BDBOYS...
BDBOYS...
সবচেয়ে সাম্প্রতিক খবর ও পোস্টসমূহ
পদ্মজা রান্নাঘরে জুলেখা বানুকে দেখে অবাক হলো। অচেনা হলেও সালাম দিল, ‘ আসসালামু আলাইকুম।’জুলেখা তীক্ষ্ণ চোখে পদ্মজার দিকে তাকালেন। অবহেলার স্বরে বললেন, ‘ওয়ালাইকুম আসসালাম।’রিনু ছিল রান্নাঘরে। পদ্মজা রিনুর দিকে তাকিয়ে ইশারায় প্রশ্ন করলো, অচেনা মহিলাটি কে? রিনু হেসে বললো, ‘মৃদুল ভাইজানের আম্মা।’পদ্মজার ঠোঁটে হাসি ফুটলো। জুলেখার দিকে এক পা এগিয়ে এসে বললো, ‘ দুঃখিত! চিনতে পারিনি। আপনি প্লেট ধুচ্ছেন কেন? রাখুন। আমি ধুয়ে দিচ্ছি।’জুলেখা মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তিনি চুপচাপ প্লেট ধুয়ে, চুপচাপ বেরিয়ে গেলেন। মুখের প্রতিক্রিয়াতে পদ্মজার প্রতি ছিল অবজ্ঞা,ঘৃণা। পদ্মজা মনে মনে আহত হয়। জুলেখার দৃষ্টি ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়ার মতো ছিল। পদ্মজা জুলেখার যাওয়ার পানে চেয়ে রইলো। রিনু পদ্মজার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। ফিসফিসিয়ে বললো, ‘আমার মনডা কয়,এই বেডির উপর জিনের আছড় আছে!’পদ্মজা রিনুর দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকালো। বললো, ‘উনি আমাদের বাড়ির মেহমান! মুখে লাগাম দাও রিনু। পূর্ণার জন্য খাবার নিতে পারবো?’লতিফা শাড়ির আঁচল দিয়ে হাত মুছতে মুছতে রান্নাঘরে ঢুকলো। পদ্মজার প্রশ্নের জবাবে বললো, ‘হ পদ্ম, নিতে পারবা। খাড়াও আমি দিতাছি। তুমি খাইবা কখন?’‘পূর্ণা আর আমার খাবার একসাথেই দিয়ে দাও বুবু।’‘দিতাছি। রিনু জলদি ওই বাডিডা(বাটি) দে।’রিনুর বদলে পদ্মজা এগিয়ে দিলো। খাবার নিয়ে উপরে যাওয়ার সময় পদ্মজাকে দেখে জুলেখা হাতের গ্লাস শব্দ করে টেবিলে রাখলেন। পদ্মজা বুঝতে পারে,জুলেখার ঘৃণা ও বিরক্তির কারণ! বোধহয় গতকালের অপবাদ তিনি শুনেছেন। পদ্মজার ভয় হয়। পূর্ণার বিয়েটা হবে তো? জুলেখাকে দেখে মনে হচ্ছে,বিয়ের কথা বলার অবস্থাতেও তিনি নেই। জুলেখার কপাল আর ভ্রুযুগলে পদ্মজার চোখ আটকে যায়। যেন হেমলতার কপাল আর ভ্রু দেখছে সে। হুবহু একরকম! পদ্মজার বুকটা হুহু করে উঠে। সে দুই চোখ মেলে জুলেখার কপালের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখের দৃষ্টিতে যেন জন্ম জন্মান্তরের দুঃখ। পদ্মজাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জুলেখা উঠে চলে যান। পদ্মজার সম্বিৎ ফিরলো। সে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে তৃতীয় তলায় চলে আসে। পূর্ণা দুই হাতে একটা বালিশ জড়িয়ে ধরে পরম আবেশে ঘুমাচ্ছে। জুলেখার কপাল,ভ্রু দেখে জেগে উঠা ব্যথা পূর্ণাকে দেখে আরো বেড়ে যায়। হেমলতার যৌবনকাল পূর্ণার বর্তমান রূপের প্রতিচ্ছবি। সেই মুখ,সেই ঠোঁট,সেই গাল। নাকের পাটা মসৃণ। এতো মিল দুজনের! পদ্মজা পূর্ণার মাথায় হাত রেখে হেমলতার কথা ভাবে।পুরনো স্মৃতিগুলো চোখের পাতায় জ্বলজ্বল করছে। পদ্মজা পূর্ণার মুখের দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করলো, ‘আম্মা।’তার দুই চোখ জলে ভরে উঠে। পূর্ণা কী কখনো জানবে? পদ্মজা পূর্ণার ঘুমন্ত মুখ দেখে বহুবার আম্মা বলে কেঁদেছে! সে মনকে বুঝিয়েছে, এইতো আম্মা আছে! আমার সামনেই আছে! আমি এতিম নই!পদ্মজা হাতের উল্টোপাশ দিয়ে চোখের জল মুছলো। পূর্ণা এতো আরাম করে ঘুমাচ্ছে যে পদ্মজার ঘুম ভাঙাতে মায়া হচ্ছে। কিন্তু বেলা করে খাওয়া তার একদম পছন্দ না। খেয়ে না হয় আরো ঘুমানো যাবে। পদ্মজা পূর্ণার চোখেমুখে স্নেহের পরশ বুলিয়ে ডাকলো, ‘পূর্ণা? পূর্ণা? এই পূর্ণা?’পূর্ণা ধীরে,ধীরে চোখ খুললো। পদ্মজা বললো, ‘সূর্য কখন উঠেছে খবর আছে? নামাযের তো নামগন্ধও নেই। যা দ্রুত হাত-মুখ ধুয়ে আয়।’পূর্ণা অন্যদিকে ফিরে চোখ বুজলো। সে ঘুমে বিভোর। পদ্মজা আবার ডাকলো। জোর করে তুলে কলপাড়ে পাঠালো। পূর্ণা ঘুমিয়ে,ঘুমিয়ে কলপাড়ে গেল। ফিরে এলো সতেজ হয়ে। ঘরে প্রবেশ করেই সোজা লেপের ভেতর ঢুকে পড়লো। পদ্মজাকে আহ্লাদী স্বরে বললো, ‘খাইয়ে দাও আপা।’পদ্মজা বিনাবাক্যে খাইয়ে দিল। পূর্ণা না বললেও খাইয়ে দিত। খাওয়ার মাঝে পূর্ণা কথা বলতে চেয়েছিল। পদ্মজা নিষেধ করে। খাওয়ার মাঝে কথা বলা ভালো না বলে চুপ করিয়ে দেয়। খাওয়া শেষে পদ্মজা বললো, ‘ শেষরাতে কোথা থেকে ফিরছিলি?’পূর্ণা চোখ বড়বড় করে তাকায়। তার হেঁচকি উঠে যায়। পদ্মজা পানি এগিয়ে দিল। তাকিয়ে রইলো সরু চোখে। পূর্ণা পানি পান করে মিনমিনিয়ে বললো, ‘আর যাব না।’পদ্মজা গুরুজনদের মতো বললো, ‘বাড়তি কথা না বলে প্রশ্নের উত্তর দেয়া বাধ্যতা।’পূর্ণা ভয়ে দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে। সে ঢোক গিলে নতজানু হয়ে বললো, ‘মৃদুল যে…উনার সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম।’‘সে ডেকেছিল?’‘হু।’‘আর তুইও চলে গেলি?’পূর্ণার মনে হচ্ছে সে ফাঁসির দঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। যেকোনো মুহূর্তে ঝুলে যাবে। পদ্মজা বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। ঘরের দুই দিকে জানালা আছে। পূর্ব দিকের জানালা খোলা। উত্তর দিকেরটা বন্ধ। সে উত্তর দিকের জানালা খুলতে খুলতে বললো, ‘ বিয়ের আগে মাঝরাতে দেখা করা কী ঠিক হলো? মৃদুল এখনো পর-পুরুষ। বিয়েও ঠিক হয়নি। যখন এসে শুয়েছিস তখন টের পেয়েছি। তার আগে টের পেলে কানে ধরে ঘরে নিয়ে আসতাম।’পূর্ণা অপরাধী কণ্ঠে বললো, ‘আপা,আর যাব না। ক্ষমা করে দাও।’পদ্মজা পূর্ণার পাশে এসে বসে। পূর্ণার হাতের উপর নিজের এক হাত রেখে বললো, ‘বিয়ের পর আমার বোনের জীবনে হাজার জ্যোৎস্না আসুক।’পূর্ণা তার অন্য হাত পদ্মজার হাতের উপর রাখলো। তারপর পদ্মজার চোখের দিকে তাকিয়ে ডাকলো, ‘আপা।’‘কী?’‘তোমাকে কে মেরেছে? কেন মেরেছে? তুমি রাতে কেন কেঁদেছো?’পদ্মজা তার হাত সরিয়ে নেয়। চোখমুখে কাঠিন্য ভাব চলে আসে। কণ্ঠে গাম্ভীর্যতা রেখে পদ্মজা বললো, ‘প্রশ্ন করতে নিষেধ করেছিলাম।’পূর্ণা চোখ নামিয়ে বললো, ‘আপা,আমি জানতে চাই।’পদ্মজা দাঁড়িয়ে পড়লো। বললো, ‘বাড়ি ফিরে যা। মৃদুলের আম্মা-আব্বা আসছে। যখন তোকে প্রয়োজন হবে ডেকে পাঠাব। তার আগে যেন এই বাড়ির আশেপাশেও না দেখি।’পদ্মজা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয়। পূর্ণা তার পায়ের উপর থেকে দ্রুত লেপ সরাল। তারপর দৌড়ে পদ্মজার সামনে এসে দাঁড়াল। অনুরোধ করে বললো, ‘আপা,আপা দোহাই লাগে বলো। আমি তোমার সব কথা শুনি। কিন্তু এইটা শোনা সম্ভব হচ্ছে না।’‘পূর্ণা!’পূর্ণা আচমকা পদ্মজার দুই পা জড়িয়ে ধরলো। কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো, ‘আপা,পায়ে পড়ছি আমাকে সব বলো। তোমার গালের ক্ষত,গলার দাগ আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। আমি শান্তি পাচ্ছি না। কে তোমাকে এত কষ্ট দিয়েছে? কে এতোবড় দুঃসাহস দেখিয়েছে? আমি তার কলিজা ছিঁড়বো।’পূর্ণার চোখের জল পদ্মজার পায়ে পড়ে। পদ্মজা পূর্ণাকে টেনে তুললো। পূর্ণার কাজল নয়ন দুটি জলে টুইটুম্বুর। যেন স্বচ্চ কালো জলের পুকুর।পদ্মজা পূর্ণার চোখের জল মুছে দিয়ে বললো, ‘কাঁদুনি।’পূর্ণা পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরে। পদ্মজার শরীরে সে মা,মা গন্ধ খুঁজে পায়। সেই ছোটবেলা থেকেই পদ্মজা তার জীবন,তার আনন্দ। পদ্মজার গলার কালসিটে দাগটা যেন তারই বুকের আঘাত। রক্তক্ষরণ হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। পদ্মজা পূর্ণাকে অপেক্ষা করতে বলে,নিজের ঘরে যায়। আলমগীরের দেয়া খাম নিয়ে ফিরে আসে। দরজা বন্ধ করে পূর্ণাকে নিয়ে বিছানার উপর বসলো। এরপর বললো, ‘আমি জানি,আমার বোন বড় হয়েছে। সেই সাথে ধৈর্য্য,জ্ঞানও বেড়েছে। আমি একটা কারণেই তোকে সব জানাব,যাতে সাবধান থাকতে পারিস। আমি চাই, সব জানার পর তুই নিজে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নিবি না। আমি যেভাবে বলবো,সেভাবে চলবি। রাজি?’পূর্ণা বুঝতে পারছে সে ভয়াবহ কিছু জানতে চলেছে। উত্তেজনায় তার গায়ের পশম দাঁড়িয়ে পড়েছে। পূর্ণা বললো, ‘রাজি।’পদ্মজা হাতের খামটা পূর্ণার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘তিনটে চিঠি আছে। তিনটাই আলমগীর ভাইয়ার লেখা। আমি গতকাল পড়েছি। মন দিয়ে পড়বি। অনেক কিছু জানতে পারবি। আর যতটুকু বাকি আছে আমি বলব।’পূর্ণা প্রবল আগ্রহ নিয়ে খাম খুলে তিনটে চিঠি বের করলো। পদ্মজার কথামতো প্রথম একটা চিঠির ভাঁজ খুললো।——বোন পদ্মজা,সালাম নিও। তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই আমার। সেদিনের রাতে তোমার আগমন আমার জীবনে নিয়ে এসেছে আনন্দ। পৌঁছে দিয়েছে আলোর জগতে। যে জগতে বাঁচার জন্য পিছনের প্রতিটি মুহূর্ত অসহনীয় যন্ত্রণায় কাটিয়েছি। জানি না এতো পাপ করার পরও করুণাময় কেন আমার প্রতি এতো উদার হলেন! তিনি চেয়েছিলেন বলেই, তুমি ফেরেশতার মতো হাজির হয়েছিলে। বাঁচিয়েছিলে আমাকে আর রুম্পাকে। যখন তুমি এই চিঠি পড়ছো,তখন তোমার অবস্থা কী আমি জানি না। হয়তো সব জেনে গিয়েছো নয়তো এখনো অন্ধকারে ডুবে আছো। যদি অন্ধকারে ডুবে থাকো তাহলে আমি তোমাকে আলোর সন্ধান দেব। সব জানার পর সিদ্ধান্ত তোমার। চিঠিটা বোধহয় বড় হয়ে যাবে। এক পৃষ্ঠাতে হবে না। ধৈর্য্য ধরে সবটুকু পড়ো। আমি তোমাকে একটা তিক্ত দীর্ঘ গল্প শোনাবো। গল্পটার কেন্দ্রবিন্দু আমির হলেও জড়িয়ে আছি অনেকেই।যখন আমিরের জন্ম হয় কাকি আম্মার পর সবচেয়ে বেশি খুশি হই আমি। কাকি আম্মা বড় দুঃখী ছিলেন। কাকা মারধর করতেন খুব। নিজ চোখে কাকি আম্মাকে বিবস্ত্র করে মারতে দেখেছি। আমার ছোট মন লজ্জায় মিইয়ে গিয়েছিল। লুকিয়ে কেঁদেছিলাম। কিন্তু কাকা বা আব্বা কাউকে একটুও মায়া দেখাতে দেখিনি,লজ্জা পেতে দেখেনি। তাদের চোখেমুখে সর্বক্ষণ হিংস্রতা ছিল। আমি খুব ভয় পেতাম আব্বাকে। ভীতু ছিলাম। আমার কাছে আমার আব্বা,কাকাই ছিল ভূত,রাক্ষস। আমার আম্মা সবসময় পাথরের মতো নিশ্চুপ। তার অনুভূতি অসাড়। কাকি আম্মা ছিলেন আমার মা। তিনি বহুবার আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে একটা ছেলের জন্য আক্ষেপ করেছেন। কাকি আম্মা বলতেন,সেই ছেলে এসে নাকি কাকি আম্মার সব দুঃখ ঘুচে দিবে। যখন সেই ছেলেটা এলো আমি অনেক খুশি হই। এবার বুঝি কাকি আম্মার কষ্ট কমবে। কাকি আম্মা বলেছিলেন, আমির হবে পুলিশ। সব অন্যায়কারীকে শাস্তি দিবে আর আমি হবো শিক্ষক। শুধু কাকি আম্মার না আমারও ইচ্ছে ছিল আমি শিক্ষক হবো। ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়াবো। সব বাচ্চাদের আদর্শ হবো। সবাই দেখে সালাম দিবে,সম্মান করবে। সারাক্ষণ হাতে একটা বই নিয়ে হাঁটবো। এই স্বপ্ন নিয়েই পড়তে থাকি স্কুলে। এর মাঝে আব্বা একটা বাচ্চাকে নিয়ে আসে। বলে, সে নাকি আমাদের আরেক ভাই। তার নাম রাখে রিদওয়ান। আমরা চার ভাই হয়ে যাই। আমি,জাফর,রিদওয়ান,আমির একসাথে এক স্কুলে পড়েছি। রিদওয়ান,আমির এক শ্রেণির ছিল। ছোট থেকেই আমিরের শরীরে ছিল অবাক করার মতো শক্তি। ওর মেধা ছিল ধারালো। আমরা সবাই ধরেই নিয়েছিলাম,আমির পুলিশ হবে। অনেক বড় পুলিশ হবে। পুরো দেশ চিনবে। ঠিক তখনই আমাকে আর জাফরকে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয় অভিশপ্ত এক কালো জীবনের সামনে। যে জীবনে টাকা, নারী আর রক্তের খেলা চলে। আমাদের বুঝিয়ে দেয়া হয়,নারী হচ্ছে ভোগের বস্তু। পাতালঘরে বনেদি ঘরের দুই-তিনজন পুরুষের দেখাও মিলে। তারা দুজন নারীকে আমাদের সামনে কুৎসিত ভাবে আঘাত করে। আব্বা,কাকা উপভোগ করে সেই দৃশ্য। সেই অসহায় দুই নারীর চিৎকারে কলিজা ছিঁড়ে যায় আমার। আব্বা আর কাকার পায়ে পড়েছি যাতে তাদের ছেড়ে দেয়। কিন্তু ছাড়েনি। রক্ত দেখে জাফর জ্ঞান হারায়। ও রক্ত সহ্য করতে পারতো না। রক্তে খুব ভয় ছিল জাফরের। একটা তেরো বছরের মেয়েকে বাঁধা অবস্থায় আমার হাতে তুলে দেয়া হয়। আব্বা আমাকে বুঝায়,মেয়েটার সাথে কী করতে হবে! জানতে পারি, বাড়ির পিছনে জঙ্গলে অবস্থিত এই পাতালঘর অনেক বছরের পুরনো। আমাদের বংশের প্রতিটি পুরুষের একমাত্র পেশা পতিতাবৃত্তি ও নারী ধর্ষণ। আমাদের অঢেল সম্পদ পতিতাবৃত্তির টাকায় করা। নারী বিক্রির টাকায় করা! একরকম বাধ্য হয়েই আমাকে অভ্যস্ত করে দেওয়া হয় এই পথে। ঘৃণায় বমি করেছি অনেকবার। ধর্ষণের পর কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হতো মেয়েগুলোকে। আমার জীবন হয়ে উঠে দূর্বিষহ।