সর্বশেষ আপডেট
সবচেয়ে সাম্প্রতিক খবর ও পোস্টসমূহ
হেমলতার ধারাল দৃষ্টি তিরের ফলার মতো পদ্মজার গায়ে বিঁধছে। সে কাঁপা স্বরে জানিয়ে দিল, ‘শুটিং দলের একজন এসেছিল।’হেমলতার ঠোঁট দুটো ফুলে উঠল প্রচণ্ড আক্রোশে। পদ্মজা সবাইকে চেনে না। তাই তিনি পূর্ণাকে প্রশ্ন করলেন, ‘পূর্ণা, কে এসেছিল?’পূর্ণা দুই সেকেন্ড ভাবল। এরপর নতমুখে বলল, ‘কালো দেখতে যে… মিলন।’পদ্মজা আড়চোখে পূর্ণার দিকে তাকাল। তার ভয় হচ্ছে: মা যদি এখন বলে, মিলন তো তার সামনেই ছিল…তাহলে কী হবে? পূর্ণা মিথ্যে বলল কেন! সত্য বললেই পারত। হেমলতা বিশ্বাস করেছেন নাকি করেননি সেটা দৃষ্টি দেখে বোঝা গেল না। পূর্ণা মাথা নত করে দাঁড়িয়ে রইল অপরাধীর মতো। হেমলতা বারান্দা অবধি এসে আবার ঘুরে তাকালেন। মনটা খচখচ করছে। মনে হচ্ছে, ঘাপলা আছে। নাকি তার সন্দেহবাতিক মনের ভুল ভাবনা? কে জানে!.রাতে পদ্মজা খেতে চাইল না। বিকেলের ঘটে যাওয়া ঘটনা তাকে ঘোরে রেখেছে। চিঠিটা পড়তে বিন্দুমাত্র ইচ্ছে হচ্ছে না। তবুও কেমন-কেমন একটা অনুভূতি হচ্ছে। অচেনা, অজানা অনুভূতি। পদ্মজার হাব-ভাব হেমলতার বিচক্ষণ দৃষ্টি এড়াতে পারল না, তিনি ঠিকই খেয়াল করেছেন। কিন্তু মেয়েরা স্বয়ং আল্লাহ ছাড়া অন্য সবার থেকে কথা লুকোনোর ক্ষমতা নিয়ে যে জন্মায় তা তো অস্বীকার করা যায় না। যেমন তিনি এই ক্ষমতা ভালো করেই রপ্ত করতে পেরেছেন। পদ্মজাকে জোর করে খাইয়ে দিলেন। কোনো প্রশ্ন করলেন না।রাতের মধ্যভাগে মোর্শেদ হেমলতাকে জড়িয়ে ধরতে চাইলে হেমলতা এক ঝটকায় সরিয়ে দেন। চাপা স্বরে ক্রোধ নিয়ে বললেন, ‘তোমার বাসন্তীর কী হয়েছে? সে কী তোমাকে ত্যাগ করেছে? সেদিন ফিরে এলে কেন?’মোর্শেদ চমকালেন, অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন যেন। হেমলতা বাসন্তীকে চিনল কী করে? এই নাম তার গোপন অধ্যায়। অবশ্য হেমলতার মতো মহিলা না জানলেই বোধহয় বেমানান লাগত। মোর্শেদ বিব্রত কণ্ঠে বললেন, ‘হে আমারে কী ত্যাগ করব। আমি হেরে ছাইড়া দিছি।’হেমলতা বাঁকা হাসলেন। অন্ধকারে তা নজরে এলো না মোর্শেদের।‘বিশ বছরের সংসার এমন আচমকা ভেঙে গেল যে!’হেমলতার কণ্ঠে ঠাট্টা স্পষ্ট, তবে চাপা দীর্ঘশ্বাস রয়ে গেল গোপনে। মোর্শেদের শরীরের পশম দাঁড়িয়ে পড়ে। এ খবরও হেমলতা জানে? এতকিছু…কীভাবে? হেমলতার চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠেছে, তিনি চাদর গায়ে দিয়ে চলে গেলেন বারান্দায়। রাতে বেশ ঠান্ডা পড়ে মোর্শেদের কোনো কৈফিয়ত তিনি শুনতে চান না। তাই বারান্দার ঘরে এসে বসলেন।কতদিন পর রাতের আঁধারে বারান্দার ঘরে এসেছেন! বিয়ের এক বছর পরই জানতে পেরেছিলেন, মোর্শেদ তাকে বিয়ে করার ছয় মাস আগে বাসন্তী নামে এক অপরূপ সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করেছেন। স্বামীর ঘর ছাড়া আর পথ ছিল না বলে এত বড়ো সত্য হজম করে নিয়েছিলেন।বাসন্তীর মা বারনারী। আর একজন বারনারীর মেয়েকে সমাজ কিছুতেই মানবে না। মোর্শেদের বাবা মিয়াফর মোড়ল টাকার বিনিময়ে দেহ বিলিয়ে দেওয়া একজন বারনারীর মেয়েকে ছেলের বউ হিসেবে মানতে আপত্তি করেন। ততদিনে মোর্শেদ বিয়ে করে ফেলেছে, যদিও সে খবর মিয়াফর মোড়ল পাননি। তিনি মোর্শেদের মন ফেরাতে শিক্ষিত এবং ঠান্ডা স্বভাবের হেমলতাকে বেছে নিলেন। কুরবান হলো হেমলতার! তখন কলেজে ওঠার সাত মাস চলছিল! এরপর পড়াটাও আর এগোল না। জীবনের মোড় করুণ- রূপে পালটে গেল।.পরদিন সকাল সকাল স্কুলে রওনা হলো দুই বোন। পূর্ণা পথে চিঠিটা পড়ার পরিকল্পনা করেছিল। পদ্মজা হতে দিল না। সেয়ানা দুইটা মেয়ের হাতে কেউ চিঠি দেখে ফেললে? ইজ্জত যাবে। পদ্মজার প্রতি বিরক্তবোধ করছে পূর্ণা। চিঠিটা তার কাছে। পথে নতুন করে পরিকল্পনা করল সে, ক্লাসে বইয়ের চিপায় রেখে চিঠি পড়বে। কিন্তু তাও হলো না। পর পর দুই দিন কেটে গেল। সুযোগ পেলেও পড়তে দিতে চাইত না পদ্মজা, সারাক্ষণ যেন হাতে জান নিয়ে থাকে। এই বুঝি মা এলো! দুই দিন পর পূর্ণা মোক্ষম সুযোগ পেল। প্রান্ত ও প্রেমাকে নিয়ে হেমলতা বাপের বাড়ি গিয়েছেন। যদিও কয়েক মিনিটের পথ, দ্রুতই ফিরবেন।চিঠি পড়ায় পদ্মজার চেয়ে পূর্ণার আগ্রহ বেশি। সে চিঠি খোলার অপেক্ষায় ছিল। আজ খুলতে গিয়ে মনে হলো, যার চিঠি তার খোলা উচিত এবং আগে তারই পড়া উচিত। তাই পদ্মজার দিকে বাড়িয়ে দিল চিঠিটা Iপদ্মজা চিঠি খুলতে দেরি করছিল বলে পূর্ণা তাড়া দিল, ‘এই আপা, খোলো না। লজ্জা পাচ্ছো কেন? জিনিসটা চিঠি, কারো গায়ের কাপড় না।’পদ্মজা বিস্মিত নয়নে তাকাল, যেন পূর্ণা কাউকে খুন করার কথা বলেছে। বলল, ‘কীসব বলছিস পূর্ণা?’আচ্ছা, মাফ চাই। আর বলব না।’পদ্মজা ভাঁজ করা সাদা কাগজটা মেলে ধরল চোখের সামনে। প্রথমেই বড়ো করে লেখা ‘প্রিয় পদ্ম ফুল’।পূর্ণা পাশে এসে বসল। চিঠিতে দুজনের পূর্ণ মনোযোগ:প্রিয় পদ্ম ফুল,আমি কীভাবে শুরু করব বুঝতে পারছি না, অনুগ্রহ করে এই চিঠিটি একবার পড়ো। জানো পদ্ম, হঠাৎ করে নিজেকে চিনতে পারছি না। আমার হৃদয়-মস্তিষ্ক যেন অন্য কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে। আজ চলে যাব ভাবতেই বুকের ভেতর তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। তার কারণ—তুমি। যেদিন তোমাকে প্রথম দেখি, থমকে গিয়েছিল আমার নিশ্বাস ও কণ্ঠনালী। এতটুকুও মিথ্যে বলিনি। সেদিন শুটিংয়ে সংলাপ বলতে গিয়ে ভুল করেছি বারংবার। না চাইতেও বার বার চোখ ছুটে যাচ্ছিল লাহাড়ি ঘরের দিকে। বুকে থাকা হৃদপিণ্ডটায় শিরশিরে অনুভূতি শুরু হয় সেই প্রথম দেখা থেকেই। তোমাকে দ্বিতীয় বার দেখার আশায় প্রতিটা ক্ষণ গুণেছি। দ্বিতীয় বার দেখা পাই যখন বেগুন নিতে আসো। সেদিন কথা বলার লোভ সামলাতে পারিনি। টমেটোর অজুহাতে শ্রবণ করি পদ্ম ফুলের কণ্ঠ। মনে হচ্ছিল, এমন রিনরিনে গলার স্বর এই ইহজীবনে আর কখনো শুনিনি। রাতের ঘুম আড়ি করে বসে। তোমায় প্রতিনিয়ত দেখার একমাত্র পন্থা তোমার স্কুল। সবার অগোচরে কতবার তোমার পিছু নিয়েছি। তুমি বোকা, ধরতে পারোনি একবারও। সুন্দরীরা বোকা হয় আবার প্রমাণ হলো। এই, বোকা বলেছি বলে রাগ কোরো না যেন।এরই মধ্যে জানতে পারি, তোমার মায়ের ইচ্ছে তুমি অনেক পড়বে। তোমার জন্য অনেক উঁচু বংশ থেকে বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। তাও তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন। সেখানে আমি অতি সামান্য, অযোগ্য পাত্র। তবুও সাহস করে তোমার বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি। পদ্ম ফুলটাকে যে আমার চাই। তিনি রাজি হয়নি। সিনেমায় অভিনয় করা নায়কের সঙ্গে আত্মীয়তা নাকি করবেন না। এটাও বললেন, তোমার অনেক পড়া বাকি। তোমার মা কিছুতেই রাজি হবেন না। আহত মনে দু-পা পিছিয়ে আসি। ভেবেছি, তোমার কলেজ পড়া শেষ হলে পরিবার সঙ্গে করে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসব। তোমার মা সম্পর্কে যা জেনেছি- বুঝেছি, তাতে এতটুকু বিশ্বাস আছে, তিনি অভিনেতা বলে আমাকে এড়াবেন না। তিনি বিচক্ষণ মানুষ।সময় নেই আর। যা এতদিন বলতে চেয়েছি কিন্তু সুযোগ পাইনি আজ বলতে চাই—আমি তোমায় ভালোবাসি পদ্ম ফুল। আমার ভালোবাসা বর্ণনা করার জন্য শব্দগুলো কম হতে পারে তবুও আমি বলছি, যদি আমি আকাশ হই তুমি সেই সূর্যের রশ্মি, যে রশ্মি থেকে নতুন করে আলোকিত হয়েছি আমি।ইতিলিখন শাহ্পদ্মজার মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে। পূর্ণা হাসছে। ভ্রু উঁচিয়ে পদ্মজাকে বলল, ‘আপা রে, লিখন ভাইয়ার সঙ্গে তোমাকে যা মানাবে! কী সুন্দর করে লিখেছে।’পদ্মজা লজ্জায় চোখ তুলতে পারছে না। পূর্ণা বলল, ‘আল্লাহ! একদম বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে দিয়েছে! আপা, তুমি কিন্তু বিয়ে করলে লিখন ভাইয়াকেই করবে।’‘আর কিছু বলিস না।’ পদ্মজা মিনমিনে গলায় বলল।পূর্ণা শুনল না। সে অনবরত কথা বলে যাচ্ছে, ‘আমার ভাবতেই কী যে খুশি লাগছে আপা। নায়ক লিখন শাহ আমার বোনের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে! একদিন বিয়ে হবে।’‘চুপ কর না।’‘এই আপা, লিখন ভাইয়াকে ফেরত চিঠি দিবে না?’পদ্মজা চোখ বড়ো করে তাকাল। অবাক স্বরে বলল, ‘কীভাবে? ঠিকানা কোথায় পাব? আর আম্মা জানলে? না, না।’পূর্ণা আর কিছু বলতে পারল না। হেমলতার উপস্তিতি টের পেয়ে চুপ হয়ে গেল। পদ্মজা দ্রুত চিঠিটা ভাঁজ করে বালিশের তলায় রাখল……বুক ধুকপুক করছে।
মাঘ মাস চলছে। কেটে গেছে চার মাস। শুষ্ক চেহারা আর হিমশীতল মন নিয়ে পদ্মজা বসে আছে নদীর ঘাটে, গুনে গুনে তিন নম্বর সিঁড়িতে। নাকের ডগায় মেট্রিক পরীক্ষা, দিনরাত পড়তে হচ্ছে। সে নিয়ম করে প্রতিদিন ভোরে পড়া শেষ করে ঘাটে এসে বসে, নিজের অনুভূতিদের সঙ্গে বোঝাপড়া করার জন্য। কখনো উদাস হয়ে আবার কখনো লাজুক মুখশ্রী নিয়ে ভাবে কারো কথা। সেই যে চিঠি দিয়ে হারাল, আর সাক্ষাৎ মিলল না তার। কখনো কি মিলবে? তিনি কি আসবেন? এক চিঠি প্রতিদিন নিয়ম করে পড়ে পদ্মজা। ধীরে ধীরে অনুভব করে তার মধ্যে আছে অন্য আরেক সত্তা…যে সত্তা প্রতিটি মেয়ের অন্তঃসালের গভীরে জেঁকে বসে থাকে ভালোবাসার অনুভূতি নিয়ে। পূর্ণা শীতের চাদর মুড়ি দিয়ে পদ্মজাকে খুঁজছে। দুই দিন আগে তার অষ্টম শ্রেণির চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ হয়েছে। হিমেল হাওয়ার হাড় কাঁপানো শীতে থেমে থেমে কাঁপছে সে।পদ্মজাকে ঘাটে বসে থাকতে দেখে পেছন থেকে ডাকল, ‘আপা?’পদ্মজা তাকাল। বলল, ‘কী?’ পরপরই উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল, ‘আম্মা আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছে?’পূর্ণা পদ্মজার পাশ ঘেঁষে বলল, ‘না, আম্মার কিছু হয়নি।’পদ্মজা হাঁফ ছেড়ে বলল, ‘আম্মা সারাদিন সেলাই কাজ করে। একদিকে তাকিয়ে থাকে, এক জায়গায় বসে থাকে। এজন্যই শরীরে এত অশান্তি। দুর্বল হয়ে পড়েছে। আব্বাকে বলিস, আম্মারে নিয়ে সদরে যেতে। আমার কথা তো শুনবে না।‘আচ্ছা।’দুজন নদীর ওপারে তাকাল। অতিথি পাখির মেলা সেখানে। রোমাঞ্চকর আকর্ষণ। এত পাখি দেখে মন ভরে গেল। পাখিদের কলকাকলিতে এলাকা মুখরিত। এপার থেকেও শোনা যাচ্ছে। কোত্থেকে দৌড়ে আসে প্রান্ত। সে চার মাসে শুদ্ধ ভাষা রপ্ত করে নিয়েছে ভালোভাবে। এসেই বলল, ‘আপারা, কী করো?’পূর্ণা বলল, ‘পাখি দেখি। আয়, তুইও দেখ।’প্রান্ত দূরে চোখ রাখল। সকালের ঘন কুয়াশার ধবল চাদরে ঢাকা নদীর ওপার। পাখিদের ভালো করে চোখে ভাসছে না। শীতের দাপটে প্রকৃতি নীরব। তাই পাখির কলকাকলি শোনা যাচ্ছে দারুণভাবে। প্রান্ত বলল, ‘বড়ো আপা, একটা ধরে আনি?’‘একদম না। পাখি ধরা ভালো না। অতিথি পাখিদের তো ভুলেও ধরা উচিত না। ওরা আমাদের দেশে অতিথি হয়ে এসেছে।’প্রান্ত চুপসে গেল। ঠোঁট উলটে বলল, ‘আচ্ছা।’‘তোরা এইহানে কী করস?’মোর্শেদের কণ্ঠস্বর শুনে তিনজন ঘুরে তাকাল। প্রান্ত হাসিমুখে ছুটে এসে বলল, ‘আব্বা, আমি আজ তোমার সঙ্গে মাছ ধরতে যাব।’মোর্শেদ প্রান্তকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন, ‘তোর মায় আমার লগে কাইজ্জা করব।’‘আম্মাকে আমি বলব।’‘আইচ্ছা যা, তুই রাজি করাইতে পারলে লইয়া যামু।’মোর্শেদ গত দুই মাস ধরে প্রান্তকে চোখে চোখে রাখছেন। ছেলে নেই বলেই হয়তো! প্রতিটা বাবা-মায়েরই একটি ছেলের আশা থাকে।হেমলতা পর পর তিনটা মেয়ে জন্ম দিলেন। এ নিয়ে মোর্শেদ কখনো অভিযোগ করেননি। তবে মনে মনে খুব করে একটা ছেলে চাইতেন। প্রান্তকে যখন প্রথম আনা হলো, ভিক্ষুকের ছেলে বলে তার খুব রাগ হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রান্তকে চোখের সামনে ঝাঁপাতে-লাফাতে দেখে ছেলের জন্য রাখা মনের শূন্যস্থানটা নাড়া দিয়ে ওঠে। মোর্শেদ দুই হাত বাড়িয়ে দেন অনাথ ছেলেটির দিকে। এখন দেখে আর বোঝার উপায় নেই, মোর্শেদ আর প্রান্তের মধ্যে রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই। মোর্শেদ কাঠখোট্টা গলায় দুই মেয়েকে বললেন, ‘সদরে যাইয়াম। তোদের দুজনের লাইগা চাদর আনতাম না সুইডার?’কথাটি শুনে পদ্মজা দারুণভাবে চমকাল। অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু পেলে মানুষ কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। পদ্মজার অবস্থাও তাই হলো। খুশি প্রকাশ করার মতো পথ খুঁজে পাচ্ছে না, স্নায়ু কোষ থমকে গেছে। শীতের তাণ্ডবে প্রকৃতি বিবর্ণ, অথচ তার মনে হচ্ছে, বসন্তকাল চলছে। ঢোক গিলে ঝটপট উত্তর দিল, ‘আব্বা, তোমার যা পছন্দ তাই এনো।’খুশিতে পদ্মজার গলা কাঁপছে। মোর্শেদ অনুভব করলেন সেই কাঁপা গলা। গত সপ্তাহের ঘটনা, মধ্যরাতে রমিজের মেয়ে এক ছেলের সঙ্গে ধরা পড়ে। অলন্দপুরে সে কী তুলকালাম তাণ্ডব! ছেলেটিকে ন্যাড়া করে জুতার মালা পরিয়ে পুরো অলন্দপুর ঘুরানো হয়েছে। আর মেয়ের পরিবারকে মাতব্বর সমাজ থেকে বিচ্যুত করেছেন। পদ্মজা অপূর্ব সুন্দর হওয়া সত্ত্বেও আজও কোনো চারিত্রিক দোষ কেউ দিতে পারেনি। মেয়েটার দ্বারা কোনো অনৈতিক কাজ হয়নি। তার ঘরে যেন সত্যি একটা পদ্মফুলের বাস! ইদানীং মোর্শেদ পদ্মজাকে নিয়ে দোটানায় ভোগেন। খারাপ ব্যবহারটা আগের মতো আসে না। তিনি দ্রুত জায়গা ছেড়ে চলে যান।সকাল সকাল কলস ভরে খেজুরের মিষ্টি রস নিয়ে এলেন মোর্শেদ প্রেমা খেজুরের রস দেখেই বলল, ‘আম্মা, পায়েস খাব।হেমলতা সমর্থন করলেন, ‘আচ্ছা, খাবি।’সূর্য অনেক দেরিতে উঠল। প্রকৃতির ওপর সূর্যের নির্মল আলো ছড়িয়ে পড়েছে। আলোতে তেজ নেই। চার ভাই-বোন কাঁচা খেজুরের রস নিয়ে উঠানে বসল পাটি বিছিয়ে। খেজুরের কাঁচা রস রোদে বসে খাওয়াটাই যেন একটা আলাদা স্বাদ, আলাদা আনন্দের। পায়েসের জন্য তো নারিকেল দরকার তাই মোর্শেদ নারিকেল গাছে উঠেছেন।আচমকা পদ্মজা প্রশ্ন করল, ‘আজ কী সোমবার?’পূর্ণা কথা বলার পূর্বে হেমলতা বারান্দা থেকে বললেন, ‘আজ তো সোমবারই। কেন?’পদ্মজা খেজুরের বাটি রেখে ছুটে যায় বারান্দায়।‘আজ স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল আম্মা। ঝুমা ম্যাডাম বলেছিলেন, গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। সবাইকে যেতে বলেছেন।’‘আমায় বলে রাখতি। সামনে পরীক্ষা। গুরুত্বপূর্ণ দেখে পড়া দিবে বোধহয়, এজন্যই ডেকেছে। তাড়াতাড়ি যা। এই পূর্ণা, তুইও যা।’দুই বোন তাড়াহুড়ো করে বাড়ি থেকে দ্রুত বের হয়। সূর্য উঠলেও কনকনে শীতটা রয়ে গেছে। দুজনের গায়ে মোর্শেদের আনা নতুন সোয়েটার। পদ্মজা যখন মোর্শেদের হাত থেকে সোয়েটার পেল তখন আর আবেগ লুকিয়ে রাখতে পারেনি। মোর্শেদের সামনেই হাউমাউ কেঁদে দিল! তার কান্না মোর্শেদের হৃদয় স্পর্শ করে। কিন্তু মোর্শেদ নিজের অহংবোধের তাড়নায় দুর্বলতা প্রকাশ করেন না, পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান, ফেরেন অনেক রাতে। পূর্ণা হাঁটার মাঝে বলল, ‘আব্বার পছন্দ ভালো তাই না আপা?’‘কীসের পছন্দ?’‘সোয়েটারগুলো কী সুন্দর।’ধানপদ্মজা হাসতেই সামনের দাঁতগুলো ঝিলিক দিল। হাতের ডান পাশে ধানখেত। ধান গাছের ডগায় থাকা বিন্দু বিন্দু জমে থাকা শিশির রোদের আলোয় ঝিকমিক করছে। অনেকে হাতে কাঁচি নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে ধ কাটার। বাতাসে নতুন ধানের গন্ধ। হঠাৎ পূর্ণা চেঁচিয়ে উঠল, ‘আপারে, লিখন ভাই।’পদ্মজার নিশ্বাস এলোমেলো হয়ে পড়ে। মুহূর্তে বুকের মাঝে তাণ্ডব শুরু হয়। পূর্ণার দৃষ্টি অনুসরণ করে পেছনে তাকাল সে। লিখন ব্যস্ত পায়ে এদিকেই আসছে। তার পাশে চার ফুট উচ্চতার মগা।পদ্মজা অজানা আশঙ্কায় চোখ ফিরিয়ে নিলো। রুদ্ধশ্বাসে পূর্ণাকে বলল, ‘এখানে আর এক মুহূর্তও না।কথা শেষ করেই সে স্কুলের দিকে হাঁটা শুরু করে। পূর্ণা অবাক হয়। কিন্তু, এ নিয়ে রা করল না। লিখন পেছন পেছন আসছে। পদ্মজার বুক কাঁপছে বিরতিহীন ভাবে। তার চাহনি বিক্ষিপ্ত, হৃদয় অশান্ত।
বট গাছের সামনে চিন্তিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে লিখন। শীতের শুষ্কতায় বটগাছের অধিকাংশ পাতা ঝরে পড়েছে। লিখনের কাছে শীতকাল খুবই অপছন্দের ঋতু। শীত চরম শুষ্কতার রূপ নিয়ে প্রকৃতির ওপর জেঁকে বসে থাকে যা সহ্য হয় না লিখনের। ঠান্ডা লেগেই থাকে। ছোটো থেকে কয়েকবার নিউমোনিয়ায় ভুগেছে। সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে রুক্ষতা, তিক্ততা ও বিষাদের প্রতিমূর্তি শীতকাল।লিখন এক হাতের তালু দিয়ে আরেক হাতের তালু ঘষে উত্তপ্ততা সৃষ্টি করে। ভীষণ ঠান্ডা লাগছে। তখন পদ্মজা এত দ্রুত হাঁটছিল যে মনে হচ্ছিল, সে পালাতে চাইছে। লিখন আর এগোয়নি। পালাতে দিল পদ্মজাকে। মগা বলেছে, পদ্মজার লোকসমাজের ভয় খুব। তাই লিখন এই নির্জন মাঠের পাশে বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। পদ্মজা এ পথ দিয়েই বাড়ি ফিরবে। তখন যদি একটু কথা বলা যায়।পদ্মজা জড়োসড়ো হয়ে হাঁটছে। ভয়ে ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ। বার বার জিহবা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিচ্ছে।পদ্মজা মিনমিনে গলায় পূর্ণাকে ডাকল, ‘পূর্ণা রে…’পূর্ণা তাকাল। পদ্মজা এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল, ‘আমার ভয় হচ্ছে। উনি মাঝপথে দাঁড়িয়ে নেই তো?’পূর্ণা চরম বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘থাকলে কী হয়েছে? খেয়ে ফেলবে?’পদ্মজা আর কথা বলল না। পূর্ণার সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই। তখন লিখন শাহকে পাত্তা না দেয়ার জন্য পূর্ণার খুব রাগ হয়েছে। পদ্মজা বরাবরই মাথা নিচু করে হাঁটে। তাই লিখন শাহকে দেখতে পেল না। পূর্ণা দূর থেকে দেখতে পায়। কিন্তু এইবার আর পদ্মজাকে আগে থেকে বলল না। সে উত্তেজিত হয়ে ভাবছে, লিখন শাহ্ যখন আপার সামনে এসে দাঁড়াবে কী যে হবে!.লিখন-পদ্মজার দূরত্ব মাত্র কয়েক হাত…তখন পদ্মজা আবিষ্কার করল লিখনের উপস্থিতি। সে দ্রুত ওড়নার ঘোমটা চোখ অবধি টেনে নিলো। ভয়ে- লজ্জায় তার সর্বাঙ্গে কাঁপন ধরে গেছে। লিখনের পাশ কাটার সময় পুরুষালি কণ্ঠটি ডেকে উঠল, ‘পদ্ম।’পদ্মজা দাঁড়াতে চায়নি। তবুও কেন যেন দাঁড়িয়ে গেল। লিখন দুয়েক পা এগিয়ে আসে। পূর্ণা ঠোঁট টিপে সেই দৃশ্য গিলছে। লিখন উসখুস করতে শুরু করে, কথা গুলিয়ে ফেলেছে। পদ্মজা লিখনকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যায়। লিখন হতভম্ব হয়ে অবাক চোখে শুধু চেয়ে রইল।পূর্ণা বলল, ‘আমাকে বলুন, আমি বলে দেব।’লিখন পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে অনুরোধ স্বরে বলল, দয়া করে, তোমার বোনকে দিয়ো। আমি কাল বিকেলে ঢাকা চলে যাব।’পূর্ণা হাসিমুখে চিঠিটি হাতে নিয়ে বলল, ‘আপা আপনার আগের চিঠিটা প্রতিদিন পড়ে।’কথাটি শুনে লিখনের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠে। পূর্ণা চিঠি নিয়ে দৌড়ে ছুটে যায় পদ্মজার দিকে। লিখন আর পিছু নিলো না। পূর্ণা আসতেই পদ্মজা ধমকে উঠল, ‘কী কথা বলছিলি এত? কেউ দেখলে কী হতো? তুই আম্মার কথা কেন ভাবছিস না?’পদ্মজার কাঁদো-কাঁদো স্বরে পূর্ণা চুপসে গেল। সত্যি কী সে বেশি করে ফেলল? পূর্ণা আশপাশে তাকিয়ে দেখে, কেউ আছে নাকি। সত্যি কেউ দেখে থাকলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। পূর্ণা চোখ নামিয়ে চুপচাপ হেঁটে বাড়ি চলে আসে। হঠাৎ সৃষ্টি আতঙ্কের কারণে চিঠির কথা আর পদ্মজাকে বলা হয়ে উঠে না।.গোধূলি বিকেল। হেমলতা পদ্মজাকে ফরমায়েশ দেন, ‘পদ্ম, কয়টা টমেটো নিয়ে আয়।‘আচ্ছা, আম্মা।’পদ্মজা লাহাড়ি ঘরের ডান দিকে যায়। দুমাস আগে মোর্শেদ এদিকের সব ঝোপজঙ্গল সাফ করে টমেটোর ছোটোখাটো খেত করেছেন। লাল টকটকে টমেটো। হেমলতা রান্নার ফাঁকে বারান্দার দিকে উঁকি দিলেন। মোর্শেদ আর প্রান্ত কিছু নিয়ে বৈঠক করছেন।হেমলতা ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়লেন। বাসন্তী নামক মানুষটিকে কী কারণে ত্যাগ করলেন মোর্শেদ? জানতে ইচ্ছে করলেও হেমলতা এই বিষয়ে কোনো প্রশ্ন করলেন না। তবু এতটুকু বুঝেছেন মোর্শেদের বাইরের ঘোর কেটে গেছে, যার ফলস্বরূপ সংসারে তার মন পড়েছে। হেমলতাকে খুব সমীহ করে চলেন। তবে হেমলতা জানেন, মোর্শেদ পদ্মজাকে নিজের মেয়ে হিসেবে এখনো মেনে নেননি। তা নিয়ে মাঝেমধ্যেই খোঁচা দেন। এত অবিশ্বাস মানুষটার!পদ্মজা সাবধানে খেতের মধ্যখানে গেল। টমেটো ছিঁড়তে গিয়ে মনে পড়ে গেল তার লিখনের কথা। মনে মনে ভাবল, কেন এসেছেন উনি? কী-ই বা বলতে চেয়েছিলেন?জানার জন্য ব্যকুল হয়ে হয়ে ওঠে পদ্মজার মনটা 1‘আপা, একটা কথা বলি?’পদ্মজা চমকে পেছনে তাকাল, হঠাৎ পূর্ণার আগমনে ভয় পেয়েছে। বুকে ফুঁ দিয়ে বলল, ‘বল।’রাগ করবে না তো?’পদ্মজা চোখ ছোটো ছোটো করে তাকাল। বলল, ‘করব না।’পূর্ণা লিখনের দেয়া চিঠিটি দেখিয়ে বলল, ‘লিখন ভাইয়ার চিঠি।’পদ্মজা ছোঁ মেরে চিঠিটি নিলো। তার এহেন ব্যবহারে পূর্ণা অবাক হলো বটে, সেই সঙ্গে মনে মনে খুশি হলো বোনের আকুলতা দেখে। পদ্মজা দ্রুত চিঠির ভাঁজ খুলল। পূর্ণা বাড়ির দিকে তাকিয়ে দেখছে, কেউ আসছে নাকি পদ্মজা পড়া শুরু করল।প্রিয় পদ্ম ফুল,চার মাস কেটে গেল। চার মাসে একটুও অবসর মেলেনি। কিন্তু মনে ছিল এক আকাশ ছটফটানি। তোমার মনের কথা তো জানাই হলো না। তোমাদের অলন্দপুরের প্রায় প্রতিটি বাড়ির ছেলের স্বপ্ন তোমাকে ঘরে তোলার। তাই সারাক্ষণ ভয়ে ছিলাম। আমার অনুপস্থিতিতে কেউ তুলে নেয়নি তো! তিন দিনের সময় নিয়ে চলে এসেছি। শুধু একবার দেখতে আর জানতে, তুমি কি আমার জন্য অপেক্ষা করবে? মেট্রিক পরীক্ষা অবধি অপেক্ষা করলেই হবে। এরপর আমি মা আর বাবাকে নিয়ে তোমার মায়ের কাছে আসব। উনার কাছে অনুরোধ করব, তোমার পড়া শেষ হলে যেন আমার সঙ্গেই বিয়ে দেন। উনি কথা দিলে অনেকটা নিশ্চিন্ত হতে পারব। এখন অনিশ্চয়তায় ভুগছি। আমি গুছিয়ে লিখতে পারছি না আজ। কয়েকটা চিঠি লিখেছি। একটাও মনমতো হয়নি। অনুগ্রহ করে তুমি মানিয়ে নিয়ো। ভুলত্রুটি মার্জনা কোরো।