”ইকবাল খান নেমে এসে আবিরের পাশে বসতে বসতে শুধালেন,” মন খারাপ কেনো? বিয়ে তো সবাই মেনেই নিয়েছে। তাহলে মন খারাপ কেনো থাকবে?”আবির তপ্ত স্বরে বলতে শুরু করল,” মন খারাপ থাকবে না কেন? মানুষ এলাকা ছেড়ে দু-এক বছর বাহিরে থাকলেই কথা,আচরণ, চলাফেরা সব বদলে যায় সেখানে ২০-৩০ বছর ঢাকা শহরে থেকে এখনও গ্রামের কি সব আজগুবি নিয়মনীতি পালন করছে। বিয়ের পর বউ আলাদা কেনো থাকবে? এতবছর অপেক্ষা করে, নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করে, আল্লাহ র কাছে চাইতে চাইতে মেঘকে পেয়েছি, কেউ কি জানে সেটা? কিছুদিন যাবৎ এই বাড়ির প্রতিটা মানুষ আমার ইমোশন নিয়ে প্রতিনিয়ত খেলতেছে তারপরও আমি চুপ করে আছি। আমি যদি ঘুনাক্ষরেও এসব টের পেতাম তাহলে মেঘকে নিয়ে আগেই পালিয়ে যেতাম। তোমরা যা করছো তা আমি কখনো ভুলবো না৷ আমি এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।”ইকবাল খান শীতল কন্ঠে বললেন,” এভাবে বলছিস কেনো, একেক এলাকার একেক রীতি। একটু আধটু মেনে নিতেই হবে।”আবির কিছু বলার আগেই পেছন থেকে আলী আহমদ খান গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন,” তোমার নিন্দা জানানো শেষ হলে বাহিরে আসো, কাজ আছে।”আলী আহমদ খানের কন্ঠ শুনে আবির চমকে উঠে পেছনে তাকালো। আব্বুর রাগী রাগী চোখমুখ দেখে নিজের মুখ চেপে ধরল। আলী আহমদ খান কখন এসেছে আর ঠিক কতটুকু কথা শুনেছে এটা ভেবেই আঁতকে উঠছে আবির। ইকবাল খানের সাথে আবিরের ফ্রেন্ডলি সম্পর্ক হওয়ায় যা ইচ্ছে বলে দিতে পারে কিন্তু আব্বুর সামনে সে যথাসাধ্য ভদ্র থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু আজ এভাবে ধরা পড়ে যাবে সেটা কল্পনাও করতে পারে নি। আবির মাথা নিচু করে দাঁত দিয়ে জিভ কামড়ে বাসা থেকে বেড়িয়ে গেছে। ইকবাল খান আলী আহমদ খানের মুখের পানে চেয়ে মলিন হাসলেন আলী আহমদ খানও নিঃশব্দে হেসে বেড়িয়ে গেছেন।কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘ নিচে নামলো। মেঘকে দেখেই রাকিব অকস্মাৎ বলে উঠল,“এইযে ভাবি, আমার বন্ধুর ১৬ বছরের অব্যক্ত অনুভূতির বহিঃপ্রকাশে লেখা খোলা চিঠি পড়ে আপনার অনুভূতি কি?”মেঘ শাড়ির আঁচল টেনে মাথায় দিয়ে চিবুক নামিয়ে লাজুক হাসলো। রিয়া রাকিবকে উদ্দেশ্য করে বলল,” ভাইয়া সবেত প্রকাশ করেছে, মেঘকে অনুভব করার সময় দাও। বিয়ের ঘোরটা আগে কাটুক তারপর জিজ্ঞেস করো।”” ঠিক আছে জান। তুমি যা বলবে তাই হবে৷ ”রিয়া ঠোঁট বেঁকিয়ে রাগী স্বরে বলল,” হঠাৎ এত ভালোবাসা কোথা থেকে আসছে?”“রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের পানে তাকিয়ে কল্পনা করে আবির যেভাবে চিঠিটা লিখছিল সেটা দেখে আমারও খুব ইচ্ছে হয়েছিল তোমাকে নিয়ে একটা চিঠি লেখার। কিন্তু বিশ্বাস করো‘তুমি ফাল্গুনের সেই রক্তিম শিমুল ফুল, আমার হৃদয়ের..’এরপর আর কিছু ভেবেই পাচ্ছিলাম না। ৩০ মিনিট ভেবেছি, তানভিরকে নিয়ে গবেষণা করেছি কিন্তু লাইনটা আর সম্পূর্ণ করতে পারি নি। তারপর মনে হলো, কবিতা আর চিঠি লেখার থেকে সকাল সন্ধ্যা ‘বাবু খাইছো?’ জিজ্ঞেস করাটা খুব সহজ সমাধান। ”রিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,” তুমি আসলেই একটা আনরোমান্টিক।”রাকিব হেসে উত্তর দিল,” বিয়ে করেছি ৬ মাস হতে চলল, এখনও আমি কত রোমান্টিক দেখেছো? তুমি বললে শিমুল ফুল না দিতে পারলেও কচুরিফুল ঠিকই দিতে পারবো। আর কি চাও? ”রিয়া রাগান্বিত কন্ঠে হুঙ্কার দিল,” তুমি আপাতত চোখের সামনে থেকে যাও।”“আজকাল ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই। নিজের বিয়ে করা বউও বলে আমি নাকি আনরোমান্টিক। ধিক্কার জানায়। ”“কাকে ধিক্কার জানাচ্ছো?”“নিজেকেই।”রিয়া সহসা হাসতে শুরু করেছে, সেই সাথে মেঘও হাসছে। আবির এসে রাকিবের কাঁধে হাত রেখে ধীর কন্ঠে জানতে চাইল,” কি হচ্ছে এখানে?”আবিরের কন্ঠ শুনে মেঘ আড়চোখে তাকালো।আবিরকে এক পলক দেখেই লজ্জায় নুইয়ে পড়েছে। গতকালও এত লজ্জা পায় নি যতটা লজ্জা আজ পাচ্ছে, অবিলম্বে ঘোমটা টেনে মুখ ঢাকার চেষ্টা করল।রাকিবের সাথে দু একটা কথা বলে, আবির মেঘের সামনে এসে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত কোমল কন্ঠে বলল,“আসসালামু আলাইকুম। ”লজ্জায় আড়ষ্ট মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,“ওয়ালাইকুম আসসালাম। ”“শুভ সকাল, বউ।”“শুভ সকাল। ”রাকিব গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,” তোর বউ এটা আমরা সবাই জানি তাই বলে সারাদিন বউ বউ করবি?”” ভাবছি, কিছুদিন দিনরাত এক করে শুধু বউ ই ডাকব।”মাহমুদা খান মালিহা খানের রুম থেকে বেড়িয়ে আসতে আসতে ভারী কন্ঠে বললেন,” আবির তোর কি কোনো কাজ নেই? সকাল সকাল মেঘকে জ্বালাচ্ছিস কেনো?”আবির কপাল কুঁচকে, ঠোঁট বেঁকিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,” আমি কোথায় জ্বালিয়েছি? এতক্ষণ কাজ করে কেবল ই আসলাম। ফুপ্পি তোমার আমার সাথে কিসের শত্রুতা বলো তো, আব্বুর সাথে তুমিও এমন আচরণ শুরু করেছো কেনো? তোমাদের থেকে তো আমার শ্বশুরই ভালো, মেয়ে খেয়েছে কি না দেখতে আমাকে জোর করে পাঠিয়েছেন। আর তোমরা?”মাহমুদা খান রাশভারি কন্ঠে বললেন,” ভাইজান খুব সহজে মেনে নিয়েছে তো তাই কিছু বুঝতে পারছিস না, ভাইজানের ধমক না শুনা পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছিস না। তাই না? তোর আচরণে কোনো কারণে ভাইজান যদি রেগে যান, বাড়ি ভর্তি মেহমানের সামনে চিৎকার চেঁচামিচি করেন বিষয়টা কি ভালো লাগবে? তার থেকে ওনি শান্ত আছেন তুইও একটু শান্ত থাক। ”“ঠিক আছে, থাকলাম শান্ত।”আবির মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত কন্ঠে বলল,” বউ তুমি খেয়ে নেও হ্যাঁ, তোমার ফুফু শ্বাশুড়িটা ভালো না। একদম মহিলা হি*টলা*রের মতো আচরণ করছেন। আমি এখন পালায়। ”আবির এক দৌড়ে বাসা থেকে বেড়িয়ে গেছে, রাকিবও হাসতে হাসতে চলে গেছে। মাহমুদা খান হেসে বললেন,” মেঘ, খেতে বস। আমি ওদের ডেকে নিয়ে আসি।”একটু পরেই সবাই খেতে নেমেছে। মেঘকে দেখেই জান্নাত বলে উঠল,“তুমি আমার স্নিগ্ধ সকালের সুললিত গন্ধরাজ, পড়ন্ত বিকেলের একগুচ্ছ বাগানবিলাস।”পাশ থেকে আইরিন বলল,” ভাবি এইটা না, আমার ঐ লাইনটা বেশি ভালো লেগেছে।নীল দিগন্তের উড়ন্ত মেঘেরা জানে, কত স্বপ্ন উড়িয়েছি বেনামি খামে।”রিয়া মৃদুহেসে বলল,” তোমরা শুধু শুধু মেঘকে জ্বালিয়ো না। মেঘ আমি তোমাকে ভালোবেসেছি, ভালোবাসি আর আমৃত্যু ভালোবেসে যাব। তুমি একদম মন খারাপ করবে না কেমন!”ওদের দুষ্টামিতে মেঘ চোখ তুলে তাকাতেই পারছে না। এরমধ্যে মালা এসে একটা চেয়ার টেনে বসলো। আইরিন মজার ছলে জিজ্ঞেস করল,” মালা আপু, আপনার কোন ডায়লগ টা ভালো লেগেছে?”“কিসের ডায়লগ?”” আবির ভাইয়া মেঘ ভাবিকে নিয়ে ফেসবুকে খোলা চিঠি লিখেছে। আপনি দেখেন নি?”মালা আইরিনকে দেখে পরপর মেঘের লজ্জামাখা আদলের পানে তাকালো। মনে মনে বিড়বিড় করল,“আমাকে ব্লক করে রাখলে কিভাবে দেখবো।”আইরিন আবার জিজ্ঞেস করল,“দেখেন কি?”মালা বিরক্ত হয়ে বলল,” খেয়াল করি নি।”আবারও মনে মনে বিড়বিড় করল,” এসব আজাইরা ভালোবাসা দেখলেই শরীর টা জ্বলে। ”বউভাত উপলক্ষে মেঘ আজ অফ হোয়াইট রঙের মধ্যে গোল্ডেন স্টোনের একটা গর্জিয়াছ লেহেঙ্গা পড়েছে। আবির মেঘের সাথে ম্যাচিং করে অফ হোয়াইট রঙের স্যুট পড়েছে। বাকিরাও যে যার মতো সেজেছে। মালা আজ হুট করে একটা গর্জিয়াছ শাড়ি পড়েছে। মালার সাজ দেখে সাকিব মেকি স্বরে বলল,“ছ্যাঁকা খেয়ে মানুষকে ঘরের দরজা বন্ধ করে সপ্তাহব্যাপী বা মাসব্যাপী কাঁদতে দেখেছি অথচ তুই তা না করে নাচতে নাচতে বিয়ে খেতে চলে আসছিস। তোর কি মিনিমাম লজ্জা নেই?”“লাজ লজ্জা ধুয়ে কি শরবত খাবো নাকি? আর একটা কথা শুনে রাখ, আমি চাইলেই আবির ভাইয়াকে বিয়ে করতে পারতাম কিন্তু আমি মেঘের মতো এত উন্মাদ না যে আমার আবির ভাইকেই লাগবে। ”সাকিব ফিক করে হেসে বলল,“কথায় আছে, পাগলের সুখ মনে মনে। আর কি কি বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছিস জানাইস আমাকে। প্রয়োজনে আমি আরও কিছু এড করে দিব। আর রইল বাকি মেঘবতীর পাগলামির কথা, আবির ভাইয়া দেশে আসছেই মেঘকে পাগল করতে। ১৪ বছর তো একায় পাগলামি করে গেল। ভাইয়ার কি ইচ্ছে হয়না মেঘবতী তার জন্য একটু পাগলামি করবে, বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকবে, তাকে দেখার জন্য বা একটু কথা বলার জন্য উতলা হয়ে থাকবে, তার দিকে কেউ তাকালে অগ্নিকন্যার রূপ নিবে, মূল কথা ভাইয়াকে পাগলের মতো ভালোবাসবে। মেঘবতীর মনে প্রবল প্রমত্ততা জাগাতে ভাইয়া ই সব করেছে। তাই তোর চোখে মেঘবতী উন্মাদ হলে আবির ভাইয়া তার গুরু।”মালা রাগে কটমট করে চলে যেতে নিলে অলক্ষিতভাবে লিমনের সাথে ধাক্কা খেল। মালা মাথায় হাত দিয়ে রাগান্বিত কন্ঠে হুঙ্কার দিল,” আপনি কি চোখে দেখেন না?”লিমন মালার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল” মাঝে মাঝে একটু কম ই দেখি। ”মালা রাগে ফোঁস ফোঁস করে চলে গেছে। মাইশা আপু আর ওনার হাসবেন্ড আজ দুপুরেই আসছেন। আবির কল দিতে দিতে অনেক কষ্টে আপুকে রাজি করিয়েছে। মেঘ আপুকে দেখেই আহ্লাদী কন্ঠে বলল,” আপু মনে আছে তো, বাবুকে কিন্তু সর্বপ্রথম আমার কোলে দিতে হবে।”“হ্যাঁ গো মনে আছে। দোয়া করো, বাবু সুস্থভাবে হলে তোমার কোলেই প্রথমে দিব।”মেঘ এক গাল হেসে বলল,“ঠিক আছে।”আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে কিছু ভেবে আনমনে হাসলো। মেঘ বিষয়টা খেয়াল করে জিজ্ঞেস করল,“হাসছেন কেন?”” এমনিতেই। ”“বলুন।”“রাতে বলব।”“না, এখনই বলুন।”“I love you. I want to hug you. I wanna kiss you.”মেঘ সঙ্গে সঙ্গে আবিরের হাতে চিমটি কেটে ব্যস্ত কন্ঠে বলল,” চুপ করুন।”” এখন তো চুপ করতেই বলবি। অফিসিয়াল বিয়ের ২৪ ঘন্টা পেরিয়ে গেছে অথচ এখনও অফিসিয়াল আলিঙ্গনটায় করতে পারলাম না।”মেঘ নিজের কপাল চাপড়ে বিড়বিড় করল,” এত নির্লজ্জ কবে হলেন আপনি?”” তোকে বিয়ে করার পর । ”সারাদিনের অনুষ্ঠান শেষে বিকেলের দিকে অনেক আত্মীয় স্বজনই চলে গেছেন। এশা পর্যন্ত সবাই মোটামুটি ব্যস্ত ছিল। এশার নামাজ পড়ে মোজাম্মেল খান আর আলী আহমদ খান একসাথে চা খেতে বসেছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে আবির আর ইকবাল খানও এসেছেন। তানভির, সাকিব,রাকিব, আরিফ মিলে বাসরঘর সাজাচ্ছে। গতকাল তানভির বোনের পক্ষে থাকলেও আজ সে আবিরের পক্ষে। আবির নামাজ থেকে এসেই নিজের রুমে চলে গেছে। ভুল করেও কেউ যেন লাল গোলাপ না লাগায় তারজন্যই মূলত দেখতে গেছে। ফুল কিনতে যাওয়ার আগেই তানভিরদের বার বার বলে দিয়েছে ভুলেও যেন লাল গোলাপ না আনে। মিনহাজ মেঘকে লাল গোলাপ দেয়ার মতো বিশাল অপরাধের শাস্তিস্বরূপ আবির সেই রাগ মিনহাজের উপর না দেখিয়ে গোলাপের উপর দেখাচ্ছে। বিয়ে উপলক্ষে আবিরের রুম সম্পূর্ণ পরিষ্কার করা হয়েছে। আবিরের শৈশব-কৈশোরের যত স্মৃতি ছিল, সব সরিয়ে একদম ফাঁকা করে দিয়েছে৷ বিয়ের ঝামেলা মিটলে প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র এনে রুম সাজানো হবে। গায়ে হলুদের দিন থেকে আবির আব্বু চাচ্চুর মুখোমুখি বসে নি। অবশেষে আজ আবির আব্বুর চাচ্চুর পাশে গিয়ে বসেছে।মোজাম্মেল খান চিন্তিত স্বরে বললেন,” কিছু বলবে?”“জ্বি।”“বলো।”” আপনাদের পরিকল্পনার বাহিরে আমি যে কাজগুলো করতে বলেছিলাম সেগুলোর খরচ জানতে চাচ্ছিলাম। আমি পেমেন্ট দিয়ে দিচ্ছি সম্ভব হলে রাতে বা সকালের মধ্যে পরিশোধ করে দিবেন। ”আলী আহমদ খান ঠান্ডা কন্ঠে বললেন,” তোমার দিতে হবে না।”” আব্বু, আমি আগেই বলে রেখেছিলাম। অন্ততপক্ষে আমার পরিকল্পনাগুলোর টোটাল পেমেন্ট আমি করব।”মোজাম্মেল খান আস্তে করে বললেন,” আচ্ছা তুমিই করো। কিন্তু এত তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই। ইমারজেন্সি সবার পেমেন্ট করে ফেলেছি। আর যারা নেয় নি তাদের কাল পরশুর মধ্যে দিয়ে দিব।”“আমি হিসাবটা দেখতে চাচ্ছিলাম, চাচ্চু।”” আমার কি কপাল, মেয়ের জামাই কত সুন্দর করে চাচ্চু বলে ডাকছে।”আবির মৃদু হেসে মেকি স্বরে বলল,“মেঘের মতো আমিও কি আব্বাজান বলে ডাকবো?”আলী আহমদ খান, মোজাম্মেল খান এবং ইকবাল খান তিনজনেই একসঙ্গে হেসে উঠলেন। প্রায় এক ঘন্টা যাবৎ চারজন মিলে হিসাব করছে। এদিকে জান্নাত আর রিয়া মিলে মেঘকে সাজাচ্ছে আর বাসরের নিয়মকানুন শিখিয়ে দিচ্ছে। মেঘের মনে ভয়, লজ্জা, আতঙ্কের সাথে সাথে এক অজানা ভালোলাগাও কাজ করছে। রাত ১০ টার পর পর ওদের সাজানো শেষ হয়েছে। আবিরের নিষেধাজ্ঞা থাকায় লাল গোলাপ ছুঁয়েও দেখেনি। গাদা, বেলি, কাঠগোলাপ, ৩-৪ রঙের জারবেরা, জিনিয়া সহ যে যে ফুল পেয়েছে সব দিয়েই সাজিয়েছে। সাজানো শেষেই মেঘকে নিয়ে বিছানার মাঝ বরাবর বসিয়েছে। মেঘের সামনে ফুলের পাঁপড়ি দিয়ে একটা লাভ এঁকে তাতে A আর M লিখেছে। তারপর শুরু হয়েছে দল ভাগাভাগি, কয়েকজন আবিরের পক্ষে থাকলেও বেশিরভাগই মেঘের পক্ষে। তানভির আজ আবিরের পক্ষে শুনে বন্যা রাগী রাগী মুখ করে বলল,” আপনি দু’মুখো সাপের মতো আচরণ করছেন কেনো?”তানভির হেসে বলল,” বোনের বিয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই বোন শ্বশুরবাড়িতে চলে যায়। ভাগ্য ভালো আমার বোন আমার চোখের সামনে আছে। বনুর শ্বশুর বাড়ি অন্য কোথাও হলে আজকের বাসরঘর সাজানো অসম্ভব ছিল। তাছাড়া বড় ভাই হয়ে ছোট বোনের বাসর আটকানো টা তেমন শোভা পায় না।”বন্যা আর কিছু বলে নি। এদিকে আবিরদের হিসাব নিকাশের এক পর্যায়ে মোজাম্মেল খান বললেন,” অনেক তো হিসেব দেখলে এখন বরং যাও তুমি। ”আবির ঘাড় ঘুরিয়ে মালিহা খানকে উদ্দেশ্য করে বলল,” আম্মু, তোমাদের যা যা নিয়মকানুন আছে তাড়াতাড়ি শেষ করো। আমার ঘুম পাচ্ছে। ”মোজাম্মেল খান অকস্মাৎ কাশতে শুরু করলেন।ইকবাল খান আবিরের হাত চেপে বিড়বিড় করে বলল,“বাবা-চাচারা আছে, কথাবার্তা একটু সাবধানে বল।”আবির ভ্রু কুঁচকে মনে মনে বিড়বিড় করল,” গত দু’রাতে একফোঁটাও ঘুমাতে পারি নি। এখন বিয়ে করেছি বলে কি ঘুম পেলেও বলা যাবে না?”আবির নিশ্চুপ দেখে মোজাম্মেল খান স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,” বাকিগুলো সকালে দেখে নিও।”আবির তপ্ত স্বরে বলল,“আর কিছু দেখতে হবে না। যা লাগবে তানভিরকে বললেই হবে। ”মাহমুদা খান এসে মৃদুস্বরে বললেন,” আবির, তুই এখন রুমে যেতে পারিস।”আবির হঠাৎ ই কেমন যেন লজ্জা পাচ্ছে। লজ্জায় উঠে যেতে পারছে না। আলী আহমদ খান অকস্মাৎ বকে উঠলেন,” এত লজ্জা পেতে হবে না, যাও। ”আবির মাথা নিচু করে উঠে রুমের দিকে চলে গেছে। রুমের সামনে যথারীতি দু’দল মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তানভির আবিরের দলের হওয়া স্বত্তেও ওরা জোরপূর্বক তানভিরকে রুমের ভেতরে রেখেছে। আবির দরজা থেকে উঁকি দিয়ে বিছানাটা দেখে নিল। মাথায় ঘোমটা দিয়ে নববধূ বিছানায় বসে আছে। আবির বাকিদের উদ্দেশ্যে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,“কি চাই?”“তেমন কিছু না। ”রাকিব আবিরের পাশ থেকে বলে উঠল,” আজ যত ইচ্ছে দে আমি বারণ করব না। কারণ, বাসর আমিও সাজিয়েছি তাই ভাগ আমিও পাবো। ”আবির রাকিবের দিকে তাকিয়ে হাসলো। আইরিন অকস্মাৎ বলে উঠল,” ভাইয়া তাড়াতাড়ি টাকা দিয়ে আমাদের বিদায় করো।”আবির শান্ত কন্ঠে বলল,“তোরা কত চাস সিদ্ধান্ত নিয়ে তানভিরের কানে কানে বল।”আইরিন, জান্নাত, রিয়া, মীম, বন্যা ফিসফিস করে কিছুক্ষণ ভেবে চিন্তে তানভিরকে জানালো। আবির সঙ্গে সঙ্গে বলল,” সিদ্ধান্ত ফাইনাল?”“হ্যাঁ।”“এখন সামনে থেকে সরো।”” কেনো সরবো? আগে টাকা দিবে তারপর যাব।”আবির তপ্ত স্বরে বলল,“আমি যেতে বলি নি আপু, সরতে বলেছি। বউ না দেখে আমি তোমাদের কিছু দিতে পারছি না ।”“বউ দেখে ফেললে তো শেষ ই।”“তোমরা যেমন আমাকে বিশ্বাস করতে পারছো না তেমন আমিও পারছি না। আমার বউ এর জায়গায় অন্য কাউকে যে বসিয়ে রাখো নি তার কি গ্যারেন্টি আছে? তোমাদের সহজ সমাধান দিয়েছি, তোমাদের এমাউন্ট আমি না জানলেও তানভির জানে। আমার বউ ঠিকঠাক থাকলে তোমরা তোমাদের প্রাপ্য পেয়ে যাবে। আগে বউ দেখব তারপর টাকা দিব। এখন তোমরা ভেবে দেখো। ”“ঠকাবে না তো?”” তোমরা আমাকে না ঠকালে আমিও তোমাদের ঠকাবো না। ”“ঠিক আছে। ”ওরা এক প্রকার বাধ্য হয়েই আবিরকে রুমে ঢুকতে দিয়েছে। আবির রুমে ঢুকেই মেঘকে উদ্দেশ্য করে সালাম দিলো। মেঘ কাঁপা কাঁপা গলায় সালামের উত্তর দিয়েছে। এতক্ষণ যাবৎ মেঘ শান্ত থাকলেও এখন আর শান্ত থাকতে পারছে না, আবির যত কাছাকাছি আসছে মেঘের শরীরের প্রতিটা শিরা-উপশিরার রক্ত সঞ্চালন তত বেড়ে যাচ্ছে, ঢোক গিলে বার বার নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। আবির কিছুটা ঝুঁকে খুব যত্নসহকারে আস্তেধীরে মেঘের ঘোমটা উঠালো, লজ্জায় রাঙা মেঘের নামানো চিবুক দেখে কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকালো। আবির সহসা দু’আঙুলে মেঘের চিবুক উঠালো। আবিরের শক্ত হাতের কোমল স্পর্শে মেঘের শীর্ণ অধর থরথর করে কাঁপছে, হৃদয়ের তোলপাড়ে নিঃশ্বাস এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, ঘন ঘন পল্লব ঝাপ্টে নিভু নিভু চোখে আবিরের দিকে তাকাতেই আবির সহসা বুকের বা পাশে হাত রেখে নেশাক্ত কন্ঠে বলল,“হায়! মাশাআল্লাহ। ”সঙ্গে সঙ্গে বিছানার উপর লাভ লেখা অংশে ধপ করে পড়ে গেছে। মীম, আদি,আইরিন কিছুটা আতঙ্কিত হলেও বাকিরা আবিরের কাণ্ড দেখে মুচকি মুচকি হাসছে। মেঘ কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকে আবিরের মুখের দিকে তাকালো। আবির আচমকা কাত হয়ে মেঘের দিকে ঘুরে হাতের উপর মাথা রেখে মৃদুগামী কন্ঠে বলল,“অবশেষে, আবিরের একান্ত চাঁদআবিরের রুমে দীপ্তি ছড়াচ্ছে।”মেঘ লজ্জায় চোখ সরিয়ে করে ফেলেছে। আবির পকেটে হাত দিয়ে যতগুলো ৫০০ আর ১০০০ টাকার নোট পেয়েছে সব মেঘের হাতে মুষ্টিবদ্ধ করে দিয়েছে। রিয়া হাসিমুখে বলল,” ভাইয়া আপনার চাঁদকে সারাজীবনের জন্য আপনার রুমে রেখে গেলাম। আপাতত আমাদের দিক টা একটু ভাবুন।”আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,” ওরা কিছু চাচ্ছে, দিব?”মেঘ কিছুই বলছে না, চুপচাপ বসে নিজের হৃৎস্পন্দন গুনছে। আইরিন সঙ্গে সঙ্গে বলল,” এটা কিন্তু কথা ছিল না। তুমি বলেছো ভাবিকে দেখেই দিয়ে দিবে। ”আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে থেকেই ঠান্ডা কন্ঠে বলে উঠল,” আমি আমার বউয়ের অনুমতি ব্যতীত কিছু দিতে পারছি না, সরি। ”সবাই মেঘকে রিকুয়েষ্ট করছে কিন্তু মেঘ মুখ ফুটে কিছু বলতেই পারছে না। আবির মৃদু হেসে পুনরায় প্রশ্ন করল,” কি হলো? দিয়ে দিব?”মেঘ ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালো। আবির সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকে উঠে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,” তোমাদের এমাউন্ট কত ছিল আমি জানি না আর জানতেও চাই না। আমার বউ যেহেতু সম্মতি দিয়েছে তাই তোমরা যা চেয়েছো তার ডাবল পাবে। ”তানভিরের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল,” তানভির, ওদের এমাউন্ট বুঝিয়ে দিবি।”“জ্বি ভাইয়া।”জান্নাত, রিয়া একসঙ্গে বলে উঠল,“ইসস, এত বড় মিস্টেক কিভাবে করলাম। আগে জানলে আরও বেশি চাইতাম। ”আইরিন বলল,” আমরা এখন নতুন করে এমাউন্ট চাইবো।”আবির মুচকি হেসে বলল,” সুযোগ একবার ই দিয়েছি সেই সুযোগ আর পাবে না। এখন সবাই যাও এখান থেকে।”রাকিব আবিরের কানে কানে ফিসফিস করে কিছু বলেই দৌড়ে বেড়িয়ে গেছে। বাকিরাও যে যার মতো চলে গেছে। বন্যা মেঘের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বেড়িয়েছে। তানভির আগেই বেড়িয়ে গিয়েছিল, আবির দরজা বন্ধ করতে যাবে অকস্মাৎ তানভির হাজির হলো। আবির শক্ত কন্ঠে বলল,“আবার কি?”তানভির মেঘকে এক পলক দেখে নিল। মেঘ মাথা নিচু করে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। তানভির গলা খাঁকারি দিয়ে অত্যন্ত কোমল কন্ঠে বলল,” ভাইয়া, আমার বোনটা কিন্তু এখনও ছোট। তোমার অনাবশ্যক ভালোবাসাকে একটু কন্ট্রোলে রেখো, প্লিজ।”
গল্পঃ আমৃত্যু ভালোবাসি তোকেলেখিকাঃ সালমা চৌধুরী..................................................................................................................................................................আবির ভ্রু গুটিয়ে সরাসরি তানভিরের চোখের দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বিড়বিড় করল,” তুই না আমার সম্বন্ধী?”তানভির নিঃশব্দে হেসে অত্যন্ত ধীর কন্ঠে বলল,“তুমি না আমার ভাই? তাছাড়া পুরো পৃথিবী জানে তুমি আমার বন্ধু টাইপের ভাই তাই আমার সবদিক থেকে পারমিশন আছে।”আবির দাঁতে দাঁত চেপে বলল,” জ্বি ভাই, বুঝতে পেরেছি। বলছিলাম কি ভাই আপনি পারমিশন দিলে আমি আপনার বোনের সাথে একান্তে কিছুটা সময় কাটাতাম। পারমিশন দিবেন, ভাই?”“জ্বি ভাই, আপনার জন্যই এত আয়োজন। বেস্ট অফ লাক, বাই। ”তানভির চলে যাচ্ছে, আবির মুচকি হেসে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। দরজা বন্ধের শব্দে মেঘের শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠেছে, মাথা নিচু করে জোরে নিঃশ্বাস ছাড়লো। আবির আড়চোখে মেঘের দিকে তাকালো, ঠোঁটে লেগে আছে দুষ্টু হাসি। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল মেঘের কাছে, আবিরের তৃপ্ত দুচোখ চকচক করছে। উৎকণ্ঠায় মেঘের চিবুক নেমে গলায় ঠেকেছে, ক্ষীণ বক্ষের তীব্র কম্পনে শরীর ঘেমে একাকার অবস্থা। আবির আগপাছ না ভেবেই আচমকা মেঘের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পরেছে। অপ্রত্যাশিত ঘটনায় মেঘ চমকে উঠে, বুকের ভেতর পর্যন্ত স্তব্ধ হয়ে গেছে। মেঘ সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে, হাত-পা সহ সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। আবির অকস্মাৎ জামা-কাপড়ের উপর দিয়ে মেঘকে জড়িয়ে ধরে পেটে মুখ গুঁজল। আবিরের অবাঞ্ছিত স্পর্শে মেঘের জোড়াল বক্ষস্পন্দন আরও বেশি জোড়ালো হতে শুরু করেছে, নিরবে ঢোক গিলে এলোমেলো নিঃশ্বাস ছাড়ছে। আবির ভয়ঙ্কর আবেশে আবদ্ধ, সুদীর্ঘ অবকাশের অস্ফুট প্রণয়ের অফিসিয়াল অনুমোদন পেয়েছে আজ। মেঘের শরীর থেকে আসা বিমুগ্ধকারী ঘ্রাণটা আবিরের নাসারন্ধ্রের সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ে তোলপাড় চালাচ্ছে, আবির এক মনে সেই ঘ্রাণটা উপলব্ধি করছে। মেঘের অভিমানে নাক ফুলানো, গায়ের তীব্র গন্ধ, দরদী স্পর্শ, আহ্লাদী কন্ঠের আবদার পূরণের পরিপূর্ণ অধিকার পেয়েছে আজ। এই মেঘ একান্ত আবিরের, পৃথিবীর আর কারো সাধ্য নেই যে আবিরের কাছ থেকে তার মেঘকে দূরে সরাবে। আজ ছোট্ট মেঘের আদুরে কন্ঠে বলা কথাগুলো আবিরের খুব মনে পড়ছে, অকস্মাৎ পেট থেকে মুখ সরিয়ে ঘাড় কিছুটা ঘুরিয়ে মেঘের অভিমুখে তাকালো। মেঘের বন্ধ চোখের পাতা আর কম্পিত অধর দেখে আবির আনমনে হেসে অত্যন্ত মোলায়েম কন্ঠে বলল,” তুমি আমার বহু প্রতীক্ষিত একান্ত অভিলাষ,হৃদয়ের মনিকোঠায় সঙ্গোপনে রাখার নির্মম প্রয়াস। আমার অবিচ্ছেদ্য প্রণয়ের উত্তাপ তুমি,সকাল- সন্ধ্যা সর্বনাশের কারণটাও শুধু তুমি।”মেঘের সংকোচ কোনোভাবেই কাটছে না, চোখ খুলে আবিরের দিকে তাকাতেও পারছে না। আবির মুচকি হেসে ডাকল,“ওগো অপরূপা,চেয়ে দেখো না মনোরমা। ”মেঘ কিংকর্তব্যবিমুঢ়, আবিরের একের পর এক ভাবপ্রবণ কথা শুনে মেঘের অস্থিরতা বেড়েই চলেছে। বুকের ভেতরে চলমান ইতস্ততা কাটিয়ে চোখ পিটপিট করে তাকাল । আবিরের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই আবির অকস্মাৎ স্ব শব্দে হেসে উঠল। আবিরের প্রাণোচ্ছল হাসি দেখে মেঘ না হেসে পারল না। আবির হাসি থামিয়ে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে তপ্ত স্বরে শুধালো,” আমাকে পেয়ে খুশি তো?”