BDBOYS...
BDBOYS...
সবচেয়ে সাম্প্রতিক খবর ও পোস্টসমূহ
মূল তথ্য: চক্র সিজন ২স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম: iScreen (আইস্ক্রিন)পরিচালক: ভিকি জাহেদমুক্তির তারিখ: ২৬ মার্চ, ২০২৬ধরণ: সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার / মিস্ট্রি / প্যারানরমালমুখ্য অভিনয়শিল্পী: তৌসিফ মাহবুব এবং তাসনিয়া ফারিণ।গল্প ও প্রেক্ষাপটপ্রথম সিজনের পর থেকেই দর্শকদের মনে অনেক অমীমাংসিত প্রশ্ন ছিল। সিজন ২-এ মূলত সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা হবে।আসল ঘটনার অনুপ্রেরণা: সিজন ১-এর মতো সিজন ২-এর গল্পও ঢাকার একটি সত্য ও রহস্যময় ঘটনা (আদম পরিবারের ঘটনা) থেকে অনুপ্রাণিত বলে জানা গেছে।কাহিনি সংক্ষেপ: সিজন ২-এ হোমায়রা (তাসনিয়া ফারিণ) এবং তার সাথে ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক ঘটনাগুলোর গভীর রহস্য উন্মোচিত হবে। এতে দেখানো হবে কীভাবে একটি পরিবার ক্রমাগত অন্ধকার ও অতিপ্রাকৃত বিষয়ের দিকে ধাবিত হয় এবং এর পেছনে আসলে কোনো মানুষের হাত নাকি অলৌকিক কিছু কাজ করছে।কেন এটি নিয়ে এত আলোচনা?ভিকি জাহেদের পরিচালনা: তার সিগনেচার 'টুইস্ট' এবং ডার্ক আবহ এই সিরিজের মূল আকর্ষণ।শ্যুটিং সেটের রহস্য: শিল্পী ও কলাকুশলীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, শ্যুটিং চলাকালীন সেটে অনেক অদ্ভুত ও অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাদের, যা দর্শকদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি করেছে।পারফরম্যান্স: তৌসিফ এবং ফারিণের রসায়ন এবং তাদের চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর সিরিজটিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।দ্রষ্টব্য: আপনি যদি সিজন ১ দেখে না থাকেন, তবে সিজন ২ শুরু করার আগে আইস্ক্রিনে গিয়ে প্রথম সিজনটি দেখে নেওয়া জরুরি, কারণ গল্পের প্রতিটি ধাপ একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত।Download Link.......Download 480p QualityDownload 720p QualityDownload 1080p Quality
পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল)–এর ১১তম আসরের উদ্বোধনী ম্যাচে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স ছিল মিশ্র। ব্যাট হাতে খুব একটা উজ্জ্বল হতে পারেননি পারভেজ হোসেন ইমন, তবে বল হাতে কার্যকর ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান।লাহোর কালান্দার্সের হয়ে অভিষেক ম্যাচে নেমে পারভেজ হোসেন ইমন ১৩ বলে ১৪ রান করেন। ইনিংসে একটি ছক্কা হাঁকালেও বড় কিছু করতে পারেননি এই বাঁহাতি ব্যাটার।রাইলি মেরেডিথের বলে ক্যাচ তুলে আউট হয়ে থামতে হয় তাকে।অন্যদিকে, একই ম্যাচে বল হাতে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন মুস্তাফিজুর রহমান। ৪ ওভারে মাত্র ১৯ রান দিয়ে ১ উইকেট নেন এই বাঁহাতি পেসার। তার স্লোয়ার ডেলিভারিতে আউট হন ইরফান খান।ম্যাচে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে লাহোর কালান্দার্স তোলে ৬ উইকেটে ১৯৯ রান। ফখর জামান ৩৯ বলে ৫৩ রান এবং হাসিবউল্লাহ খান অপরাজিত ৪০ রানের ইনিংস খেলে দলের বড় সংগ্রহ গড়তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।জবাবে ব্যাট করতে নেমে হায়দরাবাদ কিংসমেন শুরুটা ভালো করলেও পরে ধারাবাহিক উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ১৩০ রানে অলআউট হয়ে ৬৯ রানের বড় ব্যবধানে হারে দলটি।
আজ সকালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আন্তমহাদেশীয় প্লে-অফে মুখোমুখি নিউ ক্যালেডোনিয়া ও জ্যামাইকা। আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচেরও অভাব নেই আজ। আছে পিএসএলও।বিশ্বকাপ বাছাই: আন্তমহাদেশীয় প্লে–অফনিউ ক্যালেডোনিয়া-জ্যামাইকাসকাল ৯টা, ফিফা প্লাসসাফ অ-২০ ফুটবলমালদ্বীপ-নেপালবিকেল ৪-৪৫ মি., ইউটিউব@sportzworkzভুটান-শ্রীলঙ্কারাত ৯-৩০ মি., ইউটিউব@sportzworkzপিএসএলকরাচি-কোয়েটারাত ৮টা, টি স্পোর্টসআন্তর্জাতিক প্রীতি ফুটবলঅস্ট্রেলিয়া-ক্যামেরুনবেলা ৩-১০ মি., ফিফা প্লাসউজবেকিস্তান-গ্যাবনরাত ৮টা, ফিফা প্লাসআজারবাইজান-সেন্ট লুসিয়ারাত ৯টা, সনি স্পোর্টস ২মন্টেনেগ্রো-অ্যান্ডোরারাত ১১টা, সনি স্পোর্টস ২অস্ট্রিয়া-ঘানারাত ১১টা, সনি স্পোর্টস ৫সুইজারল্যান্ড-জার্মানিরাত ১-৪৫ মি., সনি স্পোর্টস ২নেদারল্যান্ডস-নরওয়েরাত ১-৪৫ মি., সনি স্পোর্টস ৫ইংল্যান্ড-উরুগুয়েরাত ১-৪৫ মি., সনি স্পোর্টস ১স্পেন-সার্বিয়ারাত ২টা, সনি স্পোর্টস ৩
বাংলাদেশ অপেক্ষায় ছিল ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানের ম্যাচের ফলের। ভারতও যেন খেললো বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের জন্য। পাকিস্তানকে ৩-০ গোলে হারিয়ে বাংলাদেশকে সঙ্গী করে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের বি গ্রুপ থেকে সেমিফাইনালে উঠেছে ভারত। শনিবার বাংলাদেশ ও ভারত মুখোমুখি হবে গ্রুপ সেরা হওয়ার লড়াইয়ে।পাকিস্তানের বিপক্ষে ৩-০ জয়ে একটু এগিয়ে থেকেই বাংলাদেশের মুখোমুখি হবে ভারত। অর্থাৎ দুই দলের ম্যাচটা ড্র হলে গ্রুপ সেরা হবে ভারত। বাংলাদেশকে সেরা হতে জিততেই হবে।গ্রুপ সেরা হলে সেমিফাইনালে অপেক্ষাকৃত সহজ প্রতিপক্ষ পাওয়ার সুযোগ থাকবে দুই দলের জন্যই।এর আগে পাকিস্তানকে ২-০ গোলের হারিয়ে আগেই নিজের কাজটা সেরে রেখেছিল বাংলাদেশ।
বলিউডের ‘ভাইজান’ সালমান খানের ভক্তদের জন্য বড় সুখবর। বহুল প্রতীক্ষিত সিনেমা ‘মাতৃভূমি’ মুক্তির অপেক্ষায় থাকার মাঝেই নিজের পরবর্তী প্রজেক্ট নিয়ে মাঠে নামছেন এই মহাতারকা। দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দক্ষিণী প্রযোজক দিল রাজু এবং জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক বংশী পাইডিপল্লীর বিগ বাজেট অ্যাকশন সিনেমার শুটিং শুরু হতে যাচ্ছে আগামী ১৪ এপ্রিল। মুম্বাইয়ের গোরেগাঁও এসআরপিএফ গ্রাউন্ডে বিশাল আয়োজনে এই সিনেমার প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু হবে বলে জানা গেছে।সূত্রমতে, এই সিনেমার জন্য কোনো সাধারণ সেট নয়, বরং একটি আস্ত ‘মিনি সিটি’ বা ছোট শহর তৈরি করা হচ্ছে। সেটটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে একটি ঘনবসতিপূর্ণ শিল্পাঞ্চল বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল টাউনশিপের আবহ পাওয়া যায়। ছবির গল্পের প্রয়োজনে সেখানে হাইভোল্টেজ ও বড় মাপের অ্যাকশন সিক্যুয়েন্সের চিত্রায়ন করা হবে। সিনেমার সঙ্গে যুক্ত একজন ইনসাইডার জানিয়েছেন, সেট নির্মাণ থেকে শুরু করে অ্যাকশন কোরিওগ্রাফি এবং কাস্টিং—সবই প্রায় চূড়ান্ত। একটি উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট হিসেবে পরিচালক বংশী পাইডিপল্লী সালমান খানকে সম্পূর্ণ নতুন এক লুকে পর্দায় হাজির করতে যাচ্ছেন।নাম ঠিক না হওয়া এই সিনেমাটিতে বলিউড ও দক্ষিণী সিনেমার নামী তারকাদের এক বিশাল সমাহার থাকবে বলে আভাস পাওয়া গেছে। সালমানের অত্যন্ত প্রিয় একটি অ্যাকশন থ্রিলার স্ক্রিপ্ট এবং এর ভেতরের আবেগঘন গল্পই তাকে এই প্রজেক্টে যুক্ত হতে উৎসাহিত করেছে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ২০২৭ সালে সিনেমাটি বড় পর্দায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সালমানের চিরচেনা বাণিজ্যিক ঘরানার সঙ্গে দক্ষিণী মেকিংয়ের মেলবন্ধনে তৈরি এই ছবিটি বক্স অফিসে নতুন রেকর্ড গড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাধীনতা মহান আল্লাহর নিয়ামত। আরবি ভাষার প্রবচন-‘দেশপ্রেম ইমানের অঙ্গ’। জন্মভূমি মক্কার প্রতি রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অপরিসীম ভালোবাসার কথা বিশ্ববাসীর জানা। প্রতিপক্ষ মুশরিকদের হিংস্রতার শিকার হয়ে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা ছেড়ে মদিনায় চলে যেতে বাধ্য হন। তিনি যখন মদিনার উদ্দেশে যাচ্ছিলেন তখন পেছন ফিরে প্রিয় মাতৃভূমির দিকে তাকাচ্ছিলেন আর বলছিলেন, ‘হে প্রিয় জন্মভূমি মক্কা আমার! যদি তোমার অধিবাসীরা আমাকে বাধ্য না করত আমি কোনো দিন তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।’ জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা আমরা পেয়েছি রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে। সে অর্থে জন্মভূমিকে ভালোবাসা রসুলের সুন্নত। তাফসিরে কুরতুবির বর্ণনা অনুযায়ী-যখন রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় হিজরত করছিলেন তখন তাঁর চোখ সজল হয়ে উঠেছিল। দেশের জন্য, জন্মভূমির জন্য তাঁর দরদ ও ভালোবাসা ছিল অকৃত্রিম। পরে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর প্রিয় হাবিবের মাধ্যমে মক্কাকে মুশরিকদের হাত থেকে মুক্তি দিয়ে, স্বাধীনতা দিয়ে ধন্য করেছেন। হাদিসের বর্ণনায় আছে, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনাকেও খুব ভালোবাসতেন। কোনো সফর থেকে প্রত্যাবর্তনকালে মদিনার সীমান্তে ওহুদ পাহাড় চোখে পড়লে নবীজির চেহারায় আনন্দের আভা ফুটে উঠত এবং তিনি বলতেন, ‘এ ওহুদ পাহাড় আমাদের ভালোবাসে, আমরাও ওহুদকে ভালোবাসি (বুখারি, মুসলিম)।’বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে ৩০ লাখ মানুষের জীবনের বিনিময়ে। মানুষ হত্যাকে ইসলামে জঘন্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যারা বিনা বিচারে মানুষ হত্যা করে তারা জঘন্য অপরাধী। গণহত্যা আরও বড় অপরাধ। আল্লাহতায়ালার যত সৃষ্টি রয়েছে এর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হচ্ছে মানুষ। মানবসৃষ্টির ব্যাপারে আল্লাহ ফেরেশতাদের প্রবল আপত্তি উপেক্ষা করেছেন এবং মানুষকে এই জমিনে তাঁর প্রতিনিধি বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আল কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমার পালনকর্তা যখন ফেরেশতাদের বললেন, আমি পৃথিবীতে একজন প্রতিনিধি বানাতে যাচ্ছি, তখন তারা বলল, তুমি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে সৃষ্টি করবে যে দাঙ্গাহাঙ্গামার সৃষ্টি করবে এবং রক্তপাত ঘটাবে? অথচ আমরা প্রতিনিয়ত তোমার গুণকীর্তন করছি এবং তোমার পবিত্র সত্তাকে স্মরণ করছি। তিনি বললেন, নিঃসন্দেহে আমি জানি, যা তোমরা জান না (সুরা বাকারা, আয়াত ৩০)।’মানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণেই আল্লাহ মানুষকে তাদের দান করেছেন সৃষ্টিকুলের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর আকৃতি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেন, ‘আমি সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতর অবয়বে।’ সুরা তিন, আয়াত ৪। শুধু তা-ই নয়, আল্লাহর সুস্পষ্ট বাণী হচ্ছে, এই বিশ্বজগতের সবকিছু তিনি সৃষ্টি করেছেন কেবল মানুষেরই জন্য। আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘তিনিই সেই সত্তা যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য জমিনের সবকিছু (সুরা বাকারা, আয়াত ২৯)।’ আল্লাহ যেমন ভালোবাসা দিয়ে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি মানবজাতির সুরক্ষা এবং নিরাপত্তাও নিশ্চিত করেছেন। একজন মানুষের জীবন, সম্পদ, মানসম্মান আল্লাহর কাছে এত দামি যে কোরআন ও হাদিসে এসব বিষয়ের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আল কোরআনে একজন মানুষ হত্যা করাকে গোটা মানবজাতিকে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।হিজরতের পর মদিনায় হজরত আবুবকর (রা.) ও বেলাল (রা.) জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় তাঁদের মনে প্রিয় স্বদেশ মক্কার স্মৃতিচিহ্ন জেগে উঠেছিল। তাঁরা জন্মভূমি মক্কার কথা স্মরণ করে আবেগে আপ্লুত হয়ে কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের মনের এ দুরবস্থা দেখে প্রাণভরে দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ! আমরা মক্কাকে যেমন ভালোবাসি মদিনার ভালোবাসা তার চেয়েও বেশি আমাদের অন্তরে দান করুন। বুখারি।’ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে স্বদেশকে ভালোবেসে আমাদের জন্য দেশপ্রেমের আদর্শ রেখে গেছেন। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যদি কেউ তোমাদের কোনো উপকার করে তবে তাকে প্রতিদান দেবে। যদি প্রতিদান দিতে না পার তবে তার জন্য এমনভাবে দোয়া করবে, যেন তোমাদের মন সাক্ষ্য দেয়, হ্যাঁ তোমরা তার প্রতিদান দিয়ে দিয়েছ (আবু দাউদ)।’ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা কর তবে তা শেষ করতে পারবে না (সুরা নাহল আয়াত ১৭)।’ আল্লাহর দেওয়া অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ নেয়ামত হলো স্বাধীনতা। বাংলাদেশের মানুষ দুই যুগের দীর্ঘ সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আল্লাহর এ নেয়ামত অর্জন করেছে। আমাদের স্বাধীনতার জন্য যাঁরা প্রাণ দিয়েছেন মহান আল্লাহর কাছে এই দিনে আমরা তাঁদের জন্য দোয়া করব। আল্লাহ তাঁদের বেহেশতের সুশীতল স্থানে ঠাঁই দিন।লেখক : ইসলামিক গবেষক
বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। ছবি, ভিডিও বা ব্যক্তিগত মুহূর্ত শেয়ার করার জন্য অনেকেই নিয়মিত ব্যবহার করেন ইনস্টাগ্রাম। তবে অনেক ব্যবহারকারী অজান্তেই এমন কিছু কাজ করেন, যা প্ল্যাটফর্মটির নিয়ম ভঙ্গ করে। এর ফল হিসেবে অ্যাকাউন্টে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা থেকে শুরু করে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। তাই কিছু সাধারণ ভুল সম্পর্কে আগে থেকেই সচেতন থাকা জরুরি।ফেক ফলোয়ার ব্যবহার করাঅনেকে দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়ার আশায় কৃত্রিম ফলোয়ার বাড়ানোর চেষ্টা করেন। বিভিন্ন বট বা অচেনা অনলাইন সার্ভিসের মাধ্যমে ফলোয়ার কিনে নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। কিন্তু এই ধরনের কার্যক্রম প্ল্যাটফর্মের নীতিমালার বিরুদ্ধে। সিস্টেমে ধরা পড়লে অ্যাকাউন্টের রিচ কমে যেতে পারে, সাময়িকভাবে সীমাবদ্ধতাও আরোপ হতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।কপিরাইটযুক্ত কনটেন্ট অনুমতি ছাড়া শেয়ার করাঅন্যের তৈরি ছবি, ভিডিও বা গান নিজের নামে বা অনুমতি ছাড়া পোস্ট করাও বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে। মূল নির্মাতা অভিযোগ করলে সংশ্লিষ্ট পোস্ট দ্রুত সরিয়ে দেওয়া হয়। একই ধরনের অভিযোগ বারবার হলে অ্যাকাউন্টের ওপর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।নিষিদ্ধ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করাসব হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করা নিরাপদ নয়। কিছু হ্যাশট্যাগ অপব্যবহার বা অনুপযুক্ত কনটেন্টের কারণে নিষিদ্ধ তালিকায় পড়ে। সেগুলো ব্যবহার করলে পোস্টের দৃশ্যমানতা কমে যেতে পারে এবং অ্যাকাউন্টও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।অশালীন বা ক্ষতিকর কনটেন্ট প্রকাশ করাঘৃণাত্মক বক্তব্য, অশালীন ছবি বা বিতর্কিত কনটেন্ট শেয়ার করার ব্যাপারে প্ল্যাটফর্মটি খুবই কঠোর। এই ধরনের পোস্ট করলে তা দ্রুত মুছে ফেলা হয় এবং ব্যবহারকারীকে সতর্ক করা হয়। নিয়ম ভঙ্গের ঘটনা একাধিকবার ঘটলে অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।স্প্যাম ধরনের আচরণ করাএকই মন্তব্য বারবার করা, অল্প সময়ে অনেক পোস্টে লাইক দেওয়া বা অকারণে প্রচুর ডাইরেক্ট মেসেজ পাঠানোকে স্প্যাম হিসেবে ধরা হয়। এছাড়া ফলোয়ার বাড়ানোর আশায় তৃতীয় পক্ষের অ্যাপ ব্যবহার করে লগইন করাও ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের কাজ নিয়মিত হলে অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে রিপোর্ট জমা পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সেটি হারানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়।সোশ্যাল মিডিয়ায় নিরাপদ থাকতে হলে নিয়ম মেনে চলাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কী পোস্ট করছেন, কোথায় মন্তব্য করছেন এবং কোন ধরনের টুল ব্যবহার করছেন এসব বিষয়ে সচেতন থাকলে নিজের অ্যাকাউন্ট দীর্ঘদিন নিরাপদ রাখা সম্ভব।
আমার প্রায় লেখাগুলোই শুরু হয় আমাদের জ্ঞানহীনতার আহাজারি দিয়ে। ব্যাপারটা একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে কিন্তু সত্যি কথা এটাই যে মুসলিম হিসেবে যা জানার কথা ছিল ক্লাস ফোর-ফাইভে, সেটা আমি জেনেছি অনার্স পরীক্ষা দেবার পর! এরকম ইসলামের খুব বেসিক কিন্তু একেবারেই অজানা একটা বিষয় হল সুন্নাত।সুন্নাত শব্দটার সরল অর্থ পথ, নিয়ম বা রীতি। সুন্নাতুল্লাহ মানে আল্লাহর রীতি। সুন্নাতুর রসুল মানে রসুল(সাঃ) এর পথ, তাঁর রীতি। কিন্তু ইসলামি পরিভাষায় সুন্নাত শব্দটি বিভিন্ন শাখার স্কলাররা বিভিন্ন ভাবে ব্যবহার করেছেন। যেমন –১. ফিক্হ (ইসলামি আইন) শাস্ত্রে সুন্নাত বলতে বোঝায় এমন কাজ যা করা ভাল কিন্তু তা করতে মানুষ বাধ্য নয়। যেমন ফজরের ফরযের আগের দুই রাকাত নামাজ সুন্নাত। এটা কেউ না পড়লে পাপী হবেনা কিন্তু পড়লে অনেক অনেক সাওয়াব – আসমান এবং জমিনের মাঝে যা কিছু আছে তার থেকে এ দু’রাকাত নামায উত্তম বলে রসুল(সাঃ) আমাদের জানিয়ে গেছেন। এই ‘সুন্নাত’ মুস্তাহাব/মানদুব/পছন্দনীয়/Recommended এর সমার্থক শব্দ।২. হাদীস শাস্ত্রে রসুল(সাঃ) এর কথা, কাজ, মৌন সম্মতির পাশাপাশি অভ্যাস, দৈহিক বৈশিষ্ট্য অথবা জীবনবৃত্তান্ত – যা কিছু বর্ণিত হয়েছে তার সবই সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন তিনি লাউ খেতে ভালোবাসতেন এটা সুন্নাত, ঘুমের সময় তার হালকা নাক ডাকার শব্দ হত সেটাও সুন্নাত আবার তিনি মাথায় পাগড়ি পড়তেন এটাও সুন্নাত।৩. উসুলুল ফিক্হ (ইসলামি আইনের মূলনীতি) শাস্ত্রে সুন্নাত বলতে বোঝায় রসুল(সাঃ) এর কথা – আদেশ, উৎসাহ, অনুমোদন, অপছন্দ বা নিষেধ; তাঁর কাজ যা অন্যদের জন্য অনুকরণযোগ্য এবং তাঁর মৌন সম্মতি (কারণ কোন খারাপ কাজ হবে আর তিনি চুপ করে থাকবেন তা হবার নয়) সবকিছুর সমন্বয়কে।ভিন্ন ভিন্ন শাস্ত্রে ভিন্ন ভিন্ন পটভূমিতে সুন্নাত শব্দের চলের ফলে আমরা প্রায়ই ভুল বুঝাবুঝির শিকার হই। খুব প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা –১. কুর’আনের সব আদেশ মানা বাধ্যতামূলক কিঃআল কুর’আনের সব আদেশ মুসলিমদের উপর ফরয নয়। যেমন সুরা বাক্বারার ২৮২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন – “…আর তোমরা বেচা-কেনা করার সময় সাক্ষী রাখ…” আল্লাহর এই আদেশটি অবশ্য পালনীয় নয় বরং মুস্তাহাব বা পছন্দনীয়। আল্লাহ তার অসীম করুণায় এটা আমাদের উপর ফরয করে দেননি, দিলে দৈনন্দিন জীবন যাপনে আমাদের অনেক অসুবিধা হত।কুর’আন যেহেতু রসুল(সাঃ) এর উপর নাযিল হয়েছিল তাই এর বিধানগুলো কিভাবে মানতে হবে তা জানার জন্য আমাদের যেতে হবে রসুল(সাঃ) এর কাছে। কুর’আনের কোন আদেশের মর্যাদা কী তা ফকীহ আলিমরা সেই বিষয়ের উপর কুর’আন এবং হাদিসের সমস্ত সূত্র এক করে গবেষণা করে বের করেন। যেমন উল্লেখিত আয়াত রসুল(সাঃ) এর উপর নাযিল হওয়া সত্ত্বেও তিনি অনেক সময় সাক্ষী ছাড়াই কেনাকাটা করতেন। তার এ আচরণ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে এটা অবশ্য করণীয় নয়।২. হাদিসের আদেশ কি মানলেও চলে, না মানলেও চলেঃকোন ব্যাপারে রসুল(সাঃ) এর আদেশ মানা বাধ্যতামূলক হতে পারে যদিও হয়ত সে ব্যাপারে কুর’আন থেকে সরাসরি কোন বিধান নেই। যেমন রসুল(সাঃ) বলেছেন –“গোঁফ ছেঁটে রাখ এবং দাড়িকে ছেড়ে দাও”এখানে দাড়ির ব্যাপারে রসুল(সাঃ) “আমার প্রভু আমাকে আদেশ করেছেন” – এমন শব্দ ব্যবহার করেছেন। এটি সহ দাড়ির ব্যাপারে অন্যান্য সব হাদিস একসাথে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে দাড়ি রাখা প্রত্যেক মুসলিম পুরুষের জন্য ফরয বা বাধ্যতামূলক।অনেকে মনে করেন দাড়ি রাখা রসুলের সুন্নাত। এখানে সুন্নাত বলতে বুঝিয়েছে রসুল(সাঃ) এর একটি অভ্যাসকে। কিন্তু এই অভ্যাস আসলে ‘করলে ভালো না করলে ক্ষতি নেই’- এমন স্ট্যাটাসের না। এটা ফরয যা করতে প্রত্যেক মুসলিম বাধ্য। যদি কেউ দাড়ি না রাখে তবে তার জন্য তাকে রসুল(সাঃ), প্রকারান্তরে আল্লাহর আদেশ লঙ্ঘন করায় পরকালে শাস্তি পেতে হবে।৩. সব সুন্নাতই কি অনুকরণীয়ঃযেসব সুন্নাত রসুল(সাঃ) এর অভ্যাসগত বা জীবন যাপনের সাথে সম্পর্কিত তার সব কিছু মানতে মুসলিম বাধ্য নয়। যেমন রসুল(সাঃ) ঘুমানোর সময় তার নাক ডাকতো। এখন আমাদেরও নাক ডাকতে হবে এমনটা জরুরী নয়। ঠিক তেমন রসুল(সাঃ) যে ধরণের পোষাক পরতেন তা তিনি আমাদের জন্য অনুকরণীয় করেননি। করলে দেখা যেত শীতের দেশের মুসলিমরা কিংবা আমাদের মত পানির দেশের মুসলিমরা সে ধরণের পোশাক পরতে না পারার কারণে সাওয়াবের দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তাই তিনি পোশাকের একটি রূপরেখা দিয়ে দিলেন। সে রূপরেখা মেনে চললে পৃথিবীর যে কোন এলাকার মুসলিম নিজেকে আবৃত করতে পারবে, পরিবেশের সাথে মানিয়ে চলাচল করতে পারবে আবার রসুল(সাঃ) এর আদেশ মানার মাধ্যমে পূণ্যার্জনও করতে পারবে।৪. রসুলের আনুগত্য কি বাধ্যতামূলকঃমানুষ হিসেবে রসুল(সাঃ) এর কিছু কাজ আমাদের জন্য অনুকরণীয় নয় বটে কিন্তু রসুল হিসেবে তার সব কাজই আমাদের জন্য অনুকরণীয়। কিছু কিছু ব্যাপারে তার অনুকরণ করাটা পছন্দনীয় এবং বাঞ্চনীয় – যেমন তার চারিত্রিক শিষ্টাচার। আবার কিছু কিছু ব্যাপারে তাকে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। আসলে তিনি যত আদেশ দিয়েছেন তা যদি অন্য কোন কথা বা কাজ দিয়ে লঘু না করে থাকেন তবে সেটা আমাদের জন্য ফরয বা বাধ্যতামূলক। এটা সময় বা পরিবেশের সাপেক্ষে পরিবর্তনশীল নয়। যেটা স্থান-কাল-পাত্র ভেদে বদলে যেতে পারে সেটা আমাদের উপর বাধ্য করা হয়নি। সত্যি কথা বলতে গেলে ইসলামটা আসলে রসুলের আনুগত্যের উপরে দাঁড়িয়ে আছে। মানুষের জীবনে ইসলামের রূপটা কেমন হবে তার জ্বলন্ত উদাহরণ রসুল(সাঃ)। এ কারণেই আল্লাহ কুর’আন আকাশ থেকে পৃথিবীতে ঠাস করে ফেলে দেননি, একজন মানুষ নবীর উপর নাযিল করেছেন। এতে কুর’আনের তাত্বিক ও ব্যবহারিক ব্যাখ্যা সমেত মানব্জাতির কাছে আল্লাহর পুরো মেসেজটাই কিয়ামাত পর্যন্ত সংরক্ষণ করা গেছে। আর মূলতঃ এই কারণে হাফ-কাফির / ফুল-কাফির / ওরিয়েন্টালিস্ট / মুক্তমনাদের আক্রমণের কেন্দ্র ক্বুর’আন নয়, সুন্নাতুর রসুল। সুন্নাত আছে মানে কুর’আন যাচ্ছেতাই ভাবে ব্যাখ্যা করার দরজা বন্ধ। সুন্নাত নেই মানে ‘মারি তো গন্ডার লুটি তো ভান্ডার’।৫. নামাযে টুপি পড়া কি সুন্নাতঃপাগড়ি বা টুপি জাতীয় পোশাক পড়া ছিল রসুল(সাঃ) এর অভ্যাস। কিন্তু তিনি সহিহ হাদিসে নামাযের পড়ার সাথে টুপির বিষয়টা সম্পর্কযুক্ত করেননি। নামাযের সময় ভালো পোশাক পরতে আদেশ দেয়া হয়েছে কুর’আনে কারণ অজ্ঞ মুশরিকরা নগ্নদেহে কাবা ঘর তাওয়াফ করত। এর বিরুদ্ধাচারণ করতে বলা হয়েছে ইসলামে। আমরা কোন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গেলে বা গুরুত্বপূর্ণ কোন মানুষের সাথে দেখা করতে হলে আমাদের সবচেয়ে ভালো পোশাক পড়ে যাই। একজন মুসলিমের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্ত্বা আল্লাহ, সবচেয়ে দামী জায়গা মসজিদ – তাই সে সেখানে সবচেয়ে ভালো, সবচেয়ে দামী পোশাক পড়ে যাবে এটাই কাম্য। কারো যদি টুপি পড়ার অভ্যাস থাকে সে অবশ্যই টুপি পড়ে নামায পড়তে পারে। কারো যদি অভ্যাস না থাকে কিন্তু শুধু নামাযের জন্য টুপি পড়ে তবে সেটা ততক্ষণ পর্যন্ত ঠিক আছে যতক্ষণ না সে মনে করছে এই টুপি পড়ায় বাড়তি কোন সাওয়াব আছে। পাগড়ি বা টুপি পড়ায় যদি বাড়তি কোন সাওয়াব থাকতো তবে তা রসুল(সাঃ) বলে যেতেন। যেহেতু তিনি তা বলে যাননি সেহেতু কেউ যদি ভাবে ‘টুপি/পাগড়ি পড়লে সাওয়াব হয়’ অথবা ‘টুপি/পাগড়ি নামাযের একটি অংশ’ তবে সেটা হবে বিদ’আত। এখানে কাজটা অভ্যাসগত সুন্নাত অথচ কাজের সাথে মিশে থাকা বিশ্বাসটা বিদ’আত। কোনটায় সাওয়াব হবে সেগুলো খুব স্পষ্টভাবে কুর’আন এবং সুন্নাহতে বলে দেয়া আছে – আমার মনে করাকরির কোন স্থান ইসলামে নেই।৬. সুন্নাতি লেবাস কিঃরসুল(সাঃ) তোফ মানে ঢিলেঢালা লম্বা জামা পড়তেন যার দৈর্ঘ্য ছিল হাটু থেকে গোড়ালির মাঝামাঝি পর্যন্ত। এখন কেউ একটা পাঞ্জাবি পড়ল যা হাটু পর্যন্ত। আর আমি একটা তোফ পড়লাম যা প্রায় গোড়ালি ছুঁই-ছুঁই। এখন যদি আমি মনে করি এটা পড়ে আমি একটু বেশি সাওয়াব পাচ্ছি তবে সেটা হবে বিদ’আত। কারণ জামার ধরণ বা দৈর্ঘ্যের সাথে সাওয়াবের কোন সম্পর্ক আল্লাহ বা তার রসুল(সাঃ) করেননি। আমাদের দেশে সুন্নাতি লেবাসের যে ধারণাটি প্রচলিত আছে তা আসলে সুন্নাতি লেবাসের একটা রূপ মাত্র, পুরো চিত্রটা নয়।তবে একটা ব্যাপার পরিষ্কার করে দেয়া উচিত। রসুল(সাঃ) কে ভালোবাসা ঈমানের অঙ্গ। যে কেউ রসুল(সাঃ)কে ভালোবেসে শরিয়াতের সীমার মধ্যে কিছু করলে সেটা সে যাই করুক না কেন সেজন্য সে সাওয়াব পাবে। তবে সে সাওয়াব হবে ‘রসুল কে ভালোবাসা’-এই মূলনীতির আওতায়। অর্থাৎ কেউ যদি সবসময় টুপি পড়ে থাকে তবে সে রসুল(সাঃ) কে ভালোবেসে অনুকরণ করার কারণে সাওয়াব পাবে, কিয়ামাতের বিপদে রসুলের সান্নিধ্য পাবে। কেউ যদি লাউ খেতে ভালোবাসে এজন্য যে রসুল(সাঃ) তা ভালোবাসতেন তবে রসুল(সাঃ) কে ভালোবাসার কারণে সে সাওয়াব পাবে – ‘লাউ খাওয়া’ এ কাজটির কারণে সাওয়াব পাবেনা।সাধু সাবধানঃআমাদের দেশের তথাকথিত সচল-আলোকিত শ্রেণীর মানুষের গা-জ্বালা করা দু’টি ব্যাপার আছে – দাড়ি ও টুপি। প্রথমটি ফরয এবং দ্বিতীয়টি সুন্নাত। কারো যদি এ দু’টি দেখে গা জ্বালা করে তবে বুঝতে হবে তার গা-জ্বালার আসল কারণ ইসলাম। দাড়ি-টুপি ইসলামের বাহ্যিক প্রতীকগুলোর মধ্যে দু’টি উল্লেখযোগ্য প্রতীক।আমরা আসলে ‘পা-ঝাড়া’ মুসলিম। সপ্তাহে একদিন সামাজিকতার খাতিরে জুম’আর নামায পড়তে আমরা মসজিদে যাই। সেখান থেকে বের হয়ে প্রথম যে কাজটা করি তা হলো গোটানো প্যান্টটা ঝেড়ে ছেড়ে দেই গোড়ালির নিচে। এই পা ঝাড়ার সময় যতটুকু ইসলাম ভুল করে মসজিদ থেকে পায়ে লেগে গিয়েছিল সেটুকু ঝেড়ে ফেলে দিলাম। এই আমরা কথায় কথায় ছাগু বলি, রাজাকারের কার্টুন আঁকার সময় দাড়ি আর টুপি আঁকি। সাকা চৌধুরী তো বিখ্যাত রাজাকার – তার মত মাকুন্দ রাজাকারের কোন ক্যারিকেচার কেন কেউ কখনো আঁকলোনা? কারণটা খুব স্পষ্ট – যাতে দাড়ি আর টুপি তথা ইসলামকে রাজাকারের প্রতিশব্দ করে ফেলা যায়। আজ সেটা খুব সফলভাবে করা গেছে। যে মুসলিম নিজের ধর্মের প্রতীক প্রকাশে লজ্জা পাবে এমন মুসলিমই তো শয়তান চেয়েছিল। নিজের ইসলামকে কাফিরদের মন মত করে সাজিয়ে নেবে এমন মুসলিমের পরিকল্পনাই তো কাফিররা করেছিল। রজম, চার বিয়ে আর মেয়েদের পর্দার মত ‘নোংরা’ (নাউযুবিল্লাহ) সুন্নাত মুসলিমরা ঝাড় দিয়ে পরিষ্কার করে খাটের তলায় লুকোবে আর হাত কাঁচু-মাচু করে বলবে – না, না এসব আসল ইসলাম নয় – এমন মুসলিমদের স্বপ্নই দেখেছে কাফিরেরা, আজীবন।ইসলাম মানে আল্লাহ যা পাঠিয়েছেন তার পুরোটাই মেনে নেয়া। যেটুকু আমার ভাল লাগে বা যেটুকু আমার বুঝে আসে বা যেটুকু মানলে আলোকিত সচল হওয়া যাবে, সুশীল সমাজ ভাল বলবে শুধু সেটুকু মানার নাম ইসলাম নয়। আমাদের মত সুশীল/সচল হবার দৌড়ে মত্ত আপাত মুসলিমদের আল্লাহ খুব বড় একটা ধাক্কা দিয়েছেন এভাবে –“…..তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস কর এবং কিছু অংশকে প্রত্যাখ্যান কর? সুতরাং তোমাদের যারা এরকম করে তাদের একমাত্র প্রতিফল পার্থিব জীবনে হীনতা এবং কিয়ামতের দিন তারা কঠিনতম শাস্তির দিকে নিক্ষিপ্ত হবে।………” [সূরা বাক্বারা, ২ : ৮৫]আবার বলি। শ্যাম এবং কূল দুটো একসাথে রাখার কোন সিস্টেম ইসলামে নাই। বাঁশি সহ শ্যামকে ওয়াক-আউট না করাতে পারলে ইসলাম থাকবেনা। একটা মানুষ হয় মুসলিম নাহয় কাফির – মাঝামাঝি কিছু নেই। আর মুসলিম মানে সুন্নাতের কাছে আত্মসমর্পণ। একজন কত ভালো ভাবে আত্মাকে সমর্পণ করতে পারলো সেটা দিয়ে নির্ধারিত হবে সে কোন গ্রেডের মুসলিম। পা-ঝাড়া মুসলিম হয়ে এপারে জানাজাটুকু মিললেও ওপারে কিন্তু কেবলই কাঁচকলা।