ইতিলিখন শাহ্বাড়ির সবাই ঘুমে। পদ্মজা চুপিচুপি উঠে বসে পড়ার টেবিলে। রাত অনেক, গাছের পাতায় নিশ্চয় শিশির বিন্দু জমছে। এরপর ভোররাতে টিনের চালে শিশিরকণা বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টির মতো ঝরবে। গাঁ হিম করা ঠান্ডা, তা উপেক্ষা করে পদ্মজা হাতে কলম তুলে নিলো। সাদা কাগজে লিখল, অপেক্ষা করব। এরপর কাগজটা ভাঁজ করে বালিশের তলায় রেখে শুয়ে পড়ল।ফজরের নামাজ আদায় করে চার ভাইবোন পড়তে বসে। পড়ায় মন টিকছে না পদ্মজার। বই আনার ছুতোয় পদ্মজা ঘরের ভেতর চলে গেল। রাতের লেখা কাগজটা ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলে দিল জানালার বাইরে। এরপর আবার নতুন করে লিখল: আমার আম্মা যা চান তাই হবে।পড়াশেষে অভ্যাসবশত ঘাটে যায় পদ্মজা। হাতের মুঠোয় তিনটে চিঠি—দুটো লিখনের, একটা তার লেখা। পূর্ণাও পাশে। প্রেমা- প্ৰান্ত বাড়িজুড়ে ছুটাছুটি করছে। সামনের কোনোকিছু ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। সবকিছুই অস্পষ্ট। কুয়াশার স্তর এত ঘন যে, দেখে মনে হচ্ছে সামনে কুয়াশার পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। সেই পাহাড় ভেদ করে একটা নৌকা এসে ঘাটে ভেরে। নৌকায় লিখন আর মগা। আকস্মিক ঘটনায় পিলে চমকে উঠল পদ্মজার। পালানোর মতো শক্তিটুকু পেল না।লিখন মায়াভরা কণ্ঠে পদ্মজার উদ্দেশ্যে বলল, ‘আমি বাধ্য হয়ে এসেছি। আজ বিকেলে চলে যাব। মগা বলল, প্রতিদিন সকালে নাকি তুমি ঘাটে বসো। তাই এসেছি।’পদ্মজা মনে মনে দোয়া ইউনুস পড়ছে। ভয়ে বুক দুরুদুরু করছে। মা দেখে ফেললে কী হবে? বা অন্য কেউ? একটু সাহস জড়ো হতেই নিজের লেখা চিঠি সিঁড়িতে রেখে পদ্মজা ছুটে চলে গেল বাড়ির ভেতর। পূর্ণা বড়ো বড়ো চোখে শুধু দেখল। লিখন নৌকা থেকে নেমে চিঠিটা হাতে তুলে নেয়। ভাঁজ খুলে একটা লাইন পেল শুধু। বিষাদের ছায়া নেমে আসে লিখনের মুখে।পূর্ণার কৌতূহল হলো চিঠিতে কী আছে জানার জন্য। তবে তা প্রকাশ বল না। শুধু বলল, ‘আপা আপনার কথা প্রতিদিন ভাবে।’.১৯৯৬ সাল। পদ্মজা থেমে থেমে কাঁপছে। মুখ লুকিয়ে রেখেছে হাঁটুর ওপর। তুষার কালো চাদর টেনে দিল তার গায়ে। পদ্মজা চোখ তুলে তাকাল। বিষাদভরা কণ্ঠে বলল, ‘সেদিন আমার লেখা প্রথম চিঠিটা কুটিকুটি কেন করেছি জানি না। ইচ্ছে হয়েছিল তাই করেছি। তবে জানেন, আমি একদম ঠিক করেছিলাম। সেদিন যদি আমি কথা দিয়ে দিতাম। আমার কথা ভঙ্গ হতো।’পদ্মজা হাসল। তুষার একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল পদ্মজার দিকে।বলল, ‘লিখনের সঙ্গে আর দেখা হয়নি?’পদ্মজা হাতের কাটা জায়গায় ফুঁ দিয়ে বলল, ‘হয়েছিল।’‘তাহলে কথা ভঙ্গ হতো কেন বললেন?’তুষারের দিকে তাকাল পদ্মজা, এরপর হাঁটুতে মুখ লুকালো। এক মিনিট, দুই মিনিট, তিন মিনিট করে…কেটে গেল দশ মিনিট। পদ্মজার সাড়া নেই। তুষার ডাকল, ‘পদ্মজা? শুনতে পাচ্ছেন?’‘পাচ্ছি।’‘আপনার কী কষ্ট হচ্ছে?’‘হচ্ছে।’‘মুখ তুলে তাকান।’পদ্মজা ছলছল চোখে তাকাল। তুষার উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, ‘কোনো সমস্যা হচ্ছে?’তুষারের প্রশ্ন অগ্রাহ্য করে পদ্মজা ভেজা কণ্ঠে বলল, ‘আমার আম্মা আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা কেন করল?’তুষার ভেতরে ভেতরে চমকাল। হেমলতা নামে মানুষটার সম্পর্কে যা জানে এবং জানল, তাতে তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা শব্দটা যায় না পরপরই নিজেকে সামলে নিলো।ভালো মানুষের খারাপ রূপ—এমন কেইস শত শত আছে।তুষার সাবধানে প্রশ্ন করল, ‘কী করেছেন তিনি?’পদ্মজা উত্তর দিল না। মেঝেতে শুয়ে চোখ বুজল। তুষার গোপনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। পদ্মজা এখন আর কিছু বলবে না, সে ক্লান্ত; অতীত হাতড়াতে গিয়ে মনের অসুস্থতা বেড়ে গেছে। তুষার তাকাল মেয়েটার মুখের দিকে। আঁচল সরে গেছে তার বুকের ওপর থেকে, চাদরের অংশ পড়ে আছে মেঝেতে। তুষার চাদরটা টেনে দিতে গিয়ে আবিষ্কার করল, পদ্মজার গলায় কালো-খয়েরি মিশ্রণে কয়টা দাগ। কেউ শক্ত হাতে চেপে ধরেছিল গলা! হুংকার ছাড়ল সে, ‘ফাহিমা?’ফাহিমা কাছেই ছিল, তাই ছুটে এলো। তুষার বলল, আপনি আসামির গলা টিপে ধরেছেন?’ফাহিমা চট করে বলল, ‘না, স্যার। প্রথম থেকেই গলায় দাগগুলো দেখছি। প্রশ্নও করেছি। মেয়েটা উত্তর দিল না।’কপাল ভাঁজ করে ফেলল তুষার। হাজারটা প্রশ্ন মাথায় ভনভন করছে, মস্তিষ্ক শূন্য প্রায়। পদ্মজা যতটুকু বলেছে, তার পরের সাত বছরের কাহিনি জানা পর্যন্ত শান্তি মিলবে না। মাথা কাজ না করলে তুষার সিগারেট টানে। তাই সে বেরিয়ে গেল।
বাড়ির গিন্নির মতো কোমরে ওড়নার আঁচল গুঁজে রান্নাবান্না করছে পদ্মজা। হেমলতার কোমরে ব্যথা। তিনি রান্না করতে চাইলেও পদ্মজা রাঁধতে দিল না। মোর্শেদও বললেন, ‘বেদনা লইয়া রান্ধা লাগব না। তোমার মাইয়া যহন রানতে পারে তে হেই রান্ধক।’শেষ অবধি হেমলতা হার মানলেন। পদ্মজা মাটির চুলায় মুরগি গোশত রান্না করছে। খড়ি বা লাকড়ি হিসেবে আছে বাঁশের মুড়ো। আগুনের শিখার রং নীলচে। শীতের মাঝে রান্নার করার শান্তি আলাদা। মুরগি গোশত রান্না হওয়ার কারণ—আজ এতিম-মিসকিন খাওয়ানো হবে। হেমলতা বলেন, সামর্থ্য থাকলে মাসে একবার হলেও এতিম-মিসকিনদের খাওয়ানো উচিত, নয়তো ঘরে রহমত থাকে না। রান্না শেষ করে পদ্মজা হেমলতার কাছে এলো। বলল, ‘আম্মা রান্না শেষ।’হেমলতা দৌর্বল্যমাখা কণ্ঠে বললেন, ‘তোর আব্বারে গিয়ে বল—আলী, মুমিন, আর ময়নাকে নিয়ে আসতে।’পদ্মজা কিছু না বলে মাথা নিচু করে ফেলল। মোর্শেদের সঙ্গে আগবাড়িয়ে কথা বলতে তার ভয় হয়। অনেকদিন বাজে ব্যবহার করেন না। হুট করে যদি করে ফেলেন তো খুব কষ্ট হবে। হেমলতা মৃদু হাসলেন। বললেন, ‘কিছু বলবে না। যা তুই।’পদ্মজা ধীর কণ্ঠে বলল, ‘সত্যি যাব?’হেমলতা সামনে-পেছনে মাথা ঝাকিয়ে ইঙ্গিত করলেন যেতে। পদ্মজা মোর্শেদকে উঠানেই পেল, চেয়ারে বসে রোদ পোহাচ্ছেন। পদ্মজা গুটিগুটি পায়ে হেঁটে গেল। আব্বা ডাকতে গিয়ে গলা ধরে আসছে তার। ঢোক গিলে ডাকল, ‘আব্বা?’মোর্শেদ ঘাড় ঘুরাতেই পদ্মজার মনে হলো বুকে কিছু ধপাস করে পড়ল। পদ্মজা দৃষ্টি অস্থির রেখে মিনমিনে গলায় বলল, ‘আম্মা বলেছে আলীদের নিয়ে আসতে।’‘রান্ধন শেষ?’‘জি, আব্বা।’মোর্শেদ গলায় গামছা বেঁধে বেরিয়ে যান। পদ্মজা মোর্শেদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকল বেশ কিছুক্ষণ। অনুভূতিগুলো থমকে গেছে, ঝাপসা হয়ে আসছে পদ্মজার চোখ দুটো। অল্পতেই তার কান্না চলে আসে। সে তাড়াতাড়ি ডান হাতের উলটো পাশ দিয়ে চোখের জল মুছল। গাছ থেকে পাখির কিচিরমিচির শব্দ আসছে। পদ্মজা সেদিকে তাকাল। তখনি হেমলতা ডাকলেন, ‘পদ্ম।’পদ্মজা ছুটে যায়, ‘কিছু লাগবে আম্মা?’‘না। পূর্ণারা কোথায় গেল?‘ঘাটে।’‘কী করে?’‘মাছ ধরে।’‘বড়শি দিয়ে?’‘জালি দিয়ে।’‘এত বড়ো মেয়ে নদীতে নেমে জাল দিয়ে মাছ ধরে!’ কী মনে করে যেন আবার মেনে নিলেন, ‘আচ্ছা, থাক। তুই আয়। বস আমার পাশে।’পদ্মজা হেমলতার পায়ের কাছে বসে পায়ে হাত দিল টিপে দেওয়ার জন্য। হেমলতা পা সরিয়ে নিতে নিতে বললেন, ‘লাগবে না।’ শাড়ির আঁচল দিয়ে পদ্মজার কপালের ঘাম মুছে দিয়ে বললেন, ‘কোমরের ব্যথাটা কমেছে চিন্তা করিস না। তোর আব্বা কিছু বলেছে?’‘না, আম্মা। আচ্ছা আম্মা, আব্বা এত পালটাল কীভাবে?’ পদ্মজা নিজের আগ্রহ দমে রাখতে পারল না।হেমলতা মৃদু হাসলেন। উদাস হয়ে টিনের দেয়ালে তাকিয়ে বললেন, ‘শুনেছিলাম তোর বাপ ভালো মানুষ। কিন্তু বিয়ের পর তার ভালোমানুষি ভুলেও দেখিনি। কারণ, তার কানে-মগজে মন্ত্র দেয়ার মানুষ ছিল। অন্যের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন আর কেউ নিয়ন্ত্রণ করে না তাই পালটাচ্ছে। তোর বাপের ব্যক্তিত্ব নেই। নিজস্ব স্বকীয়তা নাই। অন্যের কথায় নাচে ভালো।’শেষ কথাটা হেমলতা হেসে বললেন। পদ্মজা কিছু বলল না। হেমলতা শুয়ে পড়লেন। আজ সারাদিন বিশ্রাম নিবেন। আগামীকাল অনেক কাজ। অনেকগুলো কাপড় জমেছে।‘রূপ ক্ষণিকের, গুণ চিরস্থায়ী। এটা আব্বা শেষ বয়েসে এসে বুঝেছে।’পদ্মজার শীতল কণ্ঠ এবং কথার তিরে হেমলতা ভীষণভাবে বিস্মিত হলেন। তিনি সেকেন্ড কয়েক কথা বলতে পারলেন না। পদ্মজা চলে যাওয়ার জন্য উঠতেই, হেমলতা অবিশ্বাস্য স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়লেন, ‘এই খবর তুই কোথায় পেলি?’পদ্মজা ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, ‘আমি তো তোমারই মেয়ে, আম্মা। তোমার এত বড়ো দুঃখ আমি জানব না?’পদ্মজা চলে গেল। পেছনে রেখে গেল হেমলতার অবিশ্বাস্য চাহনি।.বিকেলবেলা হেমলতা ঘর থেকে বের হলেন। শরীরে কিছুটা আরাম এসেছে। পূর্ণা বরই ভর্তা করছে, পাশে প্রেমা। পদ্মজাকে দেখা গেল না। নিশ্চয়ই ঘাটে বসে আছে। প্রান্তও তো নেই।তিনি পূর্ণাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘প্রান্ত কোথায়?’পূর্ণা কয়েক সেকেন্ড ভাবল কী উত্তর দিবে। এরপর ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল, ‘জানি না, আম্মা।’‘জানিস না কী?’ তিনি এবার প্রেমাকে ধরলেন, ‘প্রান্ত কোথায় রে প্রেমা?’ প্রেমা সহজ স্বরে বলল, ‘আমরা সবাই ঘাটে ছিলাম। প্রান্ত উঠানে ছিল। এরপর এসে দেখি নেই।’হেমলতা গলা উঁচিয়ে বললেন, ‘কোন মুখে বলছিস জানি না? একসঙ্গে নিয়ে থাকতে পারিস না। একা ছাড়িস কেন? কোথায় গেছে ছেলেটা।’হেমলতার ধমক ঘাট অবধি পৌঁছে যায়। পদ্মজা বাড়ির পেছন থেকে ছুটে এসে প্রশ্ন করে, ‘কী হয়েছে আম্মা?’‘প্রান্ত বাড়ি নেই সেটা আমাকে কেউ বলল না! দেখ দুটোকে, বসে বসে বরই ভর্তা গিলছে। দিন দিন অবাধ্য হচ্ছে মেয়েগুলো।’পূর্ণা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। প্রেমা হেমলতার ধমকে ভয় পাচ্ছে, কিন্তু অতটা না। হেমলতার মন কু গাইছে।তিনি নিজ ঘরে যেতে যেতে পদ্মজাকে বললেন, ‘বের হচ্ছি আমি। সাবধানে থাকবি।তখন দুজন লোক প্রান্তকে নিয়ে বাড়িতে ঢুকল। প্রান্তর কপাল বেয়ে রক্ত ঝরছে। পদ্মজা উদগ্রীব হয়ে হেমলতাকে ডাকল, ‘আম্মা।’ এরপর দৌড়ে গেল উঠানে। প্রান্ত কাঁদছে। হেমলতা ব্যস্ত পায়ে বেরিয়ে আসেন। প্রান্তকে আহত অবস্থায় দেখে ভড়কে যান। বুকটা হাহাকার করে উঠে তার। ছুটে গিয়ে প্রান্তকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে লোক দুটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার ছেলের কী হয়েছে?’একজন লোক বলল, ‘পলাশ মিয়ার ছেড়ার লগে মাইর লাগছিল। হেই ছেড়ায় পাথথর দিয়া ইডা মারছে কপালে আর ফাইট্টা গেছে।’মোর্শেদ লাহাড়ি ঘরের সামনে গাছ কাটছিলেন। চেঁচামেচি শুনে চলে আসেন। প্রান্তকে এমতাবস্থায় দেখে লোক দুটিকে তেজ নিয়ে বললেন, ‘কোন কুত্তার বাচ্চায় আমার ছেড়ারে মারছে? কোন বান্দির ছেড়ার এত বড়ো সাহস?’মোর্শেদ উত্তরের অপেক্ষা করলেন না। প্রান্তকে নিয়ে ছুটে চলে যান বাজারে। হেমলতা রয়ে গেলেন বাড়িতে। বাজারে আজ হাট বসেছে। মোর্শেদ হেমলতাকে নিষেধ করেছেন সঙ্গে যেতে। বাড়িতে থেকে হেমলতা হাঁসফাঁস করছেন। প্রান্ত একা বড়ো হয়েছে। কতবার কতরকম আঘাত পেয়েছে, দেখার কেউ ছিল না; সবসময় মিনমিনিয়ে কেঁদেছে। এমন বাচ্চা ছেলের এত বড়ো আঘাত পেয়ে চেঁচিয়ে কাঁদার কথা। কষ্ট তো আর কম পায়নি! দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করেছে। হেমলতার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। পদ্মজা ঘরে লুকিয়ে কাঁদছে। পূর্ণা-প্রেমা বাড়ির বাইরে বার বার উঁকি দিয়ে দেখছে, তাদের আব্বা প্রান্তকে নিয়ে ফিরল কি না!.দেখতে দেখতে চলে এসেছে মেট্রিক পরীক্ষা। কেন্দ্র শহরে, যেতে লাগে ছয় ঘণ্টা। বাড়িতে থেকে পরীক্ষা দেয়া সম্ভব না। এদিকে কেন্দ্রের পাশেই মোর্শেদের মামা বাড়ি; মামা নেই, তবে মামাতো ভাইয়েরা আছে। কথাবার্তা বলে সেখানেই দেড় মাসের জন্য হেমলতা আর পদ্মজা উঠল। মোর্শেদ বাকি দুই মেয়ে আর প্রান্তকে নিয়ে বাড়িতে রয়ে গেছেন। হেমলতা পদ্মজাকে নিয়ে আসার পূর্বে নিজে এসে দেখে গেছেন, পরিবেশ কেমন। মোর্শেদের দুই মামাতো ভাইয়ের মধ্যে একজন রাজধানীতে থাকে। আরেকজনের বয়স হয়েছে অনেক। ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিয়ে বউ নিয়ে একাই থাকেন। ছেলেরা শহরে চাকরি করে। পদ্মজার জন্য উপযুক্ত স্থান। তাই আর অমত করলেন না।মোর্শেদের যে ভাইটি বাড়িতে আছেন তার নাম—আকবর হোসেন। বয়স ষাটের বেশি হবে। তবে আকবর হোসেনের স্ত্রী জয়নবের বয়স খুব কম, হেমলতার বয়সি। হেমলতা আকবর হোসেনকে ভাইজান বলে সম্বোধন করেন। দালান বাড়ি, বেশিরভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকে। ফলে পদ্মজা মন দিয়ে পড়তে পারছে। পরীক্ষাও ভালো করে দিচ্ছে।হেমলতা অবশ্য আকবর হোসেনকে চোখে চোখে রেখেছেন। শীতল প্রকৃতির লোক, তবে বিশ্বাসী। রাতের খাবার আকবর হোসেনের সঙ্গেই খেতে হয়। হেমলতা দেড় মাসের খাওয়ার খরচ নিয়ে এসেছেন। আকবর হোসেন কিছুতেই আলাদা রাঁধতে দিচ্ছেন না। এভাবে অন্যের বোঝা হয়ে থাকতে হেমলতার আত্মসম্মানে লাগে। তিনি কথায় কথায় জানতে পারলেন, আকবর হোসেন এবং জয়নবের নকশিকাঁথা খুব পছন্দ। তাই তিনি কিছুদিন যাবৎ নকশিকাঁথা সেলাই করছেন। যতক্ষণ পদ্মজা পরীক্ষা দেয়, ততক্ষণ হেমলতা কেন্দ্রের বাইরে কোথাও বসে বা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন।অনেক রাত অবধি পদ্মজা পড়ে, আজ অনেকক্ষণ ধরে কী যেন ভাবছে। হেমলতা ব্যাপারটা খেয়াল করে পদ্মজার পাশে বসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী ভাবছিস?’পদ্মজা এক নজর হেমলতাকে দেখে চোখ ফিরিয়ে নিলো। হেমলতা তাকিয়ে রইলেন জানার জন্য। পদ্মজা দ্বিধা নিয়ে বলল, ‘রাগ করবে না তো?’হেমলতা পদ্মজাকে পরখ করে নিলেন। বললেন, ‘কী জানতে চাস?’পদ্মজা এদিক-ওদিক চোখ বুলায়। কীভাবে শুরু করবে বুঝে উঠতে পারছে না। দুই মিনিট পর নীরবতা ভেঙে বলল, ‘দুপুর থেকে আমার খুব জানতে ইচ্ছে হচ্ছে, হানিফ মামাকে কে মারল? তোমার সঙ্গে মামার কী কথা হয়েছিল? হানিফ মামাকে… মানে তুমি তো অন্য কারণে গিয়েছিলে কিন্তু ফিরে এলে। খুনও হলো। আমি সবসময় এটা ভাবি। কখনো উত্তর পাই না। মনে মনে অনেক যুক্তি সাজাই। কিন্তু যুক্তিগুলো মিলে না। সব যুক্তিই খাপছাড়া, এলোমেলো।’‘কাল পরীক্ষা। আর আজ এসব ভেবে সময় নষ্ট করছিস!’হেমলতার কণ্ঠ স্বাভাবিক। তবুও পদ্মজা ভয় পেয়ে গেল। তবে কিঞ্চিৎ আশা মনে ভীষণভাবে উঁকি দিচ্ছে।
কিছুটা দূরেই রেলস্টেশন। সেখান থেকে হুইসেলের শব্দ ভেসে আসছে। গভীর রাতের ট্রেন ছুটে যাচ্ছে নিজ গন্তব্যের দিকে। কাছে কোথাও নেড়ি কুকুরের দল ঘেউঘেউ করছে। হেমলতা জানালাগুলো বন্ধ করে দিলেন যাতে কুকুরের ডাকাডাকির আওয়াজে পদ্মজার পড়াশোনায় সমস্যা না হয়।পদ্মজা ইংরেজি বইয়ের দিকে চোখ রেখে মিনমিনে স্বরে বলল, ‘পরীক্ষা তো পরশু।হেমলতা খোলা চুল মুঠোয় নিয়ে হাত খোঁপা করে বললেন, ‘কাল আর পরশুর মাঝে তো খুব একটা পার্থক্য নেই।’পদ্মজা কিছু বলল না। বইয়ের দিকে তাকিয়ে এমন ভান ধরল যেন পড়ায় তার ভীষণ একাগ্ৰতা।হেমলতা চোখ ছোটো ছোটো করে পদ্মজাকে দেখছেন। মেয়েটা পড়ায় মনোযোগ দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কিন্তু সফল হতে পারছে না। বার বার নিচের ঠোঁট কামড়াচ্ছে। তিনি হঠাৎই বললেন, ‘ছাদে যাবি?’এহেন প্রস্তাবে পদ্মজা বিস্মিত হলো, নাকের পাটা হয়ে গেল লাল। যদিও এই কথাই নাক লাল কেন হলো, তা জানা নেই। সে হাঁ করে তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে। হেমলতা আবার বললেন, ‘যাবি?’পদ্মজা প্রফুল্লচিত্তে বলল, ‘যাব…যাব আম্মা।’আকবর হোসেনের বাড়িটির নাম সিংহাসনকুঞ্জ। এই অদ্ভুত নামের হেতু ছাদে উঠলেই জানা যায়। মা-মেয়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদের দিকে উঠছে। তাদের পায়ের শব্দ মোহময় ছন্দ তুলে হারিয়ে যাচ্ছে গহিন অন্ধকারে। ছাদের ঠিক মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল সিংহাসন। তা দেখে পদ্মজার চক্ষু চড়কগাছ!বিষ্ময় নিয়ে প্রশ্ন করল, ‘আম্মা! এই সিংহাসন কার?’হেমলতা পদ্মজার মুখের ভাব দেখে বেশ আনন্দ পাচ্ছেন। তিনি নিজেও দুইদিন আগে সিংহাসনটি দেখে খুব অবাক হয়ে আকবর হোসেনের কাছে একই ভাবে করেছিলেন প্রশ্নটা। তাই আকবর হোসেনের উত্তর পুনরাবৃত্তি করলেন, ‘তোর আকবর কাকার বাবা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক ছিলেন। উনার ইচ্ছে ছিল নিজের বাড়ির ছাদে একটা সিংহাসন তৈরি করার। শেষ বয়সে এসে নিজের মনের ইচ্ছে পূরণ করেছেন। দিনরাত নাকি রাজকীয় ভঙ্গীতে সিংহাসনে বসে থাকতেন। মৃত্যুও হয় এই সিংহাসনে, ঘুমানো অবস্থায়।’পদ্মজা হাঁ করে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। তারপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল সিংহাসনটি—ময়ূর সিংহাসন! ইট-সিমেন্টের তৈরি আসনটি যেন পেখম মেলে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক বড়ো, দৈর্ঘ্যে পাঁচ ফুট বা আরো বেশি হবে। পদ্মজা প্রশ্ন করল, ‘আম্মা, এটা মোঘল সম্রাট শাহজাহানের সিংহাসনের মতো না?’হেমলতা বললেন, ‘অনেকটাই তেমন। সম্রাট শাহজাহানের সিংহাসনের মতো করে বানানোর স্বপ্নই বোধহয় তিনি দেখতেন। অর্থের জন্য পারেননি।’ পদ্মজা ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে গেল। অনুরোধ করে বলল, ‘আম্মা তুমি সিংহাসনে বসো।’‘আমাকে মানাবে না। তুই বস, তোকে রাজরানি লাগবে।’‘তুমি আগে বসো। আম্মা একটু বসো…একটু?’পদ্মজার অনুরোধে হেমলতা সিংহাসনে বসলেন। পদ্মজাকে ডেকেবললেন, ‘তুইও আয়, পাশে বস।’পদ্মজা এলো না। দূর থেকে বলল, ‘মাঝে বসো আম্মা।’‘কী শুরু করেছিস!’‘বসো না।’হেমলতা কপাল কুঁচকে সিংহাসনের মাঝে বসেন। পদ্মজার ঠোঁটে হাসি ফুটে আবার হারিয়ে গেল। বলল, ‘আরেকটু বাকি।’‘কী বাকি?’বাঁ-পায়ের উপর ডান পা তুলে রানিদের মতো বসো।’হেমলতা বিরক্তি নিয়ে উঠে পড়েন। পদ্মজাকে বললেন, ‘পাগলের প্রলাপ শুরু করেছিস!’পদ্মজা নাছোড়বান্দা হয়ে দৃঢ়ভাবে বলল, ‘আম্মা, বসো। নয়তো আমি কাঁদব।’পদ্মজার ছেলেমানুষি দেখে হেমলতা হাসবেন না রাগবেন—ঠাওর করতে পারলেন না।রাতের সৌন্দর্য আর তার মায়াবী রূপকে, প্রতিটি মানুষের ভেতরের আহ্লাদ-ইচ্ছে-কষ্টকে ঠেলেঠুলে বের করে আনার ক্ষমতা বোধহয় আল্লাহ নিজ হাতে দিয়েছেন। তাই হেমলতা তার নিজের শক্ত খোলসে ফিরতে পারলেন না। পদ্মজার পাগলামোর সুরে সুর মিলিয়ে তিনি সিংহাসনে রাজকীয় ভঙ্গীতে বসলেন। পদ্মজার কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়, বুকের ভেতর ঝিরিঝিরি কাঁপন। এই তো তার কল্পনার রাজ্যের রাজরানি—হেমলতা…এবং তার কন্যা সে পদ্মজা। চোখের মণিকোঠায় ভেসে উঠল একটি অসাধারণ দৃশ্য। হেমলতার সর্বাঙ্গে হীরামণি-মুক্তার অলংকার। অসম্ভব সুন্দর শ্যামবর্ণের এই সাহসী নারীকে দেখতে কতশত দেশ থেকে মানুষ ভিড় জমিয়েছে। আর সে হেমলতার পাশে বসে আছে। চারিদিকে ঢাকঢোল পিটানো হচ্ছে। হাতিশাল থেকে হাতির হুংকার আসছে। তারাও যেন খুশি এমন রানি পেয়ে।‘তোর পাগলামি শেষ হয়েছে?পদ্মজা জবাব না দিয়ে হেমলতার পাশে এসে বসল। কোলে মাথা রেখে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আক্ষেপের স্বরে বলল, ‘আম্মা, তুমি রানি আর আমি রাজকন্যা কেন হলাম না? সবাই আমাদের ভালোবাসত। সম্মান করত। মুগ্ধ হয়ে দেখত।হেমলতার বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। সমাজ কেন তার প্রতিকূলে থাকল? কেন পদ্মজা ছোটো থেকে সমাজের অন্য কারো মেয়ের সঙ্গে মেশার অধিকার পেল না? তিনি বললেন, ‘জন্ম যেভাবেই হোক। জীবনে সফলতা না এনে মৃত্যুতে ঢলে পড়া ব্যক্তির ব্যর্থতা। তুই এমন জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা কর যাতে মানুষ সম্মান করে। সম্মান করতে বাধ্য হয়। চোখ তুলে তাকাতেও যেন ভয় করে। যারা দূরছাই করেছে তাদের যেন বিবেকে বাঁধে।’‘পারব আমি?’‘কেনো পারবি না? পুরো জীবন তো দুঃখে-অবহেলায় যায় না।’‘তোমার জীবনের অনেকগুলো বছর দুঃখ আর অবহেলাতেই তো গেছে। কিছুই পাওনি।’হেমলতা তাৎক্ষণিক পালটা জবাব দিতে পারলেন না। তিনি দুঃখকষ্ট- অবহেলা-অপমান আর একাকীত্ব ছাড়া জীবনে কী পেয়েছেন? উত্তরটাও চট করে পেয়ে গেলেন।পদ্মজাকে বললেন, ‘তিনটে মেয়ে পেয়েছি। আমার মেয়েরা আমার সফলতা। আমার অহংকার। প্রেমা তো ছোটো। তোরা দুইজন নিজেদের মতো থাকিস, পড়িস; কোনো দুর্নাম নাই। যখন মানুষ বলে—এই যে, এরা হচ্ছে হেমলতার মেয়ে…তখন আমার অনেক কিছু পাওয়া হয়ে যায়। গর্বে বুকটা ভরে উঠে।’পদ্মজা আশ্বস্ত করে বলল, ‘কখনো ভুল কাজ করব না। তোমার সম্মান আমাদের জন্য একটুও নষ্ট হতে দেব না।’হেমলতা পদ্মজার ডান হাত নিয়ে তার উলটোপাশে চুমু দিয়ে বললেন, ‘আমি জানি পদ্ম। আমার মেয়েরা কখনো আমার অসম্মান হতে দিবে না।’নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেঙে মাঝে মাঝে পাতার ফাঁকে ফাঁকে পাখ-পাখালির ডানা নাড়ার শব্দ ভেসে আসছে। পদ্মজা চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশে একটা চাঁদ, অগণিত তারা। আকাশকে তারায় পরিপূর্ণ একটি কালো গালিচার মতো লাগছে। হেমলতা বিভ্রম নিয়ে বললেন, ‘গায়ের কালো রংয়ের দোষে সমাজের সঙ্গে আমার সখ্যতা কখনো হয়ে উঠেনি। প্রকৃতির মতিগতি অবস্থা দেখে দেখে আমার সময় কাটত। আব্বা শিক্ষক ছিলেন বলে কালো হয়েও পড়াশোনা করার সুযোগ পেয়েছিলাম। অবশ্য আব্বার সামর্থ্যও ছিল। আমাদের সব ভাই-বোনকে পড়িয়েছেন। আম্মা আমাকে পড়ানোতে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। রং কালো, কেউ বিয়ে করবে না। একটু পড়ালেখা থাকলে হয়তো করবে সেই আশায়। যখন আমি তোর বয়সি ছিলাম, তখন বড়ো আপার মেয়ে হয়। মেয়েটার গায়ের রং কালো। শ্বশুর বাড়িতে তুলকালাম কাণ্ড। বংশের সবাই ফরসা। বাচ্চা কেন কালো হলো। আপাকে বের করে দিল! বাড়ি ফিরল আপা, সমাজের কত কটুক্তি হজম করেছে! তখন আমি নামাজের দোয়ায় আকুতি করে চাইতাম একটা সুন্দর মেয়ের। আমার বিয়ে হলে মেয়েটা যেন পরির মতো সুন্দর হয়, আমার মতো অবহেলার পাত্রী যেন না হয়; বড়ো আপার মতো কালো মেয়ে নিয়ে শ্বশুর বাড়ি থেকে বিতাড়িত হতে যেন না হয়। তুই যখন পেটে তখন নফল নামাজ-রোজা বাড়িয়ে দেই। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ বাদে সময় পেলেই সেজদায় লুটিয়ে আল্লাহকে একই কথা বলতাম। আমার পরির মতো মেয়ে চাই। দোয়াও কবুল হয়ে গেল। তোর যেদিন জন্ম হয়, সবাই অবাক হয়ে শুধু তাকিয়েই ছিল। আমি তো খুশিতে কেঁদেই দিয়েছিলাম। এত সুন্দর বাচ্চা এই গ্রামে কেন, পুরো দেশেও বোধহয় ছিল না। চোখের পাপড়ি যেন ভ্রুতে এসে ঠেকছিল। ঠোঁট এত লাল ছিল যেন ঠোঁট বেয়ে রক্ত ঝরছে। সদ্য জন্মানো শিশুর মাথা ভরতি ঘন কালো রেশমি চুল। অলন্দপুরের সবার কাছে ছড়িয়ে পড়ে এই কথা। দল বেঁধে দেখতে আসে। এক সপ্তাহ বেশ তোড়জোড় চলে। কী খুশি ছিলাম আমি! সারাক্ষণ তোকে চুমো খেতাম। রাতেও ঘুমাতে ইচ্ছে করত না। মনে হতো, এই বুঝি আমার পরির মতো মেয়ে চুরি হয়ে গেল! তোর আব্বা সারাক্ষণ খুশিতে বাকবাকম করত। বাইরে থেকে এসে গোসল ছাড়া কোলে নিত না। যখন কোলে নিত বার বার আমাকে বলত, ‘ও লতা। ছেড়িড়া মানুষ না শিমুল তুলা।’হেমলতা থামলেন। তার চোখের তারায় জল ছলছল করছে। পদ্মজা আগ্রহ নিয়ে শুনছিল। সে বলল, তারপর?‘কেউ বা কারা রটিয়ে দিল তুই তোর বাপের মেয়ে না। যুক্তি দাঁড় করাল: বাপ-মা কালো মেয়ে এত সুন্দর হয় কী করে? গ্রামের প্রায় সব মানুষ অশিক্ষিত, কুসংস্কারে বিশ্বাসী। তাই বিবেচনা ছাড়াই বিশ্বাস করে নিলো।’হেমলতা থামলেন। পদ্মজার মনে হতে থাকে, হেমলতা কিছু একটা লুকিয়েছেন। শুধু গ্রামের মানুষ বললেই এত বড়ো দাগ লেগে যায় না। অন্য কোনো কারণ আছে, যা যুক্তি হিসেবে শক্ত ছিল। হেমলতা দম নিয়ে বললেন, ‘আমায় একা করে দিয়ে তোর বাপ সরে গেল। সমাজ সরে গেল। আঁতুড়ঘরে তোকে নিয়ে একা পড়ে রইলাম। তোকে দেখলেই মনে হতো, আল্লাহ কোনো মূল্যবান সম্পদ আমাকে দেখে রাখতে দিয়েছেন। তোকে দেখে রাখা আর বড়ো করাটাই জীবনের লক্ষ্য মনে হতে থাকে। নিজেকে শক্ত করে আমি অন্য-আমি হয়ে যাই, খোলসটা পালটে যেতে থাকে; রাত জেগে স্বপ্ন সাজাই। তোর সঙ্গে ফুল কুড়ানোর স্বপ্ন দেখে ফুল গাছ লাগাই। যখন তোর চার বছর হয় বাড়ি ভরে যায় ফুলগাছে। ছোটো শাড়ি পরিয়ে প্রতিদিন মা-মেয়ে মিলে ফুল তুলে মালা গাঁথতাম। নিশুতি রাতে পাকা ছাদে জোছনা পোহানোর স্বপ্ন ছিল। আজ পূরণ হলো। আর দুইটা ইচ্ছে বাকি, সাগর জলে মা-মেয়ে পা ডুবিয়ে পুরো একটা বিকেল কাটাব। আর, শেষ বয়সে নাতি-নাতনিদের নিয়ে তাদের মায়ের জীবনী বলব।’পদ্মজা দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হেমলতার কোমর। তিনি টের পান পদ্মজা ফোপাচ্ছে।উৎকণ্ঠা নিয়ে বললেন, ‘পদ্ম… কাঁদছিস কেন?পদ্মজা বাচ্চাদের মতো কাঁদতে থাকল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমাকে কখনো একা থাকতে দিয়ো না আম্মা। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না। তোমার মতো কেউ হয় না।’‘এজন্য কাঁদতে হয়? আমি সবসময় তোর সঙ্গে আছি। কান্না থামা। কী মেয়ে হয়েছে দেখো! কেমন করে কাঁদছে। পদ্ম, চুপ…আর না…মারব এবার…পদ্ম।’পদ্মজা থামল। কিন্তু ভেতরের ছটফটানি পীড়া দিচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে জানে না, কিন্তু হচ্ছে; কান্না পাচ্ছে। ভয় হচ্ছে আকাশ ভরা রাতের দিকে তাকিয়ে। একটু আগেই সুন্দর লাগছিল এই আকাশ। আচমকা ভয়ংকর মনে হচ্ছে। মায়ের কোল ছাড়তে ইচ্ছে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, চারিদিকে অশরীরীদের ভিড়। তাদের কোলাহলে মস্তিষ্ক ফেটে যাচ্ছে। পদ্মজা মায়ের কোলে মুখ লুকাল। মেয়েকে অনেকক্ষণ কথা বলতে না দেখে হেমলতা বললেন, ‘পদ্ম, ঘুমিয়ে পড়েছিস?’‘না আম্মা।’হেমলতা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘সেদিন মাঝ রাত্রিরে ছুরি নিয়ে বের হয়েছিলাম। হানিফের ঘরটা আব্বা-আম্মার ঘর থেকে দূরে হওয়াতে সুবিধা ছিল। ঘরের পাশে গিয়ে দেখি, মদনও ঘরে। আমার পক্ষে দুজন পুরুষকে সামলানো সম্ভব না। তাই মদনের চলে যাবার অপেক্ষা করতে থাকি। এরপর আরেকজন লোক আসে। একটু দূরে সরে যাই, গোয়ালঘরের পেছনে। মিনিট কয়েক পর উঁকি দিয়ে দেখি দরজা লাগানো, সাড়াশব্দ নেই। সাবধানে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে দেখি হানিফ নেই। তখন হয়তো আম্মা দেখেছে। তাই ভাবছে আমি খুন করেছি।’‘নানু কেন এমন ভাবল? হানিফ মামা তো তোমারই ভাই।’হেমলতা তাৎক্ষণিক জবাব দিলেন না। সময় নিয়ে একটা গোপন সত্যি বললেন, ‘আমি তোর নানুর ভাইকে খুন করেছি। তাই তিনি আমাকে ঘৃণা করেন, ভয় পান; সন্দেহ করেন।’হেমলতার কণ্ঠ স্বাভাবিক। পদ্মজা চমকে উঠে বসল। মুখখানা হাঁ অবস্থায় স্থির হয়ে গেল তার, দৃষ্টি গেল থমকে। পদ্মজা যাতে নিজেকে সামলে নিতে পারে সেই সময়টুকু দিতে হেমলতা দূরের আকাশে চোখ রাখেন। পদ্মজা নিজেকে ধাতস্থ করে নিয়ে বলল, ‘তিনি কি হানিফ মামার মতো ছিলেন?’হেমলতা সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালেন। সিঁড়িতে কারো পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।হেমলতা সাবধান হয়ে পদ্মজাকে আড়াল করে দাঁড়ান। সেকেন্ড কয়েক পর একটা ছেলের দেখা মিলল, অচেনা মুখ। হেমলতা আগে কখনো দেখেননি। ছেলেটিও তাদের দেখে ভড়কে গেল।
ভোর বেলার সূর্য উদয়ের সময় চার পাশে ছড়িয়ে পড়ল মৃদু সূর্যালোক। ট্রেনের জানালা দিয়ে সূর্যের আগুনরঙা আলো পদ্মজার মুখশ্রী ছুঁয়ে যাচ্ছে। ফজরের নামাজ পড়ে ট্রেনে উঠেছে তারা। গন্তব্য অলন্দপুর। পদ্মজার মেট্রিক শেষ হলো আজ তিন দিন। হেমলতার কাঁধে মাথা রেখে চোখ বুজল পদ্মজা। পুরো দেড় মাস পর পূর্ণা-প্রেমা-প্রান্তর দেখা পাবে। খুশিতে আত্মহারা সে।মাঝে একটু জিরিয়ে ফের চলছে ট্রেন। হেমলতা জানালার বাইরে তাকিয়ে আকাশ দেখছেন। কারণে-অকারণে তিনি এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। শুষ্ক চক্ষুদ্বয় যখন-তখন সজল হয়ে উঠে। কিছুতেই বারণ মানে না, নীল আকাশের বুকে যেন সেদিন রাতের স্মৃতি আকার নিয়ে ভেসে উঠল। ছেলেটার বয়স তেইশ-চব্বিশ বছর হবে। অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল। দেখতে-শুনতে বেশ ভালো। হেমলতা পদ্মজাকে আড়াল করে কঠিন স্বরে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কে তুমি?’ছেলেটি হেমলতার কথার ধরনে বিব্রতবোধ করল।ইতস্তত করে বলল, ‘মুহিব, মুহিব হোসেন।’হেমলতার টনক নড়ল। তিনি সাবধানে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বারেক হোসেন তোমার বাবা?’মুহিব ভদ্রভাবে বলল, ‘জি।’হেমলতা কী যেন বলতে চেয়েছিলেন, পারলেন না। তার আগেই মুহিব অপরাধী স্বরে বলল, ‘বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। আমি আসছি।’ এরপরই হন্তদন্ত হয়ে চলে গেল। সেদিন আর রাত জাগা হলো না। ছাদ থেকে নেমে গেল মা-মেয়ে। গোপন বৈঠকে একবার বাধা পড়লে আলোচনা চালিয়ে যেতে আর মন সায় দেয় না। অনুভূতিগুলো ভোঁতা হয়ে যায়।পরদিন জানা গেল—মুহিব তার পিতার সঙ্গে রাগ করে ঢাকা ছেড়ে চাচার বাড়ি উঠেছে। এখনকার ছেলে-মেয়েদের ক্ষমতা খুব। তারা খুব সহজ কারণে মা-বাবার সঙ্গে রাগ করে দূরে সরে যেতে পারে। হেমলতা অবজ্ঞায় কপাল কুঞ্চিত করতে সঙ্কোচবোধ করলেন না। পরে অবশ্য বুঝেছেন, মুহিব খুবই ভালো ছেলে। নম্র, ভদ্র, জ্ঞানী। মেধাবী ছাত্র, বিএ পড়ছে। সবচেয়ে ভালো গুণ হলো, মুহিবের নজর সৎ। হেমলতা চোখের দৃষ্টি চিনতে ভুল করেন না। ঠিক সতেরো দিন পর বারেক হোসেন ছেলেকে নিতে আসেন। যেদিন আসেন পরদিন রাতেই হেমলতার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। মুহিবের বউ হিসেবে পদ্মজাকে নিতে চান। হেমলতা অবাক হোন। মুহিব মনে মনে পদ্মজার প্রতি দুর্বল, অথচ তিনি একটুও বুঝতে পারেননি!নিঃসন্দেহে মুহিব পাত্র হিসেবে উপযুক্ত। মুহিবের বড়ো দুই ভাই—মুমিন ও রাজীব। দুজনই চাকরিজীবী। মুমিন বিয়ে করে বউকে ডাক্তারি পড়াচ্ছে। বউয়ের পড়াশোনার সমর্থনে আছে পুরো পরিবার। বোঝা যাচ্ছে, পরিবারের প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্ক, ভাবনা উচ্চ মানের। বারেক হোসেন বিয়ের প্রস্তাবের সঙ্গে এটিও বলেছেন, ‘আমার মেয়ে নেই। ছেলের বউরাই আমার মেয়ে। আপনার মেয়ের যতটুকু ইচ্ছে পড়বে। কোনো বাধা নেই।’হেমলতা প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন না। তিনি আনন্দ সাথে জবাব দিলেন, ‘পদ্মজা আইএ শেষ করুক। এরপরই না হয়।’বারেক হোসেন হেসে বললেন, ‘তাহলে এটাই কথা রইল।’স্মৃতির পর্দা থেকে চোখ সরিয়ে নিলেন হেমলতা। গোপনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। গলাটা কাঁপছে। ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ। ব্যাগ থেকে বোতল বের করে পানি পান করলেন।.অলন্দপুর।প্রেমা-প্রান্ত বাড়ির বাইরে সড়কে পায়চারি করছে। পূর্ণা গেটের আড়াল থেকে বার বার উঁকি দিয়ে দেখছে দূরের পথ। হেমলতা ও পদ্মজাকে আনতে মোর্শেদ যে সেই কখন গঞ্জে গেলেন, এখনো আসছেন না! পুরো দেড় মাস পর মা-বোনের সাক্ষাৎ পাবে তারা। হৃদপিণ্ড দ্রুতগতিতে চলছে। মিনিট পাঁচেক পর কাঁচা সড়কের মোড়ে মোর্শেদের পাশে কালো বোরখা পরা দুজন মানুষকে দেখা যায়। পূর্ণা লাজলজ্জা ভুলে আগে আগে ছুটতে থাকে। পেছনে প্রান্ত এবং প্রেমা। দৌড়ে গিয়ে মা-বোনকে একসঙ্গে জড়িয়ে ধরে প্রবল কণ্ঠে কেঁদে উঠল পূর্ণা। হেমলতা পূর্ণাকে ধমক দিতে গিয়েও থেমে গেলেন। মাঝে মাঝে একটু বাড়াবাড়ি করা দোষের নয়। পদ্মজার চোখ বেয়েও টপটপ করে জল পড়ছে। প্রায় প্রতিটা রাত সে ভাই-বোনদের কথা মনে করেছে। বিশেষ করে পূর্ণাকে মনে পড়েছে বেশি। মনে হচ্ছে, কত শত বছর পর দেখা হলো! পদ্মজাকে জাপটে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদছে পূর্ণা। প্রতিটি দিন সে বাড়ির আনাচে-কানাচে পদ্মজার শূন্যতা অনুভব করেছে। পূর্ণা অশ্রুসিক্ত চোখ মেলে বোনের দিকে তাকাল। এরপর আবার জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আপা, আমার এত আনন্দ হচ্ছে! আগে কখনো এমন হয়নি।পদ্মজার কোমল হৃদয়, পূর্ণার ভালোবাসা দেখে বিমোহিত হয়ে উঠল সে স্নেহমাখা কণ্ঠে বলল, ‘আমার সোনা বোন। আর কাঁদিস না।’পূর্ণা দ্রুত চোখের জল মুছে প্রফুল্লচিত্তে বলল, ‘আপা, আমি তোমার পছন্দের চিংড়ি মাছ দিয়ে লতা রেঁধেছি।’পদ্মজা অবাক চোখে তাকাল। এদিকে এক বোনের প্রতি আরেক বোনের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখে হেমলতা প্রশান্তিদায়ক সুখ অনুভব করছেন। আনন্দে বাকহারা হয়ে পূর্ণার দুই গালে চুমো দিল পদ্মজা। মোর্শেদ দৃশ্যটি মুগ্ধ হয়ে দেখছিলেন, মানুষজনকে আসতে দেখে তাড়া দিলেন, ‘দেহো মাইয়াডির কারবার। মানুষ আইতাছে। আর হেরা রাস্তায় কান্দাকাটি লাগাইছে। হাঁট, সবাই হাঁট।’বাড়ি ফিরে হাতমুখ ধুয়ে সবাই খেতে বসে। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে চার ভাই-বোন আশ্রয় নিলো ঘাটে। এই ঘাট হচ্ছে তাদের বৈঠকখানা। দেড় মাসে কী কী হলো, না হলো সব পূর্ণা বলছে। প্রেমা পূর্ণার নামে বিচার দিল। প্রান্ত প্রেমার নামে বিচার দিল। প্রান্ত কেন বিচার দিল তা নিয়ে আবার বাকবিতণ্ডা লাগিয়ে দিল প্রেমা। সে কী কাণ্ড! তুমুল ঝগড়ায় লিপ্ত হয় দুজন। এক পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে বিচার নিয়ে ছোটো দুজন গেল হেমলতার কাছে।তখন পদ্মজা শুষ্ককণ্ঠে পূর্ণাকে বলল, জানিস পূর্ণা, আম্মা আমার বিয়ে ঠিক করেছে।’পূর্ণা ভীষণ চমকাল। চমকিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, ‘কবে? কার সঙ্গে?’‘যে বাড়িতে ছিলাম ওই বাড়ির ছেলের সঙ্গে। বিএ পড়ছে। আমার আইএ শেষ হলে বিয়ের তারিখ পড়বে।’‘আপা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। আম্মার না ইচ্ছে তোমাকে অনেক পড়াবে। তোমার চাকরি হবে।’পদ্মজা চুপ থাকল ক্ষণকাল। তারপর বলল, ‘আম্মার কী যেন হয়েছে। পালটে গেছেন।’‘কী রকম?’‘আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। বেশিরভাগ কথা এড়িয়ে যান। আমার ভবিষ্যত নিয়ে আগের মতো আগ্রহ দেখান না। আমি কথা তুললে এড়িয়ে যান। গল্প করেন না। আম্মা আগের মতো নেই পূর্ণা।’ কথাগুলো বলতে গিয়ে পদ্মজার গলা কিঞ্চিৎ কাঁপল।‘কী বলছ!’‘সত্যি।’‘কিছু হয়েছে ওখানে?‘না। আমি যতটুকু জানি তেমন কিছুই হয়নি।’পূর্ণা সীমাহীন আশ্চর্য হয়ে চিন্তায় ডুবে গেল। পদ্মজা শূন্যে তাকিয়ে রইল। লিখন শাহ নামে মানুষটার কথা মনে পড়ছে। তিনি যখন শুনবেন এই খবর, সহ্য করতে পারবেন? সত্যি ভালোবেসে থাকলে সহ্য করতে কষ্ট হবে নিশ্চয়ই। পূর্ণা দ্বিধাভরে প্রশ্ন করল, ‘আপা, লিখন ভাইয়ের কী হবে?’পদ্মজা ক্লান্ত ভঙ্গিতে তাকাল। বলল, ‘আমি তাকে বলেই দিয়েছি, আম্মা যা বলবেন তাই হবে।’পূর্ণার মনজুড়ে নেমে আসে বিষাদের ছায়া। তার আপার মতো সুন্দরীকে শুধুমাত্র লিখন শাহর পাশেই মানায়। লিখন শাহ আর পদ্মজাকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখল সে।সব স্বপ্নে গুড়ো-বালি!পূর্ণা কাতর কণ্ঠে বলল, ‘লিখন ভাইয়ের সঙ্গে তোমার বিয়ে না হলে আমি কষ্ট পাব খুব।’‘আমি তো আম্মার কথার বাইরে যেতে পারব না।’পূর্ণা গলার স্বর খাদে এনে বলল, ‘যদি লিখন ভাই রাজি করাতে পারে?’ পদ্মজা অবিশ্বাস্য দৃষ্টি নিয়ে তাকাল। সেই দৃষ্টি যেন ইঙ্গিত দিচ্ছে, হওয়ার নয়! পূর্ণা কপাল কুঁচকে ফেলল। বিরক্তিতে বলে উঠল, ‘ধ্যাত! ভালো লাগছে না।’.বাতাসটা গরম ঠেকছে, ক্রমশ বেড়ে চলেছে মাথাব্যথা। এত এত গাছগাছালি চারিদিকে, তবুও এতটুকুও শীতলতা নেই। হেমলতা আলমারির কাপড় গুছিয়ে বিছানার দিকে তাকালেন। মোর্শেদ এই রোদ ফাটা দুপুরে কখন থেকে ঝিম মেরে বিছানায় বসে আছেন। মুখখানা বিমর্ষ, চিন্তিত 1 হেমলতা প্রশ্ন ছুঁড়লেন, ‘কী হয়েছে?’মোর্শেদ তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিলেন। হেমলতা তাকিয়ে রইলেন জবাবের আশায়। ক্ষণকাল সময় নিয়ে মোর্শেদ বললেন, ‘বাসন্তী এই বাড়িত থাকবার জন্য আইতে চায়।’হেমলতার চোখ দুটি ক্রোধে জ্বলে উঠে আবার নিভে গেল।তিনি নির্বিকার কণ্ঠে বললেন, ‘তোমার ইচ্ছে হলে নিয়ে এসো। বাড়ি তো তোমার।’মোর্শেদ চকিতে তাকালেন। তিনি ভেবেছিলেন হেমলতা রাগারাগি করবে। মোর্শেদের চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ রূপ নিলো। কিড়মিড় করে হেমলতাকে বললেন, ‘আমি তারে চাই না।’হেমলতা ঠাট্টা করে হাসলেন। বললেন, ‘বিশ বছর সংসার করে এখন তাকে চাও না! আমি হলে মামলা ঠুকতাম।’মোর্শেদ আহত মন নিয়ে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। তার চোখ দুটিতে অসহায়ত্ব স্পষ্ট। হেমলতা নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে সেখান থেকে সরে পড়েন। মোর্শেদ তখন কপট রাগ নিয়ে নিজে নিজে আওড়ান, ‘বাসন্তী আমারে ডর দেহায়! মা*ডারে খুন করতে পারলে জীবনে শান্তি পাইতাম।’হেমলতা দরজার ওপাশ থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে মোর্শেদকে পরখ করছেন। রাগে ছটফট করছেন মোর্শেদ। বাসন্তীর প্রতি তার এত রাগ কেন?হেমলতা পুনরায় ঘরে এসে বললেন, ‘ভালোবাসার মানুষকে এভাবে গালি দিয়ে ভালোবাসা শব্দটির সম্মান খুইয়ে দিয়ো না।’‘আমি তারে কোনোকালেও ভালোবাসি নাই। বাসলে তোমারে বাসছি।’ হেমলতা ভীষণ অবাক হয়ে তাকালেন। চোখের তারায় জ্বলজ্বল করে কিছু একটা যেন ছুটতে শুরু করে।ভোঁতা অনুভূতিগুলো মুহূর্তে নাড়াচাড়া দিয়ে উঠে। মোর্শেদ অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। তিনি বিছানা থেকে নেমে গটগট পায়ে বেরিয়ে যান। হেমলতা মোর্শেদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকেন ঝাপসা চোখে।মানুষটার থেকে এই একটি শব্দ শোনার জন্য একসময় কত পাগলামি করেছেন, কত কেঁদেছেন। আকুতি-মিনতি করেছেন। মোর্শেদের মুখে ভালোবাসার সত্য স্বীকারোক্তি শুনে হেমলতার ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। বয়সটা কম হলে আজ তিনি অনেক পাগলামি করতেন, অনেক!.পূর্ণার গা কাঁপানো জ্বর। তাই পূর্ণাকে নানাবাড়ি রেখেই পদ্মজা বাড়ি ফিরল সঙ্গে এলো হিমেল-প্রান্ত-প্রেমা। তিন ভাইবোন মিলে বাড়িজুড়ে ছোটাছুটি করে লাউ, শিম, লতা, পুঁইশাক বন্দোবস্ত করল। বাজার থেকে মাছ নিয়ে এলো হিমেল। বাড়িতে শুঁটকি ছিল। আজ হেমলতা আর মোর্শেদ ফিরবেন। তাই এত আয়োজন। দুই দিন আগে তারা ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। হেমলতার বড়ো বোন হানির মেজো মেয়ের বিয়ের কথাবার্তা চলছে। হানি বলেছেন, হেমলতা না গেলে তিনি বিয়ের তারিখ ঠিক করবেন না। তাই বাধ্য হয়ে হেমলতা গেছেন। তবে পদ্মজার শুরু থেকে খটকা লাগছে। তার মা তাকে রেখে পাশের এলাকায় যেতেও আপত্তি করেন। আর আজ দুই দিন ধরে তিনি মাইলের পর মাইল দূরে পদ্মজাকে ছাড়া রয়েছেন! অবশ্য এসব এখন ভাবার সময় নয়। পদ্মজা যত্ন করে কয়েক পদের রান্নার প্রস্তুতি নিলো। সকাল থেকে সূর্যের দেখা নেই। পরিবেশ ঠান্ডা, স্তব্ধ। এ যেন ঝড়ের পূর্বাভাস। প্রান্ত-প্রেমা উঠান জুড়ে মারবেল খেলছে। হিমেল শুধু দেখছে, মাঝে মাঝে প্রবল কণ্ঠে হেসে হাত তালি দিচ্ছে। রান্না শেষ হলো বিকেলে প্রেমা, প্রান্ত ও হিমেলকে খাবার বেড়ে দেয় পদ্মজা।খাওয়াদাওয়া শেষ হলে বলল, ‘মামা, তুমি আর প্রান্ত গিয়ে পূর্ণাকে নিয়ে আসো। সন্ধ্যা হয়ে যাবে একটু পর। আম্মা-আব্বাও চলে আসবে।’হিমেল-প্রান্ত বের হতেই পেছন পেছন ছুটে গেল প্রেমা। পদ্মজা একা হয়ে গেল। রান্নাঘর গুছিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল।কালো মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ, বাতাস বইছে প্রবলবেগে। বাতাসের দাপটে পদ্মজার চুল ও ওড়না উড়ছে। পরিবেশ অন্ধকার হচ্ছে ধীরে ধীরে। তার মনটা কু গাইতে লাগল। সে এক হাত দিয়ে অন্য হাতের তালু চুলকাতে চুলকাতে গেটের দিকে বারংবার তাকিয়ে দেখছে, কেউ এলো কি না! যতক্ষণ কেউ না আসবে শান্তি মিলবে না। বিকট শব্দ তুলে কাছে কোথাও বজ্রপাত পড়ল। ভয়ে পদ্মজার আত্মা শুকিয়ে যায়। চারিদিক কেমন গাঢ় অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে! ঘোমটা টেনে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে। বিকট বজ্রপাত, দমকা হাওয়া সঙ্গে বড়ো বড়ো ফোঁটার বৃষ্টি, যেন প্রলয়ঙ্কারী ঝড় বইছে। লাহাড়ি ঘরের মাথার ওপরে থাকা তাল গাছগুলো অবাধ্য বাতাসের তেজে একবার ডানে আরেকবার বাঁয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। পদ্মজার গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গেল আতঙ্কে, ছুটে গেল নিজের ঘরে। বিছানার উপর কাঁচুমাচু হয়ে বসে অপেক্ষা করতে লাগল। টিনের চালে ধুমধাম শব্দ হচ্ছে। পদ্মজা অনবরত প্রার্থনা করে যাচ্ছে, যেন বৃষ্টি কমে যায়।কিন্তু বৃষ্টির বেগ কমার বদলে উলটো বাড়ল! এতসব শব্দ ভেদ করে আরেকটি শব্দ এসে থেমে গেল পদ্মজার কানের কাছে, সদর ঘরে কিছু একটা পড়েছে। ভয় পদ্মজাকে আরো বেশি করে গ্রাস করে ফেলল।পরক্ষণেই খুশিতে সে আওড়াল, ‘আম্মা এসেছে?’বিছানা থেকে নেমে হন্তদন্ত হয়ে সদর ঘরে যায় পদ্মজা। ঘরটা অন্ধকারে তলিয়ে আছে। জানালা দিয়ে আসা ঈষৎ আলোয় দেখল একজন পুরুষের অবয়ব। সঙ্গে সঙ্গে তার সর্বাঙ্গ অসাড় হয়ে পড়ল। জায়গায় স্তব্ধ হয়ে গেল দুটো পা।পদ্মজা কাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘কে আপনি? খালি বাড়িতে কেন ঢুকেছেন? কোনো জবাব এলো না। পদ্মজা অনুরোধ করে ভেজা কণ্ঠে বলল, ‘বলুন না, কে আপনি?’একটি ম্যাচের কাঠি জ্বলে উঠল। সেই আলোয় দুটি গভীর কালো চোখ বিভ্রম নিয়ে তাকিয়ে রইল পদ্মজার দিকে।শীতল-স্পষ্ট কণ্ঠে চোখের মালিক বলল, ‘আমির হাওলাদার।’পুরুষালী কণ্ঠটি শুনে আরো ভড়কে গেল পদ্মজা। রগে-রগে, বরফের মতো ঠান্ডা আর সূক্ষ্ম কিছু একটা দৌড়ে বেড়াচ্ছে। এক হাত দরজায় রেখে, পদ্মজা আকুতি করে বলল, ‘আপনি চলে যান। কেন এসেছেন?’উত্তরের আশায় না থেকে পদ্মজা দৌড়ে নিজের ঘরে চলে গেল, ভেতরে ঢুকেই লাগিয়ে দিল দরজা। তার মস্তিষ্ক জমে গেছে, কাজ করছে না। লোকটা যদি সম্মানে আঘাত করে বা গ্রামের মানুষ যদি দেখে ফেলে খালি বাড়িতে অচেনা পুরুষের সঙ্গে…কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। সে আর ভাবতে পারছে না।করাঘাত শুনে পদ্মজা ঘরের সব আসবাবপত্র ঠেলেঠুলে দরজার কাছে নিয়ে এলো। শরীর কাঁপছে, মাটিতে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল সে। দুই হাত মাথায় রেখে আর্তনাদ করে ডাকল, ‘আম্মা, কোথায় তুমি? আমি খুব একা, আম্মা। আম্মা…।’