তবে ঘরে ফিরে শান্তি লাগতো। আমির ছিল সেখানে। আমিরের দুষ্টুমি আমাকে খুব হাসাতো। আমিরের একটা দোষ ছিল,ও রিদওয়ানকে খুব অত্যাচার করতো। দুজনের সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলে। সে যাই হোক, আমিরের সঙ্গ ছিল শান্তির! ওর চঞ্চলতা,সাহসিকতা ছিল মুগ্ধ করার মতো। আমার সেই শান্তিও একদিন নষ্ট হয়ে যায়। যেদিন নানাবাড়ি থেকে ফিরে পাতালঘরে প্রবেশ করে রিদওয়ান আর আমিরের উপস্থিতি দেখি! আমির তখন পুরোদমে পনেরো বছরের একটা মেয়েকে পেটাচ্ছিল! আমিরের চোখেমুখের হিংস্রতা আমাকে অবাক করে দেয়। আমি কিছুতেই মানতে পারছিলাম না,আমার প্রিয় ভাইয়ের এই রূপ! এই জীবন!এর পরের কথাগুলো তোমার জন্য খুব কষ্টের হবে পদ্মজা। দয়া করে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিয়ে আবার পড়া শুরু করো।——পূর্ণা থামে। তার শরীর কাঁপছে। অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। সে ছলছল চোখে পদ্মজার দিকে তাকায়। তার চোখে খুব ভয়,ঘৃণা। সে স্পষ্ট স্বরে উন্মাদের মতো ডাকলো, ‘আপা…এই আপা।’পদ্মজা পূর্ণার এক হাত শক্ত করে ধরলো। বললো, ‘ভাইয়া আমাকে যা বলেছেন,তাই কর। প্রাণভরে নিঃশ্বাস নে।’পূর্ণার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। তার মাথা ভনভন করছে। শরীর যেন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। সে পদ্মজার এক হাত শক্ত করে ধরে জোরে নিঃশ্বাস নিল। বুকে অপ্রতিরোধ্য তুফান বয়ে যাচ্ছে! আমির তার কাছে আপন বড় ভাই। সম্মানীয় বড় ভাই! এই ব্যথা সহ্য করতে পারবে না সে। পুরো শরীরে তীব্র ব্যথা অনুভূত হচ্ছে।
পদ্মজা পূর্ণার মনের অবস্থা টের পাচ্ছে। তার মতো সহ্যশক্তি নেই পূর্ণার। পদ্মজা পূর্ণার হাতের পিঠে চুমু খেয়ে বললো, ‘মন এতো দূর্বল হলে কি চলে?’পূর্ণা পদ্মজার দিকে তাকালো। পদ্মজা চোখের ইশারায় বাকিটুকু পড়তে বলে। পূর্ণা এক হাতের তালু দিয়ে চোখের জল মুছে পড়া শুরু করলো-——আমাদের দাদুর সঙ্গ পেয়ে আমির ছোট থেকেই নিষ্ঠুর প্রকৃতির হয়েছে। কাকার কথায় দাদু আমিরকে আলাদা করে সময় দিতেন। আমির কাকার বড় শিকার ছিল। আমিরের চাল-চলন ছিল অন্যরকম। তাকে ছোট থেকে শিক্ষা দেয়া হয়েছে,মেয়েরা ভোগের বস্তু। শিখিয়েছে টাকার ক্ষমতা আর পৈশাচিক আনন্দ কেমন! দাদু শুরু থেকে সব জানেন। তিনি কাকা আর আব্বাকে উৎসাহিত করতেন। আমাদের দাদাকেও সাহায্য করেছেন। দাদুর সোনার অলংকারের প্রতি দূর্বলতা ছিল খুব। এই দূর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে আমার দাদা,আব্বা,কাকা দাদুকে ব্যবহার করেছেন। দাদুর সাথে দাদুর এক বোনও ছিল। দাদুর বোন বলতে আপন নয়,পরিচিত। দুজন নারী মিলে সহযোগিতা করে এসেছে বছরের পর বছর। আমির নারীর শরীর ভোগ করার চেয়ে, আঘাত করতে পছন্দ করতো। প্রথম তিন বছর সে কোনো মেয়ের সাথে জোরপূর্বক মিলিত হওয়ার চেষ্টা করেনি। সবসময় প্রতিটি মেয়ের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছে।প্রথম প্রথম আমার খারাপ লাগতো। কিন্তু একসময় অভ্যস্ত হওয়ার সাথে উপভোগ করতে থাকি। আমিরের যখন আঠারো বয়স তখন থেকে সে যৌনতার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠে। পাশের গ্রামের এক মেয়ের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে। মেয়েটা দেখতে মিষ্টি ছিল। আমিরকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছে। বিশ্বাস করে নিজের ইজ্জত সঁপে দিয়েছিল, বিনিময়ে এরপরদিন লাশ হয়ে নদীর ঢেউয়ে ভেসে যেতে হয়েছে! আমিরের নারী আসক্তি তীব্র হয়ে উঠে। কিন্তু জোরপূর্বক কিছু করতে সে নারাজ। বেছে নেয় ছলনার পথ,প্রতারণার পথ। কতগুলো মেয়েকে সে ঠকিয়ে ভোগ করেছে তার হিসেব নেই আমার কাছে। ঢাকায় পড়তে গিয়ে কারো মাধ্যমে নারী পাচারের সাথে যুক্ত হয়। তারপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি। টাকার পাহাড় গড়ে উঠে। পদ্মজা,তোমার খারাপ লাগবে। তাও বলতে হচ্ছে, তুমি যেমন আমিরের জীবনের প্রথম মেয়ে নও তেমন বউও নও! শহরের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সুন্দরী এক মেয়েকে আমির বিয়ে করেছিল। সেই মেয়েটি নিঃসন্দেহে রূপসী ছিল। সে বিয়ের পূর্বে শারিরীক সম্পর্কে আগ্রহী ছিল না বলে আমির তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মেয়েটি তার পরিবারে না জানিয়ে আমিরকে বিয়ে করে। এক সপ্তাহ পর মেয়েটি যখন আমিরের কাছে তিক্ত হয়ে উঠে, তখন মৃত্যু মেয়েটির সামনে এসে দাঁড়ায়! মেয়েটির পরিবারের কেউ জানতেও পারেনি,তাদের বাড়ির মেয়ের বিয়ে হয়েছিল! আর সে স্বামীর হাতেই মারা গিয়েছে! আমির তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। সে তখনই ঠান্ডা মাথায় পুরো ঘটনার চিহ্ন মুছে দেয়। এটাই কিন্তু ওর একটা বিয়ে নয়। আমির আরেকটা বিয়েও করেছিল। ভিন্ন ধর্মের এক সুন্দরী মেয়েকে। তার বেলায়ও হবুহু ঘটনা ঘটে। সে মেয়ের মৃত্যু আমি নিজচোখে দেখেছি। কিন্তু কিছু বলিনি। বলতে ইচ্ছে হয়নি! মন বলতে কিছু ছিল না তখন। মেয়েটা মৃত্যুর পূর্বে অবাক হয়ে দেখছিল আমিরকে। সে বোধহয় বিশ্বাস করতে পারছিল না,যাকে ভালোবেসে ঘর ছেড়েছে সে তাকে খুন করছে! আমির কিন্তু খুন করার ঘন্টাখানেক পরই অন্য মেয়ের সাথে সময় কাটিয়েছে! আমিরের বাড়ি-গাড়ি সব হয়। যেকোনো নারী আমিরকে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিত নির্দ্বিধায়। আমির দেখতে একটু শ্যামলা হলেও ওর কথাবার্তা, চাল-চলন, চাহনি ছিল আকর্ষণ করার মতো। যতগুলো মেয়ে আমিরকে ভালোবেসেছে বেশিরভাগই আমিরের থুতুনির কাটা দাগটা দেখে প্রেমে পড়েছে। আমির সম্পর্কিত আর কিছু বলার নেই। এইটুকুতেই তুমি আমিরের স্থান বুঝে যাবে। তোমার স্বামী একা খারাপ এই কথা বলার মুখ নেই আমার। আমি কিছু কম করিনি!তবে আমির কাকির ব্যাপারে ছিল দূর্বল। তার সব সাবধানতা ছিল কাকিকে নিয়ে! কাকি যেন কিছু জানতে না পারেন। আমির ঢাকা থাকার কারণে,কাকি কখনো সন্দেহও করেননি। তার আগে সন্দেহ করেছিলেন কিন্তু প্রমাণ পাননি। যেদিন কাকি তোমাকে আর আমিরকে তোমাদের বাড়ি থেকে আনতে গিয়েছিলেন। সেদিন তোমরা আসার পর রাতে কাকি জানতে পারেন আমির অনেক আগে থেকে কাকার সাথে কাজ করছে। এমনকি ঢাকা এই কাজই করে। আমির কাকার সাথে ডিল নিয়ে আলোচনা করছিল। খুব চাপ ছিল মাথার উপর। চিন্তায় আমির অসতর্ক হয়ে যায়। কাকির ঘরেই কাকার সাথে নারী পাচারের বিষয়ক কথা বলছিল। আর কাকিও সব শুনে ফেলেন। তিনি খুব কাঁদেন। রাগে আমিরকে অনেকগুলো থাপ্পড় দেন। আমির কিছু বলেনি। চুপচাপ থাপ্পড় খেয়েছে। কাকি আমিরকে নিষেধ করেন, আমির আর যেন আম্মা না ডাকে। আর যেন দেখা না করে। আমির কাকিকে সামলানোর অনেক চেষ্টা করেছে। পারেনি। কাকির খুব কষ্ট হচ্ছিলো। ঘৃণায় আমিরের শার্ট টেনে হিঁচড়ে ছিঁড়ে ফেলেছেন। কাকির নখের দাগ আমিরের পেটে-বুকে হয়তো এখনো আছে। কাকির বেঁচে থাকার সুতোটাই ছিঁড়ে যায়। সারা রাত্রি হাউমাউ করে কেঁদেছেন। অনেকবার কাকিকে স্বান্তনা দিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সাহস হয়নি। আমি নিজেই তো একটা নিকৃষ্ট মানব! আবার সেদিন রাতে তুমি রুম্পার সাথে ছিলে। রুম্পা যদি সব বলে দেয় তোমাকে সে ভয়ে আমির রিদওয়ানকে পাহারায় রেখেছিল। লতিফাকে দিয়ে খাবারে ঔষধ মিশিয়ে দিয়েছিল। যাতে রুম্পা ঘুমিয়ে পড়ে। আমির অনেক ছলচাতুরী করেছে,তুমি যাতে কিছু না জানতে পারো।আমার আর রুম্পাকে তুমি নতুন জীবন পেতে সহযোগিতা করেছো তাই তোমাকে আমাদের গল্পটাও বলতে চাই। জানি না আর কতদিন বাঁচব। পালিয়ে এসেছি! আমিরের হাত অনেক লম্বা। ওর আমাকে খুঁজে পেতে সময় লাগবে না। বরং অবাক হচ্ছি,এতদিনেও আমির আমাকে খুঁজে পায়নি কেন?রুম্পাকে আমার জন্য কাকা পছন্দ করেছিলেন। বিয়ের প্রথম দিনই বুঝতে পারি,রুম্পা সরল সোজা একটা মেয়ে। রুম্পার সঙ্গ ছিল অনেক শান্তির। কখন যে ভালোবেসে ফেলি বুঝিনি। বিয়ের মাস কয়েক পর বৈশাখ মাসে আমি পাতালঘরে ছিলাম। আমার সামনে নগ্ন মেয়ে ছিল। তখন পাতালঘরের চারপাশেএতো নিরাপত্তা ছিল না। হুট করে দেখি রুম্পা চলে এসেছে। তারপরের দিনগুলো বিষাক্ত হয়ে উঠে। রুম্পাকে রিদওয়ান মারে,আব্বা মারে,কাকা মারে। আমি চুপচাপ মেনে নেই। কিন্তু খুব কষ্ট হতো। নিজের সাথে যুদ্ধ করেছি। নিজের প্রতি ঘৃণা হতো। স্বামী হিসেবে নিজেকে ব্যর্থ লাগতো। রিদওয়ান আমার অজান্তে আমার ভালোবাসার বউকে ধর্ষণ করে। এই খবর ধর্ষণের এক সপ্তাহ পর শুনেছি। কিন্তু আমি এমনই কাপুরুষ যে রিদওয়ানকে মারতে গিয়ে উল্টো মার খেয়ে চুপ হয়ে গিয়েছি! রুম্পা তেজি মেয়ে ছিল। ও রাগে বার বার বলেছে,পুলিশের কাছে যাবে। সব বলে দিবে। তাই রুম্পাকে মারার পরিকল্পনা করা হয়। আমি রুম্পার সাথে লুকিয়ে দেখা করি। ওর পায়ে ধরে ক্ষমা চাই। আর বলি,পাগলের ভান ধরে থাকতে। আমি মাঝে মাঝে দেখা করব। রুম্পা তেজি হলেও মৃত্যুকে ভয় পেতো খুব। পাগলের ভান ধরে থাকলে বাঁচতে পারবে এই কথা শুনে খুব কাঁদে। আর তাই করে। সে যে এই সুন্দর পৃথিবীতে বাঁচতে চায়! রুম্পার চিৎকার,চেঁচামেচি শুনে আব্বা,কাকা ধরে নেয় রুম্পার মাথা ঠিক নেই। তবে আমিরের দৃষ্টি ঈগলের মতো। প্রথম দেখাতেই বুঝতে পারে,রুম্পা পাগল নয়। মানসিক ভারসাম্যও হারায়নি। তাও কেন যেন কাউকে কিছু বলেনি! রুম্পা কিন্তু তখনো জানতো না আমির এই কাজে যুক্ত আছে। আমির আর রুম্পার সম্পর্ক ভাইবোনের মতো ছিল। আমির পরিবারের সাথে সবসময় সহজ-সরল থেকেছে। একদম সাধারণ একটা মানুষের মতো। শুরু হয় রুম্পার বন্দী জীবন আর আমার নিঃসঙ্গ রাত। একটা দিনও শান্তিতে ঘুমাতে পারিনি। কাপুরুষ শব্দটা সর্বক্ষণ খুঁড়ে-খুঁড়ে খেয়েছে। মাঝে মাঝে লুকিয়ে দেখা করেছি। বুঝতে পেরেছি,রুম্পাকে আমি খুব ভালোবাসি। আব্বা,চাচা আর ছোট ভাই আমির এই তিন জনের ভয়ে এক পাও বাড়ানোর সাহস হয়নি। একজন লোক আমাদের দল ছেড়ে পালিয়েছিল। বিনিময়ে তার নির্মম মৃত্যু হয়েছে। সে ভারত চলে গিয়েছিল। তাও আমির ধরে ফেলেছে! বলো তো পদ্মজা,এমন ঘটনা জানার পর আমার মতো কাপুরুষ আর কী ই বা করতো? ধিক্কার আমার নিজের জীবনকে! আমাকে তো কুকুরের খাবার হওয়া উচিত! রুম্পাকে তুমি ঢাকা নিয়ে যেতে চেয়েছিলে তাই আমির বাবলুকে আদেশ করে,রুম্পাকে খুন করতে। আমি এই খবর পেয়ে পালানোর কথা ভাবি। পথে বাবলু আটক করে তখন তুমি ফেরেশতার মতো হাজির হও। এই ঋণ শোধের উপায় আমার জানা নেই।