BDBOYS...
BDBOYS...
সবচেয়ে সাম্প্রতিক খবর ও পোস্টসমূহ
মেষ রাশি: মন থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখুন। শরীর এবং মনকে সুস্থ রাখার লক্ষ্যে নিয়মিতভাবে ধ্যান ও যোগ ব্যায়াম করুন। এর ফলে আপনার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে। এই রাশির কিছু ব্যবসায়ী অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে ব্যবসা সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ পেতে পারেন। যেগুলিকে সঠিকভাবে কাজে লাগালে তাঁদের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যাঁরা বৈদেশিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তাঁদের জন্য এই দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি কাজ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করুন। খেলাধুলার বিষয়ে অযথা সময় নষ্ট করবেন না। বিবাহিত জীবন নিঃসন্দেহে সুখের হবে।প্রতিকার: শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে আমিষ খাবার পরিত্যাগ করুন।বৃষ রাশি: আপনি আজ একটি সামাজিক জমায়েতে অংশগ্রহণ করতে পারেন। আপনার আজ বিপুল অর্থব্যয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে বাবা-মা এবং অর্ধাঙ্গিনীর সঙ্গে আপনি আর্থিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। একজন দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের কাছ থেকে আপনি অপ্রত্যাশিত সুসংবাদ পাবেন। প্রেমের জীবনে সংযত হয়ে কথা বলুন। কর্মক্ষেত্রে প্রতিটি কাজ মাথা ঠান্ডা রেখে করুন। এই রাশির ব্যবসায়ীদের প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। আপনি আজ একটি বই কিনে দীর্ঘক্ষণ ধরে সেটি পড়তে পারেন। জীবনসঙ্গীর কারণে আজ আপনি কোনও কাজে ব্যাঘাতের সম্মুখীন হবেন।প্রতিকার: প্রেমের জীবন সুখকর করে তোলার লক্ষ্যে ভালোবাসার মানুষকে সুগন্ধি উপহার দিন।মিথুন রাশি: শরীর নিয়ে অযথা চিন্তা করবেন না। কারণ, আজ আপনি শারীরিক দিক থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ থাকবেন। এই রাশিচক্রের বিবাহিত ব্যক্তিরা তাঁদের শ্বশুরবাড়ির কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আজকের দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে। আপনার আজ একজন যত্নশীল বন্ধুর সঙ্গে দেখা হবে। কর্মক্ষেত্রে আজকের দিনটিকে সঠিকভাবে কাজে লাগালে আপনার লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আজ আপনার কোথাও বেড়াতে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলি নিয়েছেন কিনা তা অবশ্যই ভালোভাবে যাচাই করে নিন। আজকের দিনটি আপনার বিবাহিত জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে বিবেচিত হবে।প্রতিকার: আর্থিক দিক থেকে উন্নতির লক্ষ্যে দাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন এবং তাঁর প্রতিটি পরামর্শ মেনে চলুন।কর্কট রাশি: কোথাও কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে অবশ্যই ঠান্ডা মাথায় সেটিকে সমাধানের চেষ্টা করুন। মন থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রেখে প্রতিটি কাজ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করুন। অতীতের কোনও বিনিয়োগের মাধ্যমে আপনার লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি কাজ সর্তকতার সঙ্গে করুন। যাঁদের সঙ্গে থাকলে আপনার অযথা সময় নষ্ট হয় তাঁদের সঙ্গ অবিলম্বে পরিত্যাগ করুন। আজকের দিনটি আপনার বিবাহিত জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে বিবেচিত হবে।প্রতিকার: পারিবারিক জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে ফুল গাছের টবে কালো বা সাদা রঙের মার্বেল পাথর অথবা নুড়ি রাখুন।সিংহ রাশি: মন থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রেখে প্রতিটি কাজ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করলে আপনার লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আপনার একটি অস্থাবর সম্পত্তি আজ চুরি হতে পারে। তাই, এদিক থেকে অবশ্যই সতর্ক থাকুন। এই রাশির কিছু অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের একটি বিশেষ করে দিতের মাধ্যমে অত্যন্ত গর্বিত হবেন। বিস আপনি আজ আপনার দক্ষতা অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন। প্রেমের জন্য এই দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। আপনার কাছে আজ কিছুটা অবসর সময় থাকলেও আপনি সেটি একাকী অতিবাহিত করতে পছন্দ করবেন। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: আর্থিক দিক থেকে উন্নতির লক্ষ্যে সূর্য চালিশা এবং আরতি পাঠ করুন।কন্যা রাশি: শরীরের প্রতি অবশ্যই যত্নশীল হন। খাওয়া-দাওয়ার বিষয়ে আজ আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। নিজের ওজনকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করুন। ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে অযথা অর্থব্যয়ের বদভ্যাস পরিত্যাগ করে সঠিকভাবে অর্থ সঞ্চয়ের প্রতি মনোযোগী হন। প্রত্যেকের সঙ্গে ঠান্ডা মাথায় কথা বলুন। প্রেমের জন্য এই দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। কোথাও বিনিয়োগের মাধ্যমে আপনার লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নিজের চেহারা এবং ব্যক্তিত্ব ঠিক করার জন্য আজ আপনার কাছে অনেকটা সময় থাকবে। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: পারিবারিক জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে গরুকে বার্লি খেতে দিন।তুলা রাশি: আপনার মধ্যে আজ ভরপুর আত্মবিশ্বাস বজায় থাকবে। তাই, এই দিনটিকে অবশ্যই ভালোভাবে কাজে লাগান। যাঁরা বাজি বা জুয়া খেলে অর্থব্যয় করেন তাঁরা আজ বিপুল ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন। তাই, এহেন বদভ্যাস থেকে বিরত থাকুন। মন থেকে অবশ্যই সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখুন। বাড়ির কিছু কাজ করতে গিয়ে আজ আপনি ক্লান্ত হয়ে পড়বেন। প্রেমের জন্য এই দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। আপনি আজ একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তির কাছ থেকে আশীর্বাদ লাভ করবেন। যার ফলে আপনার মন ভালো হয়ে যাবে। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: আর্থিক দিক থেকে উন্নতির লক্ষ্যে বাড়িতে অ্যাকোরিয়াম রেখে মাছকে খাবার দিন।বৃশ্চিক রাশি: শরীরের প্রতি অবশ্যই যত্নশীল হন। আপনি আজ ঘাড় অথবা পিঠের ব্যথায় ভুগতে পারেন। কোনও কাজে সঠিক পরিশ্রমের মাধ্যমে আপনি কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করবেন। শুধু তাই নয়, আজ আপনি আর্থিক পুরস্কারও পেতে পারেন। অতিথিদের সঙ্গে দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে। ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে আজ আপনি কোথাও বেড়াতে যেতে পারেন। কোনও নতুন যৌথ উদ্যোগে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকুন। প্রয়োজন পড়লে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কিছুটা সময় অতিবাহিত করতে পারেন। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে বিছানার চারটি কোণে তামার পেরেক লাগান।ধনু রাশি: মন থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রেখে প্রতিটি কাজ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করুন। কোথাও অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে আপনার লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আত্মীয় এবং বন্ধুদের সঙ্গে দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে। ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে আজ আপনি একটি সুন্দর বার্তা পেতে পারেন। যার ফলে আপনার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে। কোনও নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে আপনার লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলির পুনর্মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দিনটি অবশ্যই ভালো। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে বিছানার পাশে সারারাত তামার পাত্রে জল রাখুন এবং পরেরদিন সকালে কাছাকাছি থাকা একটি গাছের শিকড়ে সেই জল ঢেলে দিন।মকর রাশি: মন থেকে অবশ্যই সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রেখে প্রতিটি কাজ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করুন। কোথাও অর্থ বিনিয়োগের আগে সমস্ত তথ্য ভালোভাবে জেনে নেওয়ার চেষ্টা করুন। ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে আজ আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নতির সম্মুখীন হবেন। যার ফলে আপনার পুরো পরিবারে খুশির আমেজ বজায় থাকবে। প্রেমের জন্য এই দিনটি খুব একটা খারাপ নয়। কর্মক্ষেত্রে আপনার চারপাশে কী কী ঘটছে সেদিকে সতর্ক থাকুন। নাহলে, কেউ আপনার কোনও পরিকল্পনা ভেস্ত দিতে পারেন। বিবাহিত জীবনে কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে নিজেরাই তা মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন।প্রতিকার: পেশাগত জীবনে উন্নতির লক্ষ্যে ‘ওম ক্ষিতি পুত্রায় বিদ্মাহে লোহিতংগায় ধীমহি তন্নৌ ভৌমঃ প্রচৌদয়াত’ মন্ত্রটি প্রতিদিন ১১ বার জপ করুন।কুম্ভ রাশি: প্রত্যেকের সঙ্গে আজ অবশ্যই ঠান্ডা মাথায় কথা বলুন। এই রাশির কিছু ব্যবসায়ী তাঁদের বন্ধুত্ব বন্ধুদের সহায়তায় আর্থিক দিক থেকে লাভবান হতে পারেন। প্রেমের জীবনে আজ আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে কোনও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে কারোর দ্বারা প্রভাবিত হবেন না। খেলাধুলার প্রতি অযথা সময় নষ্ট করবেন না। এই রাশির পড়ুয়াদের পড়াশোনার বিষয়ে মনোযোগী হতে হবে। বিবাহিত জীবনে কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে নিজেরাই তা মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন।প্রতিকার: পারিবারিক জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে ভগবান বিষ্ণুর চতুর্থ অবতার নরসিংহের পুজো করুন এবং নরসিংহ কবচ (সুরক্ষার জন্য বর্ম) জপ করুন।মীন রাশি: আপনার মধ্যে আজ ভরপুর আত্মবিশ্বাস বজায় থাকবে। তাই, এই দিনটিকে অবশ্যই সঠিকভাবে কাজে লাগান। কোথাও কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে আজ আপনি দ্রুত সেটিকে সমাধান করে ফেলতে পারবেন। আর্থিক দিক থেকে আজকের দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। শুধু তাই নয়, পূর্বে আপনার কাছ থেকে অর্থ ধার নিয়েছিলেন এমন একজন ব্যক্তি আজ সেই অর্থ আপনাকে ফেরত দিতে পারেন। বন্ধুদের সঙ্গে ঠান্ডা মাথায় কথা বলুন। প্রেমের জন্য এই দিনটি খুব একটা খারাপ নয়। বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আজ আপনার যোগাযোগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। আজ অবশ্যই নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করুন। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: পারিবারিক জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে প্রতিদিন বিশুদ্ধ মধু সেবন করুন।
পিএসএল ও আইপিএলে আজ একটি করে ম্যাচ। হামজা চৌধুরীর লেস্টার ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপে মুখোমুখি হবে শেফিল্ড ওয়েনসডের।পিএসএলমুলতান-রাওয়ালপিন্ডিরাত ৮টা, টি স্পোর্টসআইপিএলকলকাতা-পাঞ্জাবরাত ৮টা, স্টার স্পোর্টস ১, ২ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপশেফিল্ড ওয়েনসডে-লেস্টাররাত ৮টা, ফ্যানকোডসিরি ‘আ’জুভেন্টাস-জেনোয়ারাত ১০টা, ডিএজেডএননাপোলি-এসি মিলানরাত ১২-৪৫ মি., ডিএজেডএনলা লিগাজিরোনা-ভিয়ারিয়ালরাত ১টা, বিগিন অ্যাপ
बस.. तुम से मिलने की देर थी,बस.. तुम से मिलने की देर थी।सितारे सितारे,मिले हैं सितारे।तभी तो हुए हैं,नज़ारे तुम्हारे।सितारे सितारे,मिले हैं सितारे।तभी तो हुए हैं,नज़ारे तुम्हारे।बस.. तुम से मिलने की देर थी,तुम से मिलने की देर थी,तुम से मिलने की देर थी।बस.. तुम से मिलने की देर थी,तुम से मिलने की देर थी,तुम से मिलने की देर थी।जिस पे रखे तुमने क़दम,अब से मेरा भी रास्ता है।जैसे मेरा तुम से कोई,पिछले जनम का वास्ता है।जिस पे रखे तुमने क़दम,अब से मेरा भी रास्ता है।जैसे मेरा तुम से कोई,पिछले जनम का वास्ता है।अधूरे अधूरे,थे वो दिन हमारे।तुम्हारे बिना जो,गुज़ारे थे सारे।सितारे सितारे,मिले हैं सितारे।तभी तो हुए हैं,नज़ारे तुम्हारे।बस.. तुम से मिलने की देर थी,बस.. तुम से मिलने की देर थी।बस.. तुम से मिलने की देर थी,तुम से मिलने की देर थी,तुम से मिलने की देर थी। English Version.......................................................................................................................................................................Bas.. Tum Se Milne Ki Der ThiBas.. Tum Se Milne Ki Der ThiSitaare SitaareMile Hain SitaareTabhi Toh Huye HainNazaare TumhareSitaare SitaareMile Hain SitaareTabhi Toh Huye HainNazaare TumhareBas.. Tum Se Milne Ki Der ThiTum Se Milne Ki Der ThiTum Se Milne Ki Der Thi..Bas.. Tum Se Milne Ki Der ThiTum Se Milne Ki Der ThiTum Se Milne Ki Der Thi..Jis Pe Rakhe Tum Ne QadamAb Se Mera Bhi Raasta HaiJaise Mera Tum Se KoiPichhle Janam Ka Vaasta HaiJis Pe Rakhe Tum Ne QadamAb Se Mera Bhi Raasta HaiJaise Mera Tum Se KoiPichhle Janam Ka Vaasta HaiAdhoore AdhooreThhe Vo Din HumareTumhare Bina JoGuzaare Thhe Saare..Sitaare SitaareMile Hain SitaareTabhi Toh Huye HainNazaare TumhareBas Tum Se Milne Ki Der ThiBas Tum Se Milne Ki Der ThiBas Tum Se Milne Ki Der ThiTum Se Milne Ki Der ThiTum Se Milne Ki Der Thi..
Song : Amra ShobaiWeb Series : Montu Pilot season 3Singer : Ishan Mitra (Male version)Composition : Amit ChatterjeeLyricist : Debaloy BhattacharyaProgramming : Shubhro BhattacharyaLabel : SVF Music.................................................................................................................................................................আমরা সবাই সবাই শুধু হেরে যাইশুধু কিছু রঙ ছড়াই,স্মৃতির শহর শহর মাটি আর খড়আহত নগর তোকে চায়।হারায় হারায় সব এমনি হারায়স্বপ্নে দাঁড়ায় চেনা মুখ,এ তুমি আজ আজ বৃষ্টির সাজসেজেছ হারাবার মতই ..ভেসে যায়, ভেসে যায় সীমানা ছাড়ায়যারা ভালবেসেছিল বন্দর,যদি সে আবার আবার, শুধু একবারফিরে তাকাবার মতই।প্রান্তরে প্রান্তরে কেউ কোনও অন্তরেকেটেছে নিজের হাতে শেষ পরিখা,আমরা সবাই সবাই গল্প সাজাইঅল্প বাঁচার প্রয়োজন,এ তুমি কার কার চেয়েছ আবারদু’হাতে তোমার আয়োজন।হারায় হারায় সব এমনি হারায়স্বপ্নে দাঁড়ায় চেনা মুখ,এ তুমি আজ আজ বৃষ্টির সাজসেজেছ হারাবার মতই ..আমরা সবাই সবাই শুধু হেরে যাইশুধু কিছু রঙ ছড়াই,স্মৃতির শহর শহর মাটি আর খড়আহত নগর তোকে চায়।
Song : Raat Kototuku DewalerWeb Series : Montu Pilot season 3Singer : Ishan MitraComposition : Amit ChatterjeeLyricist : Debaloy BhattacharyaProgramming : Atanu MitraLabel : SVF Music.......................................................................................................................................................................রাত কতটুকু দেওয়ালেরতার আশা ছিল খেয়ালে,কার তাতে কী এসে যায়, হারালে।ক্ষত যা ছিল গোলাপেরবাকি যা কিছু প্রলাপের,কার তাতে কী ক্ষতি হয়, ফুরোলে।এই চলে যাওয়া আলেয়ার মত মৃত নদীখাতেবিষাদ বাগান জুড়ে আগুন ছড়ায় নিজে হাতে,যত পায়রা মরেছে রোজ পুড়ে যাওয়া পালকের শোকেতাদের মৃত ছায়া আকাশে প্রচার করে তোকে।রাত কতটুকু দেওয়ালেরতার আশা ছিল খেয়ালে,কার তাতে কী এসে যায়, হারালে।ক্ষত যা ছিল গোলাপেরবাকি যা কিছু প্রলাপের,কার তাতে কী ক্ষতি হয়, ফুরোলে।আমরা ফিরব এই মৃত শহরে ভুল বিশ্বাসেখুঁজে গেছি কাকে বলে নিশ্বাস আমাদেরই লাশে,আমরা শিখেছি এক আলপথে হাত ধরে থাকাআমরা থেকেছি এক গলিপথ ভালবেসে একা।রাত কতটুকু দেওয়ালেরতার আশা ছিল খেয়ালে,কার তাতে কী এসে যায়, হারালে।
কয়েক মাস পরে। ফাল্গুন মাসের প্রথম। লবটুলিয়া হইতে কাছারি ফিরিতেছি, জঙ্গলের মধ্যে কুণ্ডীর ধারে বাংলা কথাবার্তায় ও হাসির শব্দে ঘোড়া থামাইলাম। যত কাছে যাই, ততই আশ্চর্য হই। মেয়েদের গলাও শোনা যাইতেছে-ব্যাপার কি? জঙ্গলের মধ্যে ঘোড়া ঢুকাইয়া কুণ্ডীর ধারে লইয়া গিয়া দেখি বনঝাউয়ের ঝোপের ধারে শতরঞ্চি পাতিয়া আট-দশটি বাঙালি ভদ্রলোক বসিয়া গল্পগুজব করিতেছে, পাঁচ-ছয়টি মেয়ে কাছেই রান্না করিতেছে, ছয়-সাতটি ছোট ছোট ছেলেমেয়ে ছুটাছুটি করিয়া খেলা করিয়া বেড়াইতেছে। কোথা হইতে এতগুলি মেয়ে-পুরুষ এই ঘোর জঙ্গলে ছেলেপুলে লইয়া পিকনিক করিতে আসিল বুঝিতে না পারিয়া অবাক হইয়া দাঁড়াইয়া আছি, এমন সময় সকলের চোখ আমার দিকে পড়িল- একজন বাংলায় বলিল- এ ছাতুটা আবার কোথা থেকে এসে জুটল এ জঙ্গলে? আমব্রেলু?আমি ঘোড়া হইতে নামিয়া তাদের কাছে যাইতে যাইতে বলিলাম- আপনারা বাঙালি দেখছি- এখানে কোথা থেকে এলেন?তারা খুব আশ্চর্য হইল, অপ্রতিভও হইল। বলিল- ও, মশায় বাঙালি? হেঁ-হেঁ কিছু মনে করবেন না, আমরা ভেবেছি – হেঁ-হেঁ-বলিলাম- না না, মনে করবার আছে কি! তা আপনারা কোথা থেকে আসছেন বিশেষ মেয়েদের নিয়ে-আলাপ জমিয়া গেল। এই দলের মধ্যে প্রৌঢ় ভদ্রলোকটি একজন রিটায়ার্ড ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, রায় বাহাদুর। বাকি সকলে তাঁর ছেলে, ভাইপো, ভাইঝি, মেয়ে, নাতনি, জামাই, জামাইয়ের বন্ধু-ইত্যাদি। রায় বাহাদুর কলিকাতায় থাকিতে একখানি বই পড়িয়া জানিতে পারেন, পূর্ণিয়া জেলায় খুব শিকার মেলে, তাই শিকার করিবার কোনো সুবিধা হয় কিনা দেখিবার জন্য পূর্ণিয়ায় তাঁর ভাই মুন্সেফ, সেখানেই আসিয়াছিলেন। আজ সকালে সেখান হইতে ট্রেনে চাপিয়া বেলা দশটার সময় কাটারিয়া পৌঁছেন। সেখান হইতে নৌকা করিয়া কুশী নদী বাহিয়া এখানে পিকনিক করিতে আসিয়াছেন-কারণ সকলের মুখেই নাকি শুনিয়াছেন লবটুলিয়া বোমাইবুরু ও ফুলকিয়া বইহারের জঙ্গল না দেখিয়া গেলে জঙ্গল দেখাই হইল না। পিকনিক সারিয়াই চার মাইল হাঁটিয়া মোহনপুরা জঙ্গলের নিচে কুশী নদীতে গিয়া নৌকা ধরিবেন- ধরিয়া আজ রাত্রেই কাটারিয়া ফিরিয়া যাইবেন।আমি সত্যই অবাক হইয়া গেলাম। সম্বলের মধ্যে দেখিলাম ইহাদের সঙ্গে আছে একটা দো-নলা শট-গান্- ইহাই ভরসা করিয়া এ ভীষণ জঙ্গলে ইহারা ছেলেমেয়ে লইয়া পিকনিক করিতে আসিয়াছে! অবশ্য, সাহস আছে অস্বীকার করিব না, কিন্তু অভিজ্ঞ রায় বাহাদুরের আর একটু সাবধান হওয়া উচিত ছিল। মোহনপুরা জঙ্গলের নিকট দিয়া এদেশের জংলী লোকেরাই সন্ধ্যার পূর্বে যাইতে সাহস করে না বন্য মহিষের ভয়ে। বাঘ বার হওয়াও আশ্চর্য নয়। বুনো শুয়োর আর সাপের তো কথাই নাই। ছেলেমেয়ে লইয়া পিকনিক করিতে আসিবার জায়গা নয় এটা।রায় বাহাদুর আমাকে কিছুতেই ছাড়িবেন না। বসিতে হইবে, চা খাইতে হইবে। আমি এ জঙ্গলে কি করি, কি বৃত্তান্ত। আমি কি কাঠের ব্যবসা করি? নিজের ইতিহাস বলিবার পরে তাঁহাদিগকে সবসুদ্ধ কাছারিতে রাত্রিযাপন করিতে অনুরোধ করিলাম। কিন্তু তাঁহারা রাজি হইলেন না। রাত্রি দশটার ট্রেনে কাটারিয়াতে উঠিয়া পূর্ণিয়া আজই রাত বারোটায় পৌঁছিতে হইবে। না ফিরিলে বাড়িতে সকলে ভাবিবে, কাজেই থাকিতে অপারগ-ইত্যাদি।জঙ্গলের মধ্যে ইহারা এত দূর কেন পিকনিক করিতে আসিয়াছে তাহা বুঝিলাম না। লবটুলিয়া বইহারের উন্মুক্ত প্রান্তর বনানী ও দূরের পাহাড়রাজির শোভা, সূর্যাস্তের রং, পাখির ডাক, দশ হাত দূরে বনের মধ্যে ঝোপের মাথায় মাথায় এই বসন্তকালে কত চমৎকার ফুল ফুটিয়া রহিয়াছে- এসবের দিকে ইহাদের নজর নাই দেখিলাম। ইহারা কেবল চিৎকার করিতেছে, গান গাহিতেছে, ছুটাছুটি করিতেছে, খাওয়ার তরিবৎ কিসে হয়, সে-ব্যবস্থা করিতেছে। মেয়েদের মধ্যে দুটি কলিকাতায় কলেজে পড়ে, বাকি দু-তিনটি স্কুলে পড়ে। ছেলেগুলির মধ্যে একজন মেডিকেল কলেজের ছাত্র, বাকিগুলি বিভিন্ন স্কুল-কলেজে পড়ে। কিন্তু প্রকৃতির এই অত্যাশ্চর্য সৌন্দর্যময় রাজ্যে দৈবাৎ যদি আসিয়াই পড়িয়াছে, দেখিবার চোখ নাই আদৌ। প্রকৃতপক্ষে ইহারা আসিয়াছিল শিকার করিতে-খরগোশ, পাখি, হরিণ-পথের ধারে যেন ইহাদের বন্দুকের গুলি খাইবার অপেক্ষায় বসিয়া আছে।যে মেয়েগুলি আসিয়াছে, এমন কল্পনার-লেশ-পরিশূন্য মেয়ে যদি কখনো দেখিয়াছি। তাহারা ছুটাছুটি করিতেছে, বনের ধার হইতে রান্নার জন্য কাঠ কুড়াইয়া আনিতেছে, মুখে বকুনির বিরাম নাই- কিন্তু একবার কেহ চারিধারে চাহিয়া দেখিল না যে কোথায় বসিয়া তাহারা খিচুড়ি রাঁধিতেছে, কোন্ নিবিড় সৌন্দর্যভরা বনানী-প্রান্তে!একটি মেয়ে বলিল- ‘টিনকার্টা’ ঠুকবার বড্ড সুবিধে এখানে, না? কত পাথরের নুড়ি!আর একটি মেয়ে বলিল- উঃ, কি জায়গা! ভালো চাল কোথাও পাবার জো নেই- কাল সারা টাউন খুঁজে বেড়িয়েছি- কি বিশ্রী মোটা চাল- তোমরা আবার বলছিলে পোলাও হবে!ইহারা কি জানে, যেখানে বসিয়া তারা রান্না করিতেছে, তার দশ-বিশ হাতের মধ্যে রাত্রের জ্যোৎস্নায় পরীরা খেলা করিয়া বেড়ায়?ইহারা সিনেমার গল্প শুরু করিয়াছে। পূর্ণিয়ায় কালও রাত্রে তাহারা সিনেমা দেখিয়াছে, তা নাকি যৎপরোনাস্তি বাজে। এইসব গল্প। সঙ্গে সঙ্গে কলিকাতার সিনেমার সঙ্গে তাহার তুলনা করিতেছে। ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে, কথা মিথ্যা নয়। বৈকাল পাঁচটার সময় ইহারা চলিয়া গেল।যাইবার সময় কতকগুলি খালি জমাট দুধের ও জ্যামের টিন ফেলিয়া রাখিয়া গেল। লবটুলিয়া জঙ্গলের গাছপালার তলায় সেগুলি আমার কাছে কি খাপছাড়াই দেখাইতেছিল!বসন্তের শেষ হইতেই এবার লবটুলিয়া বইহারের গম পাকিয়া উঠিল। আমাদের মহালে রাই সরিষার চাষ ছিল গত বৎসর খুব বেশি। এবার অনেক জমিতে গমের আবাদ, সুতরাং এবছর এখানে কাটুনী মেলার সময় পড়িল বৈশাখের প্রথমেই।কাটুনী মজুরদের মাথায় যেন টনক আছে, তাহাদের দল এবার শীতের শেষে আসে নাই, এ সময়ে দলে দলে আসিয়া জঙ্গলের ধারে, মাঠের মধ্যে সর্বত্র খুপরি বাঁধিয়া বাস করিতে শুরু করিয়াছে। দুই-তিন হাজার বিঘা জমির ফসল কাটা হইবে, সুতরাং মজুরও আসিয়াছে প্রায় তিন-চার হাজারের কম নয়। আরো শুনিলাম আসিতেছে।আমি সকাল হইলেই ঘোড়ায় বাহির হই, সন্ধ্যায় ঘোড়ার পিঠ হইতে নামি। কত নূতন ধরনের লোক আসিতে আরম্ভ করিয়াছে, ইহাদের মধ্যে কত বদমাইশ, গুণ্ডা, চোর, রোগগ্রস্ত-সকলের উপর নজর না রাখিলে এসব পুলিসবিহীন স্থানে একটা দুর্ঘটনা যখন-তখন ঘটিতে পারে।দু-একটি ঘটনা বলি।একদিন দেখি এক জায়গায় দুটি বালক ও একটি বালিকা রাস্তার ধারে বসিয়া কাঁদিতেছে।ঘোড়া হইতে নামিলাম।জিজ্ঞাসা করিলাম-কি হয়েছে তোমাদের?উত্তরে যাহা বলিল উহার মর্ম এইরূপঃ উহাদের বাড়ি আমাদের মহালে নয়, নন্দলাল ওঝা গোলাওয়ালার গ্রামে। উহারা সহোদর ভাই-বোন, এখানে কাটুনী মেলা দেখিতে আসিয়াছিল। আজই আসিয়া পৌঁছিয়াছে, এবং কোথায় নাকি লাঠি ও দড়ির ফাঁসের জুয়াখেলা হইতেছিল, বড় ছেলেটি সেখানে জুয়া খেলিতে আরম্ভ করে। একটা লাঠির যে-দিকটা মাটিতে ঠেকিয়া আছে সেই প্রান্তটা দড়ি দিয়া জড়াইয়া দিতে হয়, যদি দড়ি খুলিতে খুলিতে লাঠির আগায় ফাঁস জড়াইয়া যায়, তবে খেলাওয়ালা খেলুড়েকে এক পয়সায় চার পয়সা হিসাবে দেয়।বড় ভাইয়ের কাছে ছিল দশ আনা পয়সা, সে একবারও লাঠিতে ফাঁস বাঁধাইতে পারে নাই, সব পয়সা হারিয়া ছোট ভাইয়ের আট আনা ও পরিশেষে ছোট বোনের চার আনা পয়সা পর্যন্ত লইয়া বাজি ধরিয়া সর্বস্বান্ত হইয়াছে! এখন উহাদের খাইবার পয়সা নাই, কিছু কেনা বা দেখাশোনা তো দূরের কথা।আমি তাহাদের কাঁদিতে বারণ করিয়া তাহাদিগকে লইয়া জুয়াখেলার অকুস্থানের দিকে চলিলাম। প্রথমে তাহারা জায়গাই স্থির করিতে পারে না, পরে একটা হরীতকী গাছ দেখাইয়া বলিল- এরই তলায় খেলা হচ্ছিল। জনপ্রাণী নাই সেখানে। কাছারির রূপসিং জমাদারের ভাই সঙ্গে ছিল, সে বলিল- জুয়াচোরেরা কি এক জায়গায় বেশিক্ষণ থাকে হুজুর? লম্বা দিয়েছে কোন্ দিকে।বিকালের দিকে জুয়াড়ী ধরা পড়িল। সে মাইল তিন দূরে একটি বস্তিতে জুয়া খেলিতেছিল, আমার সিপাহীরা দেখিতে পাইয়া তাহাকে আমার নিকট হাজির করিল। ছেলেমেয়েগুলিও দেখিয়াই চিনিল।লোকটা প্রথমে পয়সা ফেরত দিতে চায় না। বলে, সে তো জোর করিয়া কাড়িয়া লয় নাই, উহারা স্বেচ্ছায় খেলিয়া পয়সা হারিয়াছে, ইহাতে তাহার দোষ কি? অবশেষে তাহাকে ছেলেমেয়েদের সব পয়সা তো ফেরত দিতেই হইল-আমি তাহাকে পুলিসে দিবার আদেশ দিলাম।সে হাতে পায়ে ধরিতে লাগিল। বলিলাম-তোমার বাড়ি কোথায়?– বালিয়া জেলা, বাবুজী।– এ রকম করে লোককে ঠকাও কেন? কত পয়সা ঠকিয়েছ লোকজনের?– গরিব লোক, হুজুর! আমায় ছেড়ে দিন এবার। তিন দিনে মোটে দু-টাকা তিন আনা রোজগার-– তিন দিনে খুব বেশি রোজগার হয়েছে মজুরদের তুলনায়।– হুজুর, সারা বছরে এ-রকম রোজগার ক’বার হয়? বছরে ত্রিশ-চল্লিশ টাকা আয়।লোকটাকে সেদিন ছাড়িয়া দিয়াছিলাম- কিন্তু আমার মহাল ছাড়িয়া সেদিনই চলিয়া যাইবার কড়ারে। আর তাকে কোনোদিন কেউ আমাদের মহালের সীমানার মধ্যে দেখেও নাই।এবার মঞ্চীকে কাটুনী মজুরদের মধ্যে না দেখিয়া উদ্বেগ ও বিস্ময় দুই-ই অনুভব করিলাম। সে বারবার বলিয়াছিল গম কাটিবার সময়ে নিশ্চয়ই আমাদের মহালে আসিবে। ফসল কাটার মেলা আসিল, চলিয়াও গেল- কেন যে সে আসিল না, কিছুই বুঝিলাম না।অন্যান্য মজুরদের নিকট জিজ্ঞাসা করিয়াও কোনো সন্ধান মিলিল না। মনে ভাবিলাম, এত বিস্তীর্ণ ফসলের মহাল কাছাকাছির মধ্যে আর কোথাও নাই, এক কুশী নদীর দক্ষিণে ইসমাইলপুরের দ্বিয়ারা মহাল ছাড়া। কিন্তু সেখানে কেন সে যাইবে, অত দূরে, যখন মজুরি উভয় স্থানেই একই।অবশেষে ফসলের মেলার শেষ দিকে জনৈক গাঙ্গোতা মজুরের মুখে মঞ্চীর সংবাদ পাওয়া গেল। সে মঞ্চীকে ও তাহার স্বামী নক্ছেদী ভকতকে চেনে। একসঙ্গে বহু জায়গায় কাজ করিয়াছে নাকি। তাহারই মুখে শুনিলাম গত ফাল্গুন মাসে সে উহাদের আকবরপুর গবর্নমেন্ট খাসমহলে ফসল কাটিতে দেখিয়াছে। তাহার পর তাহারা যে কোথায় গেল সে জানে না।ফসলের মেলা শেষ হইয়া গেল জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি, এমন সময় একদিন সদর কাছারির প্রাঙ্গণে নক্ছেদী ভকতকে দেখিয়া বিস্মিত হইলাম। নক্ছেদী আমার পা জড়াইয়া হাউমাউ করিয়া কাঁদিয়া উঠিল। আরো বিস্মিত হইয়া পা ছাড়াইয়া লইয়া বলিলাম- কি ব্যাপার? তোমরা এবার ফসলের সময় আস নি কেন? মঞ্চী ভালো আছে তো? কোথায় সে?উত্তরে নক্ছেদী যাহা বলিল তাহার মোট মর্ম এই, মঞ্চী কোথায় তাহা সে জানে না। খাসমহলে কাজ করিবার সময়েই মঞ্চী তাহাদের ফেলিয়া কোথায় পালাইয়া গিয়াছে। অনেক খোঁজ করিয়াও তাহার পাত্তা পাওয়া যায় নাই।বিস্মিত ও স্তম্ভিত হইলাম। কিন্তু দেখিলাম বৃদ্ধ নক্ছেদী ভকতের প্রতি আমার কোনো সহানুভূতি নাই, যা কিছু ভাবনা সবই সেই বন্য মেয়েটির জন্য। কোথায় সে গেল, কে তাহাকে ভুলাইয়া লইয়া গেল, কি অবস্থায় কোথায় বা সে আছে। সস্তায় বিলাসদ্রব্যের প্রতি তাহার যে রকম আসক্তি লক্ষ্য করিয়াছি সে-সবের লোভ দেখাইয়া তাহাকে ভুলাইয়া লইয়া যাওয়াও কষ্টকর নয়। তাহাই ঘটিয়াছে নিশ্চয়।জিজ্ঞাসা করিলাম- তার ছেলে কোথায়?– সে নেই। বসন্ত হয়ে মারা গিয়েছে মাঘ মাসে।অত্যন্ত দুঃখিত হইলাম শুনিয়া। বেচারি পুত্রশোকেই উদাসী হইয়া, যেদিকে দু-চোখ যায়, চলিয়া গিয়াছে নিশ্চয়ই। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলাম – তুলসী কোথায়?– সে এখানেই এসেছে। আমার সঙ্গেই আছে। আমায় কিছু জমি দিন হুজুর। নইলে আমরা বুড়োবুড়ি, ফসল কেটে আর চলে না। মঞ্চী ছিল, তার জোরে আমরা বেড়াতাম। সে আমর হাত-পা ভেঙ্গে দিয়ে গিয়েছে!সন্ধ্যার পর নক্ছেদীর খুপরিতে গিয়া দেখিলাম তুলসী তাহার ছেলেমেয়ে লইয়া চীনার দানা ছাড়াইতেছে। আমায় দেখিয়া কাঁদিয়া উঠিল। দেখিলাম মঞ্চী চলিয়া যাওয়াতে সেও যথেষ্ট দুঃখিত। বলিল- হুজুর, সব ঐ বুড়োর দোষ। গোরমিণ্টের লোক মাঠে সব টিকে দিতে এল, বুড়ো তাকে চার আনা পয়সা ঘুষ দিয়ে তাড়ালে। কাউকে টিকে নিতে দিল না। বললে, টিকে নিলে বসন্ত হবে। হুজুর, তিন দিন গেল না. মঞ্চীর ছেলেটার বসন্ত হোলো, মারাও গেল। তার শোকে সে পাগলের মতো হয়ে গেল- খায় না, দায় না, শুধু কাঁদে।– তারপর?– তারপর হুজুর, খাসমহল থেকে আমাদের তাড়িয়ে দিলে। বললে-বসন্তে তোমাদের লোক মারা গিয়াছে, এখানে থাকতে দেবো না! এক ছোকরা রাজপুত মঞ্চীর দিকে নজর দিত। যেদিন আমরা খাসমহল থেকে চলে এলাম, সেই রাত্রেই মঞ্চী নিরুদ্দেশ হোলো। আমি সেদিন সকালে ঐ ছোকরাটাকে খুপরির কাছে ঘুরতে দেখেছি। ঠিক তার কাজ, হজুর! ইদানীং মঞ্চী বড় কলকাতা দেখব, কলকাতা দেখব, করত। তখনই জানি একটা কিছু ঘটবে।আমারও মনে পড়িল মঞ্চী আর-বছর কলিকাতা দেখিবার যথেষ্ট আগ্রহ দেখাইয়াছিল বটে। আশ্চর্য নয়, ধূর্ত রাজপুত যুবক সরলা বন্যমেয়েটিকে কলিকাতা দেখাইবার লোভ দেখাইয়া ভুলাইয়া লইয়া যাইবে।আমি জানি এ অবস্থায় এদেশের মেয়েদের শেষ পরিণতি হয় আসামের চা-বাগানে কুলিগিরিতে। মঞ্চীর অদৃষ্টে কি শেষকালে নির্বান্ধব আসামের পার্বত্য অঞ্চলে দাসত্ব ও নির্বাসন লেখা আছে?বৃদ্ধ নক্ছেদীর উপর খুব রাগ হইল। এই লোকটা যত নষ্টের মূল। বৃদ্ধ বয়সে মঞ্চীকে বিবাহ করিতে গিয়াছিল কেন? দ্বিতীয়, গবর্নমেণ্টের টিকাদারকে ঘুষ দিয়া বিদায় করিয়াছিল কেন? যদি উহাকে জমি দিই, সে ওর জন্য নয়, উহার প্রৌঢ়া স্ত্রী তুলসী ও ছেলেমেয়েগুলির মুখের দিকে চাহিয়াই দিব।দিলামও তাই। নাঢ়া-বইহারে শীঘ্র প্রজা বসাইতে হইবে, সদর আপিসের হুকুম আসিয়াছে, প্রথম প্রজা বসাইলাম নক্ছেদীকে।নাঢ়া-বইহারে ঘোর জঙ্গল। মাত্র দু-চার ঘর প্রজা সামান্য জঙ্গল কাটিয়া খুপরি বাঁধিতে শুরু করিয়াছে। নক্ছেদী প্রথমেই জঙ্গল দেখিয়া পিছাইয়া গিয়াছিল, বলিল-হুজুর দিনমানেই বাঘে খেয়ে ফেলে দেবে ওখানে-কাচ্চাবাচ্চা নিয়ে ঘর করি-তাহাকে স্পষ্ট বলিয়া দিলাম, তার পছন্দ না হয়, সে অন্যত্র দেখুক।নিরুপায় হইয়া নক্ছেদী নাঢ়া-বইহারের জঙ্গলেই জমি লইল।সে এখানে আসা পর্যন্ত আমি কখনো তাহার খুপরিতে যাই নাই। তবে সেদিন সন্ধ্যার সময় নাঢ়া বইহারের জঙ্গলের মধ্যে দিয়া আসিতে দেখি ঘন জঙ্গলের মধ্যে খানিকটা ফাঁকা জায়গা-নিকটে কাশের দুটি ছোট খুপরি। একটার ভিতর হইতে আলো বাহির হইতেছে।সেইটাই যে নক্ছেদীর তা আমি জানিতাম না, ঘোড়ার পায়ের শব্দ শুনিয়া যে প্রৌঢ়া স্ত্রীলোকটি খুপরির বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইল- দেখিলাম সে তুলসী।– তোমরা এখানে জমি নিয়েছ? নক্ছেদী কোথায়?তুলসী আমায় দেখিয়া থতমত খাইয়া গিয়াছে। ব্যস্তসমস্ত হইয়া সে গমের ভুসি-ভরা একটা চটের গদি পাতিয়া দিয়া বলিল-নামুন বাবুজী- বসুন একটু। ও গিয়েছে লবটুলিয়া, তেল নুন কিনে আনতে দোকানে। বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছে।– তুমি একা এই ঘন বনের মধ্যে আছ?– ও-সব সয়ে গিয়েছে, বাবুজী। ভয়ডর করলে কি আমাদের গরিবদের চলে? একা তো থাকতে হত না-কিন্তু অদৃষ্ট যে খারাপ। মঞ্চী যত দিন ছিল, জলে জঙ্গলে কোথাও ভয় ছিল না। কি সাহস, কি তেজ ছিল তার বাবুজী!তুলসী তাহার তরুণী সপত্নীকে ভালবাসিত। তুলসী ইহাও জানে এই বাঙালি বাবু মঞ্চীর কথা শুনিতে পাইলে খুশি হইবে।তুলসীর মেয়ে সুরতিয়া বলিল-বাবুজী, একটা নীলগাইয়ের বাচ্চা ধরে রেখেছি, দেখবেন? সেদিন আমাদের খুপরির পেছনের জঙ্গলে এসে বিকেলবেলা খস্খস্ করছিল-আমি আর ছনিয়া গিয়ে ধরে ফেলেছি। বড় ভালো বাচ্চা।বলিলাম-কি খায় রে?সুরতিয়া বলিল-শুধু চীনার দানার ভুসি আর গাছের কচি পাতা। আমি কচি কেঁদ পাতা তুলে এনে দিই।তুলসী বলিল-দেখা না বাবুজীকে-সুরতিয়া ক্ষিপ্রপদে হরিণীর মতো ছুটিয়া খুপরির পিছন দিকে অদৃশ্য হইল। একটু পরে তাহার বালিকা-কণ্ঠের চিৎকার শোনা গেল-আরে নীলগাইয়া তো ভাগলুয়া হৈ রে ছনিয়া-উধার-ইধার-জলদি পাকড়া-দুই বোনে হুটাপুটি করিয়া নীলগাইয়ের বাচ্চা পাকড়াও করিয়া ফেলিল এবং হাঁপাইতে হাঁপাইতে হাসিমুখে আমার সামনে আনিয়া হাজির করিল।অন্ধকারে আমার দেখিবার সুবিধার জন্য তুলসী একখানা জ্বলন্ত কাঠ উঁচু করিয়া ধরিল। সুরতিয়া বলিল, কেমন, ভালো না বাবুজী? একে খাবার জন্যে কাল রাত্রে ভালুক এসেছিল। ওই মহুয়া গাছে কাল ভালুক উঠেছিল মহুয়া ফুল খেতে-তখন অনেক রাত-বাপ মা ঘুমোয়, আমি সব টের পাই-তারপর গাছ থেকে নেমে আমাদের খুপরির পেছনে এসে দাঁড়াল। আমি একে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে শুই রাতে-ভালুকের পায়ের শব্দ পেয়ে ওর মুখ হাত দিয়ে জোর করে চেপে আরো জড়িয়ে ধরে শুয়ে রইলুম--ভয় করল না তোর, সুরতিয়া ?-ইস্! ভয় বই কি! ভয় আমি করি নে। কাঠ কুড় ুতে গিয়ে জঙ্গলে কত ভালুক-ঝোড় দেখি-তাতেও ভয় করি নে। ভয় করলে চলে বাবুজী?সুরতিয়া বিজ্ঞের মতো মুখখানা করিল।বড় বড় কলের চিমনির মতো লম্বা, কালো কেঁদ গাছের গুঁড়ি ঠেলিয়া আকাশে উঠিয়াছে খুপরির চারিধারে, যেন কালিফোর্নিয়া রেডউড গাছের জঙ্গল। বাদুড় ও নিশাচর কাঁকপাখির ডানা-ঝটাপটি ডালে ডালে, ঝোপে ঝোপে অন্ধকারে জোনাকির ঝাঁক জ্বলিতেছে, খুপরির পিছনের বনেই শিয়াল ডাকিতেছে-এই কয়টি ছোট ছেলেমেয়ে লইয়া উহাদের মা যে কেমন করিয়া এই নির্জন বনে-প্রান্তরে থাকে, তাহা বুঝিয়া ওঠা কঠিন। হে বিজ্ঞ, রহস্যময় অরণ্য, আশ্রিত জনের প্রতি তোমার সত্যই বড় কৃপা।কথায় কথায় বলিলাম-মঞ্চী নিজের জিনিস সব নিয়ে গিয়েছে?সুরতিয়া বলিল-ছোট মা কোনো জিনিস নিয়ে যায় নি। ওর যে বাক্সটা সেবার দেখেছিলেন-ফেলেই রেখে গিয়েছে। দেখবেন? আনছি।বাক্সটা আনিয়া সে আমার সামনে খুলিল। চিরুনি, ছোট আয়না, পুঁতির মালা, একখানা সবুজ-রঙের খেলো রুমাল-ঠিক যেন ছোট খুকির পুতুলখেলার বাক্স! সেই হিংলাজের মালাছড়াটা কিন্তু নাই, সেবার লবটুলিয়া খামারে সেই যেটা কিনিয়াছিল।কোথায় চলিয়া গেল নিজের ঘর-সংসার ছাড়িয়া কে বলিবে? ইহারা তো জমি লইয়া এতদিন পরে গৃহস্থালি পাতাইয়া বসবাস শুরু করিয়াছে, ইহাদের দলের মধ্যে সে-ই কেবল যে-ভবঘুরেই রহিয়া গেল!ঘোড়ায় উঠিবার সময় সুরতিয়া বলিল-আর একদিন আসবেন বাবুজী-আমরা পাখি ধরি ফাঁদ পেতে। নূতন ফাঁদ বুনেছি। একটা ডাহুক আর একটা গুড়গুড়ি পাখি পুষেছি। এরা ডাকলে বনের পাখি এসে ফাঁদে পড়ে-আজ আর বেলা নেই-নইলে ধরে দেখাতাম-নাঢ়া-বইহারের বন-প্রান্তরের পথে এত রাত্রে আসিতে ভয় ভয় করে। বাঁয়ে ছোট একটি পাহাড়ি ঝরনার জলস্রোত কুলকুল করিয়া বহিতেছে, কোথায় কি বনের ফুল ফুটিয়াছে, গন্ধে ভরা অন্ধকার এক-এক জায়গায় এত নিবিড় যে ঘোড়ার ঘাড়ের লোম দেখা যায় না, আবার কোথাও নক্ষত্রালোকে পাতলা।নাঢ়া বইহার নানাপ্রকার বৃক্ষলতা, বন্যজন্তু ও পাখিদের আশ্রয়স্থান- প্রকৃতি ইহার বনভূমি ও প্রান্তরকে অজস্র সম্পদে সাজাইয়াছে, সরস্বতী কুণ্ডী এই নাঢ়া-বইহারেরই উত্তর সীমানায়। প্রাচীন জরিপের থাক-নক্সায় দেখা যায় সেখানে কুশী নদীর প্রাচীন খাত ছিল-এখন মজিয়া মাত্র ঐ জলটুকু অবশিষ্ট আছে- অন্যদিকে সেই প্রাচীন খাতই ঘন অরণ্যে পরিণত-পুরা যত্র স্রোতঃ পুলিনমধুনা তত্র সরিতাম-কি অবর্ণনীয় শোভা দেখিলাম এই বনভূমির সেই নিস্তব্ধ অন্ধকার রাত্রে! কিন্তু মন খারাপ হইয়া গেল যখন বেশ বুঝিলাম নাঢ়া-বইহারের এ বন আর বেশি দিন নয়। এত ভালবাসি ইহাকে অথচ আমার হাতেই ইহা বিনষ্ট হইল। দু-বৎসরের মধ্যেই সমগ্র মহালটি প্রজাবিলি হইয়া কুশ্রী টোলা ও নোংরা বস্তিতে ছাইয়া ফেলিল বলিয়া। প্রকৃতি নিজের হাতে সাজানো তার শত বৎসরের সাধনার ফল এই নাঢ়া-বইহার, ইহার অতুলনীয় বন্য সৌন্দর্য ও দূরবিসর্পী প্রান্তর লইয়া বেমালুম অন্তর্হিত হইবে। অথচ কি পাওয়া যাইবে তাহার বদলে?কতকগুলি খোলার চালের বিশ্রী ঘর, গোয়াল, মকাই জনারের ক্ষেত, শোনের গাদা, দড়ির চারপাই, হনুমানজীর ধ্বজা, ফনিমনসার গাছ, যথেষ্ট দোক্তা, যথেষ্ট খৈনী, যথেষ্ট কলেরা ও বসন্তের মড়ক।হে অরণ্য, হে সুপ্রাচীন, আমায় ক্ষমা করিও।আর একদিন গেলাম সুরতিয়াদের পাখি-ধরা দেখিতে।সুরতিয়া ও ছনিয়া দুটি খাঁচা লইয়া আমার সঙ্গে নাঢ়া-বইহারের জঙ্গলের বাহিরে মুক্ত প্রান্তরের দিকে চলিল।বৈকালবেলা, নাঢ়া-বইহারের মাঠে সুদীর্ঘ ছায়া ফেলিয়া সূর্য পাহাড়ের আড়ালে নামিয়া পড়িয়াছে।একটা শিমুলচারার তলায় ঘাসের উপর খাঁচা দুটি নামাইল। একটিতে একটি বড় ডাহুক অন্যটিতে গুড়গুড়ি। এ দুটি শিক্ষিত পাখি, বন্য পাখিকে আকৃষ্ট করিবার জন্য ডাহুকটি অমনি ডাকিতে আরম্ভ করিল।গুড়গুড়িটা প্রথমত ডাকে নাই।সুরতিয়া শিস্ দিয়া তুড়ি দিয়া বলিল-বোলো রে বহিনিয়া-তোহর কির-গুড়গুড়ি অমনি ডাকিয়া উঠিল-গুড়-ড়-ড়-ড়-নিস্তব্ধ অপরাহে¦ বিস্তীর্ণ মাঠের নির্জনতার মধ্যে সে অদ্ভুত সুর শুধুই মনে আনিয়ে দেয় এমনি দিগন্তবিস্তীর্ণতার ছবি, এমনি মুক্ত দিক্চক্রবালের স্বপ্ন, ছায়াহীন জ্যোৎস্নালোক নিকটেই ঘাসের মধ্যে যেখানে রাশি রাশি হলুদ রঙের দুধলি ফুল ফুটিয়াছে তারই উপর ছনিয়া ফাঁদ পাতিল-যেন পাখির খাঁচার বেড়ার মতো, বাঁশের তৈরি। সেই বেড়া ক’খানা দিয়া গুড়গুড়ি-পাখির খাঁচাটা ঢাকিয়া দিল।সুরতিয়া বলিল-চলুন বাবুজী, লুকিয়ে বসি গে ঝোপের আড়ালে, মানুষ দেখলে চিড়িয়া ভাগবে।-সবাই মিলিয়া আমরা শাল-চারার আড়ালে কতক্ষণ ঘাপটি মারিয়া বসিয়া রহিলাম।-ডাহুকটি মাঝে মাঝে থামিতেছে-গুড়গুড়ির কিন্তু রবের বিরাম নাই-একটানা ডাকিয়াই চলিয়াছে- গুড়-ড়-ড়-ড়-সে কি মধুর অপার্থিব রব! বলিলাম- সুরতিয়া, তোদের গুড়গুড়িটা বিক্রি করবি? কত দাম?সুরতিয়া বলিল-চুপ চুপ বাবুজী, কথা বলবেন না-ঐ শুনুন বুনো পাখি আসছে-কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিবার পরে অন্য একটি সুর মাঠের উত্তর দিকে বন-প্রান্তর হইতে ভাসিয়া আসিল-গুড়-ড়-ড়-ড়।আমার শরীর শিহরিয়া উঠিল। বনের পাখি খাঁচার পাখির সুরে সাড়া দিয়েছে।ক্রমে সে সুর খাঁচার নিকটবর্তী হইতে লাগিল।কিছুক্ষণ ধরিয়া দুইটি পাখির রব পাশাপাশি শোনা যাইতেছিল, ক্রমে দুইটি সুর যেন মিশিয়া এক হইয়া গেল…হঠাৎ আবার একটা সুর… একটা পাখিই ডাকিতেছে…খাঁচার পাখিটা।ছনিয়া ও সুরতিয়া ছুটিয়া গেল, ফাঁদে পাখি পড়িয়াছে। আমিও ছুটিয়া গেলাম।ফাঁদে পা বাঁধাইয়া পাখিটা ঝট্পট্ করিতেছে। ফাঁদে পড়িবার সঙ্গে সঙ্গে তাহার ডাক বন্ধ হইয়া গিয়াছে-কি আশ্চর্য কাণ্ড! চোখকে যেন বিশ্বাস করা শক্ত।সুরতিয়া পাখিটা হাতে তুলিয়া দেখাইল-দেখুন বাবুজী, কেমন ফাঁদে পা আটকেছে। দেখলেন?সুরতিয়াকে বলিলাম-পাখি তোরা কি করিস!সে বলিল-বাবা তিরাশি-রতনগঞ্জের হাটে বিক্রি করে আসে। এক একটা গুড়গুড়ি দু’পয়সা-একটা ডাহুক সাত পয়সা।বলিলাম-আমাকে বিক্রি কর, দাম দেব।সুরতিয়া গুড়গুড়িটা আমায় এমনি দিয়া দিল-কিছুতেই তাহাকে পয়সা লওয়াইতে পারিলাম না।আশ্বিন মাস। এই সময় একদিন সকালে পত্র পাইলাম রাজা দোবরু পান্না মারা গিয়াছেন, এবং রাজপরিবার খুব বিপন্ন-আমি সময় পাইলে যেন যাই। পত্র দিয়াছে জগরু পান্না, ভানুমতীর দাদা।তখনি রওনা হইয়া সন্ধ্যার কিছু পূর্বে চক্মকিটোলা পৌঁছিয়া গেলাম। রাজার বড় ছেলে ও নাতি আমাকে আগাইয়া লইয়া গেল। শুনিলাম, রাজা দোবরু গোরু চরাইতে চরাইতে হঠাৎ পড়িয়া গিয়া হাঁটুতে আঘাতপ্রাপ্ত হন, শেষ পর্যন্ত হাঁটুর সেই আঘাতেই তাঁর মৃত্যুর কারণ ঘটে।রাজার মৃত্যুসংবাদ পাওয়া মাত্র মহাজন আসিয়া গোরু-মহিষ বাঁধিয়া রাখিয়াছে। টাকা না পাইলে সে গোরু-মহিষ ছাড়িবে না। এদিকে বিপদের উপর বিপদ, নূতন রাজার অভিষেক-উৎসব আগামীকল্য সম্পন্ন হইবে। তাহাতেও কিছু খরচ আছে। কিন্তু সে-টাকা কোথায়? তা ছাড়া গোরু-মহিষ মহাজনে যদি লইয়া যায়, তবে রাজপরিবারের অবস্থা খুবই হীন হইয়া পড়িবে-ঐ দুধের ঘি বিক্রয় করিয়া রাজার সংসারের অর্ধেক খরচ চলিত-এখন তাহাদের না খাইয়া মরিতে হইবে।শুনিয়া আমি মহাজনকে ডাকাইলাম। তার নাম বীরবর সিং। আমার কোনো কথাই সে দেখিলাম শুনিতে প্রস্তুত নয়। টাকা না পাইলে কিছুতেই সে গোরু-মহিষ ছাড়িবে না। লোকটা ভালো নয় দেখিলাম।ভানুমতী আসিয়া কাঁদিতে লাগিল। সে তাহার জ্যাঠামশায় অর্থাৎ প্রপিতামহকে বড়ই ভালবাসিত-জ্যাঠামশায় থাকিতে তাহারা যেন পাহাড়ের আড়ালে ছিল, যেমনি তিনি চোখ বুজিয়াছেন, আর অমনি এইসব গোলমাল! এইসব কথা বলিতে বলিতে ভানুমতীর চোখের জল কিছুতেই থামে না। বলিল-চলুন বাবুজী, আমার সঙ্গে-জ্যাঠামশায়ের গোর আপনাকে দেখিয়ে আনি পাহাড়ের উপর থেকে। আমার কিছু ভালো লাগছে না বাবুজী, কেবল ইচ্ছে হচ্ছে ওঁর কবরের কাছে বসে থাকি।বলিলাম-দাঁড়াও, মহাজনের একটা কি ব্যবস্থা করা যায় দেখি। তারপর যাব-কিন্তু মহাজনের কোনো ব্যবস্থা করা আপাতত সম্ভব হইল না। দুর্দান্ত রাজপুত মহাজন কারো অনুরোধ উপরোধ শুনিবার পাত্র নয়। তবে সামান্য একটু খাতির করিয়া আপাতত গোরু-মহিষগুলি এখানেই বাঁধিয়া রাখিতে সম্মত হইল মাত্র, তবে দুধ এক ফোঁটাও লইতে দিবে না। মাস দুই পরে এ দেনা শোধার উপায় হইয়াছিল-সেকথা এখন নয়।ভানুমতী দেখি একা ওদের বাড়ির সামনে দাঁড়াইয়া। বলিল- বিকেল হয়ে গিয়েছে, এর পর যাওয়া যাবে না, চলুন কবর দেখতে।ভানুমতী একা যে আমার সঙ্গে পাহাড়ে চলিল ইহাতে বুঝিলাম সরলা পর্বতবালা এখন আমাকে তাহার পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও পরমাত্মীয় মনে করে। এই পাহাড়ি বালিকার সরল ব্যবহার ও বন্ধুত্ব আমাকে মুগ্ধ করিয়াছে।বৈকালের ছায়া নামিয়াছে সেই বড় উপত্যকাটায়।ভানুমতী বড় তড়বড় করিয়া চলে, ত্রস্তা হরিণীর মতো। বলিলাম-শোন ভানুমতী, একটু আস্তে চল, এখানে শিউলিফুলের গাছ কোথায় আছে?ভানুমতীর দেশে শিউলিফুলের নাম সম্পূর্ণ আলাদা। ঠিকমতো তাহাকে বুঝাইতে পারিলাম না। পাহাড়ের উপরে উঠিতে উঠিতে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাইতেছিল। নীল ধন্ঝরি শৈলমালা ভানুমতীদের দেশকে, রাজ্যহীন রাজা দোবরু পান্নার রাজ্যকে মেখলাকারে ঘেরিয়া আছে, বহুদূর হইতে হু-হু খোলা হাওয়া বহিয়া আসিতেছে।ভানুমতী চলিতে চলিতে থামিয়া আমার দিকে চাহিয়া বলিল- বাবুজী, উঠতে কষ্ট হচ্ছে?-কিছু না। একটু আস্তে চল কেবল-কষ্ট কি।আর খানিকটা চলিয়া সে বলিল-জ্যাঠামশাই চলে গেল, সংসারে আমার আর কেউ রইল না, বাবুজী-ভানুমতী ছেলেমানুষের মতো কাঁদ-কাঁদ হইয়া কথাটা বলিল।উহার কথা শুনিয়া আমার হাসি পাইল। বৃদ্ধ প্রপিতামহই না হয় মারা গিয়াছে, মাও নাই, নতুবা উহার বাবা, ভাই, ঠাকুরমা, ঠাকুরদা সবাই বাঁচিয়া, চারিদিকে জাজ্বল্যমান সংসার। হাজার হোক, ভানুমতী স্ত্রীলোক এবং বালিকা, পুরুষের একটু সহানুভূতি আকর্ষণ করিবার ও মেয়েলি আদর-কাড়ানোর প্রবৃত্তি তার পক্ষে স্বাভাবিক।ভানুমতী বলিল-আপনি মাঝে মাঝে আসবেন বাবুজী, আমাদের দেখাশুনো করবেন-ভুলে যাবেন না বলুন-নারী সব জায়গায় সব অবস্থাতেই সমান। বন্য বালিকা ভানুমতীও সেই একই ধাতুতে গড়া!বলিলাম-কেন ভুলে যাব? মাঝে মাঝে আসব নিশ্চয়ই-ভানুমতী কেমন একরকম অভিমানের সুরে ঠোঁট ফুলাইয়া বলিল- হাঁ, বাংলা দেশে গেলে, কলকাতা শহরে গেলে আপনার আবার মনে থাকবে এ পাহাড়ে জংলী দেশের কথা-একটু থামিয়া বলিল-আমাদের কথা-আমার কথা-স্নেহের সুরে বলিলাম-কেন, মনে ছিল না ভানুমতী? আয়নাখানা পাও নি? মনে ছিল কি ছিল না ভাব-ভানুমতী উজ্জ্বল মুখে বলিল- উঃ বাবুজী, বড় চমৎকার আয়না-সত্যি, সে-কথা আপনাকে জানাতে ভুলেই গিয়েছি!সমাধিস্থানের সেই বটগাছের তলায় যখন গিয়া দাঁড়াইলাম, তখন বেলা নাই বলিলেও হয়, দূর পাহাড়শ্রেণীর আড়ালে সূর্য লাল হইয়া ঢলিয়া পড়িতেছে, কখন ক্ষীণাঙ্গ চাঁদ উঠিয়া বটতলায় অপরাহে¦র এই ঘনছায়া ও সম্মুখবর্তী প্রদোষের গভীর অন্ধকার দূর করিবে, স্থানটি যেন তাহারই স্তব্ধ প্রতীক্ষায় নীরবে দাঁড়াইয়া আছে।ভানুমতীকে কিছু বনের ফুল কুড়াইয়া আনিতে বলিলাম, উহার ঠাকুরদাদার কবরের পাথরে ছড়াইবার জন্য। সমাধির উপর ফুল-ছড়ানো-প্রথা এদের দেশে জানা নাই, আমার উৎসাহে সে নিকটের একটা বুনো শিউলি গাছের তলা হইতে কিছু ফুল সংগ্রহ করিয়া আনিল। তাহার পর ভানুমতী ও আমি দুজনেই ফুল ছড়াইয়া দিলাম রাজা দোবরু পান্নার সমাধির উপরে।ঠিক সেই সময় ডানা ঝট্পট্ করিয়া একদল সিল্লী ডাকিতে ডাকিতে উড়িয়া গেল বটগাছটার মগডাল হইতে-যেন ভানুমতী ও রাজা দোবরুর সমস্ত অবহেলিত অত্যাচারিত প্রাচীন পূর্বপুরুষগণ আমার কাজে তৃপ্তিলাভ করিয়া সমস্বরে বলিয়া উঠিলেন-সাধু! সাধু! কারণ আর্যজাতির বংশধরের এই বোধ হয় প্রথম সম্মান অনার্য রাজ-সমাধির উদ্দেশে।