মেঘ মাথা দুলিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,” আলহামদুলিল্লাহ, অনেক খুশি। আপনি?”আবির আবারও মৃদু হাসলো। মেঘের কোল থেকে উঠে মুখোমুখি বসল। লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে মেঘের হাতটা শক্ত করে ধরে কোমল কন্ঠে বলতে শুরু করল,” আলহামদুলিল্লাহ আজ আমি খুব খুশি। কারণ আমার স্পেরোকে দেয়া কথা আজ পরিপূর্ণভাবে রাখতে পেরেছি। ছোট্ট স্পেরোর সেই আহ্লাদী কন্ঠে বলা কথাটা, “আমাকে ছেড়ে যেতে পারবে না” স্পেরো ভুলে গেলেও আমি ভুলতে পারি নি। গত ১৬ টা বছর আমি শুধু এই একটা কথার জোরেই সব বিপত্তিতে টিকে ছিলাম। আজ আমার স্পেরোকে আবারও বলতে চাই, আমি ছেড়ে যায় নি কোথাও যায় নি। তোমার আবির তোমারই আছে। তুমি সেদিন শুধু বলেছিলে, “ছেড়ে যেও না” অথচ আমি বুঝেছিলাম “তোমাকে ছেড়ে বাঁচতে পারবো না”। শেষ বিকেলে পাখিদের বাড়ি ফেরার তাড়া দেখে তুমি আবেগী কন্ঠে বলেছিলে, ” ওদের মতো আমারও যদি আলাদা একটা বাড়ি থাকতো৷” আর আমি ভেবেছিলাম, “যেকোনো মূল্যেই হোক তোমাকে তোমার স্বপ্নের বাড়ি উপহার দিব” একবার খেলতে গিয়ে পায়ে ব্যথা পেয়েছিলাম বলে তুমি শীতল কন্ঠে বলেছিলে, “খেলতে না গেলে তো ব্যথা পেতে না” আমি মনে মনে বলেছিলাম, ” আজকের পর খেলতে যাব না” । জ্বরের ঘোরে আমার হাতটা আঁকড়ে ধরে তুমি বলেছিলে, “আমার কাছে থাকো” “আমিও থেকে গেলাম”। কোনো একদিন কোনোকারণে বাসায় আমাকে বকা দিচ্ছিলো দেখে তুমি সবার সামনে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলেছিলে, ” আবির ভাইয়া শুধু আমার তোমরা কেউ কিছু বলতে পারবে না।”“আমি আবির সেদিনই তোমার হয়ে গিয়েছিলাম”নিজের সাথে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম বাঁচলে তোমার সাথেই বাঁচবো। ”মেঘ অবিশ্বাস্য চোখে আবিরের অভিমুখে চেয়ে আছে, অতর্কিতেই বেড়েছে বুকের ভেতরের ধুকপুক শব্দ। আবিরের কথাগুলো শুনে মেঘের চক্ষুদ্বয় কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে চাইছে। ফর্সা,লাজুক আদল মুহুর্তেই পরিবর্তন হয়ে গেছে, নাকের ডগায় মুক্তোর মতো বিন্দু বিন্দু ঘাম চিকচিক করছে। মেঘের উদ্বেজিত মনোভাব চোখে মুখে ফুটে উঠছে। যেই আবিরের প্রণয়ে আসক্ত মেঘ, সেই আবির মেঘের কাছেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল এতগুলো বছর। এটা ভেবেই মেঘের মস্তিষ্কের নিউরনে অনুরণন শুরু হয়েছে। মেঘ অসহায় মুখ করে আবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,” আমি আপনাকে এতকিছু বলেছিলাম?”আবির মেঘের দু’হাত নিজের দু গালে রেখে নিঃশ্বাস টেনে বলল,“হুমমমমমমম”“আমার মনে নেই কেনো?”” কারণ তখন তুমি অনেক ছোট ছিলে। ”” আপনি কখনো বলেন নি কেনো?”” ভালোবাসা মুখে বলে হয় না পাগলি, তোমাকে নিজ থেকে অনুভব করতে হতো। আর আমি সেই অপেক্ষাতেই ছিলাম। ”মেঘ কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,” আপনি আমাকে তুমি করে বলছেন কেনো?”” শুনতে খারাপ লাগছে?”“কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। আপনার মুখে তুই টায় মানায়। ”” অভ্যাস করো, এখন থেকে তুমিটায় বেশি শুনতে হবে।”“কেনো?”আবির মৃদুস্বরে বলল,” আমার সম্বন্ধী আমাকে ভয়ঙ্করভাবে ওয়ার্নিং দিয়েছে, বিয়ের পর তোমার সাথে তুই তুকারি করলে আমার নামে মা*ম*লা দিবে। তানভিরের এসব তুই তুকারি একদম পছন্দ না, ওর সাথে কথা বললে সচরাচর তোমাকে তুই বলে সম্বোধন করি না তারপরও ভুলে যদি বলে ফেলি তখন দেখা যায় রাগে সারাদিন আমার সাথে কথায় বলে না। গতকাল রাতে আমাকে লাস্টবারের মতো ওয়ার্ন করেছে যেন কোনোভাবেই তুই না বলি। পার্সোনালি ঘরে দরজা বন্ধ করে তুই বললেও আমার সম্বন্ধী,বাবা মা, শ্বশুর- শ্বাশুড়ি কিংবা কোনো আত্মীয়ের সামনে কোনোভাবেই তুই বলতে পারবো না। ”মেঘ অভিনিবিষ্টের ন্যায় চেয়ে থেকে শান্ত কন্ঠে শুধালো,” আপনি ভাইয়াকে ভয় পান?”“না। তোমাকে ভয় পায়। ”“মানে?”আবির মেঘের হাত গাল থেকে নামিয়ে বুকের উপর রেখে বলতে শুরু করল,” তোমাকে হারানোর ভয়ে আমার এইযে এইখানটা বারংবার কেঁপে উঠে। আবিরকে ধ্বংসের একমাত্র অস্ত্রই মেঘ। তানভির সহ আমার কাছের মানুষজন খুব ভালোভাবে জানে আমার জীবনে তোমার অস্তিত্ব ঠিক কতোখানি জুড়ে। আমাকে কোনোকিছুতে রাজি করাতে ব্যর্থ হলেই ইচ্ছেকৃত তোমার নাম নেয়। কারণ তারা জানে, তুমি আমার একমাত্র দূর্বলতা। এইযে তুমি কতশত কুসংস্কার মানো, কিছু হবে না জেনেও আবেগে নাচো। আমিও ঠিক তেমন, তোমার নামে কিছু শুনলে বুঝে না বুঝে রিয়েক্ট করি, নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। অন্ততপক্ষে তোমাকে নিয়ে তানভিরের সাথে আমি কোনোরকম অসদ্ভাবে জড়াতে চাই না তাই ও যা বলেছে আমি মেনে নিয়েছি।”আবিরের উৎকণ্ঠা দেখে মেঘ প্রতিনিয়ত আশ্চর্যের চূড়ায় পৌছে যাচ্ছে। মেঘ নির্বাক চোখে তাকিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে আবিরকে দেখছে। আবির কয়েক মুহুর্ত মেঘের মায়াবী আদলে চেয়ে থেকে আনমনে হেসে বলল,” ম্যাম, এভাবে তাকিয়ে আমাকে আগেভাগেই দূর্বল করে দিবেন না। আপনার সাথে আমার অনেক কথা আছে। ”আবিরের কথায় মেঘের ভাবনার সুতো ছিঁড়েছে, কপালে ভাঁজ ফেলে মৃদুস্বরে বলল,” কি কথা?”“আগে নামাজ পড়ে রবের কাছে শুকরিয়া আদায় করি তারপর বলবো। যাও, ফ্রেশ হয়ে ওজু করে আসো।”আবির মেঘের হাত ছেড়ে বিছানা থেকে নামছে। এত কথোপকথনের ভিড়ে রিয়া আর জান্নাতের শিখিয়ে দেয়া নিয়মকানুনের কথা মেঘ ভুলেই গিয়েছিল। মেঘ ঝটপট বিছানা থেকে নেমে আবিরের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে নিল কিন্তু সালাম করার আগেই আবির মেঘের দুই বাহু ধরে উঠিয়ে আলতোভাবে বুকে জড়িয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,“তোমার অবস্থান আমার পায়ে নয় হৃদয়ে। আজকের পর কোনোদিন পায়ে হাত দিয়ে সালাম করার চেষ্টাও করবে না। মনে থাকবে?”“জ্বি।”আবির মেঘকে ছেড়ে ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে ব্যালকনির দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কিছু একটা করছে। এদিকে মেঘ মনে মনে হাবিজাবি ভাবছে আর ব্যস্ত হাতে গহনা খুলছে। গলার একটা গহনাকে খুলতে গিয়ে চুলে টান পড়তেই মেঘ ব্যথায় ‘উফফ’ করে উঠেছে। আবির সহসা ফোন টেবিলের উপর রেখে মেঘের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল,” কি হয়েছে?”” চুলে টান লাগছে। ”” হাত সরাও, আমি দেখছি। ”মেঘ ভ্রু কুঁচকালো, তবে নিষেধ করল না। আবির খুব মনোযোগ দিয়ে মেঘের চুল সরিয়ে গহনা খুলে দিয়েছে। মাথায় লাগানো ক্লিপগুলো খুলতে খুলতে কর্কশ কন্ঠে বিড়বিড় করল,” আগেই বলেছি রাতে এত সাজগোছ করতে হবে না তারপরও কেউ কথা শুনে না। ”আবিরের ঠান্ডা কন্ঠের অভিযোগে সম্বিত ফিরল মেঘের। চোখ ঘুরিয়ে আবিরকে এক পলক দেখে হালকা করে কেশে শীতল কন্ঠে ডাকল,” আবির ভাই..”অকস্মাৎ আবিরের সুপ্ত ক্রোধ চোখে ভেসে উঠেছে, মেঘের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙাতেই মেঘ দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,” মজা করেছি। ”আবির প্রতিত্তোরে কিছুই বলল না। মেঘ ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসতেই আবির চুপচাপ ওয়াশরুমে চলে গেছে। যথারীতি দু’জন একসঙ্গে দু রাকাত নফল নামাজ পড়ে নিয়েছে। নামাজ শেষ করে আবির মেঘের কপালে দীর্ঘ চুমু খেয়ে মেঘকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। আবিরের সারাদিনের সব দুষ্টামি, খুনসুটি হঠাৎ ই পরিবর্তন হয়ে গেছে। কেমন যেন নিশ্চুপ হয়ে গেছে। আবিরের বুকের উপর মাথা থাকায় মেঘ স্পষ্টভাবে আবিরের হৃৎস্পন্দন টের পাচ্ছিল। মেঘ হঠাৎ ই তটস্থ কন্ঠে শুধালো,” কি হয়েছে আপনার? আপনি কি কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত?”আবির ঘন ঘন ঢোক গিলছে, মেঘকে বিছানার পাশে বসিয়ে আবির ফ্লোরে বসল । মেঘ ব্যাকুল কন্ঠে বার বার প্রশ্ন করছে, আবির উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো। আবির আচমকা বসা থেকে উঠে ওয়ারড্রব থেকে একটা ছোট বক্স বের করল। ‘Abir’ নাম লেখা একটা ডিজাইনিং লকেট বের করে মেঘের গলায় পড়িয়ে দিতে দিতে মৃদু স্বরে বলল,” এটা বাসর রাতের গিফট।”মেঘ তৎক্ষনাৎ লাফিয়ে উঠে বালিশের নিচ থেকে একটা ঘড়ির বক্স বের করে আবিরকে দিয়ে বলল,” এটা আপনার জন্য। ”আবির কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,” বাসর রাতে গিফট দিতে হয় এটা তোমাকে কে বলেছে?”“রিয়া আপু , জান্নাত আপু তাছাড়া আমার বান্ধবীরাও বলেছে। ”“আর কি কি বলেছে? ”” আরও অনেক কিছু ।”আবির ভ্রু গুটিয়ে ধীর হস্তে কপাল চাপড়ে শক্ত কন্ঠে বলল,” ইসস! আমার বউটাকে ওরাই নষ্ট করছে।”মেঘ ঠোঁট কামড়ে বিড়বিড় করল,” মোটেই না।”আবির ঘড়িটা দেখে মুচকি হেসে বলল,” পড়িয়ে দাও।”“এখন?”“হুমমমম।”মেঘ ঘড়িটা পড়িয়ে দিয়ে আহ্লাদী কন্ঠে শুধালো,“পছন্দ হয়েছে?”” হুমমমমমমম। আমার একমাত্র বউয়ের দেয়া গিফট পছন্দ তো হবেই। ”আবির তপ্ত স্বরে ফের বলল,“তোমার জন্য আরও সারপ্রাইজ আছে।”“কি?”আবির একটা অ্যালবাম বের করে মেঘের হাতে দিল। অ্যালবামের সর্বপ্রথম ছবিটা আবির আর মেঘের বিয়ের। দু’জন পাশাপাশি বসা, মেঘ ঘাড় কাত করে আবিরের বাইসেপে রেখেছে আবির মেঘের মাথায় উপর নিজের মাথা কাত করে রেখেছে। দু’জনের এক হাত সামনের দিকে । আবিরের হাতের তালুতে মেহেদী দিয়ে লেখা ‘মেঘের আবির’ আর মেঘের হাতে লেখা ‘আবিরের মেঘ’। মেঘ ছবিটা দেখে মৃদু হেসে অ্যালবাম খুলেছে। মেঘের জন্মের পর আবিরের প্রথম কোলে নেয়ার ছবি, মেঘের ছয় মাস, এক বছর, দুই বছর বয়স থেকে শুরু করে বিয়ে পর্যন্ত আবিরের সাথে যতছবি ছিল সবই অ্যালবামে আছে। মেঘ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ছবিগুলো দেখছে, আবির পাশে দাঁড়িয়ে ছবিগুলোর বর্ণনা দিচ্ছে। ছোটবেলার ছবিগুলো ফ্যামিলি অ্যালবাম থেকে সংগ্রহ করা। কোন ছবি কখন, কি অবস্থায় কাকে দিয়ে উঠিয়েছিল সবই আজ নির্দ্বিধায় বলছে। মেঘ নিস্তব্ধ হয়ে ছবিগুলো দেখছে আর আবিরকে দেখছে। মাঝখানে ৯ বছরের একসাথে ছবি না থাকলেও লাস্ট ২ বছরের ছবিতেই তার উসুল তুলে ফেলেছে। যার মধ্যে হাতে গুনা কয়েকটা ছবি মেঘ নিজের ইচ্ছেতে তুলেছিল বাকি সব আবিরের পার্সোনাল ফটোগ্রাফার তুলে দিয়েছে। অ্যালবাম দেখা শেষ হতেই মেঘ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো। আবির মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল,“রাগ করেছো?”মেঘ ঠোঁট ফুলিয়ে চেয়ে আছে। আবির নিরেট কন্ঠে বলল,” রাগ করো না, প্লিজ। এটা দেখে রেগে গেলে পরের গুলো তো বলতেই পারব না।”” পরে কি?”আবির একটা চাবির গোছা মেঘের হাতে দিয়ে বলতে শুরু করল,” আজ থেকে এই চাবির গোছাটা তোমার। এখানে আমার রুমের প্রতিটা তালাবদ্ধ জিনিসের চাবির পাশাপাশি আমার অফিসের সব চাবি আছে। তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী তাই আজ থেকে আর কোনো লুকোচুরি নয়। আমার যা কিছু আছে সবকিছুতে তোমার অধিকার আছে।”মেঘ আজ হতবিহ্বল। যে আবির নিজের জিনিসপত্র কখনো কাউকে ছুঁতে দেয় না, রুমে ঢুকতে দেয় না, সব কিছুতে তালা দিয়ে রাখে সে আজ নিজের হাতে সব দায়িত্ব মেঘকে দিয়ে দিচ্ছে। আবিরের এত পরিবর্তন মেঘ স্তব্ধ চোখে কেবল দেখেই যাচ্ছে। আবির অকস্মাৎ মেঘের মুখোমুখি দাঁড়ালো। আচমকা ধপ করে মেঘের পায়ের কাছে বসে পরেছে, আবিরের গায়ে যেন পা না লাগে তারজন্য মেঘ সঙ্গে সঙ্গে পা সরিয়ে থমথমে কন্ঠে শুধালো,“কি হয়েছে আপনার?”আবির পেছন থেকে একটা সুন্দর গিফট বক্স বের করে মেঘের হাতে দিল। মেঘ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,” কি এটাতে?”“দেখো।”বক্স খুলতেই ২ টা ব্যাংক চেক চোখে পরেছে, মেঘ এমাউন্টও ঠিকমতো খেয়াল করে নি। কৌতূহল বশত চেক তুলে বিস্ময় সমেত তাকালো । বক্সে স্বর্ণের বেশ কিছু গহনা। মেঘ বার বার আবিরের দিকে তাকাচ্ছে, আবিরের ঠোঁটে মলিন হাসি। মেঘ গহনা গুলো তুলে বিছানার পাশে রাখছে। কাগজের মতো কিছু লাল ফিতা দিয়ে প্যাঁচানো দেখে মেঘ স্বাভাবিকভাবে খুলতে নিল, খুলতেই দেখল এটা একটা দলিল। কিছুটা পড়ার পড় বুঝতে পারলো কোনো একটা জায়গা আবির মেঘের নামে করে দিয়েছে। মেঘ আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,” এসবের মানে কি?”আবির মুচকি হেসে বলল,” Sparrow’s Dreamhouse তোমার বাড়ি, একান্তই তোমার। সেখানে আমার কোনো অধিকার নেই।”মেঘ কিঞ্চিৎ রাগী স্বরে বলল,” অধিকার যদি না ই থাকবে তাহলে আমার বাড়ি আপনি আমাকে না জানিয়ে কেনো করেছেন? আগে আমাকে বললেন না কেনো?”” শুরুতে জানানোর মতো পরিস্থিতি ছিল না।”“কেনো?”” সময় টা ছিল ডিসেম্বর মাস, মাইশা আপুর বিয়ে থেকে মালার কারণে তোমাকে জোর করে নিয়ে আসছিলাম। আমি অফিস থেকে এসে তোমাকে সময় নিয়ে বুঝাতে চেয়েছিলাম মালার সাথে আমার কিছুই নেই অথচ তুমি আমার আসা পর্যন্ত জাস্ট ১০ মিনিট অপেক্ষা করতে পারলে না। আমাকে গুরুত্ব না দিয়ে মিনহাজদের গুরুত্ব দিয়েছিলে। তারজন্য তোমার প্রতি অভিমান হয়েছিল। সেই অভিমান তোমার আব্বুর কথায় জেদে পরিণত হয়েছিল। ওনার মেয়েকে রাণীর মতো রাখতে গেলে আগে রাণীর স্বপ্নগুলো পূরণ করা জরুরি ছিল। সেই রাতেই ৩-৪ দিনের জন্য চলে গেলাম, দিনরাত এক করে সবকিছু রেডি করে আসছি। যেদিন বাসার কাজ শুরু করব তার আগের দিন থেকে আপনাকে এতমতে রিকুয়েষ্ট করলাম কিন্তু তুমি এতটায় জেদি যে কোনোভাবেই যেতে রাজি হলে না। তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েও দিতে পারলাম না তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বাসার কাজ পুরোপুরি শেষ করেই জানাবো।”মেঘ শক্ত কন্ঠে বলল,” ইশশ! মিস করলাম।”“বাকিগুলো দেখে শেষ করো।”মেঘ আবারও বক্স হাতে নিল। কিছু চিরকুট, আবিরের অফিসের কিছু ডকুমেন্টসের সাথে কয়েকটা ৫০০ আর ১০০০ টাকার বান্ডিল। এত এত টাকার বান্ডিল দেখে মেঘ আশ্চর্যান্বিত নয়নে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,“এত টাকা কার?”আবির মোলায়েম কন্ঠে বলল,“তোমার। ”“মানে? এত টাকা দিয়ে আমি কি করব?”” এগুলো সব কাবিনের।”মেঘ ধীর কন্ঠে বলতে শুরু করল,” আমি যতদূর শুনেছি, কাবিন বউয়ের পরিবার অথবা বউয়ের ইচ্ছে অনুযায়ী দিতে হয়। আমি বউ হয়ে বলছি, আমার কাবিনের কোনো প্রয়োজন নেই। আমি আপনাকে চেয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ আপনাকে পেয়ে গেছি। আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই। আপনার এত এত গিফট, টাকা, ব্যাংক চেক এসবের কোনো কিছুই চাই না। বিয়েতে কাবিন যদি আবশ্যক হয় তবে আমি কাবিন হিসেবে আপনাকে চাইব, আমৃত্যু শুধু আপনাকেই চাইব।”মেঘের দুচোখ ছলছল করছে, নিজেকে সংযত করতে তাড়িত শ্বাস টানলো। আবির দুর্বোধ্য নেত্রে মেঘের মায়াবী আননে চেয়ে আছে। অল্পতে লজ্জায় আড়ষ্ট হওয়া মেয়েটার অদম্য কন্ঠের আকাঙ্ক্ষা শুনে আবির শীতল চোখে চেয়ে মুচকি হাসলো। মেঘ এতক্ষণ কি বলেছে নিজেও জানে না, আবিরের অন্যরকম চাহনিতে কিছুটা লজ্জা পেয়েছে। আবির চোখমুখ গুটিয়ে শান্ত কন্ঠে শুধালো,” যা দিয়েছি সবকিছু সহ আবির যদি তোমার হয় তাহলে কাবিন নিয়ে কি তোমার আর কোনো আপত্তি আছে?”মেঘ সঙ্গে সঙ্গে আবিরের দিকে তাকিয়ে শ্বাস ছেড়ে ঠোঁট ফুলিয়ে নিষ্পাপ কন্ঠে বলে উঠল,” আমার আবির হলেই হবে।”আবির ভ্রু উঠাতেই মেঘ থতমত খেয়ে বলল,” সরি সরি সরি, আপনাকে হলেই হবে। ”“আমি তো তোমার ই। বাকি যা দিয়েছি ঐ সবও তোমার। এগুলোর পর কাবিন হিসেবে তোমার কি আমার কাছে আর কিছু চাওয়ার আছে? ”মেঘ সাবলীল ভঙ্গিতে বলল,” আমার আর কিছুই লাগবে না।”“মনে কষ্ট থাকবে না তো?”মেঘ একগাল হেসে বলল,” আমার মনে কষ্টের ছিটেফোঁটাও নেই কারণ আপনাকে পেয়ে গেছি যে।”আবির অনুগ্র হেসে টেবিলের উপরে রাখা একটা বই থেকে কাগজ এনে মেঘের হাতে দিল। তেমন একটা গুরুত্ব না দিয়েই মেঘ জিজ্ঞেস করল,” কি এগুলো?”“পড়ো।”মেঘ বিড়বিড় করে পড়ছে, কিছুটা পড়তেই বুঝতে পারলো এটা কাবিননামার কপি। মেঘ সঙ্গে সঙ্গে নিচে তাকালো। বরের স্বাক্ষরের জায়গায় ‘সাজ্জাদুল খান আবির’ লেখা আর কন্যার স্বাক্ষরের জায়গায় ‘মাহদিবা খান মেঘ’ বিবাহ রেজিস্ট্রী করার তারিখ: ০৩/০২/২০– যা আজ থেকে আরও তিন বছর আগের। এটা দেখে মেঘ বিস্তীর্ণ চোখে তাকিয়ে এক হাতে নিজের মুখ চেপে ধরেছে। মেঘের হাত থরথর করে কাঁপছে, কান দিয়ে গরম হাওয়া বের হচ্ছে, মস্তিষ্কে বিদ্যমান স্নায়ুগুলো ধপধপ করে কাঁপছে, বুকের ভেতরটা দুরু দুরু কেঁপেই চলেছে, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। মেঘ শশব্যস্ত চোখে আবিরের দিকে তাকালো। আবির নিরুদ্বেগ ভঙ্গিতে মেঘকে দেখছে আর নিজের বুকে হাত রেখে অনুচ্চ স্বরে দোয়া পড়ছে। মেঘের গলায় আটকানো নিঃশ্বাস টা অতি সন্তর্পণে বেড়িয়ে আসছে, মুখ ফুলিয়ে শ্বাস টেনে জিভ দিয়ে ঠোট ভিজিয়ে থমথমে কন্ঠে প্রশ্ন করল,” এগুলো কি সত্যি? ”আবির ঢোক গিলে ধীরস্থির কন্ঠে বলল,“হুমমমমমমম। আইনের চোখে আমাদের বিয়ের তিনবছর পূর্ণ হয়ে গেছে, গতকাল চতুর্থ বছরে পদার্পণ করেছি। তোমাকে আগেই বলেছিলাম, তুমি আমারই। কেউ তোমাকে আমার থেকে আলাদা করতে পারবে না। কেউ যদি আমার সাথে ঝামেলা করতেও চাইতো, আমি সরাসরি কাবিননামা দেখিয়ে দিতাম।”মেঘ ভাবনাচিন্তা ছাড়াই আচমকা বলে উঠল,” এটা কিভাবে সম্ভব?”আবির শক্ত কন্ঠে বলতে শুরু করল,” আমি দেশ ছাড়ার মাসখানেক আগে তানভিরকে তোমার ব্যাপারে সব বলেছিলাম। সে আমার আবেগ, অনুভূতি দেখে প্রথমদিকে মেনে নিলেও পরবর্তীতে ওর মনে কিছুটা খটকা সৃষ্টি হয়েছিল কারণ শত হলেও সে তোমার আপন ভাই। তোমার প্রতি তার দায়িত্ব, ভালোবাসা অন্য লেবেলের যেটা আমার প্রতি হাজার থাকলেও তোমার সমান নয়। বলতে গেলে তানভির, আমি দুজনেই তখন অপ্রাপ্তবয়স্ক। মজার ছলেই হোক কিংবা গভীর চিন্তা থেকেই, তানভির একদিন হুট করে বলে বসে,” ভাইয়া, তুমি বনুকে এখন পছন্দ করো মানলাম, আমি ওকে দেখেও রাখলাম কিন্তু ৭ বছর পর তোমার মন মানসিকতা যে এরকম থাকবে তার কি গ্যারেন্টি আছে? তখন যদি বনুর প্রতি এখনকার মতো অনুভূতি না থাকে?”তানভিরের কথা শুনে আমার মনে চিন্তন জাগে৷ আমি নিজেও কখনো সেভাবে ভেবে দেখি নি তাই ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিলাম তোমাকে বিয়ে করব। কেনো সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমি নিজেও জানি না শুধু মনে হয়েছিল তানভির যা বলেছে একদম ঠিক বলেছে। তানভির মজার ছলে বললেও আমি দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারছিলাম না। তানভিরকে জানানোর পর সে খুব রিকুয়েষ্ট করেছে যেন বিয়ের ঝামেলা না করি, ও এমনিতেই এসব বলেছিল আরও অনেককিছু। আমার মাথায় তখন কিছুই ঢুকছিল না, আমার কাছের বন্ধুর বাবা কাজী তাই তৎক্ষনাৎ খোঁজ নিলাম। তোমার বয়স অনেক কম ছিল, তখন তোমার আমার প্রতি তীব্র ঘৃণাও ছিল সব মিলিয়ে তখন বিয়ে সম্ভব ছিল না৷ তাছাড়াও কিছু নিয়মনীতি ছিল যার কারণে আংকেল কোনোভাবেই রাজি হয়তেছিল না৷ কিন্তু তখন আমার একটায় জেদ ছিল যেভাবেই হোক বিয়ে আমার করতেই হবে। আংকেলকে বিস্তারিত বুঝিয়ে খুব কষ্টে রাজি করিয়ে, রাকিব, তানভির আর সুজনের উপস্থিতিতে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করে দেশ ছাড়ি।”আবির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে পুনরায় বলতে শুরু করল,” বিশ্বাস করো, আমি তখন কোনোকিছু ভাবি নি, এতকিছু বুঝি নি। শুধু বুঝেছিলাম তোমাকে আমার লাগবে সেটা যেকোনো মূল্যেই হোক। মস্তিষ্কে শুধু একটা চিন্তায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, তোমাকে বৈধতার চাদরে মোড়ানো। পাওয়া না পাওয়ার মাঝে আমি তখন বাস্তবিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম, ভবিষ্যতে কি হবে বা হতে পারে সব ভুলে গিয়েছিলাম। বিয়ে পরিপূর্ণ হবে না জেনেও আবেগের তাড়নায় বিয়ে করেছিলাম৷”নিশ্চুপ মেঘ এবার মুখ খুলল। কিছুটা বিস্মিত হয়ে জানতে চাইল,” আমার সাইন কে দিয়েছিল?”“তুমি। ”“কিভাবে? আমি তো এসবের কিছুই জানতাম না।”“মনে আছে তানভির একদিন ঘুরতে নিয়ে তোমাকে বিয়ের কথা বলেছিল?”“হ্যাঁ, মনে আছে৷ আমাকে এমন ই একটা কাগজে সাইন করতে বলেছিল। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম এটা কিসের কাগজ? ভাইয়া বলেছিল বিয়ের। আমি তখন সেভাবে গুরুত্ব ই দেয় নি, ভেবেছিলাম ভাইয়া মজা করছে।”আবির কপাল গুটিয়ে জানতে চাইল,” কেনো আমার নাম বলেছিল মনে নেই?”“হ্যাঁ, এটাও মনে আছে। বিয়ের কথা বলায় আমি যখন হাসছিলাম তখন ভাইয়া জিজ্ঞেস করছিল আমাকে যার তার কাছে বিয়ে দিলে আমার আপত্তি আছে কি না। আমিও সুন্দর করে বলেছিলাম, কোনো আপত্তি নেই তুমি যাকে বলবা তাকেই বিয়ে করে নিব। আমার সত্যি ই তখন কোনো আপত্তি ছিল না কারণ তখন আমার জীবনে আপনি ছিলেন না। আমার চোখে আমার ভাই ই সবার সেরা ছিল, সে যা বলতো আমি সবকিছু মেনে নিতাম। ভাইয়া তখন আপনাকে বিয়ে করার কথা বলেছিল আর আমি ভাইয়ার কথায় আপনাকে বিয়ে করতেও রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম ভাইয়া মজা করছে তাই যা বলেছিল সবেতেই হ্যাঁ হ্যাঁ করে সাইনও করে দিয়েছিলাম। তারপর ভাইয়ার সাথে এ বিষয়ে আমার আর কোনোদিন কথা হয় নি। ভাইয়া কিছু বলে নি আর আমি তো সেই ঘটনা বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলাম। ”আবির মলিন হেসে বলল,” ঐদিন ই তোমার আমার সাথে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তানভিরের সাথে সাথে সেখানে কাজী সাহেব, সুজনরাও উপস্থিত ছিল তাছাড়া ফোনে আমিও ছিলাম।”