আলেম সমাজ একমত যে বুখারী ও মুসলিম বিশুদ্ধ কিতাব। এ দু’টি কিতাবকে একত্রে ‘ছহীহায়ন’ তথা বিশুদ্ধ দু’খানা কিতাব বলা হয়। বুখারী ও মুসলিমের বিশুদ্ধতার বিষয়ে মনীষীদের সুচিন্তিত অভিমত নিম্নে প্রদত্ত হ’ল-ছহীহ বুখারী :১. জমহূর মুহাদ্দিছীনে কেরামের মতে,أصح الْكتب بعد كتاب الله الصحيح البخارى- ‘আল্লাহর কিতাব কুরআনুল কারীমের পর সর্বাধিক বিশুদ্ধ কিতাব হ’ল ছহীহুল বুখারী’।[1]২. হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী ইমাম নববী সহ অসংখ্য মুসলিম মনীষী বলেছেন,اتفق العلماء رحمهم الله على أن أصح الكتب بعد القرآن العزيز الصحيحان البخاري ومسلم وتلقتهما الأمة بالقبول وكتاب البخاري أصحهما وأكثرهما فوائد ومعارف ظاهرة وغامضة- ‘জমহূর ওলামায়ে কেরাম ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, কুরআনুল কারীমের পর সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ হ’ল ‘ছহীহায়ন’ তথা ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিম। আর ছহীহ বুখারী হ’ল উভয় কিতাবের মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধতম, অধিক উপকারী, সুপরিচিত ও সূক্ষ্ম’।[2]৩. হাফেয মূসা ইবনে হারূণ বলেন,لو أن أهل الاسلام اجتمعوا على أن ينصبوا آخر مثل محمد بن إسماعيل ما قدروا عليه- ‘যদি সকল মুসলমান একত্রিত হয়ে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল আল-বুখারী (রহঃ) কর্তৃক সংকলিত ছহীহ আল-বুখারীর মতো উঁচু মানের ও বিশুদ্ধ কিতাব সংকলন করতে চেষ্টা করে, তবুও তারা তা করতে সক্ষম হবে না’।[3]৪. হাফেয আবু ইয়ালা আল-খলীলী স্বীয় ‘ইরশাদ’ গ্রন্থে লিখেছেন,رحم الله مُحَمَّد بن إِسْمَاعِيل فَإِنَّهُ ألف الْأُصُول يَعْنِي أصُول الْأَحْكَام من الْأَحَادِيث وَبَين للنَّاس وكل من عمل بعده فَإِنَّمَا أَخذه من كِتَابه كمسلم بن الْحجَّاج ‘আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল (রহঃ)-এর প্রতি রহম করুন। কেননা তিনি ইলমে হাদীছের হুকুম-আহকাম তথা মূলনীতি প্রণয়ন করেছেন ও তাঁর পরে যারা একাজ করবে তাদের প্রত্যেকের জন্য সুস্পষ্ট বর্ণনা করেছেন। বস্ত্তত তাঁর সংকলিত ছহীহ বুখারী থেকে অন্যান্য মুহাদ্দিছ তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন। যেমন ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (রহঃ)।[4]৫. ইমাম নাসাঈ (রহঃ) বলেন, ما فى هذه الكتب كلها أجود من كتاب البخارى- অর্থাৎ ‘হাদীছের এসব কিতাবের মধ্যে ছহীহ আল-বুখারী অপেক্ষা অধিক উত্তম আর কোন কিতাব নেই’।[5]৬. আবূ জা‘ফর মাহমূদ ইবনে আমর আল-আকীলী বলেন, لما ألف البُخَارِيُّ كتاب الصَّحِيْح عرضه على أَحْمد بن حَنْبَل وَيحيى بن معِين وعَلى بن الْمَدِينِيّ وَغَيرهم فاستحسنوه وشهدوا لَهُ بِالصِّحَّةِ الا فِي أَرْبَعَة أَحَادِيث- অর্থাৎ ইমাম বুখারী (রহঃ) ছহীহ আল-বুখারীর পান্ডুলিপি আলী ইবনুল মাদীনী, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, আহমাদ ইবনে হাম্বল প্রমুখ সমকালীন জগদ্বিখ্যাত মনীষীগণের নিকট পেশ করেন। তাঁরা একে উত্তম বলে অভিহিত করেন এবং মাত্র চারটি হাদীছ ব্যতীত সকল হাদীছের বিশুদ্ধতার স্বীকৃতি প্রদান করেন। অবশ্য ইমাম বুখারী (রহঃ)-এর শর্তে ঐ চারটি হাদীছও ছহীহ’।[6]৭. আবু যায়েদ আল-মারওয়াযী বলেন,كنت نَائِما بَين الرُّكْن وَالْمقَام فَرَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْمَنَامِ فَقَالَ لي يَا أَبَا زيد إِلَى مَتى تدرس كتاب الشَّافِعِي وَلاَ تدرس كتابي، فَقلت يَا رَسُول الله وَمَا كتابك قَالَ جَامع مُحَمَّد بن إِسْمَاعِيل- অর্থাৎ আমি রুকনে ইয়ামানী ও মাকামে ইবরাহীমের মাঝামাঝি স্থানে ঘুমন্ত ছিলাম। এ সময় আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আমাকে বলছেন, হে আবু যায়েদ! শাফেঈর কিতাবের দারস আর কতদিন দিবে, আমার কিতাবের দারস দিবে না? তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! আপনার কিতাব কোনটি? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল আল-বুখারীর জামি‘ তথা ছহীহ বুখারী।[7]ছহীহ মুসলিম :এ বিশ্বে ইলমে হাদীছের যতগুলো কিতাব সংকলিত হয়েছে, তন্মধ্যে দু’টি কিতাবকে ওলামায়ে কেরাম ‘ছহীহায়ন’ তথা ‘বিশুদ্ধতম দু’টি কিতাব’ বলে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। এ ছহীহায়নের একটি হ’ল ছহীহ মুসলিম। অধিকাংশ মুহাদ্দিছীনে কেরাম ছহীহায়নের ছহীহ বুখারীকে সর্বাধিক বিশুদ্ধতম বলে অভিমত পোষণ করলেও আবু আলী নিসাপুরীসহ মুসলিম বিশ্বের ও পাশ্চাত্যের কিছু সংখ্যক মনীষী অভিমত পোষণ করেছেন যে, أَن كتاب مُسلم أفضل من كتاب البُخَارِيّ ছহীহ মুসলিম ছহীহ বুখারীর চেয়ে উত্তম।[8]১. হাফেয ইবনে মান্দাহ (রহঃ) বলেন,سمعت أبا علي الحسين بن علي النيسابوري، يقول: ما تحت أديم السماء أصح من كتاب مسلم بن الحجاج في علم الحديث অর্থাৎ আমি আবু আলী নিসাপুরীকে বলতে শুনেছি, এ আকাশের নীচে ছহীহ মুসলিমের চেয়ে অধিক বিশুদ্ধ ইলমে হাদীছের কোন কিতাব নেই’।[9]২. হাফেয ইবনে হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন,حصل لمسلم في كتابه حظ عظيم مفرط لم يحصل لأحد مثله অর্থাৎ ‘ইমাম মুসলিম (রহঃ) তাঁর ছহীহ মুসলিমের কারণে এত দ্রুততার সাথে এমন মহান সৌভাগ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন যে, এত দ্রুততার সাথে ঐ স্তরে পেঁŠছা কারোর পক্ষে সম্ভব নয়’।[10]৩. হাফেয মুসলিম ইবনে কুরতুবী (রহঃ) ছহীহ মুসলিম সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, لم يضع أحد فى الإسلام مثله অর্থাৎ ‘ইসলামে এরূপ গ্রন্থ কেউ রচনা করতে সক্ষম হয়নি’।[11]৪. আবু সাঈদ ইবনে ইয়া‘কূব বলেন,رأيت فيما يرى النائم كأن أبا على الزغورى يمضى فى شارع الحيرة وفى يده جزء من كتاب مسلم يعنى ابن الحجاج، فقلت له ما فعل الله بك؟ قال نجوت بهذا وأشار إلى ذلك الجزء. অর্থাৎ ‘প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ আবু আলী মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল আযীয ইবনে আব্দুল্লাহ আয-যাগূরীকে যেন স্বপ্নে দেখলাম, তিনি নিসাপুরের ‘হিরাত’ নামক রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন এবং তাঁর হাতে রয়েছে ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজের সংকলিত হাদীছগ্রন্থ ছহীহ মুসলিমের একটি খন্ড। আমি তাঁকে বললাম, আল্লাহ তা‘আলা আপনার সাথে কি আচরণ করেছেন? তখন তিনি ছহীহ মুসলিমের খন্ডটির দিকে ইশারা করে বললেন, এর বদৌলতে আমি (জাহান্নাম থেকে) নাজাত পেয়েছি’।[12]ইমাম মুসলিম (রহঃ) তাঁর অনবদ্য গ্রন্থ ছহীহ মুসলিম সংকলনে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। হাদীছের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ে শুধু নিজের অভিমত ও দৃষ্টিকোণকেই প্রাধান্য দেননি; বরং তৎকালীন জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিছগণের অভিমত ও পরামর্শানুযায়ী হাদীছ লিপিবদ্ধ করেছেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেন,لَيْسَ كُلُّ شَيْءٍ عِنْدِيْ صَحِيْحٌ وَضَعْتُهُ ها هنا إنما وضعت ها هنا مَا أَجْمَعُوْا عَلَيْهِ অর্থাৎ শুধু আমার নিজস্ব অভিমতের ভিত্তিতে বিশুদ্ধতা যাচাইয়ে এ কিতাবে হাদীছ সন্নিবেশ করিনি; বরং যে সকল হাদীছের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে সমকালীন মুহাদ্দিছগণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন ঐ সকল হাদীছও লিপিবদ্ধ করেছি’।[13]ছহীহ মুসলিমের পান্ডুলিপি বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের জন্য যে সকল মনীষীর নিকট পেশ করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে আবু যুর‘আ অগ্রগণ্য, যিনি হাফেযুল হাদীছ নামে খ্যাত। মাক্কী ইবনে আবদান বলেন,سمعت مسلما يقول : عرضت كتابى هذا المسند على أبى رزعة فكل ما أشار على فى هذا الكتاب ان له علة وسببا تركته وكل ما قال : أنه صحيح ليس له علت فهو الذى أخرجت.‘আমি ইমাম মুসলিম (রহঃ)-কে বলতে শুনেছি, আমি এ কিতাব (ছহীহ মুসলিম) আমার শ্রদ্ধেয় উস্তায প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ আবু যুর‘আ-এর নিকট উপস্থাপন করেছি। অতঃপর যে হাদীছের মধ্যে ত্রুটি আছে বলে তিনি ইঙ্গিত করেছেন, আমি নিঃসংকোচে তা পরিত্যাগ করেছি। আর যে সকল হাদীছ বিশুদ্ধ ও ত্রুটিমুক্ত বলে অভিমত পোষণ করেছেন, সে সকল হাদীছ আমি এ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছি’।[14]ছহীহ মুসলিম সংকলনান্তে ইমাম মুসলিম (রহঃ) দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন,ما وضعة فى هذا المسند شيئا الا بحجة ولا اسقطة شيئا منه الا بحجة. অর্থাৎ বিশুদ্ধতার অকাট্য প্রমাণ ছাড়া কোন হাদীছ আমি এ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করিনি এবং অশুদ্ধতার অকাট্য প্রমাণ ছাড়া কোন হাদীছ আমি পরিত্যাগও করিনি’।[15]ইমাম মুসলিম (রহঃ) স্বীয় অমর সংকলন ছহীহ মুসলিমের বিশুদ্ধতার প্রতি সর্বোচ্চ আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে দাবী রেছেন,لو أن أهل الحديث يكتبون مائتي سنة الحديث فمدارهم على هذا المسند অর্থাৎ ‘যদি মুহাদ্দিছগণ দু’শত বছর অক্লান্ত পরিশ্রম ও কঠোর সাধনা করে ইলমে হাদীছের কোন গ্রন্থ সংকলন করেন তবুও এ গ্রন্থের ওপর তাঁদেরকে নির্ভর করতে হবে’।[16]– ক্বামারুয্যামান বিন আব্দুল বারীপ্রধান মুহাদ্দিছ, বেলটিয়া কামিল মাদরাসা, জামালপুর। [1]. আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী (হানাফী), উমদাতুল ক্বারী (বৈরূত : দারু এহইয়াইত তুরাছিল আরাবী, তাবি), ১/৫ পৃঃ; জালালুদ্দীন জালালাবাদী; মিফতাহুল উলূম ওয়াল ফুনূন (হাটহাজারী, চট্টগ্রাম, তাবি), পৃঃ ৫৮; মান্না আল-কাত্ত্বান, তারীখুত তাশরীয়িল ইসলামী (রিয়ায : মাকতাবাতুল মা‘আরিফ ১৯৯৬ ইং/১৪১৭ হিঃ), পৃঃ ৯৪।[2]. শরহে মুসলিম লিন নববী, ১/১৫ পৃঃ, সাইয়েদ ছিদ্দীক হাসান কানুহী, আল-হিত্তাহ ফী যিকারিছ ছিহাহ সিত্তাহ, (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলয়িয়্যাহ, ১৯৮৫ ইং), পৃঃ ১৬৮; হাজী খলীফা, কাশফুয যুনূন (বৈরূত : দারু ইহইয়ায়িত তুরাছিল আরাবী, ১/৫৪১ পৃঃ; তাদবীবুর রাবী, পৃঃ ৬৭।[3]. হাফেয জালালুদ্দীন আল-মিযযী, তাহযীবুল কামাল ফী আসমাইর রিজাল, (বৈরূত : মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ ১৯৯২ইং), ২৪/৪৫৭; হাফেয শামসুদ্দীন আয-যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, (বৈরূত : মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, ১৯৯৬ইং/১৪১৭ হিঃ), ১২/৪৩৪ পৃঃ।[4]. হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী, হুদা আস-সারী মুক্বাদ্দামাতু ফাতহিল বারী (রিয়ায : মাকতাবাতু দারিস সালাম, ১৯৯৭ইং/১৪১৮ হিঃ), পৃঃ ১৪।[5]. শাববীর আহমাদ উছমানী, মুক্কাদ্দামাতু ফাতহিল মুলহিম (দেওবন্দ : মাকতাবাতুল আশরাফিয়া, ১৯৯৯ ইং), ১/৯৭ পৃঃ; তাদবীবুর রাবী, পৃঃ ৭০।[6]. হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী, তাহযীবুত তাহযীব (বৈরূত : দারু ইহইয়াইত তুরাছ আল-আরাবী, ১৯৯৩ ইং/১৪১৩ হিঃ), ৫/৩৭ পৃঃ; হুদা আসসারী মুক্বাদ্দামাতু ফাতহিল বারী, পৃঃ ৯।[7]. হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী, মুকাদ্দামাতু ফাতহিল বারী (বৈরূত : ইহয়াইত তুরাছিল আরাবী, তাবি), ১/৪৭৮; আত-তুহফাতু লি তালিবিল হাদীছ, পৃঃ ৮।[8]. হুদা আস-সারী, পৃঃ ১৩; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১২/৫৬৭ পৃঃ; তারীখুত তাশরীঈল ইসলামী, পৃঃ ৯৪; শরহে ছহীহ মুসলিম নববী, ১/১৫ পৃঃ।[9]. তাযকিরাতুল হুফফায, ২/৫৮৯ পৃঃ; তারীখু বাগাদাদ, ৩/১০১ পৃঃ; শাযারাতুয যাহাব, ২/১৪৪ পৃঃ।[10]. তাহযীবুত তাহযীব, ৫/৪২৭ পৃঃ; মুকাদ্দামাতু ফাতহিল মুলহিম, ১/৯১ পৃঃ; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১২/৫৬৭ পৃঃ।[11]. হায়াতুল মুছান্নিফীন, পৃঃ ৫৫; হুদা আস-সারী বারী, পৃঃ ১৬।[12]. বুস্তানুল মুহাদ্দিছীন, পৃঃ ২৩২।[13]. আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া ইবনে শরফুদ্দীন নববী, শরহে ছহীহ মুসলিম (দারুত তাহাভী, তা.বি), ১/১৬ পৃঃ; আল-হিত্তাহ ফী যিকরিছ ছিহাহ সিত্তাহ, পৃঃ ২০১; তাদরীবুর রাবী, পৃঃ ৭৩।[14]. আল্লামা শাববীর আহমাদ ওছমানী, ফাতহুল মুলহিম, (দেওবন্দ : মাকতাবাতুল আশরাফিয়া, ১৯৯৯ খ্রিঃ), ১/১০১ পৃঃ; মিফতাহুল উলূম ওয়াল ফুনূন, পৃঃ ৫৮।[15]. তাযকিরাতুল হুফফায, ২/৫৮৯ পৃঃ; কাশফূয যুনূন আন আসামিল কুতুবি ওয়াল ফুনূন, ১/৫৫৫ পৃঃ।[16]. শরহে ছহীহ মুসলিম, ১/১৬ পৃঃ; মুকাদ্দামাতু ছহীহ মুসলিম লি নববী, ১/১৩ পৃঃ।