আর কী বলবো আমি? এখন সিদ্ধান্ত তোমার। তুমি কী করবে! আমিতো সব জানিয়ে দিয়েছি। কিছু কথা না জানালেই নয়। আমির আমার কাছে সবসময় স্বচ্ছ ছিল। কিন্তু তুমি আসার পর আমি তাকে চিনতে পারি না। যখন তোমাদের বিয়ে হয় ভেবেই নিয়েছিলাম কয়দিন পর তোমার লাশও দেখতে হবে। কিন্তু সেটা হয়নি। উল্টা আমির পাল্টে যায়। চারিদিকে কঠোর নিরাপত্তা দেয়া হয়। গ্রাম থেকে ঢাকা ফিরেই সুন্দরী দুই মেয়েকে সঙ্গ দেয়ার কথা ছিল। এই দুই মেয়েকে হাতের মুঠোর আনতে আমিরের সবচেয়ে বেশি সময় লেগেছে। সুযোগ পেয়েও আমির তাদের কাছে টানতে পারেনি। বছরখানেকে বুঝে যাই, আমির সত্যি তোমাকে ভালোবেসেছে! কোনো মেয়ের শরীর আর টানেনি আমিরকে। এ নিয়ে আব্বা,কাকার মাঝে অনেক কথা হয়েছে। আমির যদি সব ছেড়ে দেয়? আমার মনের কোণে আশা জাগে,আমির এবার আমার মতো অনুভব করবে। এই কালো জগতকে তার কালোই লাগবে। আমি নিজ চোখে দেখেছি,আমিরকে তোমার জন্য ছটফট করতে। তোমার অসুখ হলে সবকিছু ভুলে যেতো। তোমার চিন্তায় এক জায়গায় স্থির থাকতে পারতো না। এমনকি ঢাকার বাড়ি সহ আমাদের বাড়িটাও আমির তোমার নামে করে দিয়েছে। আমিরের যত সম্পদ আছে সব তোমার নামে করা। আমিরের কিন্তু নিজস্ব বলতে কিছু নেই। সে নিঃস্ব। এই খবর রিদওয়ান বা আব্বা,কাকা কেউ জানে না। কোনো কাক-পক্ষীও জানে না। চট্টগ্রাম সমুদ্রের কাছে তোমার জন্য একটা বাংলো বাড়ি বানাচ্ছে। বাড়ি বানানোর টাকা একত্রিশটা মেয়ে পাচার করার বিনিময়ে অগ্রিম নিয়েছিল। এখন সেই চাপ মাথায় নিয়ে ঘুরছে। হাতে সময় কম। কিন্তু মেয়ে পাওয়া যাচ্ছে না! আমার জানামতে, তুমি ধার্মিক ও পবিত্র একটা মেয়ে। তুমি এতকিছু জানার পর আমিরকে মেনে নিতে পারবে না। তোমার বিবেক তোমাকে সঠিক পথ দেখাবে। আমি যা জানি সব বলেছি। আমির তোমাকে ভালোবাসে এই কথাটা কঠিন সত্য। তুমি যদি আমিরের কাছে তার দুই চোখ চাও সে তোমার সামনে ছুরি ধরে হাঁটুগেড়ে বসে বলবে নিয়ে নাও! ছয় বছরে আমিরের যে রূপ,তোমার প্রতি যে টান আমি দেখেছি তা থেকে আমার এটাই মনে হয়। আমির তোমাকে অন্ধের মতো ভালোবাসে। এমন মানুষের মনে এতো ভালোবাসা দেয়ার কোনো উদ্দেশ্য হয়তো সৃষ্টিকর্তার আছে। শুনেছি,সৃষ্টিকর্তার সব সৃষ্টি কোনো উদ্দেশ্যে করা। এখন সবটা তোমার সিদ্ধান্ত। আমি এইটুকুও মিথ্যে বলিনি। তুমি বুদ্ধিমতী একটু চোখ কান খোলা রাখলেই বুঝতে পারবে। যে পদক্ষেপই নাও না কেন সাবধান থেকো। আমিরের চোখ ফাঁকি দিয়ে একটা পক্ষীও উড়ে যেতে পারে না।রুম্পা তোমাকে ভালোবাসা জানিয়েছে। কখনো সুযোগ মিললে আমাদের আবার দেখা হবে। আমার মৃত্যু যেকোনো সময় হয়ে যেতে পারে। রুম্পাকে যদি আবার ওই বাড়িতে নেয়া হয় তুমি দেখে রেখো। আল্লাহ তোমার সাথে আছেন। আমার জন্য দোয়া করো। আল্লাহ আমার শাস্তি যেন রুম্পাকে না দেন। আমাকেই যেন দেন। আর আমাকে ক্ষমা করে দেন। আমি অনুতপ্ত। এতো বড় চিঠি লিখে অভ্যেস নেই। ভুল হলে ক্ষমা করো। ভালো থেকো বোন।ইতি,আলমগীর।——-পূর্ণা দুই হাতে মাথা চেপে ধরে। কাঁদতে কাঁদতে তার বুক ভিজে গিয়েছে। সে পদ্মজার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আমার বিশ্বাস হচ্ছে না আপা। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।’পদ্মজা পূর্ণাকে জড়িয়ে ধরলো। পূর্ণা পদ্মজার বুকে মুখ গুঁজে ফোঁপাতে থাকলো। পদ্মজা তার সাথে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা খুলে বলে। পূর্ণা দুই হাতে শক্ত করে ধরে পদ্মজাকে। তার প্রিয় বোনের এতো কষ্ট! সে সহ্য করতে পারছে না। পূর্ণা কাঁদতে কাঁদতে বললো, ‘ভাইয়া তোমার আগে আরো দুটো বিয়ে করেছে। এই ব্যথা কীভাবে সহ্য করেছো আপা?’পদ্মজা কান্না আটকিয়ে রেখেছিল। এই কথা শুনে ভেতর থেকে কান্না আপনা আপনি চলে আসে। পূর্ণাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। একটা মানুষ খুঁজছিল সে,যাকে জড়িয়ে ধরে মনখুলে কাঁদা যাবে। আমির অত্যাচারী, হিংস্র,নারী ব্যবসায়ী এইটুকুর ব্যথাই সে হজম করতে পারেনি। চিঠি পড়ে যখন জানতে পারলো,আমির নারী আসক্ত ছিল। এমনকি বিয়েও করেছে। তখন ইচ্ছে হচ্ছিল,গলায় ফাঁস লাগিয়ে মরে যেতে। ঠান্ডা মেঝেতে বসে হাত-পা ছড়িয়ে কেঁদেছে। বার বার চোখে ভেসে উঠেছে আমিরের সাথে অনেক মেয়ের অন্তরঙ্গ মুহূর্ত। একজন স্ত্রীর জন্য এটা কতোটা বেদনাদায়ক হতে পারে,তার কোনো পরিমাপ নেই। পদ্মজা চোখের জল মুছলো। পূর্ণাকে সামনাসামনি বসিয়ে বললো, ‘ এখন কাঁদার সময় নয়। তোকে আমি সব জানিয়েছি,যাতে প্রেমাকে দেখে রাখতে পারিস। আর নিজেও সাবধানে থাকিস। আমি একটা ছুরি দেব। নিজের সাথে রাখবি। রিদওয়ানের নজর ভালো না। প্রেমার দায়িত্ব তোর। তোর বিয়ে দিয়ে দেব তিন-চারদিনের মধ্যেই।’‘আপা?’ পূর্ণার কণ্ঠটা অদ্ভুত শোনায়। পদ্মজা তাকালো। পূর্ণা ঢোক গিলে নতজানু হয়ে কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে বললো, ‘ভাইয়ার কোনো ক্ষতি করো না আপা।’কথা শেষ করেই জোরে কেঁদে উঠলো পূর্ণা। সে বুঝতে পারছে সে অন্যায় আবদার করেছে। পাপীর প্রতি মায়া দেখাচ্ছে। কিন্তু আমিরকে সে আপন ভাইয়ের মতো ভালোবাসে। আমির কখনো বড় ভাইয়ের অভাব বুঝতে দেয়নি। মাথার উপরের ছাদ হয়ে থেকেছে। সবচেয়ে বড় কথা তার প্রিয় বোনের ভালোবাসার মানুষ আমির। কেউ না জানুক সে জানে,আমির ছাড়া পদ্মজা বেঁচে থেকেও মৃত। পদ্মজা তার মা হেমলতার মতো হয়েছে। সত্যকে,ন্যায়কে বেছে নিবে। ভালোবাসার সিন্দুকটা তালা মেরে রাখবে। তারপর কষ্টে ধুঁকে-ধুঁকে মরবে। পূর্ণার কথা শুনে পদ্মজা অবাক হয়ে উচ্চারণ করলো, ‘পূর্ণা!’পূর্ণা পদ্মজার কোলের উপর মাথা নত করে বললো, ‘আপা,আমি খুব খারাপ। কিন্তু তোমার সুখ আমার কাছে সবচেয়ে বড়। ভাইয়া তোমাকে ভালো রাখবে। ভাইয়া তোমাকে ভালোবাসে। আগের সব ভুলে যাও। মাফ করে দাও। আমি জানি তুমি ভাইয়াকেও ছাড়বে না। ভাইয়ার কিছু করে ফেলবে। আপা,দোহাই লাগে। তোমার সুখ নষ্ট করো না।’পদ্মজা আশ্চর্যের চরম পর্যায়ে অবস্থান করছে। পূর্ণা মাথা তুলে তাকায়। পদ্মজা প্রশ্ন করে, ‘ আর যে মেয়েগুলো অত্যাচারিত হয়েছে? যে মেয়েগুলো ঠকেছে? যে মেয়েগুলো যন্ত্রনায় ছটফট করে জীবন দিয়েছে? তাদের প্রতি অন্যায়ের শাস্তি কে দিবে?’পূর্ণার সহজ উত্তর, ‘তোমাকে তো কিছু করেনি। তোমাকে তো ভালো রাখবে।’পদ্মজা নিজেকে সামলে রাখতে পারেনি। সে ভেবেছিল পূর্ণা ঘৃণায় আমিরকে খুন করতে চাইবে। খুন করতে চাইবে রিদওয়ান, খলিল আর মজিদকে। কিন্তু এ তো উল্টা সুর তুলছে! পদ্মজা গায়ের সবটুকু শক্তি দিয়ে পূর্ণাকে থাপ্পড় দিল। পূর্ণা আকস্মিক ঘটনায় নিজেকে শক্ত রাখার সুযোগ পায়নি। বিছানা থেকে হুমড়ি খেয়ে মেঝেতে পড়ে। পদ্মজার নাক লাল হয়ে গেছে। সে রাগে পূর্ণাকে বললো, ‘ ছিঃ! তুই আম্মার মেয়ে!’
পূর্ণা উত্তরে কিছু বললো না। সে ঝরঝর করে কাঁদতে থাকলো। নাকের পানি,চোখের পানি মিলেমিশে একাকার। দৃষ্টি মেঝেতে নিবদ্ধ। পদ্মজার রাগে দুঃখে কান্না পায়। বেসামাল ঘূর্ণিপাকে সে আটকে পড়েছে। প্রতিটি নিঃশ্বাস হয়ে উঠেছে বিষাক্ত। কেউ নেই পাশে দাঁড়ানোর মতো। কেউ মাথা ছুঁয়ে দিয়ে বলে না, পাশে আছি! মন যা চায় করো। পদ্মজার ভেতরের ঝড়ের তাণ্ডব কেউ টের পাচ্ছে না। সবাই তার বিরুদ্ধে। সবাই!পদ্মজা চিঠি ও খাম নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। পূর্ণা মৃদু আর্তনাদ করলো। সে কিছুতেই চিঠির লেখাগুলো আর পদ্মজার মুখে উচ্চারিত শব্দগুলো বিশ্বাস করতে পারছে না। তার কাছে ভাইয়া নামক শব্দটির মানে আমির। তাৎক্ষণিক চোখের সামনে ভেসে উঠে একটা হাসিখুশি মুখ। আমিরের যে স্নেহ,ভালোবাসা এতদিন তাদের উপর চুইয়ে-চুইয়ে পড়েছে। সেই ভালোবাসায় খাদ থাকতে পারে না! পূর্ণা দেয়ালে হাতের ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। শরীরটা কেমন করছে! হাজারটা সূচ যেন বুকের ভেতরটা খোঁচাচ্ছে। সে তার আপার চোখেমুখে দেখেছে সীমাহীন কষ্ট! পূর্ণা দুই হাতে কপালের দুই পাশ চেপে ধরে পায়চারি করতে করতে বিড়বিড় করে, ‘তুমি গতকাল রাতে এজন্যে কাঁদছিলে আপা! ভাইয়ার ভালোবাসার অভাব তোমাকে ছাই করে দিচ্ছে। তুমি পুড়ে যাচ্ছো। পুড়ে যাচ্ছো তুমি।’পূর্ণা বিছানায় বসলো। সে অস্থির হয়ে আছে। জানালায় চোখ পড়তেই সে সেখানে গিয়ে দাঁড়ালো। চোখের সামনে দৃশ্যমান হয় বড় বড় গাছ। তারা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। না জানি কত মেয়ের কুরবানির সাক্ষী এই গাছেরা! পূর্ণা জানালার গ্রিলে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুজে। গাল বেয়ে টুপ করে জল গড়িয়ে পড়ে মেঝেতে। তার কেন এতো কষ্ট হচ্ছে সে জানে না। বড় ভাইয়ের সমতূল্য আমিরের এমন ভয়ংকর রূপের কথা জেনে নাকি তার বোন আর বোনের ভালোবাসার বিচ্ছেদের আশঙ্কায়! পূর্ণা দুই হাতে চোখের জল মুছে ওড়না দিয়ে মাথা ঢাকলো। তারপর দ্রুতপায়ে ২য় তলায় পদ্মজার ঘরে যায়। পদ্মজা ঘরে নেই। নিচ তলায় হয়তো! পূর্ণা সোজা নিচ তলায় চলে আসে। সদর ঘরে জুলেখা রিনুর সাথে কথা বলছিল। তিনি ব্যাগও গুছাচ্ছেন। পূর্ণা মৃদুলের কাছে শুনেছে,মৃদুল তার মা-বাবাকে নিয়ে এসেছে। জুলেখা বানুর মুখের সাথে মৃদুলের মুখের মিল রয়েছে। পূর্ণা আন্দাজ করে নিল,তিনি মৃদুলের মা। পূর্ণা নতজানু হয়ে এগিয়ে আসে। জুলেখার পায়ে ছুঁয়ে সালাম করার জন্য ঝুঁকতেই জুলেখা পা সরিয়ে নিলেন। কর্কশ কণ্ঠে বললেন, ‘ দূরে যাও।’পূর্ণা মনে মনে আহত হয়। দূরে সরে দাঁড়ায়। চোখের কার্নিশে জল জমে। সে ঢোক গিলে কান্না আটকিয়ে কাঁপাকণ্ঠে বললো, ‘আসসালামু আলাইকুম।’জুলেখা বানু জবাব দিলেন না। তিনি কাউকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘ কী গো! হয় নাই তোমার? সময় যাইতাছে নাকি আইতাছে?’গফুর মিয়া বেরিয়ে আসেন। পূর্ণা গফুর মিয়াকে দেখে বুঝতে পারলো, উনি মৃদুলের বাবা। লাল রঙের লম্বা দাঁড়ি,মাথায় সাদা টুপি,পরনে সাদা পাঞ্জাবি। চোখেমুখের নূর যেন দ্যুতি ছড়াচ্ছে। গফুর মিয়া পূর্ণাকে দেখে হাসলেন। বললেন, ‘ভালো আছো মা? শরীরটা ভালো লাগছে?’গফুর মিয়ার প্রশ্ন দুটো পূর্ণা শরীরকে চাঙ্গা করে তুললো। সে মৃদু হেসে বললো, ‘ ভালো আছি। আপনি…আপনি ভালো আছেন?’‘আছি। বুড়ো মানুষ… ‘গফুর মিয়া কথা শেষ করতে পারলেন না। জুলেখা বানু বাজখাঁই কণ্ঠে বললেন, ‘এহন তোমার গপ(গল্প) করার সময় না। ট্রেইন ছাইড়া দিলে বুঝবা।’পদ্মজা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে। শাড়ির আঁচল দিয়ে মাথার চুল ঢেকে জুলেখা বানুকে বললো, ‘গতকালই আসলেন। আজই চলে যাবেন?’জুলেখা বানু পদ্মজার দিকে ফিরেও তাকালেন না। তিনি রিনুকে ধমকের স্বরে বললেন, ‘মৃদুইল্লা কই গেছে?’রিনু বললো, ‘বাইরে গেছে। কলপাড়ে।’‘গিয়া খবর দেও,হের আম্মায় ডাকতাছে।’রিনু পদ্মজাকে একবার দেখলো। তারপর বাইরে গেল। লতিফা সদর ঘর ঝাড়ু দিচ্ছে। সে আড়চোখে জুলেখার ব্যবহার দেখছে। তার ইচ্ছে হচ্ছে, মহিলাকে ভেজা কাপড়ের মতো মুচড়াতে! জুলেখার এমন ব্যবহারের কারণ পদ্মজা বুঝতে পারছে। তাও প্রশ্ন করলো, ‘মনে হচ্ছে আপনি খুব বিরক্ত হয়ে আছেন! আমরা কোনো ভুল করেছি?’জুলেখা কটাক্ষ করে বললেন, ‘দেখো মা,তোমার সাথে আমি কথা কইতে চাইতাছি না। তুমিও কইয়ো না।’পদ্মজা পূর্ণার দিকে তাকালো। পূর্ণা অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। তার চোখে, জলের পুকুর সৃষ্টি হয়েছে। যেকোনো সময় গড়িয়ে পড়ে যেন ঘর ভাসিয়ে নিবে। লতিফা ঝাড়ু দেওয়ার ভান করে সব বালু জুলেখার ভেজা পায়ের উপর ছিটিয়ে দিল। জুলেখা বানু দুই লাফে দূরে সরে যান। চোখ বড় বড় করে লতিফাকে বললেন, ‘এই ছেড়ি,চোক্ষে দেহো না? কেমনে কামডা বাড়াইছে! এহন আবার পাও ধুইতে হইবো।’