BDBOYS...
BDBOYS...
সবচেয়ে সাম্প্রতিক খবর ও পোস্টসমূহ
ঐদিন রুনীনা বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে ঢুকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বিছানায় শুয়ে রইল। চিন্তা করতে লাগল, এখন কি করবে। যদি মায়ের কথামত মহিমের সঙ্গে মেলামেশা না করত, তা হলে এই অঘটন ঘটত না। তখন তার মনে অনেক কথা ভেসে উঠল। মহিম তাদের পাড়ার বড় লোকের ছেলে। দেখতে সুন্দর। লেখাপড়াতেও ভালো। কিন্তু সে চরিত্রহীন। বড় লোকের সুন্দর মেধাবী ছেলের বান্ধবীর অভাব হয় না। সে প্রত্যেককে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের মধু খেয়েছে। অনেকে তার আসল রূপ জানতে পেরে সরে গেছে। রুবীনা পাড়ার মেয়ে বলে এতদিন পরিচয় থাকলেও কোনো অশ্লীল কাজ তার সঙ্গে করেনি। কিন্তু ইদানীং বান্ধবীর অভাবে রুবীনার পিছনে লেগেছিল।স্কুল জীবন থেকে তাদের পরিচয়। কলেজে ঢুকে সেটা গাঢ় হয়। প্রায় প্রতিদিন গভীর রাতে মহিম এসে সে জানালার কাছে দাঁড়িয়ে রুবীনার সঙ্গে গল্প করত। একদিন তার মা সোহানা বেগম জানতে পেরে মেয়েকে রাগারাগি করেন। কিন্তু রুবীনা শোনেনি। গোপনে গোপনে তার সঙ্গে নানান জায়গায় ঘুরে বেড়াত। এক ছুটির দিনে কাউকে কিছু না বলে সে মহিমের গাড়িতে করে ন্যাশনাল পার্কে বেড়াতে যায়। সেদিন মেঘলা ছিল। সেখানে পৌঁছাবার কিছুক্ষণপর ভীষণ ঝড়-বৃষ্টি আরম্ভ হল। দিনের বেলাতে সন্ধ্যার মত অন্ধকার হয়ে এল। ওরা বেড়াতে বেড়াতে ছুটে এসে ডাক বাংলোতে উঠল। খুব জোরে ঝড় হচ্ছিল বলে একটি কামরার মধ্যে ঢুকে লাইট জ্বেলে দুজনে দুটো চেয়ারে বসল। তখন আর কেউ সেখানে ছিল না। ঝড়ের দাপট এক সময় কারেন্ট অফ হয়ে গেল। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকে উঠে কাছাকাছি কোথাও বাজ পড়ল। রুবীনা ভয় পেয়ে ছুটে এসে মহিমকে জড়িয়ে ধরল। মহিম তাই চাচ্ছিল। রুবীনাকে সে বুঝিয়ে সুজিয়ে নিজের মনস্কামনা চরিতার্থ করার জন্য এখানে এনেছে। সুযোগ পেয়ে সেও রুবীনাকে জড়িয়ে ধরল। রুবীনার নরম তুলতুলে যৌবন পুষ্ট শরীরের স্পর্শে মহিমের শরীরের অনুকণাগুলো সতেজ হয়ে উঠল। ভাবল, আজ তার মনের ইচ্ছা পূরণ হবে। সে একটা হাত দিয়ে রুবীনার মুখটা নিজের মুখের কাছে এনে ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে বলল, এত ভয় পাচ্ছ কেন? আমিতো রয়েছি। তারপর তার নিচের ঠোঁট চুষতে লাগল। রুবীনা প্রথমে ভয় পেয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেছিল, কিন্তু মহিম যখন তার ঠোঁট চুষতে লাগল তখন তার যৌবন জোয়ার উত্তাল তরঙ্গের মত প্রবাহিত হতে লাগল। সে সব কিছু ভুলে গেল। সমস্ত শরীর তার থর থর করে কেঁপে উঠল। ঘন ঘন গরম নিঃশ্বাস পড়তে লাগল। তার অবস্থা দেখে মহিম তখন পাগলের মত বুকে চেপে ধরে পীষে ফেলার চেষ্টা করল। রুবীনা বলল, প্লীজ মহিম, অতজোরে চাপ দিয়ো না, আমার লাগছে। মহিম মনে করল, রুবীনার তা হলে এসব ভালো লাগছে। সে তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সুযোগ পেয়ে আদিমতায় মেতে উঠল। একসময় দুজনেই ক্লান্ত হয়ে পড়ল। বেশ কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলতে পারল না। একটু পরে রুবীনা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। নিজের ভুলের অনুশোচনায় সে তখন জর্জরিত।তাকে কাঁদতে দেখে মহিম কপটতার আশ্রয় নিয়ে বলল, আমি ঠিক এতটা চাইনি। উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে করে ফেলেছি। তুমি আমাকে ক্ষমা কর।রুবীনা বেশ কিছুক্ষণ কাঁদল। তারপর চোখ মুছে বলল, মহিম ভাই, একটা কথা বলব রাখবে?মহিম বলল, বল কি কথা?রুবীনা বলল, এরপর আমি আর অন্য কাউকে এই দেহ দিতে পারব না। যদি তুমি আমাকে বিয়ে না কর, তবে আমি বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করব।মহিম বলল, সে কথা আমিও এখন ভাবছিলাম। কথা দিলাম, আমি তোমাকে বিয়ে করব। তবে তোমাকে অনেক দিন অপেক্ষা করতে হবে।রুবীনা মহিমের কপটতা বুঝতে পারল না। বলল, যতদিন অপেক্ষা করতে বলবে ততদিন অপেক্ষা করব।আরও কিছুক্ষণ দুজনে গল্প করে বাড়ি ফিরে এল। এরপর প্রায়ই তাদের দৈহিক মিলন হত। মহিম খুব চালাক, সে প্রেগনেন্টের ভয়ে সব সময় কন্ডম ব্যবহার করে। কিন্তু দুর্ঘটনা যা ঘটবার প্রথম বারে ঘটে গেছে। মাস শেষ হওয়ার পর যখন রুবীনার ঋতুস্রাব হল না তখন বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ল। মনে করল, তার তো মাসিকের একটু দোষ আছেই। আগেও কয়েকবার এরকম হয়েছে। কিন্তু যখন দুমাস কেটে গেল অথচ মাসিক হল না, তখন সে মহিমকে সব কথা জানাল।রুবীনার কথা শুনে মহিম প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেল। তারপর সামলে নিয়ে রেগে উঠে বলল, আমি সব সময়।এ রকম ( পারে না। তারপর রুবীনাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিল, আমি তোমার গর্ভের সন্তানের জন্মদাতা নই, অন্য কেউ। যাও আর কোনোদিন এস না। মহিমের তখন অন্য চিন্তা মাথায় ঘুরছে। সে ফিজিক্সে উচ্চ ডিগ্রী নেওয়ার জন্য বিদেশ যাবে। বিদেশী যুবতীদের চিন্তায় তার মাথা ঘুরপাক খাচ্ছে। সে এখন রুবীনাকে থোড়াই কেয়ার করে।রুবীনার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। বলল, মহিম তুমি এতবড় নীচ কথা বলতে পারলে? এত বড় পাষান্ড তুমি? আমি যে কিছুই ভাবতে পারছি না।মহিম বলল, দেখ বেশি বাড়াবাড়ি করো না, যা বলছি শোন, লক্ষ্মী মেয়ের মত ঘরে ফিরে যাও। তারপর তোমার গর্ভে যার ঔরসে সন্তান এসেছে তাকে ভয়ে দেখিয়ে বিয়ে করে ফেল।রুবীনা রাগে ও অপমানে আর কোনো কথা বলতে পারল না। কেমন করে সেদিন বাড়ি ফিরেছিল তার মনে নেই। সেই থেকে মহিমের খোঁজ আর করেনি। কয়েকদিন পরে এক বান্ধবীর কাছে শুনেছে, সে বিদেশ চলে গেছে।এই ঘটনার কিছুদিন পর মনিরুল তার পিছনে লাগল। রুবীনা দু একদিন তার সঙ্গে বেড়িয়ে বুঝতে পারল, সেও তাকে চায়। রুবীনা এখন চালাক হয়ে গেছে। বিয়ের আগে দেহ দিলে সে তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চাইবে না। তাই মনিরুল যখন সুযোগ পেয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেল তখন রুবীনা নিজেকে মুক্ত করে নিয়ে মেকি রাগ দেখিয়ে বলেছিল, বিয়ের আগে এসব হলে বিয়ের পর আর মজা থাকবে না। বিয়ের পর যা কিছু করো আমি আপত্তি করবো না।রুবীনা এত তাড়াতাড়ি বিয়ের প্রস্তাব দিবে মনিরুল ভাবেনি। সে তখন তাকে পাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠল। সেইজন্য ঐ দিন তাকে নিয়ে কাবিন করতে যাবে বলে বলেছিল। জানাজানি করে বিয়ে করতে গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে। তাই গোপনে এই ব্যবস্থা করেছিল। এই সমস্ত চিন্তা করতে করতে রুবীনা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। এরপর আর কি করে সকলের কাছে মুখ দেখাবে? কদিন ধরে কিছু খেতে পারছে না, শুধু বমি পায়। একদিন তো ভাবির সামনেই ওকি করতে করতে শরীর খারাপের অজুহাত দেখিয়ে পালিয়ে বেঁচেছে। তাকে সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। এই বুঝি ভাবির কাছে ধরা পড়ে গেল? এভাবে আর কত দিন পাপকে লুকোতে পারবে? মনিরুলকে বিয়ে করে পূর্বের পাপটা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাকেও মহিমের মত দেখল। সে তখন মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। সেইদিন সন্ধ্যার পর দুটো চিঠি লিখল। একটি মাকে আরঅন্যটা থানার দারোগাকে।মায়ের চিঠি- মা, আমি তোমার কলঙ্কিনী মেয়ে। আমার আর এ দুনিয়াতে থাকার কোনো অধিকার নেই। তুমি জেনে খুব দুঃখ পাবে, তবু বলতে বাধ্য হচ্ছি, আমি মা হতে চলেছি। আমি অনেক চিন্তা করে দেখেছি, দুনিয়ার কোনো কিছু দিয়ে এ পাপ ঢাকতে পারব না। তাই আমি আত্মহত্যার পথ বেছে নিলাম। আমার এই পরিণতির জন্য আমি কাউকে দায়ী করলাম না। শুধু তুমি দুনিয়ার সব মায়েদের বলে দিও, তারা তাদের মেয়েদের যত লেখাপড়া করাক না কেন, ছেলেদের সঙ্গে যেন ফ্রীভাবে মেলামেশা করতে না দেয়। যুবক যুবতীরা এক সঙ্গে ফ্রী মেলামেশা করলে কোনো এক দূর্বল মুহূর্তে অপকীর্তি করে ফেলবেই। ভাবির কাছে শুনেছিলাম, এই জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (দঃ) ছেলেমেয়েদের এক সঙ্গে মেলামেশা করতে নিষেধ করেছেন। মেয়েদের কাজের ও থাকার স্থান আলাদা করে দিয়েছেন। এই সব শিক্ষা তুমি আমাকে দাওনি। তুমি আমাকে ধর্মেরও কোনো জ্ঞান দাওনি। এই সমস্ত জ্ঞান আমি ভাবির কাছে পেয়েছি। বিয়ের আগে প্রথম যখন ভাবি আমাদের বাড়িতে আসে তখন আমি তাকে সেকেলে আনকালচার্ড মেয়ে মনে করে এড়িয়ে চলেছি। যখন তাকে পরশ পাথর বলে চিনলাম তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভাবি ও দাদাদেরকে আমার জন্য দোয়া করতে বলো। তোমাকে আর কি দোষ দেব। এটাই আমার তকদীর। পারলে এই কলঙ্কিনী মেয়েকে ক্ষমা করো। ইতি- রুবীনা।দারোগার চিঠি-দারোগা সাহেব, আমি আমার দুস্কর্মের জন্য আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছি। এর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি এক ভাগ্য বিড়ম্বনা চরিত্রহীন মেয়ে। আমার মত মেয়ে এ দুনিয়ায় বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো মনে করে এই পথ বেছে নিলাম। আপনারা আমার মা, ভাই, ভাবি এবং অন্য কাউকে সন্দেহ করবেন না। আমি নিজে স্বেচ্ছায় সকলের অগোচরে চলে যাচ্ছি। আপনার কাছে আমার একটা অনুরোধ, আমার লাশ ময়না তদন্ত করবেন না। আশা করি, আপনি একজন মৃত্যুপথ যাত্রীর অনুরোধ রক্ষা করে তাড়াতাড়ি দাফনের অনুমতি দিবেন। নিজের মেয়ে বা বোন মনে করে আমার এই অনুরোধ রাখার জন্য আবার অনুরোধ করছি। ইতি-রুবীনা।রাত দশটার সময় লাইলী রুবীনাকে ভাত খাওয়ার জন্য ডাকতে এসে দরজা বন্ধ দেখে কড়া নাড়া দিয়ে বলল, ভাত খাবে এস।রুবীনার তখন এ্যাবনরমাল অবস্থা। সে ভাবির গলা শুনে অনেক কষ্টে গলার স্বর সংযত রেখে দরজা না খুলে বলল, তোমরা খেয়ে নাও, আমার শরীর খারাপ। আজ আমি কিছু খাব না।লাইলী ফিরে এসে সেলিমকে রুবীনার কথা বললে সেলিম বলল, আজ ওর শরীর ও মন খুব খারাপ হওয়ার কথা, তার জন্য কোনো চিন্তা করো না।ওদিকে রুবীনা যখন বুঝল, ভাবি ফিরে গেছে তখন সে ধীরে ধীরে আলমারীর কাছে গিয়ে ঘুমের ট্যাবলেটের শিশি হাতে নিল। প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর থেকে সে রাত্রে একদম ঘুমাতে পারত না। তাই ঘুমের ট্যাবলেট এক শিশি কিনে ছিল। তাতে এখনো অনেক ট্যাবলেট আছে। রুবীনা সব ট্যাবলেট এক সঙ্গে খেয়ে ঘুমিয়ে গেল। সে ঘুম তার আর ভাঙ্গল না।পরের দিন অনেক বেলা পর্যন্ত যখন রুবীনা ঘর থেকে বের হল না তখন লাইলী এসে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখে কড়া নাড়া দিয়ে ডাকতে লাগল। কোনো সাড়া না পেয়ে লাইলীর মনে সন্দেহ হল। সে কাচের জানলা দিয়ে দেখার চেষ্টা করল। কিন্তু জানালাও ভিতর থেকে বন্ধ। পর্দা ঝুলছে। শেষে ফিরে গিয়ে শাশুড়ীকে ও স্বামীকে জানাল।আরিফও সেখানে ছিল। সবাই মিলে তাড়াতাড়ি করে এসে দরজা জানালা কিছুই খুলতে পারল না। অনেক ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া পেল না। শেষে আরিফ জানালার কাচ ভেঙ্গে পর্দা সরিয়ে দেখল, রুবীনা খাটের উপর শুয়ে আছে। সেলিম ও আরিফ খুব জোরে ডাকতে লাগল। কিন্তু রুবীনার কাছ থেকে কোনো সাড়া এল না। তখন লাইলীর সন্দেহ দৃঢ় হল। স্বামীকে বলল, তুমি শীগগীর একটা মিস্ত্রী নিয়ে এসে দরজা খোলার ব্যবস্থা কর, নচেৎ দরজা ভেঙ্গে ফেল।কথাটা আরিফ শুনতে পেয়ে ছুটে বাজারের মোড় থেকে দুজন কাঠের মিস্ত্রী ডেকে নিয়ে এলে তারা দরজা ভেঙ্গে দিল। ভিতরে ঢুকে রুবীনাকে মৃত দেখে সবাই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। কিছুক্ষণ পর লাইলী একটা চাদর দিয়ে রুবীনাকে ঢাকা দিয়ে দিল। সেলিম থানায় ফোন করল। লাইলী শাশুড়ীকে বৃথা প্রবোধ দিতে লাগল। সেলিম টেবিলের উপর ভাঁজ করা কাগজ দেখতে পেয়ে হাতে নিয়ে পড়ে সবাইকে শুনাল। আরিফ হাউ মাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মা ও ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠল, রুবীনা, এ কি করল? আমরা তো কিছুই বুঝতে পারিনি। আমাদের যে আর কোনো বোন রইল না মা। রুবীনা, তুই যে আমাদের বড় আদরের বোন ছিলি, আমাদেরকে ফাঁকি দিয়ে চলে যেতে পারলি? যত বড় অন্যায় করে থাকিস না কেন, আমরা তোকে ক্ষমা করে দিতাম।কিছুক্ষণ পরে দুজন সিপাই সঙ্গে করে দারোগা সাহেব এলেন। সেলিমের সঙ্গে তার আগে থেকে জানাশোনা। তার বড় ছেলে সেলিমদের মিলের অফিসে চাকরি করে। তিনি রুবীনার দুটি চিঠিই পড়লেন। তারপর তাদেরকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করে ডাইরীতে তাদের মুখজবানী লিখে লাশ দাফন করার হুকুম দিয়ে ফিরে গেলেন।রুবীনার মৃত্যুর পরে সারা বাড়িতে দুঃখের ছায়া নেমে এল। কারো মুখে হাসি নেই।রুবীনার মৃত্যুর খবর পেয়ে জাহিদ সাহেবদের বাড়ির সবাই এসেছিল।আসমা সোহানা বেগমকে জড়িয়ে ধরে অনেক কেঁদেছে। ফিরে যাওয়ার সময় সোহানা বেগমকে বলল, আমাকে তো মেয়ের মত মানুষ করেছেন; আমি আপনার পেটে না হয়েও যা স্নেহ ভালোবাসা, পেয়েছি তাতে করে নিজের গর্ভধারিণী মায়ের চেয়েও আপনাকে আমি বেশি জানি।সোহানা বেগম রুবীনার এই পরিণামের জন্য নিজেকে দায়ী মনে করে আহার নিদ্রা ত্যাগ করে কেঁদে কেঁদে দিন কাটাতে লাগলেন। সেলিম ও আরিফ ব্যবসা বাণিজ্য দেখাশোনা করছে বটে, কিন্তু কারও মনে শান্তি নেই।লাইলী একদিন বিকেলে চায়ের টেবিলে শাশুড়ীকে জোর করে নিয়ে এল। এতদিন তিনি নিজের ঘর থেকে বার হননি। সবাইকে চা দিয়ে লাইলী বলল, আজ আমি দু’একটা কথা না বলে থাকতে পারছি না।আরিফ বলল, বেশ তো ভাবি! কি বলবে বল না।লাইলী কয়েক সেকেণ্ড সবাইকে দেখল, তারপর বলল, আমরা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা বলে বিশ্বাস করি কিনা? এবং তিনিই যে একমাত্র বিশ্বনিয়ন্তা, এ কথাও বিশ্বাস করি কি না?সকলে লাইলীর দিকে চেয়ে রইল; কিন্তু কেউ কোনো উত্তর দিল না। লাইলী বলল, কি হল? তোমরা উত্তর দিচ্ছ না কেন? সেলিম বলল, মুসলমান মাত্রেই ঐ কথা সবাই বিশ্বাস করে। লাইলী বলল, আমরা এও বিশ্বাস করি, তার হুকুম ছাড়া কোনো কিছু হয়। সেইজন্য তার কোনো কাজে আমাদের অসন্তুষ্ট হওয়া উচিত না। দুঃখ কষ্টে, বিপদ-আপদে তিনি আমাদের সবর করতে বলেছেন। আমরা যদি তার কোনো কাজে অসন্তুষ্ট হই, তা হলে কি তাঁকে বিশ্বনিয়ন্তা বলে অস্বীকার করা হলকি? সুখ দুঃখ মানুষের জীবনে দিন রাত্রির মত জড়িত। যে লোক সুখ দুঃখ দুটোই লোগ না করেছে, তার জীবন পূর্ণ হয় না। আর এ রকম লোক দুনিয়াতে আছে কি না সন্দেহ। এই দুর্ঘটনায় আমরা খুব দুঃখ পেয়েছি। আল্লাহর কাছে আমরা তা সইবার ক্ষমতা চাইব। তারপর লাইলী শাশুড়ীকে জড়িয়ে ধরে বলল, মা, এক রুবীনাকে আল্লাহ নিয়েছেন তো কি হয়েছে? এ দুনিয়াতে রুবীনার মত কত শত মেয়ে আছে, তারাও যেন রুবীনার মত দুর্ঘটনায় না পড়ে, সেজন্য আমাদের সবাইকে সচেষ্ট থাকতে হবে। যদি আমরা তা করি, তা হলে নিশ্চয় আল্লাহ খুশি হবেন। তখন সোহানা বেগমের চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। লাইলী নিজের আঁচল দিয়ে মুছে দিয়ে বলল, আমাকে রুবীনা মনে করে দীলে তসল্লি দিন মা। দোয়া করুন, আমি যেন রুবীনার মতো হয়ে আপনার দুঃখ ভুলাতে পারি।সোহানা বেগম ভিজে গলায় বললেন, তুমি আমার রুবীনার থেকে অনেক বেশি মা। রুবীনাকে কেড়ে নিবে বলে আল্লাহ তোমাকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন। লাইলী বসে পড়ে শাশুড়ীর পা জড়িয়ে ধরে বলল, তা হলে এবার থেকে ঠিক মত খাওয়া দাওয়া করবেন বলুন? না খেয়ে খেয়ে আপনি শুকিয়ে আধখানা হয়ে গেছেন।সেলিম ও আরিফ উঠে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, মা, তোমার বউ যা বললে, সেইমত আমাদের সবার চলা উচিত। নচেৎ আল্লাহ বেজার হবেন। তারপর ধীরে ধীরে বাড়ির সবার মনে শান্তি ফিরে আসতে লাগল।কয়েকদিন পর মনিরুল রেহানা ও আসমাকে নিয়ে সেলিমদের বাড়িতে বেড়াতে এল। নাস্তার টেবিলে সবাই বসেছে। লাইলী নাস্তা আনার জন্য রান্নাঘরে গেছে। হঠাৎ মনিরুল উঠে গিয়ে সোহানা বেগমের পায়ে হাত দিয়ে বলল, ফুফুআম্মা, আপনি আমাকে মাফ করে দিন। আমি আপনাকে আর ভাবির আবাকে বেনামে চিঠি দিয়ে সেলিমের বিয়ে ভাঙ্গিয়েছিলাম। আমার এই অন্যায় কাজের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আপনার কাছে মাফ চাইছি।এমন সময় লাইলী চা-নাস্তা নিয়ে এসে মনিরুলের কথা শুনে থ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।সোহানা বেগম শুনে ওম হয়ে বসে রইলেন। তার নিজের ভাইপো হয়ে এমন জঘন্য কাজ করবে, তিনি কখনও ভাবতে পারেন নি।ফুফুআম্মাকে চুপ করে থাকতে দেখে মনিরুল আবার বলল, আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন, তবে আমি কারও কাছে মুখ দেখাতে পারব না। আর নিজের বিবেকের চাবুকে চিরকাল জর্জরিত হতে থাকব। তার কথাগুলো কান্নার মত শোনাল।লাইলী শাশুড়ীকে বলল, আপনি মনিরুল ভাইকে ক্ষমা করে দিন মা। আল্লাহপাক ক্ষমাকে ভালবাসেন। যখন কেউ নিজের অপরাধ স্বীকার করে অনুতপ্ত হৃদয়ে তার কাছে ক্ষমা চায়, তখন তিনি সঙ্গে সঙ্গে তাকে ক্ষমা করে দেন। যে ক্ষমাপ্রার্থীকে ক্ষমা করে, আল্লাহপাক তার অপরাধও ক্ষমা করে দেন এবং তাকে ভালবাসেন।সোহানা বেগম পূত্রবধূর কথা শুনে অশ্যপূর্ণ নয়নে বললেন, মনিরুল, তুমি আমার কাছে যতটুকু অপরাধ করেছ, তার চেয়ে শতগুণ বেশি মা লাইলীর কাছে করেছ। আগে তার কাছে মাফ চাও। আমি তোমাকে মাফ করে দিলাম।মনিরুলকে উঠে তার দিকে এগোতে দেখে লাইলী বলল, আমার কাছে মাফ চাইতে হবে না। আমি কোনোদিন কারুর দোষ দেখি না। কেউ যদি আমার কোনোক্ষতি করে, তখন আমি ভাবি সবকিছু আল্লাহপাকের ইশারা। তার হুকুম ছাড়া কারুর কিছু করার ক্ষমতা নেই। সেই কথা চিন্তা করে আমি কারও প্রতি দোষারোপও করি এবং কাউকে অপরাধীও মনে করি না। যদি কিছু করে থাক, দোয়া করছি, আল্লাহপাক যেন তোমাকে মাফ করেন।লাইলীর জ্ঞানগর্ভ কথা শুনে সকলে শুধু অবাক নয়, সেই থেকে তারা তাকে আল্লাহপাকের খাসবান্দী বলে মনে করল।সোহানা বেগম পূত্রবধূকে কাছে বসিয়ে গায়ে ও মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, আল্লাহ এমন রত্মকে আমার বৌ করে ধন্য করেছেন। আল্লাগো! তোমার দরবারে হাজার হাজার শুকরিয়া।সেলিম বলল, আমি কিন্তু মনিরুলকে কিছুতেই ক্ষমা করতাম না। আসমাকে বিয়ে করেছে বলে ক্ষমা পেয়ে গেল। আল্লাহ ওকে সুবুদ্ধি দিয়েছেন, মচৎ আমি এতক্ষণ ওকে আস্ত রাখতাম না। আল্লাহপাকের দরবারে দোওয়া করি, তিনি যেন আমাদের সবাইকে হেদায়েত দান করেন। তারপর লাইলীকে বলল, তুমি চা নাস্তা খাওয়াবে, না মায়ের সব আদরটুকু স্বার্থপরের মত নিজে একা ভোগ করবে? তারপর মাকে বলল, তুমি যেভাবে ওকে আদর করছ, মনে হচ্ছে দুদিন পরে আমদেরকে ভুলেই যাবে। আচ্ছা আরিফ! তুইও কিছু বলবি না?আরিফ হাসতে হাসতে বলল, ভাইয়া, আদর-যত্ব, ভক্তি-সম্মান কেউ কাউকে দেয় না। আদায় করার ক্ষমতা থাকা চাই। ঐগুলো পাওয়ার জন্য যা কিছু দরকার, সবগুলোই ভাবির মধ্যে আছে। সেইজন্য সে আমাদের সবাই-এর কাছ থেকে শ্ৰেনীমত আদর-যত্ন-ভক্তি সম্মান পাচ্ছে।সেলিম বলল, তুইও তোর ভাবির দলে? বেশ, তোরা তাকে ভক্তি-সম্মান করতে থাক, আমি হোটেলে গিয়ে চা খাব। সেই কখন থেকে চা খাবার ইচ্ছা হচ্ছে। তারপর সত্যি সত্যি যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াল।লাইলী তাড়াতাড়ি করে নাস্তা পরিবেশন করতে লাগল।সোহানা বেগম বললেন, আমি তো ভাগ্যচক্রে ওকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। তুইতো খুঁজে এনে দিলি। ওর জন্য সেদিন তুই আমাকে কি বলেছিলি মনে আছে? বাপ মরা মেয়েকে এখন একটু আদর করলে তোর হিংসা হয় কেন?সোহানা বেগমের কথা শুনে সবাই মিটি মিটি হাসতে লাগল।লাইলী চায়ের কাপটা সেলিমকে দেওয়ার সময় ফিস ফিস করে বলল, নিজের কথায় কেমন বকুনি খাওয়া হচ্ছে?সেলিম কৃত্রিম রাগতস্বরে বলল, মা তোমার ফরে, তা না হলে কে তোমার কথা শুনতো?