‘(তুমি বল) তবে কি আমি আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে বিচারকরূপে কামনা করব? অথচ তিনি তোমাদের প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন বিস্তারিত ব্যাখ্যাসহ। আর যাদেরকে আমরা ইতিপূর্বে কিতাব দিয়েছিলাম, তারা ভালভাবেই জানে যে, এটি (কুরআন) তোমার প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে সত্যসহ নাযিল হয়েছে। অতএব তুমি অবশ্যই সংশয়বাদীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না’ (১৪)। ‘তোমার প্রতিপালকের বাণী সত্য ও ন্যায় দ্বারা পূর্ণ। তাঁর বাণীর পরিবর্তনকারী কেউ নেই। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ’ (১৫)। ‘অতএব যদি তুমি জনপদের অধিকাংশ লোকের কথা মেনে চল, তাহ’লে ওরা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুৎ করবে। তারা তো কেবল ধারণার অনুসরণ করে এবং তারা তো কেবল অনুমান ভিত্তিক কথা বলে’ (আন‘আম-মাক্কী ৬/১১৪-১৬)।সংক্ষিপ্ত তাফসীর......পরপর বর্ণিত তিনটি আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ইসলামী জীবন ব্যবস্থার মৌলিক কিছু ভিত্তি ও নীতি বর্ণনা করেছেন। যেমন-(১) যেকোন বিষয়ে চূড়ান্ত ফায়ছালা দানকারী হ’লেন আল্লাহ। অতএব আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে বিধানদাতা বা বিচারক হিসেবে গ্রহণ করা বৈধ নয় (কুরতুবী)।(২) আল্লাহর কিতাব সবকিছুর বিস্তারিত ব্যাখ্যা। অর্থাৎ হালাল-হারাম, ন্যায়-অন্যায় এবং জীবনযাপনের সকল মৌলিক বিধি-বিধান তিনি এই কিতাবে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন।(৩) ইহূদী-নাছারাগণ কুরআনের সত্যতা জানা সত্ত্বেও মুখে সন্দেহ প্রকাশ করবে।(৪) ঈমানদারগণকে অহি-র বিধানে সন্দেহ করা চলবে না।(৫) আল্লাহর কালাম সত্য ও সুবিচার দ্বারা পূর্ণ। অর্থাৎ কুরআনে বর্ণিত প্রতিটি সংবাদ ও তথ্য সত্য এবং এর প্রতিটি আদেশ, নিষেধ ও বিধান ন্যায়পূর্ণ। এতে কোন ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতা নেই। তাই কোন সংযোজন বা বিয়োজনের প্রয়োজন নেই। রাসূল (ছাঃ)-এর সুস্পষ্ট ঘোষণা, যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু উদ্ভাবন (বিদ‘আত) করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত (বুখারী হা/২৬৯৭)।(৬) কুরআনের কোন পরিবর্তনকারী নেই। ক্বিয়ামত পর্যন্ত কেউ এর কোন একটি শব্দ বা বিধানকে রদবদল বা পরিবর্তন করতে পারবে না। আল্লাহ স্বয়ং এর সংরক্ষক।(৭) আল্লাহর বাণী যে অপরিবর্তনীয় এবং তিনি যে সবকিছু শোনেন ও জানেন এই বিশ্বাস একজন মুমিনকে শত প্রতিকূলতার মাঝেও হকের উপর অবিচল থাকতে সাহস যোগায়।(৮) আল্লাহ প্রেরিত অহি-র বিধান হ’ল চূড়ান্ত ও অভ্রান্ত।(৯) সংখ্যা কখনো হক ও বাতিলের মাপকাঠি নয়। অধিকাংশ মানুষ তাদের প্রবৃত্তি, অজ্ঞতা, পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুসরণ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয়। তাই সত্য যাচাইয়ের মানদন্ড যদি আল্লাহর বাণী না হয়ে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের মতামত হয়, তাহলে ফলাফল হবে নিশ্চিত পথভ্রষ্টতা।(১০) সত্যের অনুসারীরা সংখ্যায় কম হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘ইসলাম নিঃসঙ্গভাবে যাত্রা শুরু করেছিল। সত্বর সেই অবস্থায় ফিরে আসবে। অতএব সুসংবাদ হ’ল সেই অল্পসংখ্যক লোকদের জন্য যারা দ্বীনের সংস্কার করবে। যখন মানুষ নষ্ট হয়ে যাবে (ছহীহাহ হা/১২৭৩, রাবী ইবনু মাসঊদ (রাঃ)।(১১) আল্লাহর বিধানের অনুসরণে সমাজের অধিকাংশ লোক বাধা হবে।(১২) অহি-র বিধানের বিপরীতে অধিকাংশের রায় গ্রহণযোগ্য নয়।(১৩) অধিকাংশের মতের বিরুদ্ধে অহি-র বিধানকে প্রতিষ্ঠা দানে চাই উক্ত লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ একদল ঈমানদার মুজাহিদ।(১৪) অহি-র বিধান দলমত নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য কল্যাণবহ।দুনিয়াতে নাস্তিকের সংখ্যা খুবই কম। বরং মুশরিকের সংখ্যাই বেশী। যারা আল্লাহকে স্বীকার করে। কিন্তু তারা আল্লাহর সাথে বা তাঁর গুণাবলী ও আইন-বিধানের সাথে অন্য কোন সত্তা ও গুণাবলী বা তার বিধানকে শরীক করে। আল্লাহ বলেন, وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللهِ إِلاَّ وَهُمْ مُشْرِكُونَ- ‘তাদের অধিকাংশ আল্লাহকে বিশ্বাস করে। অথচ তারা শিরক করে’ (ইউসুফ-মাক্কী ১২/১০৬)। অর্থাৎ ঈমানদারগণের অধিকাংশ আল্লাহর সাথে বা তাঁর গুণাবলীর সাথে অন্যকে শরীক করে। মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যারা ঈমান আনার পরেও বিভিন্ন শিরকে লিপ্ত রয়েছে, তারাও এ আয়াতের হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। (এ বিষয়ে হাফেয ইবনু কাছীর স্বীয় তাফসীরে অনেকগুলি হাদীছ উদ্ধৃত করেছেন)।আরবের মুশরিকরা আল্লাহকে মানতো। যখন তারা হজ্জ করত তখন ‘তালবিয়া’ পাঠ করার সময় বলত,لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ إِلاَّ شَرِيكًا هُوَ لَكَ تَمْلِكُهُ وَمَا مَلَكَ- ‘আমি হাযির হে আল্লাহ তোমার কোন শরীক নেই। একজন মাত্র শরীক আছে তোমার জন্য। তুমি তার ও তার অধিকারভুক্ত সব কিছুর মালিক’। মুসলিম শরীফের অন্য বর্ণনায় এসেছে, যখন মুশরিকরা তালবিয়া পাঠ করত, তখন ‘লাববায়েক লা শারীকা লাকা’ পর্যন্ত গেলেই আল্লাহর নবী (ছাঃ) তাদের বলতেন, قَدْ قَدْ ‘যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে। আর বেড়ো না।১কিন্তু শুধুমাত্র আল্লাহর স্বীকারোক্তি তাদেরকে মুমিন বানাতে পারেনি। তাদের নাম ‘আব্দুল্লাহ’ ‘আব্দুল মুত্ত্বালিব’ ছিল। কিন্তু শুধু নাম দিয়েই তারা মুসলমান হ’তে পারেনি। আজকের নামকা ওয়াস্তে মুসলমানরাও আল্লাহকে স্বীকার করে। কিন্তু জীবনের যে সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান মেনে চললে দুনিয়াবী স্বার্থের ক্ষতি হয়, সে সকল ক্ষেত্রে তারা তা অমান্য করে বা কৌশলে এড়িয়ে চলে। আর একারণেই তারা সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ইত্যাদি বিজাতীয় মতবাদের প্রতিষ্ঠাকল্পে জানমাল ব্যয় করে। কিন্তু আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে চায় না। এর জন্য জান-মাল ও শ্রম ব্যয় করতে চায় না। কারণ আল্লাহর আইন সকল বান্দার জন্য সমান। সেখানে সবল, দুর্বল, সরকারী দল, বিরোধী দল কারু জন্য কোন দয়া প্রদর্শন করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ইসলামের ফৌজদারী আইন বাহ্যত খুবই কঠোর, যা থেকে বাঁচার জন্য সমাজের প্রায় সকল অপকর্মের হোতা সমাজনেতা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বিভিন্ন অজুহাতে আল্লাহর আইনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে ভয় পায়।অত্র আয়াতে সার্বভৌম ক্ষমতা আল্লাহকে প্রদান করা হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ঊর্ধে। অর্থাৎ দেশের জাতীয় সংসদে যদি এমন কোন আইন পাস হয়, যা আল্লাহর আইনের সাথে সাংঘর্ষিক, তখন রাষ্ট্র প্রধানের কর্তব্য হবে আল্লাহর আইন বলবৎ করা ও সংসদে গৃহীত আইন প্রস্তাব বাতিল করা। কেননা মুসলিম রাষ্ট্র প্রধান ইসলামী আইন বলবৎ করতে ধর্মীয়ভাবেই বাধ্য। এখানে প্রণিধানযোগ্য যে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বলা হয়ে থাকে ‘জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস’। জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করেন সংখ্যাগরিষ্ট দলের প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর মন্ত্রী পরিষদ। রাষ্ট্রপ্রধান এখানে ক্ষমতাহীন একটি ইনস্টিটিউশন মাত্র।এক্ষণে মুসলিম রাজনীতিকগণ যদি জনগণকে সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস বলার মাধ্যমে আল্লাহর সার্বভৌম ও সর্বোচ্চ ক্ষমতাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে চ্যালেঞ্জ করেন, তবে তা হবে পরিষ্কারভাবে শিরক। আল্লাহ কর্তৃক হারামকৃত কোন বস্ত্তকে হালাল করার কোন অধিকার কোন মুসলিম সরকার বা রাষ্ট্রের নেই। অথচ বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন মুসলিম দেশের রাজনীতিকগণ দলীয় সংখ্যাগরিষ্টতার জোরে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে ব্যবহার করে আল্লাহ কর্তৃক হারামকৃত সূদ-ঘুষ-জুয়া-লটারী-বেশ্যাবৃত্তি সবকিছুর অবাধ অনুমতি দিচ্ছেন। মাদক সেবন, চুরি-ডাকাতি-রাহাযানির বিরুদ্ধে ইসলামের কঠোর বিধান তারা জারি করছেন না। আদালতগুলিতে আল্লাহর আইনে বিচার না করে নিজেদের তৈরী আইনে বিচারের নামে অবিচার করা হচ্ছে। এভাবে আল্লাহর স্বাধীন সৃষ্টি মানুষকে তারা নিজেদের গোলাম বানিয়েছে। এগুলি আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতাকে সরাসরি আঘাত করে। অতএব এই শিরকের মহাপাতক হ’তে বাঁচার জন্য প্রত্যেক মুসলমানকে জিহাদী প্রতিজ্ঞা নিয়ে এগিয়ে আসা কর্তব্য।ইসলামী জীবন ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মুমিনকে স্রেফ আল্লাহর অহি-র অনুসরণ করতে হয়। তবে যেসব বিষয় ব্যাখ্যা সাপেক্ষ, সেসব বিষয়ে ইসলামী শরী‘আতে অভিজ্ঞ বিদ্বানদের নিকট থেকে পরামর্শ ও উপদেশ গ্রহণ করতে হয়। ইসলামে হারাম-হালাল, ফরয-ওয়াজিব ইত্যাদি বিষয়গুলি স্পষ্ট দলীল দ্বারা প্রমাণিত। অতএব এ বিষয়গুলি ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে বাস্তবায়ন করা প্রত্যেক মুমিনের ধর্মীয় দায়িত্ব। এর জন্য রাষ্ট্রপ্রধান পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী হবেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ‘অধিকাংশের রায় চূড়ান্ত’। ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ‘অহি-র বিধানই চূড়ান্ত’। জাতীয় সংসদে অধিকাংশের রায় যদি অহি-র বিধানের বিপরীত হয়, তবে রাষ্ট্রপ্রধান ঐ রায়ে ভেটো দিবেন ও অহি-র বিধান বলবৎ করবেন। উপরে বর্ণিত ১১৬ নং আয়াতে অধিকাংশের কথা অনুযায়ী কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে, যদি তা আল্লাহর বিধানের বিপরীত হয়।ইসলামী শরী‘আতের সীমারেখার মধ্যে ইসলামী বিদ্বানদের অধিকাংশের মতামত ততক্ষণ গ্রহণযোগ্য হ’তে পারে, যতক্ষণ তা কুরআন ও ছহীহ হাদীছের প্রকাশ্য অর্থের অনুকূলে হবে। নইলে প্রত্যাখ্যাত হবে। যখনই স্পষ্ট ছহীহ হাদীছ পাওয়া যাবে, তখনই সকল ‘রায়’ বাতিল হবে। যদিও সেটা পার্লামেন্ট বা প্রেসিডেন্টের রায় হয়। অতএব প্রচলিত সকল বিধানকে অহি-র বিধানের অনুকূলে বাতিল বা সংশোধন করে নেওয়া সকল মুমিনের জন্য বিশেষ করে সরকারী দল ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উপরে ফরয দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনের জন্য এবং সরকার ও জনগণকে সচেতন ও সক্রিয় করে তোলার জন্য অবশ্যই একটি জামা‘আত বা দল থাকতে হবে। যারা উক্ত লক্ষ্যে দিনরাতের আরামকে হারাম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যেকোন ত্যাগের বিনিময়ে এগিয়ে যেতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হবে।পরিশেষে বলব, বাংলাদেশের প্রচলিত রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সাংঘর্ষিক। মুসলমান হিসাবে আমাদের দায়িত্ব সবকিছুকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পুনর্গঠন করা। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দিন- আমীন!– প্রফেসর ড. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব(আত-তাহরীক)
পড়ন্ত বিকেলের শীতল বাতাসে শরীর কাঁটা দিচ্ছে। পদ্মজা শাল গায়ে জড়িয়ে নিয়ে পা রাখল নিচতলায়, ফরিনার ঘরে। ফরিনা কাঁথা সেলাই করছিলেন। পদ্মজাকে দেখে দুই পা ভাঁজ করে বসে উল্লাস করে বললেন, ‘তুমি আইছো!পদ্মজা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, ‘জি, আম্মা। কাঁথা সেলাই করছিলেন নাকি। আমি সাহায্য করি?’‘না, না তুমি এইসব পারবা না। সুঁই লাগব হাতে।’‘কিছু হবে না, আম্মা। প্রতিদিনই সেলাই করা হয়।’ফরিনা অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘তুমি কাঁথা সিলাও?’পদ্মজা হেসে বলল, ‘ওই একটু।’‘কেরে? আমরা থাকতে তুমি সিলাও কেরে? তোমার সৎ আম্মায় তো নকশিকাঁথা সিলায়। হে থাকতে তোমার সিলাই করা লাগে কেরে?’পদ্মজা ফরিনার হাত থেকে সুঁই টেনে নিয়ে বলল, ‘আব্বা মারা যাওয়ার পর দুই বছর আমি কেমন অবস্থা ছিলাম জানেনই তো। সে অবস্থায় আমার পক্ষে আমার পরিবারের জন্য কিছু করা সম্ভব ছিল না। তখন উনি পর হয়েও, সৎ মা হয়েও নিজের ঘাড়ে সব দায়িত্ব তুলে নিলেন। কিন্তু যতটুকু করতেন ততটুকুতে পরিবার চলতে গিয়ে হিমশিম খেত। তাই আমিও চেষ্টা করেছি একটু যদি নকশিকাঁথার পরিমাণটা বাড়ানো যায়!’ পদ্মজার ফুলের পাপড়ির মতো ফোলা ফোলা দুটি ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল, সেই হাসিতে পরমা সুন্দরীর মুখমণ্ডল যেন আলোকিত হয়ে উঠল অল্প আভায়। ফরিনা অবাক হয়ে সেই হাসি দেখলেন।মন দিয়ে কাঁথায় ফুল তুলছে পদ্মজা। দাঁত দিয়ে সুতা কেটে ফরিনার দিকে তাকাল। পদ্মজার নিখুঁত নাক, নিখুঁত চোখ। ফরিনা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। পদ্মজা ডাকল, ‘আম্মা?’ফরিনার সংবিৎ ফিরতেই প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি নাকি শহরে কাম করো?পদ্মজা হাসল, ‘হু, করা হয়। প্রেমা-প্রান্ত দুইজনই পড়াশোনা করে। পড়ালেখার কত খরচ! আর পূর্ণা তো পড়ালেখার চেয়ে বেশি খরচ করে ফেলে শাড়ি-অলংকার কিনতে গিয়ে। আম্মা নেই। বাধা দিতে কষ্ট হয়। আর উনি নিজের সব সঞ্চয় উজার করে দেন আমার তিন ভাই-বোনকে। টাকা তো থাকে না। তাই চাকরি নিতে হলো। দুই বোনের বিয়ে দিতে হবে না? আমার তো ফরজ কাজ বাকি। তার জন্য টাকা জমাতে হচ্ছে। আর উনার নকশিকাঁথার টাকার সঙ্গে বেতনের কিছুটা অংশ মিলিয়ে পাঠিয়ে দেই। বেশ ভালোই চলছে। উনি আছেন বলেই আমার মাথার উপরের চাপটা কমেছে।’‘হ, বাসন্তী অনেক ভালা। আমি হের চেয়ে চার বছরের বড়ো। মেলা সম্মান করে আমারে। আচ্ছা, আমির তোমারে বাইরে কাম করতে দিছে?’এ প্রশ্নে পদ্মজা কপাল চাপড়ে বলল, ‘আর বলবেন না, আম্মা! কী যে যুদ্ধ করতে হয়েছে। শেষমেশ রাজি হয়েছেন। কিন্তু উনার অফিসে নাকি চাকরি করতে হবে। উনার অফিসে চাকরি নিলে উনি আমাকে কোনো কাজ করতে দিতেন? টাকা ঠিকই মাস শেষে হাতে গুঁজে দিতেন। ঘুরে-ফিরে, স্বামীর টাকায় বাপের বাড়ি খায় কথাটা আত্মসম্মানের সঙ্গে লেগে যেত। এ নিয়ে তিনদিন আমাদের ঝগড়া ছিল। আলাদা থেকেছি, কেউ কারো সঙ্গে কথা বলিনি।’