ধাওতাল সাহু মহাজনের কাছে আমাকে একবার হাত পাতিতে হইল। আদায় সেবার হইল কম, অথচ দশ হাজার টাকা রেভিনিউ দাখিল করিতেই হইবে। তহসিলদার বনোয়ারীলাল পরামর্শ দিল, বাকি টাকাটা ধাওতাল সাহুর কাছে কর্জ করুন। আপনাকে সে নিশ্চয়ই দিতে আপত্তি করিবে না। ধাওতাল সাহু আমার মহালের প্রজা নয়, সে থাকে গবর্নমেণ্টের খাসমহলে। আমাদের সঙ্গে তার কোনোপ্রকার বাধ্যবাধকতা নাই, এ অবস্থায় সে যে এক কথায় আমাকে ব্যক্তিগতভাবে হাজারতিনেক টাকা ধার দিবে, এ বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ ছিল।কিন্তু গরজ বড় বালাই। একদিন বনোয়ারীলালকে সঙ্গে লইয়া গোপনে গেলাম ধাওতাল সাহুর বাড়ি, কারণ কাছারির অপর কাহাকেও জানিতে দিতে চাহি না কর্জ করিয়া দিতে হইতেছে।ধাওতাল সাহুর বাড়ি পওসদিয়ার একটা ঘিঞ্জি টোলার মধ্যে। বড় একখানা খোলার চালার সামনে খানকতক দড়ির চারপাই পাতা। ধাওতাল সাহু উঠানের এক পাশের তামাকের ক্ষেত নিড়ানি দিয়া পরিষ্কার করিতেছিল-আমাদের দেখিয়া শশব্যস্তে ছুটিয়া আসিল, কোথায় বসাইবে, কি করিবে ভাবিয়া পায় না, খানিকক্ষণের জন্য যেন দিশাহারা হইয়া গেল।-একি! হুজুর এসেছেন গরিবের বাড়ি, আসুন, আসুন। বসুন হুজুর। আসুন তহসিলদার সাহেব।ধাওতাল সাহুর বাড়িতে চাকর-বাকর দেখিলাম না। তাহার একজন হৃষ্টপুষ্ট নাতি, নাম রামলখিয়া, সে-ই আমাদের জন্য ছুটাছুটি করিতে লাগিল। বাড়িঘর আসবাবপত্র দেখিয়া কে বলিবে ইহা লক্ষপতি মহাজনের বাড়ি।রামলখিয়া আমার ঘোড়ার পিঠ হইতে জিন খুরপাচ খুলিয়া ঘোড়াকে ছায়ায় বাঁধিল। আমাদের জন্য পা ধুইবার জল আনিল। ধাওতাল সাহু নিজেই একখানা তালের পাখা দিয়া বাতাস করিতে লাগিল। সাহুজীর এক নাতনি তামাক সাজিতে ছুটিল। উহাদের যত্নে বড়ই বিব্রত হইয়া উঠিলাম। বলিলাম-ব্যস্ত হবার দরকার নেই সাহুজী, তামাক আনতে হবে না, আমার কাছে চুরুট আছে।যত আদর-আপ্যায়নই করুক, আসল ব্যাপার সম্বন্ধে কথা পাড়িতে একটু সমীহ হইতেছিল, কি করিয়া কথাটা পাড়ি?ধাওতাল সাহু বলিল-ম্যানেজার সাহেব কি এদিকে পাখি মারতে এসেছিলেন?– না, তোমার কাছেই এসেছিলাম সাহুজী।– আমার কাছে হুজুর? কি দরকার বলুন তো?– আমাদের কাছারির সদর খাজনার টাকা কম পড়ে গিয়েছে, সাড়ে তিন হাজার টাকার বড় দরকার, তোমার কাছে সেজন্যেই এসেছিলাম।মরিয়া হইয়াই কথাটা বলিয়া ফেলিলাম, বলিতেই যখন হইবে।ধাওতাল সাহু কিছুমাত্র না ভাবিয়া বলিল-তার জন্যে আর ভাবনা কি হুজুর? সে হয়ে যাবে এখন, তবে তার জন্যে কষ্ট করে আপনার আসবার দরকার কি ছিল? একখানা চিরকুট লিখে তহসিলদার সাহেবের হাতে পাঠিয়ে দিলেই আপনার হুকুম তামিল হত।মনে ভাবিলাম এখন আসল কথাটা বলিতে হইবে। টাকা আমি ব্যক্তিগতভাবে লইব, কারণ জমিদারের নামে টাকা কর্জ করিবার আমমোক্তারনামা আমার নাই। একথা শুনিলেও ধাওতাল কি আমায় টাকা দিবে? বিদেশী লোক আমি। আমার কি সম্পত্তি আছে এখানে যে এতগুলি টাকা বিনা বন্ধকে আমায় দিবে? কথাটা একটু সমীহের উপরই বলিলাম।– সাহুজী, লেখাপড়াটা কিন্তু আমার নামেই করতে হবে। জমিদারের নামে হবে না।ধাওতাল সাহু আশ্চর্য হইবার সুরে বলিল-লেখাপড়া কিসের? আপনি আমার বাড়ি বয়ে এসেছেন, সামান্য টাকার অভাব পড়েছে তাই নিতে। এ তো আসবার দরকারই ছিল না, হুকুম করে পাঠালেই টাকা দিতাম। তারপর যখন এসেছেনই-তখন লেখাপড়া কিসের? আপনি স্বচ্ছন্দে নিয়ে যান, যখন কাছারিতে আদায় হবে, আমায় পাঠিয়ে দিলেই হবে।বলিলাম-আমি হ্যাণ্ডনোট দিচ্ছি, টিকিট সঙ্গে করে এনেছি। কিংবা তোমার পাকা খাতা বার কর, সই করে দিয়ে যাই।ধাওতাল সাহু হাত জোড় করিয়া বলিল-মাপ করুন হুজুর। ও কথাই তুলবেন না। মনে বড় কষ্ট পাব। কোনো লেখাপড়ার দরকার নেই, টাকা আপনি নিয়ে যান।আমার পীড়াপীড়িতে ধাওতাল কর্ণপাতও করিল না। ভিতর হইতে আমায় নোটের তাড়া গুনিয়া আনিয়া দিয়া বলিল-হুজুর, একটা কিন্তু অনুরোধ আছে।-কি?– এ-বেলা যাওয়া হবে না। সিধা বার করে দিই, রান্নাখাওয়া করে তবে যেতে পাবেন।পুনরায় আপত্তি করিলাম, তাহাও টিকিল না। তহসিলদারকে বলিলাম-বনোয়ারীলাল, রাঁধতে পারবে তো? আমার দ্বারা সুবিধে হবে না।বনোয়ারী বলিল-তা চলবে না, হুজুর, আপনাকে রাঁধতে হবে। আমার রান্না খেলে এ পাড়াগাঁয়ে আপনার দুর্নাম হবে। আমি দেখিয়ে দেব এখন।বিরাট এক সিধা বাহির করিয়া দিল ধাওতাল সাহুর নাতি। রন্ধনের সময় নাতি-ঠাকুরদা মিলিয়া নানা রকম উপদেশ-পরামর্শ দিতে লাগিল রন্ধন সম্বন্ধে।ঠাকুরদাদার অনুপস্থিতিতে নাতি বলিল-বাবুজী, ঐ দেখেছেন আমার ঠাকুরদাদা, ওঁর জন্যে সব যাবে। এত লোককে টাকা ধার দিয়েছেন বিনা সুদে, বিনা বন্ধকে, বিনা তমসুকে-এখন আর টাকা আদায় হতে চায় না। সকলকে বিশ্বাস করেন, অথচ লোকে কত ফাঁকিই দিয়েছে। লোকের বাড়ি বয়ে টাকা ধার দিয়ে আসেন।গ্রামের আর একজন লোক বসিয়া ছিল, সে বলিল-বিপদে আপদে সাহুজীর কাছে হাত পাতলে ফিরে যেতে কখনো কাউকে দেখি নি বাবুজী। সেকেলে ধরনের লোক, এতবড় মহাজন, কখনো আদালতে মকদ্দমা করেন নি। আদালতে যেতে ভয় পান। বেজায় ভীতু আর ভালোমানুষ।সেদিন যে-টাকা ধাওতাল সাহুর নিকট হইতে আনিয়াছিলাম, তাহা শোধ দিতে প্রায় ছ’মাস দেরি হইয়া গেল-এই ছ’মাসের মধ্যে ধাওতাল সাহু আমাদের ইসমাইলপুর মহালের ত্রিসীমানা দিয়া হাঁটে নাই, পাছে আমি মনে করি যে সে টাকার তাগাদা করিতে আসিয়াছে। ভদ্রলোক আর কাহাকে বলে!প্রায় বছরখানেক রাখালবাবুদের বাড়ি যাওয়া হয় নাই, ফসলের মেলার পরে একদিন সেখানে গেলাম। রাখালবাবুর স্ত্রী আমায় দেখিয়া খুব খুশি হইলেন। বলিলেন-আপনি আর আসেন না কেন দাদা, কোনো খোঁজখবর নেন না-এই নির্বান্ধব জায়গায় বাঙালির মুখ দেখা যে কি-আর আমাদের এই অবস্থায়-বলিয়া দিদি নিঃশব্দে কাঁদিতে লাগিলেন।আমি চারিদিকে চাহিয়া দেখিলাম। বাড়িঘরের অবস্থা আগের মতোই হীন, তবে এবার ততটা যেন বিশৃঙ্খল নয়। রাখালবাবুর বড় ছেলেটি বাড়িতেই টিনের মিস্ত্রির কাজ করে-সামান্যই উপার্জন-তবু যা হয় সংসার একরকম চলিতেছে।রাখালবাবুর স্ত্রীকে বলিলাম-ছোট ছেলেটিকে অন্তত ওর মামার কাছে কাশীতে রেখে একটু লেখাপড়া শেখান।তিনি বলিলেন-আপন মামা কোথায় দাদা? দু-তিনখানা চিঠি লেখা হয়েছিল এত বড় বিপদের খবর দিয়ে-দশটি টাকা পাঠিয়ে দিয়ে সেই যে চুপ করল-আর দেড় বছর সাড়াশব্দ নেই। তার চেয়ে দাদা ওরা মকাই কাটবে, জনার কাটবে, মহিষ চরাবে-তবুও তেমন মামার দোরে যাবে না।আমি তখনই ঘোড়ায় ফিরিব-দিদি কিছুতেই আসিতে দিলেন না। সেবেলা থাকিতে হইবে। তিনি কি একটা খাবার করিয়া আমায় না খাওয়াইয়া ছাড়িবেন না।অগত্যা অপেক্ষা করিতে হইল। মকাইয়ের ছাতুর সহিত ঘি ও চিনি মিশাইয়া একরকম লাড্ডু বাঁধিয়া ও কিছু হালুয়া তৈরি করিয়া দিদি খাইতে দিলেন। দরিদ্র সংসারে যতটা আদর-অভ্যর্থনা করা যাইতে পারে, তাহার ত্রুটি করিলেন না।বলিলেন-দাদা, ভাদ্র মাসের মকাই রেখেছিলাম আপনার জন্য তুলে। আপনি ভুট্টাপোড়া খেতে ভালবাসেন, তাই।জিজ্ঞাসা করিলাম-মকাই কোথায় পেলেন? কিনেছিলেন?-না। ক্ষেতে কুড়ুতে যাই, ফসল কেটে নিয়ে গেলে যে-সব ভাঙ্গা, ঝরা ভুট্টা চাষারা ক্ষেতে রেখে যায়-গাঁয়ের মেয়েরাও যায়, আমিও যাই ওদের সঙ্গে-এক ঝুড়ি, দেড় ঝুড়ি করে রোজ কুড়োতাম।আমি অবাক হইয়া বলিলাম-ক্ষেতে কুড়ুতে যেতেন?-হ্যাঁ, রাত্রে যেতাম, কেউ টের পেত না। গাঁয়ের কত মেয়েরা তো যায়। তাদের সঙ্গে এই ভাদ্র মাসে কম্সে-কম দশ টুক্রি ভুট্টা কুড়িয়ে এনেছিলাম।মনে বড় দুঃখ হইল। এ কাজ গরিব গাঙ্গোতার মেয়েরা করিয়া থাকে-এদেশের ছত্রী বা রাজপুত মেয়েরা গরিব হইলেও ক্ষেতের ফসল কুড়াইতে যায় না। আর একজন বাঙালির মেয়েকে এ-কাজ করিতে শুনিলে মনে বড়ই লাগে। এই অশিক্ষিত গাঙ্গোতাদের গ্রামে বাস করিয়া দিদি এসব হীনবৃত্তি শিখিয়াছেন-সংসারের দারিদ্র্যও যে তাহার একটা প্রধান কারণ সে-বিষয়ে ভুল নাই। মুখ ফুটিয়া কিছু বলিতে পারিলাম না, পাছে মনে কষ্ট দেওয়া হয়। এই নিঃস্ব বাঙালি পরিবার বাংলার কোনো শিক্ষা-সংস্কৃতি পাইল না, বছরকয়েক পরে চাষী গাঙ্গোতায় পরিণত হইবে, ভাষায়, চালচলনে, হাবভাবে। এখন হইতেই সে-পথে অনেক দূর অগ্রসর হইয়াছে।রেলস্টেশন হইতে বহু দূরে অজ পল্লীগ্রামে আমি আরো দু-একটি এরকম বাঙালি-পরিবার দেখিয়াছি। এইসব পরিবারে মেয়ের বিবাহ দেওয়া যে কি দুঃসাধ্য ব্যাপার! এমনি আর একটি বাঙালি ব্রাহ্মণ পরিবার জানিতাম-দক্ষিণবিহারে এক অজ গ্রামে তাঁরা থাকিতেন। অবস্থা নিতান্তই হীন, বাড়িতে তাঁদের তিনটি মেয়ে ছিল, বড়টির বয়স একুশ-বাইশ বছর, মেজটির কুড়ি, ছোটটিরও সতের। ইহাদের বিবাহ হয় নাই, হইবার কোনো উপায়ও নাই-সঘর জোটানো, বাঙালি পাত্রের সন্ধান পাওয়া এসব অঞ্চলে অত্যন্তই কঠিন।বাইশ বছরের বড় মেয়েটি দেখিতে সুশ্রী-এক বর্ণও বাংলা জানে না-আকৃতি-প্রকৃতিতে খাঁটি দেহাতী বিহারী মেয়ে-মাঠ হইতে মাথায় মোট করিয়া কলাই আনে, গমের ভুসি আনে।এই মেয়েটির নাম ছিল ধ্রুবা। পুরাদস্তুর বিহারী নাম।তাহার বাবা প্রথমে এই গ্রামে হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারি করিতে আসিয়া চাষবাসের কাজও আরম্ভ করেন। তারপর তিনি মারা যান, বড় ছেলে, একেবারে হিন্দুস্থানি-চাষবাস দেখাশুনা করিত, বয়স্থা ভগ্নীদের বিবাহের যোগাড় সে চেষ্টা করিয়াও করিতে পারে নাই। বিশেষত পণ দিবার ক্ষমতা তাদের আদৌ ছিল না জানি।ধ্রুবা ছিল একেবারে কপালকুণ্ডলা। আমাকে ভাইয়া অর্থাৎ দাদা বলিয়া ডাকিত। গায়ে অসীম শক্তি, গম পিষিতে, উদুখলে ছাতু কুটিতে, মোট বহিয়া আনিতে, গোরু-মহিষ চরাইতে চমৎকার মেয়ে, সংসারের কাজকর্মে ঘুণ। তাহার দাদা এ প্রস্তাবও করিয়াছিলেন যে, এমন যদি কোনো পাত্র পান, তিনটি মেয়েকেই এক পাত্রে সম্প্রদান করিবেন। মেয়ে তিনটিরও নাকি অমত ছিল না।মেজ মেয়ে জবাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম-বাংলা দেখতে ইচ্ছে হয়?জবা বলিয়াছিল-নেই ভেইয়া, উঁহাকো পানি বড্ডি নরম ছে-শুনিয়াছিলাম বিবাহ করিতে ধ্রুবারও খুব আগ্রহ। সে নিজে নাকি কাহাকে বলিয়াছিল তাহাকে যে বিবাহ করিবে, তাহার বাড়িতে গোরুর দোহাল বা উদুখলওয়ালী ডাকিতে হইবে না-সে একাই ঘণ্টায় পাঁচ সের গম কুটিয়া ছাতু করিতে পারে।হায় হতভাগিনী বাঙালি কুমারী! এত বৎসর পরেও সে নিশ্চয় আজও গাঙ্গোতীন সাজিয়া দাদার সংসারে যব কুটিতেছে, কলাইয়ের বোঝা মাথায় করিয়া মাঠ হইতে আনিতেছে, কে আর দরিদ্রা দেহাতী বয়স্কা মেয়েকে বিনাপণে বিবাহ করিয়া পালকিতে তুলিয়া ঘরে লইয়া গিয়াছে মঙ্গলশঙ্খ ও উলুধ্বনির মধ্যে!শান্ত মুক্ত প্রান্তরে যখন সন্ধ্যা নামে, দূর পাহাড়ের গা বাহিয়া যে সরু পথটি দেখা যায় ঘনবনের মধ্যে চেরা সিঁথির মতো, ব্যর্থযৌবনা, দরিদ্রা ধ্রুবা হয়তো আজও এত বছরের পরে সেই পথ দিয়া শুকনো কাঠের বোঝা মাথায় করিয়া পাহাড় হইতে নামে-এ ছবি কতবার কল্পনানেত্রে প্রত্যক্ষ করিয়াছি-তেমনি প্রত্যক্ষ করিয়াছি আমার দিদি, রাখালবাবুর স্ত্রী, হয়তো আজও বৃদ্ধা গাঙ্গোতীনদের মতো গভীর রাত্রে চোরের মতো লুকাইয়া ক্ষেতে-খামারে শুকনো তলায়-ঝরা ভুট্টা ঝুড়ি করিয়া কুড়াইয়া ফেরেন।ভানুমতীদের ওখান হইতে ফিরিবার পরে শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝি সেবার ঘোর বর্ষা নামিল। দিনরাত অবিশ্রান্ত বৃষ্টি, ঘন কাজল-কালো মেঘপুঞ্জে আকাশ ছাইয়াছে; নাঢ়া ও ফুলকিয়া বইহারের দিগন্তরেখা বৃষ্টির ধোঁয়ায় ঝাপসা, মহালিখারূপের পাহাড় মিলাইয়া গিয়াছে-মোহনপুরা রিজার্ভ ফরেস্টের শীর্ষদেশ কখনো ঈষৎ অস্পষ্ট দেখা যায়, কখনো যায় না। শুনিলাম পূর্বে কুশী ও দক্ষিণে কারো নদীতে বন্যা আসিয়াছে।মাইলের পর মাইল ব্যাপিয়া কাশ ও ঝাউবন বর্ষার জলে ভিজিতেছে, আমার আপিসঘরের বারান্দায় চেয়ার পাতিয়া বসিয়া দেখিতাম, আমার সামনে কাশবনের মধ্যে একটা বনঝাউয়ের ডালে একটা সঙ্গীহারা ঘুঘু বসিয়া অঝোরে ভিজিতেছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা একভাবেই বসিয়া আছে-মাঝে মাঝে পালক উষ্কখুষ্ক করিয়া ঝুলাইয়া বৃষ্টির জল আটকাইবার চেষ্টা করে, কখনো এমনিই বসিয়া থাকে।এমন দিনে আপিসঘরে বসিয়া দিন কাটানো আমার পক্ষে কিন্তু অসম্ভব হইয়া উঠিত। ঘোড়ায় জিন কষিয়া বর্ষাতি চাপাইয়া বাহির হইয়া পড়িতাম। সে কি মুক্তি! কি উদ্দাম জীবনানন্দ! আর, কি অপরূপ সবুজের সমুদ্র চারিদিকে-বর্ষার জলে নবীন, সতেজ, ঘনসবুজ কাশের বন গজাইয়া উঠিয়াছে-যতদূর দৃষ্টি চলে, এদিকে নাঢ়া-বইহারের সীমানা ওদিকে মোহনপুরা অরণ্যের অস্পষ্ট নীল সীমারেখা পর্যন্ত বিস্তৃত থৈ থৈ করিতেছে-এই সবুজের সমুদ্র-বর্ষাসজল হাওয়ায় মেঘকজ্জল আকাশের নিচে এই দীর্ঘ মরকতশ্যাম তৃণভূমির মাথায় ঢেউ খেলিয়া যাইতেছে-আমি যেন একা এ অকূল সমুদ্রের নাবিক-কোন্ রহস্যময় স্বপ্নবন্দরের উদ্দেশে পাড়ি দিয়াছি।এই বিস্তৃত মেঘচ্ছায়াশ্যামল মুক্ত তৃণভূমির মধ্যে ঘোড়া ছুটাইয়া মাইলের পর মাইল যাইতাম-কখনো সরস্বতীকুণ্ডীর বনের মধ্যে ঢুকিয়া দেখিয়াছি-প্রকৃতির এই অপূর্ব নিভৃত সৌন্দর্যভূমি যুগলপ্রসাদের স্বহস্তে রোপিত নানাজাতীয় বন্য ফুলে ও লতায় সজ্জিত হইয়া আরো সুন্দর হইয়া উঠিয়াছে। সমগ্র ভারতবর্ষের মধ্যে সরস্বতী হ্রদ ও তাহার তীরবর্তী বনানীর মতো সৌন্দর্যভূমি খুব বেশি নাই-এ নিঃসন্দেহে বলতে পারি। হ্রদের ধারে রেড ক্যাম্পিয়নের মেলা বসিয়াছে এই বর্ষাকালে-হ্রদের জলের ধারের নিকট। জলজ ওয়াটারক্রোফটের বড় বড় নীলাভ সাদা ফুলে ভরিয়া আছে। যুগলপ্রসাদ সেদিনও কি একটা বন্যলতা আনিয়া লাগাইয়া গিয়াছে জানি। সে আজমাবাদ কাছারিতে মুহুরীর কাজ করে বটে, কিন্তু তাহার মন পড়িয়া থাকে সরস্বতী কুণ্ডীর তীরবর্তী লতাবিতানে ও বন্যপুষ্পের কুঞ্জে।সরস্বতী কুণ্ডীর বন হইতে বাহির হইতাম-আবার মুক্ত প্রান্তর, আবার দীর্ঘ তৃণভূমি-বনের মাথায় ঘন নীল বর্ষার মেঘ আসিয়া জমিতেছে, সমগ্র জলভার নামাইয়া রিক্ত হইবার পূর্বেই আবার উঠিয়া আসিতেছে নবমেঘপু -একদিকের আকাশে এক অদ্ভুত ধরনের নীল রং ফুটিয়াছে-তাহার মধ্যে একখণ্ড লঘুমেঘ অস্তদিগন্তের রঙে রঞ্জিত হইয়া বহির্বিশ্বের দিগন্তে কোন্ অজানা পর্বতশিখরের মতো দেখা যাইতেছে।সন্ধ্যার বিলম্ব নাই। দিগন্তহারা ফুলকিয়া বইহারের মধ্যে শিয়াল ডাকিয়া উঠিত-একে মেঘের অন্ধকার, তার উপর সন্ধ্যার অন্ধকার নামিতেছে-ঘোড়ার মুখ কাছারির দিকে ফিরাইতাম।কতবার এই ক্ষান্তবর্ষণ মেঘ-থম্কানো সন্ধ্যায় এই মুক্ত প্রান্তরের সীমাহীনতার মধ্যে কোন্ দেবতার স্বপ্ন যেন দেখিয়াছি-এই মেঘ, এই সন্ধ্যা, এই বন, কোলাহলরত শিয়ালের দল, সরস্বতী হ্রদের জলজ পুষ্প, মঞ্চী, রাজু পাঁড়ে, ভানুমতী, মহালিখারূপের পাহাড়, সেই দরিদ্র গোঁড়-পরিবার, আকাশ, ব্যোম সবই তাঁর সুমহতী কল্পনায় একদিন ছিল বীজরূপে নিহিত-তাঁরই আশীর্বাদ আজিকার এই নবনীলনীরদমালার মতোই সমুদয় বিশ্বকে অস্তিত্বের অমৃতধারায় সিক্ত করিতেছে-এই বর্ষা-সন্ধ্যা তাঁরই প্রকাশ, এই মুক্ত জীবনানন্দ তাঁরই বাণী, অন্তরে অন্তরে যে বাণী মানুষকে সচেতন করিয়া তোলে। সে দেবতাকে ভয় করিবার কিছুই নাই-এই সুবিশাল ফুলকিয়া বইহারের চেয়েও, ঐ বিশাল মেঘভরা আকাশের চেয়েও সীমাহীন, অনন্ত তাঁর প্রেম ও আশীর্বাদ। যে যত হীন, যে যত ছোট, সেই বিরাট দেবতার অদৃশ্য প্রসাদ ও অনুকম্পা তার উপর তত বেশি।আমার মনে যে দেবতার স্বপ্ন জাগিত, তিনি যে শুধু প্রবীণ বিচারক, ন্যায় ও দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, বিজ্ঞ ও বহুদর্শী কিংবা অব্যয়, অক্ষয় প্রভৃতি দুরূহ দার্শনিকতার আবরণে আবৃত ব্যাপার তাহা নয়-নাঢ়া-বইহারের কি আজমাবাদের মুক্ত প্রান্তরে কত গোধূলিবেলায় রক্ত-মেঘস্তূপের, কত দিগন্তহারা জনহীন জ্যোৎস্নালোকিত প্রান্তরের দিকে চাহিয়া মনে হইত তিনিই প্রেম ও রোমান্স, কবিতা ও সৌন্দর্য, শিল্প ও ভাবুকতা-তিনি প্রাণ দিয়া ভালবাসেন, সুকুমার কলাবৃত্তি দিয়া সৃষ্টি করেন, নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বিলাইয়া দিয়া থাকেন নিঃশেষে প্রিয়জনের প্রীতির জন্য-আবার বিরাট বৈজ্ঞানিকের শক্তি ও দৃষ্টি দিয়া গ্রহ-নক্ষত্র-নীহারিকার সৃষ্টি করেন।এমনি এক বর্ষামুখর শ্রাবণ-দিনে ধাতুরিয়া ইসমাইলপুর কাছারিতে আসিয়া হাজির।অনেক দিন পরে উহাকে দেখিয়া খুশি হইলাম।-কি ব্যাপার, ধাতুরিয়া? ভালো আছিস তো?যে ছোট পুঁটুলির মধ্যে তাহার সমস্ত জাগতিক সম্পত্তি বাঁধা, সেটা হাত হইতে নামাইয়া আমায় হাত তুলিয়া নমস্কার করিয়া বলিল- বাবুজী, নাচ দেখাতে এলাম। বড় কষ্টে পড়েছি, আজ এক মাস কেউ নাচ দেখে নি। ভাবলাম, কাছারিতে বাবুজীর কাছে যাই, সেখানে গেলে তাঁরা ঠিক দেখবেন। আরো ভালো ভালো নাচ শিখেছি বাবুজী।ধাতুরিয়া যেন আরো রোগা হইয়া গিয়াছে। উহাকে দেখিয়া কষ্ট হইল।-কিছু খাবি ধাতুরিয়া?ধাতুরিয়া সলজ্জভাবে ঘাড় নাড়িয়া জানাইল, সে খাইবে।আমার ঠাকুরকে ডাকিয়া ধাতুরিয়াকে কিছু খাবার দিতে বলিলাম। তখন ভাত ছিল না, ঠাকুর দুধ ও চিঁড়া আনিয়া দিল। ধাতুরিয়ার খাওয়া দেখিয়া মনে হইল সে অন্তত দু-দিন কিছু খাইতে পায় নাই।সন্ধ্যার পূর্বে ধাতুরিয়া নাচ দেখাইল। কাছারির প্রাঙ্গণে সেই বন্য অঞ্চলের অনেক লোক জড়ো হইয়াছিল ধাতুরিয়ার নাচগান দেখিবার জন্য। আগের চেয়েও ধাতুরিয়া নাচে অনেক উন্নতি করিয়াছে। ধাতুরিয়ার মধ্যে যথার্থ শিল্পীর দরদ ও সাধনা আছে। আমি নিজে কিছু দিলাম, কাছারির লোক চাঁদা করিয়া কিছু দিল। ইহাতে তাহার কত দিনই বা চলিবে?ধাতুরিয়া পরদিন সকালে আমার নিকট বিদায় লইতে আসিল।-বাবুজী, কবে কলকাতা যাবেন?-কেন বল তো?-আমায় কলকাতায় নিয়ে যাবেন বাবুজী? সেই যে আপনাকে বলেছিলাম?-তুমি এখন কোথায় যাবে ধাতুরিয়া? খেয়ে তবে যেও।-না, বাবুজী, ঝল্লুটোলাতে একজন ভুঁইহার বাভনের বাড়ি, তার মেয়ের বিয়ে হবে, সেখানে হয়তো নাচ দেখতে পারে। সেই চেষ্টাতে যাচ্ছি। এখান থেকে আট ক্রোশ রাস্তা- এখন রওনা হলে বিকেল নাগাদ পৌঁছব।ধাতুরিয়াকে ছাড়িয়া দিতে মন সরে না। বলিলাম- কাছারিতে যদি কিছু জমি দিই, তবে এখানে থাকতে পারবে? চাষবাস কর, থাক না কেন?মটুকনাথ পণ্ডিতেরও দেখিলাম খুব ভালো লাগিয়াছে ধাতুরিয়াকে। তাহার ইচ্ছা ধাতুরিয়াকে সে টোলের ছাত্র করিয়া লয়। বলিল- বলুন না ওকে বাবুজী, দু-বছরের মধ্যে মুগ্ধবোধ শেষ করিয়ে দেব। ও থাকুক এখানে।জমি দেওয়ার কথায় ধাতুরিয়া বলিল- বাবুজী, আপনি আমার বড় ভাইয়ের মতো, আপনার বড় দয়া। কিন্তু চাষ-কাজ কি আমায় দিয়ে হবে? ওদিকে আমার মন নেই যে! নাচ দেখাতে পেলে আমার মনটা ভারি খুশি থাকে। আর কিছু তেমন ভালো লাগে না।-বেশ, মাঝে মাঝে নাচ দেখাবে, চাষ করতে তো জমির সঙ্গে তোমায় কেউ শেকল দিয়ে বেঁধে রাখবে না?ধাতুরিয়া খুব খুশি হইল। বলিল- আপনি যা বলবেন, আমি তা শুনব। আপনাকে বড় ভালো লাগে, বাবুজী। আমি ঝল্লুটোলা থেকে ঘুরে আসি- আপনার এখানেই আসব।মটুকনাথ পণ্ডিত বলিল- আর সেই সময় তোমাকে টোলেও ঢুকিয়ে নেব। তুমি না হয় রাত্রে এসে পড়ো আমার কাছে। মূর্খ থাকা কিছু নয়, কিছু ব্যাকরণ, কিছু কাব্য লব্জ রাখা দরকার।ধাতুরিয়া তাহার পর বসিয়া বসিয়া নৃত্যশিল্পের বিষয়ে নানা কথা কি সব বলিল, আমি তত বুঝিলাম না। পূর্ণিয়ার হো-হো-নাচের ভঙ্গির সঙ্গে ধরমপুর অঞ্চলের ঐ শ্রেণীর নাচের কি তফাৎ-সে নিজে নূতন কি একটা হাতের মুদ্রা প্রবর্তন করিয়াছে- এইসব ধরনের কথা।-বাবুজী, আপনি বালিয়া জেলায় ছট্ পরবের সময় মেয়েদের নাচ দেখেছেন? ওর সঙ্গে ছক্কর-বাজি নাচের বেশ মিল থাকে একটা জায়গায়। আপনাদের দেশে নাচ কেমন হয়?আমি তাহাকে গত বৎসর ফসলের মেলায় দৃষ্ট ননীচোর নাটুয়া’র নাচের কথা বলিলাম। ধাতুরিয়া হাসিয়া বলিল- ও কিছু না বাবুজী, ও মুঙ্গেরের গেঁয়ো নাচ। গাঙ্গোতাদের খুশি করবার নাচ। ওর মধ্যে খাঁটি জিনিস কিছু নেই। ও তো সোজা।বলিলাম- তুমি জানো? নেচে দেখাও তো?ধাতুরিয়া দেখিলাম নিজের শাস্ত্রে বেশ অভিজ্ঞ। ‘ননীচোর নাটুয়ার’ নাচ সত্যিই চমৎকার নাচিল- সেই খুঁত খুঁত করিয়া ছেলেমানুষের মতো কান্না, সেই চোরা ননী বিতরণ করিবার ভঙ্গি- সেইসব। তাহাকে আরো মানাইল এইজন্য যে, সে সত্যিই বালক।ধাতুরিয়া বিদায় লইয়া চলিয়া গেল। যাইবার সময় বলিল-এত মেহেরবানিই যখন করলেন বাবুজী, একবার কলকাতায় কেন নিয়ে চলুন না? ওখানে নাচের আদর আছে।এই ধাতুরিয়ার সহিত আমার শেষ দেখা।মাস দুই পরে শোনা গেল, বি এন ডব্লিউ রেল লাইনের কাটারিয়া স্টেশনের অদূরে লাইনের উপর একটি বালকের মৃতদেহ পাওয়া যায়-নাটুয়া বালক ধাতুরিয়ার মৃতদেহ বলিয়া সকলে চিনিয়াছে। ইহা আত্মহত্যা কি দুর্ঘটনা তাহা বলিতে পারিব না। আত্মহত্যা হইলে, কি দুঃখেই বা সে আত্মহত্যা করিল?সেই বন্য অঞ্চলে দু-বছর কাটাইবার সময় যতগুলি নরনারীর সংস্পর্শে আসিয়াছিলাম- তার মধ্যে ধাতুরিয়া ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। তাহার মধ্যে যে একটি নির্লোভ, সদাচঞ্চল, সদানন্দ, অবৈষয়িক, খাঁটি শিল্পীমনের সাক্ষাৎ পাইয়াছিলাম, শুধু সে বন্য দেশ কেন, সভ্য অঞ্চলের মানুষের মধ্যেও তা সুলভ নয়!আরো তিন বৎসর কাটিয়া গেল।নাঢ়া-বইহার ও লবটুলিয়ার সমুদয় জঙ্গলমহাল বন্দোবস্ত হইয়া গিয়াছে। এখন আর কোথাও পূর্বের মতো বন নাই। প্রকৃতি কত বৎসর ধরিয়া নির্জনে নিভৃতে যে কুঞ্জ রচনা করিয়া রাখিয়াছিল, কত কেঁয়োঝাঁকার নিভৃত লতাবিতান, কত স্বপ্নভূমি-জনমজুরেরা নির্মম হাতে সব কাটিয়া উড়াইয়া দিল, যাহা গড়িয়া উঠিয়াছিল পঞ্চাশ বৎসরে, তাহা গেল এক দিনে। এখন কোথাও আর সে রহস্যময় দূরবিসর্পী প্রান্তর নাই, জ্যোৎস্নালোকিত রাত্রিতে যেখানে মায়াপরীরা নামিত, মহিষের দেবতা দয়ালু টাঁড়বারো হাত তুলিয়া দাঁড়াইয়া বন্য মহিষদলকে ধ্বংস হইতে রক্ষা করিত।নাঢ়া-বইহার নাম ঘুচিয়া গিয়াছে, লবটুলিয়া এখন একটি বস্তি মাত্র। যে দিকে চোখ যায়, শুধু চালে চালে লাগানো অপকৃষ্ট খোলার ঘর। কোথাও বা কাশের ঘর। ঘন ঘিঞ্জি বসতি-টোলায় টোলায় ভাগ করা- ফাঁকা জায়গায় শুধুই ফসলের ক্ষেত। এতটুকু ক্ষেতের চারিদিকে ফনিমনসার বেড়া। ধরণীর মুক্তরূপ ইহারা কাটিয়া টুকুরা টুকরা করিয়া নষ্ট করিয়া দিয়াছে।আছে কেবল একটি স্থান, সরস্বতী কুণ্ডীর তীরবর্তী বনভূমি।চাকুরির খাতিরে মনিবের স্বার্থরক্ষার জন্য সব জমিতেই প্রজাবিলি করিয়াছি বটে, কিন্তু যুগলপ্রসাদের হাতে সাজানো সরস্বতী-তীরের অপূর্ব বনকু কিছুতেই প্রাণ ধরিয়া বন্দোবস্ত করিতে পারি নাই। কতবার দলে দলে প্রজারা আসিয়াছে সরস্বতী কুণ্ডীর পাড়ের জমি লইতে- বর্ধিত হারে সেলামি ও খাজনা দিতেও চাহিয়াছে, কারণ একে ঐ জমি খুব উর্বরা, তাহার উপর নিকটে জল থাকায় মকাই প্রভৃতি ভালো জন্মাইবে; কিন্তু আমি রাজি হই নাই।তবে কতদিন আর রাখিতে পারিব? সদর আপিস হইতে মাঝে মাঝে চিঠি আসিতেছে সরস্বতী কুণ্ডীর জমি আমি কেন বিলি করিতে বিলম্ব করিতেছি। নানা ওজর-আপত্তি তুলিয়া এখনো পর্যন্ত রাখিয়াছি বটে, কিন্তু বেশি দিন পারিব না। মানুষের লোভ বড় বেশি, দুটি ভুট্টার ছড়া আর চীনাঘাসের এককাঠা দানার জন্য প্রকৃতির অমন স্বপ্নকু ধ্বংস করিতে তাহাদের কিছুমাত্র বাধিবে না, জানি। বিশেষ করিয়া এখানকার মানুষে গাছপালার সৌন্দর্য বোঝে না, রম্য ভূমিশ্রীর মহিমা দেখিবার চোখ নাই, তাহারা জানে পশুর মতো পেটে খাইয়া জীবনযাপন করিতে। অন্য দেশ হইলে আইন করিয়া এমন সব স্থান সৌন্দর্যপিপাসু প্রকৃতিরসিক নরনারীর জন্য সুরক্ষিত করিয়া রাখিত, যেমন আছে কালিফোর্নিয়ার যোসেমাই ন্যাশনাল পার্ক, দক্ষিণ আফ্রিকায় আছে ক্রুগার ন্যাশনাল পার্ক, বেলজিয়ান কঙ্গোতে আছে পার্ক ন্যাশনাল আলবার্ট। আমার জমিদাররা ও ল্যাণ্ডস্কেপ বুঝিবে না, বুঝিবে সেলামির টাকা, খাজনার টাকা, আদায় ইরশাল, হস্তবুদ।এই জন্মান্ধ মানুষের দেশে একজন যুগলপ্রসাদ কি করিয়া জন্মিয়াছিল জানি না- শুধু তাহারই মুখের দিকে চাহিয়া আজও সরস্বতী হ্রদের তীরবর্তী বনানী অক্ষুন্ন রাখিয়াছি।কিন্তু কতদিন রাখিতে পারিব?যাক্, আমারও কাজ শেষ হইয়া আসিল বলিয়া।প্রায় তিন বছর বাংলা দেশে যাই নাই- মাঝে মাঝে বাংলা দেশের জন্য মন বড় উতলা হয়। সারা বাংলা দেশ আমার গৃহ- তরুণী কল্যাণী বধূ সেখানে আপন হাতে সন্ধ্যাপ্রদীপ দেখায়; এখানকার এমন লক্ষ্মীছাড়া উদাস ধূ ধূ প্রান্তর ও ঘন বনানী নয়- যেখানে নারীর হাতের স্পর্শ নাই।কি হইতে যেন মনে অকারণ আনন্দের বান ডাকিল তাহা জানি না। জ্যোৎস্নারাত্রি- তখনই ঘোড়ায় জিন কষিয়া সরস্বতী কুণ্ডীর দিকে রওনা হইলাম, কারণ তখন নাঢ়া ও লবটুলিয়া বইহারের বনরাজি শেষ হইয়া আসিয়াছে- যাহা কিছু অরণ্যশোভা ও নির্জনতা আছে তখনো সরস্বতীর তীরেই। আমি মনে মনে বেশ বুঝিলাম, এ আনন্দকে উপভোগ করিবার একমাত্র পটভূমি হইতেছে সরস্বতী হ্রদের তীরবর্তী বনানী।ঐ সরস্বতীর জল জ্যোৎস্নালোকে চিক্চিক্ করিতেছে-চিক্চিক্ করিতেছে কি শুধু? ঢেউয়ে ঢেউয়ে জ্যোৎস্না ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে। নির্জন, স্তব্ধ বনানী হৃদের জলের তিন দিকে বেষ্টন করিয়া, বন্য লাল হাঁসের কাকলি, বন্য শেফালি-পুষ্পের সৌরভ, কারণ যদিও জ্যৈষ্ঠ মাস, শেফালিফুল এখানে বারোমাস ফোটে।কতক্ষণ হ্রদের তীরে এদিকে ওদিকে ইচ্ছামতো ঘোড়া চালাইয়া বেড়াইলাম। হ্রদের জলে পদ্ম ফুটিয়াছে, তীরের দিকে ওয়াটারক্রোফ্ট ও যুগলপ্রসাদের আনীত স্পাইডার লিলির ঝাড় বাঁধিয়াছে। দেশে চলিয়াছি কতকাল পরে, এ নির্জন অরণ্যবাস হইতে মুক্তি পাইব, সেখানে বাঙালি মেয়ের হাতে রান্না খাদ্য খাইয়া বাঁচিব, কলিকাতায় এক-আধ দিন থিয়েটার-বায়োস্কোপ দেখিব, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কত কাল পরে আবার দেখা হইবে।এইবার ধীরে ধীরে সে অননুভূত আনন্দের বন্যা আমার মনের কূল ভাসাইয়া দোলা দিতে লাগিল। যোগাযোগ হইয়াছিল বোধ হয় অদ্ভুত-এতদিন পরে দেশে প্রত্যাবর্তন, সরস্বতী হ্রদের জ্যোৎস্নালোকিত-বারিরাশি ও বনফুলের শোভা, বন্য শেফালির জ্যোৎস্না-মাখানো সুবাস, শান্ত স্তব্ধতা-ভালো ঘোড়ার চমৎকার কোনাকুনি ক্যাণ্টার চাল, হু-হু হাওয়া- সব মিলিয়া স্বপ্ন! স্বপ্ন! আনন্দের ঘন নেশা! আমি যেন যৌবনোন্মত্ত তরুণ দেবতা, বাধাবন্ধহীন, মুক্ত গতিতে সময়ের সীমা পার হইয়া চলিয়াছি-এই চলাই যেন আমার অদৃষ্টের জয়লিপি, আমার সৌভাগ্য, আমার প্রতি কোন্ সুপ্রসন্ন দেবতার আশীর্বাদ!হয়তো আর ফিরিব না-দেশে ফিরিয়া মরিয়াও তো যাইতে পারি। বিদায় সরস্বতী-কুণ্ডী, বিদায় তীরতরু-সারি, বিদায় জ্যোৎস্নালোকিত মুক্ত বনানী। কলিকাতার কোলাহলমুখর রাজপথে দাঁড়াইয়া তোমার কথা মনে পড়িবে, বিস্তৃত জীবনদিনের বীণার অনতিস্পষ্ট ঝঙ্কারের মতো মনে পড়িবে যুগলপ্রসাদের আনা গাছগুলির কথা, জলের ধারে স্পাইডার লিলি ও পদ্মের বন, তোমার বনের নিবিড় ডালপালার মধ্যে স্তব্ধ মধ্যাহ্নে ঘুঘুর ডাক, অস্তমেঘের ছায়ায় রাঙা ময়নাকাঁটার গুঁড়ি ও ডাল, তোমার নীল জলে উপরকার নীল আকাশে উড়ন্ত সিল্লী ও লাল হাঁসের সারি-জলের ধারের নরম কাদার উপরে হরিণশিশুর পদচিহ্ন … নির্জনতা, সুগভীর নির্জনতা। বিদায়, সরস্বতী কুণ্ডী।ফিরিবার পথে দেখি সরস্বতী হ্রদের বন হইতে বাহির হইয়া মাইলখানেক দূরে একটা জায়গায় বন কাটিয়া একখানা ঘর বসাইয়া মানুষ বাস করিতেছে- এই জায়গাটার নাম হইয়াছে নয়া লবটুলিয়া-যেমন নিউ সাউথ ওয়েল্স্ বা নিউ ইয়র্ক- নূতন গৃহস্থ পরিবার আসিয়া বনের ডালপালা কাটিয়া (নিকটে বড় বন নাই, সুতরাং সরস্বতীর তীরবর্তী বন হইতেই আমদানি নিশ্চয়ই) ঘাসের ছাওয়া তিন-চারখানা নিচু নিচু খুপরি বাঁধিয়াছে। তারই নিচে এখনো পর্যন্ত ভিজা দাওয়ার উপর একটা নারিকেল কিংবা কড়ুয়া তেলের গলা-ভাঙ্গা বোতল, একটি উলঙ্গ হামাগুড়িরত কৃষ্ণকায় শিশু, কয়েকটি সিহোড়া গাছের সুরু ডালে বোনা ঝুড়ি, একটি মোটা রূপার অনন্ত পরা যক্ষের মতো কালো আঁটসাঁট গড়নের বউ, খানকয়েক পিতলের লোটা ও থালা ও কয়েকখানা দা, খোন্তা, কোদাল। ইহাই লইয়া ইহারা প্রায় সবাই সংসার করে। শুধু নিউ লবটুলিয়া কেন, ইসমাইলপুর ও নাঢ়া-বইহারের সর্বত্রই এইরূপ। কোথা হইতে উঠিয়া আসিয়াছে তাই ভাবি; ভদ্রাসন নাই, পৈতৃক ভিটা নাই, গ্রামের মায়া নাই, প্রতিবেশীর স্নেহমমতা নাই-আজ ইসমাইলপুরের বনে, কাল মুঙ্গেরের দিয়ারা চরে, পরশু জয়ন্তী পাহাড়ের নিচে তরাইভূমিতে -সর্বত্রই ইহাদের গতি, সর্বত্রই ইহাদের ঘর।পরিচিত কণ্ঠের আওয়াজ পাইয়া দেখি রাজু পাড়ে এই ধরনের একটি গৃহস্থবাড়িতে বসিয়া ধর্মতত্ত্ব আলোচনা করিতেছে। উহাকে দেখিয়া ঘোড়া হইতে নামিলাম। আমায় সবাই মিলিয়া খাতির করিয়া বসাইল। রাজুকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম সে এখানে কবিরাজি করিতে আসিয়াছিল। ভিজিট পাইয়াছে চারিকাঠা যব এবং নগদ আট পয়সা। ইহাতেই সে মহা খুশি হইয়া ইহাদের সহিত আসর জমাইয়া দার্শনিক তত্ত্ব আলোচনা জুড়িয়া দিয়াছে।আমায় বলিল-বসুন, একটা কথার মীমাংসা করে দিন তো বাবুজী! আচ্ছা, পৃথিবীর কি শেষ আছে? আমি তো এদের বলছি বাবু, যেমন আকাশের শেষ নেই, পৃথিবীরও তেমনি শেষ নেই। কেমন, তাই না বাবুজী?বেড়াইতে আসিয়া এমন গুরুতর জটিল বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সম্মুখীন হইতে হইবে, তাহা ভাবি নাই।রাজু পাঁড়ের দার্শনিক মন সর্বদাই জটিল তত্ত্ব লইয়া কারবার করে জানি এবং ইহাও জানি যে ইহাদের সমাধানে সে সর্বদাই মৌলিক চিন্তার পরিচয় দিয়া আসিতেছে, যেমন রামধনু উইয়ের ঢিবি হইতে জন্মায়, নক্ষত্রদল যমের চর, মানুষ কি পরিমাণে বাড়িতেছে তাহাই সরেজমিনে তদারক করিবার জন্য যম কর্তৃক উহারা প্রেরিত হয়-ইত্যাদি।পৃথিবীতত্ত্ব যতটা আমার জানা আছে বুঝাইয়া বলিতে রাজু বলিল- কেন সূর্য পূর্বদিকে ওঠে, পশ্চিমে অস্ত যায়, আচ্ছা কোন্ সাগর থেকে সূর্য উঠছে আর কোন্ সাগরে নামছে এর কেউ নিরাকরণ করতে পেরেছে? রাজু সংস্কৃত পড়িয়াছে, ‘নিরাকরণ’ কথাটা ব্যবহার করাতে গাঙ্গোতা গৃহস্থ ও তাহার পরিবারবর্গ সপ্রশংস ও বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে রাজুর দিকে চাহিয়া রহিল এবং সঙ্গে সঙ্গে ইহাও ভাবিল ইংরেজিনবিশ বাঙালি বাবুকে কবিরাজমশায় একেবারে কি অথৈ জলে টানিয়া লইয়া ফেলিয়াছে! বাঙালি বাবু এবার হাবুডুবু খাইয়া মরিল দেখিতেছি!বলিলাম-রাজু, তোমার চোখের ভুল, সূর্য কোথাও যায় না, এক জায়গায় স্থির আছে।রাজু আমার মুখের দিকে অবাক হইয়া চাহিয়া রহিল। গাঙ্গোতার দল হা হা করিয়া তাচ্ছিল্যের সুরে হাসিয়া উঠিল। হায় গ্যালিলিও, এই নাস্তিক বিচারমূঢ় পৃথিবীতেই তুমি কারারুদ্ধ হইয়াছিলে!বিস্ময়ের প্রথম রেশ কাটিয়া গেলে রাজু আমায় বলিল-সূরযনারায়ণ পূর্বে উদয়-পাহাড়ে উঠেন না বা পশ্চিম-সমুদ্রে অস্ত যান না?বলিলাম- না।– এ কথা ইংরিজি বইতে লিখেছে?– হাঁ।জ্ঞান মানুষকে সত্যই সাহসী করে; যে শান্ত, নিরীহ রাজু পাঁড়ের মুখে কখনো উঁচু সুরে কথা শুনি নাই- সে সতেজে, সদর্পে বলিল- ঝুট্ বাত বাবুজী। উদয়-পাহাড়ের যে গুহা থেকে সূরযনারায়ণ রোজ ওঠেন সে গুহা একবার মুঙ্গেরের এক সাধু দেখে এসেছিলেন। অনেক দূর হেঁটে যেতে হয়, পূর্বদিকের একেবারে সীমানায় সে পাহাড়, গুহার মুখে মস্ত পাথরের দরজা, ওঁর অভ্রের রথ থাকে সেই গুহার মধ্যে। যে-সে কি দেখতে পায় হুজুর? বড় বড় সাধু মহান্ত দেখেন। ঐ সাধু অভ্রের রথের একটা কুচি এনেছিলেন- এই এত বড় চক্চকে অভ্র- আমার গুরুভাই কামতাপ্রসাদ স্বচক্ষে দেখেছেন।কথা শেষ করিয়া রাজু সগর্বে একবার সমবেত গাঙ্গোতাদের মুখের দিকে চক্ষু ঘুরাইয়া-ফিরাইয়া চাহিল।উদয়-পর্বতের গুহা হইতে সূর্যের উত্থানের এতবড় অকাট্য ও চাক্ষুষ প্রমাণ উত্থাপিত করার পরে আমি সেদিন একেবারে নিশ্চুপ হইয়া গেলাম।
যুগলপ্রসাদকে একদিন বলিলাম- চল, নতুন গাছপালার সন্ধান করে আসি মহালিখারূপের পাহাড়ে।যুগলপ্রসাদ সোৎসাহে বলিল- একরকম লতানে গাছ আছে ওই পাহাড়ের জঙ্গলে- আর কোথাও নেই। চীহড় ফল বলে এদেশে, চলুন খুঁজে দেখি।নাঢ়া-বইহারের নূতন বস্তিগুলির মধ্য দিয়া পথ। এরই মধ্যে এক-এক পাড়ায় সর্দারের নাম অনুসারে টোলার নামকরণ হইয়াছে- ঝল্লুটোলা, রূপদাসটোলা, বেগমটোলা ইত্যাদি। উদুখলে ধুপধাপ যব কোটা হইতেছে, খোলাছাওয়া মাটির ঘর হইতে কুণ্ডলী পাকাইয়া ধোঁয়া উপরে উঠিতেছে- উলঙ্গ কৃষ্ণকায় শিশুর দল পথের ধারে ধুলাবালি ছড়াইয়া খেলা করিতেছে।নাঢ়া-বইহারের উত্তর সীমানা এখনো ঘন বনভূমি। তবে লবটুলিয়া বইহারে আর এতটুকু বনজঙ্গল বা গাছপালা নাই- নাঢ়া-বইহারের শোভাময়ী বনভূমির বারোআনা গিয়াছে, কেবল উত্তর সীমানায় হাজার দুই বিঘা জমি এখনো প্রজাবিলি হয় নাই। দেখিলাম যুগলপ্রসাদ ইহাতে বড় দুঃখিত।বলিল- গাঙ্গোতার দল বসে সব নষ্ট করলে, হুজুর। ওদের ঘরবাড়ি নেই, হাঘরের দল। আজ এখানে, কাল সেখানে। এমন বন নষ্ট করলে!বলিলাম- ওদের দোষ নেই যুগলপ্রসাদ। জমিদারে জমি ফেলে রাখবে কেন, তারাও তো গবর্নমেণ্টের রেভিনিউ দিচ্ছে, চিরকাল ঘর থেকে রেভিনিউ গুনবে? জমিদার ওদের এনেছে, ওদের কি দোষ?– সরস্বতী কুণ্ডী দেবেন না হুজুর। বড় কষ্টে ওখানে গাছপালা সংগ্রহ করে এনে বসিয়েছি-– আমার ইচ্ছেয় তো হবে না, যুগল। এতদিন বজায় রেখেছি এই যথেষ্ট, আর কত দিন রাখা যাবে বল। ওদিকে জমি ভালো দেখে প্রজারা সব ঝুঁকছে।সঙ্গে আমাদের দু-তিন জন সিপাহী ছিল। তারা আমাদের কথাবার্তার গতি বুঝিতে না পারিয়া আমাকে উৎসাহ দিবার জন্য বলিল-কিছু ভাববেন না হুজুর, সামনে চৈতী ফসলের পরে সরস্বতী কুণ্ডীর জমি এক টুকরো পড়ে থাকবে না।মহালিখারূপের পাহাড় প্রায় নয় মাইল দূরে। আমার আপিসঘরের জানালা হইতে ধোঁয়া-ধোঁয়া দেখা যাইত। পাহাড়ের তলায় পৌঁছিতে বেলা দশটা বাজিয়া গেল।কি সুন্দর রৌদ্র আর কি অদ্ভুত নীল আকাশ সেদিন! এমন নীল কখনো যেন আকাশে দেখি নাই-কেন যে এক-এক দিন আকাশ এমন গাঢ় নীল হয়, রৌদ্রের কি অপূর্ব রং, নীল আকাশ যেন মদের নেশার মতো মনকে আচ্ছন্ন করে। কচি পত্রপল্লবের গায়ে রৌদ্র পড়িয়া স্বচ্ছ দেখায়- আর নাঢ়া-বইহারের ও লবটুলিয়ার যত বন্য পক্ষীর ঝাঁক বাসা ভাঙ্গিয়া যাওয়াতে কতক সরস্বতী সরোবরের বনে, কতক এখানে ও মোহনপুরা রিজার্ভ ফরেস্টে আশ্রয় লইয়াছে- তাহাদের কি অবিশ্রান্ত কূজন!ঘন বন। এমন ঘন নির্জন আরণ্যভূমিতে মনে একটি অপূর্ব শান্তি ও মুক্ত অবাধ স্বাধীনতার ভাব আনে- কত গাছ, কত ডালপালা, কত বনফুল, কত বড় বড় পাথর ছড়ানো-যেখানে সেখানে বসিয়া থাক, শুইয়া পড়, অলস জীবনমুহূর্ত প্রস্ফুটিত পিয়াল বৃক্ষের নিবিড় ছায়ায় বসিয়া কাটাইয়া দাও- বিশাল নির্জন আরণ্যভূমি তোমার শ্রান্ত স্নায়ুমণ্ডলীকে জড়াইয়া দিবে।আমরা পাহাড়ে উঠিতে আরম্ভ করিয়াছি-বড় বড় গাছ মাথার উপরে সূর্যের আলোক আটকাইয়াছে-ছোট বড় ঝরনা কল্লল্ শব্দে বনের মধ্য দিয়া নামিয়া আসিতেছে-হরীতকী গাছ, কেলিকদম্ব গাছের সেগুন পাতার মতো বড় বড় পাতায় বাতাস বাধিয়া শন্শন্ শব্দ হইতেছে। বন-মধ্যে ময়ূরের ডাক শোনা গেল।আমি বলিলাম-যুগলপ্রসাদ, চীহড় ফলের গাছ কোথায়, খোঁজ।চীহড় ফলের গাছ পাওয়া গেল আরো অনেক উপরে উঠিয়া। স্থলপদ্মের পাতার মতো পাতা, খুব মোটা কাষ্ঠময় লতা, আঁকিয়া বাঁকিয়া অন্য গাছকে আশ্রয় করিয়া উঠিয়াছে। ফলগুলি শিমজাতীয়, তবে শিমের দুখানি খোলা কটকী চটিজুতার মতো বড়, অমনি কঠিন ও চওড়া-ভিতরে গোল বিচি। আমরা শুকনো লতাপাতা জ্বালাইয়া বিচি পুড়াইয়া খাইয়াছি-ঠিক যেন গোল আলুর মতো আস্বাদ।অনেক দূর উঠিয়াছি। ওই দূরে মোহনপুরা ফরেস্ট-দক্ষিণে ওই আমাদের মহাল, ওই সরস্বতী কুণ্ডীর তীরবর্তী জঙ্গল অস্পষ্ট দেখা যাইতেছে। ওই নাঢ়া-বইহারের অবশিষ্ট সিকিভাগ বন- ওই দূরে কুশী নদী মোহনপুরা রিজার্ভ ফরেস্টের পূর্ব সীমানা ঘেঁষিয়া প্রবাহিত-নিন্মের সমতল ভূমির দৃশ্য যেন ছবির মতো!-ময়ূর! ময়ূর-হুজুর, ঐ দেখুন, ময়ূর!-প্রকাণ্ড একটা ময়ূর মাথার উপরেই এক গাছের ডালে বসিয়া। একজন সিপাহী বন্দুক লইয়া আসিয়াছিল, সে গুলি করিতে গেল, আমি বারণ করিলাম।যুগলপ্রসাদ বলিল-বাবুজী, একটা গুহা আছে পাহাড়ের মধ্যে জঙ্গলে কোথায়-তার গায়ে সব ছবি আঁকা আছে- কত কালের কেউ জানে না, সেটাই খুঁজছি।হয়তো বা প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষের হাতে আঁকা বা খোদাই ছবি গুহার কঠিন পাথরের গায়ে! পৃথিবীর ইতিহাসের লক্ষ লক্ষ বৎসরের যবনিকা এক মুহূর্তে অপসারিত হইয়া সময়ের উজানে কোথায় লইয়া গিয়া ফেলিবে আমাদের!প্রাগৈতিহাসিক যুগের গুহাঙ্কিত ছবি দেখিবার প্রবল আগ্রহে জঙ্গল ঠেলিয়া গুহা খুঁজিয়া বেড়াইলাম- গুহাও মিলিল, কিন্তু যে অন্ধকার, তাহার ভিতরে ঢুকিবার সাহস হইল না। ঢুকিলেই বা অন্ধকারের মধ্যে কি দেখিব! অন্য একদিন তোড়জোড় করিয়া আসিতে হইবে-আজ থাক্। অন্ধকারে কি শেষে ভীষণ বিষধর চন্দ্রবোড়া কিংবা শঙ্খচূড় সাপের হাতে প্রাণ দিব? এসব স্থানে তাহাদের অভাব নাই।যুগলপ্রসাদকে বলিলাম-এ জঙ্গলে কিছু গাছপালা লাগাও নূতন ধরনের। পাহাড়ের বন কেউ কখনো কাটবে না। লবটুলিয়া তো গেল- সরস্বতী কুণ্ডীর ভরসাও ছাড়-যুগলপ্রসাদ বলিল- ঠিক বলেছেন হুজুর। কথাটা মনে লেগেছে। কিন্তু আপনি তো আসছেন না, আমাকে একাই করতে হবে।-আমি মাঝে মাঝে এসে দেখে যাব। তুমি লাগাও।মহালিখারূপের পাহাড় একটা পাহাড় নয়, একটা নাতিদীর্ঘ, অনুচ্চ পাহাড়শ্রেণী, কোথাও দেড় হাজার ফুটের বেশি উঁচু নয়-হিমালয়েরই পাদশৈলের নিন্মতর শাখা, যদিও তরাই প্রদেশের জঙ্গল ও আসল হিমালয় এখান হইতে এক-শ হইতে দেড়-শ মাইল দূরে। মহালিখারূপের পাহাড়ের উপর দাঁড়াইয়া নিন্মের সমতল ভূমির দিকে চাহিয়া দেখিলে মনে হয় প্রাচীন যুগের মহাসমুদ্র একসময়ে এই বালুকাময় উচ্চ তটভূমির গায়ে আছড়াইয়া পড়িত, গুহাবাসী মানব তখন ভবিষ্যতের গর্ভে নিদ্রিত এবং মহালিখারূপের পাহাড় তখন সেই সুপ্রাচীন মহাসাগরের বালুকাময় বেলাভূমি।যুগলপ্রসাদ অন্তত আট-দশ রকমের নূতন গাছ-লতা দেখাইল-সমতল ভূমির বনে এগুলি নাই- পাহাড়ের উপরকার বনের প্রকৃতি অন্য ধরনের-গাছপালাও অনেক অন্য রকম।বেলা পড়িয়া আসিতে লাগিল। কি রকমের বনফুলের গন্ধ খুব পাওয়া যাইতেছিল- বেলা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গন্ধটা যেন নিবিড়তর হইয়া উঠিল। গাছের ডালে ঘুঘু, পাহাড়ি বনটিয়া, হরটিট প্রভৃতি কত কি পক্ষীর কূজন!বাঘের ভয় বলিয়া সঙ্গীরা পাহাড় হইতে নামিবার জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়িল, নতুবা এই আসন্ন সন্ধ্যায় নিবিড় ছায়ায় নির্জন শৈলসানুর বনভূমিতে যে শোভা ফুটিয়াছে, তাহা ফেলিয়া আসিতে ইচ্ছা করে না।মুনেশ্বর সিং বলিল- হুজুর, মোহনপুরা জঙ্গলের চেয়েও এখানে বাঘের ভয় বেশি। বিকেলের পর এখানে যারা কাঠকুটো কাটতে আসে সব নেমে যায়। আর দল না বেঁধে একা কেউ এ পাহাড়ে আসেও না। বাঘ আছে, শঙ্খচূড় সাপ আছে-দেখছেন না কি গজাড় জঙ্গল সারা পাহাড়ে!অগত্যা আমরা নামিতে লাগিলাম। পাহাড়ের জঙ্গলে কেলিকদম্ব গাছের বড় পাতার আড়ালে শুক্র ও বৃহস্পতি জ্বলজ্বল করিতেছে।একদিন দেখি এমনি একটি নূতন গৃহস্থের বাড়ির দাওয়ায় বসিয়া গনোরী তেওয়ারী স্কুলমাস্টার শালপাতার ওপর ছাতুর তাল মাখিয়া খাইতেছে।– হুজুর যে! ভালো আছেন?– বেশ আছি। তুমি কবে এলে? কোথায় ছিলে? এরা তোমার কেউ হয় নাকি?– কেউ নয়। এখান দিয়ে যাচ্ছিলাম, বেলা হয়ে গিয়েছে, ব্রাহ্মণ, এদের এখানে অতিথি হলাম। তাই দুটো খাচ্ছি। চেনা-শুনো ছিল না, তবে আজ হোলো।গৃহকর্তা আগাইয়া আসিয়া আমাকে নমস্কার করিয়া বলিল- আসুন হুজুর, বসুন উঠে।– না, বসব না। বেশ আছি। কতদিন জমি নিয়েছ?– আজ দু-মাস হুজুর। এখনো জমি চষতে পারি নি।গনোরী তেওয়ারীকে একটি ছোট মেয়ে আসিয়া কয়েকটি কাঁচা লঙ্কা দিয়া গেল। সে খাইতেছে কলাইয়ের ছাতু, নুন ও লঙ্কা। ছাতুর সে বিরাট তাল শীর্ণ গনোরী তেওয়ারীর পেটে কোথায় ধরিবে বোঝা কঠিন। গনোরী খাঁটি ভবঘুরে! যেখানে খাইতে বসিয়াছে, সেই দাওয়ার এক পাশে একটি ময়লা কাপড়ের পুঁটুলি, একটি গেলাপ অর্থাৎ পাতলা বালাপোশজাতীয় লেপ দেখিয়া বুঝিতে পারিলাম উহা গনোরীর- এবং উহাই উহার সমগ্র জাগতিক সম্পত্তি। গনোরীকে বলিলাম- ব্যস্ত আছি, তুমি কাছারিতে এসো ওবেলা।বিকালে গনোরী কাছারিতে আসিল।বলিলাম-কোথায় ছিলে গনোরী?– বাবুজী, মুঙ্গের জেলায় পাড়াগাঁ অঞ্চলে। বহুৎ পাড়াগাঁয়ে ঘুরেছি।– কি করে বেড়াতে?– পাঠশালা করতাম। ছেলে পড়াতাম।– কোনো পাঠশালা টিক্ল না?– দু-তিন মাসের বেশি নয় হুজুর। ছেলেরা মাইনে দেয় না।– বিয়ে-থাওয়া করেছ? বয়স কত হোলো?– নিজেরই পেট চলে না হুজুর, বিয়ে করব কি? বয়স চৌত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হয়েছে।গনোরীর মতো এত দরিদ্র লোক এ অঞ্চলেও বেশি দেখা যায় না। মনে পড়িল, গনোরী একবার বিনা-নিমন্ত্রণে ভাত খাইতে আমার কাছারিতে আসিয়াছিল, প্রথম যেবার এখানে আসি। বর্তমানে বোধ হয় কত কাল সে ভাত খাইতে পায় নাই। গাঙ্গোতা-বাড়িতে অতিথি হইয়া কলাইয়ের ছাতু খাইয়া দিন কাটাইতেছে।বলিলাম- গনোরী, আজ রাত্রে আমার এখানে খাবে। কণ্টু মিশির রাঁধে, তার হাতে তোমার তো খেতে আপত্তি নেই? ….গনোরী বেজায় খুশি হইল। একগাল হাসিয়া বলিল- কণ্টু আমাদেরই ব্রাহ্মণ, ওর হাতে আগেও তো খেয়েছি- আপত্তি কি?তারপর বলিল- হুজুর, বিয়ের কথা যখন তুললেন তখন বলি। আর-বছর শ্রাবণ মাসে একটা গাঁয়ে পাঠশালা খুললাম। গাঁয়ে একঘর আমাদেরই ব্রাহ্মণ ছিল। তার বাড়িতে থাকি। ওর মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ের কথা সব ঠিকঠাক, এমন কি আমি মুঙ্গের থেকে ভালো মেরজাই একটা কিনে আনলাম- তারপর পাড়ার লোক ভাঙ্গচি দিলে- বললে- ও গরিব স্কুলমাস্টার, চাল নেই, চুলো নেই, ওকে মেয়ে দিও না। তাই সে বিয়ে ভেঙ্গে গেল। আমি সে গাঁ ছেড়ে চলেও গেলাম।– মেয়েটিকে দেখিছিলে? দেখতে ভালো?– দেখি নি? চমৎকার মেয়ে, হুজুর! তা আমাকে কেন দেবে? সত্যিই তো। আমার কি আছে বলুন না?দেখিলাম গনোরী বেশ দুঃখিত হইয়াছে বিবাহ ফাঁসিয়া যাওয়াতে, মেয়েটিকে মনে ধরিয়াছিল।তারপর অনেকক্ষণ বসিয়া সে গল্প করিল। তাহার কথা শুনিয়া মনে হইল জীবন তাহাকে কোনো জিনিস দেয় নাই- গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে ফিরিয়াছে দুটি পেটের ভাতের জন্য! তাও জোটাইতে পারে নাই। গাঙ্গোতাদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরিয়াই অর্ধেক জীবন কাটাইয়া দিল।বলিল- অনেক দিন পরে তাই লবটুলিয়াতে এলাম। এখানে অনেক নতুন বস্তি হয়েছে শুনলাম। সে জঙ্গল-মহাল আর নেই। এখানে যদি একটা পাঠশালা খুলি- তাই এলাম। চলবে না, কি বলেন হুজুর?তখনই মনে মনে ভাবিলাম, এখানে একটা পাঠশালা করিয়া দিয়া গনোরীকে রাখিয়া দিব। এতগুলি ছোট ছোট ছেলেমেয়ে আমার মহালে নব আগন্তুক, তাহাদের শিক্ষার একটা ব্যবস্থা করা আমারই কর্তব্য; দেখি কি করা যায়।অপূর্ব জ্যোৎস্নারাত। যুগলপ্রসাদ ও রাজু পাঁড়ে গল্প করিতে আসিল। কাছারি হইতে কিছু দূরে একটি ছোট বস্তি বসিয়াছে। সেখানকার একটি লোকও আসিল। আজ চারদিন মাত্র তাহারা ছাপরা জেলা হইতে এখানে আসিয়া বাস করিতেছে।লোকটি তাহার জীবনের ইতিহাস বলিতেছিল। স্ত্রী-পুত্র লইয়া কত জায়গায় ঘুরিয়াছে, কত চরে জঙ্গলে বন কাটিয়া কতবার ঘরদোর বাঁধিয়াছে। কোথাও তিন বছর, কোথাও পাঁচ বছর, এক জায়গায় কুশী নদীর ধারে ছিল দশ বছর। কোথাও উন্নতি করিতে পারে নাই। এইবার লবটুলিয়া বইহারে আসিয়াছে উন্নতি করিতে।এইসব যাযাবর গৃহস্থজীবন বড় বিচিত্র। কথা বলিয়া দেখিয়াছি ইহাদের সঙ্গে, সম্পূর্ণ বন্ধনমুক্ত, ব্রাত্য ইহাদের জীবন- সমাজ নাই, সংসার নাই, ভিটার মায়া নাই। নীল আকাশের নিচে সংসার রচনা করিয়া, বনে শৈলশ্রেণীর মধ্যস্থ উপত্যকায়, বড় নদীর নির্জন চরে ইহাদের বাস। আজ এখানে, কাল সেখানে।ইহাদের প্রেম-বিরহ, জীবন-মৃত্যু সবই আমার কাছে নূতন ও অদ্ভুত। কিন্তু সকলের চেয়ে অদ্ভুত লাগিল বর্তমানে এই লোকটির উন্নতির আশা।এই লবটুলিয়ার জঙ্গলে সামান্য পাঁচ বিঘা কি দশ বিঘা জমিতে গম চাষ করিয়া সে কিরূপ উন্নতির আশা করে বুঝিয়া ওঠা কঠিন।লোকটির বয়স পঞ্চাশ পার হইয়াছে। নাম বলভদ্র সেঙ্গাই, জাতে চাষা কালোয়ার অর্থাৎ কলু। এই বয়সে সে এখনো আশা রাখে জীবনে উন্নতি করিবার।আমি জিজ্ঞাসা করিলাম- বলভদ্র, এর আগে কোথায় ছিলে?– হুজুর, মুঙ্গের জেলায় এক দিয়াড়ার চরে। দু-বছর সেখানে ছিলাম- তার পরে অজন্মা হয়ে মকাই ফসল নষ্ট হয়ে গেল। সে-জায়গায় উন্নতি হবার আশা নেই দেখলাম। হুজুর, সংসারে সবাই উন্নতি করবার জন্যে চেষ্টা পায়। এইবার দেখি হুজুরের আশ্রয়ে-রাজু পাঁড়ে বলিল- আমার ছটা মহিষ ছিল যখন প্রথম এখানে আসি- এখন হয়েছে দশটা। লবটুলিয়া উন্নতির জায়গা-বলভদ্র বলিল- মহিষ আমায় এক জোড়া কিনে দিও পাঁড়েজী। এবার ফসল হোক, সেই টাকা দিয়ে মহিষ কিনতেই হবে- ও ভিন্ন উন্নতি হয় না।গনোরী ইহাদের কথা শুনিতেছিল। সেও বলিল- ঠিক কথা! আমারও ইচ্ছে আছে মহিষ দু-একটা কিনব। একটু কোথাও বসতে পারলেই-মহালিখারূপের পাহাড়ের গাছপালা এবং তাহারও পিছনে ধন্ঝরি শৈলমালা অস্পষ্ট হইয়া ফুটিয়াছে জ্যোৎস্নার আলোয়, একটু একটু শীত বলিয়া ছোট একটি অগ্নিকুণ্ড করা হইয়াছে আমাদের সামনে- একদিকে রাজু পাঁড়ে ও যুগলপ্রসাদ, অন্যদিকে বলভদ্র ও তিন-চারটি নবাগত প্রজা।আমার কাছে কি অদ্ভুত ঠেকিতেছিল ইহাদের বৈষয়িক উন্নতির কথা। উন্নতি সম্বন্ধে ইহাদের ধারণা অভাবনীয় ধরনের উচ্চ নয়- ছ’টি মহিষের স্থানে দশটা মহিষ না-হয় বারোটা মহিষ- এই সুদূর দুর্গম অরণ্য ও শৈলমালা বেষ্টিত বন্য দেশেও মানুষের মনের আশা-আকাক্সক্ষা কেমন, জানিবার সুযোগ পাইয়া আজকার জ্যোৎস্নারাতটাই আমার নিকটে অপূর্ব রহস্যময় মনে হইল শুধু জ্যোৎস্নারাত কেন, মহালিখারূপের ঐ পাহাড়, দূরে এই ধন্ঝরি শৈলমালা, ঐ পাহাড়ের উপরকার ঘন বনশ্রেণী।কেবল যুগলপ্রসাদ এসব বৈষয়িক কথাবার্তায় থাকে না। ও আর এক ধরনের ব্রাত্য মন লইয়া পৃথিবীতে আসিয়াছে- জমিজমা, গোরু-মহিষের আলোচনা করিতে ভালও বাসে না, তাহাতে যোগও দেয় না।সে বলিল- সরস্বতী কুণ্ডীর পূর্ব পাড়ের জঙ্গলে যতগুলো হংসলতা লাগিয়েছিলাম, সবগুলো কেমন ঝাঁপালো হয়ে উঠেছে দেখেছেন বাবুজী? এবার জলের ধারে স্পাইডার-লিলির বাহারও খুব। চলুন, যাবেন জ্যোৎস্নারাতে বেড়াতে?দুঃখ হয়- যুগলপ্রসাদের এত সাধের সরস্বতী কুণ্ডীর বনভূমি- কতদিন বা রাখিতে পারিব? কোথায় দূর হইয়া যাইবে হংসলতা আর বন্য শেফালিবন। তাহার স্থানে দেখা দিবে শীর্ষ-ওঠা মকাই ও জনারের ক্ষেত এবং সারি সারি খোলা-ছাওয়া ঘর, চালে চালে ঠেকানো, সামনে চারপাই পাতা।… কাদা-হাবড় আঙিনায় গোরু-মহিষ নাদায় জাব খাইতেছে।এই সময় মটুকনাথ পণ্ডিত আসিল। আজকাল মটুকনাথের টোলে প্রায় পনরটি ছাত্র কলাপ ও মুগ্ধবোধ পড়ে। তাহার অবস্থা আজকাল ফিরিয়া গিয়াছে। গত ফসলের সময় যজমানদের ঘর হইতে এত গম ও মকাই পাইয়াছে যে, টোলের উঠানে তাহাকে একটা ছোট গোলা বাঁধিতে হইয়াছে!অধ্যবসায়ী লোকের উন্নতি যে হইতেই হইবে- মটুকনাথ পণ্ডিত তাহার অকাট্য প্রমাণ।উন্নতি! -আবার সেই উন্নতির কথা আসিয়া পড়িল।কিন্তু উন্নতির কথা না আসিয়া উপায় নাই। চোখের উপর দেখিতে পাইতেছি মটুকনাথ উন্নতি করিয়াছে বলিয়াই তাহার আজকাল খুব খাতির সম্মান- আমার কাছারির যে-সব সিপাহী ও আমলা মটুকনাথকে পাগল বলিয়া উপেক্ষা করিত-গোলাবাঁধার পর হইতে আমি লক্ষ্য করিতেছি তাহারা মটুকনাথকে সম্মান ও খাতির করিয়া চলে। সঙ্গে সঙ্গে টোলের ছাত্রসংখ্যাও যেন বাড়িয়া চলিয়াছে। অথচ যুগলপ্রসাদ বা গনোরী তেওয়ারীকে কেউ পোঁছেও না। রাজু পাঁড়েও নবাগত প্রজাদের মধ্যে খুব খাতির জমাইয়া ফেলিয়াছে-জড়িবুটির পুঁটুলি হাতে তাহাকে প্রায়ই দেখা যায় গৃহস্থবাড়ির ছেলেমেয়েদের নাড়ি টিপিয়া বেড়াইতেছে। তবে রাজু পাঁড়ে পয়সা তেমন বোঝে না, খাতির পাইয়া ও গল্প করিয়াই সন্তুষ্ট।মাস তিন-চারের মধ্যে মহালিখারূপের পাহাড়ের কোল হইতে লবটুলিয়া ও নাঢ়া-বইহারের উত্তর সামীনা পর্যন্ত প্রজা বসিয়া গেল। পূর্বে জমি বিলি হইয়া চাষ আরম্ভ হইয়াছিল বটে, কিন্তু লোকের বাস এত হয় নাই- এ বছর দলে দলে লোক আসিয়া রাতারাতি গ্রাম বসাইয়া ফেলিতে লাগিল।কত ধরনের পরিবার। শীর্ণ টাট্টু ঘোড়ার পিঠে বিছানাপত্র, বাসন, পিতলের ঘয়লা, কাঠের বোঝা, গৃহদেবতা, তোলা উনুন চাপাইয়া একটি পরিবারকে আসিতে দেখা গেল। মহিষের পিঠে ছোট ছোট ছেলেমেয়ে, হাঁড়িকুড়ি, ভাঙ্গা লণ্ঠন, এমন কি চারপাই পর্যন্ত চাপাইয়া আর এক পরিবার আসিল। কোনো কোনো পরিবারে স্বামী-স্ত্রীতে মিলিয়া জিনিসপত্র ও শিশুদের বাঁকের দু-দিকে চাপাইয়া বাঁক কাঁধে বহুদূর হইতে হাঁটিয়া আসিতেছে।ইহাদের মধ্যে সদাচারী, গর্বিত মৈথিল ব্রাহ্মণ হইতে আরম্ভ করিয়া গাঙ্গোতা ও দোসাদ পর্যন্ত সমাজের সর্বস্তরের লোকই আছে। যুগলপ্রসাদ মুহুরীকে জিজ্ঞাসা করিলাম-এরা কি এতদিন গৃহহীন অবস্থায় ছিল? এত লোক আসছে কোথা থেকে?যুগলপ্রসাদের মন ভালো নয়। বলিল-এদেশের লোকই এই রকম। শুনেছে এখানে জমি সস্তায় বিলি হচ্ছে-তাই দলে দলে আসছে। সুবিধে বোঝে থাকবে, নয়তো আবার ডেরা উঠিয়ে অন্য জায়গায় ভাগবে।-পিতৃপিতামহের ভিটের কোনো মায়া নেই এদের কাছে?-কিছু না বাবুজী। এদের উপজীবিকাই হচ্ছে নূতন-ওঠা চর বা জঙ্গলমহাল বন্দোবস্ত নিয়ে চাষবাস করা। বাস করাটা আনুষঙ্গিক। যতদিন ফসল ভালো হবে, খাজনা কম থাকবে, ততদিন থাকবে।-তারপর?-তারপর খোঁজ নেবে অন্য কোথায় নূতন চর বা জঙ্গল বিলি হচ্ছে, সেখানে চলে যাবে। এদের ব্যবসাই এই।সেদিন গ্র্যাণ্ট সাহেবের বটগাছের নিচে জমি মাপিয়া দিতে গিয়াছি, আস্রফি টিণ্ডেল জমি মাপিতেছিল, আমি ঘোড়ার উপর বসিয়া দেখিতেছিলাম, এমন সময় কুন্তাকে টোলার পথ ধরিয়া যাইতে দেখিলাম।কুন্তাকে অনেকদিন দেখি নাই। আস্রফিকে বলিলাম-কুন্তা আজকাল কোথায় থাকে, ওকে দেখি নি তো?আস্রফি বলিল-ওরা কথা শোনেন নি বাবুজী? ও মধ্যে এখানে ছিল না অনেক দিন--কি রকম?-রাসবিহারী সিং ওকে নিয়ে যায় তার বাড়ি। বলে, তুমি আমাদের জাতভাইয়ের স্ত্রী-আমার এখানে এসে থাক-– বেশ।– সেখানে কিছুদিন থাকবার পরে- ওর চেহারা দেখেছেন তো বাবুজী, এত দুঃখে কষ্টে এখনো- তারপর রাসবিহারী সিং কি-সব কথা বলে- এমন কি ওর উপর অত্যাচারও করতে যায়- তাই আজ মাসখানেক হোলো সেখান থেকে পালিয়ে এসে আছে। শুনি রাসবিহারী ছোরা নিয়ে ভয় দেখায়। ও বলেছিল, মেরে ফেল বাবুজী, জান দেগা-ধরম দেগা নেহিন।– কোথায় থাকে?– ঝল্লুটোলায় এক গাঙ্গোতার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের গোয়ালঘরের পাশে একখানা ছোট্ট চালা আছে সেখানেই থাকে।– চলে কি করে? ওর তো দু-তিনটি ছেলেমেয়ে।– ভিক্ষে করে-ক্ষেতের ফসল কুড়োয়। কলাই গম কাটে। বড় ভালো মেয়ে বাবু কুন্তা। বাইজীর মেয়ে ছিল বটে, কিন্তু ভালো ঘরের মেয়ের মতো মন-মেজাজ- কোনো অসৎ কাজ ওকে দিয়ে হবে না।জরিপ শেষ হইল। বালিয়া জেলার একটি প্রজা এই জমি বন্দোবস্ত লইয়াছে- কাল হইতে এখানে সে বাড়ি বাঁধিবে। গ্র্যাণ্ট সাহেবের বটগাছের মহিমাও ধ্বংস হইল।মহালিখারূপের পাহাড়ের উপরকার বড় বড় গাছপালার মাথায় রোদ রাঙা হইয়া আসিল। সিল্লীর দল ঝাঁক বাঁধিয়া সরস্বতী কুণ্ডীর দিকে উড়িয়া চলিয়াছে। সন্ধ্যার আর দেরি নাই।একটা কথা ভাবিলাম।এতটুকু জমি কোথাও থাকিবে না এই বিশাল লবটুলিয়া ও নাঢ়া-বইহারে, যেমন দেখিতেছি। দলে দলে অপরিচিত লোক আসিয়া জমি লইয়া ফেলিল- কিন্তু এই আরণ্যভূমিতে যাহারা চিরকাল মানুষ অথচ যাহারা নিঃস্ব, হতভাগ্য- জমি বন্দোবস্ত লইবার পয়সা নাই বলিয়াই কি তাহারা বঞ্চিত থাকিবে? যাহাদের ভালবাসি, তাহাদের অন্তত এতটুকু উপকার করিবই।আস্রফিকে বলিলাম- আস্রফি, কুন্তাকে কাল সকালে কাছারিতে হাজির করতে পারবে? ওকে একটু দরকার আছে।– হাঁ, হুজুর, যখন বলবেন।পরদিন সকালে কুন্তাকে আস্রফি আমার আপিসঘরের সামনে বেলা ন’টার সময় লইয়া আসিল।বলিলাম- কুন্তা, কেমন আছ?কুন্তা আমায় দুই হাত জোড় করিয়া প্রণাম করিয়া বলিল- জি হুজুর, ভালো আছি।– তোমার ছেলেমেয়েরা?– ভালো আছে হুজুরের দোয়ায়।– বড়ছেলেটি কত বড় হোলো?– এই আট বছরে পড়েছে, হুজুর।– মহিষ চরাতে পারে না?– অতটুকু ছেলেকে কে মহিষ চরাতে দেবে হুজুর?কুন্তা সত্যই এখনো দেখিতে বেশ, ওর মুখে অসহায় জীবনের দুঃখকষ্ট যেমন ছাপ মারিয়া দিয়াছে- সাহস ও পবিত্রতাও তেমনি তাদের দুর্লভ জয়চিহ্ন অঙ্কিত করিয়া দিয়াছে।এই সেই কাশীর বাইজীর মেয়ে, প্রেমবিহ্বলা কুন্তা!…প্রেমের উজ্জ্বল বর্তিকা এই দুঃখিনী রমণীর হাতে এখনো সগৌরবে জ্বলিতেছে, তাই ওর এত দুঃখ-দৈন্য, এত হেনস্থা, অপমান। প্রেমের মান রাখিয়াছে কুন্তা।বলিলাম- কুন্তা, জমি নেবে?কুন্তা কথাটি ঠিক শুনিয়াছে কি না যেন বুঝিতে পারিল না। বিস্মিত মুখে বলিল-জমি, হুজুর?– হাঁ, জমি। নূতন বিলি জমি!কুন্তা একটুখানি কি ভাবিল। পরে বলিল- আগে তো আমাদেরই কত জোতজমা ছিল। প্রথম প্রথম এসে দেখেছি। তারপর সব গেল একে একে। এখন আর কি দিয়ে জমি নেব, হুজুর?– কেন, সেলামির টাকা দিতে পারবে না?– কোথা থেকে দেব? রাত্তির করে ক্ষেত থেকে ফসল কুড়োই পাছে দিনমানে কেউ অপমান করে। আধ টুক্রি এক টুক্রি কলাই পাই- তাই গুঁড়ো করে ছাতু করে বাচ্ছাদের খাওয়াই। নিজে খেতে সব দিন কুলোয় না-কুন্তা কথা বন্ধ করিয়া চোখ নিচু করিল। দুই চোখ বাহিয়া টস্টস্ করিয়া জল গড়াইয়া পড়িল।আস্রফি সরিয়া গেল। ছোকরার হৃদয় কোমল, এখনো পরের দুঃখ ভালো রকম সহ্য করিতে পারে না।আমি বলিলাম- কুন্তা, আচ্ছা ধর যদি সেলামি না লাগে?কুন্তা চোখ তুলিয়া জলভরা বিস্মিত চোখে আমার মুখের দিকে চাহিল।আস্রফি তাড়াতাড়ি কাছে আসিয়া কুন্তার সামনে হাত নাড়িয়া বলিল- হুজুর তোমায় এমনি জমি দেবেন, এমনি জমি দেবেন- বুঝলে না দাইজী?আস্রফিকে বলিলাম- ওকে জমি দিলে ও চাষ করবে কি করে আস্রফি?আস্রফি বলিল- সে বেশি কঠিন কথা নয় হুজুর। ওকে দু-একখানা লাঙল দয়া করে সবাই ভিক্ষে দেবে। এত ঘর গাঙ্গোতা প্রজা, একখানা লাঙল ঘর-পিছু দিলেই ওর জমি চাষ হয়ে যাবে। আমি সে-ভার নেব, হুজুর।– আচ্ছা, কত বিঘে হলে ওর হয়, আস্রফি?– দিচ্ছেন যখন মেহেরবানি করে হুজুর, দশ বিঘে দিন।কুন্তাকে জিজ্ঞাসা করিলাম- কুন্তা, কেমন, দশ বিঘে জমি যদি তোমায় বিনা সেলামিতে দেওয়া যায়- তুমি ঠিকমতো চাষ করে ফসল তুলে কাছারির খাজনা শোধ করতে পারবে তো? অবিশ্যি প্রথম দু-বছর তোমার খাজনা মাফ। তৃতীয় বছর থেকে খাজনা দিতে হবে।কুন্তা যেন হতবুদ্ধি হইয়া পড়িয়াছে। আমরা তাহাকে লইয়া ঠাট্টা করিতেছি, না সত্য কথা বলিতেছি- ইহাই যেন এখনো সম্ঝাইয়া উঠিতে পারে নাই।কতকটা দিশাহারাভাবে বলিল- জমি! দশ বিঘে জমি!আস্রফি আমার হইয়া বলিল- হাঁ- হুজুর তোমায় দিচ্ছেন। খাজনা এখন দু-বছর মাফ। তীসরা সাল থেকে খাজনা দিও। কেমন রাজি?কুন্তা লজ্জাজড়িত মুখে আমার দিকে চাহিয়া বলিল-জ্বি হুজুর মেহেরবান। পরে হঠাৎ বিহ্বলার মতো কাঁদিয়া ফেলিল।আমার ইঙ্গিতে আস্রফি তাহাকে লইয়া চলিয়া গেল।