এক রাত্রে ঘুমাবার সময় লাইলীর দেরি দেখে সেলিম ছটফট করতে লাগল। তাকে জড়িয়ে ধরে না ঘুমালে তার ঘুম আসে না। সে মনে মনে একটু রেগে গেল।লাইলী শাশুড়ীর বিছানা ঠিক করে দিয়ে মাথার কাছে টেবিলে এক গ্লাস পানি ঢেকে রেখে তার হুকুম নিয়ে নিজের রুমে ঢুকল। দেখল, সেলিম চেয়ারে বসে বই পড়ছে।সেলিম লাইলীকে ঢুকতে দেখেও না দেখার ভান করে বই পড়তে লাগল।লাইলী বুঝতে পারল, তার অভিমান হয়েছে। কারণ খাওয়া দাওয়ার পর মায়ের কাছে সবাই গল্প করছিল। সেলিম উঠে আসার সময় লাইলীকে ইশারা করে চলে আসতে বলেছিল। কিন্তু মায়ের সাথে কথা বলতে বলতে একটু দেরি হয়ে গেছে। লাইলী চেয়ারের পেছন থেকে স্বামীকে জড়িয়ে ধরে মাথায় চিবুক রেখে বলল, অপরাধীনি ক্ষমা প্রার্থী। সারাদিন অফিসে কাজ করে তুমি ক্লান্ত, এবার ঘুমাবে চল।সেলিম তাকে সামনে এনে কোলে বসিয়ে বলল, স্বামীর জন্য যদি এত দরদ, তবে তাকে এত রাত জাগিয়ে রেখেছ কেন?অন্যায় করেছি, তার জন্য আবার ক্ষমা চাইছি।সেলিম বলল, মেয়েরা বেশ সুখে আছে। কোনো চিন্তা ভাবনা নেই, অন্যায় করলে মাফ চেয়ে খালাস। আজ কিন্তু মাফ করছি না। শাস্তি পেতেই হবে বলে তাকে দুহাতে তুলে নিয়ে খাটের দিকে এগোল।লাইলী বলল, তুমি যত ইচ্ছা শাস্তি দাও। তোমার শাস্তি আমাকে যে কি আনন্দ দেয়, তা যদি জানতে, তা হলে………বলে তার বুকে মুখ লুকাল।ওরে দুষ্ট মেয়ে, দাঁড়াও মজা দেখাচ্ছি বলে সেলিম তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আনন্দে মেতে উঠল।এইভাবে খুব সুখের মধ্যে ওদের দিন কাটছিল। কিন্তু আল্লাহপাক সুখ দুঃখকে আলো ও অন্ধকারের মত পাশাপাশি রেখেছেন। কিছুদিন পর হঠাৎ লাইলীর ভীষণ জ্বর হল। জ্বরের ঘোরে সে ভুল বকতে শুরু করল, ‘আমি রেহানার কাছে অপরাধী।’ রেহানা সারাদিন তার কাছে থেকে সেবা শুশ্রুষা করে রাত্রে বাড়ি চলে যায়। সোহানা বেগম বড় ডাক্তার এনে চিকিৎসা করাতে লাগলেন। সেলিম আজ আট দিন স্ত্রীর কাছ থেকে উঠেনি। রেহানা জোর করে তাকে গোসল করতে ও খেতে পাঠায়। সেলিম সারারাত স্ত্রীর কাছে জেগে বসে থাকে। সোহানা বেগম ছেলেকে অনেক করে বোঝান, মানুষ মাত্রেই অসুখ বিসুখ হয়। তুই অত ভেঙ্গে পড়ছিস কেন? আল্লাহপাকের কাছে দোওয়া চা। সেলিম পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের পর স্ত্রীর রোগ মুক্তির জন্য দোয়া করতে লাগল। পনের দিন পর লাইলীর জ্বর একটু কমল।।ডাক্তার বললেন, এবার আর ভয় নেই, রুগী এখন আউট অফ ডেঞ্জার। প্রতিদিন মনিরুল আসমাকে সঙ্গে করে লাইলীকে দেখতে আসে।প্রায় এক মাস রোগ ভোগের পর লাইলী অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছে। এখন বালিশে হেলান দিয়ে বসতে পারে।একদিন রেহানা যখন তাকে পথ্য খাওয়াচ্ছিল, তখন লাইলী তাকে বলল, তুমি মায়ের পেটের বোনের মত আমার সেবা করে আমাকে বাঁচিয়ে তুলেছ। তোমার ঋণ আমি কোনোদিন শোধ করতে পারব না।রেহানা বলল, তোমার মতো বোন পেলে আমি ধন্য হয়ে যেতাম। আচ্ছা ভাবি, তুমি জ্বরের ঘোরে কেন বলতে, আমার কাছে তুমি অপরাধী?লাইলী তাকে পাশে বসিয়ে বলল, জ্বরের মধ্যে কি বলেছি না বলেছি জানি না। এখন তোমাকে একটা কথা বলতে চাই, কিছু মনে করবে না তো?কি যে বল ভাবি, তোমার কথায় কিছু মনে করব এ কথা ভাবতে পারলে? তুমি কি বলবে বল, আমি কিছু মনে করব না।লাইলী রেহানার দুটো হাত ধরে বলল, তোমাকে আমি ছোট জা করে সারাজীবন কাছে পেতে চাই। তুমি রাজি থাকলে বল, আমি সব ব্যবস্থা করব।রেহানা মনে মনে খুব খুশি হল। কারণ সে লাইলীর সংস্পর্শে এসে ধর্মের অনেক জ্ঞান পেয়ে তার স্বভাব চরিত্রের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। ভেবে দেখেছে নারী স্বাধীনতার নামে দিন দিন নারী সমাজ উচ্ছল হয়ে অধঃপতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই কারণে আরিফের দিকে তার মন ঝুঁকে পড়েছে।তাকে চুপ করে থাকতে দেখে সাইলী বলল, কি হল? কথা বলছ না কেন?ভাবি, তোমার কথা শুনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা কথা মনে পড়ে গেল। “মানুষ যা চায় তা পায় না। আর যা পায় তা ভুল করে চায়।” আমি তো তোমার কাছে জেনেছি, আল্লাহপাক প্রত্যেক নারীকে তার স্বামীর বাঁ দিকের পাঁজরা থেকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি যার সঙ্গে আমার জোড়া করেছেন, তার সঙ্গে বিয়ে হবেই। এখন এর বেশি কিছু বলতে পারছি না।ঠিক এই সময় সেলিম ঘরে ঢুকে রেহানার শেষ কথা শুনতে পেয়ে বলল, তোমার ভাবি বুঝি প্রশ্ন করছে, যার উত্তর দিতে পারছ না? ওর সঙ্গে কেউ তর্কে পারে না। কি প্রশ্ন করছে বল, দেখি আমি উত্তর দিতে পারি কি না।রেহানা ভীষণ লজ্জা পেল। কিছু না বলতে পেরে তাড়াতাড়ি করে ঝুঁটো বাসন পত্র নিয়ে এস্তপদে পালিয়ে গেল।সেলিম অবাক হয়ে তার চলে যাওয়া দেখল। তারপর খাটে লাইলীর পাশে বসে বলল, ওকে তুমি কি কথা জিজ্ঞেস করেছ? আমি জানতে চাইতে লজ্জা পেয়ে পালিয়ে গেল।মৃদু হেসে লাইলী বলল, সে কথা তোমার এখন শুনে কাজ নেই, পরে এক সময় বলব।দেখ স্বামীর অবাধ্য হলে কি হয়, তাতো জান।লাইলী স্বামীর দুটো হাত ধরে বলল, তুমি রাগ করবে না তো?সেলিম তার হাতটায় চুমো খেয়ে বলল, এই চুমোর কসম কিছু মনে করব না।লাইলীও স্বামীর হাতে চুমো খেয়ে বলল, রেহানাকে আমার খুব পছন্দ। আর আরিফের সঙ্গেও খুব মানাবে। তার এতে মত আছে নাকি জিজ্ঞেস করছিলাম।সেলিম কয়েক সেকেণ্ড চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করল, রেহানা কি বলল? রেহানা যা বলেছে তার হুবহু বলে লাইলী বলল, আমার মনে হয় ও রাজি আছে।সেলিম বলল, আরিফ যদি রাজি থাকে, তা হলে বেশ ভালই হবে। এবার থেকে ঘটকালির কাজ শুরু করলে তা হলে?তাতো আপন জনের জন্য একটু আধটু সবাইকে করতে হয়।এরপর থেকে রেহানা প্রতিদিন আসে না। মাঝে মাঝে আসে। একদিন লাইলী তাকে জিজ্ঞস করল, তুমি এখানে আসা কমিয়ে দিয়েছ কেন? সেদিনের কথায় মনে কি ব্যাথা পেয়েছ? যদি তাই হয়, তা হলে আমার কথা উইথড় করে নিচ্ছি। আমাকে ক্ষমা করে দাও।রেহানা বলল, ভাবি তোমার কথায় আমি মনে ব্যাথা পাইনি। শুধু শুধু তুমি ক্ষমা চাইছ কেন? তবে খুব লজ্জা পেয়েছি, তাই ঘনঘন আসতে মন চাইলেও আসতে পারিনি।লাইলী বলল, অনার্সের ছাত্রী। এতটা লজ্জা পাওয়ার কথা নয়?রেহানা বলল, তোমার সংস্পর্শে আসার আগে অবশ্য ঐসব ছিল না। কিন্তু তোমার কাছে এসে তোমার দেওয়া শিক্ষা পেয়ে এখন অনেক কিছু আমার পরিবর্তন হয়েছে।লাইলী বলল, আলহামদুলিল্লাহ, (সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তায়ালার)। আল্লাহ সবাইকে হেদায়েত করুন।ইদানিং রেহানা যে খুব কম আসে সেটা আরিফও লক্ষ্য করেছে। আজ যখন সে অফিস থেকে ফিরে গাড়ি থেকে নামছিল তখন রেহানাকে তাদের ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে দেখে ডেকে বলল, একটু সময় হবে? তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা ছিল।রেহানা তার মুখের দিকে চেয়ে বলল, বেশ তো বল না কি কথা বলবে?আরিফ বলল, এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি বলা যায়? গাড়িতে উঠ, নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে বলব।রেহানা সামনের সীটে আরিফের পাশে বসল। আরিফ তাকে রমনা পার্কের একটা নিরিবিলি জায়গায় নিয়ে এল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আরিফ বলল, তুমি আমাকে কি মনে করবে জানি না তবু বলছি, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। বিদেশ থেকে ফিরে এসে তোমাকে দেখেই আমার খুব পছন্দ হয়েছে। অবশ্য তোমারও পছন্দ আছে। আমি তোমার মতামতের দাম দেব, এ কথা বলে রাখছি।রেহানা বেশ কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে চিন্তা করল। তারপর তার দিকে চেয়ে বলল, আমার কিছু কথা তোমার জানা দরকার। সেগুলো শোনার পর তুমি যা ভালো বুঝবে করবে, তাতে আমার কোনো আপত্তি থাকবে না।বেশ বল, তুমি কি বলতে চাও?প্রায় বছর তিনেক আগে ফুফুআম্মা আব্বাকে বলেছিল, আমাকে সেলিম ভাইয়ের জন্য পছন্দ করেছে। আৰ্বও রাজি ছিলেন। আমি আড়াল থেকে তাদের কথা শুনে খুব আনন্দ পাই। কারণ সেলিম ভাইয়ের মত চরিত্রবান সুপুরুষকে কার না ভালো লাগবে? সেই থেকে মনে মনে তাকে ভালবেসে ফেললাম, কিন্তু সেলিম ভাই বোধ হয় সে কথা জানত না। এরপর যখন সেলিম ভাই লাইলী ভাবির দিকে ঝুঁকে পড়ল তখন তার উপর আমার খুব রাগ ও হিংসা হয়। দাদাও ব্যাপারটা জানত। সেও যখন দেখল, লাইলী ভাবির জন্য সেলিম ভাইয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে হচ্ছে না তখন সে বেনামী চিঠি দিয়ে বিয়ে ভাঙ্গিয়ে দেয়। তারপরের ঘটনা সেদিন সে তোমাদের বাড়িতে বলে সকলের কাছ থেকে মাফ চেয়ে নিয়েছে। তবে আমি দাদার ঐসব কার্যকলাপ কিছুই জানতাম না তোমাদের বাড়িতেই প্রথম শুনলাম। যাই হোক, আমি অজ্ঞতা ও ঈর্ষার কারণে লাইলী ভাবিকে ভুল বুঝেছিলাম। অনুতপ্ত হয়ে তার কাছে আমিও মাফ চেয়ে নিয়েছি। তাকে মানবী বলে আমার মনে হয় না। যতবড় শত্রু এবং যত বড় দুশ্চরিত্র লোক তার সংস্পর্শে আসুক না কেন, সে মিত্র ও চরিত্রবান হতে বাধ্য। হবে। লাইলী ভাবি যেন পরশ পাথর, যেই তাকে ছুঁবে, সেই মানিক হয়ে যাবে। আল্লাহপাক তাকে যেমন অদ্বিতীয়া সুন্দরী করে সৃষ্টি করেছেন, তেমনি সর্বগুণে গুণান্বিতাও করেছেন।আরিফ বলল, সত্যি ভাবি অদ্বিতীয়া। তার উপর ধর্মের জ্ঞান পেয়ে এবং সেই মত চলে সে সকলের কাছে উচ্চ মর্যাদার আসন পেয়েছে। ইসলাম বড় উদার ধর্ম। সেখানে কোনো কুসংস্কার ও মানুষের মনগড়া কিছুর স্থান নেই। আমি মনপ্রাণ দিয়ে তোমাকে পেতে চাই।রেহানা ছলছল নয়নে আরিফের হাত ধরে বলল, তুমি আমাকে তোমার মত করে গড়ে নিও। আর দোষ ত্রুটি সংশোধন করার সুযোগ দিও।আরিফ সুবহান আল্লাহ বলে বলল, আল্লাহ তুমি সর্বত্র বিরাজমান। তুমি আমাদের মনের বাসনা পূরণ কর। তারপর বলল, চল তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিই।রেহানা বলল, তোমাদের বাড়িতেই চল। আমার গাড়ি তো ওখানে আছে। বাড়িতে ফিরে আরিফ রেহানাকে তার গাড়িতে তুলে বিদায় দিয়ে একেবারে ভাবির ঘরে ঢুকল।লাইলী জানালা দিয়ে তাদের দুজনের যাওয়া আসা দেখেছে এবং অনেক কিছু বুঝেও নিয়েছে।আরিফের ডাক শুনে বলল, কি ব্যাপার? ছোট সাহেবকে আজ খুব খুশি খুশি লাগছে। মনে হচ্ছে যেন দুনিয়া জয় করে এসেছ।আরে থাম থাম, তুমি যে দেখছি এ্যাসট্রোলজার হয়ে গেছ। তারপর বলল, সত্যি ভাবি আজ যা পেয়েছি, সারা দুনিয়া জয় করলেও তা পাওয়া যেত না।সে তো বুঝতেই পারছি। বলি ব্যাপারটা খুলেই বল না?আরিফ চারিদিকে তাকিয়ে নিয়ে গলা খাটো করে বলল, তোমাদেরকে আর মেয়ে দেখতে হবে না। এতদিনেও যখন তোমরা পারলে না তখন আমি নিজেই আজ সেই কাজ করে এসেছি।লাইলী অবাক হওয়ার ভান করে বলল, সে কি? এদিকে আমি ও তোমার ভাইয়া একটা মেয়ে পছন্দ করেছি। কথাবর্তাও এক রকম পাকাপাকি। তুমি আমাদের। মান ইজ্জত ডুবাবে বুঝি? তা হতে দিচ্ছি না।আরিফের আনন্দ উজ্জল মুখটা মুহুর্তে মলিন হয়ে গেল। বলল, তা হলে বড় সমস্যা হয়ে দাঁডল দেখছি! একদিকে আমার প্রেম, আর একদিকে তোমাদের ইজ্জত, ধুততেরী বিয়েই করব না।লাইলী অনেক কষ্টে হাসি চেপে রেখে বলল, তুমি চিন্তা করো না, আমি তোমার সব সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করব। মেয়েটার পরিচয় তো শুনি?মেয়েটার পরিচয় জেনে কি হবে? আর তুমি সমস্যার সমাধানই বা করবে কি করে? আমি যদি আমার পছন্দ করা মেয়েকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে না করি?আরে ভাই হতাশ হচ্ছ কেন? এমনভাবে মীমাংসা করব, সাপও মরবে না, আর লাঠিও ভাঙ্গবে না।যা খুশি তোমরা করগে যাও, আমি বিয়েই করব না।সে দেখা যাবে যখন সময় হবে, এখন হাত মুখ ধুয়ে নাস্তা খাবে এস। খাব না, ক্ষিদে নেই বলে আরিফ আবার বাইরে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াল।লাইলী বলল, আরে ভাই, শুনে যাও না। তোমার সঙ্গে একটু রসিকতা করছিলাম। তোমার প্রেমিকা রেহানার সঙ্গেই তোমার বিয়ের ব্যবস্থা আমরা করেছি, হয়েছে তো? বাব্বাহ, সাহেবের রাগ দেখ না? এখনই যদি এত, বিয়ের পর কি করবে কি জানি।আরিফ কথাগুলো শুনে ভীষণ লজ্জা পেল। সে যেন কিছু শুনতে পায়নি এমনি ভাব দেখিয়ে গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিয়ে বলল, ভাইয়ার মতো আমার কোনো প্রেমিকা নেই। তারপর ভাবিকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সাঁ করে বেরিয়ে গেল।লাইলী হাসি মুখে সেদিকে চেয়ে রইল।–: সমাপ্ত :–
একটি ছোটো চিঠি এল লাবণ্যর হাতে, শোভনলালের লেখা :শিলঙে কাল রাত্রে এসেছি। যদি দেখা করতে অনুমতি দাও তবে দেখতে যাব। না যদি দাও কালই ফিরব। তোমার কাছে শাস্তি পেয়েছি, কিন্তু কবে কী অপরাধ করেছি আজ পর্যন্ত স্পষ্ট করে বুঝতে পারি না। আজ এসেছি তোমার কাছে সেই কথাটি শোনবার জন্যে নইলে মনে শান্তি পাই নে। ভয় কোরো না। আমার আর কোনো প্রার্থনা নেই।লাবণ্যর চোখ জলে ভরে এল। মুছে ফেললে। চুপ করে বসে ফিরে তাকিয়ে রইল নিজের অতীতের দিকে। যে অঙ্কুরটা বড়ো হয়ে উঠতে পারত অথচ যেটাকে চেপে দিয়েছে, বাড়তে দেয় নি, তার সেই কচিবেলাকার করুণ ভীরুতা ওর মনে এল। এতদিনে সে ওর সমস্ত জীবনকে অধিকার করে তাকে সফল করতে পারত কিন্তু সেদিন ওর ছিল জ্ঞানের গর্ব, বিদ্যার একনিষ্ঠ সাধনা, উদ্ধত স্বাতন্ত্র৻বোধ। সেদিন আপন বাপের মুগ্ধতা দেখে ভালোবাসাকে দুর্বলতা বলে মনে মনে ধিক্কার দিয়েছে। ভালোবাসা আজ তার শোধ নিলে, অভিমান হল ধূলিসাৎ। সেদিন যা সহজে হতে পারত নিশ্বাসের মতো, সরল হাসির মতো, আজ তা কঠিন হয়ে উঠল। সেদিনকার জীবনের সেই অতিথিকে দু হাত বাড়িয়ে গ্রহণ করতে আজ বাধা পড়ে, তাকে ত্যাগ করতেও বুক ফেটে যায়। মনে পড়ল অপমানিত শোভনলালের সেই কুণ্ঠিত ব্যথিত মূর্তি। তার পরে কতদিন গেছে, যুবকের সেই প্রত্যাখ্যাত ভালোবাসা এতদিন কোন্ অমৃতে বেঁচে রইল। আপনারই আন্তরিক মাহাত্ম্যে।লাবণ্য চিঠিতে লিখলে :তুমি আমার সকলের বড়ো বন্ধু। এ বন্ধুত্বের পুরো দাম দিতে পারি এমন ধন আজ আমার হাতে নেই। তুমি কোনোদিন দাম চাও নি; আজও, তোমার যা দেবার জিনিস তাই দিতে এসেছ কিছুই দাবি না করে। চাই নে বলে ফিরিয়ে দিতে পারি এমন শক্তি নেই আমার, এমন অহংকারও নেই।চিঠিটা লিখে পাঠিয়ে দিয়েছে এমন সময় অমিত এসে বললে, “বন্যা, চলো আজ দুজনে একবার বেড়িয়ে আসি গে।”অমিত ভয়ে ভয়েই বলেছিল; ভেবেছিল, লাবণ্য আজ হয়তো যেতে রাজি হবে না।লাবণ্য সহজেই বললে, “চলো।”দুজনে বেরোল। অমিত কিছু দ্বিধার সঙ্গেই লাবণ্যর হাতটিকে হাতের মধ্যে নেবার চেষ্টা করলে। লাবণ্য একটুও বাধা না দিয়ে হাত ধরতে দিলে। অমিত হাতটি একটু জোরে চেপে ধরলে, তাতেই মনের কথা যেটুকু ব্যক্ত হয় তার বেশি কিছু মুখে এল না! চলতে চলতে সেদিনকার সেই জায়গাতে এল যেখানে বনের মধ্যে হঠাৎ একটুখানি ফাঁক। একটি তরুশূন্য পাহাড়ের শিখরের উপর সূর্য আপনার শেষ স্পর্শ ঠেকিয়ে নেমে গেল। অতি সুকুমার সবুজের আভা আস্তে আস্তে সুকোমল নীলে গেল মিলিয়ে। দুজনে থেমে সেই দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল।লাবণ্য আস্তে আস্তে বললে, “একদিন একজনকে যে আংটি পরিয়েছিলে, আমাকে দিয়ে আজ সে আংটি খোলালে কেন।”অমিত ব্যথিত হয়ে বললে, “তোমাকে সব কথা বোঝাব কেমন করে বন্যা। সেদিন যাকে আংটি পরিয়েছিলুম, আর যে আজ সেটা খুলে দিলে, তারা দুজনে কি একই মানুষ।”লাবণ্য বললে, “তাদের মধ্যে একজন সৃষ্টিকর্তার আদরে তৈরি, আর একজন তোমার অনাদরে গড়া।”অমিত বললে, “কথাটা সম্পূর্ণ ঠিক নয়। যে আঘাতে আজকের কেটি তৈরি তার দায়িত্ব কেবল আমার একলার নয়।”“কিন্তু মিতা, নিজেকে যে একদিন সম্পূর্ণ তোমার হাতে উৎসর্গ করেছিল তাকে তুমি আপনার করে রাখলে না কেন। যে কারণেই হোক, আগে তোমার মুঠো আলগা হয়েছে, তার পরে দশের মুঠোর চাপ পড়েছে ওর উপরে, ওর মূর্তি গেছে বদলে। তোমার মন একদিন হারিয়েছে বলেই দশের মনের মতো করে নিজেকে সাজাতে বসল। আজ তো দেখি, ও বিলিতি দোকানের পুতুলের মতো; সেটা সম্ভব হত না, যদি ওর হৃদয় বেঁচে থাকত। থাক্ গে ও সব কথা। তোমার কাছে আমার একটা প্রার্থনা আছে। রাখতে হবে।”“বলো, নিশ্চয় রাখব।”“অন্তত হপ্তাখানেকের জন্যে তোমার দলকে নিয়ে তুমি চেরাপুঞ্জিতে বেরিয়ে এসো। ওকে আনন্দ দিতে নাও যদি পার, ওকে আমোদ দিতে পারবে।”অমিত একটুখানি চুপ করে থেকে বললে, “আচ্ছা।”তার পরে লাবণ্য অমিতর বুকে মাথা রেখে বললে, “একটা কথা তোমাকে বলি মিতা, আর কোনোদিন বলব না। তোমার সঙ্গে আমার যে অন্তরের সম্বন্ধ তা নিয়ে তোমার লেশমাত্র দায় নেই। আমি রাগ করে বলছি নে, আমার সমস্ত ভালোবাসা দিয়েই বলছি, আমাকে তুমি আংটি দিয়ো না, কোনো চিহ্ন রাখবার কিছু দরকার নেই। আমার প্রেম থাক্ নিরঞ্জন; বাইরের রেখা, বাইরের ছায়া তাতে পড়বে না।”এই বলে নিজের আঙুলের থেকে আংটি খুলে অমিতর আঙুলে আস্তে আস্তে পরিয়ে দিলে। অমিত তাতে কোনো বাধা দিলে না।সায়াহ্নের এই পৃথিবী যেমন অস্তরশ্মি উদ্ভাসিত আকাশের দিকে নিঃশব্দে আপন মুখ তুলে ধরেছে, তেমনি নীরবে, তেমনি শান্ত দীপ্তিতে লাবণ্য আপন মুখ তুলে ধরলে অমিতর নত মুখের দিকে।সাত দিন যেতেই অমিত ফিরে যোগমায়ার সেই বাসায় গেল। ঘর বন্ধ, সবাই চলে গেছে। কোথায় গেছে তার কোনো ঠিকানা রেখে যায় নি।সেই য়ুক্যালিপ্টাস গাছের তলায় অমিত এসে দাঁড়াল, খানিকক্ষণ ধরে শূন্যমনে সেইখানে ঘুরে বেড়ালে। পরিচিত মালী এসে সেলাম করে জিজ্ঞাসা করলে, “ঘর খুলে দেব কি। ভিতরে বসবেন?” অমিত একটু দ্বিধা করে বললে, “হাঁ।”ভিতরে গিয়ে লাবণ্যর বসবার ঘরে গেল। চৌকি টেবিল শেল্ফ্ আছে, সেই বইগুলি নেই। মেজের উপর দুই-একটা ছেঁড়া শূন্য লেফাফা, তার উপরে অজানা হাতের অক্ষরে লাবণ্যর নাম ও ঠিকানা লেখা; দু-চারটে ব্যবহার করা পরিত্যক্ত নিব এবং ক্ষয়প্রাপ্ত একটি অতি ছোটো পেন্সিল টেবিলের উপরে। পেন্সিলটি পকেটে নিলে। এর পাশেই শোবার ঘর। লোহার খাটে কেবল একটা গদি, আর আয়নার টেবিলে একটা শূন্য তেলের শিশি। দুই হাতে মাথা রেখে অমিত সেই গদির উপর শুয়ে পড়ল, লোহার খাটটা শব্দ করে উঠল। সেই ঘরটার মধ্যে বোবা একটা শূন্যতা। তাকে প্রশ্ন করলে কোনো কথাই বলতে পারে না। সে একটা মূর্ছা, যে মূর্ছা কোনোদিনই আর ভাঙবে না।তার পরে শরীরমনের উপর একটা নিরুদ্যমের বোঝা বহন করে অমিত গেল নিজের কুটিরে। যা যেমন রেখে গিয়েছিল তেমনিই সব আছে। এমন-কি, যোগমায়া তাঁর কেদারাটিও ফিরিয়ে নিয়ে যান নি। বুঝলে, তিনি স্নেহ করেই এই চৌকিটি তাকে দিয়ে গেছেন, মনে হল যেন শুনতে পেলে শান্ত মধুর স্বরে তাঁর সেই আহ্বান–বাছা! সেই চৌকির সামনে মাথা লুটিয়ে অমিত প্রণাম করলে।সমস্ত শিলঙ পাহাড়ের শ্রী আজ চলে গেছে। অমিত কোথাও আর সান্ত্বনা পেল না।
কলকাতার কলেজে পড়ে যতিশংকর। থাকে কলুটোলা প্রেসিডেন্সি কলেজের মেসে। অমিত তাকে প্রায় বাড়িতে নিয়ে আসে, খাওয়ায়, তার সঙ্গে নানা বই পড়ে, নানা অদ্ভুত কথায় তার মনটাকে চমকিয়ে দেয়, মোটরে করে তাকে বেড়িয়ে নিয়ে আসে।তার পর কিছুকাল যতিশংকর অমিতর কোনো নিশ্চিত খবর পায় না। কখনো শোনে সে নৈনিতালে, কখনো উটকামণ্ডে। একদিন শুনলে, অমিতর এক বন্ধু ঠাট্টা করে বলছে, সে আজকাল কেটি মিত্তিরের বাইরেকার রঙটা ঘোচাতে উঠে-পড়ে লেগেছে। কাজ পেয়েছে মনের মতো, বর্ণান্তর করা। এতদিন অমিত মূর্তি গড়বার শখ মেটাত কথা দিয়ে, আজ পেয়েছে সজীব মানুষ। সে মানুষটিও একে একে আপন উপরকার রঙিন পাপড়িগুলো খসাতে রাজি, চরমে ফল ধরবে আশা করে। অমিতর বোন লিসি নাকি বলছে যে, কেটিকে একেবারে চেনাই যায় না, অর্থাৎ তাকে নাকি বড্ডো বেশি স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। বন্ধুদের সে বলে দিয়েছে তাকে কেতকী বলে ডাকতে; এটা তার পক্ষে নির্লজ্জতা, যে মেয়ে একদা ফিন্ফিনে শান্তিপুরে শাড়ি পরত সেই লজ্জাবতীর পক্ষে জামা শেমিজ পরারই মতো। অমিত তাকে নাকি নিভৃতে ডাকে “কেয়া” বলে। এ কথাও লোকে কানাকানি করছে যে, নৈনিতালের সরোবরে নৌকো ভাসিয়ে কেটি তার হাল ধরেছে আর অমিত তাকে পড়ে শোনাচ্ছে রবি ঠাকুরের “নিরুদ্দেশ যাত্রা।” কিন্তু লোকে কী না বলে। যতিশংকর বুঝে নিলে, অমিতর মনটা পাল তুলে চলে গেছে ছুটিতত্ত্বের মাঝদরিয়ায়।অবশেষে অমিত ফিরে এল। শহরে রাষ্ট্র কেতকীর সঙ্গে তার বিয়ে। অথচ অমিতর নিজ মুখে একদিনও যতী এ প্রসঙ্গ শোনে নি। অমিতর ব্যবহারেরও অনেকখানি বদল ঘটেছে। পূর্বের মতোই যতীকে অমিত ইংরেজি বই কিনে উপহার দেয়, কিন্তু তাকে নিয়ে সন্ধেবেলায় সে-সব বইয়ের আলোচনা করে না। যতী বুঝতে পারে, আলোচনার ধারাটা এখন বইছে এক নতুন খাদে। আজকাল মোটরে বেড়াতে সে যতীকে ডাক পাড়ে না। যতীর বয়সে এ কথা বোঝা কঠিন নয় যে, অমিতর “নিরুদ্দেশ যাত্রা”র পার্টিতে তৃতীয় ব্যক্তির জায়গা হওয়া অসম্ভব।যতী আর থাকতে পারলে না। অমিতকে নিজেই গায়ে পড়ে জিজ্ঞাসা করলে, “অমিতদা, শুনলুম মিস কেতকী মিত্রের সঙ্গে তোমার বিয়ে?”অমিত একটুখানি চুপ করে থেকে বললে, “লাবণ্য কি এ খবর জেনেছে।”“না, আমি তাকে লিখি নি। তোমার মুখে পাকা খবর পাই নি বলে চুপ করে আছি।”“খবরটা সত্যি, কিন্তু লাবণ্য হয়তো-বা ভুল বুঝবে।”যতী হেসে বললে, “এর মধ্যে ভুল বোঝার জায়গা কোথায়। বিয়ে কর যদি তো বিয়েই করবে, সোজা কথা।”“দেখো যতী, মানুষের কোনো কথাটাই সোজা নয়। আমরা ডিক্শনারিতে যে কথার এক মানে বেঁধে দিই, মানবজীবনের মধ্যে মানেটা সাতখানা হয়ে যায়, সমুদ্রের কাছে এসে গঙ্গার মতো।”যতী বললে, “অর্থাৎ তুমি বলছ বিবাহ মানে বিবাহ নয়।”“আমি বলছি, বিবাহের হাজারখানা মানে–মানুষের সঙ্গে মিশে তার মানে হয়; মানুষকে বাদ দিয়ে তার মানে বের করতে গেলেই ধাঁধা লাগে।”“তোমার বিশেষ মানেটাই বলো-না।”“সংজ্ঞা দিয়ে বলা যায় না, জীবন দিয়ে বলতে হয়। যদি বলি ওর মূল মানেটা ভালোবাসা তা হলেও আর-একটা কথায় গিয়ে পড়ব। ভালোবাসা কথাটা বিবাহ কথার চেয়ে আরো বেশি জ্যান্ত।”“তা হলে অমিতদা, কথা বন্ধ করতে হয় যে। কথা কাঁধে নিয়ে মানের পিছন পিছন ছুটব, আর মানেটা বাঁয়ে তাড়া করলে ডাইনে আর ডাইনে তাড়া করলে বাঁয়ে মারবে দৌড়, এমন হলে তো কাজ চলে না।”“ভায়া, মন্দ বল নি। আমার সঙ্গে থেকে তোমার মুখ ফুটেছে। সংসারে কোনোমতে কাজ চালাতেই হবে, তাই কথার নেহাত দরকার। যে-সব সত্যকে কথার মধ্যে কুলোয় না ব্যবহারের হাটে তাদেরই ছাঁটি, কথাটাকেই জাহির করি। উপায় কী। তাতে বোঝাপড়াটা ঠিক না হোক, চোখ বুজে কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়।”“তবে কি আজকের কথাটাকে একেবারেই খতম করতে হবে।”“এই আলোচনাটা যদি নিতান্তই জ্ঞানের গরজে হয়, প্রাণের গরজে না হয়, তা হলে খতম করতে দোষ নেই।”“ধরে নাও-না প্রাণের গরজেই।”“শাবাশ, তবে শোনো।”এইখানে একটু পাদটীকা লাগালে দোষ নেই। অমিতর ছোটো বোন লিসির স্বহস্তে ঢালা চা যতী আজকাল মাঝে মাঝে প্রায়ই পান করে আসছে। অনুমান করা যেতে পারে যে, সেই কারণেই ওর মনে কিছুমাত্র ক্ষোভ নেই যে, অমিত ওর সঙ্গে অপরাহ্নে সাহিত্যালোচনা এবং সায়াহ্নে মোটরে করে বেড়ানো বন্ধ করেছে। অমিতকে ও সর্বান্তঃকরণে ক্ষমা করেছে।অমিত বলে, “অক্সিজেন এক ভাবে বয় হাওয়ায় অদৃশ্য থেকে, সে না হলে প্রাণ বাঁচে না। আবার অক্সিজেন আর-এক ভাবে কয়লার সঙ্গে যোগে জ্বলতে থাকে, সেই আগুন জীবনের নানা কাজে দরকার–দুটোর কোনোটাকেই বাদ দেওয়া চলে না। এখন বুঝতে পেরেছ?”“সম্পূর্ণ না, তবে কিনা বোঝবার ইচ্ছে আছে।”“যে ভালোবাসা ব্যাপ্তভাবে আকাশে মুক্ত থাকে, অন্তরের মধ্যে সে দেয় সঙ্গ; যে ভালোবাসা বিশেষভাবে প্রতিদিনের সব-কিছুতে যুক্ত হয়ে থাকে, সংসারে সে দেয় আসঙ্গ। দুটোই আমি চাই।”“তোমার কথা ঠিক বুঝছি কি না সেইটেই বুঝতে পারি নে। আর-একটু স্পষ্ট করে বলো অমিতদা।”অমিত বললে, “একদিন আমার সমস্ত ডানা মেলে পেয়েছিলুম আমার ওড়ার আকাশ; আজ আমি পেয়েছি আমার ছোট্ট বাসা, ডানা গুটিয়ে বসেছি। কিন্তু আমার আকাশও রইল।”“কিন্তু বিবাহে তোমার ঐ সঙ্গ-আসঙ্গ কি একত্রেই মিলতে পারে না।”“জীবনে অনেক সুযোগ ঘটতে পারে কিন্তু ঘটে না। যে মানুষ অর্ধেক রাজত্ব আর রাজকন্যা একসঙ্গেই মিলিয়ে পায় তার ভাগ্য ভালো; যে তা না পায়, দৈবক্রমে তার যদি ডান দিক থেকে মেলে রাজত্ব আর বাঁ দিক থেকে মেলে রাজকন্যা, সেও বড়ো কম সৌভাগ্য নয়।”“কিন্তু–”“কিন্তু তুমি যাকে মনে কর রোম্যান্স্ সেইটেতে কমতি পড়ে! একটুও না। গল্পের বই থেকেই রোম্যান্সের বাঁধা বরাদ্দ ছাঁচে ঢালাই করে জোগাতে হবে নাকি। কিছুতেই না। আমার রোম্যান্স্ আমিই সৃষ্টি করব। আমার স্বর্গেও রয়ে গেল রোম্যান্স্, আমার মর্তেও ঘটাব রোম্যান্স্। যারা ওর একটাকে বাঁচাতে গিয়ে আর-একটাকে দেউলে করে দেয় তাদেরই তুমি বল রোম্যান্টিক! তারা হয় মাছের মতো জলে সাঁতার দেয়, নয় বেড়ালের মতো ডাঙায় বেড়ায়, নয় বাদুড়ের মতো আকাশে ফেরে। আমি রোম্যান্সের পরমহংস। ভালোবাসার সত্যকে আমি একই শক্তিতে জলে স্থলে উপলব্ধি করব, আবার আকাশেও। নদীর চরে রইল আমার পাকা দখল; আবার মানসের দিকে যখন যাত্রা করব, সেটা হবে আকাশের ফাঁকা রাস্তায়। জয় হোক আমার লাবণ্যর, জয় হোক আমার কেতকীর, আর সব দিক থেকেই ধন্য হোক অমিত রায়।”যতী স্তব্ধ হয়ে বসে রইল, বোধ করি কথাটা তার ঠিক লাগল না। অমিত তার মুখ দেখে ঈষৎ হেসে বললে, “দেখো ভাই, সব কথা সকলের নয়। আমি যা বলছি, হয়তো সেটা আমারই কথা। সেটাকে তোমার কথা বলে বুঝতে গেলেই ভুল বুঝবে। আমাকে গাল দিয়ে বসবে। একের কথার উপর আরের মানে চাপিয়েই পৃথিবীতে মারামারি খুনোখুনি হয়। এবার আমার নিজের কথাটা স্পষ্ট করেই না-হয় তোমাকে বলি। রূপক দিয়েই বলতে হবে, নইলে এ-সব কথার রূপ চলে যায়–কথাগুলো লজ্জিত হয়ে ওঠে। কেতকীর সঙ্গে আমার সম্বন্ধ ভালোবাসারই, কিন্তু সে যেন ঘড়ায়-তোলা জল–প্রতিদিন তুলব, প্রতিদিন ব্যবহার করব। আর লাবণ্যর সঙ্গে আমার যে ভালোবাসা সে রইল দিঘি, সে ঘরে আনবার নয়, আমার মন তাতে সাঁতার দেবে।”যতী একটু কুণ্ঠিত হয়ে বললে, “কিন্তু অমিতদা, দুটোর মধ্যে একটাকেই কি বেছে নিতে হয় না।”“যার হয় তারই হয়, আমার হয় না।”“কিন্তু শ্রীমতী কেতকী যদি–”“তিনি সব জানেন। সম্পূর্ণ বোঝেন কি না বলতে পারি নে। কিন্তু সমস্ত জীবন দিয়ে এইটেই তাঁকে বোঝাব যে, তাঁকে কোথাও ফাঁকি দিচ্ছি নে। এও তাঁকে বুঝতে হবে যে, লাবণ্যর কাছে তিনি ঋণী।”“তা হোক, শ্রীমতী লাবণ্যকে তো তোমার বিয়ের খবর জানাতে হবে।”“নিশ্চয় জানাব। কিন্তু তার আগে একটি চিঠি দিতে চাই, সেটি তুমি পৌছিয়ে দেবে?”“দেব।”