মেঘ হা হয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। আবির গলা খাঁকারি দিয়ে আবারও বলতে শুরু করল,” আমি সাইন করায় দিনই তোমাকে বউ হিসেবে কবুল করেছিলাম কিন্তু তোমারটা বাকি ছিল। তোমাকে বিস্তারিত বুঝানোর পরিস্থিতি ছিল না তাই তানভির যেভাবে পেরেছে ম্যানেজ করেছে। আমার কথা ছিল, যেহেতু তোমার সাথে তখন মানসিক বা শারীরিক কোনো সম্পর্কে আমি জড়াবো না তাই শুধু আইনী কাজ টা সম্পন্ন করে রাখবো। বাসায় এসে যেভাবেই হোক তোমাকে পটিয়ে, বাসার সবার অনুমতি নিয়ে তোমাকে বিয়ে করব। আমি নির্বোধ ছিলাম কারণ আমি তখনও আবেগে গা ভাসাচ্ছিলাম। আমাদের বিয়ে আইনী ভাবে নিবন্ধিত হয়ে গিয়েছিল, আমার এত বছরের ভালোবাসাকে আইনী স্বীকৃতি দিতে পেরে মনে সুখের হাওয়া বইছিল। আমার আকাশে বাতাসে বিয়ের আমেজ ছিল কিন্তু সেই আমেজ বেশিদিন থাকলো না। মাস তিনেকের মধ্যে ফুপ্পির কথা জানতে পারি আর তখনই আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তানভিরের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনায় ভীত হয়ে আমি আইনী স্বীকৃতির জন্য জোরাজোরি করেছিলাম কিন্তু ফুপ্পির কথা শুনে সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। যেখানে ফুপ্পির প্রেমের সম্পর্ক জেনেও মানে নি সেখানে আমি কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলেছি। আমার বিয়েটা কোন লেবেলের অপরাধের কাতারে পড়বে সেটা ভেবেই আঁতকে উঠছিলাম। এত বছরে নিজের মনে জমে থাকা স্বপ্নগুলোকে পিণ্ডীভূত করে যে কাঁচের বাড়িটা বানিয়েছিলাম সেই বাড়িটা মনের ভেতরে ঘটে যাওয়া আকস্মিক ভূমিকম্পে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। নিজের সাজানো স্বপ্ন ভাঙার সাথে সাথে ভেঙেছিল তোমাকে দেখার সব আকাঙ্ক্ষা। নিজের আক্ষেপে নিজেই পুড়ছিলাম। কিছু সময়ের জন্য মনে হয়েছিল পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় কিন্তু শেষ সময়েও তোমাকে দেয়া কথাটা আমার কানে বাজছিলো, “আমাকে ছেড়ে যেতে পারবে না” সেই আদুরে আনন আমাকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত থেকে টেনে এনেছিল। শুধুমাত্র তোমার কথা ভেবে নতুনভাবে নিজেকে তৈরি করছিলাম, কিন্তু বুকে ছিল আকাশ সমান ভয়। বাসায় বিয়ের কথা জানলে তোলপাড় শুরু হবে এটা খুব ভালোই বুঝেছিলাম, তোমাকে নিয়ে আলাদা থাকার যোগ্যতাও আমার ছিল কিন্তু তুমিই যে আমার ছিলে না। তুমি এমনিতেই ৭-৮ বছর যাবৎ আমার সাথে কথা বলছিলে না। ঐ অবস্থায় কোনোক্রমে যদি শুনতে পারতে যে তোমার সাথে আমার বিয়ে হয়ে গেছে তখন আব্বু চাচ্চু কি করতো জানি না কিন্তু তুমি হয় আমাকে খু*ন করতে, নয়তো নিজে সু*ই*সাই*ড করতে আর না হয় লাস্ট অপশন ছিল ডি*ভো*র্স। তোমার জেদকে আমি বরাবর ই ভয় পায়, তখনও খুব ভয় পেয়েছিলাম। তুমি ভুলক্রমে কিছু বললেও সেটা তুমি করেই ছাড়তে৷ বাসায় ফিরে ৩ মাস কিংবা ৬ মাসের মধ্যে বিয়ে করার স্বপ্ন আড়ালেই হারিয়ে গেল। সেই থেকে আমার আতঙ্ক শুরু হলো, তানভির, রাকিব দু’জনকে খুব জোর করে বললাম ভুল করেও যেন বিয়ের টপিক না উঠায়, বিয়ের কথা যেন মন থেকে ভুলে যায়। অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে ৬ মাস আগে দেশে ফিরলাম, তখন সব ভুলে তোমাকে আমার প্রেমে পড়তে বাধ্য করলাম। প্রতিনিয়ত নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে তোমাকে অনুভব করাতে লাগলাম। আলহামদুলিল্লাহ বছরখানেকের মধ্যে আমি সফলও হয়ে গেলাম। আমার এক্সিডেন্টের পর তোমার আবেগ জড়ানো কথাগুলো শুনে তোমার ভালোবাসার পুরোপুরি নিশ্চয়তা পেয়েছিলাম। বাসার পরিস্থিতি, তোমার পরিস্থিতি দেখে তখন দ্বিতীয়বার উপলব্ধি করেছিলাম আমি আবেগের বশে ঠিক কত বড় ভুলটা করেছিলাম। আম্মুর বার বার জানতে চাওয়া, আমার কোনো পছন্দ আছে কি না, আব্বুর একই প্রশ্ন পরোক্ষভাবে জিজ্ঞেস করা সেই সাথে তোমার অতিরিক্ত যত্নে আমি পাগলপ্রায় হয়ে উঠেছিলাম৷ তখন বুঝেছিলাম, আমার বাবা মা আমাকে খুব ভালোবাসে, তাদের ইচ্ছাশক্তি এতটায় প্রবল যে আমি চাইলে তারা পৃথিবীর সবকিছু আমার সামনে হাজির করতে পারে সেখানে তোমাকে আমার সাথে বিয়ে দেয়া তেমন কোনো বিষয় ই না। বরং তোমাকে চাইলে আব্বু আম্মু খুশিই হতো। কিন্তু ওনারা তো জানতো না যে আমি ওনাদের হৃদয় আগেই ভেঙে ফেলেছি আর না তুমি কিছু জানতে। ঐ পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আমার বিয়ের কথা বলাটা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না আর না সম্ভব ছিল বিয়ের ঘটনা লুকিয়ে নতুন করে বিয়ে করা। তাছাড়া তখনও তোমার স্বপ্নের বাড়ি গিফট করা বাকি, তোমাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করাটাও বাকি ছিল। গত রমজানের আগে হুট সবার সামনে একদিন আমার বিয়ের কথা উঠল, তোমার আব্বু আগুনে ঘি ঢালার মতো কোথাকার কোন মেয়ের কথা বলল। আমি মেজাজ হারিয়ে বললাম ১ বছর বিয়েই করব না। আমি তাদের কিভাবে বুঝাতাম আমি যে তোমাকে বিয়ে করে ফেলেছি। তারপর রাকিবের বিয়ে ঠিক হলো, তখনও আব্বু আমাকে কথা শুনালো। এমনকি আমার নিজেরও খারাপ লাগছিল কারণ আমি যখন থেকে তোমাকে ভালোবাসি তারপর থেকেই বলছিলাম আমি যেভাবেই হোক রাকিবের আগে বিয়ে করব৷ বিয়ে করেও ছিলাম কিন্তু কাউকে বলতে পারছিলাম। আবেগ আর কষ্টগুলো নিজের ভেতর চাপিয়ে রাখতে রাখতে আর পারছিলাম না। রাকিবের গায়ে হলুদের রাতে ফুপ্পিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে শুধু একটা কথায় বলছিলাম,‘আমি ভুল করেছি, খুব বড় ভুল করেছি। সেই ভুলের শাস্তিস্বরূপ মেঘকে আমার থেকে কেড়ে নিও না। আমি মেঘকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না।’ফুপ্পি নিরূপায় ছিল, আমার কান্না দেখে তবুও কয়েকবার আব্বুকে বলার চেষ্টা করেছে কিন্তু সাহস করে বলে উঠতে পারে নি। তারপর শুরু হলো তোমার আব্বুর ছেলে দেখা, বাধ্য হয়ে বাসায় রাগারাগি করলাম। তোমার বাসার কাজ শেষ করতে প্রজেক্টের দায়িত্ব নিয়ে দেশের বাহিরে গেলাম। বিয়ের কথা বাসায় বলার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমার পুরোপুরি টার্গেট ছিল ১ তারিখ তোমাকে প্রপোজ করবো, রাতে বাসায় বিয়ের কথা বলব, বাসায় মানলে ২ তারিখ ধুমধাম করে গায়ে হলুদ হবে, না মানলে তোমাকে নিয়ে বাড়ি ছাড়বো। মাঝখান থেকে তুমি ৩ দিন আগে প্রপোজ করতে বের হয়ে সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছিলে। তবে যাই হোক রবের কাছে হাজারো শুকরিয়া যে কোনো ঝামেলা ছাড়ায় তোমাকে পেয়ে গেছি।”মেঘ হতবিহবল, পাথরের মতো বসে আবিরের মুখের পানে চেয়ে আছে। কিছু জিজ্ঞেস করা বা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। আবির দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখল। মেঘের হাত থেকে কাগজ নিতে নিতে মেঘের মসৃণ গালে চুমু খেয়ে হঠাৎ ই পুরু কন্ঠে বলে উঠল,” বউ, আমি তোমাকে ৫ মিনিট দিচ্ছি। এরমধ্যে টাশকি খাওয়া মুড থেকে বেড়িয়ে রোমান্টিক মুডে আসো। আমার বুকের ভেতর প্রেম ভালোবাসা ফুটন্ত গরম পানির মতো টগবগ করতেছে। তুমি রোমান্টিক মুডে না আসলে আমার অন্তর পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। তুমি কি তাই চাও?”মেঘ নির্বাক চোখে আবিরের দিকে তাকালো। আবির নিঃশব্দে হেসে চোখ টিপলো। আবিরের নির্লজ্জ মার্কা কথা আর কাণ্ড দেখে মেঘ না পারতেও কিঞ্চিৎ হাসল।★সকালে নাস্তার টেবিলে আবির আর মেঘ ব্যতীত সকলেই উপস্থিত, বন্যাও আজ সবার সাথে খেতে বসেছে। ইকবাল খান ধীর কন্ঠে শুধালো,“আবির আর মেঘ কি এখনও উঠে নি?”মালিহা খান মীমকে উদ্দেশ্য করে বলল,” মীম, দেখে আয় তো।”মীম সঙ্গে সঙ্গে উঠে গেল। আবিরের রুমের দরজায় ডাকতে গিয়ে খেয়াল করল দরজা খোলা, রুমে মেঘ আবির কেউ নেই। মীম রুমের ভেতরে ঢুকে ভালোভাবে দেখল। সহসা বাহিরে এসে উচ্চস্বরে বলল,” ভাইয়া, আপু কেউ ই রুমে নেই।”আলী আহমদ খান সঙ্গে সঙ্গে তানভিরের দিকে তাকালেন। তানভির আতঙ্কিত কন্ঠে বলল,” আমি সত্যিই কিছু জানি না। ”
পদ্মজা রান্নাঘরে জুলেখা বানুকে দেখে অবাক হলো। অচেনা হলেও সালাম দিল, ‘ আসসালামু আলাইকুম।’জুলেখা তীক্ষ্ণ চোখে পদ্মজার দিকে তাকালেন। অবহেলার স্বরে বললেন, ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম।’রিনু ছিল রান্নাঘরে। পদ্মজা রিনুর দিকে তাকিয়ে ইশারায় প্রশ্ন করলো, অচেনা মহিলাটি কে? রিনু হেসে বললো, ‘মৃদুল ভাইজানের আম্মা।’পদ্মজার ঠোঁটে হাসি ফুটলো। জুলেখার দিকে এক পা এগিয়ে এসে বললো, ‘ দুঃখিত! চিনতে পারিনি। আপনি প্লেট ধুচ্ছেন কেন? রাখুন। আমি ধুয়ে দিচ্ছি।’জুলেখা মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তিনি চুপচাপ প্লেট ধুয়ে, চুপচাপ বেরিয়ে গেলেন। মুখের প্রতিক্রিয়াতে পদ্মজার প্রতি ছিল অবজ্ঞা,ঘৃণা। পদ্মজা মনে মনে আহত হয়। জুলেখার দৃষ্টি ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়ার মতো ছিল। পদ্মজা জুলেখার যাওয়ার পানে চেয়ে রইলো। রিনু পদ্মজার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। ফিসফিসিয়ে বললো, ‘আমার মনডা কয়,এই বেডির উপর জিনের আছড় আছে!’পদ্মজা রিনুর দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকালো। বললো, ‘উনি আমাদের বাড়ির মেহমান! মুখে লাগাম দাও রিনু। পূর্ণার জন্য খাবার নিতে পারবো?’লতিফা শাড়ির আঁচল দিয়ে হাত মুছতে মুছতে রান্নাঘরে ঢুকলো। পদ্মজার প্রশ্নের জবাবে বললো, ‘হ পদ্ম, নিতে পারবা। খাড়াও আমি দিতাছি। তুমি খাইবা কখন?’‘পূর্ণা আর আমার খাবার একসাথেই দিয়ে দাও বুবু।’‘দিতাছি। রিনু জলদি ওই বাডিডা(বাটি) দে।’রিনুর বদলে পদ্মজা এগিয়ে দিলো। খাবার নিয়ে উপরে যাওয়ার সময় পদ্মজাকে দেখে জুলেখা হাতের গ্লাস শব্দ করে টেবিলে রাখলেন। পদ্মজা বুঝতে পারে,জুলেখার ঘৃণা ও বিরক্তির কারণ! বোধহয় গতকালের অপবাদ তিনি শুনেছেন। পদ্মজার ভয় হয়। পূর্ণার বিয়েটা হবে তো? জুলেখাকে দেখে মনে হচ্ছে,বিয়ের কথা বলার অবস্থাতেও তিনি নেই। জুলেখার কপাল আর ভ্রুযুগলে পদ্মজার চোখ আটকে যায়। যেন হেমলতার কপাল আর ভ্রু দেখছে সে। হুবহু একরকম! পদ্মজার বুকটা হুহু করে উঠে। সে দুই চোখ মেলে জুলেখার কপালের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখের দৃষ্টিতে যেন জন্ম জন্মান্তরের দুঃখ। পদ্মজাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জুলেখা উঠে চলে যান। পদ্মজার সম্বিৎ ফিরলো। সে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে তৃতীয় তলায় চলে আসে। পূর্ণা দুই হাতে একটা বালিশ জড়িয়ে ধরে পরম আবেশে ঘুমাচ্ছে। জুলেখার কপাল,ভ্রু দেখে জেগে উঠা ব্যথা পূর্ণাকে দেখে আরো বেড়ে যায়। হেমলতার যৌবনকাল পূর্ণার বর্তমান রূপের প্রতিচ্ছবি। সেই মুখ,সেই ঠোঁট,সেই গাল। নাকের পাটা মসৃণ। এতো মিল দুজনের! পদ্মজা পূর্ণার মাথায় হাত রেখে হেমলতার কথা ভাবে।পুরনো স্মৃতিগুলো চোখের পাতায় জ্বলজ্বল করছে। পদ্মজা পূর্ণার মুখের দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করলো, ‘আম্মা।’তার দুই চোখ জলে ভরে উঠে। পূর্ণা কী কখনো জানবে? পদ্মজা পূর্ণার ঘুমন্ত মুখ দেখে বহুবার আম্মা বলে কেঁদেছে! সে মনকে বুঝিয়েছে, এইতো আম্মা আছে! আমার সামনেই আছে! আমি এতিম নই!পদ্মজা হাতের উল্টোপাশ দিয়ে চোখের জল মুছলো। পূর্ণা এতো আরাম করে ঘুমাচ্ছে যে পদ্মজার ঘুম ভাঙাতে মায়া হচ্ছে। কিন্তু বেলা করে খাওয়া তার একদম পছন্দ না। খেয়ে না হয় আরো ঘুমানো যাবে। পদ্মজা পূর্ণার চোখেমুখে স্নেহের পরশ বুলিয়ে ডাকলো, ‘পূর্ণা? পূর্ণা? এই পূর্ণা?’পূর্ণা ধীরে,ধীরে চোখ খুললো। পদ্মজা বললো, ‘সূর্য কখন উঠেছে খবর আছে? নামাযের তো নামগন্ধও নেই। যা দ্রুত হাত-মুখ ধুয়ে আয়।’পূর্ণা অন্যদিকে ফিরে চোখ বুজলো। সে ঘুমে বিভোর। পদ্মজা আবার ডাকলো। জোর করে তুলে কলপাড়ে পাঠালো। পূর্ণা ঘুমিয়ে,ঘুমিয়ে কলপাড়ে গেল। ফিরে এলো সতেজ হয়ে। ঘরে প্রবেশ করেই সোজা লেপের ভেতর ঢুকে পড়লো। পদ্মজাকে আহ্লাদী স্বরে বললো, ‘খাইয়ে দাও আপা।’পদ্মজা বিনাবাক্যে খাইয়ে দিল। পূর্ণা না বললেও খাইয়ে দিত। খাওয়ার মাঝে পূর্ণা কথা বলতে চেয়েছিল। পদ্মজা নিষেধ করে। খাওয়ার মাঝে কথা বলা ভালো না বলে চুপ করিয়ে দেয়। খাওয়া শেষে পদ্মজা বললো, ‘ শেষরাতে কোথা থেকে ফিরছিলি?’পূর্ণা চোখ বড়বড় করে তাকায়। তার হেঁচকি উঠে যায়। পদ্মজা পানি এগিয়ে দিল। তাকিয়ে রইলো সরু চোখে। পূর্ণা পানি পান করে মিনমিনিয়ে বললো, ‘আর যাব না।’পদ্মজা গুরুজনদের মতো বললো, ‘বাড়তি কথা না বলে প্রশ্নের উত্তর দেয়া বাধ্যতা।’পূর্ণা ভয়ে দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে। সে ঢোক গিলে নতজানু হয়ে বললো, ‘মৃদুল যে…উনার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম।’‘সে ডেকেছিল?’‘হু।’‘আর তুইও চলে গেলি?’পূর্ণার মনে হচ্ছে সে ফাঁসির দঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। যেকোনো মুহূর্তে ঝুলে যাবে। পদ্মজা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। ঘরের দুই দিকে জানালা আছে। পূর্ব দিকের জানালা খোলা। উত্তর দিকেরটা বন্ধ। সে উত্তর দিকের জানালা খুলতে খুলতে বললো, ‘ বিয়ের আগে মাঝরাতে দেখা করা কী ঠিক হলো? মৃদুল এখনো পর-পুরুষ। বিয়েও ঠিক হয়নি। যখন এসে শুয়েছিস তখন টের পেয়েছি। তার আগে টের পেলে কানে ধরে ঘরে নিয়ে আসতাম।’পূর্ণা অপরাধী কণ্ঠে বললো, ‘আপা,আর যাব না। ক্ষমা করে দাও।’পদ্মজা পূর্ণার পাশে এসে বসে। পূর্ণার হাতের উপর নিজের এক হাত রেখে বললো, ‘বিয়ের পর আমার বোনের জীবনে হাজার জ্যোৎস্না আসুক।’পূর্ণা তার অন্য হাত পদ্মজার হাতের উপর রাখলো। তারপর পদ্মজার চোখের দিকে তাকিয়ে ডাকলো, ‘আপা।’‘কী?’‘তোমাকে কে মেরেছে? কেন মেরেছে? তুমি রাতে কেন কেঁদেছো?’পদ্মজা তার হাত সরিয়ে নেয়। চোখমুখে কাঠিন্য ভাব চলে আসে। কণ্ঠে গাম্ভীর্যতা রেখে পদ্মজা বললো, ‘প্রশ্ন করতে নিষেধ করেছিলাম।’পূর্ণা চোখ নামিয়ে বললো, ‘আপা,আমি জানতে চাই।’পদ্মজা দাঁড়িয়ে পড়লো। বললো, ‘বাড়ি ফিরে যা। মৃদুলের আম্মা-আব্বা আসছে। যখন তোকে প্রয়োজন হবে ডেকে পাঠাব। তার আগে যেন এই বাড়ির আশেপাশেও না দেখি।’পদ্মজা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয়। পূর্ণা তার পায়ের উপর থেকে দ্রুত লেপ সরাল। তারপর দৌড়ে পদ্মজার সামনে এসে দাঁড়াল। অনুরোধ করে বললো, ‘আপা,আপা দোহাই লাগে বলো। আমি তোমার সব কথা শুনি। কিন্তু এইটা শোনা সম্ভব হচ্ছে না।’‘পূর্ণা!’পূর্ণা আচমকা পদ্মজার দুই পা জড়িয়ে ধরলো। কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো, ‘আপা,পায়ে পড়ছি আমাকে সব বলো। তোমার গালের ক্ষত,গলার দাগ আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। আমি শান্তি পাচ্ছি না। কে তোমাকে এত কষ্ট দিয়েছে? কে এতোবড় দুঃসাহস দেখিয়েছে? আমি তার কলিজা ছিঁড়বো।’পূর্ণার চোখের জল পদ্মজার পায়ে পড়ে। পদ্মজা পূর্ণাকে টেনে তুললো। পূর্ণার কাজল নয়ন দুটি জলে টুইটুম্বুর। যেন স্বচ্চ কালো জলের পুকুর।পদ্মজা পূর্ণার চোখের জল মুছে দিয়ে বললো, ‘কাঁদুনি।’পূর্ণা পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরে। পদ্মজার শরীরে সে মা,মা গন্ধ খুঁজে পায়। সেই ছোটবেলা থেকেই পদ্মজা তার জীবন,তার আনন্দ। পদ্মজার গলার কালসিটে দাগটা যেন তারই বুকের আঘাত। রক্তক্ষরণ হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। পদ্মজা পূর্ণাকে অপেক্ষা করতে বলে,নিজের ঘরে যায়। আলমগীরের দেয়া খাম নিয়ে ফিরে আসে। দরজা বন্ধ করে পূর্ণাকে নিয়ে বিছানার উপর বসলো। এরপর বললো, ‘আমি জানি,আমার বোন বড় হয়েছে। সেই সাথে ধৈর্য্য,জ্ঞানও বেড়েছে। আমি একটা কারণেই তোকে সব জানাব,যাতে সাবধান থাকতে পারিস। আমি চাই, সব জানার পর তুই নিজে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নিবি না। আমি যেভাবে বলবো,সেভাবে চলবি। রাজি?’পূর্ণা বুঝতে পারছে সে ভয়াবহ কিছু জানতে চলেছে। উত্তেজনায় তার গায়ের পশম দাঁড়িয়ে পড়েছে। পূর্ণা বললো, ‘রাজি।’পদ্মজা হাতের খামটা পূর্ণার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘তিনটে চিঠি আছে। তিনটাই আলমগীর ভাইয়ার লেখা। আমি গতকাল পড়েছি। মন দিয়ে পড়বি। অনেক কিছু জানতে পারবি। আর যতটুকু বাকি আছে আমি বলব।’পূর্ণা প্রবল আগ্রহ নিয়ে খাম খুলে তিনটে চিঠি বের করলো। পদ্মজার কথামতো প্রথম একটা চিঠির ভাঁজ খুললো।——বোন পদ্মজা,সালাম নিও। তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই আমার। সেদিনের রাতে তোমার আগমন আমার জীবনে নিয়ে এসেছে আনন্দ। পৌঁছে দিয়েছে আলোর জগতে। যে জগতে বাঁচার জন্য পিছনের প্রতিটি মুহূর্ত অসহনীয় যন্ত্রণায় কাটিয়েছি। জানি না এতো পাপ করার পরও করুণাময় কেন আমার প্রতি এতো উদার হলেন! তিনি চেয়েছিলেন বলেই, তুমি ফেরেশতার মতো হাজির হয়েছিলে। বাঁচিয়েছিলে আমাকে আর রুম্পাকে। যখন তুমি এই চিঠি পড়ছো,তখন তোমার অবস্থা কী আমি জানি না। হয়তো সব জেনে গিয়েছো নয়তো এখনো অন্ধকারে ডুবে আছো। যদি অন্ধকারে ডুবে থাকো তাহলে আমি তোমাকে আলোর সন্ধান দেব। সব জানার পর সিদ্ধান্ত তোমার। চিঠিটা বোধহয় বড় হয়ে যাবে। এক পৃষ্ঠাতে হবে না। ধৈর্য্য ধরে সবটুকু পড়ো। আমি তোমাকে একটা তিক্ত দীর্ঘ গল্প শোনাবো। গল্পটার কেন্দ্রবিন্দু আমির হলেও জড়িয়ে আছি অনেকেই।যখন আমিরের জন্ম হয় কাকি আম্মার পর সবচেয়ে বেশি খুশি হই আমি। কাকি আম্মা বড় দুঃখী ছিলেন। কাকা মারধর করতেন খুব। নিজ চোখে কাকি আম্মাকে বিবস্ত্র করে মারতে দেখেছি। আমার ছোট মন লজ্জায় মিইয়ে গিয়েছিল। লুকিয়ে কেঁদেছিলাম। কিন্তু কাকা বা আব্বা কাউকে একটুও মায়া দেখাতে দেখিনি,লজ্জা পেতে দেখেনি। তাদের চোখেমুখে সর্বক্ষণ হিংস্রতা ছিল। আমি খুব ভয় পেতাম আব্বাকে। ভীতু ছিলাম। আমার কাছে আমার আব্বা,কাকাই ছিল ভূত,রাক্ষস। আমার আম্মা সবসময় পাথরের মতো নিশ্চুপ। তার অনুভূতি অসাড়। কাকি আম্মা ছিলেন আমার মা। তিনি বহুবার আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে একটা ছেলের জন্য আক্ষেপ করেছেন। কাকি আম্মা বলতেন,সেই ছেলে এসে নাকি কাকি আম্মার সব দুঃখ ঘুচে দিবে। যখন সেই ছেলেটা এলো আমি অনেক খুশি হই। এবার বুঝি কাকি আম্মার কষ্ট কমবে। কাকি আম্মা বলেছিলেন, আমির হবে পুলিশ। সব অন্যায়কারীকে শাস্তি দিবে আর আমি হবো শিক্ষক। শুধু কাকি আম্মার না আমারও ইচ্ছে ছিল আমি শিক্ষক হবো। ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়াবো। সব বাচ্চাদের আদর্শ হবো। সবাই দেখে সালাম দিবে,সম্মান করবে। সারাক্ষণ হাতে একটা বই নিয়ে হাঁটবো। এই স্বপ্ন নিয়েই পড়তে থাকি স্কুলে। এর মাঝে আব্বা একটা বাচ্চাকে নিয়ে আসে। বলে, সে নাকি আমাদের আরেক ভাই। তার নাম রাখে রিদওয়ান। আমরা চার ভাই হয়ে যাই। আমি,জাফর,রিদওয়ান,আমির একসাথে এক স্কুলে পড়েছি। রিদওয়ান,আমির এক শ্রেণির ছিল। ছোট থেকেই আমিরের শরীরে ছিল অবাক করার মতো শক্তি। ওর মেধা ছিল ধারালো। আমরা সবাই ধরেই নিয়েছিলাম,আমির পুলিশ হবে। অনেক বড় পুলিশ হবে। পুরো দেশ চিনবে। ঠিক তখনই আমাকে আর জাফরকে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয় অভিশপ্ত এক কালো জীবনের সামনে। যে জীবনে টাকা, নারী আর রক্তের খেলা চলে। আমাদের বুঝিয়ে দেয়া হয়,নারী হচ্ছে ভোগের বস্তু। পাতালঘরে বনেদি ঘরের দুই-তিনজন পুরুষের দেখাও মিলে। তারা দুজন নারীকে আমাদের সামনে কুৎসিত ভাবে আঘাত করে। আব্বা,কাকা উপভোগ করে সেই দৃশ্য। সেই অসহায় দুই নারীর চিৎকারে কলিজা ছিঁড়ে যায় আমার। আব্বা আর কাকার পায়ে পড়েছি যাতে তাদের ছেড়ে দেয়। কিন্তু ছাড়েনি। রক্ত দেখে জাফর জ্ঞান হারায়। ও রক্ত সহ্য করতে পারতো না। রক্তে খুব ভয় ছিল জাফরের। একটা তেরো বছরের মেয়েকে বাঁধা অবস্থায় আমার হাতে তুলে দেয়া হয়। আব্বা আমাকে বুঝায়,মেয়েটার সাথে কী করতে হবে! জানতে পারি, বাড়ির পিছনে জঙ্গলে অবস্থিত এই পাতালঘর অনেক বছরের পুরনো। আমাদের বংশের প্রতিটি পুরুষের একমাত্র পেশা পতিতাবৃত্তি ও নারী ধর্ষণ। আমাদের অঢেল সম্পদ পতিতাবৃত্তির টাকায় করা। নারী বিক্রির টাকায় করা! একরকম বাধ্য হয়েই আমাকে অভ্যস্ত করে দেওয়া হয় এই পথে। ঘৃণায় বমি করেছি অনেকবার। ধর্ষণের পর কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হতো মেয়েগুলোকে। আমার জীবন হয়ে উঠে দূর্বিষহ।তবে ঘরে ফিরে শান্তি লাগতো। আমির ছিল সেখানে। আমিরের দুষ্টুমি আমাকে খুব হাসাতো। আমিরের একটা দোষ ছিল,ও রিদওয়ানকে খুব অত্যাচার করতো। দুজনের সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলে। সে যাই হোক, আমিরের সঙ্গ ছিল শান্তির! ওর চঞ্চলতা,সাহসিকতা ছিল মুগ্ধ করার মতো। আমার সেই শান্তিও একদিন নষ্ট হয়ে যায়। যেদিন নানাবাড়ি থেকে ফিরে পাতালঘরে প্রবেশ করে রিদওয়ান আর আমিরের উপস্থিতি দেখি! আমির তখন পুরোদমে পনেরো বছরের একটা মেয়েকে পেটাচ্ছিল! আমিরের চোখেমুখের হিংস্রতা আমাকে অবাক করে দেয়। আমি কিছুতেই মানতে পারছিলাম না,আমার প্রিয় ভাইয়ের এই রূপ! এই জীবন!এর পরের কথাগুলো তোমার জন্য খুব কষ্টের হবে পদ্মজা। দয়া করে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিয়ে আবার পড়া শুরু করো।——পূর্ণা থামে। তার শরীর কাঁপছে। অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। সে ছলছল চোখে পদ্মজার দিকে তাকায়। তার চোখে খুব ভয়,ঘৃণা। সে স্পষ্ট স্বরে উন্মাদের মতো ডাকলো, ‘আপা…এই আপা।’পদ্মজা পূর্ণার এক হাত শক্ত করে ধরলো। বললো, ‘ভাইয়া আমাকে যা বলেছেন,তাই কর। প্রাণভরে নিঃশ্বাস নে।’পূর্ণার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। তার মাথা ভনভন করছে। শরীর যেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। সে পদ্মজার এক হাত শক্ত করে ধরে জোরে নিঃশ্বাস নিল। বুকে অপ্রতিরোধ্য তুফান বয়ে যাচ্ছে! আমির তার কাছে আপন বড় ভাই। সম্মানীয় বড় ভাই! এই ব্যথা সহ্য করতে পারবে না সে। পুরো শরীরে তীব্র ব্যথা অনুভূত হচ্ছে।
পদ্মজা পূর্ণার মনের অবস্থা টের পাচ্ছে। তার মতো সহ্যশক্তি নেই পূর্ণার। পদ্মজা পূর্ণার হাতের পিঠে চুমু খেয়ে বললো, ‘মন এতো দূর্বল হলে কি চলে?’পূর্ণা পদ্মজার দিকে তাকালো। পদ্মজা চোখের ইশারায় বাকিটুকু পড়তে বলে। পূর্ণা এক হাতের তালু দিয়ে চোখের জল মুছে পড়া শুরু করলো-——আমাদের দাদুর সঙ্গ পেয়ে আমির ছোট থেকেই নিষ্ঠুর প্রকৃতির হয়েছে। কাকার কথায় দাদু আমিরকে আলাদা করে সময় দিতেন। আমির কাকার বড় শিকার ছিল। আমিরের চাল-চলন ছিল অন্যরকম। তাকে ছোট থেকে শিক্ষা দেয়া হয়েছে,মেয়েরা ভোগের বস্তু। শিখিয়েছে টাকার ক্ষমতা আর পৈশাচিক আনন্দ কেমন! দাদু শুরু থেকে সব জানেন। তিনি কাকা আর আব্বাকে উৎসাহিত করতেন। আমাদের দাদাকেও সাহায্য করেছেন। দাদুর সোনার অলংকারের প্রতি দূর্বলতা ছিল খুব। এই দূর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে আমার দাদা,আব্বা,কাকা দাদুকে ব্যবহার করেছেন। দাদুর সাথে দাদুর এক বোনও ছিল। দাদুর বোন বলতে আপন নয়,পরিচিত। দুজন নারী মিলে সহযোগিতা করে এসেছে বছরের পর বছর। আমির নারীর শরীর ভোগ করার চেয়ে, আঘাত করতে পছন্দ করতো। প্রথম তিন বছর সে কোনো মেয়ের সাথে জোরপূর্বক মিলিত হওয়ার চেষ্টা করেনি। সবসময় প্রতিটি মেয়ের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছে।প্রথম প্রথম আমার খারাপ লাগতো। কিন্তু একসময় অভ্যস্ত হওয়ার সাথে উপভোগ করতে থাকি। আমিরের যখন আঠারো বয়স তখন থেকে সে যৌনতার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠে। পাশের গ্রামের এক মেয়ের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে। মেয়েটা দেখতে মিষ্টি ছিল। আমিরকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছে। বিশ্বাস করে নিজের ইজ্জত সঁপে দিয়েছিল, বিনিময়ে এরপরদিন লাশ হয়ে নদীর ঢেউয়ে ভেসে যেতে হয়েছে! আমিরের নারী আসক্তি তীব্র হয়ে উঠে। কিন্তু জোরপূর্বক কিছু করতে সে নারাজ। বেছে নেয় ছলনার পথ,প্রতারণার পথ। কতগুলো মেয়েকে সে ঠকিয়ে ভোগ করেছে তার হিসেব নেই আমার কাছে। ঢাকায় পড়তে গিয়ে কারো মাধ্যমে নারী পাচারের সাথে যুক্ত হয়। তারপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি। টাকার পাহাড় গড়ে উঠে। পদ্মজা,তোমার খারাপ লাগবে। তাও বলতে হচ্ছে, তুমি যেমন আমিরের জীবনের প্রথম মেয়ে নও তেমন বউও নও! শহরের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সুন্দরী এক মেয়েকে আমির বিয়ে করেছিল। সেই মেয়েটি নিঃসন্দেহে রূপসী ছিল। সে বিয়ের পূর্বে শারিরীক সম্পর্কে আগ্রহী ছিল না বলে আমির তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মেয়েটি তার পরিবারে না জানিয়ে আমিরকে বিয়ে করে। এক সপ্তাহ পর মেয়েটি যখন আমিরের কাছে তিক্ত হয়ে উঠে, তখন মৃত্যু মেয়েটির সামনে এসে দাঁড়ায়! মেয়েটির পরিবারের কেউ জানতেও পারেনি,তাদের বাড়ির মেয়ের বিয়ে হয়েছিল! আর সে স্বামীর হাতেই মারা গিয়েছে! আমির তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। সে তখনই ঠান্ডা মাথায় পুরো ঘটনার চিহ্ন মুছে দেয়। এটাই কিন্তু ওর একটা বিয়ে নয়। আমির আরেকটা বিয়েও করেছিল। ভিন্ন ধর্মের এক সুন্দরী মেয়েকে। তার বেলায়ও হবুহু ঘটনা ঘটে। সে মেয়ের মৃত্যু আমি নিজচোখে দেখেছি। কিন্তু কিছু বলিনি। বলতে ইচ্ছে হয়নি! মন বলতে কিছু ছিল না তখন। মেয়েটা মৃত্যুর পূর্বে অবাক হয়ে দেখছিল আমিরকে। সে বোধহয় বিশ্বাস করতে পারছিল না,যাকে ভালোবেসে ঘর ছেড়েছে সে তাকে খুন করছে! আমির কিন্তু খুন করার ঘন্টাখানেক পরই অন্য মেয়ের সাথে সময় কাটিয়েছে! আমিরের বাড়ি-গাড়ি সব হয়। যেকোনো নারী আমিরকে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিত নির্দ্বিধায়। আমির দেখতে একটু শ্যামলা হলেও ওর কথাবার্তা, চাল-চলন, চাহনি ছিল আকর্ষণ করার মতো। যতগুলো মেয়ে আমিরকে ভালোবেসেছে বেশিরভাগই আমিরের থুতুনির কাটা দাগটা দেখে প্রেমে পড়েছে। আমির সম্পর্কিত আর কিছু বলার নেই। এইটুকুতেই তুমি আমিরের স্থান বুঝে যাবে। তোমার স্বামী একা খারাপ এই কথা বলার মুখ নেই আমার। আমি কিছু কম করিনি!