চাঁদটা ঠিক মাথার উপরে। চারিদিকে ভয়াবহ নিস্তব্ধতা। জোনাকি পোকা ও রাতের প্যাঁচা কারোর মুখে রা নেই। এমনকি বাতাসের নিজস্ব শব্দও থমকে গিয়েছে। শুধু শোনা যাচ্ছে তাণ্ডবলীলার আহবান। গাছের ডালপালার আড়াল থেকে নিশাচর পাখিরা চেয়ে আছে। তারা তেজস্বী পদ্মজার আগমন দেখছে। পদ্মজার একেকটা কদম নিশাচর পাখিদের মনে বজ্রপাতের মতো আঘাত হানছে। তার সাদা শাড়ি থেকে বিচ্ছুরিত সাদা রঙ নিশাচরদের চোখ ঝলসে দিচ্ছে। পদ্মজার এক হাতে রাম দা অন্যহাতে দঁড়ি। দঁড়ি দিয়ে বাঁধা তিনটে নেড়ি কুকুর! আচমকা কুকুরগুলো চিৎকার করে উঠলো। নিশাচর পাখিরা ভয় পেয়ে এক গাছ থেকে অন্য গাছে উড়ে গেল। গাছের ডালপালা নড়ে উঠাতে পদ্মজাসহ তিনটে কুকুর আড়চোখে উপরে তাকালো। চার জোড়া হিংস্র চোখজ্বলজ্বল করছে! কুকুরগুলোর চোখের চেয়ে মানবসন্তান পদ্মজার চোখের দৃষ্টি ভয়ংকর! যেন চোখ নয় আগ্নেয়গিরি! এক্ষুনি আগুন ছড়িয়ে দিয়ে চারপাশ ভস্ম করে দিবে! পদ্মজা পায়ে হেঁটে ঘাস পেরিয়ে একটা পুকুরের সামনে এসে দাঁড়ালো। পুকুরের জল কুচকুচে কালো। পুকুরের চেয়ে কিছুটা দূরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় রেইনট্রি গাছ । গাছগুলোর শত বছর বয়স। রেইনট্রি গাছের সাথে বাঁধা অবস্থায় ঘুমাচ্ছে মজিদ,খলিল,আমির,রিদওয়ান ও আসমানি।পদ্মজা পাশ থেকে ছোট চৌকিখাট টেনে নিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিমায় বসলো। তার শরীরের রক্ত বুদবুদ করে ফুটছে! ঘুমন্ত অমানুষগুলোকে দেখে তার ঠোঁটে তিরস্কারের মৃদু হাসি ফুটে উঠলো। যখন চোখ খুলে আমির ও তার দলবল আবিষ্কার করবে, তারা বন্দী! আর সামনে তিনটে কুকুরের সাথে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে পদ্মজা! তখন তাদের কেমন অনুভূতি হবে?.সাত ঘন্টা পূর্বে, তখন শেষপ্রহরের বিকেল। পদ্মজা লতিফাকে পানি আনতে পাঠিয়েছে। সে রান্নাঘরে রান্না করছে। লতিফা কলপাড়ে এসে আমিরকে দেখতে পেল। আমির আলগ ঘরে প্রবেশ করেছে মাত্র। লতিফা কলসি রেখে আমিরের কাছে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। কিন্তু দুই কদম হেঁটে এসে সে থমকে দাঁড়ায়। দ্রুত উল্টো ঘুরে কলপাড়ে চলে আসে। কলপাড়ে খালি কলসিটা স্থির হয়ে আছে। লতিফা কলসির উপর চোখ নিবদ্ধ রেখে কপাল কুঁচকায়। নূরজাহানের ঘর থেকে তিনদিন আগেই ঘুমের ঔষধ সংগ্রহ করে রেখেছিল পদ্মজা। আজ রাতের খাবার পরিবেশন করার পূর্বে খাবারের সাথে ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে দেয়া হবে। যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়বে তখন পদ্মজা আক্রমণ করবে! এই পরিকল্পনাই লতিফাকে জানানো হয়েছে। লতিফা কলপাড়ে এসে আমিরকে দেখে দূর্বল হয়ে পড়ে। তার বলে দিতে ইচ্ছে হয়,আমির যেন রাতের খাবার না খায়! কিন্তু যখন মনুষ্যত্ব জেগে উঠলো সে থেমে গেল।আজ লতিফার একখানা বড় কাজ আছে। রিনুকে নিয়ে তার পালাতে হবে! এই বাড়িতে কিশোরী রিনু এসেছে গতবছর। তার আগেও অন্দরমহলে রিনু নামে একজন কাজের মহিলা ছিল। তিনি ডায়রিয়ায় গত হয়েছেন দুই বছর আগে। এতিম লতিফা প্রথম যখন এই বাড়িতে এসেছিল,মজিদ ও খলিলের দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিল। তারপর লতিফা ফরিনাকে সব জানায়। ফরিনা প্রতিবাদ করায় আমির সব শুনলো। আমির তার বাপ-চাচাকে নিষেধ করে লতিফাকে নির্যাতন করতে। সে চায়,তার মায়ের সেবা করা মানুষগুলো নিরাপদ থাকুক।এরপর প্রায় দুই-তিনবছর নিরাপদে কেটে গেলেও পনেরো বছর বয়সে রিদওয়ানের মাধ্যমে লতিফা ধর্ষিতা হয়। ধর্ষণের পর লতিফা পালানোর জন্য ছটফট করেছে। দরজা বন্ধ করে দিনের পর দিন লুকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদেছে। তারপর বেশ কয়েকবার মজিদ ও খলিলের থাবার শিকার হতে হয়েছে। দিনগুলো বিষাক্ত ছিল। পালানোর মতো জায়গা ছিল না। তাই একসময় লতিফা ভাগ্যকে মেনে নিল। সহ্য করে নিল সবকিছু। অন্দরমহলের পাশাপাশি পাতালঘরের বিশ্বস্ত সহযোগী হয়ে উঠলো। তবে গত চার বছর ধরে সে মজিদ,খলিল আর রিদওয়ানের থাবা থেকে মুক্ত। এর পিছনেও কাহিনি রয়েছে। ফরিনার প্রতি লতিফার ভালোবাসা এবং সম্মান দেখে আমির লতিফার ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। তার হুমকিতে থেমে যায় লতিফার কালরাত্রিগুলো। লতিফা বিশ্বস্ততার সাথে আমিরের গোপন আদেশ-নিষেধগুলো মেনে চলে। পদ্মজা, রূম্পা ও হেমলতাকে চোখে চোখে রাখা ছিল লতিফার দায়িত্ব। গত বছর কিশোরী রিনু নতুন এসেছে অন্দরমহলে। সে এ বাড়ি সম্পর্কে কিছুই জানে না। মজিদ হাওলাদার উদারতা দেখিয়ে এতিম রিনুকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। যেহেতু রিনুকে উদারতার জন্য আনা তাই রিনুকে দেখেশুনে রাখা হয়। বিয়ের জন্য পাত্রও খোঁজা হচ্ছে। কিন্তু লতিফা দেখেছে,রিদওয়ানের কু-দৃষ্টি রিনুর উপরে আছে। রিনুর সাথে একই বিছানায় থাকতে থাকতে লতিফা রিনুকে আপন ছোট বোন ভাবা শুরু করেছে। সে রিনুকে ছোট বোনের মতো ভালোবাসে। রিনুকে অভিশপ্ত নিখুঁত যন্ত্রণাময় কালরাত্রিগুলো থেকে বাঁচাতে লতিফা দ্রুত পালাতে চায়। তাই আমিরের প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ থাকা সত্ত্বেও গোপন পরিকল্পনার কথা বলতে পারলো না। দমে গেল! সে কলসি রেখে দ্রুতপায়ে অন্দরমহলে চলে যায়।রান্নাঘরে পা রাখতেই পদ্মজা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। সে পাথরের মতো স্থির! লতিফার হাত খালি দেখে যান্ত্রিক স্বরে বললো, ‘ পানি কোথায়?’লতিফা নিজের হাতে নিজের কপাল চাপড়ালো। সে কলসি রেখে চলে এসেছে। লতিফা টান টান করে হেসে বললো, ‘ এহনি আনতাছি। খাড়াও। ‘লতিফা কলসি আনতে চলে গেল। পদ্মজা এক এক করে পাতিলে মশলা ঢাললো। মুরগি কষানো হবে। পুলিশ ভোরে পূর্ণার লাশ ফেরত দিয়েছে। বাসন্তী নাকি রাতে স্বপ্ন দেখেছেন,পূর্ণা লাহাড়ি ঘরের পাশে কবর খুঁড়ছে। তাই তিনি সবাইকে অনুরোধ করেছেন,পূর্ণার কবর যেন লাহাড়ি ঘরের পাশে গোলাপ গাছটির নিচে হয়। বাসন্তীর কথা রাখা হয়৷ পূর্ণা তার প্রিয় গোলাপ গাছটির নিচে পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। পদ্মজা আজও কাঁদলো না। সে চুপচাপ কোরান শরীফ পড়েছে। তারপর পূর্ণাকে কবর দেয়া হলে অন্দরমহলে ফিরে এসেছে। এ নিয়ে সমাজে নানান কথা হচ্ছে৷ পদ্মজার ব্যবহারে অবাক হয়েছে প্রেমা,বাসন্তী ও প্রান্ত। মৃদুলের অবস্থা নাজেহাল। তাকে হাজার টেনেও পূর্ণার কবর থেকে সরানো যাচ্ছে না। খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। মৃদুলের মা জুলেখা বানু ছেলের পাগলামি দেখে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মোড়ল বাড়ির অবস্থা করুণ! পদ্মজা ভাবনা ছেড়ে কাজে মন দিল। লতিফা কলসি নিয়ে দৌড়ে আসে। তারপর মেঝেতে কলসি রেখে বললো, ‘ লও পানি।’পদ্মজা পূর্বের স্বরেই বললো, ‘ যা যা আনতে বলেছিলাম,আনা হয়েছে?’‘হ,আনছি।’‘রিনু ব্যাগ গুছিয়েছে?’‘হ,গুছাইছে।’‘রিনুকে ডাকো।’লতিফা রান্নাঘর থেকে গলা উঁচু করে ডাকলো, ‘ রিনুরে…ওই রিনু।’রিনু আশেপাশেই ছিল। লতিফার ডাক শুনে দ্রুত হেঁটে আসে। সে গতকাল থেকে আতঙ্কে আছে। ভয়ে রাতে ঘুমাতে পারেনি। রিনুর সামনের দাঁতগুলো উঁচু। গায়ের রঙ কুচকুচে কালো। কিন্তু মনটা সাদা। সরল-সহজ একটা মেয়ে। রিনু এসে বললো, ‘ হ, আপা?’পদ্মজা বললো, ‘ রাতে বের হয়ে যাবি লুতু বুবুর সাথে। পথে একদম ভয় পাবি না। আমি লুতু বুবুকে কিছু টাকা দিয়েছি আর একটা ঠিকানা দিয়েছি। আল্লাহ সহায় আছেন। বিসমিল্লাহ বলে বের হবি। পথে আল্লাহকে স্মরণ করবি বেশি বেশি। ইনশাআল্লাহ কোনো ক্ষতি হবে না।’রিনু বাধ্যের মতো মাথা নাড়াল। লতিফা পদ্মজাকে বললো, ‘ তোমারে ওরা কিচ্ছু যদি করে?’পদ্মজা উত্তর দিল না। লতিফা উত্তরের আশায় তাকিয়ে রইলো। অনেকক্ষণ পর পদ্মজা বললো, ‘ আমার ঘর থেকে কাপড়ের ব্যাগটা নিয়ে পুকুরপাড়ের আশেপাশে কোথাও রেখে আসো। এখন আরেকটু পেঁয়াজ, রসুন বাটো।’‘রাইখা আইছি। সব কাম শেষ। গোয়ালঘরের পিছনে তিনডা কুত্তা বান্ধা আছে। চিল্লাইছে অনেকক্ষণ, খাওন দিছি এরপরে থামছে। আর ওইযে আলমারিডার পিছনে একটা বৈয়াম আছে। ওইডার ভিতরে রিনু বিষ পিঁপড়া ভরছে। এইডাও একটু পরে রাইখা আমুনে।’‘মরে যাবে না?’‘না। বৈয়ামের মুখ কাপড় দিয়া বাইন্ধা রাখছি। ভিত্রে(ভিতরে)মাডিও আছে।’ বললো রিনু।পদ্মজা,লতিফা ও রিনু তিনজনে মিলে রান্নাবান্না শেষ করলো। আমিনা সদর ঘরে আলোকে নিয়ে খেলছেন। তার জীবন আলোতে সীমাবদ্ধ। আর কিছুতে পরোয়া করেন না। আগে ঘরের ব্যাপারে হলেও কথা বলতেন। এখন তাও করেন না। সারাদিন আলোর সাথে কথা বলেন। মনের ব্যথা আলোকে শোনান। আলো কিছু বুঝে না। শুধু হাসে। আলোর হাসিটাই আমিনার সঙ্গী। রিনু রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। মিনিট দুয়েকের মাঝে দৌড়ে ফিরে আসে। পদ্মজাকে জানায়, ‘ রিদওয়ান ভাইজানে আইতাছে। লগে একটা ছেড়ি।’পদ্মজার হাত থেমে যায়! তাহলে সেই নারী? যে পূর্ণাকে হত্যা করতে সাহায্য করেছে! রিনু এক হাত দিয়ে অন্য হাত চুলকাতে থাকলো। সে রিদওয়ানকে আগে ভয় পেত,এখন নাম শুনলেই কাঁপে। লতিফা রিনুর অস্বস্তি,ভয় খেয়াল করে বললো, ‘ রিনু ঘরে যা। দরজাডা লাগায়া দিবি।’লতিফার বলতে দেরি হয়,রিনুর ঘরে চলে যেতে দেরি হয় না।রিদওয়ান সদর ঘরে প্রবেশ করে আসমানিকে বললো, ‘ আমার লগে থাকবা না অন্য ঘর লইবা?’রিদওয়ানকে দেখেই আমিনা আলোকে নিয়ে ঘরে চলে যান। আসমানি নিকাব তুলে চোখ বড় বড় করে বললো, ‘ বাড়ির ভিত্রে(ভিতরে) তোমার লগে থাকুম? আইছি যে এইডাই বেশি। এমনিতে ডর লাগতাছে আমার।’‘তখন রানি,কাকি এরা ছিল। এখন তো নাই। যারা আছে এরা থাকা আর না থাকা সমান।’আসমানি চারপাশ দেখে বললো, ‘ পদ্মজা কই?’আসমানির চোখমুখ দেখে দাত কেলিয়ে হাসলো রিদওয়ান। বললো, ‘ বাবুর বউ পাগল হইছে। মাথা ঠিক নাই। ভয় পেও না।’আসমানি চারপাশ দেখতে দেখতে বললো, ‘ মাথা ঠিক নাই দেইখাই তো ডর বেশি।’রিদওয়ান আসমানির সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালো। বললো, ‘ আজিদ ফিরবে কোনদিন?’‘মা রে লইয়া শহরে গেছে। আইতে চাইর-পাঁচদিন তো লাগবই।’‘তাহলে কয়দিন আমার সাথে থাকো।’আসমানি রিদওয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলো। রান্নাঘর থেকে টুংটাং শব্দ আসছে। আসমানি বললো, ‘পদ্মজা যদি জিগায়,আমি কার কী লাগি?’‘তোমাকে চিনে না? বাড়ির কাছে থাকো,আজিদের বউ হিসেবে দেখেনি কখনো?’‘না।’‘তাইলে কিছু বলার দরকার নাই। প্রশ্ন করলে উত্তর দিও না।’‘সন্দেহ করলে?’‘সন্দেহ করলেই কী? না করলেই কী? পদ্মজার দাম আছে আর?’‘আইচ্ছা ছাড়ো,আমি পদ্মজারে দেইখা আইতাছি।’আসমানি রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়। সে চোখ বুলিয়ে চারপাশ দেখছে। এই বাড়িতে আসার অনেক ইচ্ছে ছিল তার। কখনো আসতে পারেনি। এই প্রথম আসতে পেরেছে। অন্যবার সোজা পাতালঘরে যেত। লুকোচুরি লুকোচুরি খেলাটা কমেছে বলে ভালো লাগছে। এখন হয়তো প্রতিনিয়ত অন্দরমহলে আসা হবে! লুকিয়ে ভাঙা ফটক দিয়ে পাতালঘরে যেতে হবে না।আমির ধানের বস্তায় পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে। ঘরের অর্ধেক অংশ জুড়ে ধানের বস্তা রাখা হয়েছে। বস্তাগুলো বাঁশের মাচার উপর। মাটি স্যাঁতসেঁতে। এই ঘরটায় খুব দরকার ছাড়া কেউ আসে না। আবছা অন্ধকারে আমিরের মুখটা অস্পষ্ট। তার হাতে পদ্মজার বেনারসি। বুকটা ধড়ফড় ধড়ফড় করছে। আর মাত্র কয়টা ঘণ্টা! ইশ,যদি থেকে যাওয়া যেত! আফসোসে বুকের ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোনো পথ নেই। সব পথ বন্ধ। হয় আগুনে ঝলসে যেতে থাকো নয় মৃত্যু গ্রহণ করো। কী নিষ্ঠুর শর্ত! আমির পদ্মজার বেনারসির দিকে তাকালো। ধূলোর আস্তরণে বন্দী হয়ে গেছে সব স্বপ্ন-আশা! চোখে ছবির মতোন দৃশ্যমান হয়,পদ্মজার লাজুক মুখখানা। তার দুধে আলতা ছিমছিমে গড়নে খয়েরী রঙটা কী ভীষণ মানাতো! বর্ষাকালের শুক্রবার মানেই ছিল, বৃষ্টিতে ভেজা। আমির ঘন্টার পর ঘন্টা পদ্মজাকে একধ্যানে দেখেছে। মুখস্থ করে নিয়েছে তার প্রতিটি পশমের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ। আমির কল্পনা থেকে বেরিয়ে বেনারসিতে চুমু দিল। সীমাহীন যন্ত্রণা থেকে বললো, ‘যখন তোমার কথা ভাবি, তখন আমার শরীরের সমস্ত শিরা উপশিরা বাজতে থাকে। আমাদের পথটা কি আরেকটু দীর্ঘ হতে পারতো না?’আমির উত্তরের আশায় বেনারসির দিকে তাকিয়ে রইলো। তার ঠোঁট দুটো বাচ্চাদের মতো ভেঙে আসে। একটু কথা বলুক না…বেনারসিটি একটু কথা বলুক! আমির ভেজা গলায় আবার বললো, ‘তোমার জন্য বুকটা পুড়ে যাচ্ছে। তোমায় ছোঁয়ার সাধ্যি,দেখার সাধ্যি কেন নেই আমার?’বেনারসি নিশ্চুপ! সে বোবা,প্রাণহীন। আমির চোখ বুজে বস্তায় হেলান দিল। গত কয়দিনে পদ্মজার উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ কানে বাজছে। যখন পদ্মজার বলা, ‘ একবার…একবার নিজের মা-বোনকে মেয়েগুলোর জায়গায় দাঁড় করিয়ে ভাবুন। একবার আমাকে মেয়েগুলোর জায়গায় ভেবে দেখুন।’ কথাগুলো কানে বাজলো তখন চোখের পর্দায় ভেসে উঠে পদ্মজার নগ্ন শরীর। তার সারা শরীরে ছোপ ছোপ দাগ। একটা ছায়া পদ্মজার শরীরে চাবুক মারছে। পদ্মজা আর্তনাদ করার শক্তিটুকু পাচ্ছে না। শুধু গলা কাটা গরুর মতো কাতরাচ্ছে।আমির ছায়াটির গলা চেপে ধরার জন্য হাত বাড়ায়৷ কিন্তু একি! ছায়াটিকে ছোঁয়া যাচ্ছে না! আমির দ্রুত চোখ খুলে ফেললো। তার মুখ থেকে অস্পষ্ট উচ্চারণ হয়,পদ্মজা! আমির চট করে উঠে দাঁড়ায়। বুকের ভেতর আগুন লেগে গেছে৷ ভেতরটা ভস্ম হয়ে যাচ্ছে। শরীর দিয়ে যেন ধোঁয়া বের হচ্ছে। সে শার্ট খুলে ছুঁড়ে ফেলে দূরে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। শরীরের শিরা-উপশিরায় তাণ্ডব শুরু হয়ে গিয়েছে। এই যন্ত্রণা আমির নিতে পারে না। সেই দুই হাতে নিজের চুল টেনে ধরলো। বিগত দিনগুলো তাকে নরকীয় শাস্তি দিয়েই চলেছে। চোখগুলো আজেবাজে দেখছে৷ মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরন আজেবাজে ভাবছে। পদ্মজা,পদ্মজা,পদ্মজা…এই পদ্মজাতে কী শক্তি লুকিয়ে আছে? এই একটিমাত্র নাম তাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে। বিষাক্ত করে তুলেছে প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস। আমির টিনের দেয়ালে এক হাত রেখে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে।মজিদ ক্লান্ত হয়ে আলগ ঘরে বসলেন। এখানে প্রচুর আলো-বাতাস আসে। লতিফা মজিদকে আসতে দেখে,দ্রুত শরবত আর পান-সুপারি নিয়ে আসে। মজিদের সামনে এসে বসে রিদওয়ান ও খলিল। মজিদ শরবত পান করে লতিফাকে প্রশ্ন করলেন, ‘পদ্মজা কথাবার্তা বলছে?’লতিফা নতজানু অবস্থায় উত্তর দিল, ‘হ,কইছে।’রিদওয়ান লতিফাকে বললো, ‘যে মেয়েটা আসছে দেখে রাখবি। যত্ন নিবি।’লতিফা বাধ্যের মতো বললো, ‘আইচ্ছা,ভাইজান।’খলিল বললেন, ‘ আসিদপুর থাইকা যে বড় পাটিডা আনছিলাম, পুশকুনিপাড়ে ওইডা বিছাবি।’‘বিছাইছি খালু। এশারের আযানডার পরে সব খাওনদাওন দিয়া আমু।’‘ভালা করছস।’ খলিল পান মুখ পুরে বললেন।লতিফা শরবতের খালি গ্লাস নিয়ে চলে গেল। মজিদ আরো দুই গ্লাস পানি পান করলেন। তিনি ভীষণ ক্লান্ত। সারাদিন দৌড়ের উপর ছিলেন। রিদওয়ানের ভুল আপাতত মগার উপর ঘুরে গিয়েছে। মগা গতকাল থেকে বাড়িতে নেই। আবার শেষবার মগার সাথে পূর্ণা ছিল। সবার জবানবন্দির ভিত্তিতে আপাতদৃষ্টিতে মগা খুনি! পুলিশ হাওলাদার বাড়ির দারোয়ানকে খুঁজেছে। মোড়ল বাড়িতে পুলিশ এসেছে শুনেই রিদওয়ান দারোয়ান মুত্তালিবকে হত্যা করেছিল। তাই পুলিশ মুত্তালিবকে পেল না। মজিদ হাওলাদার পুলিশকে বলেছেন,তিনি ধারণা করছেন দারোয়ান ও মগা পরিকল্পনা করে পূর্ণালে ধর্ষণ করার পর হত্যা করেছে। পুলিশ এখন দারোয়ান মুত্তালিব ও মগাকে খুঁজছে।রিদওয়ান নিরাপদে আছে। খলিল মজিদকে বললেন, ‘ ভাইজান, কিছু ভাবছেন?’‘কী নিয়ে?’ মজিদের নির্বিকার স্বর।রিদওয়ানের ভ্রুকুটি হয়ে গেল। সে চারপাশ দেখে বললো, ‘ আপনি এতো নির্বিকার কেন চাচা? আজ আমিরকে খুন করার কথা ছিল।’মজিদ এক হাত তুলে রিদওয়ানকে চুপ করতে ইশারা করলেন। তারপর বললেন, ‘বাবু যদি আমাদের কথা না শুনে তখন ব্যবস্থা নেব। তার আগে না।’রিদওয়ানের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে যায়। সে নাছোড়বান্দা স্বরে বললো, ‘ আমির কখনোই পদ্মজাকে খুন করবে না,শেকল বন্দীও করবে না!’মজিদ গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘দেখা যাবে।’রিদওয়ান খলিলের দিকে তাকালো। তারপর অধৈর্য্য হয়ে মজিদকে বললো, ‘ আমিরের জন্য আমাদের ক্ষতি না হয়ে যায়!’মজিদ খলিলকে বললেন, ‘ দেখ তো আশেপাশে কেউ আছে নাকি। ঘরগুলোও দেখবি।’আমির মাত্র বের হতে যাচ্ছিল। মজিদের শেষ কথাটা কানে আসতেই সে দরজার আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। খলিল আলগ ঘরের প্রথম দুটো ঘর দেখে এসে বললেন, ‘কেউ নাই।’তারপর চেয়ারে বসলেন। রিদওয়ান খলিলের দিকে তাকিয়ে ইশারা করে মজিদকে বুঝাতে। খলিল মজিদের আরেকটু কাছে এসে বসলেন। তারপর বললেন, ‘রিদু কিন্তু হাচা কইতাছে ভাইজান। বাবুরে দিয়া আর ভরসা নাই।’মজিদ রিদওয়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তুই কী বোঝাতে চাচ্ছিস? বাবু আমাদের খুন করে পদ্মজাকে নিয়ে সংসার করতে চাইবে?’রিদওয়ান তড়িৎ গতিতে বললো, ‘এটা কি সম্ভব না কাকা? আলমগীর ভাই কী করলো?’মজিদ নির্লিপ্ত কণ্ঠে খলিলকে বললেন, ‘ খলিল,তোর ছেলের বুদ্ধি এখনো হাঁটুতে আছে।’রিদওয়ান উঠে দাঁড়ায়। তার মাথা চড়ে যাচ্ছে। মজিদ বললেন, ‘তুই আমার পাশে বস। তোর মাথায় কিছু কথা ঢোকাতে হবে।’রিদওয়ান মনের বিরুদ্ধে আবার বসলো। মজিদ বললেন, ‘চুপ করে আমার কথা শোন। আলমগীর আর বাবুর মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। পাতালঘরের রীতি পূর্বপুরুষ থেকে পেলেও, নারীপাচার চক্রটার সৃষ্টি বাবুর। এই চক্রে আলমগীর, তুই, আমি আর খলিল বাবুর দলের একটা অংশমাত্র। আমরা সরে গেলে আমাদের উপর রাগ একমাত্র বাবুই ঝাড়তে পারবে। কিন্তু এই চক্রের শুরুটা যে করেছে সে হচ্ছে নেতা। গত সপ্তাহে বাবু ঢাকা থেকে একটা খাম নিয়ে আসছে। খামের চিঠিতে স্পষ্ট লেখা আছে,ছয় মাস পর বাবু নিজ দায়িত্বে ষোলটা মেয়ে সিঙ্গাপুরে পাঠাবে। সার্নার জনের সাথে তিন মাস আগে থেকে চুক্তিবদ্ধ বাবু। বাবুর সাক্ষর আছে চিঠিতে। বাবু প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।’রিদওয়ান বললো, ‘পড়ছি আমি। কিন্তু টাকা কী করছে? আমাদের তো দেয়নি।’মজিদ বিরক্তিতে কপাল কুঁচকালেন। তিনি কথার মাঝে কথা বলা একদম পছন্দ করেন না। বললেন ‘হয়তো কাজশেষে দিত। আমার পুরো কথা শোন। কথার মাঝে কথা বলবি না।’রিদওয়ান মাথা নাড়াল। মজিদ বললেন, ‘এখন বাবু যদি প্রতিজ্ঞা রক্ষা না করে এর পরিণতি কেমন হবে ধারণা আছে? বিদেশের কত মানুষের সাথে ও কাজ করছে হিসাব আছে? সবার বিরুদ্ধে ছোটখাটো প্রমাণ হলেও বাবুর কাছে আছে। আর এই দেশে কি একমাত্র বাবু মেয়ে পাচার করে? আরো আছে। কম হলেও আট-নয় জন দলনেতার সাথে বাবুর ভালো পরিচয় আছে। যেখানে এই দেশ পরিচালনা করা একজন নেতা এই চক্রের সাথে জড়িত আর বাবুর তার সাথে যোগসূত্র আছে, সেখানে বাবু পালিয়েছে যদি জানতে পারেন তিনি বাবুকে ছেড়ে দিবেন না। সব রকম ব্যবস্থা নিবেন। সম্মানহানির ভয় পাবেন,সব প্রকাশ হওয়ার ভয় পাবেন। বাবুর সাথে পদ্মজার ক্ষতি করবেন। পদ্মজা সুন্দর। বাবুর সামনে পদ্মজার বেইজ্জতি হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ আছে। আরো কত ক্ষমতাশীল লোক বাবুর সাথে এই কাজে জড়িত আছে। যতদিন বাবু এই কাজে নিজেকে রাখবে ততদিন ভালো থাকবে। ছাড়তে চাইলেই সর্বনাশ। বাবুর বুদ্ধি তোর মতো না রিদু। ও আর যাই করুক পালিয়ে যাওয়ার মতো বোকামি করবে না। এতোটা বোকা বাবু না। যদি সত্যি বাবু পদ্মজাকে ভালোবেসে থাকে ও ভুলেও পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিবে না। এই চক্রের সাথে জড়িত সবাই একজোট! বাবু পালানোর চেষ্টা করলে ও একা হয়ে যাবে। সবাই ঠিক ধরে ফেলবে বাবুকে। আর বাবু ধরা পড়লে পদ্মজাও ধরা পড়বে। পদ্মজা একবার ধরা পড়লে চোখের পলকে ভোগের বস্তু হয়ে যাবে।’‘পালিয়ে কোথাও না গিয়ে পুলিশকে সব খুলে বললেই তো ও নিরাপত্তা পেয়ে যাবে! আর ফেঁসে যাবো আমরা আর অন্যরা!’মজিদ বোকা রিদওয়ানের পিঠ চাপড়ে বললেন, ‘ পুলিশ কয়জনকে ধরবে? আমির নিজেও পুলিশের হাতে ধরা পড়বে। ফাঁসিও হবে। নিজের মৃত্যু নিজে টেনে আনবে। তো কী হলো? কিছু কিছু কাজ আছে,যেগুলোতে একবার প্রবেশ করে ঘাঁটি সৃষ্টি করে ফেললে আর সেখান থেকে বের হওয়া যায় না। বাবু তেমনই চিপায় আছে। যদি পালাতে চায় নিজের সাথে পদ্মজার ইজ্জত আর জীবন হারাবে। এই ঝুঁকি নেয়ার সাহস বাবুর হবে না। আমি নিজের চোখে ঢাকায় দেখেছি, পদ্মজা অসুস্থ হয়ে ঘরে ঘুমাচ্ছে আর আমির বাড়ির সব কাজ করছে। পদ্মজার জন্য হলেও বাবু পাতালঘর আর আমাদের আঁকড়ে ধরে রাখবে ।’‘দেশে কি জায়গার অভাব আছে? কোথাও না কোথাও ঠিক লুকিয়ে থাকতে পারবে।’‘ওর কাজ করতে হবে না? ঘরে বসে খাবে? তুই নিজ চোখে দেখেছিস, আমির কীভাবে মাত্র দশ দিনে আলীকে রাজশাহী থেকে ধরেছে। আলীর পালিয়ে যাওয়া আমিরের জন্য হুমকি ছিল। তাই চিরুনি অভিযান চালিয়ে ঠিক খুঁজে বের করছে। আমিরের অভিজ্ঞতা আছে। আমির পদ্মজাকে নিয়ে এতো বড় ঝুঁকি নিবে না। আমির চিনে তার পেশার রক্ত কেমন! এতদিন অন্য মেয়েদের পিটিয়েছে। তখন নিজের বউকে পিটাতে দেখবে।’মজিদ থামলেন,দাঁত বের করে হাসলেন। এতো কথাতেও রিদওয়ানের মনে শান্তি এলো না। সে দুইহাত তুলে বললো, ‘ আচ্ছা ধরলাম,আমির পালাবে না। কিন্তু পদ্মজাকে বেইজ্জতি করার জন্য আমাদের খুন করবে না তার নিশ্চয়তা আছে?’মজিদ হাওলাদার এবার রেগে গেলেন। বললেন, ‘বাবুর যখন এই কাজের সাথে থাকতেই হবে তখন আমাদের খুন করে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারবে না। খলিল তোর ছেলেরে নিয়ে যা। তারপর গোয়ালঘর থেকে কতোটা গোবর খাইয়ে দে।’অপমানে রিদওয়ানের মুখটা থমথমে হয়ে যায়। সে ঘনঘন নিঃশ্বাস নিতে থাকলো। আমিরের জায়গাটা সে কিছুতেই দখল করতে পারছে না!ব্যর্থ হচ্ছে বার বার। রিদওয়ান চেয়ারে লাথি দিয়ে, চলে গেল। খলিল বললেন, ‘ ভাইজান,আসমানিরে আনা কি ঠিক কাম হইলো?’‘একদম না। রিদওয়ান আবার আরেকটা ভুল করলো। বাড়িতে কেউ নাই বলে,ঝুঁকি নিয়ে যা ইচ্ছে করছে। আবার বিপদে পড়লে আমার পা যেন না চাটে বলে দিস।’খলিল মুখ থেকে পানের পিচকিরি ফেলে বাইরে চোখ নিবদ্ধ করলেন।ক্রোধে-আক্রোশে আমিরের কপালের রগ ভেসে উঠে। চোখ দুটি রক্তবর্ণ ধারণ করে। সে রাগে এক হাতে দরজা চেপে ধরলো। তার দূর্বলতা ধরতে পেরে মজিদের আনন্দ হচ্ছে! মজিদের হাসি দেখে আমিরের গা জ্বলে যাচ্ছে। সে একবার ভাবলো এক্ষুনি গিয়ে মজিদের গলা চেপে ধরবে। কিন্তু পরক্ষণে কী ভেবে থেমে গেল। চলে এলো ধান রাখার ঘরে। ধানের মাচার ভেতর উঁকি দিয়ে দেখলো,চাপাতি আর রাম দা ঠিকঠাক আছে নাকি। হ্যাঁ,ঠিকঠাক আছে! আমির স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। জানালা খুলে বাইরে তাকাতেই বিকেলের রঙহীন ধূসর কুয়াশা চোখে পড়ে।পদ্মজা পালঙ্কের উপর গাঁট হয়ে বসে আছে। এশারের নামায আদায় করে মাত্রই উঠেছে। তার পরনে সাদা শাড়ি৷ লতিফা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে পদ্মজাকে জানালো,সে পুকুরপাড়ে খাবার রেখে এসেছে। বেশ সুন্দর করে সাজানো হয়েছে চারপাশ। মজিদ,খলিল,আমির,রিদওয়ান ও আসমানি এখুনি যাবে৷ পদ্মজা নিস্তেজ গলায় বললো, ‘ওরা ঘুমিয়ে পড়লে আমাকে ডেকো।’তার শান্ত স্বর ! কথা শুনে মনে হচ্ছে,পদ্মজা লতিফাকে ঘর ঝাড়ুর জন্য অথবা রান্না করার জন্য ডাকতে বলেছে! লতিফা দৌড়ে বেরিয়ে গেল। তার বুকের ভেতর দামামা বাজছে। মনে হচ্ছে, যুদ্ধ শুরু হতে চলেছে। এ তো সত্যিই যুদ্ধ! লতিফার ঘাম হচ্ছে।চাপা একটা আনন্দও কাজ করছে! কী অদ্ভুত!রান্নাঘরে আসমানি গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু পদ্মজাকে কথা বলাতে পারেনি৷ পদ্মজা একটাও জবাব দেয়নি। সে আসমানিকে পুরোদমে এড়িয়ে গিয়েছে। আসমানি নিরাশ হয়ে বেরিয়ে যায়৷ তারপর আর তাদের দেখা হয়নি। পদ্মজা বিছানা থেকে নেমে শক্ত করে হাত খোঁপা করলো। জানালা গলে চাঁদের আলো পদ্মজার পায়ের উপর পড়ে। নিখুঁত কালো রাতকে চাঁদ তার নরম আলোয় আচ্ছন্ন করে রেখেছে। পদ্মজা চাঁদের আলোকে ছোঁয়ার চেষ্টা করে। ছোঁয়া গেল ঠিকই অনুভব করা গেল না। পদ্মজার কানের পাশ দিয়ে সাঁ সাঁ করে বাতাস উড়ে যায়। সে বাতাসের শীতলতাকে আগুনের আঁচের মতো অনুভব করছে!তারা পাঁচ জন গোল হয়ে বসেছে। খাবারের সুন্দর ঘ্রাণে চারপাশ মৌ মৌ করছে। রান্নার ঘ্রাণ শুনেই আমির বুঝে গেল,সব পদ্মজা রান্না করেছে! সে নিজেকে সামলাতে পারলো না। সবার আগে খাওয়া শুরু করলো। আগে তাদের হালকা-পাতলা আলোচনা করার কথা ছিল। তারপর খাওয়া দাওয়া করে ভবিষ্যত পরিকল্পনা করবে। কিন্তু আমির নিয়ম ভঙ্গ করে শুরুতেই খাওয়া শুরু করে। অগত্যা বাকিরাও খাওয়া শুরু করলো। তাদের চেয়ে কয়েক হাত দূরে টলটলে জলের বিশাল পুকুর। জলের রঙ কালো। আশেপাশে কোনো ফুলের গাছ আছে। একটা মিষ্টি ঘ্রাণ ভেসে আসছে৷ কালো জলের পুকুরটির পঁচিশটি সিঁড়ি। এই পুকুর নিয়ে অনেক গুজব রয়েছে। যদিও সব মিথ্যে৷ বাড়ির মেয়েরা এদিকটায় কখনো আসেনি। মজিদ হাওলাদারের ভীষণ প্রিয় এই জায়গাটা। তার দাদা এই জায়গাটাতে সবসময় ভোজ আসর করতেন। মজিদের ইচ্ছে ছিল চাঁদের রাতে পুকুরের পাশে বসে ভোজ আসর উপভোগ করার। কিন্তু সম্ভব হয়নি! মজিদ হাওলাদারের দাদা নিজের বউকে ভূতে ধরা পাগল প্রমাণ করার জন্য গুজব রটিয়ে দেন। সেই গুজব ধরে রাখতে মজিদ হাওলাদারও এদিকটায় আসেননি কখনো। আজ বাড়ি খালি হওয়াতে সেই সুযোগ মিলেছে৷ তিনি গতকালই দুজন লোক দিয়ে জায়গাটা সুন্দর করে পরিষ্কার করেছেন। চোখ জুড়িয়ে দেয়ার মতো দৃশ্য হয়েছে!একটু দূরেই ঝাঁকে ঝাঁকে জোনাকি পোকা উড়ছে৷ মাথার উপর চাঁদের আলো। চারপাশে চারটি হারিকেন। চমৎকার পরিবেশ। খলিল মুরগির রানে কামড় দিয়ে বললেন, ‘ বাবু,সারাদিন কই থাহছ?’আমির ছোট করে উত্তর দিল, ‘এখানেই।’মজিদ আমিরকে আগাগোড়া পরখ করে নিয়ে বললেন, ‘কোনো কিছু নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছিস?’‘না,আব্বা।’ বললো আমির।রিদওয়ান কিছু বলতে আগ্রহী নয়। সে চুপচাপ খাচ্ছে। তার চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ। আসমানি আমিরের পাশ ঘেঁষে বসলো। বললো, ‘ পরের কামে কয়দিনের সময় দিছে?’‘অনেকদিন।’‘এইবার ভৈরবে নিশানা রাইখো। ওইহানে সুযোগ সুবিধা আছে অনেক।’মজিদ আসমানির সাথে তাল মেলালেন, ‘আমিও ভৈরবের কথা বলতাম।’আমির রিদওয়ানের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘এই কাজ রিদওয়ান নিক। আজিদ আর হাবুরে নিয়ে কয়দিনের জন্য ট্রলার নিয়ে ভৈরবে চলে যাবে।’রিদওয়ান না চাইতেও সম্মতি জানালো। আমির আড়চোখে পিছনে তাকালো। তার চেয়ে পাঁচ হাত দূরে একটা রেইনট্রি গাছ। গাছটির পিছনে সে চাপাতি আর রাম দা রেখেছে। আরেকটু রাত বাড়লে যখন সবাই ক্লান্ত হয়ে যাবে,নেশা করবে তখন সে আক্রমণ করবে। দুই হাতে দুই অস্ত্র নিয়ে রিদওয়ান ও মজিদকে আঘাত করা তার লক্ষ্য। তারপর খলিল ও আসমানি বাঁ হাতের খেল! আমির চুপচাপ প্রহর গুণতে থাকে।খাওয়া শেষে প্লেটগুলো দূরে রাখা হয়। প্লেটগুলো সরানোর জন্য মজিদ চারপাশে চোখ বুলিয়ে লতিফাকে খুঁজলেন। লতিফা আশেপাশে নেই।অন্যবার তো থাকে। আজ কোথায়? মজিদ বিরক্ত হলেন। তিনি মনে মনে লতিফাকে একটা নোংরা গালি দিলেন। তারপর পরবর্তী ডিল নিয়ে কথাবার্তা শুরু করলেন। কীভাবে এগোতে হবে কোন এলাকায় যেতে হবে,বর্তমান পরিস্থিতি কীভাবে স্বাভাবিক করা যায়। এসব নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। রিদওয়ান চোখমুখ কুঁচকে বসে আছে। মজিদ হাওলাদার আমিরকে কী প্রশ্ন করবেন বলেছিলেন। তাও করছে না। এই বুড়ো আবার গুটি পাল্টে দিয়েছে। আমির কথা কম বলছে। সে মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায়! কিন্তু তার সুযোগ আসার পূর্বেই সে এবং বাকিরা ঘুমের কাছে হেরে যায়। এতোই ঘুম পেয়েছিল যে,তাদের শরীর অন্দরমহলে যাওয়া অবধি ইচ্ছেশক্তি পায়নি।লতিফা কিছুটা দূরে অন্ধকারে লেবু গাছের আড়ালে বসে ছিল। মশা কামড়ে তার হাত-পা বিষিয়ে দিয়েছে। যখনই দেখলো ভোজ আসরের পাঁচজনই ঘুমিয়ে পড়েছে,তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠে। সে ছুটে যায় অন্দরমহলে। পদ্মজা সদর ঘরে শান্ত হয়ে বসেছিল। লতিফা হাঁপাতে হাঁপাতে সব জানালো। তারপর তারা লুকিয়ে রাখা দঁড়ি আর ওড়না নিয়ে চলে আসে পুকুরপাড়ে। পদ্মজা, লতিফা ও রিনু মিলে ঠান্ডা মাথায় মজিদ,খলিল,আমির,রিদওয়ান এবং আসমানির হাত-পা ও মুখ বেঁধে ফেললো। তারপর এক এক করে টেনে নিয়ে গেল রেইনট্রি গাছের সামনে। পাঁচজনকে পাঁচটি গাছের সাথে বেঁধে তারা স্থির হয়ে দাঁড়ালো।লতিফা,রিনু ঘেমে একাকার। রিনু তো ভয়ে তরতর করে কাঁপছে। এমন একটি দুঃসাহসিক কাজে অংশগ্রহণ করে সে হতভম্ব! পদ্মজা বললো, ‘ এবার তোমরা বেরিয়ে যাও।’লতফা ও রিনু দুজনের গায়েই বোরকা ছিল। তারা ব্যাগ নেয়ার জন্য অন্দরমহলে দৌড়ে যায়। পদ্মজা বিদায় জানাতে অন্দরমহলে আসে। বের হওয়ার পূর্বে রিনু ও লতিফা পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিল। লতিফা বিষণ্ণ গলায় বললো, ‘ আবার দেখা হইবো তো পদ্ম?’‘আল্লাহ চাইলে,আবার আমাদের দেখা হবে বুবু।’‘সামলাইতে পারবা সব?’‘পারবো। তুমি বেরিয়ে যাও। আর দেরি করো না।’লতিফা এক হাতে ব্যাগ নিয়ে অন্য হাতে রিনুর হাত ধরলো। তারপর ছলছল চোখে পদ্মজাকে একবার দেখে বেরিয়ে পড়লো অচেনা গন্তব্যে। আমিনা সদর ঘর থেকে সবকিছু দেখেছেন। এতদিনের পুরনো কাজের মেয়ে চলে যাচ্ছে কেন? তিনি প্রবল আগ্রহ থেকে পদ্মজাকে প্রশ্ন করলেন, ‘ লুতু কই যাইতাছে?’পদ্মজা শান্ত স্বরে বললো, ‘ শহরে যাচ্ছে।’‘ওমা! কার কাছে?’‘আপনি ঘরে যান। সকাল হওয়া অবধি বের হবেন না।’আমিনা অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘কেরে?’পদ্মজা তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো,বললো, ‘ এতদিন যেরকম নির্জীব ছিলেন আজও থাকুন।’পদ্মজা রান্নাঘর থেকে হাতে রাম দা তুলে নিল। তারপর আমিনাকে জোর করে ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। দরজা বন্ধ করার আগে আমিনার উদ্দেশ্যে বললো, ‘যদি কোনো শব্দ করেন আপনার মাথা শরীর থেকে আলাদা হয়ে যাবে।’তারপর পদ্মজা রাম দা নিয়ে গোয়ালঘরে গেল। সেখান থেকে তিনটে নেড়ি কুকুর নিয়ে পুকুরপাড়ের পথ ধরলো।.নিশীথে পাঁচজন মানুষ বাঁধা অবস্থায় মাথা ঝুঁকে ঘুমাচ্ছে। আর সামনে রাম দা নিয়ে এক রূপসী বসে আছে। পাশে তিনটে কুকুর দাঁড়িয়ে আছে। দৃশ্যটি ভয়ংকর। সুনসান নীরবতায় কেটে যায় ক্ষণ মুহূর্ত। আর সময় নষ্ট করা যাবে না। তারা বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। মৃত্যু উপভোগ না করে অমানুষগুলো মরে যাক পদ্মজা চায় না। সে দুই জগ পানি পাঁচ জনের মাথার উপর ঢেলে দিল। তাতেও তাদের ঘুম ভাঙলো না। পদ্মজা রাম দার শেষ প্রান্ত দিয়ে পর পর পাঁচজনের পায়ের তালুতে আঘাত করলো। এতে কাজ হয়। তারা সক্রিয় হয়। পাঁচ জনই আধবোজা চোখে তাকায়। তাদের ঘুমের ঘোর এখনো কাটেনি। মাথা ভারী হয়ে আছে। ভনভন করছে। পদ্মজা চৌকিখাটের উপর গিয়ে বসলো। রিদওয়ান পদ্মজাকে ঝাপসা ঝাপসা দেখছে। সে চোখ বুজে আবার তাকালো। পদ্মজার হাসি হাসি মুখটা ভেসে উঠে। তার হাতে রাম দা। জ্বলজ্বল করছে পদ্মজার পাশের তিনটে কুকুরের চোখ! রিদওয়ান চমকে গেল। মজিদ,খলিল এবং আসমানি যখন পরিস্থিতি বুঝতে পারলো তারাও চমকে যায়। তারা কথা বলতে গেলে ‘উউউ’ আওয়াজ বের হয়। উঠতে গেলে টের পায় তাদের হাত-পা বাঁধা। ঘুম উবে যায়। মস্তিষ্ক সচল হয়ে উঠে। রিদওয়ান অবাক চোখে মজিদের দিকে তাকায়। মজিদও তাকালেন। তারা ছোটার জন্য ছটফট করলো। কিছু একটা বলার চেষ্টা করলো। কিন্তু কোনো চেষ্টাই সফল হচ্ছে না। আমির পদ্মজার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ দুটি বার বার বুজে যাচ্ছে। তবে পরিস্থিতি ধরতে পেরেছে। সে সবসময় বলে,পদ্মজার নাকি নিজস্ব আলো আছে! এইযে এখন তার মনে হচ্ছে,অন্ধকারাচ্ছন্ন অতলে যখন সে তলিয়ে যাচ্ছিল তখন পদ্মজা এসে আলোর মিছিলে ভরিয়ে দিয়েছে তার মনের উঠান!নিশীথে পাঁচজন মানুষ বাঁধা অবস্থায় মাথা ঝুঁকে ঘুমাচ্ছে। আর সামনে রাম দা নিয়ে এক রূপসী বসে আছে। পাশে তিনটে কুকুর দাঁড়িয়ে আছে। দৃশ্যটি ভয়ংকর। সুনসান নীরবতায় কেটে যায় ক্ষণ মুহূর্ত। আর সময় নষ্ট করা যাবে না। তারা বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। মৃত্যু উপভোগ না করে অমানুষগুলো মরে যাক পদ্মজা চায় না। সে দুই জগ পানি পাঁচ জনের মাথার উপর ঢেলে দিল। তাতেও তাদের ঘুম ভাঙলো না। পদ্মজা রাম দার শেষ প্রান্ত দিয়ে পর পর পাঁচজনের পায়ের তালুতে আঘাত করলো। এতে কাজ হয়। তারা সক্রিয় হয়। পাঁচ জনই আধবোজা চোখে তাকায়। তাদের ঘুমের ঘোর এখনো কাটেনি। মাথা ভারী হয়ে আছে। ভনভন করছে। পদ্মজা চৌকিখাটের উপর গিয়ে বসলো। রিদওয়ান পদ্মজাকে ঝাপসা ঝাপসা দেখছে। সে চোখ বুজে আবার তাকালো। পদ্মজার হাসি হাসি মুখটা ভেসে উঠে। তার হাতে রাম দা। জ্বলজ্বল করছে পদ্মজার পাশের তিনটে কুকুরের চোখ! রিদওয়ান চমকে গেল। মজিদ,খলিল এবং আসমানি যখন পরিস্থিতি বুঝতে পারলো তারাও চমকে যায়। তারা কথা বলতে গেলে ‘উউউ’ আওয়াজ বের হয়। উঠতে গেলে টের পায় তাদের হাত-পা বাঁধা। ঘুম উবে যায়। মস্তিষ্ক সচল হয়ে উঠে। রিদওয়ান অবাক চোখে মজিদের দিকে তাকায়। মজিদও তাকালেন। তারা ছোটার জন্য ছটফট করলো। কিছু একটা বলার চেষ্টা করলো। কিন্তু কোনো চেষ্টাই সফল হচ্ছে না। আমির পদ্মজার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ দুটি বার বার বুজে যাচ্ছে। তবে পরিস্থিতি ধরতে পেরেছে। সে সবসময় বলে,পদ্মজার নাকি নিজস্ব আলো আছে! এইযে এখন তার মনে হচ্ছে,অন্ধকারাচ্ছন্ন অতলে যখন সে তলিয়ে যাচ্ছিল তখন পদ্মজা এসে আলোর মিছিলে ভরিয়ে দিয়েছে তার মনের উঠান!পদ্মজা পাঁচজনকে পরখ করে নিল। তাদের ছটফটানি আর ভয়ার্ত চোখ পদ্মজার দেখা সবচেয়ে সুন্দর ও তৃপ্তিকর দৃশ্য। আমিরের উপর চোখ পড়তেই আগে চোখে ভাসে আমিরের অযত্নে বেড়ে উঠা মাথার চুল। যা আমিরের কপাল ও চোখ ঢেকে রেখেছে৷ পদ্মজা উঠে দাঁড়ালো। রিদওয়ান ও মজিদের পাশে গিয়ে বসলো। দূরে সন্তানহারা পেঁচা ডাকছে চাপাস্বরে। আশেপাশে নাড়াচাড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। পদ্মজা তাদের উপর ঝুঁকলো। তারপর মৃদু হেসে চাপাস্বরে বললো, ‘ তবে হউক উৎসব। ‘পদ্মজার কন্ঠ ও হাসি তাদের হৃৎপিণ্ডে জোরেশোরে আঘাত হানে। আসমানি ‘উউ’ শব্দ করই চলেছে। সে ভীতগ্রস্ত। ভয়ে তার শরীরে ঘাম হচ্ছে। ভয় পাচ্ছে উপস্থিত চারজনই। পদ্মজা আনাড়ি নয়৷ সে এর আগে তিনটে খুন করেছে। শেষ খুনটা নিখুঁত ছিল! পদ্মজাকে ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। রিদওয়ান শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। পদ্মজা হিজল গাছটির দিকে এগিয়ে যায়। লতিফা হিজল গাছের পিছনে কাপড়ের ব্যাগটি রেখেছে। পদ্মজা কাপড়ের ব্যাগখানা নিয়ে আসে। ব্যাগ উল্টো করতেই বেরিয়ে আসে তিনটে বৈয়াম, চাপাতি,ছুরি,রাম দা ও তলোয়ার। অস্ত্রগুলো দেখেই বন্দীদের আত্মা কেঁপে উঠে। খলিল হাওলাদার ভয়ে পা দিয়ে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে গোঙানো শুরু করলেন। পদ্মজা তীক্ষ্ণ চোখে তাকায়। ছুরি নিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে আসে। পদ্মজার হাতে ছুরি দেখে কুকুরগুলো পালাতে উদ্যত হয়। কিন্তু তারা সুপারি গাছের সাথে বাঁধা! তাই পালাতে পারলো না। ঘেউ ঘেউ করে চিৎকার করে উঠলো।পদ্মজা খলিলের উপর ঝুঁকে তার মাথার চুল শক্ত করে ধরে কিড়মিড় করে বললো, ‘ যে হাত দিয়ে এতদিন হত্যা করে আসা হয়েছে আমি আজ সেই হাত কেটে ফেলবো।’খলিল চোখ দুটি মারবেলের মতো বড় বড় হয়ে যায়। পদ্মজার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়ে পূর্ণার মৃত দেহের সোঁদা গন্ধ৷ ভেসে উঠে আঁচড় কাটা মায়াবী মুখটা। সে মনের ক্রোধ প্রকাশ করতে,খলিলের চুলে ধরে রেইনট্রি গাছের সাথে বার কয়েক আঘাত করলো। খলিলের মাথা ফুলে টিলার মতো উঁচু হয়ে যায়। যে চোখে এতদিন হিংস্রতা ছিল সেই চোখে ভয়ের ছাপ।পদ্মজা ছুরি দিয়ে খলিলের হাত-পায়ের চামড়া ছিঁড়ে দিল। তারপর বৈয়াম থেকে মরিচ নিয়ে সেখানে আহত স্থানে মাখিয়ে দিল। খলিলের চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে। তিনি কেঁদে কিছু বলছেন,কিন্তু ‘উউ’ ছাড়া কিছু শোনা যাচ্ছে না। যন্ত্রণায় তার কলিজা ফেটে যাচ্ছে। জ্বলে যাচ্ছে হাত-পা।খলিলকে ছেড়ে পদ্মজা সরু চোখে রিদওয়ানের দিকে তাকালো। কাছে কোথাও থেকে থেকে পেঁচা ডাকছে। জোনাকি পোকাদের দেখা যাচ্ছে না। কুকুর তিনটে পদ্মজার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে।খলিলকে আঘাত করার সময় পদ্মজার চোখেমুখে যে হিংস্রতা ফুটে উঠেছিল, সেই দৃশ্য দেখে তারা অবাক হয়েছে৷ পদ্মজাকে তাকাতে দেখে রিদওয়ান চট করে চোখের দৃষ্টি সরিয়ে নিল। খলিলের অবস্থা দেখার পর থেকে সে পদ্মজাকে ভয় পাচ্ছে। শরীরের সব শক্তি দিয়ে চেষ্টা করছে ছোটার। রিদওয়ানের চোরা চাহনি দেখে পদ্মজা হয়তো হাসলো। মধ্যরাতের বাতাস ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। পদ্মজা দ্বিতীয় বৈয়ামটি নিয়ে রিদওয়ানের দিকে এগিয়ে আসে। পদ্মজার একেকটা কদম রিদওয়ানের আত্মাকে কাঁপিয়ে তুলছে। পদ্মজা রিদওয়ানের পাশে বসলো। রিদওয়ান আড়চোখে পদ্মজার দিকে তাকায়। পদ্মজা রিদওয়ানের মুখের সামনে মুখ নিয়ে দাঁত বের করে হাসলো। বললো, ‘ রাখে আল্লাহ মারে কে হা?’রিদওয়ান একটু নড়াচড়া করে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করে। পদ্মজা এক থাবায় রিদওয়ানের মুখ থেকে ওড়নার বাঁধন খুলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে রিদওয়ান মজিদের উদ্দেশ্যে বললো, ‘ আমি আগেই বলছিলাম এই মেয়ে আমাদের বিপদের কারণ হবে। শুনেননি।’পদ্মজা খপ করে রিদওয়ানের তালুর চুল টেনে ধরলো। রিদওয়ান পদ্মজার মুখে থুথু ছুঁড়ে মারে। পদ্মজা তার মুখ দ্রুত সরিয়ে নেয়। রিদওয়ানের থুথু রিদওয়ানের মুখের উপরই পড়লো। রিদওয়ান কটমট করে তাকালো। বললো, ‘ বে** মা* তোরে প্রথম দিনই মেরে ফেলা উচিত ছিল।’পদ্মজা উঠে দাঁড়ায়। জোরে লাথি মারে রিদওয়ানের মুখে। লাথি খেয়ে রেইনট্রি গাছের সাথে আঘাত পায় রিদওয়ান। তার মাথা ভনভন করে উঠে। রিদওয়ান কিছু বুঝে উঠার আগে পদ্মজা তার প্যান্টের ভেতর বৈয়াম থেকে কিছু ঢেলে দিল। সেকেন্ড কয়েক পার হতেই বিশেষস্থানে জ্বালাপোড়া অনুভুব করে। একসাথে অনেকগুলো জীবের কামড়ে তার মুখ নীল হয়ে যায়। সে চমকে তাকায় পদ্মজার দিকে। প্রশ্ন করে, ‘কী দিছস? খান** ঝি প্যান্টের ভেতর কী দিছস তুই?’পদ্মজা উত্তর দিল না। রিদওয়ান চিৎকার করতে থাকে। পদ্মজা রয়ে সয়ে রিদওয়ানের চিৎকার করার দৃশ্য দেখতে দেখতে কুকুরগুলোকে মুক্ত করে দেয়। কুকুর তিনটে পদ্মজার দিকে তাকিয়ে ঘেউ ঘেউ করে পিছিয়ে যায়। পদ্মজা তৃতীয় বৈয়াম নিয়ে মজিদের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো। বৈয়াম থেকে দুই টুকরো কাঁচা মাংস বের করলো। ছাগল জবাই করেছিল আজ। সে দেখেশুনে হাড্ডিসহ কয়েক টুকরো মাংস রেখে দিয়েছিল। মাংস দেখে কুকুরগুলোর চোখ চকচক করে উঠলো। পদ্মজা এক টুকরো মাংস নিয়ে মজিদের পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর মজিদের মুখের উপর মাংসের টুকরোটি ধরলো। তিনটে কুকুর ঘেউ ঘেউ করে একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ে মজিদের উপর। কুকুরগুলো লাফ দিতেই পদ্মজা মাংসের টুকরোটা মজিদের উরুর উপর ছেড়ে দেয়।কুকুরগুলোকে নিজের দিকে তেড়ে আসতে দেখে মজিদ নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যান। চোখের পলকে মজিদের হাত-পা ও মুখের চামড়া ছিঁড়ে যায়। বেরিয়ে আসে রক্ত। এক টুকরো মাংস নিয়ে তিন কুকুরের মধ্যে কাড়াকাড়ি শুরু হয়। তাদের বিষদাঁতের কামড় পড়ে মজিদের গোপনাঙ্গে!তিনি গোঙাতে গোঙাতে চোখের ইশারায় পদ্মজাকে আকুতি করেন এসব যেন থামানো হয়। অন্যদিকে রিদওয়ান ছোটার জন্য ছটফট করছে। পদ্মজাকে বিশ্রী গালিগালাজ করে হুমকিও দিয়েছে। যখন পিপড়ার কামড়ে সর্বাঙ্গ বিষিয়ে উঠে তখন সে পদ্মজাকে অনুরোধ করে তাকে বাঁচাতে। কখনো পদ্মজাকে দেবী বলে আবার কখনো মা বলে ডাকলো। ওয়াদা করলো,সে আর কখনো অন্যায় করবে না। পদ্মজা উত্তরে কিছুই বলেনি। সে নির্বিকার। রিদওয়ান ও কুকুরের চিৎকার শুনে মাথার উপর এক ঝাঁক পাখি ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গেল। আবার ডানা ঝাপটিয়ে ফিরে এলো। পাখিদের মধ্যে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। তাদের অস্থিরতায় দানবের মতো দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোর কচি ডালপালা ও পাতা বার বার নড়েচড়ে উঠছে। পদ্মজা এবার বৈয়াম নিয়ে খলিলের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো। পূর্বের মাংসটি নিয়ে একটি কুকুর দৌড়ে দূরে চলে যায়। তার পিছনে পিছনে বাকি দুটি কুকুরও গেল।পদ্মজা আরেক টুকরো মাংস খলিলের মুখের উপর ধরলো। তারপর কুকুর তিনটের আকর্ষণ পেতে মুখ দিয়ে শব্দ করলো, ‘হুশশ!’খলিল হাওলাদার কুকুরগুলোর দিকে তাকিয়ে ভয়ে প্রস্রাব করে দিলেন। পদ্মজার ডাকে তিনটে নেড়ি কুকুর সাড়া দিল। তারা ঘেউ ঘেউ করে দৌড়ে আসে। খলিলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। পদ্মজা আগের মতোই হাতের মাংস খলিলের উরুর উপর ছেড়ে দিল।তারপর আরেক টুকরো মাংস নিয়ে আসমানির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। বৈয়াম রাখলো মাটিতে। একটা কুকুর পদ্মজার পিছনে এসে দাঁড়ায়। ঘেউ ঘেউ করে চিৎকার করে,তাকে মাংস দিতে। পদ্মজার এক হাতে ছুঁরি বলে ভয়ে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মাংস কেড়ে নেয়ার সাহস পাচ্ছে না। আসমানি পদ্মজাকে তার সামনে দাঁড়াতে দেখে গোপনে ঢোক গিলল। তার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে। সে কিছু একটা বলতে চাইছে। চোখের জলে যেন এক্ষুনি বন্যা বয়ে যাবে! মেয়েরা ভালো হউক,খারাপ হউক, বুড়ো হউক আর যুবতী হউক তারা ভীষণ কাঁদতে পারে! পদ্মজা আসমানির মুখ মুক্ত করে দিল। আসমানি কাঁদো কাঁদো স্বরে অনুরোধ করলো, ‘ আল্লাহর দোহাই লাগে ভাবি,আমারে ছাইড়া দেন। আমি আপনার গোলামি করাম সারাজীবন।’পদ্মজা আসমানির সামনে বসলো। আসমানির উপর ঝুঁকে তার গাল আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে আদুরে স্বরে বললো, ‘ তুমি ভীষণ সুন্দর।’পদ্মজার ঠান্ডা স্পর্শ আসমানির যকৃত ছুঁয়ে ফেললো। সে কেঁপে উঠে। চোখেমুখে অসহায়ত্ব ফুটিয়ে পদ্মজার চোখের দিকে তাকায়। পদ্মজা হাসলো। আসমানির চুলের মুঠি শক্ত করে ধরে বললো, ‘ আমি পুরুষ না যে আমাকে আকৃষ্ট করবে। আমার বোনের মৃত্যুকষ্ট তোমাকেও অনুভব করতে হবে।’পদ্মজা হাতের মাংসের টুকরোটি মজিদের উপর ছুঁড়ে মারলো। তাৎক্ষণিক কুকুর তিনটে মজিদের উপর আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে।পদ্মজা আসমানির পায়ের দঁড়ি খুলে সেই দঁড়ি দিয়ে আসমানির গলা পেঁচিয়ে ধরে৷ আসমানির চোখ উল্টে যায়। পদ্মজার চোখেমুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে শান্ত,স্বাভাবিক। যখন আসমানি নিস্তেজ হওয়ার পথে পদ্মজা দঁড়ি ছেড়ে দিল৷ আসমানি কাশতে কাশতে নতজানু হয়। পদ্মজা আবার পেঁচিয়ে ধরলো। আসমানি দুই পা দাপিয়ে দম নেয়ার চেষ্টা করে। তার শাড়ি হাঁটু অবধি চলে এসেছে। যতক্ষণ না আসমানির নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বের হয় পদ্মজা শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে টেনে ধরে রাখে দঁড়ি। ক্ষণমুহূর্ত যুদ্ধে আসমানি নিস্তেজ হয়ে যায়। পদ্মজা দঁড়ি ছেড়ে দিল। আসমানির জিহবা মুখের ভেতর নেই। বাইরে বেরিয়ে এসেছে। চোখ দুটি উল্টে রয়েছে। সারামুখ কালচে ভাব। পদ্মজা তার দুই হাত ঝেড়ে আসমানির মৃত লাশ থেকে দূরে সরে দাঁড়ায়।