ফরিনা বেশ আগ্রহ পাচ্ছেন। উৎসুক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘এরপরে কী হইলো? কাম করতে দিছে কেমনে?’‘এরপর… তিন দিন পর এসে বলল, চাকরি পেয়েছে একটা। ছয় ঘণ্টা কাজ। হিসাব রক্ষকের পদ। বেতন ভালো। জানেন আম্মা, আমি ভীষণ অবাক হয়েছি! এত কম সময়ের চাকরি, আবার বেতনও তুলনায় বেশি 1 এরপর জানতে পারি উনার পরিচিত একজনের অফিসে চাকরি বন্দোবস্ত করেছেন। উনি চান না আমি বেশি সময় বাইরে থাকি। আবার জেদ ধরেও বসে ছিলাম। এভাবেই সব ঠিক হয়। ইনশাআল্লাহ আম্মা, পূর্ণার বিয়েটা ধুমধামে হয়ে যাবে। প্রেমার তো দেরি আছে। অনেক পড়বে ও।’ফরিনা পদ্মজার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘আল্লাহ হাজার বছর বাঁচায়া রাখুক।’‘আম্মা, রুম্পা ভাবি কী তিন তলায়?’‘হ।’‘আজ দেখতে যাব ভাবছি। চাবি কার কাছে?’ফরিনা মুখ গুমট করে বললেন, ‘হেই ঘরে যাওনের দরকার নাই। রিদওয়ান চাবি দিব না। ওরা আর আমারারে দাম দেয় না। যেমনে ইচ্ছা চলে।’‘দিবে না মানে কী? আপনি গুরুজন আপনাকে দিতে বাধ্য।’‘চাইছিলাম একবার, যা ইচ্ছা কইয়া দিছে।’ ফরিনার মুখে আঁধার নেমে আসে। তিনি নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, ‘চাবি চাওনের লাইগগা রিদওয়ান হের আম্মারেও মারছে।’পদ্মজার চোখ দুটি বড়ো বড়ো হয়ে যায়, ‘সে কী! মায়ের গায়ে হাত তুলেছে?ফরিনা কাঁথা সেলাই করতে করতে বললেন, ‘নিজের মা আর কই থাইকা! এই ছেড়ার মাথা খারাপ। অমানুষ।‘বাড়ির অন্যরা কিছু বলেনি?’‘অন্যরা কারা?’‘আব্বা, চাচা, বড়ো ভাই কেউ কিছু বলেনি?’‘বাকিদের কথা জানি না। তোমার শ্বশুর তো নিজেই শকুনের বাচ্চা।’ পদ্মজা চমকে তাকাল। ফরিনাও চকিতে চোখ তুলে তাকালেন। তিনি মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন। দুজন দুজনের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। পদ্মজা প্রশ্ন করার আগে ফরিনা বললেন, ‘পূর্ণায় গাছে উঠছে। সকালে আছাড়ড়া খাইল বিকেল অইতেই গাছে উইট্টা গেছে। ছেড়িডারে কয়ডা মাইর দিয়ো।’পদ্মজা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে তার শাশুড়ি আগের কথাটা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে। সে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে পারল না। মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘আমি আসি।’‘যাও।’পদ্মজা দরজা অবধি এসে ফিরে তাকাল। ফরিনা দ্রুত দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিলেন। পদ্মজা ঘর ছাড়তেই তিনি হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। পদ্মজা উদাসীন হয়ে হাঁটছে আর ভাবছে: আম্মা কেন নিজের স্বামীকে শকুনের বাচ্চা বললেন?পদ্মজা সামলে নিলো নিজেকে। এখন এসব ভাবা যাবে না। রিদওয়ানের কাছ থেকে চাবি নিতে হবে। সে রিদওয়ানের ঘরের সামনে এসে দরজায় শব্দ করতেই ওপাশ থেকে পুরুষালি কণ্ঠ ভেসে আসে, ‘কে?’পদ্মজা জবাব না দিয়ে আরো জোরে শব্দ করল। রিদওয়ান কপাল কুঁচকে দরজা খুলল। পদ্মজাকে দেখে কপালের ভাঁজ মিলিয়ে যায়। ঠোঁটে ফুটে ওঠে হাসি। মোটা হয়েছে আগের চেয়ে। গালভরতি ঘন দাড়ি। এক- দুটো চুল পেকেছে। সে খুশিতে গদগদ হয়ে বলল, ‘আরে বাপরে, পদ্মজা আমার দুয়ারে এসেছে!’পদ্মজা সোজাসুজি বলল, ‘রুম্পা ভাবির ঘরের চাবি দিন।রিদওয়ান দরজা ছেড়ে দাঁড়াল, ‘এতদিন পর এসেছো আবার আমার ঘরের সামনে! ভেতরে আসো, বসো। এরপর কথা বলি।’‘আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে আসিনি। দয়া করে চাবিটা দিন।’‘চাবি তো দেব না।’‘কী সমস্যা?’রিদওয়ান পদ্মজার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘আরে, ঘরে আসো তো আগে।’পদ্মজা এক ঝটকায় রিদওয়ানের হাত সরিয়ে দিল। চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল, ‘চাবি দিন।’‘চোখ দিয়ে তো আগুন ঝরছে। কিন্তু আমি তো ভয় পাচ্ছি না। চাবি আমি দেব না।’‘দেবেন না?’রিদওয়ান আড়মোড়া ভেঙে আয়েশি ভঙ্গিতে বলল, ‘না।’পদ্মজা আর কথা বাড়াল না। চলে গেল। রিদওয়ান পিছু ডেকেছে। সে শোনেনি। মগাকে দিয়ে পাথর আনিয়ে সোজা চলে গেল তিন তলায়। মদন একটা ঘরের সামনে চেয়ার নিয়ে বসে ছিল। তাহলে এই ঘরেই রুম্পা আছে। সে দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই মদন বিনয়ের সঙ্গে বলল, ‘কুনু কাম আছিল ভাবি?’পদ্মজা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, ‘তালা ভাঙব। মগা, তালা ভাঙ।’মদন দুই হাত মেলে দরজার সামনে দাঁড়াল, ‘রিদওয়ান ভাইয়ের কাছে চাবি আছে। তার কাছ থাইকা লইয়া আহেন। তালা ভাইঙেন না।’‘উনি আমাকে চাবি দেননি। তাই আমি তালা ভাঙব। আপনি সরে দাঁড়ান।’‘না, ভাবি, এইডা হয় না। আমার ওপরে এই ঘরডার ভার দিছে।’‘আপনি সরে দাঁড়ান।’ পদ্মজা কথাটা বেশ জোরেই বলল। মদন হাওলাদার বাড়ির বউয়ের সামনে আর দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেল না। দৌড়ে চলে গেল। বাড়ির সবাইকে জানাল, পদ্মজা তালা ভাঙছে।সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এলো খলিল, আলমগীর, আমির, রিদওয়ান, ফরিনা, আমিনা। ততক্ষণে পদ্মজা তালা ভেঙে ফেলেছে। আমির হন্তদন্ত হয়ে এসেই প্রশ্ন করল, ‘তালা ভাঙলে কেন?’‘আপনার ভাই আমাকে চাবি দেয়নি। আমার রুম্পা ভাবির সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে হচ্ছিল তাই ভেঙেছি।’‘এইডা অসভ্যতা। তোমারে ভালা ভাবছিলাম। ছেড়ি মানুষের এত তেজ, অবাধ্যতা ভালা না।’পদ্মজা এক নজর খলিলকে দেখল। এরপর ঢুকে গেল রুম্পার ঘরে। রুম্পা ঘরের মাঝে মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে। লম্বা চুল এখন ঘাড় অবধি! কে কেটে দিয়েছে? যেন চুল না ময়লা ঝাড়ু। পদ্মজা দৌড়ে রুম্পার পাশে এসে বসে। রুম্পার শাড়ি ঠিক করে দিয়ে ডাকল, ‘ভাবি? ভাবি? শুনছো ভাবি?’রুম্পার সাড়া নেই। গলায়, হাতে, পায়ে মারের দাগ। ফরিনা তাকে দেখে চমকে গেলেন। রুম্পার এক হাত চেপে ধরে উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘ও মা গো, কেলায় মারছে বউডারে? আল্লাহ গো, কেমনে মারছে। রক্ত শুকায়া পাথথর হইয়া গেছে। এর লাইগগা আমরারে রুম্পার কাছে আইতে দেও না তোমরা? বউডা তোমরারে কী করছে? পাগল মানুষ।’ ফরিনা বাড়ির পুরুষদের দিকে ঘৃণার চোখে তাকান। তিনি রূম্পার অবস্থা দেখে কাতর হয়ে উঠেছেন।আমিনা দূরেই দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বরাবরই অন্যরকম মানুষ। অহংকারী, হিংসুক। অন্যদের ভালো দেখতে পারে না। রানির জীবনটা এভাবে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর আরো বেশি খামখেয়ালি হয়ে উঠেছেন।পদ্মজা আমিরের দিকে তাকিয়ে হুংকার দিয়ে উঠল, ‘আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন? অন্যরা পাষাণ। আপনি তো পাষাণ না। ভাবিকে বিছানায় তুলে দিন।’পদ্মজার কথায় আমির রুম্পাকে কোলে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিল। আমির আর ফরিনা ছাড়া বাকি সবাই বিরক্তিতে কপাল ভাঁজ করে চলে যায়। তারা অসন্তুষ্ট। খলিল যাওয়ার আগে বিড়বিড় করে পদ্মজাকে অনেক কিছু বললেন। পদ্মজা সেসব কানে নেয়নি। সে শুধু অবাক হচ্ছে। মানুষগুলোর প্রতি ঘৃণা হয়। সে রুম্পার জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করছে। আমিরকে বলে, কবিরাজ নিয়ে আসতে। আমির চলে যায়। ফরিনার কাছ থেকে পদ্মজা জানতে পারল, তিনি দুই বছর পর রুম্পাকে দেখছেন! কী অবাক কাণ্ড! কখন চুল কাটা হয়েছে জানেন না। পদ্মজা জানতে চাইল, ‘কেন এত ভয় পান বাড়ির পুরুষদের? একটু শক্ত করে কথা বলে ভাবিকে দেখতে আসতে পারলেন না? ভাবির মা বাপের বাড়ি কোথায়? উনারা মেয়ের খোঁজ নেন না?’‘রুম্পার মা-বাপ নাই। ভাই আছে দুইডা। ভাইগুলা আগেই খোঁজ নিত না। পাগল হুনার পর থাইকা নামও নেয় নাই।’‘মানুষ এত স্বার্থপর কী করে হয়, আম্মা?’ফরিনা রুম্পার শাড়ির ময়লা ঝেড়ে দেন। ঘরদোর পরিষ্কার করেন। রুম্পার জ্ঞান ফেরে ঘণ্টাখানেক পর। কিন্তু কথা বলার শক্তিটুকুও নেই তার। সে ড্যাবড্যাব করে পদ্মজার দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন পদ্মজার জন্য অপেক্ষায় ছিল। পদ্মজার জন্যই বেঁচে আছে! কিছু বলার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। কতদিন ধরে তাকে পানি ছাড়া কিছু দেওয়া হচ্ছে না। ঘরের এক কোণে বালির বস্তা রাখা, ক্ষুধার চোটে কতবার বালি খেয়েছে। পেট খারাপ হয়ে পুরো ঘর নষ্ট করেছে। বমি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গতকাল থেকে সে অজ্ঞান। তবুও কেউ এসে দেখেনি। পদ্মজার চোখের জল আপনাআপনি পড়ছে। রুম্পার কষ্ট তাকে দুমড়েমুচড়ে দিচ্ছে। সে মনে মনে শপথ করে, রুম্পাকে নিয়ে শহরে যাবে। ফরিনা ও পদ্মজা মিলে রুম্পাকে গোসল করাল। নতুন শাড়ি পরিয়ে, গরম গরম ভাত খাওয়াল। চুলে তেল দিয়ে দিল। খাওয়া শেষে রুম্পা বিছানায় নেতিয়ে পড়ে। শরীরের শক্তি আসতে সময় লাগবে। একটু ঘুমালেই পুনরুদ্ধার হবে গায়ের জোরের। পদ্মজা রুম্পার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘ঘুমাও, ভাবি।’পদ্মজা টের পেল, রুম্পার দুর্বল দুটি হাত পদ্মজার হাত শক্ত করে ধরতে চাইছে। সে রুম্পার দুই হাত শক্ত করে ধরে বলল, ‘তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।রুম্পার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। পদ্মজা জল মুছে দিল। ফরিনাকে বলল, ‘আম্মা, আমি আমার ঘর থেকে আমার কোরআন শরীফ আর জায়নামাজ নিয়ে আসি। আর উনাকে বলে আসি আপাতত আমি রুম্পা ভাবির সঙ্গে থাকব।’যাও তুমি। আমি এইহানে আছি।’পদ্মজা বেরিয়ে গেল। বারান্দা পেরোবার সময় উঠানে চোখে পড়ে। সেখানে পূর্ণা, রানি, বাচ্চাদের নিয়ে গোল্লাছুট খেলছে। পূর্ণার পরনে শাড়ি! মেয়েটা এত দস্যি হলো কী করে? সে চোখ সরিয়ে নিজের ঘরের দিকে গেল। সন্ধ্যার আজান পড়ার বেশি দেরি নেই।রানি এক দলের নেতা, পূর্ণা অন্য দলের নেতা। দুই দলের নাম শাপলা আর গোলাপ। প্রতি দলে ছয়জন করে। বাচ্চাগুলোর বয়স নয়-দশ।আলো আলগ ঘরের বারান্দায় চেয়ারে বসে আছে। মৃদুল আলগ ঘর থেকে বেরিয়ে বলল, ‘এই বাচ্চারা আমিও খেলতাম।’রানি বলল, ‘না, না। তোরে নিতাম না।’পূর্ণা মৃদুলকে দেখেই অন্যদিকে চাইল। তার ভীষণ লজ্জা করছে মৃদুলের সামনে পড়তে! মৃদুল আরেকটু এগিয়ে এসে বলল, ‘ডরাইতাছোস? ডরানিরই কথা। এই মৃদুলের সঙ্গে কেউ পারে না। আর তুই তো মুটকি। কেমনে পারবি?’‘আমি তোর চার মাসের বড়ো। সম্মান দিয়া কথা ক। মাঝখান থাইকা সর। খেলতে দে।’‘ধুর, তোর ছেড়ির এখন খেলার সময়। আর তুই খেলতাছস। সর। এই এই, বোয়াল মাছ। তোমার দলের একটারে বাদ দিয়া আমারে লও। এই মুটকিরে একশোটা গোল্লা না দিলে আমি বাপের ব্যাঠা না।’পূর্ণা হাঁ করে তাকাল। তাকে বোয়াল মাছ ডাকা হচ্ছে! তার দিকে তাকিয়ে বাচ্চারাও হাসছে! দেখতে চকচকে সুন্দর হয়ে গেছে বলে কী যা ইচ্ছে ডাকার অধিকার বাঘিনী পূর্ণা দিয়ে দিবে? কখনো না। সে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলল, ‘আমাকে আপনার কোন দিক দিয়ে বোয়াল মাছ মনে হচ্ছে?’পূর্ণাকে কথা বলতে দেখে মৃদুল হাসল। রসিকতা করে বলল, ‘আরে কালি বেয়াইন দেখি কথা কইতেও পারে।’পূর্ণা আহত হলো। এক হাতে নিজের গাল ছুঁয়ে ভাবল, আমি কি কালি ডাকার মতো কালো? বাঘিনী রূপটা মুহূর্তে নিভে গেল। তার চোখ দুটি ছলছল করে ওঠে। যাকে পছন্দ করল সে-ই কালি বলছে। পূর্ণা থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল। রানি বলল, ‘মৃদুইলল্যা সর কইতাছি। খেলতে দে।’‘আমিও খেলাম। এই আন্ডা তুই বাদ। তোর বদলে আমি বেয়াইনের দলের হয়ে খেলাম।’মৃদুলের এক কথায় ন্যাড়া মাথার ছেলেটি সরে দাঁড়াল। মৃদুল খেলার নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল। পূর্ণাকে বলল, ‘কালি বেয়াইন তুমি আগে যাইবা? নাকি আমি আগে যামু?’পূর্ণা মিনমিনিয়ে বলল, ‘আমি খেলব না।’রানি দূর থেকে বলল, ‘দেখছস মৃদুইললা তুই খেলার মাঝে ঢুকছস বইললা পূর্ণা খেলত না। সবসময় কেন খেলা নষ্ট কইরা দেস তুই?’মৃদুল সেসব কথায় ভ্রুক্ষেপও করল না। সে রসিকতার স্বরেই বলল, ‘আরে বেয়াইনের শক্তি ফুরায়া গেছে। আর খেলতে পারব না। এই আন্ডা তুই আয়। বেয়াইন খেলব না। তুই আইজ হারবিরে আপা।’রানি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল, ‘আমার দলই জিতব।’‘আগে আগে চাপা মারিস না। আমার মতো দেখায়া দে। এই পেটওয়ালা তুই আগে যা।’পূর্ণা ব্যথিত মন নিয়ে আলগ ঘর পেরিয়ে অন্দরমহলের দিকে পা রাখে। সে কালো নিজেও জানে! কিন্তু কেউ কালি বললে তার খুব খারাপ লাগে। আল্লাহ কেন তাকে সৌন্দর্য দিলেন না? একটু ফরসা করে দিলে কী হতো? তার আপার মতো কালো রঙে সবাই সৌন্দর্য কেন খুঁজে পায় না? পূৰ্ণা দুই হাত দিয়ে দুই চোখের জল মুছে। অভিমানী মন থেমে থেমে কাঁদছে। এই শাড়ি তো মৃদুলের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই পরেছিল। দরকার নেই এই চকচকে পুরুষ।কেউ তাকে কালি বললে সে ভীষণ রাগ করে! ভীষণ।