তবে আমির কাকির ব্যাপারে ছিল দূর্বল। তার সব সাবধানতা ছিল কাকিকে নিয়ে! কাকি যেন কিছু জানতে না পারেন। আমির ঢাকা থাকার কারণে,কাকি কখনো সন্দেহও করেননি। তার আগে সন্দেহ করেছিলেন কিন্তু প্রমাণ পাননি। যেদিন কাকি তোমাকে আর আমিরকে তোমাদের বাড়ি থেকে আনতে গিয়েছিলেন। সেদিন তোমরা আসার পর রাতে কাকি জানতে পারেন আমির অনেক আগে থেকে কাকার সাথে কাজ করছে। এমনকি ঢাকা এই কাজই করে। আমির কাকার সাথে ডিল নিয়ে আলোচনা করছিল। খুব চাপ ছিল মাথার উপর। চিন্তায় আমির অসতর্ক হয়ে যায়। কাকির ঘরেই কাকার সাথে নারী পাচারের বিষয়ক কথা বলছিল। আর কাকিও সব শুনে ফেলেন। তিনি খুব কাঁদেন। রাগে আমিরকে অনেকগুলো থাপ্পড় দেন। আমির কিছু বলেনি। চুপচাপ থাপ্পড় খেয়েছে। কাকি আমিরকে নিষেধ করেন, আমির আর যেন আম্মা না ডাকে। আর যেন দেখা না করে। আমির কাকিকে সামলানোর অনেক চেষ্টা করেছে। পারেনি। কাকির খুব কষ্ট হচ্ছিলো। ঘৃণায় আমিরের শার্ট টেনে হিঁচড়ে ছিঁড়ে ফেলেছেন। কাকির নখের দাগ আমিরের পেটে-বুকে হয়তো এখনো আছে। কাকির বেঁচে থাকার সুতোটাই ছিঁড়ে যায়। সারা রাত্রি হাউমাউ করে কেঁদেছেন। অনেকবার কাকিকে স্বান্তনা দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সাহস হয়নি। আমি নিজেই তো একটা নিকৃষ্ট মানব! আবার সেদিন রাতে তুমি রুম্পার সাথে ছিলে। রুম্পা যদি সব বলে দেয় তোমাকে সে ভয়ে আমির রিদওয়ানকে পাহারায় রেখেছিল। লতিফাকে দিয়ে খাবারে ঔষধ মিশিয়ে দিয়েছিল। যাতে রুম্পা ঘুমিয়ে পড়ে। আমির অনেক ছলচাতুরী করেছে,তুমি যাতে কিছু না জানতে পারো।আমার আর রুম্পাকে তুমি নতুন জীবন পেতে সহযোগিতা করেছো তাই তোমাকে আমাদের গল্পটাও বলতে চাই। জানি না আর কতদিন বাঁচব। পালিয়ে এসেছি! আমিরের হাত অনেক লম্বা। ওর আমাকে খুঁজে পেতে সময় লাগবে না। বরং অবাক হচ্ছি,এতদিনেও আমির আমাকে খুঁজে পায়নি কেন?রুম্পাকে আমার জন্য কাকা পছন্দ করেছিলেন। বিয়ের প্রথম দিনই বুঝতে পারি,রুম্পা সরল সোজা একটা মেয়ে। রুম্পার সঙ্গ ছিল অনেক শান্তির। কখন যে ভালোবেসে ফেলি বুঝিনি। বিয়ের মাস কয়েক পর বৈশাখ মাসে আমি পাতালঘরে ছিলাম। আমার সামনে নগ্ন মেয়ে ছিল। তখন পাতালঘরের চারপাশেএতো নিরাপত্তা ছিল না। হুট করে দেখি রুম্পা চলে এসেছে। তারপরের দিনগুলো বিষাক্ত হয়ে উঠে। রুম্পাকে রিদওয়ান মারে,আব্বা মারে,কাকা মারে। আমি চুপচাপ মেনে নেই। কিন্তু খুব কষ্ট হতো। নিজের সাথে যুদ্ধ করেছি। নিজের প্রতি ঘৃণা হতো। স্বামী হিসেবে নিজেকে ব্যর্থ লাগতো। রিদওয়ান আমার অজান্তে আমার ভালোবাসার বউকে ধর্ষণ করে। এই খবর ধর্ষণের এক সপ্তাহ পর শুনেছি। কিন্তু আমি এমনই কাপুরুষ যে রিদওয়ানকে মারতে গিয়ে উল্টো মার খেয়ে চুপ হয়ে গিয়েছি! রুম্পা তেজি মেয়ে ছিল। ও রাগে বার বার বলেছে,পুলিশের কাছে যাবে। সব বলে দিবে। তাই রুম্পাকে মারার পরিকল্পনা করা হয়। আমি রুম্পার সাথে লুকিয়ে দেখা করি। ওর পায়ে ধরে ক্ষমা চাই। আর বলি,পাগলের ভান ধরে থাকতে। আমি মাঝে মাঝে দেখা করব। রুম্পা তেজি হলেও মৃত্যুকে ভয় পেতো খুব। পাগলের ভান ধরে থাকলে বাঁচতে পারবে এই কথা শুনে খুব কাঁদে। আর তাই করে। সে যে এই সুন্দর পৃথিবীতে বাঁচতে চায়! রুম্পার চিৎকার,চেঁচামেচি শুনে আব্বা,কাকা ধরে নেয় রুম্পার মাথা ঠিক নেই। তবে আমিরের দৃষ্টি ঈগলের মতো। প্রথম দেখাতেই বুঝতে পারে,রুম্পা পাগল নয়। মানসিক ভারসাম্যও হারায়নি। তাও কেন যেন কাউকে কিছু বলেনি! রুম্পা কিন্তু তখনো জানতো না আমির এই কাজে যুক্ত আছে। আমির আর রুম্পার সম্পর্ক ভাইবোনের মতো ছিল। আমির পরিবারের সাথে সবসময় সহজ-সরল থেকেছে। একদম সাধারণ একটা মানুষের মতো। শুরু হয় রুম্পার বন্দী জীবন আর আমার নিঃসঙ্গ রাত। একটা দিনও শান্তিতে ঘুমাতে পারিনি। কাপুরুষ শব্দটা সর্বক্ষণ খুঁড়ে-খুঁড়ে খেয়েছে। মাঝে মাঝে লুকিয়ে দেখা করেছি। বুঝতে পেরেছি,রুম্পাকে আমি খুব ভালোবাসি। আব্বা,চাচা আর ছোট ভাই আমির এই তিন জনের ভয়ে এক পাও বাড়ানোর সাহস হয়নি। একজন লোক আমাদের দল ছেড়ে পালিয়েছিল। বিনিময়ে তার নির্মম মৃত্যু হয়েছে। সে ভারত চলে গিয়েছিল। তাও আমির ধরে ফেলেছে! বলো তো পদ্মজা,এমন ঘটনা জানার পর আমার মতো কাপুরুষ আর কী ই বা করতো? ধিক্কার আমার নিজের জীবনকে! আমাকে তো কুকুরের খাবার হওয়া উচিত! রুম্পাকে তুমি ঢাকা নিয়ে যেতে চেয়েছিলে তাই আমির বাবলুকে আদেশ করে,রুম্পাকে খুন করতে। আমি এই খবর পেয়ে পালানোর কথা ভাবি। পথে বাবলু আটক করে তখন তুমি ফেরেশতার মতো হাজির হও। এই ঋণ শোধের উপায় আমার জানা নেই।আর কী বলবো আমি? এখন সিদ্ধান্ত তোমার। তুমি কী করবে! আমিতো সব জানিয়ে দিয়েছি। কিছু কথা না জানালেই নয়। আমির আমার কাছে সবসময় স্বচ্ছ ছিল। কিন্তু তুমি আসার পর আমি তাকে চিনতে পারি না। যখন তোমাদের বিয়ে হয় ভেবেই নিয়েছিলাম কয়দিন পর তোমার লাশও দেখতে হবে। কিন্তু সেটা হয়নি। উল্টা আমির পাল্টে যায়। চারিদিকে কঠোর নিরাপত্তা দেয়া হয়। গ্রাম থেকে ঢাকা ফিরেই সুন্দরী দুই মেয়েকে সঙ্গ দেয়ার কথা ছিল। এই দুই মেয়েকে হাতের মুঠোর আনতে আমিরের সবচেয়ে বেশি সময় লেগেছে। সুযোগ পেয়েও আমির তাদের কাছে টানতে পারেনি। বছরখানেকে বুঝে যাই, আমির সত্যি তোমাকে ভালোবেসেছে! কোনো মেয়ের শরীর আর টানেনি আমিরকে। এ নিয়ে আব্বা,কাকার মাঝে অনেক কথা হয়েছে। আমির যদি সব ছেড়ে দেয়? আমার মনের কোণে আশা জাগে,আমির এবার আমার মতো অনুভব করবে। এই কালো জগতকে তার কালোই লাগবে। আমি নিজ চোখে দেখেছি,আমিরকে তোমার জন্য ছটফট করতে। তোমার অসুখ হলে সবকিছু ভুলে যেতো। তোমার চিন্তায় এক জায়গায় স্থির থাকতে পারতো না। এমনকি ঢাকার বাড়ি সহ আমাদের বাড়িটাও আমির তোমার নামে করে দিয়েছে। আমিরের যত সম্পদ আছে সব তোমার নামে করা। আমিরের কিন্তু নিজস্ব বলতে কিছু নেই। সে নিঃস্ব। এই খবর রিদওয়ান বা আব্বা,কাকা কেউ জানে না। কোনো কাক-পক্ষীও জানে না। চট্টগ্রাম সমুদ্রের কাছে তোমার জন্য একটা বাংলো বাড়ি বানাচ্ছে। বাড়ি বানানোর টাকা একত্রিশটা মেয়ে পাচার করার বিনিময়ে অগ্রিম নিয়েছিল। এখন সেই চাপ মাথায় নিয়ে ঘুরছে। হাতে সময় কম। কিন্তু মেয়ে পাওয়া যাচ্ছে না! আমার জানামতে, তুমি ধার্মিক ও পবিত্র একটা মেয়ে। তুমি এতকিছু জানার পর আমিরকে মেনে নিতে পারবে না। তোমার বিবেক তোমাকে সঠিক পথ দেখাবে। আমি যা জানি সব বলেছি। আমির তোমাকে ভালোবাসে এই কথাটা কঠিন সত্য। তুমি যদি আমিরের কাছে তার দুই চোখ চাও সে তোমার সামনে ছুরি ধরে হাঁটুগেড়ে বসে বলবে নিয়ে নাও! ছয় বছরে আমিরের যে রূপ,তোমার প্রতি যে টান আমি দেখেছি তা থেকে আমার এটাই মনে হয়। আমির তোমাকে অন্ধের মতো ভালোবাসে। এমন মানুষের মনে এতো ভালোবাসা দেয়ার কোনো উদ্দেশ্য হয়তো সৃষ্টিকর্তার আছে। শুনেছি,সৃষ্টিকর্তার সব সৃষ্টি কোনো উদ্দেশ্যে করা। এখন সবটা তোমার সিদ্ধান্ত। আমি এইটুকুও মিথ্যে বলিনি। তুমি বুদ্ধিমতী একটু চোখ কান খোলা রাখলেই বুঝতে পারবে। যে পদক্ষেপই নাও না কেন সাবধান থেকো। আমিরের চোখ ফাঁকি দিয়ে একটা পক্ষীও উড়ে যেতে পারে না।রুম্পা তোমাকে ভালোবাসা জানিয়েছে। কখনো সুযোগ মিললে আমাদের আবার দেখা হবে। আমার মৃত্যু যেকোনো সময় হয়ে যেতে পারে। রুম্পাকে যদি আবার ওই বাড়িতে নেয়া হয় তুমি দেখে রেখো। আল্লাহ তোমার সাথে আছেন। আমার জন্য দোয়া করো। আল্লাহ আমার শাস্তি যেন রুম্পাকে না দেন। আমাকেই যেন দেন। আর আমাকে ক্ষমা করে দেন। আমি অনুতপ্ত। এতো বড় চিঠি লিখে অভ্যেস নেই। ভুল হলে ক্ষমা করো। ভালো থেকো বোন।ইতি,আলমগীর।——-পূর্ণা দুই হাতে মাথা চেপে ধরে। কাঁদতে কাঁদতে তার বুক ভিজে গিয়েছে। সে পদ্মজার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আমার বিশ্বাস হচ্ছে না আপা। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।’পদ্মজা পূর্ণাকে জড়িয়ে ধরলো। পূর্ণা পদ্মজার বুকে মুখ গুঁজে ফোঁপাতে থাকলো। পদ্মজা তার সাথে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা খুলে বলে। পূর্ণা দুই হাতে শক্ত করে ধরে পদ্মজাকে। তার প্রিয় বোনের এতো কষ্ট! সে সহ্য করতে পারছে না। পূর্ণা কাঁদতে কাঁদতে বললো, ‘ভাইয়া তোমার আগে আরো দুটো বিয়ে করেছে। এই ব্যথা কীভাবে সহ্য করেছো আপা?’পদ্মজা কান্না আটকিয়ে রেখেছিল। এই কথা শুনে ভেতর থেকে কান্না আপনা আপনি চলে আসে। পূর্ণাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। একটা মানুষ খুঁজছিল সে,যাকে জড়িয়ে ধরে মনখুলে কাঁদা যাবে। আমির অত্যাচারী, হিংস্র,নারী ব্যবসায়ী এইটুকুর ব্যথাই সে হজম করতে পারেনি। চিঠি পড়ে যখন জানতে পারলো,আমির নারী আসক্ত ছিল। এমনকি বিয়েও করেছে। তখন ইচ্ছে হচ্ছিল,গলায় ফাঁস লাগিয়ে মরে যেতে। ঠান্ডা মেঝেতে বসে হাত-পা ছড়িয়ে কেঁদেছে। বার বার চোখে ভেসে উঠেছে আমিরের সাথে অনেক মেয়ের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত। একজন স্ত্রীর জন্য এটা কতোটা বেদনাদায়ক হতে পারে,তার কোনো পরিমাপ নেই। পদ্মজা চোখের জল মুছলো। পূর্ণাকে সামনাসামনি বসিয়ে বললো, ‘ এখন কাঁদার সময় নয়। তোকে আমি সব জানিয়েছি,যাতে প্রেমাকে দেখে রাখতে পারিস। আর নিজেও সাবধানে থাকিস। আমি একটা ছুরি দেব। নিজের সাথে রাখবি। রিদওয়ানের নজর ভালো না। প্রেমার দায়িত্ব তোর। তোর বিয়ে দিয়ে দেব তিন-চারদিনের মধ্যেই।’‘আপা?’ পূর্ণার কণ্ঠটা অদ্ভুত শোনায়। পদ্মজা তাকালো। পূর্ণা ঢোক গিলে নতজানু হয়ে কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে বললো, ‘ভাইয়ার কোনো ক্ষতি করো না আপা।’কথা শেষ করেই জোরে কেঁদে উঠলো পূর্ণা। সে বুঝতে পারছে সে অন্যায় আবদার করেছে। পাপীর প্রতি মায়া দেখাচ্ছে। কিন্তু আমিরকে সে আপন ভাইয়ের মতো ভালোবাসে। আমির কখনো বড় ভাইয়ের অভাব বুঝতে দেয়নি। মাথার উপরের ছাদ হয়ে থেকেছে। সবচেয়ে বড় কথা তার প্রিয় বোনের ভালোবাসার মানুষ আমির। কেউ না জানুক সে জানে,আমির ছাড়া পদ্মজা বেঁচে থেকেও মৃত। পদ্মজা তার মা হেমলতার মতো হয়েছে। সত্যকে,ন্যায়কে বেছে নিবে। ভালোবাসার সিন্দুকটা তালা মেরে রাখবে। তারপর কষ্টে ধুঁকে-ধুঁকে মরবে। পূর্ণার কথা শুনে পদ্মজা অবাক হয়ে উচ্চারণ করলো, ‘পূর্ণা!’পূর্ণা পদ্মজার কোলের উপর মাথা নত করে বললো, ‘আপা,আমি খুব খারাপ। কিন্তু তোমার সুখ আমার কাছে সবচেয়ে বড়। ভাইয়া তোমাকে ভালো রাখবে। ভাইয়া তোমাকে ভালোবাসে। আগের সব ভুলে যাও। মাফ করে দাও। আমি জানি তুমি ভাইয়াকেও ছাড়বে না। ভাইয়ার কিছু করে ফেলবে। আপা,দোহাই লাগে। তোমার সুখ নষ্ট করো না।’পদ্মজা আশ্চর্যের চরম পর্যায়ে অবস্থান করছে। পূর্ণা মাথা তুলে তাকায়। পদ্মজা প্রশ্ন করে, ‘ আর যে মেয়েগুলো অত্যাচারিত হয়েছে? যে মেয়েগুলো ঠকেছে? যে মেয়েগুলো যন্ত্রনায় ছটফট করে জীবন দিয়েছে? তাদের প্রতি অন্যায়ের শাস্তি কে দিবে?’পূর্ণার সহজ উত্তর, ‘তোমাকে তো কিছু করেনি। তোমাকে তো ভালো রাখবে।’পদ্মজা নিজেকে সামলে রাখতে পারেনি। সে ভেবেছিল পূর্ণা ঘৃণায় আমিরকে খুন করতে চাইবে। খুন করতে চাইবে রিদওয়ান, খলিল আর মজিদকে। কিন্তু এ তো উল্টা সুর তুলছে! পদ্মজা গায়ের সবটুকু শক্তি দিয়ে পূর্ণাকে থাপ্পড় দিল। পূর্ণা আকস্মিক ঘটনায় নিজেকে শক্ত রাখার সুযোগ পায়নি। বিছানা থেকে হুমড়ি খেয়ে মেঝেতে পড়ে। পদ্মজার নাক লাল হয়ে গেছে। সে রাগে পূর্ণাকে বললো, ‘ ছিঃ! তুই আম্মার মেয়ে!’
পূর্ণা উত্তরে কিছু বললো না। সে ঝরঝর করে কাঁদতে থাকলো। নাকের পানি,চোখের পানি মিলেমিশে একাকার। দৃষ্টি মেঝেতে নিবদ্ধ। পদ্মজার রাগে দুঃখে কান্না পায়। বেসামাল ঘূর্ণিপাকে সে আটকে পড়েছে। প্রতিটি নিঃশ্বাস হয়ে উঠেছে বিষাক্ত। কেউ নেই পাশে দাঁড়ানোর মতো। কেউ মাথা ছুঁয়ে দিয়ে বলে না, পাশে আছি! মন যা চায় করো। পদ্মজার ভেতরের ঝড়ের তাণ্ডব কেউ টের পাচ্ছে না। সবাই তার বিরুদ্ধে। সবাই!পদ্মজা চিঠি ও খাম নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। পূর্ণা মৃদু আর্তনাদ করলো। সে কিছুতেই চিঠির লেখাগুলো আর পদ্মজার মুখে উচ্চারিত শব্দগুলো বিশ্বাস করতে পারছে না। তার কাছে ভাইয়া নামক শব্দটির মানে আমির। তাৎক্ষণিক চোখের সামনে ভেসে উঠে একটা হাসিখুশি মুখ। আমিরের যে স্নেহ,ভালোবাসা এতদিন তাদের উপর চুইয়ে-চুইয়ে পড়েছে। সেই ভালোবাসায় খাদ থাকতে পারে না! পূর্ণা দেয়ালে হাতের ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। শরীরটা কেমন করছে! হাজারটা সূচ যেন বুকের ভেতরটা খোঁচাচ্ছে। সে তার আপার চোখেমুখে দেখেছে সীমাহীন কষ্ট! পূর্ণা দুই হাতে কপালের দুই পাশ চেপে ধরে পায়চারি করতে করতে বিড়বিড় করে, ‘তুমি গতকাল রাতে এজন্যে কাঁদছিলে আপা! ভাইয়ার ভালোবাসার অভাব তোমাকে ছাই করে দিচ্ছে। তুমি পুড়ে যাচ্ছো। পুড়ে যাচ্ছো তুমি।’পূর্ণা বিছানায় বসলো। সে অস্থির হয়ে আছে। জানালায় চোখ পড়তেই সে সেখানে গিয়ে দাঁড়ালো। চোখের সামনে দৃশ্যমান হয় বড় বড় গাছ। তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। না জানি কত মেয়ের কুরবানির সাক্ষী এই গাছেরা! পূর্ণা জানালার গ্রিলে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুজে। গাল বেয়ে টুপ করে জল গড়িয়ে পড়ে মেঝেতে। তার কেন এতো কষ্ট হচ্ছে সে জানে না। বড় ভাইয়ের সমতূল্য আমিরের এমন ভয়ংকর রূপের কথা জেনে নাকি তার বোন আর বোনের ভালোবাসার বিচ্ছেদের আশঙ্কায়! পূর্ণা দুই হাতে চোখের জল মুছে ওড়না দিয়ে মাথা ঢাকলো। তারপর দ্রুতপায়ে ২য় তলায় পদ্মজার ঘরে যায়। পদ্মজা ঘরে নেই। নিচ তলায় হয়তো! পূর্ণা সোজা নিচ তলায় চলে আসে। সদর ঘরে জুলেখা রিনুর সাথে কথা বলছিল। তিনি ব্যাগও গুছাচ্ছেন। পূর্ণা মৃদুলের কাছে শুনেছে,মৃদুল তার মা-বাবাকে নিয়ে এসেছে। জুলেখা বানুর মুখের সাথে মৃদুলের মুখের মিল রয়েছে। পূর্ণা আন্দাজ করে নিল,তিনি মৃদুলের মা। পূর্ণা নতজানু হয়ে এগিয়ে আসে। জুলেখার পায়ে ছুঁয়ে সালাম করার জন্য ঝুঁকতেই জুলেখা পা সরিয়ে নিলেন। কর্কশ কণ্ঠে বললেন, ‘ দূরে যাও।’পূর্ণা মনে মনে আহত হয়। দূরে সরে দাঁড়ায়। চোখের কার্নিশে জল জমে। সে ঢোক গিলে কান্না আটকিয়ে কাঁপাকণ্ঠে বললো, ‘আসসালামু আলাইকুম।’জুলেখা বানু জবাব দিলেন না। তিনি কাউকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘ কী গো! হয় নাই তোমার? সময় যাইতাছে নাকি আইতাছে?’গফুর মিয়া বেরিয়ে আসেন। পূর্ণা গফুর মিয়াকে দেখে বুঝতে পারলো, উনি মৃদুলের বাবা। লাল রঙের লম্বা দাঁড়ি,মাথায় সাদা টুপি,পরনে সাদা পাঞ্জাবি। চোখেমুখের নূর যেন দ্যুতি ছড়াচ্ছে। গফুর মিয়া পূর্ণাকে দেখে হাসলেন। বললেন, ‘ভালো আছো মা? শরীরটা ভালো লাগছে?’গফুর মিয়ার প্রশ্ন দুটো পূর্ণা শরীরকে চাঙ্গা করে তুললো। সে মৃদু হেসে বললো, ‘ ভালো আছি। আপনি…আপনি ভালো আছেন?’‘আছি। বুড়ো মানুষ… ‘গফুর মিয়া কথা শেষ করতে পারলেন না। জুলেখা বানু বাজখাঁই কণ্ঠে বললেন, ‘এহন তোমার গপ(গল্প) করার সময় না। ট্রেইন ছাইড়া দিলে বুঝবা।’পদ্মজা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে। শাড়ির আঁচল দিয়ে মাথার চুল ঢেকে জুলেখা বানুকে বললো, ‘গতকালই আসলেন। আজই চলে যাবেন?’জুলেখা বানু পদ্মজার দিকে ফিরেও তাকালেন না। তিনি রিনুকে ধমকের স্বরে বললেন, ‘মৃদুইল্লা কই গেছে?’রিনু বললো, ‘বাইরে গেছে। কলপাড়ে।’‘গিয়া খবর দেও,হের আম্মায় ডাকতাছে।’রিনু পদ্মজাকে একবার দেখলো। তারপর বাইরে গেল। লতিফা সদর ঘর ঝাড়ু দিচ্ছে। সে আড়চোখে জুলেখার ব্যবহার দেখছে। তার ইচ্ছে হচ্ছে, মহিলাকে ভেজা কাপড়ের মতো মুচড়াতে! জুলেখার এমন ব্যবহারের কারণ পদ্মজা বুঝতে পারছে। তাও প্রশ্ন করলো, ‘মনে হচ্ছে আপনি খুব বিরক্ত হয়ে আছেন! আমরা কোনো ভুল করেছি?’জুলেখা কটাক্ষ করে বললেন, ‘দেখো মা,তোমার সাথে আমি কথা কইতে চাইতাছি না। তুমিও কইয়ো না।’পদ্মজা পূর্ণার দিকে তাকালো। পূর্ণা অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। তার চোখে, জলের পুকুর সৃষ্টি হয়েছে। যেকোনো সময় গড়িয়ে পড়ে যেন ঘর ভাসিয়ে নিবে। লতিফা ঝাড়ু দেওয়ার ভান করে সব বালু জুলেখার ভেজা পায়ের উপর ছিটিয়ে দিল। জুলেখা বানু দুই লাফে দূরে সরে যান। চোখ বড় বড় করে লতিফাকে বললেন, ‘এই ছেড়ি,চোক্ষে দেহো না? কেমনে কামডা বাড়াইছে! এহন আবার পাও ধুইতে হইবো।’লতিফা অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বললো, ‘মাফ করেন খালাম্মা।’মৃদুল সদর ঘরে প্রবেশ করে আগে পূর্ণার মুখ দেখলো। পূর্ণাকে দেখেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে। সে পূর্ণাকে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘পূর্ণা,এহন কেমন লাগতাছে?’পূর্ণা গুমট কণ্ঠে জবাব দিল, ‘ভালো।’মৃদুল বললো, ‘লিখন ভাইয়ের খবর নিয়া আইছি।’পদ্মজা সঙ্গে-সঙ্গে প্রশ্ন করলো, ‘কেমন আছেন উনি?’জুলেখা তীক্ষ্ণ চোখে পদ্মজার দিকে তাকান। জুলেখার চাহনি দেখে পদ্মজা অস্বস্তিতে পড়ে যায়। মৃদুল বললো, ‘জানি না ভাবি। খালি জানি, লিখন ভাইরে ঢাকা হাসপাতাল নিয়া গেছে।’পদ্মজা বিড়বিড় করে বললো, ‘আল্লাহ উনাকে সুস্থ করে দিবেন,ইনশাআল্লাহ। ‘পূর্ণার চোখেমুখের গুমট ভাবটা স্পষ্ট। মৃদুল দেখতে পাচ্ছে কিন্তু তার কারণ বুঝতে পারছে না। জুলেখা বানু আদেশের স্বরে মৃদুলকে বললেন, ‘তোর যে কাপড়ডি বাইর করছিলি ব্যাগে ঢুকাইছি। এহন এই জুতাডি খুইলা তোর জুতাডি পায়ে লাগা।’মৃদুলের কপালে ভাঁজ সৃষ্টি হয়। বললো, ‘আমরা কই যাইতাছি? ‘‘বাড়িত যাইতাছি।’মৃদুলের মাথায় যেন বাজ পড়ে। সে পূর্ণার দিকে তাকালো। পূর্ণা অন্যদিকে ফিরে আছে। মৃদুল অবাক হয়ে জুলেখাকে বললো, ‘আমরা যেই কামে আইছি,সেই কাম তো হয় নাই আম্মা।’জুলেখা পূর্ণার উপর চোখ রেখে বললেন, ‘আমি এমন কালা ছেড়িরে আমার ছেড়ার বউ কইরা ঘরে নিতে রাজি না।’মৃদুল উঁচু স্বরে উচ্চারণ করলো, ‘আম্মা!’জুলেখা বানু চেঁচিয়ে বললেন, ‘তুই কী দেইক্ষা এমন ছেড়িরে পছন্দ করছস? তোর লগে এই ছেড়ির যায়? তোর আর এই ছেড়ির গায়ের রঙ আসমান আর জমিন।’জুলেখা বানুর চিৎকার শুনে খলিল ও আমিনা উপস্থিত হোন। অপমানে,লজ্জায় পূর্ণার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে। পূর্ণার চোখের জল পদ্মজা হজম করতে পারছে না। পদ্মজা বললো, ‘ আপনি গায়ের রঙকে মূল্য দিচ্ছেন কেন? ছেলে-মেয়ে দুজন দুজনকে ভালোবাসে। ভালোবাসাটাকে মূল্য দিন।’জুলেখা বানুর মেজাজ শুধু খারাপের দিকেই যাচ্ছে। তিনি বললেন, ‘আমার ছেড়ার মতো সোনার টুকরা এমন কয়লারে কুনুদিনও পছন্দ করব না। এই ছেড়ি তাবিজ করছে। কালা জাদু করছে আমার ছেড়ার উপর। আমার ছেড়ারে আমি বরহাট্টার হুজুরের কাছে লইয়া যাইয়াম। জাদু দিয়া বেশিদিন ধইরা রাখন যায় না। এইডা তুমি আর তোমার বইনে মনে রাইক্ষো।’মৃদুল চিৎকার করে উঠলো, ‘আম্মা! কীসব আবোলতাবোল কইতাছেন। আপনি পূর্ণারে কষ্ট দিতাছেন।’জুলেখা কেঁদে দিলেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমার কষ্ট নাই? আমি কত আশা কইরা আছিলাম আমার ছেড়ার বউ আমি পছন্দ কইরা ঘরে আনাম। পরীর মতো বউ আনাম। কিন্তু তুই এমন কালা ছেড়িরে পছন্দ কইরা রাখছস। দশ মাস দশ দিন তোরে পেটে রাখছি। আর এহন তুই এই ছেড়ির লাইগগা গলা উঁচায়া কথাও কইতাছস!’পদ্মজা জুলেখাকে বুঝাতে চাইলো, ‘আপনি অকারণে কাঁদছেন। দেখুন…’‘তুমি চুপ থাকো। তোমার বইনের তো গত্রের রঙ কালা। আর তোমার তো চরিত্রই কালা। নষ্টা মাইয়া মানুষের মতো জামাই রাইক্ষা অন্য ছেড়ার লগে সম্পর্ক রাখছো। এমন চরিত্রহীন ছেড়ি মানুষের বইনরে আমার বংশে নিয়া কি ইজ্জতে কালি লাগামু?’পূর্ণার ত্যাড়া রগটা সক্রিয় হয়ে উঠে। সে জুলেখার সামনে এসে আঙুল শাসিয়ে বললো, ‘আমি সব সহ্য করব কিন্তু আমার আপাকে কিছু বললে আমি সহ্য করব না।’পূর্ণার আঙুল শাসিয়ে কথা বলাটা জুলেখা হজম করতে পারলেন না। কত বড় সাহস! মিয়া বংশের বড় বউকে শাসিয়ে কথা বলছে! জুলেখা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বললেন, ‘কইলজাডা বেশি বড়! এই ছেড়ি কারে আঙুল দেহাইতাছো তুমি? তোমার বইনে যে নষ্টা পুরা গেরামে জানে। সত্য কইতে আমি ডরাই না।’মৃদুল ক্ষেপে যায়। সে জুলেখার পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো আর বললো, ‘আম্মা,আপনি কিন্তু বাড়াবাড়ি করতাছেন।’জুলেখা পিছনে ঘুরেই মৃদুলকে কষে চড় মারলেন। বেশ জোরেই শব্দ হয়। গফুর মিয়া জুলেখাকে ধমকালেন, ‘তুমি কী করতাছো? কী কইতাছো?’জুলেখা বানু গফুর মিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘কিয়ামত নাইমা আইলেও এমন নষ্টার কালি বইনরে আমার ঘরের ঝিও করতাম না।’পূর্ণার শিরায়-শিরায় ক্রোধ ছড়িয়ে পড়ে। সে টেবিলে এক হাত রেখে কিড়মিড় করে বললো, ‘আরেকবার নষ্টা কথা উচ্চারণ করলে আমি আপনার জিভ পুড়িয়ে দেব।’উপস্থিত সবাই পূর্ণার দিকে চমকে তাকায়। মৃদলও অবাক হয়। পদ্মজা পূর্ণার এক হাত টেনে ধরে,কিন্তু পূর্ণাকে নাড়ানো যায় না। সে বড় বড় চোখ করে জুলেখার দিকে তাকিয়ে আছে। জুলেখা রাগে,বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। তিনি ক্রোধের ভার নিতে পারছেন না। টেবিলে জোরে জোরে তিনটা থাপ্পড় দিয়ে তিনবার বললেন, ‘ নষ্টার বইন,নষ্টার বইন,নষ্টার বইন!’কেউ কিছু বুঝে উঠার পূর্বে পূর্ণা টেবিলের উপর থাকা জগ হাতে তুলে নিল। তারপর জগের সবটুকু পানি জুলেখার মুখের উপর ছুঁড়ে মারলো। আকস্মিক ঘটনায় সবার চোখ মারবেলের মতো হয়ে যায়।সাথে-সাথে পদ্মজা পূর্ণাকে বিরতিহীনভাবে থাপড়ানো শুরু করলো। পূর্ণা দুই হাতে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে। রাগে,দুঃখে সে কাঁদছে। পদ্মজার চোখভর্তি জল। সে পূর্ণাকে বললো, ‘এটা কী করলি তুই? তোকে এই শিক্ষা দিয়েছি? আর কত জ্বালাবি আমাকে?’লতিফা পূর্ণাকে বাঁচাতে দৌড়ে আসে। জুলেখা বিস্ফোরিত নয়নে তাকিয়ে আছেন। অপমানে তার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে হচ্ছে। তিনি মৃদুলের দিকে তাকালেন। মৃদুলের চোখেমুখে অসহায়ত্ব প্রকাশ পাচ্ছে! তার অনুভূতিগুলো থমকে গেছে। জুলেখার চোখে জল চিকচিক করছে। তিনি চোখের জল মুছে বললেন, ‘থাক এইহানে,বাড়ি ফেইরা আমার কবর দেখবি তুই।’মৃদুল তার মাকে খুব ভালোবাসে। জুলেখার চোখের জল তার হৃৎপিণ্ডকে জ্বালিয়ে দেয়! জুলেখা ব্যাগ হাতে নিয়ে বেরিয়ে যান। পিছন পিছন গফুর মিয়াও গেলেন। মৃদুল পূর্ণাকে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘ভালো করলে না।’পূর্ণাকে লতিফা জড়িয়ে ধরে রেখেছে। সেই অবস্থায়ই পূর্ণা হুংকার ছাড়ে, ‘ বেশ করেছি। আমার বোন আমার মা! আমার মাকে আপনার মা গালি দিয়েছে। আমি উনাকে ছেড়ে দিলে জাহান্নামেও আমার জায়গা হতো না।’‘কাজটা ঠিক করো নাই পূর্ণা!’ মৃদুলের কণ্ঠে তেজের আঁচ পাওয়া গেল।মায়ের প্রতি মৃদুলের সমর্থন দেখে পূর্ণা রাগে বলে উঠলো, ‘ এমন মায়ের ছেলেকে আমি বিয়ে করব না।’মৃদুল তিরস্কার করে হেসে বললো, ‘আমিও করব না। তুমি না আমার গায়ের রঙের সাথে মানাও, না ব্যবহারের দিক দিয়া মানাও। জুতা মারি বিয়ারে।’মৃদুল টেবিলে জোরে লাথি মেরে বেরিয়ে গেল। পদ্মজা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চেয়ারে বসলো। ছোট থেকে শত সমস্যার মুখোমুখি হতে হতে সে ক্লান্ত। বড্ড ক্লান্ত!