পিঁপড়ার কামড়ে রিদওয়ানের কোমর থেকে পায়ের তালু অবধি অবশ হয়ে গেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ! শরীর ব্যথায় টনটন করছে। তার স্পর্শকাতর স্থান গুরুতর আহত। পদ্মজা ছুরি নিয়ে রিদওয়ানের সামনে এসে দাঁড়ায়। রিদওয়ানের উরুতে ছুরি প্রবেশ করে আবার বের করে আনে। রিদওয়ান চিৎকার করে উঠলো। অনেক কষ্টে উচ্চারণ করলো, ‘ আর না। আর না…’পদ্মজা শূন্যে ছুরি ছুঁড়ে মেরে কৌশল করে ধরলো। তারপর ছুরি দিয়েরিদওয়ানের শরীরে অগণিত আঘাত করতে থাকে। তারপর এক চোখ তুলে নিল। রিদওয়ান জোরে আর্তনাদ করে উঠে। আকুতি করে তাকে মৃত্যু দিতে নয়তো বাঁচতে দিতে। পদ্মজা দাঁতে দাঁত চেপে রিদওয়ানের দুই গাল চিপা দিয়ে ধরলো। ফিসফিস আওয়াজের মতো করে বললো, ‘ এই…এই চোখগুলো আর কোনোদিন কোনো মেয়েকে দেখবে না।কোনোদিন না।’রিদওয়ানের এক চোখ থেকে গলগল করে রক্ত বের হচ্ছে৷ কুকুরগুলো আরো মাংসের জন্য বিরতিহীনভাবে চিৎকার করে যাচ্ছে৷ পদ্মজা তার কথা শেষ করে রিদওয়ানের আরেকটা চোখে ছুরি ঢুকিয়ে দিল। তারপরই মুখের উপর ছুরি দিয়ে তেরছাভাবে টান মারলো। রিদওয়ানের নাক ছিঁড়ে উপরের ঠোঁট দুই ভাগ হয়ে যায়। চিৎকার করার শক্তিটুকুও আর সে পেল না। তার পূর্বেই বেহুশ হয়ে যায়। পদ্মজা ক্রোধে মৃদু কাঁপছে। তার সাদা শাড়ি ইতিমধ্যে রাঙা হয়ে গেছে। সে রাম দা নিয়ে নিঃশ্বাসের গতিতে যেভাবে পারে রিদওয়ানকে কোপাতে থাকলো। তার মুখ দিয়ে ক্রোধ স্বর বের হচ্ছে। রিদওয়ান শরীরের মাংস ছিটকে পড়ে এদিকসেদিক। লুকিয়ে দেখা নিশাচরেরা একস্বরে ডেকে উঠে। তারা পদ্মজাকে তার কাজে সাহস যোগাতে কিছু বলছে? নাকি ভয় পেয়ে ডাকছে? কে জানে!প্রায় মিনিট দশেক পর পদ্মজা স্থির হয়ে দাঁড়ালো৷ তার মুখ রক্তে অস্পষ্ট। চোখ দুটি ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না। শাড়ি তাজা রক্তে জবজবে! সামনের চুলগুলো রক্তে আঠালো হয়ে গেছে। তার বুক হাঁপড়ের মতো ওঠানামা করছে। নিঃশ্বাস নিচ্ছে ঘন ঘন। বাতাস পদ্মজার সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে তাকে আলিঙ্গন করার জন্য ধেয়ে আসে। পদ্মজা রাম দা থেকে রক্ত পড়ছে চুইয়ে চুইয়ে। সে রাম দা রেখে সদ্য কেনা চাপাতি তুলে নেয় হাতে। ঘুরে এসে মজিদের সামনে দাঁড়ায়। কুকুরের আঁচড় আর কামড়ে মজিদের প্রাণ নেতিয়ে পড়েছে! পদ্মজা মজিদের মুখের বাঁধন খুলে দেয় মজিদের শেষ আর্তনাদ শোনার জন্য। মজিদ অস্পষ্ট স্বরে বললো, ‘ মা,মা…আমায়…’মজিদ কথা শেষ করতে পারলেন না। পদ্মজা চিৎকার করে হাত ঘুরিয়ে এক আঘাতে মজিদের মাথা দ্বিখণ্ডিত করে ফেললো। রক্ত ফিনকি দিয়ে ছিটকে পড়ে। বুরবুর শব্দ তুলে পেটের নাড়িভুড়ি ফেটে রক্ত বেরিয়ে আসে। পদ্মজা এক মুহূর্তও থামলো না। হিংস্র তাণ্ডব চালিয়ে গেল। তার রক্তের তৃষ্ণা মিটেনি! সে খলিলের মুখের বাঁধন খুলে দিল। পদ্মজাকে রক্তমানবী মনে হচ্ছে। তার শরীরে প্রতিটি লোমকূপ রক্তে স্নান করেছে। খলিল হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো, ‘ও মা, ও মা আমারে ছাইড়া দেও। আমি তোমার বাপের মতো। ও মা আমারে ছাইড়া দেও….’পদ্মজা দাঁত বের করে হাসলো। তার দাঁতেও রক্ত লেগে আছে! ভয়ানক দেখাচ্ছে! কোথায় গেল তার ভুবনমোহিনী রূপ? রক্তের সাগরে ডুব দিয়েছে সে। পদ্মজা চাপাতি দুই হাতে ধরে হাত ঘুরিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো খলিলকে আঘাত করতে থাকে। এক আঘাতেই খলিলের আত্মা দেহ ছেড়ে দেয়। কিন্তু পদ্মজা থামলো না। সে ক্রোধ স্বর মুখে রেখে খলিলকে ইচ্ছেমতো কোপাতে থাকলো। ক্যাচক্যাচ শব্দে চারপাশ কেঁপে কেঁপে উঠে। আঘাতে আঘাতে খলিলের এহ হাত,কান, নাক শরীর থেকে আলাদা হয়ে যায়। পদ্মজা ক্লান্ত হয়ে চাপাতি খলিলের মুখের ভেতর ঢুকিয়ে দিল। বাম হাতে কোমর থেকে আরেকটা ছুরি নিয়ে খলিলের পেটে ঢুকিয়ে দিল। রিদওয়ান, মজিদ আর খলিলের রক্ত মাটি বেয়ে পুকুরের কালো জলের দিকে যাচ্ছে। পদ্মজা মাটিতে বসে পড়ে। নেড়ি কুকুরগুলো ভয় পেয়ে দূরে চলে গিয়েছে। দূর থেকে তারা পদ্মজাকে দেখছে।হিংস্র ঝড়ের তান্ডব থামতেই চারিদিকে নিস্তব্ধতা ভর করে। পদ্মজা ভীষণ ক্লান্ত। সে দুই চোখ বুজে লম্বা করে নিঃশ্বাস নিল। তারপর মাথা তুলে আমিরের দিকে তাকালো। আমির এতক্ষণ পদ্মজার দিকে তাকিয়ে ছিল। পদ্মজাকে তার দিকে তাকাতে দেখে সে চোখ সরিয়ে নিল। আমিরের চোখের উপর পড়ে থাকা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। সে শান্ত হয়ে বসে আছে। কোনো ছটফটানি নেই,অস্থিরতা নেই,ভয় নেই। সে নির্লিপ্ত। পদ্মজা ঘাড় ঘুরিয়ে ডান পাশে তাকালো। আমিরের দেয়া নতুন তলোয়ারটি ঘাসের উপর পড়ে আছে। পদ্মজা মাটিতে হাতের ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। তিন কদম এগিয়ে তলোয়ারটি হাতে তুলে নিল। তারপর ফিরে তাকালো আমিরের দিকে। সেদিনের কথা,যেদিন আমির নিজে এই তলোয়ার পদ্মজার হাতে তুলে দিয়েছিল,জীবন নেয়ার অনুমতি দিয়েছিল! এ কথা শুনে পদ্মজার সেকি কান্না! কিন্তু আজ পদ্মজা শুধুই পদ্মজা,প্রিয় স্বামীর পদ্মবতী নয়! পদ্মজা শক্ত করে তলোয়ার ধরে সামনে এগিয়ে যায়। সে যত এগুচ্ছে অনুভব করছে বুকের ভেতরের শক্ত আবরণটা সরে যাচ্ছে। একটা নরম কোমল অনুভূতি জেঁকে বসছে!পদ্মজা আমিরের সামনে এসে দাঁড়াতেই আমির চোখ তুলে তাকালো। এইযে রাতের বাতাসে পদ্মজার এক দুটো চুল উড়ছে। তাতেও ভালো লাগছে। রক্তের মাখামাখিও পদ্মজার রূপের বাহার নষ্ট করতে পারেনি। অন্তত আমিরের কাছে!নির্জন,নিরিবিলি পরিবেশে আমিরকে এমন অবস্থায় এতো কাছে দেখে পদ্মজার চোখগুলো শীতল হয়ে উঠে। তার মনে হচ্ছে, আমিরের চোখ,পা,হাত,বুক,বাহু সব কথা বলছে! সেদিনই তো তাদের বিয়ে হলো। আমির তার শক্তপোক্ত দুটি হাত দিয়ে পদ্মজাকে কোলে নিয়ে ঘরে তুলে। উপহার দেয় নতুন সংসার,নতুন পৃথিবী! সে আমিরের সংস্পর্শে এসে আবিষ্কার করে নতুন এক সত্ত্বা। পুরনো কথা ভেবে পদ্মজার কণ্ঠনালিতে একটা যন্ত্রণা ঠেকছে। তার কণ্ঠনালী ব্যথা করছে! সে মাটিতে তলোয়ার রেখে রেইনট্রি গাছের দঁড়ি থেকে আমিরকে মুক্ত করে দেয়। এখন শুধু আমিরের হাত-পা আর মুখ বাঁধা। পদ্মজা আমিরের সামনে বসলো। আমিরের নতজানু মুখটা নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করলো । তারপর আমিরের বুকে সাবধানে এক হাত রাখলো। পদ্মজার একটুখানি ছোঁয়া আমিরের সত্ত্বাকে কাঁপিয়ে তুলে। যেন সমুদ্রের ঢেউ গর্জে উঠে। আকাশ ভেঙে বজ্রপাত পড়ে!কুকুরগুলো ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। পদ্মজার ছলছল চোখ দুটি স্পষ্ট! আমিরের মনে হচ্ছে, আকাশের চাঁদটা ঠিক পদ্মজার মাথার উপরেই। সে সকল অনুভূতি হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু পদ্মজাকে কোমল চোখে তাকাতে দেখে তার বুকটা হুহু করে কেঁদে উঠলো। চোখের চাহনীতে মনের সবটুকু ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছে পদ্মজা। বুঝা যাচ্ছে সে আমিরের প্রেমে কতোটা মাতোয়ারা! আমির আশা করেনি,এই মুহূর্তে এতোকিছুর পর পদ্মজার চোখে পুরনো প্রেম দেখতে পাবে! বুকটা আর কত পুড়বে? যখন একসাথে থাকা সম্ভবই নয়।আমিরের চুপ থাকা,আমিরের নির্লিপ্ততা বলে দিচ্ছে সে পদ্মজার কোনো আঘাতকেই পরোয়া করে না। আমিরের মায়া মায়া চোখ দুটি গ্রাস করে ফেলে পদ্মজাকে। কেনো জানি তার খুব কান্না পাচ্ছে! বুকের ভিতরে কোথায় যেনো লুকানো জায়গা থেকে একদল অভিমান প্রচণ্ড কান্না হয়ে দু’চোখ ফেটে বেরুতে চাইছে। পদ্মজা ধীর কণ্ঠে বললো, ‘কেন আমায় ভালোবাসলেন না?’তার কণ্ঠে কান্না! আমিরের এক চোখ থেকে জল বেরিয়ে আসে। সে কোন শাব্দিক উচ্চারণে বোঝাবে,পদ্মজাকে ঠিক কতোটা ভালোবাসে? কী করে বলবে? সে পদ্মজার জন্য বিষের দাঁনা!ভালোবাসা এক ভয়ংকর মহামারির নাম। যে মহামারির একমাত্র পথ,বিপরীত মানুষটিকে ছাড়া নিঃস্ব হয়ে যাওয়া। এই মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে কত মানুষ বৈরাগী হয়েছে! আর আমির বেছে নিয়েছে মৃত্যু! পদ্মজা হুট করে আমিরের কপালে চুমু খেল। আমিরের হৃৎপিণ্ড জ্বলে উঠে! তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। পদ্মজার দুই চোখের জল আটকাতে পারলো না। সে বললো, ‘ আপনার দুটি সত্ত্বার একটি আমার স্বামী। আমি তাকে সম্মান করি। কিন্তু অন্য সত্ত্বার জন্য আপনাকে মরতে হবে।’পদ্মজা ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কান্না আটকাচ্ছে। আমির নিজেকে সামলে চোখের দৃষ্টি নত করলো। পদ্মজা নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে,বুকটা জ্বলে যাচ্ছে কেন? একটু আগের তেজটা কেন নেই বুকের ভেতর? আমিরের ভালোবাসার অভাব তাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে। ছয়টা বছর মানুষটা এতো কেন ভালোবাসলো? এত নিখুঁত ভালোবাসার অভিনয় হতে পারে? কাঙাল সে,তার স্বামীর ভালোবাসার কাঙাল। কিন্তু সেই ভালোবাসাই প্রতারণা করলো। এই ভালোবাসা ভাগ হয়েছে আরো আগে। কষ্টগুলো বাতাসে উড়ে যায় না কেন?পদ্মজা খাপ থেকে তলোয়ার বের করলো। তলোয়ারখানা দেখে পদ্মজার বুকের ভেতরে দ্রিমদ্রিম করে কিছু বাজতে থাকে। কেঁপে উঠে তার হাত। পদ্মজা ঢোক গিলে নিজেকে ধাতস্থ করলো। তারপর কাঁপা হাতে আমিরের মুখ থেকে ওড়নার বাঁধন খুলে দিল। আমিরের আর্তনাদ শোনার জন্য নয়! সে চায়,আমির তাকে কিছু বলুক। কিন্তু কী শুনতে চায় সে জানে না। আমিরের বেলা সে কঠোর হওয়া তো দূরে থাক,তলোয়ার চালানোর সাহস পাচ্ছে না। আমির মাথা নত করে অপেক্ষা করছে মৃত্যুর জন্য। মৃত্যু তার জন্য উপহার! পদ্মজা আঘাত করতে সময় নিচ্ছে। আমিরের নিশ্চুপতা তার মনের ব্যথা বাড়িয়ে দিচ্ছে। সে বেহায়া হয়ে কাঠ কাঠ কন্ঠে বললো, ‘কিছু বলার আছে?’আমির তাকালো। এইতো…এই দৃষ্টি পদ্মজাকে খুন করে ফেলে! তীরের বেগে বুকের ভেতর ছিদ্র করে ফেলে! এই পৃথিবীতে নাকি শ্যামবর্ণ অবহেলিত! অথচ ভুবনমোহিনী রূপসী পদ্মজা শ্যামবর্ণ এক পুরুষকে ভালোবেসে থমকে গিয়েছে! আমির বললো, ‘ গত চারদিনের যন্ত্রণার একাংশ যদি তুমি অনুভব করতে আমাকে খুন না করে বাঁচিয়ে রাখতে। আমার শাস্তি হতো আমার বেঁচে থাকা!’আমির কথা শেষ করে চোখের পলক ফেলার পূর্বে পদ্মজা তার বুকের মধ্যিখানে তলোয়ার ঢুকিয়ে দিল। তলোয়ার বুক ভেদ করে পিঠে গিয়ে ঠেকে!আচমকা আক্রমণ করায় আমির অবাক হলো। তার মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে। বুকের যন্ত্রণারা শেষবারের মতো দুই চোখ ছাপিয়ে বেরিয়ে পড়ে। আমিরের মুখ থেকে এতো রক্ত বের হতে দেখে পদ্মজার পায়ের তলা কেঁপে উঠে। সে সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ার টেনে বের করলো। আমিরের দেহটা দপ করে শব্দ তুলে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। পদ্মজা বুক ছ্যাঁৎ করে উঠে। বুকের ভেতর পাহাড় ধ্বসে পড়ে। সে দ্রুত আমিরের দুই হাতের বাঁধন খুলে দেয়। বুকের ভেতর থেকে শব্দ তুলে কান্নারা বেরিয়ে আসে। সে কাঁদো কাঁদো হয়ে বললো, ‘ যাবেন না…যাবেন না।’আমিরের শরীর দুই-তিনটে ঝাঁকি দিয়ে নিথর হয়ে যায়। পদ্মজা মাথায় এক হাত দিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো এদিকসেদিক তাকায়। তার শরীরটা কেমন যেন করছে। চোখের সামনে তিলে তিলে গড়ে তোলা প্রেমের রাজপ্রাসাদ ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে! সে শব্দ শুনতে পাচ্ছে। শব্দের আঘাতে তার মগজ চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। পদ্মজা আর্তনাদ করে উঠে। দুই হাতে মাটি চাপড়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো, ‘আল্লাহ…আল্লাহ।’তার চিৎকার শুনে সন্তানহারা পেঁচাটির কান্না থেমে যায়। ‘আল্লাহ’ উচ্চারণটি প্রতিধ্বনিত হতে থাকে যেন বার বার৷ এই একটি ডাকে পদ্মজার সর্বহারার বেদনা ফুটে উঠে। সে আপন মানুষদের মৃত্যু দেখতে দেখতে ক্লান্ত। তার যন্ত্রণার পাহাড় ভেঙে গেছে। পদ্মজা বাচ্চাদের মতো হাঁটুতে ভর দিয়ে একবার ডানে যায় আরেকবার বামে যায়। তারপর আমিরের মাথার কাছে এসে বসে। আমিরের চোখ দুটো খোলা। পদ্মজার দিকে তাকিয়ে আছে! চোখ জোড়ার কি পদ্মজাকে দেখার তৃষ্ণা মেটেনি?‘তোমাকে দেখার তৃষ্ণা আমার কখনোই মিটবে না,পদ্মবতী।’ পদ্মজা চমকে পিছনে তাকায়। কেউ নেই। ডান পাশ থেকে আবার শুনতে পায় একই কথা। পদ্মজা ডান পাশে তাকায়। তারপর শুনতে পায় বাম পাশ থেকে। পদ্মজা চরকির মতো ঘুরতে থাকে। সে বাস্তব দুনিয়া থেকে বেরিয়ে এসেছে অনেক আগে। আমিরের বলা পুরনো কথাগুলো সে শুনছে। প্রতিটি কথা তাকে সূচের মতো খোঁচাচ্ছে। পদ্মজা এতো ব্যথা সহ্য করতে না পেরে দুই হাতে খামচে ঘাস টেনে তুললো। তারপর এক হাত দিয়ে মাটিতে আঘাত করতে করতে চিৎকার করে কাঁদলো।কাঁদতে কাঁদতে তার গলার স্বর স্তব্ধ হয়ে যায়। সে শরীরের ভার ছেড়ে দেয়। সেজদার মতো উঁবু হয়। তারপর মাথা তুলে এক হাতে আমিরের চোখ দুটি বন্ধ করে দিল। চোখের জল মুছে চারপাশে চোখ বুলাল। তার চোখের দৃষ্টি অস্থির৷ নিঃশ্বাস এলোমেলো। এই বিশাল পৃথিবীতে এখন সে একা!আচমকা সে উঠে দাঁড়ায়। যেখানে ভোজ আসর হয়েছিল সেখানে ছুটে যায়। আমিরের প্লেট আলাদা। তার প্লেটে দুটো পদ্মফুল আঁকানো। পদ্মজা খুঁজে খুঁজে আমিরের প্লেটটা বের করলো। সেখানে কিছু খাবার অবশিষ্ট ছিল। পদ্মজা ঘাড় ঘুরিয়ে একবার আমিরের মৃত দেহ দেখলো। তারপর দ্রুত অবশিষ্ট খাবারটুকু খেল। খাবার শেষ হতেই পানি না খেয়েই দৌড়ে আমিরের কাছে আসে। একটা তীক্ষ্ণ ঠান্ডা স্রোত বুকের এদিক থেকে ওদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে। চাঁদটা অর্ধেক ডুবে গিয়েছে। তবে তার আলো এখনো রয়ে গেছে৷ পদ্মজা আমিরকে টেনে সোজা করলো৷আমিরের শার্টের বুক পকেট থেকে একটি বিষের শিশি বেরিয়ে আসে। পদ্মজা শিশিখানা হাতে নিয়ে অবাক চোখে আমিরের ফ্যাকাসে মুখটা দেখে। সে কিছু একটা বলে কিন্তু কথাটি ফুটল না। তার কথা হারিয়ে গেছে! তারপর ভাবলো, বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করবে৷ কিন্তু পরক্ষণে মনে পড়লো, আত্মহত্যা মহাপাপ! পদ্মজা বিষের শিশি ছুঁড়ে ফেলে পুকুরে।আমিরের মাথাটা কোলে নিয়ে অনেকক্ষণ গুনগুন করে কাঁদলো পদ্মজা। বাতাসের বেগ বেড়েছে। রক্ত শুকোনোর পথে। ঠান্ডা কাঁটার মতো বিঁধছে শরীরে। পদ্মজার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। সে রক্তাক্ত আমিরকে টেনে মাঝে নিয়ে এসে সুন্দর করে শুইয়ে দিল। তারপর আমিরের নিথর দেহটিকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে তার বুকের উপর শুয়ে পড়লো। মিনিট দুয়েক পর ঘুম ঘুম চোখে মাথা উঁচু করে আমিরের দুই গালে সময় নিয়ে দুটো চুমু দিল পদ্মজা। একটা কুকুর পদ্মজাকে ঘিরে হাঁটছে। আর বাকি দুটো কুকুর মজিদ,খলিল,রিদওয়ান ও আসমানির লাশ শুঁকছে। ক্লান্ত পদ্মজা আমিরের বুকে শুয়ে শান্ত হলো। চোখ বুজলো। যে পৃথিবীর লীলাখেলায় সে বাধ্য হয়েছে স্বামীর বুকে অস্ত্র চালাতে সেই পৃথিবীর উদেশ্যে মনের খাতায় চিঠি লিখলো-‘ক্ষমা করো পৃথিবী। তাকে আমি ঘৃণা করতে পারিনি। তাকে আমি নিষ্ঠুর মৃত্যু দিতে পারিনি। যার হাতের পাঁচটি আঙুল আমার নির্ভরতা,যার বুকের পাঁজরে লেগে থাকা ঘামের গন্ধ আমার সবচেয়ে প্রিয়,যার উষ্ণ ঠোঁটের ছোঁয়া আমার প্রতিদিনের অভ্যাস, যার এলোমেলো চুলে আমি হারিয়ে যাই বারংবার, যার ভালোবাসার আহবানে সবকিছু তুচ্ছ করে ছুটে যাই,যার মিষ্টি সোহাগে অন্য জগতে হারিয়ে যাই, তার কষ্ট আমি কী করে সহ্য করি? লোকে বলে, স্বামীর বাঁ পাঁজরের হাড়ে স্ত্রী তৈরি। তাহলে যার পাঁজরে আমার সৃষ্টি তার আর্তনাদ কী করে শুনি? এই কঠিন কাজ আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। ও পৃথিবী সবাইকে বলে দিও,আমার কবরটা যেন আমার স্বামীর কবরের ঠিক বাঁ পাশেই হয়! আমি তাকে ভালোবাসি। যেমন সত্য চন্দ্র-সূর্য তেমন সত্য আমি তাকে ভালোবাসি!শেষ রাত্রি। চারিদিকে ছড়িয়ে আছে রক্ত,একটি জিহবা বের করা নারী দেহ,তিনটি ক্ষত-বিক্ষত পুরুষ দেহ ও একটা মাথা। মাঝখানে শুয়ে আছে আমির হাওলাদার। তার বুকের উপর শুয়ে আছে তারই অর্ধাঙ্গিনী তারই খুনি উম্মে পদ্মজা! খাবারে ঘুমের ঔষধ ছিল বলে, পদ্মজা ঘুমিয়ে পড়েছে। তিনটে নেড়ি কুকুর এলোমেলো হয়ে এদিক সেদিক হাঁটছে। সাঁইসাঁই করে বাতাস বইছে। অনেকগুলো তারার মাঝে একটা চাঁদ। স্বচ্ছ আকাশ। চাঁদটা তার নরম আলো নিয়ে ঠিক আমির-পদ্মজার উপর স্থির হয়ে আছে।
প্রচণ্ড গরম পড়েছে। প্রেমা ঘেমে একাকার। তৃষ্ণায় তার গলা শুকিয়ে চৌচির! ইচ্ছে করলেই হাত বাড়িয়ে নদীর পানি দিয়ে গলা ভেজাতে পারে। কিন্তু তার ইচ্ছে করছে না। বুকের ভেতরটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে সাত মাস পূর্বেই৷ শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া ভগ্নহৃদয় নিয়েই দিব্যি বেঁচে আছে! মাঝে মাঝে সে নিজেকে প্রশ্ন করে, কেন সে বেঁচে আছে?তুষার তার হাতের সিগারেটটি নদীতে ফেললো। তারপর সামনে তাকালো। কালো বোরকা পরে বসে আছে প্রেমা। তার মাথার উপর বাঁশের ছাউনি। সে চোখ ছোট ছোট করে উদাসীন হয়ে তাকিয়ে আছে দূরে,বহুদূরে। তুষার চার মাস ধরে প্রেমাকে দেখছে। মেয়েটা সবসময় উদাসীন থাকে। তুষার তার কপালের ঘাম মুছলো। গরম ভালোই পড়েছে। সে তার ব্যাগপ্যাক থেকে পানির বোতল বের করে গলা ভেজালো। তারপর প্রেমাকে ডাকলো, ‘ এই মেয়ে,পানি খাও। গরম পড়েছে খুব।’প্রেমা তাকালো না। তুষার তার এক ভ্রু উঁচিয়ে ডাকলো, ‘ এই যে খুকী? ‘প্রেমা ঘাড় ঘুরিয়ে ছোঁ মেরে বোতল নিল। তারপর আবার আগের মতো ঘুরে বসলো। প্রেমার ব্যবহারে তুষার বেকুব বনে যায়। তার মাথা চড়ে যায়। এইটুকু মেয়ে বেয়াদবি করলো কীভাবে? তুষার দূরে গিয়ে বসলো। কিন্তু তার রাগ বেশিক্ষণ রইলো না। দোষটা তো তারই! বয়সের পার্থক্যটা বেশি হওয়াতে প্রেমাকে তার বউ মনে হয় না। তাই গত চার মাসের দাম্পত্য জীবনে একবারও সে প্রেমার হাত ধরেনি। কখনো ভাবেওনি তার একটা বউ আছে! শুধু দুজন এক বাড়িতে থেকেছে,এই যা! এই যুগে একরকম চৌদ্দ-পনেরো বছর বয়সের পার্থক্যে স্বামী-স্ত্রী অহরহ দেখা যায়। তবুও কেন যেন তুষার প্রেমাকে ছোট স্কুলপড়ুয়া একটা মেয়ে ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না! সে প্রেমার সাথে সবসময় দূরত্ব রেখেছে। মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মেয়েটাকে সময় দেয়নি,এতোবার কাঁদতে দেখেও আদর করে কখনো কান্না থামায়নি! সবকিছু স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে। তুষার যে রসকষহীন কাঠখোট্টা একটা মানুষ প্রেমা বুঝে নিয়েছে! তুষারও বুঝতে পেরেছে। তাকে বুঝিয়েছে তার মা। গত শুক্রবার জুম্মার পর তুষারের মা আয়তুন বিবি তুষারের সাথে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেন। বুঝান, বউকে বউয়ের মতো দেখতে। বিয়ে যখন হয়েছে প্রেমাই তুষারের জীবনের নিখুঁত স্ত্রী। প্রেমা নিঃসঙ্গতায় কামড়ে খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। এক বোন কবরে অন্য বোন জেলে। যে স্বামী হয়েছে সেও দূরত্ব বজায় রেখে চলে। এভাবে মেয়েটা কীভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপন করবে? মায়ের কথা শোনার পর তুষার কাজকর্ম রেখে অনেক ভেবেছে। উপলব্ধি করলো,পদ্মজার মুখে প্রেমার যে বর্ণনা সে শুনেছিল,যে প্রাণোচ্ছল, লজ্জাবতী মেয়েটার কথা সে শুনেছিল সে মেয়েটা আর আগের মতো নেই! তুষারের বিবেক জাগ্রত হয়৷ সিদ্ধান্ত নেয় প্রেমাকে সময় দিবে। সম্পর্কটাকে সুযোগ দিবে,সহজ করবে! তাৎক্ষণিক সে প্রেমাকে জানালো,তারা অলন্দপুরে ঘুরতে যাবে। তুষারের সিদ্ধান্ত শুনে প্রেমা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। গত দুইদিন তুষার ইনিয়েবিনিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছে। তাও সব কথা পড়া নিয়ে! এতো ছোট মেয়ের সাথে কী বন্ধুত্ব হয়! তুষার কথা বলে সম্পর্ক সহজ করতে গিয়ে আরো কঠিন করে তুলছে। সে কিছুতেই প্রেমার সাথে সহজ হতে পারছে না। তারপর আজই দুজন গ্রামের উদ্দেশ্যে বের হলো। পথে কেউ কোনো কথা বলেনি। অলন্দপুরে চলে এসেছে তারা। নৌকা ধীরগতিতে আটপাড়ার দিকে এগোচ্ছে। তুষার আড়চোখে প্রেমাকে দেখলো। প্রেমা ঝিম ধরে বসে আছে। তুষার খ্যাঁক করে গলা পরিষ্কার করে ডাকলো, ‘ প্রেমা?’প্রেমা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। সে অবাক হয়েছে। স্বামী নামক কঠিন পাথরটি তাকে সবসময় খুকী বলে অথবা এই মেয়ে ডাকে! হুট করে প্রেমা ডাকটা শুনে অবাক হয়েছে আবার ভালোও লাগলো! তুষার গাম্ভীর্যতা ভেঙে প্রেমার দিকে এগিয়ে আসে। প্রেমার সামনে এসে বসলো। মাঝি বাউল গান গাইছে। গাইতে গাইতে বৈঠা বাইছে। তুষারকে এরকম মুখোমুখি বসতে দেখে প্রেমা উৎসুক হয়ে তাকায়।তুষার বসেছে তো ঠিকই। কিন্তু কী বলবে খুঁজে পাচ্ছে না৷ আরো দুই-তিনবার খ্যাঁক করে কাশলো। তারপর বললো, ‘ আমাদের সম্পর্কটা আসলে কী?’এটা কেমন প্রশ্ন! প্রেমা ভ্রুকুটি করলো। তুষার নিজের প্রশ্নে নিজে হতভম্ব হয়ে যায়! হয় সে কঠিন,কঠিন কথা বলে। নয়তো কী বলে নিজেও বুঝে না। প্রেমাও বুঝে না। তুষার দুই দিনের চেষ্টায় বুঝে গিয়েছে মেয়ে মানুষ পটানোর চেয়ে আসামী ধরা সোজা! প্রেমার সাথে তার জমছেই না! আসলে কি পটাতে পারছে না? নাকি কীভাবে পটাতে হয় সেটাই তুষার জানে না? প্রেমা চোখ ফিরিয়ে নিল। তুষারের হাবভাব সে বুঝে না। বুঝার ইচ্ছেও নেই। মেট্রিক পরীক্ষাটা দেয়া হয়নি। আরো এক বছর পড়তে হবে! জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেছে। তার পাশে আপন বলতে কেউ নেই। প্রেমার বুক চিঁড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। তুষার সেই দীর্ঘশ্বাস শুনতে পায়। সে প্রেমার দিকে তাকালো। এইটুকু মেয়ের দীর্ঘশ্বাস এতো ভারী! তুষার নরম কণ্ঠে বলার চেষ্টা করলো, ‘ তুমি কি আমার উপর বিরক্ত?’তুষার নরম কণ্ঠে কথা বলার চেষ্টা করলেও, কণ্ঠস্বরে গাম্ভীর্যতা থেকে যায়। প্রশ্ন করে দুই ভ্রু কুঁচকে প্রেমার দিকে তাকায়। তার চাহনি দেখে মনে হচ্ছে,প্রেমা চোর! চুরি করে ধরা পড়েছে। আর তারই জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। প্রেমা জবাব দিল না। তুষারের ভ্রু দুটি আরো বেঁকে গেল। সে কাঠ কাঠ স্বরে বললো, ‘প্রশ্ন করেছি তো? উত্তর কোথায়?’প্রেমা অন্যদিকে চোখ রেখে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো, ‘না। বিরক্ত না।’‘তাহলে আমার সাথে কথা বলো না কেন?’প্রেমা নির্বিকার চোখে তাকালো। বললো, ‘ আপনিও তো বলেন না।’তুষার থতমত খেয়ে যায়। প্রথম প্রথম প্রেমা তুষারের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছে৷ তখন তুষারই হু,হ্যাঁ এর বেশি কিছু বলেনি। তাই কখনো দীর্ঘ আলাপ হয়নি। প্রেমার কথায় তুষার বিব্রতবোধ করলেও নিজেকে গুটিয়ে নিল না। সে কখনো হারেনি। সবসময় জয়ী হয়েছে। এবারের চ্যালেঞ্জটা মেয়েলি ব্যাপার! যাই হোক,সে হারবে না। হ্যাঁ…কিছুতেই হারবে না। তুষার মাছি তাড়ানো মতো হাত নাড়িয়ে বললো, ‘ পিছনের কথা বাদ। এখন থেকে দুজনই কথা বলবো। ঠিক আছে?’প্রেমা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো। তুষার বললো, ‘ বেশি গরম লাগছে?’‘লাগছে।’তুষারের দূরে চোখ রেখে বললো, ‘আর কিছুক্ষণ। এসেই পড়েছি।’আচমকা কালো মেঘে ছেয়ে যায় আকাশ। দখিনা বাতাস ধেয়ে আসে। দস্যি বাতাসে প্রেমার ওড়নার একাংশ ছাউনির বাইরে চলে যায়। তুষার ধরলো। প্রেমা তার অবাধ্য ওড়নাকে সুন্দর করে গায়ে পেঁচিয়ে নিল। তিন-চারদিন ধরে হুটহাট বাতাস বইছে। সেই সাথে ভ্যাপসা গরম তো রয়েছেই। তুষার চোখ ছোট ছোট করে চারপাশ দেখছে। নদীর দুই পাড়ে দুই গ্রাম। বামে হিন্দু পাড়া ডানে আটপাড়া। আটপাড়ার সব মানুষ মুসলমান। তুষার বললো, ‘ হিন্দু পাড়ায় কখনো গিয়েছো?’‘হু,অনেকবার।’তুষার প্রেমার মুখের দিকে তাকালো। বললো, ‘আমাদের বিয়েটা কী করে হলো জানো?’‘জানি।’, ‘কী জানো?’প্রেমা নির্বিকার স্বরে বললো, ‘হানি খালামনির কাছে আপনার আম্মা প্রস্তাব নিয়ে যান। তারপর কিছু বুঝে উঠার আগে পরদিনই আমার বিয়ে হয়ে যায়।’তুষার গুরুতর ভঙ্গিতে প্রশ্ন করলো, ‘অচেনা একজনকে এক কথায় বিয়ে করে নিলে কেন? তোমার অনুমতি নেয়া হয়নি?’তুষার এসব কেন জিজ্ঞাসা করছে প্রেমা জানে না। জানতে ইচ্ছে হলেও সে প্রশ্ন করবে না। প্রেমা উদাস গলায় বললো, ‘ তখন আমার অভিভাবক আমার নানু আর খালামনি ছিল। আমার ভাবার বা বলার কিছু ছিল না। খালামনি যা চেয়েছেন তাই হয়েছে।‘তুমি এই বিয়েতে সুখী হতে পারোনি তাই না?’তুষারের সহজ/সরল প্রশ্ন! প্রেমা তুষারের চোখের দিকে সরাসরি তাকালো। মানুষটা হঠাৎ করে তার সুখ নিয়ে ভাবছে কেন? সে চোখ নামিয়ে ফেললো। কিছু বললো না। তুষার মিনিট দুয়েক সময় পার করে বললো, ‘ আমাদের বিয়ে হউক তোমার বড় আপা চেয়েছিলেন।’প্রেমা চকিতে তাকালো। তার চোখ দুটি হঠাৎ করেই জীবন্ত হয়ে উঠে। তুষার পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে,প্রেমার মুখটা কেমন সতেজ হয়ে উঠেছে। প্রেমা বললো, ‘আপা চেয়েছিল?’তুষার বললো, ‘ তোমার আপা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকলেও তিনি তোমাকে নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। তখন আমার আম্মা আমার বিয়ে নিয়ে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। বার বার টেলিফোন করতেন। বিয়ের জন্য চাপাচাপি করতেন। আমি বিয়েতে আগ্রহী ছিলাম না। আমার বেড়ে উঠা অন্য দশজনের মতো ছিল না। বাবা ছাড়া শহরে বেড়ে উঠা ছেলেমেয়েগুলো জানে জীবন কতোটা নিষ্ঠুর হতে পারে! তোমার আপা কম কথা বলতেন। কথা বলতে বলতে হুট করে থেমে যেতেন। তার মাঝে আম্মাও কল করতেন অনবরত। তাই একবার আম্মার সাথে চেঁচামেচি করেছিলাম। কিছু কথা তোমার আপার কানে যায়। সেদিনই রাত্রিবেলা হাওলাদার বাড়ি সম্পর্কে বলতে বলতে তোমার আপা থেমে যান। বাকি কথা কিছুতেই বলছিলেন না।যখন জোর করছিলাম বলার জন্য। আমাকে অনুরোধ করেন, আম্মাকে নিয়ে তোমাকে একবার যেন দেখতে যাই। আর আম্মার পছন্দ হলে যেন বিয়ে করি। ততক্ষণে তোমার সম্পর্কে অনেককিছুই শুনেছি। আমার বিয়ে করাও জরুরি নয়তো আম্মা খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিবেন। অন্যদিকে তোমার আপা নিজ ইচ্ছায় কিছু না বললে কিছু জানাও সম্ভব নয়৷ তাই কথা দেই,তোমাকে দেখতে যাব। তোমার আপা হাসিমুখে বাকিটুকু বলেন। তিনি যেন নিশ্চিত ছিলেন, আম্মা তোমাকে দেখলে পছন্দ করবে। ঠিক তাই হলো। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি তুমি আর তোমার পরিবার হানি খালামনির বাসায় আছো। আম্মাকেও জানাই,একটা মেয়ে আছে দেখে আসো পছন্দ হয় নাকি। আম্মা তো খুব খুশি। তোমাকে দেখার পর রাত্রে ঘুমাননি। সারারাত তোমার সৌন্দর্যের প্রশংসা করেছেন। বাকিটুকু তো তুমি জানো।’‘আমাকে বিয়ে করাটা অনুগ্রহ ছিল?’ প্রেমার কণ্ঠটা কেমন যেন শোনায়।তুষার কৈফিয়ত দেয়ার মতো বললো, ‘ মোটেও না। আম্মার পছন্দ না হলে বিয়েটা হতো না। তোমার আপাও কিন্তু আমার উপর চাপিয়ে দেননি। বলেছেন,একবার যেন দেখি। পছন্দ হওয়ার পর বিয়ে। আর আমার আম্মার তোমাকে পছন্দ হয়েছে। বরং তোমার সাথে আমাকে মানায় না।’‘কেন মানায় না?’ প্রেমা নিজের অজান্তে প্রশ্ন করলো।তুষার বললো, ‘ আমার বয়স বেশি।’প্রেমা আর কথা বাড়ালো না। তার ভালো লাগছে! হুট করেই ভীষণ ভালো লাগছে। এমনকি কাঠখোট্টা তুষারকেও এখন তার ভালো লাগছে। সে মৃদু হাসলো। তুষার প্রেমার হাসি খেয়াল করে বললো, ‘ হাসছো যে?’প্রেমা ঠোঁটে হাসি নিয়ে বললো, ‘ আপনার গোঁফ জমিদারদের মতো বড় বড়।’প্রেমার কথা শুনে তুষারও হাসলো। পদ্মজা নামটাতে জাদু আছে। তার কথা উঠতেই প্রেমা হেসেছে। জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তুষার বললো, ‘ তোমার নানাবাড়িতে এখন কে কে আছে?’‘নানু আর হিমেল মামা।’‘নানুর কিডনিতে কী না হয়েছিল? অপারেশন হয়েছে শুনেছি। শহরেই মেয়ের কাছে থাকতেন। গ্রামে আসতে গেলেন কেন?’প্রেমা অবাক হওয়ার ভান ধরে বললো,’আমি কী এখানে থাকি যে জানব?’প্রেমা থামলো। তারপর আবার বললো, ‘গত বছর আপা যখন আসছিল গ্রামে। তখন নানু আর মামা খালামনির কাছে ছিল। নানুর অপারেশন তখন হয়েছে। অনেকদিন কেটে গেছে। এখন নানু সুস্থ।গ্রামে সমস্যা হবে না।’‘তোমার নানাকে দেখার ইচ্ছে ছিল। দেখতে পারিনি।’ আক্ষেপের স্বরে বললো তুষার।প্রেমা বললো, ‘ নানা তো দুই বছর আগেই চলে গিয়েছেন। দেখবেন কী করে!’তুষার ছাউনির বাইরে আঙুলে ইশারা করে বললো, ‘তোমাদের বাড়ির ঘাট না?’প্রেমা বাইরে তাকালো। বললো, ‘ হু,এতো জলদি চলে এসেছি!’তুষার কাপড়ের ব্যাগ হাতে নিয়ে বললো, ‘কথা বলতে বলতে সময় কেটে গেছে।’নৌকা মোড়ল বাড়ির ঘাটে এসে থামলো। তুষার মাঝিকে টাকা দিয়ে প্রেমাকে হাতে ধরে নামায়। প্রেমার হাত ধরার সময় তুষারের মনে হলো, এতো কোমল হাত সে কখনো ধরেনি! তাৎক্ষণিক তার বুকের ভেতর কী যেন হয়!প্রেমা উঠানে পা রাখতেই বাসন্তীর সাথে দেখা হয়। বাসন্তী প্রেমাকে দেখে চমকে যান। হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন। প্রেমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন। বাসন্তীর কান্না শুনে রুম্পা আর প্রান্ত ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। রুম্পা বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে রইলো। প্রান্ত বাইরে ছুটে আসে। বাসন্তী কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘ও মা! মা আমার!’প্রেমার আকস্মিক আগমন তিনি হজম করতে পারছেন না। মোড়ল বাড়ি মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। মরুভূমির মাঝে প্রেমা যেন জল হয়ে এসেছে! প্রেমা বাসন্তীর পিঠে হাত বুলিয়ে বললো, ‘শান্ত হও বড় আম্মা। শান্ত হও।’বাসন্তী প্রেমার কপালে,গালে চুমু দিলেন। তুষার পাশ থেকে সালাম দিল৷ বাসন্তী চোখের জল মুছে তুষারকে বললেন, ‘ভালো আছো আব্বা?’‘জি আম্মা। আপনি তো অনেক শুকিয়ে গেছেন।’‘মেয়েগুলো কাছে নাই। তারা ভালো নাই। আমি কেমনে ভালো থাকি বাপ?’প্রেমা প্রান্তর দিকে তাকাতেই প্রান্ত প্রেমার মাথায় থাপ্পড় দিল। বললো, ‘ এতদিন পর আসলি!’প্রেমা প্রান্তর চুল টেনে ধরে বললো, ‘একদম মাথায় থাপ্পড় দিবি না। আমার মাথা ব্যথা করে।’প্রান্ত আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল তুষারকে দেখে থেমে যায়। তুষার হাসতে কার্পন্য করলো না। সে প্রান্তর সাথে হ্যান্ডশেক করে বললো, ‘ দিনকাল কেমন যাচ্ছে?’কুশল-বিনিময় শেষে বাসন্তী তুষার আর প্রেমাকে নিয়ে বারান্দায় পা রাখলেন। দেখা হয় রুম্পার সাথে। রুম্পার পেট উঁচু হয়েছে। তার গর্ভাবস্থার সাত মাস চলছে। সে এই বাড়িতেই থাকে। হাওলাদার বাড়িতে এখন আর কেউ থাকে না। সাত মাসে অনেক কিছু পাল্টে গেছে। আমিনা আলোকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গিয়েছেন। বৃদ্ধা নূরজাহান মারা গিয়েছেন৷ বিদেশ থেকে লাবণ্য ও জাফর তাদের স্বামী-স্ত্রী নিয়ে দেশে এসেছিল। দুই সপ্তাহ থেকে আবার ফিরে গিয়েছে। গ্রামবাসী এখন হাওলাদার বাড়িতে যেতে ভয় পায়। সেখানে নাকি আত্মারা ঘুরঘুর করে! প্রেমা রুম্পাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরলো। কুশল-বিনিময় শেষ করে রুম্পা তুষারকে প্রশ্ন করলো, ‘ উনি ভালা আছে? জেলে খাওনদাওন দেয়? মারে কেউ?’রুম্পার কণ্ঠে ব্যাকুলতা। তুষার রুম্পাকে আশ্বস্ত করে বললো, ‘আলমগীর সাহেব ভালো আছেন,সুস্থ আছেন। খাবার দেয়া হয়৷ কেউ মারধোর করে না। আপনি চিন্তা করবেন না।’রুম্পা হাসলো। আলমগীর সুস্থ আছে এই খবরটুকুই রুম্পার বেঁচে থাকার শক্তি!.সাত মাস পূর্বে, রবিবার দুপুরে মুমিন নামে একজন ব্যাক্তি মজিদের সাথে দেখা করতে গিয়ে দেখে ফরিনার কবরের পাশে এক মেয়ে শুয়ে আছে। তার পরনের সাদা শাড়ি রক্তে রাঙা। আর কবরের উপর একটা মাথা! মজিদ হাওলাদার মুমিনকে নতুন দারোয়ান হিসেবে নিযুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তাই ডেকে পাঠিয়েছেন। মুমিন এই দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে যায়। জান নিয়ে দৌড়ে পালায়। তারপর ঘন্টাখানেকের মধ্যে হাওলাদার বাড়ির গণহত্যার ঘটনা পুরো অলন্দপুরে ছড়িয়ে পড়ে। দলে দলে লোক জড়ো হয়৷ পদ্মজা এতো মানুষকে দেখেও নীরব থাকে। তার রূপ হয় রূপকথার অতৃপ্ত অশরীরীর মতো। কেউ কেউ পাথর ছুঁড়ে মারলো,ডাকলো,কুহকিনী, ডাইনি,রাক্ষসী ! থানা থেকে পুলিশ আসে। পদ্মজাকে শহরে নিয়ে যায়। নৃশংস এই খুনের কথা ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। টেলিভিশন, রেডিও সব জায়গায় এক কথা,‘অলন্দপুরের ছোট গ্রাম আটপাড়ার হাওলাদার বাড়ির বধূ উম্মে পদ্মজা চলচ্চিত্র অভিনেতা লিখন শাহর সাথে পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে খুন করেছে স্বামী,শ্বশুর,ভাসুর ও চাচা শ্বশুরকে। সাথে আরেকটি মেয়ের লাশ পাওয়া গেছে। তাকে খুন করার কারণ এখনও শনাক্ত করা যায়নি।’এক দিনের ব্যবধানে পুরো দেশে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। নৃশংস খুনের বর্ণনা শুনে কেউ কেউ রাতে ঘুমাতে পারেনি। গ্রামবাসী তাদের প্রিয় ও মহান মাতব্বরের মৃত্যুতে ভেঙে পড়ে। তারা সমস্বরে চিৎকার করে জানায়,তারা পদ্মজার ফাঁসি চায়। মুহূর্তে পুরো দেশের কাছে কলঙ্কিত হয়ে যায় পদ্মজা। আলমগীর গ্রামে এসে শুনে পুলিশ পদ্মজাকে ধরে নিয়ে গেছে! খুন হয়েছে বাড়ির প্রতিটি পুরুষ। সব শুনে ঘাবড়ে যায় আলমগীর। ফিরে যায় রুম্পার কাছে।মগা গ্রামে প্রবেশ করতেই পুলিশ তাকে পূর্ণার খুনের দায়ে আটক করে। আলমগীর ঘরে ফিরে দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। রুম্পা আলমগীর কে অনেক প্রশ্ন করলো,আলমগীর জবাব দিল না। আমিরের দেয়া নীল খামটির দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে রইলো। এই খামে একটা চিঠি আর অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ দলিল রয়েছে। চিঠিতে লেখা এক পরিকল্পনা। আর ঘটেছে অন্য ঘটনা! সবাই যেভাবে পদ্মজার উপর ক্ষিপ্ত হয়েছে,ফাঁসি নিশ্চিত! সে চাইলে পদ্মজার ফাঁসি আটকাতে পারে। তার হাতে যথেষ্ট প্রমাণ আছে। কিন্তু তার জন্য নিজের জীবন ও সংসার ত্যাগ করতে হবে। এতো সাধনার পর পাওয়া নতুন জীবন ভালো করে উপভোগ করার পূর্বে কিছুতেই সে বন্দী হতে চায় না! আলমগীর খাম থেকে চিঠিটি বের করে আরো একবার পড়লো;-প্রিয় বড় ভাই,বড় বিপদে পড়ে তোমার সাহায্য চাইছি। এখানে ঘটে গেছে অনেক ঘটনা। পদ্মজা জেনে গিয়েছে সব সত্য৷ তোমার চিঠি পাওয়ার পূর্বেই সব জেনেছে৷ আমি বিস্তারিত কিছু লেখব না। তুমি পরে পদ্মজার কাছে জেনে নিও। আমি আমার জীবন উৎসর্গ করব। তার আগে আমি চারজনকে হত্যা করতে চাই। তার মাঝে তিন জন পদ্মজার নামে কুৎসা রটিয়েছে। আমি তখন গ্রামে ছিলাম না। ঢাকা গিয়েছিলাম। সেই সুযোগে তারা সুন্দর চাঁদে দাগ ছিটিয়েছে। রবিবারের সকাল আমার দেখা হবে না। আমার বেঁচে থাকা পদ্মজার জন্য হুমকি! সেই সাথে আমার জন্য ভীষণ কষ্টের। আমি তোমাকে কিছু দলিল দিয়েছি। যা প্রমাণ করে আমি একজন নারী পাচারকারী। সেই সাথে এটাও প্রমাণ করে,আমার সাথে কারা কারা ছিল। একটু খুঁজে দেখো দলিলগুলোর মাঝে আরেকটি চিরকুট আছে৷ সেখানে আমি স্পষ্ট করে আমার সাথে কাজ করা সবার নাম লিখে দিয়েছি। যাদের বর্তমান ঠিকানা জানা আছে সেই ঠিকানাও লিখে দিয়েছি। আমি প্রমাণ সহ স্বীকার করেছি,আমার সব অপরাধ। তোমার নাম সেখানে কোথাও নেই। কোথায় মেয়ে পাচার হয়? কীভাবে হয়? কারা এই কাজের সাথে যুক্ত? আমার জানা সব বিস্তারিত লেখা আছে। আমার দেয়া ঠিকানা অনুসারে খোঁজ চালালে উদ্ধার হবে,আড়াইশোরও বেশি মেয়ে! তুমি এই চিরকুট নিজের কাছে রেখে আমার স্বীকারোক্তি চিরকুটটি ও সকল দলিল প্রমাণ হিসেবে সকলের সামনে উন্মোচন করবে। রুম্পা ভাবিকে বাঁচিয়ে রাখার অবদান পুরোটাই আমার ছিল। সেই কৃতজ্ঞতা থেকে হলেও তুমি পদ্মজাকে কলঙ্কমুক্ত করো ভাই। পদ্মজাকে নিজের সাথে নিয়ে যেও। দেখে রেখো। তোমার কাছে আমানত রেখে গেলাম।ইতি,আমির হাওলাদারআলমগীর চিঠি মেঝেতে রেখে দুই হাতে মাথা চেপে ধরে। সে মগার থেকে চিঠি পাওয়ার পর পরই আমিরকে বাঁচানোর জন্য বেরিয়ে পড়ে। আমিরকে সে ভীষণ ভালোবাসে। আমিরের আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত আলমগীরকে বসে থাকতে দেয়নি। কিন্তু গ্রামে পৌঁছে শুনলো সব শেষ! পদ্মজা খুন করেছে সবাইকে। আর এখন পদ্মজা মিথ্যা অপবাদে জেলে বাস করছে। এই মুহূর্তে সে যদি এই প্রমাণসমূহ নিয়ে সে পুলিশের কাছে যায়। পুলিশ তাকেও আটক করবে। সে পুলিশকে মিথ্যে বলতে পারবে না। সেই সাহস হবে না। সব সত্য জানার পর তার ফাঁসিও হতে পারে। সে নিজেকে উৎসর্গ করার সাহস পায় না।পদ্মজার মামলার তর্কবিতর্কে যখন পঁচিশ দিন পার হয় তখন রুম্পা নিজ ইচ্ছায় আলমগীরকে অনুরোধ করলো,আলমগীর যেন পদ্মজাকে বাঁচায়। মিথ্যা অপবাদে পদ্মজার ফাঁসি হতে দেখে সে সুখের সংসার করতে পারবে না। পদ্মজা পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে কাউকে খুন করেনি,এই টুকু সত্য যেন আলমগীর সবাইকে জানায়। আলমগীর রাতেই রুম্পাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে। পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে। পদ্মজাও তখন সব স্বীকার করেছে। সব প্রমাণ পাওয়ার পর দেশের পরিবেশ পাল্টে যায়। জনগণের মাথায় পড়ে হাত। আমিরের দেয়া তথ্যানুসারে ধরা পড়ে কয়েকটি চক্রের নেতা! তদন্ত চালিয়ে জানা যায়, স্বয়ং বাণিজ্য মন্ত্রী এই চক্রের সাথে জড়িত৷ উদ্ধার হয় তিনশোরও বেশি অসহায় মেয়ে। কেউ কেউ পলাতক। এই খবর দেশের বাইরেও বেরিয়ে পড়ে। কুয়েত,সৌদি সহ আরো কয়েকটি দেশে তদন্ত শুরু হয়। তারা চিরুনি অভিযান চালিয়ে আমিরের দেয়া তথ্যের উপর নির্ভর করে মেয়ে সংগ্রহকারীদের খুঁজে চলে। দুজন ধরা পড়ে। বাকিরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। উদ্ধারকৃত মেয়েগুলি নতুন জীবন পেয়ে আনন্দে আত্মহারা। আমিরের চিঠিতে নতুন গোপন তথ্য ছিল, অন্দরমহলের পিছনে বড় নারিকেল গাছটির নিচে একটি বিশাল গর্ত আছে যেখানে ছুরি,রাম দা,চাপাতি,কুড়াল,চাবুক সহ অনেক অস্ত্র রয়েছে। তুষার অস্ত্রসমূহ উদ্ধার করে,সেই সাথে উদ্ধার হয় পদ্মজার জন্য রেখে যাওয়া আমিরের লাল খামটি! পদ্মজা তখন অস্বাভাবিক ছিল। সে নিজের মধ্যে ছিল না। তাকে হাসপাতালে রাখার আদেশ দেয় আদালত। দেড় মাসের চিকিৎসার পর পদ্মজার শারীরিক ও মানসিক ক্ষয়ক্ষতি অনেকটা সেড়ে উঠে। আদালত থেকে দশ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। আলমগীর রাজ স্বাক্ষী হওয়াতে ফাঁসির বদলে আমৃত্যু কারাদণ্ড হয়। শেষ নিঃশ্বাস অবধি সে কারাগারে কাটাবে। তারপর রুম্পা চলে আসে গ্রামে। গ্রামে আসার এক মাস পর জানতে পারে সে গর্ভবতী। তার শূন্য জীবনে আশার আলো হয়ে আসে সন্তান আগমনের সংবাদ! দেশবাসীর মুখের কথা পাল্টে যায়। তারা পদ্মজার মুক্তি চেয়ে আজও আন্দোলন করে চলেছে!.পরদিন সকাল সাতটা। তুষার খাওয়াদাওয়া করে মাত্র উঠেছে। তখন দুই-তিনটে কুকুরের চিৎকার ভেসে আসে। তুষার দ্রুত বারান্দা থেকে নেমে লাহাড়ি ঘরের দিকে তাকালো। সকালের মিষ্টি বাতাসে বিষণ্ণ এক দৃশ্য চোখে পড়ে। অপরিচ্ছন্ন মৃদুল কুকুরগুলোর সাথে কী নিয়ে যেন তর্ক করছে! মাঝেমধ্যে মাটি ছুঁড়ে মারছে। তুষারদ্রুতপায়ে মৃদুলের দিকে এগিয়ে যায়। তুষারের পিছন পিছন বাসন্তী ও প্রেমাও গেল। গতকাল রাতে তুষার মৃদুলকে দেখতে এসেছিল।তখন মৃদুল পূর্ণার কবরের পাশে ঘুমাচ্ছিল। জুলেখা বানু ডাকতে নিষেধ করেন৷ তাই তুষার ডাকেনি।গোঁফ-দাড়ির জন্য মৃদুলকে চেনা যাচ্ছে না। গায়ে মাটি লেগে আছে।প্যান্টের এক পা হাঁটু অবধি ছেঁড়া। তুষারকে দেখে মৃদুল দুই কদম পিছিয়ে গেল। লাহাড়ি ঘর থেকে জুলেখা বানু বেরিয়ে আসেন। তিনি ভীষণ শুকিয়েছেন। চোখেমুখে আগের সৌন্দর্যটুকু নেই। একমাত্র ছেলেকে রেখে তিনি নিজের বাড়িতে ঘুমাতে পারেন না। মৃদুল মোড়ল বাড়ি ছেড়ে এক পাও নড়ে না। সে তার সুস্থ জীবন পূর্ণার সাথে কবর দিয়েছে। মাস তিনেক আগে মৃদুলকে জোর করে বেঁধে শহরের ডাক্তারের কাছে নেয়া হয়েছিল। ডাক্তারের পরামর্শে তাকে পাগলা গারদে রেখে আসা হয়৷ তিন-চার দিন পার হতেই খবর আসে,দারোয়ান ও দুজন নার্সকে আহত করে মৃদুল পালিয়েছে। জুলেখা বানু এই খবর শুনে অজ্ঞান হয়ে যান। মৃদুলের জ্ঞান সুস্থ নয়৷ সে কী করে গ্রামে ফিরবে? দীর্ঘ পনেরো দিন পর মৃদুলকে এক গ্রামে পাওয়া যায়। জুলেখা বানু কেঁদেকেটে অস্থির হয়ে পড়েন। মৃদুল পাগল থাকুক তাও চোখের সামনে থাকুক সেটাই তিনি চান। তাই মৃদুলকে বাড়ি নিয়ে যান। কিন্তু মৃদুল পূর্ণাকে ছাড়া কিছুতেই খাবে না। তাই বাধ্য হয়ে মৃদুলকে আবার মোড়ল বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। মৃদুল সর্বক্ষণ পূর্ণার কবরের পাশে বসে থাকে। বিড়বিড় করে কিছু বলে। পূর্ণার কবরের চারপাশে গর্ত করে বাঁশ পুঁতেছে তারপর টিনের ছাদ দিয়েছে,যেন পূর্ণা বৃষ্টিতে না ভিজে৷ রাতে পূর্ণার জন্য কিনে আনা লাল বেনারসিটি আঁকড়ে ধরে ঘুমায়। জুলেখা বানু জোর করে দুইবেলা খাইয়ে দেন৷ মাঝেমধ্যে নিজের বাড়িতে যান।নিজের বিলাসবহুল বাড়ি নিয়ে জুলেখা বানুর অহংকার ছিল। আর আজ ছেলের জন্য তাকে অন্যের বাড়ির লাহাড়ি ঘরে থাকতে হচ্ছে। সন্তানের উপরে যে কিছু নেই! গ্রামের বাচ্চারা মৃদুলকে লাল পাগল ডাকে। লাল পাগল ডাকার কারণ,মৃদুল ফর্সা,সুন্দর! যদিও তার সৌন্দর্য টিকে নেই। গোলাপি ঠোঁট দুটি কালচে হয়েছে। তুষার মৃদুলকে আদুরে স্বরে ডাকলো, ‘ মৃদুল।’মৃদুল এক নজর তুষারকে দেখলো। তারপর দূরে সরে গেল। তুষার জুলেখা বানুকে প্রশ্ন করলো, ‘মৃদুল খেয়েছে?’জুলেখা ভেজা কণ্ঠে বললেন, ‘ না। খায় নাই। কাইল থাইকা খাইতাছে না।’তুষার কপাল ইষৎ কুঁচকে মৃদুলের দিকে তাকালো। জুলেখাকে আবার প্রশ্ন করলো, ‘শুনেছিলাম ডাক্তারের কাছে নিয়েছিলেন। ওর অবস্থা কেমন? মাথা কতটুকু কাজ করে?’জুলেখা বানুর চোখের কার্ণিশে জল জমে। তিনি বললেন, ‘ বাচ্চারাও ওর থাইকা বেশি বুঝে। যত দিন যাইতাছে পাগলামি বাড়তাছে। আমি আর ওর বাপে ছাড়া যে যেইডা কয় ওইডাই বিশ্বাস করে।’‘চাচা কোথায়?’‘বাড়িত। বাড়িঘর জমিজমা দেহন লাগে না? আর কেলা দেখবো? কেউ আছে?’ জুলেখার কণ্ঠে অসহায়ত্ব স্পষ্ট।তুষার মৃদুলের পাশে গিয়ে বসলো। বললো, ‘ আমাকে ভয় পাচ্ছো?’মৃদুল আড়চোখে তুষারকে দেখলো। মাথা ঝাঁকিয়ে জানালো,সে ভয় পাচ্ছে। হাওলাদার বাড়ির খুঁটিনাটি তদন্ত করতে তুষার যখন অলন্দপুরে এসেছিল তখন মৃদুলের সাথে তার দেখা হয়। তখন মৃদুলের এতো খারাপ অবস্থা ছিল না। তুষার বললো, ‘আজ রাজহাঁস জবাই করবো৷ তুমি আমাকে সাহায্য করবে?’মৃদুল কিছু বললো না। তুষার বাসন্তীর দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আম্মা,রাজহাঁস আছে না?’‘আছে আব্বা।’ বললেন বাসন্তী।তারপর তুষার মৃদুলকে বললো, ‘রাজহাঁস আছে। অর্ধেক আমরা খাব আর অর্ধেক পূর্ণাকে দেব। পূর্ণা রাজহাঁস খেতে পছন্দ করতো। তাই না প্রেমা?’কোনাকালেই পূর্ণা রাজহাঁস পছন্দ করতো না। তাও প্রেমা তুষারের সাথে তাল মিলালো। তুষার সাবধানে মৃদুলকে বললো, ‘ তুমি যদি আমাকে সাহায্য না করো আর আমার সাথে খেতে না বসো আমি কিন্তু পূর্ণাকে কিছু দেব না। দেখিয়ে দেখিয়ে খাব। তখন পূর্ণা কষ্ট পাবে।’মৃদুল পূর্ণার কবরে হাত বুলিয়ে দিল। সে চিন্তা করছে কী করবে। অনেকক্ষণ চিন্তা করে সে রাজি হলো। সারাদিন তুষারের সাথে ভালো সময় কাটে। তুষার এমনভাবে কথা বলে,যেন পূর্ণা সত্যি বেঁচে আছে৷ মৃদুল তুষারের সঙ্গ উপভোগ করে। এক ফাঁকে জুলেখাকে তুষার জানালো,মৃদুলকে ঢাকা নিয়ে গেলে ভালো হয়। আরেকটু চেষ্টা করে দেখা যেত। জুলেখা তুষারের দুই হাত ধরে অনুরোধ করেন,মৃদুলের সুস্থতার জন্য তিনি সবরকম খরচ করতে প্রস্তুত। শুধু মৃদুলকে যেন তুষার সামলায়। তুষার জুলেখাকে আশ্বস্ত করলো। তারপর আটপাড়ায় ঘুরাঘুরি করে জানতে পারলো,মগা জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ইয়াকুব আলীর বাড়িতে কাজ নিয়েছে। আর ইয়াকুব আলী অলন্দপুরের মাতব্বর হয়েছেন।দিনের আলো কেটে রাত নামতেই মৃদুল পূর্ণার কবরের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লো। আর তুষার রাতের খাবার খেয়ে ঘরে আসে। প্রেমা মশারি টানাচ্ছে। বাইরে বিরতিহীনভাবে ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে চলেছে। তাদের ডাকাডাকিতে তুষারের কানে তালা লেগে যাচ্ছে। সে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক পছন্দ করে না। অন্যদিকে প্রেমার ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভীষণ পছন্দ। সে মুগ্ধ হয়ে শুনে। তুষার দুই কানে আঙুল ঢুকিয়ে বিরক্তি নিয়ে বললো, ‘পোকাগুলো কি সারারাত ডাকাডাকি করবে?’প্রেমা বললো, ‘মাঝরাত অবধি ডাকবে।’তুষার অবাক হয়ে প্রশ্ন করলো, ‘মাঝরাত অবধি জেগে থাকবো?’‘কানে তুলা দিয়ে রাখুন।’‘আছে তুলা?’ বললো তুষার।প্রেমা আলমারি খুলে তুলা বের করে দিল। তুষার প্রেমার কাণ্ডে বিস্মিত! সত্যি সত্যি তুলা দিয়ে দিল! এই মেয়ে নাকি বাকি দুই বোনের চেয়ে লজ্জাবতী আর ভীতু ছিল! অথচ,পদ্মজা আমিরকে লজ্জা পেত। পূর্ণা মৃদুলকে লজ্জা পেত। আর প্রেমা লজ্জা তো দূরের কথা তার চেয়ে এতো বড় মানুষটিকে পরোয়াও করে না। নির্বিকার ভঙ্গিতে থাকে। সময় ও পরিস্থিতি মানুষকে কতোটা পাল্টে দেয়! তুষার তুলা হাতে বসে রইলো। প্রেমা খেয়াল করেও কিছু বললো না।শোবার সময় প্রেমা প্রশ্ন করলো, ‘আপার কারাদণ্ডর সময় কি কমানো যায় না?’‘কমতে পারে। মনে হয় না এতদিন জেলে রাখবে। অনেক সময় যতদিন জেল হওয়ার কথা ততদিন হয় না।’‘এমনও হয়?’‘হয়। মেয়াদের আগে মুক্তি পেয়ে যায় অনেকে। তাছাড়া লিখন শাহ দৌড়াদৌড়ি করছেন,জনগণও চাইছে সাজা কমানো হউক। কমবে নিশ্চয়ই।’‘আপা কি জেল থেকে বের হয়ে লিখন ভাইয়াকে বিয়ে করতে রাজি হবে?’‘আমার যতটুকু ধারণা, রাজি হবে না। লিখন শাহ আশা নিয়ে বসে আছেন। পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। পদ্মজা লিখন শাহকে একটা চিঠি পাঠিয়েছেন ।’প্রেমা উৎসুক হয়ে জানতে চাইলো, ‘কী লেখা সেখানে?’তুষার চেয়ার ছেড়ে বিছানায় এসে বসলো। বললো, ‘ আমি পড়িনি। পিন্টুকে দিয়ে পাঠিয়েছি।’প্রেমা ছোট করে বললো, ‘ওহ।’তারপর প্রশ্ন করলো, ‘গত কয়েকদিনের মধ্যে আপার সাথে দেখা হয়েছে?’‘হ্যাঁ,গতকাল বিকেলেই দেখা হয়েছে। তিনি আমাকে দেখলেই গুটিয়ে যান। পর পুরুষের উপস্থিতি পছন্দ করেন না। তাই না?’প্রেমা হেসে মাথা ঝাঁকালো। আবার পদ্মজার কথা শুনে প্রেমা হেসেছে! তুষার প্রেমাকে ভালো করে খেয়াল করলো। পদ্মজার মুখের ছাপ প্রেমার মুখে আছে। প্রেমা সবসময় সোজা সিঁথি করে বেণি করে। শাড়ি পরে বলে বয়সের তুলনায় একটু বেশি বড় লাগে। এই যা…হুট করে প্রেমাকে বড় মনে হচ্ছে কেন? এতদিন তো শাড়ি পরাই দেখেছে। বড় তো লাগেনি! এ কোন কেরামতি! তুষার মুচকি হাসলো। প্রেমা তুষারকে তার দিকে তাকিয়ে হাসতে দেখে বললো, ‘ হাসছেন কেন?’তুষার টান টান হয়ে শুয়ে পড়লো। প্রসঙ্গ পাল্টে বললো, ‘ আমির হাওলাদার তিনটে বিয়ে করেছেন। আমি হলে চারটে বিয়ে করতাম। চার বিয়ে করা সুন্নত!’প্রেমা বাঁকা চোখে তুষারের দিকে তাকালো। বললো, ‘ করুন গিয়ে। তবে ভাইয়ার প্রথম দুটো বিয়ের কোনো মূল্য নেই। ভাইয়ার বউ একমাত্র আমার আপা।’