অমিতর এই চিঠি :সেদিন সন্ধেবেলায় রাস্তার শেষে এসে যখন দাঁড়ালুম, কবিতা দিয়ে যাত্রা শেষ করেছি। আজও এসে থামলুম একটা রাস্তার শেষে। এই শেষমুহূর্তটির উপর একটি কবিতা রেখে যেতে চাই। আর কোনো কথার ভার সইবে না। হতভাগা নিবারণ চক্রবর্তীটা যেদিন ধরা পড়েছে সেইদিন মরেছে–অতি শৌখিন জলচর মাছের মতো। তাই উপায় না দেখে তোমারই কবির উপর ভার দিলুম আমার শেষ কথাটা তোমাকে জানাবার জন্যে। তব অন্তর্ধানপটে হেরি তব রূপ চিরন্তন। অন্তরে অলক্ষ্যলোকে তোমার অন্তিম আগমন। লভিয়াছি চিরস্পর্শমণি; আমার শূন্যতা তুমি পূর্ণ করি গিয়েছ আপনি। জীবন আঁধার হল, সেই ক্ষণে পাইনু সন্ধান সন্ধ্যার দেউলদীপ চিত্তের মন্দিরে তব দান। বিচ্ছেদের হোমবহ্নি হতে পূজামূর্তি ধরি প্রেম দেখা দিল দুঃখের আলোতে। মিতা।তার পরেও আরো কিছুকাল গেল। সেদিন কেতকী গেছে তার বোনের মেয়ের অন্নপ্রাশনে। অমিত গেল না। আরামকেদারায় বসে সামনের চৌকিতে পা-দুটো তুলে দিয়ে উইলিয়ম জেম্সের পত্রাবলী পড়ছে। এমন সময় যতিশংকর লাবণ্যর লেখা এক চিঠি তার হাতে দিলে। চিঠির এক পাতে শোভনলালের সঙ্গে লাবণ্যর বিবাহের খবর। বিবাহ হবে ছ মাস পরে, জ্যৈষ্ঠমাসে, রামগড় পর্বতের শিখরে। অপর পাতে : কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও। তারি রথ নিত্যই উধাও জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন, চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন। ওগো বন্ধু, সেই ধাবমান কাল জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেরি তার জাল-- তুলে নিল দ্রুতরথে দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে তোমা হতে বহু দূরে। মনে হয়, অজস্র মৃত্যুরে পার হয়ে আসিলাম আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়-- রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায় আমার পুরানো নাম। ফিরিবার পথ নাহি; দূর হতে যদি দেখ চাহি পারিবে না চিনিতে আমায়। হে বন্ধু, বিদায়। কোনোদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে বসন্তবাতাসে অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস, ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ, সেই ক্ষণে খুঁজে দেখো--কিছু মোর পিছে রহিল সে তোমার প্রাণের প্রান্তে; বিস্মৃতিপ্রদোষে হয়তো দিবে সে জ্যোতি, হয়তো ধরিবে কভু নাম-হারা স্বপ্নের মুরতি। তবু সে তো স্বপ্ন নয়, সব-চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়, সে আমার প্রেম। তারে আমি রাখিয়া এলেম অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে। পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে কালের যাত্রায়। হে বন্ধু, বিদায়। তোমার হয় নি কোনো ক্ষতি মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃতমুরতি যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি হোক তব সন্ধ্যাবেলা, পূজার সে খেলা ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লান স্পর্শ লেগে; তৃষার্ত আবেগ-বেগে ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবেদ্যের থালে। তোমার মানস-ভোজে সযত্নে সাজালে যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায়, তার সাথে দিব না মিশায়ে যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে। আজো তুমি নিজে হয়তো-বা করিবে রচন মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন। ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়। হে বন্ধু, বিদায়। মোর লাগি করিয়ো না শোক, আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক। মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই-- শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই। উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে সেই ধন্য করিবে আমাকে। শুক্লপক্ষ হতে আনি রজনীগন্ধার বৃন্তখানি যে পারে সাজাতে অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ রাতে, যে আমারে দেখিবারে পায় অসীম ক্ষমায় ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি, এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি। তোমারে যা দিয়েছিনু তার পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার। হেথা মোর তিলে তিলে দান, করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডূষ ভরিয়া করে পান হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম। ওগো তুমি নিরুপম, হে ঐশ্বর্যবান, তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান-- গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়। হে বন্ধু, বিদায়। বন্যা
সন্ধ্যার পরে লবটুলিয়ার নূতন বস্তিগুলি দেখিতে বেশ লাগে। কুয়াশা হইয়াছে বলিয়া জ্যোৎস্না একটু অস্পষ্ট, বিস্তীর্ণ প্রান্তরব্যাপী কৃষিক্ষেত্র, দূরে দূরে দু-পাঁচটা আলো জ্বলিতেছে বিভিন্ন বস্তিতে। কত লোক, কত পরিবার অন্নের সংস্থান করিতে আসিয়াছে আমাদের মহালে-বন কাটিয়া গ্রাম বসাইয়াছে, চাষ আরম্ভ করিয়াছে। আমি সব বস্তির নামও জানি না, সকলকে চিনিও না। কুয়াশাবৃত জ্যোৎস্নালোকে এখানে ওখানে দূরে নিকটে ছড়ানো বস্তিগুলি কেমন রহস্যময় দেখাইতেছে। যে-সব লোক এইসব বস্তিতে বাস করে, তাহাদের জীবনও আমার কাছে এই কুয়াশাচ্ছন্ন জ্যোৎস্নাময়ী রাত্রির মতো রহস্যাবৃত। ইহাদের কাহারো কাহারো সঙ্গে আলাপ করিয়া দেখিয়াছি- জীবন সম্বন্ধে ইহাদের দৃষ্টিভঙ্গি, ইহাদের জীবনযাত্রাপ্রণালী আমার বড় অদ্ভুত লাগে।প্রথম ধরা যাক ইহাদের খাদ্যের কথা। আমাদের মহালের জমিতে বছরে তিনটি খাদ্যশস্য জন্মায়- ভাদ্র মাসে মকাই, পৌষ মাসে কলাই এবং বৈশাখ মাসে গম। মকাই খুব বেশি হয় না, কারণ ইহার উপযুক্ত জমি বেশি নাই। কলাই ও গম যথেষ্ট উৎপন্ন হয়, কলাই বেশি, গম তাহার অর্ধেক। সুতরাং লোকের প্রধান খাদ্য কলাইয়ের ছাতু।ধান একেবারেই হয় না-ধানের উপযুক্ত নাবাল-জমি নাই। এ অঞ্চলের কোথাও- এমন কি কড়ারী জমিতে কিংবা গবর্নমেণ্ট খাসমহালেও ধান হয় না। ভাত জিনিসটা সুতরাং এখানকার লোকে কালেভদ্রে খাইতে পায়-ভাত খাওয়াটা শখের বা বিলাসিতার ব্যাপার বলিয়া গণ্য। দু-চার জন খাদ্যবিলাসী লোক গম বা কলাই বিক্রয় করিয়া ধান কিনিয়া আনে বটে, কিন্তু তাহাদের সংখ্যা আঙ্গুলে গোনা যায়।তারপর ধরা যাক ইহাদের বাসগৃহের কথা। এই যে আমাদের মহালের দশ হাজার বিঘা জমিতে অগণ্য গ্রাম বসিয়াছে- সব গৃহস্থের বাড়িই জঙ্গলের কাশ ছাওয়া, কাশডাঁটার বেড়া, কেহ কেহ তাহার উপর মাটি লেপিয়াছে, কেহ কেহ তাহা করে নাই। এদেশে বাঁশগাছ আদৌ নাই, সুতরাং বনের গাছের, বিশেষ করিয়া কেঁদ ও পিয়াল ডালের বাতা, খুঁটি ও আড়া দিয়াছে ঘরে।ধর্মের কথা বলিয়া কোনো লাভ নাই। ইহারা যদিও হিন্দু, কিন্তু তেত্রিশ কোটি দেবতার মধ্যে ইহারা হনুমানজীকে কি করিয়া বাছিয়া বাহির করিয়া লইয়াছে জানি না-প্রত্যেক বস্তিতে একটা উঁচু হনুমানজীর ধ্বজা থাকিবেই-এই ধ্বজার রীতিমতো পূজা হয়, ধ্বজার গায়ে সিঁদুর লেপা হয়। রাম-সীতার কথা ক্বচিৎ শোনা যায়, তাঁহাদের সেবকের গৌরব তাঁহাদের দেবত্বকে একটু বেশি আড়ালে ফেলিয়াছে। বিষ্ণু, শিব, দুর্গা, কালী প্রভৃতি দেবদেবীর পূজার প্রচার তত নাই-আদৌ আছে কি না সন্দেহ, অন্তত আমাদের মহালে তো আমি দেখি নাই।ভুলিয়া গিয়াছি, একজন শিবভক্ত দেখিয়াছি বটে। তার নাম দ্রোণ মাহাতো, জাতিতে গাঙ্গোতা। কাছারিতে কোথা হইতে কে একটা শিলাখণ্ড আনিয়া আজ নাকি দশ-বারো বছর কাছারির হনুমানজীর ধ্বজার নিচে রাখিয়া দিয়াছে-সিপাহীরা মাঝে মাঝে পাথরখানাতে সিঁদুর মাখায়, একঘটি জলও কেউ কেউ দেয়। কিন্তু পাথরখানা বেশির ভাগ অনাদৃত অবস্থাতেই পড়িয়া থাকে।কাছারির কিছুদূরে একটা নূতন বস্তি আজ মাস-দুই গড়িয়া উঠিয়াছে-দ্রোণ মাহাতো সেখানে আসিয়া ঘর বাঁধিয়াছে। দ্রোণের বয়স সত্তরের বেশি ছাড়া কম নয়- প্রাচীন লোক বলিয়াই তাহার নাম দ্রোণ, আধুনিক কালের ছেলেছোকরা হইলে নাকি নাম হইত ডোমন, লোধাই, মহারাজ ইত্যাদি। এসব বাবুগিরি নাম সেকালে বাপ-মায়ে রাখিতে লজ্জাবোধ করিত।যাহা হউক, বৃদ্ধ দ্রোণ একবার কাছারি আসিয়া হনুমান-ধ্বজার নিচে পাথরখানা লক্ষ্য করিল। তারপর হইতে বৃদ্ধ কল্বলিয়া নদীতে প্রাতঃস্নান করিয়া একঘটি জল প্রত্যহ আনিয়া নিয়মিতভাবে পাথরের উপরে ঢালিত ও সাতবার পরম ভক্তিভরে প্রদক্ষিণ করিয়া সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করিয়া তবে বাড়ি ফিরিত।দ্রোণকে বলিয়াছিলাম-কল্বলিয়া তো এক ক্রোশ দূর, রোজ যাও সেখানে, তার চেয়ে ছোট কুণ্ডীর জল আনলেই পার-দ্রোণ বলিল-মহাদেওজী স্রোতের জলে তুষ্ট থাকেন, বাবুজী। আমার জন্ম সার্থক যে ওঁকে রোজ জল দিয়ে স্নান করাতে পাই।ভক্তও ভগবানকে গড়ে। দ্রোণ মাহাতোর শিবপূজার কাহিনী লোকমুখে বিভিন্ন বস্তিতে ছড়াইয়া পড়িতেই মাঝে মাঝে দেখি দু-পাঁচজন শিবের পূজারী নরনারী যাতায়াত শুরু করিল। এ অঞ্চলে এক ধরনের সুগন্ধ ঘাস জঙ্গলে উৎপন্ন হয়, ঘাসের পাতা বা ডাঁটা হাতে লইয়া আঘ্রাণ লইলে চমৎকার সুবাস পাওয়া যায়। ঘাস যত শুকায়, গন্ধ তত তীব্র হয়। কে একজন সেই ঘাস আনিয়া শিবঠাকুরের চারিধারে রোপণ করিল। একদিন মটুকনাথ পণ্ডিত আসিয়া বলিল- বাবুজী, – একজন গাঙ্গোতা কাছারির শিবের মাথায় জল ঢালে, এটা কি ভালো হচ্ছে?বলিলাম- পণ্ডিতজী, সেই গাঙ্গোতাই ওই ঠাকুরটিকে লোকসমাজে প্রচার করেছে যতদূর দেখতে পাচ্ছি! কই তুমিও তো ছিলে, একঘটি জল তো কোনোদিন দিতে দেখি নি তোমায়।রাগের মাথায় খেই হারাইয়া মটুকনাথ বলিয়া বসিল- ও শিবই নয় বাবুজী। ঠাকুর প্রতিষ্ঠা না করলে পুজো পাওয়ার যোগ্য হয় না। ও তো একখানা পাথরের নুড়ি।-তবে আর বলছ কেন? পাথরের নুড়িতে জল দিলে তোমার আপত্তি কি?সেই হইতেই দ্রোণ মাহাতো কাছারির শিবলিঙ্গের চার্টার্ড পূজারী হইয়া গেল।কার্তিক মাসে ছট্-পরব এদেশের বড় উৎসব। বিভিন্ন টোলা হইতে মেয়েরা হলুদ-ছোপানো শাড়ি পরিয়া দলে দলে গান করিতে করিতে কল্বলিয়া নদীতে ছট্ ভাসাইতে চলিয়াছে। সারাদিন উৎসবের ধুম। সন্ধ্যায় বস্তিগুলির কাছ দিয়া যাইতে যাইতে ছট্-পরবের পিঠে ভাজার ভরপুর গন্ধ পাওয়া যায়। কত রাত পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের হাসি কলরব, মেয়েদের গান- যেখানে নীলগাইয়ের জেরা গভীর রাত্রে দৌড়িয়া যাইত, হায়েনার হাসি ও বাঘের কাশি (অভিজ্ঞ ব্যক্তি জানে, বাঘে অবিকল মানুষের গলায় কাশির মতো একপ্রকার শব্দ করে ) শোনা যাইত- সেখানে আজকাল কলহাস্যমুখরিত, গীতিরবপূর্ণ উৎসবদীপ্ত এক বিস্তীর্ণ জনপদ।ছট্-পরবের সন্ধ্যায় ঝল্লুটোলায় নিমন্ত্রণ রক্ষা করিতে গেলাম। শুধু এই একটি টোলায় নয়-পনেরোটি বিভিন্ন টোলা হইতে ছট্-পরবের নিমন্ত্রণ পাইয়াছি কাছারিসুদ্ধ সকল আমলা।ঝল্লুটোলার মোড়ল ঝল্লু মাহাতোর বাড়ি গেলাম প্রথমে।ঝল্লু মাহাতোর বাড়ির একপাশে দেখি এখনো জঙ্গল কিছু কিছু আছে। ঝল্লু উঠানে এক ছেঁড়া সামিয়ানা টাঙাইয়াছে- তাহারই তলায় আমাদের আদর করিয়া বসাইল। টোলার সকল লোক ফর্সা ধুতি ও মেরজাই পরিয়া সেখানে ঘাসে-বোনা একজাতীয় মাদুরের আসনে বসিয়া আছে। বলিলাম- খাইবার অনুরোধ রাখিতে পারিব না, কারণ অনেক স্থানে যাইতে হইবে।ঝল্লু বলিল- একটু মিষ্টিমুখ করতেই হবে। মেয়েরা নইলে বড় ক্ষুন্ন হবে, আপনি পায়ের ধুলো দেবেন বলে ওরা বড় উৎসাহ করে পিঠে তৈরি করেছে।উপায় নাই। গোষ্ঠবাবু মুহুরী, আমি ও রাজু পাঁড়ে বসিয়া গেলাম। শালপাতায় কয়েখখানি আটা ও গুড়ের পিঠে আসিল- এক-একখানি পিঠে এক ইঞ্চি পুরু ইটের মতো শক্ত, ছুঁড়িয়া মারিলে মানুষ মরিয়া না গেলেও দস্তুরমতো জখম হয়। অথচ প্রত্যেকখানা পিঠে ছাঁচে ফেলা চন্দ্রপুলির মতো বেশ লতাপাতা কাটা। ছাঁচে ফেলিবার পরে তবে ঘিয়ে ভাজা হইয়াছে।অত যত্নে মেয়েদের হাতে তৈরি পিষ্টকের সদ্ব্যবহার করিতে পারিলাম না। আধখানা অতিকষ্টে খাইয়াছিলাম। না মিষ্টি, না কোনো স্বাদ। বুঝিলাম গাঙ্গোতা মেয়েরা খাবারদাবার তৈরি করিতে জানে না। রাজু পাঁড়ে কিন্তু চার-পাঁচখানা সেই বড় বড় পিঠে দেখিতে দেখিতে খাইয়া ফেলিল এবং আমাদের সামনে চক্ষুলজ্জা বশতই বোধ হয় আর চাহিতে পারিল না।ঝল্লুটোলা হইতে গেলাম লোধাইটোলা। তারপর পর্বতটোলা, ভীমদাসটোলা, আস্রফিটোলা, লছমনিয়াটোলা। প্রত্যেক টোলায় নাচগান, হাসিবাজনার ধুম। আজ সারারাত ইহারা ঘুমাইবে না। এ-বাড়ি ও-বাড়ি খাওয়াদাওয়া করিয়া নাচগান করিয়াই কাটাইয়া দিবে!একটি ব্যাপার দেখিয়া আনন্দ হইল, মেয়েরা সব টোলাতেই যত্ন করিয়া নাকি খাবার তৈরি করিয়াছে আমাদের জন্য। ম্যানেজারবাবু নিমন্ত্রণে আসিবেন শুনিয়া তাহারা অত্যন্ত উৎসাহের ও যত্নের সহিত নিজেদের চরম রন্ধনকৌশল প্রদর্শন করিয়া পিষ্টক গড়িয়াছে। মেয়েদের সহৃদয়তার জন্য মনে মনে যথেষ্ট কৃতজ্ঞ হইলেও তাহাদের রন্ধনবিদ্যার প্রশংসা করিয়া উঠিতে পারিলাম না, ইহা আমার পক্ষে খুবই দুঃখের বিষয়। ঝল্লুটোলার অপেক্ষা নিকৃষ্টতর পিষ্টকের সহিতও স্থানে স্থানে পরিচয় ঘটিল।সব জায়গায়ই দেখি রঙিন শাড়ি-পরা মেয়েরা কৌতূলহলপূর্ণ চোখে আড়াল হইতে ভোজনরত বাঙালি বাবুদের দিকে চাহিয়া আছে। রাজু পাঁড়ে কাহাকেও মনে কষ্ট দিল না-পিষ্টক ভক্ষণের সীমা অতিক্রম করিয়া রাজু পাঁড়ে ক্রমশ অসীমের দিকে চলিতে লাগিল দেখিয়া আমি গণনার হাল ছাড়িয়া দিলাম- সুতরাং সে কয়খানা পিষ্টক খাইয়াছিল বলিতে পারিব না।শুধু রাজু কেন- নিমন্ত্রিত গাঙ্গোতাদের মধ্যে সেই ইটের মতো কঠিন পিষ্টক এক-একজন এক কুড়ি দেড় কুড়ি করিয়া খাইল-চোখে না দেখিলে বিশ্বাস করা শক্ত যে সেই জিনিস মানুষে অত খাইতে পারে।নাঢ়া-বইহারে ছনিয়া ও সুরতিয়াদের ওখানে গেলাম।সুরতিয়া আমায় দেখিয়া ছুটিয়া আসিল।-বাবুজী, এত রাত করে ফেললেন? আমি আর মা দু-জনে বসে আপনার জন্যে আলাদা করে পিঠে গড়েছি-আমরা হাঁ করে বসে আছি আর ভাবছি এত দেরি হচ্ছে কেন। আসুন, বসুন।নক্ছেদী সকলকে খাতির করিয়া বসাইল।তুলসীকে খুব যত্ন করিয়া খাইবার আসন করিতে দেখিয়া মনে মনে হাসিলাম। ইহাদের এখানে খাইবার অবস্থা কি আর আছে?সুরতিয়াকে বলিলাম-তোমার মাকে বল পিঠে তুলে নিতে। এত কে খাবে?সুরতিয়া বিস্মিত দৃষ্টিতে আমার দিকে চাহিয়া বলিল- ও কি বাবুজী, এই ক’খানা খাবেন না? আমি আর ছনিয়াই তো পনর-ষোলখানা করে খেয়েছি। খান- আপনি খাবেন বলে ওর ভেতরে মা কিশমিশ দিয়েছে- ভালো আটা এনেছে বাবা ভীমদাসটোলা থেকে-খাইব না বলিয়া ভালো করি নাই। সারা বছর এই বালকবালিকা এসব সুখাদ্যের মুখ দেখিতে পায় না। এদের কত কষ্টের, কত আশার জিনিস! ছেলেমানুষকে খুশি করিবার জন্য মরিয়া হইয়া দুইখানা পিষ্টক খাইয়া ফেলিলাম।সুরতিয়াকে খুশি করিবার জন্য বলিলাম- চমৎকার পিঠে! কিন্তু সব জায়গায় কিছু কিছু খেয়েছি বলে খেতে পারলুম না সুরতিয়া। আর একদিন এসে হবে এখন।রাজু পাঁড়ের হাতে একটা ছোটখাটো বোঁচকা। সে প্রত্যেকের বাড়ি হইতে ছাঁদা বাঁধিয়াছে, এক-একখানি পিষ্টকের ওজন বিবেচনা করিলে রাজুর বোঁচকার ওজন দশ-বারো সেরের কম তো কোনো মতেই হইবে না।রাজু খুব খুশি। বলিল- এ পিঠে হঠাৎ নষ্ট হয় না হুজুর, দু-তিন দিন আর আমায় রাঁধতে হবে না। পিঠে খেয়েই চলবে।কাছারিতে পরদিন সকালে কুন্তা একখানি পিতলের থালা লইয়া আসিয়া আমার সামনে সসঙ্কোচে স্থাপন করিল। এক টুক্রা ফর্সা নেকড়া দিয়া থালাখানা ঢাকা।বলিলাম- ওতে কি কুন্তা?কুন্তা সলজ্জ কণ্ঠে বলিল ছট্-পরবের পিঠে বাবুজী। কাল রাত্রে দু-বার নিয়ে এসে ফিরে গিয়েছি।বলিলাম- কাল অনেক রাত্রে ফিরেছি, ছট্-পরবের নেমন্তন্ন রাখতে বেরিয়েছিলাম। আচ্ছা রেখে দাও, খাব এখন।ঢাকা খুলিয়া দেখি, থালায় কয়েকখানি পিষ্টক, কিছু চিনি, দুটি কলা, একখণ্ড ঝুনা নারিকেল, একটা কলম্বা লেবু।বলিলাম- বাঃ, বেশ পিঠে দেখছি।কুন্তা পূর্ববৎ মৃদুস্বরে সসঙ্কোচে বলিল- বাবুজী, সবগুলো মেহেরবানি করে খাবেন। আপনি খাবেন বলে আলাদা করে তৈরি করেছি। তবুও আপনাকে গরম খাওয়াতে পারলাম না, বড় দুঃখ রইল।– কিছু হয় নি তাতে, কুন্তা। আমি সবগুলো খাব। দেখতে বড় চমৎকার দেখাচ্ছে।কুন্তা প্রণাম করিয়া চলিয়া গেল।একদিন মুনেশ্বর সিং সিপাহী আসিয়া বলিল- হুজুর, ওই বনের মধ্যে গাছের নিচে একটা লোক ছেঁড়া কাপড় পেতে শুয়ে আছে-লোকজনে তাকে বস্তিতে ঢুকতে দেয় না-ঢিল ছুঁড়ে মারে, আপনি হুকুম করেন তো তাকে নিয়ে আসি।কথাটা শুনিয়া আশ্চর্য হইলাম। বৈকাল বেলা, সন্ধ্যার বেশি দেরি নাই, শীত তেমন না হইলেও কার্তিক মাস, রাত্রে যথেষ্ট শিশির পড়ে, শেষ রাত্রে বেশ ঠাণ্ডা। এ অবস্থায় একটা লোক বনের মধ্যে গাছের তলায় আশ্রয় লইয়াছে কেন, লোকে তাকে ঢিল ছুঁড়িয়াই বা মারে কেন বুঝিতে পারিলাম না।গিয়া দেখি গ্র্যাণ্ট সাহেবের বটগাছের ওদিকে (আজ প্রায় ত্রিশ বছর আগে গ্র্যাণ্ট সাহেব আমিন লবটুলিয়ার বন্য মহাল জরিপ করিতে আসিয়া এই বটতলায় তাঁবু ফেলেন, সেই হইতেই গাছটির এই নাম চলিয়া আসিতেছে) একটা বনঝোপে একটা অর্জুন গাছের তলায় একটা লোক ছেঁড়া ময়লা নেকড়াখানি পাতিয়া শয্যা রচনা করিয়া শুইয়া আছে। ঝোপের অন্ধকারে লোকটিকে ভালো করিয়া দেখিতে না পাইয়া বলিলাম-কে ওখানে? বাড়ি কোথায়? বের হয়ে এস-লোকটি বাহির হইয়া আসিল- অনেকটা হামাগুড়ি দিয়া, অতি ধীরে ধীরে- বয়স পঞ্চাশের উপর, জীর্ণশীর্ণ চেহারা, মলিন ছেঁড়া কাপড় ও মেরজাই গায়ে,-যতক্ষণ সে ঝোপের ভিতর হইতে বাহির হইতেছিল, কি একরকম অদ্ভুত, অসহায়ভাবে শিকারির তাড়া-খাওয়া পশুর মতো ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে চাহিয়া ছিল।ঝোপের অন্ধকার হইতে দিনের আলোয় বাহির হইয়া আসিলে দেখিলাম, তাহার বাম হাতে ও বাম পায়ে ভীষণ ক্ষত। বোধ হয় সেইজন্য সে একবার বসিলে বা শুইলে হঠাৎ আর সোজা হইয়া দাঁড়াইতে পারে না।মুনেশ্বর সিং বলিল- হুজুর, ওর ওই ঘায়ের জন্যই ওকে বস্তিতে ঢুকতে দেয় না- জল পর্যন্ত চাইলে দেয় না। ঢিল মারে, দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়-বোঝা গেল তাই এ লোকটা বনের পশুর মতো বন-ঝোপের মধ্যেই আশ্রয় লইয়াছে এই হেমন্তের শিশিরার্দ্র রাত্রে।বলিলাম- তোমার নাম কি? বাড়ি কোথায়?লোকটা আমায় দেখিয়া ভয়ে কেমন হইয়া গিয়াছে- ওর চোখে রোগকাতর ও ভীত অসহায় দৃষ্টি। তা ছাড়া আমার পিছনে লাঠিহাতে মুনেশ্বর সিং সিপাহী। বোধ হয় সে ভাবিল, সে যে বনে আশ্রয় লইয়াছে তাহাতেও আমাদের আপত্তি আছে- তাহাকে তাড়াইয়া দিতেই আমি সিপাই সঙ্গে করিয়া সেখানে গিয়াছি।বলিল- আমার নাম?- নাম হুজুর গিরধারীলাল, বাড়ি তিনটাঙা। পরক্ষণেই কেমন একটা অদ্ভুত সুরে- মিনতি, প্রার্থনা এবং বিকারের রোগীর অসঙ্গত আবদারের সুর এই কয়টি মিলাইয়া এক ধরনের সুরে বলিল- একটু জল খাব- জল-আমি ততক্ষণে লোকটাকে চিনিয়া ফেলিয়াছি। সেবার পৌষ মাসের মেলায় ইজারাদার ব্রহ্মা মাহাতোর তাঁবুতে সেই যে দেখিয়াছিলাম- সেই গিরধারীলাল। সেই ভীত দৃষ্টি, সেই নম্র মুখের ভাব-দরিদ্র, নম্র, ভীরু লোকদেরই কি ভগবান জগতে এত বেশি করিয়া কষ্ট দেন! মুনেশ্বর সিংকে বলিলাম- কাছারি যাও- চার-পাঁচজন লোক আর একটা চারপাই নিয়ে এস-সে চলিয়া গেল।আমি জিজ্ঞাসা করিলাম- কি হয়েছে গিরধারীলাল? আমি তোমায় চিনি। তুমি আমায় চিনতে পার নি? সেই যে সেবার ব্রহ্মা মাহাতোর তাঁবুতে মেলার সময় তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল- মনে নেই? কোনো ভয় নেই। – কি হয়েছে তোমার?গিরধারীলাল ঝর্ঝর্ করিয়া কাঁদিয়া ফেলিল। হাত ও পা নাড়িয়া দেখাইয়া বলিল- হুজুর, কেটে গিয়ে ঘা হয়। কিছুতেই সে ঘা সারে না, যে যা বলে তাই করি- ঘা ক্রমেই বাড়ে। ক্রমে সকলে বললে- তোর কুষ্ঠ হয়েছে। সেইজন্য আজ চার-পাঁচ মাস এই রকম কষ্ট পাচ্ছি। বস্তির মধ্যে ঢুকতে দেয় না! ভিক্ষে করে কোনো রকমে চালাই। রাত্রে কোথাও জায়গা দেয় না- তাই বনের মধ্যে ঢুকে শুয়ে থাকব বলে--কোথায় যাচ্ছিলে এদিকে? এখানে কি করে এলে?গিরধারীলাল এরই মধ্যে হাঁপাইয়া পড়িয়াছিল। একটু দম লইয়া বলিল- পূর্ণিয়ার হাসপাতালে যাচ্ছিলাম হুজুর- নইলে ঘা তো সারে না।আশ্চর্য না হইয়া পারিলাম না। মানুষের কি আগ্রহ বাঁচিবার! গিরধারীলাল যেখানে থাকে, পূর্ণিয়া সেখান হইতে চল্লিশ মাইলের কম নয়- মোহনপুরা রিজার্ভ ফরেস্টের মতো শ্বাপদসঙ্কুল আরণ্যভূমি সামনে- ক্ষতে-অবশ হাত-পা লইয়া সে চলিয়াছে এই দুর্গম পাহাড়-জঙ্গলের পথ ভাঙিয়া পূর্ণিয়ার হাসপাতালে!চারপাই আসিল। সিপাহীদের বাসার কাছে একটা খালি ঘরে উহাকে লইয়া গিয়া শোয়াইয়া দিলাম। সিপাহীরাও কুষ্ঠ বলিয়া একটু আপত্তি তুলিয়াছিল, পরে বুঝাইয়া দিতে তাহারা বুঝিল।গিরধারীকে খুব ক্ষুধার্ত বলিয়া মনে হইল। অনেকদিন সে যেন পেট ভরিয়া খাইতে পায় নাই। কিছু গরম দুধ খাওয়াইয়া দিতে সে কিঞ্চিৎ সুস্থ হইল।সন্ধ্যার দিকে তাহার ঘরে গিয়া দেখি সে অঘোরে ঘুমাইতেছে।পরদিন স্থানীয় বিশিষ্ট চিকিৎসক রাজু পাঁড়েকে ডাকাইলাম। রাজু গম্ভীর মুখে অনেকক্ষণ ধরিয়া রোগীর নাড়ি দেখিল, ঘা দেখিল। রাজুকে বলিলাম-দেখ, তোমার দ্বারা হবে, না পূর্ণিয়ায় পাঠিয়ে দেব?রাজু আহত অভিমানের সুরে বলিল- আপনার বাপ-মায়ের আশীর্বাদে হুজুর, অনেক দিন এই কাজ করছি। পনের দিনের মধ্যে ঘা ভালো হয়ে যাবে।গিরধারীকে হাসপাতালে পাঠাইয়া দিলেই ভালো করিতাম পরে বুঝিলাম। ঘায়ের জন্য নহে, রাজু পাঁড়ের জড়ি-বুটির গুণে পাঁচ-ছয় দিনের মধ্যেই ঘায়ের চেহারা বদলাইয়া গেল- কিন্তু মুশকিল বাধিল তাহার সেবা-শুশ্রূষা লইয়া। তাহাকে কেহ ছুঁইতে চায় না, ঘায়ে ঔষধ লাগাইয়া দিতে চায় না, তাহার খাওয়া জলের ঘটিটা পর্যন্ত মাজিতে আপত্তি করে।তাহার উপর বেচারির হইল জ্বর। খুব বেশি জ্বর।নিরুপায় হইয়া কুন্তাকে ডাকাইলাম। তাহাকে বলিলাম-তুমি বস্তি থেকে একজন গাঙ্গোতার মেয়ে ডেকে দাও, পয়সা দেব-ওকে দেখাশুনো করতে হবে।কুন্তা কিছুমাত্র না ভাবিয়া তখনই বলিল-আমি করব বাবুজী। পয়সা দিতে হবে না।কুন্তা রাজপুতের স্ত্রী, সে গাঙ্গোতা রোগীর সেবা করিবে কি করিয়া? ভাবিলাম আমার কথা সে বুঝিতে পারে নাই।বলিলাম, ওর এঁটো বাসন মাজতে হবে, ওকে খাওয়াতে হবে, ও তো উঠতে পারে না। সে-সব তোমায় দিয়ে কি করে হবে?কুন্তা বলিল- আপনি হুকুম করলেই আমি সব করব। আমি রাজপুত কোথায় বাবুজী! আমার জাতভাই কেউ এতদিন আমায় কি দেখেছে? আপনি যা বলবেন আমি তাই করব! আমার আবার জাত কি!রাজু পাঁড়ের জড়ি-বুটির গুণে ও কুন্তার সেবাশুশ্রূষায় মাসখানেকের মধ্যে গিরধারীলাল চাঙ্গা হইয়া উঠিল! কুন্তা এজন্য দিতে গেলেও কিছু লইল না। গিরধারীলালকে সে ইতিমধ্যে ‘বাবা’ বলিয়া ডাকিতে আরম্ভ করিয়াছে দেখিলাম। বলিল- আহা, বাবা বড় দুঃখী, বাবার সেবা করে আবার পয়সা নেব? ধরমরাজ মাথার উপর নেই?জীবনে যে কয়টি সৎ কাজ করিয়াছি, তাহার মধ্যে একটি প্রধান সৎ কাজ নিরীহ ও নিঃস্ব গিরধারীলালকে বিনা সেলামিতে কিছু জমি দিয়া লবটুলিয়াতে বাস করানো।তাহার খুপরিতে একদিন গিয়াছিলাম।নিজের বিঘা পাঁচেক জমি সে নিজের হাতেই পরিষ্কার করিয়া গম বুনিয়াছে। খুপরির চারিপাশে কতগুলি গোঁড়ালেবুর চারা পুঁতিয়াছে।– এত গোঁড়ালেবুর গাছ কি হবে গিরধারীলাল?– হুজুর, ওগুলো শরবতী নেবু। আমি বড় খেতে ভালবাসি। চিনি-মিছরি জোটে না আমাদের, ভূরা গুড়ের শরবত করে ওই লেবুর রস দিয়ে খেতে ভারি তার!দেখিলাম আশার আনন্দে গিরধারীলালের নিরীহ চক্ষু দুটি উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে।– ভালো কলমের লেবু। এক-একটা হবে এক পোয়া। অনেক দিন থেকে আমার ইচ্ছে, যদি কখনো জমি-জায়গা করতে পারি, তবে ভালো শরবতী লেবুর গাছ লাগাব। পরের দোরে লেবু চাইতে গিয়ে কতবার অপমান হয়েছি হুজুর। সে দুঃখ আর রাখব না।