এখন যে দুপুর তা বুঝার সাধ্যি নেই! ঘন কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে। সকাল থেকে সূর্যের দেখা নেই। কুয়াশা তার গভীর মায়াজালে সূর্যকে লুকিয়ে রেখেছে। পূর্ণা আলগ ঘরের বারান্দায় বসে কাঁদছে। তার পাশে বসে আছে প্রান্ত। প্রান্ত পূর্ণাকে নিয়ে যেতে এসেছে। কিন্তু পূর্ণার কোনো হুঁশ নেই। সে কেঁদেই চলেছে। মগা আলগ ঘরে ঘুমাচ্ছে। নাক দিয়ে বের হচ্ছে বিদঘুটে শব্দ। সেই শব্দে প্রান্ত বিরক্ত! সে দুই আঙুল কানে ঢুকিয়ে চুপচাপ বসে রইলো। পূর্ণা হাঁটুর উপর থুতুনি রেখে সুপারি গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ বেয়ে টুপটুপ বৃষ্টি বর্ষণ হচ্ছে। বুকের জ্বালাপোড়া সহ্য করতে পারছে না। মৃদুলের শেষ কথাগুলো তার শরীরের প্রতিটি পশমকে পুড়িয়ে দিয়েছে। এ ব্যথা সে কোথায় লুকোবে? মনের মণিকোঠায় যত্নে রাখা ভালোবাসার মুখের তিক্ত কথা কি সহ্য করা যায়! পূর্ণা নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে। বুকের ভেতর তুফান বয়ে যাচ্ছে। লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে ফুসফুস, কিডনি,মস্তিষ্ক,সর্বাঙ্গ! পূর্ণার হেঁচকি ওঠে। প্রান্ত চেয়ার ছেড়ে পূর্ণার সামনে এসে দাঁড়ালো। উৎকণ্ঠিত হয়ে বললো, ‘আপা!’পূর্ণা তার ডাগরডাগর চোখদুটো মেলে প্রান্তর দিকে তাকায়। চোখের দৃষ্টিতে দুঃখের মহাসাগর। পূর্ণা প্রান্তকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো, ‘ভাই,আল্লাহ আমাদের থেকেই কেন সবকিছু ছিনিয়ে নেন?’প্রান্ত পূর্ণার কথার মানে বুঝলো না। কিন্তু পূর্ণার কান্না তার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। সে পূর্ণার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো, ‘ আল্লাহ সব ঠিক করে দিবেন আপা। বড় আপা বলে,যা হয় সব ভালোর জন্য হয়।’পূর্ণার কান্নার দমকে কিশোর প্রান্ত কেঁপে-কেঁপে উঠে। আলগ ঘরের ডান পাশে রিদওয়ান দাঁড়িয়ে আছে। মৃদুল অন্দরমহলে আছে ভেবে সে পাতালঘর থেকে সোজা আলগ ঘরে এসেছে। কিন্তু এসে দেখে,এখানে পূর্ণা হাউমাউ করে কাঁদছে! ব্যাপারটা কী? রিদওয়ান আলগ ঘরে আর গেল না। কলপাড়ে রিনুকে দেখা যায়। রিদওয়ান চারপাশ দেখতে দেখতে কলপাড়ে আসে। রিনু রিদওয়ানকে দেখে ভয়ে জমে যায়। রিদওয়ান নানা অজুহাতে রিনুর গায়ে হাত দেয়। রিনুর ভালো লাগে না। ভয়ে কিছু বলতেও পারে না। সে এতিম! ছোট থেকে এই বাড়িতে বড় হয়েছে। যাওয়ার জায়গা নেই। রিদওয়ান রিনুকে প্রশ্ন করলো, ‘ পূর্ণা কাঁদতেছে দেখলাম। কিছু জানিস?’রিনু কাচুমাচু হয়ে সকালের ঘটনা খুলে বললো। সব শুনে রিদওয়ান খুব খুশি হয়। গুনগুনিয়ে গান গেয়ে অন্দরমহলের দিকে যায়। আমিনা আলোকে নিয়ে অন্দরমহলের সামনে খেলছেন। রিদওয়ান আলোর দিকে হাত বাড়িয়ে ডাকলো, ‘মামা,এদিকে আসো।’রিদওয়ান আলোকে কোলে নেয়। আমিনা ভারী করুণ ভাবে বললো, ‘ আমার রানিরে কি পাওন যাইতো না?’রিদওয়ান চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো, ‘খোঁজা হচ্ছে। পেয়ে যাবো।’আলোকে আমিনার কোলে দিয়ে রিদওয়ান সদর ঘরে প্রবেশ করে। রান্নাঘর থেকে পদ্মজার কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। রিদওয়ান সেদিকে যায়। পদ্মজা রিদওয়ানকে দেখে চোখ ফিরিয়ে নিল। কাজে মন দিল। রিদওয়ান পদ্মজার উপর চোখ রেখে কপাল কুঁচকায়! এই মেয়ে এতো চুপচাপ আর স্বাভাবিক কেন? সব মেনে নিল নাকি? রিদওয়ান মনের প্রশ্ন মনে রেখেই জায়গা ত্যাগ করে। যাওয়ার পূর্বে লতিফাকে বলে গেল, ‘লুতু,খাবার নিয়ে আয়।’রিদওয়ান চোখের আড়াল হতেই লতিফা ভেংচি কাটে। মাংস রান্না হচ্ছে। মাংস রান্না হতে দেখলেই পদ্মজার ফরিনার কথা মনে পড়ে। ফরিনার হাতের মাংসের ঝোলের স্বাদ ছিল অন্যরকম। অন্দরমহলের বাম পাশে ফরিনার কবর! আজ তিনদিন তিনি পৃথিবীর মায়া ছেড়েছেন। পদ্মজার বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। মাথার উপর ভারী বোঝা! বোঝা টানতে কষ্ট হচ্ছে। নিঃশ্বাসে-নিঃশ্বাসে সে আল্লাহর নাম স্বরণ করছে। প্রার্থনা করছে, এই বোঝার ঘানি যেন সে টানতে পারে। সেই ক্ষমতা আর ধৈর্য্য যেন হয়! লতিফা পদ্মজাকে চাপাস্বরে ডাকলো, ‘পদ্ম?’পদ্মজা তাকালো। লতিফা বললো, ‘তুমি আমারে না কইছিলা বড় কাকা আর ছোট কাকার সব খবর দিতে।’পদ্মজা দরজার বাইরে একবার তাকালো। তারপর লতিফার দিকে ঝুঁকে বললো, ‘কী খবর এনেছো?’‘শনিবার রাইতে ভোজ আসর বসাইবো।’‘কীসের?’লতিফা কথা বলতে ভয় পাচ্ছে। তার দৃষ্টি অস্থির। সে ফিসফিসিয়ে বললো, ‘মাইয়া পাচার করার কয়কদিনের মাঝে সবাই এক লগে বইয়া খাওয়া-দাওয়া করে। পরের কাম নিয়া কথাবার্তা কয়।’‘এটাও কী নিয়ম?‘হ।’‘কত্ত খারাপ এরা! এতো মেয়ের জীবন নষ্ট করতে পেরেছে সেই খুশিতে আনন্দ-ফূর্তি করে! কয়জন থাকবে জানো?’লতিফা বললো, ‘পাঁচ জনে।’পদ্মজা আর কথা বাড়ালো না। অন্যমনস্ক হয়ে উচ্চারণ করলো, ‘শনিবার রাতে!’লতিফা কপাল ইষৎ কুঁচকিয়ে বললো, ‘কিতা করবা ভাবছো?’পদ্মজা তেজপাতা হাতে নিয়ে বললো, ‘জানি না বুবু।’পদ্মজা কথা বাড়াতে চাইছে না বুঝতে পেরে লতিফা আর কথা বললো না। সে রিদওয়ানের জন্য খাবার প্রস্তুত করে।।পদ্মজা বললো, ‘ জানো,তোমার ভাই আমার আগে দুটো বিয়ে করেছে!’লতিফার হাত থেকে থালা পড়ে যায়। ঝনঝন শব্দ হয়। ভাত,ঝোল মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে।মৃদুল পুকুরপাড়ে বসে আছে। তার চোখ দুটি লাল। আজ ট্রেন নেই। আগামীকাল ভোরে ট্রেন আসবে। জুলেখার ফুফাতো বোনের শ্বশুর বাড়ি অলন্দপুরে। আটপাড়ার পাশের গ্রাম নয়াপাড়ায়! জুলেখা সোজা তার বোনের বাড়িতে চলে এসেছে। এখানে আসার পর থেকে বাড়ির পাশে পুকুরপাড়ে বসে আছে মৃদুল। তার জিভ ভারী হয়ে আছে। অকপট বলে দেওয়া কথাটা তাকে খুঁড়ে, খুঁড়ে খাচ্ছে। পূর্ণার কান্নামাখা চোখ দুটি বার বার ভেসে উঠছে চোখের সামনে। বুকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। দুশ্চিন্তায় দপদপ করছে মাথার রগ। কান্নারা গলায় এসে আটকে আছে। রাগের বশে সে জীবনে অনেক ভুল করেছে। কিন্তু এইবারের ভুলটা আত্মার উপর আঘাত হানছে। নিজের কথা দ্বারা নিজেই কষ্ট পাচ্ছে। জুলেখা বানু মৃদুলকে খুঁজে পুকুরপাড়ে আসেন। তিনি মৃদুলের উপর বেজায় খুশি! মৃদুলকে বললেন, ‘আব্বা,খাইতে আসো।’মৃদুল দূর্বল গলায় বললো, ‘পরে খামু। যান আপনি।’জুলেখা মৃদুলের পাশে বসলেন। মৃদুলের পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তোমার লাইগগা আসমানের পরী আনাম। মন খারাপ কইরো না।’‘লাগব না আমার আসমানের পরী।’মৃদুলের কণ্ঠস্বর কঠিন হওয়াতে জুলেখা বানুর হাসি মিলিয়ে যায়। তিনি বললেন, ‘দেহো আব্বা,তুমি চাইছো আর পাও নাই এমন কিছু আছে? ওই ছেড়ি কালা। ছেড়ির বইনেরও চরিত্র ভালা না…’‘চুপ করেন আম্মা। আল্লাহর দোহাই লাগে,চুপ করেন। আপনি কারে কি কইতাছেন? পদ্মজা ভাবির নখের যোগ্যেরও কোনো নারী নাই। আর আপনি তারে চরিত্রের অপবাদ দিতাছেন।’মৃদুল চিৎকার করে কথাগুলো বললো। মৃদুলের চিৎকার শুনে জুলেখার বোনের শ্বাশুড়ি পুকুরপাড়ে উঁকি দেন। সেদিকে তাকিয়ে জুলেখার লজ্জা হয়। মাথা হেট হয়ে যায়। তিনি রাগে চাপাস্বরে বললেন, ‘আমি কইতাছি না গেরামের মানুষ কইছে? ওই ছেড়ির শ্বশুরেও কইছে। এরা মিছা কইছে?’‘হ কইছে। আমি লিখন ভাইরেও চিনি,পদ্মজা ভাবিরেও চিনি। এই দেশের নামীদামী একজন অভিনেতা কেন অন্য বাড়ির বউয়ের সাথে লুকিয়ে সম্পর্ক রাখব আম্মা? তার কী সুন্দর মাইয়ার অভাব? পদ্মজা ভাবিরে লিখন ভাই পছন্দ করে ঠিক। কিন্তু পদ্মজা ভাবির সাথে আমির ভাইয়ের বিয়া হইবার আগে থাইকা। পদ্মজা ভাবি এমনই পবিত্র একজন মানুষ যে,লিখন ভাই এত্ত ভালোবাসে জাইননাও কোনোদিন লিখন ভাইয়ের দিকে ফেইরা তাকাইছে না। জামাইরে ভালোবাসছে। পদ্মজা ভাবি,দিনরাত এবাদত করে। ভাই-বোনের দায়িত্ব নিছে। এমন মানুষ খুঁইজা পাইবেন? পূর্ণার কাছে ওর বইনে ওর মা। তুমি ওর মারে খারাপ কথা কইছো। এজন্যে ও তোমার সাথে খারাপ করছে। আর পূর্ণা তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করছে তাই আমিও…’মৃদুল আর কথা বলতে পারলো না। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে। দাঁতে ঠোঁট কামড়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। জুলেখা পিছনে ফিরে তাকান। বোনের শ্বাশুড়ি তাকিয়ে রয়েছে! জুলেখার মুখটা অপমানে থমথমে হয়ে যায়। গটগট শব্দ তুলে জায়গা ছাড়লেন। মৃদুল জুলেখার যাওয়ার পানে তাকালো। সে তার মায়ের স্বভাব জানে। এখন খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিবে। উনিশবিশ হলেই নিজের ক্ষতি করে বসেন। এজন্য গফুর মিয়াও কিছু বলেন না,আর না মৃদুল কিছু বলতে পারে! মৃদুল মাথা নত করে কান্নায় ডুবে যায়। শেষ কবে সে কেঁদেছে জানে না!পূর্ণা পদ্মজাকে না বলে বাড়িতে চলে গেছে। পদ্মজা এক হাতে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুজে বসে আছে। মস্তিষ্কে ঘুরাঘুরি করছে আমিরের কু-কীর্তি! তার দুটো বিয়ে,নারী আসক্তি,সমাজের চোখে কলঙ্কিত হওয়া আর ফরিনার মৃত্যু! কানে বাজছে ‘নষ্টা’ শব্দটি। কতো ঘৃণা নিয়ে জুলেখা বানু এই শব্দটি উচ্চারণ করেছিলেন! তারপর মৃদুলের বলা কথাগুলো শুনে পূর্ণার অবাক চাহনি! পূর্ণার রক্তাক্ত হৃদয়ের যন্ত্রণা পদ্মজা টের পাচ্ছে! বুকটা ভারি হয়ে আছে। কান্না মন হালকা করে। কিন্তু কান্না আসছে না। আর কত কাঁদা যায়? পদ্মজা নিজেকে বুঝায়, আরো ধৈর্য্যশীল হতে হবে! এক হাতের দুই আঙুলে কপালের দুই পাশ চেপে ধরে।আমির সদর ঘরে প্রবেশ করে থমকে যায়। তার হাতে কাপড়ের একখানা খালি ব্যাগ। পদ্মজা পা দেখেই চিনে ফেলে,মানুষটা কে! সে মুখ তুলে তাকালো না। সেকেন্ড কয়েক আমির থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর পদ্মজার পাশ কেটে দ্বিতীয় তলায় উঠে গেল। পদ্মজা অনুভব করে,তার অনুভূতিরা পাল্টে যাচ্ছে। চঞ্চল হয়ে উঠছে! আমির ঘরে প্রবেশ করেই দ্রুত আলমারি খুললো। একবার দরজার দিকে তাকালো। তারপর কাগজে মুড়ানো একটা বস্তু দ্রুত ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল। যখন আলমারি লাগাতে যাবে একটা খাম মেঝেতে পড়ে। খামের উপরের লেখাটা আমিরের চেনা-চেনা মনে হয়। তাই সে পদ্মজার অনুমতি ছাড়াই খামের ভেতর থেকেচিঠি বের করলো। চিঠির লেখাগুলো দেখে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে যায়, এটা আলমগীরের চিঠি!আমিরের ভ্রু দুটি বেঁকে গেল। সে উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রতিটি লাইন পড়লো। প্রতিটি শব্দ তার মগজে আঘাত হানে! আতঙ্কে গায়ের পশম দাঁড়িয়ে যায়। নিজের অজান্তে এক কদম পিছিয়ে আসে। আলমগীরের খামের ভেতরের পৃষ্ঠায় কিছু লেখার অভ্যেস রয়েছে। আমির খাম ছিঁড়লো। তার ধারণা ঠিক! সাদা খামের ভেতরের পৃষ্ঠায় আলমগীরের বর্তমান ঠিকানা ও পাতালঘরের সঠিক অবস্থানের কথা লেখা আছে! আমির আলমগীরের ঠিকানাটা মুখস্থ করার চেষ্টা করলো। কিন্তু মুখস্থ হচ্ছে না। ভেতরটা কাঁপছে। পদ্মজা দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। আমির পদ্মজার উপস্থিতি টের পেয়ে হাতের খাম ও চিঠিগুলো বিছানার উপর রেখে কাপড়ের ব্যাগটা হাতে তুলে নিল। তারপর পদ্মজার দিকে তাকালো। তার চাহনি যেন মৃত! পদ্মজা কয়েক পা এগিয়ে এলো। আমির অপলক চোখে তাকিয়ে আছে। পদ্মজা রয়ে সয়ে প্রশ্ন করলো, ‘ আর কিছু জানার আছে?’আমির নির্বিকার! তার মুখে রা নেই। পদ্মজা বিছানা থেকে একটা চিরকুট হাতে নিল। বললো, ‘আপনার দুই বউয়ের নাম কী ছিল?’আমির বললো, ‘শারমিন,মেহুল।’পদ্মজার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠে। আমির পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। চোখের পলকও পড়ছে না। পদ্মজা ঢোক গিলে বললো, ‘আমরা যে ঘরে একসঙ্গে থেকেছি,তারাও কি সেই ঘরে আপনার সঙ্গে থেকেছে?’‘না,অন্য বাড়িতে।’‘তাহলে সব সত্য?’‘মিথ্যা বলে যদি তোমাকে আরো একবার পাওয়া যেত আমি মিথ্যা বলতাম।’ আমিরের সরল গলা। পদ্মজার নাকের পাটা ফুলে যায়। আমিরের সাথে কথা বললে তার এতো কান্না পায় কেন! আমির বললো, ‘আসি।’পদ্মজা শ্বাসরুদ্ধকর কণ্ঠে বললো, ‘কেন?’আমির থামলো। পদ্মজা কান্না করে দিল। সে কিছুতেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। আমির বললো, ‘আমাকে কান্না দেখাতে দাঁড় করালে?’পদ্মজা জল ভরা আগুন চোখে আমিরের দিকে তাকায়। কিড়মিড় করে বললো, ‘ নরপশু আপনি! এতগুলি মেয়ের ভালোবাসা নিয়ে খেলেছেন।’আমির নির্বাক। তার চুপ করে থাকাটা পদ্মজাকে আরো জ্বালা দেয়। তার অবচেতন মন চায় একবার আমির বলুক, সব মিথ্যে। কিন্তু আমির বলে না। কারণ,সব সত্য! সব সত্য! পদ্মজা অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে চিৎকার করে বললো, ‘ কথা বলার মুখ নেই? এতো লজ্জা হা? আসলেই লজ্জা আছে?’পদ্মজা তাচ্ছিল্যের হাসি দিল। আমির চোখের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। বুকের ভেতর আগুন ছুটে বেড়াচ্ছে। যেদিকে যাচ্ছে সেদিকটা পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে। পদ্মজা এলোমেলো হয়ে গেছে। আমির বের হওয়ার জন্য উদ্যত হতেই পদ্মজা বললো, ‘আমাকে তালাক দিন। আমি আপনার বউয়ের পরিচয়ে আর থাকতে চাই না।’পদ্মজার কথা শোনামাত্র আমিরের বুকটা কেঁপে উঠলো। কোথেকে যেনো একটা উত্তাল ঢেউ এসে মনের সমস্ত কিনার ওলট-পালট করে দিল। আমির কথা বলতে গিয়ে দেখলো কথা আসছে না। পদ্মজা আরো একবার চেঁচিয়ে বললো, ‘আমার তালাক চাই। আপনার বউ হওয়া কলঙ্কের।’আমির অনেক কষ্টে কয়টা শব্দ উচ্চারণ করলো, ‘থাক না এক-দুটো কলঙ্ক।’পদ্মজা সেকেন্ড তিনেক ছলছল চোখে তাকিয়ে রইলো। তারপর মুহূর্তে ভুলে যায় পৃথিবী। ভুলে যায় পাপ-পুণ্য। ঝড়ের গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমিরের বুকে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। ছেড়ে দিলে যদি হারিয়ে যায়! আমিরের বুকের সোয়েটার কামড়ে ধরে কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে বললো, ‘ চলুন না, দূরে পালিয়ে যাই। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।’পদ্মজা জড়িয়ে ধরতেই আমিরের শরীরের রক্ত চলাচল থেমে যায়। অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে। সেই জল ফুটন্ত পানির মতো গরম। এ যেন দগ্ধ হওয়া হৃদয়ের আঁচ!