লতিফা অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বললো, ‘মাফ করেন খালাম্মা।’মৃদুল সদর ঘরে প্রবেশ করে আগে পূর্ণার মুখ দেখলো। পূর্ণাকে দেখেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে। সে পূর্ণাকে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘পূর্ণা,এহন কেমন লাগতাছে?’পূর্ণা গুমট কণ্ঠে জবাব দিল, ‘ভালো।’মৃদুল বললো, ‘লিখন ভাইয়ের খবর নিয়া আইছি।’পদ্মজা সঙ্গে-সঙ্গে প্রশ্ন করলো, ‘কেমন আছেন উনি?’জুলেখা তীক্ষ্ণ চোখে পদ্মজার দিকে তাকান। জুলেখার চাহনি দেখে পদ্মজা অস্বস্তিতে পড়ে যায়। মৃদুল বললো, ‘জানি না ভাবি। খালি জানি, লিখন ভাইরে ঢাকা হাসপাতাল নিয়া গেছে।’পদ্মজা বিড়বিড় করে বললো, ‘আল্লাহ উনাকে সুস্থ করে দিবেন,ইনশাআল্লাহ। ‘পূর্ণার চোখেমুখের গুমট ভাবটা স্পষ্ট। মৃদুল দেখতে পাচ্ছে কিন্তু তার কারণ বুঝতে পারছে না। জুলেখা বানু আদেশের স্বরে মৃদুলকে বললেন, ‘তোর যে কাপড়ডি বাইর করছিলি ব্যাগে ঢুকাইছি। এহন এই জুতাডি খুইলা তোর জুতাডি পায়ে লাগা।’মৃদুলের কপালে ভাঁজ সৃষ্টি হয়। বললো, ‘আমরা কই যাইতাছি? ‘‘বাড়িত যাইতাছি।’মৃদুলের মাথায় যেন বাজ পড়ে। সে পূর্ণার দিকে তাকালো। পূর্ণা অন্যদিকে ফিরে আছে। মৃদুল অবাক হয়ে জুলেখাকে বললো, ‘আমরা যেই কামে আইছি,সেই কাম তো হয় নাই আম্মা।’জুলেখা পূর্ণার উপর চোখ রেখে বললেন, ‘আমি এমন কালা ছেড়িরে আমার ছেড়ার বউ কইরা ঘরে নিতে রাজি না।’মৃদুল উঁচু স্বরে উচ্চারণ করলো, ‘আম্মা!’জুলেখা বানু চেঁচিয়ে বললেন, ‘তুই কী দেইক্ষা এমন ছেড়িরে পছন্দ করছস? তোর লগে এই ছেড়ির যায়? তোর আর এই ছেড়ির গায়ের রঙ আসমান আর জমিন।’জুলেখা বানুর চিৎকার শুনে খলিল ও আমিনা উপস্থিত হোন। অপমানে,লজ্জায় পূর্ণার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে। পূর্ণার চোখের জল পদ্মজা হজম করতে পারছে না। পদ্মজা বললো, ‘ আপনি গায়ের রঙকে মূল্য দিচ্ছেন কেন? ছেলে-মেয়ে দুজন দুজনকে ভালোবাসে। ভালোবাসাটাকে মূল্য দিন।’জুলেখা বানুর মেজাজ শুধু খারাপের দিকেই যাচ্ছে। তিনি বললেন, ‘আমার ছেড়ার মতো সোনার টুকরা এমন কয়লারে কুনুদিনও পছন্দ করব না। এই ছেড়ি তাবিজ করছে। কালা জাদু করছে আমার ছেড়ার উপর। আমার ছেড়ারে আমি বরহাট্টার হুজুরের কাছে লইয়া যাইয়াম। জাদু দিয়া বেশিদিন ধইরা রাখন যায় না। এইডা তুমি আর তোমার বইনে মনে রাইক্ষো।’মৃদুল চিৎকার করে উঠলো, ‘আম্মা! কীসব আবোলতাবোল কইতাছেন। আপনি পূর্ণারে কষ্ট দিতাছেন।’জুলেখা কেঁদে দিলেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আমার কষ্ট নাই? আমি কত আশা কইরা আছিলাম আমার ছেড়ার বউ আমি পছন্দ কইরা ঘরে আনাম। পরীর মতো বউ আনাম। কিন্তু তুই এমন কালা ছেড়িরে পছন্দ কইরা রাখছস। দশ মাস দশ দিন তোরে পেটে রাখছি। আর এহন তুই এই ছেড়ির লাইগগা গলা উঁচায়া কথাও কইতাছস!’পদ্মজা জুলেখাকে বুঝাতে চাইলো, ‘আপনি অকারণে কাঁদছেন। দেখুন…’‘তুমি চুপ থাকো। তোমার বইনের তো গত্রের রঙ কালা। আর তোমার তো চরিত্রই কালা। নষ্টা মাইয়া মানুষের মতো জামাই রাইক্ষা অন্য ছেড়ার লগে সম্পর্ক রাখছো। এমন চরিত্রহীন ছেড়ি মানুষের বইনরে আমার বংশে নিয়া কি ইজ্জতে কালি লাগামু?’পূর্ণার ত্যাড়া রগটা সক্রিয় হয়ে উঠে। সে জুলেখার সামনে এসে আঙুল শাসিয়ে বললো, ‘আমি সব সহ্য করব কিন্তু আমার আপাকে কিছু বললে আমি সহ্য করব না।’পূর্ণার আঙুল শাসিয়ে কথা বলাটা জুলেখা হজম করতে পারলেন না। কত বড় সাহস! মিয়া বংশের বড় বউকে শাসিয়ে কথা বলছে! জুলেখা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বললেন, ‘কইলজাডা বেশি বড়! এই ছেড়ি কারে আঙুল দেহাইতাছো তুমি? তোমার বইনে যে নষ্টা পুরা গেরামে জানে। সত্য কইতে আমি ডরাই না।’মৃদুল ক্ষেপে যায়। সে জুলেখার পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো আর বললো, ‘আম্মা,আপনি কিন্তু বাড়াবাড়ি করতাছেন।’জুলেখা পিছনে ঘুরেই মৃদুলকে কষে চড় মারলেন। বেশ জোরেই শব্দ হয়। গফুর মিয়া জুলেখাকে ধমকালেন, ‘তুমি কী করতাছো? কী কইতাছো?’জুলেখা বানু গফুর মিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘কিয়ামত নাইমা আইলেও এমন নষ্টার কালি বইনরে আমার ঘরের ঝিও করতাম না।’পূর্ণার শিরায়-শিরায় ক্রোধ ছড়িয়ে পড়ে। সে টেবিলে এক হাত রেখে কিড়মিড় করে বললো, ‘আরেকবার নষ্টা কথা উচ্চারণ করলে আমি আপনার জিভ পুড়িয়ে দেব।’উপস্থিত সবাই পূর্ণার দিকে চমকে তাকায়। মৃদলও অবাক হয়। পদ্মজা পূর্ণার এক হাত টেনে ধরে,কিন্তু পূর্ণাকে নাড়ানো যায় না। সে বড় বড় চোখ করে জুলেখার দিকে তাকিয়ে আছে। জুলেখা রাগে,বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। তিনি ক্রোধের ভার নিতে পারছেন না। টেবিলে জোরে জোরে তিনটা থাপ্পড় দিয়ে তিনবার বললেন, ‘ নষ্টার বইন,নষ্টার বইন,নষ্টার বইন!’কেউ কিছু বুঝে উঠার পূর্বে পূর্ণা টেবিলের উপর থাকা জগ হাতে তুলে নিল। তারপর জগের সবটুকু পানি জুলেখার মুখের উপর ছুঁড়ে মারলো। আকস্মিক ঘটনায় সবার চোখ মারবেলের মতো হয়ে যায়।সাথে-সাথে পদ্মজা পূর্ণাকে বিরতিহীনভাবে থাপড়ানো শুরু করলো। পূর্ণা দুই হাতে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে। রাগে,দুঃখে সে কাঁদছে। পদ্মজার চোখভর্তি জল। সে পূর্ণাকে বললো, ‘এটা কী করলি তুই? তোকে এই শিক্ষা দিয়েছি? আর কত জ্বালাবি আমাকে?’লতিফা পূর্ণাকে বাঁচাতে দৌড়ে আসে। জুলেখা বিস্ফোরিত নয়নে তাকিয়ে আছেন। অপমানে তার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে হচ্ছে। তিনি মৃদুলের দিকে তাকালেন। মৃদুলের চোখেমুখে অসহায়ত্ব প্রকাশ পাচ্ছে! তার অনুভূতিগুলো থমকে গেছে। জুলেখার চোখে জল চিকচিক করছে। তিনি চোখের জল মুছে বললেন, ‘থাক এইহানে,বাড়ি ফেইরা আমার কবর দেখবি তুই।’মৃদুল তার মাকে খুব ভালোবাসে। জুলেখার চোখের জল তার হৃৎপিণ্ডকে জ্বালিয়ে দেয়! জুলেখা ব্যাগ হাতে নিয়ে বেরিয়ে যান। পিছন পিছন গফুর মিয়াও গেলেন। মৃদুল পূর্ণাকে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘ভালো করলে না।’পূর্ণাকে লতিফা জড়িয়ে ধরে রেখেছে। সেই অবস্থায়ই পূর্ণা হুংকার ছাড়ে, ‘ বেশ করেছি। আমার বোন আমার মা! আমার মাকে আপনার মা গালি দিয়েছে। আমি উনাকে ছেড়ে দিলে জাহান্নামেও আমার জায়গা হতো না।’‘কাজটা ঠিক করো নাই পূর্ণা!’ মৃদুলের কণ্ঠে তেজের আঁচ পাওয়া গেল।মায়ের প্রতি মৃদুলের সমর্থন দেখে পূর্ণা রাগে বলে উঠলো, ‘ এমন মায়ের ছেলেকে আমি বিয়ে করব না।’মৃদুল তিরস্কার করে হেসে বললো, ‘আমিও করব না। তুমি না আমার গায়ের রঙের সাথে মানাও, না ব্যবহারের দিক দিয়া মানাও। জুতা মারি বিয়ারে।’মৃদুল টেবিলে জোরে লাথি মেরে বেরিয়ে গেল। পদ্মজা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চেয়ারে বসলো। ছোট থেকে শত সমস্যার মুখোমুখি হতে হতে সে ক্লান্ত। বড্ড ক্লান্ত!
এখন যে দুপুর তা বুঝার সাধ্যি নেই! ঘন কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে। সকাল থেকে সূর্যের দেখা নেই। কুয়াশা তার গভীর মায়াজালে সূর্যকে লুকিয়ে রেখেছে। পূর্ণা আলগ ঘরের বারান্দায় বসে কাঁদছে। তার পাশে বসে আছে প্রান্ত। প্রান্ত পূর্ণাকে নিয়ে যেতে এসেছে। কিন্তু পূর্ণার কোনো হুঁশ নেই। সে কেঁদেই চলেছে। মগা আলগ ঘরে ঘুমাচ্ছে। নাক দিয়ে বের হচ্ছে বিদঘুটে শব্দ। সেই শব্দে প্রান্ত বিরক্ত! সে দুই আঙুল কানে ঢুকিয়ে চুপচাপ বসে রইলো। পূর্ণা হাঁটুর উপর থুতুনি রেখে সুপারি গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ বেয়ে টুপটুপ বৃষ্টি বর্ষণ হচ্ছে। বুকের জ্বালাপোড়া সহ্য করতে পারছে না। মৃদুলের শেষ কথাগুলো তার শরীরের প্রতিটি পশমকে পুড়িয়ে দিয়েছে। এ ব্যথা সে কোথায় লুকোবে? মনের মণিকোঠায় যত্নে রাখা ভালোবাসার মুখের তিক্ত কথা কি সহ্য করা যায়! পূর্ণা নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে। বুকের ভেতর তুফান বয়ে যাচ্ছে। লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে ফুসফুস, কিডনি,মস্তিষ্ক,সর্বাঙ্গ! পূর্ণার হেঁচকি ওঠে। প্রান্ত চেয়ার ছেড়ে পূর্ণার সামনে এসে দাঁড়ালো। উৎকণ্ঠিত হয়ে বললো, ‘আপা!’পূর্ণা তার ডাগরডাগর চোখদুটো মেলে প্রান্তর দিকে তাকায়। চোখের দৃষ্টিতে দুঃখের মহাসাগর। পূর্ণা প্রান্তকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো, ‘ভাই,আল্লাহ আমাদের থেকেই কেন সবকিছু ছিনিয়ে নেন?’প্রান্ত পূর্ণার কথার মানে বুঝলো না। কিন্তু পূর্ণার কান্না তার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। সে পূর্ণার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো, ‘ আল্লাহ সব ঠিক করে দিবেন আপা। বড় আপা বলে,যা হয় সব ভালোর জন্য হয়।’পূর্ণার কান্নার দমকে কিশোর প্রান্ত কেঁপে-কেঁপে উঠে। আলগ ঘরের ডান পাশে রিদওয়ান দাঁড়িয়ে আছে। মৃদুল অন্দরমহলে আছে ভেবে সে পাতালঘর থেকে সোজা আলগ ঘরে এসেছে। কিন্তু এসে দেখে,এখানে পূর্ণা হাউমাউ করে কাঁদছে! ব্যাপারটা কী? রিদওয়ান আলগ ঘরে আর গেল না। কলপাড়ে রিনুকে দেখা যায়। রিদওয়ান চারপাশ দেখতে দেখতে কলপাড়ে আসে। রিনু রিদওয়ানকে দেখে ভয়ে জমে যায়। রিদওয়ান নানা অজুহাতে রিনুর গায়ে হাত দেয়। রিনুর ভালো লাগে না। ভয়ে কিছু বলতেও পারে না। সে এতিম! ছোট থেকে এই বাড়িতে বড় হয়েছে। যাওয়ার জায়গা নেই। রিদওয়ান রিনুকে প্রশ্ন করলো, ‘ পূর্ণা কাঁদতেছে দেখলাম। কিছু জানিস?’রিনু কাচুমাচু হয়ে সকালের ঘটনা খুলে বললো। সব শুনে রিদওয়ান খুব খুশি হয়। গুনগুনিয়ে গান গেয়ে অন্দরমহলের দিকে যায়। আমিনা আলোকে নিয়ে অন্দরমহলের সামনে খেলছেন। রিদওয়ান আলোর দিকে হাত বাড়িয়ে ডাকলো, ‘মামা,এদিকে আসো।’রিদওয়ান আলোকে কোলে নেয়। আমিনা ভারী করুণ ভাবে বললো, ‘ আমার রানিরে কি পাওন যাইতো না?’রিদওয়ান চিন্তিত ভঙ্গিতে বললো, ‘খোঁজা হচ্ছে। পেয়ে যাবো।’আলোকে আমিনার কোলে দিয়ে রিদওয়ান সদর ঘরে প্রবেশ করে। রান্নাঘর থেকে পদ্মজার কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। রিদওয়ান সেদিকে যায়। পদ্মজা রিদওয়ানকে দেখে চোখ ফিরিয়ে নিল। কাজে মন দিল। রিদওয়ান পদ্মজার উপর চোখ রেখে কপাল কুঁচকায়! এই মেয়ে এতো চুপচাপ আর স্বাভাবিক কেন? সব মেনে নিল নাকি? রিদওয়ান মনের প্রশ্ন মনে রেখেই জায়গা ত্যাগ করে। যাওয়ার পূর্বে লতিফাকে বলে গেল, ‘লুতু,খাবার নিয়ে আয়।’রিদওয়ান চোখের আড়াল হতেই লতিফা ভেংচি কাটে। মাংস রান্না হচ্ছে। মাংস রান্না হতে দেখলেই পদ্মজার ফরিনার কথা মনে পড়ে। ফরিনার হাতের মাংসের ঝোলের স্বাদ ছিল অন্যরকম। অন্দরমহলের বাম পাশে ফরিনার কবর! আজ তিনদিন তিনি পৃথিবীর মায়া ছেড়েছেন। পদ্মজার বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। মাথার উপর ভারী বোঝা! বোঝা টানতে কষ্ট হচ্ছে। নিঃশ্বাসে-নিঃশ্বাসে সে আল্লাহর নাম স্বরণ করছে। প্রার্থনা করছে, এই বোঝার ঘানি যেন সে টানতে পারে। সেই ক্ষমতা আর ধৈর্য্য যেন হয়! লতিফা পদ্মজাকে চাপাস্বরে ডাকলো, ‘পদ্ম?’পদ্মজা তাকালো। লতিফা বললো, ‘তুমি আমারে না কইছিলা বড় কাকা আর ছোট কাকার সব খবর দিতে।’পদ্মজা দরজার বাইরে একবার তাকালো। তারপর লতিফার দিকে ঝুঁকে বললো, ‘কী খবর এনেছো?’‘শনিবার রাইতে ভোজ আসর বসাইবো।’‘কীসের?’