এখান হইতে চলিয়া যাইবার সময় আসিয়াছে। একবার ভানুমতীর সঙ্গে দেখা করিবার ইচ্ছা প্রবল হইল। ধন্ঝরি শৈলমালা একটি সুন্দর স্বপ্নের মতো আমার মন অধিকার করিয়া আছে… তাহার বনানী … তাহার জ্যোৎস্নালোকিত রাত্রি …সঙ্গে লইলাম যুগলপ্রসাদকে।তহসিলদার সজ্জন সিং-এর ঘোড়াটাতে যুগলপ্রসাদ চড়িয়াছিল- আমাদের মহালের সীমানা পার হইতে না-হইতেই বলিল-হুজুর, এ ঘোড়া চলবে না, জঙ্গলের পথে রহল চাল ধরলেই হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে আমারও পা খোঁড়া হবে। বদলে নিয়ে আসি।তাহাকে আশ্বস্ত করিলাম। সজ্জন সিং ভালো সওয়ার, সে কতবার পূর্ণিয়ায় মকদ্দমা তদারক করিতে গিয়াছে এই ঘোড়ায়। পূর্ণিয়া যাইতে হইলে কেমন পথে যাইতে হয় যুগলপ্রসাদের তাহা অজ্ঞাত নয় নিশ্চয়ই।শীঘ্রই কারো নদী পার হইলাম।তারপর অরণ্য, অরণ্য- সুন্দর অপূর্ব ঘন নির্জন অরণ্য! পূর্বেই বলিয়াছি এ-জঙ্গলে মাথার উপরে গাছপালার ডালে ডালে জড়াজড়ি নাই- কেঁদচারা, শালচারা, পলাশ, মহুয়া, কুলের অরণ্য- প্রস্তরাকীর্ণ রাঙা মাটির ডাঙা, উঁচু-নিচু। মাঝে মাঝে মাটির উপর বন্য হস্তীর পদচিহ্ন। মানুষজন নাই।হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচিলাম লবটুলিয়ার নূতন তৈরি ঘিঞ্জি কুশ্রী টোলা ও বস্তি এবং একঘেয়ে ধূসর, চষা জমি দেখিবার পরে। এ-রকম আরণ্য প্রদেশ এদিকে আর কোথাও নাই।এই পথের সেই দুটি বন্য গ্রাম- বুরুডি ও কুলপাল- বেলা বারোটার মধ্যেই ছাড়াইলাম। তার পরেই ফাঁকা জঙ্গল পিছনে পড়িয়া রহিল- সম্মুখে বড় বড় বনস্পতির ঘন অরণ্য। কার্তিকের শেষ, বাতাস ঠাণ্ডা- গরমের লেশমাত্রও নাই।দূরে দূরে ধন্ঝরি পাহাড়শ্রেণী বেশ স্পষ্ট হইয়া ফুটিল।সন্ধ্যার পরে কাছারিতে পৌঁছিলাম। যে বিড়িপাতার জঙ্গল আমাদের স্টেট নিলামে ডাকিয়া লইয়াছিল, এ-কাছারি সেই জঙ্গলের ইজারাদারের!লোকটা মুসলমান, শাহাবাদ জেলায় বাড়ি। নাম আবদুল ওয়াহেদ। খুব খাতির করিয়া রাখিয়া দিল। বলিল- সন্ধের সময় পৌঁছেছেন, ভালো হয়েছে বাবুজী। জঙ্গলে বড় বাঘের ভয় হয়েছে।নির্জন রাত্রি।বড় বড় গাছে শন্ শন্ করিয়া বাতাস বাধিতেছে।কাছারির বারান্দায় বসিবার ভরসা পাইলাম না কথাটা শুনিয়া।ঘরের মধ্যে জানালা খুলিয়া বসিয়া গল্প করিতেছি-হঠাৎ কি একটা জন্তু ডাকিয়া উঠিল বনের মধ্যে। যুগলকে বলিলাম- কি ও?যুগল বলিল- ও কিছু না, হুড়াল। অর্থাৎ নেকড়ে বাঘ।একবার গভীর রাত্রে বনের মধ্যে হায়েনার হাসি শোনা গেল-হঠাৎ শুনিলে বুকের রক্ত জমিয়া যায় ভয়ে, ঠিক যেন কাশরোগীর হাসি, মাঝে মাঝে দম বন্ধ হইয়া যায়, মাঝে মাঝে হাসির উচ্ছ্বাস।পরদিন ভোরে রওনা হইয়া বেলা ন-টার মধ্যে দোবরু পান্নার রাজধানী চক্মকিটোলায় পৌঁছানো গেল। ভানুমতী কি খুশি আমার অপ্রত্যাশিত আগমনে! তার মুখ-চোখে খুশি যেন চাপিতে পারিতেছে না, উপচাইয়া পড়িতেছে।-আপনার কথা কালও ভেবেছি বাবুজী। এতদিন আসেন নি কেন?ভানুমতীকে একটু লম্বা দেখাইতেছে, একটু রোগাও বটে। তা ছাড়া মুখশ্রী আছে ঠিক তেমনি লাবণ্যভরা, সেই নিটোল গড়ন তেমনি আছে!-নাইবেন তো ঝরনায়? মহুয়া তেল আনব না কড়ুয়া তেল? এবার বর্ষায় ঝরনায় কি সুন্দর জল হয়েছে দেখবেন চলুন।আর একটা জিনিস লক্ষ্য করিয়া আসিতেছি- ভানুমতী ভারি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, সাধারণ সাঁওতাল মেয়েদের সঙ্গে তার সেদিক দিয়া তুলনাই হয় না- তার বেশভূষা ও প্রসাধনের সহজ সৌন্দর্য ও রুচিবোধই তাহাকে অভিজাতবংশের মেয়ে বলিয়া পরিচয় দেয়।যে-মাটির ঘরের দাওয়ায় বসিয়া আছি, তাহার উঠানের চারিধারে বড় বড় আসান ও অর্জুন গাছ। এক ঝাঁক সবুজ বনটিয়া সামনের আসান গাছটার ডালে কলরব করিতেছে। হেমন্তের প্রথম, বেলা চড়িলেও বাতাস ঠাণ্ডা। আমার সামনে আধ মাইলেরও কম দূরে ধন্ঝরি পাহাড়শ্রেণী, পাহাড়ের গা বাহিয়া নামিয়া আসিয়াছে চেরা সিঁথির মতো পথ-একদিকে অনেক দূরে নীল মেঘের মতো দৃশ্যমান গয়া জেলার পাহাড়শ্রেণী।বিড়ির পাতার জঙ্গল ইজারা লইয়া এই শান্ত জনবিরল বন্য প্রদেশের পল্লবপ্রচ্ছায় উপত্যকার কোনো পাহাড়ী ঝরনার তীরে কুটির বাঁধিয়া বাস করিতাম চিরদিন! লবটুলিয়া তো গেল, ভানুমতীর দেশের এ-বন কেহ নষ্ট করিবে না। এ-অঞ্চলে মরুমকাঁকর ও পাইওরাইট্ বেশি মাটিতে, ফসল তেমন হয় না- হইলে এ-বন কোন্ কালে ঘুচিয়া যাইত। তবে যদি তামার খনি বাহির হইয়া পড়ে, সে স্বতন্ত্র কথা…তামার কারখানার চিমনি, ট্রলি লাইন, সারি সারি কুলিবস্তি, ময়লা জলের ড্রেন, এঞ্জিনঝাড়া কয়লার ছাইয়ের স্তূপ- দোকানঘর, চায়ের দোকান, সস্তা সিনেমায় ‘জোয়ানী-হাওয়া’ ‘শের শমশের’ ‘প্রণয়ের জের’ (ম্যাটিনিতে তিন আনা, পূর্বাহে¦ আসন দখল করুন)-দেশী মদের দোকান, দরজির দোকান। হোমিও ফার্মেসি (সমাগত দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করা হয়)। আদি ও অকৃত্রিম আদর্শ হিন্দু হোটেল।কলের বাঁশিতে তিনটার সিটি বাজিল।ভানুমতী মাথায় করিয়া এঞ্জিনের ঝাড়া কয়লা বাজারে ফিরি করিতে বাহির হইয়াছে-ক-ই-লা চা-ই-ই-চার পয়সা ঝুড়ি।ভানুমতী তেল আনিয়া সামনে দাঁড়াইল। ওদের বাড়ির সবাই আসিয়া আমাকে নমস্কার করিয়া ঘিরিয়া দাঁড়াইল। ভানুমতীর ছোট কাকা নবীন যুবক জগরু একটা গাছের ডাল ছুলিতে ছুলিতে আসিয়া আমার দিকে চাহিয়া হাসিল। এই ছেলেটিকে আমি বড় পছন্দ করি! রাজপুত্রের মতো চেহারা ওর, কালোর উপরে কি রূপ! এদের বাড়ির মধ্যে এই যুবক এবং ভানুমতী, এদের দুজনকে দেখিলে সত্যই যে ইহারা বন্য জাতির মধ্যে অভিজাতবংশ, তা মনে না হইয়া পারে না।বলিলাম-কি জগরু, শিকার-টিকার কেমন চলেছে?জগরু হাসিয়া বলিল-আপনাকে আজই খাইয়ে দেব বাবুজী, ভাববেন না। বলুন কি খাবেন, সজারু না হরিয়াল, না বনমোরগ?স্নান করিয়া আসিলাম। ভানুমতী নিজের সেই আয়নাখানি (সেবার যেখানা পূর্ণিয়া হইতে আনাইয়া দিয়াছিলাম) আর একখানা কাঠের কাঁকুই চুল আঁচড়াইবার জন্য আনিয়া দিল।আহারাদির পর বিশ্রাম করিতেছি, বেলা পড়িয়া আসিয়াছে, ভানুমতী প্রস্তাব করিল- বাবুজী চলুন, পাহাড়ে উঠবেন না! আপনি তো ভালবাসেন।যুগলপ্রসাদ ঘুমাইতেছিল, সে ঘুম ভাঙ্গিয়া উঠিলে আমরা বেড়াইবার জন্য বাহির হইলাম। সঙ্গে রহিল ভানুমতী, ওর খুড়তুতো বোন- জগরু পান্নার মেজ ভাইয়ের মেয়ে, বছর বারো বয়স- আর যুগলপ্রসাদ।আধ মাইল হাঁটিয়া পাহাড়ের নিচে পৌঁছিলাম।ধন্ঝরির পাদমূলে এই জায়গায় বনের দৃশ্য এত অপূর্ব যে, খানিকটা দাঁড়াইয়া দেখিতে ইচ্ছা করে। যেদিকে চোখ ফিরাই সেদিকেই বড় বড় গাছ, লতা, উপল-বিছানো ঝরনার খাদ, ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ছোট-বড় শিলাস্তূপ। ধন্ঝরির দিকে বন ও পাহাড়ের আড়ালে আকাশটা কেমন সরু হইয়া গিয়াছে, সামনে লাল কাঁকুরে মাটির রাস্তা উঁচু হইয়া ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়া পাহাড়ের ও-পারের দিকে উঠিয়াছে, কেমন খট্খটে শুকনো ডাঙা মাটি, কোথাও ভিজা নয়, স্যাঁতসেঁতে নয়। ঝরনার খাদেও এতটুকু জল নাই।পাহাড়ের উপরে ঘন বন ঠেলিয়া কিছুদূর উঠিতেই কিসের মধুর সুবাসে মনপ্রাণ মাতিয়া উঠিল, গন্ধটা অত্যন্ত পরিচিত-প্রথমটা ধরিতে পারি নাই, তারপরে চারিদিকে চাহিয়া দেখি-ধন্ঝরি পাহাড়ে যে এত ছাতিম গাছ তাহা পূর্বে লক্ষ্য করি নাই-এখন প্রথম হেমন্তে ছাতিম গাছে ফুল ধরিয়াছে, তাহারই সুবাস।সে কি দু-চারটি ছাতিম গাছ! সপ্তপর্ণের বন, সপ্তপর্ণ আর কেলিকদম্ব-কদম্বফুলের গাছ নয়, কেলিকদম্ব ভিন্নজাতীয় বৃক্ষ, সেগুনপাতার মতো বড় বড় পাতা, চমৎকার আঁকাবাঁকা ডালপালাওয়ালা বনস্পতিশ্রেণীর বৃক্ষ।হেমন্তের অপরাহে¦র শীতল বাতাসে পুষ্পিত বন্য সপ্তপর্ণের ঘন বনে দাঁড়াইয়া নিটোল স্বাস্থ্যবতী কিশোরী ভানুমতীর দিকে চাহিয়া মনে হইল, মূর্তিমতী বনদেবীর সঙ্গলাভ করিয়া ধন্য হইয়াছি- কৃষ্ণা বনদেবী। রাজকুমারী তো ও বটেই! এই বনাঞ্চল, পাহাড়, ওই মিছি নদী, কারো নদীর উপত্যকা, এদিকে ধন্ঝরি ওদিকে নওয়াদার শৈলশ্রেণী- এই সমস্ত স্থান একসময়ে যে পরাক্রান্ত রাজবংশের অধীনে ছিল, ও সেই রাজবংশের মেয়ে-আজ ভিন্ন যুগের আবহাওয়ায় ভিন্ন সভ্যতার সংঘাতে যে রাজবংশ বিপর্যস্ত, দরিদ্র, প্রভাবহীন-তাই আজ ভানুমতীকে দেখিতেছি সাঁওতালী মেয়ের মতো। ওকে দেখিলেই অলিখিত ভারতবর্ষের ইতিহাসের এই ট্র্যাজিক অধ্যায় আমার চোখের সামনে ফুটিয়া ওঠে।আজকার এই অপরাহ্নটি আমার জীবনের আরো বহু সুন্দর অপরাহ্নের সঙ্গে মিলিয়া মধুময় স্মৃতির সমারোহে উজ্জ্বল হইয়া উঠিল-স্বপ্নের মতো মধুর, স্বপ্নের মতোই অবাস্তব।ভানুমতী বলিল-চলুন, আরো উঠবেন না?-কি সুন্দর ফুলের গন্ধ বল তো! একটু বসবে না এখানে? সূর্য অস্ত যাচ্ছে, দেখি-ভানুমতী হাসিমুখে বলিল-আপনার যা মর্জি বাবুজী। বসতে বলেন এখানে বসি। কিন্তু জ্যাঠামশায়ের কবরে ফুল দেবেন না? আপনি সেই শিখিয়ে দিয়েছিলেন, আমি রোজ পাহাড়ে উঠি ফুল দিতে। এখন তো বনে কত ফুল।দূরে মিছি নদী উত্তরবাহিনী হইয়া পাহাড়ের নিচে দিয়া ঘুরিয়া যাইতেছে।নওয়াদার দিকে যে অস্পষ্ট পাহাড়শ্রেণী, তারই পিছনে সূর্য অস্ত গেল। সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ি হাওয়া আরো শীতল হইল। ছাতিম ফুলের সুবাস আরো ঘন হইয়া উঠিল, ছায়া গাঢ় হইয়া নামিল শৈলসানুর বনস্থলীতে, নিন্মের বনাবৃত উপত্যকায়, মিছি নদীর পরপারের গণ্ড-শৈলমালার গাত্রে।ভানুমতী একগুচ্ছ ছাতিম ফুল পাড়িয়া খোঁপায় গুঁজিল। বলিল- বসব, না উঠবেন বাবুজী?আবার উঠিতে আরম্ভ করিলাম। প্রত্যেকের হাতে এক-একটা ছাতিম ফুলের ডাল। একেবারে উপরে পাহাড়ের উপরে উঠিয়া গেলাম। সেই প্রাচীন বটগাছটা ও তার তলায় প্রাচীন রাজসমাধি। বড় বড় বাটনাবাটা শিলের মতো পাথর চারিদিকে ছড়ানো। রাজা দোবরু পান্নার কবরের উপর ভানুমতী ও তাহার বোন নিছনী ফুল ছড়াইল, আমি ও যুগলপ্রসাদ ফুল ছড়াইলাম।ভানুমতী বালিকা তো বটেই, সরলা বালিকার মতোই মহা খুশি। বালিকার মতো আবদারের সুরে বলিল- এখানে একটু দাঁড়াই বাবুজী, কেমন? বেশ লাগছে, না?আমি ভাবিতেছিলাম- এই শেষ। আর এখানে আসিব না। এ পাহাড়ের উপরকার সমাধিস্থান, এ বনাঞ্চল আর দেখিব না। ধন্ঝরির শৈলচূড়ায় পুষ্পিত সপ্তপর্ণের নিকট, ভানুমতীর নিটক, এই আমার চিরবিদায়। ছ-বছরের দীর্ঘ বনবাস সাঙ্গ করিয়া কলিকাতা নগরীতে ফিরিব- কিন্তু যাইবার দিন ঘনাইয়া আসিবার সঙ্গে সঙ্গে ইহাদের কেন এত বেশি করিয়া জড়াইয়া ধরিতেছি!ভানুমতীকে কথাটা বলিবার ইচ্ছা হইল, ভানমতী কি বলে আমি আর আসিব না শুনিয়া- জানিবার ইচ্ছা হইল। কিন্তু কি হইবে সরলা বনবালাকে বৃথা ভালবাসার, আদরের কথা বলিয়া?সন্ধ্যা হইবার সঙ্গে সঙ্গে আর একটি নূতন সুবাস পাইলাম। আশপাশের বনের মধ্যে যথেষ্ট শিউলি গাছ আছে। বেলা পড়িবার সঙ্গে সঙ্গে শিউলি ফুলের ঘন সুগন্ধ সান্ধ্য-বাতাসকে সুমিষ্ট করিয়া তুলিয়াছে। ছাতিম বন এখানে নাই-সে আরো নিচে নামিলে তবে। এরই মধ্যে গাছপালার ডালে জোনাকি জ্বলিতে আরম্ভ করিয়াছে। বাতাস কি সতেজ, মধুর, প্রাণারাম! এ বাতাস সকালে বিকালে উপভোগ করিলে আয়ু না বাড়িয়া পারে? নামিতে ইচ্ছা করিতেছিল না, কিন্তু বন্য জন্তুর ভয় আছে-তা ছাড়া ভানুমতী সঙ্গে রহিয়াছে। যুগলপ্রসাদ বোধ হয় ভাবিতেছিল নূতন কোন্ ধরনের গাছপালা এ জঙ্গল হইতে লইয়া গিয়া অন্যত্র রোপণ করিতে পারে। দেখিলাম তাহার সমস্ত মনোযোগ নূতন লতাপাতার ফুল, সুদৃশ্য পাতার গাছ প্রভৃতির দিকে নিবদ্ধ-অন্য দিকে তাহার দৃষ্টি নাই। যুগলপ্রসাদ পাগলই বটে, কিন্তু ঐ এক ধরনের পাগল।নূরজাহান নাকি পারস্য হইতে চেনার গাছ আনিয়া কাশ্মীরে রোপণ করিয়াছিলেন। এখন নূরজাহান নাই, কিন্তু সারা কাশ্মীর সুদৃশ্য চেনার বৃক্ষে ছাইয়া ফেলিয়াছে। যুগলপ্রসাদ মরিয়া যাইবে, কিন্তু সরস্বতী হ্রদের জলে আজ হইতে শতবর্ষ পরেও হেমন্তে ফুটন্ত স্পাইডারলিলি বাতাসে সুগন্ধ ছড়াইবে, কিংবা কোনো-না-কোনো বনঝোপে বন্য হংসলতার হংসাকৃতি নীলফুল দুলিবে, যুগলপ্রসাদই যে সেগুলি নাঢ়া-বইহারের জঙ্গলে আমদানি করিয়াছিল একদিন- একথা না-ই বা কেহ বলিল!ভানুমতী বলিল- বাঁয়ে ওই সেই টাঁড়বারোর গাছ- চিনেছেন?বন্য-মহিষের রক্ষাকর্তা সদয় দেবতা টাঁড়বারোর গাছ অন্ধকারে চিনিতে পারি নাই। আকাশে চাঁদ নাই, কৃষ্ণপক্ষের রাত্রি।অনেকটা নামিয়া আসিয়াছি। এবার সেই ছাতিম বন। কি মিষ্টি মনমাতানো গন্ধ!ভানুমতীকে বলিলাম- একটু বসি।পরে সেই বনপথে অন্ধকারের মধ্যে নামিতে নামিতে ভাবিলাম, লবটুলিয়া গিয়াছে, নাঢ়া ও ফুলকিয়া বইহার গিয়াছে-কিন্তু মহালিখারূপের পাহাড় রহিল-ভানুমতীদের ধন্ঝরি পাহাড়ের বনভূমি রহিল। এমন সময় আসিবে হয়তো দেশে, যখন মানুষে অরণ্য দেখিতে পাইবে না-শুধুই চাষের ক্ষেত আর পাটের কল, কাপড়ের কলের চিমনি চোখে পড়িবে, তখন তাহারা আসিবে এই নিভৃত অরণ্যপ্রদেশে, যেমন লোকে তীর্থে আসে। সেই সব অনাগত দিনের মানুষদের জন্য এ বন অক্ষুন্ন থাকুক।রাত্রে বসিয়া জগরু পান্না ও তাহার দাদার মুখে তাহাদের সম্বন্ধে অনেক কথাবার্তা শুনিলাম। মহাজনের দেনা এখনো শোধ যায় নাই, দুইটি মহিষ ধার করিয়া কিনিতে হইয়াছে, না কিনিলে চলে না, গয়ার এক মারোয়াড়ী মহাজন আগে আসিয়া ঘি কিনিয়া লইয়া যাইত-আজ তিন চার মাস সে আর আসে না। প্রায় আধ মন ঘি ঘরে মজুত, খরিদ্দার নাই।ভানুমতী আসিয়া দাওয়ার একধারে বসিল। যুগলপ্রসাদ অত্যন্ত চা-খোর, সে চা-চিনি সঙ্গে আনিয়াছে আমি জানি। কিন্তু লাজুকতাবশত গরম জলের কথা বলিতে পারিতেছে না, তাহাও জানি। বলিলাম- চায়ের জল একটু গরম করার সুবিধে হবে কি ভানুমতী?রাজকুমারী ভানুমতী চা কখনো করে নাই। চা খাইবার রেওয়াজই নাই এখানে। তাহাকে জলের পরিমাণ বুঝাইয়া দিতে সে মাটির হাঁড়িতে জল গরম করিয়া আনিল। তাহার ছোট বোন কয়েকটি পাথরবাটি আনিল। ভানুমতীকে চা খাইবার অনুরোধ করিলাম, সে খাইতে চাহিল না। জগরু পান্না পাথরের ছোট খোরার এক খোরা চা শেষ করিয়া আরো খানিকটা চাহিয়া লইল।চা খাইয়া আর-সকলে উঠিয়া গেল, ভানুমতী গেল না। আমায় বলিল-ক’দিন এখন আছেন বাবুজী? এবার বড় দেরি করে এসেছেন। কাল তো যেতেই দেব না। চলুন আপনাকে কাল ঝাটি ঝরনা বেড়িয়ে নিয়ে আসি। ঝাটি ঝরনায় আরো ভয়ানক জঙ্গল। ওদিকে বড্ড বুনো হাতি। অনেক বনময়ূরও আছে দেখতে পাবেন। চমৎকার জায়গা। পৃথিবীর মধ্যে এমন আর নেই।ভানুমতীর পৃথিবী কতটুকু জানিতে বড় ইচ্ছা হইল। বলিলাম- ভানুমতী, কখনো কোনো শহর দেখেছ?– না বাবুজী।– দু-একটা শহরের নাম বল তো?– গয়া, মুঙ্গের, পাটনা।– কল্কাতার নাম শোন নি?– হাঁ বাবুজী।– কোনদিকে জান?– কি জানি বাবুজী।-আমরা যে দেশে বাস করি তার নাম জান?– আমরা গয়া জেলায় বাস করি।– ভারতবর্ষের নাম শুনেছ?ভানুমতী মাথা নাড়িয়া জানাইল সে শোনে নাই। কখনো কোথায় যায় নাই চক্মকিটোলা ছাড়িয়া। ভারতবর্ষ কোন্দিকে?একটু পরে বলিল- আমার জ্যাঠামশায় একটা মহিষ এনেছিলেন, সেটা এবেলা তিন সের, ওবেলা তিন সের দুধ দিত। তখন আমাদের এর চেয়ে ভালো অবস্থা ছিল বাবুজী, তখন যদি আপনি আসতেন, আপনাকে রোজ খোয়া খাওয়াতাম। জ্যাঠামশায় নিজের হাতে খোয়া তৈরি করতেন। কি মিষ্টি খোয়া! এখন তেমন দুধই হয় না তার খোয়া। তখন আমাদের খাতিরও ছিল খুব।পরে হাতখানি একবার তুলিয়া চারিদিকে ঘুরাইয়া গর্বের সহিত বলিল- জানেন বাবুজী, এই সমস্ত দেশ আমাদের রাজ্য ছিল! সারা পৃথিবীটা। বনে যে গোঁড় দেখেন, সাঁওতাল দেখেন ওরা আমাদের জাত নয়। আমরা রাজগোঁড়। আমাদের প্রজা ওরা, আমাদের রাজা বলে মানে।উহার কথায় দুঃখও হইল, হাসিও পাইল। মহাজনে দেনার দায়ে দুইবেলা যাহাদের মহিষ ধরিয়া লইয়া যায়, সেও রাজবংশের গর্ব করিতে ছাড়ে না।বলিলাম- আমি জানি ভানুমতী তোমাদের কত বড় বংশ-ভানুমতী বলিল- তারপর শুনুন বাবুজী, আমাদের সেই মহিষটা বাঘে নিয়ে গেল। জ্যাঠামশায় যে মহিষটা এনেছিলেন।– কি করে?– জ্যাঠামশায় ওই পাহাড়ের নিচে চরাতে নিয়ে গিয়ে একটা গাছতলায় বসে ছিলেন, সেখানে বাঘে ধরল।বলিলাম- তুমি বাঘ দেখেছ কখনো?ভানুমতী কালো জোড়া-ভুরু দুটি আশ্চর্য হইবার ভঙ্গিতে উপরের দিকে তুলিয়া বলিল- বাঘ দেখি নি বাবুজী! শীতকালে আস্বেন চক্মকিটোলায়-বাড়ির উঠোন থেকে গোরু বাছুর ধরে নিয়ে যায় বাঘে-বলিয়াই সে ডাকিল-নিছনি, নিছনি-শোন-ছোট বোন আসিলে বলিল-নিছনি, বাবুজীকে শুনিয়ে দে তো আর-বছর শীতকালে বাঘ রোজ রাতে আমাদের উঠোনে এসে কি করে বেড়াত। জগরু একদিন ফাঁদ পেতেছিল। ধরা পড়ল না।পরে হঠাৎ বলিল- ভালো কথা, বাবুজী, একখানা চিঠি পড়ে দেবেন? কোথা থেকে একখানা চিঠি এসেছিল, কে পড়বে, এমনি তোলা রয়েছে। যা নিছনি, চিঠিখানা নিয়ে আয়, আর জগরু-কাকাকেও ডেকে নিয়ে আয়-নিছনি চিঠি পাইল না। তখন ভানুমতী নিজে গিয়া অনেক খুঁজিয়া সেখানা বাহির করিয়া আমার হাতে আনিয়া দিল।বলিলাম- কবে এসেছে এখানা?ভানুমতী বলিল- মাস ছ-সাত হবে বাবুজী- তুলে রেখে দিইছি, আপনি এলে পড়াবো। আমরা তো কেউ পড়তে পারি নে। ও নিছনি, জগরু-কাকাকে ডেকে নিয়ে আয়। চিঠি পড়া হবে- সবাইকে ডাক দে।ছ-সাত মাস পূর্বের পুরোনো অপঠিত পত্রখানা আমি যুগলপ্রসাদের উনুনের আলোয় পড়িতে বসিলাম- আমার চারিধারে বাড়িসুদ্ধ লোক ঘিরিয়া বসিল চিঠি শুনিবার জন্য। চিঠিখানা কায়েথী-হিন্দিতে লেখা- রাজা দোবরু পান্নার নামে চিঠি। পাটনার জনৈক মহাজন রাজা দোবরুকে জিজ্ঞাসা করিয়া পাঠাইয়াছে, এখানে বিড়িপাতার জঙ্গল আছে কিনা- থাকিলে কি দরে ইজারা বিলি হয়।এ পত্রের সঙ্গে ইহাদের কোনো সম্পর্ক নাই- ইহাদের অধীনে কোনো বিড়িপাতার জঙ্গল নাই। রাজা দোবরু, নামে রাজা ছিলেন, চক্মকিটোলার নিজ বসতবাটির বাহিরে তাঁর যে কোথাও এক ছটাক জমিও নাই একথা পাটনার উক্ত পত্রলেখক মহাজন জানিলে ডাকমাসুল খরচ করিয়া বৃথা পত্র দিত না নিশ্চয়ই।একটু দূরে দাওয়ার ও-পাশে যুগলপ্রসাদ রান্না করিতেছে। তাহার কাঠের উনুনের আলোয় দাওয়ার খানিকটা আলো হইয়াছে। এদিকে দাওয়ার অর্ধেকটায় জ্যোৎস্না পড়িয়াছে, যদিও কৃষ্ণপক্ষের আজ মোটে তৃতীয়া- ধন্ঝরি পাহাড়ের আড়াল কাটাইয়া এই কিছুক্ষণ মাত্র চাঁদ ফাঁকা আকাশে দৃশ্যমান হইয়াছে। সামনে কিছুদূরে অর্ধচন্দ্রাকৃতি পাহাড়শ্রেণী- চক্মকিটোলার বস্তির ছেলেপুলেদের কথা ও কলরব শোনা যাইতেছে। … কি সুন্দর ও অপূর্ব মনে হইতেছিল এই বন্য গ্রামে যাপিত এই রাত্রিটি। ভানুমতীর তুচ্ছ ও সাধারণ গল্পও কি আনন্দই দিতেছিল! সেদিন বলভদ্রের মুখে শোনা সেই উন্নতি করিবার কথা মনে পড়িল।মানুষে কি চায়- উন্নতি, না আনন্দ? উন্নতি করিয়া কি হইবে যদি তাহাতে আনন্দ না থাকে? আমি এমন কত লোকের কথা জানি, যাহারা জীবনে উন্নতি করিয়াছে বটে, কিন্তু আনন্দকে হারাইয়াছে। অতিরিক্ত ভোগে মনোবৃত্তির ধার ক্ষইয়া ক্ষইয়া ভোঁতা- এখন আর কিছুতেই তেমন আনন্দ পায় না, জীবন তাহাদের নিকট একঘেয়ে, একরঙা, অর্থহীন। মন শান-বাঁধানো-রস ঢুকিতে পায় না।এখানেই যদি থাকিতে পারিতাম! ভানুমতীকে বিবাহ করিতাম। এই মাটির ঘরের জ্যোৎস্না-ওঠা দাওয়ায় সরলা বন্যবালা রাঁধিতে রাঁধিতে এমনি করিয়া ছেলেমানুষি গল্প করিত- আমি বসিয়া বসিয়া শুনিতাম। আর শুনিতাম বেশি রাত্রে ওই বনে হুড়ালের ডাক, বনমোরগের ডাক, বন্য হস্তীর বৃংহিত, হায়েনার হাসি। ভানুমতী কালো বটে, কিন্তু এমন নিটোল স্বাস্থ্যবতী মেয়ে বাংলা দেশে পাওয়া যায় না। আর ওর ওই সতেজ সরল মন! দয়া আছে, মায়া আছে, স্নেহ আছে,-তার কত প্রমাণ পাইয়াছি।… ভাবিতেও বেশ লাগে। কি সুন্দর স্বপ্ন! কি হইবে উন্নতি করিয়া? বলভদ্র সেঙ্গাৎ গিয়া উন্নতি করুক। রাসবিহারী সিং উন্নতি করুক।যুগলপ্রসাদ জিজ্ঞাসা করিল, রান্না হইয়াছে, চৌকা লাগাইবে কি না। ভানুমতীদের বাড়িতে আতিথ্যের কোনো ত্রুটি হয় না। এদেশে আনাজ মেলে না, তবুও কোথা হইত জগরু বেগুন ও আলু আনিয়াছে। মাষকলাইয়ের ডাল, পাখির মাংস, বাড়িতে তৈরি অতি উৎকৃষ্ট টাটকা ভয়সা ঘি, দুধ। যুগলপ্রসাদের হাতের রান্নাও চমৎকার।ভানুমতী, জগরু, জগরুর দাদা, নিছনি-সবাই আজ আমাদের এখানে খাইবে-আমি খাইতে বলিয়াছি। কারণ এমন রান্না উহারা কখনো খাইতে পায় না। বলিলাম-একটু দূরে উহারাও একসঙ্গে সবাই বসুক। যুগলপ্রসাদের দেওয়ারও সুবিধা হইবে। একত্র খাওয়া যাক।ওরা রাজি হইল না। আমাদের আগে না খাওয়া হইলে উহারা খাইবে না।পরদিন আসিবার সময় ভানুমতী এক কাণ্ড করিল।হঠাৎ আমার হাত ধরিয়া বলিল- আজ যেতে দেব না বাবুজী-আমি অবাক হইয়া উহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিলাম। কষ্ট হইল।উহার অনুরোধ সকালে রওনা হইতে পারিলাম না- দুপুরের আহারাদির পরে বিদায় লইলাম।আবার দুধারে ছায়ানিবিড় বনপথ। পথের ধারে কোথাও রাজকুমারী ভানুমতী যেন দাঁড়াইয়া আছে- বালিকা নয়, যুবতী ভানুমতী-তাহাকে আমি কখনো দেখি নাই। তার সাগ্রহ দৃষ্টি তার প্রণয়ীর আগমন-পথের দিকে নিবদ্ধ-হয়তো সে পাহাড়ের ওপারের বনে শিকারে গিয়াছে, আসিবার দেরি নাই। তরুণীকে মনে মনে আশীর্বাদ করিলাম। ধন্ঝরি পাহাড়ের জোনাকি-জ্বলা নিস্তব্ধ প্রাচীন ছাতিম ফুলের বন ও অপূর্ব দূরছন্দা সন্ধ্যার আড়ালে বনবালার গোপন অভিসার সার্থক হউক।মহালে ফিরিয়া সপ্তাহখানেকের মধ্যেই সকলের নিকট বিদায় লইয়া লবটুলিয়া ত্যাগ করিলাম।আসিবার সময় রাজু পাঁড়ে, গনোরী, যুগলপ্রসাদ, আস্রফি টিণ্ডেল প্রভৃতি পালকির চারিধারে ঘিরিয়া পালকির সঙ্গে সঙ্গে লবটুলিয়ার সীমানার নূতন বস্তি মহারাজটোলা পর্যন্ত আসিল। মটুকনাথ সংস্কৃতে স্বস্তিবাচন উচ্চারণ করিয়া আমায় আশীর্বাদ করিল। রাজু বলিল- হুজুর, আপনি চলে গেলে লবটুলিয়া উদাস হয়ে যাবে।প্রসঙ্গক্রমে বলি এদেশে ‘উদাস’ শব্দের ব্যবহার এবং উহার অর্থের ব্যাপকতা অত্যন্ত বেশি। মকাই-ভাজা খাইতে খারাপ লাগিলে বলে, ‘ভাজা উদাস লাগছে।’ আমার সম্পর্কে কি অর্থে উহা ব্যবহৃত হইল ঠিক বলিতে পারিব না।আমার বিদায় লইয়া আসিবার সময় একটি মেয়ে কাঁদিয়াছিল। আজ সকাল হইতে আসিয়া সে কাছারির উঠানে দাঁড়াইয়া ছিল- আমার পালকি যখন তোলা হইল, তখন চাহিয়া দেখি সে হাপুস-নয়নে কাঁদিতেছে। মেয়েটি কুন্তা।নিরাশ্রয়া কুন্তাকে জমি দিয়া বসবাস করাইয়াছি, আমার ম্যানেজারি জীবনের ইহা একটি সৎকাজ। পারিলাম না কিছু করিতে সেই বালিকা মঞ্চীর। অভাগিনীকে কে কোথায় যে ভুলাইয়া লইয়া গেল! – আজ সে যদি থাকিত তাহার নিজের নামে জমি দিতাম বিনা সেলামিতে।নাঢ়া-বইহারের সীমানায় নক্ছেদীর ঘর দেখিয়াই আরো কথা মনে পড়িল। সুরতিয়া ঘরের বাহিরে কি করিতেছিল, আমার পালকি দেখিয়াই বলিয়া উঠিল-বাবুজী, বাবুজী, একটু রাখুন-পরে সে ছুটিয়া আসিয়া পালকির কাছে দাঁড়াইল। ছনিয়াও আসিল পিছু-পিছু।– বাবুজী, কোথায় যাচ্ছেন?– ভাগলপুরে। তোর বাবা কোথায়?– ঝল্লুটোলায় গমের বীজ আনতে গিয়েছে। কবে আসবেন?– আর আসব না।– ইস! মিথ্যে কথা! …নাঢ়া-বইহারের সীমানা পার হইয়া পালকি হইতে মুখ বাড়াইয়া একবার পিছন ফিরিয়া চাহিয়া দেখিলাম।বহু বস্তি, চালে চালে বসত, লোকজনের কথাবার্তা, বালকবালিকার কলহাস্য, চিৎকার, গোরু-মহিষ, ফসলের গোলা। ঘন বন কাটিয়া আমিই এই হাস্যদীপ্ত শস্যপূর্ণ জনপদ বসাইয়াছি ছয়-সাত বৎসরের মধ্যে। সবাই কাল তাহাই বলিতেছিল- বাবুজী, আপনার কাজ দেখে আমরা পর্যন্ত অবাক হয়ে গিয়েছি, নাঢ়া লবটুলিয়া কি ছিল আর কি হয়েছে!কথাটা আমিও ভাবিতে ভাবিতে চলিয়াছি। নাঢ়া লবটুলিয়া কি ছিল আর কি হইয়াছে!দিগন্তলীন মহালিখারূপের পাহাড় ও মোহনপুরা অরণ্যানীর উদ্দেশে দূর হইতে নমস্কার করিলাম।হে অরণ্যানীর আদিম দেবতারা, ক্ষমা করিও আমায়। বিদায়! …বহুকাল কাটিয়া গিয়াছে তারপর- পনের-ষোল বছর।বাদামগাছের তলায় বসিয়া এইসব ভাবিতেছিলাম।বেলা একেবারে পড়িয়া আসিয়াছে। …বিস্মৃতপ্রায় অতীতের যে নাঢ়া ও লবটুলিয়ার আরণ্য-প্রান্তর আমার হাতেই নষ্ট হইয়াছিল, সরস্বতী হ্রদের যে অপূর্ব বনানী, তাহাদের স্মৃতি স্বপ্নের মতো আসিয়া মাঝে মাঝে মনকে উদাস করে। সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়, কেমন আছে কুন্তা, কত বড় হইয়া উঠিয়াছে সুরতিয়া, মটুকনাথের টোল আজও আছে কি না, ভানুমতী তাহাদের সেই শৈলবেষ্টিত আরণ্যভূমিতে কি করিতেছে, রাখালবাবুর স্ত্রী, ধ্রুবা, গিরধারীলাল, কে জানে এতকাল পরে কে কেমন অবস্থায় আছে। …আর মনে হয় মাঝে মাঝে মঞ্চীর কথা। অনুতপ্তা মঞ্চী কি আবার স্বামীর কাছে ফিরিয়াছে, না আসামের চা-বাগানে চায়ের পাতা তুলিতেছে আজও।কতকাল তাহাদের আর খবর রাখি না।মানুষের বসতির পাশে কোথাও নিবিড় অরণ্য নাই। অরণ্য আছে দূর দেশে, যেখানে পতিত-পক্ব জম্বুফলের গন্ধে গোদাবরী-তীরের বাতাস ভারাক্রান্ত হইয়া ওঠে, ‘আরণ্যক’ সেই কল্পনালোকের বিবরণ। ইহা ভ্রমণবৃত্তান্ত বা ডায়েরি নহে-উপন্যাস। অভিধানে লেখে ‘উপন্যাস’ মানে বানানো গল্প। অভিধানকার পণ্ডিতদের কথা আমরা মানিয়া লইতে বাধ্য। তবে ‘আরণ্যক’-এর পটভূমি সম্পূর্ণ কাল্পনিক নয়। কুশী নদীর অপর পারে এরূপ দিগন্ত-বিস্তীর্ণ অরণ্যপ্রান্তর পূর্বে ছিল, এখনো আছে। দক্ষিণ ভাগলপুর ও গয়া জেলার বন পাহাড় তো বিখ্যাত।(সমাপ্ত)
দরদর করে ঘামছে ফাহিমা। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়ার উপক্রম। কপালের বিন্দু বিন্দু ঘাম হাতের তালু দিয়ে মুছে শীর্ণ পায়ে হেঁটে একটা চেয়ার টেনে বসতেই তার হাত থেকে লাঠি পড়ে মেঝেতে মৃদু শব্দ তুলল। লাঠি তোলার আগ্রহ কিংবা শক্তি কোনোটাই পেল না সে, চেয়ারে ভার ছেড়ে দিয়ে চোখ বুজল।ফাহিমার অত্যন্ত দক্ষ হাত, শক্তিশালী বাহু। পুরুষের মতো উচ্চতা তার। জিজ্ঞাসাবাদের দায়িত্ব পালনে সে শতভাগ সফল। আসামির মুখ থেকে কথা বের করতে যেকোনো কিছু করতে বদ্ধপরিকর সে। বড় বড় রাঘব বোয়ালরাও তার সামনে টিকতে পারে না। অপরাধীরা তার হাত থেকে বাঁচার জন্য ভেতরের সব কথা উগড়ে দেয়নি এমন ঘটনা কখনো ঘটেনি। অথচ আজ পাঁচদিন দিন যাবৎ এক অল্প বয়সী মেয়ে তার হেফাজতে থাকা সত্ত্বেও মুখ দিয়ে টু শব্দটিও করেনি। শারীরিক, মানসিক-কোনো নির্যাতন বাকি রাখা হয়নি তবুও তার আর্তনাদ কেউ শুনতে পায়নি! যেন একটা পাথরকে লাগাতার পেটানো হচ্ছে, যার জীবন নেই, ব্যথা নেই; একটি জড়বস্তু মাত্র! এই পাথরের রক্ত ঝরে, কিন্তু জবান খোলে না।ফাহিমা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চাপা আক্রোশ নিয়ে মেয়েটিকে শাসাল, ‘শেষবারের মতো বলছি, মুখ খোল।’মেয়েটি তার থেকে দুই হাত দূরে চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় ঝিমুচ্ছে। এক মিনিট… দুই মিনিট করে দশ মিনিট পার হয়ে গেল কিন্তু মেয়েটির থেকে কোনো জবাব এলো না। ফাহিমা হতাশাবোধ করছে। চারপাশে থমথমে নীরবতা, মেয়েটি কি নিঃশ্বাসও নেয় না?নীরবতা ভেঙে যায় বুটের ঠকঠক শব্দে। উপস্থিত হয় ইন্সপেক্টর তুষার। তাকে দেখেই ফাহিমা উঠে দাঁড়ায়, স্যালুট করে।তুষার পেশাদারী কণ্ঠে প্রশ্ন করে, ‘কী অবস্থা?’ফাহিমা নিজের ব্যর্থতা প্রকাশ করার সঙ্গে চারদিনের বর্ণনা দেয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। তুষার বহুদর্শী চোখে মেয়েটিকে দেখল তার চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে ফাহিমাকে বলল, ‘আপনি আসুন।’রিমান্ডে আসামিকে বিভিন্ন নির্যাতনের মাধ্যমে জিজ্ঞাসাবাদ করার ব্যাপারটা ফাহিমার কাছে ভীষণ উপভোগ্য। কিন্তু এই প্রথম সে কোনো দায়িত্ব থেকে পালাতে চাচ্ছে। ফাহিমা হাঁফ ছেড়ে বেরিয়ে যায়।তুষার একটি চেয়ার টেনে মেয়েটির সম্মুখ বরাবর বসে। ঠান্ডা গলায় বলে, ‘আজই আমাদের প্রথম দেখা।’সামনের মানুষটা যেভাবে ছিল সেভাবেই রইল। কিছু বলল না, তাকালও না।তুষার বলল, ‘মা-বাবাকে মনে পড়ে?’মা-বাবা শব্দ দুটি যেন নিস্তব্ধ তীড়ে সমুদ্রের ঢেউ নিয়ে আসে। মেয়েটি নড়ে উঠে, চোখ তুলে তাকায়। তার অপূর্ব গায়ের রং, ঘোলাটে চোখ। কাটা ঠোঁট থেকে রক্ত ঝরছে। চোখের চারপাশে গাঢ় কালো দাগ। এ নতুন নয়, মুখের এমন দশা রিমান্ডে আসা সব আসামিরই হয়।তুষার মুখের প্রকাশভঙ্গী আগের অবস্থানে রেখে পুনরায় প্রশ্ন করল, ‘মা-বাবাকে মনে পড়ে?’মেয়েটি বাধ্যের মতো মাথা নাড়ায়। মনে পড়ে। তুষার কিছুটা ঝুঁকে এলো।মেয়েটির দৃষ্টিজুড়ে নীলচে যন্ত্রণা। তুষার তার হাতের বাঁধন খুলে দিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে প্রশ্ন ছুঁড়ল, ‘নাম কী?’মেয়েটির নাম সহ খুঁটিনাটি সবই জানে তুষার, তবুও জিজ্ঞাসা করল। তার মনে হচ্ছে, অপর পক্ষ থেকে উত্তর আসবে।তার ধারণাকে সত্য প্রমাণ করতে ভারাক্রান্ত কণ্ঠে মেয়েটি নিজের নাম উচ্চারণ করল, ‘পদ্ম…আমি…আমি পদ্মজা।’পদ্মজা চৈতন্য হারিয়ে হেলে পড়ে তুষারের ওপর। তুষার দ্রুত তাকে বাহুডোরে আটকে ফেলল। উঁচু কণ্ঠে ফাহিমাকে ডাকল, ‘ফাহিমা, দ্রুত আসুন।’.১৯৮৯ সাল।সকাল সকাল রশিদ ঘটকের আগমনে হেমলতা বিরক্ত হোন। তিনি বহুবার পইপই করে বলেছেন, ‘পদ্মর বিয়ে আমি এখনি দেব না। পদ্মকে অনেক পড়াব।’তবুও রশিদউদ্দিন প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন প্রস্তাব নিয়ে আসে। হেমলতার কথা হচ্ছে, মেয়ের বয়স আর কতই হলো? মাত্র ষোল। শামসুল আলমের মেয়ের বিয়ে হয়েছে চব্বিশ বছর বয়সে। পদ্মর বিয়েও তখনি হবে, ওর পছন্দমতো।হেমলতা রশিদকে দেখেও না দেখার ভান ধরে মুরগির খোয়াড়ের দরজা খুলে দিলেন। রশিদ এক দলা থুথু উঠানে ফেলে হেমলতার উদ্দেশ্যে বলল, ‘বুঝছ পদ্মর মা, এইবার যে পাত্র আনছি এক্কেরে খাঁটি হীরা।’হেমলতা বিরক্ত ভরা কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘আমি কি আমার মেয়ের জন্য আপনার কাছে পাত্র চেয়েছি? তবুও বার বার কেন এসে বিরক্ত করেন?রশিদউদ্দিন হার মানার লোক নয়, সে হেমলতাকে বুঝানোর চেষ্টা করল, যুবতী মাইয়া ঘরে রাহন ভালা না। কখন কী হইয়া যাইব টের পাইবা না।’‘মেয়েটা তো আমার। আমাকেই বুঝতে দেন?’ রশিদউদ্দিনের উপস্থিতি যে তিনি নিতে পারছেন না তা স্পষ্ট। তবুও রশিদ নির্লজ্জের মতো নানা কথায় তাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করল কিন্তু সুবিধা করতে পারল না। ব্যর্থ থমথমে মুখ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।প্রতিদিন কোনো না কোনো পাত্রপক্ষ এসে হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে বলবে, ‘মোর্শেদের বড় ছেড়িডারে চাই।’