তুষার এক হাতে মাথার ভর দিয়ে প্রেমার দিকে ফিরে বললো, ‘কেন মূল্য নেই?’‘ইসলামে পালিয়ে বিয়ে করার মূল্য নেই। মেয়ের অভিভাবক লাগে৷ ভাইয়ার দুটো বউ বাসায় কিছু না বলে বিয়ে করেছে। তাই হাশরের ময়দানে আমির ভাইয়ার বউ শুধু আমার আপা!’ কথাটা প্রেমা ভাব নিয়ে বললো।তুষার আবার হাসলো। সোজা হয়ে শুয়ে চোখ বুজলো। মাঝে দূরত্ব রেখে প্রেমাও শুয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর তুষার বললো, ‘প্রেমা? ‘প্রেমা জেগেই ছিল। সে সঙ্গে সঙ্গে বললো, ‘সাত দিনের কথা তো আজ একদিনে বলে ফেলছেন!’প্রেমার কণ্ঠে ঝাঁঝ। তার মনে তুষারের জন্য কতো রাগ জমে আছে টের পাওয়া যাচ্ছে। কেন এতো রাগ? সে কি গত চার মাসে তুষারের সঙ্গ পাওয়ার আশা করে বার বার নিরাশ হয়েছে? সত্যি এমন কিছু হয়েছে? তুষার ভাবলো। অদ্ভুত বিষয় প্রেমার মুখের ঝাঁঝালো কথাগুলো তুষারের ভালো লাগছে। সর্বনাশ! তবে কি সেও মরণ প্রেমে পড়তে যাচ্ছে! পরিণতি আমিরের মতো হবে নাকি মৃদুলের মতো? নাকি আরো ভয়ানক?হঠাৎ নীরবতা ভেঙে তুষার বলে উঠলো, ‘জানো প্রেমা,ভালোবাসার ব্যাখা ও রূপের বাহার পর্যবেক্ষণ করতে গেলে মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে যায়।’তুষারের গলার স্বরটা পরিবর্তন হয়েছে৷ কোমল হয়েছে! সে এতো পাল্টে গেল কী করে? প্রেমা বললো, ‘কেন এমন হয়?’তুষার শূন্যে চোখ রেখে বললো, ‘ভালোবেসে মানুষ পাগল হয়,ভালো হয়,খারাপ হয়, নিঃস্ব হয় এমনকি নিজের জীবনকেও হত্যা করতে দুইবার ভাবে না! কী অদ্ভুত!’তুষারের কথাগুলো প্রেমার ভালো লাগছে। সে তুষারের দিকে ফিরলো। তুষারও প্রেমার দিকে তাকালো। প্রেমা বললো, ‘যে ফাঁসে সে জানে,ভালোবাসা বড়ই অদ্ভুত!’কী সুন্দর কথা! কত মোহনীয় তার কণ্ঠ! তুষার ধীর স্বরে বললো, ‘ কাউকে ভালোবেসেছো?’প্রশ্নটি শুনে প্রেমার ঠোঁট দুটি কেঁপে উঠে। সে দ্রুত অন্যদিকে ফিরে চোখ বুজলো। কী করে সে বুঝাবে, তুষারের প্রেমে পড়ে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে তার হৃদয়! তার ব্যথিত হৃদয় তারই অজান্তে তুষারের প্রেমে কবেই পড়েছে! তুষার প্রেমার পিঠের দিকে তাকিয়ে রইলো। তার কেন যেন মনে হলো,প্রেমা তার চোখের দৃষ্টি আড়াল করেছে!.লিখনের মা ফাতিমা ঘরের জিনিসপত্র ভাংচুর করছেন। তিনি তৃধার সাথে লিখনের বিয়ে ঠিক করেছেন। কিন্তু লিখন বিয়ে করবে না৷ সে পদ্মজার জন্য অপেক্ষা করছে। পদ্মজা জেল থেকে বের হলে তাকেই বিয়ে করবে৷ ফাতিমা একজন খুনি,বিবাহিত,এক বাচ্চার মাকে কিছুতেই ছেলের বউ হিসেবে মেনে নিতে রাজি নন। লিখন যেরকম নাছোড়বান্দা তার মা তেমন নাছোড়বান্দা। ফাতিমা কঠোরভাবে জানিয়েছেন,যদি লিখন পদ্মজাকে বিয়ে করে তিনি আত্মহত্যা করবেন৷ সম্মান নষ্ট হওয়ার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়! এতেও লিখন ভ্রুক্ষেপ করলো না। সে পাগল হয়ে আছে। আমির নেই। এবার সে পদ্মজাকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখতেই পারে। জীবন তাকে একটা সুযোগ দিয়েছে। সে সেই সুযোগ এড়াতে পারবে না। এতদিন দূরে থেকেছে পদ্মজার স্বামী ছিল বলে। এখন পদ্মজা একা। তার স্বামী মৃত। পদ্মজাকে বিয়ে করে তাকে একটা নতুন জীবন উপহার দিবে,সেই সাথে নিজের ক্ষত হৃদয় সাড়িয়ে তুলবে। লিখন বৈঠকখানাতে গিয়ে বসলো। যেদিন জানলো পদ্মজা জেলে। সেদিন থেকে সে দৌড়ের উপর আছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে খাওয়াদাওয়া বাদ দিয়ে দৌড়াদৌড়ি করেছে। একদিকে পদ্মজার ফাঁসি হওয়ার আশঙ্কা অন্যদিকে মিথ্যা বদনামে তার ক্যারিয়ার নষ্ট হওয়ার পথে! ভাগ্য সহায় ছিল,তাই দুটোর কোনোটিরই ক্ষতি হয়নি। এজন্য খোদার দরবারে হাজার হাজার শুকরিয়া! দ্বিতীয় তলা থেকে ফাতিমার চিৎকার ভেসে আসে, ‘এই মেয়ের জন্য আমার ছেলে জীবনে প্রথমবার আহত হয়ে হাসপাতালে ছিল। এমন অশুভ মেয়েকে আমি আমার ছেলের জীবনে মেনে নেব না। তুমি তোমার ছেলেকে সামলাও।’ফাতিমাকে তার স্বামী সামলানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু পারছেন না।দরজায় কলিং বেল বেজে উঠে। আশেপাশে কেউ নেই। লিখন কয়েকবার তাদের বাসার কাজের মেয়েটিকে ডাকলো। তারও খোঁজ নেই। লিখন বিরক্তি নিয়ে দরজা খুলতে গেল। দরজার সামনে তার বাড়ির দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটা খাম। লিখন প্রশ্ন করলো, ‘কে দিয়েছে?’দারোয়ান বললো, ‘তুষার সাহেব পাঠিয়েছেন।’লিখন খামটি হাতে নিয়ে বললো, ‘আচ্ছা,যাও।’লিখন দরজা বন্ধ করে নিজের ঘরে চলে আসে। খামটি বিছানায় উপর রেখে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। নিজেকে দেখার সময় সে তার পাশে পদ্মজাকেও দেখতে পায়। তার জীবনে কিছুর অভাব নেই। শুধু একটাই অভাব, পদ্মজার অভাব! সে তার পরনের শার্ট খুলে গোসলখানায় গেল। গোসল করে কোমরে তোয়ালে পেঁচিয়ে তারপর খামটি হাতে নিল। খামের ভেতর চিঠি! লিখন আগ্রহ নিয়ে চিঠির ভাঁজ খুললো:-সম্মানিত লিখন শাহ,আমার সালাম নিবেন। আশা করি ভালো আছেন। সর্বপ্রথম বলতে চাই,আপনার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আমি আপনাকে এবং আপনার অনুভূতিকে সম্মান করি। বাধ্য হয়ে কারাগারে থাকা অবস্থায় আপনাকে চিঠি লিখতে হলো। শুনেছি,আপনি আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আপনি আমাকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু কিছু স্বপ্ন নিষিদ্ধ! আপনি এমন এক আশায় নিষ্পাপ একটি মনকে আঘাত করছেন যে আশা পূরণ হওয়ার নয়৷ আপনার সাথে আমার বিয়ে হলে আগেই হতো৷ আমার মনপ্রাণ একজনের প্রেমে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে৷ সেই ছাই কী করে আবার আপনি পুড়াবেন? মানুষ এক জীবনে সবকিছু পায় না। প্রতিটি মানুষের জীবনে কিছু না কিছুর অভাব থাকে। এক-দুটো অভাব নিয়ে বেঁচে থাকা খুব বেশি কঠিন নয়৷ যে আপনাকে ভালোবাসে তাকে আপনি ভালোবাসুন। যে আপনার জন্য মরতে প্রস্তুত তার জন্য বুকের এক টুকরো জায়গা দলিল করে দিন। তৃধা মেয়েটি ভীষণ ভালো। আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল। সে আপনাকে খুব ভালোবাসে। তার ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হওয়ার। অথচ,সে মেডিকেলের পড়া ছেড়ে মিডিয়ায় যোগ দিয়েছে! কতোটা ভালোবাসা থাকলে মানুষ এরকম করে? আপনি নিজেও স্বীকার করতে বাধ্য তৃধা আপনাকে ভালোবাসে! সে আপনার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য ব্যাকুল। তৃধাই আপনাকে উজাড় করে ভালোবাসতে পারবে। আমাদের জুটি হওয়া সম্ভব নয়৷ এ স্বপ্নকে আর দূরে যেতে দিয়েন না। আমার সর্বত্র জুড়ে একটি নাম। আমি একটি মানুষের জন্যই আকুল। আমি হাজার চেষ্টা করেও আপনাকে এক টুকরো ভালোবাসা দিতে পারবো না। তখন ভালোবাসা অভিশাপে পরিণত হবে। চিন্তা করে দেখুন, আমাদের সত্যি বিয়ে হলে কেউ সুখী হবে না। না আপনি হবেন, না আমি হবো। আর না আপনার পরিবার আর তৃধা সুখী হবে৷ আমি বলছি না আমার কথায় তৃধাকে বিয়ে করতে,ভালোবাসতে। ভালোবাসা জোর করে হয় না৷ তবে বিয়েতে আল্লাহ তায়ালা নিজে রহমত ঢেলে দেন। ভালোবাসা ঢেলে দেন। জীবনকে একটা সুযোগ দিয়ে দেখুন৷ আমার আম্মা বলতেন,পৃথিবীতে মানুষ দায়িত্ব নিয়ে আসে৷ সেই দায়িত্ব শেষ হয়ে গেলে তারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। হয়তো আমার কোনো দায়িত্ব বাকি! তাই এখনো বেঁচে আছি। যদি সত্যি দশ বছর পর পৃথিবীর বুকে মুক্ত হয়ে হাঁটার সুযোগ পাই,আমি আপনাকে আমার পাশে দেখতে চাই না। আমি আমার স্বামীর স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই। এই বাঁচায় সুখ না থাকুক,স্বস্তি আছে৷ আমার শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে সেই স্বস্তিটুকু কেড়ে নিবেন না। আপনি আমার জীবনের গল্পটির একটা পৃষ্ঠা মাত্র! আমি আমার শেষ জীবনটুকু নিজের মতো কাটাতে চাই। পাষাণের মতো কথা বলার জন্য আমি দুঃখিত! আপনার জীবন ভালোবাসায় পূর্ণ হয়ে উঠুক। পরিবারকে সময় দিন।ইতি,পদ্মজালিখনের চোখ থেকে দুই ফোঁটা জল চিঠির উপর পড়ে! কী নিষ্ঠুর প্রতিটি শব্দ! লিখন চিঠিটি রেখে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালো। ধূলো উড়িয়ে বাতাস ছুটছে। আজ রাতে ঝড় হতে পারে! তার বুকেও ঝড় বইছে। নিজেকে পৃথিবীর উচ্ছিষ্ট মনে হচ্ছে! পদ্মজা তার জন্য চাঁদই রয়ে গেল আর সে গরীব ব্রাহ্মণ!২০০৯ সাল। দেখতে দেখতে কেটে গেল তেরোটি বছর। পদ্মজা দরজা খুলে বারান্দায় দাঁড়ালো। সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি কুয়াশা হাড় কাঁপানো শীত নিয়ে জড়িয়ে ধরে তাকে। পদ্মজা দুই হাতে চাদর টেনে ধরলো। যত দূর চোখ যায় কেবল সবুজের হাতছানি। চা বাগানের সারি সারি টিলা, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ আর ঘন সবুজ অরণ্য! আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টি কত সুন্দর! রঙহীন ধূসর কুয়াশাও চা বাগানের সৌন্দর্য আড়াল করতে পারলো না। কুয়াশার জন্য যেন অন্যরকম সুন্দর লাগছে। এই অপরূপ সৌন্দর্য যে কাউকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম । তবে বৃষ্টিস্নাত পাহাড়ি সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি সুন্দর। পদ্মজা দুই পা তুলে বেতের চেয়ারে বসলো। তার মুখ শুষ্ক। আজ তার প্রাণের চেয়েও প্রিয় প্রিয়তমর মৃত্যুবার্ষিকী! প্রিয়তম মারা গিয়েও যেন সর্বত্র বিছিয়ে রেখে গেছে ভালোবাসার ডালপালা। পদ্মজা সময়-অসময়ে,কারণে-অকারণে বার বার সেসব ডালপালার বেড়াজালে আটকে পড়ে। নিজেকে বড় নিঃস্ব মনে হয়।পদ্মজা তার হাতের লাল খামটি থেকে দুটো চিঠি বের করলো। সে প্রতিদিন এই চিঠি দুটো পড়ে দিন শুরু করে। যতক্ষণ পড়ে,মনে হয় যেন আমিরের সাথে কথা বলছে! তার একদম পাশ ঘেঁষে ফিসফিসিয়ে আমির বলছে, ‘,পদ্মবতী,ভালোবাসি।’পদ্মজা চিঠি দুটিতে প্রথমে চুমু দিল। তারপর একটি চিঠির ভাঁজ খুললো। শুরুতে কোনো সম্বোধন নেই। অদ্ভুত একখানা চিঠি। চিঠিও বলা যায় না,এক পৃষ্ঠায় লেখা এক রাজা ও রানির গল্প। পদ্মজা পড়া শুরু করলো-‘এক ছিল দুষ্টু রাজা! নারী আর টাকার প্রতি ছিল তার চরম আসক্তি। যে নারী একবার তার বিছানায় যেত তার পরের দিন সে লাশ হয়ে নদীতে ভেসে যেত। রাজা এক নারীকে দ্বিতীয়বার ছুঁতে পছন্দ করতো না। কিন্তু সমাজে ছিল রাজার বেশ নামডাক! সবার চোখের মণি। খুন করা ছিল তার নিত্যদিনের সঙ্গী। তার কালো হাতের ছোঁয়ায় বিসর্জন হয়েছে শত শত নারী। প্রতিটি বিসর্জন রাজার জন্য ছিল তৃপ্তিকর। নারী ব্যবসায় লাভবান হয়ে গড়ে তুলে প্রাসাদের পর প্রাসাদ! একদিন চাচাতো ভাইয়ের সাথে বাজি ধরে হেরে গেল রাজা। শর্তমতে,ভাইয়ের জন্য এক রাজকন্যাকে অপহরণ করতে যায়। সেদিন ছিল বৃষ্টি। সন্ধ্যার আগ মুহূর্ত। রাজকন্যার প্রাসাদে সেদিন কেউ ছিল না। রাজা এক কামরায় ওৎ পেতে থাকে। রাজকন্যা আসলেই তাকে তার কালো হাতে অপবিত্র করে দিবে। কামরায় ছিল ইষৎ আলো। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর সেই কাঙ্খিত মুহূর্ত আসে। রাজকন্যার পা পড়ে কামরায়। রাজকন্যা রাজাকে দেখে চমকে যায়। ভয় পেয়ে যায়। কাঁপা স্বরে প্রশ্ন করে ‘‘কে আপনি? খালি বাড়িতে কেন ঢুকেছেন?’ সেই কণ্ঠ যেন কোনো কণ্ঠ ছিল না। ধনুকের ছোঁড়া তীর ছিল। রাজার বুক ছিঁড়ে সেই তীর ঢুকে পড়ে। রিনঝিনে গলার রাজকন্যাকে দেখতে রাজা আগুন জ্বালায়। আগুনের হলুদ আলোয় রাজকন্যার অপরূপ মায়াবী সুন্দর মুখশ্রী দেখে রাজা মুগ্ধ হয়ে যায়। তার পা দুটো থমকে যায়। রাজকন্যা যেন এক গোলাপের বাগান। যার সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ে রাজার কালো অন্তরে। রাজা নেশাগ্রস্তের মতো উচ্চারণ করলো নিজের নাম। নাম শুনেও রাজকন্যার ভয় কমলো না। পালিয়ে গেল অন্য কামরায়। রাজা কিছুতেই ভুলতে পারছিল না রাজকন্যার মুখ। তার চেনা পৃথিবী চুরমার হয়ে যায়। রাজকন্যার কামরার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে মুহূর্তের পর মুহূর্ত৷ সেদিনই ঘটে গেল দূর্ঘটনা। রাজ্যবাসী শূন্য প্রাসাদে দুষ্টু রাজা ও মিষ্টি রাজকন্যাকে এক সঙ্গে দেখে ফেললো। রাজকন্যার গায়ে লেগে গেল কলঙ্ক। কয়েকজন অমানুষ রাজকন্যাকে নোংরা ভাষায় হেনস্তা করলো। সেই দৃশ্য দেখে রাজার বুকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। সে নিজ প্রাসাদে ফিরে এক দণ্ডও শান্তি পেল না। তার চাচাতো ভাইকে তাৎক্ষণিক আদেশ করলো যারা রাজকন্যাকে তাদের মুখ দিয়ে অপমান করেছে তাদের যেন জিহবা ছিঁড়ে ফেলা হয়,যে হাত দিয়ে রাজকন্যাকে ছুঁয়েছে সে হাত যেন কেটে দেয়া হয়, যে চোখ দিয়ে রাজকন্যাকে লোলুপ দৃষ্টিতে দেখেছে সে চোখ যেন উপড়ে ফেলা হয়। ভোররাতে দুষ্টু রাজা খবর পেল, রাজকন্যার মাতা সেই অমানুষ দের হত্যা করেছে। এতে রাজা খুশি হলেও রাজকন্যার মাতাকে নিয়ে একটা চাপা ভয় কাজ করে। কিন্তু বেশিক্ষণ রাজকন্যার মাতাকে নিয়ে ভাবলো না। রাজকন্যাকে যে ভোলা যাচ্ছে না। তাকে যে করেই হউক পেতে হবে৷ নয়তো জীবন বৃথা। রাজা তার পিতাকে আদেশ করলো, মায়াবতী রাজকন্যাকে তার চাই ই চাই। নয়তো সে বাঁচবে না। এই পৃথিবী তোলপাড় করে দিবে৷ রাজার পাগলামি দেখে অবাক তার পরিবার। সালিশ বসে। সালিশে সেই দুষ্টু রাজা রাজকন্যার মাতার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থেকে রেহাই পেয়ে,জিতে নিল রাজকন্যাকে। তিনি এক কথায় রাজকন্যাকে দিতে রাজি হলেন। আনন্দে রাজার বুকে উথাল ঢেউ শুরু হয়। কী অসহ্য সুখময় যন্ত্রণা! রাজা এর আগে এতো খুশি হয়েছে নাকি জানা নেই! যথাসময়ে তাদের বিয়ে হলো। রাজকন্যা রাজার রানী হলো। নাম তার পদ্মবতী। ফুলের মতো পবিত্র সে,সদ্যজাত শিশুর মতোই নিষ্পাপ। রাজা ভুলে গেল নারী সঙ্গের কথা,ভুলে গেল তার রাজত্বের কথা। তার ধ্যানজ্ঞান সীমাবদ্ধ হয়ে গেল পদ্মবতীতে। পদ্মবতীর একেকটা কদম রাজার বুকে ঢেউ তুলে,পদ্মবতীর প্রতিটি নিঃশ্বাস থেকে যেন ফুল ঝরে পড়ে। পদ্মবতীর পায়ে চুমু দেয়ার সময় রাজার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হয়, ‘পদ্মবতী…আমার রানী,আমি কাঁটা বিছানো বাগানে শুয়ে থাকি তুমি আমার বুকে হেঁটে বেড়াও।’ধীরে ধীরে রাজা উপলব্ধি করতে পারলো, তার পদ্মবতী পবিত্র। এতোই পবিত্র যে সে কখনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করবে না।এই পবিত্রতা রাজাকে আরো আকৃষ্ট করে ফেললো। সেই সাথে রাজা ভয় পেল,তার কালো অন্তরের খবর যদি পদ্মবতী জেনে যায়তখন কী হবে? কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। ধরে বেঁধে রাখা গেলেও পদ্মবতীর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। এই বিচ্ছেদ সহ্য করার ক্ষমতা তার হবে না। নির্ঘাত মরে যাবে। যে ভালোবাসা নিজ ইচ্ছায় তাকে বিমুগ্ধ করে তুলে,সে ভালোবাসা জোর করে সে কখনো নিতে পারবে না। রাজা তার পাপ লুকিয়ে রাখতে মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যা অভিনয় করা শুরু করলো। পদ্মবতীর থেকে সহানুভূতি আর বিশ্বাস অর্জন করতে গল্প বানালো৷ তার পাপের মহলে নিরাপত্তা বাড়িয়ে দিল। প্রয়োজনে সে পৃথিবীর প্রতিটি মানব সন্তানকে খুন করতে প্রস্তুত,তাও তার পাপের জন্য পদ্মবতীকে হারাতে চায় না।যথাসম্ভব পদ্মবতীকে নিয়ে দুষ্টু রাজা অন্য রাজপ্রাসাদে চলে আসে। সেই প্রাসাদে রাজা আর তার পদ্মবতী ছাড়া কেউ নেই! ভালোবাসার সোহাগ ও খুনসুটিতে ভরে উঠে তাদের ঘর। রাজার দৃষ্টি ডুবে যায় একজনেতে! কোনো নারী আর তাকে টানতে পারলো না। প্রতিটি প্রহর পদ্মবতীকেই নতুন করে অনুভব করে। নারী আসক্তি চিরতরে তাকে ছেড়ে গেল। কিন্তু নারী ব্যবসা রয়েই গেল। সৎ পেশার অজুহাতে অসৎ পেশা জ্বলজ্বল করে তখনো জ্বলছিল। মাঝেমধ্যে রাজার ভয় হতো,পদ্মবতী সব জেনে যাবে না তো? রাজা সব রকম পট্টি বেঁধে দিল পদ্মবতীর চোখে। পদ্মবতী সেই পট্টিসমূহ ভেদ করে পৌঁছাতে পারলো না গভীরে! ভালোবাসার বেড়াজালেই আটকে রইলো।বছর দেড়েক পর তাদের ঘর আলো করে এলো এক রাজকন্যা। রাজকন্যা ছিল মায়ের মতোই সুন্দর। আকাশে একটা চাঁদ উঠে,কিন্তু রাজার আকাশে উঠেছিল দুটো চাঁদ! ছোট্ট রাজকন্যাকে দেখে রাজার বুক কেঁপে উঠে। তৃতীয়বারের মতো কোনো মেয়ের প্রতি সে ভালোবাসা অনুভব করে। তার প্রথম ভালোবাসা তার মা,দ্বিতীয় ভালোবাসা স্ত্রী, আর তৃতীয় ভালোবাসা তার কন্যা! রাজা যতবার রাজকন্যাকে কোলে নিত, বুকে একটা ব্যথা অনুভব করতো। বার বার মনে হতো, আমার জগৎ-সংসার একটু সাধারণ হতে পারতো না? এই চিন্তা তার অসৎ কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। সে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। তার দলবল চিন্তিত হয়ে পড়ে। কাজের প্রতি রাজার উদাসীনতা তাদের ক্ষিপ্ত করে। পূর্ব ক্ষোভের জেদ ধরে তারা রাজার দূর্বলতা লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়ে মারে। সেই তীরে ছোট্ট রাজকন্যার প্রাণের আলো নিভে যায়। রাজার বুক থেকে একটা চাঁদ খসে পড়ে! পদ্মবতী ভেঙে গুড়িয়ে যায়। পদ্মবতীর ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা রাজার নেই। শক্ত দুই হাতে আঁকড়ে ধরে পদ্মবতীকে। তার কন্যার খুনিকে সে নিজ হাতে কোপাতে পারলেও,খুনের আদেশ দাতাদের হত্যা করতে পারলো না। জানতে পারলো তার পিতা,চাচা ও চাচাতো ভাইয়ের আদেশে তার রাজকন্যার চোখ দুটি চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে! ততদিনে রাজা এটাও বুঝে গেল, যে জগতে সে প্রবেশ করেছে সেই জগতের শেষ পরিণতি মৃত্যু। সে যদি খুনের আদেশ দাতাদের ক্ষতি করে তার ব্যবসা ডুবে যাবে৷ ব্যবসার খুঁটি সে হলেও, আদেশ দাতারা সেই খুঁটি ধরে রেখেছে। আর ব্যবসার পতন মানে পদ্মবতীর সব জেনে যাওয়া। সেই সাথে অন্য রাজাদের ক্ষোভের শিকার হওয়া। যে রাজাদের সাথে মিলে দুষ্টু রাজা পাপ জমায় তারা হিংস্র হয়ে উঠবে। আর তারা দুষ্টু রাজার উপর ক্ষিপ্ত হলে ক্ষতি হবে পদ্মবতীরও। এতোজনকে রুখতে যাওয়ার ক্ষমতা দুষ্টু রাজার নেই। আবার মাথার উপর আছে শাসকের আদালত! একমাত্র রাজার মৃত্যু পারে তার কন্যার খুনীদের ধ্বংস করতে। কিন্তু রাজা নিজেকে উৎসর্গ করতে চায় না। পদ্মবতীর সাথে সারাজীবন বাঁচতে চায়। তাই রাজা ধামাচাপা দিল রাজকন্যার ব্যথা! বাবা হিসেবে হেরে গেল,চুপসে গেল। অভিশাপ সেই রাজাকে। অভিশাপ!‘পদ্মজা চিঠির উপর হাত বুলিয়ে দিল। যখন সে প্রথম এই বাস্তব রূপকথা পড়েছিল,সাদা অংশে শুকনো রক্ত লেগে ছিল। তার প্রিয় স্বামীর রক্ত! আমিরের শরীরে পাওয়া গেছে অগণিত কামড়ের দাগ,চাবুক মারার দাগ,ছুরির আঘাতের দাগ। সে নিজেকে শেষ দিনগুলোতে অনেক আঘাত করেছে। নিজেকে রক্তাক্ত করে পাতালঘরে আর্তনাদ করেছে। পদ্মজা হাতের উল্টো পাশ দিয়ে চোখের জল মুছে দ্বিতীয় চিঠিটি হাতে নিল। ভাঁজ খুললো,‘প্রিয়র চেয়েও প্রিয় পদ্মবতী,আমার পাপের রাজত্বে তোমার আগমন ভূমিকম্পের মতো ছিল। যখনই দেখি তুমি দাঁড়িয়ে আছো,আমার হৃৎপিণ্ড থমকে যায়। চোখের সামনে ছয় বছরে গড়ে তোলা ভারী দেয়াল ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।আমার চোখের মণি পদ্মজা,তোমার ওই দুচোখের অবিশ্বাস্য চাহনি আমাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। আমার কথা হারিয়ে যায়। আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। খারাপের মাঝেও ভালো থাকার মন্ত্র ছিল তোমার দৃষ্টি। সেই দৃষ্টিতে যখন ঘৃণা দেখতে পাই,আমার বুক পুড়ে যায়। আমার মস্তিষ্ক ফেটে যায়!তোমার আহত মুখশ্রী দেখে আমার শরীরের চামড়া ঝলসে যায়। তোমার চোখের জল দেখে সমুদ্র আছড়ে পড়ে মাথার উপর। আমার মিথ্যাচার, আমার প্রতারণা তোমাকে কষ্টের ভুবনে ছুঁড়ে ফেলে। বিষাদের ছায়া ঢেকে যায় তোমার চোখ। সেই বিষাদটুকু মুছে দেয়ার অধিকার আমি হারিয়ে ফেলি। যদি পারতাম আকাশের মেঘ হয়ে তোমার কাজলকালো আঁখি ছুঁয়ে সবটুকু বিষাদ ধুয়েমুছে সাফ করে দিতাম।আমার প্রথম ও শেষ ভালোবাসা, তুমি একটু দূরে সরলেই যে আমি মনে মনে পুরো পৃথিবী ভস্ম করে দেয়ার ইচ্ছে পুষি, সেই আমি পরিষ্কার দেখতে পেলাম,তোমার-আমার পথচলা এখানেই শেষ! আমি শান্ত পাথরের মতো স্থির হয়ে যাই। গন্তব্য হারিয়ে ফেলি। এই ভুবনে তুমি আমার শেষ আশ্রয়স্থল ছিলে। আম্মার সাথে তখন যোজন যোজন দূরত্ব। তোমার ঘৃণাভরা চাহনি আমাকে চোখের পলকে পুড়িয়ে দেয়৷ তোমার আমার বিচ্ছেদ আমাকে আঙুল তুলে দেখিয়ে দেয়, প্রেমানলে জ্বলতে জ্বলতে আমি অনেক আগেই নিঃশেষ হয়ে গেছি।সোনালি রোদ্দুরের মতো সুন্দর পদ্মবতী, আমি তোমাকে আঘাত করে নিজে মরে গিয়েছি। যে হাতে আঘাত করেছি সেই হাত পুড়ে যাক,পোকামাকড় খাক! তোমাকে ব্যথা দিয়ে আমি ভালো নেই। ছুরির আঘাতও আমার মনের ব্যথার চেয়ে বেশি হতে পারছে না। যদি পারতাম হয় তোমাকে ভালোবাসতাম,নয় শুধু হাওলাদার বংশে জন্ম নিতাম। দুটো একসাথে গ্রহণ করতাম না। দুই সত্ত্বা মস্তিষ্কের দ্বন্দ্বে আমাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে।আমি নিষ্ঠুর,তুমি মায়াবতীআমি ধ্বংস,তুমি সৃষ্টিআমি পাপ,তুমি পবিত্রএতো অমিলে কেন হলো মিলন? কেন কালো অন্তরে ছড়িয়েছিল ফুলের সুবাস? আমাকে ধ্বংস করার কি অন্য কোনো অস্ত্র ছিল না? এমন কঠিন কষ্ট কেন দেয়া হচ্ছে আমাকে? তোমার ব্যথায় আমি দগ্ধ হচ্ছি। তোমার কান্না,তোমার আর্তনাদ আমার মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরনকে কাঁপিয়ে তুলে। মনে হয়,মাথার ভেতর পোকারা কিলবিল করছে৷ বিচ্ছেদের বিষাক্ত ছোবলে নীল হয়ে যাচ্ছি আমি। আমাকে বাঁচাও!শূন্য আকাশে গাঙচিল যেমন একা আমিও তেমন একা। প্রতিটি মুহূর্ত আমাকে অনুশোচনায় দগ্ধ করে। একাকী নীরবে সহ্য করি। এটাই তো আমার প্রাপ্য। মেয়েগুলোকে বাঁচাতে চেয়েও বাঁচাতে পারিনি। বুকের উপর পাথর চেপে পাঠিয়ে দিয়েছি বহুদূরে। যখন তাদের জাহাজে তুলে দিয়েছি আমার দিকে করুন চোখে তাকিয়ে ছিল। ব্যথিত হৃদয় প্রথমবারের মতো অনুভব করে, তারাও তো আমার মতো কষ্ট পাচ্ছে! কিন্তু তখন আমার আর সামর্থ্য ছিল না।আমার জীবনের বসন্তকাল তুমি। তোমার অসহ্য আলিঙ্গন আমার সহ্যের বাইরে ছিল। তোমার আর্তনাদ করে পালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করা আমার নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেয়। সত্যি যদি পারতাম,পালিয়ে যেতে! কিন্তু তা আর সম্ভব নয়। আমার আকাশ সমান পাপ আমার পিছু ছাড়বে না। আজীবন দৌড়াতে হবে। এক দন্ডও শান্তি মিলবে না।মেঘলা বরণ অঙ্গের সাম্রাজ্ঞী, তোমার ভালোবাসার সাম্রাজ্যে কাটিয়ে দিতে চেয়েছিলাম শত জনম। হলো না। তোমার চোখের খাদে পড়ে থাকতে চেয়েছিলাম আজীবন। তাও হলো না। সময় এসেছে আমার বিদায়ের! আমাদের পথচলা এতটুকুই। আমি ছিলাম দূর্গের মতো কঠিন। সেই দূর্গ তুমি ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছো। ভালোবাসা আমার হাঁটু ভেঙে দিয়েছে। আমার আর উঠে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই। শেষ বারের মতো তোমাকে ছুঁয়ে যেতে চাই। আমার প্রেম তুমি,আমার ভালোবাসা তুমি। সত্যি বলছি,আমার জীবনে আসা প্রতিটি নারী আমাকে নয় আমার হারাম টাকার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। তাদের আমি কিনে নিয়েছি। শারমিন আর মেহুল দুজনকে বাড়ি উপহার দিয়ে তারপর আমাকে বিয়ে করতে হয়েছে। তাও আমি অপরাধী। আমি তাদের ঠকিয়েছি, প্রতারণা করেছি,খুন করেছি। আমি অনুতপ্ত। বড্ড আফসোস হচ্ছে,বড্ড আক্ষেপ থেকে গেল৷ ওপারেও আমি তোমাকে পাবো না! আমার মতো ঘৃণিত ব্যাক্তি তোমার পাশে দাঁড়াতে পারবে না। আমার জায়গা হবে,জাহান্নামের কোনো এক দুর্গন্ধময় জগতে! তোমাকে দেখার তৃষ্ণা, তোমাকে ছোঁয়ার আকাঙ্ক্ষা আমার মিটলো না। হয়তো সহস্র বছরেও মিটবে না।আমার হৃদয়ের রঙহীন বাগানের রঙিন প্রজাপতি, সাদা শাড়িকে তোমার সঙ্গী করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য দুঃখিত। তুমি মুক্ত হবে। পাখির মতো উড়বে। শুধু আমি থাকবো না পাশে। আফসোস!চিঠির শেষ প্রহরে এসে হাত কাঁপছে। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে। এই পৃথিবীতে আমি আরেকটু থাকতে চাই। এই পৃথিবীর সবুজ বুকে তোমাকে নিয়ে প্রতিটি ভোর হাঁটতে চাই। আমাদের ভালোবাসার জ্যোৎস্না রাতগুলো আরেকটু দীর্ঘ হলে কী এমন হতো? আমাদের প্রেমের পরিণতি এতো নিষ্ঠুর কেন হলো?তোমার ওই ঘোলা চোখের মায়াজাল ছেড়ে চলে যেতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু যেতে হবেই। আর থাকা যাবে না। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। তোমার কোনো ক্ষতি হওয়ার আগে,আমাকে সব কীটদের নিয়ে এই পৃথিবী ছাড়তে হবে।আমার আঁধার জীবনের জোনাকি, সৃষ্টিকর্তাকে বলো আমাকে যেন আরেকটা সুযোগ দেয়া হয়৷ এই পৃথিবীতে আবার যেন পাঠানো হয়৷পৃথিবীর বুকে তো জায়গা, সম্পদের অভাব নেই। আরেকটা জীবন কি পেতে পারি না? তখন আমি কঠিন পরীক্ষা দেব৷ তোমাকে পেতে আগুনের উপর দিয়ে হাঁটবো, ভাঙা কাচের ধারে পা ছিন্নভিন্ন করে হলেও তোমাকে জিতে নেব। থাকবে না কোনো অন্ধকার জগতের হাতছানি,তৈরি হবে তোমার আমার প্রেমের উপাখ্যান৷ আমাদের ভালোবাসা দেখে জ্যোৎস্না ও তারকারাজি ঝলমলিয়ে ওঠবে।আমাদের আবার দেখা হবে। কোনো না কোনো ভাবে আবার দেখা হবে। দেখা হতেই হবে। নিজের খেয়াল রেখো৷ ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করো। পূর্ণা,মা হেমলতার কাছে নিশ্চয়ই ভালো আছে৷ চিন্তা করো না। পারলাম না আরো কয়টা দিন তোমাকে আগলে রাখতে। ক্ষমা করো আমায়। অতৃপ্ত আমি মৃত্যুকে তৃপ্তি হিসেবে গ্রহণ করছি।ইতি,আমির হাওলাদার ‘চোখের সামনে ছবির মতো ভেসে উঠে,আমিরের শেষ চাহনি। রক্ত বমি করে মাটিতে লুটিয়ে পড়া! ভেসে উঠে সেই শিশি। যে শিশির উপরে বড় বড় করে লেখা ছিল Poison (বিষ)। পদ্মজা দুটো চিঠি বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো। তারপর শূন্য আকাশে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। এই চিঠি যেদিন প্রথম পড়লো সে,চিৎকার করে কেঁদেছে। সে আমিরকে খুন করে অনুতপ্ত নয়। সে কাঁদে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে!দরজায় ঠকঠক শব্দ হচ্ছে৷ পদ্মজা দ্রুত চিঠি দুটো ভাঁজ করে খামের ভেতর রেখে দিল। গলার স্বর উঁচু করে বললো, ‘বলো বুবু।’দরজার ওপাশ থেকে লতিফার কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, ‘মাহবুব মাস্টার আইছে?’পদ্মজা বললো, ‘নাস্তা তৈরি করো। আমি আসছি।’পদ্মজা চোখের পানি মুছে ঘরে আসলো। আয়নায় দেখলো,সে যে কেঁদেছে বুঝা যাচ্ছে নাকি। না বুঝা যাচ্ছে না। গায়ের শালটি রেখে আলনা থেকে আরেকটি কালো শাল নিয়ে ভালো করে মাথা ঢেকে নিল। তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। বৈঠকখানার সামনে গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়ালো।মাহবুব মাস্টার বসে আছেন। তার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। তিনি অংকের মাস্টার। পদ্মজা আর তিনি এক স্কুলের শিক্ষক। ভালো পড়ান। তার সামনে বসে আছে তিনটি ছেলেমেয়ে। এই তিনজনকে পড়ানোর জন্যই পদ্মজা মাহবুব মাস্টারকে ডেকেছে। মাহবুব মাস্টার বারো বছরের ছেলেটিকে আগে প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার নাম কী?’ছেলেটি প্রবল উৎসাহ নিয়ে বললো, ‘আমার নাম নুহাশ হাওলাদার। আর ওর নাম…’মাহবুব নুহাশকে থামিয়ে দিলেন। বললেন, ‘তুমি শুধু তোমার নাম বলো। অন্যজনেরটা বলতে বলিনি। কাঁটা থুতুনি তোমার নাম কী?’‘আমীরাতুন নিসা নুড়ি।’ নুড়ি অবাক হওয়ার ভান করে নিজের নাম বললো। তার থুতনিতে গর্ত আছে বলে কি তাকে কাঁটা থুতুনি ডাকতে হবে! সে মনে মনে ব্যথা পেয়েছে। নুড়ির পাশে বসে থাকা দশ বছরের মেয়েটি বললো, ‘আমার নাম জিজ্ঞাসা করছেন না কেন? আমি সবার ছোট। আমার নাম খাদিজাতুল আলিয়া।’মাহবুব মাস্টার চোখের চশমা ঠিক করে বললেন, ‘ভীষণ বেয়াদব তো! এতো অধৈর্য্য কেন তুমি?’নুহাশ আলিয়ার মাথায় থাপ্পড় দিয়ে বললো, ‘ মা কী বলছে মনে নেই? বেশি কথা বলতে নিষেধ করেনি?’আলিয়া কটমট করে নুহাশের দিকে তাকালো। নুহাশ বললো, ‘ খেয়ে ফেলবি আমাকে?’আলিয়া খামচে ধরলো নুহাশের মাথার চুল। নুহাশও আলিয়ার চুল খামচে ধরে। দুজন ধস্তাধস্তি করে মেঝেতে শুয়ে পড়ে। তারা দুজন কথায় কথায় ঝগড়া বাঁধিয়ে ফেলে। মাহবুব মাস্টার আঁতকে উঠলেন,হইহই করে চিৎকার করে উঠলেন। পদ্মজা পর্দা ছেড়ে বেরিয়ে আসে। সঙ্গে সঙ্গে নুহাশ ও আলিয়া থেমে গেল৷ সোজা হয়ে দাঁড়ালো। নুড়ি দুই চোখ খিঁচে চাপাস্বরে নুহাশকে বললো, ‘দিলি তো মা কে রাগিয়ে!’মাহবুব মাস্টার হতবাক! পদ্মজার মতো নম্রভদ্র শিক্ষিকার এমন উশৃংখল ছেলেমেয়ে! তিনি চশমা ঠিক করতে করতে বললেন, ‘ এত অসভ্য এরা!’পদ্মজা শীতল চোখে নুহাশ ও আলিয়ার দিকে তাকালো। তারা নতজানু হয়ে আছে। পদ্মজা বললো, ‘ সবাই ভেতরে যাও।’পদ্মজার কণ্ঠে রাগের আঁচ। তা টের পেয়ে আলিয়ার চোখে জল জমে। প্রায় প্রতিদিন নুহাশ আর তার ঝগড়া হয়। ঝগড়ার জন্য শাস্তি পায় তবুও ভুলে ভুলে আবার ঝগড়া করে ফেলে। তারা চুপচাপ ঘরের ভেতর চলে গেল। পদ্মজা মৃদু হেসে মাহবুব মাস্টারকে বললো, ‘ ওরা একটু ক্ষেপা ধরণের। ভাইবোন একসাথে থাকলে যা হয়!’‘শয়তানদের মেরুদণ্ড সোজা করতে করতে চুল পেকেছে আমার। এদেরও কয়দিনে সোজা করে ফেলবো।’‘আগামীকাল থেকে আর দুষ্টুমি করবে না। আপনি একটু ভালো করে পড়াবেন। আমার তিনটা ছেলেমেয়েই অংকে কাঁচা।’‘আপনি আমাকে বলেছেন, এতেই যথেষ্ট। অংক ওদের প্রিয় সাবজেক্ট না বানাতে পারলে আমি মাহবুব মাস্টার না।’পদ্মজা জোরপূর্বক হাসলো। মাহবুব মাস্টার একটু বেশি কথা বলেন। যাওয়ার পূর্বে মাহবুব মাস্টার বলে গেলেন, আগামীকাল থেকে প্রতিদিন সকাল সাতটায় অংক পড়াতে আসবেন।পড়ন্ত বিকেল! আলিয়া ছবি আঁকছে। সে খুব ভালো ছবি আঁকে। বর্ণনা শুনে হুবহু ছবি আঁকতে পারে! গায়ের রং শ্যামলা। তার নাম আমিরের নামের সাথে মিল রেখে আলিয়া রাখা হয়েছে। পদ্মজা পাঁচ বছর জেলে ছিল। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তার নিঃস্ব জীবনে রূম্পার ছেলে নুহাশের আগমন হয়৷ রুম্পা নুহাশকে জন্ম দিয়েই মারা যায়। চার-পাঁচ বছর লতিফা আর বাসন্তী নুহাশকে দেখেছে। তারপর পদ্মজা দায়িত্ব নিলো। নুহাশ আর লতিফাকে নিয়ে চলে আসে চা বাগানের দেশ সিলেটে। তার নামে যত সম্পত্তি আমির লিখে দিয়েছিল সেসব পদ্মজা সরকারের দায়িত্বে দিয়েছে।এবং অন্দরমহল ও অলন্দপুরের জমিজমা বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে এতিমখানা,মসজিদ ও মাদরাসা নির্মাণ করেছে। গরীবদের খাবার,জামা-কাপড় দান করেছে। একটি পয়সাও নিজের জন্য রাখেনি। খালি হাতে সিলেট এসেছে। সিলেটে পদ্মজার রেনু নামে এক বান্ধবী ছিল । তারা একসাথে ঢাকা পড়েছে। রেনুর সহযোগিতায় পদ্মজা একটা বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক হয়। মাস তিনেক পার হতেই পদ্মজা অনুভব করলো,তার বেঁচে থাকা কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। তাই নুহাশকে নিয়ে ঢাকা ঘুরতে যায়। কথায় কথায় পদ্মজা তুষারকে জানালো,সে একটা মেয়ে বাচ্চা দত্তক নিতে চায়। তুষার এ কথা শুনে বললো,পদ্মজা চাইলে তাদের এলাকার এতিমখানা থেকে বাচ্চা নিতে পারে। তুষারের ভালো পরিচিতি আছে। প্রতি মাসে সে তার বেতনের একাংশ এতিমখানায় দেয়। পদ্মজা কথাটি শুনে খুব খুশি হলো। তুষারের সাহায্যে এতিমখানা থেকে আড়াই বছরের এক শ্যামবর্ণের মেয়েকে দত্তক নিয়ে নিজের মেয়ে মনে করে বুকে জড়িয়ে নেয়। নাম দেয়,খাদিজাতুল আলিয়া। যেদিন আলিয়াকে নিয়ে বাসায় আসে সেদিন রাতে টের পেল,আলিয়ার শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে। পদ্মজা এরপর দিন সকালে আবার এতিমখানায় গেল। আলিয়ার শ্বাসকষ্ট নিয়ে কথা বলতে। তারা চিকিৎসা করেছে নাকি? ঔষধের নামগুলো কী?সব জেনে যখন সে এতিমখানা থেকে বের হতে উদ্যত হলো তখন তার পিঠের উপর একটা নুড়ি পাথর এসে পড়ে। পদ্মজা পিছনে ফিরে নুহাশের বয়সী একটা মেয়েকে দেখতে পেল। মেয়েটির থুতনির গর্তটি তার পায়ের তলার মাটি কাঁপিয়ে তুলে। হুবহু আমিরের কাঁটা দাগটির মতো! এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়,তার আর আমিরের সন্তান দাঁড়িয়ে আছে। পদ্মজার বুকের ভেতরটা হাহাকারকরে উঠে। মেয়েটি দৌড়ে পালায়। পদ্মজা মেয়েটিকে খুঁজে বের করে। তারপর এতিমখানার দায়িত্বে থাকা কতৃপক্ষকে অনুরোধ করলো, এই মেয়েটিকেও সে দত্তক নিতে চায়। পদ্মজার দূর্বলতা টের পেয়ে লোকটি,বিরাট অংকের টাকা চেয়ে বসে। পদ্মজা বাধ্য হয়ে আশা ছেড়ে দেয়। তবে যে কয়টাদিন ঢাকা ছিল,নিজের অজান্তে বোরকা পরে বার বার এতিমখানার সামনে গিয়ে ঘুরঘুর করেছে। তারপর ফিরে আসে সিলেট। মাস তিনেক অনেক চেষ্টা করেও বাচ্চা মেয়েটির মুখ ভুলতে পারলো না। তার বুকের ভেতর ছোট মেয়েটি যেন আলোড়ন সৃষ্টি করে দিয়েছে। পদ্মজা আবার ঢাকা গেল। নিজ থেকে তুষারকে বললো মেয়েটিকে আনার ব্যবস্থা করে দিতে। তুষার ও প্রেমা দুজনই পদ্মজার অস্থিরতা গভীর ভাবে টের পেল। তুষার দ্রুত সম্ভব মেয়েটিকে নিয়ে আসে। মেয়েটিকে হাতের কাছে পেয়ে পদ্মজা কেঁদে দেয়। খুশিতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। নুড়ি পাথরের জন্য মেয়েটিকে পাওয়া বলে,তার নাম দিল আমীরাতুন নিসা নুড়ি।এই হলো পদ্মজার তিন সন্তানের মা হওয়ার গল্প। সিলেটে তাকে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সব সমস্যা পেরিয়ে আজ সে এক বেসরকারি স্কুলের সহকারী শিক্ষিক। বিশাল চা বাগানের মধ্যিস্থলে এক কোয়ার্টারে তারা থাকে। তাদের বাড়িটি এক তলা।পদ্মজা রাতের রান্না করছে। আলিয়া ছবি আঁকার ফাঁকে ফাঁকে পদ্মজাকে দেখছে। নুহাশ ভয়ে তাকাচ্ছেই না। পদ্মজা যখন রেগে যায়। কথা বলা বন্ধ করে দেয়। আর পদ্মজা দূরত্বের রেখা টেনে দিলে তার তিন ছেলেমেয়েদের মুখের হাসি মিলিয়ে যায়। নুড়ি আড়চোখে পদ্মজাকে দেখে আলিয়াকে ফিসফিসিয়ে বললো, ‘মা কষ্ট পেয়েছে।’আলিয়ার চোখ থেকে জল বেরিয়ে আসে। সে কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো, ‘ আমি মা কে কষ্ট দিতে চাইনি।’নুহাশ ব্যথিত স্বরে তাল মিলালো, ‘আমিও চাইনি।’আলিয়া চিৎকার করে উঠলো, ‘তোমার জন্য হয়েছে ভাইয়া৷ তুমি আমাকে রাগিয়েছো।’নুড়ি ঠোঁটে এক আঙুল রেখে ইশারা করে চুপ হতে৷ আলিয়া দ্রুত এক হাতে নিজের মুখ চেপে ধরে। সে ভুলে ভুলে আবার চিৎকার করে উঠেছে! নুহাশ ঠোঁট টিপে হাসলো। আলিয়া ভুল করলে তার ভালো লাগে। নুড়ি রান্নাঘরে গিয়ে পদ্মজাকে বললো, ‘ মা,আমি সাহায্য করবো?’পদ্মজা বললো, ‘ না মা,আমি আর তোমার লুতু খালামনি আছি। বই পড়তে বলেছিলাম পড়া হয়েছে?’নুড়ি জিহবা কামড়ে বললো, ‘ আল্লাহ! ভুলে গেছি মা।’‘কতদিন বলেছি,ছুটির দিন পাঠ্য বইয়ের বাইরে অন্য বই পড়তে? ভুলে গেলে চলবে? আমাদের ভালো অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।’নুড়ি মিইয়ে যাওয়া গলায় বললো, ‘আর ভুল হবে না।’পদ্মজা নুড়ির দিকে তাকালো। সবেমাত্র বয়সসন্ধিকালে পা দিয়েছে মেয়েটা। তার ফর্সা সাধারণ মুখশ্রী থুতুনিতে থাকা খাঁচ কাঁটা দাগটির জন্য অসাধারণ হয়ে উঠেছে। মাথায় চুল কোঁকড়া। হাত-পা চিকন চিকন। নুড়ি পদ্মজাকে এভাবে তাকাতে দেখে বিব্রতবোধ করলো। পদ্মজা চোখের দৃষ্টি সরিয়ে বললো, ‘ বাঁদর দুটোকে গিয়ে বল,যদি আমার হাতে মার খেতে না চায় অযু করে জায়নামাযে যেন বসে। এক্ষুনি মাগরিবের আযান পড়বে।’নুড়ি মাথা নাড়িয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। পদ্মজা চোখ ছোট করে বললো, ‘ কী হলো?’‘মা,আমি নামায আদায় করতে পারবো না।’পদ্মজা রেগে কিছু বলতে যাচ্ছিল,তখনই বুঝতে পারলো নুড়ি কেন নামায আদায় করতে পারবে না। সে আমুদে স্বরে বললো, ‘ ও তাহলে আপনি এজন্যই আজ এতো চুপচাপ?’নুড়ি দাঁত বের করে হাসলো। নুহাশ,আলিয়ার চেয়েও নুড়ি বেশি দুষ্ট ৷ রাগ,জেদ খুব বেশি। তবে পদ্মজার সামনে ভেজা বিড়াল। সে আর যাই করুক,পদ্মজাকে কখনো কষ্ট দিতে চায় না। নিজের অজান্তেও না।রাতের খাবার পরিবেশন করার সময় লতিফা বললো, ‘ প্রান্ত কোনদিন আইবো কইছে?’‘আগামী মাসে আসবে। ভাবছি,এইবার গ্রামে গিয়ে প্রান্তর বিয়ে দেব। জমিজমা নিয়েই সারাক্ষণ পড়ে থাকে। ধরেবেঁধে বিয়ে দিতে হবে।’‘বউ কোন এলাকার আনবা?’পদ্মজা হাসলো। বললো, ‘প্রান্ত যা চায়।’ধপাস করে কিছু একটা পড়ে! নুহাশ আর আলিয়া আবার দুষ্টুমি শুরু করেছে। লতিফা বিরক্তি নিয়ে বললো, ‘ ওরা দিন দিন খালি শয়তান অইতাছে।’‘শয়তান বলতে মানা করেছি। আল্লাহর রহমতে আমার ছেলেমেয়েরা আমার গর্ব হবে। আমি টের পাই।’পদ্মজা এই তিন বাঁদর ছেলেমেয়ের মুখে অলৌকিক কী দেখেছে লতিফার জানা নেই। শুধু এইটুকু জানে,এরা তিনজন যেখানে যায় সে জায়গায় তাণ্ডব শুরু হয়ে যায়। লতিফা জোর গলায় বললো, ‘ দেহো পদ্মজা,আমি কিন্তু হুদাই কইতাছি না। দিন দিন আরো বিগড়ে যাইবো।’পদ্মজা লতিফার কথা পাত্তা দিল না। সে খাবার পরিবেশন শেষে ঘরে চলে যায়। একদিন নুহাশ ও আলিয়াকে রাগ দেখিয়ে চলতে হবে। নুহাশ খাবার খেতে এসে বললো, ‘ লুতু খালামনি,মা খাবে না?’লতিফা বললো, ‘না,খাইবো না। তোমরা দুইডায় যেমনে মাস্টারের সামনে পদ্মর মুখ কালা করছো। পদ্ম খাইবো কেন? হে গুসা করছে।’আলিয়া পদ্মজার ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘ তাহলে আমরাও খাব না।’নুড়ি বললো, ‘ তাহলে আরো বেশি রাগ করবে। আরো বেশি কষ্ট পাবে।’মনে ব্যথা নিয়ে মুখ গুমট করে তারা দুজন খেল। খাওয়াদাওয়া শেষ করে তিনজন ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে। পদ্মজা প্রতিদিন ঘুমাবার পূর্বে তাদের গল্প বলে। গত এক মাস ধরে পদ্মজা একটা গল্প বলছে। গল্পটা এক দুষ্টু রাজা ও এক মিষ্টি রানির। ভালোবাসা সত্ত্বেও রানি রাজাকে খুন করে। তারপর রানির কারাদণ্ড হয়। কারাদণ্ড হওয়ার পর কখন মুক্তি পেল? পরের জীবনটা কীভাবে কাটলো? বললো না পদ্মজা। সেটা জানার জন্য তিনটি ছেলেমেয়ে উদগ্রীব হয়ে আছে৷ পদ্মজা বলেছিল আজ বলবে, কিন্তু বলার সুযোগই পেল না। নুহাশ ও আলিয়া রাগিয়ে দিল। নুড়ি দরজা লাগিয়ে নুহাশ ও আলিয়াকে ডাকলো। একত্রে বসার পর নুড়ি বললো, ‘আজ বাবার মৃত্যুবার্ষিকী। তাই কিছু বলার দরকার নেই। কাল সকালে তোরা দুজন মার পায়ে ধরে ফেলবি।’নুড়ি কথা শেষ করে হাত তালি দিল। যেন সব সমস্যা শেষ! নুহাশ ভ্রু কুঁচকে বললো, ‘মা,পা ধরে ক্ষমা চাওয়া পছন্দ করে না।’নুড়ির হাসি মিলিয়ে গেল। আলিয়া বললো, ‘পেয়েছি,আমরা সব বই পড়ে শেষ করে ফেলবো। মা খুশি হবে।’‘বছর পার হয়ে যাবে। মা এক বছর রেগে থাকবে?’ বললো নুড়ি।তারা ঘন্টাখানেক আলোচনা করলো। কোনো পরিকল্পনাই চূড়ান্ত হলো না। একজনের পছন্দ হয় তো অন্যজনের হয় না। হুট করে তারা পদ্মজার গলার স্বর শুনতে পেল। পদ্মজা লতিফাকে বলছে, ‘ লুতু বুবু,বাড়ির বড় বিড়ালদের বলে দাও তাদের ফিসফিসানি শোনা যাচ্ছে।’নুহাশ,নুড়ি ও আলিয়া দ্রুত লেপমুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ে। পদ্মজা মাঝ রাতে নিজ ঘর থেকে বের হয়। লতিফা জেগে ছিল। তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করছে। পদ্মজার সংস্পর্শে এসে তার মুখের আঞ্চলিক ভাষা ছাড়া সব পাল্টে গেছে। রিনুকে বিয়ে দিয়েই সে পদ্মজার সঙ্গী হয়েছে। লতিফা জায়নামাজ ছেড়ে উঠতেই পদ্মজা বললো, ‘ আমি বের হচ্ছি। আমাকে না পেয়ে ওরা যেন বের না হয়৷ আশেপাশের অবস্থা ভালো না। পাশের এলাকায় পর পর দুটো লাশ পাওয়া গেছে। এখানে আবার কোন চক্রান্ত চলছে কে জানে! দরজা বন্ধ করে রেখ।’‘তুমিও যাইয়ো না পদ্ম।’পদ্মজা শুনলো না। প্রথমে ছেলেমেয়েদের ঘরে গেল। নুড়ি ও আলিয়া এক বিছানায় ঘুমাচ্ছে। আর নুহাশ পাশের বিছানায় ৷ পদ্মজা ঘুমন্ত তিন ছেলেমেয়ের কপালে চুমু দিয়ে আলতো করে মুখ ছুঁয়ে দিল। এই তিনটে ফুটফুটে ছেলেমেয়েকে সে ভীষণ ভালোবাসে। তাদের জন্য পদ্মজা নিজের জীবন কোরবান দিতেও প্রস্তুত। জীবনে যতটুকু আনন্দ আছে তার পুরোটা অবদান নুড়ি,নুহাশ আর আলিয়ার। পদ্মজা অনেকক্ষণ বসে রইলো। তারপর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়লো বাইরে। কোয়ার্টার ছেড়ে বের হতেই নিঃসঙ্গতা কামড়ে ধরে তাকে। আমিরের প্রতিটি মৃত্যুবার্ষিকীর রাত সে খোলা আকাশের নিচে কাটায়। চোখ বন্ধ করে অনুভব করে ফেলে আসা স্মৃতিগুলো। এই সময়টুকু একান্ত তার আর আমিরের৷ঘন্টাখানেক হেঁটে এসে এক পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ালো পদ্মজা। এই পাহাড়টি এখানকার সবচেয়ে উঁচু পাহাড়। একটা মই হলেই যেন আকাশ ছোঁয়া যাবে। আকাশের গায়ে লক্ষ লক্ষ তারা জ্বলজ্বল করছে। এর মাঝে কোন তারাগুলো পদ্মজার প্রিয়জন? পদ্মজা এক হাত আকাশের দিকে বাড়িয়ে ভেজা কণ্ঠে উচ্চারণ করলো, ‘আমার প্রিয়জনেরা!’তার এই দুটি শব্দে প্রকাশ পায় ভেতরের সব দুঃখ,যন্ত্রণা, অভাববোধ। মা-বাবা,বোন,স্বামী,শ্বাশুড়ি সবাই আকাশটাতে থাকে। শুধু সে জমিনে রয়ে গেছে। পদ্মজা চোখ বুজলো। সাঁইসাঁই করে বাতাস বইছে। বাতাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ঠান্ডায় শরীরে কাঁটা দিচ্ছে। চোখের পাতায় দৃশ্যমান হয়,হেমলতার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি,রুক্ষমূর্তি, পূর্ণার আহ্লাদ, হাসি,আমিরের ছোঁয়ার বাহানা,বুকে নিয়ে কান্না থামানো। কত সুন্দর অতীত! কতোটা সুন্দর! পদ্মজা চোখ খুললো। তার ঘোলা দুটি চোখ জলে ভরে উঠেছে। সে শিশির ভেজা ঘাসের উপর বসলো। দিনটা কেটে যায়, রাতটা তার কাটে না। আমির শয়নেস্বপনে রাজত্ব করে। পদ্মজা অসহায় চোখ দুটি মেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ করে যদি তার স্বামীর মুখটা ভেসে উঠতো! কেমন আছে সে? পদ্মজার দুই চোখ বেয়ে জলের ধারা নামে। নীরবে কাঁদতে থাকে। কী ভীষণ অসহায় দেখাচ্ছে তাকে! দিনের আলোয় দেখা কঠিন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, রাগী পদ্মজা রাতের বেলায় এমন অসহায় হয়ে কাঁদে কেউ বিশ্বাস করবে? করবে না।পদ্মজা হাঁটুতে মুখ গুঁজে স্মৃতি হাতড়ে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ সে কারো উপস্থিতি টের পেল। তার দিকে কেউ হেঁটে আসছে। গত দুই সপ্তাহে দুটো খুন হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে পাশের এলাকায়। এলাকাটি খুব কাছে। লাশের ছবি দেখে বুঝা গেছে,কেউ বা কারা দেশে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করছে৷ সেই সাথে লাশের শরীরের ক্ষতস্থান দেখে মনে হয়েছে,হত্যাকারী বা হত্যাকারীরা শয়তানের উপাসনা করে। পদ্মজার মস্তিষ্ক সক্রিয় হয়। সে তার কোমরের খাঁজে থাকা খাপ থেকে ছুরি বের করলো। তারপর দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালো। দেখলো নুড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে কালো বোরকা। নুড়িকে দেখে পদ্মজা অবাক হয়। সেকেন্ড কয়েকের মধ্যে অবাকের ছাপটা মুখ থেকে সরেও গেল। নুড়ি প্রায় সময় তাকে অনুসরণ করে। সে পদ্মজাকে একা ছাড়তে নারাজ। পদ্মজা ঘাসের উপর বসতে বসতে বললো, ‘ পিছু নিতে না করেছিলাম।’নুড়ি কিছু বললো না। পদ্মজাও চুপ রইলো। নুড়ি ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো। নুহাশ ও আলিয়া দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চেয়েও দূরে দাঁড়িয়ে আছে লতিফা। লতিফা নুড়িদের আটকানোর চেষ্টা করেছে৷ কিন্তু বাঁদরদের সে আটকে রাখতে পারলো না। পারে তো তারা লতিফার হা-পা বেঁধে ফেলে। নুড়ি সাবধানে ডাকলো, ‘মা?’পদ্মজা দূরে চোখ রেখে নির্বিকার কণ্ঠে বললো, ‘ বল।’‘বাবার জন্য কাঁদছিলে?’পদ্মজা নিরুত্তর। নুড়ি সময় নিয়ে দ্বিধাভরে জিজ্ঞাসা করলো, ‘ দুষ্টু রাজাটা বাবা আর মিষ্টি রানীটা তুমি তাই না আম্মা?’পদ্মজা চমকে তাকালো। অপলকভাবে তাকিয়েই রইলো। নুড়ি কী করে জানলো,তাদেরকে বলা গল্পটি তাদেরই মায়ের গল্প! নুড়িকে দেখলে মনে হয় না,সে যে পদ্মজা ও আমির হাওলাদারের নিজের মেয়ে নয়। নুড়ির চোখের দৃষ্টি ঈগলের মতো। যেমন চঞ্চল তেমন সাহস। সে ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আশেপাশে যা কিছুই ঘটুক সর্বপ্রথম তার চোখে ধরা পড়ে। পদ্মজা নুড়ির প্রশ্ন এড়িয়ে চুপচাপ বসে রইলো। নুড়ি সংকোচ নিয়ে বললো, ‘ মা,তুমি সোয়েটার পরোনি। ঠান্ডা লাগবে।’পদ্মজা খাপে ছুরি রেখে বললো, ‘ নুহাশ আর আলিয়াও এসেছে?’নুড়ি মাথা ঝাঁকালো। পদ্মজা নুড়িকে নিয়ে নিচে নেমে আসে। নুহাশ ও আলিয়ার সামনে এসে তিনজনের উদ্দেশ্যে বললো, ‘সাহসী সঠিক সময়ে হতে বলেছি। এই রাতের বেলা ঝুঁকি নিয়ে মায়ের পিছু নিতে নয়।’লতিফা এগিয়ে এসে বললো, ‘ তোমারে লইয়া হেরা চিন্তাত আছিলো। খুনটুন যে হইলো গত সপ্তাত এর লাইগগা।’পদ্মজা ভ্রু উঁচিয়ে বললো, ‘ তাহলে ওরা আমাকে বিপদের হাত থেকে বাঁচাতে এসেছে?’নুড়ি,নুহাশ ও আলিয়া ভয়ে একজন আরেকজন চাওয়াচাওয়ি করলো। পদ্মজা হেসে তিনজনকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে বললো, ‘ আমার সাহসী বাচ্চারা! কিন্তু এতো রাতে আসা একদম ঠিক হয়নি। হ্যাঁ আমারও ঠিক হয়নি। আমরা কেউই আর ভুল করবো না। ঠিক আছে?’তিনজন সমস্বরে বললো, ‘ঠিক আছে মা।’পদ্মজা তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে পাহাড় ছেড়ে সমতলে নামে। পথে আলিয়া বললো, ‘মা,একটা কথা বলবো।’পদ্মজা আদুরে স্বরে বললো, ‘বলো বাবা।’‘মজনু স্যার রূপকথা দিদিকে কিছু বলেছে মনে হয়।’পদ্মজার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। মজনু তার স্কুলেরই একজন শিক্ষক। নবম ও দশম শ্রেণির ছাত্রীদের বাংলা পড়ায়। তার নামে অনেক অভিযোগ আছে। ছাত্রীদের হ্যারাস করে। শরীরে বিভিন্ন অজুহাতে হাত দেয়। বিয়ে করেছে দুটি। অনেক মেয়ে মজনুর জন্য স্কুলে আসা ছেড়ে দিয়েছে। তারা কিছু বলতেও পারে না,সইতেও পারে না। মাস ছয়েক আগে স্কুলের এক মেয়ে দাবি করেছে,সে গর্ভবতী। মজনু তাকে ভয় দেখিয়ে অনেকবার শারিরীক সম্পর্ক করেছে। মজনু অস্বীকার করে। উল্টো সমাজে মেয়েটির বদনাম হয়। তাকে আর স্কুলে দেখা যায়নি। পদ্মজা সত্যতা নিশ্চিত করার জন্য মেয়েটিকে খুঁজেছে। কিন্তু পেল না। তার পরিবারকেও পেল না। মজনু পদ্মজার সাথে ঘেঁষার চেষ্টাও করেছে অনেকবার। চরিত্রহীন,লম্পট পুরুষ সে। পদ্মজা কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ পাঠিয়েছিল,লাভ হয়নি। মজনু সিলেটের এমপি সুহিন আলমের শালা। এজন্যই পদ্মজার অভিযোগ গ্রহণযোগ্য হয়নি। এমনকি সেই মেয়েটির পরিবার নাকি মামলা করেছিল,সেই মামলাও ধামাচাপা পড়ে যায় সুহিন আলমের ক্ষমতার কাছে। তাই মজনুর নাম উঠতেই পদ্মজা বিচলিত হয়ে উঠে। বললো, ‘কেন এমন মনে হলো?’নুড়ি মাথা নিচু করে বললো, ‘রূপকথা দিদিকে ডেকেছিল মনে হয়। অনেকক্ষণ পর দিদি দ্বিতীয় ভবন থেকে বের হয়। তখন দিদি কাঁদছিল। দিদির চুল ঢোকার সময় খোঁপা ছিল বের হওয়ার সময় এলোমেলো ছিল।’আলিয়া বললো, ‘আমি আর নুড়ি আপা রূপকথা দিদিকে টিফিন টাইমে জাম গাছের পিছনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে দেখেছি মা।’পদ্মজা তাদের মেয়েদের আশ্বস্ত করলো। বললো,সব ঠিক হয়ে যাবে। সারা রাত পদ্মজা এ নিয়ে ভেবেছে। মজনুকে আর সহ্য করা যায় না। মেয়েগুলোর জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলোকে দূষিত করে ফেলছে! আবর্জনা বেশিদিন রাখা ঠিক হচ্ছে না। চারপাশে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে! পরদিনই স্কুলে গিয়ে পদ্মজা রূপকথাকে ডেকে পাঠালো। রূপকথা হিন্দু ধর্মালম্বী। খুব সুন্দর মেয়ে। রূপকথার ধর্মের ভাষায় বলা যায়, সে দেবীর মতো সুন্দর! নবম শ্রেণিতে পড়ে। রূপকথা পদ্মজার সামনে এসে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়ালো। পদ্মজা রূপকথাকে পরখ করে বললো, ‘তোমাকে ভীষণ হতাশাগ্রস্ত আর ভীতগ্রস্ত দেখাচ্ছে। আমাকে তোমার সমস্যা খুলে বলতে পারো।’রূপকথা পদ্মজার কথায় অপ্রতিভ হয়ে উঠলো। পদ্মজা চেয়ার ছেড়ে রূপকথার পাশে এসে দাঁড়ায়। রূপকথার মাথায় হাত রেখে বললো, ‘ মনের মাঝে চেপে রেখো না। কষ্ট লুকিয়ে রাখতে নেই। হাতের মুঠোয় এনে চেপে ধরে ধ্বংস করে দিতে হয়।’রূপকথা পদ্মজার সংস্পর্শে আজ প্রথম এসেছে। পদ্মজাকে প্রতিটি ছাত্রছাত্রী সম্মান করে,ভালোবাসে। তার ব্যবহার এবং সৌন্দর্য দুটোই সবাইকে অভিভূত করে ফেলে। অনেকে বলে পদ্মজার শরীরে তারা নাকি মা মা গন্ধ খুঁজে পায়। রূপকথাও পাচ্ছে। সে কেঁদে ফেললো। পদ্মজা রূপকথার মুখটা উঁচু করে ধরলো। বড়,বড় আঁখি তার। লাল টুকটুকে গাল,জোড়া ভ্রু। এমন সুন্দর মেয়ে কাঁদতে পারে! পদ্মজা বললো, ‘ মজনু স্যার কী বলেছে তোমাকে? আমাকে বলো। ‘রূপকথা অনেক কষ্টে কান্না আটকে বললো, ‘ আমার মা-বাবা নেই। জ্যাঠা জ্যাঠামির কাছে থাকি। ঠাম্মার কথায় জ্যাঠা আমাকে পড়াচ্ছে৷ দিঘীপাড়ার সতেন্দ্র বাবু আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছেন। জ্যাঠা বলেছে,পরীক্ষায় যদি ফেইল করি আমাকে বিয়ে দিয়ে দিবে।’পদ্মজা জানতে চাইলো, ‘সতেন্দ্র বাবু মানে দিঘীপাড়ার মোড়ের মধু ব্যবসায়ী ?’‘হু।’‘উনি তো তোমার দাদার বয়সী। আর যেহেতু তোমার জ্যাঠা বলেছে, ফেইল করলে বিয়ে দিয়ে দিবে। তাহলে পাস করার চেষ্টা করো।’রূপকথার কান্না বাড়লো। পদ্মজা বুঝতে পারলো,এখানে আরো ঘটনা আছে। সে কোমল কণ্ঠে বললো, ‘লক্ষী মেয়ে,সবটা বলো আমাকে।’রূপকথা বললো, ‘ মজনু স্যার বলেছেন,উনার সাথে প্রেম না করলে আমাকে ফেইল করিয়ে দিবেন। উনার সাথে যেন প্রেম করি। আমি ভয় পেয়ে যাই। আমি জানি না প্রেম কীভাবে করে। উনি যখন আমাকে ডাকেন,আমি যাই। আমাকে অনেক কষ্ট দেয়। শরীরে হাত দেয়। আমার ভালো লাগে না৷ রাতে ঘুমাতে পারি না। ঠাম্মাকে বলছি,ঠাম্মা বলছে স্যার যা বলে শুনতে। তাহলে বেশি মার্ক পাবো। স্যার গত পরশু আমাকে বলছে,আমি আজ যেন স্যারের সাথে ঘুরতে যাই।’রূপকথা কাঁপছে। হেঁচকি তুলে কাঁদছে। অনাথ মেয়েটা! মা-বাবার আদর ছাড়া বড় হয়েছে। আপন দাদি সমস্যা শুনে বলেছে,স্যার যা বলে শুনতে। এতে নাকি বেশি মার্ক পাবে! কেমন মানসিকতা! আজ ঘুরতে গিয়ে জানোয়ারটা মেয়েটার কতবড় ক্ষতি করে ফেলবে কে জানে! মজনু সেই অভাগী মেয়েটিকেও কি এভাবে ভয় দেখিয়ে কাছে টেনেছিল? পদ্মজা রূপকথাকে বুকের সাথে চেপে ধরে। পদ্মজার গায়ের মিষ্টি ঘ্রাণে রূপকথা ডুবে যায়। মনে হচ্ছে,সে তার মাকে জড়িয়ে ধরেছে। তার কান্নার বেগ বাড়ে। পদ্মজা রূপকথার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, ‘ এই ব্যাপারে আর কাউকে কিছু বলো না। আজ বাড়ি চলে যাও।’স্কুল ছুটির পর পদ্মজা মজনুর পিছু নেয়। মজনু তার বাসায় না গিয়ে সিলেট বোরহান উদ্দিন মাজারের পাশের এলাকায় গেল। পদ্মজাও সেখানে গেল। মজনু বার বার হাতের ঘড়ি দেখছে। বুঝা যাচ্ছে, সে কারোর জন্য অপেক্ষা করছে। পদ্মজা একটা সাদা বিল্ডিংয়ের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রায় চল্লিশ মিনিট পর তাদের স্কুলের জামা পরা একটা মেয়ে মজনুর সাথে দেখা করতে আসে। পদ্মজা ঘৃণায় কপাল কুঞ্চিত করলো। মজনু পড়ানোর জন্য নয় সুযোগ ব্যবহার করে মেয়েদের ভোগ করার জন্য শিক্ষক হয়েছে। শিক্ষক কখনো লম্পট হয় না,লম্পটরা শিক্ষকের মুখোশ পরে। পদ্মজা পর পর তিনদিন সাবধানে মজনুকে অনুসরণ করে নিশ্চিত হয়েছে,মজনু রাতে ঘুমাবার পূর্বে বাইরে টং দোকানে চা খেতে যায়। তারপর সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে বাড়ি ফিরে। রাস্তার দুই পাশে ঝোপজঙ্গল।এটা মজনুর প্রিয় অভ্যাস হতে পারে। রূপকথা তিনদিন পদ্মজার কথায় স্কুলে আসেনি। চতুর্থ দিন শেষে রাত আটটায় পদ্মজা একখানা বড় লাগেজে একটি বড় ধানের বস্তা ও রাম দা নিল। খুলে নিল নিজের কানের দুল। শরীরে এমন কিছু রাখলো না,যা প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগতে পারে। কাঁধের ব্যাগে নিল বোরকা ও রুমাল । তারপর নতুন শাল দিয়ে মাথা ঢেকে বেরিয়ে পড়লো।রাত ঠিক দশটা বাজে তখন। চারিদিকে সুনসান নীরবতা। ঠান্ডা বাতাস বইছে। মাঝেমধ্যে শেয়ালের ডাকও শোনা যাচ্ছে। মজনু সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে গুনগুন করে গান গেয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছে৷ হাঁটছে হেলেদুলে। আশেপাশে গাছপালা বেশি। রাস্তার দুই ধারের ঝোপজঙ্গল গাঢ় অন্ধকারে ঢাকা। দূরে ল্যাম্পপোস্টের আলো নিভু নিভু হয়ে জ্বলছে। এদিকটায় মানুষজন তেমন আসে না।পদ্মজা রাম দা নিয়ে একটা বড় গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। তার লাগেজ ও কাঁধ ব্যাগটি কিছুটা দূরে রাখা। সে তীক্ষ্ণ চোখ দুটি মেলে অপেক্ষা করছে মজনুর জন্য। চোখ দুটি যেন জ্বলজ্বল করছে। তার নিঃশ্বাসেও যেন ছন্দ রয়েছে। শরীর ঠান্ডা করা ছন্দ! আর সেই ছন্দে আছে প্রলয়ঙ্কারী ঝড়ের পূর্বাভাস! মজনুর দেখা মিলতেই পদ্মজা চাপাস্বরে ডাকলো, ‘ স্যার…স্যার।’যেন অশরীরী ডাকছে। মজনুর একটু ভয় করলেও উৎসুক হয়ে ডানে তাকালো। জঙ্গল থেকে কে ডাকছে! মজনু উঁচু স্বরে প্রশ্ন করলো, ‘কে?’‘আমি স্যার…’কণ্ঠস্বরটা চেনা মনে হচ্ছে। তবে কেমন যেন ভূতুড়ে এবং ভারী! মজনু হাতের সিগারেট ফেলে দুই পা এগিয়ে গেল। বললো, ‘আমিটা কে?’‘আমি পদ্মজা।’(সমাপ্ত)