টিনের চালে ঝুম ঝুম শব্দ। বৃষ্টির এই ছন্দ অন্যবেলা বেশ লাগলেও এই মুহূর্তে ভয়ংকর ঠেকছে পদ্মজার কাছে। একেকটা বজ্রপাত আরো বেশি ভয়ানক করে তুলেছে পরিবেশ। সে কাঁচুমাচু হয়ে ফোঁপাচ্ছে।বৃষ্টির শব্দ একটু কমলে কিছু কথা ভেসে আসে বাতাসে, ‘আপনি ভয় পাচ্ছেন কেন? আমাকে ভয় পাবেন না। বিপদে পড়ে এই বাড়িতে উঠেছি। বিশ্বাস করুন।’পদ্মজা কান্না থামিয়ে কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করল। দরজার ওপাশ থেকে আমির নামের মানুষটি বলছে, ‘দরজা খুলুন। বিশ্বাস করুন আমাকে। আমি আপনার কোনো ক্ষতি করতে আসেনি। ভয় পাবেন না।’পদ্মজা একটু নড়েচড়ে বসল। আমির আবার বলল, ‘শুনছেন?’ঢোক গিলে কথা বলার চেষ্টা করল পদ্মজা। কী অদ্ভুত, কথা আসছে না! খ্যাঁক করে গলা পরিষ্কার করতে চাইল সে। বলল, ‘আ…আমি দরজা খুলব না।’ক্ষণকাল কোনো উত্তর এলো না, শুধু বৃষ্টির ধ্বনি শোনা গেল। একসময় পুরুষালি কণ্ঠটি বলল, ‘আচ্ছা, খুলতে হবে না। দয়া করে আপনি শুধু ভয় পাবেন না।’‘আপনি চলে যান।’বৃষ্টিটুকু থামতে দিন। হঠাৎ বৃষ্টির জন্যই তো আপনার বাড়িতে ওঠা। আমার বৃষ্টিতে সমস্যা হয়।’আমিরের মুখে স্পষ্ট শুদ্ধ ভাষা শুনে পদ্মজা অনুমান করে নিলো, লোকটি শিক্ষিত। কথাবার্তা শুনে ভালো মানুষ মনে হচ্ছে, তবুও সাবধানের মার নেই। সে দরজা খুলল না, বিছানায় গিয়ে বসল; আগের থেকে ভয় কিছুটা কমেছে।আমিরের কণ্ঠ শোনা গেল, ‘শুনছেন?’পদ্মজা জবাব দিল, ‘বলুন।’‘আপনার নাম কী? ডাকনাম বলুন।’‘পদ্মজা।’‘সুন্দর নাম। আমার নাম জিজ্ঞাসা করবেন না?’‘জানি।’আমির অবাক হওয়ার ভান ধরে প্রশ্ন করল, ‘কীভাবে? আমাকে চিনেন?’‘না, কিছুক্ষণ আগেই নাম বললেন।’‘তখন তো ভয়ে কাঁপছিলেন, নামও শুনেছেন!আমিরের কণ্ঠে রসিকতা। পদ্মজা মৃদু হাসল, কেন হাসল জানে না। আমির পুনরায় বলল, ‘শুনছেন?’‘শুনছি।’‘আপনি কি এরকমই ভীতু?’‘সাহসিকতা প্রমাণ করানোর জন্য এখন বের হতে বলবেন, তাই তো?’ওপাশ থেকে গগন কাঁপানো হাসির শব্দ ভেসে আসে। আমির হাসতে হাসতে বলল, ‘বেশ কথা জানেন তো।’চলমান প্রসঙ্গ এড়িয়ে পদ্মজা বলল, বৃষ্টি কমলেই কিন্তু চলে যাবেন!’‘তাড়াতে হবে না। বৃষ্টি কমলে নিজে থেকেই চলে যাব।’কষ্ট নিবেন না। খালি বাড়ি তো, তাই বলছি।’‘বাকিরা কোথায়? এটা মোর্শেদ কাকার বাড়ি না?’‘জি।’‘উনার ধানের মিল তো এখন আমার আব্বার দখলে। ছুটিয়ে নিবেন কবে?’পদ্মজা অবাক হয়ে দরজার দিকে তাকাল। বিস্ময় নিয়ে বলল, ‘আপনি মাতব্বর কাকার ছেলে?’‘অবাক হলেন মনে হচ্ছে?’‘মাতব্বর কাকার ছেলের নাম তো বাবু!’আমির হেসে বলল, ‘আমার ডাকনাম বাবু। এই নামে আম্মা আর আব্বা ডাকে। ভালো নাম আমির।’পদ্মজা আর কথা দীর্ঘ করল না। বজ্রপাত থেমেছে, বৃষ্টি রয়ে গেছে। আমির জিজ্ঞাসা করল, ‘বাকিরা কোথায়?’‘আম্মা-আব্বা ঢাকা। আজ ফেরার কথা ছিল। আর আমার দুই বোন আর ভাই নানাবাড়ি। বোধহয় বৃষ্টির জন্য আসতে পারছে না।’‘এখনো আমাকে ভয় পাচ্ছেন?’‘একটু, একটু।’‘এটা ভালো। অচেনা মানুষকে একেবারেই বিশ্বাস করতে নেই।.বাসন্তী ভ্যান থেকে নেমে সামনে এগোলেন। মোর্শেদের বাড়িটা তিনি চেনেন না। তাই কোনদিকে যেতে হবে বুঝে উঠতে পারছেন না। এদিকে আকাশের অবস্থা ভালো না। রাস্তাঘাটেও মানুষ নেই। ঝড়ো হাওয়া বইছে। আরো কিছুটা পথ হাঁটার পর আচমকা ঝড় শুরু হলো। তিনি দৌড়ে একটা বাড়িতে উঠে পড়েন। রমিজ আলি বারান্দায় বসে হুঁকা টানছিল। সিল্কের শাড়ি পরনে, পেট উন্মুক্ত, লম্বা চুলের বেণুনীতে ধবধবে সাদা বাসন্তীকে দেখে সে অবাক হয়ে এগিয়ে এলো। বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন করল, ‘কেডা আপনে? কারে চান?’বাসন্তী কেঁপে উঠলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে রমিজকে দেখে লম্বা করে হেসে বললেন, ‘হুট কইরা মেঘখান আইয়া পড়ল তো।’‘তো আপনে কার বাড়িত যাইতেন?’‘মোর্ছেদের বাড়ি।’রমিজ আলি বিরক্তি নিয়ে সরে গেল। ঘরের ভেতর থেকে চেয়ার এনে দিয়ে বলল, ‘মোর্শেইদদার কী লাগেন আপনে?’বাসন্তী চিন্তায় পড়ে যান। গ্রামের মানুষ তো জানে না তার আর মোর্শেদের সম্পর্ক কী! এখন জানানোটা কতটা যুক্তিসংগত হবে? সেকেন্ড কয়েক ভাবার পর যুক্তি মিলল। গ্রামবাসীকে বলা উচিত। নয়তো নিজের অধিকার তিনি কখনো পাবেন না। একমাত্র গ্রামবাসীরাই পারবে তার জায়গাটা শক্ত করে দিতে। বাসন্তী রমিজ আলির চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি তার বউ লাগি। পরথম বউ। তার লগে আমার বিছ বছরের ছম্পর্ক।’রমিজ আলির চক্ষুদ্বয় যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। মোর্শেদের বউ! বারকয়েক চোখ পিটপিট করল সে, ‘কী বললেন? কার বউ?’‘মোর্ছেদ, মোর্ছেদের বউ।’মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি পাওয়ার মতো আনন্দ হতে থাকে রমিজের। সে প্রবল উৎসাহ নিয়ে বলল, ‘হের পরের বউয়ে জানে?’‘না।’‘থাহেন কই আপনে?’‘রাধাপুর।’‘লুকাইয়া রাখছিল বিয়া কইরা?’‘হ। এখন মোৰ্ছেদ আমারে তালাক দিতে চায়। আমার সঙ্গে ছংছার করতে চায় না। তাই আমি আমার অধিকার নেয়ার জন্য আইছি। আমি তার বাড়িতে থাকবার চাই। আপনেরা আমারে ছাহায্য করেন। গ্রামবাছী ছাড়া মোর্ছেদ আমারে জায়গা দিব না।’রমিজ আলি প্রবল বৃষ্টি, আর বজ্রপাতকে হটিয়ে বাহাদুরের মতো বলে উঠল, ‘আপনের জায়গা করে দেওন আমরার কাম। আপনি চিন্তা কইরেন না। মেঘডা কমতে দেন। এরপর খালি দেহেন কী হয়!’বাসন্তীর চোখ-মুখ জ্বলজ্বল করে উঠল। অবশেষে একটা ভরসা পাওয়া গেল। রমিজ আলির প্রতিশোধের নেশা পেয়েছে। মোর্শেদ তাকে কত কটু কথা বলেছে, অবজ্ঞা করেছে, অপমান করেছে। এইবার তার পালা। প্রতিটি অপমান ফিরিয়ে দেয়ার শপথ করেছে সে অনেক আগেই। বাসন্তীকে ভরসা দিয়ে সে বলল, ‘আপনি বইয়া থাহেন। আমি আরো কয়জনরে লইয়া আইতাছি।’রমিজ আলি খুশিতে গদগদ হয়ে বেরিয়ে গেল লোকবল আনতে। ছইদ, রজব, মালেক, কামরুলকে নিয়ে ফিরে এলো। সবার হাতে হাতে ছাতা। কামরুল আটপাড়া এলাকার মেম্বার। গ্রামে কোনো অনাচার হলে তা দেখার দায়িত্ব তার। তাই তিনি মাথার উপর বজ্রপাত, ঝড় নিয়েই ছুটে এসেছেন।.পদ্মজা উসখুস করছে। টয়লেটে যাওয়া প্রয়োজন। প্রস্রাবের বেগ ক্রমাগত বাড়ছে। এভাবে আর কতক্ষণ থাকা যায়। সাহসও পাচ্ছে না বের হওয়ার। ঘরে পায়চারি করল কিছুক্ষণ। চোখ বন্ধ করে জোরে শ্বাস নিলো। এরপর কাঁচি কোমরে গুঁজে আয়তুল কুরসি পড়ে বুকে ফুঁ দিয়েই দরজা খুলল। আচমকা দরজা খোলার আওয়াজ শুনে আমির চমকে তাকাল। আকাশ থেকে কালো মেঘের ভাব কেটে গেছে অনেকটা। সন্ধ্যার আজান পড়ছে। সালোয়ার, কামিজ পরা পদ্মজাকে দেখে মুহূর্তে হৃদস্পন্দন থমকে গেল তার। পদ্মজা ওড়না টেনে নিলো নাক অবধি। কাঁপা পায়ে আমিরের পাশ কেটে গেল। আমিরের চোখ স্থির। নিশ্বাস এলোমেলো। ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ। পদ্মজা যখন ফিরছিল ঘরে, আমির ডাকল, ‘পদ্মজা?’পদ্মজা দাঁড়াল। মানুষটা খারাপ হলে এতক্ষণে আক্রমণ করত। যেহেতু করেনি, মানুষটার উদ্দেশ্য খারাপ না। তাই দাঁড়াল, তবে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল না।আমিরের গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি। শার্ট ভিজে যাওয়াতে বারান্দার দড়িতে রেখেছে, যাতে বাতাসে শুকিয়ে যায়। যেন রূপকথার জগতে হারিয়ে গেছে এমনভাবে আমির বলল, ‘অলন্দপুরে এমন রূপবতী আছে—জানা ছিল না।’পদ্মজা লজ্জা পাওয়ার পাশাপাশি বিব্রতবোধ করল। বৃষ্টি প্রায় কমে এসেছে। তাই সে বলল, ‘আপনি এবার আসুন। কেউ দেখলে খারাপ ভাববে।’‘যেতে তো ইচ্ছে করছে না।’লোকটা বলে কী! এতক্ষণ বলল বৃষ্টি কমলেই চলে যাবে। এখন বলছে, যাবে না। পদ্মজা ঘুরে তাকাল। চোখের দৃষ্টিতে আকুতি ফুটিয়ে বলল, ‘দয়া করে চলে যান।’আমির কিঞ্চিৎ হাঁ হয়ে তাকিয়ে রইল। না চাইতেও আমির পদ্মজার নজরে পড়ে। শ্যামবর্ণের একজন পুরুষ, থুতনির মাঝে কাটা দাগ। সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিলো পদ্মজা। কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, ‘বৃষ্টি কমে গেছে। আম্মা-আব্বা চলে আসবে। চলে যান।’আমির অপলক নয়নে তাকিয়ে আছে। তার নিস্তব্ধতা পদ্মজাকে বিরক্ত করে তুলল। এত ঘাড়ত্যাড়া, দুই কথার মানুষ কীভাবে হয়? উঠানে পায়ের শব্দ! কয়েক জোড়া পায়ের শব্দ। বারান্দা থেকে দুজন তাকাল। গ্রামের এতজনকে দেখে পদ্মজার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, দৌড়ে ঘরে ঢুকে পড়ল সে। রমিজ আলি চেঁচিয়ে ডাকল, ‘কইরে মোর্শেইদদা? আকাম কইরা এখন লুকায়া আছস ক্যান? বাইর হ। তোর আকাম ধইরা লইয়া আইছি।’আমির বারান্দা পেরিয়ে বেরিয়ে আসে।গম্ভীরমুখে বলল, ‘উনারা বাড়িতে নেই।’উৎসুক জনতা আমিরকে দেখে অবাক হয়। কামরুল বললেন, ‘আরে আমির। শহর থেকে আইলা কবে?’‘এই তো চার দিন হলো। আছেন কেমন?’‘এই তো আছি। তা এইহানে কী করো?’আমির উত্তর দেয়ার আগে রমিজ আলি প্রশ্ন করলেন, ‘বাড়িত কেউ নাই?’আমির বেশ সহজ-সরল গলায় বলল, ‘আছে। পদ্মজা আছে।’উপস্থিতি পাঁচ-ছয়জন তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। সবার দৃষ্টি দেখে আমির বুঝল, সে কত বড়ো ভুল করে ফেলেছে। তাহলে পদ্মজা এটারই ভয় পাচ্ছিল? আমির দড়ি থেকে শার্ট নিয়ে দ্রুত পরল। এরপর কৈফিয়ত দেয়ার স্বরে বলল, ‘আপনারা যা ভাবছেন তা নয়। বাড়ি ফিরছিলাম। বৃষ্টি নামে তাই এই বাড়িতে উঠে পড়ি। বাড়িতে কেউ নাই জানলে…’আমির কথা শেষ করতে পারল না। রমিজ আলি চেঁচিয়ে আশপাশে বাড়ির সব মানুষদের ডাকা শুরু করল। মাতব্বর তাকে কম অপদস্ত করেনি সমাজ থেকে কোণঠাসা করেছে। মোর্শেদ পথেঘাটে কটু কথা শুনিয়েছে। আজ সেই যন্ত্রণা কমানোর দিন। আমির ভড়কে গেল।কামরুল আঙুল শাসিয়ে কঠিন স্বরে বললেন, ‘তোমার কাছে এইডা আশা করি নাই। তোমার আব্বারে ডাকাইতাছি। উনি যা করার করবেন।’আমির বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘আরে আজব! কী শুরু করেছেন আপনারা?’ছইদ আমিরের কাছাকাছি বয়সের। ব্যক্তিগত শত্রুতা আছে তাদের মধ্যে। ছইদ হুংকার ছেড়ে বলল, ‘চুপ থাক তুই! তোর বাপে মাতব্বর বইলা তোরে ডরাই আমরা? আকাম করবি আর ছাইড়া দিমু?’রাগে-অপমানে আমিরের চোখ লাল বর্ণ ধারণ করে। রেগে গেলে চোখের রং পালটে যায় তার। কালো মুখশ্রীর সঙ্গে লাল চোখ ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ছইদ ভেতরে ভেতরে ভয় পেল। আমিরের হাতে কম মার সে খায়নি। তবে আজ সুযোগ পেয়েছে। পুরো গ্রামবাসী এক দলে। সে কিছুতেই ছাড়বে না। ঢোক গিলে বলল, ‘চোখ উলডাইয়া লাভ নাই। কুকামের উসুল না তুলে যাইতাছি না।’আমির রাগে শক্ত হাতে থাপ্পড় বসাল ছইদের কানে। মুহূর্তে ছইদের মাথা ভনভন করে উঠে। ততক্ষণে রমিজের উসকানিতে মানুষ জমে গেছে। সবার হাতে হাতে টর্চ, হারিকেন। রাতের আঁধার নেমে এসেছে। আমির আবারও ছইদকে মারতে গেলে কয়জন এসে তাকে জাপটে ধরল। কামরুল একজন মহিলাকে আদেশের স্বরে বললেন, ‘শিউলির আম্মা, কয়জনরে লইয়া মাইয়াডারে বার কইরা আনো। লুকাইছে নটি। গ্রামডা নটিদের ভিড়ে ধ্বংস হইয়া যাইতাছে।’পদ্মজা মাটিতে নতজানু হয়ে বসে কাঁপছে, তীব্র কাঁপুনি পা থেকে মাথার চুল অবধি। বাইরের প্রতিটি কথা তার কানে এসেছে। চারপাশ যেন ভনভন করছে।শিউলির আম্মা পদ্মজার ঘরে আসে। দরজা খোলা ছিল। টর্চ ধরে দেখল পদ্মজা মাটিতে বসে কাঁপছে। পদ্মজাকে খুব পছন্দ করে সে। তাই পদ্মজার মাথায় হাত রেখে বলল, ‘কেন এমন কাম করছস?’পদ্মজা ঝাপসা চোখ মেলে তাকাল। শিউলির আম্মা পাশের বাড়ির। পদ্মজার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক। পদ্মজা শিউলির মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। বলল, ‘ভাবি আমি কোনো খারাপ কাজ করিনি। সবাই ভুল বুঝছে।’রীনা নামে একজন মহিলা পদ্মজাকে জোর করে টেনে দাঁড় করাল। হেমলতার অনেক বাহাদুরি এই মেয়ে নিয়ে, অনেক অহংকার। সেই অহংকার আজ ভালো করে ভাঙবে। সে মনে মনে পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠেছে।ঘৃণা ভরা কণ্ঠে পদ্মজাকে বলল, ‘ধরা পড়লে সবাই এমনডাই কয়। আয় তুই।’পদ্মজা আকুতি করে বলল, ‘বিশ্বাস করুন আমি খারাপ কিছু করিনি আম্মা এসব শুনলে মরে যাবে। আপনারা এমন করবেন না।’কারো কানে পৌঁছাল না পদ্মজার আর্তনাদ, আকুতি। সবাই গ্রামের সবচেয়ে সুন্দর মনের, সুন্দর পরিবারের সদস্যগুলোকে ধ্বংস করায় মেতে উঠল। পদ্মজাকে টেনেহিঁচড়ে বের করে আনে বাহিরে। কখনো ঘোমটা ছাড়া কোনো পুরুষের সামনে না যাওয়া মেয়েটার বুকের ওড়না পড়ে রইল ঘরে। তিন-চার জন মহিলা শক্ত করে পদ্মজার বাহু চেপে ধরে রাখে। সবাইকে উপেক্ষা করে পদ্মজা ঘৃণাভরা চোখে তাকাল আমিরের দিকে। আমির চেষ্টা করছে নিজেকে ছাড়ানোর, কিছুতেই পারছে না।পূর্ণা বাড়িতে ঢুকে দেখে কোলাহল। সে ভয় পেয়ে গেল। জ্বরের তোড়ে কাঁপছে পূর্ণা। একটু এগিয়ে দেখল, পদ্মজার বিধ্বস্ত অবস্থা। মুহূর্তে তার জ্বর উবে গেল। দৌড়ে এসে পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘আমার আপাকে এভাবে ধরেছেন কেন? আপা…এই আপা? কাঁদছ কেন?’পদ্মজা কেঁদে বলল, ‘পূর্ণা, আম্মা মরে যাবে এসব দেখলে। আমি কিছু করিনি পূর্ণা।’পূর্ণা কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। শুধু অনুভব করছে তার বুক পুড়ছে। পুরো শরীর ব্যথায় বিষিয়ে যাচ্ছে। সে রীনাকে বলল, ‘খালা আপনি আমার বোনকে এভাবে ধরেছেন কেন? ছাড়েন।’ ধমকে উঠল পূৰ্ণা।রীনা কর্কশ কণ্ঠে বলল, ‘তোর বইনের গতরে রস বাইড়া গেছিল। এজন্য খালি বাড়িত ব্যাঠা ছেড়া ডাইকা আইনা রস কমাইছে।’নোংরা কথাটি শুনে পূর্ণার গা রি রি করে উঠল! তেজ নিয়ে বলল,‘খারাপ কথা বলবেন না। আমার আপা এমন না।পাশ থেকে একজন মহিলা পূর্ণার উদ্দেশ্যে বলল, ‘তোর মা যেমন হের মাইডাও এমন অইছে। নিজেও এমন কিচ্ছা করল। মাইয়াও করল।’পদ্মজা চমকে তাকাল।মহিলা বলে যাচ্ছে, ‘বুঝলা তোমরা সবাই…মায় এক বেশ্যা, মাইয়ারে বানাইছে আরেক বেশ্যা।’পদ্মজা আচমকা রেগে গেল খুব। আক্রোশে তার শরীর কাঁপতে থাকল। রীনা সহ দুজন মহিলাকে ঠেলে সরিয়ে রাগে চেঁচিয়ে উঠল, ‘আমার মা নিয়ে কিছু বললে আমি খুন করব। মেরে ফেলব একদম। জিভ ছিঁড়ে ফেলব।’পদ্মজার এহেন রূপে সবাই থতমত খেয়ে যায়। তার লম্বা চুলগুলো খোঁপা থেকে মুক্ত হয়ে পিঠময় ছড়িয়ে পড়েছে। চোখের মণি অন্যরকম হওয়াতে মনে হচ্ছে, কোনো প্রেতাত্মা রাগে ফোঁস ফোঁস করছে। গ্রামের কিছু মহিলা আবার বিশ্বাস করে, পদ্মজা কোনো পরির মেয়ে। তাই এত সুন্দর। এই মুহূর্তে তারা ভাবছে, পদ্মজার ভেতর কেউ ঢুকেছে। তাই সামনে এগোল না। রীনা একাই এগিয়ে এলো। পদ্মজার চুলের মুঠি ধরে বিশি গালিগালাজ করতে শুরু করল। কামরুলকে বলল, ‘কামরুল ভাই, এই বান্দিরে বাঁন্ধা লাগব।’পূর্ণা-প্রেমা পদ্মজাকে ছাড়াতে গেলে ছইদসহ আরো তিন চারজন এগিয়ে আসে। অন্ধকারে ভিড়ের মাঝে বাজেভাবে নিগৃহীত হলো পদ্মজা-পূর্ণা- প্রেমা। কয়টা কালো হাত নিজেদের তৃপ্তি মিটিয়ে নিলো খুব সহজে। তিন বোনের কান্না, তাদের আর্তনাদ কারো হৃদয় ছুঁতে পারল না।হেমলতার অনুপস্থিতিতে তার আদরের তিন কন্যার জীবন্ত কবর হচ্ছিল, বাধা দেয়ার কেউ ছিল না।
নৌকা ছাড়ার পূর্বে আকাশের কালো মেঘের ঘনঘটা চোখে পড়ল। তার কিছুক্ষণ পর হঠাৎই নেমে এলো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। খোলা নৌকা হওয়াতে চোখের পলকে কাকভেজা হয়ে গেল যাত্রী পাঁচজন। ভিজলেন না হেমলতা, মোর্শেদ ছাতা ধরে রেখেছেন। বজ্রপাতের সঙ্গে সঙ্গে হেমলতার আত্মা দুলে উঠছে, খচখচ করছে মনটা। তিনি জলের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন। জলে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার সঙ্গেই বলের মতো একদলা পানি লাফিয়ে উঠছে। তারপর ছোট্ট ছাতার মতো আকৃতি নিয়ে চারপাশে প্রসারিত হয়ে হাওরে মিলিয়ে যাচ্ছে। দেখতে সুন্দর! কিন্তু সেই সৌন্দর্য মনে ধরছে না। অজানা আশঙ্কায় তিক্ত অনুভূতি হচ্ছে। মোর্শেদ গলা খাকারি দিয়ে হেমলতার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে বললেন, ‘কিছু খাইবা?’হেমলতা নিরুত্তর। মোর্শেদ শুষ্ক হাসি হেসে বললেন, ‘আর কিছুক্ষণ। আইয়াই পড়ছি।’হেমলতা কিছু বললেন না। নিরুত্তরে রইলেন। বৃষ্টির স্পর্শ নিয়ে আসা হাওরের হিমেল বাতাসের ছোঁয়া লাগছে চোখেমুখে। হাওরের ঘোর লাগা বৃষ্টি দেখতে দেখতে চোখে এসে ভর করে ঘুম। হেমলতা নিকাব খুলে চোখেমুখে পানি দিয়ে ঘুম কাটান। এরপর ক্লান্ত চোখ দুটি মেলে তাকান মোর্শেদের দিকে। মোর্শেদের হাতে হাত রেখে বললেন, ‘আমার এত খারাপ লাগছে কেন? বুক পোড়া কষ্ট হচ্ছে।’মোর্শেদ হেমলতার কণ্ঠ শুনে সহসা উত্তর দিতে পারলেন না। চিত্ত ব্যথায় ভরে উঠল। কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর আশ্বস্ত করে বললেন, ‘আইয়া পড়ছি তো। ওই যে বাজারের ঘাট দেহা যাইতাছে।’হেমলতা মোর্শেদের হাত ছেড়ে দূরে তাকালেন। অলন্দপুরের বাজারটা ছোটো পিঁপড়ার মতো দেখাচ্ছে। নৌকাটা বার বার দুলছে। ঝড় বইছে চারিদিকে, মনেও তো বইছে। তিনি নিজেকে শান্ত করতে চোখ বুজে বার কয়েক প্রাণভরে নিশ্বাস নিলেন। ব্যথাতুর মন আর্তনাদ করে শুধু জানতে চাইছে, আমার মেয়েগুলো কেমন আছে? কী করছে?রীনা চুল এত শক্ত করে ধরেছে যে পদ্মজার সারা শরীর ব্যথায় বিষিয়ে উঠছে, আকুতি করেও ছাড়া পাচ্ছে না। পূর্ণা-প্রেমা খামচে ধরে রেখেছে পদ্মজাকে। কিছুতেই তারা বোনকে ছাড়বে না।আমির ক্রোধে উন্মত্তপ্রায় হয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘কামরুল চাচা এটা ঠিক হচ্ছে না! মেয়েগুলোর অভিশাপে পুড়ে যাবেন।’আমিরের কথায় ক্ষণকালের জন্য কামরুল হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন। রমিজ আলী কামরুলের নরম, নিঃশব্দ, ভয়ার্ত মুখের দিকে চেয়ে ভেতরে ভেতরে উদ্বিগ্ন হলেও তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বললেন, ‘বেশ্যাদের শাপে কেউ পুড়ে না।’জলিল প্রেমাকে সরিয়ে নিয়েছে। দূর থেকে প্রেমার কান্না শোনা যাচ্ছে। বড়ো আপা, বড়ো আপা করে গলা ফাটিয়ে কাঁদছে। ছইদ অনেক টেনেও পূর্ণাকে সরাতে পারল না, তাই অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে পূর্ণার বুকে নোংরা হাতের দাগ বসিয়ে দিতে দ্বিধা করল না। পূর্ণা এমন ঘটনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। কোনো মেয়েই এমন নিচু ঘটনার সাক্ষী হতে চায় না। অকস্মাৎ এই ঘটনা কাটিয়ে ওঠার পূর্বেই একটা শক্ত হাত পায়জামার ফিতা টেনে ধরল। পূর্ণার পায়ের তলার মাটি সরে গেল। ভয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘আপা…আপা।’পূর্ণার আর্তনাদ পদ্মজার মস্তিষ্ক প্রখর করে তুলে। পদ্মজা মুখ তুলে পূর্ণার দিকে তাকাল। তার চেয়ে এক হাত দূরে পূর্ণা। পদ্মজার আঙুল শক্ত করে ধরে রেখেছে সে। কাছে আসতে পারছে না ছইদের জন্য। পূর্ণার কান্না দেখে পদ্মজা আতঙ্কে নীল হয়ে গেল। চারিদিকে কোলাহল। সবাই গালি দিচ্ছে মা- বাপ তুলে। কেউ বলছে না, মেয়েটা ভালো, এরকম করতেই পারে না। পূর্ণা চেঁচিয়ে যাচ্ছে। কেঁদে মাকে ডাকছে। পদ্মজা এক দৃষ্টে মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।মানুষ এত নিষ্ঠুর হয়?পূর্ণার হাত ছইদ আলগা করতেই সে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল পদ্মজাকে। তার পুরো শরীর কাঁপছে। হৃৎপিণ্ড এত জোরে চলছে যে অনুভব করা যাচ্ছে। পূর্ণা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আপা…আপা…কেন মেয়ে হলাম, আপা? এত কষ্ট হচ্ছে, আপা। আপা…’পদ্মজার দুচোখ বেয়ে টুপ করে দুই ফোঁটা জল পড়ে। এক হাতে শক্ত করে পূর্ণাকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে।রমিজের উসকানিতে কামরুল গলা উঁচিয়ে বললেন, ‘নটিরে বান ছইদ।’পূর্ণার কানে কথাটা আসতেই সে আরো জোরে পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরল। ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে থাকা পদ্মজা হঠাৎ শান্ত হয়ে ঠান্ডা স্বরে বলল, ‘পূৰ্ণা, ছেড়ে দে আমায়।’রীনা পদ্মজাকে চুলে ধরে টেনে নিয়ে যেতে চাইলেও পদ্মজা জায়গা থেকে এক চুলও নড়ল না। ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। পূর্ণাকে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘বেঁচে থাকলে সব উসুল হবে। ছেড়ে দে।’পদ্মজার কণ্ঠে মায়ের ছায়া ছিল! পূর্ণা সঙ্গে সঙ্গে শান্ত হয়ে গেল। চোখ তুলে পদ্মজার দিকে তাকাল। পদ্মজার গাল বেয়ে রক্ত ঝরছে। ছইদ পূর্ণাকে নিতে আসলে একটি দুঃসাহসিক কাজ করে বসল সে, লাথি বসিয়ে দিল ছইদের অণ্ডকোষ বরাবর। ছইদ মাগো বলে কুকিয়ে উঠে। জলিলসহ উপস্থিত তিনজন তেড়ে আসে পদ্মজার দিকে, পূর্ণাকে ধাক্কা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দূরে। অশ্রাব্য গালি দিতে দিতে কেউ পদ্মজাকে থাপ্পড় দিল, কেউ বা দিল লাথি। নির্মম দৃশ্যটি দেখে দুই তিনজন গ্রামবাসীর মনে মায়া উদয় হয়। তারা ছুটে আসে পদ্মজাকে বাঁচাতে। প্রান্ত ভয়ে চুপসে গিয়েছিল। পদ্মজাকে কাদায় ফেলে মারতে দেখে দৌড়ে আসে, জলিলের হাতে শরীরের সব শক্তি দিয়ে কামড় দেয়। জলিল প্রান্তের কান বরাবর থাপ্পড় বসাতেই প্রান্তের মাথা ভনভন করে উঠল। পরিস্থিতি বিগড়ে যেতে দেখে কামরুল হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। মনে মনে বেশ ভয় পান। কেশে গলা পরিষ্কার করে, দুই হাত তুলে চেঁচিয়ে বললেন, ‘তোমরা থামো, এইডা কি করতাছ? থামো কইতাছি। সবাই সইরা আসো। থামো…!’সবকিছু থেমে গেল। পদ্মজা কাঁচুমাচু হয়ে পড়ে রইল কাদায়। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। নাভির নিচে একটা লাথি পড়েছে বেশ জোরে। চোখ বুজে রেখেছে। দুই হাত বুকের উপর। লম্বা-চুল কাদায় মেখে ছড়িয়ে আছে আশপাশে। যন্ত্রণায় যেন পাঁজরগুলো মড়মড় করে ভেঙে যাচ্ছে। জ্বরের তোপে জ্ঞান হারিয়েছে পূর্ণা। হেমলতার মা মনজুরা বাড়িতে ঢুকে পদ্মজাকে এভাবে পড়ে থাকতে দেখে আঁতকে উঠলেন। দৌড়ে এসে পদ্মজাকে তুলতে চাইলে কামরুল হুংকার ছাড়লেন, ‘এই ছেড়িরে ধরন যাইব না। যান এন থাইকা।’