সুনসান নীরবতা চারিদিকে। রাত গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। রুম্পা বিভোর হয়ে ঘুমাচ্ছে। পদ্মজা তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছে, কখন রুম্পা চোখ খুলবে। পদ্মজা বসে আছে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে। দরজায় কেউ টোকা দিতেই পদ্মজা সাবধান হয়ে গেল। রুম্পার নিরাপত্তা নিয়ে তার মন অস্থির হয়ে আছে। সে গম্ভীরকণ্ঠে জানতে চাইল, ‘কে, কে ওখানে?’‘আমি।’আমিরের কণ্ঠ শুনে পদ্মজা ফোঁস করে নিশ্বাস ছাড়ল। খুলে দিল দরজা। আমিরের চুল এলোমেলো। ক্লান্ত দেখাচ্ছে। সে পদ্মজাকে দেখে বলল, ‘ঘুম ভেঙে গেল। তোমাকে মনে পড়ছে।’‘আমি তো এখন যেতে পারব না।’‘আমি থাকি তাহলে।’ আমিরের নির্বিকার কণ্ঠ।পদ্মজা চোখ রাঙিয়ে বলল, ‘শীতের রাতে মেঝেতে থাকবেন? রুম্পা ভাবি বিছানায় ঘুমাচ্ছে। এই ঘরে থাকলে মেঝেতে থাকতে হবে। ঘরে যান।’‘মেঝেতেই থাকব।’‘আপনি সবসময় ঘাড়ত্যাড়ামি করেন কেন? আপনাকে তো আমি বলে এসেছি কতটা দরকার রুম্পা ভাবির সঙ্গে থাকা।’‘গত দিনও বোনদের সঙ্গে ছিলে। আর আজ রুম্পা ভাবির সঙ্গে থাকতে চাইছ!’‘কয়টা দিনই তো। আজীবন একসঙ্গেই থাকব।’‘আচ্ছা যাচ্ছি, এখনও ঘুমাওনি কেন?’পদ্মজা একবার রুম্পাকে দেখে নিয়ে বলল, ‘এই তো ঘুমাব।’আমির চারপাশ দেখে বলল, ‘সাবধানে থাকবে। রিদওয়ান দোতলায় ঘুরঘুর করছে। ভয় পাবে না। আমি আছি।’পদ্মজা আমিরের চোখের দিকে তাকাল। বলল, ‘আপনি আমার সঙ্গে থাকতে নয়, দেখতে এসেছেন আমি ঠিক আছি কি না তাই না? একদমই ভয় পাবেন না। আমার কিছু হবে না।’আমির দুই হাতে পদ্মজার দুই গাল ধরে বলল, ‘আমি তো জানি আমার পদ্মবতী কতটা সাহসী! এজন্যই এই বাড়িতে আসার সাহস করতে পেরেছি।’‘আহ্লাদ হয়েছে? এবার যান।’আমির হেসে চলে গেল। পদ্মজা অনেকক্ষণ অন্ধকার বারান্দায় তাকিয়ে রইল। এরপর দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল বিছানায়। আমিরকে সে কতটা ভালোবাসে সে নিজেও জানে না! আমিরের প্রতিটি স্পর্শ ও কথার ছন্দে হৃদয় স্পন্দিত হয়। আমিরের পাগলামি, খেয়াল রাখা, দায়িত্ববোধ সবকিছু পদ্মজাকে মুগ্ধ করে। একজন আদর্শ স্বামী বোধহয় একেই বলে। আমিরের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়ল! ভালোবাসার মানুষদের নিয়ে ভাবা সময়টা জাদুর মতো। চোখের পলকে নির্ঘুম রাত কেটে যায় নয়তো নিজের অজান্তে আবেশে ঘুম চলে আসে।সকালে উঠেই পূর্ণাকে গিয়ে ডেকে তুলল পদ্মজা। এরপর রুম্পার ঘরে এসে নামাজ পড়ল। কোরআন পড়ল। রুম্পার ঘুম আরো কিছুক্ষণ পর ভাঙে। রুম্পাকে ধরে ধরে টয়লেটে নিয়ে গেল পদ্মজা। তারপর গেল রান্নাঘর থেকে খাবার আনতে। ফরিনা মাত্র চুলা থেকে খিচুড়ি নামিয়েছেন।‘আম্মা, ভাবির জন্য খিচুড়ি নিয়ে যাই?’ বলল পদ্মজা।ফরিনা হেসে বললেন, ‘এইডা আবার কওন লাগে। লইয়া যাও। তুমি খাইবা কুনসময়?’‘ভাবিকে খাইয়ে এসে তারপর উনাকে নিয়ে খাব। আম্মা, রাতের মুরগির গোশত আছে না?‘হ আছে তো। ওই যে ওই পাতিলডায়।’পদ্মজা গরম গরম খিচুড়ি মুরগি গোশতের ভুনা দিয়ে নিয়ে যায়। ঘরে ঢুকে দেখে রুম্পা মেঝেতে পড়ে আছে। পদ্মজা থালা বিছানার উপর রেখে রুম্পাকে তোলার চেষ্টা করে।অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, ‘ভাবি মেঝেতে পড়লেন কীভাবে?রুম্পা কিছু বলছে না। সে উদ্ভ্রান্তের মতো ছটফট করছে, এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে; পদ্মজাকে দূরে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করছে। পদ্মজা বিস্মিত। রুম্পা এমন করছে কেন? সে রুম্পাকে প্রশ্ন করেই চলেছে, ‘কেউ এসেছিল ঘরে? কে এসেছিল? ভয় দেখিয়েছে? ভাবি… ভাবি বলুন আমাকে। ভাবি…ধাক্কাচ্ছেন কেন? আমি আপনার জন্য খাবার এনেছি।’খাবারের কথা শুনে রুম্পা থমকে গেল। পদ্মজার দিকে এক নজর তাকিয়ে বিছানার দিকে তাকাল। ঝাঁপিয়ে পড়ল খাবারের ওপর। গরম খাবার গাপুসগুপুস করে খেতে থাকল। পদ্মজা বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছে। এমনভাবে রুম্পা খাচ্ছে যেন আর কোনোদিন খাওয়া হবে না। সুযোগ আসবে না। পদ্মজা পানি এগিয়ে দিল। রুম্পা অল্প সময়ের ব্যবধানে পুরো থালার খিচুড়ি ও এক বাটি গোশত খেল।খাওয়া শেষে পদ্মজা নমনীয় কণ্ঠে প্রশ্ন করল, ‘ভাবি আমার সঙ্গে একটু কথা বলবে?’রুম্পা দূরে সরে যায়। দেয়াল ঘেঁষে বসে। মাথা দুইদিকে নাড়িয়ে ইশারা করে জানাল, সে কথা বলবে না। পদ্মজা তবুও আশা ছাড়ল না। সে রুম্পার পাশে গিয়ে বসল। রুম্পার এক হাত মুঠোয় নিয়ে বলল, ‘আমি তোমাকে আমার সঙ্গে ঢাকা নিয়ে যাব। যাবে?’রুম্পা এক ঝটকায় হাত সরিয়ে নিলো। পদ্মজাকে ধাক্কা মেরে চেঁচিয়ে বলল, ‘বাইর হ আমার ঘর থাইকা। বাইর হ তুই।’রুম্পার ব্যবহারে পদ্মজা আহত হলো, ‘ভাবি! আমি তোমার ভালো চাই।’‘বাইর হ কইতাছি। বাইর হ।’শীতের ঠান্ডা হিম বাতাস জানালা দিয়ে ঢুকছে। শীতের দাপট বেড়েছে। এবারের শীত বোধহয় মানুষ মারার জন্য এসেছে! এত ঠান্ডা! রুম্পার পরনে শাড়ি ছাড়া আর কিছু নেই। ঠান্ডায় তার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে পদ্মজা রুম্পার চোখের দিকে দৃষ্টিপাত করল। রুম্পার চোখ বার বার দরজার দিকে যাচ্ছে। পদ্মজা উঠে স্থির হয়ে দাঁড়াল না, ছুটে গেল দরজার কাছে। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আগন্তুক ছুটে পালাতে চাইল। তবে তার আগেই পদ্মজা জোরাল কণ্ঠে ডেকে উঠল, ‘লুতু বুবু।’লতিফা একবার ঘাড় ঘুরিয়ে পদ্মজাকে দেখল। এরপর দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ভেঙে নেমে গেল নিচে, তার চোখে ভয়। আচমকা ঝনঝন শব্দ হলো একটা। পদ্মজা চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। রুম্পা পাগলামি শুরু করেছে। মুখ দিয়ে অদ্ভুত শব্দ করতে করতে ঘরের জিনিসপত্র ছুঁড়ছে। রুম্পাকে থামানোর চেষ্টা করল পদ্মজা, বোঝাল অনেক করে। কিছুতেই রুম্পা থামল না। উলটো তার ছোড়া স্টিলের গ্লাস এসে পড়ল পদ্মজার কপালে। ‘আহ’ বলে বসে পড়ল পদ্মজা, সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল রুম্পার পাগলামি। ছুটে এসে পদ্মজার আহত স্থানে হাত রাখে, উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল, ‘আমি তোমারে ইচ্ছা কইরা দুঃখ দেই নাই বইন। বেশি বেদনা করতাছে?’আঞ্চলিক ভাষায় চিকন কণ্ঠ! পদ্মজা দুই চোখ মেলে তাকাল। রুম্পা পদ্মজার কপালের ফোলা অংশে ফুঁ দিচ্ছে। ভীষণ অস্থির হয়ে আছে। বোঝাই যাচ্ছে পদ্মজাকে অনেক পছন্দ করে রুম্পা। মুখোশ খুলে বেরিয়ে এসেছে আসল রূপে। সে কঠিন নয়, পাগল নয়। বরং বড্ড নরম, কোমল। পদ্মজা শান্ত স্বরে প্রশ্ন করল, ‘কেন পাগলের অভিনয় করো?’রুম্পার হাত থেমে গেল। সে ধরা পড়ে গেছে!.কুয়াশার স্তর ভেদ করে একটা নৌকা ঢুকল খালে, মাঝি মৃদুল। গতকাল যে ছেলেটাকে আন্ডা ডেকেছিল সেই ছেলেটাও নৌকায় আছে। তার ভালো নাম, জাকির। মৃদুলের সঙ্গে বাচ্চাকাচ্চাদের অনেক খাতির। পূর্ণা খালের ঘাটে বসে ছিল। সে ফজরের নামাজ আদায় করে খিচুরি খেয়ে এখানে চলে এসেছে। মন খারাপের সময় ঘাটে বসে থাকতে তার ভালো লাগে। গতকাল রাতে খাওয়ার সময় মৃদুল কম হলেও বিশ বার তাকে কালি ডেকেছে। অন্ধকারে নাকি দেখাই যায় না। এমন অনেক কথা বলেছে। কালো রঙের মেয়ে হওয়া বোধহয় পাপ! আবার পদ্মজাও রাতে তার সঙ্গে থাকেনি। পুরো রাত সে কেঁদেছে। কেউ কেন তাকে কালি বলবে! আবার তার আপা ও তাকে সময় দিল না। শ্বশুরবাড়ির অন্য বউকে নিয়ে ব্যস্ত। পূর্ণার খুব অভিমান হয়েছে। বয়স বিশ পার হলেও রয়ে গেছে সেই ছোট্ট কিশোরী মেয়েটি। মৃদুল নৌকা থামিয়ে পূর্ণাকে ডাকল, ‘কালি বেয়াইন।’পূর্ণা তাকাল না। মৃদুল আবার ডাকল, ‘বেয়াইন গো।’তাও পূর্ণা সাড়া দিল না। মৃদুল জাকিরকে বলল, ‘কী রে ব্যাঠা, বুঝছিস কিছু? এই ছেড়িরে ভূতে ধরল নাকি?’জাকির দাঁত বের করে শুধু হাসল। মৃদুল জোরে বলল, ‘আরে বেয়াইন কী কানে শুনে না? কাল তো ঠিকই শুনছিল। ঠান্ডা কী কানের ভেতরে ঢুইকা গেছে? ও কালি বেয়াইন। বেয়াইন…’পূর্ণা হুট করে উঠে দাঁড়াল। আঙুল শাসিয়ে মৃদুলকে বলল, ‘আপনার কী মা-বাপ নাই? থাকলেও শিক্ষা দেয়নি যারে তারে যা ইচ্ছে ডাকা উচিত না? অসভ্যতা অন্য জায়গায় করবেন আমার সামনে না। আমি কালো আমি জানি। আপনাকে কালি বলে সেটা মনে করিয়ে দিতে হবে না। আমি আপনাকে অনুমতি দেইনি আমাকে কালি ডাকতে বা বেয়াইন ডাকতে। আমি আপনার বেয়াইনও না। আমার দুলাভাইয়ের আপন ভাই না আপনি। কোথাকার কে আপনি? এই ফরসা চামড়ার দেমাগ দেখান? আরেকবার আমাকে কালি বললে আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না।’কথা শেষ করেই পূর্ণা কুয়াশার আড়ালে হারিয়ে যায়। রেখে যায় অপমানে থমথম করা একটা মুখ। মৃদুল ঘোর থেকে বেরোতে পারছে না। তাকে একটা মেয়ে এভাবে বলেছে? তার মতো সুন্দর ছেলের জন্য গ্রামের সবকটি মেয়ে পাগল। আর এই কালো মেয়েটা তাকে এভাবে অপমান করল! মৃদুল রাগে বৈঠা ছুঁড়ে ফেলল খালে। নৌকা থেকে নামতে গেলে তার এক পায়ে ধাক্কা লেগে নিমিষে দূরে চলে যায় নৌকাটি।নৌকায় থাকা ছেলেটি চিৎকার করল, ‘মৃদুল ভাই। আমি আইয়াম কেমনে? বৈডাডাও ফালায়া দিছো।’মৃদুল বিরক্তি নিয়ে ফিরে তাকাল। সত্যিই তো নৌকা অনেক দূরে চলে গেছে! এই ঠান্ডার মধ্যে ছোটো বাচ্চাটা সাঁতরে পাড়ে আসবে কীভাবে!মৃদুল রাগ এক পাশে রেখে বরফের মতো ঠান্ডা জলে ঝাঁপ দিল।.রুম্পা থেমে থেমে কাঁদছে। এদিকে অনবরত প্রশ্ন করে যাচ্ছে পদ্মজা, সে ভীষণ অস্থির। একজোড়া পায়ের শব্দ ভেসে আসতেই রুম্পার কান্না থেমে গেলে। এই পায়ের শব্দগুলো সে চেনে! রুম্পা কাঁপতে থাকল। রুম্পার অবস্থা দেখে পদ্মজার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত গড়িয়ে যায়। রুম্পা পদ্মজার এক হাত ধরে চাপাস্বরে দ্রুত বলল, ‘এহান থাইকা চইলা যাও, বইন। আর আগাইয়ো না। ওরা পিশাচের মতো। ছিঁইড়া খাইয়া ফেলব। ওদের দয়ামায়া নাই। তুমি অনেক ভালা। তোমারে কোনোদিন ভুলতাম না। তুমি এইহানে থাইকো না। তুমি এই বাড়ির কেউয়ের লগে যোগাযোগ রাইখো না।’‘ওরা কী করেছে? ভাবি, অনুরোধ করছি আমাকে বলুন। ভাবি অনুরোধ করছি।’রুম্পা সেকেন্ডে সেকেন্ডে ঢোক গিলছে। পায়ের শব্দটা যত কাছে আসছে তার কাঁপুনি তত বাড়ছে। সে ছলছল চোখে পদ্মজার দিকে তাকিয়ে কোনোমতে বলল, ‘পেছনে…উত্তরে…ধ রক্ত।’পরমুহূর্তেই দরজা ঠেলে রুমে ঢুকে খলিল হাওলাদার। এত জোরে দরজা ধাক্কা দিয়েছেন যে, বিকট শব্দ হয়। হুংকার ছেড়ে পদ্মজাকে বললেন, ‘তুমি এই ঘর থাইকা বাইর হও। অনেক অবাধ্যতা দেখাইছো আর না।’খলিলের চোখ দুটি দেখে পদ্মজার রক্ত ছলকে উঠে। গাঢ় লাল। সে দুই হাতে রুম্পাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি রুম্পা ভাবির সঙ্গে থাকব।’‘থাকবা না তুমি।’‘কেন জানতে পারি?’‘একটা পাগলের সঙ্গে কীসের থাকন?’‘রুম্পা ভাবি পা…’ পদ্মজা কথা শেষ করতে পারল না। বুকে মুখ লুকিয়ে রাখা রুম্পা পিঠে চিমটি দিয়ে ভেজাকণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘কইও না। আমি পাগল না কইও না। দোহাই লাগে।’পদ্মজা থেমে গেল। খলিল বললেন, ‘বাড়ায়া যাও, বউ।’পদ্মজা নাছোড়বান্দা হয়ে বলল, ‘যাব না আমি। রুম্পা ভাবির সঙ্গে থাকব।’রুম্পা পদ্মজাকে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দিয়ে পুনরায় পাগলামি শুরু করে। খলিল রুম্পাকে আঘাত করার জন্য উদ্যত হতেই পদ্মজা বাধা হয়ে দাঁড়াল। বলল, ‘নিজের মেয়েকে অমানুষের মারতে পারেন বলে সবার মেয়েকে মারার অধিকার পাবেন না।’পদ্মজার কথা মাটিতে পড়ার আগে খলিলের শক্ত হাতের থাপ্পড় পদ্মজার গালে পড়ে।পদ্মজা ব্যথায় ‘মা’ বলে আর্তনাদ করে উঠল।
ভোর হয়েছে আর কতক্ষণই হলো! দুই ঘণ্টার মতো। এর মধ্যেই মেঘলা আকাশ বেয়ে অন্ধকার নেমে এসেছে চারিদিকে। পূর্ণা আলগ ঘরের সামনে থাকা বারান্দার চেয়ারে মুখ ভার করে বসে আছে। তার গায়ে সোয়েটার, সোয়েটারের ওপরে তিন তিনটে কাঁথা। তবুও পাতলা ঠোঁট জোড়া ঠান্ডায় কাঁপছে। বসে থাকতে থাকতে একসময় বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। কোথাও যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। তার চেয়ে বরং আপার সঙ্গে আড্ডা দেয়া যাক। চৌকাঠে পা রাখতেই মৃদুলের কণ্ঠস্বর কানে এলো। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল সে। মৃদুল কাঁপতে কাঁপতে হেঁটে আসছে। শরীর ভেজা। রানি আপা, রানি আপা বলে ডাকছে। কিন্তু এখানে তো রানি নেই। মৃদুল বারান্দায় পা রেখেই পূর্ণার মুখটা দেখতে পেল। তার দিকে তাকিয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে মৃদুলের কপালে ভাঁজ পড়ল। এই মেয়ের জন্যই তো এমন ঘটনা ঘটল। এখন ঠান্ডায় কাঁপতে হচ্ছে। সে দৃষ্টি সরিয়ে দাঁড়াল দূরে। শার্ট খুলে দড়িতে মেলে দিয়ে ডাকল, ‘কইরে রানি আপা। শীতে মইরা যাইতেছি। কাপড় নিয়ে আয়। ভেজা শরীর নিয়া ঘরে কেমনে ঢুকব?’পূর্ণা কাঠখোট্টা গলায় বলল, ‘রানি আপা এইখানে নেই। অকারণে চেঁচাচ্ছেন।’মৃদুল পূর্ণার স্বরেই পালটা জবাব দিল, ‘তোমারে কইছি আমার উত্তর দিতে? আমার ইচ্ছে হইলে আমি চেঁচাব। তোমার ভালা না লাগলে কানে ফাত্তর ঢুকায়া রাখো।’পূর্ণা দাঁতে দাঁত চেপে কিড়মিড় করে তাকিয়ে থাকে। মৃদুল আড়চোখে পূর্ণাকে দেখে চোখের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। বাতাস বেড়েছে। খালি গায়ে কাঁপুনি শুরু হয়। মৃদুলকে এভাবে কাঁপতে দেখে পূর্ণার মায়া হচ্ছে। সে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বলল, ‘আমি আপনার কাপড় নিয়ে আসব?’মৃদুল চোয়াল শক্ত রেখেই আবারও আড়চোখে তাকাল। কিন্তু উত্তর দিল না। সে সম্পূর্ণভাবে পূর্ণাকে উপেক্ষা করছে। পূর্ণা জবাবের আশায় কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকে, এরপর চলে যায়। পূর্ণা চলে যেতেই মৃদুল শীতের তীব্রতায় মুখ দিয়ে ‘উউউউউউ’ জাতীয় শব্দ করে কাঁপতে থাকল। যতক্ষণ না প্যান্ট শুকাবে ঘরের ভেতর ঢুকতে পারবে না। তার ঘরে যাওয়ার পথে ধান ছড়ানো আছে। এদিক দিয়ে গেলে ধান ভিজে নষ্ট হবে। সহ্য করা ছাড়া আর উপায় নেই। কেউ যদি কাপড় দিয়ে যেত!আলগ ঘরের পেছনে উত্তর দিকের বারান্দায় গিয়ে মগাকে পেল পূৰ্ণা। মগা ঝিমুচ্ছে। ‘মগা ভাইয়া?’মগা তাকাল। পূর্ণা বলল, ‘মৃদুল ভাইয়ের ঘর কোনটা?’