লাইলী প্রতিদিন খবরের কাগজে চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে। মনের মত পেলে সেখানে দরখাস্ত করে। কয়েক জায়গায় ইন্টারভিউও দিয়েছে। কিন্তু চাকরি হয়নি। তার মনে হয়েছে, বোরখা পরে যাই বলে চাকরি হয়নি। বোরখা না পরে গেলে তার রূপ দেখে নিশ্চয় হত। একদিন কাগজে চিটাগাং-এ একটি নূতন অফিসের জন্য একজন ষ্টেনো দরকার। মহিলারাও দরখাস্ত করতে পারে। এক কপি পাশপোর্ট সাইজ ছবি ও বায়োডাটাসহ স্বহস্তে লেখা দরখাস্ত চেয়েছে। লাইলী অনেক চিন্তা ভাবনা করে বোরখা পরে শুধু মুখটা খোলা রেখে ফটো তুলে বায়োডাটাসহ সেখানে দরখাস্ত পাঠাল। তার হাতের লেখা খুব ঝরঝরে ও অতি সুন্দর। এর মধ্যে সে সর্টহ্যাণ্ড ও টাইপ শিখেছে।অফিসের ম্যানেজার একটি পদের জন্য দেড়শত ছেলে মেয়ের দরখাস্ত দেখে হাঁপিয়ে উঠলেন। কি করবেন ঠিক করতে না পেরে প্রথমে হাতের লেখা দেখতে লাগলেন। কয়েকটা দেখার পর লাইলীর ফটো ও হাতের লেখা দেখে অবাক হয়ে চিন্তা করলেন, আল্লাহপাক মেয়েটিকে যেমন রূপ দিয়েছেন তেমনি হাতের লেখাও বটে। এরপর তিনি আর কোনো দরখাস্ত দেখলেন না। লাইলীকে ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠালেন। এই অফিসটা সেলিমদের। সে এটা উদ্বোধন করার পর এ্যাকসিডেন্ট করে। তারপর অনেক দিন বন্ধ ছিল। সোহানা বেগম যখন সেলিমকে নিয়ে তার চিকিৎসার জন্য সুইজারল্যাণ্ড গেলেন তখন তিনি চিটাগাং এর অফিস চালু করার জন্য ম্যানেজারকে বলে যান। তাঁরই নির্দেশে ম্যানেজার সাহেব কয়েকদিন আগে আবার অফিস খুলেছেন। অনেক লোক আগেই এপয়েন্টমেন্ট হয়ে কাজ করেছে। কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় একজন ষ্টেনোর দরকার হয়ে পড়ে। তাই কাগজে বিজ্ঞাপন দেন। যেদিন সোহানা বেগম লাইলীকে পূত্রবধূ করার কথা ফাংশানে ঘোষণা করেন, সেদিন ম্যানেজার মিটিং এ থাকলেও শরীর খারাপ থাকায় ফাংশান শুরু হওয়ার আগেই চলে যান। সেদিন তিনি লাইলীকে দেখেননি। তাই আজ তার ফটো দেখে তাকে চিনতে পারলেন না। কিন্তু তার মরা মেয়ের সঙ্গে প্রায় হুবহু মিল দেখে অবাক হয়ে গেলেন। ইন্টারভিউ এর দিন চুরুট ধরিয়ে লাইলীর ফটোর সঙ্গে নিজের মেয়ের মিল দেখছিলেন।লাইলী চীটাগাং এসে মাকে হোটেলে রেখে নির্দিষ্ট সময়ে ইন্টারভিউ দিতে গেল। অফিসে পৌঁছে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে ম্যানেজারের রুমের দিকে এগোল।দরজার বাইরে টুলে পিয়ন বসেছিল। একজন বোরখা পরা মেয়েকে এগিয়ে আসতে দেখে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি ইন্টারভিউ দিতে এসেছেন? ম্যানেজার সাহেব পিয়নকে বলে রেখেছেন, একজন বোরখা পরা মহিলা ইন্টারভিউ দিতে আসবেন। আসলে তাকে ভিতরে পাঠিয়ে দিও।পিয়নের কথা শুনে লাইলী বলল, জ্বি।পিয়ন বলল, আপনি ভিতরে যান।দরজায় ভারী পর্দা ঝুলছে। লাইলী পর্দা ফাঁক করে দেখল, একজন বয়স্ক ভদ্রলোক চেয়ারে বসে চুরুট টানছে। লাইলী বলল, মে আই কাম ইন স্যার? বলা বাহুল্য সে তখন মুখের নেকাব সরিয়ে দিয়েছে।ম্যানেজার সাহেব লাইলীর কণ্ঠস্বর শুনে চমকে উঠে তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। একটা মেয়ে যে আসবার অনুমতি চাচ্ছে, সেকথা ভুলে গেলেন।ভদ্রলোককে তার দিকে ঐভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে লাইলীর মনে হল লোকটা যেন অবিশ্বাস্য কিছু দেখছে। সে খুব অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। কোনো রকমে আবার বলল, “মে আই কাম ইন স্যার”?এবার ম্যানেজার সাহেব স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন, অফকোর্স। এস মা এস, আমি তোমারই জন্য অপেক্ষা করছি। লাইলী ভিতরে এলে তাকে সামনের চেয়ার দেখিয়ে বললেন, বস। তারপর প্রশ্ন করলেন, তুমি চাকরি করতে চাও কেন?লাইলী বলল, দেখন, এটা একান্ত ব্যক্তিগত প্রশ্ন। তার উপর আমি মেয়েছেলে। এরকম প্রশ্ন শুধু পিতৃস্থানীয় ব্যক্তি করতে পারেন। চাকরির ইন্টারভিউতে এরকম প্রশ্ন হবে জানলে আসতাম না। আপনার অফিসে ষ্টেনো দরকার। সে কাজের উপযুক্ত কিনা পরীক্ষা করতে পারেন। ব্যক্তিগত ব্যাপারে প্রশ্ন করলে ফিরে যাব।এতক্ষণ ম্যানেজার সাহেব চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে চুরুট টানতে টানতে সব কথা শুনছিলেন। লাইলী থেমে যেতে সোজা হয়ে বসে তার দিকে চেয়ে বললেন, তুমি একদম ছেলেমানুষ। চাকরির ইন্টারভিউ দিতে এসে এরকম কড়া কড়া কথা বললে কোথাও তোমার চাকরি হবে না। যাক, যা জানার তা জানা হয়ে গেছে। এখন তোমার কথায় ফিরে আসি। তুমি একটু আগে বলেছ, ব্যক্তিগত ব্যাপারে পিতৃস্থানীয় লোক প্রশ্ন করতে পারে। আমি নিজেই সে স্থান দখল করে কয়েকটি কথা জিজ্ঞেস করছি। দরখাস্তে তোমার পিতার নামের আগে লেট লেখা দেখে বুঝেছি তিনি নেই। তোমার কি আর কেউ গার্জেন নেই?লাইলী কয়েক সেকেণ্ড ম্যানেজারকে বুঝবার চেষ্টা করল। তারপর যখন মনে হল লোকটার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই তখন বলল, শুধু মা আছেন। চাচা একজন আছেন। তাদের সঙ্গে ঐ ব্যক্তিগত কারণে অনেক দিন থেকে মনোমালিন্য। বড় এক ভাই ছিল, আল্লাহপাক তাকেও দুনিয়া থেকে তুলে নিয়েছেন। আপনি হয়তো ভাবছেন, লাক্সারী করার জন্য আমি চাকরি করতে চাইছি। আমাকে দেখে কি সে রকম ভাবতে পারছেন? দেখুন, সত্যিই আমার একটা চাকরি খুব দরকার। আর ইন্তেকালের পর মায়ের শরীর খুব ভেঙ্গে পড়েছে। আব্বা চাকরি করতেন। হার্টের অসুখে হঠাৎ করে মারা গেছেন। ঢাকায় শুধু আর পৈত্রিক চার কামরা ঘর আছে। অনেক চিন্তাভাবনা করে চাকরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। হঠাৎ লাইলী লক্ষ্য করল, লোকটার চোখ অশ্রুতে ঢল ঢল করছে। নিজের দুঃখের কথা এতক্ষণ বলছিল, কোনো দিকে তার খেয়াল ছিল না। তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করল, আপনার চোখে পানি কেন? কিছু পড়েছে নাকি?ম্যানেজার সাহেব রুমাল বার করে চোখ মুছে বললেন, চোখে কিছু পড়েনি মা, মনে কিছু পড়েছে। আমার একটা মেয়ে ছিল, বেঁচে থাকলে আজ ঠিক তোমার মতো এত বড় হত। পনের বছর বয়সে ম্যানেনজাইটীস হয়ে মারা গেছে। দরখাস্তের সঙ্গে তোমার ফটো দেখে আমার মেয়ের কথা মনে পড়ে। তার গড়ন ছিল ঠিক তোমার মতো। এখন তোমার কথাশুনে মনে হচ্ছে, তার গলার স্বরও তোমার মতো। প্রথমে তোমার গলার আওয়াজ শুনে মনে হয়েছিল, ছয় বছর পর মেয়ের গলা শুনছি। তবে সে তোমার মত এতো সুন্দরী ছিল না। তারপর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তুমি আগামীকাল থেকে জয়েন কর। কালকেই তোমাকে এপয়েন্টমেন্ট লেটার দিয়ে দেব।ম্যানেজারের কথা শুনে লাইলীর চোখও পানিতে ভরে গেল। উঠে গিয়ে তার পায়ে হাত দিয়ে কদমবুসি করে বলল, আমাকে চিরদিন মেয়ের মতো মনে করবেন।এবারও ম্যানেজার সাহেব চোখের পানি রোধ করতে পারলেন না। তার মাথায় হাত রেখে ভিজে গলায় বললেন, বেঁচে থাক মা, সুখী হও। আল্লাহ তোমার মনের বাসনা পূরণ করুন।অফিস থেকে বেরিয়ে আনন্দে লাইলীর মনটা ভরে গেল। চাকরিটা হয়ে যাবে সে ধারণাই করতে পারেনি। হোটেলে ফিরে মাকে শুভ সংবাদটা দিল। দুপুরে খেয়ে দেয়ে মাকে বিশ্রাম করতে বলে বান্ধবী সুলতানার বাসার ঠিকানাটা নিয়ে তার খোঁজে বেরিয়ে পড়ল।যেদিন সোহানা বেগম বিয়ে ভেঙ্গে দিয়ে লাইলীদের চিঠি দেন, সেইদিন সুলতানার সঙ্গে তার খালাত ভাই খালেদের বিয়ে হয়। সুলতানা নিজে তাদের বাড়িতে দাওয়াত দিতে এসে সেলিমের সঙ্গে ওর বিয়ের কথা শুনে যায়। লাইলীরজীবনে এরকম বিপর্যয় ঘটে গেল বলে সে বিয়েতে যেতে পারেনি।বিলেত থেকে এফ, আর, সি, এস, ডিগ্রী নিয়ে এসে খালেদ চিটাগাং মেডিকেল কলেজে মেডিসিনের প্রফেসার পদে জয়েন করেছে। বিয়ের দুদিন পর ছুটি না থাকায় সুলতানাকে নিয়ে স্টাফকোয়ার্টারে নিজের বাসায় চলে এসেছে। কয়েকদিন পর সুলতানা লাইলীকে অভিযোগ করে চিঠি দিয়েছে। কিন্তু লাইলী নানান দুর্ভাবনায় সে চিঠির উত্তর দিতে পারেনি।ঠিকানামতে গিয়ে লাইলী দরজায় নক করল।সবেমাত্র সুলতানা স্বামীর সঙ্গে খেয়ে উঠে পান চিবুচ্ছে। আর খালেদ বিছানায় আড় হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। এক্ষুণি তাকে আবার চেম্বারে গিয়ে বসতে হবে। দরজায় নক হতে সুলতানাকে বলল, দেখ তোমার কোনো পড়শীনি হয়তো এসেছে। আমি ততক্ষণ পোশাক পরে নেই।সুলতানা দরজা খুলে লাইলীকে দেখে অবাক হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল, তারপর তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, সই তুই? এতদিন পরে বুঝি আমাদের কথা মনে পড়ল? বিয়েতে তুই যখন এলি না, এমন কি চিঠির উত্তরও দিলি না তখন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, জীবনে তোর সঙ্গে কখনো কথা বলব না। কিন্তু তোর মধ্যে কি যাদ আছে, তোকে দেখে সে প্রতিজ্ঞা ঠিক রাখতে পরলাম না। তারপর তাকে ছেড়ে দিয়ে হাত ধরে বলল, আয় ভিতরে আয়। তোর সয়ার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। ঘরের ভিতরে এসে সুলতানা স্বামীর উদ্দেশ্যে বলল, দেখবে এস কে এসেছে? যদি বলতে পার, তা হলে মিষ্টি খাওয়াব?খালেদ পাশের রুমে পোশাক বদলাচ্ছিল। এ ঘরে এসে এক অচেনা সুন্দরী মেয়েকে দেখে প্রথমে লজ্জায় থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। চিন্তা করল, আশ-পাশের মেয়ে হলে এভাবে সুলতানা তাকে ডাকত না। হঠাৎ কিছু মনে পড়ায় লাইলীকে ভালভাবে দেখল। তারপর লজ্জা মিশ্রিত মৃদু হাসি দিয়ে “আসসালামু আলাইকুম” বলে বলল, আপনি নিশ্চয় লাইলী।লাইলীও মিষ্টি হেসে সালামের জওয়াব দিয়ে বলল, আপনি ঠিক বলেছেন। কিন্তু আপনি আমাকে চিনলেন কি করে?লাইলী আরজুমন বানু এদেশে একজনই আছেন। তাকে কাউকে চিনিয়ে দিতে হয় না, তিনি নিজেই সকলের কাছে পরিচিত। বিলেতে থাকতে এবং বিয়ের পর থেকে আপনার কথা ওর কাছে এত বেশি শুনেছি যে, আপনাকে দেখেই চিনে ফেললাম।লাইলী সুলতানাকে বলল, তুই তো সয়ার কাছে হেরে গেলি, এখন মিষ্টি খাওয়া।তাতো খাওয়াবই, কিন্তু তুই একলা কেন? সেলিম আসেনি? তুই অত রোগা হয়ে গেছিস কেন?খালেদ বলল, তোমরা দুজনে বসে গল্প কর, আমার সময় নেই, চলি। তারপর লাইলীর দিকে চেয়ে বলল, আমি না আসা পর্যন্ত আপনি যাবেন না কিন্তু।সুলতানা বলল, বারে আমার সই এল, তার খাতির যত্ন না করে তুমি যে বড় চলে যাচ্ছ?এখন আমার একটা ইমারজেন্সী কল আছে। ময়নার মাকে দিয়ে যা দরকার আনিয়ে নিও। আমি যত তাড়াতাড়ি পারি ফেরার চেষ্টা করব।খালেদ বেরিয়ে যেতে সুলতানা লাইলীকে জিজ্ঞেস করল, ভাত খাবি?না এক্ষুণি খেয়ে এসেছি। আমি এখন কিছু খাব না, তুই তাড়াহুড়ো করছিস কেন? আমি কী তোদের কাছে খেতে এসেছি?সুলতানা তবু শুনল না। ময়নার মাকে ডেকে দু’গ্লাস লক্ষ্মী তৈরী করে আনতে বলল। তারপর লাইলীকে বলল, তোর কি ব্যাপার বলতো? এমন শুকিয়ে গেছিস কেন? তোকে দেখে আমার কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে।লাইলী বলল, তোর সন্দেহ ঠিক। তারপর সেলিমের এ্যাকসিডেন্ট, বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়া এবং বাপের মৃত্যু থেকে আজ পর্যন্ত সব ঘটনা খুলে বলল।শুনতে শুনতে সুলতানার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল। চোখ মুছে বলল, কি করবি ভাই? জানিস তো সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছা। তাঁর বাণী স্মরণ করে সবুর কর। তিনি নিশ্চয় একদিন সবুরের ফল দেবেন। তুই বেশি চিন্তা করিসনা। খালা আম্মাকে নিয়ে একদম আমার এখানে উঠলেই পারতিস। চল যাই, তোদের মালপত্র আর খালাআম্মাকে এখানে নিয়ে আসি।লাইলী বলল, সে কি করে হয়? তোদের অসুবিধে হবে। তা ছাড়া সয়া কিছু মনে করতে পারে?দেখ, তোকে অত চিন্তা করতে হবে না। দেখছিস না, দু-দুটো ঘর খালি পড়ে রয়েছে।তা হয় না রে, তার চেয়ে সয়াকে বলিস, তোদের কাছাকাছি একটা বাসা দেখে দিতে।ঠিক আছে তাই হবে। এখন নাস্তা খেয়ে চল, সব কিছু এখানে নিয়ে আসি। যতদিন না বাসা ঠিক হচ্ছে ততদিন এখানে থাকবি। তোর সয়া শুনলে খুব খুশি হবে। সুলতানা লাইলীর কোনো বাধা শুনল না। তাকে সঙ্গে নিয়ে হোটেলে গিয়ে খালা আম্মাকে সালাম করে তাদেরকে নিয়ে চলে এল।খালেদ ফিরে এসে স্ত্রীর কাছে সব কিছু শুনে খুব দুঃখ প্রকাশ করল। লাইলীরা এখানে এসেছে দেখে খুশি হল।পরের দিন থেকে লাইলী নিয়মিত অফিস করতে লাগল।সুলতানা ও খালেদ তাদেরকে এখানেই থাকতে বলল। লাইলী কিছুতেই রাজি হল না। শেষে ওদের বাসার কাছাকাছি একটা বাসা ঠিক করে দিল।দুমাস হতে চলল লাইলী চাকরি করছে। সে বোরখা পরেই অফিস করে। সব সময় তার মুখ নেকাবে ঢাকা থাকে। যখন সে ম্যানেজারের কাছে একা থাকে তখন শুধু মুখ ভোলা রাখে। তাকে সে চাচার আসনে বসিয়েছে। তার অনুরোধে মাঝে মাঝে লাইলীকে তাদের বাসায় যেতে হয়। ওঁর স্ত্রীও লাইলীকে মেয়ের মত স্নেহ করেন। তাদের বাড়িতে তারা থাকতে বলেছিলেন, কিন্তু সে রাজি হয়নি।অফিসে মোট পনের জন লোক কাজ করে। তাদের কেউ আজ পর্যন্ত লাইলীর মুখ দেখেনি। অনেকে তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে বিফল হয়েছে। একজন মেয়ে পিয়ন আছে, তার কাছ থেকে অফিস ষ্টাফরা শুনেছে, ষ্টেনো মেয়েটা অপূর্ব সুন্দরী। তারা অনেক চেষ্টা করেছে তাকে দেখতে এবং তার সঙ্গে আলাপ করতে; কিন্তু পারেনি। ছুটির পর লাইলী যখন অফিস থেকে বের হয় তখন অফিস গেটের বাইরে রাস্তায় কলিগরা তাকে দেখে নানা রকম মন্তব্য করে। একদিন একজন তাকে শুনিয়ে সঙ্গীদের বলল, উনি যদি পর্দা মেনে চলেন তবে চাকরি করতে এসেছেন কেন? একজন পীরসাহেবকে বিয়ে করে অসুস্পশ্যা হয়ে থাকতে পারতেন। রূপসী বলে কলিগদের সঙ্গে কি মেলামেশা করতে নেই? মেয়েদের এত অহংকার থাকা ভালো না। এরপরও লাইলীর কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে শেষে আংগুর ফল টক ভেবে তারা ইতি টেনেছে।লাইলী তাদের কথায় একটু মনে ব্যথা পেলেও কাউকে কিছু বলেনি। সে ভাবে, তাদেরকে দোষ দেওয়া যায় না। আজকাল কয়টা মেয়ে পর্দা করে চাকরি করে? সে তাদের বিরুদ্ধে কোনোদিন ম্যানেজার সাহেবকেও কিছু বলেনি। যদিও সে জানে, ম্যানেজারকে বলে দিলে তারা আর কোনোদিন তার পিছু লাগবে না।এদিকে সুইজারল্যাণ্ডে দীর্ঘ ছয়মাস চিকিৎসার পর সেলিম স্মৃতিশক্তি ও বাকশক্তি ফিরে পেল। সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর মায়ের কাছে এ্যাকসিডেন্টের কথা শুনে জিজ্ঞেস করল, আমাদের বিয়ে তা হলে হয়নি?লাইলীর কথা শুনে যদি ছেলের আবার কিছু হয়ে যায়? সেই কথা চিন্তা করে সোহানা বেগম বললেন, সে সব ঠিক আছে, দেশে ফিরে সব কিছু জানতে পারবে।ও নিয়ে তুমি এখন কোনো চিন্তা করো না। মনে রেখ, তুমি একসিডেন্ট করে আজ ছয়মাস স্মৃতিশক্তি ও বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলে। কোনো কিছুই এখন তোমার চিন্তা করা নিষেধ।আরও একমাস পর সোহানা বেগম ছেলেকে নিয়ে দেশে ফিরলেন।রাত্রে ঘুমোবার সময় আসমা সেলিমের ঘরে তাকে শুয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল, দাদা, তুমি ঘুমিয়ে পড়েছ?সেলিম জেগেই ছিল। সে তখন লাইলীর কথা চিন্তা করছিল। উঠে বসে বলল, নারে ঘুমোইনি, আয় বস। কিছু বলবি নাকি?সোহানা বেগম আসমাকে লাইলীর সঙ্গে বিয়ে ভেঙ্গে দেওয়ার ঘটনাটা জানাবার জন্য পাঠিয়েছেন। কিভাবে কথাটা বলবে চিন্তা করতে করতে একটা চেয়ার টেনে বসল।কিরে কথা বলছিস না কেন? তোর ছেলে কেমন আছে? পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিস তো?আসমা বলল, আমার খবর ভালো। তোমাকে একটা কথা বলব, সেটা শুনে তুমি মনে আঘাত পাবে, তাই বলতে সাহস হচ্ছে না।সেলিম একটু চিন্তা করে বলল, যত বড়ই আঘাত পাই না কেন, তুই বল।আসমা সেই বেনামী চিঠিটা এগিয়ে দিয়ে বলল, পড়ে দেখ।সেলিম তার হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে পড়ল। তারপর আসমার দিকে রাগের সঙ্গে চেয়ে রইল।আসমা ভয়ে ভয়ে বলল, তোমার যেদিন এ্যাকসিডেন্ট হয়, সেদিন একটা লোক এসে খালাম্মাকে এই চিঠিটা দিয়ে যায়। ওঁর ধারনা লাইলী খুব অপয়া মেয়ে। সেই জন্য তোমার এই দুর্ঘটনা হয়। তাই তিনি বিয়ে ভেঙ্গে দেন।আসমা তুই চুপ কর বলে চিৎকার করে সেলিম মায়ের ঘরে গিয়ে পায়ের কাছে বসে দু’পা জড়িয়ে ভিজে গলায় বলল, একি করলে মা? একজন অচেনা, অজানা লোকের একটা চিঠি পেয়ে তাকে বিশ্বাস করে ফেললে? তোমার নিজের ছেলের চেয়ে সেই অজানা লোকটা তোমার কাছে বেশি বিশ্বাসী হয়ে গেল? তুমি মা হয়ে আমাকে এতখানি অবিশ্বাস করবে তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। তারপর কাঁদতে কাঁদতে বলল, কেন তুমি আমার ভালো হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলে না? আমাকে এত টাকা খরচ করে বিদেশ থেকে ভালো করে আনলে কেন? বল মা বল, চুপ করে থেক না? আমার কথার উত্তর দাও। আমি কী এমন তোমার কাছে অন্যায় করেছি, যার জন্য তুমি আমাকে এত বড় শাস্তি দিলে? তা হলে কী ভাবব, আমাকে এই চরম আঘাত দেওয়ার জন্য বিদেশ থেকে ভালো করে এনেছ।সোহানা বেগম বললেন, সেলিম, তুই আমাকে এত বড় কথা বলতে পারলি? তারপর ভিজে গলায় বললেন, আমি মা হয়ে তোর ভালর জন্য এই কাজ করেছি। তুই শান্ত হ বাবা। তুই শিক্ষিত ছেলে, সামান্য একটা মেয়ের জন্য এতটা উতলা হওয়া উচিত না।সেলিম মাকে ছেড়ে দিয়ে আর কোনো কথা না বলে নিজের ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ গুঁজে ফোঁপাতে লাগল। রাত্রে ঘুমিয়ে সে স্বপ্ন দেখল, লাইলী পাগলি হয়ে গেছে। ভেঁড়া ময়লা কাপড় পরে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। তার সুদীর্ঘ চুল উস্কোখুসকো হয়ে জট পাকিয়েছে। সে রাস্তায় যাকে পাচ্ছে তাকেই জিজ্ঞেস করছে, আপনি সেলিম সাহেবকে দেখেছেন? বলতে পারেন তিনি কোথায় ও কেমন আছেন? একটা হোটেল থেকে বেরোবার সময় গেটে লাইলী তাকে ঠিক ঐ কথাগুলো বলল। সেলিমের তখন ইচ্ছা হল, তাকে জড়িয়ে ধরে বলে এই তো আমিই তোমার সেই সেলিম সাহেব। ঠিক এই সময় মোয়াজ্জেনের আজান শুনে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল। ভারাক্রান্ত মনে ফজরের নামায পড়ে লাইলীর মঙ্গলের জন্য আল্লাহ পাকের কাছে দোয়া চাইল।সকাল সাতটায় সেলিম লাইলীদের বাড়িতে গেল।জলিল সাহেব সেলিমকে দেখে অবাক হলেও ড্রইংরুমে এনে বসালেন।সেলিম বলল, দয়া করে লাইলীকে বা ওর আব্বাকে একটু ডাকবেন?জলিল সাহেব আরো বেশি অবাক হয়ে বললেন, খালুজান আজ প্রায় আট মাস আগে ইন্তেকাল করেছেন। আর লাইলী মাস দুই হল তার অসুস্থ মাকে নিয়ে চিটাগাং গেছে।সেলিম “ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন” পড়ে উঠে এসে জলিল সাহেবের দু’টো হাত ধরে বলল, অনুগ্রহ করে তার ঠিকানাটা দিন।জলিল সাহেব এতক্ষণ অনেক সহ্য করেছেন, এবার একটু রাগতস্বরে বললেন, আমরা তার ঠিকানা জানি না। এখন তার ঠিকানা নিয়ে কি করবেন? এতদিন কোথায় ছিলেন? শুনেছিলাম, একসিডেন্ট করে স্মৃতি ও বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। এখন তো দেখছি আপনি সুস্থ। খোঁজ-খবর নেননি কেন? বই পুস্তকে পড়েছি, বড় লোকের ছেলেরা গরিব মেয়েদের নিয়ে দুদিনের জন্য পুতুল খেলার মতো খেলে। আপনাকে দেখে প্রত্যক্ষ করলাম। আপনার মায়ের চিঠি পেয়ে লাইলী খালুজানকে গহনাগুলো ফেরৎ দিতে পাঠিয়েছিল। জানি না আপনার মা তাকে কি বলেছিলেন। ফিরে এসে সেই যে বিছানা নিলেন আর উঠলেন না। সে রাতেই মারা গেলেন। আর কি চান আপনারা? অমন বেহেস্তের হুরের মত সুন্দরী ও নিপাপ মেয়েকে দুর্ণাম দিয়ে এখান থেকে তাড়ালেন। আরও যদি কিছু করতে চান, তা হলে চিটাগাং গিয়ে গোয়েন্দা লাগান, পেয়ে যাবেন। একটা কথা মনে রাখবেন, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। বড়লোকেরা টাকার দেমাগে গরিবদের উপর অনেক জুলুম করে, কিন্তু সেটা সাময়িক। উপরে একজন শাহানশাহ আছেন, তিনি বড় ন্যায় বিচারক। তাঁকে ফাঁকি দেওয়া কারুর পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি সত্য মিথ্যা একদিন প্রমাণ করে দেবেন।সেলিম এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল। তার দু’চোখ পানিতে ভরে উঠল। জলিল সাহেব থেমে যেতে ভিজে গলায় বলল, আমি নিজের সাফাই গাইবার জন্য আসিনি। এতদিন পর কেন এসেছি, সে খবর আল্লাহপাক জানেন। শুধু একটা কথা বলে যাই, আল্লাহপাক যেন আপনার শেষ কথাটা কবুল করেন। তারপর সে রুমাল দিয়ে দু’চোখ মুছতে মুছতে হঠাৎ করে উঠে চলে গেল।জলিল সাহেব সেলিমের কথা ঠিক বুঝতে পারলেন না। রহিমা দরজার পর্দার আড়াল থেকে তাদের কথা শুনছিল। এবার ভিতরে এসে বলল, আমার কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে। সেলিম সাহেব বোধ হয় এসব ঘটনা কিছুই জানেন না। না জেনে তুমি তাকে শুধু শুধু যাতা করে বললে?সেলিমের ব্যবহারে জলিল সাহেবেরও মনে খটকা লেগেছে। বললেন, কি জানি, হয়তো হবে। তবু কিন্তু থেকে যাচ্ছে।রহিমা বলল, এইজন্য হাদিসে আছে, আসল ঘটনা না জেনে কারও উপর সন্দেহ পোষণ করা মহাপাপ।.লাইলী মাঝে মাঝে রহিমাকে পত্র দেয়। কিন্তু ঠিকানা দেয় না। পোষ্ট অফিসের সীলমোহর দেখে ওরা জেনেছে, সে চিটাগাং-এ আছে।সেলিম ঘরে ফিরে এসে জামাকাপড় ব্রীফকেসে ভরে নিয়ে মায়ের কাছে এসে বলল, মা, আমি চিটাগাং যাচ্ছি।সোহানা বেগম বললেন, সে কিরে? মাত্র গতকাল এত জার্নি করে এলি। কয়েকদিন রেষ্ট নে, তারপর না হয় যাবি। এত ব্যস্ত হওয়ার কি আছে?সেলিম হতাশভাবে ব্রীফকেসটা সেখানে রেখে নিজের রুমে ফিরে এল। ইজিচেয়ারে শুয়ে চোখ বন্ধ করে লাইলীকে নিয়ে তার অতীত জীবনের কথা চিন্তা করতে লাগল।সোহানা বেগম আসমাকে বলে দিয়েছেন তোর দাদার দিকে খুব খেয়াল রাখবি। তাকে বেশি চিন্তা করতে দিবি না। সে বীফকেসটা নিয়ে সেলিমের ঘরে এসে সেটা যথাস্থানে রেখে দিল। তারপর তার কাছে এসে মাথার চুলে হাত বুলাতে লাগল।সেলিম চমকে উঠে তাকিয়ে আসমাকে দেখে বসতে বলে বলল, হাঁরে রেহানা বা মনিরুলের সঙ্গে তোর পরিচয় হয়নি?আসমা সামনের একটা চেয়ারে বসে বলল, রেহানার সঙ্গে এখানে আসার কয়েকদিন পর পরিচয় হয়েছে। প্রথমদিন রুবীনার সঙ্গে আমাকে দেখে তার কাছে আমার পরিচয় জানতে চাইতে রুবীনা বলল, আমাদের দুর সম্পর্কের আত্মীয়া। আমাকে অবশ্য সে কোনোদিন কিছু জিজ্ঞেস করেনি। আর মনিরুল প্রায়ই এসে রুবীনার সঙ্গে গল্প করে। মাঝে মাঝে দুজনে বেড়াতে যায়। আমি তার সামনে কোনোদিন যাইনি।মনিরুলকে তুই ঠিক চিনতে পেরেছিস? আসমা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।সেলিম বলল, তোকে ভালভাবে আই, এ, পাশ করতে হবে। এখানে বেশি দিন থাকলে ধরা পড়ে যাবি। তোকে অন্তত বি. এ. পাশ করতে হবে। তোর ছেলেকে কনভেন্ট স্কুলে ভর্তি করে দেব। ছেলের চিন্তা করিসনে, তারও ব্যবস্থা করতে পারব। তোর জন্য ঐ স্কুলে ছেলেমেয়েদের দেখাশুনার কাজটা ঠিক করে দেব। তোকে আর ছেলে ছেড়ে থাকতে হবে না।আসমা মেঝেয় বসে পড়ে সেলিমের দুটো পা জড়িয়ে ধরে কাঁদকাঁদ স্বরে বলল, দাদা, তুমি এই মহাপাপীর জন্য যা করছ, তার এক কণাও আমি প্রতিদান দিতে পারব না। তোমার মতো ছেলের জীবনে কেন যে এরকম একটা ঘটনা ঘটে গেল, তা একমাত্র আল্লাহপাক জানেন। তারপর সে সেলিমের দুই হাঁটুর মাঝখানে মাথা রেখে ফোঁপাতে লাগল।সেলিম তার মাথায় হাত বলাতে বুলোতে ভাঙ্গা গলায় বলল, কাঁদিসনে বোন কাঁদিসনে, উঠে বস। কি করবি বল? উপরের দিকে আঙুল তুলে বলল, সবকিছু উনি করছেন। ওখানে মানুষের কিছু করার ক্ষমতা নেই। হারে, লাইলীর আরা মারা গেলেন, তোরা বুঝি সে খবর জানিস নি?এবারও আসমা মাথা নাড়ল। এমন সময় রেহানা সেলিম তুমি ঘরে আছ বলে ভিতরে ঢুকে আসমাকে ঐ অবস্থায় দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। সেলিম ভালো হয়ে ফিরে এসেছে জেনে সে তাকে দেখতে এসেছে।সেলিম আসমার মাথাটা হাত দিয়ে তুলে ধরে বলল, উঠে বস। তারপর রেহানার দিকে চেয়ে বলল, কি খবর? কেমন আছ?রেহানা নিজেকে সামলে নিয়ে ঝাঁজের সঙ্গে বলল, সেলিম তুমি এত নিচে নেমে গেছ? আমি যে ভাবতে পারছি না, ছি, ছি, ছি।সেলিম বলল, তুমি একি বলছ রেহানা? তোমার কাছ থেকে একথা শুনব আশা করিনি।ততক্ষণে আসমা উঠে দাঁড়িয়ে দুচোখ মুছে বলল, দেখুন রেহানাদি, যারা বাইরেটা দেখে বিচার করে, তাদের রায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভুল হয়। তারপর সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।রেহানা বলল, শুনেছি মেয়েটা তোমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়া। সে তো অনেকদিন হয়ে গেল এসেছে, আর কত দিন থাকবে?সেলিম বলল, আচ্ছা রেহানা, মেয়েরা এত হিংসুটে ও সন্দেহ প্রবণ হয় কেন বলতে পার? যাক, তুমি আমাকে যা কিছু ভাবতে পার। এখন দয়া করে আমাকে একটু একা থাকতে দাও, প্লীজ।রেহানা রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে অনেক কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সেলিমের শেষের কথা শুনে অপমান বোধ করে হাই হিল জুতোর আওয়াজ তুলে গট গট করে চলে গেল।সেলিম চোখ বন্ধ করে আবার লাইলীর চিন্তায় ডুবে গেল।ঐদিন দুপুরে আরিফের চিঠি এল। সে প্রথমে হাফেজ হয়ে পরে আরবীতে এম, এ, পাশ করেছে। যে কোনোদিন বাড়িতে এসে পৌঁছাবে। সেলিমের ব্যাপারটা নিয়ে এ সংসারে যেমন বিষাদের ছায়া নেমেছিল, আরিফের চিঠি পেয়ে সকলের মনে আনন্দের সাড়া জেগে উঠল। সেলিম মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, কি, আমি বলিনি? আরিফ মানুষের মত মানুষ হয়ে একদিন ঠিক ফিরে আসবে? এতদিন নিজেকে বড় একা মনে হত, ও এলে আর কোনো চিন্তা নেই। সকলে আরিফের পথ পানে চেয়ে রইল।দিন দশেক পরের ঘটনা। রুবীনা বিকেলে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে গেটের দিকে চেয়েছিল। দেখল, একজন দাড়ীওয়ালা মৌলবী ধরনের লোক গেটে দারোয়ানের সঙ্গে কথা বলতে বলতে, ভিতরে আসছে।দারোয়ান তার হাত থেকে সুটকেসটা নিয়ে আগে আগে এসে চিৎকার করে বলল, বেগম সাহেবা দেখবেন আসুন, ছোট বাবু এসেছেন।উপরের বারান্দা থেকে রুবীনা আরিফকে চিনতে পারেনি। দারোয়ানের চিৎকার শুনে সকলে নিচের বারান্দায় বেরিয়ে এল।আরিফ মায়ের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে উঠে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, মা তুমি কেমন আছ? আমাকে মাফ করে দিয়েছ তো?সোহানা বেগম ছেলেকে বুকে চেপে ধরে আনন্দঅশ্রু ফেলতে ফেলতে বললেন, মাফ তো অনেক আগেই করেছি। আল্লাহ যে তোকে আমার কোলে ফিরিয়ে আনলেন, তার জন্য তাঁকে অসংখ্য শুকরিয়া জানাচ্ছি। তোর খবরাখবর চিঠি দিয়েও তো জানাতে পারতিস। আজ তোর বাবা বেঁচে থাকলে কত যে খুশি হতেন।আরিফ মাকে ছেড়ে দিয়ে তার মুখের দিকে চেয়ে বলল, কি বললে মা? আহ্বা বেঁচে নেই? ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন বলে মায়ের পায়ের কাছে বসে তার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, আব্বা আমাকে ফাঁকি দিয়ে চলে গেলেন? আমি যে তার কাছে মাফ চাইতে পারলাম না। ইয়া রাহমানুর রহিম, তুমি আমার আবার রুহের মাগফেরাত দান কর। তার সমস্ত অপরাধ মাফ করে দাও।সোহানা বেগম ছেলের হাত ধরে তুলে বললেন, কতদুর থেকে এসেছিস, চল বাবা, হাত মুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম নিবি। তারপর রুবীনার দিকে চেয়ে বললেন, তোর ছোটদার জন্য নাস্তা নিয়ে আয়।আরিফ বাথরুম থেকে হাতমুখ ধুয়ে এসে নিজের রুমে কাপড় পাল্টাল। একটা অচেনা মেয়েকে রুবীনা ও মায়ের সঙ্গে নাস্তা নিয়ে ঢুকতে দেখে জিজ্ঞেস করল, মা, এই মেয়েটিকে তো চিনতে পারছি না?সোহানা বেগম বললেন, তুই চিনবি না। আমাদের দুর সম্পর্কে আত্মীয়া। বিপদে পড়েছে। তাই সেলিম ওকে রুবীনার মত মানুষ করছে। এমন সময় বছর তিনেকের একটা ছেলে পর্দা ঠেলে ঘরে ঢুকে আরিফের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে রইল। তারপর আমার দিকে দুহাত বাড়িয়ে আম্মা বলে এগিয়ে গেল। আসমা ছেলেকে কোলে তুলে নিল।আরিফ বলল, বাহ! ছেলেটা তো খুব সুন্দর। সোহানা বেগম বললেন, হ্যাঁ ওরই ছেলে।আরিফ নাস্তা খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল, ভাইয়া কখন ফিরবে? সে নিশ্চয় ব্যবসা বাণিজ্যে মন দিয়েছে?সোহানা বেগম মান স্বরে বললেন, সে দেখবে না তো কে দেখবে? সে একা আর কত দিক সামলাবে। কখন ফেরে, কখন খায়, তার কিছু ঠিক নেই। এবার দু’ভাই মিলে সবকিছু দেখাশোনা করবি।আচ্ছা মা, মনে হচ্ছে ভাইয়ার এখনও বিয়ে দাওনি?আরিফের কথা শুনে সোহানা বেগমের মুখটা আরও মান হয়ে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, কি আর বলব বাবা, বিয়ে তো ঠিক করেছিলাম। কিন্তু তা আর হল কৈ?কেন, হল না কেন।বিয়ের বিশ পঁচিশ দিন আগে তোর দাদা এ্যাক্সিডেন্ট করে স্মৃতি ও বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। ওকে নিয়ে আমি সুইজারল্যান্ডে গিয়ে ছ’মাস চিকিৎসা করিয়ে ভালো করি। এই তো মাত্র দশ বারদিন হল আমরা ফিরেছি।আরিফ আল্লাহপাকের দরবারে হাজার হাজার শুকরিয়া জানিয়ে বলল, তিনি যা কিছু করেন, তার বান্দাদের মঙ্গলের জন্যই করেন। তুমি অত মন খারাপ করছ কেন? এবার একটা ভালো মেয়ে দেখে ভাইয়ার বিয়ের ব্যবস্থা কর।রাত্রি আটটায় সেলিম ঘরে ফিরল। তাকে দেখতে পেয়ে আরিফ সালাম দিয়ে প্রায় ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে বলল, ভাইয়া তুমি কেমন আছ?সেলিম সালামের উত্তর দিয়ে ছোট ভাইকে আবেগের সঙ্গে বুকে চেপে ধরল। তারপর কান্নাজড়িত স্বরে বলল, মাঝে মাঝে চিঠি দিয়ে আমাদের অশান্তি দূর করতে পারতিস। তোর ঠিকানা জানা থাকলে আর কথা জানাতে পারতাম। তারপর দুভাই দুজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। এশার আজান শুনে সেলিম বলল, চল মসজিদ থেকে নামায পড়ে আসি।আরিফ সেলিমকে আবার জড়িয়ে ধরে বলল, তুমি নামায পড়? ইয়া আল্লাহ তোমার দরবারে জানাই লাখ লাখ শুকরিয়া।সেলিম আস্তে আস্তে ভিজে গলায় বলল, তোকে এক সময় সব কথা বলব। এখন শুধু এইটুকু জেনে রাখ, যে আমাকে এই পথে চালিত করল, তাকে ভাগ্যদোষে হারিয়ে ফেলেছি।নামায পড়ে এসে সকলে মিলে গল্প করতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে সোহানা বেগম খাওয়ার জন্য সবাইকে ডেকে পাঠালেন।ডাইনিংরুমে গিয়ে আরিফ বলল, ভাইয়া, চেয়ার টেবিলে বসে খাওয়া আর চলবে না।সেলিম বলল কেন? হাদিসে এরকম কিছু লেখা আছে নাকি? না এটা তোর গোঁড়ামী?আরিফ বলল, আমার গোঁড়ামী কি না জানি না, আর হাদিসেও তা লেখা নেই। তবে রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফ্লোরে বসে দস্তরখানা বিছিয়ে খেতেন। হাদিসে আছে, তিনি বলেছেন, “যে দস্তরখানা বিছিয়ে খাবে এবং তাতে যা খাবার পড়বে তা কুড়িয়েও খাবে, সে কোনোদিন অভাবগ্রস্ত হবে না। আর যারা খাবার জিনিষ যদি চারিদিকে ফেলে খায়, তা হলে ঐ ফেলে রাখা খাবারগুলো তাদের জন্য অভিসম্পাৎ করে।“(১) তা ছাড়া এটা বিধর্মীদের অনুকরণ করা হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সঃ) আরো বলেছেন “যারা যে ধর্মাবলম্বীদের অনুকরণ করবে অর্থাৎ তাদের যে কোনো কাজ পছন্দ করবে, তারা কেয়ামতের দিন তাদের সঙ্গে উঠবে।”(২) এখন তুমিই বল, আমরা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে অনুকরণ করব না বিধর্মীদের অনুকরণ করব?সেলিম বলল, ঠিক আছে আজ খেয়ে নে, পরে যে যার ইচ্ছামত করবে। না তুই মেঝেয় বসেই খাবি?আরিফ বলল, টেবিল চেয়ারে বসে খাব না কেন? এতে খেলে তো আর গোনাহ হচ্ছে না। তবে এটা সুন্নতের বরখেলাপ, পরিত্যাগ করা উচিৎ।খেতে খেতে সেলিম আসমাকে দেখিয়ে আরিফকে জিজ্ঞেস করল, একে চিনিস? এ বড় বিপন্না মেয়ে। নাম অসমা। ওর একটা ফুটফুটে ছেলে আছে। আমি একে ছোট বোন বলে গ্রহণ করেছি। আশা করি, তুইও ওকে ছোট বোনের মত গ্রহণ করবি।আরিফ বলল, আল্লাহপাক তা হলে আমাদেরকে আর একটা বোন দিয়েছেন? খাওয়ার পর্ব শেষ করে সকলে বারান্দায় বসে আরিফের বিদেশে কাটান দিনগুলোর কথা শুনতে লাগল। সোহানা বেগম একবার ঘুমাবার জন্য তাড়া দিয়ে গেলেন। আসমা তার বাচ্চাকে নিয়ে ঘুমাতে গেল। একটু পরে রুবীনা ঘুম পাচ্ছে বলে উঠে গেল। আরিফ বলল, ভাইয়া, তোমার উপর আমার যেন কেমন সন্দেহ হচ্ছে।কি রকম সন্দেহ?মনে হচ্ছে কোনো মায়বীনি তোমাকে তার মায়ায় ফেলেছে। তুমি সেই মায়ার যাদুতে হাবুডুবু খাচ্ছ। শত চেষ্টা করেও নাগাল পাচ্ছ না।সেলিম তার মুখের দিকে হা করে চেয়ে রইল, কিছুই বলতে পারল না।কি হল ভাইয়া, তুমি কথা বলছ না কেন? তুমি নারীর প্রেমে পড়েছ বলেছি বলে আমাকে খুব অসভ্য, বেহায়া মনে করছ বুঝি?সেলিম সামলে নিয়ে বলল, সেটা ভাবা কি আমার অন্যায় হবে?তা হবে না বলে আরিফ চুপ করে গেল।সেলিম করুণ স্বরে বলল, তোর সন্দেহটা ঠিক। সত্যিই আমি লাইলী নামে একটা মেয়েকে ভালবেসেছি। কিন্তু ললাট লিখন কে খণ্ডাবে বল। কপালের ফেরে দুজনেই বিরহ জালায় জ্বলছি। আল্লাহই জানেন আমাদের কি হবে।তুমি কি বলছ ভাইয়া আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।সেলিম খুব সংক্ষেপে ওদের দুজনের ঘটনা বলল। তারপর একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, তুই এবার ঢাকার সব কিছু দেখাশোনা কর। আমি চিটাগাং-এরটা দেখব। শুনেছি, লাইলী সেখানেই আছে? চেষ্টা করব তাকে খুঁজে বের করার। বাকি আল্লাহপাকের মর্জি।———-(১) বুস্তানুল আরেফিন ৯১ পৃঃ।(২) বর্ণনায় ও হযরত আব্বুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)-আহাম্মদ, আবু দাউদ।
সেলিম আরিফকে নিয়ে মিল, কারখানা ও অফিসের সকলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। সব কাজ তাকে বুঝিয়ে দিতে লাগল। সারাদিন কাজের মধ্যে ডুবে থাকলেও রাত্রে ঘুমোবার সময় লাইলীর চিন্তায় সে অস্থির হয়ে উঠে। সবকিছু তার কাছে অসহ্য মনে হয়। শেষে একদিন সবাইকে জানিয়ে দিল, আগামীকাল সে। চিটাগাং যাবে।সোহানা বেগম বললেন, আর কয়েকদিন থেকে যা।সেলিম বলল, ম্যানেজার ট্রাঙ্কল করেছিল, আমার যাওয়া একান্ত প্রয়োজন নচেৎ অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। কালকের ফ্লাইটে যাব বলে ম্যানেজারকে বলে দিয়েছি। পরের দিন সেলিম দশটা চল্লিশের প্লেনে চেপে বসল।এদিকে ম্যানেজার সাহেব অফিসের সমস্ত ষ্টাফকে জানিয়ে দিয়েছেন, সাহেব আসছেন। অফিসের কেউ এখনও তাদের সাহেবকে দেখেনি। ম্যানেজার সাহেবের কাছেই তারা শুনেছে, সাহেবের মতো সাহেব নাকি আর হয় না। তিনি সততাকে খুব ভালবাসেন। যারা সততার সঙ্গে কাজ করে তারা তার প্রিয়পাত্র। সকলে মিলে সাহেবকে অভ্যর্থনা করার ব্যবস্থা করল। তারা জেনে ছিল, এই অফিস উদ্বোধন করার পরের দিন তিনি এ্যাকসিডেন্ট করেন এবং চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তারা সমস্ত অফিস কক্ষ রংবেরং এর রঙিন কাগজ দিয়ে সাজাল। সাহেবের অফিস রুমটা সব থেকে আকর্ষণীয় করে তুলল। তারপর রিসিভ করার জন্য সবাই এয়ারপোর্ট গেল।বিমান যাত্রীদের মধ্যে একজন সুদর্শন যুবকের দিকে ম্যানেজার সাহেব হাত বাড়িয়ে বললেন, ঐ যে সাহেব আসছেন। ওরা প্রথমে তাকে ইউরোপিয়ান সাহেব মনে করে ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করল, আমাদের সাহেব কি ইংরেজ?ম্যানেজার সাহেব বললেন, উনি খাস ঢাকাইয়া।তখন সবাই অবাক হয়ে এগিয়ে যেতে লাগল। এত সুন্দর লোক তারা এর আগে দেখেনি।অনেকগুলো লোকের সঙ্গে ম্যানেজার সাহেবকে এগিয়ে আসতে দেখে সেলিম আগে সালাম দিয়ে বলল, আশা করি, আল্লাহর রহমতে আপনারা ভালো আছেন।ম্যানেজার ছাড়া আর কেউ সালামের জওয়াব দিতে পারল না। তারা অবাক হয়ে তাদের সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের মধ্যে সুভাস নামে একটা ছেলে এগিয়ে গিয়ে সেলিমের গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দিল এবং হাতে একটা লাল গোলাপ দিয়ে আদাব জানাল।সেলিম খুশি হয়ে তাকে ধন্যবাদ দিল।এদের সঙ্গে লাইলী আসেনি। সে সাহেবের আসবার খবরও জানে না। তার মায়ের শরীর দিন দিন ভেঙ্গে পড়ছে, তাই ডাক্তারের পরামর্শ মতো পনের দিনের ছুটি নিয়ে সাত দিন আগে মাকে নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে গেছে। হামিদা বানুর দৈহিক কোনো অসুখ নেই। ডাক্তাররা বলছেন, উনি কোনো কারণে মনে ভীষণ আঘাত পেয়েছেন। সেই চিন্তাটা ওঁকে কুরে কুরে খাচ্ছে। লাইলী হোটেলে উঠেছে। লাইলী প্রতিদিন সূর্যাস্ত দেখতে সমুদ্র তীরে গিয়ে কিছুক্ষণ বেলাভূমিতে হাঁটে। তারপর পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখে। সূর্যাস্তের পর ঐখানে মাগরিবের নামায পড়ে হোটেলে ফিরে আসে। প্রথম প্রথম মাকে সঙ্গে করে এনেছে। পরে উনি আসতে চান নাই, তাই লাইলী একাই রোজ আসে।সেলিম অফিসে এসে সবকিছু দেখে বলল, আপনাদের ব্যবহারে আমি খুব আনন্দিত হয়েছি। আশা করি, আপনারা সব সময় সততার সঙ্গে কাজ করে এই ফার্মের উন্নতি করবেন। একটা কথা মনে রাখবেন, ফার্মের উন্নতী মানেই আপনাদের উন্নতি। আমি আর বেশি কিছু বলতে চাই না। এখন জলযোগ শেষ হওয়ার পর আজ ছুটি ঘোষণা করছি। আগামীকাল থেকে আপনারা যথারীতি কাজ করবেন। সকলে হাততালি দিয়ে উঠল।সেলিম তাদের থামিয়ে দিয়ে বলল, হাততালি দেওয়া মুসলমানদের রীতি নয়। আনন্দ প্রকাশ করার সময় বলবেন, ‘সুবাহান আল্লাহ’ অথবা ‘মারহাবা মারহাবা।’ সাহেবের কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে গেল। এ রকম কথা তারা কোনোদিন শুনে নাই। সবাইকে অবাক হতে দেখে সেলিম আবার বলল, আমি কোনো নূতন কথা আপনাদের বলিনি। পুরাতন কথাটা আপনারা জানেন না বলে নূতন বলে মনে হচ্ছে। তারপর ম্যানেজার সাহেবকে বললেন, কই খাবারের কি ব্যবস্থা করেছেন, এখানে আনতে বলুন, সকলে এক সঙ্গে বসে খাব।অফিস স্টাফদের বিস্ময় ক্রমশঃ বেড়েই চলল। এতবড় ধনী মালিক, কর্মচারীদের সঙ্গে বন্ধুর মতো ব্যবহার করছেন। ম্যানেজার সাহেব বললেন, আপনারা অবাক হয়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছেন কেন? খাবারের ব্যবস্থা করুন। তারপর সকলে একসঙ্গে খাওয়ার পর অফিস ছুটি হয়ে গেল।সেলিম পরের দিন জাষ্ট টাইমে অফিস কামরায় প্রবেশ করল। তারপর পিয়নকে ডেকে বলল, যারা এখানে কাজ করছে তাদের বায়োডাটা, ফটো ও দরখাস্তগুলো ম্যানেজার সাহেবকে নিয়ে আসতে বলুন।ম্যানেজার সাহেব সবকিছু নিয়ে এলে তাকে বলল, আপনি এখন যান, প্রয়োজন হলে ডেকে পাঠাব। ম্যানেজার সাহেব চলে যাওয়ার পর তাদের কাগজ পত্রগুলো দেখতে লাগল। শেষ দরখাস্তের সাথে লাইলীর ফটো দেখে চমকে উঠল। সবকিছু ভুলে তন্ময় হয়ে ফটোর দিকে তাকিয়ে রইল। এক সময় তার চোখ দুটো পানিতে ভরে উঠল। কিছুক্ষণ পর তার কাগজ পত্রের উপর একবার চোখ বুলিয়ে বাথরুম থেকে চোখ মুখ ধুয়ে এসে ম্যানেজার সাহেবকে ডেকে পাঠাল।ম্যানেজার সাহেব এসে সামনের চেয়ারে বসলেন।সেলিম লাইলীর দরখাস্তটা এগিয়ে দিয়ে বলল, এই মেয়েটি দেখছি ষ্টেনোর জন্য দরখাস্ত করেছে। তাকে এপয়েন্টমেন্টও দিয়েছেন। কিন্তু কাল থেকে তাকে দেখছি না কেন?ম্যানেজার সাহেব বললেন, এক সপ্তাহ আগে পনের দিনের ছুটি নিয়ে ডাক্তারের কথামতো তার অসুস্থ মাকে নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে গেছে। লাইলীর মায়ের অসুখের কথা শুনে সেলিম খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল।সাহেবকে চিন্তিত দেখে ম্যানেজার সাহেব বললেন, মেয়েছেলেকে চাকরি দিয়েছি বলে কি তুমি অসন্তুষ্ট হয়েছ? সেলিম কিছু বলার আগে তিনি আবার বললেন, দেখ বাবা, আমার তো অনেক বয়স হয়েছে, এই মেয়েটির মতো আর দ্বিতীয় কোথাও দেখিনি। যেন সাক্ষাৎ বেহেস্তের হুর। মেয়েটিকে দেখে খুব দুঃখী বলে মনে হয়েছে এবং তার যে একটা চাকরির খুব দরকার সেটা বুঝতে পেরে দিয়েছি। অফিসে প্রতিদিন নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে; কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ তার মুখ দেখেনি। আমাকে চাচা বলে ডাকে এবং আমিও তাকে মেয়ের মতো মনে করি বলে হয়তো সে আমার কাছে মুখ খুলে রাখে।ম্যানেজার সাহেবের কথা শুনতে শুনতে সেলিম লাইলীর চিন্তায় ডুবে গেল। তার মন আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠল। কোনো রকমে সে ভাবটা গোপন করে বলল, ঠিক আছে, আপনি এখন আসুন। ম্যানেজার সাহেব চলে যেতে লাইলীর সব কাগজপত্র নিজের ব্রীফকেসে ভরে নিল। অফিস ছুটির পর সেলিম উপরে গিয়ে কিছুতেই নিজেকে বুঝাতে পারল না। তার মন এক্ষুণি কক্সবাজারে যাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগল। ছুটি শেষ হওয়ার পর লাইলীর ফিরে আসা পর্যন্ত ধৈৰ্য্য ধরে থাকা তার পক্ষে অসম্ভব বলে মনে হল। শেষে অনেক ভেবেচিন্তে ম্যানেজারকে চিঠি লিখল।ম্যানেজার চাচা,প্রথমে সালাম নেবেন। পরে জানাই যে, আজকের সন্ধ্যার ফ্লাইটে বিশেষ কারণবশতঃ আমি কক্সবাজারে যাচ্ছি। ফিরতে দুচার দিন দেরি হতে পারে? আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। ইনশাআল্লাহ আমি শীঘ্রি ফিরে আসব।ইতি–সেলিম। সেলিমের বাসার কাজ-কর্ম ও রান্না-বান্না করার জন্য জাভেদ নামে একজন লোককে ম্যানেজার সাহেব ঠিক করে দিয়েছেন। লোকটা খুব বিশ্বাসী। সাহেব আসবে শুনে সে আগে থেকে ঘর-দরজা, বিছানাপত্র সব পুরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করে রেখেছিল। তার আর একটি বড় গুণ, সে খুব ভালো রান্না করতে পারে। সেলিম প্রথম তার হাতের রান্না খেয়েই বুঝতে পেরেছে, লোকটি আগে বোধ হয় কোনো বড় হোটেলের বাবুর্চি ছিল। সে চিঠিটা শেষ করে জাভেদের হাতে দিয়ে বলল, কাল ঠিক নটার সময় এটা ম্যানেজার সাহেবের হাতে দেবেন। আর আমি আজ কক্সবাজার যাচ্ছি, কয়েকদিন পর ফিরে আসব।সেইদিন সন্ধ্যার ফ্লাইট সেলিম কক্সবাজারে গিয়ে পৌঁছাল। রাত্রে হোটেলে শুয়ে শুয়ে সে চিন্তা করল, কি করে লাইলীকে খুঁজে বের করবে। এই শহরে কোথায় আছে কি করে সে জানবে? পরের দিন সে সমস্ত হোটেলে গিয়ে তাদের রেজীষ্টার খাতা চেক করে দেখল, কিন্তু কোথাও লাইলীর নাম খুঁজে পেল না। সেলিম যদি লাইলীর মায়ের নাম জানত, তা হলে পেত। কারণ লাইলী মায়ের নামে রুম নিয়েছে। সারাদিন এলোমেলোভাবে ঘুরে সন্ধ্যার দিকে সে সমুদ্র তীরে গেল। তখন সূর্যাস্তের সময়। সেলিম সূর্যাস্তের অলৌকিক শোভা দেখতে লাগল। সূৰ্য্য যখন একটা বড় থালার মত টকটকে লাল হয়ে ডুবতে আরম্ভ করল তখন সেলিমের মনে হল, একটা বিরাট রক্তগোলাপ যেন ধীরে ধীরে সমুদ্রের মাঝখানে ডুবে যাচ্ছে। তার লাল কিরণছটাতে সমুদ্রের পানিও রক্তের মত লাল হয়ে গেছে। সে যে কি এক অপূর্ব দৃশ্য, তা যে দেখেছে, সে ছাড়া আর কেউ অনুভব করতে পারবে না। একটু পরে মাগরীবের আজানের ধ্বনি শুনে সেলিম সমুদ্র পাড়ের মসজিদে গিয়ে নামায পড়ল। তারপর সে আবার বেলাভূমিতে ফিরে এসে ধীরে ধীরে সমুদ্রের পানির কিনার ধরে কিছুক্ষণ হাঁটার সময় হঠাৎ ভূত দেখার মতো সে চমকে উঠল। একটা বোরখা পরা মেয়ে মুখ খোলা অবস্থায় তার পাশ দিয়ে চলে গেল। সে দ্রুত ঘুরে বলল, এই যে শুনুন।