মনজুরা পদ্মজার কামিজ ঠিক করে দিয়ে দুজন লোককে নিয়ে পূর্ণাকে তুলে ঘরে নিয়ে গেলেন। মনজুরার বুক কাঁপছে হেমলতার ভয়ে। হেমলতা বার বার বলেছিল দুই দিন তার মেয়েদের চোখের আড়াল না করতে! আর তিনি একা বাড়িতে ছেড়ে দিয়েছেন! ইচ্ছে হচ্ছে এক ছুটে কোথাও পালিয়ে যেতে। হিমেল নাক টেনে টেনে কাঁদছে। জপ করছে হেমলতার নাম। মনজুরা রেগে ধমকালেন, ‘আহ! থাম তো।’.বাপের বাড়িতে কাউকে না পেয়ে হেমলতা চিন্তায় পড়ে যান।মোর্শেদ হেমলতার দুশ্চিন্তা বুঝতে পেরে বললেন, ‘বাড়িত গিয়া বইয়া রইছে মনে হয়। আও বাড়িত যাই।’হেমলতা মিনমিনে গলায় বললেন, ‘তাই হবে।দুজন হেঁটে বাড়ির রাস্তায় উঠে। তখন পাশ কেটে একজন মহিলা হেঁটে যায়। কিছুটা হাঁটার পর মোর্শেদের খটকা লাগল। তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকান। মহিলাটি অনেক দূর চলে গিয়েছে। মহিলার অবয়ব দেখে মোর্শেদের বাসন্তীর কথা মনে পড়ে যায়। মনে মনে আওড়ান, বাসন্তী আইছে?’ পরপরই নিজের মনকে বুঝ দিলেন, ‘না, না হে আইব কেমনে। আর আইলেও যাইব গা ক্যান?’তিনি আর মাথা ঘামালেন না। হেমলতার বুক দুরুদুরু করছে। ঠান্ডা বাতাস বইছে। তবুও তিনি অজানা আশঙ্কায় ঘামছেন।তারা বাড়ির কাছাকাছি এসে মাতব্বরকে দেখতে পেল। মাতব্বরের সঙ্গে আরো দুজন ব্যক্তি। বাড়ির সামনে মানুষের ভিড়ও দেখা যাচ্ছে। হেমলতার হৃৎপিণ্ড থমকে গেল। মেরুদণ্ড বেয়ে বরফের ন্যায় ঠান্ডা কিছু একটা ছুটে গেল। তিনি নিশ্বাস আটকে রেখে ছুটতে থাকেন। পিচ্ছিল পথে পিছলা খেয়ে পড়ে যেতে গিয়েও নিজেকে সামলে নেন। হেমলতার দৌড় দেখে মোর্শেদ পিছু নেন, অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন, ‘তুমি দৌড়তাছ ক্যান?’হেমলতা প্রশ্নটি শুনলেন না। নিকাব বাতাসের দমকে উড়ে পড়ল দূরে। তিনি ভিড় ঠেলে বাড়িতে ঢুকলেন। সঙ্গে সঙ্গে কোলাহল বেড়ে গেল। এত ভিড়ের মাঝে একটা মেয়েকে কাদায় পড়ে থাকতে দেখে তিনি অবাক হলেন। অন্ধকারে মেয়েটিকে চিনতে বেশ অসুবিধা হচ্ছে।তিনি আঙুল তুলে বিড়বিড় করলেন, ‘কে?’হেমলতার প্রশ্ন কারো কান অবধি গেল না। কোত্থেকে একটি আলো এসে পড়ল পদ্মজার ওপর। সঙ্গে সঙ্গে হেমলতার চক্ষুদ্বয়ের সামনে পদ্মজার কাদা-রক্তে মাখা মুখটা ভেসে উঠলহেমলতা গগন কাঁপিয়ে আর্ত চিৎকার করে উঠলেন, ‘পদ্ম…আমার পদ্ম।পদ্মজার বুক ধড়াস করে উঠল! অস্তিত্ব কেঁপে উঠল। আম্মা এসেছে! তার পৃথিবী! তার শক্তি! পদ্মজা দুর্বল দুই হাতে ভর রেখে উঠে বসার চেষ্টা করল। পারল না। ভাঙা গলার জোর দিয়ে শুধু ডাকল, ‘আম্মা…আম্মা।’হেমলতার পৃথিবী থমকে গিয়েছে। বিধ্বস্ত, পর্দাহীন, কাদা, রক্তমাখা পদ্মজাকে দেখে বিশ্বাস হচ্ছে না এটা তার মেয়ে। তিনি দ্রুত নিজের বোরখা খুলে পদ্মজাকে ঢেকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলেন। অসহনীয় যন্ত্রণায় যেন কলিজা বেরিয়ে আসছে তার। তার সোনার কন্যার এ কী রূপ! কে করল? কাঁপা কণ্ঠে শুধু বললেন, ‘পদ্ম…আমার পদ্ম। ‘হেমলতার বুকে মাথা রেখে পদ্মজা হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, ‘আম্মা…আম্মা।’হেমলতা পদ্মজাকে আরো জোরে চেপে ধরলেন বুকের সঙ্গে। দৃষ্টি অস্থির। বুক হাপড়ের মতো ওঠানামা করছে।মোর্শেদ বাড়িতে ঢুকে উঁচু গলায় বললেন, ‘এইহানে এত মানুষ ক্যান? মাতব্বর মিয়া আপনে এইনে ক্যান? কী অইছে?’প্রান্ত-প্রেমা দৌড়ে এসে মোর্শেদকে জড়িয়ে ধরল। দুজন ভয়ে কাঁদছে, কান্নার শব্দ হচ্ছে না। মোর্শেদ বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। মাতব্বর মজিদ গম্ভীর কণ্ঠে কামরুলকে প্রশ্ন করলেন, ‘মেয়েটার এই অবস্থা কারা করেছে? এটা কি নিয়মের মধ্যে পড়ে?’কামরুল মাথা নিচু করে রেখেছেন। মিনমিনে গলায় বললেন, —আমি ছেড়িডারে মারতে কই নাই। জলিল, ছইদ আর মজনুর ছেড়ায় নিজ ইচ্ছায় মারছে।’‘আপনি আটকালেন না?‘আটকাইছি বইললাই মাইয়াডা বাঁইচা আছে। আর এমন নটিদের বাঁচার অধিকার নাই।’‘থামেন মিয়া! কার কী শাস্তি হবে সেটা আমার দায়িত্ব। আপনার না। ছইদ, জলিল আর মজনুর ছেলেকে তো দেখা যাচ্ছে না। আগামীকাল তাদের আমি মাঠে দেখতে চাই।’কামরুল মাথা নিচু করে রাখলেন। মজিদ হাওলাদার ভারি সৎ এবং নিষ্ঠাবান মানুষ। গ্রামের মানুষদের দুই হাতে আগলে রেখেছেন। পুরো অলন্দপুরের মানুষ মজিদকে ফেরেশতা-সমতুল্য ভাবে। পঁচিশ বছর ধরে অলন্দপুর সামলাচ্ছেন তিনি।গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে অন্ধকার। হেমলতা কিছুতেই হিসেব মিলাতে পারছেন না। অনেক বছর আগের ঘটনা আর এই ঘটনা হুবহু একরকম কী করে হলো? তিনি নিজের ভেতর একটা হিংস্র পশুর উপস্থিতি অনুভব করছেন। কামরুলের মুখ থেকে শোনা তিনটা নাম মস্তিষ্কে নাড়া দিচ্ছে প্রচণ্ডভাবে!ছইদ, জলিল আর মজনুর ছেলে!মজিদ সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আগামীকাল সবাই স্কুল মাঠে চলে আসবেন। মিয়া মোর্শেদ, মেয়ে নিয়ে আলো ফুটতেই চলে আসবেন। এই বাড়ি পাহারায় থাকবে মদন আর আলী। আমার ছেলেকে আমি নিয়ে যাচ্ছি। ঠিক সময়ে সেও উপস্থিত থাকবে।’
ভিড় কমতেই কানে তালা লাগানোর মতো প্রচণ্ড শব্দে কাছে কোথাও বজ্রপাত হলো। হেমলতা একা পদ্মজাকে তুলতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন মোর্শেদ এগিয়ে এসে দুই হাতে পাঁজকোলা করে তুলে নিলেন পদ্মজাকে। সেই সময় বিজলি চমকায়, সেই আলোয় পদ্মজার মুখটা দেখে মোর্শেদের বুক কেমন করে উঠল! কষ্টে চুরমার হয়ে গেল হৃদয়খানা। জন্মের দিন পদ্মজাকে কোলে নেয়ার পর যে অনুভূতি হয়েছিল ঠিক সেরকম একটা অনুভূতি হচ্ছে…এর নামই বোধহয় পিতৃত্ব!প্রচণ্ড ঝোড়ো বাতাস বইছে। তারা ঘরে ঢুকতেই ভারি বর্ষণ শুরু হলো। মুহূর্তে দেখা দিল তাণ্ডবরূপি ঘূর্ণিঝড়; সেই তাণ্ডব ছুঁতে পারল না মোড়ল বাড়ির মানুষদের মন। ঝড়ের তাণ্ডবের চেয়েও বড়ো তাণ্ডবের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলেছে তারা। হেমলতা গরম পানি করে পদ্মজাকে গোসল করালেন, পালটে দিলেন জামাকাপড়। পদ্মজা ঠোঁট কামড়ে নীরবে শুধু কেঁদে গেল, অশ্রু আটকে রাখতে পারছে না কিছুতেই। ইচ্ছে হচ্ছে বাড়ির পেছনের আম গাছটার সঙ্গে ফাঁস লেগে মরে যেতে। হেমলতা পদ্মজার চুল মুছে কপালে চুমু দিলেন। তার চোখ থেকে পদ্মজার নাকে এক ফোঁটা জল পড়ল। পদ্মজা চোখ তুলে তাকাল মায়ের দিকে।‘আম্মা আসছে? আম্মা কোথায়? আম্মা আসেনি?’পাশের ঘর থেকে পূর্ণার চিৎকার শোনা যাচ্ছে। সেকেন্ড কয়েকের মধ্যে ছুটে এলো সে, হেমলতাকে দেখেই ঝাঁপিয়ে পড়ল বুকের ওপর। হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। পূর্ণার শরীরকে আগ্নেয়গিরি মনে হচ্ছে। এত উত্তাপ! জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। পূর্ণার কান্না দেখে পদ্মজাও ডুকরে কেঁদে উঠল। হেমলতা স্তব্ধ হয়ে দুই মেয়ের কান্না শুনছেন। কাউকেই সামলানোর চেষ্টা করছেন না।এদিকে মনজুরা জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দরজার সামনে।টিনের চালে ভারি বর্ষণের শব্দ হচ্ছে, জগৎ-সংসার একাকার হয়ে যাচ্ছে সেই শব্দে।মাঝরাত। বাতাসের বেগ প্রচণ্ড। হেমলতা কালো রংয়ের শাড়ি পরে, একটা ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে বাড়ির বাইরে পা বাড়ান। মনজুরা বারান্দার ঘর থেকে উঁচু কণ্ঠে বললেন, ‘রাম-দা ব্যাগে ক্যান ঢুকাইছস? আর কোন কেলাঙ্কারি বাকি?’হেমলতা বিদ্যুৎবেগে ফিরে দাঁড়ালেন মনজুরার মুখে দিকে এক লহমার জন্য, পরক্ষণেই নিঃশব্দে বর্ষণ মাথায় নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে আঁতকে উঠলেন মনজুরা, ছুটে গেলেন পদ্মজার ঘরে। পদ্মজা চুপচাপ শুয়ে আছে। মৃদু ফোঁপানোর আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। পূর্ণা ঘুমাচ্ছে। তিনি ঘর ছেড়ে দ্রুত বারান্দা-ঘরে এলেন। বড্ড অস্থির লাগছে। জীবনে প্রথমবার সৃষ্টিকর্তার কাছে হেমলতার জীবন ভিক্ষা চেয়ে সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন! মেয়েটার যাতে কিছু না হয়।ফজরের আজান শোনা যাচ্ছে। বৃষ্টি থেমে গেছে। ধরণী শান্ত যেন কিছুই হয়নি। পদ্মজা ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। গেটের শব্দ পেয়ে উৎসুক হয়ে তাকাল। বিধ্বস্ত অবস্থায় হেমলতা ঢোকেন বাড়ির ভেতর। মনজুরা কখন যে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, পদ্মজা টের পায়নি। হেমলতা বাড়িতে ঢুকে কাঁধের ব্যাগটা মুরগির খোঁপে সামনে ছুঁড়ে ফেলেন। অন্ধকারের কারণে তার মুখ স্পষ্ট নয়। হেমলতা বাড়ির পেছনের দিকে চলে গেলেন। পদ্মজার অনুভূতিশূন্য, বিভীষিকাময় সন্ধ্যার স্মৃতি আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে তাকে। সে ধীর পায়ে উঠানে এসে দাঁড়াল। পেছন পেছন গেলেন মনজুরা। পায়ের শব্দে চমকে তাকাল পদ্মজা, দেখতে পেল নানিকে। ধীর কণ্ঠে প্রশ্ন করল, ‘নানু, আম্মা কোথায় গিয়েছিল?’মনজুরা ক্ষণকাল নীরব থেকে বললেন, ‘জানি না।’মনজুরার কণ্ঠে ভয়। পদ্মজা নিজের দুর্বল শরীর ঠেলে নিয়ে এলো বাড়ির পেছনে। দেখতে পেল, হেমলতা নদীতে নেমে গোসল করছেন। তিনি এক মুহূর্তে কয়েকটা ডুব দিলেন।পদ্মজার মাথায় এবার দুশ্চিন্তা ভর করতে শুরু করে। ব্যস্ত পায়ে ঘাটের কাছে এসে সে ক্ষীণ স্বরে ডাকল, ‘আম্মা।’হেমলতা ঘুরে তাকালেন। ঝড় শেষে আকাশ সাদা, অন্ধকার কাটার পথে। পদ্মজা বলল, ‘অসময়ে কেন গোসল করছ? ঠান্ডা লাগবে।’হেমলতা গোসল শেষ করে উঠে এলেন ওপরে। পদ্মজাও আর কিছু বলল না। হেমলতা উঠানে এসে মনজুরাকে আদেশের সুরে বললেন, ‘পূর্ণাকে নিয়ে আসো আম্মা।’পদ্মজা অবাক হয়ে শুধু দেখছে। পূর্ণা ধীর পায়ে হেঁটে আসে। তার জ্বর অনেকটা কমেছে। মনজুরা দূরে দাঁড়িয়ে রইলেন। হেমলতা মৃদু হেসে পূর্ণাকে বললেন, ‘পদ্মজার পাশে এসে দাঁড়া।’পূর্ণা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল। সে বাধ্যের মতো এসে দাঁড়াল পদ্মজার পাশে। হেমলতা মুরগির খোঁপের পাশ থেকে কালো ব্যাগটা হাতে তুলে নিলেন, ভেতর থেকে বের করলেন একটা রাম-দা আর একটা কৌটা। পূৰ্ণা রাম-দা দেখে চমকে উঠল, চোখাচোখি হলো দুই বোনের।রক্তেমাখা রাম-দা দুই মেয়ের পায়ের সামনে রাখলেন হেমলতা, শীতল কিন্তু তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন, ‘মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। তাই পৃথিবীতে সেরা মানুষগুলোরই বাঁচার অধিকার আছে। মানুষরূপী পশুদের না। যখন যেখানে কোনো মেয়েকে অসম্মান হতে দেখবি এক কোপ দিয়ে অমানুষটার আত্মা দেহ থেকে আলাদা করে দিবি। যে তোকে অসম্মান করেছে সে দোষী, তুই না। তার শাস্তি পাওয়া উচিত, তোর না। তাই আত্মহত্যার কথা কখনো ভাববি না। দোষীর আত্মা হত্যা করা উচিত। আর আমি মনে করি, এতে পাপ নেই। বরং পাপীকে বিনাশ না করা পাপ। আর আমার মেয়েরা যেন সেই পাপ কখনো না করে। সেই…’‘মেয়েদের এসব কী কইতাছস তুই? মাথা খারাপ হইয়া গেছে তোর?’ মনজুরা হইহই করে উঠলেন।হেমলতা ঢোক গিলে মনজুরার কথা হজম করে নিলেন। আবার মেয়েদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি কখনো ছেলে চাইনি। মেয়ে চেয়েছি। প্রতিবাদী, দুঃসাহসি মেয়ে চেয়েছি। আল্লাহ আমাকে তিনটা মেয়ে দিয়েছেন। এখন সেই মেয়েরা যদি এইটুকুতে দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে কীভাবে হবে? ঠিক আগের মতোই মাথা উঁচু করে বাঁচবি। যতদিন আমি আছি কেউ তোদের অসম্মান করে টিকতে পারবে না। আমি না হয় যতদিন বেঁচে থাকি তাদের শাস্তি দেব, পৃথিবী থেকে মুছে দেব; কিন্তু যখন থাকব না? তখন…তখন কী তারা বেঁচে থাকবে? বেঁচে থাকতে দেয়া ঠিক হবে? অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে নোংরামো করবে না, তার নিশ্চয়তা আছে? নেই। এখন থেকে নিজেদের শক্ত কর। মেয়েদের সাহস মেয়েদেরই হতে হয়। নিজেকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিজের। গত রাতের স্মৃতি দুঃস্বপ্ন ভেবে ভুলে যেতে বলব না, মনে রাখ। প্রতিটি মানুষের ভেতর লুকানো হিংস্র শক্তি আছে। সবাই প্রকাশ করতে জানে না। চিনতে পারে না নিজেকে। গত রাতের ঘটনাটি মনে রেখে নিজের ভেতর লুকানো হিংস্র শক্তিটাকে জাগিয়ে হাতের মুঠোয় রাখ। যাতে সঠিক সময়ে হাতের মুঠো খুলে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারিস। আঘাতে, আঘাতে চুরমার করে দিতে পারিস পাপের জগত।’এইটুকু বলে হেমলতা ক্লান্ত হয়ে দপ করে বসে পড়লেন। পদ্মজা ‘আম্মা’ বলে হেমলতাকে ধরতে চাইলে, হাত উঠিয়ে বললেন, ‘দাঁড়িয়ে থাক।’ সময় নিয়ে প্রাণ ভরে দম নিলেন তিনি, এরপর কৌটাটা খুলে ঠান্ডা তরল কিছু ঢেলে দিলেন দুই মেয়ের পায়ে। পূর্ণা কেঁপে উঠে দূরে সরে গেল। পদ্মজা আতঙ্ক নিয়ে প্রশ্ন করল, ‘কার রক্ত?’রক্তের কথা শুনে ঘৃণা আর ভয়ে পূর্ণার সর্বাঙ্গ রি রি করে উঠল। তার মনে হচ্ছে পায়ে পোকা কিলবিল করছে। টাটকা তাজা লাল রক্ত! বমি গলায় এসে আটকে গেছে। হেমলতা জবাব দিলেন না, শুধু মৃদু হাসলেন। পূৰ্ণা এই ভয়ংকর দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারাল। দুই হাতে বোনকে জাপটে ধরল পদ্মজা। কী আশ্চর্য, এই ভয়ংকর ঘটনা তাকে একটুও বিচলিত করল না! হেমলতার গায়ে ভেজা শাড়ি। তাই তিনি পূর্ণাকে ধরলেন না। মনজুরাকে বললেন, ‘পূর্ণারে ঘরে নিয়ে যাও আম্মা।’মনজুরা কঠোর চোখে চেয়ে আছেন হেমলতার দিকে। হেমলতা আবারো হাসলেন। ভেজা কণ্ঠে মনজুরাকে বললেন, ‘কালো বলে অবহেলা না করে বুকে আগলে রাখলে আমার জীবনটা, আমার মেয়েদের জীবনটা অন্যরকম হতে পারত আম্মা।’হেমলতার কথায় মনজুরার সারামুখ বিষণ্ণতা ছেয়ে গেল। তিনি হেমলতার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলেন না, অপরাধবোধে মাথা নুইয়ে ফেললেন। পূর্ণাকে ধরে নিয়ে গেলেন ঘরে। হেমলতা সেখানেই পড়ে রইলেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে নিশ্বাস ফেললেন। আলো ফুটেছে পুরোপুরি। পাখির কিচিরমিচির শোনা যাচ্ছে। তিনি পানি দিয়ে উঠানের রক্ত মুছে দিলেন চিরতরে। রাম-দা ধুয়ে লুকিয়ে রাখলেন লাহাড়ি ঘরে। শাড়ি পালটে উঠানে পা রাখতেই মগাকে দেখতে পেলেন। খবর এনেছে সে, বিচার বসবে দুপুরে। রাতের ঘূর্ণিঝড়ে গ্রামের বেশিরভাগ ঘরবাড়ি উড়ে গেছে, ফসল ও পশুপাখিসহ বিভিন্ন ক্ষতি হয়েছে। অনেক মানুষ আহত হয়েছে! এই খবর শুনে হেমলতার চোখ সজল হয়ে উঠল 1 প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। প্রকৃতি কখনো কাউকে ছাড়ে না! গ্রামবাসী অন্যায় দেখেও নিস্তব্ধ থেকেছিল। এ বুঝি তারই শাস্তি!.মাথার ওপর সূর্য, তাপদাহও প্রচণ্ড। পূর্ণা, পদ্মজা ও হেমলতা কালো বোরখার আবরণে নিজেদের ঢেকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে অলন্দপুরের মাধ্যমিক স্কুলের উদ্দেশ্যে। খা খা রোদ্দুর, তপ্ত বাতাসের আগুনের হলকা। সবুজ পাতা নেতিয়ে পড়ার দৃশ্য পড়ছে চোখে। মোর্শেদ বাকিদের নিয়ে আসছে। রীনাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার পথে করুণ কান্নার স্বর ভেসে আসে। পদ্মজা চোখ তুলে তাকিয়ে দেখল, রীনার বাড়ির ছাদ উড়ে গেছে, গাছপালা ভেঙে পড়ে আছে উঠানে। হেমলতা পদ্মজাকে টেনে নিয়ে এগিয়ে যান।বটের ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছিল এক রাখাল ছেলে। সে হেমলতার মুখ দেখে বুঝে যায়, পেছনের দুটি মেয়ে পদ্মজা আর পূর্ণা।রাখাল ছেলেটি ছুটে এসে পদ্মজাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘পদ্ম আপা, তুমি ডরাইও না। তোমার কিচ্ছু হইব না।’চারদিকে নিঝুম, নিস্তব্ধ, ঝিমধরা প্রকৃতি। ঘামে দরদর তৃষ্ণার্ত রাখাল হাঁপিয়ে কথা বলছে। স্কুলে যাওয়ার পথে, মাঝে মাঝেই এই পনেরো বছর রাখালের সঙ্গে দেখা হতো পদ্মজার। পদ্মজার জন্য পাগল সে। বড়ো বোনের মতো মান্য করে। পদ্মজামৃদু হাসল। তবে মুখের ওপর পাতলা পর্দা আছে বলে, রাখালের চোখে তা পড়ল না। রাখালকে পেছনে ফেলে তিন মা-মেয়ে এগিয়ে চলল।স্কুল মাঠে অনেক মানুষ জমেছে। রাতের ঘূর্ণিঝড়ের জন্য অলন্দপুরের বেশি অর্ধেক মানুষ আসেনি। তবুও উপস্থিত জনতার সংখ্যা শ-পাঁচেক তো হবেই! ঘটনা ঘটেছে আটপাড়ায়, আর তা ছড়িয়ে পড়েছে সব পাড়ায়! যথাসময়ে বিচার কার্য শুরু হলো। পদ্মজা এবং আমির দুজন দুই দিকে দাঁড়িয়ে আছে।আমির একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে পদ্মজার দিকে, তার দুচোখ ভরতি মুগ্ধতা।মাতব্বর ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করলেন, ‘পদ্মজা-আমিরকে একসঙ্গে কারা কারা দেখেছেন?’রমিজ আলী, কামরুল, মালেক হাত তুললেন। মজিদ মাতব্বর বললেন, ‘কী দেখেছেন? ব্যাখ্যা করুন।রমিজ আগে আগে উঁচু কণ্ঠে বললেন, ‘আমি দেখছি ঝড়ের সন্ধ্যায় আপনের পোলারে পদ্মজার ঘর থেকে বাইর হইতে। বাড়িত আর কেউ আছিল না।’আমির রেগে গিয়ে কিছু বলতে চাইলে মজিদ মাতব্বর হাতের ইশারায় আটকে দিলেন। আমির বাপের বাধ্য সন্তান, তাই থেমে গেল।মজিদ মাতব্বর বললেন, ‘আপনি আমিরকে পদ্মজার ঘর থেকেই বের হতে দেখেছেন?’রমিজ আলী দৃষ্টি অস্থির রেখে আমতা আমতা শুরু করলেন। দম নিয়ে বললেন, ‘তারে বারান্দা থাইকা বাইর হইতে দেখছি।’মজিদ মাতব্বর মুহূর্তখানেক নীরব থেকে বললেন, ‘তাহলে কোন আন্দাজে আপনি বলছেন, তারা নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত ছিল?’কথাটি শুনে পদ্মজার সর্বাঙ্গ রি রি করে উঠল, চোখ বুজে ফেলল সে। রমিজ আলী থমকে গিয়ে পরপরই হুংকার দিয়ে ওঠে, ‘একটা অচেনা ছেড়া খালি বাড়িত কোনো ছেড়ির কাছে কেন যাইব? আপনার নিজের ছেড়া বলে তার দোষ ঢাকতে পারেন না। আমার ছেড়ির বেলা কিন্তু ছাড়েন নাই।’মাতব্বর রেগে গেলেন, যুক্তি দিয়ে কথা বলুন। আপনার মেয়েকে হাতেনাতে ধরা হয়েছিল। তার গায়ে কাপড় ছিল না। তারা একসঙ্গে একই ঘরের একই বিছানায় ধরা পড়েছে। আমির আর পদ্মজার বেলা সেটা হয়নি।’মজিদ মাতব্বরের ক্ষমতা এবং কথার দাপটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে রমিজ আলীর। কামরুল চুপসে গিয়েছেন। সামনে নির্বাচন। মজিদ মাতব্বরকে খেপানো মানে নিজের কপালে দুঃখ বয়ে আনা।ভিড়ের মাঝ থেকে কেউ একজন বলল, ‘তাহলে আপনার ছেলে একটা মেয়ের কাছে খালি বাড়িতে গেল কেন?’মজিদ মাতব্বর উঁকি দিয়ে প্রশ্নদাতাকে খুঁজে বের করলেন। তারই প্রতিপক্ষ হারুন রশীদ! মজিদ মাতব্বর আমিরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি মোড়ল বাড়িতে কেন গিয়েছিলে?’আমির সহজ গলায় বলল, ‘বাড়ি ফিরছিলাম হঠাৎ ঝড় শুরু হলো সামনে মোর্শেদ কাকার বাড়ি ছিল। মোর্শেদ কাকা বাড়ি নেই আমার জানা ছিল না। জানলে বৃষ্টিতে ভিজতাম তবুও ওই বাড়ি যেতাম না। এই গ্রামের অনেকেই জানে আমার শ্বাসকষ্ট আছে। বাড়ির সবাই জানে বৃষ্টিতে ভিজলে ঠান্ডা লেগে যায়, শ্বাসকষ্ট হয়। তাছাড়া পদ্মজাকে এর আগে কখনো দেখিনি আমি। কেউ কী কখনো পদ্মজার সঙ্গে আমাকে দেখেছে?’ আমির জনতার উদ্দেশ্যে বলল, ‘বলেন, কেউ দেখেছেন? আমাদের আগে কখনো দেখাই হয়নি তাহলে সম্পর্ক কী করে হবে?’হারুন রশীদ বললেন, ‘যখন দেখলা ছেড়িড়া বাড়িত একলা তখন বাইর হইয়া গেলা না ক্যান?’আমির সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, ‘আমার মাথায় আসেনি এমন কিছু হতে পারে। আর…’আমির পদ্মজার দিকে তাকাল। পদ্মজা সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিলো। আমির বলল, ‘আর…পদ্মজার মতো রূপসী আর একটাও নেই এটা সবাই স্বীকার করতে বাধ্য। আমি প্রথম দেখে অভিভূত হয়ে পড়ি। তাই মস্তিষ্কে একবারো কোনো বিপদের আশঙ্কা আসেনি। এমন নোংরা কিছু হতে পারে ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি।’মজিদ মাতব্বর ছেলের দুর্বলতা বুঝতে পেরে অসন্তুষ্ট হলেন। তবুও স্বাভাবিক থেকেই বললেন, ‘গ্রামবাসী কোনো প্রমাণ ছাড়াই লাফিয়েছে। মেয়েটাকে অপদস্থ করেছে। প্রমাণ ছাড়া কারো বিরুদ্ধে নোংরা অপবাদ দেয়া অপরাধ।’ তিনি কামরুলের দিকে তাকিয়ে তাকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘ছইদ, মজনুর ছেলে আরেকটা কে জানি? কোথায় তারা?’কামরুল ধীরভাবে বললেন, ‘খুঁজে পাই নাই। মনে হয় ভয়ে কোনহানে লুকাইছে।’রমিজ আলী হঠাৎ গমগম করে উঠলেন, ‘এইডা আমি মানি না। পদ্মজা- আমিররে আপনে ছাইড়া দিতে পারেন না। আপনের ক্ষমতা বেশি দেইখা আপনে এমনে নিজের ছেড়ারে ঢাইকা রাখতে পারেন না। আপনি বেইমানি করতাছেন।’আমির রেগেমেগে রমিজ আলীকে ধরতে এলে, মজিদ গর্জন করে উঠলেন, ‘আমির!’আমির কিড়মিড় করে রাগ হজম করার চেষ্টা করল। হারুন অতিশয় ধূর্ত লোক। তিনি রসিকতা করে বললেন, ‘সত্য হউক আর মিথ্যাই। বদনাম তো বদনামই।’মজিদ সবার প্রশ্ন কথা উপেক্ষা করে উপস্থিত গ্রামবাসীর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আপনাদের আমার বিচারের প্রতি বিশ্বাস আছে?’সবাই আওয়াজ করে বলল, ‘আছে।’মজিদ মাতব্বর তৃপ্তির সঙ্গে হাসলেন। ক্ষণকাল নীরব থেকে উঠে দাঁড়ালেন। গলার স্বর উঁচু করে বললেন, ‘মোর্শেদের মেয়েদের সঙ্গে খারাপ হয়েছে। পদ্মজার নামে অনেক প্রশংসা শুনেছি। সে খুবই ভালো মেয়ে। আর আমার ছেলেকেও সবাই চিনেন, সে কেমন। যারা যারা দোষ করেছে তাদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেয়া হবে। পদ্মজা আর আমির নামে যে পাপের অভিযোগ করা হয়েছে তার যুক্তিগত প্রমাণ নেই। আর প্রমাণ ছাড়া আমি কখনো কাউকে শাস্তি দেইনি। আজও দেব না। তবে আমি আজ সবার সামনে মোর্শেদ আর তার স্ত্রীর কাছে একটা প্রস্তাব রাখব।’হেমলতা, মোর্শেদ সহ উপস্থিত সবাই কৌতূহল নিয়ে তাকাল। মজিদ মাতব্বর এক নজর আমিরকে দেখে বললেন, ‘পদ্মজাকে আমিরের বউ করে নিয়ে যেতে চাই।’চারিদিকে কোলাহল বেড়ে গেল। সব কোলাহল সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে স্বপ্নাবিষ্টের মতো শুধু মজিদ মাতব্বরের প্রস্তাবটি পদ্মজার কানে বাজতে থাকল। জীবনের কোন মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে সে?