লতিফা কথা বলতে ভয় পাচ্ছে। তার দৃষ্টি অস্থির। সে ফিসফিসিয়ে বললো, ‘মাইয়া পাচার করার কয়কদিনের মাঝে সবাই এক লগে বইয়া খাওয়া-দাওয়া করে। পরের কাম নিয়া কথাবার্তা কয়।’‘এটাও কী নিয়ম?‘হ।’‘কত্ত খারাপ এরা! এতো মেয়ের জীবন নষ্ট করতে পেরেছে সেই খুশিতে আনন্দ-ফূর্তি করে! কয়জন থাকবে জানো?’লতিফা বললো, ‘পাঁচ জনে।’পদ্মজা আর কথা বাড়ালো না। অন্যমনস্ক হয়ে উচ্চারণ করলো, ‘শনিবার রাতে!’লতিফা কপাল ইষৎ কুঁচকিয়ে বললো, ‘কিতা করবা ভাবছো?’পদ্মজা তেজপাতা হাতে নিয়ে বললো, ‘জানি না বুবু।’পদ্মজা কথা বাড়াতে চাইছে না বুঝতে পেরে লতিফা আর কথা বললো না। সে রিদওয়ানের জন্য খাবার প্রস্তুত করে।।পদ্মজা বললো, ‘ জানো,তোমার ভাই আমার আগে দুটো বিয়ে করেছে!’লতিফার হাত থেকে থালা পড়ে যায়। ঝনঝন শব্দ হয়। ভাত,ঝোল মেঝেতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে।মৃদুল পুকুরপাড়ে বসে আছে। তার চোখ দুটি লাল। আজ ট্রেন নেই। আগামীকাল ভোরে ট্রেন আসবে। জুলেখার ফুফাতো বোনের শ্বশুর বাড়ি অলন্দপুরে। আটপাড়ার পাশের গ্রাম নয়াপাড়ায়! জুলেখা সোজা তার বোনের বাড়িতে চলে এসেছে। এখানে আসার পর থেকে বাড়ির পাশে পুকুরপাড়ে বসে আছে মৃদুল। তার জিভ ভারী হয়ে আছে। অকপট বলে দেওয়া কথাটা তাকে খুঁড়ে, খুঁড়ে খাচ্ছে। পূর্ণার কান্নামাখা চোখ দুটি বার বার ভেসে উঠছে চোখের সামনে। বুকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। দুশ্চিন্তায় দপদপ করছে মাথার রগ। কান্নারা গলায় এসে আটকে আছে। রাগের বশে সে জীবনে অনেক ভুল করেছে। কিন্তু এইবারের ভুলটা আত্মার উপর আঘাত হানছে। নিজের কথা দ্বারা নিজেই কষ্ট পাচ্ছে। জুলেখা বানু মৃদুলকে খুঁজে পুকুরপাড়ে আসেন। তিনি মৃদুলের উপর বেজায় খুশি! মৃদুলকে বললেন, ‘আব্বা,খাইতে আসো।’মৃদুল দূর্বল গলায় বললো, ‘পরে খামু। যান আপনি।’জুলেখা মৃদুলের পাশে বসলেন। মৃদুলের পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তোমার লাইগগা আসমানের পরী আনাম। মন খারাপ কইরো না।’‘লাগব না আমার আসমানের পরী।’মৃদুলের কণ্ঠস্বর কঠিন হওয়াতে জুলেখা বানুর হাসি মিলিয়ে যায়। তিনি বললেন, ‘দেহো আব্বা,তুমি চাইছো আর পাও নাই এমন কিছু আছে? ওই ছেড়ি কালা। ছেড়ির বইনেরও চরিত্র ভালা না…’‘চুপ করেন আম্মা। আল্লাহর দোহাই লাগে,চুপ করেন। আপনি কারে কি কইতাছেন? পদ্মজা ভাবির নখের যোগ্যেরও কোনো নারী নাই। আর আপনি তারে চরিত্রের অপবাদ দিতাছেন।’মৃদুল চিৎকার করে কথাগুলো বললো। মৃদুলের চিৎকার শুনে জুলেখার বোনের শ্বাশুড়ি পুকুরপাড়ে উঁকি দেন। সেদিকে তাকিয়ে জুলেখার লজ্জা হয়। মাথা হেট হয়ে যায়। তিনি রাগে চাপাস্বরে বললেন, ‘আমি কইতাছি না গেরামের মানুষ কইছে? ওই ছেড়ির শ্বশুরেও কইছে। এরা মিছা কইছে?’‘হ কইছে। আমি লিখন ভাইরেও চিনি,পদ্মজা ভাবিরেও চিনি। এই দেশের নামীদামী একজন অভিনেতা কেন অন্য বাড়ির বউয়ের সাথে লুকিয়ে সম্পর্ক রাখব আম্মা? তার কী সুন্দর মাইয়ার অভাব? পদ্মজা ভাবিরে লিখন ভাই পছন্দ করে ঠিক। কিন্তু পদ্মজা ভাবির সাথে আমির ভাইয়ের বিয়া হইবার আগে থাইকা। পদ্মজা ভাবি এমনই পবিত্র একজন মানুষ যে,লিখন ভাই এত্ত ভালোবাসে জাইননাও কোনোদিন লিখন ভাইয়ের দিকে ফেইরা তাকাইছে না। জামাইরে ভালোবাসছে। পদ্মজা ভাবি,দিনরাত এবাদত করে। ভাই-বোনের দায়িত্ব নিছে। এমন মানুষ খুঁইজা পাইবেন? পূর্ণার কাছে ওর বইনে ওর মা। তুমি ওর মারে খারাপ কথা কইছো। এজন্যে ও তোমার সাথে খারাপ করছে। আর পূর্ণা তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করছে তাই আমিও…’মৃদুল আর কথা বলতে পারলো না। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে। দাঁতে ঠোঁট কামড়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। জুলেখা পিছনে ফিরে তাকান। বোনের শ্বাশুড়ি তাকিয়ে রয়েছে! জুলেখার মুখটা অপমানে থমথমে হয়ে যায়। গটগট শব্দ তুলে জায়গা ছাড়লেন। মৃদুল জুলেখার যাওয়ার পানে তাকালো। সে তার মায়ের স্বভাব জানে। এখন খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিবে। উনিশবিশ হলেই নিজের ক্ষতি করে বসেন। এজন্য গফুর মিয়াও কিছু বলেন না,আর না মৃদুল কিছু বলতে পারে! মৃদুল মাথা নত করে কান্নায় ডুবে যায়। শেষ কবে সে কেঁদেছে জানে না!পূর্ণা পদ্মজাকে না বলে বাড়িতে চলে গেছে। পদ্মজা এক হাতে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুজে বসে আছে। মস্তিষ্কে ঘুরাঘুরি করছে আমিরের কু-কীর্তি! তার দুটো বিয়ে,নারী আসক্তি,সমাজের চোখে কলঙ্কিত হওয়া আর ফরিনার মৃত্যু! কানে বাজছে ‘নষ্টা’ শব্দটি। কতো ঘৃণা নিয়ে জুলেখা বানু এই শব্দটি উচ্চারণ করেছিলেন! তারপর মৃদুলের বলা কথাগুলো শুনে পূর্ণার অবাক চাহনি! পূর্ণার রক্তাক্ত হৃদয়ের যন্ত্রণা পদ্মজা টের পাচ্ছে! বুকটা ভারি হয়ে আছে। কান্না মন হালকা করে। কিন্তু কান্না আসছে না। আর কত কাঁদা যায়? পদ্মজা নিজেকে বুঝায়, আরো ধৈর্য্যশীল হতে হবে! এক হাতের দুই আঙুলে কপালের দুই পাশ চেপে ধরে।আমির সদর ঘরে প্রবেশ করে থমকে যায়। তার হাতে কাপড়ের একখানা খালি ব্যাগ। পদ্মজা পা দেখেই চিনে ফেলে,মানুষটা কে! সে মুখ তুলে তাকালো না। সেকেন্ড কয়েক আমির থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর পদ্মজার পাশ কেটে দ্বিতীয় তলায় উঠে গেল। পদ্মজা অনুভব করে,তার অনুভূতিরা পাল্টে যাচ্ছে। চঞ্চল হয়ে উঠছে! আমির ঘরে প্রবেশ করেই দ্রুত আলমারি খুললো। একবার দরজার দিকে তাকালো। তারপর কাগজে মুড়ানো একটা বস্তু দ্রুত ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল। যখন আলমারি লাগাতে যাবে একটা খাম মেঝেতে পড়ে। খামের উপরের লেখাটা আমিরের চেনা-চেনা মনে হয়। তাই সে পদ্মজার অনুমতি ছাড়াই খামের ভেতর থেকেচিঠি বের করলো। চিঠির লেখাগুলো দেখে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে যায়, এটা আলমগীরের চিঠি!আমিরের ভ্রু দুটি বেঁকে গেল। সে উৎকণ্ঠা নিয়ে প্রতিটি লাইন পড়লো। প্রতিটি শব্দ তার মগজে আঘাত হানে! আতঙ্কে গায়ের পশম দাঁড়িয়ে যায়। নিজের অজান্তে এক কদম পিছিয়ে আসে। আলমগীরের খামের ভেতরের পৃষ্ঠায় কিছু লেখার অভ্যেস রয়েছে। আমির খাম ছিঁড়লো। তার ধারণা ঠিক! সাদা খামের ভেতরের পৃষ্ঠায় আলমগীরের বর্তমান ঠিকানা ও পাতালঘরের সঠিক অবস্থানের কথা লেখা আছে! আমির আলমগীরের ঠিকানাটা মুখস্থ করার চেষ্টা করলো। কিন্তু মুখস্থ হচ্ছে না। ভেতরটা কাঁপছে। পদ্মজা দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। আমির পদ্মজার উপস্থিতি টের পেয়ে হাতের খাম ও চিঠিগুলো বিছানার উপর রেখে কাপড়ের ব্যাগটা হাতে তুলে নিল। তারপর পদ্মজার দিকে তাকালো। তার চাহনি যেন মৃত! পদ্মজা কয়েক পা এগিয়ে এলো। আমির অপলক চোখে তাকিয়ে আছে। পদ্মজা রয়ে সয়ে প্রশ্ন করলো, ‘ আর কিছু জানার আছে?’আমির নির্বিকার! তার মুখে রা নেই। পদ্মজা বিছানা থেকে একটা চিরকুট হাতে নিল। বললো, ‘আপনার দুই বউয়ের নাম কী ছিল?’আমির বললো, ‘শারমিন,মেহুল।’পদ্মজার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠে। আমির পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। চোখের পলকও পড়ছে না। পদ্মজা ঢোক গিলে বললো, ‘আমরা যে ঘরে একসঙ্গে থেকেছি,তারাও কি সেই ঘরে আপনার সঙ্গে থেকেছে?’‘না,অন্য বাড়িতে।’‘তাহলে সব সত্য?’‘মিথ্যা বলে যদি তোমাকে আরো একবার পাওয়া যেত আমি মিথ্যা বলতাম।’ আমিরের সরল গলা। পদ্মজার নাকের পাটা ফুলে যায়। আমিরের সাথে কথা বললে তার এতো কান্না পায় কেন! আমির বললো, ‘আসি।’পদ্মজা শ্বাসরুদ্ধকর কণ্ঠে বললো, ‘কেন?’আমির থামলো। পদ্মজা কান্না করে দিল। সে কিছুতেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। আমির বললো, ‘আমাকে কান্না দেখাতে দাঁড় করালে?’পদ্মজা জল ভরা আগুন চোখে আমিরের দিকে তাকায়। কিড়মিড় করে বললো, ‘ নরপশু আপনি! এতগুলি মেয়ের ভালোবাসা নিয়ে খেলেছেন।’আমির নির্বাক। তার চুপ করে থাকাটা পদ্মজাকে আরো জ্বালা দেয়। তার অবচেতন মন চায় একবার আমির বলুক, সব মিথ্যে। কিন্তু আমির বলে না। কারণ,সব সত্য! সব সত্য! পদ্মজা অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে চিৎকার করে বললো, ‘ কথা বলার মুখ নেই? এতো লজ্জা হা? আসলেই লজ্জা আছে?’পদ্মজা তাচ্ছিল্যের হাসি দিল। আমির চোখের দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। বুকের ভেতর আগুন ছুটে বেড়াচ্ছে। যেদিকে যাচ্ছে সেদিকটা পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে। পদ্মজা এলোমেলো হয়ে গেছে। আমির বের হওয়ার জন্য উদ্যত হতেই পদ্মজা বললো, ‘আমাকে তালাক দিন। আমি আপনার বউয়ের পরিচয়ে আর থাকতে চাই না।’পদ্মজার কথা শোনামাত্র আমিরের বুকটা কেঁপে উঠলো। কোথেকে যেনো একটা উত্তাল ঢেউ এসে মনের সমস্ত কিনার ওলট-পালট করে দিল। আমির কথা বলতে গিয়ে দেখলো কথা আসছে না। পদ্মজা আরো একবার চেঁচিয়ে বললো, ‘আমার তালাক চাই। আপনার বউ হওয়া কলঙ্কের।’আমির অনেক কষ্টে কয়টা শব্দ উচ্চারণ করলো, ‘থাক না এক-দুটো কলঙ্ক।’পদ্মজা সেকেন্ড তিনেক ছলছল চোখে তাকিয়ে রইলো। তারপর মুহূর্তে ভুলে যায় পৃথিবী। ভুলে যায় পাপ-পুণ্য। ঝড়ের গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমিরের বুকে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। ছেড়ে দিলে যদি হারিয়ে যায়! আমিরের বুকের সোয়েটার কামড়ে ধরে কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে বললো, ‘ চলুন না, দূরে পালিয়ে যাই। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।’পদ্মজা জড়িয়ে ধরতেই আমিরের শরীরের রক্ত চলাচল থেমে যায়। অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ে। সেই জল ফুটন্ত পানির মতো গরম। এ যেন দগ্ধ হওয়া হৃদয়ের আঁচ!