মগা আঙুলের ইশারায় দেখিয়ে দিল। পূর্ণা মৃদুলের ঘরে গিয়ে একটা লুঙ্গি আর শার্ট নিয়ে বেরিয়ে আসে। মৃদুল পায়ের শব্দ পেয়ে মুখ দিয়ে উচ্চারণ করা শীতের কাতরতা বন্ধ করে দিল। পূর্ণা মৃদুলের চেয়ে এক হাত দূরে এসে দাঁড়াল। এগিয়ে দিল লুঙ্গি আর শার্ট। মৃদুল ঘুরে তাকাল। আর রাগ দেখানো সম্ভব নয়। রগে রগে ঠান্ডার তীব্রতা ঢুকে গেছে। রক্ত শীতল হয়ে এসেছে। সে পূর্ণার হাত থেকে নিজের কাপড় নিতে নিতে হৃদয় থমকে দেয়ার মতো একটা মায়াবী মুখশ্রী আবিষ্কার করল। টানা টানা চোখ, চোখের পাঁপড়িগুলো এত ঘন যে মনে হচ্ছে কোনো বিশাল বটবৃক্ষ ছায়া ফেলে রেখেছে, পাতলা ফিনফিনে ঠোঁট, ত্বকে তেলতেলে ভাব চকচক করছে। লম্বা এলো চুল বাতাসে উড়ছে। শ্যামবর্ণের মুখ এত আকর্ষণীয় হয়? কিছু সৌন্দর্য বোধহয় এভাবেই খুব কাছে থেকে চিনে নিতে হয়। মৃদুলের দৃষ্টি শীতল হয়ে আসে। সে আগে লুঙ্গি নিলো। পূর্ণা অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়াল। বলল, ‘আমি দেখব না। আপনি পালটে ফেলুন।’মৃদুল মোহময় কোনো টানে আবার ফিরে তাকাল। তবে মুখটা আর দেখতে পেল না। মায়াবী মুখটা অন্যদিকে ফিরে আছে। সে লুঙ্গি পালটে মিনমিনিয়ে বলল, ‘শার্টটা?’পূর্ণা হেসে শার্ট এগিয়ে দিল। মৃদুলের এলোমেলো দৃষ্টি। হুট করেই বুকে ঝড়ো বাতাস বইছে। কী আশ্চর্য! পূর্ণা গর্বের সঙ্গে বলল, ‘আমাকে কালি বলে কষ্ট দিলেও আমি আপনার কষ্ট দেখতে পারিনি। আমি সবসময় মহৎ।’অন্যসময় হলে হয়তো মৃদুলও পালটা জবাব দিত। কিন্তু এখন ইচ্ছে হচ্ছে না। মোটেও ইচ্ছে হচ্ছে না। পূর্ণা কিছু না বলে আলগ ঘরে ঢুকে যায়। মৃদুল দ্রুত পায়ে দুই পা এগিয়ে আসে। আবার পিছিয়ে যায়। আজকের দিনটা অন্যরকম লাগছে। আচ্ছা, দিনটা অন্যরকম নাকি অনুভূতি অন্যরকম?.নিজেকে ধাতস্থ করার আগেই খলিল পদ্মজাকে ঠেলে ঘর থেকে বের করে দ্রুত দরজায় তালা লাগিয়ে দিলেন। পদ্মজা গালে হাত রেখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুই চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। চোখের জল বিসর্জন হচ্ছে আঘাতের যন্ত্রণায়? নাকি কারো হাতে থাপ্পড় খাওয়ার অপমানে? কে জানে! খলিল কপাল কুঁচকে আরো কী কী যেন বলে চলে গেলেন। পদ্মজা ঠায় সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। সে আকস্মিক ঘটনাটি হজম করতে পারছে না। দিকদিশা হারিয়ে ফেলেছে।ঘরের ভেতর থেকে আওয়াজ পেয়ে সংবিৎ ফিরল পদ্মজা, বন্ধ দরজার দিকে একবার তাকাল। এই মুহূর্তে পরিস্থিতি কীভাবে সামলানো উচিত—তার মাথায় আসছে না। একটু দূরে চোখ পড়তেই দেখতে পেল লতিফাকে। পদ্মজাকে তাকাতে দেখেই লতিফা আড়াল হয়ে যায়। পদ্মজা সে জায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকে, তার মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। এই তীব্র শীতে আবার বৃষ্টি হবে নাকি! ভাবতে ভাবতেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি নামে। পদ্মজার গা কেঁপে উঠল ঠান্ডার তীব্রতায়।সাই সাই বাতাস বইছে। সুপারি গাছগুলো একবার ডানে দুলে পড়ছে তো আরেকবার বাঁয়ে। আলগ ঘরের পেছনের বারান্দায় গায়ে কাঁথা মুড়িয়ে জুবুথুবু হয়ে বসে আছে মগা। পদ্মজা শাড়ির আঁচল ভালো করে টেনে ধরে শীত থেকে বাঁচতে। আবহাওয়ার অবস্থা ভালো না, তার মধ্যে বৃষ্টি আর বাতাস! সামান্য শাড়ির আঁচলে কী ঠান্ডার তীব্রতা আটকানো যায়!ইচ্ছেও করছে না ঘরে যেতে। সে এদিক-ওদিক চেয়ে এক কোনায় একটা চেয়ার দেখতে পেল। চেয়ারটা আনার জন্য এগোল সে, আর তখনই নাকে একটা বিশ্রি বোটকা গন্ধ ধাক্কা দিল। সজাগ হয়ে উঠল পদ্মজার স্নায়ু। যত এগোচ্ছে গন্ধটা তীব্র হচ্ছে! সে সাবধানে এক পা এক পা করে ফেলছে। এরইমধ্যে আমিরের চেঁচামেচি কানে আসে। পদ্মজা থমকে যায়। উলটো ঘুরে বাইরে উঁকি দেয়। বাইরে ধস্তাধস্তি শুরু হয়েছে। প্রথমে দৃষ্টি কাড়ে আমিরের রাগী মুখশ্রী।পদ্মজা সবকিছু ভুলে ছুটে নেমে যায় নিচ তলায়। বাইরে এসে দেখে, আমির তার চাচাকে মারছে! যেভাবে পারে কিল-ঘুসি দিচ্ছে। আমির এতটাই রেগে গিয়েছে যে নিজের আপন চাচাকে মারছে! মজিদ হাওলাদার, রিদওয়ান, আমিনা, রানি, সবাই আটকানোর চেষ্টা করছে। কেউ পারছে না। আমির খলিলকে ছেড়ে রিদওয়ানকে ধাক্কা মেরে কাদায় ফেলে দিল। আমিরের আচরণ উন্মাদের মতো। সে বিশ্রি গালিগালাজ করতে করতে রিদওয়ানের পেটে লাথি বসায়। রিদওয়ান কোঁকিয়ে উঠল। আমিনা আমিরকে কিল-থাপ্পড় মারছেন, তাতেও কাজ হচ্ছে না। এমন তো আমির নয়! পদ্মজা দৌড়ে আসে। আমিরকে চিৎকার করে বলল, ‘কী করছেন আপনি? পাগল হয়ে গেছেন? ছাড়ুন।’আমির পদ্মজার জবাব দিল না, বরঞ্চ থাবা মেরে ধরল খলিলকে। খলিলের নাক বেয়ে রক্ত ঝরছে। সেই অবস্থায়ই শক্ত মুঠো করে মুখে আরেকটা ঘুসি মারল সে। রানি, আমিনা হাউমাউ করে কাঁদছে। মৃদুল, পূর্ণা, মগা, মদন—প্রত্যেকে দৌড়ে আসে। মৃদুল, পদ্মজা দুই হাতে আমিরকে টেনে সরাতে চায়। কেউই পারল না। আমিরের শরীরে যেন দানবের শক্তি ভর করেছে। সে কিছুতেই ক্লান্ত হচ্ছে না। মৃদুল দুই হাতে জাপটে ধরে আমিরকে দূরে সরিয়ে আনে। আমির হিংস্র বাঘের মতো হাত পা ছুড়তে ছুড়তে বলছে, ‘কুত্তার বাচ্চারা অনেক কিছু করেছিস, করতে দিয়েছি। আমার বউয়ের গায়ে হাত দেস কোন সাহসে? মৃদুল ছাড়। আমি ওদের আজরাইলের মুখ দেখিয়ে ছাড়ব। শুয়োরের বাচ্চা…’মৃদুলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে ছুটে গিয়ে রিদওয়ানকে ধরল আমির পদ্মজা হতভম্ব হয়ে পড়েছে! রিদওয়ান গতকাল তার কাঁধে হাত দিয়েছিল, আর আজ খলিল থাপ্পড়ে মেরেছে। এসব কে বলেছে আমিরকে? থাপ্পড়টা লতিফা দেখেছিল। তাহলে কী লতিফা বলেছে?আমিনা পদ্মজার পায়ে লুটিয়ে পড়েন। পদ্মজা দ্রুত সরে যায়, ‘চাচি কী করছেন!’আমিনা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘থামাও এই কামড়াকামড়ি। আল্লাহর দোহাই লাগে।’পদ্মজা কী করবে বুঝতে পারছে না। আমির তার কোনো কথাই কানে নিচ্ছে না। এমন রাগ সে আগে কখনো দেখেনি! গুরুজনদের গায়ে হাত তোলার মতো রাগ আমিরের হতে পারে, এটা তার ধারণার বাইরে ছিল! পদ্মজা আমিরের সোয়েটার খামচে ধরে কণ্ঠ কঠিন করে বলল, ‘ছাড়ুন বলছি। ছাড়ুন।’আমির তাও শুনল না। সে ধাক্কা মেরে পদ্মজাকে সরিয়ে দিল। দুই হাত দূরেই নারিকেল গাছ ছিল। সেখানে পড়লে নিশ্চিত কোনো অঘটন ঘটে যেত, অঘটন ঘটার পূর্বেই দুটো হাত পদ্মজাকে আঁকড়ে ধরে। পদ্মজা কৃতজ্ঞতার নজরে তাকাল। ফরিনাকে দেখতে পেল। ফরিনা এরকম ধস্তাধস্তি দেখেও চুপ করে আছেন, পদ্মজা অবাক হলো! থামানোর চেষ্টা পর্যন্ত করছেন না। পদ্মজা আবার আমিরকে থামানোর চেষ্টা করল, মৃদুল চেষ্টা করল। কিছুতেই কিছু হলো না। আমির খুব বেশি উত্তেজিত হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, অনেক বছরের রাগ একসঙ্গে মিটিয়ে নিচ্ছে। পদ্মজা আমিরকে অনুরোধ করে সরে আসতে। সেই অনুরোধ আমিরের কর্ণকুহর অবধি পৌঁছেছে কি না সন্দেহ!পদ্মজা অসহায় মুখ করে সরে যাবে, তখনই দুটি শক্তপোক্ত হাত আমিরকে টেনে সরিয়ে আনার চেষ্টা করে। সেই হাতে খুব দামি ঘড়ি। হাতের মালিককে দেখার জন্য পদ্মজা চোখ তুলে তাকাল। পরক্ষণেই চমকে উঠল মুখটা দেখে! দীর্ঘ সময় পর আবার সেই মানুষটির সঙ্গে দেখা। যে মানুষটি তার প্রথম ভালোবাসা না হলেও, প্রথম আবেগমাখা অনুভূতি ছিল…লিখন শাহ!দূরে সরে দাঁড়াল পদ্মজা। মৃদুল, লিখন মিলে আমিরকে চেপে ধরে দূরে নিয়ে যেতে চাইল। আমির ছটফট করছে ছুটতে, তবে পারছে না। তীব্র রাগ নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে লিখনকে দেখে তার দৃষ্টি স্থির হলো, তবে থেকে গেল ছটফটানি। লিখন হেসে বলল, ‘এবার থামুন। অনেক শক্তি ফুরিয়েছেন।আমির কিছু বলতে চাইল বটে, তবে তার আগেই রিদওয়ান ইট দিয়ে আমিরের ঘাড়ে আঘাত করে বসল সবার অগোচরে। আমির আর্তনাদ করে বসে পড়ে। লিখন রিদওয়ানকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয়। পদ্মজা উৎকর্ণ হয়ে দৌড়ে আসে। আমিনা, রানি খলিল এবং রিদওয়ানকে নিয়ে দ্রুত আলগ ঘরে গয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। মজিদ মগাকে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি গঞ্জে যা। বিপুল ডাক্তাররে নিয়ে আয়। আমার বাড়িতে এসব কী হচ্ছে!’ফরিনা তখনো দূরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন। এই ঘটনা তাকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করেনি! বরং এই ঘটনার জন্য তিনি খুশি! কী চলছে তার মনে?
ফরিনা তাড়াহুড়ো করে খোশমেজাজে রান্না করছেন। সাহায্য করার মতো পাশে কেউ নেই। একাই দৌড়ে দৌড়ে সব করছেন। হাওলাদার বাড়িতে অতিথি এসে একদিন না থেকে যেতে পারে না, এতে নাকি গৃহস্থ বাড়ির অমঙ্গল হয়। তাই মজিদ লিখনকে থেকে যেতে জোর করেছেন। পদ্মজা নিজের ঘরে স্বামী সেবায় ব্যস্ত। আমিরের ঘাড়ের চামড়া ফুলে গেছে। হাড়ে বিষের মতো যন্ত্রণা। বিপুল ডাক্তার ওষুধপত্র দিয়েছেন। পদ্মজা অশ্রুসজল নয়নে আমিরের মুখের দিকে চেয়ে চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। অনেকক্ষণ স্বামীর যন্ত্রণা দেখেছে। সহ্য করতে হয়েছে। মাত্রই আমির চোখ বুজেছে। সে মনে মনে আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করছে, দ্রুত যেন আমিরের ব্যথাটা সেরে যায়। নয়তো তাকে দিয়ে দিক। ঘাড়ের আহত অংশে পদ্মজা আলতো করে ছুঁয়ে দিলো, নীল হয়ে আছে। নীরবে পদ্মজার পাশে এসে দাঁড়াল লতিফা। পদ্মজা কারো উপস্থিতি টের পেয়ে জলদি চোখের জল মুছল। তারপর লতিফাকে দেখে বলল, ‘লুতু বুবু!লতিফা বলল, ‘খাইবা না? খালাম্মা খাইতে ডাকতাছে।’পদ্মজা গম্ভীরকণ্ঠে বলল, ‘আম্মা নিজের ছেলেকে কেন দেখতে আসেননি?’‘খালাম্মায় লিখন ভাইজানের লাইগে রানতাছিল।’পদ্মজা ক্ষিপ্ত হয়, ‘নিজের ছেলেকে না দেখে উনি কীভাবে অতিথির জন্য ভোজ আয়োজন করছেন? আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না।’লতিফা নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পদ্মজা অনেকক্ষণ ক্ষিপ্ত নয়নে মেঝেতে চোখ নিবদ্ধ করে রাখল। এরপর আমিরকে এক ঝলক দেখে, লতিফাকে বলল, ‘তুমি যাও, আমি আসছি।’লতিফা দুই পা এগোতেই পদ্মজা ডেকে উঠল, ‘লুতু বুবু।’লুতু দাঁড়াল। পদ্মজা বলল, ‘তুমি আমার ওপর নজর রাখছিলে কেন? আর আমাকে জিজ্ঞাসা না করে থাপ্পড়ের কথাই বা কেন উনাকে বলেছো?’লতিফার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে নত হয়ে, ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। পদ্মজা আরো দুই বার প্রশ্ন করেও কোনো জবাব পেল না। তাই বলল, ‘নিষেধাজ্ঞা আছে নাকি?’এইবার লতিফা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াল। সে কিছু একটা ভাবছে, মুখ তুলে দেখে পদ্মজা তার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে। অপ্রতিভ হয়ে লতিফা বলল, ‘আমি যাই। নইলে খালাম্মায় চেতব।’পদ্মজার উত্তরের আশায় না থেকে তড়িঘড়ি করে চলে গেলে লতিফা। পদ্মজা ভ্রুকুটি করে দরজার বাইরে তাকিয়ে রইল। প্রতিটি প্রশ্ন আলাদা আলাদা। অথচ তার মনে হয় সব প্রশ্নের এক উত্তর, একই সুঁতায় গাঁথা এখন সেসব ভাবার সময় না। আমিরের প্রতি যত্নশীল হওয়া দরকার। পদ্মজা আমিরের কপাল ছুঁয়ে তাপমাত্রা অনুমান করে। ভীষণ গরম। জ্বর উঠছে নাকি!লিখন আর মৃদুলের আড্ডা জমে উঠেছে। জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে দুজন। লিখনের নায়িকা তিন দিন আগে ঘাট থেকে পিছলে নদীতে পড়ে গেছে। সাঁতার জানে না তাই প্রচুর পানি খেয়েছে। সেই সঙ্গে পা মচকে গেছে। কোমরেও ব্যথা পেয়েছে। এই কথা শুনে মৃদুল হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে পড়ে যাচ্ছিল। পূর্ণা দূর থেকে কটমট করে মৃদুলের দিকে তাকিয়ে আছে। কত অসভ্য এই লোক! মানুষের আঘাতের কথা শুনে হাসে! তার গা জ্বলে যাচ্ছে মৃদুলের হা হা করে হাসা দেখে। লিখন আরো জানাল, সে এবং তার দল গত তিনদিন নায়িকা ছাড়া দৃশ্যগুলোর শুটিং করেছে। বাকি যা দৃশ্য আছে সবকিছুতে নায়িকার উপস্থিতি থাকতেই হবে। তাই আপাতত শুটিং স্থগিত। আশা করা যাচ্ছে, তিন-চার দিনের মধ্যে নায়িকা সুস্থ হয়ে যাবে। পূর্ণাকে দূরে বসে থাকতে দেখে লিখন ডাকল। খুশিতে গদগদ হয়ে দৌড়ে এলো পূর্ণা, ঘণ্টা দুয়েক আগে একটু কথা হয়েছিল; আর হয়নি। লিখন প্ৰশ্ন করল, ‘ভেতরের অবস্থা কেমন? আমির হাওলাদার আগের চেয়ে কিছুটা ভালো অনুভব করছেন?’‘ঘুমাচ্ছে দেখে এলাম। আপা আছে পাশে।’‘তোমার আপা পাশে থাকলে আর কী লাগে!’ লিখনের কণ্ঠটা করুণশোনায়। পূর্ণা প্রসঙ্গ পালটে বলল, ‘ভাইয়া, আপনি কিন্তু আমাদের বাড়িতে যাবেন। তখন বললাম, কিছুই বললেন না।’‘যাব।’‘প্রান্ত অনেক খুশি হবে।’‘প্রান্ত যেন কে?’‘আমার ভাই। ওই যে খুন—’‘মনে পড়ছে। কী যেন নাম ছিল… মুন্না বা মান্না এরকম কিছু নাম ছিল না?’‘জি ভাইয়া।’‘সবাই কত বড়ো হয়ে গেছে। পড়াশোনা আর করোনি কেন?’পূর্ণা বাঁ হাত চুলকাতে চুলকাতে বলল, ‘মেট্রিক ফেল করায় আর পড়তে ইচ্ছে করেনি।মৃদুল ভূত দেখার মতো চমকে উঠে বলল, ‘তুমিও মেট্রিক ফেল?’পূর্ণা আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইল, ‘কেন? আরো কেউ আছে এখানে?’মৃদুল মুচকি হেসে চুল ঠিক করতে করতে চমৎকার করে বলল, ‘আমিও মেট্রিক ফেল।’মৃদুলের কথা শুনে লিখন সশব্দে হেসে উঠল। পূর্ণা সরু চোখে তাকিয়ে আছে মৃদুলের দিকে। মজা করল নাকি সত্য বলল? লিখন ঠোঁটে হাসি ধরে রেখে বলল, ‘মৃদুল মজা করছো, নাকি সত্যি?’মৃদুল গুরুতর ভঙ্গিতে বলল, ‘মিথ্যা কইতে যামু কেন? এতে আমার লাভডা কী?’মৃদুলের ভঙ্গি দেখে লিখন চারপাশ কাঁপিয়ে হাসল। সঙ্গে তাল মিলাল পূর্ণা ও মৃদুল। লিখন আগের চেয়েও সুন্দর হয়েছে। দেখতে কত ভালো দেখাচ্ছে। কী অপূর্ব মুখ। বলিষ্ঠ শরীর। পূর্ণা কেন জানি আজও মনে হচ্ছে, লিখনের পাশেই পদ্মজাকে বেশি মানায়। পরক্ষণেই পূর্ণা নিজেকে শাসাল, ‘চুপ থাক পূর্ণা! আমির ভাইয়ার মতো ভালো মানুষ দুটি নেই। আপার জন্য আমির ভাইয়া সেরা।’তবুও মন বোঝে না। হয়তো সৌন্দর্যের মিলটার জন্যই লিখন-পদ্মজা দুটি নাম তার ভাবনায় একসঙ্গে জোড়া লেগে যায়। অথচ বিবেক দিয়ে ভাবলে মনে হয় আমিরের জায়গা কেউ নিতে পারবে না। কেউ না। সে অনন্য। তার মতো ভালোবাসতে কেউ পারবে না, লিখনও না।হাসিখুশি মুহূর্ত উবে যায় খলিলের কর্কশ কণ্ঠে, ‘বেহায়া, বেলাজা ছেড়ি। পর পুরুষের সামনে কেমনে দাঁত মেলায়া হাসতাছে। ঘরে বাপ-মা না থাকলে এমনই হয়। এই ছেড়ি ঘরে যাও।’