সূর্যের প্রখর তাপে সমস্ত প্রকৃতি যেন নির্জীব হয়ে ওঠেছে। উপস্থিত সবার মধ্যে চাপা উত্তেজনা কাজ করছে। রমিজ আলি আর হারুন রশীদ নামক ধূর্ত মানুষগুলোর চোখ ছানাবড়া। মজিদ মাতব্বর ধীর শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘আপনারা চাইলে সময় নিতে পারেন। আজ এখানে…’হেমলতা কথার মাঝে আটকে দিয়ে বললেন, ‘আপনি বিয়ের তারিখ ঠিক করুন।’মজিদ মাতব্বরের প্রস্তাবের চেয়ে এই প্রস্তাবে হেমলতার রাজি হওয়াটা যেন কোলাহল মুহূর্তে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল। পদ্মজা হতবাক, বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়! মোর্শেদ চোখ বড়ো করে হেমলতার দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। আশপাশ থেকে ফিসফিসানি ভেসে আসছে। মজিদ মাতব্বর মৃদু হাসলেন। আনন্দের সঙ্গে সবাইকে নিমন্ত্রণ করলেন, ‘আগামী শুক্রবার আমার ছেলের সঙ্গে মোর্শেদের বড়ো মেয়ের বিবাহ। আপনাদের সবার নিমন্ত্রণ রইল।’ কথা শেষ করে হেমলতার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘দিন তারিখ ঠিক আছে?’হেমলতা সম্মতি জানালেন। মোর্শেদ অবাকের চরম পর্যায়ে, কোনো কথা আসছে না মুখে। পদ্মজা ঢোক গিলে ব্যাপারটা হজম করে নিলো মুহিবের সঙ্গে যখন তার বিয়ের আলোচনা হলো তখন সে ভারি অবাক হয়েছিল। লিখন শাহ নামে একটা মানুষকে মনে পড়েছিল। এখন তেমন কিছুই হচ্ছে না, অনুভূতিগুলো ভোঁতা। যা হওয়ার হবে। সেসব নিয়ে ভেবে লাভ নেই।বিচার সভা ভেঙে গেল। মজিদ মাতব্বর আলাদা করে মোর্শেদের সঙ্গে কথা বললেন। তিনি আগামীকাল নিজ স্ত্রী এবং বাড়ির অন্যান্য বউদের নিয়ে পদ্মজাকে দেখতে আসবেন। মোর্শেদ, হেমলতা সমস্বরে অনুমতি দিলেন বাড়ি ফেরার পথে অনেকের কটু কথা কানে আসে। পদ্মজা আর আমির দুজনেরই চরিত্র খারাপ। এজন্যই বিয়ে হচ্ছে। মাতব্বর ক্ষমতাবান বলে পুরো ব্যাপারটা ঘুরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু তলে তলে তো নিজেরা জানে তাদের ছেলেমেয়ে কেমন। তাই তাড়াতাড়ি করে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। কেউ একজন খুব বিশ্রীভাবে পদ্মজাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘কে জানে, মনে কয় তো ছেড়ি পেট বাঁধাইছে। রাইতে বাপ-মারে দিয়া পায়ে ধরাইয়া বিয়া ঠিক করছে।’পদ্মজার মন তিক্ত হয়ে ওঠে, হাঁটতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। এত নোংরা মন্তব্য সহ্য করা খুব কঠিন। মিথ্যে অপবাদ চারিদিকে। বোরখার আড়ালে পদ্মজার চোখ দুটি ছলছল করছে। খুব কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে।হেমলতা পদ্মজার একহাত শক্ত করে চেপে ধরলেন। মানুষদের ছায়া ছেড়ে খেতের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথে বললেন, ‘জীবন খুব ছোটো। এই ছোটো জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে। যে ভালো তার সঙ্গে যে শুধুই ভালোই হবে তা কিন্তু ঠিক না, উচিতও না। ভালো খারাপে মিলিয়েই জীবন। তাই বলে সেই খারাপকে পাত্তা দিয়ে সময় নষ্ট করতে হবে—তার কোনো মানে নেই। খারাপটাকে পাশে রেখে ভালো মুহূর্ত তৈরি করার চেষ্টা করবি। ভালোটা ভাববি। শুধুমাত্র কয়জনের কথায় কী আসে যায়? পুরো গ্রামবাসী জানে, তুই কেমন। পুরো অলন্দপুরের যত মানুষ আজ এসেছে তাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই মনে মনে তোর গুণগান গেয়েছে। তারা মনে মনে বিশ্বাস করে তুই নির্দোষ। কিন্তু চুপ ছিল। যারা খারাপের দলে তারা সংখ্যায় কম বলে কোলাহল করে নিজেদের দাপট দেখাতে চেয়েছিল। সবার অগোচরে বোঝাতে চেয়েছিল, আমরা অনেকজন। কিন্তু পারেনি। কোলাহল কোনো কিছুর সমাধান নয়। এখন যারা নিন্দা করল তারা নিজেদের নিচু মনের পরিচয় দিয়েছে, সেই সঙ্গে আমলনামায় পাপের সংখ্যা বাড়িয়েছে। তাদের শাস্তি পৃথিবী এবং আখিরাত—দুটোতেই হবে। একদিন এদের শাস্তি হবেই এই কথাটা ভেবে খুশি হ। সব ভুলে যা, বাকি জীবন পড়ে রয়েছে। তা নিয়ে ভাব। চোখের জল অতি আপনজন এবং আল্লাহর জন্য ফেলা উচিত। এদের মতো অমানুষদের জন্য না।’পদ্মজা হুহু করে কেঁদে উঠল। আচমকা হেমলতাকে মাঝপথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে, কান্নামাখা কণ্ঠে বলল, ‘তুমি জাদুকর আম্মা। তুমি জাদু জানো।’হেমলতা পদ্মজার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। মোর্শেদ পদ্মজাকে কান্না থামাতে বলতে চাইলে হেমলতা ইশারায় চুপ করিয়ে দেন। পাশেই বিস্তীর্ণ ক্ষেত। গ্রীষ্মের দুপুরের রূপ স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। মোর্শেদের কপাল বেয়ে ঝরঝর করে ঘাম ঝরছে। তার দৃষ্টি থমকে আছে হেমলতার দিকে। একটা অপ্রিয় সত্য সম্ভাবনার কথা মনে হতেই চোখ দুটি ছলছল করে উঠল। তিনি দ্রুত চোখ সরিয়ে বড়ো করে নিশ্বাস ফেলেন। জীবনের লীলাখেলায় তিনি নিঃস্ব। পদ্মজার কান্না থামার লক্ষণ নেই। হেমলতা ছদ্ম গাম্ভীর্যের সহিত বললেন, ‘এত কাঁদলে কিন্তু মারব।’.আকাশ জুড়ে তারার মেলা। জানালা গলে চাঁদের আলো পদ্মজার মুখশ্রী ছুঁয়ে দিচ্ছে। বারান্দার ঘরে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে সে, বুকটা কেমন কেমন করছে; কাঁপছে অনবরত। হেমলতার উপস্থিতি টের পেয়ে দ্রুত উঠে বসল। হেমলতা পদ্মজার দিকে মুহূর্তকাল তাকিয়ে রইলেন।‘ঘুম আসছে না?’ জানতে চাইলেন তিনি।পদ্মজা মাথা দুই পাশে নাড়াল। হেমলতা আর কিছু বললেন না। নীরবতা কাটিয়ে বলল, ‘মেজো আপার বিয়ের তারিখ পড়েছে?’হেমলতা পদ্মজার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিলেন। বিছানার ওপর বসে ইশারায় পদ্মজাকে কোলে শুতে বললেন। পদ্মজা শুয়ে পড়ল। মায়ের কোলটা তার এখন ভীষণ দরকার ছিল। হেমলতা পদ্মজার প্রশ্ন এড়িয়ে অন্য কথা তুললেন।বললেন, ‘জানি না কোনো মা তার মেয়ের সঙ্গে নিজের বিয়ের গল্প করেছে কি না। কিন্তু আমি আমার বিয়ের গল্প তোকে বলতে চাই। শুনবি?’পদ্মজা সায় দিল। হেমলতা পদ্মজাকে বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলার জন্য নিজের অতীতে নিয়ে যান, ‘সেদিন রাতে আব্বা এসে বলল, তিনদিন পর আমার বিয়ে। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। কষ্ট হয়েছিল। আমি আরো পড়তে চেয়েছিলাম। এরপর শুনলাম—যার সঙ্গে আমার বিয়ে হচ্ছে তার পড়াশোনা নেই, জ্ঞানও যথেষ্ট কম; রাগচটা লোক। এসব তথ্য জেনে রাগ কিংবা মন খারাপ কিছুই হয়নি। ভয় হয়েছিল—না জানি কেমন হবে সংসার!‘বিয়ের দিন ঘনিয়ে এলো। তোর আব্বাকে তখনো আমি দেখিনি। বিয়ের দিন আয়নায় প্রথম দেখি। কালো একটা মুখ। চোখ দুটি গভীর। কখনো না দেখা মানুষটাকে, প্রথম দেখেই মনে হয় আমার সবচেয়ে আপন একজন মানুষ। সব ভয় কেটে গেল। বিদায়ের সময় সবাই বলেছিল দুজনকে খুব মানিয়েছে, রাজযোটক। একজন হিন্দু দিদি বলেছিলেন, সাক্ষাৎ রাম- সীতা। আটপাড়ায় যদি একজন ছয় ফুট লম্বার মানুষ থাকে তবে সেটা তোদের আব্বা ছিল। বিয়ের পর জানতে পারি, তোর আব্বাকে বিয়ে করার জন্য অনেক মেয়েই পাগল ছিল। নিজেকে খুব সৌভাগ্যবতী মনে হতো। অশিক্ষিত ভেবে নাক কুঁচকেছিলাম। সেই আমি তোর আব্বার জন্য দিনকে রাত, রাতকে দিন মানতে রাজি ছিলাম। তোর আব্বার প্রতি এতটাই ভালোবাসা সৃষ্টি হয়েছিল, যদি ছুরি নিয়ে রক্তের আবদার করত আমি আমার বুক পেতে দিতাম।’পদ্মজা মাঝপথে আটকে দিয়ে বলল, ‘তাও তো আব্বা তোমাকে ভালোবাসেনি।’হেমলতার হাসি উজ্জ্বল মুখটা সঙ্গে সঙ্গে নিভে গেল। অপ্রতিভ হয়ে উঠলেন। তিনি এলোমেলো দৃষ্টিতে দূরের দিকে চেয়ে বললেন, ‘তাকে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়েছিল।’পদ্মজা চুপ করে রইল। হেমলতাও নিশ্চুপ। দরজার পাশে মোর্শেদ বসে বসে বিড়ি ফুঁকছিলেন। হেমলতার প্রতিটি কথা বুড়ো হয়ে যাওয়া মনটাকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়। তিনি বিড়ি নিয়ে বেরিয়ে যান চৌরাস্তার উদ্দেশ্যে। চৌরাস্তার পাশে একটা বড়ো ব্রিজ আছে, ওখানে দখিনা হাওয়ার তীব্রতা খুব। সেখানেই এসে দাঁড়ান। ফেলে আসা জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ চোখ খুঁজে মনে করার চেষ্টা করেন।বেশ কিছুক্ষণ পর পদ্মজা বলল, ‘আম্মা, প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আর প্রশ্ন করব না। তবুও…’‘বলব একদিন।’পদ্মজা নিশ্চুপ হয়ে গেল। একমুহূর্ত স্থির থেকে হেমলতা বললেন, ‘পূর্ণা খুব কান্নাকাটি করে দেখলাম। মেয়েটা এত দুর্বল কী করে হলো?’পদ্মজা হেমলতার এক হাত মুঠোয় নিয়ে আশ্বস্ত করল, ‘আমি আছি আম্মা। সামলে নেব।’‘ঘরে যা। রাত হয়েছে অনেক।’পদ্মজা উঠে বসল। ওড়নাটা ভালো করে টেনে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। হেমলতা বিছানার শেষ প্রান্ত থেকে বালিশ টেনে নিতে গিয়ে বালিশের তলায় ভাঁজ করা দুটি চিঠি দেখতে পেলেন। তিনি হাত বাড়িয়ে চিঠি দুটো নিয়ে পদ্মজার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘পদ্মজা, এগুলো কী?’পদ্মজা ফিরে তাকাল। হেমলতার হাতে লিখনের চিঠি দুটি দেখে সর্বাঙ্গে বৈদ্যুতিক কিছু একটা ছড়িয়ে পড়ে শরীর কাঁপিয়ে দিল। মাটি যেন টেনে ধরল দুই পা। হেমলতা প্রথম চিঠিটির ভাঁজ খুলে প্রথম লাইন পড়ে বেশ অবাক হোন, পদ্মজার দিকে একবার চকিতে তাকান। এরপর এক নিশ্বাসে দুটো চিঠি পড়ে শেষ করলেন।পড়া শেষে থম মেরে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। ভয়ে পদ্মজার দুই চোখ জ্বলছে। মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে সে। হেমলতা ধীর পায়ে হেঁটে পদ্মজার কাছে এসে দাঁড়ান। দুই ভ্রু প্রসারিত করে, শান্ত অথচ ধারাল কণ্ঠে বললেন, ‘এসব কবে হয়েছে? আমাকে জানাসনি কেন?পদ্মজা বলল, ‘যখন উনারা শুটিং করতে আসেন।’ ওর মনে হচ্ছে এখুনি অজ্ঞান হয়ে যাবে। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। মনে মনে প্রার্থনা করছে, যাতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। তাহলে এই লজ্জা থেকে বেঁচে যাবে।হেমলতা পদ্মজাকে পরখ করলেন, পদ্মজা অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে; বার বার কামড়ে ধরছে নিচের ঠোঁট।পদ্মজা হেমলতাকে চুপ থাকতে দেখে বলল, ‘তুমি যা বলবে তাই হবে আম্মা। আমার ওপর রাগ কোরো না।’
আজ যেন শুধু মোড়ল বাড়ির মাথার ওপরেই সূর্য উঠেছে। সকাল থেকে আত্মীয় আপ্যায়নের প্রস্তুতির তোড়জোড় চলছে। সবাই ঘেমে একাকার। বাড়ির প্রতিটি মানুষ ব্যস্ত। মোর্শেদ হিমেল ও প্রান্তকে নিয়ে বাজার করে ফিরেছেন সূর্য ওঠার মাথায়। লাহাড়ি ঘরের পাশে বড়ো উনুন করা হয়েছে। সাধারণ চালের পরিবর্তে সুগন্ধি, সিদ্ধ চালের ভাত রান্না করা হয়েছে; সেই সঙ্গে রাজহাঁস আর দেশি মুরগি। বাড়িজুড়ে রমরমা ব্যাপার। একদিন আগের ঘটনা ধামাচাপা পড়েছে পঁচানব্বই ভাগ। ছোটো ছোটো দরিদ্র ছেলেমেয়েরা খাবারের ঘ্রাণ পেয়ে ছুটে এসেছে মোড়ল বাড়ি। সবার মধ্যেই নতুন উত্তেজনা, নতুন অনুভূতি। শুধু পূর্ণা এখনো সেদিনের ঘটনা থেকে বেরোতে পারছে না, চিত হয়ে শুয়ে আছে ঘরে। মনজুরা আর শিউলির মাকে কাজে সাহায্য করছিল পদ্মজা। হেমলতা ধমকে ঘরে পাঠিয়ে দেন। পদ্মজা ঘামে ভেজা কপাল মুছতে মুছতে ঘরে প্রবেশ করে। পূর্ণার দুচোখ জলে নদী যেন! পদ্মজা বিছানার ওপর পা তুলে বসে। বোনের উপস্থিতি টের পেয়ে, হাতের উলটো পাশ দিয়ে চোখের জল মুছল পূর্ণা।পদ্মজা কণ্ঠ খাঁদে নামিয়ে বলল, ‘চোখের জল কী শেষ হয় না?’পূর্ণা নিরুত্তর। পদ্মজা অভিজ্ঞ স্বরে বলল, ‘দেখ পূর্ণা, এসব মনে রাখলে তোরই ক্ষতি। দেখছিস না, আমি অল্প সময়ের ব্যবধানে সব ভুলে হবু শ্বশুরবাড়ির মানুষদের জন্য রান্নাবান্না করছি। তুইও ভুলে যা। তোর বন্ধুরা আসছে। তুই নাকি তাদের ধমকে দিয়েছিস? এটা কিন্তু ঠিক না। ‘পূর্ণা পদ্মজার দিকে তাকাল। দৃষ্টি ভীষণ শীতল। পদ্মজাকে বলল, ‘সত্যি ভুলতে পেরেছ আপা?’পদ্মজা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, ‘ভুলিনি। কিন্তু সহ্য করতে পেরেছি। তোর মতো চোখের জল অপাত্রে ঢালছি না।’পূর্ণা উঠে বসে, একটা বালিশ বুকে জড়িয়ে ধরে দায়সারাভাবে বলল, ‘তুমি অনেক শক্ত আপা। আমি খুব দুর্বল, ভুলতে পারছি না।’পদ্মজা আর কথা বাড়াল না। পূর্ণার গাঁ ঘেঁষে বসে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘গতকাল রাতে কী হয়েছে জানিস?’‘কী হয়েছে?’পদ্মজা চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বলল, ‘তোর নায়ক ভাইয়ের চিঠি আম্মার হাতে পড়েছে।’পূর্ণা আঁতকে উঠে বলল, ‘সে-কী! কখন? কীভাবে?’‘আর বলিস না! সেদিন তুই নানাবাড়ি ছিলি। তখন চিঠি দুইটা বের করেছিলাম। বারান্দার ঘরে বালিশের নিচে রেখে দিই। আর মনে নেই 1 এরপরেই অঘটন ঘটে। এরপর দিন বিচার বসল। চিঠির কথা ভুলেই গেলাম। বারান্দার ঘরে ছিলাম রাতে তবুও মনে পড়েনি। আর আম্মা পেয়ে গেল।’উত্তেজনা-ভয়ে পূর্ণার গলা শুকিয়ে গেছে। প্রশ্ন করল, ‘আম্মা কী বলছে?’পদ্মজা ঠোঁট দুটি উলটে কী যেন ভাবে। এরপর ব্যথিত স্বরে বলল, ‘তেমন কিছুই না। এজন্যই আরো ভয় হচ্ছে।’‘কিছুই না?’‘কখন হলো এসব—জিজ্ঞাসা করেছে। আমি বললাম, তুমি যা বলবে তাই হবে। এরপর আম্মা অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে ছিল।’‘তারপর?’‘বলল, ঘুমা গিয়ে। শেষ।’দুই বোন একসঙ্গে চিন্তায় পড়ে গেল। কপাল ভাঁজ করে কিছু ভাবতে শুরু করে। পূর্ণা বলল, ‘আম্মা তোমার মুখ দেখে বুঝে গেছে তুমি লিখন ভাইকে ভালোবাস না।’পদ্মজা অন্যমনস্ক হয়ে বলল, ‘মনে হয়।পূর্ণা খুব বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘লিখন ভাই এত সুন্দর, তোমাকে এত ভালোবাসে তবুও কেন ভালোবাসোনি আপা? লিখন ভাইয়ের চিঠি তো ঠিকই সময় করে করে পড়তে। বিয়ে করতে কী সমস্যা?’‘আম্মা দিলে তো করবই। সমস্যা নেই।’‘তোমার এই ন্যাকার কথা আমার ভালো লাগে না আপা।’পূর্ণার রেগে কথা বলা দেখে পদ্মজা হেসে ফেলল।পদ্মজা পূর্ণার এক হাত মুঠোয় নিয়ে বলল, ‘গতকাল রাতে আম্মা আব্বাকে কতটা ভালোবাসে আমাকে বলেছে। প্রথম দেখেই নাকি আপন- আপন লেগেছিল। আব্বার জন্য আম্মা দিনকে রাত, রাতকে দিন মানতেও রাজি ছিলো। এতটা ভালোবাসত! আমার তেমন কোনো অনুভূতি হয়নি তোর নায়ক ভাইয়ের জন্য। প্রথম প্রথম কোনো পুরুষের চিঠি পেয়েছিলাম, সবকিছু নতুন ছিল। তাই একটা ঘোরে গিয়ে নতুন অনুভূতির সাক্ষাৎ পাচ্ছিলাম। আম্মার ভালোবাসার কথা শোনার পর থেকে মনে হচ্ছে আমি উনাকে ভালোবাসিনি। সবটা মোহ ছিল। দূরে যেতেই উবে গেছে। তবে উনি খুব অসাধারণ একজন মানুষ। আম্মা উনার হাতে আমাকে তুলে দিলে কোনো ভুল হবে না। কিন্তু এটা এখন কল্পনাতীত। পরিস্থিতি পালটে গেছে। আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।’পদ্মজার এত কথা উপেক্ষা করে পূর্ণা কটমট করে বলল, ‘তোমার কী কালাচাঁদরে দেখলে আপন আপন লাগে?’পদ্মজা চোখ ছোটো ছোটো করে জিজ্ঞাসা করল, ‘কালাচাঁদ কে?পূর্ণা মিনমিনিয়ে বলল, ‘তোমার হবু জামাই,’ তারপরই গলা উঁচিয়ে বলল, ‘আমিও কালা। কিন্তু আপা, তোমার জন্য লিখন ভাইয়ের মতো সুন্দর জামাই দরকার।’পদ্মজা এক হাতে কপাল চাপড়ে বলল, ‘এখনও লিখন ভাই! যা তোর সঙ্গে তোর নায়কের বিয়ে দিয়ে দেব। এখন আয়, ঘর থেকে বের হ। মুক্তা, সোনামণি, রোজিনা এসেছে। তোর সঙ্গে কথা বলবে। আয় বলছি…আয়।’পূর্ণাকে টেনে নিয়ে বন্ধুদের মাঝে বসিয়ে দিল পদ্মজা। ঘরে এসে আয়নায় নিজেকে দেখে থমকে দাঁড়াল, ছুঁয়ে দেখল গালের দাগটা। সে কী সত্যি নির্মম, নিষ্ঠুর মুহূর্তটি সহ্য করে নিয়েছে? না, করেনি। বুকের ভেতরটা খুব জ্বলে। এই অপমান মেনে নিতে গিয়ে প্রতিটি মুহূর্তে মরে যাচ্ছে সে। কিন্তু আম্মা বা পূর্ণাকে সেটা বুঝতে দেয়া যাবে না। পদ্মজা দ্রুত চোখের জল মুছে একা হাসার চেষ্টা করল।সূর্য মামার রাগ কমেছে। তাই মোড়ল বাড়ির মাথার ওপর থেকে সরে দূরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সদর ঘর ভরতি মানুষ। হাওলাদার বাড়ির মহিলারা এসেছে। যদিও তাদের আরো আগে আসার কথা ছিল। নানা কারণে তারিখ পিছিয়ে দিতে হয়েছে। হাওলাদার বাড়ির বউদের গ্রামবাসী শেষবার তাদের বিয়েতেই দেখেছে। আবার দেখার সুযোগ হওয়াতে দল বেঁধে মানুষ এসেছে। লোকমুখে শোনা যায়, হাওলাদার বাড়ির মেয়ে-বউদের সারা অঙ্গে সোনার অলংকার ঝলমল করে। মগা-মদনসহ আরো দুজন ভৃত্য মোড়ল বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে বাড়ি পাহারা দিচ্ছে। পদ্মজাকে শাড়ি পরাচ্ছেন হেমলতা। পদ্মজা এর আগে কখনো শাড়ি পরেনি। পূর্ণা-প্রেমা ছোটো হয়েও পরেছে। পদ্মজার কখনো ইচ্ছে করেনি। তাই সে হেমলতাকে বলল, ‘প্রথম শাড়ি তুমি পরাবে।’শাড়ি পরানো শেষে, চোখে কাজল এঁকে দেন হেমলতা। ঠোঁটে লিপিস্টিক দিতে গিয়েও দিলেন না। মাথার মাঝ বরাবর সিঁথি করে চুল খোঁপা করতেই, পূর্ণা ছুটে আসে। হাতে শিউলি ফুলের মালা।হেমলতা মৃদু ধমকের স্বরে বললেন, ‘এতক্ষণ লাগল!’হেমলতার কথা বোধহয় পূর্ণার কানে গেল না।পূর্ণা চাপা উত্তেজনা নিয়েতা আপাকে কী সুন্দর লাগছে!’পদ্মজা লজ্জা পেল, চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ল লাল আভা। হেমলতা পদ্মজার খোঁপায় ফুলের মালা লাগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘শুধু রূপে চারিদিক আলোকিত করলে হবে না, গুণেও তেমন হতে হবে।’পদ্মজা বাধ্যের মতো মাথা নাড়াল। তখন হুড়মুড়িয়ে সেখানে উপস্থিত হয় লাবণ্য। দৌড়ে এসে পদ্মজাকে জাপটে ধরে। এক নিশ্বাসে বলে উঠে, ‘আল্লাহ, পদ্ম তুই আমার ভাবি হবি। আমার বিশ্বাসই হইতাছে না। মনে হইতাছে স্বপ্ন দেখতাছি। ইয়া…মাবুদ, শাড়িতে তোরে পরি লাগতাছে। তোর রূপ দেখে বাড়ির সবাই অজ্ঞান হয়ে যাবে দেহিস।’পদ্মজা কী বলবে ভেবে পেল না, শুধু হাসল। হেমলতা পদ্মজার মাথার ঘোমটা টেনে দিয়ে লাবণ্যকে বললেন, ‘তোমার সইকে নিয়ে যাও।’পদ্মজা হেমলতার হাতে হাত রেখে অনুরোধ করে বলল, ‘আম্মা, তুমিও এসো।’হেমলতা হেসে পদ্মজার মাথায় এক হাত রেখে বললেন, ‘কয়দিন পর থেকে এরাই তোর আপন। মা পাশে থাকবে না।’পদ্মজার চোখ দুটি সজল হয়ে ওঠে। ছলছল চোখ নিয়ে সে তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে। পদ্মজাকে নতুন বউ রূপে দেখে হেমলতার বুকে ঝড় বইছে। মেয়েটা কয়দিন পর আলাদা হয়ে যাবে। দুই মাস আগে হলে তিনি সাত রাজার ধনের বিনিময়েও মেয়ের বিয়ে দিতেন না। তিনি নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে বললেন, ‘আমি আসছি। লাবণ্য যাও তো নিয়ে যাও। পূর্ণা তুইও যা।’লাবণ্য পদ্মজাকে নিয়ে যায়। পদ্মজার বুক ধড়ফড় করছে। মায়ের যেন কী হয়েছে! সে পেছন ফিরে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গে হেমলতা অন্য দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে, তিনি দ্রুত তা মুছে ফেললেন।সদর ঘর কোলাহলময় ছিল। পদ্মজা ঢুকতেই সব চুপ হয়ে গেল। লাবণ্য পদ্মজাকে ছেড়ে ভারী আনন্দ নিয়ে বলল, ‘আম্মা, কাকিম্মা, ভাবি, আপারা—এই যে পদ্মজা। আমার নতুন ভাবি।’পদ্মজা চোখ তুলে তাকাল। অলংকারে জ্বলজ্বল করা পাঁচ জন নারীকে দেখে যেন চোখ ঝলসে গেল। সবাই তার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। পদ্মজা চোখ নামিয়ে ফেলল। তখন কোত্থেকে আবির্ভাব হলো আমিরের সদর দরজার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল পদ্মজা, হবু বউকে দেখে থমকে গেল সে। পদ্মজার পরনে খয়েরি রংয়ের জামদানি শাড়ি। শাড়িতে কোনো মেয়েকে এত সুন্দর মনে হতে পারে এর আগে কখনো অনুভব করেনি আমির। আমিরের লজ্জা খুব কম। সে উপস্থিত গুরুজনদের উপেক্ষা করে পদ্মজাকে বলল, ‘মাশাআল্লাহ। দিনের বেলা চাঁদ উঠে গেছে।’লজ্জায় পদ্মজার রগে রগে কাঁপন ধরে। এত লজ্জাহীন মানুষ কী করে হয়! আমিরের মা ফরিনা ধমকের স্বরে বললেন, ‘বাবু, এইনে বয় আইসসা।’আমির পদ্মজার ওপর দৃষ্টি স্থির রেখে মায়ের পাশে গিয়ে বসল। হেমলতা সদর ঘরে প্রবেশ করতেই আমির ধড়ফড়িয়ে উঠল। ছুটে এসে হেমলতার পা ছুঁয়ে সালাম করল। হবু শাশুড়ির প্রতি আমিরের এত দরদ দেখে ফরিনা খুব বিরক্ত হলেন। পাশ থেকে ফরিনার জা আমিনা ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘মেয়ের রূপ আগুনের হলকা। বাবু এইবার হাত ছাড়া হইলো বলে।’আমিনার মন্ত্র ফরিনার মগজ ধোলাই করতে পারল না। পদ্মজার রূপে তিনি মুগ্ধ। আমির কালো বলে তিনি ছোটো থেকেই আমিরকে বলতেন, ‘বাবু, তোর জন্যি চান্দের লাহান বউ আনাম।’সেই কথা রক্ষার পথে। তিনি শুধু পছন্দ করছেন না শাশুড়ির প্রতি আমিরের এত দরদ! কী দরকার ঝাঁপিয়ে পড়ে পায়ে ধরে সালাম করার? আমির হেমলতাকে ভক্তির সঙ্গে প্রশ্ন করল, ‘ভালো আছেন?’হেমলতা মিষ্টি করে হেসে বললেন, ‘ভালো আছি। যাও গিয়ে বসো।’আমির বাধ্যের মতো মায়ের পাশে গিয়ে বসল। মজিদ মাতব্বর, মোর্শেদের সঙ্গে বাইরে আলোচনা করছেন। আর কোনো পুরুষ আসেনি বাড়িতে। তারা বিয়ের আয়োজনে ব্যস্ত। মুহূর্তে পদ্মজার সারা অঙ্গ সোনার অলংকারে পূর্ণ হয়ে উঠল। রূপ বেড়ে গেল লক্ষ গুণ, যার কোনো সীমা নেই। যার সঙ্গেই পদ্মজা কথা বলেছে, সেই এগিয়ে এসে বালা নয়তো হার পরিয়ে দিচ্ছে।কী অবাক কাণ্ড!সবাই আড্ডা দিচ্ছে। তবে চুপ করে বসে আছে পদ্মজা। কেউ প্রশ্ন করলে জবাব দিচ্ছে। লাবণ্য একজনকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘রানি আপা, বাড়ির পেছনে যাইবা?’রানি খুশিতে গদগদ হয়ে বলল, ‘যাব।’তার খুশির কারণ লাবণ্য কিছুটা ধরতে পেরেছে। রানির একজন প্ৰেমিক আছে। তাই শুধু সুযোগ খোঁজে দেখা করার। যেখানেই দাওয়াত পড়ে সেখানেই তার প্রেমিক উপস্থিত হয়। লাবণ্য সবার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে পদ্মজা-পূর্ণা, রানিকে নিয়ে বাড়ির পেছনে যায়। রানি বাড়ির পেছনে এসেই ছুটে যায় ঘাটের দিকে, সেই মুহূর্তেই একটা নৌকা এসে ভেরে সেখানে। নৌকায় কে ছিল দেখা যাচ্ছে না। রানি নৌকায় উঠে পড়ে। শোনা যায়, কারো সঙ্গে সে বিরতিহীন ভাবে কথা বলছে। পূর্ণা লাবণ্যকে প্রশ্ন করল, ‘লাবণ্য আপা, রানি আপা কার সঙ্গে কথা বলে?’‘আবদুল ভাইয়ের সঙ্গে।’‘কোন আবদুল?’‘যার কথা ভাবছিস।’ কথা শেষ করে লাবণ্য চোখ টিপল। পূর্ণা অবাক হয়ে বলল, ‘মাস্টারের সঙ্গে!’লাবণ্য হাসে। রানি এগিয়ে আসে। লাবণ্য বলল, ‘কথা শেষ?’‘হ, চইলা গেছে।’রানি পদ্মজার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মাশাআল্লাহ, তুমি এত সুন্দর। আমার কোলে নিয়া আদর করতে মন চাইতাছে।পদ্মজা মুচকি হেসে বলল, ‘আপনি খুব শুকনো। আমাকে কোলে নিতে পারবেন না।’‘শুকনা হইতে পারি। শক্তি আছে।’রানির কথা বলার ঢংয়ে সবাই হেসে উঠল। পূর্ণা পেছনে ফিরে দেখে আমির আসছে। সে তাৎক্ষণিক পদ্মজার কানে কানে বলল, ‘আপা তোমার কালাচাঁদ আসছে।’পদ্মজা পূর্ণাকে চোখ রাঙিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘কীসব কথা! উনার বোনরা আছে।’আমির সেখানে এসেই বোনদের আদেশ করল, ‘লাবণ্য-রানি যা এখান থেকে।’আমিরের আদেশ শুনে রানি-লাবণ্য খুব বিরক্ত হলো। রানি কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল, ‘দাভাই, থাকি না।’আমির চোখ রাঙিয়ে ধমকের স্বরে বলল, ‘যেতে বলছি যা।’লাবণ্য বিরক্তিতে, ইস বলে পদ্মজাকে বলল, ‘আয় অন্যখানে যাই।’‘পদ্মজা থাকুক। তোরা যা।’আমিরের কথা শুনে বেশি চমকাল পদ্মজা। লাবণ্য ফোঁসফোঁস করতে করতে বলল, ‘কেন? কেন?’পদ্মজা-পূর্ণা অন্যদিকে ফিরে আছে। আমির দৃষ্টি কঠোর করতেই লাবণ্য-রানি চলে যায়। পূর্ণা চলে যেতে চাইলে পদ্মজা পূর্ণার হাত চেপে ধরে। পূর্ণা পদ্মজার হাত ছাড়িয়ে, ধীরকণ্ঠে বলল, ‘একা থেকে তোমার কালাচাঁদের ভালোবাসা খাও।’‘ছি।’পূর্ণা ছুটে চলে গেল। আমির পদ্মজার পাশে এসে দাঁড়াতেই পদ্মজা বলল, ‘বিয়ের আগে গুরুজনদের না জানিয়ে এভাবে একা কথা বলা ঠিক নয়।’‘কী হবে?’পদ্মজা কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, ‘কলঙ্ক লাগবে।’‘আর কী বাকি আছে?’‘পরিমাণ না বাড়ানোই ভালো।’পদ্মজার কথা বলতে একটুও গলা কাঁপেনি। বাড়ির ভেতর চলে আসার জন্য পা বাড়াতেই আমির পদ্মজার এক হাত থাবা দিয়ে ধরে আবার ছেড়ে দিল। পদ্মজা ছিটকে সরে গেল দূরে।আমির বলল, ‘তুমি সত্যি একটা পদ্ম ফুল, পদ্মবতী। এজন্যই লিখন শাহর মতো সুদর্শন যুবক তোমার প্রেমে পড়েছে।’দেখা হওয়ার পর এই প্রথম পদ্মজা চোখ তুলে তাকাল। পরপরই চোখের দৃষ্টি সরিয়ে ছুটে বাড়ির ভেতর চলে গেল। আমির অনেকক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল।দেখতে দেখতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। এবার আত্মীয় বিদায়ের পালা। যাওয়ার পূর্বে লাবণ্য একটা কাগজ পদ্মজার হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, ‘দাভাই দিছে।’ঘুমাবার আগে পদ্মজা কাঁপা হাতে কাগজটির ভাঁজটি খুলল। কাগজটিতে যত্ন করে লেখা—সারা অঙ্গ কলঙ্কে ঝলসে যাকতুই বন্ধু শুধু আমার থাক।