হৃদয়ের প্রলয়ঙ্করী ঝড় ক্ষণমুহূর্তের জন্য থামিয়ে আমির বললো, ‘ ছাড়ো পদ্মজা।’পদ্মজার কান্না থেমে যায়! হাত দুটি আমিরের পিঠ থেকে সরে যায়। পদ্মজা তার জলভরা নয়ন দুটি মেলে আমিরের দিকে তাকালো। তার রক্ত জবা ঠোঁট দুটি কাঁপছে। হোঁচট খাওয়া গলায় পদ্মজা বললো, ‘ আমার হৃদয়ের আকুলতা আপনাকে ছুঁতে পারছে না?’আমির ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছে। পদ্মজা দূরে সরে দাঁড়ালো। আমিরের কৃষ্ণ মুখে, বিপর্যস্ত পদ্মজার নিষ্কম্প স্থির চোখের দৃষ্টি থমকে আছে। পদ্মজা থেমে থেমে বললো, ‘ তাহলে আমি…আমিও বঞ্চিত ভালোবাসা থেকে!’পদ্মজার দুই চোখ বেয়ে জল পড়ছে। আমির আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। চোখের পলকে প্রস্থান করলো। পদ্মজা ধাতস্থ হয়ে আচমকা ক্ষুধার্ত বাঘিনীর মতো চিৎকার করে উঠলো, ‘ ধিক্কার নিজের উপর! জানোয়ারকে মানুষ হওয়ার সুযোগ দিয়েছি! ধিক্কার নিজের ভালোবাসার উপর! প্রতিটি কাজের জন্য আপনি শাস্তি পাবেন। আমি আপনার আজরাইল হবো।’পদ্মজার গলার হাড় ভেসে উঠে। তার চিৎকার অন্দরমহলকে কাঁপিয়ে তুলে। কাঁদতে-কাঁদতে সে মেঝেতে বসে পড়লো। আমিরের প্রত্যাখ্যান তার ভালোবাসাকে ক্রোধে পরিণত করছে। পদ্মজা রাগে বিছানার চাদর টেনে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেললো। বুকের ভেতরটা পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে! ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ! পানি প্রয়োজন!ফরিনার কবরের চারপাশে বাঁশের বেড়া দেয়া হয়েছে। আমির ফরিনার কবরের পাশে এসে বসলো। হাতের ব্যাগটা পাশে রেখে বেড়ার ফাঁক দিয়ে ফরিনার কবরে হাত বুলিয়ে দিল। গাঢ় স্বরে ডাকলো, ‘আম্মা! আমার আম্মা।’চারিদিকে নিস্তব্ধতা। অন্দরমহল থেকে কোনো শব্দ আসছে না। নিস্তব্ধতা ভেঙে- ভেঙে মাঝেমধ্যে পাতার ফাঁকেফাঁকে পাখ-পাখালির ডানা নাড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। আমিরের ঠোঁট দুটো কিছু বলতে চাইছে কিন্তু পারছে না। অথবা সে কিছু বলছে কিন্তু শব্দ হচ্ছে না। আড়ষ্টতা ঘিরে রেখেছে তাকে। সে তার মৃত মা’কে কিছু বলার সাহস পাচ্ছে না। আমির অনেকক্ষণ নতজানু হয়ে চুপচাপ বসে রইলো। তারপর উঠে দাঁড়ালো। ব্যাগ হাতে নিয়ে পাতালঘরের উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করে। লতিফা অন্দরমহল থেকে অস্থির হয়ে বের হয়। তার হাঁটায় তাড়াহুড়ো।আমির ডাকলো, ‘ লুতু।’লতিফা দাঁড়াল। আমির বললো, ‘ পদ্মজার খেয়াল রাখবি। খাওয়া-দাওয়া ঠিকঠাক রাখবি। আর, যখন যা বলে করবি।’লতিফা মাথা নাড়াল। আমির প্রশ্ন করলো, ‘কোথায় যাচ্ছিস?’আমিরের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে লতিফা বললো, ‘ ভাইজান,তোমারে কিছু কইতাম।’‘বল।’‘মৃদুল ভাইজানে আর তার আম্মা-আব্বা আইছিলো। মৃদুল ভাইজানের আম্মা মৃদুল ভাইজানরে পূর্ণার লগে বিয়া করাইতে রাজি হয় নাই। ‘আমির কপাল কুঁচকাল। বললো, ‘কী সমস্যা? কেন রাজি হয়নি?’রিদওয়ান অন্দরমহল থেকে বের হয়ে ফোড়ন কাটলো, ‘আমির,তোর সাথে কথা আছে।’আমির পিছনে ফিরে তাকালো না। বললো, ‘পরে শুনব।’রিদওয়ান বললো, ‘আমি জানি কেন রাজি হয়নি। আয়,ওদিকে যেতে যেতে বলি।’লতিফা রিদওয়ানের দিকে তাকায়। রিদওয়ান তার চোখের দৃষ্টি দিয়ে লতিফাকে সতর্ক করে। আমির রিদওয়ানের দিকে ফিরে বিরক্তি নিয়ে বললো, ‘ আরে ভাই,যা তো। লুতু কী কী হয়েছে বলতো?’রিদওয়ানের সামনে রিদওয়ান সম্পর্কে কিছু বলার সাহস লতিফার হলো না। সে বললো, ‘ মৃদুল ভাইজানের আম্মা পূর্ণার গায়ের রঙ পছন্দ করে নাই। কইছে,কালা ছেড়ি ঘরে নিব না।’আমির রাগ নিয়ে বললো, ‘ফালতু মহিলা! পূর্ণা জানে? কোথায় পূর্ণা?’‘হ জানে। এই বাড়িত আছিলো। এহন হেই বাড়িত গেছে।’‘মৃদুল…মৃদুল কী বললো?’লতিফা পুরো ঘটনা খুলে বললো। এড়িয়ে গেল পদ্মজার ব্যাপারটা। সে মনে মনে পরিকল্পনা করলো,রাতে যদি রিদওয়ান অন্দরমহলে থাকে সে পাতালঘরে গিয়ে আমিরকে সব বলবে। আমির সব শুনে বললো, ‘ মৃদুল ছাড়া এই পরিস্থিতি ঠিক হবে না। দেখা যাক,ও কী সিদ্ধান্ত নেয়। আর ওই মুখছুটা মহিলাকে আমি একবার পাই শুধু!’আমির রাগে গজগজ করতে করতে সামনে এগিয়ে যায়। রিদওয়ান লতিফাকে চাপা স্বরে হুমকি দিল, ‘ গতকালের ঘটনা যদি আমিরের কানে যায় তোর খবর আছে। ল্যাং* করে গাছে ঝুলিয়ে রাখবো।’লতিফা চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলে। বললো, ‘ বাড়ির বাইরে গেলেই আমির ভাইজানে সব জাইননা যাইব। তহন ?’লতিফার প্রশ্ন শুনে রিদওয়ান চিন্তায় পড়ে যায়। সে আমিরের পিছনে যেতে যেতে ভাবতে থাকে,এই পরিস্থিতি কী করে সামাল দিবে! আজ না হয় কাল আমির তো সব জানবে! আমির জঙ্গলে প্রবেশ করে রিদওয়ানকে বললো, ‘ কী কথা না বলবি!’রিদওয়ান বললো, ‘ শনিবার রাতে ভোজ আসর হবে। চাচা সিদ্ধান্ত নিল।’‘আচ্ছা।’‘ছাগলের মাংস পুড়ানো হবে।’‘কয়টা?’‘দুটো।’‘বিরাট আয়োজন!’দুজন কথা বলতে বলতে পাতালঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। রিদওয়ান ঘাস সরিয়ে দরজা খুললো। এক পা সিঁড়িতে দিতেই আমির রিদওয়ানের কাঁধ চেপে ধরলো। ফিসফিসিয়ে বললো, ‘এখানে কেউ আছে!’আমিরের কথা শুনে রিদওয়ানের বুক ছ্যাঁত করে উঠলো। এমতাবস্থায় কে দেখে ফেললো! রিদওয়ান চারপাশে চোখ বুলায়। কোথাও কেউ নেই! আমিরের প্রখরতা নিয়ে তাদের কোনো সন্দেহ নেই। আমির যেহেতু বলেছে এখানে কেউ আছে। মানে আছে। রিদওয়ান চাপাস্বরে বললো, ‘এখন কী করব?’আমির দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যাক্তি। সে চারপাশে আরো একবার চোখ বুলিয়ে বললো, ‘ কেউ এখানে থাকলে সে ডান দিকে আছে।’রিদওয়ান ডান দিকে এগিয়ে যায়। তখনই একজন লোক ঝোপঝাড়ের মাঝখান থেকে উঠে দৌড়াতে শুরু করে। রিদওয়ান উল্কার গতিতে তাকে ধরে ফেললো। লোকটার মাথায় চুল নেই। পরনে লুঙ্গি আর ফতুয়া। পাটকাঠির মতো চিকন লোকটা ইয়াকুব আলীর সহকারী পলাশ মিয়া। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি অথবা ত্রিশই। রিদওয়ান পলাশকে ঘাড়ে ধরে আমিরের সামনে নিয়ে আসে। দেখে মনে হচ্ছে,রিদওয়ান জীবিত ইঁদুর ধরেছে। আমির পলাশকে প্রশ্ন করলো, ‘ নির্বাচনের তো অনেক দেরি আছে। এখনই আমাদের পিছনে পড়ার রহস্যটা বুঝলাম না।’পলাশ পাতালঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘ এইডা কিতা? এইহানে কিতা করেন আপনেরা?’আমির হাসলো। পলাশের মাথায় টোকা মেরে বললো, ‘ এই দৃশ্য দেখা তোর একদম ঠিক হয়নি। আয়ুটা কমে গেল।’আমির পাতালে নেমে গেল। পলাশ ছটফট করতে থাকে। সে কিছুতেই ভেতরে যাবে না। সে ভয় পাচ্ছে। রিদওয়ান পলাশকে টেনে ভেতরে নিয়ে যায়। আমির বিওয়ানের চেয়ারে এসে বসলো। রিদওয়ান পলাশকে বেঁধে মেঝেতে ফেললো। চিৎকার,চেঁচামেচি করার জন্য পলাশ রিদওয়ানের হাতে দুই-তিনটা থাপ্পড় খেল। পলাশ কাঁদো-কাঁদো হয়ে আমিরকে বললো, ‘ আপনেরা এমন করতাছেন কেন আমার লগে? আমারে ছাইড়া দেন।’রিদওয়ান আমিরকে বললো, ‘তুই সামলা। আমি যাই,চাচার সাথে কথা আছে।’আমির ইশারা করলো, যেতে। রিদওয়ান চলে গেল। পলাশ চারপাশ দেখে ঢোক গিললো। পাতালঘর মৃদু লাল-হলুদ আলোতে ডুবে আছে। কেমন ভূতুড়ে পরিবেশ! তার মনে হচ্ছে,সে কবরে আছে। আর সামনে ঘাড় বাঁকিয়ে বসে আছে স্বয়ং যমদূত! আমির এক পা চেয়ারে তুলে বললো, ‘ তারপর,পলাশ মিয়ার এখানে কোন দরকারে আসা হয়েছে?’পলাশ হাতজোড় করে বললো, ‘আমারে ছাইড়া দেন। আমি এমন কবর আর দেহি নাই। আমার কইলজাডা কাঁপতাছে।’আমির ধমকে বললো, ‘এখানে আসছিলি কেন?’পলাশ দ্রুত বললো, ‘ ইয়াকুব চাচা পাডাইছে।’‘কোন দরকারে?’‘আমারে খালি কইছে,মজিদ মাতব্বরের বাড়িত যা। আমার মনে হইতাছে ওই বাড়িত কিছু একটা গোলমাল আছে। কিছু যদি বাইর করতে পারছ তোরে আরেকটা বিয়া দিয়া দিয়াম।’আমির চমকাল। বললো, ‘উনার হুট করে কেন মনে হলো এখানে গোলমাল আছে?’পলাশ কেঁদে বললো, ‘আমি এইডা জানি না ভাই। আমারে ছাইড়া দেন।’আমিরের মাথায় কয়েকটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়ে যায়। কী এমন হলো যে, ইয়াকুব আলী হাওলাদার বাড়ি নিয়ে সন্দেহ করছে! আমির আয়েশি ভঙ্গিতে বসলো। বললো, ‘ শুনেছি,গত বছর তোর বউকে নাকি হিন্দু এক জমিদারের কিনে নিয়েছে । তারপর তোর বউ আত্মহত্যা করলো! সত্যি?’পলাশ মেঝেতে কপাল ঠেকিয়ে বললো, ‘ভাই,আমারে মাফ কইরা দেন। আমি ভুল করছিলাম। আমারে ছাইড়া দেন। আমি কেউরে কিছু কইতাম না।’আমির বললো, ‘তুইতো ভাই আমার চাইতেও খারাপ। আচ্ছা,সবসময় তো পাপ কাজ করেছি। আজ একটা ভালো কাজ করার সুযোগ যখন পেয়েছি,করে ফেলি।’পলাশের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠে। সে জানে না,এই কবরস্থানের মতো বড় ঘরটায় কী হয়! কিন্তু এখানে যে ভালো কিছু হয় না বুঝা যাচ্ছে। বাঁচতে পারলে পরে এর রহস্য বের করা যাবে। আমির চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পলাশের মুখে জোরে লাথি দিল। পলাশ আর্তনাদ করে শুয়ে পড়ে। আমির চারিদিকে চোখ বুলিয়েও কোনো অস্ত্র পেল না। সে টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা কাঁচি বের করলো। ধারালো কাঁচি। সে কাঁচি দিয়ে পলাশের মুখে আঁচড় কাটে। হাতে-পায়ে,শরীরে আঁচড় কাটে। পলাশের বিদঘুটে চিৎকার পাতালঘরেই চাপা পড়ে যায়। তার চামড়া ছিঁড়ে রক্ত ঝরতে থাকে। আমিরকে আব্বা ডেকে অনুরোধ করে,তাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু সে জানে না, আমির কখনো তার শিকারের প্রতি মায়া দেখায় না। আমির পলাশের পাশে বসলো। দুই-তিনবার মাথা ঘুরাল। খুব নিঃস্ব লাগছে নিজেকে,মাথাটা ফাঁকা লাগছে। সে কাঁচি দিয়ে নিজের হাতে হেঁচকা টান মারে। সাথে-সাথে হাত থেকে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে আসে। পলাশ আমিরের কাণ্ড দেখে চমকে যায়। আমির কাঁচি রেখে মেঝেতে শুয়ে পড়ে। শূন্যে চোখ রেখে হাসে। হাসতে হাসতে গড়াগড়ি করে দেয়ালের পাশে যায়। ভয়ে পলাশের আত্মা কেঁপে উঠে! আমির দেয়ালের পাশ ঘেঁষে বসে। পলাশের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে উঠে। হঠাৎ করে তার কী হয়ে গেল? আমিরের উন্মাদ আচরণ দেখে পলাশের গায়ের পশম দাঁড়িয়ে পড়ে। আমির চট করেই উঠে দাঁড়াল। পলাশকে টেনে বসালো। তারপর নিজে গিয়ে চেয়ারে বসলো।ব্যাগ থেকে কাগজে মুড়ানো বস্তুটি বের করলো। কাগজের ভাঁজ খুলতেই একটা লাল বেনারসি বেরিয়ে আসে। আমির লাল বেনারসি গায়ে জড়িয়ে নিয়ে পলাশকে বললো, ‘আমার আম্মা ছোটবেলা একটা গল্প বলতেন,এক রাজা প্রতি রাতে বিয়ে করে প্রতি রাতেই বউকে খুন করতেন। তারপর শেষদিকে যে রানিকে বিয়ে করেন সেই রানি রাতজেগে রাজাকে গল্প শোনাতেন। গল্প শেষ হতো না বলে রাজাও রানিকে খুন করতে পারতেন না। রানি এভাবে গল্প বলে-বলে অনেকদিন বেঁচে ছিলেন। এখন আমি তোকে একটা গল্প শোনাব। আমাদের নিয়ম হচ্ছে,যতক্ষণ আমার গল্প চলবে ততক্ষণ তুই বেঁচে থাকবি। গল্প শেষ তোর আয়ুও শেষ।’পলাশ হাতজোড় করে আকুতি-মিনতি করলো, ‘ ভাই,আমার জীবন ভিক্ষা দেন। আপনেরা তো ভালা মানুষ ভাই। আপনেরার অনেক নাম। আমারে কেন মারতে চাইতাছেন? আমারে ছাইড়া দেন ভাই।’পলাশের কথায় আমিরের ভাবান্তর হলো না। সে বেনারসি থেকে ঘ্রাণ নেয়ার চেষ্টা করলো। তারপর শূন্যে চোখ রেখে ঘোর লাগা গলায় বললো, ‘ এক ছিল দুষ্টু রাজা! নারী আর টাকার প্রতি ছিল তার চরম আসক্তি। যে নারী একবার তার বিছানায় যেত তার পরের দিন সে লাশ হয়ে নদীতে ভেসে যেত। রাজা এক নারীকে দ্বিতীয়বার ছুঁতে পছন্দ করতো না। কিন্তু সমাজে ছিল রাজার বেশ নামডাক! সবার চোখের মণি। খুন করা ছিল তার নিত্যদিনের সঙ্গী। তার কালো হাতের ছোঁয়ায় বিসর্জন হয়েছে হাজারো নারী। প্রতিটি বিসর্জন রাজার জন্য ছিল তৃপ্তিকর। তাকে শাস্তি দেয়ার মতো কোনো অস্ত্র ছিল না পৃথিবীতে। ভাইয়ের সাথে বাজি ধরে হেরে যায় রাজা। শর্তমতে,ভাইয়ের জন্য এক রাজকন্যাকে অপহরণ করতে যায়। সেদিন ছিল বৃষ্টি। সন্ধ্যার আগ মুহূর্ত। রাজকন্যার প্রাসাদে সেদিন কেউ ছিল না। রাজা এক কামরায় ওৎ পেতে থাকে। রাজকন্যা আসলেই তাকে তার কালো হাতে অপবিত্র করে দিবে। কামড়ায় ছিল ইষৎ আলো। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর সেই কাঙ্খিত মুহূর্ত আসে। রাজকন্যার পা পড়ে কামড়ায়। রাজকন্যা রাজাকে দেখে চমকে যায়। ভয় পেয়ে যায়। কাঁপা স্বরে প্রশ্ন করে ‘‘কে আপনি? খালি বাড়িতে কেন ঢুকেছেন?’ সেই কণ্ঠ যেন কোনো কণ্ঠ ছিল না। ধনুকের ছোঁড়া তীর ছিল। রাজার বুক ছিঁড়ে সেই তীর ঢুকে পড়ে। রিনঝিনে গলার রাজকন্যাকে দেখতে রাজা আগুন জ্বালাল। আগুনের হলুদ আলোয় রাজকন্যার অপরূপ মায়াবী সুন্দর মুখশ্রী দেখে রাজা মুগ্ধ হয়ে যায়। তার পা দুটো থমকে যায়। রাজকন্যা যেন এক গোলাপের বাগান। যার সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ে রাজার কালো অন্তরে। রাজা কী আর তখন বুঝেছিল,সৃষ্টিকর্তা তাকে তার পাপের শাস্তি দেয়ার জন্য সেদিন অস্ত্র পাঠিয়েছিল!’আমির পলাশের দিকে তাকিয়ে হাসলো। কী মায়া সেই হাসিতে! মায়াভরা সেই হাসি প্রমাণ করে দিল,সেদিনটার জন্য সে কতোটা খুশি!