সব পাত্র যদি এই এক মেয়েকেই চায় তাহলে তার কী করার? তাকেও তো টাকাপয়সা কামাতে হবে!রশিদ গজগজ করতে করতে আওড়ায়, ‘গেরামে কি আর ছেড়ি নাই? একটা ছেড়িরেই ক্যান সবার চোক্ষে পড়তে হইব?’ কথা শেষ করেই সে এ দলা থুতু ফেলল সড়কে।রোদ উঠতে না উঠতেই মেঘে মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ, কিছুক্ষণের মধ্যে বৃষ্টি হবে। বছরের এই সময়ে এভাবেই রোদ-বৃষ্টির খেলা চলে। বর্ষায় একদম স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে না পূর্ণার। শুধু মারের ভয়ে যেতে হয়। সে মুখ কালো করে স্কুলের জামা পরে পদ্মজাকে ডাকল, ‘আপা? এই আপা? স্কুলে যাবা না? আপারে।’পদ্মজা পিটপিট করে চোখ খুলে কোনোমতে বলল, ‘না। যাব না।’ পর পরই চোখ বুজে তলিয়ে গেল গভীর ঘুমে। পূর্ণা নিরাশ হয়ে হেমলতার ঘরে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আম্মা, আপা কি স্কুলে যাইব না?’হেমলতা বিছানা ঝাড়ছিলেন। হাত থামিয়ে পূর্ণার দিকে কড়াচোখে তাকিয়ে বললেন, ‘যাইব কি? যাবে বলবি। বল, যাবে।’পূর্ণা মাথা নত করে বলল, ‘যাবে।’হেমলতা বললেন, ‘তোদের পড়াশোনা করাচ্ছি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলার জন্য নয়। বইয়ের ভাষায় কথা বলবি।’ পূর্ণা মাথা নত করে রেখেছে। তা দেখে হেমলতা সন্তুষ্ট হোন। তার মেয়েগুলো মায়ের খুবই অনুগত।তিনি পুনরায় বিছানা ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, পদ্মর শরীর ভালো না। সারারাত পেটে ব্যাথায় কেঁদেছে। থাকুক, আজ ঘুমাক।’পূর্ণার সদ্য পা দেয়া কিশোরী মন চট করে বুঝে যায় পদ্মজা কীসের ব্যাথায় কেঁদেছে। সে গতকাল রাতে নানাবাড়ি ছিল বলে জানত না। ভোরেই চলে এসেছে। নানাবাড়ি কাছে, হেঁটে যেতে পাঁচ মিনিটও লাগে না।পূর্ণাকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হেমলতা বললেন, ‘তুই যা। মাথা নিচু করে যাবি মাথা নিচু করে আসবি। কোনো অভিযোগ যেন না শুনি।’‘আচ্ছা আম্মা।’পূর্ণা ঘরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে। সবাই বলে তার চুল নাকি খুব সুন্দর। কিন্তু সে নিজেকে পুরোটাই সুন্দর মনে করে। গায়ের রং কালো হতে পারে তবে সে কখনোই সেজন্য নিজেকে অসুন্দরভাবে না। পূর্ণার ইদানীং খুব সাজতে ইচ্ছে করে। কিন্তু হেমলতা সাজগোজ পছন্দ করেন না। তাই সে সতর্ক দৃষ্টিতে মায়ের উপস্থিতি একবার দেখে নিলো। আশপাশে নেই! পূর্ণা দ্রুত গত মাসে মেলা থেকে আনা লাল লিপস্টিক গাঢ় করে ঠোঁটে মাখল। এখন হেমলতা দেখার আগে এক ছুটে বেরিয়ে যাবে।ঘড়ির কাঁটায় সকাল দশটা বাজল। এখনো পদ্মজা ওঠেনি। হেমলতা শব্দহীন পায়ে মেয়েদের ঘরে প্রবেশ করেন। বিশাল বড় বিছানায় পদ্মজা দুই হাত ভাঁজ করে ঘুমাচ্ছে। জানালার পর্দা ভেদ করে আসা আলতো পেলব রোদ্দুরের স্পর্শে পদ্মজার মসৃণ পাতলা ঠোঁট, ফরসা ত্বক চিকচিক করছে। হেমলতা বিসমিল্লাহ বলে দ্রুত পদ্মজার গায়ে তিনবার ফুঁ দিলেন। গুরুজনরা বলে, মায়ের নজর ভালো না। এতে সন্তানের ক্ষতি হয়। তাই সঙ্গে সঙ্গে নজর কাটাতে বিসমিল্লাহ বলে ফুঁ দিয়ে দিলেনহেমলতার মায়া লাগছে পদ্মজার ঘুম ভাঙাতে।তবুও আদুরে গলায় ডাকলেন, ‘পদ্ম। এই পদ্ম।’পদ্মজা চোখ খুলে মাকে দেখে হুড়মুড়িয়ে উঠে বসে। যেদিন ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয় সেদিনই তাকে হেমলতা ডেকে তুলেন। পদ্মজা অপরাধী কণ্ঠে প্রশ্ন করল, ‘বেশি দেরি হয়ে গেছে আম্মা?’হেমলতা হেসে বললেন, ‘না, মুখ ধুয়ে খেতে আয়।’পদ্মজা দ্রুত কলপাড়ে গিয়ে দাঁত মেজে মুখ ধুয়ে নিল। হেমলতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। তার বাবা ছিল হাই স্কুলের শিক্ষক। তাই তার মধ্যে নিয়ম-নীতির প্রভাব বেশি। মেয়েদের শক্তপোক্ত নিয়মে বড় করছেন। নিয়মের মধ্যে সবকিছু হওয়া চাই।পদ্মজা রান্নাঘরে ঢুকে দেখে স্টিলের প্লেটে খাবার সাজানো। হেমলতা রান্নাঘরে ঢুকতেই পদ্মজা দ্রুত ওড়না দিয়ে মাথা ঢেকে নিল।এটি হেমলতার দেওয়া আরেকটি আদেশ, খাওয়ার সময় মাথা ঢেকে খেতে হবে। পদ্মজা খেতে বসতেই হেমলতা মেয়েকে সরল কণ্ঠে বললেন, মুখ ধুতে গিয়ে চুল ভিজিয়ে এসেছিস। খেয়ে রোদে বসে চুলটা শুকিয়ে নিস।’‘আচ্ছা আম্মা।’ পরক্ষণেই বলল, ‘আম্মা, পূর্ণা, প্রেমা আসেনি?’‘পূর্ণা স্কুলে। প্রেমা দুপুরে আসবে।’‘আর আব্বা…আব্বা কবে আসবেন?’ মিনমিন করে বলল পদ্মজা।এই প্রশ্নে হেমলতা থমকে দাঁড়ালেন। শুকনো গলায় জবাব দিলেন, ‘খাওয়ার সময় কথা বলতে নেই।পদ্মজার চোখ দুটি জ্বলতে শুরু করে। তার জীবনে জন্মদাতা আছে কিন্তু জন্মদাতার আদর নেই। সে জানে না তার দোষটা কোথায়? কেন নিজের বাবা বাকি বোনদের আদর করলেও তাকে করে না? কথা অবধিও বলেন না। পদ্মজা বহুবার হেমলতাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আমি কি তোমাদের সত্যিকারের মেয়ে আম্মা? নাকি সন্তান হয় না বলে কি দত্তক এনেছিলে? আব্বা কেন আমাকে এত অবহেলা করে? ও আম্মা…আম্মা বলো না?’হেমলতা নিশ্চুপ থেকে অনেকক্ষণ পর জবাব দেন, ‘তুই আমার গর্ভের সন্তান। আর তোর বাবারই মেয়ে। এখন যা, পড়তে বস। অনেক পড়তে হবে তোর।’ব্যাস এইটুকুই! যতবার প্রশ্ন করেছে একই উত্তর পেয়েছে। কখনো কোনো শব্দের নড়চড় হয়নি।‘এত কী ভাবছিস? তাড়াতাড়ি খেয়ে উঠ।’হেমলতার কথায় পদ্মজার ভাবনার সুতো ছিঁড়ে গেল। সে দ্রুত খাওয়া শেষ করে। হঠাৎ তার মনে পড়ে, আজ বড়ই আচার বানানোর কথা ছিল।সন্ধ্যার পরপরই বিদ্যুৎ চলে যায়। কয়েক মাস হলো গ্রামে বিদ্যুৎ এসেছে। আট গ্রাম মিলিয়ে অলন্দপুর। তাদের গ্রামের নাম আটপাড়া। প্রতিদিন নিয়ম করে সন্ধ্যারাত থেকে তিন ঘণ্টা অন্ধকারে তলিয়ে থাকে গ্রাম। সারাদিন তো বিদ্যুৎ এর নামগন্ধও থাকে না। তাহলে বিদ্যুৎ দিয়ে লাভটা কী হলো? পদ্মজা, পূর্ণা, প্রেমা তিন বোন একসঙ্গে পড়তে বসে। হঠাৎ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হতেই মোড়ল বাড়ি অন্ধকারে তলিয়ে যায়। নয় বছরের প্রেমা খামচে ধরে পদ্মজার ওড়না। পদ্মজা মৃদু স্বরে ডাকল, ‘আম্মা…আম্মা।’হেমলতা ভেতরের ঘর থেকে বললেন, ‘টর্চ নিয়ে যা।’হেমলতার ডাকে পদ্মজা উঠে দাঁড়ায়। প্রেমা অন্ধকার খুব ভয় পায়। বড় বোনের ওড়না ছেড়ে পূর্ণার হাত চেপে ধরে। টর্চ নিয়ে ঘরে ঢোকার মুহূর্তে পদ্মজা গেইট খোলার আওয়াজ পায়। উঁকি দিয়ে দেখে হানিফ এসেছে। লোকটা সম্পর্কে তার সৎ মামা। হানিফকে দেখেই সে দৌড়ে ঘরে ঢুকে পড়ে।হানিফ চেঁচিয়ে বলে, ‘বুবু, বাড়ি আন্ধার ক্যান! বাত্তি-টাত্তি জ্বালাও।’‘হানিফ নাকি?’ হেমলতা হারিকেন হাতে বারান্দায় এসে দাঁড়ান। হানিফ দাঁত বের করে হাসল। বলল, ‘হ, আমি।’‘আয়, ভেতরে আয়।’হানিফ বারান্দা পেরিয়ে বড় ঘরে ঢুকে বলল, ‘তোমার ছেড়িগুলা কই?’‘ঘরেই আছে, পড়াশোনা করে।’‘এই আন্ধারেও পড়ে!’ অবাক হয়ে বলল হানিফ।হেমলতা কিছু বললেন না। হানিফ এই বাড়িতে আসলে কোনো কারণ ছাড়াই অস্বস্তি হয় তারতিনি প্রসঙ্গ এড়াতে বললেন, ‘ওদের খাওয়ার সময় হয়েছে। তুইও খেয়ে নে।‘এইহানেই খামু? না তোমার সরাইখানাত যাইতে হইব?’তার উচ্চারিত শেষ বাক্যে রসিকতা ছিল। গ্রামে থেকেও হেমলতা খাবারের জন্য আলাদা ঘর রেখেছে সেটা হানিফের কাছে রসিকতাই বটে!হেমলতার স্বাভাবিক সুরে বললেন, ‘খেতে চাইলে খেতে আয়।’পদ্মজা কিছুতেই রাতের খাবার খেতে আসল না। কেমন জড়োসড়ো হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, হানিফকে ভয় পাচ্ছে বা কোনো কারণে অবহেলা করছে। হানিফ ছয় বছর সৌদিতে ছিল। তিন মাস হলো দেশে ফিরেছে। তিন মাসে যতবার হানিফ এই বাড়িতে পা রেখেছে ততবারই পদ্মজা অজুহাত দিয়ে দূরে দূরে থেকেছে। হেমলতার বিচক্ষণ, সন্দেহবাতিক মস্তিষ্ক মুহূর্তে ভেবে নিল অনেক কিছু। আজই এই লুকোচুরির ফয়সালা করবেন তিনি। হানিফ পদ্মজাকে দেখার জন্য অনেক ছলচাতুরী করেও সুযোগ পেল না। বিদ্যুৎ আসার ঘণ্টাখানেক পর হানিফ চলে যায়। পূর্ণা, প্রেমা ঘরে ঢুকতেই পদ্মজা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের ওপর। রুদ্ধশ্বাস কণ্ঠে বলে, ‘কতবার না করেছি? লোকটার পাশে বেশিক্ষণ না থাকতে? তোরা কেনো শুনিস না আমার কথা?’পূর্ণা, প্রেমা বিস্ময়ে হতবিহ্বল। পদ্মজা কখনো কিছু নিয়ে এভাবে নিষেধ করে না। তাহলে এখন কেন এমন করছে? হেমলতা রুমে ঢুকতেই পদ্মজা চুপসে গেল।‘পদ্ম আমার ঘরে আয়।’মায়ের এমন কাঠকাঠ আদেশ শুনে পদ্মজার কলিজা শুকিয়ে একটুখানি হয়ে যায়। পূর্ণা-প্রেমা নিজেদের মধ্যে চাওয়াচাওয়ি করে। পদ্মজা ধুকধুকানি হৃদস্পন্দর নিয়ে হেমলতার ঘরের দিকে গেল।হেমলতা মেয়ের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে আছেন। পদ্মজা পায়ের আঙুল খিঁচে দাঁড়িয়ে আছে! সুন্দরীরা ভীতু আর বোকা হয় তার দৃষ্টান্ত প্ৰমাণ পদ্মজা। তাকে ছাড়া পদ্মজা কীভাবে চলবে?পদ্মজার সঙ্গে উঁচুকণ্ঠে কথা বলতে হেমলতার খুব মায়া হয়। কিন্তু আজ বলতেই হবে। আবেগ লুকিয়ে তিনি বজ্রকণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, ‘কী লুকোচ্ছিস আমার থেকে? হানিফ কী করেছে?’পদ্মজা ফোঁপাতে থাকে। হেমলতা সেকেন্ড কয়েক সময় নিয়ে নিজেকে সামলে নিলেন। কণ্ঠ নরম করে বললেন, ‘হানিফ ধড়িবাজ লোক! সৎ ভাই বলে বলছি না। আমি জানি সে কতটা খারাপ। তার ব্যাপারে যেকোনো কথা আমি বিশ্বাস করব। তুই আমাকে বল কী লুকোচ্ছিস? কী করেছে হানিফ?’মায়ের আদুরে কণ্ঠ শুনে পদ্মজা বাঁধ ভাঙা নদীর মতো হু হু করে কেঁদে উঠল। লুটিয়ে পড়ল মায়ের পায়ে।
বাড়িটি মোড়ল বাড়ি নামে পরিচিত। পদ্মজার দাদার নাম ছিল মিয়াফর মোড়ল। তিনি গ্রামের একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। চার পুত্রের জন্মের পর তাদের জন্য ছয় কাঠা জমির ওপর টিনের বিশাল বড় বাড়ি বানিয়েছিলেন। টগবগে দুই পুত্র ষোলো বছর আগে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নিহত হয়। ছোট ছেলে আট বছর বয়সে কলেরা রোগে মারা যায়। বাকি থাকে বড় ছেলে মোর্শেদ মোড়ল। বর্তমানে এই বাড়ির উত্তরাধিকার মোর্শেদ। যদিও তিনি সবসময় বাড়িতে থাকেন না, বাউন্ডুলে জীবন তার। স্ত্রী-সন্তানের অধীনেই এখন মোড়ল বাড়ি, তারাই বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণ করে। পুরো বাড়ির চারপাশ জুড়ে গাছগাছালি। বাড়ির পিছনে টলটলে জলের স্রোতস্বিনী। অন্ধকার গাঢ় হতেই পরিবেশ নিশুতি রাতের রূপ ধারণ করে।রাতের এই নির্জন প্রান্তর ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকে ছেয়ে গেছে। ঝিঁঝিঁ পোকার সঙ্গে পদ্মজার ভাঙা কান্না মিলেমিশে ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। মনে হচ্ছে কোনো আত্মা তার ইহজীবনের না পাওয়া কোনো বস্তুর শোকে এমন মরা সুর ধরেছে। হেমলতা পদ্মজাকে টেনে পাশে বসালেন। পদ্মজা ডান হাতের উল্টো পাশ দিয়ে চোখের জল মুছে হেমলতাকে বলতে শুরু করল, ‘মামা সৌদিতে যাওয়ার আগের দিন ওই বাড়িতে খালামণি, ভাই, আফা সবাই এসেছিল। সেদিন ঢাকা থেকে যাত্রাপালার লোকও এসেছিল তাই…’হেমলতা শিকারি পাখির মতো চেয়ে আছে। পদ্মজা কান্নার দমকে কথা বলতে পারছে না। হাত-পা কাঁপছে, তাকে ভীত দেখাচ্ছে। হেমলতা মেয়ের হাত চেপে ধরেন উৎসাহ দিতে ঠিক তখনই উঠোনে ধপ করে একটা আওয়াজ হয়। পদ্মজা কেঁপে উঠল। পূর্ণা, প্রেমা কথা শোনার জন্য দরজায় কান পেতে রেখেছিল। হুট করে কিছু পতনের আওয়াজ হওয়াতে দুজন ভয় পেয়ে দরজা ঠেলে হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। হেমলতা গোপন বৈঠক ভেঙে দ্রুত পায়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ান। উঠানে বিদ্যুৎ নেই। পিছনে তিন মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। হেমলতা গলা উঁচিয়ে খেঁকিয়ে উঠলেন, ‘কে? কে ওখানে?ভাঙা গলায় কেউ খুব কষ্টে উচ্চারণ করল, ‘আমি।’চির পরিচিত কণ্ঠটি চিনতে বিড়ম্বনা হলো না তার। তিনি দ্রুত পায়ে উঠানে ছুটে যান। গেইটের পাশে নিথরের মতো পড়ে আছে মোর্শেদ মোড়ল। তার গায়ে শীতের চাদর। হাঁপড়ের মতো উঠা-নামা করছে বুক যেন দম ফুরিয়ে যাচ্ছে। হেমলতা চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ে উদ্বেগ। তিনি দুই হাতে মোর্শেদকে আঁকড়ে ধরেন। পদ্মজা, পূর্ণা, দৌড়ে এলো সাহায্য করতে। মোর্শেদের এমফাইসিমা রোগ আছে। এই রোগে অল্প চলাফেরাতেই শ্বাসটানের উপক্রম হয় এবং দম ফুরিয়ে যায়। শ্বাস নেবার সময় গলার শিরা ভরে যায়। তিন মা-মেয়ে মোর্শেদকে ধরে ঘরে নিয়ে যায়।মোর্শেদ হুট করে বাড়ি ছাড়ে, হুট করেই বাড়ি ফেরে। কখনো কাকডাকা ভোরে, কখনো নিশুতি রাতে, কখনো কাঠফাটা রোদে তার মনে পড়ে নিজ আলয়ের কথা; ফিরে আসে ক্ষিপ্ত ঘোড়ার মতো।মোর্শেদের এমফাইসিমা রোগটা ধরা পড়ে সাত বছর আগে। তার অ্যাজমা ছিল আবার ধূমপানেও আসক্ত। ফলে ফুসফুসের এই রোগটি খুব দ্রুত আক্রমণ করে বসে।মোর্শেদ খানিকটা সুস্থ হয়ে রাত একটার দিকে ঘুমিয়ে পড়েন। পূৰ্ণা, প্রেমা ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েছে। পদ্মজা বারান্দার ঘরে ঝিম মেরে বসে আছে। তার চোখের দৃষ্টি জানালার বাইরে। জ্যোৎস্না গলে গলে পড়ছে! কি সুন্দর দৃশ্য! সেই দৃশ্যের দিকে অপলক নয়নে চেয়ে থেকে পদ্মজা ভাবছে, আম্মা এখনো আসছে না কেন?সে আজ সব বলতে চায়, হৃদয়ের ক্ষত বয়ে বেড়ানো যাচ্ছে না।কিছুক্ষণের মধ্যে দরজার পাশে এসে দাঁড়ান হেমলতা। হাতে থাকা হারিকেনের তীব্র আলোয় পদ্মজা গুটিয়ে যায়।হেমলতা হারিকেনের আগুন নিভিয়ে পদ্মজার পাশে গিয়ে বসেন। পদ্মজা সবকিছু বলার জন্য তৈরি ছিল তবুও অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে।পদ্মজা তখন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। বয়স আর কত হবে, নয় কী দশ। খুব কম বয়সেই তাকে স্কুলে পাঠানো শুরু করেছিলেন হেমলতা। হানিফের সৌদি চলে যাবার উপলক্ষ্যে রবিবারের এক সকালে নানাবাড়িতে সবার দাওয়াত পড়ে। স্কুল মাঠেও সেদিন নাচ-গান অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। দুপুরের দিকে বাড়ির সবাই সেখানে চলে যায়। বাড়িতে রয়ে যায় শুধু পদ্মজা, পদ্মজার বৃদ্ধ নানা, আর হানিফ। পদ্মজা ঘুমে ছিল তাই বাকিদের সঙ্গে যেতে পারেনি যখন ঘুম ভাঙল আবিষ্কার করল বাড়িতে কেউ নেই। সেদিন মোর্শেদ হঠাৎ করে অসুস্থ হওয়াতে হেমলতা বাপের বাড়িতে ছিলেন না।বাড়ি থেকে বের হওয়ার উপক্রম হতেই কানে আসে হানিফের ডাক, ‘পদ্ম নাকি?’পদ্মজা মিষ্টি করে হেসে মাথা নাড়ায়। হানিফের লোলুপ দৃষ্টি তখন পদ্মজার সারা শরীর ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওইটুকু মেয়ের ফরসা চামড়া বিকৃত মস্তিষ্কের হানিফকে বড্ড টানে! উপেক্ষা করতে পারে না।মিষ্টি সুরে হানিফ বলল, ‘আয়, আমার ঘরে আয়।’সহজ সরল শিশুসুলভ পদ্মজা মামার ডাকে সাড়া দেয়। সে শুনেছে, মামা-ভাগনে যেখানে আপদ নেই সেখানে। অথচ, সেদিন সে মামাকেই ঘোর বিপদ হিসেবে জানল।পদ্মজা রুমে ঢুকতেই হানিফ চট করে দরজা বন্ধ করে দিল। তার অদ্ভুত চাহনি আর দরজা লাগানোর গতি দেখে পদ্মজার মন কেমন করে ওঠে। হানিফ কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করতে থাকে। পদ্মজার দেখতে খুব খারাপ লাগছে, গা ঝিমঝিম করছে, ভয় হচ্ছে!হানিফ বিছানায় বসে পদ্মজাকে কাছে ডাকে, ‘এদিকে আয় তোর লগে গল্প করি।’পদ্মজা কাছে যেতে সংকোচ বোধ করছে। হানিফ পদ্মজার ডান হাতে ধরে টেনে কোলে বসায়। পদ্মজার বাহুতে গভীরভাবে স্পর্শ করে বলে, ‘তুই জানোস তুই যে সবার থাইকা বেশি সুন্দর?’হানিফের প্রশ্ন পদ্মজার কানে ঢুকেনি। সে মোচড়াতে থাকে কোল থেকে নামার জন্য। আপত্তিকর স্পর্শগুলো পদ্মজাকে খারাপ অনুভূতি দিচ্ছে। তার কান্না পাচ্ছে, মাথা ভনভন করছে। হানিফ গলার জোর বাড়িয়ে মিষ্টি করে বলল, ‘মোছড়াস ক্যান রে ছেড়ি। শান্তিমত বইয়া থাক। মামা মেলা থাইকা সাজনের জিনিষ কিইন্যা দিমু।’হানিফ দুই হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছে পদ্মজাকে। পদ্মজা কিছুতেই কোল থেকে নামতে পারছে না। সে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, ‘মামা আমি চলে যাব।’‘কই যাবি? মামার ধারে থাক।’ বলল হানিফ।হানিফের শক্তপোক্ত হাতের স্পর্শগুলো শুধু অস্বস্তি দিচ্ছে না, স্পর্শকাতর জায়গাগুলো ব্যাথায় বিষিয়ে তুলছে। পদ্মজা কান্না আটকে রাখতে পারল না, হঠাৎ কেঁদে ওঠল। বলল, ‘ব্যাথা পাচ্ছি মামা। বাড়ি যাব আমি।’হানিফ হাতের বাঁধন নরম করে আদুরে গলায় বলল, ‘আচ্ছা আর ব্যাথা দিতাম না। কান্দিস না।’বাঁধন হালকা হতেই পদ্মজা কোল থেকে নেমে পড়ে। হানিফকে তার আজরাইলের মতো লাগছে। মায়ের কাছে সে আজরাইলের অনেক গল্প শুনেছে। আজরাইল যখন জান নিতে আসবে তখন শরীরে খুব কষ্ট অনুভব হবে। এই মুহূর্তে যেন ঠিক তেমনই অনুভূতি হলো। তাহলে তার হানিফ মামাই আজরাইল? পদ্মজা দরজার দিকে তাকায়, অনেক উঁচুতে ছিটকিনি উচ্চতা কম হওয়াতে সে দরজা খুলতে পারবে না। তাই হানিফকে ভীতকণ্ঠে অনুরোধ করল, ‘মামা দরজা খুলে দাও।’ধমকে উঠল হানিফ, ‘ক্যান? আমি তোরে যাইতে কইছি?’ তার কর্কশ কণ্ঠের ধমকে পদ্মজা ভয়ে কেঁপে ওঠল। তার চোখে নহর বইছে। হানিফ পদ্মজাকে জোর করে কোলে তুলে নেয়। পদ্মজা কাঁদছে। বার বার বলছে, ‘মামা আমি বাড়ি যাব।’হানিফের তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই। বাড়িতে কেউ নেই। বৃদ্ধ সৎ বাবা বধির, কানে শুনে না। পদ্মজা হানিফকে কিল, ঘুষি দিতে থাকে। ভয়ে জোরে জোরে কান্না শুরু করেছে। এভাবে কাঁদলে পাশের বাড়ির যে কেউ চলে আসবে। হানিফের রক্ত টগবগ করছে উত্তেজনায়। সে দ্রুত ওড়না দিয়ে পদ্মজার হাত, পা, মুখ বেঁধে ফেলল। পদ্মজার দুই চোখের পানি হানিফের হৃদয়কে ছুঁতে পারছে না। সে ভীষণ আনন্দ পাচ্ছে। পৈশাচিক উল্লাসে ভেসে যাচ্ছে। হানিফ সিগারেট জ্বালায়। খুব আনন্দ হলে তার সিগারেট টানতে ইচ্ছে হয়। সিগারেট টানতে গিয়ে মাথায় এলো নৃশংস বাসনা। তাৎক্ষণিক নাক, মুখ দিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে সিগারেটটি দুই আঙুলের মাঝে রেখে পদ্মজার বাম পায়ের তালুতে জ্বলন্ত সিগারেটটি চেপে ধরল।স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে পদ্মজা হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। হেমলতা দুই হাতে শক্ত করে মেয়েকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরেন। পদ্মজা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আম্মা, তখন আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল। আমার দমটা বেরিয়ে যাচ্ছিল। আমি তোমাকে খুব ডেকেছি আম্মা। তুমি আসোনি।’পদ্মজার কথাগুলো হেমলতার বুকে ঝড় তুলে দিয়েছে। লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরা। এ যেন ১৯৭১ সালের পাকিস্তানিদের নৃশংসতা। নিজের চোখে তিনি দেখেছেন পাকিস্তানিদের নিষ্ঠুরতা। হানিফ আর তার দেখা অত্যাচারী পাকিস্তানিদের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই হেমলতা নির্বাক, বাকরুদ্ধ। শুধু অনুভব হচ্ছে তার বুকে পড়ে আদরের পদ্মজা হাউমাউ করে কাঁদছে। হেমলতার সর্বাঙ্গ জ্বলছে। হানিফকে ক্ষত- বিক্ষত করে দিতে হাত নিশপিশ করছে। সেদিন একটুর জন্য পদ্মজা ধর্ষিতা হয়নি। পোড়া স্থানের যন্ত্রণা আর মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে চৈতন্য হারায়। তখনই বাড়িতে সবাই ফিরে আসে।বাকিটুকু আর পদ্মজাকে বলতে হয়নি, হেমলতা জানেন। পদ্মজার গা কাঁপিয়ে জ্বর এসেছিল সেদিন। একুশ দিন বিছানায় ছিল। ততদিনে হানিফ দেশ ছেড়ে চলে যায়। পদ্মজা ভয়ে, লজ্জায় ঘটনাটি কাউকে বলেনি। পায়ের পোড়া দাগ দেখে যখন হেমলতা প্রশ্ন করেছিলেন, ‘পা এমনভাবে পুড়ল কী করে?’পদ্মজা সহজভাবে জবাব দিয়েছিল, ‘চুলার কাছে গিয়েছিলাম। লাকড়ির আগায় পা লেগে পুড়ে গেছে।’কথাটা পদ্মজা সাজিয়েই রেখেছিল। সঙ্গে অনেক যুক্তি। তাই মিথ্যে বলতে একটুও কাঁপেনি। পুরো ঘটনাটা পদ্মজার বুকে দগদগে ক্ষত হয়ে রয়ে যায়। এই ছয় বছরে লুকিয়ে কতবার কেঁদেছে সে। মনে হলেই চুপ করে কোথাও বসে থাকে। হেমলতা মেয়ের নিশ্চুপতা দেখে মাথা ঘামাননি কখনো। পদ্মজা ছোট থেকেই চুপচাপ ছিল। কিন্তু আজ হেমলতার খুব আফসোস হচ্ছে। নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। তিনি ভেবেছিলেন, তার তিনটা মেয়েই তার কাছে খোলা বইয়ের মতো। চাইলেই পড়া যায়। পদ্মজাকে বাড়ির পিছনের নদীর বুক দিয়ে তরতর করে বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ টলটলে পানির মতো মনে হতো। যার জীবনে অস্বচ্ছ বলতে কিছু নেই। সবই সাদামাটা, সহজ সরল। অথচ পদ্মজার জীবনেই কত বড় দাগ জ্বলজ্বল করে জ্বলছে! কতবড় ঘটনা লুকিয়ে ছিল! মেয়েরা কথা লুকিয়ে রাখার সীমাহীন ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। কথাটি নিজের মেয়েদের ক্ষেত্রে মাথায় আসেনি।অনেকক্ষণ মায়ের বুকে থাকার পর পদ্মজা শান্ত হয়। তখন হেমলতা ধীর কণ্ঠে বললেন, ‘পা টা দেখি।’পদ্মজা বাঁ পা বিছানায় তুলল। হেমলতা পদ্মজার পা কোলে নিয়ে পোড়া দাগটা দেখলেন মনোযোগ দিয়ে। বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যায়, রক্ত টগবগ করে ওঠে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে শুরু হয় প্রতিশোধের স্লোগান। তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘এই পোড়া দাগ হানিফের রক্ত দিয়ে মুছব।’কথাটি কত সহজ করে বলেছেন হেমলতা। কিন্তু পদ্মজার হৃদয় কাঁপিয়ে তুলল। কী যেন ছিল কথাটিতে! তাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হেমলতা বলেন, ‘এখন যা ঘুমিয়ে পড়। কাল স্কুল আছে।’পদ্মজাকে ঘরে পাঠিয়ে রান্নাঘর থেকে রামদা, ছুরি হাতে নিয়ে উঠানে গিয়ে বসেন হেমলতা। উঠানের এক পাশে একটা বড় পাথর আছে। তিনি সেখানে গিয়ে পাথরটির পাশে বসে ছুরিটি পাথরে ঘষতে থাকলেন। ঘষতে ঘষতে পাথর গরম হয়ে আগুনের স্ফুলিঙ্গ দেখা দেয়। ধার হয়ে গেছে। পদ্মজা ঘর থেকে লুকিয়ে দেখছে। অজানা আশঙ্কায় তার বুক কাঁপছে। হেমলতা বারান্দা পেরিয়ে ঘরে ঢুকতে যাবে তখন পদ্মজা উৎকণ্ঠিত গলায় ডাকল, ‘আম্মা!’পদ্মজা কিছু বলার পূর্বেই হেমলতা বললেন, ‘আন্নার চাচার বড় মেয়ে বহুবছর আগে নিখোঁজ হয়েছে শুনেছিস তো? সেই মেয়ের ধর্ষক হানিফ ধর্ষণের পর মেয়েটাকে পুঁতে ফেলেছে। অলন্দপুরের এই একটা মানুষই এতটা বর্বর। আমি তখন ঢাকা পড়তাম। বাড়ি এসে ঘটনাটি শুনি। আম্মার অনুরোধ আর কান্নায় আমি সেদিন মুখ খুলিনি। এত বড় পাপ চেপে যাই। সেই শাস্তি আমি ধীরে ধীরে পাচ্ছিলাম। আজ পুরোপুরি পেয়ে গেলাম। আমার পাপের শাস্তি শেষ হয়েছে।’হেমলতার মুখ দিয়ে যেন আগুনের স্ফুলিঙ্গ বের হচ্ছে! তিনি কথা শেষ করে জায়গা ত্যাগ করলেন। পদ্মজার মস্তিষ্ক শূন্য হয়ে পড়ে।