বাড়ির সব কাজ শেষ করে ক্লান্ত পায়ে হেঁটে ঘরে ঢুকলেন হেমলতা। মোর্শেদ সবেমাত্র শুয়েছেন। হেমলতা বিছানার এক পাশে কাত হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করলেন।মোর্শেদ হেমলতার দিকে ফিরে ধীরকণ্ঠে বললেন, ‘ধানের মিলটা পাইয়া যাইতাছি।’ গলা দুর্বল হলেও খুশিতে চোখ চকচক করছে।হেমলতা মৃদু হেসে বললেন, ‘মাতব্বর কী যৌতুক দিচ্ছেন?’মোর্শেদ হেসে বললেন, ‘সে কইতে পারো। সে আমারে কী কইছে জানো?’‘কী?’‘কইল, শুনো মোর্শেদ…আইচ্ছা আগে হুনো আমি কিন্তু শহুরে ভাষায় কইতে পারুম না। আমি আমার গেরামের ভাষায় কইতাছি।’মোর্শেদের কথা বলার ভঙ্গি দেখে হেমলতা আওয়াজ করে হাসলেন। বললেন, ‘যেভাবে ইচ্ছে বলো।’মোর্শেদ খ্যাক করে গলা পরিষ্কার করে বললেন, ‘কইল, হুনো মোর্শেদ, তোমার এই মোড়ল বাড়ি হইতাছে একটা বিল। যে বিলে একটাই পদ্ম ফুল আছে। এই পদ্ম ফুলডার জন্যই এই বিলটা এত সুন্দর। আর আমি সেই পদ্ম ফুলডারে তুইললা নিয়া যাইতাছি। এই বিলে পদ্ম ফুলডার চেয়ে দামি সুন্দর আর কিছু নাই। তাই আমার আর কিছু লাগব না। বিনিময়ে আমি এই খালি বিলডারে ধানের মিল দিয়ে দিলাম। বুঝলা লতা? মাতব্বর মানুষটা সাক্ষাৎ ফেরেশতা। মন দয়ার সাগর।’হেমলতা ছোটো করে বললেন, ‘হুম।’পরমুহূর্তেই বললেন, ‘একটা প্রশ্ন করার ছিল।’মোর্শেদ ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকান। হেমলতা উঠে বসে বললেন, ‘লিখনকে মনে আছে? সে কি তোমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল?’মোর্শেদ লেশমাত্র অবাক হলেন না। দায়সারাভাবে বললেন, ‘এতদিনে জানলা? আমি মনে করছি কবেই জাইন্যা ফালাইছ।’‘আমি তো আর সবজান্তা নই। আমাকে বলোনি কেন?’‘বইললা কী হইত? ছেড়ি বিয়া দিতা? আর ছেড়াড়া নায়ক। কত ছেড়ির লগে ঘষাঘষি করে। ছেড়িগুলাও নষ্টা। নষ্টাদের সঙ্গে চলে এই ছেড়ায়।’মুখ খারাপ করো না। ছেলেটার মধ্যে আমি তেমন কিছু দেখিনি। তুমি আমাকে জানাতে পারতে। নিশ্চিন্তে ছেলেটা সুপাত্র। বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে, সে মা-বাবা নিয়ে আসলে আমি ফিরিয়ে দিতাম না। থাক…এসব কথা। এখন বলেও লাভ নেই। পদ্মজার মন স্থির আছে। পরিস্থিতি আর ভাগ্য সেখানে নিয়ে যাচ্ছে সেখানেই গা ভাসিয়ে চলুক। ঘুমাও এখন। ভোরে উঠে গোলাপ ভাইয়ের বাড়িতে যেয়ো। কত কাজ বাকি! বাড়ির বড়ো মেয়ের বিয়ে কী সামান্য কথা!হেমলতা কথা বলতে বলতে অন্যদিকে ঘুরে শুয়ে পড়েন, ঘুমিয়েও পড়লেন কিছুক্ষণের মাঝে।.সকাল থেকে পূর্ণার দেখা নেই। তাকে খুঁজতে খুঁজতে ঘাটে চলে গেল পদ্মজা। পূর্ণা সিঁড়িঘাটে বসে উদাস হয়ে কিছু ভাবছে। পদ্মজা পা টিপে হেঁটে এলো। পূর্ণা তখনো বোনের উপস্থিতি টের পায়নি। পদ্মজা পাশে বসে, তাও পূর্ণা টের পেল না। পদ্মজা ধাক্কা দিতেই, পূর্ণা চমকে তাকাল।বুকে ফুঁ দিয়ে বলল, ‘ভয় পেয়েছি আপা।’‘উদাস হয়ে কী ভাবছিস?’‘কিছু না।’‘আবার ওইসব ভাবছিস! কতবার না করলে শুনবি বল তো?’পূর্ণা নতজানু হয়ে রইল। ক্ষণকাল পার হওয়ার পর ভেজা কণ্ঠে বলল, ‘নিজের ইচ্ছায় মনে করে কষ্ট পেতে আমার ইচ্ছে করে না। কিন্তু মনে পড়ে যায়।’‘চেষ্টা তো করবি। আর ভুলতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই 1 অমানুষগুলোও তাদের শাস্তি পেয়েছে। একটু নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টা কর।’পূর্ণা চোখের জল মুছে আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘আম্মা তিনজনকে কী করে মারল আপা? আমাদের আম্মা খুনি?’পূর্ণার মুখ চেপে ধরল পদ্মজা। চারপাশে চোখ বুলিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘আর কখনো এটা বলবি না।’‘কিন্তু আমি জানতে চাই, কী করে আম্মা খুন করল?’‘জানি না।’‘আম্মাকে জিজ্ঞাসা করবে?’পদ্মজা ভাবল। এরপর বলল, ‘করব। তবে আজ না অন্য একদিন।’‘বিয়ে করে তো চলেই যাবে।’পদ্মজা অভিমানী চোখে তাকাল পূর্ণার দিকে। বলল, ‘আর কী আসব না? ফিরে যাত্রা আছে। আবার কয়দিন পর পর এমনিতেও আসব।’‘তাহলে কালাচাঁদের সঙ্গে বিয়েটা সত্যিই হচ্ছে?’‘তুই কী মিথ্যে ভাবছিস?’পূর্ণা বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফেলল। বলল, ‘লিখন ভাইয়ের জন্য কষ্ট হচ্ছে।’লিখন নামটা শুনে পদ্মজা অপ্রতিভ হয়ে উঠল। নিজেকে অপরাধী অপরাধী মনে হচ্ছে। এই অনুভূতির কোনো মানে নেই, সে কোনো অপরাধ করেনি…তবুও ভাবলেই কী যেন হয় ভেতরে!পদ্মজা প্রসঙ্গ পালটাতে বলল, উনাকে…মানে মাতব্বরের ছেলেকে পছন্দ না তাই কালা বলিস, ঠিক আছে বুঝলাম। কিন্তু চাঁদ কেন বলিস বুঝলাম না!’পূর্ণা আড়চোখে পদ্মজার দিকে তাকাল। যান্ত্রিক স্বরে জানাল, ‘পাতিলের তলার মতো কালা হয়ে আমার চাঁদের মতো সুন্দর বোনকে বিয়ে করবে বলেই কালাচাঁদ ডাকি। নয়তো কালা পাতিল ডাকতাম। আবার দরদ দেখিয়ে বলো না, উনি তো এত কালা না, শ্যামলা।’ কথা শেষ করে পূর্ণা ঠোঁট বাঁকাল।পদ্মজা শব্দ করে হাসতে শুরু করল। কিছুতেই তার হাসি থামছে না। পূর্ণা পদ্মজার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘তুমি খুব কঠিন আপা। খুব ধৈর্য তোমার, ঠিক আম্মার মতো।’পদ্মজা হাসি থামিয়ে পূর্ণার দিকে তাকাল। সময়টা শুধু দুই বোনের পদ্মজা স্নেহার্দ্র কণ্ঠে শুধাল, ‘আর তুই ঠিক আম্মার বাহ্যিক রূপের জোড়া পৰ্ব।’প্রান্ত-প্রেমা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে নদীর ঘাটে। পদ্মজার উদ্দেশ্যে বলল, ‘বড়ো আপা, দুলাভাই আসছে।’আমির আসার সংবাদ পেয়েই খিড়কি দিয়ে পদ্মজা নিজের ঘরে চলে গেল। এই লোকটা এত বেহায়া আর নির্লজ্জ! গতকাল নাকি সকাল-বিকাল বাড়ির সামনে ঘুর ঘুর করেছে। আজ একেবারে বাড়িতে! বিয়ের তো আর মাত্র তিন দিন বাকি। এতটুকু সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না?পদ্মজা কপাল চাপড়ে বিড়বিড় করে, ‘এ কার সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে আল্লাহ!’ উঠানে হেমলতা ছিলেন। আমির বাড়ির ভেতর ঢুকেই হেমলতার পা ছুঁয়ে সালাম করল। নতজানু হয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে বলল, ‘কেমন আছেন আম্মা?’হেমলতার চক্ষু চড়কগাছ! আমিরের সঙ্গে মগা এসেছে। মগার হাতে মাছের ব্যাগ, মাথায় ঝুড়ি। তাতে মশলাপাতি সঙ্গে শাকসবজি। বিয়ের আগে এত বাজার আবার আম্মা ডাকা হচ্ছে! অপ্রত্যাশিত ব্যাপার স্যাপার! হেমলতা ঢোক গিলে ব্যাপারটা হজম করে নিলেন। ধীরেসুস্থে বললেন, ‘ভালো আছি। তুমি কেমন আছো? বাড়ির সবাই ভালো আছে?’‘জি, জি। সবাই ভালো।’আমির মগাকে ইশারা করতেই মগা বারান্দায় মাছের ব্যাগ, মাথার ঝুড়ি রেখে দিল।হেমলতা ঠোঁটে হাসি ধরে রেখে বললেন, ‘এতসব বিয়ের আগে আনার কী দরকার ছিল? পাগল ছেলে।’আমির হেসে নতজানু অবস্থায় ইতস্ততভাবে বলল, ‘এমনি।’‘যাও, ঘরে গিয়ে বসো।’‘আম্মা…’হেমলতা চলে যেতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়লেন। আমির দ্রুত বলল, ‘আম্মা, ক্ষমা করবেন। সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরতে হবে।’হেমলতা বুঝতে পারছেন না, ছেলেটা কী চাচ্ছে! তিনি আগ্রহান্বিত হয়ে জানতে চাইলেন, ‘কোনো দরকার ছিল?’‘আ…আসলে আম্মা। পদ্মজার সঙ্গে একটু কথা ছিল।’আমির উসখুস করছে। হাত-পা নাড়াচ্ছে এদিক-ওদিক, কিন্তু চোখ মাটিতে স্থির। হেমলতা আমিরকে ভালো করে পরখ করে নিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা যাও, পদ্মজা ঘরে আছে নয়তো ঘাটে।’অনুমতি পেয়ে ব্যস্ত পায়ে হেঁটে ঘরের দিকে চলে গেল আমির। হেমলতা তার যাওয়ার পানে চেয়ে থেকে ভাবছেন, ‘ছেলেটার সঙ্গে এখনও চোখাচোখি হয়নি। সবসময় মাথা নত করে রাখে। কিন্তু কথাবার্তায় তো মনে হচ্ছে, এই ছেলে মোটেও লাজুক নয়, তিনি কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে রাখলেন। পরে ভাবলেন: হয়তো গুরুজনদের সামনে মাথা নিচু করে রাখা ছোটোবেলার স্বভাব। ভালো অভ্যাস!হেমলতা মুচকি হেসে লাহাড়ি ঘরের দিকে এগিয়ে যান।পদ্মজার ঘরের শেষ প্রান্তে একটি বারান্দা আছে। বারান্দা পেরোলেই বাড়ির পেছনের দরজা। আমির আসছে শুনে ঘর আর বারান্দার মাঝ বরাবর দরজায় পর্দা টানিয়ে দিল পদ্মজা। আমির হন্তদন্ত হয়ে ঘরের দিকে, পর্দার অন্যপাশে দাঁড়াল। পদ্মজা দাঁড়াল বারান্দার দিকে। পর্দার কাপড় পাতলা ও মসৃণ। তাই পদ্মজার অবয়ব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে আমির। তিরতির করে বাতাস বইছে। সেই বাতাসে পদ্মজার কপালে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো অবাধ্য হয়ে উড়ছে।আমির ডাকল, ‘পদ্মজা?’‘হু?’ পদ্মজা লজ্জায় কথা বলতে পারছে না।‘কেমন আছো?’‘ভালো। আপনি?’‘ভালো।’বেশ কিছুক্ষণ নীরবতা। পদ্মজা বলল, ‘কী বলবেন বলুন।’সঙ্গে সঙ্গে আমির বলল, ‘মায়াভরা চোখগুলো দেখার সৌভাগ্য কী হবে?’ আমিরের কণ্ঠে আকুতি! তৃষ্ণা! পদ্মজার পীড়া লাগছে। বেহায়া মানুষ বড়োই বিপজ্জনক। সে পালানোর জন্য পা বাড়াতেই আমির হই হই করে উঠল, কসম লাগে পালাবে না।’পদ্মজা মাথার ওড়না টেনে নিয়ে বলল, ‘প্রয়োজনীয় কথা থাকলে বলে চলে যান।’‘তাড়িয়ে দিচ্ছো?’‘ছি, না।’‘তোমায় না দেখলে আজ আর প্রাণে বাঁচব না। রাতেই ইন্না লিল্লাহ…’‘রসিকতা করবেন না। কাউকে না দেখে কেউ মরে না।’‘পদ্মবতীর রূপ যে পুরুষ একবার দেখেছে সে যদি বার বার না দেখার আগ্রহ দেখায় তাহলে সে কোনো জাতেরই পুরুষ না। একবার দেখা দাও। কসম লাগে…’‘বার বার কসম দিয়ে ঠিক করছেন না।’‘আচ্ছা, কসম আর কসম দেব না। একবার দেখা দাও।’পদ্মজার দুই ঠোঁট হাঁ হয়ে গেল। কী বলে মানুষটা! কসম করেই বলছে আর কসম দিবে না। আমির ধৈর্যহারা হয়ে বলল, ‘পদ্মবতী অনুরোধ রাখো…’‘এভাবে বলবেন না। নিজেকে ছোটো লাগে।’‘পর্দা সরাব?’পদ্মজা ঘামছে। বাতাসে অস্বস্তি, নিশ্বাসে অস্বস্তি। তবুও সায় দিল 1 আমির পর্দা সরিয়ে খুব কাছ থেকে পদ্মজাকে দেখতে পেল। কালো রঙের সালোয়ার কামিজ পরেছে। সিঁথির মাঝ অবধি ঘোমটা টেনে রাখা।পদ্মজা চোখ তুলে তাকাতেই আমির বলল, ‘জীবন ধন্য।’আমিরের কথা বলার ভঙ্গি দেখে পদ্মজা হাসি সামলাতে পারল না। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে হাসল। আমির বলল, ‘এ মুখ প্রতিদিন ভোরে দেখব। আর প্রতিদিনই জীবন ধন্য হবে। এমন কপাল কয়জনের হয়!পদ্মজা কিছু বলল না। আমির আবেগে আপ্লুত হয়ে বলল, আমার ইচ্ছে হচ্ছে তোমার হাতে খুন হয়ে যাই।’পদ্মজা চমকে উঠল। বিস্মিত কণ্ঠে বলল, ‘আপনি পাগল।’আমির কণ্ঠ খাদে নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘তোমার উপস্থিতি আমার নিশ্বাসের তীব্রতা কতটা বাড়িয়ে দিয়েছে টের পাচ্ছো?’পদ্মজা দূরে সরে গেল। মনে মনে বলল, ‘আল্লাহ আমি পাগল হয়ে যাব। এ কার পাল্লায় পড়লাম। জ্ঞানবুদ্ধি, লাজলজ্জা কিছু নেই।’অথচ মুখে বলল, ‘পেয়েছি। এবার আসি।আমিরকে কিছু বলতে না দিয়ে পদ্মজা বারান্দা ছাড়ল।বাড়ির পেছনে মগাকে পেয়ে তার পথ আটকে বলল, ‘মগা ভাই।’মগা সবগুলো দাঁত বের করে হাসল। বলল, ‘জে, ভাবিজান।’মগার মুখে ভাবি ডাক শুনে পদ্মজা বিরক্ত হলেও প্রকাশ করল না। বিরক্তি লুকিয়ে বলল, ‘লিখন শাহর কথা আপনি উনাকে বলেছেন?’‘উনিটা কে?’‘আপনার আমির ভাই।‘জে, ভাবিজান।’মগার অকপট স্বীকারোক্তি! পদ্মজা এ নিয়ে আর কথা বাড়াল না। মগাকে পাশ কেটে চলে গেল। মগা দৌড়ে এসে পদ্মজার পথ রোধ করে দাঁড়ায়, ফিসফিসিয়ে গোপন তথ্য দিল: আগামী দুই দিনের মধ্যে লিখন শাহ আসছে। তার বাবা-মাকে নিয়ে। খবরটা মগা গত সপ্তাহ পেয়েছে।সংবাদটি পেয়ে পদ্মজার পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল। ঢোক গিলে নিজেকে আশ্বস্ত করল: আমি তো কথা দেইনি বিয়ে করার। কখনো চিঠিও দিইনি। লিখন শাহ নিরাশ হলে এটা তার দোষ নয়, লিখন শাহর ভাগ্য। তবুও পদ্মজার খারাপ লাগছে। অপরাধী মনে হচ্ছে নিজেকে।জীবনে আবার কি নতুন কিছু ঘটতে চলেছে? বুক ধড়ফড় করছে।ঘাটের সিঁড়িতে ঝিম মেরে বসে রইল পদ্মজা।
মোড়ল বাড়ির আনাচে-কানাচে আত্মীয়স্বজনদের উচ্চরব। পদ্মজা বিছানার এক কোণে চুপটি করে বসে আছে। ঘরে দুষ্টু রমণী আছে কয়েকজন নিজেদের মধ্যে রসিকতা করছে, উচ্চস্বরে হাসছে। অথচ এরাই বিপদের সময় পাশে ছিল না। ভীষণ গরম পড়েছে। পদ্মজার পরনে সুতার কাজ করা সুতি শাড়ি। গরমে শুধু ঘামছে না, বমিও পাচ্ছে। প্রেমা পদ্মজার পাশে বসে ছিল।প্রেমাকে ফিসফিসিয়ে বলল পদ্মজা, ‘এই বনু? আম্মাকে গিয়ে বলবি লেবুর শরবত দিতে?’প্রেমা মাথা নাড়িয়ে চলে গেল শরবত আনতে। হেমলতা রান্নাঘরে ছিলেন। প্রেমা লেবুর শরবতের কথা বললে তিনি বললেন, ‘তুই যা আমি নিয়ে যাচ্ছি।’লেবু গাছ থেকে সবেমাত্র ছিঁড়ে আনা পাকা লেবুর শরবত বানিয়ে পদ্মজার ঘরের দিকে গেলেন তিনি। গিয়ে দেখেন, পদ্মজা বিছানার এক পাশে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। ছটফট করছে।ঘরভরতি অনেক মানুষ। তিনি সবার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘সবাই অন্য ঘরে যাও। পদ্মজাকে একা ছাড়ো।’হেমলতার এমন আদেশে অনেকের রাগ হলেও চুপচাপ বেরিয়ে গেল। তিনি দরজা বন্ধ করে শরবতের গ্লাস পদ্মজার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘সবসময় মুখ বন্ধ রাখা ভালো না। যারা বিপদে পাশে থাকে না, তাদের জন্য বিন্দুমাত্র অসুবিধার মুখোমুখি হবি না। গরমে তো শেষ হয়ে যাচ্ছিস। জানালার পাশটাও অন্যরা ভরাট করে রেখেছিল। ভালো করেই সরতে বলতি।’পদ্মজা মায়ের কথার জবাব না দিয়ে এক নিশ্বাসে লেবুর শরবত শেষ করল। এবার একটু আরাম লাগছে। আলনার কাপড়গুলো অগোছালো। সকালেই তো ঠিক ছিল। নিশ্চয় মেয়েগুলোর কাজ। হেমলতা আলনার কাপড় ঠিক করতে করতে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী নিয়ে এত চিন্তা করছিস?’পদ্মজা কিছু না বলে বিছানায় আঙুল দিয়ে আঁকিবুকি করতে থাকল। পদ্মজার অস্বাভাবিকতা দেখে হেমলতা চিন্তায় পড়ে যান, ‘বলবি তো?’ পদ্মজা বিচলিত হয়ে বলল, ‘আম্মা উনি বোধহয় আজ আসবেন।’‘উনি? উনি কে? আমির?’না আম্মা। লিখন শাহ যে, উনি।’হেমলতা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘কপালে যা আছে তাই তো হবে। ভাবিস না। আমি আছি, সব সামলে নেব। লিখনকে আমি বুঝাব।’হেমলতার কথা শেষ হতেই পদ্মজা ভেজা কণ্ঠে বলল, উনি খুব কষ্ট পাবেন আম্মা।’হেমলতা অবাক হয়ে তাকালেন পদ্মজার দিকে। পদ্মজা এত ব্যাকুল কেন হচ্ছে? তিনি কী পদ্মজার অনুভূতি চিনতে ভুল করেছেন? নাকি শুধুমাত্র কারো মন ভাঙবে ভেবে পদ্মজার এত ব্যাকুলতা? হেমলতা দোটানায় পড়ে গেলেন। পদ্মজার জীবনে এ কেমন টানাপোড়নের আবির্ভাব হলো! এই মুহূর্তে পদ্মজাকে বুঝতে তিনি হিমশিম খাচ্ছেন। ওদিকে হানি ডাকছে। হেমলতার বড়ো বোন হানি, গতকাল ঢাকা থেকে ছেলেমেয়ে নিয়ে গ্রামে এসেছে। হেমলতা দরজার দিকে পা বাড়ানোর আগে বলে গেলেন, আমার নোংরা অতীত আজ তোকে শুনাব। বাকি সিদ্ধান্ত তোর। যা চাইবি তাই হবে। মনে রাখিস, যা চাইবি তাই পাবি।’পদ্মজা কিছু বলার পূর্বেই হেমলতা চলে গেলেন। পদ্মজার বুকের ভেতর অপ্রতিরোধ্য তুফান শুরু হয়। মায়ের অতীত জানার জন্য কত অপেক্ষা করেছে সে। আজ যখন সেই সুযোগ এলো…তার ভয় হচ্ছে খুব। কেন হচ্ছে জানে না; কিন্তু হচ্ছে। হাত-পায়ের রগে রগে শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে যাচ্ছে।.ভ্যানগাড়িতে চড়ে অলন্দপুরের আটপাড়ায় ঢুকল লিখন শাহ। সঙ্গে বাবা-মা এবং বোন। বাবা শব্দর আলী, মা ফাতিমা বেগম এবং বোন লিলি।শব্দর আলী চশমার গ্লাস দিয়ে গ্রামের খেত দেখছেন আর বার বার বলছেন, ‘এই তো আমার দেশ। এই তো আমার বাংলাদেশ।’ফাতিমা ভীষণ বিরক্ত ভ্যানে চড়ে। উনার ইচ্ছে ছিল কোনো মন্ত্রীর মেয়েকে ঘরের বউ করে আনবেন। অথচ পুত্রের নাকি পাত্রী পছন্দ হয়েছে গ্রামে। লিখনের জেদের কাছে হেরে গ্রামে আসতেই হলো।লিখনের পরনে ছাইরঙা শার্ট। চোখে সানগ্লাস। উত্তেজনায় রীতিমতো তার হাত-পা কাঁপছে। এমন একটা দিন নেই, যেদিন পদ্মজার কথা ভেবে শুরু হয়নি। এমন একটা রাত নেই, যে রাতে পদ্মজাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা হয়নি। সময়ের ব্যবধানে পদ্মজাকে খুব বেশি ভালোবেসে ফেলেছে সে। প্রায়ই স্বপ্নে দেখে, পদ্মজা গৃহবধূর মতো তার ঘরে কোমরে আঁচল গুঁজে কাজ করছে।কখনো বা অপরূপ সুন্দরী পদ্মজাকে ঘুমের ঘোরে ঠিক বিছানার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। কল্পনার পদ্মজাকে নিয়ে সে সংসার পেতেছে। এবার হয়তো সত্যিই সেই সংসার হতে চলেছে। লিখন আনমনে হেসে উঠল। মনেপড়ে যায় পদ্মজাকে প্রথম দেখার কথা। সঙ্গে সঙ্গে বুকের মধ্যে অদ্ভুত ঝড় শুরু হয়। কী মায়াবী, কী স্নিগ্ধ একটা মুখ! তার চেয়েও সুন্দর পদ্মজার ভয় পাওয়া, লজ্জায় পালানোর চেষ্টা করা, পরপুরুষের ভয়ে আতঙ্কে থাকা। লিখন আওয়াজ করে হেসে উঠল। ফাতিমা আর শব্দর অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকালেন। লিলির এসবে খেয়াল নেই। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে। লিখন মা-বাবাকে এভাবে থাকাতে দেখে খুক খুক করে কাশল। বলল, ‘সুন্দর না গ্রামটা? বুঝছো আব্বু, এই গ্রামটা এত সুন্দর যে আগামী বছর আবার আরেকটা সিনেমার জন্য এখানে আসতে হবে।’শব্দর আলী প্রবল আনন্দের সঙ্গে বললেন, ‘সে ঠিক বলেছিস। মন জুড়িয়ে যাচ্ছে দেখে। চারিদিকে গাছপালা-নদী, পথঘাটও খুব সুন্দর, সাজানো। এখানে একটা বাড়ি বানালে কেমন হয়?’লিখন গোপনে দীর্ঘশ্বাস লুকাল। তার বাবা যখন যেখানে যান, তখন সেখানেই বাড়ি বানানোর স্বপ্ন দেখেন। কখনোই বানানো হয় না। ফাতিমা বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তা আমরা উঠছি কার বাড়ি? তোর পছন্দ করা মেয়ের বাড়ি নাকি অন্য কোথাও?’মায়ের চোখেমুখে বিরক্তি দেখে লিখনের হাসি পেল। বলল, ‘তোমাকে রাগলে এত ভালো লাগে আম্মু।’ফাতিমা আড়চোখে ছেলের দিকে তাকান। প্রশংসা শুনতে তিনি বেশ পছন্দ করেন। লিখনের মুখে প্রশংসা শুনে একটু নিভলেন, ‘হয়েছে, আর কতক্ষণ?’‘পাঁচ মিনিট। অলন্দপুরের মাতব্বর বড়ো মনের মানুষ। আমাকে নিজের সন্তানের দৃষ্টিতে দেখেন। যতদিন ছিলাম প্রতিদিন খোঁজ নিয়েছেন। নিজের একজন লোককে আমার সহায়ক হিসেবেও দিয়েছিলেন! উনার বাড়িতেই উঠব।’লিলি চোখ-মুখ বিকৃত করে বলল, ‘অন্যের বাড়িতে উঠব! উফ।’‘মারব ধরে। অন্যের বাড়ি তোর কাছে, আমার কাছে না। মজিদ চাচার বউ ফরিনা চাচি এত ভালো রাঁধেন! আমাকে নিজের হাতে বেশ কয়েকবার খাইয়ে দিয়েছেন। উনার একটাই ছেলে। ঢাকায় ব্যাবসা সামলাচ্ছে। তার সঙ্গে অবশ্য সাক্ষাৎ হয়নি। কিন্তু ফরিনা চাচি সারাক্ষণ ছেলে-ছেলে করতেন। আমাকে পেয়ে ছেলের সব ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছিলেন। তাই ওই বাড়ি আমার কাছে আপন না লাগুক, পরও লাগে না। আর বিশাল বাড়ি। উনারা বিব্রত হবেন না। তিন-চার দিনেরই তো ব্যাপার।’লিখনের এত বড়ো বক্তব্যের পার লিলি আর কিছু বলার মতো পেল না।হাওলাদার বাড়ির সামনে এসে ভ্যান থামল। বাড়ির চারপাশ সাজানো দেখে বেশ অবাক হলো লিখন। লিলি চারপাশ দেখতে দেখতে বলল, ‘দাদাভাই, তুমি যে বিয়ে করতে এসেছো—এই খবর উনারা বোধহয় পেয়েছেন। তাই আগে থেকেই এত আয়োজন।’লিখন লিলির মাথায় গাঁট্টা মেরে বলল, ‘বাড়িতে দুটো মেয়ে আছে। তাদের কারো বিয়ে হবে হয়তো। চল।’ইটের বড়ো প্রাচীর চারদিকে। মাঝে বড়ো গেট। প্রাচীরের উচ্চতা ১৫ ফুট, আর গেটের বারো। পাশেই দুজন দাঁড়িয়ে ছিল, তারা লিখনকে চিনে। তাই বাড়ির ভেতর ঢুকতে দিল।গেট পার হলেই খোলা জায়গা, প্রচুর গাছপালা। বেশ অনেকগুলো সুপারি গাছ এবং তালগাছ। সবকিছু সুন্দর! দুই মিনিট হাঁটার পর রং করা টিনের একটা বড়ো ঘর। তার সামনে সিঁড়ি। সিঁড়ির দুই পাশে সিমেন্টের তৈরি বসার বেঞ্চি। এই ঘরটাকে গ্রামে আলগ ঘর বলা হয়, কেউ কেউ আলগা ঘর বলে থাকে। অতিথিরা এসে বিশ্রাম নেয়, রাত্রিযাপন করে। ভেতরে ইট সিমেন্টের তৈরি দুতালা অন্দরমহল। আলগ ঘরের বারান্দায় বসে ছিলেন মজিদ মাতব্বর, ফরিনা ও রিদওয়ান। লিখনকে দূর থেকে দেখতে পেয়ে উনারা অবাক হোন, সেই সঙ্গে খুশিও। শহরের চারজন মানুষ হেঁটে আসছে। সর্বাঙ্গে আধুনিকতার ছোঁয়া। দেখতেও ভালো লাগে। লিখন বারান্দায় পা রাখতেই মজিদ মাতব্বর হেসে বললেন, ‘আজকের দিনটা সত্যি খুব সুন্দর।’লিখন হেসে ফরিনা এবং মজিদ মাতব্বরকে সালাম করে বলল, ‘এই হচ্ছেন আমার বাবা-মা আর বোন। আর আম্মু-আব্বু…উনি হচ্ছেন মজিদ চাচা। আর ইনি ফরিনা চাচি। আর ওই যে বড়ো বড়ো গোঁফদাড়ি, উনি হচ্ছেন রিদওয়ান ভাইয়া। এই বাড়িরই আরেক ছেলে।’মজিদ মাতব্বর একজনকে ডেকে বললেন চেয়ার দিয়ে যেতে আর অন্দরমহলে খবর পাঠাতে মেহমান এসেছে। তাৎক্ষণিক চেয়ার ও ঠান্ডা শরবত চলে এলো। পরিচিয় পর্ব শেষ হতেই লিখন প্রশ্ন করল, ‘বাড়িতে কোনো অনুষ্ঠান চলছে নাকি?’‘সে চলছে। আমার ছেলেটার বিয়ে। একমাত্র ছেলে।’লিখন হাসল। চোখ পড়ে আলগ ঘরের ডান পাশে। কয়েকটা মেয়ে উঁকি দিয়ে তাকে দেখছে। লিখন আনমনে হেসে উঠল। কোনো মেয়ে যখন তাকে দেখে খুব তৃপ্তিদায়ক অনুভূতি হয়। নায়ক কী এমনি এমনি হওয়া! শব্দর আলী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাই নাকি? তাহলে তো ঠিক সময়েই এসেছি। আমরাও আমাদের একমাত্র ছেলের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এই গ্রামে এসেছি।’মজিদ মাতব্বর আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলেন, ‘মেয়ে কে? কার মেয়ে? আমাকে বলুন। এখনি বিয়ে করতে চাইলে এখনি হবে।’শব্দর আলী লিখনকে প্রশ্ন করলেন, ‘মেয়ের পরিচয় বল।’লিখন কথা বলার পূর্বেই ফরিনা গেটের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, ‘এই তো আমার ছেড়ায় আইয়া পড়ছে। আমির এইহানে আয়। দেইখা যা কারা আইছে।’ফরিনার দৃষ্টি অনুসরণ করে সবাই পেছনে তাকাল। আমির চুল ঠিক করতে করতে এগিয়ে আসছে। হাঁটার গতিতে বোঝা যাচ্ছে, বেশ চঞ্চল একটা ছেলে। আমির ঘেমে একাকার। কয়েক ফুটের দূরত্ব থাকা অবস্থায় লিখনকে দেখেই সে চিনে ফেলল। মগার কাছে লিখনের বর্ণনা শুনেছে। এছাড়া লিখন একজন নামকরা অভিনেতা। তার অভিনীত ছায়াছবি সে দেখেছে। হাঁটার গতি কমিয়ে দিল আমির। কাছে এলে লিখন উঠে দাঁড়াল। হেসে আমিরের সঙ্গে করমর্দন করে বলল, ‘আমি লিখন শাহ।’আমির বলল, ‘আমির হাওলাদার। বসুন আপনি।’লিখন পূর্বের চেয়ারে বসে। আমির তার থেকে একটু দূরত্ব রেখে দূরে বসল। মজিদ মাতব্বর আমিরকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘কোথায় থাকিস সারাদিন? বলেছিলাম না, লিখন শাহ এসেছিল? এই যে ইনি।’আমির শুষ্কমুখে বলল, ‘চিনি আমি। উনার অনেক কাজ আমার দেখা।’শব্দর আলী, ফাতিমা, লিলি, লিখন সবাই একসঙ্গে মৃদু হাসল। কেউ চেনে বললে আনন্দ হবারই কথা। রিদওয়ান আমিরকে বলল, ‘লিখনও বিয়ে করতে এসেছে।’আমির কিছু বলল না। ফরিনা জানতে চাইলেন, ‘পাত্রী কে? কইলা না তো?’লিখন বুক ভরা ভালোবাসা নিয়ে বলল, ‘পদ্মজা। মোড়ল বাড়ির বড়ো মেয়ে।’লিখনের কথা শুনে মুহূর্তে হাওলাদার বাড়ির সব মানুষের মুখ কালো হয়ে গেল। থেমে গেল আলগ ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলির কোলাহল; চারিদিক স্তব্ধ, শান্ত। লিখন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। কী হলো সবার! লিখন মা-বাবার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় করল। মজিদ মাতব্বর শান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, ‘তার সঙ্গে তোমার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল?’মজিদ মাতব্বরের কথা বলার ধরন পালটে যাওয়াতে লিখন আহত হয়, ‘না। আজ প্রস্তাব নিয়ে যাব।’মজিদ দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, ‘পরশু আমির-পদ্মজার বিয়ে।’লিখন চকিতে চোখ তুলে তাকাল। বুক পোড়ার মতো অসহনীয় যন্ত্রণা কামড়ে ধরে তার সর্বাঙ্গে। হাড়ে হাড়ে বরফের ন্যায় ঠান্ডা কিছু ছুটতে শুরু করে দিয়েছে……যেন এখুনি সব রগ ছিঁড়ে রক্ত বেরিয়ে আসবে।