লাইলী প্রতিদিনকার মতো সূর্যাস্ত দেখে নামায পড়ে হোটেলে ফিরছিল। কতলোক সূর্যাস্ত দেখতে আসে। সেলিমকে সে দেখেনি, অন্য নোক ভেবে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল। প্রথমে সেলিমের গলার আওয়াজ পেয়ে সে স্তম্ভিত হয়ে গেল। পরে তার মনে হল কেউ হয়তো অন্য কাউকে ডাকছে। সে সেলিমের চিন্তায় ছিল বলে হয়তো তার গলার মতো শুনতে পেয়েছে। সেইজন্য থমকে দাঁড়িয়ে আবার পথ চলতে শুরু করল।সেলিম ততক্ষণ লাইলীর সামনে এসে তার পথ রোধ করে দাঁড়াল। আবছা অন্ধকার হলেও দুজন দুজনকে চিনতে পারল। বেশ কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলতে পারল না। দুজনেরই মনে হল, স্বপ্ন দেখছে। চোখে পানি এসে গেছে বুঝতে পেরে লাইলী মাথা নিচু করে নিল।সেলিম মৃদুস্বরে ডাকল, লাইলী?লাইলী অশ্রুভরা নয়নে তার দিকে শুধু চেয়েই রইল। শত চেষ্টা করেও তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না, শুধু তার ঠোঁট দুটো নড়ে উঠল।সেলিম বলল, তুমি আমার সঙ্গে কথাও বলবে না? জান, আমি ভালো হওয়ার পর থেকে তোমাকে পাগলের মত খুঁজে বেড়াচ্ছি? আর তুমি তোমার সেলিমকে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছ। তারপর তার হাত দুটো নিজের বুকে ধরে রেখে বলল, আল্লাহপাকের দরবারে কোটি কোটি শুকরিয়া জানাই, তিনি এত তাড়াতাড়ি আমার প্রিয়তমাকে পাইয়ে দিলেন।লাইলী থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে যাচ্ছিল।সেলিম তাকে ধরে ফেলল। তারপর যখন বুঝতে পারল অজ্ঞান হয়ে গেছে, তখন তাকে পাজাকোলা করে পানির কাছে নিয়ে বসিয়ে একহাতে ধরে রেখে অন্য হাত দিয়ে চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ কেটে যেতেও যখন তার জ্ঞান ফিরল না তখন তাকে আবার পাঁজাকোলা করে তুলে একটা বেবী ট্যাক্সিতে করে হোটেলের রুমে নিয়ে এসে বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর হোটেলের বয়কে দিয়ে ডাক্তার আনল।ডাক্তার দেখে বললেন, ভয় পাবেন না, হঠাৎ মানষিক কারণে জ্ঞান হারিয়েছে। আমি একটা ইনজেকশন দিচ্ছি, এক্ষুণি জ্ঞান ফিরবে।ডাক্তার ইনজেকশন দেওয়ার পাঁচ মিনিট পর লাইলীর জ্ঞান ফিরল। ঘরের চারিদিকে তাকিয়ে ধড়মড় করে উঠে বসে সেলিমের সঙ্গে ডাক্তারকে দেখে মাথার কাপড়টা টেনে দিয়ে মুখটা ঢেকে দিল। পানিতে বোরখা ভিজে গিয়েছিল বলে সেলিম রুমে এসে সেটা খুলে দিয়েছে।ডাক্তার বললেন, আর কোনো চিন্তা নেই। সেলিম ডাক্তারকে বিদায় করে এসে দেখল, লাইলী জড়সড় হয়ে বসে আছে।সেলিমকে ঘরে ঢুকতে দেখে সে খাট থেকে নেমে তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল।সেলিম তার দিকে দু’হাত বাড়িয়ে ডাকল, ‘লাইলী।’লাইলী আর স্থির থাকতে পারল না। সে ভুলে গেল এখনও তাদের বিয়ে হয়নি। সেলিম বলে ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে মাথা রেখে অশ্রু বিসর্জন করতে লাগল।সেলিমেরও চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল। তারা স্থির হয়ে অনেকক্ষণ ঐভাবে রইল। কেউ কোনো কথা বলতে পারল না। যখন তাদের মনের উত্তাল স্পন্দন ক্লান্ত হল তখন প্রথমে লাইলী বুঝতে পারল তার চোখের পানিতে সেলিমের অনেকখানি জামা ভিজে গেছে। লজ্জা পেয়ে আলিঙ্গন মুক্ত হয়ে বলল, দেখ কি করলাম, তোমার জামা একদম ভিজিয়ে দিয়েছি।সেলিম লাইলীর আঁচল দিয়ে প্রথমে তার চোখ মুখ মুছে দিয়ে পরে নিজেরটা মুছতে মুছতে বলল, দু’জন প্রেমিক প্রেমিকা প্রেমের সাগরে ডুব দিয়েছিল। সাগরে তো পানি থাকবেই। তারপর তারা দু’টো চেয়ারে সামনা-সামনি বসে একে অপরের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর লাইলী বলল, এভাবে বসে থাকলে চলবে? ওদিকে মা ভীষণ চিন্তা করছে।মায়ের কথা শুনে সেলিম জিজ্ঞেস করল, উনি এখন কেমন আছেন?লাইলী বলল, একটু ভালোর দিকে।তোমার হোটেলের ফোন নাম্বার ও রুম নাম্বারটা বল, মায়ের চিন্তা দূর করে দিই।লাইলী ফোন নাম্বার বলল।সেলিম ডায়েল করে হোটেলের ম্যানেজারকে বলল, এত নাম্বার রুমে দিন তো। তারপর লাইলীর হাতে রিসিভার দিয়ে বলল, মায়ের সঙ্গে কথা বল। বলবে তোমার ফিরতে আরও দেরি হবে, উনি যেন চিন্তা না করেন।লাইলী সেলিমের কথামতো মায়ের সঙ্গে কথা বলে রিসিভার নামিয়ে রেখে বলল, আরো কত দেরি করাবে?সেলিম বলল, আরও কিছুক্ষণ বস না, প্রাণ ভরে দেখি। বহুদিন পর তোমাকে পেলাম। ছাড়তে মোটেই মন চাইছে না। কি করি বল দেখি? আচ্ছা, আমাকে ছেড়ে যেতে তোমার মনে চাইছে?লাইলী বলল, না। তোমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা মনে করলে কলজে মোচড় দিয়ে উঠছে। কিন্তু মায়ের কথা ভেবে নিজেকে সংযত করতে হচ্ছে।সেলিম বলল, এক্ষুণি তোমাকে ছাড়ছি না। একবার ছেড়ে যা ভোগান ভুগিয়েছে, আর নয়। আগে বাঁধব, তারপর যা হয় হবে। তারপর ব্রিফকেস খুলে কিছু টাকা নিয়ে লাইলীকে সঙ্গে করে একটা বেবী ট্যাশ্রীতে উঠে বলল, কাজি অফিসে চল।ডাইভার বলল, এখন তো কাজি অফিস বন্ধ হয়ে গেছে, স্যার।হোক বন্ধ, আপনি চলুন।ড্রাইভার কাজি অফিসের সামনে গাড়ি পার্ক করল।সেলিম তাকে অপেক্ষা করতে বলে লাইলীকে নিয়ে অফিসের সামনে গিয়ে দেখল বন্ধ। তবে দরজার ফাঁক দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে। সে দরজায় ধাক্কা দিতে একজন প্রবীণ লোক বেরিয়ে এসে তাদেরকে দেখে বললেন, এখন অফিস বন্ধ হয়ে গেছে, আগামীকাল সকাল আটটায় আসুন।সেলিম বলল, দেখুন আমরা ভোরেই এখান থেকে চলে যাব। আপনাকে অফিসের টাইমের বাইরে কাজ করার জন্য ওভার টাইম দেব। আপনি দয়া করে আমাদের কাজটা করে দিন।কাজি সাহেব বললেন, সরকারী রেটের চেয়ে ডবল দিতে হবে। আর দুজন সাক্ষীর জন্য আলাদা চার্জও দিতে হবে।সেলিম সবকিছুতে রাজি হয়ে ওদের বিয়ের কাবিন রেজিষ্ট্রি করে নিল। তারপর গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে বলল, একটা ভালো হোেটলের সামনে রাখবেন। আর লাইলীকে বলল, খেয়ে দেয়ে তোমাকে মায়ের কাছে পৌঁছে দেব। খাওয়া দাওয়া সেরে ওরা যখন হোটেলে পৌঁছাল তখন রাত্রি দশটা।সেলিমকে সঙ্গে করে লাইলী যখন রুমে ঢুকল তখন হামিদা বানু ওজিফা শেষ করেছেন। সেলিমকে দেখে অবাক হয়ে ঘোমটা টেনে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে লাইলী ও সেলিম একসঙ্গে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। তারপর সেলিম বলল, আজ আমাদের কাবিন হয়ে গেছে। বাকি কাজ আগামীকাল চিটাগাং-এ গিয়ে সেরে নিতে চাই। আপনি আমাদেরকে দোয়া করুন মা।সেলিমের কথা শুনে হামিদা বানু আরো অবাক হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তিনি যেন কিছু বিশ্বাস করতে পারছেন না।ওকে চুপ করে থাকতে দেখে সেলিম আবার বলল, আমার অসুখের সময় আমার মা আপনাদেরকে ভুল বুঝে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছেন। আমি সেজন্য খুব দুঃখিত। অনুগ্রহ করে আমাদের সবাইকে মাফ করে দিন। আমি এসবের কিছুই জানতাম না। এ্যাকসিডেন্ট করে যখন স্মৃতিশক্তি ও বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম তখন চিকিৎসার জন্য সাত মাস বিদেশ ছিলাম, তাই এইরুপ অঘটন ঘটে গেছে। আপনার ছেলে যদি অন্যায় করে মাফ চাইত, তা হলে কি তাকে মাফ করতেন না? সেলিমের শেষের দিকের কথাগুলো কান্নার মত শোনাল। লাইলীর চোখ দিয়ে পানি টপটপ করে পড়তে লাগল।হামিদা বানুর চোখও পানিতে ভরে উঠল। চোখ মুছে বললেন, সবই আল্লাহপাকের ইচ্ছা বাবা, তিনি তোমাদের মাফ করুন। আমরাও তোমাদেরকে ভুল বুঝে অন্যায় করেছি।সেলিম বলল, না, না আপনারা কোনো অন্যায় করেননি। এই রকম ঘটনা ঘটলে সবাই তাই করতো। আমার মা যে ভুল করেছেন, সেটা আমি শুধরোতে চাই। আপনি আজ বিশ্রাম নিন। তারপর লাইলীর দিকে চেয়ে বলল, তুমি ভোরে উঠে সব গুছিয়ে নিয়ে রেডি হয়ে থাকবে। আমি এসে তোমাদেরকে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যাব। আমরা কাল ফাষ্ট ফ্লাইটে চিটাগাং যাব। তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হোটেলে নিজের রুম ফিরে এসে এয়ারপোর্টে ফোন করে তিনটি টিকিট বুক করল। পরেরদিন ভোর ছ’টার প্লেনে সেলিম লাইলীকে ও হামিদা বানুকে নিয়ে প্রেনে উঠল।বেলা আটটার সময় সাহেবকে দুজন মহিলাসহ গাড়ি থেকে নামতে দেখে জাভেদ দোতলা থেকে ছুটে নেমে এল। তখনও অফিস খুলেনি। বেলা নয়টায় অফিস খুলে। সেলিম জাভেদকে আসসালামু আলাইকুম দিয়ে বলল, গাড়ি থেকে সব মালপত্র নিয়ে উপরে এস।সাহেবকে আগে সালাম দিতে শুনে জাভেদ লজ্জায় এতটুকু হয়ে সালামের উত্তর দিতে ভুলে গেল।সেলিম তার অবস্থা দেখে বলল, এতে লজ্জা বা অবাক হওয়ার কিছু নেই। হাদিসে আছে না যে আগে সালাম দিবে সে উত্তর দাতার চেয়ে নই গুণ সওয়াব বেশি পাবে? তারপর সে ওদেরকে নিয়ে উপরে চলে গেল।জাভেদ মালপত্র গাড়ি থেকে নামাবার সময় ভাবল, সাহেব গেলেন একা, এলেন তিনজন। উনারা কে হতে পারে যেই হোক না কেন তাতে আমার কি ভেবে মালপত্র নিয়ে উপরে এল।উপরে পাঁচ কামরা ঘর। একটাতে সেলিম আর একটাতে জাভেদ থাকে। বাকি রুমগুলো খালি পড়ে থাকে। জাভেদ মালপত্র উপরে নিয়ে এলে সেলিম তাকে বলল, তুমি পাশের রুমটা পরিষ্কার কর, আর শেষের রুমটায় তুমি থকবে। তোমার মালপত্র নিয়ে সেখানে রেখে এস। আমার রুমের পাশেরটা উইংরুম আর তার পাশেরটা আর একটা বেডরুম করবে। আমি সেই মত আসবাবপত্র পাঠিয়ে দিচ্ছি। তোমার এখন অনেক কাজ। দেখছ না, মেহমান এসেছে। বাজার করে এনে ভালো করে রান্না করবে। তারপর কিছু টাকা তার হাতে দিয়ে বলল, যাও তাড়াতাড়ি কর। আর শোন, এখন আগে আমাদের নাস্তার ব্যবস্থা কর।নাস্তা খেয়ে সেলিম হামিদা বানুকে বলল, মা, আপনি বিশ্রাম নিন। আমরা একটু বাইরে যাব। তারপর লাইলীকে সাথে করে মার্কেটে গিয়ে ঘরের প্রয়োজনীয় সব আসবাবপত্র কিনে দোকানের ম্যানেজারকে ঠিকানা দিয়ে পাঠিয়ে দিতে বলল। তারপর কাপড়ের দোকানে গিয়ে কয়েকটা দামী শাড়ী ও গহনার দোকানে গিয়ে কয়েক সেট সোনার অলঙ্কার কিনে বাসায় ফিরল।ততক্ষণে জাভেদ ফার্নিচারগুলো পাশের দুটি রুমে সাজিয়ে দিয়ে রান্নার কাজে লেগে গেছে। হামিদা বানু রান্নাঘরে এসে তার সঙ্গে রান্নার তদারক করছেন।সেলিম ম্যানেজার সাহেবকে উপরে ডেকে পাঠালে তিনি সেলিমের ঘরে এসে লাইলীকে দেখে অবাক হলেন।ম্যানেজার সাহেবকে বসতে বলে সেলিম বলল, আপনি বোধ হয় শুনে থাকবেন, আমার পছন্দ করা মেয়েকে আমার মা পুত্রবধূ করবেন বলে আমাদের বাড়ির এক ফাংশানে তাকে বালা পরিয়ে সকলের সামনে ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ আমরা তাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। সেই মেয়েটি ভাগ্যের অন্বেষণ আমদের এই অফিসে না জেনে চাকরি নেয়। তারপর লাইলীকে দেখিয়ে বলল, আপনার ষ্টেনোকে নিশ্চয় চিনতে পারছে। অফিসে ওর ফটো দেখে কক্সবাজার থেকে অনেক কষ্ট করে নিয়ে এসেছি। কারণ এই সেই মেয়ে, যার সঙ্গে আমার বিয়ের পাকা কথা হয়েছিল। গতকাল কক্সবাজারে কাবিন করেছি। আপনি আমার বাবার বয়েসী। আজকেই আমাদের বাকি কাজগুলো আপনাকে সেরে দিতে হবে। আর চাচি মাকে এক্ষুণি আনার ব্যবস্থা করুন।এতক্ষণ লাইলী লজ্জায় মাথা নিচু করে ছিল। এবার আস্তে আস্তে এসে ম্যানেজার সাহেবের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল।ম্যানেজার সাহেব বললেন, থাক মা, বেঁচে থাক। আল্লাহপাকের কাছে দোয়া করি, তিনি তোমাদেরকে সুখী করুন। তারপর সেলিমের দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি নিশ্চিন্ত থাক, আমি সব ব্যবস্থা করছি।ম্যানেজার সাহেব চলে যাওয়ার উপক্রম করলে সেলিম বলল, আর একটা কথা, আজ রাত্রে সব অফিস স্টাফকে বিয়ের দাওয়াত দিবেন।ম্যানেজার সাহেব সম্মতি জানিয়ে চলে গেলেন।ম্যানেজার সাহেব চলে যাওয়ার পর লাইলী সেলিমকে বলল, আমার প্রাণের সই সুলতানা এখানে আছে। তার স্বামী এখানকার মেডিকেল কলেজের মেডিসিনের পফেসর। তাদেরকে দাওয়াত দিয়ে আনার ব্যবস্থা কর। তা না হলে সই ভীষণ মনে কষ্ট পাবে।সেলিম বলল, তোমার সই তো আমাকে চেনে না। তুমি বরং একটা চিঠি লিখে দাও।তা দিচ্ছি, তবে আমার সই তোমাকে চেনে।তা চিনতে পারে। কত মেয়েই তো আমাকে চেনে। অথচ আমি তাদের অনেককে চিনি না।লাইলী একটা চিঠি লিখে সেলিমের হাতে দিল।সেলিম চিঠি নিয়ে ঠিকানা অনুযায়ী গিয়ে দরজা নক করল।খালেদ মেডিকেলে চলে গেছে। সুলতানা ময়নার মাকে রান্নার আইটেম বাতলে দিয়ে এসে একটা গল্পের বই পড়ছিল। অসময়ে দরজায় আওয়াজ শুনে বিরক্তির সঙ্গে দরজা খুলে সেলিমকে দেখে অবাক হয়ে বলল, সেলিম ভাই তুমি? এতদিন কোথায় ছিলে? এস ভিতরে এস।সেলিম ভিতরে এসে ভাবল, লাইলীর কথাই ঠিক। মেয়েটি আমাকে চেনে অথচ আমি তাকে চিনি না। কিন্তু এ কেমন করে হয়? শেষে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, আমাকে চিনলেন কেমন করে? অথচ আমি আপনাকে তো চিনি না।সুলতানা বলল, তুমি আমাকে আপনি করে বলছ কেন? আমি ছেলেবেলা থেকে তোমাকে চিনি। আর সঙ্গে কয়েকবার তোমাদের বাসায় গেছি। তোমার আর সঙ্গে আমাদের দূরের কি রকম একটা সম্পর্ক ছিল। সে তো ছোটকালের কথা। বড় হয়ে ভার্সিটিতে তোমাকে অনেক দেখেছি। তা ছাড়া আমার সই এর লাভার হিসাবে তোমাকে আরও বেশি চিনি।সেলিম বলল, এখন বুঝলাম। তারপর লাইলীর চিঠিটা বের করে সুলতানার হাতে দিল। এবার সুলতানার অবাক হওয়ার পালা। চিঠি খুলে পড়তে লাগল—সই, আল্লাহপাকের দরবারে লক্ষ লক্ষ শুকরিয়া জানিয়ে তোকে জানাচ্ছি যে, এক্ষুণি আমাদের শুভ কাজ হতে যাচ্ছে। তুই চিঠি পেয়েই সয়াকে সাথে নিয়ে ওর সঙ্গে চলে আসবি। সাক্ষাতে সব কিছু বলব।ইতি–তোর সই লাইলী।চিঠি ভাঁজ করে সেলিমের দিকে চেয়ে বলল, সুবহান আল্লাহ। আল্লাহ তোমার কুদরত বোঝা মানুষের অসাধ্য। যাই হোক, সই এর যখন হুকুম তখন অমান্য করতে পারি না। চা পাঠিয়ে দিচ্ছি খাও, আমি ততক্ষণে তৈরী হয়ে নিই। কথা শেষ। করে কিচেনে গিয়ে ময়নার মাকে মেহমানকে চা দিতে বলল। তারপর স্বামীকে ফোন করে সংক্ষেপে সব কিছু বলে এক্ষুণি বাসায় আসতে বলল। তারপর পোশাক পরিবর্তন করে সেলিমের কাছে এসে তার অতীত জীবনের সমস্ত কথা শুনতে লাগল।ঘন্টা খানেকের মধ্যে খালেদ এসে গেল। সেলিমের সঙ্গে সালাম ও পরিচয় বিনিময়ের পর সকলে রওয়ানা হল।ম্যানেজার সেলিমের কাছ থেকে ফিরে এসে অফিসের সমস্ত ষ্টাফকে নিজের রুমে ডেকে পাঠালেন। সকলে এলে ম্যানেজার সাহেব বললেন, আপনাদেরকে একটা আশ্চর্যজনক আনন্দ সংবাদ জানাবার জন্য ডেকেছি। আমাদের এখানে যে মেয়েটা ষ্টেনোর কাজ করছে, সে আমাদের সাহেবের বাগদত্ত। সাহেব এ্যাকসিডেন্ট করে বিদেশে চিকিৎসার জন্য চলে গেলে, মেয়েটি ভাগ্যের ফেরে না জেনে এখানে চাকরি নেয়। সাহেব অফিসে আপনাদের সবার বায়োডাটা দেখার সময় মেয়েটির ফটো দেখে চিনতে পারে। আর আমাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারে, সে কক্সবাজার বেড়াতে গেছে। তাই সেদিন বিকেলে কক্সবাজারে গিয়ে তাকে নিয়ে ফিরে এসেছে। আজ তার সঙ্গে সাহেবের সন্ধ্যার পর বিয়ে হবে। আপনারা সকলেই বিয়েতে আমন্ত্রিত।ম্যানেজারের কথা শুনে সকলে আশ্চর্য হয়ে নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে লাগল, আমরা মেয়েটিকে যা-তা বলে খুব অন্যায় করেছি।তাদেরকে ফিস ফিস করে কথা বলতে শুনে ম্যানেজার সাহেব আবার বললেন, আপনারা এখন যে যার কাজ করুন গিয়ে, সন্ধ্যার পর সকলেই বাসায় আসবেন।সেলিম সুলাতানা ও খালেদকে নিয়ে ফিরে এল। ওরা ড্রইংরুমে এসে বসল। লাইলী সুলতানাকে নিয়ে বেডরুমে ঢুকে জড়িয়ে ধরে বলল, সই, আমি যে এখনও নিজেকে বোঝাতে পারছি না, এটা বাস্তব না স্বপ্ন।সুলতানা বলল, আমিও তোর চিঠি পেয়ে অবাক হয়ে ভাবলাম, এটা বাস্তব না স্বপ্ন। এখন দেখছি সব বাস্তব। আল্লাহ তোদের সুখী করুক ভাই। একটা সোনার নেকলেস ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে বের করে লাইলীর গলায় পরিয়ে দিয়ে বলল, এটা আমাদের তরফ থেকে তোকে উপহার দিলাম।শুধু শুধু এত দামী জিনিষ দিতে গেলি কেন তোর ভালবাসাকে আমি এর চাইতে দামী মনে করি।সেই ভালবাসার নমুনা স্বরূপই তো এটা তোকে উপহার দিলাম। যাকে ভালবাসি, তাকে কি আর কম দামী জিনিষ দিতে পারি?তোর খালেদ সাহেবের চেয়েও কি আমাকে বেশি ভালবাসিস? বলে হেসে ফেলল।দূর পাগলী, তোকে আর তাকে ভালবাসার মধ্যে অনেক পার্থক্য।সে আবার কি রকম?অত ন্যাকা সাজিসনি। তবু বলছি শোন, তুই তো খালাম্মা আর সেলিমকে খুব ভালবাসিস। কেউ যদি তোকে জিজ্ঞেস করে, দুজনের মধ্যে কাকে বেশি ভালবাসিস, তখন কি বলবি?বলব দুজনকেই বেশি ভালবাসি। এই কথায় দুজনেই হেসে উঠল।বিয়ে পড়াবার আগে সুলতানা সইকে মনের মত করে সাজাল। তারপর ড্রেসিং টেবিলের আয়নার কাছে নিয়ে গিয়ে বলল, দেখতো সই, ঐ মেয়েটিকে চিনতে পারিস কি না?লাইলী আয়নার দিকে চেয়ে সত্যি নিজেকে চিনতে পারল না। তার মনে হল, আয়নার মেয়েটি অন্য কেউ, লাইলী নয়।কিরে চুপ করে আছিস কেন তারপর গাল টিপে দিয়ে বলল, সত্যি আল্লাহ তোকে এত রূপ দিয়ে বানিয়েছেন, সে আর কি বলব। তিনি যদি আমাকে পুরুষ করে বানাতেন তা হলে তোকে হাইজ্যাক করে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করতাম। সেলিম খুব ভাগ্যবান। তার ভাগ্যকে আমি মেয়ে হয়েও হিংসা করছি।লাইলী নিজের প্রশংসা শুনে লজ্জা পেয়ে বলল, তুই বুঝি দেখতে খারাপ, তোর মত রূপ কটা মেয়ের আছে শুনি।তোর কথা মানি, কিন্তু আমার সই অদ্বিতীয়া।রাত্রি এগারোটায় বিয়ের কাজ ও খাওয়া-দাওয়া মিটে গেল। আমন্ত্রিত অতিথিরা সব বিদায় নিয়ে চলে গেল। শুধু খালেদ স্ত্রীকে নিয়ে যাবে বলে খালেদ বরবেশি সেলিমের সঙ্গে উইংরুমে বসে বসে গল্প করতে লাগল। সুলতানা বাসর ঘর সাজাতে ব্যস্ত। একটু পরে লাইলীকে বাসর বিছানায় বসিয়ে রেখে ড্রইংরুমে এসে সেলিমের হাত ধরে সীত হাস্যে বলল, চল ভাই, তোমার প্রিয়তমা তোমার জন্যে অপেক্ষা করছে। যাওয়ার সময় স্বামীর দিকে চেয়ে বলল, তুমি একটু অপেক্ষা কর, আমি কপোতকে কপোতীর কাছে দিয়ে এক্ষুণি আসছি। তারপর এক রকম জোর করে সেলিমকে নিয়ে এসে বাসর ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, আল্লাহপাকের উপর ভরসা করে আমার সইকে তোমার কাছে দিয়ে গেলাম। দেখবেন, সে যেন কোনো বিষয়ে কষ্ট না পায়। কষ্ট দিলে ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। আল্লাহ তোমাদের সুখি করুন। আজ আসি আবার দেখা হবে। তারপর আল্লাহ হাফেজ বলে দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে স্বামীর কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, কি গো, আমার সই-এর বাসর রাত্রির কথা ভেবে তোমারও কী আমাকে নিয়ে বাসর করার ইচ্ছে হচ্ছে নাকি।খালেদ হেসে বলল, তোমার অনুমান ঠিক। তবে আমার মন বলছে, তোমার মনের ইচ্ছটা আমার উপর দিয়ে বলে ফেললে। তারপর লাইলীর মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দুজনে হাসতে হাসতে বাসায় ফেরার জন্য গাড়িতে উঠল।সেলিম বাসর ঘরে ঢুকে লাইলীর দিকে চেয়ে এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। যখন বুঝতে পারল সুলতানা ও খালেদ চলে গেছে, তখন ধীরে ধীরে খাটের কাছে গেল। লাইলী খাটের উপর বসে তার দিকে চেয়ে ছিল। সেলিম এগিয়ে এসে খাটের কাছে দাঁড়াতে খাট থেকে নেমে তার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল।সেলিম তাকে দুহাতে পাজাকোলা করে তুলে নিয়ে তার কপালে চুমু খেয়ে সুবহান আল্লাহ বলে তার দিকে অপলক নয়নে চেয়ে রইল। সে লাইলীর রূপের ঐশ্বর্যের মধ্যে ডুবে গেল। আগেও তো সে কতবার দেখেছে, কিন্তু এখনকার লাইলী যেন অন্য মেয়ে। তার মনে হল, বেহেস্তের হুর আসমান থেকে নেমে এসে তার হাতে ধরা দিয়েছে। বিয়ের পোশাকে ও নানারকম অলঙ্কারে সজ্জিত লাইলী যেনআসমান জমিনের সব রূপ কেড়ে নিয়েছে। সেলিম সেই রূপের সাগরে তলিয়ে গিয়ে। বাহ্যিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।অনেকক্ষণ ঐভাবে তাকে নিয়ে সেলিমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লাইলী তার পূর্ব অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারল, সেলিম নিশ্চয় বাহ্যিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। সে তখন দু হাত দিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে মুখে মুখ ঘসে বলল, এই, তোমার কষ্ট হচ্ছে না? হাত ব্যাথা করবে তো, আমাকে নামাও না। তবু যখন সেলিমের হুঁস হল না তখন সেলিমের ঠোটু নিজের মুখের মধ্যে নিয়ে আস্তে কামড়ে ধরে রইল।এবার সেলিম সজ্ঞানে ফিরে এল। তারপর সে লাইলীর সারা মুখে চুমোয় ভরিয়ে দিয়ে শেষে তার লাল গোলাপী ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ফিস ফিস করে বলল, তুমি আমার ঠোঁট কামড়ে দিয়েছ, আমি তার শোধ তুলে নিই?লাইলী মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে লজ্জায় চোখ বন্ধ করে নিল। সেলিম তার নরম তুল তুলে ঠোঁটে নিজের ঠোঁট দিয়ে একটু চাপ দিয়ে বলল, সেই আল্লাহপাকের দরবারে কোটি কোটি শুকরিয়া জানাই, যিনি তোমাকে আমার সহধর্মিণী করেছেন। তারপর খাটে বসে লাইলীকে কোলের উপর রেখে জিজ্ঞেস করল, বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ায় আমার প্রতি তোমার খুব রাগ হয়েছিল তাই না?লাইলী অপূর্ণ চোখে তার দিকে চেয়ে বলল, আমার অন্তর্যামী জানেন, আমি তোমার কখনো দোষ খুঁজেছি কি না বা তোমাকে দোষী মনে করেছি কি না। ভেবেছি, আমার মত হতভাগিণী তোমার অযোগ্য, তাই এইরূপ হয়েছে। আজ যদি আব্বা বেঁচে থাকতেন, তা হলে সব থেকে বেশি খুশি হতেন।সেলিম তার টস টসে রক্তিম গোলাপী ঠোঁটে আঙ্গুল ঠেকিয়ে বলল, চুপ। তোমাকে একদিন বারণ করেছিলাম না, নিজেকে কোনোদিন হতভাগিণী বলবে না? তারপর অধরে অধর ঠেকিয়ে বলল, প্রতিজ্ঞা কর, আর কখনও একথা বলবে না।লাইলী আস্তে করে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।সেলিম লাইলীকে পাশে বসিয়ে বলল, এস চাচাজানের রূহের মাগফেরাত কামনা করে আল্লাহপাকের দরবারে দোয়া চাই। মোনাজাত শেষে লাইলী স্বামীর দুটো হাত নিজের মাথায় রেখে বলল, তুমি দোয়া কর, আমি যেন কখনও তোমার প্রেমের অমর্যাদা না করি।সেলিম দোয়া করে বলল, আমি সত্যি তোমাকে নিজের করে পেয়েছি, না এখন ও স্বপ্ন দেখছি।লাইলী তার বুকে মাথা রেখে বলল, আল্লাহপাক যেন সারাজনম আমাদের এই স্বপ্ন না ভাঙ্গেন।সেলিম লাইলীর কাছ থেকে সব ঘটনা জেনে নিয়ে বলল, ঐ রকম একটা চিঠি মাও পেয়েছে। মা যেদিন চিঠি পায়, সেদিন আমি এ্যাকসিডেন্ট করি। তাই সে তোমাকে অপয়া ভেবে বিয়ে ভেঙ্গে দেয়। আমি মায়ের সে ভুল ভাঙ্গিয়ে দেব। তুমি মায়ের উপর মনে কোনো কষ্ট রাখনি তো?লাইলী বলল, আব্বা যেদিন গহনা ফেরৎ দিয়ে এলেন, সেদিন রাত্রেই হার্টের ব্যাথায় মারা যান। তখন খালা আম্মাকে দায়ী মনে করে তার উপর আমার মনে কষ্ট হয়েছিল, কিন্তু পরে যখন আমার বিবেক বলল, কারুর মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী হয় না, হায়াত মউত একমাত্র আল্লাহপাকের হাতে। তুমি না তকদীর বিশ্বাস কর? তিনি যদি তোমাকে তার জোড়া করে পয়দা করে থাকেন, তা হলে বিয়ে ভেঙ্গে গেলেও জোড়া লাগতে কতক্ষণ তিনি সর্বশক্তিমান। যখন যা কিছু করার ইচ্ছে করেন, তখন শুধু বলেন, হও, আর তা তখুনি হয়ে যায়। এইসব চিন্তা করার পর থেকে তার প্রতি আমার মনের কষ্ট দূর হয়ে গেছে।সেলিম লাইলীকে জড়িয়ে ধরে আবার সারামুখে চুমোয় ভরিয়ে দিয়ে বলল, আল্লাহপাক তার এক প্রিয় বান্দীর স্বামী করে আমাকে ধন্য করেছেন। সেই জন্যে আবার তার দরবারে লাখ লাখ শুকরিয়া জানাচ্ছি।লাইলীও তার স্বামীর সোহাগের প্রতিদান দিয়ে বলল, ইয়া আল্লাহ, তুমি তোমার এই নগণ্য বান্দীকে স্বামীর খেদমত করে তাকে সুখী করার তৌফিক দাও।সে রাত্রে তারা ঘুমোতে পারল না। সারারাত প্রেমালাপ করে কাটাল। দুজনেরই মনে হয়েছে ঘুমিয়ে পড়লে যদি এই মধুময় স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। ফজরের আজান শুনে সেলিম বলল, আল্লাহপাক আজকের রাতটাকে বড় ছোট করে তৈরি করেছেন।লাইলী মৃদু হেসে বলল, সুখের রাত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়। তারপর দুজনে একসঙ্গে ফজরের নামায পড়ে সেলিম বলল, এস, এবার একটু ঘুমিয়ে নিই।লাইলী বলল, উঠতে বেলা হয়ে গেলে মা কি মনে করবেন? আমার লজ্জা করবে না বুঝি?সেলিম বলল, মা সবকিছু জানেন। উনি কিছু মনে করবেন না। তারপর তারা আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।লাইলীর যখন ঘুম ভাঙল তখন দেয়াল ঘড়িতে ঢং ঢং আওয়াজ করে বেলা নটা ঘোষণা করল। দেখল, এখনও সেলিম তাকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। তার ঠোঁটে আস্তে করে একটা হাম দিয়ে খুব ধীরে ধীরে নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে বাথরুমে গেল। ফিরে এসে ড্রেস চেঞ্জ করে সেলিমের পাশে বসে তার পায়ে হাত বুলিয়ে ঘুম ভাঙাবার চেষ্টা করল।সেলিমের ঘুম ভেঙে গেল। ধীরে ধীরে চোখ খুলে লাইলীকে বুকে টেনে নিল।কিছুক্ষণ স্থির থেকে লাইলী বলল, এই, এবার উঠে পড়। সাড়ে নয়টা বাজে, আমি এখন মায়ের কাছে যাব কি করে? ভীষণ লজ্জা করছে।সেলিম তাকে আদর করতে করতে বলল, একজন পুরুষের বুকের উপর শুয়ে থাকতে লজ্জা করছে না বুঝি?লাইলী বলল, ধ্যেৎ, তুমি পুরুষ হতে যাবে কেন?তা হলে আমি কি মেয়ে মানুষ?মেয়ে মানুষও না পুরুষও না। তুমি যে আমার শাহানশাহ। আর আমাকে আল্লাহপাক সেই শাহানশাহর চরণের সেবা করার জন্য আইনের মাধ্যমে বেঁধে দিয়েছেন। তারপর তার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে বলল, এভাবে অনন্তকাল থাকতে চাই, কিন্তু কর্তব্য বলে তো একটা কথা আছে। সোনা যে, এবার উঠে হাতমুখ ধুয়ে নাও। এখানে মা না থাকলে তোমাকে ছেড়ে উঠতাম না।তোমার সাথে তর্কে কোনোদিন পারব না বলে সেলিম উঠে বাথরুমে গেল। ফিরে এলে লাইলী তোয়ালে এগিয়ে দিল।সেলিম বলল, মায়ের কাছে যাবে না।লাইলী বলল, যাব তো; কিন্তু একজন ভদ্রলোক আমাকে এমন বিপদে ফেলেছেন যে, আমি এখন লজ্জায় মায়ের কাছে যেতে পারছি না।তা হলে তো ভদ্রলোকটার শাস্তি হওয়া উচিৎ। দেবে নাকি শাস্তি বলে সেলিম মুখটা তার ঠোঁটের কাছে নিয়ে গেল।লাইলী তার ঠোঁটে খুব আস্তে করে কামড়ে দিতে সেলিম ওকে জাপটে ধরল। লাইলী বলল, অপরাধ বেশি হয়ে যাচ্ছে।সেলিম বলল, আমিও শাস্তি বেশি পেতে চাই।লাইলী বলল, হার মানছি, প্রীজ ছেড়ে দাও। চল দুজনে আম্মাকে সালাম করব। কালকেই সালাম করা উচিৎ ছিল। কিন্তু আমরা নিজেদেরকে নিয়ে এমনই মশগুল ছিলাম যে, সে কথা কারুরই মনে আসেনি। তার দোয়া নেওয়া উচিত।সেলিম তাকে আলিঙ্গন মুক্ত করে বলল, চল। তারপর বলল, সত্যি তোমার বুদ্ধির তারিফ না করে পারছি না। আল্লাহ তোমাকে রূপের সঙ্গে সবকটা গুণও দিয়েছেন। আর দেরি করে লাভ নেই বলে সে তার হাত ধরে এগোতে গেল।লাইলীকে দাঁড়িয়ে মিটি মিটি হাসতে দেখে বলল, কি হল যাবে না?শুধু গেঞ্জী গায়ে দিয়েই যাবে নাকি?সেলিম নিজের শরীরের দিকে চেয়ে বলল, তাই তো লাইলী ততক্ষণে তার জামাটা এনে হাতে দিল। তারপর দুজনে মায়ের ঘরে গেল।হামিদা বানু জাভেদের সঙ্গে নাস্তা তৈরী করে সবেমাত্র বসে বসে মেয়ের ভাগ্যের কথা চিন্তা করছিলেন। তাদেরকে আসতে দেখে বললেন, এস বাবা এস।ওরা পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল।হামিদা বানু দুজনকে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমা খেয়ে দোয়া করলেন, আল্লাহপাক তোমাদের দুজনকে অক্ষে ওশ্মর করুন। তোমাদের সুখী করুন। লাইলীর আব্বা বেঁচে থাকলে বড় খুশি হতেন।সেলিম বলল, আল্লাহপাক তার রূহের মাগফেরাত দিন। তাঁকে কাঁদতে দেখে সেলিম আবার বলল, আম্মা, আপনি কাঁদবেন না। সবকিছু আল্লাহপাকের ইচ্ছা। তারপর লাইলীকে বলল, তুমি নাস্তার ব্যবস্থা কর।হামিদা বানু চোখ মুখ মুছে বললেন, তোমরা এখানে বস, নাস্তা তৈরি আছে। আমি জাভেদকে নিয়ে আসছি।নাস্তা খেয়ে রুমে ফিরে এসে সেলিম বলল, নিচেই তো অফিস। যাওয়ার পারমিসান চাই। দর হলে আজ অবশ্য যেতাম না।লাইলী জামা-কাপড় এগিয়ে দিয়ে বলল, তোমার অফিসের ষ্টেনো কি করবে? তার চাকরি আছে তো?সেলিস বলল, সে ম্যানেজার সাহেবের ষ্টেনো ছিল। তাকে মালিক প্রমোশন দিয়ে পার্টনার করে নিয়েছে। এখন সেও কোম্পানীর মালিক। মালিক তো আর নিজের অফিসে ষ্টেনোর কাজ করতে পারে না।লইলী বলল, দুজন মালিকের মধ্যে একজন যখন অফিসের স্টাফের মত কাজ করতে পারে, তখন অন্যজনই বা পারবে কেন।দোষ আছে বলে আমি বলছি না। অন্য জন পুরুষ হলে কোনো কথা ছিল না। তিনি একজন মহিলা। যিনি বর্তমানে একজনের স্ত্রী। বিয়ের পর মেয়েদের আগের জীবনের সবকিছু পরিত্যাগ করে স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখার কাজ করবে।লাইলী এরপর আর কিছু বলতে পারল না। কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে থেকে বলল, ঠিক একটায় আসবে কিন্তু। তারপর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে উঠে দাঁড়াল।সেলিম তাকে জড়িয়ে ধরে তার গোলাপী নরম ঠোঁটে চুমো খেয়ে বলল, তাই হবে, আসি, আল্লাহ হাফেজ।লাইলীও বলল, আল্লাহ হাফেজ।প্রতিদিন অফিসের পর সেলিম লাইলীকে নিয়ে বেড়াতে যায়। ছুটির দিনে সুলতানাদের বাসায় হৈ হুল্লোড় করে দিন কাটায়।বিয়ের পর লাইলী সব কিছু জানিয়ে রহিমা ভাবিকে চিঠি দিয়েছে। তারা লাইলীর পত্র পেয়ে আল্লাহর কাছে শোকর গুজারী করেছে।একদিন লাইলী স্বামীকে বলল, আম্মাকে পত্র দিয়ে তোমাদের বাড়ির সবাইকে আমাদের বিয়ের কথা জানাবে না?সেলিম বলল, না, আর কয়েকদিন পর দুজনে এক সঙ্গে গিয়ে সবাইকে অবাক করে দেব। সেইজন্য ম্যানেজারকেও জানাতে নিষেধ করে দিয়েছি।প্রায় মাসখানেক পর সেলিম আরিফের টাঙ্কল পেল, মা খুব অসুস্থ, তুমি আজই আসবার চেষ্টা করবে। সেলিম ম্যানেজারকে ডেকে বলল, মা অসুস্থ, আরিফ ট্রাঙ্কল করেছে। আমি আজই যেতে চাই। আপনি বিমান অফিসে ফোন করে দেখুন, তিনটে সীট পাওয়া যাবে কিনা। যদি না পাওয়া যায়, তা হলে গাড়ি নিয়ে যাব। আপনি তাড়াতাড়ি ব্যাবস্থা করুন।ম্যানেজার সাহেব বিমান অফিসে ফোন করে জেনে বলেন, একটা সীটও খালি নেই।সেলিম বলল, ঠিক আছে আমি গাড়ি নিয়ে যাব।স্বামীকে দুপুরের আগেই মন ভার করে আসতে দেখে লাইলী সালাম দিয়ে এগিয়ে এলে তার একটা হাত ধরে জিজ্ঞেস করল, তোমার কী শরীর খারাপ?সেলিম সালামের জবাব দিয়ে তাকে উদ্বিগ্ন হতে দেখে জড়িয়ে ধরে বলল, আরিফ ট্রাঙ্কল করেছে, মায়ের অসুখ। আমি এক্ষুণি রওয়ানা হতে চাই। প্লেনে সীট নেই, তাই ঠিক করেছি, অফিসের গাড়ি নিয়ে যাব।সেলিমের কথাগুলো লাইলীর কানে কান্নার মতো শোনাল। তার বুকে মাথা রেখে বলল, আল্লাহপাক আম্মাকে সহিসালামতে রাখুন। তুমি হাত মুখ ধুয়ে খেয়ে একটু বিশ্রাম নাও। আমি মাকে নিয়ে সবকিছু গুছিয়ে নিচ্ছি।সেলিম সবাইকে নিয়ে বেলা দুটোয় রওয়ানা দিল। গাড়িতে লাইলী জিজ্ঞেস করল, আরিফ কে?সেলিম বলল, আরিফ আমার ছোট ভাই। ম্যাটিক পাশ করে ধর্মের দিকে খুব ঝুঁকে পড়ে। ধর্মের জ্ঞান আহরণের জন্য আজ থেকে প্রায় পাঁচ ছ বছর আগে কাউকে কিছু না জানিয়ে দেওবন্দ চলে গিয়েছিল। সেখানে পড়াশুনা শেষ করে মাস দুয়েক হল ফিরে এসেছে।রাত্রি আটটায় ওরা ঢাকার বাড়িতে এসে পৌঁছাল। গাড়ির শব্দ শুনে আরিফ, রুবীনা ও আসমা ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তারা এতক্ষণ সোহানা বেগমের কাছে ছিল। তার আজ এক সপ্তাহ খুব জ্বর। গতকাল ডাক্তার বলেছে, টাইফয়েডের লক্ষণ। তাই আরিফ সেলিমকে আসার জন্য ট্রাঙ্কল করেছিল। সেলিমের সঙ্গে লাইলীকে এবং আধা বয়সী একজন মহিলাকে দেখে ওরা সবাই অবাক হয়ে গেল।সেলিম আরিফের সঙ্গে সালাম বিনিময় করে লাইলীকে দেখিয়ে বলল, তোদের ভাবি, আর উনি আমার শ্বাশুড়ী।আসমা একরকম ছুটে এসে লাইলীকে জড়িয়ে ধরে বলল, ভাবি আপনি কেমন আছেনসেলিম বলল, আসমা কি হচ্ছে? আগে মায়ের কাছে চল, মা কেমন আছে?আসমা ভাবিকে ছেড়ে দিল। আরিফ ডাক্তারের কথাগুলো বলল। সকলে সোহানা বেগমের ঘরে এসে ঢুকল। উনি শুয়ে ছিলেন। জ্বর এখন একটু কম, রাত্রে বেশি বাড়ে। ওদের দেখতে পেয়ে আস্তে আস্তে উঠে হেলান দিয়ে বসলেন।সেলিম মায়ের পায়ের কাছে বসে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে বলল, তুমি এখন কেমন আছ মা সোহনা বেগম ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে চুমো খেয়ে বললেন, এখন একটু সুস্থ বোধ করছি।ততক্ষণে লাইলী এসে সোহানা বেগমের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, আপনি আমাদের দুজনকে মাফ করে দিন মা।সোহানা বেগম সবকিছু বুঝতে পারলেন। তিনি লাইলীকে জড়িয়ে ধরে তার মাকে কাছে এসে বসতে বলে বললেন, তোমরা কোনো অন্যায় করনি। যা কিছু করেছি আমি। তোমাদেরকে ভুল বুঝেছিলাম। সেলিম ভালো হয়ে সেদিন যে কথা বলেছে, তাতেই আমার ভুল ভেঙ্গে গেছে। তারপর হামিদা বানুর হাত ধরে বললেন, বেয়ান সাহেবা, আপনি আমাকে মাফ করে দিন। লাইলীর আব্বা এলেন না যে, তিনি বুঝি এখনও আমার উপর রাগ করে আছেন?সেলিম বলল, মা তিনি অনেকদিন আগে ইন্তেকাল করেছেন।সোহানা বেগম অশ্রুসিক্ত নয়নে বললেন, আল্লাহ তার ভালো করুন। সেদিন তার প্রতি ভালো ব্যবহার করিনি। তার কাছে ক্ষমা চাওয়া হল না। তারপর আঁচলে চোখ মুছে সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, হ্যারে, এ বাড়ির বড় বৌ প্রথম বাড়িতে এল, তোরা একটু আনন্দ করবি না? আরিফকে বললেন, তুই দোকান থেকে মিষ্টি আনতে দে। আর তোমরা সব দাঁড়িয়ে আছ কেন? বৌমাকে তার ঘরে নিয়ে যাও, অনেক দুর থেকে এসেছে, বিশ্রাম করুক।লাইলী বলল, আম্মা, আপনি ওসব নিয়ে কিছু ভাববেন না। তারপর সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল, তোমরা এখন এ ঘর থেকে যাও। অসুস্থ শরীরে মানসিক টেনশন এলে মায়ের ক্ষতি হতে পারে।লাইলীর কথায় যেন একটা আদেশের সুর রয়েছে। আর কথাটা এমনভাবে বলল, তা কেউ অমান্য করতে পারল না। সেলিম সবাইকে নিয়ে চলে গেল।সকলে বেরিয়ে যাওয়ার পর লাইলী শাশুড়ীর বিছানা ঝেড়ে ঠিক করে দিয়ে তাকে শুইয়ে দিল। চার্ট দেখে ঔষধ খাইয়ে টেম্পারেচার দেখে চার্টে লিখে রাখল। তারপর পায়ের কাছে বসে পায়ে হাত বুলোত বুলোতে বলল, আপনি আর একদম কথা বলবেন না, ঘুমোবার চেষ্টা করুন। আমি ঠিক সময় মত পথ্য ও ঔষধ খাওয়াব।সোহানা বেগম নিজেকে সংযত করতে পারলেন না। তার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। ধরা গলায় বললেন, ঠিক যেন আমার মা। জান মা, ছোট বেলায় আমার যখন জ্বর জ্বালা হত তখন আমার মাও ঠিক এই রকম করত।লাইলী মিষ্টি ধমকের স্বরে বলল, আপনাকে কোনো কিছু চিন্তা করতে ও কথা বলতে নিষেধ করলাম না? নিজের আঁচল দিয়ে তার চোখ মুছে দিয়ে আবার বলল, ঘুমোনার চেষ্টা করুন মা।সোহানা বেগম আর কথা বললেন না। চোখ বন্ধ করে চিন্তা করলেন, এত সুন্দর ও গুণবতী মেয়েকে ভুল বুঝে তার নামে কত দুর্ণাম দিয়েছি। আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন তিনি মেয়েটির মধ্যে কি জিনিষ দিয়েছেন মুহূর্তের মধ্যে সবাইকে বাধ্য করে ফেলল।লাইলী যখন বুঝতে পারল উনি ঘুমিয়ে গেছেন, তখন ধীরে ধীরে খাট থেকে নেমে কম্বলটা বুক পর্যন্ত টেনে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।এতক্ষণ আরিফ রুবীনা ও আসমা সেলিমের কাছ থেকে লাইলীকে কি করে খুঁজে বের করে বিয়ে করল, সে সব কথা শুনছিল।লাইলী সেখানে এসে দাঁড়াতে আরিফ প্রথমে তার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। তার দেখাদেখি আসমা ও রুবীনা করল।লাইলী বলল, আল্লাহ সবাইকে হেদায়েত দান করুন। তিনি আমাদের সবাইকে সব রকম বিপদ-আপদ থেকে হেফাজত করুন। তারপর বলল, রাত অনেক হয়েছে, আর গল্প নয়, সকলে এশার নামাজ পড়ে খাওয়া দাওয়ার কাজ সেরে নাও। মায়ের অসুখ, সে কথা সকলের মনে রাখা উচিৎ।আরিফ মাঝে মাঝে ভাবির দিকে না চেয়ে থাকতে পারছে না। দেখা অবধি ভাবিকে মানবী বলে বিশ্বাস করতে পারছে না। শুধু চিন্তা করছে, কোনো মানবী তো এত রূপবতী ও গুণবতী হতে পারে না। তার কথাগুলো যেন শুনতে মধুর মতো লাগে। তাকে সে মনের মধ্যে খুব উচ্চ আসনে বসিয়ে ফেলল।খাওয়া দাওয়ার পর লাইলী বিছানা ঠিক করে মশারী খাটিয়ে স্বামীকে বলল, তুমি ঘুমাও। আমি মায়ের কাছে থাকব।সেলিম বলল, তুমি ঘুমাও, আমি আমার মায়ের কাছে থাকব।বিয়ের পর স্বামীর সবকিছুর উপর স্ত্রীর অধিকার হয়ে যায়। উনি এখন আমারও মা। তা ছাড়া স্ত্রীর কর্তব্য স্বামীর আরামের দিকে সর্বদা লক্ষ্য রাখা।সেলিম কৃত্রিম রাগের সঙ্গে বলল, আর স্বামী বুঝি স্ত্রীর আরামের দিকে লক্ষ্য রাখবে না? আমি অতশত বুঝতে চাই না, তোমার সঙ্গে তর্কে কোনোদিন জিতেছি? আমিও তোমার সঙ্গে মায়ের কাছে থাকব। তোমার হুকুম বাড়ির সকলের উপর চালিও কিন্তু আমার উপর নয়। তা ছাড়া স্ত্রীর কর্তব্য স্বামীর হুকুম মেনে চলা।লাইলী মৃদু হেসে বলল, হয়েছে হয়েছে, বাবুর রাগ দেখ না? আমি আর কোনোদিন তোমার সঙ্গে তর্ক করব না। স্বামীর হুকুম সবসময় মেনে চলব।লাইলীর হাসিটা বিদ্যুতের মতো সেলিমের মনে আনন্দের ঝিলিক দিল। সে তাকে জড়িয়ে ধরে সোহাগ করতে করতে বলল, আমি তোমাকে ছেড়ে আর একটা রাতও থাকতে পারব না।লাইলী আবার মৃদু হেসে বলল, আমিও পারি নাকি? তুমি অনেক দূর থেকে গাড়ি চালিয়ে এসে ক্লান্ত হয়েছ। প্রথম অর্ধেক রাত্রি তুমি ঘুমাও, আমার ঘুম পেলে তোমাকে না হয় জাগিয়ে মায়ের কাছে রেখে এসে তারপর আমি ঘুমাব।সেলিম তার গালটা আস্তে করে টিপে ছেড়ে দিয়ে বলল, সব সময় জিতবেই, একবারও হারাতে পারলাম না। তারপর পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল।লাইলী মশারী খুঁচে দিয়ে শাশুড়ীর ঘরে এসে দেখল, তিনি তখনও ঘুমোচ্ছেন। মাথায় হাত দিয়ে বুঝতে পারল জ্বর বেশি উঠেছে। চার্টে লেখা আছে টেম্পারেচার বেশি উঠলে মাথায় বরফ দিতে হবে। লাইলী আইস ব্যাগে বরফভরে মাথায় দিতে লাগল।রাত তখন সাড়ে বারোটা, লাইলী আইস ব্যাগ শাশুড়ীর মাথায় ধরে বসে আছে। আরিফ ঘরে ঢুকে কয়েক মুহূর্ত লাইলীর শান্ত সৌম্য মুখের দিকে চেয়ে কাছে এসে বলল, ভাবি, আপনি এখনও জেগে আছেন? গত কয়েক রাত জেগে আজ একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এবার আপনি ঘুমোতে যান, আমি মায়ের কাছে বসছি।লাইলী বলল, ভাবিকে কেউ আপনি করে বলে না। তারপর বলল, তুমি ঘুমাওগে যাও। আমার জন্য ভেব না, মেয়েদেরকে রাত জেগে সেবা করার ক্ষমতা ও ধৈৰ্য্য দিয়ে আল্লাহপাক তৈরি করেছেন। রাত জাগলে পুরুষদের শরীর ভেঙ্গে যায়। তা ছাড়া তোমরা এতদিন মায়ের সেবা করেছ, এবার আমাকে কিছু করতে দাও। যাও সোনা ভাই, ঘুমাওগে যাও। বড়দের কথার অবাধ্য, সুবোধ ছেলেরা হয় না। আমার অসুবিধা হলে তোমার ভাইয়াকে ডেকে নেব।ভাবির কথা শুনে আরিফ মনে বড় শান্তি পেল। তখন তার ভাইয়ার সেদিনের কথা মনে পড়ল, “জানিস আরিফ, আমাদের সোসাইটির কলেজ ইউনিভার্সিটির কত মেয়ের সাথে তো পরিচিত হয়েছি, কিন্তু লাইলীর সঙ্গে তাদের তুলনা হয় না, লাইলী অনন্যা।”তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লাইলী আবার বলে উঠল, বড়দের কথার অবাধ্য হওয়া যে বেয়াদবী, তা তো তুমি আমার থেকে ভালো জান।আরিফ নিজেকে সংযত করতে পারল না, অশ্রুসিক্ত নয়নে ভক্তি গদগদ কণ্ঠে বলল, যাচ্ছি ভাবি, জীবনে কোনোদিন তোমার কথার অবাধ্য হওয়ার ধৃষ্টতা যেনআমার না হয়। তারপর হনহন করে চলে গেল।ফজরের আজান শুনে লাইলী নিজের ঘরে এসে স্বামীকে জাগিয়ে বলল, আজান হয়ে গেছে; তুমি নামায পড়ে মায়ের কাছে এসে বসবে। আমিও নামায পড়ব। এখনও বরফ দিতে হচ্ছে। রাত্রে জ্বর খুব বেশি উঠেছে, এখনও কমেনি। ডাক্তারকেও একবার কল দিতে হবে।সেলিম তাড়াতাড়ি করে উঠে বলল, তোমার প্রতি খুব অবিচার করলাম। আমি নিজের ছেলে হয়ে স্বার্থপরের মত ঘুমালাম। আর তুমি বৌ হয়ে আমার মাকে সারারাত জেগে সেবা করলে?লাইলী বলল, এতে তোমার কোনো অপরাধ হয়নি। তোমাকে বিশ্রাম করতে দেওয়া এবং মায়ের সেবা করা দুটোই আমার কর্তব্য। আমি তা করতে পেরে খুব আনন্দিত। এতে তোমার লজ্জা বা অনুশোচনা করার কিছু নেই।দিন-রাত চব্বিশ ঘন্টা লাইলী শাশুড়ির সেবা করে চলছে। তারই ফাঁকে ফাঁকে স্বামীর প্রতি কর্তব্যও করছে। এইভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে লাইলী শাশুড়ির সেবা করে চলল। প্রায় বিশ পঁচিশ দিন যমে মানুষে টানাটানি করার পর সোহানা বেগম এখন আরোগ্যের পথে।আরো কয়েক দিন পর একদিন সকালের দিকে হামিদা বানু সোহানা বেগমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মেয়ে জামাইকে সঙ্গে করে র্যাংকীন স্ট্রীটে নিজের বাড়িতে এলেন।সবাইকে দেখে রহিমা ও জলিল সাহেব খুশি হলেন। সেরেলা রহিমা তাদেরকে রান্না করতে দিল না। দুপুরে খুব ধুমধামের সঙ্গে খাওয়া দাওয়া হল। এক ফাঁকে রহিমা লাইলীকে একান্তে ডেকে নিয়ে বলল, কি সখি, সখাকে কেমন লাগছে? একেই বলে সত্যিকারের প্রেম। তা না হলে যার সঙ্গে একবার বিয়ে ভেঙ্গে যায়, তার সঙ্গেই আবার বিয়ে। হাদিসে আছে, সাতী সাধ্বী নারীর মনের বাসনা আল্লাহ পূরণ করেন। হাদিস তো মিথ্যা হতে পারে নালাইলী প্রথমে লজ্জায় কথা বলতে পারল না। একটু সময় নিয়ে বলল, দোয়া কর ভাবি, আমি যেন তাকে সুখী করতে পারি।জীবনে অনেক দুঃখ পেয়েছ। দোয়া করি ভাই, আল্লাহপাক তোমাদের দাম্পত্য জীবন সুখের করুন।সাদেক ও ফিরোজা লাইলীকে জড়িয়ে ধরে বলল, তুমি আমাদেরকে ছেড়ে দাদিকে নিয়ে কোথায় চলে গিয়েছিলে? আবার যাবে না তো?রহিমা ছেলে মেয়েকে বোঝাল, তোমাদের ফুপু আম্মার বিয়ে হয়ে গেছে। সে তো তার শ্বশুর বাড়িতে যাবেই। তবে তোমাদের দাদি থাকবেন।রাত্রে খাওয়া দাওয়ার পর হামিদা বানু কাঁদতে কাঁদতে মেয়ে জামাইকে বিদায় দিলেন।সেলিম বলল, মা আপনি কাঁদবেন না। যখনই আপনার মন খারাপ হবে অথবা প্রয়োজনবোধ করবেন তখনই খবর দেবেন। আমি ঘরে না থাকলেও আপনার মেয়ে চলে আসবে। ছেলের অপরাধ যদি না নেন, তা হলে বলি, আমার ইচ্ছা আপনি আপনার মেয়ের সঙ্গে সব সময় থাকুন। আপনিও আমার মা। ছেলেকে মায়ের সেবা করার সুযোগ দিয়ে আমাকে ধন্য করুন।সেলিমের কথা শুনে হামিদা বানু চোখের পানি রোধ করতে পারলেন না। বললেন, আল্লাহ তোমাদের সুখে রাখুন। তোমাকে আমিও ছেলের মত জানি। আমি স্বামীর ভিটে ছেড়ে অন্য জায়গায় গিয়ে শান্তি পাব না। আর তোমার মত জামাই পেয়েছিলে আমার নয়নের পূতলী লাইলীর জন্য কোনো চিন্তা নেই। তোমরা সময় করে দুজনে এসে আমাকে দেখা দিয়ে যেও। তা হলেই আমি খুশি হব, শান্তি পাব।লাইলী মাকে সালাম করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।সেলিম বলল, লাইলী তুমি কাঁদছ? কোথায় তুমি মাকে শান্তনা দেবে? তা না করে নিজেই ভেঙে পড়ছ?লাইলী সেলিমের কথা শুনে সামলে নিয়ে মাকে ছেড়ে দিয়ে তার চোখ বলল, তুমি কেঁদ না মা? কোনো চিন্তাও করো না, আমি প্রায়ই আসব।সেলিমও শাশুড়ির পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠল।কিছু দিনের মধ্যে সোহানা বেগম সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠলেন। তিনি লাইলীকে যতই দেখছেন ততই মুগ্ধ হচ্ছেন আর ভাবছেন, কে বলবে, সে একজন সাধারণ ঘরের মেয়ে। আচার-ব্যাবহারে, চাল-চলনে, কথা-বার্তায় এবং আদর আপ্যায়নে সর্ব বিষয়ে পারদর্শী। কেউ তার কোনো কিছুতে এতটুকু দোষ ধরতে পারেনি। লাইলীকে পত্রবধূ হিসাবে পেয়ে সোহানা বেগম যেমন আনন্দিত তেমনি গর্বিতও।কোটিপতির ছেলে সেলিম। উচ্চশিক্ষিত ও আল্টামডার্ণ সোসাইটিতে মানুষ হয়ে একটা গরিব ঘরের সেকেলে আনকালচার্ড মেয়েকে বিয়ে করেছে শুনে অনেক উচ্চশিক্ষিত ও আল্টামডার্ণ বন্ধু-বান্ধবী লাইলীকে দেখার জন্য তাদের বাড়িতে আসে। বন্ধুদের মধ্যে অনেকে তাদের সুন্দরী অর্ধনগ্ন বোন অথবা স্ত্রীকে সঙ্গে করে নিয়ে আসে সেলিমকে ক্রিটীসাইজ করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু যখন সেই আটপৌরে মেয়ে সাধারণ পোশাকে গায়ে মাথায় কাপড় দিয়ে স্বামীর সঙ্গে তাদের অভ্যর্থনা করে তখন তাকে দেখে, তার মার্জিত ভাষা শুনে ও সুমিষ্ট ব্যাবহারে তারা মুগ্ধ হয়ে যায়। তাদের সেই ঈর্ষা ও রাগ কোথায় যেন উড়ে যায়। অর্ধনগ্ন মেয়েরা তাদের শরীরের খোলা অঙ্গগুলো ঢেকে দেয়। তারা লাইলীকে যত দেখে, তার সঙ্গে যত কথা বলে ততই তারা আকৃষ্ট হতে থাকে। শেষে সবাই তাকে তাদের মনের উচ্চ আসনে বসায়, যেখানে কোনো হিংসা, বিদ্বেষ ও ক্রিটিসাইজ মনোভাবের স্থান নেই। বাড়ি ফেরার সময় প্রত্যেকে তাকে সাদর নিমন্ত্রণ করে। বন্ধুরা বলে, সত্যি সেলিম, তোর মতো ভাগ্য আর কারো হয় না। আলাহ তোদের দুজনকে ঠিক যেন এক বৃন্তে দুটো ফুল করে সৃষ্টি করেছেন। তোরা দুজনে একে অন্যের জন্য সৃষ্টি হয়েছিস। তোদের মতো এত সুন্দর মিল, সারা পৃথিবীতে আর আছে কি না সন্দেহ। ঐ দলে রেহানা আর মনিরুলও থাকে। তাদের মনেও আর কোনো ঈর্ষা বা রাগ নেই। লাইলীর ব্যাবহারে সব দূর হয়ে গেছে।একদিন রেহানা লাইলীকে আসমার কথা উত্থাপন করে সেদিনের ঘটনাটা বলল।লাইলী বলল, আসমার পরিচয় পেলে তুমি চমকে উঠবে। আর তোমার সেলিম ভাই-এর কথা যে বলছ, ওর চেয়ে চরিত্রবান ছেলে এ পৃথিবীতে আছে কি না সন্দেহ। তোমাকে একটা কথা বলি শোন, কখন পরের ছিদ অন্বেষণ করবে না বরং অন্যের ভালো গুণগুলো দেখবে। অন্যের কোনো দোষ দেখলে নিজের দিকে লক্ষ্য করবে। দেখবে তোমার সে দোষ আছে কিনা। যদি থাকে তবে তা সংশোধন করার চেষ্টা করবে। হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ (দঃ) বলিয়াছেন, “যে অন্যের দোষ পাঁচ জনের কাছে প্রকাশ না করে তার সম্মান বাঁচায়, কাল হাশরের ময়দানে আল্লাহ পাকও তার অনেক গুনাহ গোপন রাখবেন, যা মিজানের পাল্লায় দিলে সে জাহান্নামী হত।”(১)রেহানা লাইলীর কথা শুনে খুব খুশি হল। জিজ্ঞেস করল, আসমার পরিচয় পেলে চমকে উঠব কেনসে কথা এখন বলতে পারব না, তোমার ভাইয়ের নিষেধ। তবে চিন্তা কর না, খুব শিঘী তার পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়বে।মনিরুল ইদানিং এ বাড়িতে যাতায়াত শুরু করেছে। প্রায় প্রতিদিন রুবীনা কলেজ থেকে ফেরার সময় আসে। তার সঙ্গে গল্প করে। মাঝে মাঝে দুজনে গাড়ি নিয়ে বেড়াতে যায়।সেলিম এর মধ্যে কয়েকবার চিটাগাং গিয়েছে। দুই একদিনের বেশি সেখানে থাকতে পারে না। এক রাতে চিটাগাং থেকে ফিরে লাইলীকে বলল, মা তো ভালো হয়ে গেছে। তুমি এবার আমার সঙ্গে চিটাগাং চল। এ রকম দু’একদিন ছাড়া যাতায়াত করে অফিসের অনেক ক্ষতি হচ্ছে।লাইলী বলল, তুমি নিয়ে গেলেই যাব। তবে মায়ের শরীর আর একটু ইমপ্রুভ করলে তারপর গেলে ভালো হত।সেলিম বলল, বেশ তাই হোক। গৃহকর্তি লাইলী আরজুমান বানুর কথা কি অমান্য করতে পারি।তুমি আমার পুরো নাম জানলে কেমন করে।কেন কাবিননামা লেখার সময় জেনেছি। সত্যি তোমার নামটাও তোমার মতই অপূর্ব সুন্দর। যিনি তোমার এই নাম রেখেছিলেন, তাঁকে জানাই শত শত ধন্যবাদ।রেহানাও মনিরুলের মতো ঘন ঘন এ বাড়িতে আসতে শুরু করেছে। আগে সে সেলিমের সঙ্গে বেড়াতে যেত, ব্যটমিন্টন খেলত। এখন লাইলীর সঙ্গে গল্প করে। বিকেলে চায়ের আসরে গল্প বেশ জমে উঠে। লাইলী তাদেরকে কোরআন ও হাদিসের অনেক উপদেশ মূলক গল্প বলে এবং ইসলামের কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ইসলামের মহান আদর্শের দৃষ্টান্ত দেয়। সোহানা বেগমও সেই সব শোনেন লাইলার চেষ্টায় এবাড়ির সকলে নামাজ পড়ছে। শুধু রুবানা ধরব ধরব করছে।একদিন লাইলী দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর বিছানায় গা এলিয়ে বেহেস্তী জেওর বইটি পড়ছিল। সেলিম চিটাগাং গেছে।এমন সময় রেহানা ঘরে ঢুকে বলল, ভাবি ঘুমিয়ে গেছ নাকি রেহানা লাইলীর গুণে মুগ্ধ হয়ে তাকে মনেপ্রাণে ভালবেসে ফেলেছে। একদিন না দেখলে থাকতে পারে না। সে লাইলীর মহব্বতে ও তার কাছে ধর্মীয় জ্ঞান পেয়ে চাল চলন ও পোশাক-পরিচ্ছদ পরিবর্তন করে ফেলেছে। মন থেকে তার প্রতি হিংসা বিদ্ধেষ দূর করে দিয়েছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে। তাই প্রতিদিন বিকালে লাইলীর কাছে ছুটে আসে।লাইলী বিছানার উপর উঠে বসে বলল, না ভাই ঘুমোইনি। তারপর বইটি দেখিয়ে বলল, এটা পড়ছিলাম। তুমিও পড়ো। এতে মেয়েদের অনেক শেখার জিনিষ আছে। এস, বস। আজ যে বড় তাড়াতাড়ি এসে গেছ।রেহানা বলল, তুমি যে কি যাদু করেছ ভেবে পাইনি। সব সময় শুধু তোমার কথা মনে পড়ে। তারপর বিছানার উপর তার পাশে বসে আবার বলল, ভাবি বল না, তুমি যাদু জান কি না।লাইলী বলল, না ভাই ওসব কিছু জানি না। তবে তোমাকে আমিও খুব ভালবেসে ফেলেছি। ওসব কথা বাদ দাও, আজ তোমাকে দুএকটা কথা বলব, তুমি যদি মনে কিছু না কর।রেহানা বলল, তোমার কথায় আমি কিছু মনে করব না, তুমি নিশ্চিন্তে বল।লাইলী বলল, দেখ বোন, আমার প্রায় মনে হয়, ওকে যেন আমি তোমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছি। এই চিন্তাটা আমার অন্তরে সব সময় কাটার মত বিধে। আল্লাহপাকের কসম করে বলছি, তোমার প্রতি আমার এতটুকু দুষমনি মনোভাব ছিল না, আজও নেই। আর আল্লাহপাককে জানাই ভবিষ্যতেও যেন না হয়। হঠাৎ কি করতে কি হয়ে গেল। আমরা দুজন দুজনকে ভালবেসে ফেললাম। তুমি নিউমার্কেটে একদিন এব্যাপারে কিছু কথা বলেছিলে। কিন্তু তখন বড় দেরি হয়ে গেছে। তা ছাড়া তার আগে আমি জানতাম না তোমাদের দুজনের সম্পর্ক। যাই হোক, তোমার কথা শুনে আমি দুরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ওর কথা ভেবে পারিনি। আমি শত দুঃখ পেলেও সবকিছু সহ্য করতে পারতাম। কিন্তু তোমার দাদা তার অনেক আগে আমাকে স্পষ্ট করে বলেছিল, আলাহপাক ছাড়া দুনিয়ার কোনো শক্তি আমার কাছ থেকে তোমাকে দূরে সরিয়ে নিতে পারবে না। যদি তুমি নিজে সরে যাও তবে হয় আমি পাগল হয়ে যাব, নচেৎ আত্মহত্যা করে ফেলব। আমি তোমার দাদার পরিণতির কথা চিন্তা করে তোমার কথা রাখতে পারিনি। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও, নচেৎ চিরকাল এই অশান্তিতে ভুগব।রেহানা ভেজা কণ্ঠে বলল, তুমি ক্ষমা চেয়ে আমাকে আরো বেশি অপরাধী করো। তুমি যে কত মহৎ, তা অন্ধ মোহের বশবর্তী হয়ে তখন বুঝিনি। আল্লাহ তোমাকে সেলিম ভাই-এর উপযুক্ত করে সৃষ্টি করেছেন। আমার মতো মেয়ে তার উপযুক্ত নয়। আমি ঈর্ষা ও রাগের বশবর্তী হয়ে নিউমার্কেট যাতা করে বলেছি এবং ফাংশানের দিনে নানাভাবে অপমান করার চেষ্টা করেছি। সেইসব কথা এখন মনে হলে মরমে মরে যাই। আমার সেইসব দুর্মতির জন্য এখন তোমার কাছে মাফ চাইছি বলে লাইলীর হাত ধরে কেঁদে ফেলল।লাইলী রেহানাকে জড়িয়ে ধরে বলল, এ ব্যাপারে তোমার কোনো অন্যায় হয়নি। আর হলেও আমি কিছু মনে রাখিনি। আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। তারপর নিজের আঁচল দিয়ে তার চোখ মুছে দেওয়ার বলল, চল বারান্দায় গিয়ে চা খেতে খেতে গল্প করা যাবে। ঘর থেকে বেরোবার সময় বলল, তুমি যদি বল, তা হলে তোমার জন্য পাত্র দেখতে পারি। আমার হাতে একটা খুব ভালো ছেলে আছে। সব দিক থেকে সে তোমার উপযুক্ত। রেহানা কিছু না বলে শুধু তার দিকে একবার চেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে চায়ের টেবিলে এসে বসল।আরিফের জন্য মেয়ে ধোজ করা চলছে। সেদিন চায়ের টেবিলে সেও ছিল। লাইলী তাকে বলল, আমি তোমার জন্য একটা মেয়ে চয়েস করেছি।আরিফ বলল, একটা কেন হাজারটা চয়েস কর, তাতে কোনো আসে যায় না। কিন্তু মনে রেখ, আজকাল কলেজ-ইউনিভার্সিটির মেয়েরা ধর্ম মেনে চলা তো দূরের কথা, ধর্মের নাম শুনলেই নাক ছিটকায়।লাইলী বলল, সব মেয়েরা কি এক রকম হয়? হাতের পাঁচটা আঙ্গুল কি সমান? আমিও তো কলেজ-ভার্সিটিতে পড়েছি। তাদের মধ্যে ভালো মেয়েও আছে।আরিফ বলল, ভাইয়াই তোমার সঙ্গে তর্কে পারেনি, আর আমি তো কোন ছার। অতশত বুঝি না, আপটুডেট ডিসকো–মিসকো মেয়ে হলে আমি তো অসুখী হই, আর তোমাদের সাথেও বনিবনা হবে না। শেষে সকলেই অশান্তি ভোগ করব।লাইলী বলল, তা হলে তো তোমাকে তোমার ভাইয়ার মত গরিব ঘরের মেয়ে বিয়ে করতে হয়।তা হোক, তাতেও আমি রাজি। আমি কি তোমাদের বলেছি নাকি, বড়লোকের মেয়েকে বিয়ে করব?সোহানা বেগম সেখানে ছিলেন না। একটু আগে এসে দেওর ভাবির কথা শুনছিলেন। হেসে ফেলে আরিফকে উদ্দেশ্য করে বললেন, যে ধরনের মেয়ে আসুক না কেন, তুই যদি ঠিক থাকিস, তা হলে আমার মা লাইলী তাকে দুদিনেই মানুষ করে ফেলবে।আরিফ মায়ের কথা শুনে লজ্জা পেয়ে রেহানার দিকে একপলক চেয়ে পালিয়ে গেল। রেহানাও তার দিকে চেয়েছিল, দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল।লাইলী প্রায়ই লক্ষ্য করে ওরা মাঝে মাঝে একে অপরের দিকে গোপনে গোপনে তাকায়। আজকের ঘটনার পর থেকে তার মনে যেন একটু সন্দেহ হল।————-(১) বর্ণনায় আবু হোরাইরা (রাঃ)-তিরমিজী।