ঘটনাবলি১২৪১ - লিইয়েগনিটয যুদ্ধে মোঙ্গল বাহিনী পোলিশ এবং জার্মান সেনাদের পরাজিত করে। ১৪১৩ - পঞ্চম হেনরি ইংল্যান্ডের রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হন। ১৪৪০ - ক্রিস্টোফার ডেনমার্কের রাজা হন। ১৪৮৩ - প্রথম অ্যাডওয়ার্ড চতুর্থ অ্যাডওয়ার্ডকে ইংল্যান্ডের পরবর্তী রাজা হিসেবে নির্বাচিত করেন। ১৭৮৩ - টিপু সুলতান ব্রিটিশদের কাছ থেকে বেন্দোর দখল করে নেন। ১৭৫৬ - নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা বা মির্জা মুহাম্মাদ সিরাজ-উদ-দৌলা রাজ্যভার গ্রহণ করেন। ১৮৭২ - স্যামুয়েল আর পার্সি গুঁড়া দুধ প্যাটেন্ট করেন। ১৯১৮ - লাটভিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১৯২৮ - তুরস্কে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৪০ - দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘অপারেশন ওয়েসেরুবুং’ জার্মানরা ডেনমার্ক ও নরওয়ে আক্রমণ করে। ১৯৪৫ - যুক্তরাষ্ট্রে আণবিক শক্তি কমিশন গঠন করা হয়। ১৯৪৮ - বায়তুল মোকাদ্দাসারের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত দিরইয়াসিন গ্রামে ইসরাইলিরা ব্যাপক গণহত্যা চালায়। ১৯৫৭ - সুয়েজখাল সব ধরনের জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হয়। ১৯৬৫ - ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯৭৪ - দিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীকে প্রত্যর্পণের চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ১৯৯১ - জর্জিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পক্ষে ভোট দেয়। ১৯৯৭ - বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আইসিসি ট্রফিতে স্কটল্যান্ডকে পরাজিত করে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। ১৯৯৮ - সৌদি আরবে হজের শেষ দিনে ভিড়ের চাপে পদদলিত হয়ে ১৫০ জন মুসল্লির মৃত্যু হয়। জন্ম ১২৮৭ - ইংল্যান্ডের রাজা চতুর্থ অ্যাডওয়ার্ড। ১৮০৬ - ইসাম্বারড কিংডম ব্রুনেল, ইংরেজ প্রকৌশলী ও ক্লিফটন সাসপেনশন ব্রিজ পরিকল্পক। ১৮২১ - ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়ার। ১৮৩০ - এয়াড্বেয়ারড মুয়ব্রিডগে, ইংরেজ ফটোগ্রাফার ও সিনেমাটোগ্রাফার। ১৮৩৫ - বেলজিয়ামের রাজা দ্বিতীয় লিওপল্ড। ১৮৬৫ - এরিক লুডেন্ডোরফ, জার্মান জেনারেল ও রাজনীতিবিদ। ১৮৬৭ - ক্রিস ওয়াটসন, চিলির বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলীয় সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ ও ৩য় প্রধানমন্ত্রী। ১৮৭২ - লিও বলুম, ফরাসি আইনজীবী, রাজনীতিবিদ ও প্রধানমন্ত্রী। ১৮৮২ - ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী ও সমাজসেবক মহিমচন্দ্র দাশগুপ্ত। ১৮৯৩ - রাহুল সাংকৃত্যায়ন ভারতের সুপণ্ডিত ও স্বনামধন্য পর্যটক। ১৯০১ - পল উইলিয়ামস, মার্কিন অভিনেতা ও পরিচালক। ১৯২৫ - রোকনুজ্জামান খান বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিকে ও সাংবাদিক। ১৯২৬ - হিউ হেফ্নার, মার্কিন প্রকাশক এবং প্লেবয় পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক। ১৯৩৮ - ভিক্টর চেরনোম্যরডিন, রাশিয়ান ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও ৩০তম প্রধানমন্ত্রী। ১৯৪৮ - জয়া বচ্চন, ভারতীয় অভিনেত্রী ও রাজনীতিবিদ। ১৯৫৩ - ভবানীপ্রসাদ মজুমদার, ভারতীয় বাঙালি কবি ও ছড়াকার। ১৯৫৭ - সেভে বালেস্টেরস, স্প্যানিশ গল্ফ খেলোয়াড় ও স্থপতি। ১৯৬৬ - সিনথিয়া নিক্সন, মার্কিন অভিনেত্রী। ১৯৭৫ - রবি ফাওলার, সাবেক ইংরেজ ফুটবলার ও ম্যানেজার। ১৯৮৫ - আন্তোনিও নকেরিনো, ইতালিয়ান ফুটবলার। মৃত্যু ৫৮৫ - সম্রাট জিমু, জাপানি সম্রাট। ৪৯১ - যেনো, বাইজেন্টাইন সম্রাট। ১৫৫৩ - ফ্রাঁসোয়া রাবলে, ফরাসি সন্ন্যাসী ও পণ্ডিত। ১৫৫৭ - মিকায়েল আগ্রিকলা, ফিনিশ যাজক ও পণ্ডিত। ১৬২৬ - ফ্রান্সিস বেকন, ইংরেজ দার্শনিক। ১৭৫৪ - ক্রিস্টিয়ান উলফের, জার্মান দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ। ১৭৫৬ - নবাব আলীবর্দী খাঁ, বাংলা, বিহার, ওড়িশার নবাব। ১৮৮২ - ডান্টে গ্যাব্রিয়েল রসেটি, ইংরেজ চিত্রশিল্পী, চিত্রকর ও কবি। ১৮৮৯ - মাইকেল ইউজিনে শেভরেউল, ফরাসি রসায়নবিদ ও শিক্ষাবিদ। ১৯৩৬ - ফেরডিনান্ড টনিয়েস, জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিক। ১৯৪৫ - ডিয়েট্রিখ বোনহোফের, জার্মান যাজক ও ধর্মতত্ত্ববিদ। উইলহেম কানারিস, জার্মান নৌসেনাপতি। ১৯৫৯ - ফ্র্যাংক লয়েড রাইট, মার্কিন স্থপতি, ইন্টেরিওর ডিজাইনার, লেখক ও শিক্ষক। ১৯৭০ - প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি রসায়ন বিজ্ঞানী জ্ঞানেন্দ্রনাথ রায়। ১৯৮০ - মোহাম্মদ বাকির আল-সাদর, ইরাকি দার্শনিক। ১৯৯৩ - ইরানের বিখ্যাত শিল্পী ও লেখক সাইয়্যেদ মোর্তজা আয়ুবী শাহাদাত। ২০০১ - শাকুর রানা, পাকিস্তানি আম্পায়ার। ২০০৯ - শক্তি সামন্ত, ভারতীয় বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক। ২০১১ - সিডনি লুমেট, মার্কিন পরিচালক, প্রযোজক ও চিত্রনাট্যকার। ২০২১ - পবিত্র মুখোপাধ্যায়, বাঙালি কবি।
মেষ রাশি: বন্ধুদের সঙ্গে আজকের দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে। আর্থিক দিক থেকে আজকের দিনটি খুব একটা ভালো নয়। আত্মীয়দের সঙ্গে আজ আপনার কোথাও ছোট সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। যার ফলে আপনি দৈনিক কাজের সূচি থেকে বিরতি পাবেন। মন থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখুন। প্রেমের জন্য এই দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। কর্মক্ষেত্রের দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে। আজ আপনি নিজের জন্য কিছুটা সময় পাবেন। সেই সময়ে আপনি একটি বই পড়তে পারেন অথবা গান শুনতে পারেন। আজকের দিনটি আপনার বিবাহিত জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে বিবেচিত হবে।প্রতিকার: আর্থিক দিক থেকে উন্নতির লক্ষ্যে দৈনন্দিন শিবলিঙ্গের অভিষেক ঘটান।বৃষ রাশি: কোথাও অর্থ বিনিয়োগ করার আগে আজ অবশ্যই অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করুন। পরিবারের সদস্য এবং বন্ধুদের সঙ্গে আজকের দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে। প্রেমের জীবনে আজ আপনি একটি চমকের সম্মুখীন হবেন। কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি কাজ সর্তকতার সঙ্গে করুন। সামগ্রিকভাবে দিনটি অত্যন্ত ব্যস্ততার মধ্যে অতিবাহিত হওয়ায় আপনি নিজের জন্য সময় পাবেন না। জীবনসঙ্গীর সঙ্গে দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে।প্রতিকার: ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে উন্নতির লক্ষ্যে অবশ্যই অভাবী শিশু কন্যাদের উদ্দেশ্যে দুধের প্যাকেট দান করুন।মিথুন রাশি: শরীরের প্রতি অবশ্যই যত্নশীল হন এবং শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে অতিরিক্ত খাওয়া-দাওয়া এড়িয়ে চলুন। নিজের ওজনকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রাখুন। এই রাশির কিছু জাতক-জাতিকা আজ চাকরি পেতে পারেন। যার ফলে তাঁদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটবে। বন্ধুদের কাছ থেকে আজ আপনি একটি কাজে সাহায্য পেতে পারেন। প্রেমের জীবনে আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। কর্মক্ষেত্রে দিনটি খুব একটা খারাপ কাটবে না। যাঁরা কিছুদিন ধরে অত্যন্ত ব্যস্ততার মধ্যে ছিলেন তাঁরা আজ নিজেদের জন্য অবসর সময় পাবেন। বিবাহিত জীবনে কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে নিজেরাই তা মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন।প্রতিকার: প্রেমের জীবন সুখকর করে তোলার লক্ষ্যে পকেটে একটি সুগন্ধি রুমাল রাখুন।কর্কট রাশি: প্রত্যেকের সঙ্গে আজ অবশ্যই ঠান্ডা মাথায় কথা বলুন। আপনার নামে একটি ভুল সিদ্ধান্ত আজ আপনাকে বিপরীতভাবে প্রভাবিত করতে পারে। যার ফলে আপনার মানসিক চাপ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। আপনি আজ একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে আর্থিক লেনদেন এবং অর্থ সঞ্চয় সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ পাবেন। সেগুলিকে সঠিকভাবে কাজে লাগালে আপনার লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পুরনো বন্ধুদের কাছ থেকে আজ আপনি একটি কাজে সাহায্য পেতে পারেন। প্রেমের জন্য এই দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। আপনি আজ খুব সহজে কিছু নতুন জিনিস শিখতে পারবেন। পরিবারের সব থেকে ছোট সদস্যকে নিয়ে আপনি আজ একটি পার্কে অথবা শপিং মলে যেতে পারেন। বিবাহিত জীবন নিঃসন্দেহে সুখের হবে।প্রতিকার: শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে দুধ এবং দই খান।সিংহ রাশি: কাউকে অর্থ ধার দেওয়া থেকে অবশ্যই বিরত থাকুন। পাশাপাশি, যদি ঋণ দিতেই হয় সেক্ষেত্রে লিখিত প্রমাণ রাখুন। সন্তানদের স্বাস্থ্যের প্রতি অবশ্যই নজর দিন। বিদেশে পেশাগত যোগাযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। প্রেমের জীবনে আজ আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। আপনার আজ কোথাও আনন্দদায়ক সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। বিবাহিত জীবনে কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে নিজেরাই তা মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন।প্রতিকার: পারিবারিক জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে একজন কন্যাকে ক্ষীর অথবা পায়েস খেতে দিন।কন্যা রাশি: মন থেকে অবশ্যই সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখুন। আর্থিক দিক থেকে আজকের দিনটি খুব একটা খারাপ নয়। যাঁদের সঙ্গে আপনার অত্যন্ত কম সাক্ষাৎ হয় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। প্রেমের জীবনে আজ আপনি একটি চমকের সম্মুখীন হবেন। আপনার নেওয়া একটি দৃঢ় পদক্ষেপ আজ ইতিবাচক ফলপ্রদান করবে। বিবাহিত জীবনে অবশ্যই কিছুটা সময় দিন।প্রতিকার: শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে গম, গোটা লাল মসুর এবং লাল রঙের সিঁদুর মিশিয়ে সূর্যস্নান করুন।তুলা রাশি: কর্মক্ষেত্রের অতিরিক্ত চাপ এবং বাড়িতে চলা একটি বিরোধের কারণে আজ আপনার মেজাজ খিটখিটে হয়ে উঠবে। প্রত্যেকের সঙ্গে অবশ্যই ঠান্ডা মাথায় কথা বলুন। আর্থিক দিক থেকে আজকের দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। এই রাশির কিছু অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের একটি পুরস্কার গ্রহনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়ে অত্যন্ত খুশি হবেন। কর্মক্ষেত্রে দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে। আপনি আজ আপনার একটি অসুবিধার কথা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন। যার ফলে বিষয়টির সমাধান হয়ে যাবে। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: আর্থিক দিক থেকে উন্নতির লক্ষ্যে আপনার ক্রয়ক্ষমতা অনুসারে সোনা কিনে তা পরিধান করুন।বৃশ্চিক রাশি: মন থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখুন। মন ভালো রাখার জন্য আজ আপনি কিছু আকর্ষণীয় বই পড়তে পারেন। দীর্ঘস্থায়ী লাভের জন্য আপনি আজ কোনও শেয়ারে অথবা মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন। বাবা মায়ের স্বাস্থ্যের প্রতি অবশ্যই নজর দিন। ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে আজ আপনি কোথাও পিকনিকে যেতে পারেন। সেখানে গিয়ে কিছু মূল্যবান স্মৃতির সঞ্চয় ঘটবে। কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি কাজ সতর্কতার সঙ্গে করুন। আজ নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করে আপনার মধ্যে থাকা ঘাটতিগুলি পূরণ করার চেষ্টা করুন। এর ফলে আপনার ব্যক্তিত্বে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিবাহিত জীবন নিঃসন্দেহে সুখের হবে।প্রতিকার: পারিবারিক জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে গরুকে খাবার খেতে দিন।ধনু রাশি: নিজের উপার্জন ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অবশ্যই চেষ্টা করুন। বিদেশে থাকেন এমন একজন আত্মীয়ের কাছ থেকে আজ আপনি একটি উপহার পেতে পারেন। যার ফলে আপনার মন ভালো হয়ে যাবে। প্রেমের জীবনে আজ আপনি একটি চমকের সম্মুখীন হবেন। আজ আপনার সঙ্গে একটি আকর্ষণীয় ঘটনা ঘটতে পারে। সামগ্রিকভাবে দিনটি খুব একটা খারাপ কাটবে না। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: আর্থিক দিক থেকে উন্নতির লক্ষ্যে বৃহন্নলাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুন।মকর রাশি: শরীর নিয়ে অযথা চিন্তা করবেন না। কারণ, আজ আপনি শারীরিক দিক থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ থাকবেন। আপনার আজ জমি সংক্রান্ত বিষয়ে অর্থব্যয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। কোনও নতুন প্রকল্পে অংশগ্রহণ করার আগে সমস্ত তথ্য ভালোভাবে জেনে নেওয়ার চেষ্টা করুন। নিজের মূল্যবান জিনিসপত্রগুলি আজ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে রাখুন। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে এবং কেরিয়ারে উন্নতির লক্ষ্যে ময়ূরের পালক বাড়িতে রাখুন।কুম্ভ রাশি: মন থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখুন। শরীরের প্রতি অবশ্যই যত্নশীল হন। বাবার কাছ থেকে পাওয়া একটি পরামর্শকে কর্মক্ষেত্রে সঠিকভাবে কাজে লাগালে আপনার লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে ঠান্ডা মাথায় সেটিকে সমাধানের চেষ্টা করুন। ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে সংযত হয়ে কথা বলুন। আপনি আজ ভাই-বোনের সঙ্গে বাড়িতে একটি সিনেমা কিংবা প্রতিযোগিতা দেখতে পারেন। বিবাহিত জীবনে কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলেও পরে তা ঠিক হয়ে যাবে।প্রতিকার: শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে শোয়ার ঘরে ক্রিস্টালের বল রাখুন।মীন রাশি: এই রাশির কিছু জাতক-জাতিকা আজ চাকরি পেতে পারেন। যার ফলে তাঁরা আর্থিক দিক থেকে লাভবান হবেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আজ আপনি আপনার একটি সমস্যার কথা ভাগ করে নিতে পারেন। আপনার অহঙ্কার মানসিকতাকে অবশ্যই দূরে সরিয়ে রাখুন। প্রেমের জীবনে আজ আপনি একটি চমকের সম্মুখীন হবেন। আপনি আজ অবসর সময়ে একটি ওয়েব সিরিজ দেখতে পারেন। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: দাম্পত্য জীবন সুখকর করে তোলার লক্ষ্যে খাবারে জাফরানের ব্যবহার করুন।