‘এই আপা, স্কুলে যাবা না?’‘যাব।’‘তাড়াতাড়ি করো।’তাড়া দিয়ে পূর্ণা বাড়ির ভেতর চলে গেল। পদ্মজা বাড়ির পেছনের নদীর ঘাটে উদাসীন হয়ে বসে আছে। এ নদীর নাম—মাদিনী। জলে কানায় কানায় ভরে উঠেছে মাদিনী। জলের একটানা স্রোত বয়ে যায় সাগরের দিকে। উজান থেকে ভেসে আসছে ঘন সবুজ কচুরিপানা। পদ্মজার এই দৃশ্য দেখতে বেশ লাগছে, নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে মাদিনীর স্বচ্ছ জলের দিকে। একটা লঞ্চ জল কেটে এগিয়ে যাচ্ছে মাদিনীর বুকের ওপর দিয়ে। লঞ্চ দেখে এক মাস আগেকার ঘটনা মনে পড়ে গেল তার।সেই রাতে হেমলতা ছুরি ধার দিয়ে নিজ ঘরে চলে যান। পদ্মজা অজানা আশঙ্কায় সেদিন ঘুমোতে পারেনি। চুপচাপ অন্ধকার ঘরে শুয়ে থাকে। শেষরাতে চোখ লেগে আসে। ভোর হতেই হিমেলের চিৎকারে ঘুম ভেঙে যায়। হিমেল তার ছোটো মামা, প্রতিবন্ধী। এক পা বাঁকিয়ে হাঁটে। খুব সরল মনের মানুষ। বয়স বাইশ হলেও, এখনো শিশুদের মতো আচরণ করে; কথায় কথায় খুব কাঁদে।পদ্মজা ওড়না গায়ে জড়িয়ে দৌড়ে বের হয়। পদ্মজাকে দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়ে হিমেল, ‘এই পদ্ম, আপা কই? আপা…আপা।’পদ্মজা উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন করল, ‘কী হয়েছে মামা? এমন করছ কেন?’ পদ্মজার প্রশ্ন উপেক্ষা করে হিমেল হেমলতাকে ডাকছে, ‘আপা, এই আপা।’হেমলতা বাড়ির পেছন থেকে ব্যস্ত পায়ে হেঁটে এলেন। ‘কী হয়েছে?’হেমলতাকে দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল হিমেল।‘আপা, ভাইজান খুন হইছে। রাইতে কে জানি মাইরা ফেলছেরে আপা…’হিমেল কাঁদতে কাঁদতে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল। পদ্মজা তাৎক্ষণিক সন্দিহান চোখে মায়ের দিকে তাকাল। হেমলতাকে দেখে মনে হচ্ছে, তিনি চমকে গিয়েছেন। অথচ, তার চমকানোর কথা ছিল না। নাকি হিমেলের সামনে অভিনয় করলেন?হেমলতা দ্রুত পায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, ‘পূৰ্ণা- প্রেমাকে ওদিক যেতে দিস না, পদ্ম। আমি আসছি।’হেমলতার পিছু পিছু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে যায় হিমেল।পদ্মজা রাতেই ভেবেছিল, এমন ঘটনা ঘটতে পারে। সে তার মাকে সবচেয়ে ভালো জানে। তবুও এখন ভয় পাচ্ছে। পুলিশ কি এসেছে? মাকে ধরে নিয়ে যাবে না তো? ভাবতে গিয়ে ধক করে উঠল পদ্মজার বুক। গ্রামের কাছেই শহর, থানা। পুলিশ নিশ্চয় চলে এসেছে। পদ্ম ধপ করে বসে পড়ল মাটিতে। সে ঘামছে, নাক-মুখ-গলা ঘেমে একাকার হয়ে যাচ্ছে।খুনের কথা শুনে ভীষণ ভয় পেয়েছে পূর্ণা। আতঙ্কে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। সে পদ্মজার পাশে এসে হাত চেপে ধরে। পদ্মজা মৃদু কাঁপছে। চোখে ভাসছে, হেমলতাকে পুলিশ শিকল দিয়ে বেঁধে নিয়ে যাচ্ছে। তার খুব কান্না পাচ্ছে। সময় নষ্ট না করে তড়িঘড়ি করে মাথায় ওড়নার আঁচল টেনে নিয়ে পূর্ণার উদ্দেশ্যে বলল, ‘প্রেমাকে দেখে রাখিস।’বাড়ি ভরতি মানুষ। মানুষ আসছে ঠেলেঠুলে। হেমলতা হানিফের লাশের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। ঠিক সেই মুহূর্তে ফরসা রঙের দুজন মহিলা ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। আকস্মিক আক্রমণে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন হেমলতা। খেয়াল করে দেখেন, মহিলা দুজন তার মা আর বোন। তারা হাউমাউ করে কাঁদছে। কিন্তু হেমলতার তো কান্না পাচ্ছে না! ব্যাপারটা লোকচক্ষু ঠেকছে? একটু কী কান্নার অভিনয় করা উচিত? হানিফের মৃতদেহ দেখে মনে হচ্ছে কেউ ইচ্ছেমতো কুপিয়েছে। হেমলতার দেখে শান্তি লাগছে! এমন শান্তি অনেকদিন পাওয়া হয়নি। পদ্মজাও সেখানে উপস্থিত হয়। হেমলতার নজরে পড়ে। ভীতু চোখে মায়ের চোখের দিকে তাকাল পদ্মজা। হেমলতা ভ্রু কুঞ্চিত করে আবার স্বাভাবিক করে নিলেন। পদ্মজা চোখ ঘুরিয়ে দেখছে পুলিশ এসেছে কি না! চারিদিকে এত মানুষ। পদ্মজাকে এদিক-ওদিক উঁকি দিতে দেখে হেমলতা মেয়ের দিকে তেড়ে যান। চোখ রাঙিয়ে পদ্মজার মাথা ঢেকে দিলেন ওড়না দিয়ে। পদ্মজা দ্রুত ওড়নার আঁচল মুখে চেপে ধরে গোয়ালঘরে ঢুকে পড়ে। তার মা চায় না সে কখনো এত মানুষের সামনে থাকুক।হেমলতা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন, পদ্মজা গোয়ালঘর থেকে উঁকি দিয়ে বাইরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে।কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশের দল আসে। সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করে হানিফের লাশ নিয়ে যায়। লোকমুখে শোনা যায়, হানিফ খুন হয়েছে শেষ রাতে। সকালে লঞ্চ ঘাটে লাশ ভেসে ওঠে!হেমলতাকে পুলিশ নিয়ে যায়নি বলে পদ্মজা স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ে। মানুষের ভিড়ও কমে গেছে। হেমলতার মা কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে উঠোনের এক কোণে বসে আছেন। পদ্মজা গুটিপায়ে গোয়ালঘর থেকে বেরিয়ে আসে। পদ্মজার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসেন হেমলতা। সেই হাসি দৃষ্টিগোচর হয় হেমলতার মা মনজুরার। তিনি কিছু একটা ভেবে নিয়ে হেমলতার কাছে এসে কিড়মিড় করে বললে, ‘তুই খুন করছস?’সঙ্গে সঙ্গে হেমলতা জবাব দিলেন, ‘তোমার এমন মনে হচ্ছে কেন?’হেমলতার কণ্ঠ স্বাভাবিক। পদ্মজা এই প্রশ্ন শুনে ভয় পেয়ে গেছে।যদি নানু পুলিশকে বলে দেয়? পুলিশ তো তার মাকে নিয়ে যাবে!‘কাইল রাইতে তুই আইছিলি হানিফের ঘরে। আমি দেহি নাই?’ রাগে কাঁপছেন মনজুরা।‘হুম এসেছি।’ হেমলতার নির্বিকার স্বীকারোক্তি।‘কেন মারলি আমার ছেড়ারে? তোর কী ক্ষতি করছে?’‘আসছি বলেই আমি খুন করেছি?’‘এত রাইতে তুই তার কাছে আর কী দরকারে আইবি?’‘আমি তাকে মারতেই যাব কেন?’মনজুরা আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন হেমলতার দিকে। হেমলতার চোখ মুখ শক্ত। নিস্তব্ধতা কাটিয়ে মনজুরা চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘পুলিশের কাছে যামু আমি।’পদ্মজা কেঁদে উঠল। অস্পষ্ট কণ্ঠে বলল, ‘নানু, এমন করো না।’ হেমলতা নিচু স্বরে কঠিন করে বললেন, ‘আমার মেয়েদের থেকে আমাকে দূরে সরানোর চেষ্টা করো না, আম্মা। ফল খুব খারাপ হবে।’পদ্মজার মনে হলো মনজুরা ভয় পেয়ে গেছেন। তার চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়েছে শঙ্কা। তিনি সবসময়ই হেমলতাকে ভয় পেয়ে চুপসে থাকেন। পদ্মজা বুঝে উঠতে পারে না, নানু কেন ভয় পায় মাকে? মায়ের অতীতে কী ঘটেছে? কেন তিনি এমন কাঠখোট্টা? ছেলের খুনিকে কোনো মা ছেড়ে দেয়? নানু কেন ছাড়লেন? মেয়ে বলে? নাকি অন্য কারণ আছে? কোনো উত্তর নেই। এসব ভাবলে ভীষণ মাথা ব্যথা হয়। অন্য আট-দশটা পরিবারের মতো তারা নয় কেন? নাকি গোপনে সব পরিবারেই এমন জটিলতা আছে?প্রশ্ন হাজারটা!!উত্তর কোথায়?সেদিন রাতে খাওয়ার সময় হেমলতা নিম্নস্বরে পদ্মজাকে ডাকেন, ‘পদ্ম?’‘জি, আম্মা।’‘আমি হানিফকে খুন করিনি। কারা করেছে তাও জানি না।কথাটি শুনে পদ্মজা অবাক হয়। তার মা মিথ্যে বলে না। তাহলে কারা খুন করল? পদ্মজা প্রশ্ন করল, তাহলে শেষ রাতে মামার কাছে কেন গিয়েছিলে আম্মা?’হেমলতা জবাব না দিয়ে খাওয়া ছেড়ে উঠে গেলেন।পদ্মজার ভাবনার সুতো কাটল কারো পায়ের আওয়াজ শুনে। ঘাড় ঘুরিয়ে মোর্শেদকে দেখতে পেল। মোর্শেদ পদ্মজাকে ঘাটে বসে থাকতে দেখে বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে ফেললেন, ‘এই ছেড়ি, যা এন থাইকা।’জন্মদাতার এমন দূর দূর ব্যবহারে পদ্মজার কান্না পায়। নিঃশব্দে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে, তা আড়াল করে ব্যস্ত পায়ে বাড়ির ভেতর চলে যায় সে।কয়েক মাস পর পদ্মজার মেট্রিক পরীক্ষা। নিয়মিত স্কুলে যেতে হয়। তিন বোন বই নিয়ে সড়কে ওঠে। পদ্মজার কোমর অবধি ওড়না দিয়ে ঢাকা। পূর্ণা একনাগাড়ে বকবক করে যাচ্ছে। স্কুলে যাওয়া অবধি কথা বন্ধ হবে না, মাঝে মাঝে জোরে জোরে হাসছেও! মেয়েটার হাসির রোগ আছে বোধহয়। একবার হাসি শুরু করলে আর থামে না। পদ্মজা বার বার বলেছে, ‘আম্মারাস্তায় কথা বলতে আর হাসতে মানা করছে। চুপ করতবুও পূর্ণা হাসছে। বাড়ির বাইরে এসে সে মুক্ত পাখির মতো আচরণ করে। তাকে দেখে মনে হয়, খাঁচা থেকে মুক্ত হয়েছে।‘পদ্ম…ওই, পদ্ম। খাড়া।’পদ্মজা ক্ষেতের দিকে তাকাল। ক্ষেতের আইল ভেঙে দৌড়ে আসছে লাবণ্য। একই সঙ্গে পড়ে দুজন। কাছে এসে হাঁপাতে লাগল লাবণ্য। শান্ত হওয়ার পর চারজন মিলে স্কুলের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করে।‘বাংলা পড়া শিখে এসেছিস বলল পদ্মজা?’তার প্রশ্ন অগ্রাহ্য করে লাবণ্য বলল, ‘আরে ছেড়ি, বাড়িত শুদ্ধ ভাষায় কথা কইলে বাইরেও কইতে হইব নাকি?’‘আমি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে পারি না।’লাবণ্য অসন্তোষ প্রকাশ করল। সে অলন্দপুরের মাতব্বর বাড়ির মেয়ে। তাদের বাড়ির সবাই শিক্ষিত। তবুও তারা আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে, পরিবারের দুই-তিন জন সদস্য ছাড়া। আর পদ্মজার চৌদ্দ গুষ্ঠি মূর্খ, দুই- তিন জন ছাড়া…তবুও এমন ভাব করে! আঞ্চলিক ভাষা নাকি পারে না!‘সত্যি আমি পারি না। ছোটো থেকে আম্মা শুদ্ধ ভাষা শিখিয়েছেন। উনিও এই ভাষাতেই কথা বলেন। তাই শুদ্ধ ভাষায় কথা বলতেই আরাম পাই।’‘পূর্ণা তো পারে।’‘আমার চেষ্টা করতে ইচ্ছে হয় না।’‘আইচ্ছা বাদ দে। শুন, কাইল আমরার বাড়িত নায়ক-নায়িকারা আইব।’পূর্ণা বিগলিত হয়ে প্রশ্ন করল, ‘কেন আসবে? কোন নায়ক?‘শুটিং করতে। ছবির শুটিং।’পদ্মজা এসবে কোনো আগ্রহ পাচ্ছে না। পূর্ণা খুব আগ্রহবোধ করছে। সপ্তাহে একদিন সুমিদের বাড়িতে গিয়ে সাদাকালো টিভিতে ছায়াছবি দেখে, তাই অভিনয় শিল্পীদের প্রতি তার আগ্রহ আকাশছোঁয়া। পূর্ণা গদগদ হয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ল, ‘কোন নায়ক নায়িকা? বলো না লাবণ্য আপা!’‘দাঁড়া! মনে করি।’পূর্ণা কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে। লাবণ্য চোখ বুজে মনে করার চেষ্টা করল। এরপর মনে হতেই বলল, ‘লিখন শাহ আর চিত্রা দেবী।’‘তুমি আমার ছবির নায়ক-নায়িকা?’‘হ।’স্কুলের যাওয়ার পুরোটা পথ লাবণ্য আর পূর্ণা ছায়াছবি নিয়ে আলোচনা করল। মূল বক্তব্যে ছিল সুদর্শন অভিনেতা—লিখন শাহ।
দিনটিকে বড়ো অলক্ষুণে মনে হচ্ছে পদ্মজার। সকালে উঠে দেখে লাল মুরগিটার একটা বাচ্চা নেই। নিশ্চয় শিয়ালের কারবার! রাতে মুরগির খোপের দরজা লাগানো হয়নি। আর এখন চোখে পড়ল, দেয়াল ঘড়িটার কাঁটা ঘুরছে না। ঘড়িটা রাজধানী থেকে হানি খালামণি দিয়েছিলেন। গ্রামে খুব কম লোকই হাতঘড়ি পরে। দেয়াল ঘড়ি হাতেগোনা দুই-তিনজনের বাড়িতে আছে। পদ্মজা সূর্যের দিকে চেয়ে সময়ের আন্দাজ করার চেষ্টা করল। পূর্ণা-প্রেমা দুপুরের খাবার খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। আর আম্মা…পদ্মজা পাশের ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে হেমলতা মনোযোগ সহকারে সেলাই মেশিনে কাপড় সেলাই করছেন। আটপাড়ায় একমাত্র তিনিই সেলাই কাজ করেন। প্রতিটি ঘরের কারো না কারো পরনে তার সেলাই করা জামা আছে।‘লুকিয়ে দেখছিস কেন? ঘরে আয়, হঠাৎ বললেন হেমলতা। পদ্মজা লজ্জা পেয়ে বলল, ‘না, আম্মা। কাজ আছে।’হেমলতা জগ বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘পানি ভরে নিয়ে আয়।’জগ হাতে নিয়ে পদ্মজা বলল, ‘ছদকা কোন মুরগিটা দেব?’হেমলতা গতকাল স্বপ্নে দেখেছেন, বাড়িতে আগুন লেগেছে। তাই ছদকা দিবেন বলে মনস্থির করেছেন। দুঃস্বপ্ন দেখলেই তিনি ভীষণ অস্থির হয়ে পড়েন, গরিব-দুঃখীদের ছদকা দেয়ার পরই স্বস্তি পান। তার পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাস, গরিব-মিসকিনদের দান করলে তাদের দোয়ায় বিপদ কেটে যায়।‘সাদা মোরগটা। মুন্না এসেছে?’‘না। প্রতিদিন বিকেলবেলা পানি নিতে আসে। একটু পরই আসবে।’ হেমলতা আর কথা বাড়ালেন না। পদ্মজা কলপাড় থেকে পানি নিয়ে আসে। আছরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে মোড়ল বাড়ির কল থেকে পানি নিতে আসে মুন্না। গ্রামে সচ্ছল পরিবার নেই বললেই চলে। হাতেগোনা যে কয়টা পরিবারে সচ্ছলতা বিদ্যমান শুধু তাদের বাড়িতেই টিউবওয়েল আছে। পুরো আটপাড়াতে টিউবওয়েল মাত্র পাঁচটা। পদ্মজাদের টিউবওয়েল থেকে পানি নিতে প্রতিদিন অনেকেই আসে। তার মধ্যে একজন মুন্না; বয়স বেশি নয়, মাত্র দশ। মা হারা ছেলেটির পঙ্গু বাবা সদরে বসে ভিক্ষা করে। মুন্নাকে দেখে রাখার বা যত্ন করার কেউ নেই। এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ায়, কারো মায়া হলে একবেলা নিয়ে দুমুঠো খেতে দেয়।পদ্মজা মোরগ নিয়ে কলপাড়ে এসে দেখে—মুন্না নেই। একটু সামনে হেঁটে যেতেই ঘাটে দেখতে পেল ছেলেটিকে। ডাকল, ‘এই, মুন্না।’মুন্না ফিরে তাকাল, পদ্মজার হাতে সাদা মোরগ দেখে খুশিতে জ্বলজ্বল করে ওঠে তার চোখ-মুখ। পদ্মজা না বললেও সে বুঝে গেল—আজ ছদকা পাবে। দাঁত কেলিয়ে হেসে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এরো মুন্না।‘হাসছিস কেন? এই নে মোরগ। তোর আব্বাকে নিয়ে খাবি।মুন্না খুশিতে গদগদ হয়ে মোরগটিকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরল। কী সুন্দর মুন্নার হাসি! তার খুশিতে পদ্মজাও খুশি হলো। বলল, ‘খুব খুশি?’‘হ’‘আমাদের জন্য দোয়া করবি।’‘করবাম, আপা।’‘আচার খাবি?’‘হ, খাইবাম।’ কোনো খাবারে ছেলেটার ‘না’ নেই। সে সব খায়।পদ্মজা আবার হাসল। খাওয়ার কথা শুনলেই পেটুক মুন্নার চোখ চকচক করে ওঠে। আচার নিয়ে আসে পদ্মজা, মুন্নার সঙ্গে ঘাটের সিঁড়িতে বসে আরাম করে দুজন আচার খায়। মুন্না একটু একটু করে খেতে খেতে বলল, ‘আপা, তুমি খুব ভালা।’‘তাই?’‘হ। বড়ো হইয়া আমি তোমারে বিয়া করবাম।’পদ্মজা বিষম খেল। দ্রুত এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল, কেউ শুনল নাকি। বিয়ে তার কাছে খুব লজ্জাজনক শব্দ। শব্দটি শুনলেই লজ্জায় লাল হয়ে যায় সে, অন্তর কাঁপে। ফিসফিসিয়ে মুন্নাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘বিয়ের কথা কোথায় শিখলি?’‘আব্বা কইছে।’‘আর বলবি না এসব। যা, বাড়িতে যা।’পদ্মজা তড়িঘড়ি করে বাড়ির ভেতর চলে যায়।রান্নাঘরে ঢুকে দেখে, হেমলতা রাতের রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ থাকে না। হারিকেন জ্বালিয়ে রান্না করতে হয়। প্রতিদিন ঘরে একটা, আবার রান্নাঘরে আরেককটা হারিকেন জ্বালানো অনেক খরচের ব্যাপার। তাই বিকেলে রাতের রান্না সেড়ে ফেলেন তিনি।পদ্মজা উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আম্মা, আমি রাঁধি?’লাগবে না। সাহায্য কর শুধু।পদ্মজা চোখ ঘুরিয়ে খুঁজতে লাগল, কী কাজ করা যায়! কিন্তু এমন কিছু পেল না যেটা করা যায়, কোনো সাহায্যের প্রয়োজনই তো নেই-ই! হেমলতা বললেন, ‘লাউ নিয়ে আয়।’‘লাহাড়ি ঘর থেকে?’‘লাহাড়ি ঘরে নেই। ছিঁড়ে নিয়ে আয়।’পদ্মজা এমনভাবে ছুটে যায় যেন মায়ের আদেশ নয়, চাঁদ পেয়েছে!লাউ, বরবটি, ঢেঁড়স, কাঁকরোল, করলা, চিচিঙ্গা, পটল, ঝিঙাসহ নানা ধরনের সবজির মেলা বাড়ির চারপাশে। পদ্মজা সাবধানে ঘাসের ওপর দিয়ে লাউ গাছের দিকে এগোয়। বর্ষাকাল হওয়াতে জোঁকের উপদ্রব বেড়েছে। অবশ্য জোঁকের ভয় তার নেই।পদ্মজার গমনপথের দিকে ঝিম মেরে কতক্ষণ চেয়ে রইলেন হেমলতা। মেয়েটাকে দেখলে মাঝেমধ্যে মন বিষণ্নতায় ভরে ওঠে, বুকের ভেতর কীসের যেন অস্থিরতা অনুভব হয়; যুক্তিহীন কিছু চিন্তা ঘুরে বেড়ায় মস্তিষ্ক জুড়ে। পদ্মজার চুল দেখলে মনে হয়, এই সুন্দর ঘন কালো রেশমি চুল পদ্মজার একেকটা কাল রাত। পদ্মজার ছিমছাম গড়নের দুধে-আলতা দেহের অবয়ব দেখলে মন বলে—এই দেহ পদ্মজার যন্ত্রণা। পদ্মজার ওষ্ঠদ্বয়ের নিম্নে স্থির হয়ে থাকা কালো সূক্ষ্ম তিল দেখলে যেন পদ্মজার এক জীবনের কান্নার কারণ। হেমলতা পদ্মজার রূপের বাহার নিতে পারেন না। কেন কৃষ্ণকলির ঘরে ভুবন মোহিনী রূপসীর জন্ম হলো? জন্ম-মৃত্যু-বিয়ে…এই তিনের ওপর কারো হাত থাকে না। যদি থাকত, হেমলতা মোর্শেদকে বিয়ে করতেন না…কিংবা পদ্মজার মতো রূপসীর জন্মও দিতেন না। ভুলেও আল্লাহর কাছে রূপসী মেয়ে চাইতেন না। হেমলতার বুক চিরে ভারি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।আজ শুক্রবার। স্কুল নেই। ফজরের নামাজ আদায় করে তিন বোন পড়তে বসেছে। প্রেমা নামাজ পড়তে চায় না, ঘুমাতে চায়। হেমলতার মারের ভয়ে পড়ে। সে ঝিমুচ্ছে আর পড়ছে। তা দেখে পদ্মজা আর পূর্ণা ঠোঁট টিপে হাসছে। হেমলতা বিরক্ত হোন। প্রেমার তো পড়া হচ্ছেই না…সেই সঙ্গে পদ্মজা আর পূর্ণার মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে। তিনি কর্কশ কণ্ঠে ধমকে উঠলেন, ‘প্রেমা, ঘুমাচ্ছিস কেন? ঠিক হয়ে পড়।’আচম্বিত ধমকে চমকে উঠল প্রেমা, তাড়াতাড়ি পড়া শুরু করল চোখ খুলে। হেমলতা কিছুক্ষণ প্রেমাকে পর্যবেক্ষণ করে স্বাভাবিক গলায় বললেন, ‘পড়তে হবে না। ঘরে গিয়ে ঘুমা।’প্রেমা একটু অবাক হয়। পরমুহূর্তেই খুশি হয়ে ছুটে যায় ঘরে। পূর্ণা মুখ ভার করে ফেলল। তারও তো পড়তে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু মা কখনো তাকে ছাড় দেন না। হয়তো ছোটোবেলা ছাড় দিতেন, মনে নেই। সে আবার সব কিছু খুব দ্রুতই ভুলে যায়। ব্রেন ভালো প্রেমার, যা পড়ে মনে থাকে। পদ্মজার অবশ্য সবকিছুই স্বাভাবিক……শুধু রূপ বাদে।.সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে হাতে ঝাকি জাল আর বড়শি নিয়ে মোর্শেদ বাড়িতে ঢুকলেন, কাঁধে পাটের ব্যাগ ঝুলানো। ভোরে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। তিনি বাড়ি ফিরলে পূর্ণা ও প্রেমা সবচেয়ে বেশি খুশি হয়। মাছ খেতে পারে অনেক! অর্থসংকটের জন্য হেমলতা খুব কম মাছ কেনেন। মোর্শেদ যতদিন বাড়িতে থাকেন, ততদিন মাছের অভাব হয় না। মোর্শেদ কিছু বলার আগেই পূর্ণাও প্রেমা গামলা নিয়ে ছুটে আসে উঠানে। তিনি কাঁধের ব্যাগ উলটে ধরলেন গামলার ওপর। পুঁটি, ট্যাংড়া, পাবদা, চিংড়ি মাছের ছড়াছড়ি লেগে যায়।হেমলতা মনে মনে ভারি খুশি হোন। পদ্মজা লতা দিয়ে চিংড়ি খেতে খুব পছন্দ করে। আর প্রেমা-পূর্ণা পছন্দ করে পাবদা মাছের ভুনা। আড়াল থেকে পদ্মজা দেখছে, তার ঠোঁটেও হাসি। মেয়েগুলো খুব খুশি হয়েছে মাছ দেখে। মোর্শেদ বাড়ি থেকে বের হতেই লতা আনতে বাড়ির পেছনে ছুটে যাবে পদ্মজা।প্রেমার মাথায় হাত বুলিয়ে হেমলতাকে উদ্দেশ্য করে মোর্শেদ বললেন, হুনো লতা। আমার আম্মারারে পাবদা ভুনা কইরা দিবা। সবজি-টবজি দিয়া রানবা না।’‘আব্বা, আপনি বাড়িতে থাকবেন? তাইলে তো প্রতিদিনই মাছ খেতে পারি,’ বলল পূর্ণা।মোর্শেদ আড়চোখে আড়ালে লুকিয়ে থাকা পদ্মজাকে একবার দেখে তীক্ষ্ণ চোখে হেমলতার দিকে তাকিয়ে পূর্ণাকে জবাব দিলেন, ‘কোনো রহম অশান্তি না হইলে তো থাকবামই।’গামছা নিয়ে কলপাড়ে চলে যান তিনি। জন্মদাতার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে পদ্মজার মুখটা ছোটো হয়ে যায়। প্রতিবার বাড়ি ছাড়ার আগে মোর্শেদ পদ্মজাকে কটুকথা শোনান। তখন হেমলতা রেগে গিয়ে জবাব দিলে তর্কা- তর্কি করে তিনি বাড়ি ছাড়েন।‘মোর্শেদ নাকি? বাড়ি ফিরলা কোনদিন?’মোর্শেদ গোসল সেরে সকালের মিষ্টি রোদ পোহাচ্ছিলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে রশিদ ঘটককে দেখে হেসে বললেন, ‘আরে, মিয়া চাচা। আহেন, আহেন। পূর্ণারে চেয়ার আইননা দে। খবর কী?’পূর্ণা চেয়ার নিয়ে আসে। রশিদ এক দলা থুতু উঠানে ফেলে চেয়ারে বসল আরাম করে। প্রেমাকে উঠানে খেলতে দেখে খসখসে গলায় ফরমায়েশ দিল, ‘এই মাইয়া, যা পানি লইয়া আয়। অনেকক্ষণ ধইরা দমডা আটকাইয়া আছে।’প্রেমা রান্নাঘর থেকে পানি এনে দেয়। রশিদ পানি খেয়ে মোর্শেদকে বলল, ‘খবর তো ভালাই। তো বাবা ছেড়িডারে কী বিয়া দিবা না?’‘দুই বছর যাক। পড়তাছে যহন মেট্রিকটা পাশ করুক। কী কন?’‘মেজোডা না। বড়োড়া। তোমার বউ তো মরিচের লাহান। কোনোবায় ও রাজি অয় না। তুমি বোঝাও। পাত্র খাঁড়ি হীরা। বাপ-দাদার জমিদারি আছে।’মোর্শেদ আড়চোখে হেমলতা এবং পদ্মজার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেন— নেই ওরা। তিনি জানেন পদ্মজার উপর কোনোরকম জোরজবরদস্তি তিনি করতে পারবেন না। হেমলতা তা হতে দেবে না। এসব তো আর বাইরের মানুষের সামনে বলা যায় না। মোর্শেদ রশিদ ঘটককে নরম গলায় বললেন, ‘থাকুক না, পড়ুক। মায়ে যহন চায় ছেড়ি পড়ুক তাইলে পড়ুক।’রশিদ নিরাশ হয়ে তাকিয়ে রইল। ভেবেছিল, মোর্শেদ হয়তো রাজি হবে। রশিদ এতদিন মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে ছিল। এরপর বড়ো অসুখে পড়ে। তাই মোর্শেদ বাড়ি ফিরেছে শুনেও আসতে পারেনি। আজ একটু আরামবোধ হতেই ছুটে এসেছে অনেক আশা নিয়ে। কিন্তু মোর্শেদের জবানবন্দিতে সে আশাহত হলো। কটমটে গলায় বলল, ‘যুবতী ঘরে রাহন ভালা না। যহন বংশে কালি পড়ব তহন বুঝবা। হুনো মোর্শেদ, এই বয়সি মাইয়াদের স্বভাব চরিত্র বেশিদিন ভালা থাহে না। পাপ কাম এদের চারপাশে ঘুরঘুর কর। বেলা থাকতে জামাই ধরাইয়া দেওন লাগে। বুঝছ? তোমার বউরে বোঝাও।’পাত্রের অনেক প্রশংসা করল রশিদ; জমিজমা, বাড়িঘর—সবকিছুর বাড়াবাড়ি রকমের বর্ণনা দিল। রশিদ ঘটক যেতেই মোর্শেদ হেমলতার পাশে গিয়ে বসেন, পদ্মজার বিয়ের কথা তুলেন ইনিয়েবিনিয়ে। হেমলতা সাফ নাকচ করে জানিয়ে দিলেন—কিছুতেই এখন মেয়ের বিয়ে দিবেন না। আর মোর্শেদকে পদ্মজার ব্যাপারে নাক গলাতেও মানা করে দেন। শেষ কথাটা বেশ কঠিন করেই বললেন, ‘আগে বাপ হও। পরে বাপের কাজ করতে এসো।’মোর্শেদের তিরিক্ষি মেজাজ। রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান তিনি। রগে রগে তার রাগ টগবগ করছে। পদ্মজাকে বারান্দায় দেখে তিনি ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললেন, ‘ছেড়ি যহন রূপ দিয়া নটি হইব, তহন আমার ঠ্যাংও পাইবা না। এই ছেড়ি মজা বুঝাইব।’কথাটি শুনে পদ্মজার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। হেমলতা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে আসেন মোর্শেদকে কিছু কঠিন কথা শোনাতে। পদ্মজা তখন দৌড়ে আসে। হেমলতার হাতে ধরে রান্নাঘরের ভেতরে নিয়ে যায়। মোর্শেদ যতক্ষণ বাড়িতে থাকে, তারও ততক্ষণ খুব ভালো লাগে। পূর্ণা-প্রেমা কত খুশি হয়। বাড়িটা পরিপূর্ণ লাগে। সে চায় না বাবা ঝগড়া করে রাগ নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যাক। হেমলতা রাগে এক ঝটকায় মেয়ের হাত সরিয়ে দেন। তার সহ্য হয় না মোর্শেদকে। মানুষের কথা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া বদমেজাজি একজন মানুষ মোর্শেদ। ভালোটা কখনো বোঝে না, মানুষের কথায় নাচে। সারাক্ষণ একটা বাক্যই যেন জপ করে, ‘লোকে কী বলবে?’.মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। মাথার ওপর বৃষ্টি নিয়ে মোর্শেদ বাড়ি ফেরেন। মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে তিনি খুব খুশি। হেমলতাকে ডেকে বললেন, ‘এক মাসের লাইগগা ঘরটা ছাইড়া লাহাড়ি ঘরে উইঠঠা পড়ো।’হেমলতা কিছু বললেন না। তার প্রশ্নবোধক চাহনি দেখে মোর্শেদ বললেন, ‘শুটিং করার লাইগগা মাতব্বর বাড়িত যারা আইছে হেরার নাকি শুটিংয়ের জন্যি আমার বাড়ি পছন্দ হইছে। বিরাট অংকের টেকা দিব কইছে। আমিও কথা দিয়া আইছি।’হেমলতা রেগে যেতে গিয়েও পারলেন না। সত্যি, টাকা খুব দরকার। পদ্মজার সামনে মেট্রিক পরীক্ষা। কত খরচ! কলেজে পড়াতে ঢাকা পাঠাতে হবে। পদ্মজা যখন ছোটো ছিল তখনো একবার এই বাড়িতে শুটিং হয়েছিল। তিনি কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, ‘টাকার কথা আমার সঙ্গে আলোচনা করতে বলো। নয়তো জায়গা হবে না।’‘আরে..বলামনে। এখন সব গুছাও। ওরা কালই আইব।’পূর্ণা আড়াল থেকে সবটা শুনেছে। সাত দিন হয়েছে লিখন শাহ আর চিত্রা দেবী অলন্দপুরে এসেছে। অথচ, সে দেখতে পারল না! হেমলতা যেতে অনুমতি দেননি। পূর্ণা নামাজের পর দোয়ায় খুব অনুনয় করে আল্লাহকে বলেছে, যেন লিখন শাহ আর চিত্রা দেবীকে স্বচক্ষে দেখতে পারে। আর এখন শুনছে তাদের বাড়িতেই নাকি আসছে ওরা! পূর্ণার মনে হচ্ছে খুশিতে সে মারা যাবে! বুকের ভেতর দম আটকে আসছে……পানি লাগবে…পানি।.‘এই, মগা আমাকে এক কাপ চা দাও তো।’মগা ঝড়ের গতিতে চা নিয়ে আসে। চিত্রার পাশের চেয়ারটা টেনে তাতে বসল লিখন। এরপর মগাকে বলল, ‘দারুণ চা করো তো তুমি! ‘কাঁচুমাচু হয়ে হাসল মগা। ভাবে বোঝা গেল, প্রশংসা শুনে ভীষণ লজ্জা পেয়েছে। এদিকে মগার ভাবভঙ্গি দেখে হেসে উঠল চিত্রা। চিত্রার হাসির সেই দৃশ্য মুগ্ধ হয়ে দেখছে মগা। মাতব্বর বাড়ির কামলা সে, চিত্রনায়ক লিখন শাহ এবং চিত্র নায়িকা চিত্রা দেবীর সেবা করার দায়িত্ব তাকে দেয়া হয়েছে। চিত্রার সুন্দর মুখশ্রীর সামনে সবসময় থাকতে পারবে ভেবে মগা ভীষণ খুশি। চিত্রা বলল, ‘তোমার ভাইয়ের নামটা যেন কী?’চার ফুট উচ্চতার মগা উৎসাহ নিয়ে জবাব দিল, ‘মদন।’চিত্রার হাসি পায়। অনেক কষ্টে চেপে রাখল।মগা-মদন…এসবও কারো নাম হয়?শুটিংয়ের মাঝে হুট করে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে। তাই আপাতত শুটিং স্থগিত আছে। বারান্দায় বসে বৃষ্টি দেখছে সবাই, প্রত্যেকের হাতে রং চা। ডিরেক্টর আবুল জাহেদের খিচুড়ির স্বাদ অতুলনীয়। তিনি আজ খিচুড়ি রান্না করছেন, বৃষ্টি দেখেই ঢুকে পড়েছেন রান্নাঘরে।চিত্রা লাহাড়ি ঘরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আচ্ছা, এই বাড়ির দুইটা মেয়ে কোথায়? আসার পর একবার এসেছিল। এরপর তো আর এলো না।মগা বলল, ‘ওই যে লাহাড়ি ঘর। ওইডাত আছে।’‘লাহাড়ি ঘর…সেটা কী?’মগার বদলে লিখন জবাব দিল, ‘যে ঘরের অর্ধেক জুড়ে ধান রাখা হয়, আর অর্ধেক জায়গায় চৌকি থাকে কামলাদের জন্য—ওই ঘরকে এখানে লাহাড়ি ঘর বলে। বোঝা গেছে?চিত্রা চমৎকার করে হাসল, ‘বোঝা গেছে। এই মগা, বৃষ্টি কমলে লাহাড়ি ঘরে যাব। ঠিক আছে?’চিত্রার ‘এই মগা’ ডাক যেন মুহূর্তে মগার জগৎ-সংসারকে স্বর্গ করে তোলে। সে বাধ্যের মতো মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘আইচ্ছা, আপা।’চিত্রা লিখনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি যাবা? ওই তো সামনেই আলসেমি করো না।’মগা হইহই করে উঠল, ‘না না, বেঠা লইয়া যাওন যাইত না। বাড়ির মালিকের মানা আছে।মগার না করার তীব্রতা দেখে ভীষণ অবাক হলো সবাই। চিত্রা প্রশ্ন করল, ‘মানা কেন?’‘বাড়ির বড়ো ছেড়িডারে তো আপনেরা দেহেন নাই। আগুন সুন্দরী। এই লিখন ভাইয়ের লাহান বিলাই চোখা। ছেড়িডারে স্কুল ছাড়া আর কোনোহানো যাইতে দেয় না। বাড়ি দিবার আগে কইয়া রাখছে—লাহাড়ি ঘরে বেঠামানুষ না যাইতে। এই ছেড়ি লইয়া বহুত্তা কিচ্ছা আছে।’চিত্রা বেশ কৌতূহল বোধ করল। লিখন তীক্ষ্ণ ঘোলা চোখে লাহাড়ি ঘরের দিকে তাকাল। দেড় দিন হলো এখানে এসেছে। উঠানের শেষ মাথায় থাকা লাহাড়ি ঘরটা একবারো মনোযোগ দিয়ে দেখা হয়নি।সামনের দরজাটা বন্ধ। দুটো ছোটো মেয়ে এসেছিল ঘরটার ডান পাশ দিয়ে। ঘরটার ডানে-বাঁয়ে-পেছনে গাছপালা। বাড়িটা পুরনো হলেও দারুণ।তবে এই মুহূর্তে তার অন্যকিছুর প্রতি তীব্র কৌতূহল কাজ করছে।