আসমা ফাষ্ট ডিভিসনে আই এ, পাশ করল। সেলিম তাকে জয়দেবপুরে কনভেন্ট স্কুলে প্রাইমারী সেকশানে মাষ্টারী পাইয়ে দিল। সে ছেলেকে নিয়ে সেখানে থাকে। আর প্রাইভেটে বি. এ পরীক্ষা দেবার জন্য পড়াশোনা করতে লাগল। প্রতি সপ্তাহে ছুটির দিনে ছেলেকে নিয়ে সে সেলিমদের বাড়িতে আসে। এক ছুটির দিন স্কুলে ফাংশান ছিল বলে আসতে পারল না। সেলিম গত রাত্রে বাড়ি ফিরেছে। দুপুর পর্যন্ত আসমা এল না। বেলা তিনটার দিকে মনিরুল এসেছে। সে আজ রুবীনাকে নিয়ে কোথায় যেন যাবে। সেলিম খাওয়া দাওয়া সেরে শুয়ে শুয়ে একটা বই পড়ছিল। লাইলী সবাইকে খাইয়ে নিজেও খেল। তারপর হাতের কাজ সেরে স্বামীর পাশে এসে বসে বলল, একটা কথা বলব তুমি যেন আবার মাইন্ড করো না?সেলিম বলল, আমি তোমার কথায় কখনো মাইড করেছি?লাইলী বলল, রুবীনা মনিরুলের সঙ্গে প্রতিদিন বেড়াতে যায়। ফিরে আসে রাত করে। ও এখন বড় হয়েছে। অত রাতে বাড়ি ফেরা আমি ভালো মনে করি না।সেলিম বলল, তুমি ঠিক বলেছ। আমিও মাঝে মাঝে তা লক্ষ্য করেছি। তোমাকে তো সেদিন আসমা আর মনিরুলের ব্যাপারটা বলেছি। এক কাজ কর, আজ আমরা সবাই আমাকে দেখতে যাই চল। সে আজ কেন এল না? নিশ্চয়ই কোনো অসুখ বিসুখ হয়েছে। রেহানা এসেছে কি?লাইলী বলল, হ্যাঁ সে মায়ের সঙ্গে কথা বলছে। সেলিম বলল, তুমি রেহানা, মনিরুল ও রুবীনাকে কথাটা বলে এসে তৈরি হয়ে নাও। আমরা এক্ষুণি বেরুব।দুটো গাড়িতে করে সকলে এসে কনভেন্ট স্কুলের গেটের কাছে নামল। স্কুলের ফাংশান অনেক আগে শেষ হয়ে গেছে। আসমাকে ফাংশানে অনেক খাটাখাটনি করতে হয়েছে। তাই ক্লান্ত হয়ে ষ্টোভে চা করে ছেলেকে নিয়ে খাচ্ছিল।সেলিম আসমার রুম চেনে। সবাইকে নিয়ে এগোল।তাদেরকে দেখতে পেয়ে আসমা সালাম দিয়ে লাইলীকে জড়িয়ে ধরে বলল, আমার কি সৌভাগ্য, তোমরা এই হতভাগীর কাছে এসেছ? সে মনিরুলকে লক্ষ্য করেনি।সেলিম বলল, আজ বাড়িতে এলি না, ভাবলুম তোর কোনো অসুখ বিসুখ হল কিনা। তাই দেখতে এলুম।আসমা বলল, আজ স্কুলে একটা ফাংশান ছিল। তাই যেতে পারিনি। ভাবছিলাম, এক্ষুণি সেকথা ফোনে তোমাদের জানাব। তোমরা এসে খুব ভালো হয়েছে। কিন্তু এত লোককে কোথায় বসতে দেব? লাইলীর দিকে চেয়ে বলল, তুমি বল না ভাবি, আমি এখন কি করব?লাইলী আসমার ছেলেকে কোলে নিয়ে আদর করতে করতে বলল, তোমাকে কিছু করতে হবে না, ঘরে চাবি দিয়ে তুমিও আমাদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়। কোনো হোটলে গিয়ে তোমার ভাইয়ার পকেট খালি করে দিই।সেলিম বলল, তাই চল বাইরে কোথাও যাই। তারপর মনিরুলের দিকে একবার চেয়ে সকলের অলক্ষ্যে লাইলীর কানের কাছে মুখ নিয়ে খুব আস্তে আস্তে বলল, ওদের দুজনকে রেখে রেহানা ও রুবীনাকে সাথে করে বাইরে চলে এস।লাইল আসমাকে বলল, আমরা বাইরে অপেক্ষা করছি। তুমি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে এস।ওরা বাইরে চলে যাওয়ার পর মনিরুলের দিকে আসমার লক্ষ্য পড়ল। দেখল, সে তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। এতক্ষণ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মনিরুল আসমাকে দেখে ভীষণ আশ্চর্য হয়ে তার দিকে তাকিয়েছিল। তার মনে তখন চিন্তার ঝড় বইছে। রেহানার মুখে সে একদিন শুনেছিল, আসমা নামে একটা মেয়ে সেলিমদের বইতে আছে। সেদিন নামটা শুনে মনে মনে চমকে উঠেছিল। পরে ভেবেছে আসমা নামে তো অনেক মেয়ে আছে। কিন্তু আজকে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। তার মনে হল, এই দিন-দুপুরে স্বপ্ন দেখছে না তো? কিছুক্ষণ দুজন দুজনের দিকে চেয়ে রইল। আসমা নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, মনিরুল ভাই, আমাকে চিনতে পারছ?মনিরুল কি বলবে ভেবে ঠিক করতে পারল না। তার মনের পর্দায় তখন অনেক দিন আগের কুমিল্লার একটা বাগান বাড়ির কথা মনে পড়ল। সেই বাগানে কত দিন এই মেয়েটার সঙ্গে প্রেম করেছে। শহরে ফিরে তার কথা ভুলে গিয়েছিল। তার জীবনে এমন কত মেয়ে আসে যায়, কটাকে মনে রাখবে। আজ আসমাকে দেখে তার বিবেক বলল, মনিরুল, তুমি এমন রন্সকে হারিও না। বুঝতে পারছ না, তোমার জন্য সে বাপ মায়ের দেশ ছেড়ে এসে কি রকম তপস্যা করছে। এখনও তোমার শুধরাবার সময় আছে।তাকে চুপ করে থাকতে দেখে আসমা আবার বলল, বড়লোকেরা গরিবদের মানুষ বলে গণ্য করে না। তিন চার বছর আগের আসমাকে কি আর তোমার মনে আছে। এর মধ্যে কত আসমা তোমার জীবনে এসেছে। গরিবদের যতটুকু দয়া দেখাও, তা শুধু নিজেদের স্বার্থের খাতিরে। যেখানে স্বার্থ নেই সেখানে দয়াও নেই। মনে হচ্ছে,জেনে তুমি এখানে এসে পড়েছ। আমি তোমার কাছে কোনো আব্দার বা দাবী করব না, শুধু ঐ ছেলেটাকে পিতৃত্বের পরিচয় দিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা কর। তারপর মনিরুলের দু’পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।সেলিম ও লাইলী আসমার বুদ্ধির পরিচয় পেয়ে অবাক হল। রেহানা সব দেখেশুনে একেবারে থ হয়ে গেল। সে জানত, ভাইয়া মেয়েদেরকে নিয়ে একটু হৈ হুল্লোড় করে। তা বলে বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে গিয়ে একটা গরিবের মেয়ের সর্বনাশ করে আসবে, সেকথা কল্পনাও করেনি। রেগে মেগে ঘরের ভিতরে যেতে উদ্যত হলে সেলিম তার একটা হাত ধরে আস্তে আস্তে বলল, এখনও সময় হয়নি, আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর।এদিকে রুবীনাও ভীষণ রেগে গেল। কাল তাদের রেজেষ্ট্রি করে বিয়ে হওয়ার কথা। সে কোনো রকমে টলতে টলতে গাড়িতে গিয়ে বসল।আসমা ঐ অবস্থায় বলে চলল, যখন আমি বুঝতে পারলাম মা হতে চলেছি তখন তোমাকে দিনের পর দিন পাগলের মত চিঠি লিখেছি। কিন্তু কোনো উত্তর পাইনি। শেষে তোক জানাজানির ভয়ে একরাত্রে ঘর থেকে পালিয়ে তোমার দেওয়া ঠিকানায় গেলাম। তোমাকে পেলাম না। পেলাম একজন বয়স্ক লোককে। মনে হয় তিনি তোমার বাবা। সব শুনে তিনি লাঞ্ছনা গঞ্চনা দিয়ে তাড়িয়ে দিলেন। তারপর অনেক ঘটনা ঘটেছে। শেষে সেলিম ভাই আশ্রয় দিয়ে নিজের বোনের মত দেখছে। তবে যত কিছু ঘটুক না কেন, আজ পর্যন্ত তুমি ছাড়া আর কেউ আমার শরীরে হাত দিতে পারেনি। জানি না, এসব তুমি বিশ্বাস করবে কিনা? যদি তুমি আমাকে আর তোমার ছেলেকে পথের কাঁটা বলে মনে কর, তবে খাবারের সঙ্গে বিষ মাখিয়ে এনে দিও। তাই খেয়ে তোমার আপদ দূর হয়ে যাবে।মনিরুল আর সহ্য করতে পারল না। একেবারে ভেঙ্গে পড়ল। সে ভূলে গেল বারান্দায় তার সঙ্গীরা থাকতে পারে। ঝুকে পড়ে আসমাকে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরে ভিজে গলায় বলল, আসমা, তুমি আমার ভুল ভাঙ্গিয়ে দিয়েছ। আমি তোমার কাছে চরম অন্যায় করেছি। মাফ করে দিয়ে সংশোধন হওয়ার সুযোগ দাও। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। আমার অন্যায়ের জন্য লজ্জিত ও দুঃখিত হৃদয়ে তোমার কাছে মাফ চাইছি। বল আসমা বল, মাফ করে দিয়ে আমাকে সংশোধন হওয়ার সুযোগ দিবে।আসমাও মনিরুলকে আঁকড়ে ধরে ফোঁপাতে লাগল। কিছুক্ষণ পর আসমা নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে এসে কাপড়টা ঠিক করে বলল, আল্লাহ কি এত সুখ আমার কপালে রেখেছেন? আমার স্বপ্ন কি সফল হবে? তুমি যা বলবে তাই করব। এখন বাথরুম থেকে চোখে-মুখে পানি দিয়ে ধুয়ে এস। ওরা সবাই আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে।মনিরুল বাথরুম থেকে এসে বলল, তুমি এখানে থাক, আমি আসছি বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।ওরা সবাই তখন গাড়ির কাছে অপেক্ষা করছিল। সে তাদের কাছে এসে লাইলীর দিকে দু’হাত বাড়িয়ে বলল, ভাবি, ওকে আমার কাছে দিন। আপনারা তো সবকিছু জানেন। আপনারা যান, ওর সঙ্গে আমার আরও কথা আছে।লাইলী ছেলেটাকে কোল থেকে নামাতে নামাতে বলল, যাও সোনামনি তোমার আন্ধুর কাছে যাও।মনিরুল আর কোনো কথা না বলে ছেলেকে বুকে তুলে নিয়ে আসমার কাছে ফিরে এল।সেলিম সবাইকে নিয়ে গাড়িতে উঠল।রুবীনা বলল, ভাইয়া আমার ভীষণ মাথা ধরেছে, আমাকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে তোমরা যেখানে খুশি যাও।রেহানা বলল, আজ বেড়াবার মুড নষ্ট হয়ে গেছে, তোমরা যাও। আমি বাড়ি চললাম বলে নিজেদের গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিল।মনিরুল ছেলেকে বুকে করে ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করল, এর নাম কি রেখেছ?ছেলেসহ মনিরুলকে আসতে দেখে আমার চোখে আবার পানিতে ভরে গেল। ধরা গলায় বলল, রফিকুল ইসলাম।রফিকুল মনিরুলের বুকে থেকেই বলল, আম্মা, মামী বললেন, ইনি আমার আব্বু। তুমি এতদিন আমাকে আন্ধুর কাছে নিয়ে যাওনি কেন? মা কিছু বলছে না দেখে সে মনিরুলের মুখের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনি আমার আব্বু?ছেলেকে আদর করে বুকে চেপে ধরে মনিরুল বলল, হ্যাঁ সোনা, আমি তোমার আব্বু। রফিক মায়ের কাছে ছাড়া এত আদর আর কারও কাছ থেকে পায়নি। সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বলল, এতদিন আসেননি কেন? আম্মা কত কাঁদে।এইতো এসেছি বাবা আর তোমার আম্মা কাঁদবে না। তারপর আসমাকে বলল, চল একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি।আজ আমি বড় ক্লান্ত। তুমি বস, আমি চা করে নিয়ে আসি। পাশেই রান্না ঘর। সেখান থেকে কয়েকটা বিস্কুট বের করে মনিরুলকে খেতে দিল।রফিক বলে উঠল, আমিও চা খাব আম্মা।মনিরুল ছেলের দুহাতে চারটে বিস্কুট দিয়ে বলল, আগে এগুলো খেয়ে নাও, পরে চা খাবে।চা খাওয়ার সময় মনিরুল বলল, তুমি আগামীকাল ছুটি নেবে। আমি ঠিক দশটার দিকে আসব। তুমি রেডী থাকবে। কালকেই বিয়ের কাজটা সারতে চাই। আসমা বলল, বেশ, তাই হবে। মনিরুল বিদায় নিয়ে চলে গেল।মনিরুলকে বিদায় দিয়ে আসমা চোখের পানি ফেলছিল। রফিক মাকে কাঁদতে দেখে বলল, আব্বু চলে গেছে বলে তুমি কাঁদছো? আবার কখন আব্বু আসবেন?আসমা চোখ মুছে ছেলেকে চুমো খেয়ে বলল, তোমার আন্ধু আবার কালকে আসবেন।পরের দিন ঠিক দশটায় স্কুলের গেটের কাছে মনিরুলকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে আসমা এগিয়ে এসে সালাম দিল।মনিরুল সালামের উত্তর দিয়ে বলল, তুমি তৈরি?আসমা মাথা নেড়ে সায় দিল।রফিক কোথায়?তাকে রিজিয়া নামে আমার এক সহকর্মির তত্বাবধানে রেখে এসেছি।তা হলে এস বলে মনিরুল গাড়িতে উঠে পাশের গেট খুলে দিল।মনিরুল তাকে নিয়ে কাজি অফিসে গিয়ে কাবিন ও বিয়ের কাজ সারল। তারপর বেলা দুটোর সময় ফিরে এল। রিজিয়াকে রফিক বড় বিরক্ত করছিল। তার মায়ের জন্য খুব কান্নাকাটি করছিল। মার সঙ্গে আব্বাকে দেখতে পেয়ে কান্না থামিয়ে ছুটে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, তুমি কোথায় গিয়েছিলে? আমি তোমার জন্য কাঁদছিলাম। তারপর মনিরুলের দিকে চেয়ে বলল, আপনি আম্মাকে নিয়ে গেলেন, আমাকেও নিয়ে গেলেন না কেন?মনিরুল ছেলেকে কোলে নিয়ে চুমো খেয়ে বলল, আমরা একটা কাজে গিয়েছিলাম। এবার আর কখনো তোমাকে ফেলে কোথাও যাব না। তারপর আসমাকে বলল, তুমি সব গুছিয়ে নাও, আমি তোমাদের হেড মিস্ট্রেসের সঙ্গে দেখা করে এখনই আসছি।হেড মিস্ট্রেস একজন অচেনা লোককে রফিককে কোলে নিয়ে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, কাকে চান?মনিরুল রফিককে দেখিয়ে বলল, ওর মা আসমা আমার স্ত্রী, তাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে চাই। তাই আপনার অনুমতি নিতে এসেছি।হেড মিস্ট্রেস বসতে বলে বললেন, স্বামীর বাড়ি তো মেয়েদের নিজের বাড়ি। নিয়ে যাবেন ভালো কথা। আসমা কী চাকরি রিজাইন দিয়ে একেবারে চলে যেতে চায় নাকি? তা হলে কিন্তু আমার আপত্তি আছে। কারণ ওর মত মেয়ে পাওয়া মুশকিল। বাচ্চারা আসমা আপা বলতে অজ্ঞান। এতদিন আমি শাসন করে যা পারি নি, মাত্র কয়েক মাস হল এসে সে তার থেকে অনেক বেশি করেছে।মনিরুল বলল, দেখুন চাকরি করবে কি না করবে সে কথা ও আপনাকে পরে জানাবে।সেলিম সাহেব আপনার কে হন?ফুপাতো ভাই।ঠিক আছে ওকে নিয়ে যান। যাওয়ার আগে একটা ছুটির দরখাস্ত দিয়ে যেতে বলুন।সব ব্যবস্থা করে ওরা গাড়িতে উঠল। সামনের সীটে সবাই বসেছে।গাড়ি চলতে শুরু করার পর রফিক বলল, আব্বু এটা তোমার গাড়ি? সে মাঝখানে বসেছে।গাড়ি চালাতে চালাতে মনিরুল ছেলের গালটা আলতো করে টিপে আদর করে বলল, হ্যাঁ আব্বু, এটা তোমার আরুর গাড়ি। ওরা যখন ঘরে পৌঁছল তখন বিকেল পাঁচটা।মনিরুলের বাবা জাহিদ সাহেব তখন বাড়ির সামনের লনে স্ত্রী ও মেয়েসহ বৈকালিক জলযোগ করছিলেন। মনিরুলের গাড়ি গেট দিয়ে ঢুকতে দেখে সেদিকে সকলে একবার চেয়ে খাওয়াতে মনোযোগ দিলো। তিনি গত রাত্রে রেহানার কাছে ছেলের অপকীর্তির সব কথা শুনেছেন।মনিরুল গাড়ি পার্ক করে নেমে ছেলের একটা হাত ধরে আসমাকে সঙ্গে করে একবারে তাদের কাছে এসে বলল, আব্বা, আমি আসমাকে বিয়ে করেছি। আজ সকালে মনিরুল যাওয়ার সময় কাজি অফিস থেকে আসমাকে বিয়ে করে নিয়ে আসবার কথা রেহানাকে বলেছিল। রেহানা চা খেতে খেতে একটু আগে মা-বাবাকে সেকথা বলেছে।জাহিদ সাহেব কয়েক মুহূর্ত গম্ভীর হয়ে বসে থেকে রাগে ফেটে পড়লেন। বললেন, তুমি একটা স্কাউণ্ডেল। তোমার মত চরিত্রহীন ছেলের আমি বাবা, এ কথা মনে করলে নিজের প্রতি ঘৃণা হয়। একটা মেয়ের সরলতার সুযোগ নিয়ে তার সর্বনাশ করে এতদিন ভুলে ছিলে। মেয়েটার যদি কোনো অঘটন ঘটে যেত, তা হলে তোমাকে আমি দূর করে তাড়িয়ে দিতাম। লেখাপড়া করে তুমি একটা জানোয়ার হয়েছ।রফিক জাহিদ সাহেবের রাগ দেখে প্রথমে ভয় পেয়ে যায়। তারপর সেসকলের অলক্ষ্যে জাহিদ সাহেবের সামনে গিয়ে বলল, কে আপনি? আমার আন্ধুকে বকছেন কেন?জাহিদ সাহেব চমকে উঠে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে দেখলেন, অবিকল মনিরুলের অবয়ব। তিনি তাকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন, আমি তোমার দাদু। তোমার আব্বু তোমাদের এতদিন আনেনি বলে বকলাম। তোমার নাম কি ভাই?আমার নাম রফিকুল ইসলাম। আমাকে সবাই রফিক বলে ডাকে।বাহ বেশ সুন্দর নাম তো। রফিক মানে বন্ধু। তা হলে আজ থেকে তুমি আমার বন্ধু হলে। এবার থেকে আমরা দু’বন্ধুতে মিলে খুব গল্প করব, কি বল?আপনি গল্প জানেন? কি মজা! আমি কিন্তু আপনার কাছে ঘুমাব। সেই সময় আপনি গল্প বলবেন।তাই হবে ভাই। তারপর আমার মুখের দিকে চাইতে অনেক দিন আগের একটা আবছা মুখ মনে পড়ল। সে দিন বোধ হয় এই মেয়েটাই মনিরুলের খোঁজ। করে অনেক কথা বলেছিল? তাকে অপমান করে টাকা দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিল। মেয়েটা টাকা তার পায়ের কাছে ফেলে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে চলে গিয়েছিল। আজ সেকথা মনে হতে খুব অনুতপ্ত হলেন। বললেন, বৌমা, তোমাকে সেদিন ভুল বুঝে অনেক অপমান করে তাড়িয়ে দিয়ে অন্যায় করেছি। বুড়ো ছেলে মনে করে আমাকে। ক্ষমা করে দাও মা।আসমা বসে পড়ে শ্বশুরের পায়ে হাত দিয়ে বলল, আপনি ক্ষমা চেয়ে আমাকে গোনাহগার করবেন না। সবকিছু তকদিরের লিখন। যার তকদিরে যতদিন বিড়ম্বনা থাকে, তাকে ততদিন সেটা ভোগ করতেই হবে। আমাকে আপনি পূত্রবধূ হিসাবে। পায়ে ঠাই দিয়ে ধন্য করেছেন। সেই জন্য আল্লাহপাকের দরবারে জানাই লাখো শুকরিয়া। তারপর ফুঁপিয়ে উঠল।জাহিদ সাহেব তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, আল্লাহ তোমাদের সুখি করুন। তারপর মেয়ে ও স্ত্রীর দিকে চেয়ে বললেন, বৌমাকে ঘরে নিয়ে যাও। তোমরা দাঁড়িয়ে রয়েছ কেন?আসমা উঠে এসে শাশুড়ীকে কদমবুসি করল।তার দেখাদেখি মনিরুলও মা-বাবাকে কদমবুসি করল।রেহানা আসমার হাত ধরে বলল, এস ভাবি আমরা ঘরে যাই।
আহার শেষ হলে অমিত বললে, “কাল কলকাতায় যাচ্ছি মাসিমা। আমার আত্মীয়স্বজন সবাই সন্দেহ করছে আমি খাসিয়া হয়ে গেছি।“আত্মীয়স্বজনেরা কি জানে, কথায় কথায় তোমার এত বদল সম্ভব।”“খুব জানে। নইলে আত্মীয়স্বজন কিসের। তাই বলে কথায় কথায় নয়, আর খাসিয়া হওয়া নয়। যে বদল আজ আমার হল এ কি জাত-বদল। এ যে যুগ-বদল! তার মাঝখানে একটা কল্পান্ত। প্রজাপতি জেগে উঠেছেন আমার মধ্যে এক নূতন সৃষ্টিতে। মাসিমা, অনুমতি দাও, লাবণ্যকে নিয়ে আজ একবার বেড়িয়ে আসি। যাবার আগে শিলঙ পাহাড়কে আমাদের যুগল প্রণাম জানিয়ে যেতে চাই।”যোগমায়া সম্মতি দিলেন। কিছুদূরে যেতে যেতে দুজনের হাত মিলে গেল, ওরা কাছে কাছে এল ঘেঁষে। নির্জন পথের ধারে নীচের দিকে চলেছে ঘন বন। সেই বনের একটা জায়গায় পড়েছে ফাঁক, আকাশ সেখানে পাহাড়ের নজরবন্দি থেকে একটুখানি ছুটি পেয়েছে; তার অঞ্জলি ভরিয়ে নিয়েছে অস্তসূর্যের শেষ আভায়। সেইখানে পশ্চিমের দিকে মুখ করে দুজনে দাঁড়াল। অমিত লাবণ্যর মাথা বুকে টেনে নিয়ে তার মুখটি উপরে তুলে ধরলে। লাবণ্যর চোখ অর্ধেক বোজা, কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। আকাশে সোনার রঙের উপর চুনি-গলানো পান্না-গলানো আলোর আভাসগুলি মিলিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে; মাঝে মাঝে পাতলা মেঘের ফাঁকে ফাঁকে সুগভীর নির্মল নীল, মনে হয় তার ভিতর দিয়ে, যেখানে দেহ নেই শুধু আনন্দ আছে সেই অমর্তজগতের অব্যক্ত ধ্বনি আসছে। ধীরে ধীরে অন্ধকার হল ঘন। সেই খোলা আকাশটুকু, রাত্রিবেলায় ফুলের মতো, নানা রঙের পাপড়িগুলি বন্ধ করে দিলে।অমিতর বুকের কাছ থেকে লাবণ্য মৃদুস্বরে বললে, “চলো এবার।” কেমন তার মনে হল, এইখানে শেষ করা ভালো।অমিত সেটা বুঝলে, কিছু বললে না। লাবণ্যর মুখ বুকের উপর একবার চেপে ধরে ফেরবার পথে খুব ধীরে ধীরে চলল।বললে, “কাল সকালেই আমাকে ছাড়তে হবে। তার আগে আর দেখা করতে আসব না।”“কেন আসবে না।”“আজ ঠিক জায়গায় আমাদের শিলঙ পাহাড়ের অধ্যায়টি এসে থামল–ইতি প্রথমঃ সর্গঃ, আমাদের সয়ে-বয়ে স্বর্গ।”লাবণ্য কিছু বললে না, অমিতর হাত ধরে চলল। বুকের ভিতর আনন্দ, আর তারই সঙ্গে সঙ্গে একটা কান্না স্তব্ধ হয়ে আছে। মনে হল, জীবনে কোনোদিন এমন নিবিড় করে অভাবনীয়কে এত কাছে পাওয়া যাবে না। পরম ক্ষণে শুভদৃষ্টি হল, এর পরে আর কি বাসরঘর আছে। রইল কেবল মিলন আর বিদায় একত্র মিশিয়ে একটি শেষ প্রণাম। ভারি ইচ্ছে করতে লাগল অমিতকে এখনই প্রণামটি করে; বলে, তুমি আমাকে ধন্য করেছ। কিন্তু সে আর হল না।বাসার কাছাকাছি আসতেই অমিত বললে, “বন্যা, আজ তোমার শেষ কথাটি একটি কবিতায় বলো, তা হলে সেটা মনে করে নিয়ে যাওয়া সহজ হবে। তোমার নিজের যা মনে আছে এমন একটা-কিছু আমাকে শুনিয়ে দাও।”লাবণ্য একটুখানি ভেবে আবৃত্তি করলে–“তোমারে দিই নি সুখ, মুক্তির নৈবেদ্য গেনু রাখিরজনীর শুভ্র অবসানে। কিছু আর নাই বাকি,নাইকো প্রার্থনা, নাই প্রতি মুহূর্তের দৈন্যরাশি,নাই অভিমান, নাই দীন কান্না, নাই গর্ব-হাসি,নাই পিছু ফিরে দেখা। শুধু সে মুক্তির ডালিখানিভরিয়া দিলাম আজি আমার মহৎ মৃত্যু আনি।”“বন্যা, বড়ো অন্যায় করলে। আজকের দিনে তোমার মুখে বলবার কথা এ নয়, কিছুতেই নয়। কেন এটা তোমার মনে এল। তোমার এ কবিতা এখনই ফিরিয়ে নাও।”“ভয় কিসের মিতা। এই আগুনে-পোড়া প্রেম, এ সুখের দাবি করে না, এ নিজে মুক্ত বলেই মুক্তি দেয়, এর পিছনে ক্লান্তি আসে না, ম্লানতা আসে না–এর চেয়ে আর কিছু কি দেবার আছে।”“কিন্তু আমি জানতে চাই, এ কবিতা তুমি পেলে কোথায়।”“রবি ঠাকুরের।”“তার তো কোনো বইয়ে এটা দেখি নি।”“বইয়ে বেরোয় নি।”“তবে পেলে কী করে।”“একটি ছেলে ছিল, সে আমার বাবাকে গুরু বলে ভক্তি করত। বাবা দিয়েছিলেন তাকে তার জ্ঞানের খাদ্য, এ দিকে তার হৃদয়টিও ছিল তাপস। সময় পেলেই সে যেত রবি ঠাকুরের কাছে, তাঁর খাতা থেকে মুষ্টিভিক্ষা করে আনত।”“আর নিয়ে এসে তোমার পায়ে দিত।”“সে সাহস তার ছিল না। কোথাও রেখে দিত, যদি আমার দৃষ্টিতে পড়ে, যদি আমি তুলে নিই।”“তাকে দয়া করেছ?”“করবার অবকাশ হল না। মনে মনে প্রার্থনা করি,ঈশ্বর যেন তাকে দয়া করেন।”“যে কবিতাটি আজ তুমি পড়লে, বেশ বুঝতে পারছি, এটা সেই হতভাগারই মনের কথা।”“হাঁ, তারই কথা বইকি।”“তবে তোমার কেন আজ ওটা মনে পড়ল।”“কেমন করে বলব। ঐ কবিতাটির সঙ্গে আর-এক টুকরো কবিতা ছিল, সেটাও আজ আমার কেন মনে পড়ছে ঠিক বলতে পারি নে–সুন্দর, তুমি চক্ষু ভরিয়া এনেছ অশ্রুজল।এনেছ তোমার বক্ষে ধরিয়া দুঃসহ হোমানল।দুঃখ যে তার উজ্জ্বল হয়ে উঠে,মুগ্ধ প্রাণের আবেশ-বন্ধ টুটে।এ তাপে শ্বসিয়া উঠে বিকশিয়া বিচ্ছেদশতদল।"অমিত লাবণ্যর হাত চেপে ধরে বললে, “বন্যা, সে ছেলেটা আজ আমাদের মাঝখানে কেন এসে পড়ল। ঈর্ষা করতে আমি ঘৃণা করি, এ আমার ঈর্ষা নয়। কিন্তু কেমন একটা ভয় আসছে মনে। বলো, তার দেওয়া ঐ কবিতাগুলো আজই কেন তোমার এমন করে মনে পড়ে গেল।”“একদিন সে যখন আমাদের বাড়ি থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল তার পরে যেখানে বসে সে লিখত সেই ডেস্কে এই কবিতাদুটি পেয়েছি। এর সঙ্গে রবি ঠাকুরের আরো অনেক অপ্রকাশিত কবিতা, প্রায় এক খাতা ভরা। আজ তোমার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি, হয়তো সেইজন্যেই বিদায়ের কবিতা মনে হল।”“সে বিদায় আর এ বিদায় কি একই।”“কেমন করে বলব। কিন্তু এ তর্কের তো কোনো দরকার নেই। যে কবিতা আমার ভালো লেগেছে তাই তোমাকে শুনিয়েছি, হয়তো এ ছাড়া আর কোনো কারণ এর মধ্যে নেই।”“বন্যা, রবি ঠাকুরের লেখা যতক্ষণ না লোকে একেবারে ভুলে যাবে ততক্ষণ ওর ভালো লেখা সত্য করে ফুটে উঠবে না। সেইজন্যে ওর কবিতা আমি ব্যবহারই করি নে। দলের লোকের ভালো-লাগাটা কুয়াশার মতো, যা আকাশের উপর ভিজে হাত লাগিয়ে তার আলোটাকে ময়লা করে ফেলে।”“দেখো মিতা, মেয়েদের ভালো-লাগা তার আদরের জিনিসকে আপন অন্দরমহলে একলা নিজেরই করে রাখে, ভিড়ের লোকের কোনো খবরই রাখে না। সে যত দাম দিতে পারে সব দিয়ে ফেলে, অন্য পাঁচজনের সঙ্গে মিলিয়ে বাজার যাচাই করতে তার মন নেই।”“তা হলে আমারও আশা আছে বন্যা। আমার বাজার-দরের ছোট্ট একটা ছাপ লুকিয়ে ফেলে তোমার আপন দরের মস্ত একটা মার্কা নিয়ে বুক ফুলিয়ে বেড়াব।”“আমাদের বাড়ি কাছে এসে পড়ল, মিতা। এবার তোমার মুখে তোমার পথ-শেষের কবিতাটা শুনে নিই।”“রাগ কোরো না বন্যা, আমি কিন্তু রবি ঠাকুরের কবিতা আওড়াতে পারব না।”“রাগ করবো কেন।”“আমি একটি লেখককে আবিষ্কার করেছি, তার স্টাইল–”“তার কথা তোমার কাছে বরাবরই শুনতে পাই। কলকাতায় লিখে দিয়েছি, তার বই পাঠিয়ে দেবার জন্য।”“সর্বনাশ! তার বই! সে লোকটার অন্য অনেক দোষ আছে, কিন্তু কখনো বই ছাপতে দেয় না। তার পরিচয় আমার কাছ থেকেই তোমাকে ক্রমে ক্রমে পেতে হবে। নইলে হয়তো–”“ভয় কোরো না মিতা, তুমি তাকে যেভাবে বোঝ আমিও তাকে সেইভাবেই বুঝে নেব, এমন ভরসা আমার আছে। আমারই জিত থাকবে।”“কেন।”“আমার ভালো লাগায় যা পাই সেও আমার, আর তোমার ভালো লাগায় যা পাব সেও আমার হবে। আমার নেবার অঞ্জলি হবে দুজনের মনকে মিলিয়ে। কলকাতায় তোমার ছোটো ঘরের বইয়ের আলমারিতে এক শেল্ফেই দুই কবির কবিতা ধরাতে পারব। এখন তোমার কবিতাটি বলো।”“আর বলতে ইচ্ছে করছে না। মাঝখানে বড্ডো কতকগুলো তর্কবিতর্ক হয়ে হাওয়াটা খারাপ হয়ে গেল।”“কিচ্ছু খারাপ হয় নি, হাওয়া ঠিক আছে।”অমিত তার কপালের চুলগুলো কপালের থেকে উপরের দিকে তুলে দিয়ে খুব দরদের সুর লাগিয়ে পড়ে গেল–"সুন্দরী তুমি শুকতারা সুদূর শৈলশিখরান্তে,শর্বরী যবে হবে সারা দর্শন দিয়ো দিক্ভ্রান্তে।বুঝেছ বন্যা, চাঁদ ডাক দিয়েছে শুকতারাকে, সে আপনার রাত-পোহাবার সঙ্গিনীকে চায়। নিজের রাতটার ‘পরে ওর বিতৃষ্ণা হয়ে গেছে। ধরা যেথা অম্বরে মেশে আমি আধো-জাগ্রত চন্দ্র। আঁধারের বক্ষের 'পরে আধেক আলোক-রেখা-রন্ধ্র।ওর এই আধখানা জাগা, ঐ অল্প একটুখানি আলো আঁধারটাকে সামান্য খানিকটা আঁচড়ে দিয়েছে। এই হল ওর খেদ। এই স্বল্পতার জালে ওকে জড়িয়ে ফেলেছে, সেইটে ছিঁড়ে ফেলবার জন্যে ও যেন সমস্ত রাত্রি ঘুমোতে ঘুমোতে গুমরে উঠছে। কী আইডিয়া! গ্র৻াণ্ড! আমার আসন রাখে পেতে নিদ্রাগহন মহাশূন্য। তন্ত্রী বাজাই স্বপনেতে তন্দ্রা ঈষৎ করি ক্ষুণ্ণ।কিন্তু এমন হালকা করে বাঁচার বোঝাটা যে বড্ডো বেশি; যে নদীর জল মরেছে তার মন্থর স্রোতের ক্লান্তিতে জঞ্জাল জমে, যে স্বল্প সে নিজেকে বইতে গিয়ে ক্লিষ্ট হয়। তাই ও বলছে– মন্দচরণে চলি পারে, যাত্রা হয়েছে মোর সাঙ্গ। সুর থেমে আসে বারে বারে, ক্লান্তিতে আমি অবশাঙ্গ।কিন্তু এই ক্লান্তিতেই কি ওর শেষ। ওর ঢিলে তারের বীণাকে নতুন করে বাঁধবার আশা ও পেয়েছে, দিগন্তের ও পারে কার পায়ের শব্দ ও যেন শুনল– সুন্দরী ওগো শুকতারা, রাত্রি না যেতে এসো তূর্ণ স্বপ্নে যে বাণী হল হারা জাগরণে করো তারে পূর্ণ।উদ্ধারের আশা আছে, কানে আসছে জাগ্রত বিশ্বের বিপুল কলরব, সেই মহাপথের দূতী তার প্রদীপ হাতে করে এল বলে–নিশীথের তল হতে তুলিলহো তারে প্রভাতের জন্য।আঁধারে নিজেরে ছিল ভুলি,আলোকে তাহারে করো ধন্য।যেখানে সুপ্তি হল লীনা,যেথা বিশ্বের মহামন্দ্র,অর্পিনু সেথা মোর বীণাআমি আধো-জাগ্রত চন্দ্র।এই হতভাগা চাঁদটা তো আমি। কাল সকালবেলা চলে যাব। কিন্তু চলে যাওয়াকে তো শূন্য রাখতে চাই নে। তার উপরে আবির্ভাব হবে সুন্দরী শুকতারার, জাগরণের গান নিয়ে। অন্ধকার জীবনের স্বপ্নে এতদিন যা অস্পষ্ট ছিল, সুন্দরী শুকতারা তাকে প্রভাতের মধ্যে সম্পূর্ণ করে দেবে। এর মধ্যে একটা আশার জোর আছে, ভাবী প্রত্যুষের একটা উজ্জ্বল গৌরব আছে তোমার ঐ রবি ঠাকুরের কবিতার মতো মিইয়ে-পড়া হাল-ছাড়া বিলাপ নয়।”“রাগ কর কেন মিতা। রবি ঠাকুর যা পারে তার বেশি সে পারে না, এ কথা বারবার বলে লাভ কী।”“তোমরা সবাই মিলে তাকে নিয়ে বড়ো বেশি–”“ও কথা বোলো না মিতা। আমার ভালো-লাগা আমারই, তাতে যদি আর-কারো সঙ্গে আমার মিল হয় বা তোমার সঙ্গে মিল না হয়, সেটাতে কি আমার দোষ। নাহয় কথা রইল, তোমার সেই পঁচাত্তর টাকার বাসায় একদিন আমার যদি জায়গা হয় তা হলে তোমার কবির লেখা আমাকে শুনিয়ো, আমার কবির লেখা তোমাকে শোনাব না।”“কথাটা অন্যায় হল যে। পরস্পর পরস্পরের জুলুম ঘাড় পেতে বহন করবে, এইজন্যেই তো বিবাহ।”“রুচির জুলুম তোমার কিছুতেই সইবে না। রুচির ভোজে তোমরা নিমন্ত্রিত ছাড়া কাউকে ঘরে ঢুকতে দাও না, আমি অতিথিকেও আদর করে বসাই।”“ভালো করলুম না তর্ক তুলে। আমাদের এখানকার এই শেষ সন্ধেবেলার সুর বিগড়ে গেল।”“একটুও না। যা-কিছু বলবার আছে সব স্পষ্ট করে বলেও যে সুরটা খাঁটি থাকে সেই আমাদের সুর। তার মধ্যে ক্ষমার অন্ত নেই।”“আজ আমার মুখের বিস্বাদ ঘোচাতেই হবে। কিন্তু বাংলা কাব্যে হবে না। ইংরেজি কাব্যে আমার বিচারবুদ্ধি অনেকটা ঠাণ্ডা থাকে। প্রথম দেশে ফিরে এসে আমিও কিছুদিন প্রোফেসারি করেছিলুম।”লাবণ্য হেসে বললে, “আমাদের বিচারবুদ্ধি ইংরেজ-বাড়ির বুল্ডগের মতো– ধুতির কোঁচাটা দুলছে দেখলেই ঘেউ ঘেউ করে ওঠে। ধুতির মহলে কোন্টা ভদ্র ও তার হিসেব পায় না। বরঞ্চ খানসামার তকমা দেখলে লেজ নাড়ে।”“তা মানতেই হবে। পক্ষপাত-জিনিসটা স্বাভাবিক জিনিস নয়। অধিকাংশ স্থলেই ওটা ফরমাশে তৈরি। ইংরেজি সাহিত্যে পক্ষপাত কান-মলা খেয়ে খেয়ে ছেলেবেলা থেকে অভ্যেস হয়ে গেছে। সেই অভ্যেসের জোরেই এক পক্ষকে মন্দ বলতে যেমন সাহস হয় না, অন্য পক্ষকে ভালো বলতেও তেমনি সাহসের অভাব ঘটে। থাক্ গে, আজ নিবারণ চক্রবর্তীও না, আজ একেবারে নিছক ইংরেজি কবিতা–বিনা তর্জমায়।”“না না মিতা, তোমার ইংরেজি থাক্, সেটা বাড়ি গিয়ে টেবিলে বসে হবে। আজ আমাদের এই সন্ধেবেলাকার শেষ কবিতাটি নিবারণ চক্রবর্তীর হওয়াই চাই। আর-কারো নয়।”অমিত উৎফুল্ল হয়ে বললে, “জয় নিবারণ চক্রবর্তীর! এতদিনে সে হল অমর। বন্যা, তাকে আমি তোমার সভাকবি করে দেব। তুমি ছাড়া আর-কারো দ্বারে সে প্রসাদ নেবে না।”“তাতে কি সে বরাবর সন্তুষ্ট থাকবে।”“না থাকে তো তাকে কান মলে বিদায় করে দেব।”“আচ্ছা, কান-মলার কথা পরে স্থির করব; এখন শুনিয়ে দাও।”অমিত আবৃত্তি করতে লাগল– "কত ধৈর্য ধরিছিলে কাছে দিবসশর্বরী। তব পদ-অঙ্কনগুলিরেকতবার দিয়ে গেছ মোর ভাগ্যপথের ধূলিরে। আজ যবেদূরে যেতে হবে তোমারে করিয়া যাব দান তব জয়গান।কতবার ব্যর্থ আয়োজনে এ জীবনেহোমাগ্নি উঠে নি জ্বলি, শূন্যে গেছে চলিহতাশ্বাস ধূমের কুণ্ডলী।কতবার ক্ষণিকের শিখা আঁকিয়াছে ক্ষীণ টিকা নিশ্চেতন নিশীথের ভালে।লুপ্ত হয়ে গেছে তাহা চিহ্নহীন কালে। এবার তোমার আগমন হোমহুতাশন জ্বেলেছে গৌরবে। যজ্ঞ মোর ধন্য হবে। আমার আহুতি দিনশেষেকরিলাম সমর্পণ তোমার উদ্দেশে। লহো এ প্রণাম জীবনের পূর্ণপরিণাম। এ প্রণতি'পরে স্পর্শ রাখো স্নেহভরে, তোমার ঐশ্বর্য-মাঝে সিংহাসন যেথায় বিরাজে করিয়ো আহ্বান, সেথা এ প্রণতি মোর পায় যেন স্থান।"
সকালবেলায় কাজে মন দেওয়া আজ লাবণ্যর পক্ষে কঠিন। সে বেড়াতেও যায় নি। অমিত বলেছিল, শিলঙ থেকে যাবার আগে আজ সকালবেলায় সে ওদের সঙ্গে দেখা করতে চায় না, সেই পণটাকে রক্ষা করবার ভার দুজনেরই উপর। কেননা, যে রাস্তায় ও বেড়াতে যায় সেই রাস্তা দিয়েই অমিতকে যেতে হবে। মনে তাই লোভ ছিল যথেষ্ট। সেটাকে কষে দমন করতে হল। যোগমায়া খুব সকালেই স্নান সেরে তাঁর আহ্নিকের জন্যে কিছু ফুল তোলেন। তিনি বেরোবার আগেই লাবণ্য সে জায়গাটা থেকে চলে এল য়ুক্যালিপ্টাস-তলায়। হাতে দুই-একটা বই ছিল, বোধ হয় নিজেকে এবং অন্যদেরকে ভোলাবার জন্যে। তার পাতা খোলা; কিন্তু বেলা যায়, পাতা ওলটানো হয় না। মনের মধ্যে কেবলই বলছে, জীবনের মহোৎসবের দিন কাল শেষ হয়ে গেল। আজ সকালে এক-একবার মেঘরৌদ্রের মধ্যে দিয়ে ভাঙনের দূত আকাশ ঝেঁটিয়ে বেড়াচ্ছে। মনে দৃঢ় বিশ্বাস যে, অমিত চিরপলাতক, একবার সে সরে গেলে আর তার ঠিকানা পাওয়া যায় না। রাস্তায় চলতে চলতে কখন সে গল্প শুরু করে, তার পর রাত্রি আসে, পরদিন সকালে দেখা যায়, গল্পের গাঁথন ছিন্ন, পথিক গেছে চলে। লাবণ্য তাই ভাবছিল, ওর গল্পটা এখন থেকে চিরদিনের মতো রইল বাকি। আজ সেই অসমাপ্তির ম্লানতা সকালের আলোয়, অকাল-অবসানের অবসাদ আর্দ্র হাওয়ার মধ্যে।এখন সময়, বেলা তখন ন’টা, অমিত দুম্দাম-শব্দে ঘরে ঢুকেই “মাসিমা” মাসিমা” করে ডাক দিলে। যোগমায়া প্রাতঃসন্ধ্যা সেরে ভাঁড়ারের কাজে প্রবৃত্ত। আজ তাঁরও মনটা পীড়িত। অমিত তার কথায় হাসিতে চাঞ্চল্যে এতদিন তাঁর স্নেহাসক্ত মনকে, তাঁর ঘরকে ভরে রেখেছিল। সে চলে গেছে এই ব্যথার বোঝা নিয়ে তাঁর সকালবেলাটা যেন বৃষ্টিবিন্দুর ভারে সদ্যঃপাতী ফুলের মতো নুয়ে পড়ছে। তাঁর বিচ্ছেদকাতর ঘরকন্নার কাজে আজ তিনি লাবণ্যকে ডানেন নি; বুঝেছিলেন, আজ তার দরকার ছিল একলা থাকার, লোকের চোখের আড়ালে।লাবণ্য তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল, কোলের থেকে বই গেল পড়ে, জানতেও পারলে না। এ দিকে যোগমায়া ভাঁড়ারঘর থেকে দ্রুতপদে বেরিয়ে এসে বললেন, “কী বাবা অমিত, ভূমিকম্প নাকি।”“ভূমিকম্পই তো। জিনিসপত্র রওনা করে দিয়েছি; গাড়ি ঠিক; ডাকঘরে গেলুম দেখতে চিঠিপত্র কিছু আছে কি না। সেখানে এক টেলিগ্রাম।”অমিতর মুখের ভাব দেখে যোগমায়া উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “খবর সব ভালো তো?”লাবণ্যও ঘরে এসে জুটল। অমিত ব্যাকুল মুখে বললে, “আজই সন্ধেবেলায় আসছে সিসি, আমার বোন, তার বন্ধু কেটি মিত্তির, আর তার দাদা নরেন।”“তা ভাবনা কিসের বাছা। শুনেছি, ঘোড়দৌড়ের মাঠের কাছে একটা বাড়ি খালি আছে। যদি নিতান্ত না পাওয়া যায় আমার এখানে কি একরকম করে জায়গা হবে না।”“সেজন্যে ভাবনা নেই মাসি। তারা নিজেরাই টেলিগ্রাফ করে হোটেলে জায়গা ঠিক করেছে।”“আর যাই হোক বাবা, তোমার বোনেরা এসে যে দেখবে তুমি ঐ লক্ষ্মীছাড়া বাড়িটাতে আছ সে কিছুতেই হবে না। তারা আপন লোকের খেপামির জন্যে দায়িক করবে আমাদেরই।”“না মাসি, আমার প্যারাডাইস লস্ট। ঐ নগ্ন আসবাবের স্বর্গ থেকে আমার বিদায়। সেই দড়ির খাটিয়ার নীড় থেকে আমার সুখস্বপ্নগুলো উড়ে পালাবে। আমাকেও জায়গা নিতে হবে সেই অতিপরিচ্ছন্ন হোটেলের এক অতিসভ্য কামরায়।”কথাটা বিশেষ কিছু নয়, তবু লাবণ্যর মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। এতদিন একটা কথা ওর মনেও আসে নি যে, অমিতর যে সমাজ সে ওদের সমাজ থেকে সহস্র যোজন দূরে। এক মুহূর্তেই সেটা বুঝতে পারলে। অমিত যে আজ কলকাতায় চলে যাচ্ছিল তার মধ্যে বিচ্ছেদের কঠোর মূর্তি ছিল না। কিন্তু এই-যে আজ ও হোটেলে যেতে বাধ্য হল এইটেতেই লাবণ্য বুঝলে, যে-বাসা এতদিন দুজনে নানা অদৃশ্য উপকরণে গড়ে তুলছিল সেটা কোনোদিন বুঝি আর দৃশ্য হবে না।লাবণ্যর দিকে একটু চেয়ে অমিত যোগমায়াকে বললে, “আমি হোটেলেই যাই আর জাহান্নমেই যাই, কিন্তু এইখানেই রইল আমার আসল বাসা।”অমিত বুঝেছে, শহর থেকে আসছে একটা অশুভ দৃষ্টি। মনে মনে নানা প্ল্যান করছে যাতে সিসির দল এখানে না আসতে পারে। কিন্তু ইদানীং ওর চিঠিপত্র আসছিল যোগমায়ার বাড়ির ঠিকানায়, তখন ভাবে নি কোনো সময়ে তাতে বিপদ ঘটতে পারে। অমিতর মনের ভাবগুলো চাপা থাকতে চায় না, এমন-কি, প্রকাশ পায় কিছু আতিশয্যের সঙ্গে। ওর বোনের আসা সম্বন্ধে অমিতর এত বেশি উদ্বেগ যোগমায়ার কাছে অসংগত ঠেকেছিল। লাবণ্যও ভাবলে, অমিত ওকে নিয়ে বোনেদের কাছে লজ্জিত। ব্যাপারটা লাবণ্যর কাছে বিস্বাদ ও অসম্মানজনক হয়ে দাঁড়াল।অমিত লাবণ্যকে জিজ্ঞাসা করলে, “তোমার কি সময় আছে। বেড়াতে যাবে?”লাবণ্য একটু যেন কঠিন করে বললে, “না, সময় নেই।”যোগমায়া ব্যস্ত হয়ে বললেন, “যাও-না মা, বেড়িয়ে এসো গে।”লাবণ্য বললে, “কর্তা-মা,কিছুকাল থেকে সুরমাকে পড়ানোয় বড়ো অবহেলা হয়েছে। খুবই অন্যায় করেছি। কাল রাত্রেই ঠিক করেছিলুম, আজ থেকে কিছুতেই আর ঢিলেমি করা হবে না।” বলে লাবণ্য ঠোঁট চেপে মুখ শক্ত করে রইল।লাবণ্যর এই জেদের মেজাজটা যোগমায়ার পরিচিত। পীড়াপীড়ি করতে সাহস করলেন না।অমিতও নীরস কণ্ঠে বললে, “আমিও চললুম কর্তব্য করতে, ওদের জন্যে সব ঠিক করে রাখা চাই।”এই বলে যাবার আগে বারান্দায় একবার স্তব্ধ হয়ে দাঁড়াল। বললে, “বন্যা, ঐ চেয়ে দেখো। গাছের আড়াল থেকে আমার বাড়ির চালটা অল্প একটু দেখা যাচ্ছে। একটা কথা তোমাদের বলা হয় নি, ঐ বাড়িটা কিনে নিয়েছি। বাড়ির মালেক অবাক। নিশ্চয় ভেবেছে, ওখানে সোনার গোপন খনি আবিষ্কার করে থাকব। দাম বেশ-একটু চড়িয়ে নিয়েছে। ওখানে সোনার খনির সন্ধান তো পেয়েইছিলুম, সে সন্ধান একমাত্র আমিই জানি। আমার জীর্ণ কুটিরের ঐশ্বর্য সবার চোখ থেকে লুকানো থাকবে।”লাবণ্যর মুখে গভীর একটা বিষাদের ছায়া পড়ল। বললে, “আর-কারো কথা অত করে তুমি ভাব কেন। নাহয় আর-সবাই জানতে পারলে। ঠিকমত জানতে পারাই তো চাই, তা হলে কেউ অমর্যাদা করতে সাহস করে না।”এ কথার কোনো উত্তর না দিয়ে অমিত বললে, “বন্যা, ঠিক করে রেখেছি বিয়ের পরে ঐ বাড়িতেই আমরা কিছুদিন এসে থাকব। আমার সেই গঙ্গার ধারের বাগান, সেই ঘাট, সেই বটগাছ, সব মিলিয়ে গেছে ঐ বাড়িটার মধ্যে। তোমার দেওয়া মিতালি নাম ওকেই সাজে।”“ও বাড়ি থেকে আজ তুমি বেরিয়ে এসেছ মিতা। আবার একদিন যদি ঢুকতে চাও দেখবে, ওখানে তোমাকে কুলোবে না। পৃথিবীতে আজকের দিনের বাসায় কালকের দিনের জায়গা হয় না। সেদিন তুমি বলেছিলে, জীবনে মানুষের প্রথম সাধনা দারিদ্র৻ের, দ্বিতীয় সাধনা ঐশ্বর্যের। তার পরে শেষ সাধনার কথা বল নি; সেটা হচ্ছে ত্যাগের।”“বন্যা, ওটা তোমাদের রবি ঠাকুরের কথা। সে লিখেছে, শাজাহান আজ তার তাজমহলকেও ছাড়িয়ে গেল। একটা কথা তোমার কবির মাথায় আসে নি যে, আমরা তৈরি করি তৈরি-জিনিসকে ছাড়িয়ে যাবার জন্যেই। বিশ্বসৃষ্টিতে ঐটেকেই বলে এভোল্যুশন। একটা অনাসৃষ্টি-ভূত ঘাড়ে চেপে থাকে, বলে, সৃষ্টি করো; সৃষ্টি করলেই ভূত নামে, তখন সৃষ্টিটাকেও আর দরকার থাকে না। কিন্তু তাই বলে ঐ ছেড়ে-যাওয়াটাই চরম কথা নয়। জগতে শাজাহান-মমতাজের অক্ষয় ধারা বয়ে চলেছেই। ওরা কি একজন মাত্র। সেইজন্যেই তো তাজমহল কোনোদিন শূন্য হতেই পারল না। নিবারণ চক্রবর্তী বাসরঘরের উপর একটি কবিতা লিখেছে–সেটা তোমাদের কবিবরের তাজমহলের সংক্ষিপ্ত উত্তর, পোস্টকার্ডে লেখা– তোমারে ছাড়িয়া যেতে হবে রাত্রি যবে উঠিবে উন্মনা হয়ে প্রভাতের রথচক্ররবে। হায় রে বাসরঘর, বিরাট বাহির সে যে বিচ্ছেদের দস্যু ভয়ংকর। তবু সে যতই ভাঙে-চোরে, মালাবদলের হার যত দেয় ছিন্ন ছিন্ন করে, তুমি আছ ক্ষয়হীন অনুদিন; তোমার উৎসব বিচ্ছিন্ন না হয় কভু, না হয় নীরব। কে বলে তোমারে ছেড়ে গিয়েছে যুগল শূন্য করি তব শয্যাতল। যায় নাই, যায় নাই, নব নব যাত্রী-মাঝে ফিরে ফিরে আসিছে তারাই তোমার আহ্বানে উদার তোমার দ্বার-পানে। হে বাসরঘর, বিশ্বে প্রেম মৃত্যুহীন, তুমিও অমর।রবি ঠাকুর কেবল চলে যাবার কথাই বলে, রয়ে যাবার গান গাইতে জানে না। বন্যা, কবি কি বলে যে, আমরাও দুজন যেদিন ঐ দরজায় ঘা দেব, দরজা খুলবে না।”“মিনতি রাখো মিতা, আজ সকালে কবির লড়াই তুলো না। তুমি কি ভাবছ প্রথম দিন থেকেই আমি জানতে পারি নি যে তুমিই নিবারণ চক্রবর্তী। কিন্তু তোমার ঐ কবিতার মধ্যে এখনই আমাদের ভালোবাসার সমাধি তৈরি করতে শুরু কোরো না, অন্তত তার মরার জন্যে অপেক্ষা কোরো।”অমিত আজ নানা বাজে কথা বলে ভিতরের কোন্-একটা উদ্বেগকে চাপা দিতে চায়, লাবণ্য তা বুঝেছিল।অমিতও বুঝতে পেরেছে, কাব্যের দ্বন্দ্ব কাল সন্ধেবেলায় বেখাপ হয় নি, আজ সকালবেলায় তার সুর কেটে যাচ্ছে। কিন্তু সেইটে যে লাবণ্যর কাছে সুস্পষ্ট সেও ওর ভালো লাগল না। একটু নীরসভাবে বললে, “তা হলে যাই, বিশ্বজগতে আমারও কাজ আছে, আপাতত সে হচ্ছে হোটেল-পরিদর্শন। ও দিকে লক্ষ্মীছাড়া নিবারণ চক্রবর্তীর ছুটির মেয়াদ এবার ফুরোল বুঝি।”তখন লাবণ্য অমিতর হাত ধরে বললে, “দেখো মিতা, আমাকে চিরদিন যেন ক্ষমা করতে পার। যদি একদিন চলে যাবার সময় আসে তবে, তোমার পায়ে পড়ি, যেন রাগ করে চলে যেয়ো না।” এই বলে চোখের জল ঢাকবার জন্যে দ্রুত অন্য ঘরে গেল।অমিত কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার পরে আস্তে আস্তে যেন অন্যমনে গেল য়ুক্যালিপ্টাস-তলায়। দেখলে, সেখানে আখরোটের গোটাকতক ভাঙা খোলা ছড়ানো। দেখেই ওর মনটার ভিতর কেমন একটা ব্যথা চেপে ধরলে। জীবনের ধারা চলতে চলতে তার যে-সব চিহ্ন বিছিয়ে যায় সেগুলোর তুচ্ছতাই সব চেয়ে সকরুণ। তার পরে দেখলে, ঘাসের উপর একটা বই, সেটা রবি ঠাকুরের “বলাকা’। তার নীচের পাতাটা ভিজে গেছে। একবার ভাবলে, ফিরিয়ে দিয়ে আসি গে, কিন্তু ফিরিয়ে দিলে না, সেটা নিল পকেটে। হোটেলে যাব-যাব করলে, তাও গেল না; বসে পড়ল গাছতলাটাতে। রাত্রের ভিজে মেঘে আকাশটাকে খুব করে মেজে দিয়েছে। ধুলো-ধোওয়া বাতাসে অত্যন্ত স্পষ্ট করে প্রকাশ পাচ্ছে চার দিকের ছবিটা; পাহাড়ের আর গাছপালার সীমান্তগুলি যেন ঘননীল আকাশে খুদে-দেওয়া, জগৎটা যেন কাছে এগিয়ে একেবারে মনের উপরে এসে ঠেকল। আস্তে আস্তে বেলা চলে যাচ্ছে, তার ভিতরটাতে ভৈরবীর সুর।এখনই খুব কষে কাজে লাগবে বলে লাবণ্যর পণ ছিল, তবু যখন দূর থেকে দেখলে অমিত গাছতলায় বসে, আর থাকতে পারলে না, বুকের ভিতরটা হাঁপিয়ে উঠল, চোখ এল জলে ছল্ছলিয়ে। কাছে এসে বললে, “মিতা, তুমি কি ভাবছ।”“এতদিন যা ভাবছিলুম একেবারে তার উলটো।”“মাঝে মাঝে মনটাকে উলটিয়ে না দেখলে তুমি ভালো থাক না। তা তোমার উলটো ভাবনাটা কিরকম শুনি।”“তোমাকে মনের মধ্যে নিয়ে এতদিন কেবল ঘর বানাচ্ছিলুম–কখনো গঙ্গার ধারে, কখনো পাহাড়ের উপরে। আজ মনের মধ্যে জাগছে সকালবেলাকার আলোয় উদাস-করা একটা পথের ছবি–অরণ্যের ছায়ায় ছায়ায় ঐ পাহাড়গুলোর উপর দিয়ে। হাতে আছে লোহার-ফলা-ওয়ালা লম্বা লাঠি, পিছে আছে চামড়ার স্ট্র৻াপ দিয়ে বাঁধা একটা চৌকো থলি। তুমি চলবে সঙ্গে। তোমার নাম সার্থক হোক বন্যা, তুমি আমাকে বন্ধ ঘর থেকে বের করে পথে ভাসিয়ে নিয়ে চললে বুঝি। ঘরের মধ্যে নানান লোক, পথ কেবল দুজনের।”“ডায়মণ্ড্হার্বারের বাগানটা তো গেছেই, তার পরে সেই পঁচাত্তর টাকার ঘর-বেচারাও গেল। তা যাক গে। কিন্তু চলবার পথে বিচ্ছেদের ব্যবস্থাটা কিরকম করবে। দিনান্তে তুমি এক পান্থশালায় ঢুকবে আর আমি আর-একটাতে?”“তার দরকার হয় না বন্যা। চলাতেই নতুন রাখে, পায়ে পায়ে নতুন, পুরানো হবার সময় পাওয়া যায় না। বসে-থাকাটাই বুড়োমি।”“হঠাৎ এ খেয়ালটা তোমার কেন মনে হল মিতা।”“তবে বলি। হঠাৎ শোভনলালের কাছ থেকে একখানা চিঠি পেয়েছি। তার নাম শুনেছ বোধ হয়–রায়চাঁদ-প্রেমচাঁদ-ওয়ালা। ভারত-ইতিহাসের সাবেক পথগুলো সন্ধান করবে বলে কিছুকাল থেকে সে বেরিয়ে পড়েছে। সে অতীতের লুপ্ত পথ উদ্ধার করতে চায়। আমার ইচ্ছে ভবিষ্যতের পথ সৃষ্টি করা।”লাবণ্যর বুকের ভিতরে হঠাৎ খুব একটা ধাক্কা দিলে। কথাটাকে বাধা দিয়ে অমিতকে বললে, “শোভনলালের সঙ্গে একই বৎসর আমি এম. এ. দিয়েছি। তার সব খবরটা শুনতে ইচ্ছা করে।”“এক সময়ে সে খেপেছিল, আফগানিস্থানের প্রাচীন শহর কাপিশের ভিতর দিয়ে একদিন যে পুরোনো রাস্তা চলেছিল সেইটেকে আয়ত্ত করবে। ঐ রাস্তা দিয়েই ভারতবর্ষে হিউয়েন সাঙের তীর্থযাত্রা, ঐ রাস্তা দিয়েই তারও পূর্বে আলেকজাণ্ডারের রণযাত্রা। খুব কষে পুশতু পড়লে, পাঠানি কায়দাকানুন অভ্যেস করলে। সুন্দর চেহারা, ঢিলে কাপড়ে ঠিক পাঠানের মতো দেখতে হয় না, দেখায় যেন পারসিকের মতো। আমাকে এসে ধরলে, সেখানে ফরাসি পণ্ডিতরা এই কাজে লেগেছেন, তাঁদের কাছে পরিচয়পত্র দিতে। ফ্রান্সে থাকতে তাঁদের কারো কারো কাছে আমি পড়েছি। দিলেম পত্র, কিন্তু ভারত-সরকারের ছাড়চিঠি জুটল না। তার পর থেকে দুর্গম হিমালয়ের মধ্যে কেবলই পথ খুঁজে খুঁজে বেড়াচ্ছে, কখনো কাশ্মীরে কখনো কুমায়ুনে। এবার ইচ্ছে হয়েছে, হিমালয়ের পূর্বপ্রান্তটাতেও সন্ধান করবে। বৌদ্ধধর্ম-প্রচারের রাস্তা এ দিক দিয়ে কোথায় কোথায় গেছে সেইটে দেখতে চায়। ঐ পথ-খেপাটার কথা মনে করে আমারও মন উদাস হয়ে যায়। পুঁথির মধ্যে আমরা কেবল কথার রাস্তা খুঁজে খুঁজে চোখ খোওয়াই, ঐ পাগল বেরিয়েছে পথের পুঁথি পড়তে, মানববিধাতার নিজের হাতে লেখা। আমার কী মনে হয় জান?”“কী, বলো।”“প্রথম যৌবনে একদিন শোভনলাল কোন্ কাঁকন-পরা হাতের ধাক্কা খেয়েছিল, তাই ঘরের থেকে পথের মধ্যে ছিটকিয়ে পড়েছে। ওর সমস্ত কাহিনীটা স্পষ্ট জানি নে, কিন্তু একদিন ওতে-আমাতে একলা ছিলুম, নানা কথায় হল প্রায় রাত-দুপুর, জানলার বাইরে হঠাৎ চাঁদ দেখা দিল একটা ফুলন্ত জারুলগাছের আড়ালে, ঠিক সেই সময়টাতে কোনো-একজনের কথা বলতে গেল। নাম করলে না, বিবরণ কিছুই বললে না, অল্প একটু আভাস দিতেই গলা ভার হয়ে এল, তাড়াতাড়ি বেরিয়ে চলে গেল। বুঝতে পারলুম, ওর জীবনের মধ্যে কোন্খানে অত্যন্ত একটা নিষ্ঠুর কথা বিঁধে আছে। সেই কথাটাকেই বুঝি পথ চলতে চলতে ও পায়ে পায়ে খইয়ে দিতে চায়।”লাবণ্যর হঠাৎ উদ্ভিদ্তত্ত্বের ঝোঁক এল, নুয়ে পড়ে দেখতে লাগল ঘাসের মধ্যে সাদায়-হলদেয়-মেলানো একটা বুনো ফুল। একান্ত মনোযোগে তার পাপড়িগুলো গুনে দেখার জরুরি দরকার পড়ল।অমিত বললে, “জান বন্যা, আমাকে তুমি আজ পথের দিকে ঠেলে দিয়েছ।”“কেমন করে।”“আমি ঘর বানিয়েছিলুম। আজ সকালে তোমার কথায় মনে হল, তুমি তার মধ্যে পা দিতে কুণ্ঠিত। আজ দু মাস ধরে মনে মনে ঘর সাজালুম। তোমাকে ডেকে বললুম, এসো বধূ, ঘরে এসো। তুমি আজ বধূসজ্জা খসিয়ে ফেললে, বললে, এখানে জায়গা হবে না বন্ধু, চিরদিন ধরে আমাদের সপ্তপদীগমন হবে।”বনফুলের বটানি আর চলল না। লাবণ্য হঠাৎ উঠে পড়ে ক্লিষ্টস্বরে বললে, “মিতা, আর নয়, সময় নেই।”