ফাতিমা কাতর চোখে লিখনের দিকে তাকালেন। চোখে চোখ পড়তেই লিখন হাসার চেষ্টা করল। তার দৃষ্টি এলোমেলো। কী বলবে খুঁজে পাচ্ছে না। আমির চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ‘আব্বা আসছি,’ বলে জায়গা ত্যাগ করল। শব্দর আলী হতভম্ব হয়ে গেছেন।তিনি মজিদ মাতব্বরকে প্রশ্ন করলেন, ‘মজা করছেন?’মজিদ মাতব্বর শব্দর আলীর চোখে চোখ রেখে জবাব দিলেন, ‘প্রথম পরিচয়ে মজা করার মতো মানুষ আমি না ভাইসাহেব।’লিলি এক হাত লিখনের পিঠের ওপর রেখে ডাকল, ‘ভাইয়া।লিখন লিলির হাতটা মুঠোয় নিয়ে ঢোক গিলল। বলল, ‘বিয়ে হবে না তো কী? বলেছি যখন দেখাবোই।’‘ভাইয়া তোর চোখে জল,’ লিলির গলা ভেঙে আসছে।লিখন দ্রুত হাতের উলটোপাশ দিয়ে চোখের জল মুছল। পরিবেশ থম মেরে গেছে। কেউ কিছু বলার মতো খুঁজে পাচ্ছে না। লিলি অবাক চোখে তাকিয়ে আছে তার ভাইয়ের দিকে। পদ্মজা নামের মেয়েটাকে নিয়ে কত গল্প শুনেছে সে। মেয়েটা তার বয়সি শুনে লিলি খুব হেসেছিল। তার ভাইয়া এত ছোটো মেয়ের প্রেমে পড়েছে! দিনগুলো কত যে সুন্দর ছিল! মেট্রিক পরীক্ষার সময় বার বার খোঁজ নিয়েছে কবে শেষ হবে পরীক্ষা। যেদিন শেষ হলো সেদিন থেকেই শুটিং শুরু হলো। কথা ছিল এক সপ্তাহ পর থেকে শুরু হবে। কিছু জরুরি কারণে আগে শুরু হয়ে গেল। তাই আসতে কয়েকদিন দেরি হয়েছে।মজিদ মাতব্বর স্তব্ধতা কাটিয়ে বললেন, ‘বিয়েটা একটা দুর্ঘটনার জন্য খুব দ্রুত ঠিক হয়েছে।’লিখন উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কী দুর্ঘটনা?’ফরিনা সন্দিহান গলায় বললেন, ‘তার আগে তুমি কও তো, পদ্মজার লগে কী তোমার প্রেম-ট্ৰেম আছিল?’লিখন ফরিনার প্রশ্নে বিব্রতবোধ করল। ধীরকণ্ঠে জবাব দিল, ‘না। শুধু আমার পক্ষ থেকেই।’লিখনের উত্তরে ফরিনা সন্তুষ্ট হলেন। শব্দর আলী কী দুর্ঘটনা ঘটেছিল জানতে চাইলেন। মজিদ মাতব্বর সময় নিয়ে ধীরে ধীরে সব বললেন। সব শুনে লিখন আশার আলো দেখতে পায়। ভাবে, এরকম একটা ঘটনা ঘটেছে বলে অন্য কেউ বিয়ে করবে না—এমনটা ভেবেই হয়তো পদ্মজার বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সে যদি এখনি পদ্মজাকে বিয়ে করতে রাজি থাকে, তাহলে তাকে ফিরিয়ে না-ও দেওয়া হতে পারে। আর পদ্মজা কী বিন্দুমাত্র ভালোবাসে না তাকে? বাসে, নিশ্চয় বাসে। লিখন নিজেকে নিজে সান্ত্বনা দেয়।শব্দর আলী আফসোস নিয়ে বললেন, ‘কী আর করার! পরিস্থিতি এখন হাতের বাইরে।’‘আপনারা কিন্তু বিয়ে শেষ করে তবেই যাবেন,’ বললেন মজিদ মাতব্বর।ফাতিমা মতামত জানালেন দৃঢ়ভাবে, ‘না, না আজই চলে যাব। এই গ্রামে আর এক মুহূর্ত না। ‘শব্দর আলী মৃদু করে ধমকালেন, ‘কী বলছ? কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যা। এখন ট্রেন পাবে কোথায়? কাল ভোরে নাহয় চলে যাব।’রিদওয়ান অনুরোধ করে বলল, ‘বিয়েটা শেষ হওয়া অবধি থেকে যান। দেখুন, মেহমান হয়ে এসেই অপ্রত্যাশিত খবর শুনলেন। এজন্য খারাপ লাগছে। কিন্তু কিছু তো করার নেই। মেয়েটা জলে ভাসবে বিয়েটা না হলে।লিখন সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলল, ‘পদ্মজাকে ফেলনা ভাবছেন কেন? কেউ অপবাদ দিলেই কী সে পঁচে যায়?’রিদওয়ান কিছু বলতে গেলে মজিদ মাতব্বর কড়া চোখে তাকিয়ে থামতে ইশারা করেন। কাজের মেয়েকে ডেকে বললেন, ‘উনাদের ঘরে নিয়ে যাও। আর আপনারা না করবেন না। আমি আপনাদের অবস্থা বুঝতে পারছি। বিয়ে অবধি না থাকুন, রাতটা থেকে যান।’বাধ্য হয়ে ফাতিমা থাকতে রাজি হলেন। তিনি রাগে ফোঁসফোঁস করছেন। সব রাগ হাওলাদার বাড়ির ওপর। মনে মনে এই বাড়ির বিনাশ চাইছেন তিনি। মেয়েটাকে তুলে নিয়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। লিখন তার চোখের মণি। নয়তো কী গ্রামের মেয়ে নিতে আসতেন! আর সেই ছেলের মন এভাবে ভাঙল! ঘরে ঢুকেই বিছানায় চোখের চশমা ছুঁড়ে ফেলেন। কটমট করে শব্দর আলীকে বললেন, ‘তোমার না এক বন্ধু আছে মেজর? তাকে কল করে বলো মেয়েটাকে তুলে এনে লিখনের সঙ্গে বিয়ে দিতে। আমার ছেলেকে হারতে দেখতে পারব না।’‘আহ! চুপ করো তো। সব জায়গায় ক্ষমতা চলে না। পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করো।‘কীসের পরিস্থিতি? তুমি জানো, তোমার ছেলের ব্যক্তিগত ডায়রিতে আগে শুধু আমার নাম ছিল। সেখানে এখন বেশি পদ্মজা নামটা লেখা। কতটা পাগল এই মেয়ের জন্য। এখন মেয়েটাকে ছেড়ে শহরে চলে গেলে,চলে গেলে, ছেলের দেবদাস রূপ দেখতে হবে। আর আমি তা পারব না।’শব্দর আলী পায়ের মোজা খুলতে খুলতে অসন্তুষ্টি নিয়ে বললেন, ‘তোমার যা ইচ্ছে করো। আমি পারব না। ক্লান্ত আমি। শান্তি দাও।’ফাতিমা কড়া কিছু কথা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। লিলি ঘরে ঢুকেছে। লিখন আসেনি। আমেনা লিলিকে বললেন, ‘লিখন কোথায়?’‘কী জানি! ভাইয়া ব্যাগটা আমার হাতে দিয়ে বেরিয়ে গেল।’.রোদের কঠিন রূপ শীতল হয়ে এসেছে। মৃদু বাতাস বইছে। তবুও লিখন ঘামছে। পদ্মজার বাড়ির দিকে যাচ্ছে সে। আতঙ্কে তার ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ। মাথায় শুধু কয়টা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, ‘আমি কী পাগলামি করছি? এত আয়োজন ভেঙে ওর বাবা-মা কী আমার হাতে তুলে দিবে পদ্মজাকে? পদ্মজা আমাকে দেখলে কী কাঁদবে? ও কী আমাকে একটুও ভালোবাসেনি? মায়া নিশ্চয় জমেছে?’লিখন আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে আল্লাহর কাছে অনুরোধ করে, ‘আল্লাহ, সব যেন ভালো হয়পূর্ণা বারান্দায় চেয়ার নিয়ে বসে আছে। বয়স্ক কিছু মহিলা বাড়ির পেছনে গীত গাইছে। সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচছে দুই বুড়িসহ ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা। পুরো বাড়ি সাজানো হচ্ছে রঙিন কাগজ দিয়ে। উঠানের এক কোণে একটি লাল বড়ো গরু বাঁধা, বিয়ে উপলক্ষে জবাই করা হবে। চারিদিকের এত আনন্দ পূর্ণার মন ছুঁতে পারছে না। প্রথমত, সে স মানসিকভাবে বিপর্যস্ত! কিছুতেই স্থির হতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, পদ্মজার জন্য লিখন শাহ ছাড়া অন্য কাউকে তার পছন্দ হচ্ছে না। সব মিলিয়ে সে উদাসীন। চোখ ছোটো করে বাচ্চাদের খেলা দেখছে। হুট করে চোখের তারায় ভেসে উঠে লিখন শাহ। পূর্ণা দ্রুত চোখ কচলে আবার তাকাল। সত্যি তাই! খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়ল সে, হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল পদ্মজার ঘরে। পদ্মজার কানে কানে গিয়ে বলল, ‘লিখন ভাই এসেছে। তুমি কিন্তু পালিয়ে যাবে আপা। এই বিয়ে কিছুতেই করবে না।’কথা শেষ করে খুশিতে আবার ছুটে গেল বারান্দায়। এমন দিনে লিখনের উপস্থিতি পদ্মজাকে অপ্রস্তুত করে তুলল। গলা শুকিয়ে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম।লিখন বাড়িতে ঢুকে হয়ে সব দেখে। কত আয়োজন! কত মানুষ! তার স্বপ্নের রানি পদ্মজার বিয়ে। কিন্তু তার সঙ্গে না! ভাবতেই লিখনের বুক ছ্যাঁত করে উঠল। মেয়েরা খুব আগ্রহ নিয়ে সুদর্শন লিখনকে দেখছে। লিখন পূর্ণাকে বারান্দায় দেখে এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল, ‘কেমন আছো-পূর্ণা?’পূর্ণা খুশিতে উচ্চকণ্ঠে জবাব দেয়, ভালো, খুব ভালো। ভাইয়া আপনি…’পূর্ণা থেমে গেল। অনেকে তার উচ্চ গলার স্বর শুনে তাকিয়ে আছে, তাই চুপসে গেল। আস্তে আস্তে বলল, ‘এত দেরিতে আসলেন কেন? আপার তো বিয়ে। আপনি আপাকে নিয়ে পালিয়ে যান।’পূর্ণার এমন কথায় লিখন হাসল। আদুরে কণ্ঠে জানতে চাইল, ‘আন্টি কোথায়?’পূর্ণা ঝটপট করে বলল, ‘আপনি আসুন ঘরে। আমি আম্মাকে নিয়ে আসছি।’লিখনকে সদর ঘরে বসিয়ে পূর্ণা ছুটে গেল রান্নাঘরে। হেমলতা রান্না করছিলেন। পাশে অনেকে আছে। পূর্ণা ইশারায় বাইরে আসতে বললে, হেমলতা তাই করলেন। পূর্ণা ফিসফিসিয়ে জানাল, ‘লিখন ভাই এসেছে।’‘কোথায়? বসতে দিয়েছিস?’‘হ্যাঁ, দিয়েছি। তুমি আসো।’হেমলতা ব্যস্ত পায়ে হেঁটে সদর ঘরে যান। এসে দেখেন দুজন বয়স্ক মহিলা অনবরত লিখনকে প্রশ্ন করে যাচ্ছে: সে কোত্থেকে এসেছে? এই বাড়ির কী হয়? পদ্মজার মতো চোখ কেন? পদ্মজার আসল বাপের ছেলে নাকি। এমন আরো যুক্তিহীন কথাবার্তা। হেমলতা সবাইকে উপেক্ষা করে লিখনকে বললেন, ‘লিখন, তুমি আমার ঘরে এসো।’লিখন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। হেমলতার পিছু পিছু চলে গেল, তা অনেকের নজরেই পড়ল। একজন আরেকজনের সঙ্গে আলোচনা করতে থাকল লিখন শাহকে নিয়ে। সবাই ভেবে নিয়েছে—পদ্মজা যার সন্তান, এই ছেলেও তার সন্তান। এজন্যই সবার মাঝ থেকে তুলে নিয়েছে হেমলতা, নয়তো কথায় কথায় ধরা পড়ে যাবে।লিখনকে মোড়ায় বসতে দিলেন হেমলতা। লিখন কীভাবে কী শুরু করবে বুঝে উঠতে পারছে না। হেমলতা শুরু করলেন, ‘আমি জানি তুমি কী বলবে। তোমার দুটো চিঠি আমি পড়েছি।’লিখন লজ্জা পেল। তবে স্বাভাবিক হয়ে গেল পরক্ষণেই। হেমলতা বললেন, ‘দেখো লিখন পরিস্থিতি আর হাতে নেই। অন্য সময় হলে আমি পদ্মজাকে তোমার হাতে তুলে দিতাম। তুমি নম্র-ভদ্র বুদ্ধিমান ছেলে। কমতি নেই কিছুতেই। কিন্তু এখন তা সম্ভব নয়। তবুও পদ্মজা তোমাকে নিজের মুখে যদি চায়, আমি তাৎক্ষণিক তাকে তোমার হাতে তুলে দেব। কিন্তু সে চাইবে না। কারণ, সে তোমাকে ভালোবাসে না। আমার কথাগুলো শুনে কষ্ট পেয়ো না। আমি সরাসরি কথা বলি। পদ্মজার দৃষ্টি, অনুভূতি আমার চেনা। সে তোমাকে ভালোবাসেনি কখনো। শুধু তোমার মন ভাঙবে ভেবে মায়া হচ্ছে, কষ্ট পাচ্ছে। তুমি বাড়ি ফিরে যাও। কষ্ট হবে ভেবেই বলছি, ফিরে যাও।’লিখন কয়েক সেকেন্ড চুপ রইল। তার চোখের দৃষ্টি রাখা মাটিতে। তারপর বলল, ‘আন্টি মেয়ের ভালোবাসা দেখছেন, অন্যের সন্তানেরটা দেখবেন না?’‘অন্যের অনেক সন্তানই আমার মেয়েকে ভালোবাসে। সবার কথা ভাবা কী সম্ভব?’হেমলতার কথায় ভীষণ আহত হয় লিখন। তার মনে হচ্ছে সে কঠিন পাথরের সঙ্গে কথা বলছে। দুই চোখ জ্বলছে ভীষণ। এখনি কান্নারা ঠেলেঠুলে বেরিয়ে আসবে। ছেলে হয়ে কাঁদা ভীষণ লজ্জার ব্যাপার। লিখন নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। হেমলতা কঠিন স্বরে বললেন, ‘তুমি পদ্মজার রূপের প্রেমে পড়েছো।’লিখন সঙ্গে সঙ্গে চোখ তুলে তাকাল। বলল, ‘আন্টি ক্ষমা করবেন কিছু কথা বলি। পৃথিবীতে যে কয়টা সফল প্রেমের গল্প আছে তার মধ্যে নিরানব্বই ভাগ সৌন্দর্যের টানেই শুরু হয়। এরপর আস্তে আস্তে ভালোবাসা গভীর হয়। মানুষটাকে নিয়ে ভাবতে গিয়ে, স্বপ্ন দেখতে গিয়ে ভালোবাসাটা আকাশ ছুঁয়ে ফেলে। সময়ের ব্যবধানে সে মানুষটা শিরা-উপশিরায় বিরাজ করতে শুরু করে। তখন তার অন্যান্য গুণ চোখে ভাসে। ভালোবাসা আরো বাড়ে। কারো কারো তো দোষও ভালো লেগে যায়। অবস্থা এরকম হয় যে, রূপ নষ্ট হয়ে গেলেও মানুষটাকে আমার চাই। এজন্যই বুড়ো বয়সেও কুঁচকে যাওয়া মানুষটাকেও ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। অথচ শুরুটা হয় সৌন্দর্য দিয়ে। আন্টি, আমি পদ্মজার রূপে মুগ্ধ হয়ে ছিলাম এটা সত্যি। কিন্তু গত কয়েক মাসে সারাক্ষণ পদ্মজাকে ভাবতে গিয়ে আমি সত্যি সত্যি পদ্মজাকে ভালোবেসে ফেলেছি। পদ্মজার রূপ আগুনে ঝলসে গেলেও এমন করেই বাসব। প্লিজ আন্টি, কথাগুলো শুটিংয়ের ডায়লগ ভেবে উড়িয়ে দিবেন না। বাস্তব জীবনে মুখস্থ ডায়লগ আমি আওড়াই না।’লিখনের কণ্ঠ গম্ভীর, অথচ চোখে জল ছলছল করছে। হেমলতা স্তব্ধ হয়ে যান। এখন কী জবাব দিবেন? ভালোবাসার বিরুদ্ধে কোন শক্তি কাজে আসে? আদৌ কি ভালোবাসার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা যায়? তিনি সময় নিয়ে বললেন, ‘আমার পদ্মজা তোমার কাছে খুব ভালো থাকত লিখন। কিন্তু সমাজের কিছু সীমা আছে, যার মুখোমুখি আমি হয়েছি। জেনেশুনে আমার মেয়েকে সেসবের মুখোমুখি কী করে হতে দেই?’লিখন হাতজোড় করে বলল, ‘প্লিজ আন্টি! ‘হেমলতা একদৃষ্টে লিখনের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। এমন তো কখনো হয় না। পদ্মজার জন্মের পর সিদ্ধান্তহীনতায় কখনো ভোগেননি। যেকোনো একটা পথ বেছে নিয়েছেন, আর তাতেই পদ্মজার মঙ্গল হয়েছে। এবার কেন এমন হচ্ছে? কেন তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছেন? পদ্মজার জীবন নিয়ে যেন ভেসে আছেন মাঝ নদীতে। চারদিকে স্রোত; মাঝি নেই, বৈঠা নেই। আমির না লিখন? কার কাছে ভালো থাকবে পদ্মজা? হেমলতার শরীর ভীষণ খারাপ লাগছে। তিনি দুর্বল কণ্ঠে বললেন, ‘এত বোঝো যখন, তখন নিজেকেও সামলাতে পারবে। বাড়ি ফিরে যাও।’‘আন্টি, আমার বেঁচে থাকতে কষ্ট হবে।’‘পদ্মজার সঙ্গে যা হয়েছে তবুও সে বেঁচে আছে। আর তুমি এইটুকু মানিয়ে নিতে পারবে না?লিখন আর কথা খুঁজে পেল না। আহত মন নিয়ে উঠে দাঁড়াল। চলে যেতে ঘুরতেই হেমলতা দাঁড়াতে বললেন। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে, তবুও হেঁটে লিখনের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘নিজেকে শক্ত রেখো। তোমার এখনও অনেক পথ যাওয়া বাকি। কারো জন্য কারো জীবন থেমে থাকে না! ভাগ্যে যা থাকে, তাই হয়। সব যেহেতু আয়োজন হয়ে গেছে, তাই আর ভেবে লাভ নেই। তবে কবুল বলার আগেও যদি পদ্মজা বলে, তার তোমাকেই চাই…আমি সব ভেঙেচুরে পদ্মজাকে নিয়ে তোমার বাড়ি ছুটে যাব। আমি আমার মেয়েটাকে ভীষণ ভালোবাসি, বাবা। এই মেয়েটার সুখের জন্য আমি স্বার্থপর হয়েছি। অন্যের সন্তানের কষ্ট চোখে ভেসেও ভাসছে না। আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো।’হেমলতার চোখে জলের ভিড়। লিখন ভীষণ অবাক হয়ে দেখতে থাকল এই কঠিন মানুষটাকে। হেমলতা নিজের দুর্বলতা, নিজের কান্না কেন দেখালেন লিখনকে? জবাব খুঁজে পেল না লিখন। শুধু এইটুকু বুঝতে পারল যে হেমলতার কাছে জীবন মানেই পদ্মজা।লিখন ভাঙা গলায় ‘আসি’ বলে চলে যায়। হেমলতা সব কাজ ভুলে গুটিসুটি মেরে বিছানায় শুয়ে পড়েন। চোখ বেয়ে দুই ফোঁটা জল বেরিয়ে আসে। মনের শক্তি কমে গেছে। দুর্বল হয়ে পড়েছেন তিনি। নিজের উপর আস্থা কিংবা বিশ্বাস পাচ্ছেন না। সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতাটুকু যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছে।
বারান্দার গ্রিলে হাত রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে পদ্মজা। তার পরনে শাড়ি রয়ে গেছে। আকাশের বুকে থালার মতো একখান চাঁদ। চাঁদের আলোয় চারদিক ঝিকমিক করছে। চারপাশ থেকে ভেসে আসছে ঝিঁঝিপোকার ডাক।‘পদ্ম…’পদ্মজা কেঁপে উঠে পেছনে ফিরে তাকাল। মোর্শেদকে দেখতে পেয়ে হাঁফ ছাড়ল গোপনে। মোর্শেদ বললেন, ‘তোর মায়ে কী আর উডে নাই?’‘না, আব্বা।’মোর্শেদ চিন্তিত ভঙ্গিতে কিছু ভাবলেন। বললেন, ‘তুই হজাগ ক্যান? যা ঘরে গিয়া ঘুমা। আমি ঘাটে যাইতাছি।’‘আচ্ছা, আব্বা।’মোর্শেদের যাওয়ার পানে পদ্মজা তাকিয়ে রইল। সে ভাবছে…কিন্তু কী ভাবছে তা নিজেই ধরতে পারছে না। কুকুরের ঘেউ ঘেউ শুনে উদাসীনতা কেটে গেল। শাড়ির আঁচল টেনে সাবধানে হেঁটে ঢুকল সদর ঘরে, ওখানে পাটি বিছিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা আত্মীয়রা ঘুমাচ্ছে। তাদের ডিঙিয়ে পদ্মজা হেমলতার ঘরে এলো। হেমলতা ঘুমাচ্ছেন বেঘোরে। শুনেছিল, লিখন শাহকে নিয়ে মা নিজ ঘরে এসেছিলেন। এরপর কী হলো কে জানে! সন্ধ্যার পর পূর্ণা জানাল, আম্মা ঘুমাচ্ছে। হেমলতা কখনো সন্ধ্যা সময় ঘুমান না। তাই পদ্মজা ঘোমটা টেনে হেমলতার ঘরে ছুটে আসে। মাকে এত শান্তিতে ঘুমাতে কখনো দেখেনি পদ্মজা। তাই আর ডাকেনি। কেউ ডাকতে আসলে তাড়িয়ে দিয়েছে। ঘুমাচ্ছে যখন, ঘুমাক নাহয়। এখন মধ্য রাত। হেমলতার মুখের সামনে মাটিতে বসে একদৃষ্টে তাকিয়ে মাকে দেখছে পদ্মজা, তার গলা কাঁপছে।শ্বশুর বাড়ি কীভাবে থাকবে সে! মাকে ছাড়া দুইদিন থাকতে গিয়ে এত বড়ো ঝড় বয়ে গেল। আর এখন কিনা সারাজীবনের জন্য মায়ের ছায়া ছেড়ে দিতে হবে! এই মুখটা না দেখলে তার দিন কাটে না…এই মানুষটার আদুরে শাসন ছাড়া দিন সম্পূর্ণ হয় না। পদ্মজা বিছানায় মাথা ঠুকে ফুঁপিয়ে উঠল। অস্ফুট করে ডাকল, ‘আম্মা।’সঙ্গে সঙ্গে হেমলতা চোখ খুললেন। পদ্মজা খেয়াল করল না। সে কাঁদতে কাঁদতে চাপা স্বরে বলছে, ‘তোমাকে ছাড়া কীভাবে থাকব আম্মা! বিয়ে করাটা কী খুব দরকার ছিল?’‘ছিল।’পদ্মজা চমকে গিয়ে মাথা তুলল। গলার স্বর আগের অবস্থানে রেখে বলল, ‘কেন আম্মা?’‘সব জানতে নেই, মা।’পদ্মজা মাথা নত করে নাক টানছে। হেমলতা বললেন, ‘বিয়ে হতেই হবে। বর বদল হলে সমস্যা নেই। তোর কী আর কাউকে পছন্দ?প্রশ্নটি শুনে পদ্মজা বিব্রত হয়ে গেল। হেমলতাও প্রশ্নটা করতে গিয়ে অস্বস্তি বোধ করছিলেন। পদ্মজা মাথা দুই পাশে নাড়িয়ে জানাল, তার আলাদা করে কাউকে পছন্দ নেই। হেমলতা উঠে বসেন। চুল খোঁপা করতে করতে প্রশ্ন করলেন, ‘রাত কী খুব হয়েছে? কারো সাড়া নেই যে।’‘মাঝ রাত।’‘আর তুই জেগে থেকে কাঁদছিস?’ মৃদু ধমকের স্বরে বললেন।পদ্মজা নিরুত্তর। হেমলতা জানালার বাইরে চেয়ে দেখলেন চাঁদের আলোয় চারিদিক উজ্জ্বল। আজ জ্যোৎস্না রাত। চাঁদের আলো গলে ঘরের মেঝেতে এসে পড়ছে। তিনি বিছানা থেকে নামতে নামতে পদ্মজাকে তাড়া দিয়ে বললেন, ‘শাড়ি পালটে সালোয়ার-কামিজ পরে নে।’‘কেন আম্মা?’‘যা বলছি কর।’পদ্মজা ঘরে গিয়ে শাড়ি পালটে নিলো। উঠানে এসে দেখে হেমলতার হাতে বৈঠা। পদ্মজা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, ‘হাতে বৈঠা কেন?’‘পূর্ণাকে নেব? নেওয়া উচিত। যা ওকে ডেকে নিয়ে আয়। প্রান্ত-প্ৰেমা যেন টের না পায়।’পদ্মজা অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে। হেমলতা তাড়া দিলেন, ‘যা তো!’হন্তদন্ত হয়ে ছুটে গেল পদ্মজা, কয়েক মিনিটের মধ্যে ফিরল পূর্ণাকে নিয়ে; বেচারি ঘুমে ঢুলছে। হেমলতা ঘাটে এসে দেখেন মোর্শেদ নৌকায় বসে বিড়ি ফুঁকছেন‘নৌকা ছাড়ো।’মোর্শেদ দুই মেয়ে আর বউকে দেখে হকচকিয়ে গিয়েছেন। তার মধ্যে হেমলতা যেভাবে বললেন, নৌকা ছাড়ো—তা শুনে আরো ভড়কে গেলেন। চোখ বড়ো বড়ো করে প্রশ্ন করলেন, ‘ক্যান? কী অইলো?’মোর্শেদের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে পদ্মজা-পূর্ণাকে নিয়ে হেমলতা নৌকায় উঠে স্থির হয়ে বসলেন। বৈঠা মোর্শেদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মিষ্টি করে হেসে বললেন, ‘জ্যোৎস্না রাতের নৌকা ভ্রমণে বের হয়েছি আমরা। তুমি এখন আমাদের মাঝি।’ হেমলতা থামলেন। এরপর আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, ‘লও, মাঝি, বৈঠা লও। ছাড়ো তোমার নৌকা। যত সিকি চাইবা তুমি ততই পাইবা।’একসঙ্গে চারটা দুঃখী মানুষ হেসে উঠে। মোর্শেদ বৈঠা হাতে নিয়ে নৌকা ছাড়লেন। হুট করেই যেন অনুভব হচ্ছে, যুবক কালের রক্ত শরীরে টগবগ করছে।এই তো তার সংসার, এই তো তার আনন্দ।.রাতের নির্মল বাতাস বইছে। মাদিনী নদীর স্বচ্ছ জলে চাঁদের প্রতিচ্ছবি। কচুরিপানারা ভেসে যাচ্ছে। সবকিছু সুন্দর, মুগ্ধকর। পূর্ণার বুকের ভারটা খুব হালকা লাগছে। পদ্মজা প্রাণভরে নিশ্বাস নিলো, রগে রগে যেন বয়ে গেল শান্তি। আল্লাহ তায়ালা যেন প্রকৃতির সৌন্দর্যে যেকোনো দুঃখী মানুষকে সুখী অনুভব করানোর মন্ত্র ঢেলে দিয়েছেন।‘মোর্শেদ নাকি গো?’ হিন্দুপাড়া থেকে কেউ একজন চেঁচিয়ে ডাকল।মোর্শেদ এক হাত তুলে জবাব দিলেন, ‘হ দাদা, আমি।’রাইতের বেলা যাইতাছ কই?’‘মেয়ে-বউ লইয়া জ্যোৎস্না পোহাইতে বাইর হইছি দাদা।’‘তোমাদেরই দিন মিয়া।মোর্শেদ আর কিছু বললেন না, হাসলেন। ওপাশ থেকেও আর কারো কথা শোনা গেল না। নৌকা আটপাড়া ছেড়ে হাওড়ে ঢুকে পড়েছে। সা সা করে বাতাস বইছে। গায়ের কাপড় উড়ছে। হেমলতা দুই মেয়ের মাঝে এসে বসলেন, চাদর নিয়ে এসেছেন। দুই মেয়েকে দুইহাতে জড়িয়ে ধরে ঢেকে দিলেন চাদরে। বাতাসে চাদর উড়ে প্যাতপ্যাত আওয়াজ তুলছে। চাঁদটা একদম মাথার ওপর। তাদের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছে! মোর্শেদ মনের সুখে গান ধরলেন—লোকে বলে বলেরেঘর-বাড়ি ভালা নাই আমারকী ঘর বানাইমু আমি শূন্যেরও মাঝার।।ভালা কইরা ঘর বানাইয়াকয়দিন থাকমু আরআমি কয়দিন থাকমু আরআয়না দিয়া চাইয়া দেখিআয়না দিয়া চাইয়া দেখিপাকনা চুল আমার।পাকনা চুল আমার বলতেই পূর্ণা ফিক করে হেসে ফেলল। পদ্মজাকে ফিসফিসিয়ে বলল, আব্বা বোধহয় এখনো জোয়ান থাকতে চায়।’পদ্মজা হেসে চাপা স্বরে বলল, ‘চুপ থাক। আব্বা কী সুন্দর গায়!’মোর্শেদ গেয়ে যাচ্ছেন —এ ভাবিয়া হাসন রাজাহায়রে, ঘর-দুয়ার না বান্ধেকোথায় নিয়া রাখব আল্লায়কোথায় নিয়া রাখব আল্লায়তাই ভাবিয়া কান্দে।।লোকে বলে ও বলেরেঘর-বাড়ি ভালা নাই আমার।।জানত যদি হাসন রাজাহায়রে, বাঁচব কতদিনবানাইত দালান-কোঠাকরিয়া রঙিন।।লোকে বলে ও বলেরেঘর-বাড়ি ভালা নাই আমার।মোর্শেদ থামলেন। তিন মা-মেয়ে একসঙ্গে হাতের তালি দিল, সেই আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠল চারপাশ। এত সুন্দর রাত বার বার ফিরে আসুক। মোর্শেদ হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন সামনে থাকা তিনটা মানুষের দিকে। তাদের চোখেমুখে খুশি ঝিলিক মারছে। অথচ তিনি জানেন একেকজন কতটা দুঃখী। মোর্শেদ ঢোক গিলে লুকায়িত এক সত্যের কষ্ট পুনরায় লুকিয়ে যান। হেমলতা আর তিনি ছাড়া এই কলিজা ছেঁড়া কষ্ট কেউ জানে না। মোর্শেদ হেসে বললেন, ‘এই অভাগা মাঝিকে কী আপনারা আপনাদের মাঝে জায়গা দেবেন?’মোর্শেদের কণ্ঠে শুদ্ধ ভাষায় মিষ্টি আবদার শুনে পদ্মজা পুলকিত হয়ে উঠল। আজ সব কিছু কত সুন্দর! পূর্ণা বলল, ‘দেব। এক শর্তে, নৌকা চালানোর বিনিময়ে সিকি যদি না নেন।’মোর্শেদ মেয়ের রসিকতা শুনে হা হা করে হাসেন। সেই হাসি বার বার প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে কানে। তিনি বৈঠা রেখে হেমলতার সামনে এসে বসেন। নৌকা নিজের মতো যেদিকে ইচ্ছে ছুটে চলছে।মোর্শেদ হেমলতাকে বললেন, ‘দুইডা ছেড়িরে খালি তুমি ধইরা রাখবা? ছাড়ো তো এইবার। আয় রে, তোরা আমারে ধারে আইয়া ব।’পদ্মজা অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল। হেমলতা যেতে বললেন। পদ্মজা মোর্শেদের ডান পাশে বসল, আর পূর্ণা বাঁ-পাশে। মোর্শেদ পূর্ণাকে এক হাতে, পদ্মজাকে আরেক হাতে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে ওঠেন 1 অপরাধী স্বরে বললেন, ‘আমি বাপ হইয়া পারি নাই আমার ছেড়িদের বেইজ্জতির হাত থাইকা রক্ষা করতে। আমারে মাফ কইরা দিস তোরা।’মোর্শেদ কখনো এত আদর করে পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরেননি। এই প্রথম ধরেছেন, আবার কাঁদছেনও! পদ্মজার চোখ দুটি জলে ভরে ওঠে। হেমলতা মোর্শেদের পায়ের কাছে বসলেন। মোর্শেদের হাঁটুতে মাথা রেখে, দুই মেয়ের হাত চেপে ধরলেন। কেটে যায় অনেকগুলো মুহূর্ত। নৌকা হাওড়ের পানির স্রোতে একবার এদিক, তো আরেকবার ওদিক যাচ্ছে। বাতাসে চারজনের চোখের জল শুকিয়ে মিশে গেছে ত্বকের সঙ্গে।নিস্তব্ধতা ভেঙে পদ্মজা বলল, ‘আজ আমি বুঝলাম জীবনে সুখ বা দুঃখ—কোনোটাই চিরস্থায়ী নয়। দুঃখে মর্মাহত না হয়ে সুখের সময়টা তৈরি করে নিতে হয়। তাহলেই জীবনে সুখকর মুহূর্ত আসে। আবার সুখ সর্বক্ষণ সঙ্গে থাকে না। দুনিয়ার লীলাখেলার শর্তে দুঃখ বার বার ফিরে আসে।’হেমলতা পদ্মজার দিকে না তাকিয়ে পদ্মজার ডান হাতে পরম মমতায় চুমু খেলেন। চাঁদটা অর্ধেক হয়ে এসেছে। খুব তাড়াতাড়ি আকাশে মিলিয়ে যাবে।