মধ্যখানে চাদর টানিয়ে দুই ভাগ করা হয়েছে লাহাড়ি ঘরকে। একপাশের চৌকিতে হেমলতা এবং মোর্শেদ থাকেন। অন্যপাশেরটা পদ্মজা, পূর্ণা ও প্রেমার দখলে। লাহাড়ি ঘরের পেছনের দরজাটি আপাতত প্রধান দরজা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।ঘরের পেছনে অসংখ্য কচু গাছ ছিল। হেমলতা মোর্শেদকে নিয়ে সব কচু কেটে জায়গা খালি করে সেখানে তৈরি করেছেন মাটির চুলা। বড়ো সড়কে ওঠার জন্য ঝোপঝাড় কেটে সরু করে পথ করা হয়েছে। এতে অবশ্য মোর্শেদের মত ছিল না। সড়কে ওঠার একটা পথ থাকতে আরেকটা পথ তৈরি করার বিপক্ষে তিনি। হেমলতা দুই মেয়েকে নিয়ে সব ঝোপঝাড় সাফ করেছেন। শুটিং দলে অনেক পুরুষ। পদ্মজাকে ভুলেও তাদের সামনে দিয়ে আসা-যাওয়া করতে দেওয়া যাবে না। হেমলতার মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে, পদ্মজার মুখ পুড়িয়ে দিতে। পরক্ষণেই নিজের ওপর ঘৃণা হয়। একজন মায়ের মনে কী করে নিজের মেয়েকে নিয়ে এমন ভাবনা আসতে পারে? পদ্মজার হাতে সূচ ফুটলে তার মনে হয় নিজের শরীরে আঘাত লেগেছে। কেন এত টান পদ্মজার প্রতি? ভেতরে ভেতরে এই প্রশ্নের উত্তর তিনি জানেন। শুধু প্রকাশ পায় না, না জানার ভান ধরে থাকেন।থাকতে হয় তাকে।‘আম্মা, আজ আমি রাঁধি?’পদ্মজার প্রতিদিনকার প্রশ্ন! হেমলতা রাঁধতে দেবেন না জানা সত্ত্বেও পদ্মজা প্রতিদিন অনুরোধ করে। হেমলতা বিপদ-আপদ ছাড়া পদ্মজাকে রান্নাঘরে পাঠান না। সোনার শরীরে পাতিলের কালি লাগুক চান না তিনি। হেমলতা হাসেন, পদ্মজা মুগ্ধ হয়ে দেখে। হেমলতার বয়স ছয়ত্রিশ। শ্যামলা চেহারা, দাঁতগুলো ধবধবে সাদা; চোখের মণি অন্যদের তুলনার বড়ো এবং কালো, চোখ দুটিকে পদ্মজার গভীর পুকুর মনে হয়। ছিমছাম গড়ন। পূৰ্ণা যেনো মায়েরই কিশোরী শরীর। তবে তারা তিন বোনই মায়ের মতো চিকন আর লম্বা হয়েছে।হেমলতা সম্মতি দিয়ে বললেন, ‘আজ তুই রাঁধবি।’পদ্মজা ভাবেনি অনুমতি পাবে। সে আদুরে উল্লাসে প্রশ্ন করল, সত্যি আম্মা?’‘সত্যি। আছরের আজান সেই কবে পড়েছে! দ্রুত যা।’পদ্মজা রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছে। পূর্ণা-প্রেমা হিজল গাছের নিচে পাটি বিছিয়ে লুডু খেলছে। প্রেমা বার বার বাটপারি করায় এ নিয়ে কিছুকক্ষণ পর পর তর্কও হচ্ছে তাদের মাঝে।সকালে বৃষ্টি হয়েছিল। রান্না করতে গিয়ে পদ্মজা ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ পেল। মাটির ঘ্রাণ তাকে খুব টানে।মোর্শেদ বাড়ি ফিরে পদ্মজাকে রাঁধতে দেখে কপাল কুঁচকে ফেলেন। ঘরে ঢুকে হেমলতাকে মেজাজ দেখিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, ‘এই ছেড়ি রান্ধে ক্যান?’হেমলতা নির্লিপ্তভাবে জবাব দেন, ‘আমি বলেছি।’‘কতদিন কইছি—এই ছেড়ির হাতের রান্ধন আমারে না খাওয়াইতে?’মোর্শেদের কঠিন স্বর পদ্মজার কানে আসে। মায়ের অনুমতি পাওয়ার খুশিটুকু মুহূর্তে ফাটা বেলুনের মতো চুপসে যায়। সে জানে এখন ঝগড়া শুরু হবে। তার আম্মা, আব্বার অনুচিত কথাবার্তা মাটিতে পড়তে দেন না। তার আগেই জবাব ছুঁড়ে দেন।‘খেতে ইচ্ছে না হলে খাবা না।’রাইতবেলা না খাইয়া থাকবাম আমি?’‘খাবার রেখেও যদি না খেতে চাও সেটা তোমার সমস্যা। আমি বা আমার মেয়ে কেউই না করিনি।’মোর্শেদ কিছু নোংরা কথা শোনাতে প্রস্তুত হোন। হেমলতা সেলাই মেশিন রেখে উঠে দাঁড়ান। তিনি বুঝে গিয়েছেন মোর্শেদ কী বলবেন। আঙুল তুলে শাসিয়ে মোর্শেদকে বললেন, ‘একটা নোংরা কথা উচ্চারণ করলে আমি আজ তোমাকে ছাড় দেব না। পদ্ম তোমার মেয়ে। আল্লাহ সইবে না। নিজের মেয়ে সম্পর্কে এত নোংরা কথা কোনো বাবা বলে না।’মোর্শেদ নোংরা কথাগুলো হজম করে নিলেন। তবে কিড়মিড় করে বললেন, ‘পদ্ম আমার ছেড়ি না।’‘পদ্ম তোমার মেয়ে। আর একটা কথাও না। বাড়িতে অনেক মানুষ। নিজের বিকৃত রূপ লুকিয়ে রাখ।’মোর্শেদ দমে যান। চৌকিতে বসে বড়ো করে নিশ্বাস ছাড়েন। চোখের দৃষ্টি অস্থির। পদ্মজার জন্মের পর থেকেই হেমলতার রূপ পালটে গেছে। কিছুতেই এই নারীর সঙ্গে পারা যায় না। অথচ, একসময় হেমলতাকে কত মেরেছেন! হেমলতার পিঠে, উরুতে, ঘাড়ে এখনো মারের দাগ আছে। সময় কোন যাদুবলে হেমলতাকে পালটে দিল, জানা নেই মোর্শেদের।.রাতের একটা শুট করে সবাই বিশ্রাম নিচ্ছিল। চিত্রা তখন কথায় কথায় জানাল, ‘মগা যে মেয়েটার কথা বলেছিল, তাকে দেখতে লাহাড়ি ঘরে গিয়েছিলাম।’চিত্রার কথায় লিখন আগ্রহ পেল না। মেয়েটা কখনো কোনো মেয়ের প্রশংসা করে না। খুঁত খুঁজে বের করে সেটা নিয়ে আলোচনা করতে তার ভীষণ আগ্রহ। নিজেকে সে খুঁতহীন সেরা সুন্দরী মনে করে। ‘মেয়েটার নাম পদ্মজা। মগা, পুরো নামটা যেন কী?’চিত্রা ওর সঙ্গে কথা বললে, মগা খুব লজ্জা পায়। এখনো পেল। লাজুক ভঙ্গিতে জবাব দিল, ‘উম্মে পদ্মজা।’‘হ্যাঁ, উম্মে পদ্মজা।’চিত্রার পাশ থেকে সেলিনা পারভীন প্রশ্ন করলেন, ‘কী নিয়ে আলাপ হচ্ছে?’সেলিনা পারভীন চলমান চলচ্চিত্রে চিত্রার মায়ের অভিনয় করছেন। চিত্রা বলল, ‘এই বাড়ির মালিক যিনি, উনার বড়ো মেয়ের কথা বলছি। এমন সুন্দর মুখ আমি দুটি দেখিনি। মেয়েটার মুখ দেখলেই বুকের ভেতর নিকষিত, বিশুদ্ধ ভালো লাগার জন্ম হবে। ভগবান এত শ্রী দিয়েছেন মেয়েটাকে!হতবাক হয়ে গেল লিখনসহ উপস্থিত প্রত্যেকে। চিত্রার মুখে অন্য নারীর প্রশংসা! অবিশ্বাস্য! সবাইকে অবাক হয়ে তাকাতে দেখে বিব্রতবোধ করল চিত্রা। গলার জোর বাড়িয়ে বলল, ‘সত্যি বলছি! সন্ন্যাসী ছাড়া কোনো পুরুষ এই মেয়েকে উপেক্ষা করতে পারবে না।’পদ্মজাকে নিয়ে বেশ খানিকক্ষণ আলোচনা চলল তাদের মাঝে। আগ্রহ বেশি দেখাল লিখন। কিন্তু যখন শুনল পদ্মজার ষোলো বছর, তখন দমে গেল। ছোটো মেয়ে! হয়তো এমন বয়সি বেশিরভাগ মেয়েরা স্বামীর ঘরে থাকে, তবুও লিখনের পদ্মজাকে খুব ছোটো মনে হচ্ছে। তার একটা বোন আছে, ষোলো বছরের। এখনো দুই বেণি করে স্কুলে যায়, কত ছোটো দেখতে! নিজের ক্ষণ-সময়ের অভিলাষের কথা ভেবে আনমনে হেসে উঠল লিখন। চিত্রা তখনো পদ্মজার রূপের প্রশংসা করছিল।.হিজল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে পদ্মজা। রাতের জোনাকি পোকা চারিদিকে। পদ্মজা প্রায় রাতে মুগ্ধ হয়ে দেখে জোনাকি পোকাদের। মনে হয় দল বেঁধে হারিকেন নিয়ে নাচছে তারা! তবে এই মুহূর্তে রাতের সৌন্দর্যটুকু পদ্মজার মনে দাগ কাটতে পারছে না। ঠোঁট কামড়ে কাঁদছে সে, খুব জ্বলছে চোখ দুটো। রান্না খারাপ হওয়ার অজুহাতে থালা ভরতি ভাত-তরকারি তার মুখে ছুঁড়ে দিয়েছেন মোর্শেদ। চোখে ঝোল পড়েছে, তা নিয়ে হেমলতার সে কী রাগ! মোর্শেদ অবশ্য চুপ ছিলেন। তিনি তো রাগ মিটিয়েই ফেলেছেন। আর তর্ক করে কী হবে?পেছনে এসে হেমলতা দাঁড়ালেন। ডাকলেন, ‘পদ্ম?’পদ্মজা তাকাল।হেমলতা ভেজা কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, ‘খুব জ্বলছে?’পদ্মজা জবাব দিতে পারল না। ঠোঁট ভেঙে কেঁদে উঠল। মা ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ নেই তার। মা বাদে আর কারো আদরও পাওয়া হয়নি। সবাই তার দোষ খোঁজে। হেমলতার বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরোল। পদ্মজা ছিঁচকাঁদুনে। ছোটো থেকে বাবার অনাদর আর অপমানে বিদ্ধ হয়ে কেঁদে চলেছে তবুও চোখের জল ফুরোয় না, মন শক্ত হয় না। এমন হলে তো চলবে না!পদ্মজার কান্নার বেগ বাড়ল। হেমলতা সদ্য কাটা বড়ো গাছটির গুঁড়িতে বসে, চুপ করে পদ্মজার ফোঁপানো শুনছেন। একটিবারের জন্যও কান্না থামানোর চেষ্টা করলেন না। যখন চাঁদ মাথার উপরে চলে এলো তখন ক্লান্ত হয়ে পদ্মজা নিজেই থেমে গেল। শান্ত হয়ে বসল মায়ের পাশে। হেমলতা উদাস গলায় বললেন, ‘এভাবে চলবে না পদ্ম।পদ্মজা মায়ের দিকে তাকাল। হেমলতা বললেন, ‘শোন পদ্ম, কেউ আঘাত করলে কাঁদতে নেই। কারণ মানুষ আঘাত করে কাঁদানোর জন্যই। যখন উদ্দেশ্য সফল হয়ে যায় তখন তারা শান্তি পায়। যে তোকে আঘাত করল তাকে কেন তুই শান্তি দিবি? শক্ত থাকবি। বুঝিয়ে দিবি তুই এত দুর্বল না। যাকে তাকে পাত্তা দিস না। হাজার কষ্টেও কাঁদবি না। কান্না সাময়িক সময়ের জন্য মন হালকা করে। পুরোপুরি নয়। যে তোকে আঘাত করবে তাকে তুই তোর চাল-চলন দিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দিবি। তখন তার মুখটা দেখে তোর যে শান্তিটা হবে সেটা কান্না করার পর হবে না। এই শান্তি স্থায়ী!’হেমলতার কথা পদ্মজার ওপর প্রভাব ফেলল না। সে করুণ স্বরে বলল, ‘কিন্তু আব্বার ব্যবহার আমার সহ্য হয় না আম্মা। আমার সঙ্গে কেন এমন করে আব্বা?‘তাকে কখনো সামনাসামনি আব্বা ডাকার সুযোগ পেয়েছিস? পাসনি! তবুও কেন আব্বা-আব্বা করিস? তুইও তাকে পাত্তা দিবি না।’‘তুমি খুব কঠিন আম্মা।’‘তোকেও হতে হবে।’‘আব্বা কেন এমন করে, আম্মা? আমি কি আব্বার মেয়ে না? আব্বা কেন বার বার বলেন, আমি তার মেয়ে না।’এহেন প্রশ্নে হেমলতা চোখ সরিয়ে নিলেন। পদ্মজা জানে এই জবাব সে পাবে না। সে দাঁতে দাঁত চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করল।হেমলতা পরম স্নেহে একহাত পদ্মজার মাথায় রেখে বললেন, ‘কাঁদিস না আর। মায়ের রং না হয় পাসনি। মায়ের মতো শক্ত হওয়ার তো চেষ্টা করতেই পারিস।’পদ্মজা নির্লজ্জ হয়ে আবার প্রশ্ন করল, ‘আম্মা, আমি কি আব্বার মেয়ে না? বলো না আম্মা।’পদ্মজার চোখ বেয়ে জল পড়ছে। মায়া হচ্ছে হেমলতার, বুক ভারি হয়ে আসছে। তিনি আবেগ লুকিয়ে কণ্ঠ কঠিন করার চেষ্টা করলেন, ‘মার খাবি, পদ্ম। কতবার বলব, তুই আমার আর তোর আব্বার মেয়ে!’‘কী নাম আমার আব্বার?’কী শান্ত কণ্ঠ পদ্মজার! হেমলতা চমকালেন, তবে তা প্রকাশ করলেন না। মেয়েদের সামনে তিনি কখনো দুর্বল হতে চান না। পদ্মজার দিকে ঝুঁকে কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বললেন, ‘তোর আব্বার নাম, মোর্শেদ মোড়ল।’পদ্মজা হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। মার ওপর বিরক্তি জন্মাছে, খুব কঠিন করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, যাও এখান থেকে। আমার কাছে আর আসবে না। কখনো না।’কিন্তু এমন ব্যবহার কখনো করতে পারবে না সে…কক্ষনো না। রাতের বাতাসে ভেসে আসছে হাসনাহেনা ফুলের ঘ্রাণ, আকাশে থালার মতো চাঁদ; ঝিরিঝিরি মোলায়েম বাতাস চারিদিকে। পদ্মজার চোখের জল শুকিয়ে যায়। হেমলতা ঝিম মেরে বসে আছেন। মা-মেয়ে পাশাপাশি বসে থেকেও যেন কত দূরে! নিজেদের মতো ভেবে যাচ্ছে এটা-সেটা নিয়ে। হঠাৎ নিস্তব্ধতা কাটিয়ে একটা অসহায় কণ্ঠ ভেসে এলো: ‘মায়েরা তাদের জীবনের গোপন গল্প সন্তানদের বলতে পারে নারে পদ্ম।’পদ্মজা তাকাল। হেমলতা ছলছল চোখে তাকিয়ে আছেন। পদ্মজার বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। এই মানুষটাকে এত নরম রূপে মানায় না।মাকে আশ্বস্ত করে পদ্মজা বলল, ‘আমি আর কখনো জানতে চাইব না আম্মা।’শুটিং দলের একজনও বাড়িতে নেই। সবাই স্কুল মাঠে গেছে। কয়দিন ধরে নদীর ঘাটে যেতে না পেরে তৃষ্ণার্থ হয়ে উঠেছে পদ্মজা। এই সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। হেমলতার অনুমতি নিয়ে সে ঘাটে চলে যায়, সিঁড়িতে বসে আয়েশ করে। কয়েক মুহূর্ত পর শুনতে পায়, গান বাজছে কোথাও। পদ্মজা গানের সুর অনুসরণ করে নিচের দিকে নামে। ঘাটের বাঁ- পাশে বাঁধা নৌকায় একজন পুরুষ বসে আছে, হাতে রেডিয়ো। গানের উৎস তাহলে এখানেই। পদ্মজা বিব্রতবোধ করে। দ্রুত উলটো দিকে ঘুরে ব্যস্ত পায়ে চলে আসে লাহাড়ি ঘরে। তাকে এত দ্রুত ফিরতে দেখে হেমলতা প্ৰশ্ন করলেন, ‘কেউ ছিল?’পদ্মজা ওপর-নিচে মাথা নাড়াল। হেমলতা চিন্তিত স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়লেন, ‘কিছু বলেছে? দেখতে কেমন?’‘না, আম্মা, কিছু বলেনি। আমাকে দেখেনি। মাথার চুল ঝাঁকড়া। মুখ খেয়াল করিনি।’পূর্ণা অংক করছিল। পদ্মজার মুখে আগন্তুকের বর্ণনা শুনে হই হই করে উঠল, ‘এইটাই তো লিখন শাহ, নায়ক।’হেমলতা আড়চোখে মেয়ের দিকে তাকান। নায়ক-নায়িকাদের প্রতি পূর্ণার যে তীব্র আগ্রহ, তা ভালো লাগে না তার। পূর্ণা মায়ের চাহনি দেখে দমে যায়।সারাক্ষণ শুটিং দলের আশপাশে ঘুরঘুর করে মেয়েটা। হেমলতা বিরক্ত হয়ে তাকে কড়া নিষেধ দিয়েছেন, আর যেন না যায়; যদি যায়…মার একটাও মাটিতে পড়বে না। পূর্ণা ভয় পেয়েছে। কিন্তু লিখন শাহ আর চিত্রা দেবী জুটিটা এত ভালো লাগে তার যে শুটিং না দেখলে দম বন্ধ হয়ে আসে। তাই সে চুপিসারে টিনে একটা ছিদ্র করেছে। হেমলতা সেলাই মেশিন রেখেছেন লাহাড়ি ঘরের পেছনের বারান্দায়, সারাক্ষণ সেখানেই থাকেন। সেই সময় পূর্ণা ছিদ্র দিয়ে উঁকি দিয়ে শুটিং দেখে।পূর্ণার এই আচরণ দেখতে দেখতে একদিন পদ্মজারও আগ্রহ জন্মাল। সাত-পাঁচ ভেবে একদিন উঁকি দিয়ে বসল সে-ও।ঝাঁকড়া চুলের মানুষটি একজন অতি সুন্দরী মেয়েকে কোলে তুলে নিয়েছে। মানুষটির দৃষ্টি মোহময়। বাড়ি জুড়ে গানের সুরধ্বনি। কেউ কেউ ক্যামেরা ধরে রেখেছে। গানের শুটিং চলছে বোধহয়! অদ্ভুত ঠেকছে পদ্মজার, লজ্জা পেয়ে চোখ সরিয়ে নিলো সে।
রাতে ঝড় উঠেছিল। লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে বহু গাছপালা। লাহাড়ি ঘরের পেছনে তৈরি পথ বন্ধ হয়ে গেছে গাছের ভাঙা ডালপালা পড়ে। মোর্শেদ রাতে বাড়ি ফেরেননি। হেমলতার একার পক্ষে সম্ভব নয় ডালপালা সরানো। তাই পদ্মজা আর পূর্ণা স্কুল থেকে ফিরছিল বাড়ির সামনের পথ দিয়ে। উঠোনে শুটিং দলের সবাই উপস্থিত। পদ্মজার মাথা নত, ঘোমটা টানা লম্বা করে। এত মানুষের সামনে দিয়ে যেতে তার হাঁটু কাঁপছে। আজ যেন পথ শেষই হচ্ছে না। উপস্থিত অনেকের নজরে চলে এলো পদ্মজা। মিলন নামে একজন পূর্ণাকে ডাকল, ‘এই পূৰ্ণা!’পূর্ণা দাঁড়াল, সঙ্গে পদ্মজা; যদিও মেয়েটা শুটিং দলটির দিকে তাকাচ্ছে না। মিলন পদ্মজার দিকে চোখ স্থির রেখে পূর্ণাকে প্রশ্ন করল, ‘পাশের মেয়েটা কে? প্রথম দেখছি।’‘আমার বড়ো আপা।’‘আপন?’মিলন আশ্চর্য হয়ে বলল। দশ দিন হলো তারা এখানে এসেছে, কখনো পূর্ণা-প্রেমা ছাড়া কোনো মেয়েকে চোখে পড়েনি, কণ্ঠও শোনা যায়নি। তাই বড়ো বোন বলাতে সে খুব অবাক হলো। পূর্ণা হেসে বলল, ‘হুম। আপন। ‘মিলন বিড়বিড় করে বলল, ‘চেহারায় তো মিল নেই।’‘সবাই বলে।’‘আচ্ছা, যাও।’দুই বোন লাহাড়ি ঘরে চলে যায়, হাঁফ ছেড়ে বাঁচে পদ্মজা। ভেতরটা এত কাঁপছিল! সে অনেক মানুষের পা দেখেছে, তবে চোখ তুলে তাদের মুখ দেখার সাহস হয়নি। কিন্তু হ্যাঁ…ইচ্ছে হয়েছিল বটে! সিনেমায় যারা অভিনয় করে, তারা দেখতে কেমন? সাধারণ মানুষের মতোই?নাকি অন্যরকম?.বিকেলে হাজেরা নামক এক মহিলা আসে মোড়ল বাড়িতে, সে সবুর মিয়ার স্ত্রী। সবুর দিনরাত গাঁজা খেয়ে পড়ে থাকে, বউ-বাচ্চাদের খোঁজ রাখে না। হাজেরা এর-ওর বাড়ি গিয়ে এটা-ওটা চেয়ে নেয়, খায় দুই বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে। পদ্মজার খুব মায়া হয় হাজেরার জন্য। মহিলা আসতেই হেমলতা পদ্মজাকে প্রশ্ন করলেন, ‘গাছে কয়টা লাউ আছে?’‘নয়টা, আম্মা।’‘পূর্ণা কোথায়? ওরে বল দুইটা লাউ হাজেরাকে দিয়ে দিতে। কাঁচামরিচও দিতে বলবি।’পদ্মজার নীরবতা দেখে হেমলতা বুঝতে পারেন পূর্ণা বাড়িতে নেই। ‘পূর্ণা কী টিভি দেখতে গেছে?’পদ্মজাকে দ্বিধাগ্রস্ত হতে দেখা গেল। বিব্রতভাবে বলল, ‘আম্মা, আমাকে ব…বলে গেছে।’‘তুই ওর অভিভাবক? একটু শরীরটা খারাপ লাগছিল বলে শুয়েছিলাম। ওমনি সুযোগ লুফে নিয়েছে!‘আম্মা, আমার দোষ। পূর্ণাকে কিছু বোলো না।পদ্মজার ভেজা কণ্ঠ হেমলতার রাগ উড়িয়ে দিল। তিনি অন্য দিকে মুখ করে শুয়ে বললেন, ‘হাজেরাকে নিয়ে যা। ঘোমটা টেনে যাবি। বেগুন বেশি থাকলে কয়টা দিয়ে দিস।’পদ্মজার মন ভরে গেল। তার মা এত বেশি উদার! কখনো কাউকে ফিরিয়ে দেন না। সামর্থ্যের মধ্যে আরো বেশি কিছু দেওয়ার মতো থাকলে, তিনি কখনো কার্পণ্য করেন না। তবে হাজেরার স্বভাব অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে, চুরি করার প্রবণতা আছে তার মাঝে। তাই পদ্মজাকে সঙ্গে যেতে বলেছেন।উঠোনের এক কোণে, লাহাড়ি ঘরের ডান পাশে লাউয়ের মাচা। নয়টা লাউ ঝুলছে তাতে। চোখের সামনে শুধু তরতাজা, টাটকা সবুজ পাতা। পদ্মজা বাড়ির দিকে তাকাল না। একটা লাউ হাজেরার হাতে দিয়ে বলল, ‘কী দিয়ে রান্না হবে?’‘জানি না গো পদ্ম। গিয়া দেহি মাছ মিলানো যায়নি।’‘তোমার ছোটো ছেলের ঠান্ডা কমেছে?’পদ্মজা কাঁচামরিচ ছিঁড়ে হাজেরার আঁচল ভরে দিল। হাজেরা গুঞ্জন করে কাঁদছে আর বলছে, ‘ছেড়াডা সারাদিন মাডিত পইড়া থাহে একলা একলা। রাইত হইলে জ্বরে কাঁপে। দম ফালাইতে পারে না।’‘ডাক্তার দেখাচ্ছ না কেন?’‘টেহা লাগব না? কই পামু?’‘তুমি মাতব্বর বাড়িতে যাও। শুনছি, উনারা খুব দান-খয়রাত করেন।’হাজেরা বাধ্যের মতো মাথা নাড়াল। বেগুন গাছ বাড়ির পেছনে। সাবধানে বাড়ির পেছনে গেল পদ্মজা। সে মনে মনে ভাবছে—হাজেরার ছেলে সুস্থই আছে। সকালেই দেখেছে ছেলেটাকে, দিব্যি খেলাধুলা করছিল। দেখে যে কেউ বলবে: সুস্থ। হাজেরা মিথ্যা বলছে।মানুষের খুব অভাব পড়লে বুঝি এমনই হয়?‘এতো সবজি আছে! টমেটো নেই? পাওয়া যাবে?পরিষ্কার সহজ গলায় বলা পুরুষালী কণ্ঠটা পদ্মজাকে মৃদু কাঁপিয়ে তুলল। ঘুরে তাকাল সে, ব্রিত বোধ করল লিখনকে দেখে। কারো সামনে নিজের অস্বস্তি প্রকাশ করা উচিত না—কথাটি হেমলতা বলেছেন। পদ্মজা হাসার চেষ্টা করে জবাব দিল, ‘এই বর্ষাকালে টমেটো কোথায় পাবেন?‘বর্ষাকালে টমেটো চাষ হয় না?’‘টমেটো শীতকালীন ফসল।’‘গ্রীষ্ম-বর্ষাতেও তো পাওয়া যায়।’পদ্মজা অস্বস্তি লুকিয়ে রাখতে পারছে না। স্কুলের শিক্ষক আর খুব আপন মানুষগুলো ছাড়া কোনো পর-পুরুষের সঙ্গে তার কখনো কথা হয়নি। লিখনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে জবান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সে চুপচাপ বেগুন বুঝিয়ে দিল হাজেরাকে। লিখন বলল, ‘আমি তো গতবার বর্ষাকালেও টমেটোর সালাদ তৈরি করেছি!’‘হয়তো টমেটোর জাত আলাদা ছিল। আমাদের এখানে সাধারণত শীতকালেই টমেটো হয়।’দ্রুত জবাব দিয়ে লাহাড়ি ঘরে ফিরল পদ্মজা। মনে হচ্ছে পর-পুরুষের সঙ্গে কথা বলে ঘোর পাপ করে ফেলেছে, পাপ মোচন করতে হবে। ঘরে ঢুকে ঢকঢক করে দুই গ্লাস পানি খেল। হেমলতা ঘুমাচ্ছেন। নয়তো পদ্মজার মুখ দেখে নির্ঘাত বুঝে যেতেন, কিছু একটা ঘটেছে। পদ্মজা ভক্তি নিয়ে আল্লাহ তায়ালার প্রতি শুকরিয়া আদায় করল।.হেমলতা সালোয়ার-কামিজ সেলাই করছিলেন। তখন বারান্দার সামনে একজন পুরুষ লোক এসে দাঁড়াল। শাড়ির আঁচল মাথায় টেনে নিলেন হেমলতা, জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন লোকটা দিকে। লোকটি হেসে বলল, ‘আমি শুটিং দলের মিলন।’হেমলতা জোরপূর্বক হাসার চেষ্টা করলেন। আড়চোখে তাকালেন ঘরের দরজার দিকে। পদ্মজা ঘুমাচ্ছে, দরজাটা লাগানো দরকার। তিনি সোজা প্রশ্নে চলে যান, ‘কোনো দরকার?’‘না, এমনি দেখতে আসলাম। কতদিন হলো আপনাদের বাড়িতে উঠলাম। এদিকটায় আসা হয়নি।’হেমলতা পেঁচিয়ে কথা বলা পছন্দ করেন না। সরাসরি বলে উঠলেন, ‘এদিকে আসা নিষেধ। আপনাদের বলা হয়নি?’মিলনের জ্বলজ্বল করা চোখেমুখে ছায়া নেমে আসে, অপমানিত বোধ করল সে। আমতা আমতা করে বলল, ‘ইয়ে…আচ্ছা, আসছি।’মিলন স্থান ত্যাগ করল। তবে যাওয়ার পূর্বে তার তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টি হেমলতার নজর এড়াতে পারল না। হেমলতা চোখ বুজে জীবনের হিসেব কষেন, নরম দৃষ্টিতে তাকান ঘুমন্ত পদ্মজার দিকে। তিনি নিশ্চিত, এই লোক পদ্মজাকেই দেখতে এসেছিল।এখন পূর্ণার চেয়ে পদ্মজার বেশি আগ্রহ শুটিং দেখার। টিনের ছিদ্র আরো দুটো করেছে। লিখন শাহকে দেখলে তার ঠান্ডা, কোমল অনুভূতি হয়। এই অনুভূতির নাম সে জানে না। শুটিংয়ে লিখন শাহ কত ভালোবাসেন চিত্রা দেবীকে, পদ্মজার দেখতে খুব ভালো লাগে।পূর্ণা তেলের বোতল নিয়ে বলল, ‘আপা, তেল দিয়ে দাও না।’‘সোনা বোন, একটু দাঁড়া।’পদ্মজা ছিদ্র দিয়ে লিখন শাহর হাসি, কথা বলার ভঙ্গী দেখছে। লজ্জাও পাচ্ছে। সময়টাকে থামিয়ে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে তার।‘এই আপা। পরেও তো দেখতে পারবে। দিয়ে দাও না।’‘আরেকটু। শুটিং শুরু হচ্ছে। একটু…’পূর্ণার রাগ হয় খুব। কিন্তু সে আপাকে কিছু বলবে না। তার সব ইচ্ছের সঙ্গী, সব গোপন কথার স্বাক্ষী তার আপা। আপাকে খুব ভালোবাসে সে। মাঝে মাঝে মনে হয়…সেই ভালোবাসাটুকু যেন মায়ের প্রতি ভালোবাসার চাইতেও বেশি…কিংবা হয়তো না। পদ্মজা মিটিমিটি হাসছে। পূর্ণা তেল রেখে ছিদ্র দিয়ে উঁকি দিল।নাহ! তার এখন ভালো লাগছে না এসব দেখতে। চোখ সরিয়ে নিলো সে।‘কী রে পদ্ম? কী দেখছিস?’হেমলতার কণ্ঠ শুনে চমকে উঠল পদ্মজা। আরক্ত হয়ে উঠল তার গাল। ডাকাতি করতে গিয়ে বাড়ির মালিকের কাছে ধরা পড়লে যেমন অনুভূতি হয়, তেমন অনুভূতি হচ্ছে তার। উহু, এই অনুভূতি আরও বেশি ভয়ংকর! হেমলতার দৃষ্টি গেল টিনের ছিদ্রের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে পদ্মজা অনুভব করল, তঁর পায়ের নিচের মাটি কাঁপছে। পূর্ণা ভয়ার্ত চোখে একবার মাকে একবার বোনকে দেখছে।ছিদ্রের গুরু তো সে! মারও সে খাবে।
হেমলতা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দুই মেয়েকে দেখছেন। টিনের গায়ে তৈরি ছিদ্র তিনটের দিকে চোখ রেখে প্রশ্ন করলেন, ‘শুটিং দেখছিলি?’পদ্মজা বাধ্যের মতো মাথা ঝাঁকায়। হেমলতা চোখ দুটি হঠাৎ শীতল হয়ে এলো।তিনি চৌকিতে বসে প্রশ্ন ছুঁড়লেন, ‘ছিদ্রের বুদ্ধি পূর্ণার?প্রশ্নটা শুনে পূর্ণার গলা শুকিয়ে যায়। এক ফোঁটা পানি দরকার, নয়তো দম বেরিয়ে যাবে। পদ্মজা চকিতে চোখ তুলে তাকাল। অসহায় কণ্ঠে বলল, ‘আম্মা, আর হবে না। পূর্ণাকে কিছু বলো না। ওর দোষ নেই। আমি…’হেমলতা পদ্মজাকে কথা শেষ করতে দিলেন না। প্রেমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘প্রেমা, তোর আব্বা কোথায়?’‘উঠানে আম্মা।’‘গিয়ে বল, আমি ডাকছি।’প্রেমা একছুটে গিয়ে আবার একছুটে ফিরে এলো। হেমলতা বারান্দা পেরিয়ে চুলার কাছে গিয়ে বসেন। তখন মোর্শেদ এসে জানতে চাইলেন, ‘কী হইছে? ডাক ক্যারে?’‘মেয়েদের চৌকির পাশে একটা জানালা করে দাও। মুরগির খোপের কাছে কাঠ আছে।’‘কেন?’‘আমি চেয়েছি তাই, না পারলে না করো; অন্য কাউকে ডাকব।’‘ত্যাড়া কথা কওন ছাড়ো।’‘তোমার সঙ্গে ভালো করে কথা বলতে ভালো লাগে না।’‘লাগব ক্যারে? তোমার তো আমারে পছন্দ না। তোমার পছন্দ বিলাই চোখা ব্যাটা ছ্যাড়ারে।’‘অহেতুক কথা বোলো না। মাসের পর মাস কোথায় থাকো, তা আমার অজানা নয়। রোগে ধরলেই লতার কথা মনে পড়ে।’মোর্শেদ মিনিটখানেক রাগ নিয়ে তাকিয়ে রইলেন।.মোর্শেদ ঘণ্টাখানেক সময় নিয়ে দুই ফুট উচ্চতার একটি জানালা তৈরি করে দিলেন। পদ্মজা-পূর্ণা হতবাক, সেই সঙ্গে খুশিও। হেমলতা জানালায় ছোটো পর্দা টানিয়ে দিলেন। রুম থেকে বাইরের দৃশ্য দেখা যায়, কিন্তু জানালার ওপাশে কে আছে তা বাহির থেকে বোঝা যায় না।সন্ধ্যায় শুটিং শুরু হলো। পদ্মজা-পূর্ণা-প্রেমা চৌকিতে বসল চিড়া নিয়ে তাদের চোখেমুখে খুশির ঝিলিক। হেমলতা মৃদু হাসলেন। বড়ো মেয়ে দুটো কখনো মুখ ফুটে শখ-আহ্লাদের কথা বলে না। না বলা সত্ত্বেও অনেকবার তিনি দুই বোনের ইচ্ছে পূরণ করেছেন। আর কিছু ইচ্ছে বুঝতে পারলেও পূরণের সামর্থ্য হয়নি তার। যতটুকু পারেন ততটুকুই করেন।হেমলতা ঘরের বাইরে যেতেই পূর্ণা বলল, ‘আমাদের মায়ের মতো সেরা মা আর কেউ না। তাই না আপা?’‘মায়ের মতো কেউ হয় না। সবার কাছে সবার মা সেরা। আমাদের মা আমাদের কাছে সেরা। লাবণ্যর মা লাবণ্যর কাছে সেরা। মনির মা মনির কাছে সেরা।’‘ওরা বলেছে?’‘দূর বোকা! এসব বলতে হয় না।’‘না, আমাদের আম্মাই সবচেয়ে ভালো মা। এমন মা আর একটাও নেই।’হেমলতার কর্ণকুহরে প্রতিটি কথা আসে। পূর্ণা সবার অনুভূতি অনুভব করতে জানে না। পদ্মজা জানে।পদ্মজা হেসে বলল, ‘আমাদের আম্মা সত্যি সেরা। আলাদা।’পূর্ণা জানালার বাইরে চোখ রেখে প্রশ্ন করল, ‘আপা, চিত্রা দিদিকে কেমন লাগে?’পদ্মজা চিত্রার দিকে তাকাল। ছাইরঙা শাড়ি পরা, হাতে কালো রঙের ঘড়ি। ফুলহাতা ব্লাউজ; শালীন, তবে সর্বাঙ্গে আধুনিকতার ছোঁয়া। নাকে সাদা পাথরের নাকফুল, লম্বা চুল বেণি করে রেখেছে; মুখে খুব মায়া। স্নিগ্ধ একটা মুখ, যেন শরতের শুভ্র এক টুকরো মেঘ। পদ্মজা বলল, ‘আমার দেখা দ্বিতীয় সুন্দর মেয়েমানুষ চিত্ৰা দিদি।’পূর্ণা আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল, ‘প্রথম কে?’পদ্মজা কণ্ঠ খাদে নামিয়ে মোহময় কণ্ঠে বলল, ‘আমাদের আম্মা।’সঙ্গে সঙ্গে হেমলতার বুক শীতল, কোমল অনুভূতিতে ছেয়ে গেল। পদ্মজা এত সুন্দর করে ‘আমাদের আম্মা’ বলেছে! হেমলতা প্রথম…এই প্রথম শুনলেন, তিনি সুন্দর! ভূবন মোহিনী রূপসীর মুখে শুনলেন। এই আনন্দ কোথায় রাখবেন? কেন ছেলেমানুষি অনুভূতিতে তলিয়ে যাচ্ছেন তিনি! প্ৰেমা অবাক স্বরে বলল, ‘আম্মা তো কালো। চিত্রা দিদির চেয়ে সুন্দর কীভাবে?’‘এভাবে বলছিস কেন প্রেমা? তুই ফরসা হয়ে গেছিস বলে কালোকে ভালো মনে হয় না?’ পূর্ণা গমগম করে উঠল। বোনের কথা শুনে ভয় পেল প্ৰেমা।পদ্মজা বলল, ‘বকছিস কেন? প্রেমা কত ছোটো। ও কী সুন্দরের গভীরতা বুঝে? ও খালি চোখে কালো-সাদার তফাৎ দেখে।’‘সুন্দরের গভীরতা তো আমিও বুঝি না।’পূর্ণার কণ্ঠ ভারী নিষ্পাপ শোনাল। পদ্মজা এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে নিলো হেমলতার উপস্থিতি। এরপর বলল, ‘আম্মার রং কালো। কিন্তু সৌন্দর্যের কমতি নেই। আম্মাকে কখনো এক মনে দেখিস, বুঝবি। আমাদের আম্মার চোখ দুটি গভীর, বড়ো-বড়ো; পাতলা, মসৃণ ঠোঁট আম্মার ঘন চুলের খোঁপায় এক আকাশ কালো মেঘ। আম্মার শাড়ির কুঁচির ভাজে আভিজাত্য লুকানো। আম্মা যখন তীক্ষ্ণ চোখে আমাদের দিকে তাকান, তখন মনে হয়: প্রকাণ্ড কোনো রাজ্যের রানি তার পূর্বপুরুষের ক্ষমতা প্রকাশ করছেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে। এতকিছু থাকা সত্ত্বেও কি আম্মা আমাদের দেখা প্রথম সুন্দর মানুষ হতে পারেন না?’পদ্মজার প্রতিটি কথা পূর্ণার ওপর ভীষণ ভাবে প্রভাব ফেলে। ওদিকে প্রেমা চোখ পিটপিট করে কিছু ভাবছে।পূর্ণা উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল, ‘কাল থেকে আমি আম্মাকে মন দিয়ে দেখব।’‘আমিও,’ প্রেমাও পূর্ণার দলে যোগ দিল।আবেগের সাইক্লোনে দুই ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল হেমলতার চোখ বেয়ে, কিছুতেই আটকে রাখতে পারলেন না। এই কালো রঙের জন্য ছোটো থেকে সমাজের তুচ্ছতাচ্ছিল্য পেয়ে এসেছেন! লুকিয়ে কত কেঁদেছেন। কত করে চেয়েছেন, কেউ তাকে সুন্দর বলুক। কিন্তু সেই কপাল কখনো হয়নি। আর আজ, এই বয়সে এসে শুনলেন—তিনি কুৎসিত নন। তার মাঝেও সৌন্দর্য আছে! জন্মদাত্রী মা গায়ের কালো রঙের জন্য গরম চামচ দিয়ে ঘাড়ে পোড়া দাগ বসিয়ে দিয়েছিলেন। আর আজ গর্ভের সন্তান সেই অনুচিত কাজের জবাব দিল! আল্লাহর সৃষ্টি কেউ অসুন্দর নয়। সবার মধ্যেই সৌন্দর্য আছে……যা ধরা পড়ে শুধুমাত্র সুন্দর একজোড়া চোখে…পদ্মজার সুন্দর চোখে!.নিশুতি রাত। চারিদিকে ঝিঁঝিপোকার ডাক। হুট করে হেমলতার ঘুম ভেঙে গেল। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ইঙ্গিতে জানান দিচ্ছে ষড়যন্ত্রের। লাহাড়ি ঘরের ডান পাশে দুইজোড়া পায়ের আওয়াজ। হেমলতার বুক কেঁপে উঠল। দ্রুত উঠে বসলেন তিনি, দুই চৌকির মাঝের পর্দা সরিয়ে দেখে নিলেন পদ্মজার অবস্থান। পদ্মজাকে ঘুমাতে দেখে স্বস্তি পেলেন, ছাড়লেন আটকে যাওয়া নিশ্বাস। পায়ের আওয়াজ খুব কাছে শোনা যাচ্ছে। হেমলতা ডান পাশে তাকালেন। গাঢ় অন্ধকার ছাড়া কিছু দেখা যাচ্ছে না। তবুও তিনি তাকিয়ে আছেন। দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে, টিনের ওপাশে থাকা অদৃশ্য গোপন শত্রুকে তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন।‘কে ওখানে?’হেমলতার ঝাঁঝালো কণ্ঠে পায়ের আওয়াজ থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর ছুটে পালাল দুইজোড়া পা।