লিখন-মৃদুলের সামনে এভাবে কটু কথা শুনে পূর্ণার বুক ফেটে কান্না আসে। সে এক পলক তাদেরকে দেখে আলগ ঘরের ভেতর চলে যায়। এদিকে লিখন, মৃদুলও হতভম্ব। খলিলের মাথায়, হাতে ব্যান্ডেজ। নাকের নিচে চামড়া উঠে গেছে, মাংস দেখা যাচ্ছে। তবুও তেজ কমেনি। তিনি পূর্ণাকে উদ্দেশ্য করে বলছেন, ‘মা ডা মইরা যাওয়ার পর থেকে এই ছেড়ি দস্যি হইয়া গেছে। এত বড়ো ছেড়ি বুড়া হইতাছে। বড়ো বইনে বিয়া দেয় না। কোনদিন কোন কাম ঘটায় আল্লায় জানে। তা, লিখন, দুপুরের খাবার খাইছো?’লিখনের ইচ্ছে হচ্ছে না এই কুৎসিত ভাবনার লোকটার জবাব দিতে। যেহেতু সে এই বাড়ির অতিথি, তাই মনের কথা শুনতে পারল না। বলল, ‘জি না।’খলিলকে উপেক্ষা করে আলগ ঘরে চলে গেল মৃদুল। পূর্ণা আলগ ঘরের পেছনের বারান্দায় এসে দাঁড়াল, মৃদুল তার পেছনে। কোমল স্বরে বলল, ‘খালুর কথায় কষ্ট পাইছো?’পূর্ণা মৃদুলের দিকে না তাকিয়ে জবাব দিল, ‘আপনি কারো কষ্টের কথা ভাবেন দেখে ভালো লাগল।’‘সবসময় ত্যাড়া কথা কেন কও? আমি যদি আগে জানতাম তোমারে কালি কইলে তোমার এত্ত কষ্ট হয়, তাইলে কইতাম না।’পূর্ণা তাকাল। পূর্ণার দৃষ্টি দেখে মৃদুলের মন কেমন করে ওঠে। এ দৃষ্টির নাম বোধহয় মন কেমন করা দৃষ্টি’। পূর্ণা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, মাফ চাইছেন?’মৃদুলের জোড়া ভ্রু কুঁচকে আসে। দুই পা পিছিয়ে যেয়ে বলল, ‘জীবনেও না।’.পদ্মজা ক্ষুধার্ত বাঘিনীর মতো রান্নাঘরে ঢুকে ফরিনাকে বলল, ‘আম্মা, কী হয়েছে আপনার?’ফরিনা প্রবল বিস্ময়ে জানতে চাইলেন, ‘কেন? কী হইব আমার?’ফরিনার ব্যবহারে পদ্মজা অবাক। সে কিঞ্চিৎ হাঁ হয়ে তাকিয়ে রইল। ফরিনা নিশ্চিন্ত মনে চুলা থেকে পাতিল নামালেন। তারপর বললেন, ‘ও পদ্মজা, মগারে একটু কইবা লিখন-মৃদুলরে ডাইকা আনতে। লিখন ছেড়াডা কহন আইছে। এহনও খায় নাই।’পদ্মজা আর ঘাঁটল না ফরিনাকে। সে বুঝে গেছে কোনো জবাব পাবে না। সদর ঘরে পার হতেই সদর দরজায় মৃদুল এবং লিখনের দেখা পেল। পদ্মজা চট করে আঁচল দিয়ে মাথা ঢেকে নিয়ে বলল, ‘আপনারা এখানে এসে বসুন। আম্মা আপনাদেরই খোঁজ করছিলেন।’কথা শেষ হতেই পদ্মজা সদর ঘর ছেড়ে রান্নাঘরে চলে গেল। আবিষ্ট হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল লিখন। সেই পুরনো দিনের মতোই তার স্বপ্নের প্রেয়সী এক ছুটে পালিয়ে বেড়ায়। পার্থক্য শুধু—আগে লজ্জায় পালাত, এখন অস্বস্তিতে। লিখন গোপনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। পদ্মজাকে এক ঝলক দেখার জন্য এই বাড়িতে সে পা দিয়েছে। যাকে মনপ্রাণ উজার করে ভালোবাসে তার স্বামীর বাড়িতে আসা কতটা কষ্টের তা শুধু তার মতো অভাগারাই জানে। মৃদুল লিখনের দৃষ্টি খেয়াল করে কিছু একটা আন্দাজ করে বলল, ‘পদ্মজা ভাবিকে চিনেন?’‘চিনব না কেন—’লিখন থেমে গেল। সে নিজের অজান্তেই কী বলে দিচ্ছিল! হেসে বলল, ‘এতসব জেনে কী হবে? আসো গিয়ে বসি। তারপর বলো, কখনো প্রেমে পড়েছো?’‘না মনে হয়।’ উদাসীন হয়ে বলল মৃদুল।‘নিশ্চিত হয়ে বলো।’মৃদুল ভাবল, কোন নারীর প্রতি তার আকর্ষণ বেশি কাজ করেছে। উত্তর পেয়েও গেল। সকালেই সে পূর্ণার মধ্যে অদ্ভুত কিছু পেয়েছে। অজানা অনুভূতি অনুভব করেছে। এটা কী প্রেম? মৃদুল নিশ্চিত নয়। তাই সে বলল, ‘না, পড়ি নাই।’‘আচ্ছা, সেসব বাদ। বিয়ে করছো কবে সেটা বলো।’‘উমম, হুট করে একদিন। আমার ইচ্ছা আমি হুট করে একদিন বিয়ে করে আম্মারে চমকে দেব।’লিখন সশব্দে হাসল। বলল, মানুষের সব চাওয়া পূরণ হয় না। প্রতিটি মানুষের জীবনের কোনো না কোনো পাশে অপূর্ণতা থাকে।’‘তাহলে বলছেন আমার এই ইচ্ছে পূরণ হইব না?’‘না তা বলছি না। হুট করে বিয়ে করে ফেলা আর কেমন অসম্ভব কাজ? মেয়ে রাজি থাকলেই হলো। মেয়ে বেঁকে গেলে কিন্তু কিচ্ছা খতম।’লিখন আবারও সশব্দে হাসল। মৃদুলও অকারণে তাল মিলিয়ে হাসল। সে ভাবছে, একটা মানুষ এত হাসতে পারে কীভাবে? এত সুখী লিখন শাহ?সে তো আর জানে না দুঃখীরা পাহাড় সমান কষ্ট লুকোয় হাসির আড়ালে।.ধীরে ধীরে বাড়ির সবাই বৈঠকখানায় জমা হলো, আমির ছাড়া। রিদওয়ান, খলিল এত শান্ত আচরণ করছে যে মনেই হচ্ছে না সকালে এত বড়ো ঘটনা ঘটে গেছে। বাড়ির মহিলারা দৌড়ে দৌড়ে খাবার পরিবেশন করছে। পদ্মজা খুব অবাক হয়ে প্রতিটি মানুষকে পর্যবেক্ষণ করছে। লিখনও এতে কম অবাক হয়নি। কত শান্ত পরিবেশ! ঝগড়ার পর মান-অভিমান, তর্ক-বিতর্ক থাকে। সেসব কিছুই নেই। পদ্মজা সবার সামনে আলাদা প্লেটে খাবার নিয়ে ফরিনাকে বলল, ‘আম্মা, আমি উনার জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছি। ঘুম ভেঙেছে হয়তো।পদ্মজা সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠছে। লিখন সেদিকে আড়চোখে তাকিয়ে রইল। পদ্মজার হাঁটার ছন্দ দৃপ্ত ও সাবলীল। মাথায় শাড়ির আঁচলে ঘোমটা টানা। স্বামীর জন্য খাবার নিয়ে যাচ্ছে। এই স্বামীটা কী সে হতে পারত না? এতটাই অযোগ্য ছিল? অযোগ্য নাকি নিয়তির খেলা? কেন ভোলা যায় না এই নারীকে?লিখনের বোন লিলি আর পদ্মজা একই ক্যাম্পাসের হওয়া সত্ত্বেও লিখন কখনো পদ্মজার সামনে এসে দাঁড়ায়নি, পদ্মজার অস্বস্তি হবে ভেবে। সে পদ্মজার চোখে ভালোবাসা দেখতে চায়, বিব্রতভাব বা অস্বস্তি দেখতে চায় না। এ যে বড়ো যন্ত্রণার। এতদিনেও বুকের ভেতর কীভাবে পুষে আছে এক পাক্ষিক ভালোবাসা? কোনোভাবে কী এই ভালোবাসা পূর্ণতা পাবে! আসবে কী সেই সুদিন? লিখনের শুষ্ক চক্ষু সজল হয়ে ওঠে। সে ভাবতে পারে না, পদ্মজা বিবাহিত! লিখনের ঠিক সামনেই মৃদুল ছিল, লিখনের প্রতিক্রিয়া দেখে অনেক কিছুই বুঝে নিলো। নিশ্চিত হওয়া যাবে পূর্ণাকে জিজ্ঞাসা করলে। খাওয়াদাওয়া শেষ করে পূর্ণার সঙ্গে কথা বলতে হবে। মৃদুল চারিদিকে চোখ বুলিয়ে কাঙ্খিত রমণীকে খোঁজে।.পদ্মজা আমিরকে ধরে ধরে বসাল। ঘাড়ে প্রচণ্ড ব্যথা। টিকে থাকাই দায়। রাগে কিড়মিড় করছে এখনো। পদ্মজা তাকে শান্ত করে খাইয়ে দিল। খাওয়া শেষে আমির ম্লান হেসে বলল, ‘লিখনের সঙ্গে কথা হয়েছে?’পদ্মজা নিষ্কম্প স্থির চোখে তাকাল, ‘উনার সঙ্গে কেন কথা হতে যাবে আমার?’‘উনি তো তোমার জন্যই এসেছেন।’‘আপনাকে বলেছে? অন্য দরকারেও আসতে পারে।’আমির হাসল। বলল, ‘সে আজও তোমাকে পছন্দ করে। আশা করে তুমি তার কাছে যাবে।’‘অসম্ভব। যা তা বলছেন। আপনি এসব বললে আমার খারাপ লাগে।’পদ্মজা থামল। আমির মৃদু হাসছে। পদ্মজা আমিরের কোলে মাথা রেখে আদুরে কণ্ঠে বলল, আপনি জানেন না আপনাকে কত ভালোবাসি আমি? আমি আপনাকে ছাড়া এক মুহূর্তও ভাবতে পারি না।’‘তাহলে বাচ্চার জন্য বিয়ে করতে বলো কেন?’‘বন্ধ্যা নারীর কত যন্ত্রণা, বুঝবেন না।’‘আমাদের একটা মেয়ে হয়েছিল।’‘আর হবে না তাই বলি।’‘হবে, আল্লাহ চাইলে হবে। তাছাড়া আমার কাছে তো ফুটফুটে একটা বউই আছে। আর কী লাগে?পদ্মজা আমিরের কোল থেকে মাথা তুলে উঠে বসে। চিরুনি দিয়ে আমিরের চুল আঁচড়ে দিতে দিতে বলল, ‘চুলগুলো বড়ো হয়েছে অনেক। ‘‘হু, এদিকে আসো।’আমির পদ্মজাকে এক হাতে টান দিতে গিয়ে ঘাড়ে চাপ খেয়ে ‘আহ’ করে উঠল। পদ্মজা ব্যস্ত হয়ে পড়ল, ‘খুব লেগেছে? আমি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলাম। কেন এমন করেন আপনি!তেজহীন দুপুরের সূর্যটা একটু একটু দেখা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর আবার ডুবেও যাবে। পূর্ণা লবণ দিয়ে টক বরই খাচ্ছে, দেখে মনে হচ্ছে অমৃত! মৃদুল পূর্ণার পাশে এসে বসতেই পূর্ণা চমকে উঠে। মৃদুলকে দেখে বুকে থুতু দেয়। তারপর বাজখাঁই কণ্ঠে বলল, ‘হুট করে এভাবে কেউ আসে?’আর কথা কইও না। তোমারে সারা দুনিয়া খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে গেছি। মাত্র মগা কইল তুমি নাকি ছাদে।’‘কেন? আমাকে খুঁজছেন কেন?’‘এমনে খ্যাট খ্যাট কইরা কথা কইতাছ কেন? একটু ভালো কথা আহে না মুখে?’পূর্ণা একটু নড়েচড়ে বসল। হেসে বলল, ‘দুঃখিত। এবার বলুন কী দরকার।’‘ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতাম আর কী!‘আমার ব্যক্তিগত কোনো তথ্য নেই।’‘তোমার না, তোমার বড়ো বইনের। পদ্মজা ভাবির।’পূর্ণা উৎসুক হয়ে তাকাল। মৃদুল উশখুশ করতে করতে বলল, ‘পদ্মজা ভাবি আর লিখন ভাইয়ের মধ্যে কী কোনো সম্পর্ক ছিল?’পূর্ণা জোরে নিশ্বাস ছাড়ল। তার ভাব দেখে মনে হচ্ছে মৃদুল কোনো ফালতু প্রশ্ন করেছে। নির্বিকার কণ্ঠে বলল, ‘না। তবে লিখন ভাই আপাকে পছন্দ করত। আপার সঙ্গে ভাইয়ার বিয়েটা কীভাবে হয়েছে জানেন?’‘আমির ভাইয়ের কথা বলছো?’‘আপার কী আর কোথাও বিয়ে হয়েছে?’‘সোজা উত্তর দিতে পারো না? তারপর বলো।’‘ওই ঘটনাটা না হলে হয়তো লিখন ভাইয়ের সঙ্গেই আপার বিয়েটা হতো। কিন্তু হয়নি। এতটুকুই।’‘লিখন ভাইরে দেখলে মনে হয় তাদের মধ্যে কোনো গভীর সম্পর্ক ছিল। তারপর বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। ভাই অনেক ভালোবাসতে পারে।’‘হু।’ পূর্ণা বরই খাচ্ছে তৃপ্তি করে।মৃদুল বিরক্তি নিয়ে অনেকক্ষণ পূর্ণার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর উঠে দাঁড়াল এক পাশে; চোখ ঘুরিয়ে দেখে নিলো চারপাশ। পূর্ণা বাঁকা চোখে মৃদুলকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পরখ করে নিলো, মৃদুলের উপস্থিতি তার হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়, বুক হাপড়ের মতো ওঠানামা করে। তবে তা প্রকাশ করার সাহস হয় না। পূর্ণা আরেকটা বরই হাতে নিলো। তখন মৃদুল ডাকল, ‘বেয়াইন।’পূর্ণা তাকাল। মৃদুল ঝুঁকে ছাদের মেঝেতে কিছু দেখছে। পূর্ণা উৎসুক হয়ে সেদিকে এগিয়ে যায়। মৃদুল আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ‘রক্ত না?পূর্ণা মৃদুলের মতো ঝুঁকে ভালো করে খেয়াল করল। তারপর বিস্ফোরিত কণ্ঠে বলল, ‘তাই তো।‘মানুষের রক্ত না পশুর রক্ত, বুঝতাম কেমনে?’‘পশুর রক্ত এইখানে আসবে কেন?’‘মানুষের রক্তই বা কেন আসবে?’‘তাই তো!’দুইজন চিন্তিত হয়ে ভাবতে থাকল। পূর্ণা বলল, ‘মনে হয় কোনো পাখি শিকার হয়েছে। আর রক্তাক্ত অবস্থায় এখানে এসে পড়েছে।’‘তাহলে মরা পাখিডা কই?’‘ধরুন, আহত হয়েছে কিন্তু মরেনি। এরপর চলে গেছে।’.সন্ধ্যারাত, জোনাকিপোকারা ছুটে বেড়াচ্ছে। ঠান্ডা বাতাস। সেই বাতাসে পাতলা শার্ট পরে লিখন দাঁড়িয়ে আছে নারিকেল গাছের নিচে, জোনাকি পোকা দেখছে। মাঝেমধ্যে অন্দরমহলের দিকে তাকিয়ে কাউকে চোখ দুটি খুঁজছে। সেদিন হেমলতা ফিরিয়ে দেয়ার পর, সারা রাত বাড়ি ফেরেনি সে। খেতে বসে ছিল, আকাশ কাঁপিয়ে কেঁদেছে। কেউ শোনেনি। স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার মতো কষ্ট দুটো নেই। স্বপ্নে সাজানো সংসার ভেঙে চুরমার হওয়ার দিন ছিল সেদিন। এক সময় ইচ্ছে হয়েছিল পদ্মজাকে তুলে নিয়ে পালাতে। কিন্তু বিবেক সাড়া দেয়নি। পরদিন সকালে উঠেই মা-বাবাকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। প্রতিটা মুহূর্তে আফসোস হয়, শুরুতে কেন হেমলতার কাছে প্রস্তাব দিতে পারল না!পরবর্তী কয়েকটা মাস ঘোরের মধ্যে কেটেছে। সিনেমা জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল। বছরখানেক লেগেছিল জীবনের গতি স্বাভাবিক করতে। কিন্তু মন…মন তো ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। আজও জোড়া লাগেনি। পদ্মজা কী কখনো জানবে, সে ঢাকায় কতবার পদ্মজার পিছু নিয়েছে? জানবে কী তার ভালোবাসার গভীরতা?লিখন আনমনে হেসে উঠল। চোখে জল ঠোঁটে হাসি! এ হাসি সুখের নয়, যন্ত্রণার। নিজের প্রতি উপহাস!পূর্ণা অন্দরমহলে আসেনি। পদ্মজা ভীষণ রেগে আছে। আলগ ঘরের বারান্দায় সারাক্ষণ কী করে এই মেয়ে? এর আগেও যখন পারিজা তার পেটে ছিল, পূর্ণা তখন এই বাড়িতে ছিল অনেকদিন। তখনো মাঝরাত অবধি আলগ ঘরের বারান্দায় বসে থাকত। পদ্মজা গায়ে শাল জড়িয়ে বেরিয়ে আসে অন্দরমহল থেকে। সারাদিন পূর্ণার খোঁজ নেয়া হয়নি। এখন ধরে ঘরে নিয়ে যাবে। নির্জন, থমথমে পরিবেশ।তখন লিখনের কণ্ঠ ভেসে আসে, ‘পদ্মজা?’কণ্ঠটি শোনামাত্র ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠে পদ্মজা, অপ্রতিভ হয়ে যায়। একটা মানুষ কেন তাকে এত বছর মনে রাখবে? কেন অনুচিত আশা নিয়ে বসে থাকবে? পদ্মজার রাগ হয়, অস্বস্তি হয়। কষ্টও হয়। প্রার্থনা করে, এই মানুষটার জীবনে কেউ আসুক। এসে তার জীবনটা কানায় কানায় পূর্ণ করে দিক। ভুলিয়ে দিক অতীত। পদ্মজা স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, ‘এভাবে রাতের বেলা ডাকবেন না।’পদ্মজা লিখনকে উপেক্ষা করে দুই পা এগিয়ে যায়।‘জীবন থেকে তো সরেই গিয়েছো। আমি তোমাকে বিব্রত করতে চাই না। তাই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সামনে আসিনি। আজ যখন এসেই পড়েছি, কয়েক হাত দূরে থেকেই একটু কথা বললে কী খুব বড়ো দোষ হয়ে যাবে?’লিখনের করুণ কণ্ঠ শুনে দাঁড়িয়ে পড়ে পদ্মজা। হাসল লিখন, সুরগুলি যেন ফিরে এসে প্রাণে মৃদুগুঞ্জন শুরু করে দিয়েছে। পদ্মজার উপস্থিতি এভাবে কাঁপন ধরাচ্ছে কেন!আজকের এই সময়টা সুন্দর, ভারী সুন্দর!
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে এটি প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সাক্ষাৎ।বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে বঙ্গভবনে আসেন প্রধানমন্ত্রী। এসময় সঙ্গে ছিলেন কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান।রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ছিলেন তার সহধর্মিণী অধ্যাপিকা রেবেকা সুলতানা।প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন। এসময় তিনি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে স্বাধীনতা দিবসের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ উদ্বোধন করার পরে কিছুক্ষণ খেলা দেখে বঙ্গভবনে আসেন প্রধানমন্ত্রী।গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তারেক রহমানকে শপথবাক্য পাঠ করান। বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এটি প্রথম সাক্ষাৎ।