হৃদয়ের প্রলয়ঙ্করী ঝড় ক্ষণমুহূর্তের জন্য থামিয়ে আমির বললো, ‘ ছাড়ো পদ্মজা।’পদ্মজার কান্না থেমে যায়! হাত দুটি আমিরের পিঠ থেকে সরে যায়। পদ্মজা তার জলভরা নয়ন দুটি মেলে আমিরের দিকে তাকালো। তার রক্ত জবা ঠোঁট দুটি কাঁপছে। হোঁচট খাওয়া গলায় পদ্মজা বললো, ‘ আমার হৃদয়ের আকুলতা আপনাকে ছুঁতে পারছে না?’আমির ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছে। পদ্মজা দূরে সরে দাঁড়ালো। আমিরের কৃষ্ণ মুখে, বিপর্যস্ত পদ্মজার নিষ্কম্প স্থির চোখের দৃষ্টি থমকে আছে। পদ্মজা থেমে থেমে বললো, ‘ তাহলে আমি…আমিও বঞ্চিত ভালোবাসা থেকে!’পদ্মজার দুই চোখ বেয়ে জল পড়ছে। আমির আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। চোখের পলকে প্রস্থান করলো। পদ্মজা ধাতস্থ হয়ে আচমকা ক্ষুধার্ত বাঘিনীর মতো চিৎকার করে উঠলো, ‘ ধিক্কার নিজের উপর! জানোয়ারকে মানুষ হওয়ার সুযোগ দিয়েছি! ধিক্কার নিজের ভালোবাসার উপর! প্রতিটি কাজের জন্য আপনি শাস্তি পাবেন। আমি আপনার আজরাইল হবো।’পদ্মজার গলার হাড় ভেসে উঠে। তার চিৎকার অন্দরমহলকে কাঁপিয়ে তুলে। কাঁদতে-কাঁদতে সে মেঝেতে বসে পড়লো। আমিরের প্রত্যাখ্যান তার ভালোবাসাকে ক্রোধে পরিণত করছে। পদ্মজা রাগে বিছানার চাদর টেনে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেললো। বুকের ভেতরটা পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে! ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ! পানি প্রয়োজন!ফরিনার কবরের চারপাশে বাঁশের বেড়া দেয়া হয়েছে। আমির ফরিনার কবরের পাশে এসে বসলো। হাতের ব্যাগটা পাশে রেখে বেড়ার ফাঁক দিয়ে ফরিনার কবরে হাত বুলিয়ে দিল। গাঢ় স্বরে ডাকলো, ‘আম্মা! আমার আম্মা।’চারিদিকে নিস্তব্ধতা। অন্দরমহল থেকে কোনো শব্দ আসছে না। নিস্তব্ধতা ভেঙে- ভেঙে মাঝেমধ্যে পাতার ফাঁকেফাঁকে পাখ-পাখালির ডানা নাড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমিরের ঠোঁট দুটো কিছু বলতে চাইছে কিন্তু পারছে না। অথবা সে কিছু বলছে কিন্তু শব্দ হচ্ছে না। আড়ষ্টতা ঘিরে রেখেছে তাকে। সে তার মৃত মা’কে কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। আমির অনেকক্ষণ নতজানু হয়ে চুপচাপ বসে রইলো। তারপর উঠে দাঁড়ালো। ব্যাগ হাতে নিয়ে পাতালঘরের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করে। লতিফা অন্দরমহল থেকে অস্থির হয়ে বের হয়। তার হাঁটায় তাড়াহুড়ো।আমির ডাকলো, ‘ লুতু।’লতিফা দাঁড়াল। আমির বললো, ‘ পদ্মজার খেয়াল রাখবি। খাওয়া-দাওয়া ঠিকঠাক রাখবি। আর, যখন যা বলে করবি।’লতিফা মাথা নাড়াল। আমির প্রশ্ন করলো, ‘কোথায় যাচ্ছিস?’আমিরের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে লতিফা বললো, ‘ ভাইজান,তোমারে কিছু কইতাম।’‘বল।’‘মৃদুল ভাইজানে আর তার আম্মা-আব্বা আইছিলো। মৃদুল ভাইজানের আম্মা মৃদুল ভাইজানরে পূর্ণার লগে বিয়া করাইতে রাজি হয় নাই। ‘আমির কপাল কুঁচকাল। বললো, ‘কী সমস্যা? কেন রাজি হয়নি?’রিদওয়ান অন্দরমহল থেকে বের হয়ে ফোড়ন কাটলো, ‘আমির,তোর সাথে কথা আছে।’আমির পিছনে ফিরে তাকালো না। বললো, ‘পরে শুনব।’রিদওয়ান বললো, ‘আমি জানি কেন রাজি হয়নি। আয়,ওদিকে যেতে যেতে বলি।’লতিফা রিদওয়ানের দিকে তাকায়। রিদওয়ান তার চোখের দৃষ্টি দিয়ে লতিফাকে সতর্ক করে। আমির রিদওয়ানের দিকে ফিরে বিরক্তি নিয়ে বললো, ‘ আরে ভাই,যা তো। লুতু কী কী হয়েছে বলতো?’রিদওয়ানের সামনে রিদওয়ান সম্পর্কে কিছু বলার সাহস লতিফার হলো না। সে বললো, ‘ মৃদুল ভাইজানের আম্মা পূর্ণার গায়ের রঙ পছন্দ করে নাই। কইছে,কালা ছেড়ি ঘরে নিব না।’আমির রাগ নিয়ে বললো, ‘ফালতু মহিলা! পূর্ণা জানে? কোথায় পূর্ণা?’‘হ জানে। এই বাড়িত আছিলো। এহন হেই বাড়িত গেছে।’‘মৃদুল…মৃদুল কী বললো?’লতিফা পুরো ঘটনা খুলে বললো। এড়িয়ে গেল পদ্মজার ব্যাপারটা। সে মনে মনে পরিকল্পনা করলো,রাতে যদি রিদওয়ান অন্দরমহলে থাকে সে পাতালঘরে গিয়ে আমিরকে সব বলবে। আমির সব শুনে বললো, ‘ মৃদুল ছাড়া এই পরিস্থিতি ঠিক হবে না। দেখা যাক,ও কী সিদ্ধান্ত নেয়। আর ওই মুখছুটা মহিলাকে আমি একবার পাই শুধু!’আমির রাগে গজগজ করতে করতে সামনে এগিয়ে যায়। রিদওয়ান লতিফাকে চাপা স্বরে হুমকি দিল, ‘ গতকালের ঘটনা যদি আমিরের কানে যায় তোর খবর আছে। ল্যাং* করে গাছে ঝুলিয়ে রাখবো।’লতিফা চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলে। বললো, ‘ বাড়ির বাইরে গেলেই আমির ভাইজানে সব জাইননা যাইব। তহন ?’লতিফার প্রশ্ন শুনে রিদওয়ান চিন্তায় পড়ে যায়। সে আমিরের পিছনে যেতে যেতে ভাবতে থাকে,এই পরিস্থিতি কী করে সামাল দিবে! আজ না হয় কাল আমির তো সব জানবে! আমির জঙ্গলে প্রবেশ করে রিদওয়ানকে বললো, ‘ কী কথা না বলবি!’রিদওয়ান বললো, ‘ শনিবার রাতে ভোজ আসর হবে। চাচা সিদ্ধান্ত নিল।’‘আচ্ছা।’‘ছাগলের মাংস পুড়ানো হবে।’‘কয়টা?’‘দুটো।’‘বিরাট আয়োজন!’দুজন কথা বলতে বলতে পাতালঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। রিদওয়ান ঘাস সরিয়ে দরজা খুললো। এক পা সিঁড়িতে দিতেই আমির রিদওয়ানের কাঁধ চেপে ধরলো। ফিসফিসিয়ে বললো, ‘এখানে কেউ আছে!’আমিরের কথা শুনে রিদওয়ানের বুক ছ্যাঁত করে উঠলো। এমতাবস্থায় কে দেখে ফেললো! রিদওয়ান চারপাশে চোখ বুলায়। কোথাও কেউ নেই! আমিরের প্রখরতা নিয়ে তাদের কোনো সন্দেহ নেই। আমির যেহেতু বলেছে এখানে কেউ আছে। মানে আছে। রিদওয়ান চাপাস্বরে বললো, ‘এখন কী করব?’আমির দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যাক্তি। সে চারপাশে আরো একবার চোখ বুলিয়ে বললো, ‘ কেউ এখানে থাকলে সে ডান দিকে আছে।’রিদওয়ান ডান দিকে এগিয়ে যায়। তখনই একজন লোক ঝোপঝাড়ের মাঝখান থেকে উঠে দৌড়াতে শুরু করে। রিদওয়ান উল্কার গতিতে তাকে ধরে ফেললো। লোকটার মাথায় চুল নেই। পরনে লুঙ্গি আর ফতুয়া। পাটকাঠির মতো চিকন লোকটা ইয়াকুব আলীর সহকারী পলাশ মিয়া। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি অথবা ত্রিশই। রিদওয়ান পলাশকে ঘাড়ে ধরে আমিরের সামনে নিয়ে আসে। দেখে মনে হচ্ছে,রিদওয়ান জীবিত ইঁদুর ধরেছে। আমির পলাশকে প্রশ্ন করলো, ‘ নির্বাচনের তো অনেক দেরি আছে। এখনই আমাদের পিছনে পড়ার রহস্যটা বুঝলাম না।’পলাশ পাতালঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘ এইডা কিতা? এইহানে কিতা করেন আপনেরা?’আমির হাসলো। পলাশের মাথায় টোকা মেরে বললো, ‘ এই দৃশ্য দেখা তোর একদম ঠিক হয়নি। আয়ুটা কমে গেল।’আমির পাতালে নেমে গেল। পলাশ ছটফট করতে থাকে। সে কিছুতেই ভেতরে যাবে না। সে ভয় পাচ্ছে। রিদওয়ান পলাশকে টেনে ভেতরে নিয়ে যায়। আমির বিওয়ানের চেয়ারে এসে বসলো। রিদওয়ান পলাশকে বেঁধে মেঝেতে ফেললো। চিৎকার,চেঁচামেচি করার জন্য পলাশ রিদওয়ানের হাতে দুই-তিনটা থাপ্পড় খেল। পলাশ কাঁদো-কাঁদো হয়ে আমিরকে বললো, ‘ আপনেরা এমন করতাছেন কেন আমার লগে? আমারে ছাইড়া দেন।’রিদওয়ান আমিরকে বললো, ‘তুই সামলা। আমি যাই,চাচার সাথে কথা আছে।’আমির ইশারা করলো, যেতে। রিদওয়ান চলে গেল। পলাশ চারপাশ দেখে ঢোক গিললো। পাতালঘর মৃদু লাল-হলুদ আলোতে ডুবে আছে। কেমন ভূতুড়ে পরিবেশ! তার মনে হচ্ছে,সে কবরে আছে। আর সামনে ঘাড় বাঁকিয়ে বসে আছে স্বয়ং যমদূত! আমির এক পা চেয়ারে তুলে বললো, ‘ তারপর,পলাশ মিয়ার এখানে কোন দরকারে আসা হয়েছে?’পলাশ হাতজোড় করে বললো, ‘আমারে ছাইড়া দেন। আমি এমন কবর আর দেহি নাই। আমার কইলজাডা কাঁপতাছে।’আমির ধমকে বললো, ‘এখানে আসছিলি কেন?’পলাশ দ্রুত বললো, ‘ ইয়াকুব চাচা পাডাইছে।’‘কোন দরকারে?’‘আমারে খালি কইছে,মজিদ মাতব্বরের বাড়িত যা। আমার মনে হইতাছে ওই বাড়িত কিছু একটা গোলমাল আছে। কিছু যদি বাইর করতে পারছ তোরে আরেকটা বিয়া দিয়া দিয়াম।’আমির চমকাল। বললো, ‘উনার হুট করে কেন মনে হলো এখানে গোলমাল আছে?’পলাশ কেঁদে বললো, ‘আমি এইডা জানি না ভাই। আমারে ছাইড়া দেন।’আমিরের মাথায় কয়েকটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়ে যায়। কী এমন হলো যে, ইয়াকুব আলী হাওলাদার বাড়ি নিয়ে সন্দেহ করছে! আমির আয়েশি ভঙ্গিতে বসলো। বললো, ‘ শুনেছি,গত বছর তোর বউকে নাকি হিন্দু এক জমিদারের কিনে নিয়েছে । তারপর তোর বউ আত্মহত্যা করলো! সত্যি?’পলাশ মেঝেতে কপাল ঠেকিয়ে বললো, ‘ভাই,আমারে মাফ কইরা দেন। আমি ভুল করছিলাম। আমারে ছাইড়া দেন। আমি কেউরে কিছু কইতাম না।’আমির বললো, ‘তুইতো ভাই আমার চাইতেও খারাপ। আচ্ছা,সবসময় তো পাপ কাজ করেছি। আজ একটা ভালো কাজ করার সুযোগ যখন পেয়েছি,করে ফেলি।’পলাশের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠে। সে জানে না,এই কবরস্থানের মতো বড় ঘরটায় কী হয়! কিন্তু এখানে যে ভালো কিছু হয় না বুঝা যাচ্ছে। বাঁচতে পারলে পরে এর রহস্য বের করা যাবে। আমির চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পলাশের মুখে জোরে লাথি দিল। পলাশ আর্তনাদ করে শুয়ে পড়ে। আমির চারিদিকে চোখ বুলিয়েও কোনো অস্ত্র পেল না। সে টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা কাঁচি বের করলো। ধারালো কাঁচি। সে কাঁচি দিয়ে পলাশের মুখে আঁচড় কাটে। হাতে-পায়ে,শরীরে আঁচড় কাটে। পলাশের বিদঘুটে চিৎকার পাতালঘরেই চাপা পড়ে যায়। তার চামড়া ছিঁড়ে রক্ত ঝরতে থাকে। আমিরকে আব্বা ডেকে অনুরোধ করে,তাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু সে জানে না, আমির কখনো তার শিকারের প্রতি মায়া দেখায় না। আমির পলাশের পাশে বসলো। দুই-তিনবার মাথা ঘুরাল। খুব নিঃস্ব লাগছে নিজেকে,মাথাটা ফাঁকা লাগছে। সে কাঁচি দিয়ে নিজের হাতে হেঁচকা টান মারে। সাথে-সাথে হাত থেকে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে আসে। পলাশ আমিরের কাণ্ড দেখে চমকে যায়। আমির কাঁচি রেখে মেঝেতে শুয়ে পড়ে। শূন্যে চোখ রেখে হাসে। হাসতে হাসতে গড়াগড়ি করে দেয়ালের পাশে যায়। ভয়ে পলাশের আত্মা কেঁপে উঠে! আমির দেয়ালের পাশ ঘেঁষে বসে। পলাশের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে উঠে। হঠাৎ করে তার কী হয়ে গেল? আমিরের উন্মাদ আচরণ দেখে পলাশের গায়ের পশম দাঁড়িয়ে পড়ে। আমির চট করেই উঠে দাঁড়াল। পলাশকে টেনে বসালো। তারপর নিজে গিয়ে চেয়ারে বসলো।ব্যাগ থেকে কাগজে মুড়ানো বস্তুটি বের করলো। কাগজের ভাঁজ খুলতেই একটা লাল বেনারসি বেরিয়ে আসে। আমির লাল বেনারসি গায়ে জড়িয়ে নিয়ে পলাশকে বললো, ‘আমার আম্মা ছোটবেলা একটা গল্প বলতেন,এক রাজা প্রতি রাতে বিয়ে করে প্রতি রাতেই বউকে খুন করতেন। তারপর শেষদিকে যে রানিকে বিয়ে করেন সেই রানি রাতজেগে রাজাকে গল্প শোনাতেন। গল্প শেষ হতো না বলে রাজাও রানিকে খুন করতে পারতেন না। রানি এভাবে গল্প বলে-বলে অনেকদিন বেঁচে ছিলেন। এখন আমি তোকে একটা গল্প শোনাব। আমাদের নিয়ম হচ্ছে,যতক্ষণ আমার গল্প চলবে ততক্ষণ তুই বেঁচে থাকবি। গল্প শেষ তোর আয়ুও শেষ।’পলাশ হাতজোড় করে আকুতি-মিনতি করলো, ‘ ভাই,আমার জীবন ভিক্ষা দেন। আপনেরা তো ভালা মানুষ ভাই। আপনেরার অনেক নাম। আমারে কেন মারতে চাইতাছেন? আমারে ছাইড়া দেন ভাই।’পলাশের কথায় আমিরের ভাবান্তর হলো না। সে বেনারসি থেকে ঘ্রাণ নেয়ার চেষ্টা করলো। তারপর শূন্যে চোখ রেখে ঘোর লাগা গলায় বললো, ‘ এক ছিল দুষ্টু রাজা! নারী আর টাকার প্রতি ছিল তার চরম আসক্তি। যে নারী একবার তার বিছানায় যেত তার পরের দিন সে লাশ হয়ে নদীতে ভেসে যেত। রাজা এক নারীকে দ্বিতীয়বার ছুঁতে পছন্দ করতো না। কিন্তু সমাজে ছিল রাজার বেশ নামডাক! সবার চোখের মণি। খুন করা ছিল তার নিত্যদিনের সঙ্গী। তার কালো হাতের ছোঁয়ায় বিসর্জন হয়েছে হাজারো নারী। প্রতিটি বিসর্জন রাজার জন্য ছিল তৃপ্তিকর। তাকে শাস্তি দেয়ার মতো কোনো অস্ত্র ছিল না পৃথিবীতে। ভাইয়ের সাথে বাজি ধরে হেরে যায় রাজা। শর্তমতে,ভাইয়ের জন্য এক রাজকন্যাকে অপহরণ করতে যায়। সেদিন ছিল বৃষ্টি। সন্ধ্যার আগ মুহূর্ত। রাজকন্যার প্রাসাদে সেদিন কেউ ছিল না। রাজা এক কামরায় ওৎ পেতে থাকে। রাজকন্যা আসলেই তাকে তার কালো হাতে অপবিত্র করে দিবে। কামড়ায় ছিল ইষৎ আলো। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর সেই কাঙ্খিত মুহূর্ত আসে। রাজকন্যার পা পড়ে কামড়ায়। রাজকন্যা রাজাকে দেখে চমকে যায়। ভয় পেয়ে যায়। কাঁপা স্বরে প্রশ্ন করে ‘‘কে আপনি? খালি বাড়িতে কেন ঢুকেছেন?’ সেই কণ্ঠ যেন কোনো কণ্ঠ ছিল না। ধনুকের ছোঁড়া তীর ছিল। রাজার বুক ছিঁড়ে সেই তীর ঢুকে পড়ে। রিনঝিনে গলার রাজকন্যাকে দেখতে রাজা আগুন জ্বালাল। আগুনের হলুদ আলোয় রাজকন্যার অপরূপ মায়াবী সুন্দর মুখশ্রী দেখে রাজা মুগ্ধ হয়ে যায়। তার পা দুটো থমকে যায়। রাজকন্যা যেন এক গোলাপের বাগান। যার সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ে রাজার কালো অন্তরে। রাজা কী আর তখন বুঝেছিল,সৃষ্টিকর্তা তাকে তার পাপের শাস্তি দেয়ার জন্য সেদিন অস্ত্র পাঠিয়েছিল!’আমির পলাশের দিকে তাকিয়ে হাসলো। কী মায়া সেই হাসিতে! মায়াভরা সেই হাসি প্রমাণ করে দিল,সেদিনটার জন্য সে কতোটা খুশি!
ঘটনাবলি১২৪১ - লিইয়েগনিটয যুদ্ধে মোঙ্গল বাহিনী পোলিশ এবং জার্মান সেনাদের পরাজিত করে। ১৪১৩ - পঞ্চম হেনরি ইংল্যান্ডের রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হন। ১৪৪০ - ক্রিস্টোফার ডেনমার্কের রাজা হন। ১৪৮৩ - প্রথম অ্যাডওয়ার্ড চতুর্থ অ্যাডওয়ার্ডকে ইংল্যান্ডের পরবর্তী রাজা হিসেবে নির্বাচিত করেন। ১৭৮৩ - টিপু সুলতান ব্রিটিশদের কাছ থেকে বেন্দোর দখল করে নেন। ১৭৫৬ - নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা বা মির্জা মুহাম্মাদ সিরাজ-উদ-দৌলা রাজ্যভার গ্রহণ করেন। ১৮৭২ - স্যামুয়েল আর পার্সি গুঁড়া দুধ প্যাটেন্ট করেন। ১৯১৮ - লাটভিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১৯২৮ - তুরস্কে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৪০ - দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘অপারেশন ওয়েসেরুবুং’ জার্মানরা ডেনমার্ক ও নরওয়ে আক্রমণ করে। ১৯৪৫ - যুক্তরাষ্ট্রে আণবিক শক্তি কমিশন গঠন করা হয়। ১৯৪৮ - বায়তুল মোকাদ্দাসারের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত দিরইয়াসিন গ্রামে ইসরাইলিরা ব্যাপক গণহত্যা চালায়। ১৯৫৭ - সুয়েজখাল সব ধরনের জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হয়। ১৯৬৫ - ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৭৪ - দিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীকে প্রত্যর্পণের চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ১৯৯১ - জর্জিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পক্ষে ভোট দেয়। ১৯৯৭ - বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আইসিসি ট্রফিতে স্কটল্যান্ডকে পরাজিত করে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। ১৯৯৮ - সৌদি আরবে হজের শেষ দিনে ভিড়ের চাপে পদদলিত হয়ে ১৫০ জন মুসল্লির মৃত্যু হয়। জন্ম ১২৮৭ - ইংল্যান্ডের রাজা চতুর্থ অ্যাডওয়ার্ড। ১৮০৬ - ইসাম্বারড কিংডম ব্রুনেল, ইংরেজ প্রকৌশলী ও ক্লিফটন সাসপেনশন ব্রিজ পরিকল্পক। ১৮২১ - ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার। ১৮৩০ - এয়াড্বেয়ারড মুয়ব্রিডগে, ইংরেজ ফটোগ্রাফার ও সিনেমাটোগ্রাফার। ১৮৩৫ - বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপল্ড। ১৮৬৫ - এরিক লুডেন্ডোরফ, জার্মান জেনারেল ও রাজনীতিবিদ। ১৮৬৭ - ক্রিস ওয়াটসন, চিলির বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলীয় সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ ও ৩য় প্রধানমন্ত্রী। ১৮৭২ - লিও বলুম, ফরাসি আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও প্রধানমন্ত্রী। ১৮৮২ - ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী ও সমাজসেবক মহিমচন্দ্র দাশগুপ্ত। ১৮৯৩ - রাহুল সাংকৃত্যায়ন ভারতের সুপণ্ডিত ও স্বনামধন্য পর্যটক। ১৯০১ - পল উইলিয়ামস, মার্কিন অভিনেতা ও পরিচালক। ১৯২৫ - রোকনুজ্জামান খান বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিকে ও সাংবাদিক। ১৯২৬ - হিউ হেফ্নার, মার্কিন প্রকাশক এবং প্লেবয় পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক। ১৯৩৮ - ভিক্টর চেরনোম্যরডিন, রাশিয়ান ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও ৩০তম প্রধানমন্ত্রী। ১৯৪৮ - জয়া বচ্চন, ভারতীয় অভিনেত্রী ও রাজনীতিবিদ। ১৯৫৩ - ভবানীপ্রসাদ মজুমদার, ভারতীয় বাঙালি কবি ও ছড়াকার। ১৯৫৭ - সেভে বালেস্টেরস, স্প্যানিশ গল্ফ খেলোয়াড় ও স্থপতি। ১৯৬৬ - সিনথিয়া নিক্সন, মার্কিন অভিনেত্রী। ১৯৭৫ - রবি ফাওলার, সাবেক ইংরেজ ফুটবলার ও ম্যানেজার। ১৯৮৫ - আন্তোনিও নকেরিনো, ইতালিয়ান ফুটবলার। মৃত্যু ৫৮৫ - সম্রাট জিমু, জাপানি সম্রাট। ৪৯১ - যেনো, বাইজেন্টাইন সম্রাট। ১৫৫৩ - ফ্রাঁসোয়া রাবলে, ফরাসি সন্ন্যাসী ও পণ্ডিত। ১৫৫৭ - মিকায়েল আগ্রিকলা, ফিনিশ যাজক ও পণ্ডিত। ১৬২৬ - ফ্রান্সিস বেকন, ইংরেজ দার্শনিক। ১৭৫৪ - ক্রিস্টিয়ান উলফের, জার্মান দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ। ১৭৫৬ - নবাব আলীবর্দী খাঁ, বাংলা, বিহার, ওড়িশার নবাব। ১৮৮২ - ডান্টে গ্যাব্রিয়েল রসেটি, ইংরেজ চিত্রশিল্পী, চিত্রকর ও কবি। ১৮৮৯ - মাইকেল ইউজিনে শেভরেউল, ফরাসি রসায়নবিদ ও শিক্ষাবিদ। ১৯৩৬ - ফেরডিনান্ড টনিয়েস, জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিক। ১৯৪৫ - ডিয়েট্রিখ বোনহোফের, জার্মান যাজক ও ধর্মতত্ত্ববিদ। উইলহেম কানারিস, জার্মান নৌসেনাপতি। ১৯৫৯ - ফ্র্যাংক লয়েড রাইট, মার্কিন স্থপতি, ইন্টেরিওর ডিজাইনার, লেখক ও শিক্ষক। ১৯৭০ - প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি রসায়ন বিজ্ঞানী জ্ঞানেন্দ্রনাথ রায়। ১৯৮০ - মোহাম্মদ বাকির আল-সাদর, ইরাকি দার্শনিক। ১৯৯৩ - ইরানের বিখ্যাত শিল্পী ও লেখক সাইয়্যেদ মোর্তজা আয়ুবী শাহাদাত। ২০০১ - শাকুর রানা, পাকিস্তানি আম্পায়ার। ২০০৯ - শক্তি সামন্ত, ভারতীয় বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক। ২০১১ - সিডনি লুমেট, মার্কিন পরিচালক, প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার। ২০২১ - পবিত্র মুখোপাধ্যায়, বাঙালি কবি।
মেষ রাশি: বন্ধুদের সঙ্গে আজকের দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে। আর্থিক দিক থেকে আজকের দিনটি খুব একটা ভালো নয়। আত্মীয়দের সঙ্গে আজ আপনার কোথাও ছোট সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। যার ফলে আপনি দৈনিক কাজের সূচি থেকে বিরতি পাবেন। মন থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখুন। প্রেমের জন্য এই দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। কর্মক্ষেত্রের দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে। আজ আপনি নিজের জন্য কিছুটা সময় পাবেন। সেই সময়ে আপনি একটি বই পড়তে পারেন অথবা গান শুনতে পারেন। আজকের দিনটি আপনার বিবাহিত জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে বিবেচিত হবে।প্রতিকার: আর্থিক দিক থেকে উন্নতির লক্ষ্যে দৈনন্দিন শিবলিঙ্গের অভিষেক ঘটান।বৃষ রাশি: কোথাও অর্থ বিনিয়োগ করার আগে আজ অবশ্যই অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করুন। পরিবারের সদস্য এবং বন্ধুদের সঙ্গে আজকের দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে। প্রেমের জীবনে আজ আপনি একটি চমকের সম্মুখীন হবেন। কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি কাজ সর্তকতার সঙ্গে করুন। সামগ্রিকভাবে দিনটি অত্যন্ত ব্যস্ততার মধ্যে অতিবাহিত হওয়ায় আপনি নিজের জন্য সময় পাবেন না। জীবনসঙ্গীর সঙ্গে দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে।প্রতিকার: ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে উন্নতির লক্ষ্যে অবশ্যই অভাবী শিশু কন্যাদের উদ্দেশ্যে দুধের প্যাকেট দান করুন।মিথুন রাশি: শরীরের প্রতি অবশ্যই যত্নশীল হন এবং শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে অতিরিক্ত খাওয়া-দাওয়া এড়িয়ে চলুন। নিজের ওজনকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রাখুন। এই রাশির কিছু জাতক-জাতিকা আজ চাকরি পেতে পারেন। যার ফলে তাঁদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে। বন্ধুদের কাছ থেকে আজ আপনি একটি কাজে সাহায্য পেতে পারেন। প্রেমের জীবনে আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। কর্মক্ষেত্রে দিনটি খুব একটা খারাপ কাটবে না। যাঁরা কিছুদিন ধরে অত্যন্ত ব্যস্ততার মধ্যে ছিলেন তাঁরা আজ নিজেদের জন্য অবসর সময় পাবেন। বিবাহিত জীবনে কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে নিজেরাই তা মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন।প্রতিকার: প্রেমের জীবন সুখকর করে তোলার লক্ষ্যে পকেটে একটি সুগন্ধি রুমাল রাখুন।কর্কট রাশি: প্রত্যেকের সঙ্গে আজ অবশ্যই ঠান্ডা মাথায় কথা বলুন। আপনার নামে একটি ভুল সিদ্ধান্ত আজ আপনাকে বিপরীতভাবে প্রভাবিত করতে পারে। যার ফলে আপনার মানসিক চাপ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। আপনি আজ একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে আর্থিক লেনদেন এবং অর্থ সঞ্চয় সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ পাবেন। সেগুলিকে সঠিকভাবে কাজে লাগালে আপনার লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পুরনো বন্ধুদের কাছ থেকে আজ আপনি একটি কাজে সাহায্য পেতে পারেন। প্রেমের জন্য এই দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। আপনি আজ খুব সহজে কিছু নতুন জিনিস শিখতে পারবেন। পরিবারের সব থেকে ছোট সদস্যকে নিয়ে আপনি আজ একটি পার্কে অথবা শপিং মলে যেতে পারেন। বিবাহিত জীবন নিঃসন্দেহে সুখের হবে।প্রতিকার: শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে দুধ এবং দই খান।সিংহ রাশি: কাউকে অর্থ ধার দেওয়া থেকে অবশ্যই বিরত থাকুন। পাশাপাশি, যদি ঋণ দিতেই হয় সেক্ষেত্রে লিখিত প্রমাণ রাখুন। সন্তানদের স্বাস্থ্যের প্রতি অবশ্যই নজর দিন। বিদেশে পেশাগত যোগাযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। প্রেমের জীবনে আজ আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। আপনার আজ কোথাও আনন্দদায়ক সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। বিবাহিত জীবনে কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে নিজেরাই তা মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন।প্রতিকার: পারিবারিক জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে একজন কন্যাকে ক্ষীর অথবা পায়েস খেতে দিন।কন্যা রাশি: মন থেকে অবশ্যই সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখুন। আর্থিক দিক থেকে আজকের দিনটি খুব একটা খারাপ নয়। যাঁদের সঙ্গে আপনার অত্যন্ত কম সাক্ষাৎ হয় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। প্রেমের জীবনে আজ আপনি একটি চমকের সম্মুখীন হবেন। আপনার নেওয়া একটি দৃঢ় পদক্ষেপ আজ ইতিবাচক ফলপ্রদান করবে। বিবাহিত জীবনে অবশ্যই কিছুটা সময় দিন।প্রতিকার: শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে গম, গোটা লাল মসুর এবং লাল রঙের সিঁদুর মিশিয়ে সূর্যস্নান করুন।তুলা রাশি: কর্মক্ষেত্রের অতিরিক্ত চাপ এবং বাড়িতে চলা একটি বিরোধের কারণে আজ আপনার মেজাজ খিটখিটে হয়ে উঠবে। প্রত্যেকের সঙ্গে অবশ্যই ঠান্ডা মাথায় কথা বলুন। আর্থিক দিক থেকে আজকের দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। এই রাশির কিছু অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের একটি পুরস্কার গ্রহনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়ে অত্যন্ত খুশি হবেন। কর্মক্ষেত্রে দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে। আপনি আজ আপনার একটি অসুবিধার কথা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন। যার ফলে বিষয়টির সমাধান হয়ে যাবে। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: আর্থিক দিক থেকে উন্নতির লক্ষ্যে আপনার ক্রয়ক্ষমতা অনুসারে সোনা কিনে তা পরিধান করুন।বৃশ্চিক রাশি: মন থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখুন। মন ভালো রাখার জন্য আজ আপনি কিছু আকর্ষণীয় বই পড়তে পারেন। দীর্ঘস্থায়ী লাভের জন্য আপনি আজ কোনও শেয়ারে অথবা মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন। বাবা মায়ের স্বাস্থ্যের প্রতি অবশ্যই নজর দিন। ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে আজ আপনি কোথাও পিকনিকে যেতে পারেন। সেখানে গিয়ে কিছু মূল্যবান স্মৃতির সঞ্চয় ঘটবে। কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি কাজ সতর্কতার সঙ্গে করুন। আজ নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করে আপনার মধ্যে থাকা ঘাটতিগুলি পূরণ করার চেষ্টা করুন। এর ফলে আপনার ব্যক্তিত্বে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিবাহিত জীবন নিঃসন্দেহে সুখের হবে।প্রতিকার: পারিবারিক জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে গরুকে খাবার খেতে দিন।ধনু রাশি: নিজের উপার্জন ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অবশ্যই চেষ্টা করুন। বিদেশে থাকেন এমন একজন আত্মীয়ের কাছ থেকে আজ আপনি একটি উপহার পেতে পারেন। যার ফলে আপনার মন ভালো হয়ে যাবে। প্রেমের জীবনে আজ আপনি একটি চমকের সম্মুখীন হবেন। আজ আপনার সঙ্গে একটি আকর্ষণীয় ঘটনা ঘটতে পারে। সামগ্রিকভাবে দিনটি খুব একটা খারাপ কাটবে না। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: আর্থিক দিক থেকে উন্নতির লক্ষ্যে বৃহন্নলাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন।মকর রাশি: শরীর নিয়ে অযথা চিন্তা করবেন না। কারণ, আজ আপনি শারীরিক দিক থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ থাকবেন। আপনার আজ জমি সংক্রান্ত বিষয়ে অর্থব্যয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। কোনও নতুন প্রকল্পে অংশগ্রহণ করার আগে সমস্ত তথ্য ভালোভাবে জেনে নেওয়ার চেষ্টা করুন। নিজের মূল্যবান জিনিসপত্রগুলি আজ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে রাখুন। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে এবং কেরিয়ারে উন্নতির লক্ষ্যে ময়ূরের পালক বাড়িতে রাখুন।কুম্ভ রাশি: মন থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখুন। শরীরের প্রতি অবশ্যই যত্নশীল হন। বাবার কাছ থেকে পাওয়া একটি পরামর্শকে কর্মক্ষেত্রে সঠিকভাবে কাজে লাগালে আপনার লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে ঠান্ডা মাথায় সেটিকে সমাধানের চেষ্টা করুন। ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে সংযত হয়ে কথা বলুন। আপনি আজ ভাই-বোনের সঙ্গে বাড়িতে একটি সিনেমা কিংবা প্রতিযোগিতা দেখতে পারেন। বিবাহিত জীবনে কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলেও পরে তা ঠিক হয়ে যাবে।প্রতিকার: শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে শোয়ার ঘরে ক্রিস্টালের বল রাখুন।মীন রাশি: এই রাশির কিছু জাতক-জাতিকা আজ চাকরি পেতে পারেন। যার ফলে তাঁরা আর্থিক দিক থেকে লাভবান হবেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আজ আপনি আপনার একটি সমস্যার কথা ভাগ করে নিতে পারেন। আপনার অহঙ্কার মানসিকতাকে অবশ্যই দূরে সরিয়ে রাখুন। প্রেমের জীবনে আজ আপনি একটি চমকের সম্মুখীন হবেন। আপনি আজ অবসর সময়ে একটি ওয়েব সিরিজ দেখতে পারেন। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: দাম্পত্য জীবন সুখকর করে তোলার লক্ষ্যে খাবারে জাফরানের ব্যবহার করুন।
পিএসএলে আজ দুটি ম্যাচ। আছে আইপিএল। রাতে আছে ইউরোপা ও কনফারেন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল।পিএসএলইসলামাবাদ-লাহোরবেলা ৩-৩০ মি., টি স্পোর্টসকরাচি-পেশোয়াররাত ৮টা, টি স্পোর্টসআইপিএলকলকাতা-লক্ষ্ণৌরাত ৮টা, স্টার স্পোর্টস ১, ২ইউরোপা লিগবোলোনিয়া-অ্যাস্টন ভিলারাত ১টা, সনি স্পোর্টস ১পোর্তো-নটিংহামরাত ১টা, সনি স্পোর্টস ২ফ্রাইবুর্গ-সেল্তা ভিগোরাত ১টা, সনি স্পোর্টস ৫কনফারেন্স লিগশাখতার-আলকমাররাত ১টা, সনি স্পোর্টস ৩
এক নিবিড় অরণ্য ছিল। তা’তে ছিল বড় বড় বট, সারি সারি তাল তমাল, পাহাড় পর্ব্বত, আর ছিল—ছোট নদী মালিনী। মালিনীর জল বড়ো স্থির, আয়নার মত; তা’তে গাছের ছায়া, নীল আকাশের ছায়া, রাঙা মেঘের ছায়া, উড়ন্ত পাখীর ছায়া—সকলি দেখা যে’ত। আর দেখা যে’ত গাছের তলায় কতগুলি কুটিরের ছায়া। নদীতীরে যে নিবিড় বন ছিল তা’তে অনেক জীব জন্তু ছিল। কত হাঁস, কত বক, সারাদিন খালের ধারে বিলের জলে ঘুরে বেড়াত। কত ছোট ছোট পাখী, কত টীয়াপাখীর ঝাঁক গাছের ডালে ডালে গান গাইত, কোটরে কোটরে বাসা বাঁধত। দলে দলে হরিণ, ছোট ছোট হরিণ-শিশু, কুশের বনে, ধানের ক্ষেতে, কচি ঘাসের মাঠে খেলা করত। বসন্তে কোকিল গাইত, বর্ষায় ময়ূর নাচত। এই বনে তিন হাজার বৎসরের এক প্রকাণ্ড বটগাছের তলায় মহর্ষি কণ্বদেবের আশ্রম ছিল। সেই আশ্রমে জটাধারী তপন্বী কণ্ব আর মা-গৌতমী ছিলেন, তাঁদের পাতার কুটির ছিল,পরনে বাকল ছিল,গোয়াল-ভরা গাই ছিল, চঞ্চল বাছুর ছিল, আর ছিল বাকল-পরা কত্কগুলি ঋষিকুমার। তা’রা কণ্বদেবের কাছে বেদ পড়ত, মালিনীর জলে তর্পণ করত, গাছের ফলে অতিথিসেবা করত, বনের ফুলে দেবতার অঞ্জলি দিত। আর কী করত?—বনে বনে হোমের কাঠ কুড়িয়ে বেড়াত, কালো গাই ধ’লো গাই মাঠে চরাতে যে’ত। সবুজ মাঠ ছিল তা’তে গাই বাছুর চরে বেড়াত, বনে ছায়া ছিল তা’তে রাখাল-ঋষিরা খেলে বেড়াত। তা’দের ঘর গড়বার বালি ছিল, ময়ূর গড়বার মাটী ছিল, বেণুবাঁশের বাঁশী ছিল, বটপাতার ভেলা ছিল; আর ছিল—খেলবার সাথী বনের হরিণ, গাছের ময়ূর; আর ছিল—মা-গৌতমীর মুখে দেবদানবের যুদ্ধকথা, তাত কণ্বের মুখে মধুর সামবেদ গান। সকলি ছিল, ছিল না কেবল—আঁধার ঘরের মাণিক—ছোট মেয়ে—শকুন্তলা। একদিন নিসুতি রাতে আপ্সরী মেনকা তা’র রূপের ডালি—দুধের বাছা—শকুন্তলা মেয়েকে সেই তপোবনে ফেলে রেখে গেল। বনের পাখীরা তা’কে ডানায় ঢেকে বুকে নিয়ে সারা রাত বসে রইল। বনের পাখীদেরও দয়ামায়া আছে কিন্তু সেই মেনকা পাষাণীর কি কিছু দয়া হ’ল! খুব ভোর বেলায় তপোবনের যত ঋষি-কুমার বনে বনে ফল ফুল কুড়তে গিয়েছিল। তা’রা আমলকীর বনে আমলকী, হরীতকীর বনে হরীতকী, ইংলী ফলের বনে ইংলী কুড়িয়ে নিলে; তার পরে ফুলের বনে পূজার ফুল তুল্তে তুল্তে পাখীদের মাঝে ফুলের মত সুন্দর শকুন্তলা মেয়েকে কুড়িয়ে পেলে। সবাই মিলে তা’কে কোলে করে তাত কণ্বের কাছে নিয়ে এল। তখন সেই সঙ্গে বনের কত পাখী, কত হরিণ, সেই তপোবনে এসে বাসা বাঁধলে। শকুন্তলা সেই তপোবনে, সেই বটের ছায়ায় পাতার কুটীরে, মা-গৌতমীর কোলে-পিঠে মানুষ হতে লাগল। তার পর শকুন্তলার যখন বয়স হ’ল তখন তাত কণ্ব পৃথিবী খুঁজে শকুন্তলার বর আনতে চলে গেলেন। শকুন্তলার হাতে তপোবনের ভার দিয়ে গেলেন। শকুন্তলার আপনার মা-বাপ তা’কে পর করলে, কিন্তু যা’রা পর ছিল তা’রা তা’র আপনার, হল। তাতঃ কণ্ব তা’র আপনার, মা-গৌতমী তা’র আপনার, ঋষিবালকেরা তা’র আপনার ভায়ের মতো, গোয়ালের গাই বাছুর—সেও তা’র আপনার, এমন কি—বনের লতাপাতা তা’রাও তা’র আপনার ছিল। আর ছিল—তা’র বড়ই আপনার দুই প্রিয়সখী—অনসূয়া, প্রিয়ম্বদা; আর ছিল একঢি মা-হারা হরিণ-শিশু—বড়ই ছোট—বড়ই চঞ্চল। তিন সখীর আজকাল অনেক কাজ, ঘরের কাজ, অতিথি সেবার কাজ, সকালে সন্ধ্যায় গাছে জল দেবার কাজ, সহকারে মল্লিকা লতার বিয়ে দেবার কাজ; আর শকুন্তলার দুই সখীর আর একটি কাজ ছিল—তা’রা প্রতিদিন মাধবী-লতায় জল দিত আর ভাব্ত, কবে ওই মাধবীলতায় ফুল ফুটবে, সেই দিন সখী শকুন্তলার বর আস্বে। এ ছাড়া আর কি কাজ ছিল?—হরিণ-শিশুর মত নির্ভয়ে এ-বনে সে-বনে খেলা করা, ভ্রমরের মত লতা-বিতানে গুণ গুণ গল্প করা, নয়তো মরালীর মতো মালিনীর হিম জলে গা ভাসান; আর প্রতিদিন সন্ধ্যার আঁধারে বনপথে বনদেবীর মত তিন সখীতে ঘরে ফিরে আসা,—এই কাজ। একদিন দক্ষিণ বাতাসে সেই কুসুমবনে দেখতে দেখতে প্রিয় মাধবীলতার সর্ব্বাঙ্গ ফুলে ভরে উঠল। আজ সখীর বর আসবে বলে চঞ্চল হরিণীর মতো চঞ্চল অনসূয়া প্রিয়ম্বদা আরো চঞ্চল হ’য়ে উঠল।
যে দেশে ঋষির তপোবন ছিল, সেই দেশের রাজার নাম ছিল—দুষ্মন্ত। সেকালে এতবড় রাজা কেউ ছিল না। তিনি পূব দেশের রাজা, পশ্চিম দেশের রাজা, উত্তর দেশের রাজা, দক্ষিণ দেশের রাজা, সব রাজার রাজা ছিলেন। সাত-সমুদ্র তের-নদী—সব তাঁ’র রাজ্য। পৃথিবীর এক রাজা—রাজা দুষ্মন্ত। তাঁ’ কত সৈন্য সামন্ত ছিল, হাতিশালে কত হাতি ছিল, ঘোড়াশালে কত ঘোড়া ছিল, গাড়ি খানায় কত সোনা রূপার রথ ছিল, রাজমহলে কত দাস দাসী ছিল; দেশ জুড়ে তাঁ’র সুনাম ছিল, ক্রোশ জুড়ে সোনার রাজপুরী ছিল, আর ব্রাহ্মণকুমার মাধব্য সেই রাজার প্রিয় সখা ছিল। যেদিন তপোবনে মল্লিকার ফুল ফুটল সেই দিন সাত-সমুদ্র তের-নদীর রাজা—রাজা দুষ্মন্ত, প্রিয়সখা মাধব্যকে বললেন—“চল বন্ধু, আজ মৃগয়ায় যাই।” মৃগয়ার নামে মাধব্যের যেন জ্বর এল। গরিব ব্রাহ্মণ রাজবাড়িতে রাজার হালে থাকে, দুবেলা থাল থাল লুচি মণ্ডা, ভার ভার ক্ষীর দই দিয়ে মোটা পেট ঠাণ্ডা রাখে, মৃগয়ার নামে বেচারার মুখ এতটুকু হ’য়ে গেল, বাঘ ভালুকের ভয়ে প্রাণ কেঁপে উঠল। ‘না’ বলবার যো কি, রাজার আজ্ঞা! অমনি হাতিশালে হাতি সাজল, ঘোড়াশালে ঘোড়া সাজল, কোমর বেঁধে পালোয়ান এল, বর্ষা হাতে শীকারী এল, ধনুক হাতে ব্যাধ এল, জাল ঘাড়ে জেলে এল। তারপর সারথী রাজার সোনার রথ নিয়ে এল, সিংহদ্বারে সোনার কপাট ঝন্ঝনা দিয়ে খুলে গেল। রাজা সোনার রথে শীকারে চল্লেন। দুপাশে দুই রাজহস্তি চামর ঢোলাতে চল্লো, ছত্রধর রাজছত্র ধরে চল্লো, জয়ঢাক বাজতে বাজতে চল্লো, আর সর্ব্বশেষে প্রিয়সখা মাধব্য এক খোঁড়া ঘোড়ায় হট্হট্ করে চল্লেন। ক্রমে রাজা এ-বন সে-বন ঘুরে শেষ মহাবনে এসে পড়লেন। গাছে গাছে ব্যাধ ফাঁদ পাততে লাগল, খালে বিলে জেলে জাল ফেলতে লাগল, সৈন্য সামন্ত বন ঘিরতে লাগল, বনে সাড়া পড়ে গেল। গাছে গাছে কত পাখী, কত পাখীর ছানা পাতার ফাঁকে ফাঁকে কচি পাতার মত ছোট ডানা নাড়ছিল, রাঙা ফলের মতো ডালে দুলছিল, আকাশে উড়ে যাচ্ছিল, কোটরে ফিরে আসছিল, কিচমিচ করছিল। ব্যাধের সারা পেয়ে, বাসা ফেলে কোটর ছেড়ে, কে কোথায় পালাতে লাগল। মোষ গরমের দিনে ভিজে কাদায় পড়ে ঠাণ্ডা হচ্ছিল, তাড়া পেয়ে—শিং উঁচিয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে গহন বনে পালাতে লাগল। হাতি শুঁড়ে করে জল ছিটিয়ে গা ধুচ্ছিল, শালগাছে গা ঘষছিল, গাছের ডাল ঘুরিয়ে মশা তাড়াচ্ছিল, ভয় পেয়ে—শুঁড় তুলে, পদ্মবন দ’লে, ব্যাধের জাল ছিঁড়ে পালাতে আরম্ভ করলে। বনে বাঘ হাঁকার দিয়ে উঠল, পর্ব্বতে সিংহ গর্জ্জন করে উঠল,সারা বন কেঁপে উঠল। কত পাখী, কত বরা, কত বাঘ, কত ভালুক, কেউ জালে ধরা,পড়ল, কেউ ফাঁদে বাঁধা পড়ল, কেউ বা তলোয়ারে কাটা গেল; বনে হাহাকার, পড়ে গেল। বনের বাঘ বন দিয়ে, জলের কুমীর জল দিয়ে, আকাশের পাখী আকাশ ছেয়ে পালাতে আরম্ভ করলে। ফাঁদ নিয়ে ব্যাধ পাখীর সঙ্গে ছুটল, তীর নিয়ে বীর বাঘের সঙ্গে গেল, জাল ঘাড়ে জেলে মাছের সঙ্গে চল্লো, রাজা সোনার রথে এক হরিণের সঙ্গে ছুটলেন। হরিণ প্রাণভয়ে হাওয়ার মতো রথের আগে দৌড়েছে, সোনার রথ তা’র পাছে বিদ্যুতের বেগে চলেছে। রাজার সৈন্য সামন্ত, হাতি, ঘোড়া, প্রিয়সখা মাধব্য, কতদূরে কোথায় পড়ে রইল। কেবল রাজার রথ আর বনের হরিণ নদীর ধার দিয়ে, বনের ভিতর দিয়ে, মাঠের উপর দিয়ে ছুটে চল্লো। যখন গহন বনে এই শিকার চলছিল তখন সেই তপোবনে সকলে নির্ভয়ে ছিল। গাছের ডালে টীয়াপাখী লাল ঠোঁটে ধান খুঁটছিল, নদীর জলে মনের সুখে হাঁস ভাসছিল, কুশবনে পোষা হরিণ নির্ভয়ে খেলা করছিল; আর শকুন্তলা, অনসূয়া, প্রিয়ম্বদা—তিন সখী কুঞ্জবনে গুন্গুন্ গল্প করছিল। এই তপোবনে সকলে নির্ভয়, কেউ কারো হিংসা করে না। মহাযোগী কণ্বের তপোবনে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায়। হরিণ-শিশু ও সিংহ-শাবক এক বনে খেলা করে। এ বনে রাজাদেরও শিকার করা নিষেধ। রাজার শিকার—সেই হরিণ ঊর্দ্ধশ্বাসে এই তপোবনের ভিতর চলে গেল। রাজাও অমনি ধনুঃশর ফেলে ঋষিদর্শনে চল্লেন। সেই তপোবনে সোনার রথে পৃথিবীর রাজা, আর মাধবীকুঞ্জে রূপসী শকুন্তলা,—দুজনে দেখা হ’ল! এদিকে মাধব্য কী বিপদেই পড়েছে! আর সে পারে না! রাজভোগ নাহলে তা’র চলে না, নরম বিছানা ছাড়া ঘুম হয় না, পাল্কী ছাড়া সে এক পা চলে না, তা’র কি সারাদিন ঘোড়ার পিঠে চড়ে ‘ওই বরা যায়, ওই বাঘ পালায়’ করে এ-বন সে-বন ঘুরে বেড়ান পোষায়? পল্বলের পাতা-পচা কষা জলে কি তা’র তৃষ্ণা ভাঙ্গে? ঠিক সময় রাজভোগ না পেলে সে অন্ধকার দেখে, তা’র কি সারাদিনের পর একটু আধপোড়া মাংসে পেট ভরে? পাতার বিছানায় মশার কামড়ে তা’র কি ঘুম হয়? বনে এসে ব্রাহ্মণ মহা মুষ্কিলে পড়েছে! সমস্ত দিন ঘোড়ার পিঠে ফিরে সর্ব্বাঙ্গে দারুণ ব্যথা, মশার জ্বালায় রাত্রে নিদ্রা নেই, মনে সর্ব্বদা ভয়—ওই ভালুক এল, ওই বুঝি বাঘে ধরলে! ভয়ে ভয়ে বেচারা আধখানা হয়ে গেছে। রাজাকে কত বোঝাচ্ছে—“মহারাজ, রাজ্য ছারেখারে যায়, শরীর মাটী হ’ল, আর কেন? রাজ্যে চলুন।” রাজা তবু শুনলেন না, শকুন্তলাকে দেখে অবধি রাজকার্য্য ছেড়ে, মৃগয়া ছেড়ে, তপস্বীর মতো সেই তপোবনে রইলেন। রাজ্যে রাজার মা ব্রত করেছেন, রাজাকে ডেকে পাঠালেন, তবু রাজ্যে ফিরলেন না, কত ওজর আপত্তি করে মাধব্যকে সব সৈন্য সামন্ত সঙ্গে মা’র কাছে পাঠিয়ে দিয়ে একলা সেই তপোবনে রইলেন। মাধব্য রাজবাড়িতে মনের আনন্দে রাজার হালে আছে, আর এদিকে পৃথিবীর রাজা বনবাসীর মতো বনে বনে “হা শকুন্তলা যো শকুন্তলা!” ব’লে ফিরছে। হাতের ধনুক,তূণের বাণ কোন্ বনে পড়ে আছে! রাজবেশ নদীর জলে ভেসে গেছে, সোণার অঙ্গ কালি হোয়েছে। দেশের রাজা বনে ফিরছে! আর শকুন্তলা কী করছে?—নিকুঞ্জবনে পদ্মের বিছানায় বসে পদ্মপাতায় মহারাজাকে মনের কথা লিখছে। রাজাকে দেখে কে জানে তা’র মন কেমন হ’ল! একদণ্ড না দেখলে প্রাণ কাঁদে, চক্ষের জলে বুক ভেসে যায়। দুই সখী তা’কে পদ্মফুলে বাতাস করছে, গলা ধরে কত আদর করছে, আঁচলে চোখ মোছাচ্ছে, আর ভাবছে—এইবার ভোর হ’ল, বুঝি সখীর রাজা ফিরে এল। তারপর কি হ’ল? দুঃখের নিশি প্রভাত হ’ল, মাধবীর পাতায় পাতায় ফুল ফুটল, নিকুঞ্জের গাছে গাছে পাখী ডাকল, সখীদের পোষা হরিণ কাছে এল। আর কি হ’ল?— বনপথে রাজা-বর কুঞ্জে এল। আর কি হ’ল? পৃথিবীর রাজা আর বনের শকুন্তলা—দুজনে মালা বদল হ’ল। দুই সখীর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হ’ল। তারপর কী হ’ল?— তারপর কতদিন পরে সোণার সাঁঝে সোণার রথ রাজাকে রাজ্যে নিয়ে গেল, আর আঁধার বনপথে দুই প্রিয়সখী শকুন্তলাকে ঘরে নিয়ে গেল।
রাজা রাজ্যে চলে গেলেন, আর শকুন্তলা সেই বনে দিন গুন্তে লাগল। যাবার সময় রাজা নিজের মোহর আংটী শকুন্তলাকে দিয়ে গেলেন, বলে গেলেন—সুন্দরি, তুমি প্রতিদিন আমার নামের একটি করে অক্ষর পড়বে, নামও শেষ হবে আর বনপথে সোণার রথ তোমাকে নিতে আসবে।” কিন্তু হায়, সোণার রথ কই এল? কত দিন গেল, কত রাত গেল; দুষ্মন্ত নাম কতবার পড়া হয়ে গেল, তবু সোণার রথ কই এল! হায় হায়, সোণার সাঁঝে সোণার রথ সেই যে গেল আর ফিরল না! পৃথিবীর রাজা সোণার সিংহাসনে, আর বনের রাণী কুটীর দুয়ারে,—দুই জনে দুই খানে। রাজার শোকে শকুন্তলার মন ভেঙ্গে পড়ল। কোথা রইল অতিথিসেবা, কোথা রইল পোষা হরিণ, কোথা রইল সাধের নিকুঞ্জবনে প্রাণের দুই প্রিয়সখী! শকুন্তলার মুখে হাসি নেই, চোখে ঘুম নেই! রাজার ভাবনা নিয়ে কুটীর দুয়ারে পাষাণ-প্রতিমা বসে রইল। রাজার রথ কেন এল না? কেন রাজা ভুলে রইলেন? রাজা রাজ্যে গেলে একদিন শকুন্তলা কুটীর দুয়ারে গালে হাত দিয়ে বসে বসে রাজার কথা ভাবছে—ভাবছে আর কাঁদছে, এমন সময় মহর্ষি দুর্ব্বাসা দুয়ারে অতিথি এলেন, শকুন্তলা জানতেও পারলে না, ফিরেও দেখলে না। একে দুর্ব্বাসা মহা অভিমানী, একটুতেই মহা রাগ হয়, কথায় কথায় যা’কে তা’কে ভস্ম করে ফেলেন, তা’র উপর শকুন্তলার এই অনাদর—তাঁ’কে প্রণাম করলে না, বসতে আসন দিলে না, পা ধোবার জল দিলে না। দুর্ব্বাসার সর্বাঙ্গে যেন আগুণ ছুটল, রাগে কাঁপ্তে কাঁপ্তে বললেন—“কি অতিথির অপমান? পাপীয়সি, এই অভিশম্পাত করছি—যা’র জন্যে আমার অপমান করলি সে যেন তোকে কিছুতে না চিনতে পারে।” হায়, শকুন্তলার কি তখন জ্ঞান ছিল—যে দেখবে কে এল কে গেল! দুর্ব্বাসার একটি কথাও তা’র কাণে গেল না। মহামানী মহর্ষি দুর্ব্বাসা ঘোর অভিশম্পাত করে চলে গেলেন—সে কিছুই জানতে পারলে না, কুটীর দুয়ারে আনমনে যেমন ছিল তেমনি রইল। অনসূয়া প্রিয়ম্বদা দুই সখী উপবনে ফুল তুলছিল, ছুটে এসে দুর্ব্বাসার পায়ে লুঠিয়ে পড়ল। কত সাধ্য সাধনা করে, কত কাকুতি মিনতি করে, কত হাতে পায়ে ধরে দুর্ব্বাসাকে শান্ত করলে। শেষ এই শাপান্ত হ’ল—“রাজা যাবার সময় শকুন্তলাকে যে আংটী দিয়ে গেছেন সেই আংটী যদি রাজাকে দেখাতে পারে তবেই রাজা শকুন্তলাকে চিনবেন; যত দিন সেই আংটী রাজার হাতে না পরবে ততদিন রাজা সব ভূলে থাকবেন।” দুর্ব্বাসার অভিশাপে তাই পৃথিবীর রাজা সব ভুলে রইলেন। বনপথে সোণার রথ আর ফিরে এল না। এদিকে দুর্ব্বাসাও চলে গেলেন আর তাতঃ কণ্ব তপোবনে ফিরে এলেন। সারা পৃথিবী খুঁজে শকুন্তলার মেলেনি। তিনি ফিরে এসে শুনলেন সারা পৃথিবীর রাজা বনে এসে তা’র গলায় মালা দিয়েছেন। তাতঃ কণ্বের আনন্দের সীমা রইল না, তখনি শকুন্তলাকে রাজার কাছে পাঠাবার উদ্যোগ করতে লাগলেন। দুঃখে অভিমানে শকুন্তলা মাটীতে মিশে ছিল, তা’কে কত আদর করলেন, কত আশীর্ব্বাদ করলেন! উপবনে দুই সখী যখন শুনলে শকুন্তলা শ্বশুরবাড়ি চল্লো, তখন তা’দের আর আহ্লাদের সীমা রইল না! প্রিয়ম্বদা কেশর ফুলের হার নিলে, অনসূয়া গন্ধফুলের তেল নিলে। দুই সখীতে শকুন্তলাকে সাজাতে বসল। তা’র মাথায় তেল দিলে, খোঁপায় ফুল দিলে কপালে সিদুঁর দিলে, পায়ে আল্তা দিলে, নতুন বাকল দিলে;—তবু ত মন উঠল না? সখীর এ কি বেশ করে দিলে? প্রিয়সখী শকুন্তলা পৃথিবীর রাণী, তা’র কি এই সাজ? হাতে মৃণালের বালা, গলায় কেশরের মালা, খোঁপায় মল্লিকার ফুল, পরনে বাকল?—হায়, হায়, মতির মালা কোথায়? হীরের বালা কোথায়? সোণার মল কোথায়? পরণে সাড়ী কোথায়? বনের দেবতারা সখীদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করলেন। বনের গাছ থেকে সোণার সাড়ী উড়ে পড়ল, হাতের বালা খসে পড়ল, মতির মালা ঝরে পড়ল, পায়ের মল বেজে পড়ল। বনদেবতারা পলকে বনবাসিনী শকুন্তলাকে রাজ্যেশ্বরী মহারাণীর সাজে সাজিয়ে দিলেন। তারপর যাবার সময় হ’ল। হায়, যেতে কি পা সরে, মন কি চায়? শকুন্তলা কোন দিকে যাবে,—সোণার পুরীতে রাণীর মত রাজার কাছে চলে যাবে—না—তিন সখীতে বনপথে আজন্ম—কালের তপোবনে ফিরে যাবে? এদিকে শুভলগ্ন বহে যায়, ওদিকে বিদায় আর শেষ হয় না। কুঞ্জবনে মল্লিকা মাধবী কচি কচি পাতা নেড়ে ফিরে ডাকছে, মা-হারা হরিণ-শিশু সোণার আঁচল ধরে বনের দিকে টানছে, প্রাণের দুই প্রিয়সখী গলা ধরে কাঁদছে। এক দণ্ডে এত মায়া এত ভালবাসা কাটান কি সহজ? মা-হারা হরিণ-শিশুকে তাতঃ কণ্বের হাতে, প্রিয় তরুলতাদের প্রিয়সখীদের হাতে সঁপে দিতে কত বেলাই হ’য়ে গেল। তপোবনের শেষে বটগাছ, সেইখান থেকে তাতঃ কণ্ব ফিরলেন। দুই সখী কেঁদে ফিরে এল। আসবার সময় শকুন্তলার আঁচলে রাজার সেই আংটী বেঁধে দিলে, বলে দিলে—“দেখিস্, ভাই, যত্ন করে রাখিস।” তারপর বনের দেবতাদের প্রণাম করে, তাতঃ কণ্বকে প্রণাম করে, শকুন্তলা রাজপুরীর দিকে চলে গেল। পরের মেয়ে পর হ’য়ে পরের দেশে চলে গেল, বনখানা আঁধার করে গেল! ঋষির অভিশাপ কখন মিথ্যা হয় না। রাজপুরে যাবার পথে শকুন্তলা একদিন শচীতীর্থের জলে গা ধুতে গেল। সাঁতার জলে গা ভাসিয়ে, নদীর জলে ঢেউ নাচিয়ে শকুন্তলা গা ধুলে। রঙ্গভরে অঙ্গের সাড়ি জলের উপর বিছিয়ে দিলে; জলের মত চিকণ আঁচল জলের সঙ্গে মিশে গেল, ঢেউয়ের সঙ্গে গড়িয়ে গেল। সেই সময়ে দুর্ব্বাসার শাপে রাজার সেই আংটী শকুন্তলার চিকণ আঁচলের এক কোণ থেকে অগাধ জলে পড়ে গেল, শকুন্তলা জানতেও পারলে না। তারপর ভিজে কাপড়ে তীরে উঠে, কালো চুল এলো করে, হাসিমুখে শকুন্তলা বনের ভিতর দিয়ে রাজার কথা ভাবতে ভাবতে শূন্য আঁচল নিয়ে রাজপুরে চলে গেল। আংটীর কথা মনেই পড়ল না।
দুর্ব্বাসার শাপে রাজা শকুন্তলাকে একেবারে ভুলে বেশ সুখে আছেন। সাত ক্রোশ জুড়ে রাজার সাত মহল বাড়ি; তা’র এক এক মহলে এক এক রকম কাজ চলছে। প্রথম মহলে রাজসভা;—সেখানে সোণার থামে সোণার ছাত, তা’র তলায় সোণার সিংহাসন; সেখানে দোষী নির্দ্দোষের বিচার চলছে। তারপর দেবমন্দির;—সেখানে সোণার দেওয়ালে মানিকের পাখী, মুক্তোর ফল, পান্নার পাতা; মাঝখানে প্রকাণ্ড হোমকুণ্ড,—সেখানে দিবাবাত্রি হোম হচ্ছে। তারপর অতিথি-শালা;—সেখানে সোণার থালায় দুসন্ধ্যা লক্ষ লক্ষ অতিথি খাচ্ছে। তারপর নৃত্যশালা;—সেখানে নাচ চলছে, সানের উপর সোনার নুপুর রুণুঝুনু বাজছে, ম্ফটিকের দেয়ালে অঙ্গের ছায়া তালে তালে নাচছে। সঙ্গীতশালায় গান চলছে, অন্তঃপুরে সংসারের কাজ চলছে, উপবনে উৎসব চলছে। সোণার পালঙ্কে পৃথিবীর রাজা দুষ্মন্ত বসে আছেন, দক্ষিণ-দুয়ারি ঘরে দক্ষিণের বাতাস আসছে;—শকুন্তলার কথা তাঁ’র মনেই নাই। হায়, দুর্ব্বাসার শাপে সুখের অন্তঃপুরে সোণার পালঙ্কে রাজা সব ভুলে রইলেন। আর শকুন্তলা কত ঝড় বৃষ্টিতে—কত পথ চলে—রাজার কাছে এল, রাজা চিনতেও পারলেন না; বললেন—“কন্যে, তুমি কেন এসেছ? কি চাও? টাকা কড়ি চাও,—না—ঘর বাড়ি চাও, কী চাও?’ শকুন্তলা বল্লে—“মহারাজ, আমি টাকাও চাই না, কড়িও চাই না, ঘর বাড়ি কিছুই চাই না, আমি চাই তোমায়। তুমি আমার রাজা, আমার গলায় মালা দিয়েছ, আমি তোমায় চাই।” রাজা বললেন—“ছি ছি, কন্যে, একি কথা! তুমি হলে বনবাসিনী তপস্বিনী, আমি হলেম রাজ্যেশ্বর মহারাজা, আমি তোমায় কেন মালা দেব? টাকা চাও টাকা নাও, ঘর বাড়ি চাও তাই নাও, গায়ের গহনা চাও তাও নাও। রাজ্যেশ্বরী হ’তে চাও—এ কেমন কথা?’ রাজার কথায় শকুন্তলার প্রাণ কেঁপে উঠল, কাঁদতে কাঁদতে বল্লে—“মহারাজ, সে কি কথা? আমি যে সেই শকুন্তলা—আমায় ভুলে গেলে? মনে নেই, মহারাজ, সেই মাধবীর বনে একদিন আমরা তিন সখীতে গুন্ গুন্ গল্প করছিলুম এমন সময় তুমি অতিথি এলে; সখীরা তোমায় পা-ধোবার জল দিলে, আমি আঁচলে ফল এনে দিলেম, তুমি হাসি মুখে তাই খেলে। তারপর একটা পদ্মপাতায় জল নিয়ে আমার হরিণ শিশুকে খাওয়াতে গেলে, সে ছুটে পালাল, তুমি কত ডাকলে, কত মিষ্টি কথা বল্লে, কিছুতে এল না। তারপর আমি ডাকতেই আমার কাছে এল, আমার হাতে জল খেল,তুমি আদর করে বল্লে—‘দুজনেই বনের প্রাণী কিনা তাই এত ভাব’—শুনে সখীরা হেসে উঠল, আমি লজ্জায় মরে গেলাম। তার পর, মহারাজ, তুমি কতদিন তপস্বীর মতো সে বনে রইলে; বনের ফল খেয়ে, নদীর জল খেয়ে, কতদিন কাটালে। তারপর একদিন পূর্ণিমা রাতে মালিনীর তীরে নিকুঞ্জ বনে আমার কাছে এলে, আমার গলায় মালা দিলে;—মহারাজ, সে কথা কি ভুলে গেলে? যাবার সময় তুমি, মহারাজ, আমার হাতে তোমার আংটী, পরিয়ে দিলে; প্রতিদিন তোমার নামের একটি করে অক্ষর পড়তে বলে দিলে, বলে গেলে—নামও শেষ হবে আর আমায় নিতে সোণার রথ পাঠাবে। কিন্তু মহারাজ, সোণার রথ কই পাঠালে, সব ভুলে রইলে? মহারাজ, এমনি করে কি কথা রাখলে?” বনবাসিনী শকুন্তলা রাজার কাছে কত অভিমান করলে, রাজাকে কত অনুযোগ করলে, সেই কুঞ্জবনের কথা, সেই দুই সখীর কথা, সেই হরিণ-শিশুর কথা,—কত কথাই মনে করে দিলে, তবু রাজার মনে পড়ল না। শেষে রাজা বল্লেন—“কই, কন্যে, দেখি তোমার সেই আংটী? তুমি যে বল্লে আমি তোমায় আংটী দিয়েছি, কই দেখাও দেখি কেমন আংটী?” শকুন্তলা তাড়াতাড়ি আঁচল খুলে আংটী দেখাতে গেল, কিন্তু হায়, আঁচল শূন্য,— রাজার সেই সাতরাজার ধন এক-মানিকের বরণ-আংটী কোথায় গেল! এতদিনে দুর্ব্বাসার শাপ ফল্লো। হায়, রাজাও তা’র পর হলেন, পৃথিবীতে আপনার লোক কেউ রইল না! ‘মা-গো’—বলে শকুন্তলা রাজসভায় সানের উপর ঘুরে পড়ল; তা’র কপাল ফুটে রক্ত ছুটল। রাজার সভায় হাহাকার পড়ে গেল। সেই সময় শকুন্তলার সেই পাষাণী মা মেনকা স্বর্গপুরে ইন্দ্রসভায় বীণা বাজিয়ে গান গাচ্ছিল। হঠাৎ তা’র বীণার তার ছিঁড়ে গেল, গানের সুর হারিয়ে গেল, শকুন্তলার জন্যে প্রাণ কেঁদে উঠল; অমনি সে বিদ্যুতের মত মেঘের রথে এসে রাজার সভা থেকে শকুন্তলাকে কোলে তুলে একবারে হেমকূট পর্ব্বতে নিয়ে গেল। সেই হেমকূট পর্ব্বতে কশ্যপের আশ্রমে স্বর্গের অপ্সরাদের মাঝে কতদিনে শকুন্তলার একটি রাজচক্রবর্ত্তী রাজকুমার হ’ল। সেই কোল-ভরা ছেলে পেয়ে শকুন্তলার বুক জুড়ল। শকুন্তলা তো চলে গেল। এদিকে রাজবাড়ির জেলেরা একদিন শচীতীর্থের জলে জাল ফেলতে আরম্ভ করলে। রূপলী রঙ্গের সরলপুটী, চাঁদের মত পায়রা-চাঁদা, সাপের মত বাণমাছ, দাঁড়াওয়ালা চিংড়ি, কাঁটাভরা বাটা, কত কি জালে পড়ল। সোণালি রূপলী মাছে নদীর পাড় মাছের ঝুড়ি যেন সোণায় রূপায় ভরে গেল। সারাদিন জেলেদের জালে কত রকমের কত যে মাছ পড়ল তা’র ঠিকানা নেই। শেষে ক্রমে বেলা পড়ে এল; নীল আকাশ, নদীর জল, নগরের পথ আঁধার হয়ে এল, জেলেরা জাল গুড়িয়ে ঘরে চল্লো। এমন সময় এক জেলে জাল ঘাড়ে নদীতীরে দেখা দিল। প্রকাণ্ড জালখানা মাথার উপর ঘুরিয়ে নদীর উপর উড়িয়ে দিলে; মেঘের মতো কাল জাল আকাশে ঘুরে, নদীর এ-পার ও-পার দু-পার জুড়ে জলে পরল। সেই সময় মাছের সর্দ্দার, নদীর রাজা, বুড়ো মাছ রুই অন্ধকারে সন্ধ্যার সময় সেই নদী ঘেরা কাল জালে ধরা পড়ল। জেলে পাড়ায় রব উঠল—জাল কাটবার গুরু, মাছের সর্দ্দার, বুড়ো রুই এতদিনে জালে পড়েছে। যে যেখানে ছিল নদীতীরে ছুটে এল। তারপর অনেক কষ্টে মাছ ডাঙ্গায় উঠল। এত বড় মাছ কেউ কখন দেখেনি। আবার যখন সেই মাছের পেট চিরতে সাত রাজার ধন এক-মানিকের আংটী জ্বলন্ত আগুণের মত ঠিক্রে পড়ল তখন সবাই অবাক্ হয়ে রইল। যা’র মাছ তা’র আনন্দের সীমা রইল না। গরীব জেলে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলে। মাছের ঝুড়ি, ছেঁড়া জাল জলে ফেলে মানিকের আংটী সেকরার দোকানে বেচতে চল্লো। রাজা শকুন্তলাকে যে আংটী দিয়েছিলেন—এ সেই আংটী, শচীতীর্থে গা-ধোবার সময় তা’র আঁচল থেকে যখন জলে পড়ে যায় তখন রুইমাছটা খাবার ভেবে গিলে ফেলেছিল। জেলের হাতে রাজার মোহর আংটী দেখে সেকরা কোটালকে খবর দিলে। কোটাল জেলেকে মারতে মারতে রাজসভায় হাজির করলে। বেচারা জেলে রাজদরবারে দাঁড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে কেমন করে মাছের পেটে আংটী পেয়েছে নিবেদন করলে। রাজমন্ত্রী দেখলেন সত্যই আংটীতে মাছের গন্ধ, জেলে ছাড়া পেয়ে মোহরের তোড়া বখশিশ নিয়ে নাচতে নাচতে বাড়ি গেল। এদিকে আংটী হাতে পড়্তেই রাজার তপোবনের কথা সব মনে পড়ে গেল। শকুন্তলার শোকে রাজা যেন পাগল হয়ে উঠলেন। বিনা দোষে তা’কে দূর করে দিয়ে প্রাণ যেন তুঁষের আগুণে পুড়তে লাগল। মুখে অন্য কথা নেই কেবল—‘হা শকুন্তলা—হা শকুন্তলা’। আহারে, বিহারে, শয়নে, স্বপনে, কিছুতে সুখ নাই; রাজ-কার্য্যে সুখ নাই, অন্তঃপুরে সুখ নাই, উপবনে সুখ নাই, কোথাও সুখ নাই। সঙ্গীতশালায় গান বন্ধ হ’ল, নৃত্যশালায় নাচ বন্ধ হ’ল, উপবনে উৎসব বন্ধ হ’ল। রাজার দুঃখের সীমা রইল না। একদিকে বনবাসিনী শকুন্তলা কোলভরা ছেলে নিয়ে হেমকূটের সোণার শিখরে বসে রইল, আর একদিকে জগতের রাজা রাজা দুষ্মন্ত জগৎজোড়া শোক নিয়ে ধূলায় ধূসর পড়ে রইলেন। কত দিন পরে দেবতার কৃপা হল। স্বর্গ থেকে ইন্দ্রদেবের রথ এসে রাজাকে দৈত্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করবার জন্যে স্বর্গপুরে নিয়ে গেল। সেখানে নন্দনবনে কত দিন কাটিয়ে, দৈত্যদের সঙ্গে কত যুদ্ধ করে, মন্দারের মালা গলায় পরে, রাজা রাজ্যে ফিরছেন—এমন সময় দেখলেন, পথে হেমকূট পর্ব্বত, মহর্ষি কশ্যপের আশ্রম। রাজা মহর্ষিকে প্রণাম করবার জন্য সেই আশ্রমে চল্লেন। এই আশ্রমে অনেক তাপস অনেক তপস্বিনী থাকতেন,অনেক অপ্সর অনেক অপ্সরা থাকত। আর থাকত—শকুন্তলা আর তা’র পুত্র রাজপুত্র সর্ব্বদমন। রাজা দুষ্মন্ত যেমন দেশের রাজা ছিলেন তাঁ’র সেই রাজপুত্র তেমনি বনের রাজা ছিল। বনের যত জীব জন্ত তাঁ’কে বড়ই ভালোবাসত। সেই বনে সাতক্রোশ জুড়ে একটা প্রকাণ্ড বটগাছ ছিল, তা’র তলায় একটা প্রকাণ্ড অজগর দিনরাত্রি পড়ে থাকত; এই গাছতলায় সর্ব্বদমনের রাজসভা বসত। হাতিরা তা’কে মাথায় করে নদীতে নিয়ে যেত, শুঁড়ে করে জল ছিটিয়ে গা ধুইয়ে দিত, তারপর তা’কে সেই সাপের পিঠে বসিয়ে দিত—এই তা’র রাজসিংহসন। দুদিকে দুই হাতি পদ্মফুলের চামর ঢোলাত, অজগর ফণা মেলে মাথায় ছাতা ধরত; ভালুক ছিল মন্ত্রী, সিংহ ছিল সেনাপতি, বাঘ ছিল চৌকিদার, শেয়াল ছিল কোটাল আর ছিল—শুক পাখী তা’র প্রিয়সখা, কত মজার মজার কথা বলত, দেশ বিদেশের গল্প করত। সে পাখীর বাসায় পাখীর ছানা নিয়ে খেলা করত, বাঘের বাসায় বাঘের কাছে বসে থাকত,—কেউ তাকে কিছু বলত না। সবাই তাকে ভয়ও করত, ভালও বাস্ত। রাজা যখন সেই বনে এলেন তখন রাজপুত্র একটা সিংহ-শিশুকে নিয়ে খেলা করছিল, তা’র মুখে হাত পুরে দাঁত গুনছিল, তা’কে কোলে পিঠে করছিল, তা’র জটা ধরে টানছিল। বনের তপস্বিনীরা কত ছেড়ে দিতে বলছিলেন, কত মাটীর ময়ূরের লোভ দেখাচ্ছিলেন, শিশু কিছুতে শুনছিল না। এমন সময় রাজা সেখানে এলেন, সিংহ-শিশুকে ছাড়িয়ে সেই রাজ-শিশুকে কোলে নিলেন; দুষ্ট শিশু রাজার কোলে শান্ত হ’ল। সেই রাজশিশুকে কোলে করে রাজার বুক যেন জুড়িয়ে গেল। রাজা তো জানেন না যে এ শিশু তাঁ’রই পুত্র; ভাবছেন—পরের ছেলেকে কোলে করে মন কেন এমন হল, এর উপর কেন এত মায়া হল? এমন সময় শকুন্তলা অঞ্চলের নিধি কোলের বাছাকে খুঁজতে খুঁজতে সেইখানে এলেন। রাজা রাণীতে দেখা হ’ল, রাজা আবার শকুন্তলাকে আদর করলেন, তাঁ’র কাছে ক্ষমা চাইলেন। দেবতার কৃপায় এতদিনে আবার মিলন হ’ল, দুর্ব্বাসার শাপান্ত হ’ল। কশ্যপ অদিতিকে প্রণাম করে রাজা রাণী রাজপুত্র কোলে রাজ্যে ফিরলেন। তারপর কত দিন সুখে রাজত্ব করে, রাজপুত্রকে রাজ্য দিয়ে রাজা রাণী সেই তপোবনে তাতঃ কণ্বের কাছে, সেই দুই সখীর কাছে, সেই হরিণ-শিশুদের কাছে, সেই সহকার এবং মাধবীলতার কাছে ফিরে গেলেন এবং তাপস তাপসীদের সঙ্গে সুখে জীবন কাটিয়ে দিলেন।সমাপ্ত।
পনের-ষোল বছর আগেকার কথা। বি.এ. পাশ করিয়া কলিকাতায় বসিয়া আছি। বহু জায়গায় ঘুরিয়াও চাকুরি মিলিল না।সরস্বতী-পূজার দিন। মেসে অনেক দিন ধরিয়া আছি তাই নিতান্ত তাড়াইয়া দেয় না, কিন্তু তাগাদার উপর তাগাদা দিয়া মেসের ম্যানেজার অস্থির করিয়া তুলিয়াছে। মেসে প্রতিমা গড়াইয়া পূজা হইতেছে-ধুমধামও মন্দ নয়, সকালে উঠিয়া ভাবিতেছি আজ সব বন্ধ, দু-একটা জায়গায় একটু আশা দিয়াছিল, তা আজ আর কোথাও যাওয়া কোনো কাজের হইবে না; বরং তার চেয়ে ঘুরিয়া ঘুরিয়া ঠাকুর দেখিয়া বেড়াই।মেসের চাকর জগন্নাথ এমন সময় একটুকরা কাগজ হাতে দিয়া গেল। পড়িয়া দেখিলাম ম্যানেজারের লেখা তাগাদার চিঠি। আজ মেসে পূজা-উপলক্ষে ভালো খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা হইয়াছে, আমার কাছে দু-মাসের টাকা বাকি, আমি যেন চাকরের হাতে অন্তত দশটি টাকা দিই। অন্যথা কাল হইতে খাওয়ার জন্য আমাকে অন্যত্র ব্যবস্থা করিতে হইবে।কথা খুব ন্যায্য বটে, কিন্তু আমার সম্বল মোটে দুটি টাকা আর কয়েক আনা পয়সা। কোনো জবাব না দিয়াই মেস হইতে বাহির হইলাম। পাড়ার নানা স্থানে পূজার বাজনা বাজিতেছে, ছেলেমেয়েরা গলির মোড়ে দাঁড়াইয়া গোলমাল করিতেছে; অভয় ময়রার খাবারের দোকানে অনেক রকম নতুন খাবার থালায় সাজানো-বড়রাস্তার ওপারে কলেজ হোস্টেলের ফটকে নহবৎ বসিয়াছে। বাজার হইতে দলে দলে লোক ফুলের মালা ও পূজার উপকরণ কিনিয়া ফিরিতেছে।ভাবিলাম কোথায় যাওয়া যায়। আজ এক বছরের উপর হইল জোড়াসাঁকো স্কুলের চাকুরি ছাড়িয়া দিয়া বসিয়া আছি-অথবা বসিয়া ঠিক নাই, চাকুরির খোঁজে হেন মার্চেণ্ট আপিস নাই, হেন স্কুল নাই, হেন খবরের কাগজের আপিস নাই, হেন বড়লোকের বাড়ি নাই-যেখানে অন্তত দশবার না হাঁটাহাঁটি করিয়াছি, কিন্তু সকলেরই এক কথা, চাকুরি খালি নাই।হঠাৎ পথে সতীশের সঙ্গে দেখা। সতীশের সঙ্গে হিন্দু হোস্টেলে একসঙ্গে থাকিতাম। বর্তমানে সে আলীপুরের উকিল, বিশেষ কিছু হয় বলিয়া মনে হয় না, বালিগঞ্জের ওদিকে কোথায় একটা টিউশনি আছে, সেটাই সংসারসমুদ্রে বর্তমানে তাহার পক্ষে ভেলার কাজ করিতেছে। আমার ভেলা তো দূরের কথা, একখানা মাস্তুল-ভাঙ্গা কাঠও নাই, যতদূর হাবুডুবু খাইবার তাহা খাইতেছি-সতীশকে দেখিয়া সে কথা আপাতত ভুলিয়া গেলাম। ভুলিয়া গেলাম তাহার আর একটা কারণ, সতীশ বলিল-এই যে, কোথায় চলেছ সত্যচরণ? চল হিন্দু হোস্টেলের ঠাকুর দেখে আসি-আমাদের পুরোনো জায়গাটা। আর ওবেলা বড় জলসা হবে- এসো। ওয়ার্ড সিক্সের সেই অবিনাশকে মনে আছে, সেই যে ময়মনসিংহের কোন্ জমিদারের ছেলে, সে যে আজকাল বড় গায়ক। সে গান গাইবে, আমায় আবার একখানা কার্ড দিয়েছে-তাদের এস্টেটের দু-একটা কাজকর্ম মাঝে মাঝে করি কিনা। এসো, তোমায় দেখলে সে খুশি হবে।কলেজে পড়িবার সময়, আজ পাঁচ-ছয় বছর আগে, আমোদ পাইলে আর কিছু চাহিতাম না-এখনো সে মনের ভাব কাটে নাই দেখিলাম। হিন্দু হোস্টেলে ঠাকুর দেখিতে গিয়া সেখানে মধ্যাহ্নভোজনের নিমন্ত্রণ পাইলাম। কারণ আমাদের দেশের অনেক পরিচিত ছেলে এখানে থাকে, তাহারা কিছুতেই আসিতে দিতে চাহিল না। বলিলাম-বিকেলে জলসা হবে, তা এখন কি! মেস থেকে খেয়ে আসব এখন।তাহারা সে কথায় কর্ণপাত করিল না।কর্ণপাত করিলে আমাকে সরস্বতী-পূজার দিনটা উপবাসে কাটাইতে হইত। ম্যানেজারের অমন কড়া চিঠির পরে আমি গিয়া মেসের লুচি পায়েসের ভোজ খাইতে পারিতাম না-যখন একটা টাকাও দিই নাই। এ বেশ হইল-পেট ভরিয়া নিমন্ত্রণ খাইয়া বৈকালে জলসার আসরে গিয়া বসিলাম। আবার তিন বৎসর পূর্বের ছাত্রজীবনের উল্লাস ফিরিয়া আসিল-কে মনে রাখে যে চাকুরি পাইলাম কি না-পাইলাম, মেসের ম্যানেজার মুখ হাঁড়ি করিয়া বসিয়া আছে কি না-আছে। ঠুংরি ও কীর্তনের সমুদ্রে তলাইয়া গিয়া ভুলিয়া গেলাম যে দেনা মিটাইতে না পারিলে কাল সকাল হইতে বায়ুভক্ষণের ব্যবস্থা হইবে। জলসা যখন ভাঙ্গিল তখন রাত এগারটা। অবিনাশের সঙ্গে আলাপ হইল, হিন্দু হোস্টেলে থাকিবার সময় সে আর আমি ডিবেটিং ক্লাবের চাঁই ছিলাম-একবার স্যর গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমরা সভাপতি করিয়াছিলাম। বিষয় ছিল, স্কুল-কলেজে বাধ্যতামূলক ধর্মশিক্ষা প্রবর্তন করা উচিত। অবিনাশ প্রস্তাবকর্তা আমি প্রতিবাদী পক্ষের নায়ক। উভয় পক্ষে তুমুল তর্কের পর সভাপতি আমাদের পক্ষে মত দিলেন। সেই হইতে অবিনাশের সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব হইয়া যায়-যদিও কলেজ হইতে বাহির হইয়া এই প্রথম আবার তার সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ।অবিনাশ বলিল-চল, আমার গাড়ি রয়েছে-তোমাকে পৌঁছে দিই। কোথায় থাক?মেসের দরজায় নামাইয়া দিয়া বলিল- শোন, কাল হ্যারিংটন স্ট্রিটে আমার বাড়িতে চা খাবে বিকেল চারটের সময়। ভুলো না যেন। তেত্রিশের দুই। লিখে রাখ তো নোটবইয়ে।পরদিন খুঁজিয়া হ্যারিংটন স্ট্রিট বাহির করিলাম, বন্ধুর বাড়িও বাহির করিলাম। বাড়ি খুব বড় নয়, তবে সামনে পিছনে বাগান। গেটে উইস্টারিয়া লতা, নেপালি দারোয়ান, ও পিতলের প্লেট। লাল সুরকির বাঁকা রাস্তা- রাস্তার এক ধারে সবুজ ঘাসের বন, অন্য ধারে বড় বড় মুচুকুন্দ চাঁপা ও আমগাছ। গাড়িবারান্দায় বড় একখানা মোটর গাড়ি। বড়লোকের বাড়ি নয় বলিয়া ভুল করিবার কোনো দিক হইতে কোনো উপায় নাই। সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিয়াই বসিবার ঘর। অবিনাশ আসিয়া আদর করিয়া ঘরে বসাইল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পুরাতন দিনের কথাবার্তায় আমরা দুজনেই মশগুল হইয়া গেলাম। অবিনাশের বাবা ময়মনসিংহের একজন বড় জমিদার, কিন্তু সম্প্রতি কলিকাতার বাড়িতে তাঁহারা কেহই নাই। অবিনাশের এক ভগ্নীর বিবাহ উপলক্ষে গত অগ্রহায়ণ মাসে দেশে গিয়াছিলেন- এখনো কেহই আসেন নাই।এ-কথা ও-কথার পর অবিনাশ বলিল-এখন কি করছ সত্য?বলিলাম-জোড়াসাঁকো স্কুলে মাস্টারি করতুম, সম্প্রতি বসেই আছি একরকম। ভাবছি, আর মাস্টারি করব না। দেখছি অন্য কোনো দিকে যদি-দু-এক জায়গায় আশাও পেয়েছি।আশা পাওয়ার কথা সত্য নয়, কিন্তু অবিনাশ বড়লোকের ছেলে, মস্তবড় এস্টেট ওদের। তাহার কাছে চাকুরির উমেদারি করিতেছি এটা না-দেখায়, তাই কথাটা বলিলাম।অবিনাশ একটুখানি ভাবিয়া বলিল-তোমার মতো একজন উপযুক্ত লোকের চাকুরি পেতে দেরি হবে না অবিশ্যি। আমার একটা কথা আছে, তুমি তো আইনও পড়েছিলে-না?বলিলাম-পাশও করেছি, কিন্তু ওকালতি করবার মতিগতি নেই।অবিনাশ বলিল-আমাদের একটা জঙ্গল-মহাল আছে পূর্ণিয়া জেলায়। প্রায় বিশ-ত্রিশ হাজার বিঘে জমি। আমাদের সেখানে নায়েব আছে কিন্তু তার ওপর বিশ্বাস করে অত জমি বন্দোবস্তের ভার দেওয়া চলে না। আমরা একজন উপযুক্ত লোক খুঁজছি। তুমি যাবে?কান অনেক সময় মানুষকে প্রবঞ্চনা করে জানিতাম। অবিনাশ বলে কি! যে চাকুরির খোঁজে আজ একটি বছর কলিকাতার রাস্তাঘাট চষিয়া বেড়াইতেছি, চায়ের নিমন্ত্রণে সম্পূর্ণ অযাচিতভাবে সেই চাকুরির প্রস্তাব আপনা হইতেই সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল?তবুও মান বজায় রাখিতে হইবে। অত্যন্ত সংযমের সহিত মনের ভাব চাপিয়া উদাসীনের মতো বলিলাম-ও! আচ্ছা ভেবে বলব। কাল আছ তো?অবিনাশ খুব খোলাখুলি ও দিলদরিয়া মেজাজের মানুষ। বলিল- ভাবাভাবি রেখে দাও। আমি বাবাকে আজই পত্র লিখতে বসছি। আমরা একজন বিশ্বাসী লোক খুঁজছি। জমিদারির ঘুণ কর্মচারী আমরা চাই নে-কারণ তারা প্রায়ই চোর। তোমার মতো শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান লোকের সেখানে দরকার। জঙ্গল-মহাল আমরা নূতন প্রজার সঙ্গে বন্দোবস্ত করব। ত্রিশ হাজার বিঘের জঙ্গল। অত দায়িত্বপূর্ণ কাজ কি যার-তার হাতে ছেড়ে দেওয়া যায়। তোমার সঙ্গে আজ আলাপ নয়, তোমার নাড়িনক্ষত্র আমি জানি। তুমি রাজি হয়ে যাও-আমি এখুনি বাবাকে লিখে অ্যাপয়েণ্টমেণ্ট লেটার আনিয়ে দিচ্ছি।কি করিয়া চাকুরি পাইলাম তাহা বেশি বলিবার আবশ্যক নাই। কারণ এ গল্পের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। সংক্ষেপে বলিয়া রাখি-অবিনাশের বাড়ির চায়ের নিমন্ত্রণ খাইবার দুই সপ্তাহ পরে আমি একদিন নিজের জিনিসপত্র লইয়া বি.এন.ডব্লিউ. রেলওয়ের একটা ছোট স্টেশনে নামিলাম।শীতের বৈকাল। বিস্তীর্ণ প্রান্তরে ঘন ছায়া নামিয়াছে, দূরে বনশ্রেণীর মাথায় মাথায় অল্প অল্প কুয়াশা জমিয়াছে। রেল-লাইনের দু-ধারে মটর-ক্ষেত, শীতল সান্ধ্য-বাতাসে তাজা মটরশাকের স্নিগ্ধ সুগন্ধে কেমন মনে হইল যে-জীবন আরম্ভ করিতে যাইতেছি তাহা বড় নির্জন হইবে, এই শীতের সন্ধ্যা যেমন নির্জন, যেমন নির্জন এই উদাস প্রান্তর আর ওই দূরের নীলবর্ণ বনশ্রেণী, তেমনি।গোরুর গাড়িতে প্রায় পনের-ষোল ক্রোশ চলিলাম সারারাত্রি ধরিয়া-ছইয়ের মধ্যে কলিকাতা হইতে আনীত কম্বল র্যাগ ইত্যাদি শীতে জল হইয়া গেল-কে জানিত এ-সব অঞ্চলে এত ভয়ানক শীত! সকালে রৌদ্র যখন উঠিয়াছে, তখনো পথ চলিতেছি। দেখিলাম, জমির প্রকৃতি বদলাইয়া গিয়াছে-প্রাকৃতিক দৃশ্যও অন্য মূর্তি পরিগ্রহ করিয়াছে-ক্ষেতখামার নাই, বস্তি লোকালয়ও বড়-একটা দেখা যায় না-কেবল ছোটবড় বন, কোথাও ঘন, কোথাও পাতলা, মাঝে মাঝে মুক্ত প্রান্তর, কিন্তু তাহাতে ফসলের আবাদ নাই।কাছারিতে পৌঁছিলাম বেলা দশটার সময়। জঙ্গলের মধ্যে প্রায় দশ-পনের বিঘা জমি পরিষ্কার করিয়া কতকগুলি খড়ের ঘর, জঙ্গলেরই কাঠ, বাঁশ ও খড় দিয়া তৈরি-ঘরে শুকনো ঘাস ও বন-ঝাউয়ের সরু গুঁড়ির বেড়া, তাহার উপর মাটি দিয়া লেপা।ঘরগুলি নতুন তৈরি, ঘরের মধ্যে ঢুকিয়াই টাট্কা-কাটা খড়, আধকাঁচা ঘাস ও বাঁশের গন্ধ পাওয়া গেল। জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম, আগে জঙ্গলের ওদিকে কোথায় কাছারি ছিল, কিন্তু শীতকালে সেখানে জলাভাব হওয়ায় এই ঘর নতুন বাঁধা হইয়াছে, কারণ পাশেই একটা ঝরনা থাকায় এখানে জলের কষ্ট নাই।জীবনের বেশির ভাগ সময় কলিকাতায় কাটাইয়াছি। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গ, লাইব্রেরি, থিয়েটার সিনেমা, গানের আড্ডা-এ-সব ভিন্ন জীবন কল্পনা করিতে পারি না-এ অবস্থায় চাকুরির কয়েকটি টাকার খাতিরে যেখানে আসিয়া পড়িলাম, এত নির্জন স্থানের কল্পনাও কোনোদিন করি নাই। দিনের পর দিন যায়, পূর্বাকাশে সূর্যের উদয় দেখি দূরের পাহাড় ও জঙ্গলের মাথায়, আবার সন্ধ্যায় সমগ্র বনঝাউ ও দীর্ঘ ঘাসের বনশীর্ষ সিঁদুরের রঙে রাঙাইয়া সূর্যকে ডুবিয়া যাইতে দেখি-ইহার মধ্যে শীতকালের যে এগার-ঘন্টা ব্যাপী দিন, তা যেন খাঁ-খাঁ করে শূন্য, কি করিয়া তাহা পুরাইব, প্রথম প্রথম সেইটা আমার পক্ষে হইল মহাসমস্যা।কাজকর্ম করিলে অনেক করা যায় বটে, কিন্তু আমি নিতান্ত নব আগন্তুক, এখনো ভালো করিয়া এখানকার লোকের ভাষা বুঝিতে পারি না, কাজের কোনো বিলিব্যবস্থাও করিতে পারি না, নিজের ঘরে বসিয়া বসিয়া, যে কয়খানি বই সঙ্গে আনিয়াছিলাম তাহা পড়িয়াই কোনো রকমে দিন কাটাই। কাছারিতে লোকজন যারা আছে তারা নিতান্ত বর্বর, না বোঝে তাহারা আমার কথা, না আমি ভালো বুঝি তাহাদের কথা। প্রথম দিন-দশেক কি কষ্টে যে কাটিল! কতবার মনে হইল চাকুরিতে দরকার নাই, এখানে হাঁপাইয়া মরার চেয়ে আধপেটা খাইয়া কলিকাতায় থাকা ভালো। অবিনাশের অনুরোধে কি ভুলই করিয়াছি এই জনহীন জঙ্গলে আসিয়া, এ-জীবন আমার জন্য নয়।রাত্রিতে নিজের ঘরে বসিয়া এই সবই ভাবিতেছি, এমন সময় ঘরের দরজা ঠেলিয়া কাছারির বৃদ্ধ মুহুরী গোষ্ঠ চক্রবর্তী প্রবেশ করিলেন। এই একমাত্র লোক যাহার সহিত বাংলা কথা বলিয়া হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচি। গোষ্ঠবাবু এখানে আছেন অন্তত সতের-আঠার বছর। বর্ধমান জেলায় বনপাশ স্টেশনের কাছে কোন্ গ্রামে বাড়ি। বলিলাম, বসুন গোষ্ঠবাবু-গোষ্ঠবাবু অন্য একখানা চেয়ারে বসিলেন। বলিলেন-আপনাকে একটা কথা বলতে এলাম নিরিবিলি, এখানকার কোনো মানুষকে বিশ্বাস করবেন না। এ বাংলা দেশ নয়। লোকজন সব বড় খারাপ--বাংলা দেশের মানুষও সবাই যে খুব ভালো, এমন নয় গোষ্ঠবাবু--সে আর আমার জানতে বাকি নেই, ম্যানেজার বাবু। সেই দুঃখে আর ম্যালেরিয়ার তাড়নায় প্রথম এখানে আসি। প্রথম এসে বড় কষ্ট হত, এ জঙ্গলে মন হাঁপিয়ে উঠত-আজকাল এমন হয়েছে, দেশ তো দূরের কথা, পূর্ণিয়া কি পাটনাতে কাজে গিয়ে দু-দিনের বেশি তিন দিন থাকতে পারি নে।গোষ্ঠবাবুর মুখের দিকে সকৌতুকে চাহিলাম-বলে কি!জিজ্ঞাসা করিলাম-থাকতে পারেন না কেন? জঙ্গলের জন্য মন হাঁপায় নাকি?গোষ্ঠবাবু আমার দিকে চাহিয়া একটু হাসিলেন। বলিলেন, ঠিক তাই, ম্যানেজার বাবু। আপনিও বুঝবেন। নতুন এসেছেন কলকাতা থেকে, কলকাতার জন্যে মন উড়ু উড়ু করছে, বয়সও আপনার কম। কিছুদিন এখানে থাকুন। তারপর দেখবেন।-কি দেখব?-জঙ্গল আপনাকে পেয়ে বসবে। কোনো গোলমাল কি লোকের ভিড় ক্রমশ আর ভালো লাগবে না। আমার তাই হয়েছে মশাই। এই গত মাসে মুঙ্গের গিয়েছিলাম মকদ্দমার কাজে-কেবল মনে হয় কবে এখান থেকে বেরুব।মনে মনে ভাবিলাম, ভগবান সে দুরবস্থার হাত থেকে আমায় উদ্ধার করুন। তার আগে চাকুরিতে ইস্তফা দিয়া কোন্কালে কলিকাতায় ফিরিয়া গিয়াছি!গোষ্ঠবাবু বলিলেন, বন্দুকটা রাত-বেরাত শিয়রে শিয়রে রেখে শোবেন, জায়গা ভালো নয়। এর আগে একবার কাছারিতে ডাকাতি হয়ে গিয়েছে। তবে আজকাল এখানে আর টাকাকড়ি থাকে না, এই যা কথা।কৌতূহলের সহিত বললাম, বলেন কি! কতকাল আগে ডাকাতি হয়েছিল?-বেশি না। এই বছর আট-নয় আগে। কিছুদিন থাকুন, তখন সব কথা জানতে পারবেন। এ অঞ্চল বড় খারাপ। তা ছাড়া, এই ভয়ানক জঙ্গলে ডাকাতি করে মেরে নিলে দেখবেই বা কে?গোষ্ঠবাবু চলিয়া গেলে একবার ঘরের জানালার কাছে আসিয়া দাঁড়াইলাম। দূরে জঙ্গলের মাথায় চাঁদ উঠিতেছে-আর সেই উদীয়মান চন্দ্রের পটভূমিকায় আঁকাবাঁকা একটা বনঝাউয়ের ডাল, ঠিক যেন জাপানি চিত্রকর হকুসাই-অঙ্কিত একখানি ছবি।চাকুরি করিবার আর জায়গা খুঁজিয়া পাই নাই! এ-সব বিপজ্জনক স্থান, আগে জানিলে কখনোই অবিনাশকে কথা দিতাম না।দুর্ভাবনা সত্ত্বেও উদীয়মান চন্দ্রের সৌন্দর্য আমাকে বড় মুগ্ধ করিল।কাছারির অনতিদূরে একটা ছোট পাথরের টিলা, তার উপর প্রাচীন ও সুবৃহৎ একটা বটগাছ। এই বটগাছের নাম গ্র্যান্ট সাহেবের বটগাছ। কেন এই নাম হইল, তখন অনুসন্ধান করিয়াও কিছু জানিতে পারি নাই। একদিন নিস্তব্ধ অপরাহ্নে বেড়াইতে বেড়াইতে পশ্চিম দিগন্তে সূর্যাস্তের শোভা দেখিতে টিলার উপরে উঠিলাম।টিলার উপরকার বটতলায় আসন্ন সন্ধ্যার ঘন ছায়ায় দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া কত দূর পর্যন্ত এক চমকে দেখিতে পাইলাম-কলুটোলার মেস, কপালীটোলার সেই ব্রিজের আড্ডাটি, গোলদিঘিতে আমার প্রিয় বেঞ্চখানা-প্রতিদিন এমন সময়ে যাহাতে গিয়া বসিয়া কলেজ স্ট্রিটের বিরামহীন জনস্রোত ও বাস মোটরের ভিড় দেখিতাম। হঠাৎ যেন কতদূরে পড়িয়া রহিয়াছে মনে হইল তাহারা। মন হু-হু করিয়া উঠিল-কোথায় আছি! কোথাকার জনহীন অরণ্যে-প্রান্তরে খড়ের চালায় বাস করিতেছি চাকুরির খাতিরে! মানুষ এখানে থাকে? লোক নাই, জন নাই, সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ-একটা কথা কহিবার মানুষ পর্যন্ত নাই। এদেশের এইসব মূর্খ, বর্বর মানুষ এরা একটা ভালো কথা বলিলে বুঝিতে পারে না-এদেরই সাহচর্যে দিনের পর দিন কাটাইতে হইবে? সেই দূরবিসর্পী দিগন্তব্যাপী জনহীন সন্ধ্যার মধ্যে দাঁড়াইয়া মন উদাস হইয়া গেল, কেমন ভয়ও হইল। তখন সঙ্কল্প করিলাম, এ-মাসের আর সামান্য দিনই বাকি, সামনের মাসটা কোনোরূপে চোখ বুজিয়া কাটাইব, তারপর অবিনাশকে একখানা লম্বা পত্র লিখিয়া চাকুরিতে ইস্তফা দিয়া কলিকাতায় ফিরিয়া গিয়া সভ্য বন্ধুবান্ধবদের অভ্যর্থনা পাইয়া, সভ্য খাদ্য খাইয়া, সভ্য সুরের সঙ্গীত শুনিয়া, মানুষের ভিড়ের মধ্যে ঢুকিয়া, বহু মানবের আনন্দ-উল্লাসভরা কণ্ঠস্বর শুনিয়া বাঁচিব।পূর্বে কি জানিতাম মানুষের মধ্যে থাকিতে এত ভালবাসি! মানুষকে এত ভালবাসি! তাহাদের প্রতি আমার যে কর্তব্য হয়তো সব সময় তাহা করিয়া উঠিতে পারি না-কিন্তু ভালবাসি তাহাদের নিশ্চয়ই। নতুবা এত কষ্ট পাইব কেন তাহাদের ছাড়িয়া আসিয়া?প্রেসিডেন্সি কলেজের রেলিঙে বই বিক্রি করে সেই যে বৃদ্ধ মুসলমানটি, কতদিন তাহার দোকানে দাঁড়াইয়া পুরোনো বই ও মাসিক পত্রিকার পাতা উল্টাইয়াছি-কেনা উচিত ছিল হয়তো, কিন্তু কেনা হয় নাই- সেও যেন পরম আত্মীয় বলিয়া মনে হইল-তাহাকে আজ কতদিন দেখি নাই!কাছারিতে ফিরিয়া নিজের ঘরে ঢুকিয়া টেবিলে আলো জ্বালিয়া একখানা বই লইয়া বসিয়াছি, সিপাহি মুনেশ্বর সিং আসিয়া সেলাম করিয়া দাঁড়াইল। বলিলাম-কি মুনেশ্বর?ইতিমধ্যে দেহাতি হিন্দি কিছু কিছু বলিতে শিখিয়াছিলাম।মুনেশ্বর বলিল-হুজুর, আমায় একখানা লোহার কড়া কিনে দেবার হুকুম যদি দেন মুহুরী বাবুকে।-কি হবে লোহার কড়া?মুনেশ্বরের মুখ প্রাপ্তির আশায় উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। সে বিনীত সুরে বলিল-একখানা লোহার কড়া থাকলে কত সুবিধে হুজুর। যেখানে সেখানে সঙ্গে নিয়ে গেলাম, ভাত রাঁধা যায়, জিনিসপত্র রাখা যায়, ওতে করে ভাত খাওয়া যায়, ভাঙবে না। আমার একখানাও কড়া নেই। কতদিন থেকে ভাবছি একখানা কড়ার কথা-কিন্তু হুজুর, বড় গরিব, একখানা কড়ার দাম ছ-আনা, অত দাম দিয়ে কড়া কিনি কেমন করে? তাই হুজুরের কাছে আসা, অনেক দিনের সাধ একখানা কড়া আমার হয়, হুজুর যদি মঞ্জুর করেন, হুজুর মালিক।একখানা লোহার কড়াই যে এত গুণের, তাহার জন্য যে এখানে লোক রাত্রে স্বপ্ন দেখে, এ ধরনের কথা এই আমি প্রথম শুনিলাম। এত গরিব লোক পৃথিবীতে আছে যে ছ-আনা দামের একখানা লোহার কড়াই জুটিলে স্বর্গ হাতে পায়? শুনিয়াছিলাম এদেশের লোক বড় গরিব। এত গরিব তাহা জানিতাম না। বড় মায়া হইল।পরদিন আমার সই করা চিরকুটের জোরে মুনেশ্বর সিং নউগচ্ছিয়ার বাজার হইতে একখানা পাঁচ নম্বরের কড়াই কিনিয়া আনিয়া আমার ঘরের মেজেতে নামাইয়া আমায় সেলাম দিয়া দাঁড়াইল।-হো গৈল, হুজুরকী কৃপা-সে-কড়াইয়া হো গৈল! তাহার হর্ষোৎফুল্ল মুখের দিকে চাহিয়া আমার এই একমাসের মধ্যে সর্বপ্রথম আজ মনে হইল-বেশ লোকগুলা। বড় কষ্ট তো এদের!