ভোর, বাইরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। সেই সঙ্গে সুন্দর ঠান্ডা একটা হাওয়া বইছে। বৃষ্টি পড়ার কারণে আকাশ মেঘলা, চারপাশটা একটু অন্ধকারাচ্ছন্ন। হালকা আলোতেই মেঝেতে শীতল পাটি বিছিয়ে তিন বোন পড়ছে। ঝমঝম করে বৃষ্টি হয়েছে রাতভর, বর্ষা-স্নানে প্রকৃতি স্নিগ্ধ। এমন সকালে কেউ কেউ ঘুমাতে চায়, আর কেউ-বা বই পড়তে পছন্দ করে…অথবা পছন্দের অন্য যেকোনো কাজ করে। পূর্ণার ঘুমাতে ইচ্ছে করছে, পড়া একদমই সহ্য হচ্ছে না। পদ্মজাকে বলল, ‘আর কতক্ষণ? ঘুমাতে চাই আপা।’পদ্মজা নিচু গলায় বলল, ‘এইটুকু শেষ করে ঘুমিয়ে পড়িস।’‘আম্মা তো আরো পড়তে বলল।’‘কিছু হবে না। এই যে…’ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ‘এইটুকু পড় ভালো করে, তাহলেই আম্মা ছুটি দিবে।’পূর্ণা মনের বিরুদ্ধে গিয়েই পড়া শেষ করল। হেমলতা প্রথমে ছুটি দিতে না চাইলেও পদ্মজার অনুরোধে ছেড়ে দিলেন। ছুটি পেয়ে দৌড়ে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল পূর্ণা, সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে গেল গভীর ঘুমে।কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি থেমে রোদ উঠল। স্কুলের জন্য তৈরি হয়ে পূর্ণাকে অনেক ডাকল পদ্মজা, সাড়া পেল না। এদিকে স্কুলে যাওয়ার সময় হয়েছে। হেমলতা বাইরে থেকে উঁকি দিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘পূর্ণা ঘুমে?’‘জি, আম্মা।’‘সে জানে না স্কুল আছে? তবুও কোন আক্কেলে ঘুমাল?’মায়ের রাগের ফলাফল ভেবে পদ্মজা শঙ্কিত। আজ পূর্ণা নির্ঘাত মার খাবে। সে হেমলতাকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘তুমি যাও আম্মা। পূর্ণা কিছুক্ষণের মধ্যে তৈরি হয়ে যাবে।’হেমলতা জানেন, পূর্ণা এত সহজে ঘুম থেকে উঠবে না। প্রায়ই এমন হয়। যতই আদর করে ডাকা হোক না কেন, বৃষ্টিমাখা সকালে তার ঘুম ভাঙানো যুদ্ধের সমান। বাঁশের কঞ্চিকে পূর্ণা ভীষণ ভয় পায়, অথচ কঞ্চির বাড়ি না খাওয়া অবধি ঘুম তাকে কিছুতেই ছাড়ে না! এ যেন ভূত তাড়ানো। হেমলতা বাঁশের কঞ্চি আনতে বাঁশ বাগানের দিকে চলে যান। এদিকে পদ্মজা ডেকেই যাচ্ছে, ‘পূর্ণা? ওঠ। মারটা খাওয়ার আগে ওঠ। এই পূর্ণা। পূর্ণা রে…পূর্ণা, উঠ।’পূর্ণা পিটপিট করে চোখ খুলে আবার ঘুমিয়ে যাচ্ছে। প্রেমা এই ব্যাপারটা খুব উপভোগ করে। একটা মানুষ এত ডাকাডাকির পরও কী করে ঘুমিয়ে থাকতে পারে? সে নিষ্কম্প স্থির চোখে তাকিয়ে আছে বড়ো দুই বোনের দিকে। হেমলতা হাতে বাঁশের কঞ্চি নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। তা দেখে পদ্মজা পূর্ণাকে জোরে চিমটি কাটে, কিন্তু মুখে বিরক্তিকর আওয়াজ তুলে আবার ঘুমে তলিয়ে যায় পূর্ণা।তুই সর পদ্ম। ও মারের যোগ্য। পিটিয়ে ওর ঘুম ছুটাতে হবে, হেমলতার রাগান্বিত স্বর।পদ্মজা মায়ের কথার ওপর কিছু বলার সাহস পেল না, দূরে গিয়ে দাঁড়াল। হেমলতা পূর্ণার পায়ের গোড়ালিতে কঞ্চি দিয়ে বাড়ি দিতেই একটা আওয়াজ হলো প্যাঁচ করে। ভয়ে চোখ বুজে ফেলল পদ্মজা। ইস! পায়ের চামড়া ছিঁড়ে গেছে বোধহয়। ঘুমন্ত পূর্ণার মস্তিষ্ক জানান দেয়, আম্মা এসেছেন এবং তিনি আঘাত করছেন। সে চোখ খোলার আগেই দ্রুত উঠে বসল। চোখ খুলতে খুলতে যদি দেরি হয়ে যায়! বোকাসোকা মুখ করে মায়ের দিকে তাকাল পরিস্থিতি বুঝতে। পদ্মজা ঠোঁট টিপে হাসছে, প্রেমা জোরে হেসে উঠল। হেমলতা কড়া চোখে তাকাতেই থেমে গেল দুই বোনের হাসি। পূর্ণা ভীতু কণ্ঠে বলল, ‘আর হবে না আম্মা।’‘সে তো প্রতিদিনই বলিস।’‘আজই শেষ। আম্মা…আম্মা মেরো না।’ সে লাফিয়ে উঠে চৌকির কোণে গিয়ে বসে।এমন সময় ঘন মেঘে আকাশ ছেয়ে গেল, শোনা গেল বজ্রপাতের আওয়াজ। মনে মনে পূর্ণা-প্রেমা খুশি হলো। আজ আর স্কুলে যেতে হবে না। বাড়ি থেকে দুই ক্রোশ দূরে স্কুল। আম্মা নিশ্চয় যেতে না করবেন। পূৰ্ণা খুশি লুকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘মেঘ আসবে মনে হয়। যাব স্কুলে?’‘মেঘ তোর কী সমস্যা করল? এখনি যাবি স্কুলে। তৈরি হ।হেমলতা চলে যেতেই পূর্ণা ভ্রুকুঞ্চন করে থম মেরে বসে রইল।পদ্মজা তাড়া দেয়, ‘বসে আছিস কেন? জলদি কর। নয়তো আবার মার খাবি।’পূর্ণা তীব্র বিরক্তি নিয়ে স্কুলের জন্য প্রস্তুত হয়।বর্ষাকাল চলছে। রাতে বিরতিহীনভাবে বৃষ্টি হওয়ায়, কাদা জমেছে রাস্তায়। পথ চলা কষ্টকর।তিন বোন হাতে জুতা নিয়ে পা টিপে হাঁটছে। তাদের মনে কাজ করছে পিছলে পড়ে বই খাতা নষ্ট হওয়ার ভয়। অর্ধেক পথ যেতে না যেতেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। পথের পাশ থেকে বড়ো তিনটে কচু পাতা ছিঁড়ল পদ্মজা। পূর্ণা-প্রেমার হাতে দুটো দিয়ে নিজের মাথায় ধরল তৃতীয়টি, তবে তাতে লাভ হলো না। মাথা না ভিজলেও, শরীর ও বই-খাতা ভিজে একাকার হয়ে গেল।পূর্ণা বিরক্তি প্রকাশ করল, ‘ধ্যাত! ভিজে স্কুলে গিয়ে লাভ কী আপা? দেখো, হাঁটু অবধি পায়জামা কাদা আর বৃষ্টির পানি দিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।’পদ্মজা চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল, ‘বুঝতে পারছি না কী করব! স্কুলে যাব? নাকি বাড়ি ফিরব।’‘আপা, বাড়ি যাই।’ বলল প্রেমা।পদ্মজা একটু ভাবল। এরপর দুই বোনকে বলল, ‘ভিজে তো কতবারই গেলাম। আজও যাই। সমস্যা কী?’অগত্যা স্কুলেই যেতে হলো। পদ্মজা সম্মতি না দিলে বাড়িতে গিয়েও উঠতে পারবে না তারা। স্কুল ছুটির আগেও বৃষ্টি পুরোপুরি থামেনি। তখন গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। বৃষ্টিতে ভিজে ভিজেই বাড়ি ফেরার পথ ধরল দুই বোন। প্রেমার এক ঘণ্টা আগে ছুটি হয়েছে। পদ্মজা নিচু কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, ‘স্কুলে আব্বা এসেছিলেন?’‘হুম। প্রেমাকে নিয়ে গেছে।’‘তোর সঙ্গেও তো দেখা হলো।’পদ্মজার গলাটা করুণ শোনায়। পূর্ণার মন খারাপ হয়। আব্বা কেন তার এত ভালো আপাকে ভালোবাসে না?বৃষ্টির পানি ও মাটি মিশে কাদায় একাকার হয়ে গেছে পুরো পথ। কাদামাটিতে হাঁটার মতো ভোগান্তি আর নেই। পূর্ণা যেভাবে হেলেদুলে হাঁটছে তাতে পদ্মজার ভয় হচ্ছে, পড়ে না যায়। সে বোনকে ডেকে বলল, ‘পূর্ণা, সাবধানে হাঁট। পড়ে যাবি।’তার সাবধানী বাণী শেষ হতেই ধপাস করে কাদামাটিতে পড়ে গেল পূর্ণা। আঁতকে উঠে পদ্মজা। পূর্ণার পা নিমিষে ব্যথায় টনটন করে ওঠে। পদ্মজা দুই হাতে আঁকড়ে তোলার চেষ্টা করে। পূর্ণা কিছুতেই ওঠাতে পারছে না। পা যেন ব্যথায় অবশ হয়ে গেল।কাঁদো কাঁদো হয়ে পদ্মজাকে বলল, ‘আপা, পা ভেঙে গেল মনে হয়। ইস…এত ব্যথা করছে!’‘মচকেছে বোধহয়। ঠিক হয়ে যাবে। ওঠার চেষ্টা কর। আমার গলা ধরে ওঠ।গ্রামের পথ, গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে বলে পথে কেউ নেই। গৃহস্থরা ভাতঘুম দিয়েছে। সামনের বিলে থইথই জল, তার পাশে খেত; ডানে-বাঁয়ে কাদামাটির পথ, পেছনে ঝোপঝাড়। পদ্মজা সাহায্য করার মতো আশপাশে কাউকে দেখতে পেল না। এদিকে পা সোজা করার শক্তি পাচ্ছে না পূৰ্ণা, প্রচণ্ড ব্যথা! ঠোঁট কামড়ে কাঁদছে সে। পদ্মজা না পারছে পূর্ণাকে তুলতে, আর না পারছে পূর্ণার কান্না সহ্য করতে। সে মনে মনে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, ‘আল্লাহ, কিছু করো। সাহায্য করো।’ একটু পর পূর্ণাকে বলল, ‘বোন আমার, একটু চেষ্টা কর উঠতে।’পদ্মজার উৎসাহে পূর্ণা পায়ের পাতা মাটিতে ফেলল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ব্যথার বিজলি চমকে ওঠল তার পুরো শরীরে। ‘ও মা! আপা রে, পারছি না। আমার পা শেষ। মরে যাব আমি।’‘এসব বলিস না। পায়ের ব্যথায় কেউ মরে!’অল্পক্ষণের মাঝেই আহত পা ফুলে দুই ইঞ্চি উঁচু হয়ে গেছে! তা দেখে আতঙ্কে চোখ-মুখ নীল হয়ে গেল পদ্মজার, কান্না পাচ্ছে তার। পদ্মজা আলতো করে চাপ দিতেই পায়ের ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠল পূর্ণা।‘একটু সাবধানে হাঁটলে কী হতো? ইশ, এখন কী কষ্টটা হচ্ছে।’ পদ্মজার চোখ জলে ভরে উঠেছে।‘আপা…আপা, ব্যথায় মরে যাচ্ছি।’পদ্মজা খুব কাছে পায়ের শব্দ পেল। চকিতে চোখ তুলে তাকাল সে খেতের দিকে; পরমুহূর্তে হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটে। সে উচ্ছ্বাসে চেঁচিয়ে উঠল, ‘পূর্ণা রে, আম্মা আসছে!’হেমলতাকে দেখে পূর্ণা কলিজায় পানি প্রায়, মাকে দেখেই যেন ব্যথা অনেকটা কমে গেছে। হেমলতা ছুটে আসেন। পূর্ণার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘কিছু হয়নি। এসব সামান্য ব্যাপার।এরপর পদ্মজাকে বললেন, ‘তুই বইগুলো নে।’হেমলতা এদিকে সেলাই করা কাপড় দিতে এসেছিলেন। যার কাপড় ছিল, সে অসুস্থ। তাই যেতে পারছিল না। বাড়িতেও কোনো কাজে মন টিকছিল না। তাই ছাতা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। ঘরে চুপচাপ বসে থাকার চেয়ে একটা মানুষকে সাহায্য করা ভালো। ফেরার পথে তিনি দূর থেকে দুটো বিপর্যস্ত মেয়েকে দেখতে পেলেন। একটা মেয়ে পথে বসে আছে, আরেকটা মেয়ে তাকে তোলার চেষ্টা করছে। মেয়ে দুটিকে চিনতে পেরে বুক কেঁপে ওঠে তার। পথ দিয়ে আসলে দেরি হবে বলে তিনি খেতের ভেতর দিয়েই ছুটে এসেছেন।পূর্ণা ব্যথায় যেন নিশ্বাস নেয়ার শক্তি পাচ্ছে না। একটা ভ্যান পাওয়া গেলে খুব উপকার হতো। আশ্চর্যভাবে দুই মিনিটের মাথায় দেখা মিলল ভ্যানের! ভ্যানে চিত্রা, লিখনসহ আরো দুজন, তারা মাতব্বর বাড়িতে গিয়েছিল। আরেকটু এগোতেই পদ্মজা আর তার মা-বোনকে দেখতে পেল চিত্রা, উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ভ্যানচালককে বলল, ‘চাচা, ভ্যান থামান।’চিত্রার দৃষ্টি অনুসরণ করে লিখনের নজরে ব্যাপারটা আসতেই সে তাড়াহুড়ো করে ভ্যান থেকে নেমে আসে, চিত্রাও বসে নেই। চোখে-মুখে ভয় নিয়ে জানতে চাইল, ‘কী হয়েছে? পূর্ণার কী হয়েছে?পদ্মজা বলল, ‘কাদায় পড়ে পা মচকে গেছে।’হেমলতা, চিত্রা, পদ্মজা এবং পূর্ণাকে ভ্যানে তুলে দিয়ে লিখনসহ বাকি দুজন সহকর্মী ভ্যান ছেড়ে দিল। তারা মোড়ল বাড়িতে হেঁটেই ফিরবে।.অনেকটা কমেছে পা ব্যথা, দুটি বালিশের ওপর রাখা হয়েছে পা। ব্রেস নেই বলে ব্রেসের মতো কাপড় বেঁধে দিয়েছেন হেমলতা। যে ব্যথা পেয়েছে, তাতে কয়দিন স্বাভাবিক ভাবে হাঁটতেও পারবে না। হেমলতা মেয়েকে খাইয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘এবার খুশি? স্কুলে যেতে হবে না। কাজ করতে হবে না। সকালে উঠে পড়তে বসতে হবে না।পূর্ণা রাজ্যের দুঃখ নিয়ে বলল, ‘সবই ঠিক আছে। কিন্তু এখন টিভি দেখতে যাব কীভাবে?’সাড়া না পেয়ে পূর্ণা বুঝতে পারল, সে মুখ ফসকে ভুল জায়গায় ভুল কথা বলে ফেলেছে। বিব্রত হয়ে উঠল ও, ঢোক গিলল। এরপর কাঁচুমাচু হয়ে মিইয়ে যাওয়া গলায় বলল, ‘মোটেও খুশি হইনি।’পূর্ণার অগোচরে হেমলতা ঠোঁট চেপে হাসেন। আড়াল থেকে তা দেখে পদ্মজাও হাসল।তখন দিনের শেষভাগ। সূর্য মামা আকাশ গাঢ় লাল আভায় রাঙিয়ে বিদায় নিতে চলেছেন। আকাশের সঙ্গে মিশে রয়েছে ঘন মেঘ, সেই মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে দিনান্তের শেষ আলো। ঠিক তখন মগা এসে জানাল, মুন্নার বাপ খুন হয়েছে। কথাটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত সবার মাথায় যেন আছড়ে পড়ল বজ্র। পঙ্গু, ভিক্ষুক অসহায় মানুষটাকে আবার কে মারল? এমন মানুষের শত্রু থাকে? তাও আবার এমনই যে একেবারে মেরে ফেলল! হেমলতা শ্বাসরুদ্ধকর কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, ‘কখনকার ঘটনা?’মগা জানাল, দুপুরের কথা। দুপুর দুটো কি তিনটায় গ্রামবাসী জানতে পারে ঘটনাটি। আস্তে আস্তে সব গ্রামে খবর যাচ্ছে। লাশ নোয়াপাড়ার ধানখেতে পাওয়া গেছে। সবাই মিলে মুন্নার বাপকে দেখতে যায়। বাড়িতে রয়ে যায় শুধু পদ্মজা, প্রেমা ও পূর্ণা।পুলিশ লাশ নিয়ে যাওয়ার পর সবাই মুন্নাকে নিয়ে বিপাকে পড়ে। আত্মীয় বলতে তার কেউ নেই। দুঃসম্পর্কের যারা আছে তারা মুন্নার দায়িত্ব নিতে চাইল না। মাতব্বর মুন্নার ভার নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মুন্না জানাল, সে থাকলে পদ্মজাদের বাড়িতে থাকবে। হেমলতা মাতব্বরের অনুমতি নিয়ে সানন্দে মুন্নাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। এখন থেকে মুন্না এই বাড়ির ছেলে। পদ্মজা-পূর্ণা খুব খুশি হয়। খুশি হলো না শুধু প্রেমা। মুন্না ও প্রেমা সমবয়সি। প্রেমা ভাবছে, তার আদর এখন ভাগাভাগি হয়ে যাবে।হেমলতা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে পদ্মজাকে বললেন, ‘প্রেমার বোধহয় মুন্নাকে পছন্দ হচ্ছে না। দুজনের মধ্যে সখ্যতা করে দিস, যাতে একজন আরেকজনকে আপন চোখে দেখে।’পদ্মজা আশ্বস্ত করে বলল, ‘কয়দিন গেলেই মিশবেমুন্না বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। হেমলতা তাকে ঘরে এনেই গরম গরম ভাত খাইয়ে দিয়েছিলেন। খেয়েই ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়ে। রাত তো কম হলো না! মা-বোনের বৈঠক দেখে পূর্ণা বলল, ‘আম্মা, মুন্নার নতুন নাম রাখা উচিত।’‘কেন?’‘এখন থেকে মুন্না আমাদের ভাই। আমাদের নাম প দিয়ে। তাইলে ওর নাম-ও প দিয়ে হবে। তাই না আপা?’হেমলতা হেসে বললেন, ‘তুই নাম রাখ তাহলে।’‘রেখেছি তো। প্রান্ত মোড়ল।’‘মুন্নাকে আগে ওর নতুন নাম সম্পর্কে জানা, যদি রাজি হয় তখন সবাই এই নামে ডাকব। ওরও তো পছন্দ আছে।’‘রাজি হবে না মানে? পিটিয়ে রাজি করাবমেয়ের কথায় হেমলতা হাসলেন। পূর্ণা বলল, শ্বশুরবাড়ি থেকে গিয়ে আনার মতো একটা ভাই হলো আমাদের। আপাকে যখন বিয়ে দেব, আমি আর প্রান্ত গিয়ে আপাকে নিয়ে আসব তাই না আম্মা?’অসুস্থ হলে খুব কথা বলে পূর্ণা। মুখ বন্ধ রাখতেই পারে না। অনেক বছর আগের ঘটনা, বা কয়েক বছর পর কী হবে তা নিয়ে অনবরত কথা বলতে থাকে।.গহিন অন্ধকার। আজ বোধহয় অমাবস্যা। হেমলতা কালো চাদরের আবরণে ঘাপটি মেরে বারান্দায় বসে আছেন। হাতের কাছে ছুরি, লাঠি। গত তিন দিন ধরে ঘরের পাশে পায়ের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তখন ঘরে মোর্শেদ ছিলেন, আর যাই হোক—পুরুষ তো, তাই সাহসও ছিল বুকে। আজ মোর্শেদ নেই। মুন্নাকে দত্তক নিয়ে বাড়িতে আনায় তিনি ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়েছেন। কবে ফিরবেন ঠিক নেই! আজ কিছুতেই ঘুমানো যাবে না। হাতেনাতে সন্দেহকারীকে ধরে এই বিপদ থেকে মুক্ত হতে হবে। কিন্তু অনেকক্ষণ হলো কেউ আসছে না। চোখ বুজে আসছে হেমলতার। সারাদিন অনেক খাটুনি গেল।কাদামাটিতে ছপছপ শব্দ তুলে কেউ আসছে। হেমলতা সতর্ক হয়ে ওঠেন, শক্ত করে ধরলেন লাঠি-ছুরি। পায়ের শব্দটা কাছে আসতেই তিনি বেরিয়ে আসেন। অন্ধকারে মুখ পরিষ্কার নয়। আন্দাজে ছুঁড়ে মারেন হাতের লাঠি। লাঠিটা বেশ ভালোভাবেই পড়ল সামনে থাকা ছায়াটির ওপর, হতভাগা আর্তনাদ করে বসে পড়ল মাটিতে; ততক্ষণে পেছনের ছায়াটি দৌড়ে পালাল! প্রথমজনও পালানোর চেষ্টা করল, হেমলতার জন্য পেরে উঠল না। তিনি আরেকটা লাঠি দিয়ে আবার আঘাত করে বসেন, তার দৃষ্টি থেকে যেন আগুন স্ফুরিত হচ্ছে।আহত ব্যক্তির আর্তচিৎকার শুনে বাড়ির ভেতর থেকে ছুটে আসে সবাই। টর্চের আলোতে চারদিক আলোকিত হয়ে ওঠে। হেমলতা স্বাভাবিক ভঙ্গি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি যেন জানতেন এই ছায়াটিরই আসার কথা ছিল। আজই শুটিং দলকে বাড়ি থেকে বের করবেন। তবেই শান্তি! হই- হুল্লোড় শুনে পদ্মজা, প্রেমা, মুন্না বেরিয়ে আসে। পূর্ণা ঘরেই রইল।চোখের সামনে ডিরেক্টর আবুল জাহেদকে দেখে চমকে গেল পদ্মজা!আর ঠিক তখনই কোত্থেকে যেন আগমন ঘটল মোর্শেদের!
আবুল জাহেদকে আহত অবস্থায় দেখে সবাই চমকে গেল। তার কপাল বেয়ে রক্ত ঝরছে।ফার্স্ট এইড বক্স আনতে একজন দৌড়ে যায় বাড়ির ভেতর। লিখন কিছু সময়ের জন্য থমকাল। আবুল জাহেদের ক্ষতটা ব্যান্ডেজ করার পর তাকে একটা চেয়ারে বসতে দেয়া হয়। হেমলতা একহাতে লাঠিতে ভর দিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন।লিখন বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করল, ‘কী হয়েছিল? আপনি উনাকে আঘাত করেছেন কেন?’হেমলতা স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন, ‘এই অসভ্য লোক আজ চারদিন ধরে মাঝরাতে এখানে ঘুরঘুর করে। তার উদ্দেশ্য খারাপ।’লিখন চোখের কোণ দিয়ে পদ্মজাকে দেখে আবুল জাহেদকে প্রশ্ন করল, ‘উনি যা বলছেন, সত্যি?’আবুল জাহেদ গমগম করে উঠল, ‘এখানে আমি আজই প্রথম এসেছি। ঘুম আসছিল না তাই হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছি। বলা নেই, কওয়া নেই হুট করেই উনি আক্রমণ করে বসলেন। কী ব্যথা!’ কপালে হাত রাখল সে।হেমলতা প্রতিবাদ করলেন দৃঢ় স্বরে, ভুলেও মিথ্যে বলবেন না।’আবুল জাহেদ কিছুতেই তার উদ্দেশ্য স্বীকার করল না। তর্কে-তর্কে ভোরের আলো ফুটল। হেমলতা কঠিন করে জানিয়ে দিয়েছেন, আজই এই বাড়ি ছাড়তে হবে। হেমলতার সিদ্ধান্ত শুনে দলটির মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তীরে এসে নৌকা ডুববে নাকি! সিনেমার শেষ অংশটুকু এখনো বাকি। শর্ত অনুযায়ী আরো দশদিন সময় আছে। দলের একজন বয়স্ক অভিনেতা এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করলে হেমলতা জবাব দিলেন, ‘আমার তিনটা মেয়ের নিরাপত্তা দিতে পারবেন? একটা পুরুষ মানুষ রাতের আঁধারে যুবতী মেয়েদের ঘরের পাশ দিয়ে ঘুরঘুর কেন করবে? কীসের ভিত্তিতে?’কাউকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সবাইকে এড়িয়ে লাহাড়ি ঘরে চলে গেলেন হেমলতা। এদের সঙ্গে তর্ক করে শুধু সময়ই নষ্ট হবে। আবুল জাহেদের ধূর্ত চাহনি তার নজরে এসেছে বারংবার। প্রথম রাতে পায়ের আওয়াজ শুনে চিনতে পারেননি। পরদিন সন্দেহ তালিকায় থাকা চার-পাঁচ জনকে অনুসরণ করে তিনি নিশ্চিত হোন: রাতে কে লাহাড়ি ঘরের পাশে হেঁটেছিল। ঘরের ডান পাশে পলিথিন কাগজ দিয়ে ঢাকা তুষের স্তূপ রাখা আছে। অসাবধানতায় আবুল জাহেদের কাদা-মাখা জুতা তুষের স্তূপে পড়ে যায়, তাই তুষ লেগে যায় জুতায়। হেমলতা বাড়ির বারান্দায় সেই জুতাজোড়া দেখতে পান। তুষ বাড়ির আর কোথাও নেই, তাই ব্যস্ত হয়ে তুষের স্তূপের কাছে এসে দেখেন; একজোড়া জুতার ছাপ! সেই জুতা যখন আবুল জাহেদ পরল তখন তিনি পুরোপুরিভাবে নিশ্চিত হলেন, শেয়ালটা আসলে কে!শুটিং দলটার মধ্যে একটা হাহাকার লেগে গেছে। বেশ কিছুকক্ষণ তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা চলল। হেমলতাকে কিছু বলে লাভ নেই, তা প্রত্যেকে বুঝে গেছে; তাই সবাই মোর্শেদকে ধরল। বিনিময়ে তারা আরো টাকা দিতে রাজি আছে। হেমলতার ধমকের ভারে তখন চুপ হয়ে গেলেও, টাকার কথা শুনে মোর্শেদের চোখ দুটি জ্বলজ্বল করে ওঠে। ঘরে এসে হেমলতার সঙ্গে ধুন্ধুমার ঝগড়া লাগিয়ে দেন। হেমলতা প্রথমে কিছুতেই রাজি হোননি। তবে শেষ অবধি নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকতে পারলেন না। দলের কিছু ভালো মানুষের অনুরোধ ফেলতে বেশ অস্বস্তিবোধ করছিলেন। দশদিনের বদলে পাঁচ দিনের সময় দিলেন। যতক্ষণ এরা বাড়ি না ছাড়বে তিনি শান্তি পাবেন না। তবে একটা স্বস্তির নিশ্বাসও ফেললেন।ভাগ্যিস কোনো ঘটনা ঘটার আগে ব্যাপারটা সামলানো গেছে।বেশ গরম পড়েছে আজ। পদ্মজা পাটিতে বসে মনোযোগ দিয়ে মুন্নাকে শেখাচ্ছে; কাকে কী ডাকতে হবে।‘আমায় ডাকবি বড়ো আপা। পূর্ণাকে ছোটো আপা। আর প্রেমা তো তোর সমান। তাই প্রেমা ডাকবি। দুজন মিলেমিশে থাকবি। বুঝেছিস?’‘হ, বুঝছি।’‘আম্মাকে তুইও আম্মা ডাকবি। আমাদের আম্মা-আব্বা এখন থেকে তোরও আম্মা-আব্বা, বুঝেছিস?মুন্না বিজ্ঞ স্বরে বলল, ‘হ, বুঝছি।’হেমলতা রান্না রেখে উঠে আসেন। মুন্নাকে বললেন, ‘শুদ্ধ ভাষায় কথা বলবি। তোর পদ্ম আপা যেভাবে বলে।’মুন্নার সরল স্বীকারোক্তি, ‘কইয়ামনে।’পদ্মজা বলল, কইয়ামনে না। বল, আচ্ছা বলব।’মুন্না বাধ্য ছেলের মতো হেসে বলল, ‘আচ্ছা, বলব।’হেমলতা হেসে চলে যান। পূর্ণা রুম থেকে মুন্নাকে ডাকল, ‘মুন্না রে?’‘হ, ছুডু আপা।’পদ্মজা মুন্নার গালে আলতো করে থাপ্পড় দিয়ে বলল, বল—জি, ছোটো আপা।’মুন্না পদ্মজার মতো করেই বলল, ‘জি ছোটো আপা।’পদ্মজা হাসল। পূর্ণা বলল, ‘তোর নাম পালটাতে হবে। আমি তোর নতুন নাম রেখেছি।‘কেরে? নাম পালডাইতাম কেরে?’ পদ্মজা কিছু বলার আগে মুন্না প্ৰশ্ন করল, ‘আইচ্ছা এই কথাডা কেমনে কইতাম?’পদ্মজা হেসে কপাল চাপড়ায়, এই ছেলে তো আঞ্চলিক ভাষায় বুঁদ হয়ে আছে। পূর্ণা বলল, ‘তুই এখন আমাদের ভাই। আমাদের নামের সঙ্গে মিলিয়ে তোর নাম রাখা উচিত। উচিত না?’মুন্না দাঁত কেলিয়ে হেসে সায় দিল, ‘হ।’‘এজন্যই তোর নাম পালটাতে হবে। আজ থেকে তোর নাম প্রান্ত মোড়ল। সবাইকে বলবি এটা। মনে থাকবে?’‘হ, মনে রাহাম।’‘বল, আচ্ছা মনে রাখব।’‘আচ্ছা, মনে রাখব।’দুপুর গড়াতেই হাজেরা এলো। সঙ্গে নিয়ে এসেছে বানোয়াট গল্প আর বিলাপ। ইশারা-ইঙ্গিতে সে লাউ চাইছে। মোর্শেদ গতকাল সব লাউ বাজারে তুলেছেন, গাছে আর একটা ছিল। এদিকে ঘরে চিংড়ি মাছ আছে, প্ৰান্ত লাউ দিয়ে চিংড়ি খাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে বলে হেমলতা ছেলের ইচ্ছে পূরণ করতে হাসিমুখে শেষ লাউটা ছিঁড়ে এনে ঘরে রেখেছেন। এখন আবার হাজেরারও লাউ চাই! কেউ কিছু চাইলে হাতে থাকা সত্ত্বেও হেমলতা ফিরিয়ে দেননি। আজও দিলেন না। তিনি হাজেরাকে হাসিমুখে লাউ দিয়ে দিলেন। হাজেরা সন্তুষ্টি প্রকাশ করে চলে গেল। পদ্মজা মায়ের দিকে অসহায় চোখে তাকাল। প্রান্ত এই বাড়িতে এসে প্রথম যা চাইল, তাই পেল না। মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না তো! হেমলতা পদ্মজার দৃষ্টি বুঝেও কিছু বললেন না। প্রান্তকে ডেকে কোলে বসালেন। ছেলেটাকে দেখতে বেশ লাগছে। দুপুরে তিনি গোসল করিয়েছেন। মনে হচ্ছিল, কোনো ময়লার স্তূপ পরিষ্কার করা হচ্ছে। জন্মদাতার মৃত্যু প্রান্তের উপর বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলল না। এজন্য কেউই অবাক হয়নি। বাপ-ছেলের শুধু রাতেই একসঙ্গে থাকা হতো। অনেক রাত প্রান্ত একা থেকেছে। এইটুকু ছেলে কত রাত ভয় নিয়ে কাটিয়েছে! হেমলতা আদুরে কণ্ঠে বললেন, ‘একটা গল্প শোনাই। শুনবি?’‘হুনাও।’পদ্মজা প্রান্তের ভাষার ভুল ধরিয়ে দিল, ‘হুনাও না। বল, শোনাও, আম্মা।’প্রান্ত মাথা কাত করে হেমলতাকে বলল, ‘শোনাও, আম্মা।’আম্মা ডাকটা শুনে হেমলতা বুক বিশুদ্ধ ভালোলাগায় ছেয়ে গেল। তিনি কণ্ঠে ভালোবাসা ঢেলে বললেন, ‘আমাদের একদিন মরতে হবে জানিস তো?’‘হ।’‘জান্নাত-জাহান্নামের কথা কখনো কেউ বলেছে?’প্রান্ত মাথা দুই পাশে নাড়াল, কেউ শোনায়নি। হেমলতা এমনটাই সন্দেহ করেছিলেন। প্রান্ত এ সম্পর্কে জানে না। তিনি ধৈর্য নিয়ে সুন্দর করে জান্নাত-জাহান্নামের বর্ণনা দিলেন। জান্নাতের বর্ণনা শুনে প্রান্তের চোখ দুটি জ্বলজ্বল করে উঠল। প্রশ্ন করল হাজারটা। হেমলতাকে জানাল, সে জান্নাতে যেতে চায়; জাহান্নামে যেতে চায় না। হেমলতা বললেন, ‘আচ্ছা, এখন গল্পটা বলি। মন দিয়ে শুনবি।’প্রান্ত মাথা কাত করে হ্যাঁ সূচক সম্মতি দিল। হেমলতা বলতে শুরু করলেন, ‘একজন মহিলা একা থাকত বাড়িতে। না, দুটি ছেলেমেয়ে থাকত তার সঙ্গে, খুব ছোটো ছোটো; খুব অভাব তাদের। ছোটো একটা জায়গায় মাটির ঘর। ঘরের সামনে শখ করে একটা লাউ-চারা লাগায়। লাউ গাছ বড়ো হয়, পাতা হয় অনেক। এই লাউ পাতা দিয়ে দিন চলে তাদের। কখনো সিদ্ধ করে খায়। নুন-মরিচ পেলে শাক রেঁধে খায়। তো একদিন একজন ভিক্ষুক এলো। ভিক্ষুকটি খায় না দুই দিন ধরে। লাউ গাছে পাতা দেখে তার ভীষণ খেতে ইচ্ছে করে। লাউ গাছের মালিককে ভিক্ষুক বলে, লাউ পাতা দিতে, রেঁধে খাবে। খুব অনুনয় করে বলে। মহিলাটির মায়া হয়। ভিক্ষুক মহিলাকে কথা শোনাতে শোনাতে কয়েকটা লাউ পাতা ছিঁড়ে দেয়। তার কয়দিন পর লাউ গাছের মালিক মারা গেল। গ্রামবাসীসহ মসজিদের ইমাম মিলে দাফন করে তাকে। বুঝতে পেরেছিস প্রান্ত?’‘হ।’প্রান্ত মনোযোগ দিয়ে শুনছে, মনোযোগী শ্রোতা সে। হেমলতা বাকিটা শুরু করলেন, ‘গ্রামের ইমাম একদিন স্বপ্ন দেখেন, যে মহিলাটিকে তিনি দাফন করেছেন তার চারপাশে আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। কিন্তু তার গায়ে আঁচ অবধি লাগছে না। মহিলাটিকে ঘিরে রেখেছে লাউ পাতা! তাই আগুন কাছে ঘেঁষতে পারছে না। ওই যে সে এক ভিক্ষুককে নিজের একবেলা খাবারের লাউ পাতা দান করেছিল? সেই লাউ পাতা এখন তাকে কবরের শাস্তি থেকে বাঁচাচ্ছে। জাহান্নাম থেকে বাঁচতে আমাদের অনেক ইবাদত করা উচিত। তার মধ্যে একটি হলো দান। সামর্থ্য অনুযায়ী দান করা উচিত। কাউকে ফিরিয়ে দেয়া উচিত না। বোঝা গেছে?’‘হ, বুঝছি। আমিও অনেক দান করাম।’‘হুম। করবি। অনেক বড়ো হবি জীবনে। আর অনেক দান-খয়রাত করবি। আচ্ছা, প্রান্ত এখন যদি কোনো অভাবী এসে বলে, তোর লাউটা দিতে। তুই কী করবি?’প্রান্ত গম্ভীর হয়ে ভেবে বলল, ‘দিয়া দিয়াম।’‘একটু আগে একজন মহিলা এসেছিল, দেখেছিস?’‘হ, দেখছি।’‘সে খুব গরিব। বাড়িতে ছোটো ছোটো বাচ্চা আছে। এসে বলল, লাউ দিতে। তাই তোর লাউটা দিয়েছি। এজন্য কী এখন তোর মন খারাপ হবে?’‘লাউড়া তো তুমি দিছো। তাইলে তোমারে আগুন থাইকা বাঁচাইব লাউডা?’‘লাউটা আমি দিলেও, তোর জন্য ছিল। তুই এখন খুশি মনে মেনে নিলে লাউটা তোকে আগুন থেকে বাঁচাবে।’হেমলতার কথায় প্রান্তর চোখেমুখে দীপ্তি ছড়ায়। পরপরই মুখ গম্ভীর করে প্রশ্ন করল, ‘একটা লাউ কেমনে বাঁচাইব আমারে?’প্রান্তর নিষ্পাপ কণ্ঠে প্রশ্নটা শুনে হেমলতা-পদ্মজা-পূর্ণা হেসে উঠল পদ্মজা বলল, ‘কয়টা পাতা অনেকগুলো হয়ে মহিলাটাকে বাঁচিয়েছিল। তেমন একটা লাউ অনেকগুলো হয়ে তোকে বাঁচাবে।’প্রান্ত একটার পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। হেমলতা হেসে হেসে তার উত্তর দিচ্ছেন। পদ্মজার হুট করেই প্রান্তের থেকে চোখ সরে হেমলতার ওপর পড়ে।মা হাসলে সন্তানদের বুকে যে আনন্দের ঢেউ উঠে তা কী মায়েরা জানেন? পদ্মজার আদর্শ তার মা। সে তার মায়ের মতো হতে চায়। হুবহু মায়ের মতো!পাঁচদিন শেষ। শুটিং দলের মধ্যে খুব ব্যস্ততা। সবকিছু গোছানো হচ্ছে। তাড়াহুড়ো করে পাঁচ দিনে শেষ করা হয়েছে শুট। লিখন উঠানে চেয়ার নিয়ে বসে আছে। চিত্রা এসে তার পাশে বসল, কাশির মতো শব্দ করল লিখনের মনোযোগ পেতে। তাকাল লিখন, ম্লানমুখে প্রশ্ন করল, ‘সব গোছানো শেষ?’হুম, শেষ। তুমি তো কিছুই গুছাওনি!’‘বিকেলে রওনা দেব। আমার আর কী আছে গোছানোর? দুপুরেই শেষ করে ফেলব।’‘মন খারাপ?’লিখন কিছু বলল না, তাকাল লাহাড়ি ঘরের দিকে; দৃষ্টিতে শূন্যতা, কিছু ফেলে যাওয়ার বেদনা। বুকের বাঁ পাশে চিনচিন করা ব্যথাটা আর সহ্য হচ্ছে না। চিত্রা হাতঘড়ি পরতে পরতে বলল, ‘ছোটো বোনের সমান বলে ঠোঁট বাঁকিয়ে ছিলে। এখন তার প্রেমেই পড়লে।’লিখন কিছু বলল না, তবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল একটা। চিত্রা বলল, ‘পদ্মজা কিন্তু অনেক বড়োই। শুনেছি, আগামী মাসে ওর সতেরো হবে। এই গ্রামে সতেরো বছর বয়সি অবিবাহিত মেয়ে হাতেগোনা কয়টা। পদ্মজার নব্বই ভাগ সহপাঠী বিবাহিত। তাছাড়া খুব কম মেয়েই স্কুলে পড়ে।’চিত্রার কথা অগ্রাহ্য করে লিখন বলল, ‘তোমার বিয়েটা কবে হচ্ছে?’‘ভগবান চাইলে বছরের শেষ দিকে।’কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই ঢাকা রওনা দেবে। হেমলতা-মোর্শেদ বিদায় দিতে এসেছেন। দলটার তিন-চার জনের চরিত্রে সমস্যা থাকলেও, বাকিরা খুব ভালো। তারা হেমলতার সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। নিজের বাড়ি মনে করে থেকেছে, বাড়ির দেখাশোনা করেছে। লিখন হেমলতার আড়ালে একটি সাহসিকতার কাজ করে ফেলল। ব্যস্ত পায়ে চলে গেল লাহাড়ি ঘরের দিকেবারান্দায় বসেছিল পদ্মজা। লিখনকে দেখে ভয়ে কেঁপে উঠল তার বুক। পদ্মজাকে কিছু বলতে দিল না লিখন। সে দ্রুত বারান্দায় উঠে পদ্মজার হাতে একটা চিঠি গুঁজে দিয়ে জায়গা ত্যাগ করল।প্রবলভাবে কাঁপছে পদ্মজা। এমনকি পূর্ণাও চৌকি থেকে ব্যাপারটা খেয়াল করে হতভম্ব। খোঁড়ার মতো ধীর পায়ে হেঁটে এলো সে। ততক্ষণে পদ্মজার সারা শরীর বেয়ে ঘাম ছুটছে, হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে গেছে। হাত থেকে পড়ে গেল চিঠি, সেই চিঠিটি দ্রুত কুড়িয়ে নিলো পূর্ণা।পদ্মজার মনে হচ্ছে—এখনই সে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে! হেমলতা এসে দেখেন পদ্মজা হাঁটুতে থুতনি ঠেকিয়ে বসে আছে। কেমন দেখাচ্ছে যেন। তিনি উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘পদ্ম? শরীর খারাপ?মায়ের কণ্ঠ শুনে পদ্মজা ভয় পেল। বাতাসে অস্বস্তি, নিশ্বাসে অস্বস্তি; চোখ দুটি স্থির রাখা যাচ্ছে না, নিশ্বাস এলোমেলো। পূর্ণা পরিস্থিতি সামলাতে বলল, ‘আম্মা, আপার মাথাব্যথা।’‘হুট করে এমন মাথাব্যথা উঠল কেন? পদ্ম রে, খুব ব্যথা?’পদ্মজা অসহায় চোখে পূর্ণার দিকে তাকাল। আকস্মিক ঘটনায় সে ভেঙে পড়েছে। ডান হাত কাঁপছে অনবরত। হেমলতা চোখ ঘুরিয়ে দুই মেয়েকে দেখলেন। এদের হাবভাব হঠাৎ সন্দেহজনক লাগছে। তিনি কঠিন স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘কী লুকোচ্ছিস দুজন? কেউ এসেছিল?’মায়ের প্রশ্নে পদ্মজার চেয়ে পূর্ণা বেশি ভয় পেল। হাতের চিঠিটা আরো শক্ত করে চেপে ধরল সে।কী লেখা আছে না পড়ে এই চিঠি হাতছাড়া করবে না সে।