পিএসএলে আজ দুটি ম্যাচ। আছে আইপিএল। রাতে আছে ইউরোপা ও কনফারেন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল।পিএসএলইসলামাবাদ-লাহোরবেলা ৩-৩০ মি., টি স্পোর্টসকরাচি-পেশোয়াররাত ৮টা, টি স্পোর্টসআইপিএলকলকাতা-লক্ষ্ণৌরাত ৮টা, স্টার স্পোর্টস ১, ২ইউরোপা লিগবোলোনিয়া-অ্যাস্টন ভিলারাত ১টা, সনি স্পোর্টস ১পোর্তো-নটিংহামরাত ১টা, সনি স্পোর্টস ২ফ্রাইবুর্গ-সেল্তা ভিগোরাত ১টা, সনি স্পোর্টস ৫কনফারেন্স লিগশাখতার-আলকমাররাত ১টা, সনি স্পোর্টস ৩
এক নিবিড় অরণ্য ছিল। তা’তে ছিল বড় বড় বট, সারি সারি তাল তমাল, পাহাড় পর্ব্বত, আর ছিল—ছোট নদী মালিনী। মালিনীর জল বড়ো স্থির, আয়নার মত; তা’তে গাছের ছায়া, নীল আকাশের ছায়া, রাঙা মেঘের ছায়া, উড়ন্ত পাখীর ছায়া—সকলি দেখা যে’ত। আর দেখা যে’ত গাছের তলায় কতগুলি কুটিরের ছায়া। নদীতীরে যে নিবিড় বন ছিল তা’তে অনেক জীব জন্তু ছিল। কত হাঁস, কত বক, সারাদিন খালের ধারে বিলের জলে ঘুরে বেড়াত। কত ছোট ছোট পাখী, কত টীয়াপাখীর ঝাঁক গাছের ডালে ডালে গান গাইত, কোটরে কোটরে বাসা বাঁধত। দলে দলে হরিণ, ছোট ছোট হরিণ-শিশু, কুশের বনে, ধানের ক্ষেতে, কচি ঘাসের মাঠে খেলা করত। বসন্তে কোকিল গাইত, বর্ষায় ময়ূর নাচত। এই বনে তিন হাজার বৎসরের এক প্রকাণ্ড বটগাছের তলায় মহর্ষি কণ্বদেবের আশ্রম ছিল। সেই আশ্রমে জটাধারী তপন্বী কণ্ব আর মা-গৌতমী ছিলেন, তাঁদের পাতার কুটির ছিল,পরনে বাকল ছিল,গোয়াল-ভরা গাই ছিল, চঞ্চল বাছুর ছিল, আর ছিল বাকল-পরা কত্কগুলি ঋষিকুমার। তা’রা কণ্বদেবের কাছে বেদ পড়ত, মালিনীর জলে তর্পণ করত, গাছের ফলে অতিথিসেবা করত, বনের ফুলে দেবতার অঞ্জলি দিত। আর কী করত?—বনে বনে হোমের কাঠ কুড়িয়ে বেড়াত, কালো গাই ধ’লো গাই মাঠে চরাতে যে’ত। সবুজ মাঠ ছিল তা’তে গাই বাছুর চরে বেড়াত, বনে ছায়া ছিল তা’তে রাখাল-ঋষিরা খেলে বেড়াত। তা’দের ঘর গড়বার বালি ছিল, ময়ূর গড়বার মাটী ছিল, বেণুবাঁশের বাঁশী ছিল, বটপাতার ভেলা ছিল; আর ছিল—খেলবার সাথী বনের হরিণ, গাছের ময়ূর; আর ছিল—মা-গৌতমীর মুখে দেবদানবের যুদ্ধকথা, তাত কণ্বের মুখে মধুর সামবেদ গান। সকলি ছিল, ছিল না কেবল—আঁধার ঘরের মাণিক—ছোট মেয়ে—শকুন্তলা। একদিন নিসুতি রাতে আপ্সরী মেনকা তা’র রূপের ডালি—দুধের বাছা—শকুন্তলা মেয়েকে সেই তপোবনে ফেলে রেখে গেল। বনের পাখীরা তা’কে ডানায় ঢেকে বুকে নিয়ে সারা রাত বসে রইল। বনের পাখীদেরও দয়ামায়া আছে কিন্তু সেই মেনকা পাষাণীর কি কিছু দয়া হ’ল! খুব ভোর বেলায় তপোবনের যত ঋষি-কুমার বনে বনে ফল ফুল কুড়তে গিয়েছিল। তা’রা আমলকীর বনে আমলকী, হরীতকীর বনে হরীতকী, ইংলী ফলের বনে ইংলী কুড়িয়ে নিলে; তার পরে ফুলের বনে পূজার ফুল তুল্তে তুল্তে পাখীদের মাঝে ফুলের মত সুন্দর শকুন্তলা মেয়েকে কুড়িয়ে পেলে। সবাই মিলে তা’কে কোলে করে তাত কণ্বের কাছে নিয়ে এল। তখন সেই সঙ্গে বনের কত পাখী, কত হরিণ, সেই তপোবনে এসে বাসা বাঁধলে। শকুন্তলা সেই তপোবনে, সেই বটের ছায়ায় পাতার কুটীরে, মা-গৌতমীর কোলে-পিঠে মানুষ হতে লাগল। তার পর শকুন্তলার যখন বয়স হ’ল তখন তাত কণ্ব পৃথিবী খুঁজে শকুন্তলার বর আনতে চলে গেলেন। শকুন্তলার হাতে তপোবনের ভার দিয়ে গেলেন। শকুন্তলার আপনার মা-বাপ তা’কে পর করলে, কিন্তু যা’রা পর ছিল তা’রা তা’র আপনার, হল। তাতঃ কণ্ব তা’র আপনার, মা-গৌতমী তা’র আপনার, ঋষিবালকেরা তা’র আপনার ভায়ের মতো, গোয়ালের গাই বাছুর—সেও তা’র আপনার, এমন কি—বনের লতাপাতা তা’রাও তা’র আপনার ছিল। আর ছিল—তা’র বড়ই আপনার দুই প্রিয়সখী—অনসূয়া, প্রিয়ম্বদা; আর ছিল একঢি মা-হারা হরিণ-শিশু—বড়ই ছোট—বড়ই চঞ্চল। তিন সখীর আজকাল অনেক কাজ, ঘরের কাজ, অতিথি সেবার কাজ, সকালে সন্ধ্যায় গাছে জল দেবার কাজ, সহকারে মল্লিকা লতার বিয়ে দেবার কাজ; আর শকুন্তলার দুই সখীর আর একটি কাজ ছিল—তা’রা প্রতিদিন মাধবী-লতায় জল দিত আর ভাব্ত, কবে ওই মাধবীলতায় ফুল ফুটবে, সেই দিন সখী শকুন্তলার বর আস্বে। এ ছাড়া আর কি কাজ ছিল?—হরিণ-শিশুর মত নির্ভয়ে এ-বনে সে-বনে খেলা করা, ভ্রমরের মত লতা-বিতানে গুণ গুণ গল্প করা, নয়তো মরালীর মতো মালিনীর হিম জলে গা ভাসান; আর প্রতিদিন সন্ধ্যার আঁধারে বনপথে বনদেবীর মত তিন সখীতে ঘরে ফিরে আসা,—এই কাজ। একদিন দক্ষিণ বাতাসে সেই কুসুমবনে দেখতে দেখতে প্রিয় মাধবীলতার সর্ব্বাঙ্গ ফুলে ভরে উঠল। আজ সখীর বর আসবে বলে চঞ্চল হরিণীর মতো চঞ্চল অনসূয়া প্রিয়ম্বদা আরো চঞ্চল হ’য়ে উঠল।
যে দেশে ঋষির তপোবন ছিল, সেই দেশের রাজার নাম ছিল—দুষ্মন্ত। সেকালে এতবড় রাজা কেউ ছিল না। তিনি পূব দেশের রাজা, পশ্চিম দেশের রাজা, উত্তর দেশের রাজা, দক্ষিণ দেশের রাজা, সব রাজার রাজা ছিলেন। সাত-সমুদ্র তের-নদী—সব তাঁ’র রাজ্য। পৃথিবীর এক রাজা—রাজা দুষ্মন্ত। তাঁ’ কত সৈন্য সামন্ত ছিল, হাতিশালে কত হাতি ছিল, ঘোড়াশালে কত ঘোড়া ছিল, গাড়ি খানায় কত সোনা রূপার রথ ছিল, রাজমহলে কত দাস দাসী ছিল; দেশ জুড়ে তাঁ’র সুনাম ছিল, ক্রোশ জুড়ে সোনার রাজপুরী ছিল, আর ব্রাহ্মণকুমার মাধব্য সেই রাজার প্রিয় সখা ছিল। যেদিন তপোবনে মল্লিকার ফুল ফুটল সেই দিন সাত-সমুদ্র তের-নদীর রাজা—রাজা দুষ্মন্ত, প্রিয়সখা মাধব্যকে বললেন—“চল বন্ধু, আজ মৃগয়ায় যাই।” মৃগয়ার নামে মাধব্যের যেন জ্বর এল। গরিব ব্রাহ্মণ রাজবাড়িতে রাজার হালে থাকে, দুবেলা থাল থাল লুচি মণ্ডা, ভার ভার ক্ষীর দই দিয়ে মোটা পেট ঠাণ্ডা রাখে, মৃগয়ার নামে বেচারার মুখ এতটুকু হ’য়ে গেল, বাঘ ভালুকের ভয়ে প্রাণ কেঁপে উঠল। ‘না’ বলবার যো কি, রাজার আজ্ঞা! অমনি হাতিশালে হাতি সাজল, ঘোড়াশালে ঘোড়া সাজল, কোমর বেঁধে পালোয়ান এল, বর্ষা হাতে শীকারী এল, ধনুক হাতে ব্যাধ এল, জাল ঘাড়ে জেলে এল। তারপর সারথী রাজার সোনার রথ নিয়ে এল, সিংহদ্বারে সোনার কপাট ঝন্ঝনা দিয়ে খুলে গেল। রাজা সোনার রথে শীকারে চল্লেন। দুপাশে দুই রাজহস্তি চামর ঢোলাতে চল্লো, ছত্রধর রাজছত্র ধরে চল্লো, জয়ঢাক বাজতে বাজতে চল্লো, আর সর্ব্বশেষে প্রিয়সখা মাধব্য এক খোঁড়া ঘোড়ায় হট্হট্ করে চল্লেন। ক্রমে রাজা এ-বন সে-বন ঘুরে শেষ মহাবনে এসে পড়লেন। গাছে গাছে ব্যাধ ফাঁদ পাততে লাগল, খালে বিলে জেলে জাল ফেলতে লাগল, সৈন্য সামন্ত বন ঘিরতে লাগল, বনে সাড়া পড়ে গেল। গাছে গাছে কত পাখী, কত পাখীর ছানা পাতার ফাঁকে ফাঁকে কচি পাতার মত ছোট ডানা নাড়ছিল, রাঙা ফলের মতো ডালে দুলছিল, আকাশে উড়ে যাচ্ছিল, কোটরে ফিরে আসছিল, কিচমিচ করছিল। ব্যাধের সারা পেয়ে, বাসা ফেলে কোটর ছেড়ে, কে কোথায় পালাতে লাগল। মোষ গরমের দিনে ভিজে কাদায় পড়ে ঠাণ্ডা হচ্ছিল, তাড়া পেয়ে—শিং উঁচিয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে গহন বনে পালাতে লাগল। হাতি শুঁড়ে করে জল ছিটিয়ে গা ধুচ্ছিল, শালগাছে গা ঘষছিল, গাছের ডাল ঘুরিয়ে মশা তাড়াচ্ছিল, ভয় পেয়ে—শুঁড় তুলে, পদ্মবন দ’লে, ব্যাধের জাল ছিঁড়ে পালাতে আরম্ভ করলে। বনে বাঘ হাঁকার দিয়ে উঠল, পর্ব্বতে সিংহ গর্জ্জন করে উঠল,সারা বন কেঁপে উঠল। কত পাখী, কত বরা, কত বাঘ, কত ভালুক, কেউ জালে ধরা,পড়ল, কেউ ফাঁদে বাঁধা পড়ল, কেউ বা তলোয়ারে কাটা গেল; বনে হাহাকার, পড়ে গেল। বনের বাঘ বন দিয়ে, জলের কুমীর জল দিয়ে, আকাশের পাখী আকাশ ছেয়ে পালাতে আরম্ভ করলে। ফাঁদ নিয়ে ব্যাধ পাখীর সঙ্গে ছুটল, তীর নিয়ে বীর বাঘের সঙ্গে গেল, জাল ঘাড়ে জেলে মাছের সঙ্গে চল্লো, রাজা সোনার রথে এক হরিণের সঙ্গে ছুটলেন। হরিণ প্রাণভয়ে হাওয়ার মতো রথের আগে দৌড়েছে, সোনার রথ তা’র পাছে বিদ্যুতের বেগে চলেছে। রাজার সৈন্য সামন্ত, হাতি, ঘোড়া, প্রিয়সখা মাধব্য, কতদূরে কোথায় পড়ে রইল। কেবল রাজার রথ আর বনের হরিণ নদীর ধার দিয়ে, বনের ভিতর দিয়ে, মাঠের উপর দিয়ে ছুটে চল্লো। যখন গহন বনে এই শিকার চলছিল তখন সেই তপোবনে সকলে নির্ভয়ে ছিল। গাছের ডালে টীয়াপাখী লাল ঠোঁটে ধান খুঁটছিল, নদীর জলে মনের সুখে হাঁস ভাসছিল, কুশবনে পোষা হরিণ নির্ভয়ে খেলা করছিল; আর শকুন্তলা, অনসূয়া, প্রিয়ম্বদা—তিন সখী কুঞ্জবনে গুন্গুন্ গল্প করছিল। এই তপোবনে সকলে নির্ভয়, কেউ কারো হিংসা করে না। মহাযোগী কণ্বের তপোবনে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায়। হরিণ-শিশু ও সিংহ-শাবক এক বনে খেলা করে। এ বনে রাজাদেরও শিকার করা নিষেধ। রাজার শিকার—সেই হরিণ ঊর্দ্ধশ্বাসে এই তপোবনের ভিতর চলে গেল। রাজাও অমনি ধনুঃশর ফেলে ঋষিদর্শনে চল্লেন। সেই তপোবনে সোনার রথে পৃথিবীর রাজা, আর মাধবীকুঞ্জে রূপসী শকুন্তলা,—দুজনে দেখা হ’ল! এদিকে মাধব্য কী বিপদেই পড়েছে! আর সে পারে না! রাজভোগ নাহলে তা’র চলে না, নরম বিছানা ছাড়া ঘুম হয় না, পাল্কী ছাড়া সে এক পা চলে না, তা’র কি সারাদিন ঘোড়ার পিঠে চড়ে ‘ওই বরা যায়, ওই বাঘ পালায়’ করে এ-বন সে-বন ঘুরে বেড়ান পোষায়? পল্বলের পাতা-পচা কষা জলে কি তা’র তৃষ্ণা ভাঙ্গে? ঠিক সময় রাজভোগ না পেলে সে অন্ধকার দেখে, তা’র কি সারাদিনের পর একটু আধপোড়া মাংসে পেট ভরে? পাতার বিছানায় মশার কামড়ে তা’র কি ঘুম হয়? বনে এসে ব্রাহ্মণ মহা মুষ্কিলে পড়েছে! সমস্ত দিন ঘোড়ার পিঠে ফিরে সর্ব্বাঙ্গে দারুণ ব্যথা, মশার জ্বালায় রাত্রে নিদ্রা নেই, মনে সর্ব্বদা ভয়—ওই ভালুক এল, ওই বুঝি বাঘে ধরলে! ভয়ে ভয়ে বেচারা আধখানা হয়ে গেছে। রাজাকে কত বোঝাচ্ছে—“মহারাজ, রাজ্য ছারেখারে যায়, শরীর মাটী হ’ল, আর কেন? রাজ্যে চলুন।” রাজা তবু শুনলেন না, শকুন্তলাকে দেখে অবধি রাজকার্য্য ছেড়ে, মৃগয়া ছেড়ে, তপস্বীর মতো সেই তপোবনে রইলেন। রাজ্যে রাজার মা ব্রত করেছেন, রাজাকে ডেকে পাঠালেন, তবু রাজ্যে ফিরলেন না, কত ওজর আপত্তি করে মাধব্যকে সব সৈন্য সামন্ত সঙ্গে মা’র কাছে পাঠিয়ে দিয়ে একলা সেই তপোবনে রইলেন। মাধব্য রাজবাড়িতে মনের আনন্দে রাজার হালে আছে, আর এদিকে পৃথিবীর রাজা বনবাসীর মতো বনে বনে “হা শকুন্তলা যো শকুন্তলা!” ব’লে ফিরছে। হাতের ধনুক,তূণের বাণ কোন্ বনে পড়ে আছে! রাজবেশ নদীর জলে ভেসে গেছে, সোণার অঙ্গ কালি হোয়েছে। দেশের রাজা বনে ফিরছে! আর শকুন্তলা কী করছে?—নিকুঞ্জবনে পদ্মের বিছানায় বসে পদ্মপাতায় মহারাজাকে মনের কথা লিখছে। রাজাকে দেখে কে জানে তা’র মন কেমন হ’ল! একদণ্ড না দেখলে প্রাণ কাঁদে, চক্ষের জলে বুক ভেসে যায়। দুই সখী তা’কে পদ্মফুলে বাতাস করছে, গলা ধরে কত আদর করছে, আঁচলে চোখ মোছাচ্ছে, আর ভাবছে—এইবার ভোর হ’ল, বুঝি সখীর রাজা ফিরে এল। তারপর কি হ’ল? দুঃখের নিশি প্রভাত হ’ল, মাধবীর পাতায় পাতায় ফুল ফুটল, নিকুঞ্জের গাছে গাছে পাখী ডাকল, সখীদের পোষা হরিণ কাছে এল। আর কি হ’ল?— বনপথে রাজা-বর কুঞ্জে এল। আর কি হ’ল? পৃথিবীর রাজা আর বনের শকুন্তলা—দুজনে মালা বদল হ’ল। দুই সখীর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হ’ল। তারপর কী হ’ল?— তারপর কতদিন পরে সোণার সাঁঝে সোণার রথ রাজাকে রাজ্যে নিয়ে গেল, আর আঁধার বনপথে দুই প্রিয়সখী শকুন্তলাকে ঘরে নিয়ে গেল।
রাজা রাজ্যে চলে গেলেন, আর শকুন্তলা সেই বনে দিন গুন্তে লাগল। যাবার সময় রাজা নিজের মোহর আংটী শকুন্তলাকে দিয়ে গেলেন, বলে গেলেন—সুন্দরি, তুমি প্রতিদিন আমার নামের একটি করে অক্ষর পড়বে, নামও শেষ হবে আর বনপথে সোণার রথ তোমাকে নিতে আসবে।” কিন্তু হায়, সোণার রথ কই এল? কত দিন গেল, কত রাত গেল; দুষ্মন্ত নাম কতবার পড়া হয়ে গেল, তবু সোণার রথ কই এল! হায় হায়, সোণার সাঁঝে সোণার রথ সেই যে গেল আর ফিরল না! পৃথিবীর রাজা সোণার সিংহাসনে, আর বনের রাণী কুটীর দুয়ারে,—দুই জনে দুই খানে। রাজার শোকে শকুন্তলার মন ভেঙ্গে পড়ল। কোথা রইল অতিথিসেবা, কোথা রইল পোষা হরিণ, কোথা রইল সাধের নিকুঞ্জবনে প্রাণের দুই প্রিয়সখী! শকুন্তলার মুখে হাসি নেই, চোখে ঘুম নেই! রাজার ভাবনা নিয়ে কুটীর দুয়ারে পাষাণ-প্রতিমা বসে রইল। রাজার রথ কেন এল না? কেন রাজা ভুলে রইলেন? রাজা রাজ্যে গেলে একদিন শকুন্তলা কুটীর দুয়ারে গালে হাত দিয়ে বসে বসে রাজার কথা ভাবছে—ভাবছে আর কাঁদছে, এমন সময় মহর্ষি দুর্ব্বাসা দুয়ারে অতিথি এলেন, শকুন্তলা জানতেও পারলে না, ফিরেও দেখলে না। একে দুর্ব্বাসা মহা অভিমানী, একটুতেই মহা রাগ হয়, কথায় কথায় যা’কে তা’কে ভস্ম করে ফেলেন, তা’র উপর শকুন্তলার এই অনাদর—তাঁ’কে প্রণাম করলে না, বসতে আসন দিলে না, পা ধোবার জল দিলে না। দুর্ব্বাসার সর্বাঙ্গে যেন আগুণ ছুটল, রাগে কাঁপ্তে কাঁপ্তে বললেন—“কি অতিথির অপমান? পাপীয়সি, এই অভিশম্পাত করছি—যা’র জন্যে আমার অপমান করলি সে যেন তোকে কিছুতে না চিনতে পারে।” হায়, শকুন্তলার কি তখন জ্ঞান ছিল—যে দেখবে কে এল কে গেল! দুর্ব্বাসার একটি কথাও তা’র কাণে গেল না। মহামানী মহর্ষি দুর্ব্বাসা ঘোর অভিশম্পাত করে চলে গেলেন—সে কিছুই জানতে পারলে না, কুটীর দুয়ারে আনমনে যেমন ছিল তেমনি রইল। অনসূয়া প্রিয়ম্বদা দুই সখী উপবনে ফুল তুলছিল, ছুটে এসে দুর্ব্বাসার পায়ে লুঠিয়ে পড়ল। কত সাধ্য সাধনা করে, কত কাকুতি মিনতি করে, কত হাতে পায়ে ধরে দুর্ব্বাসাকে শান্ত করলে। শেষ এই শাপান্ত হ’ল—“রাজা যাবার সময় শকুন্তলাকে যে আংটী দিয়ে গেছেন সেই আংটী যদি রাজাকে দেখাতে পারে তবেই রাজা শকুন্তলাকে চিনবেন; যত দিন সেই আংটী রাজার হাতে না পরবে ততদিন রাজা সব ভূলে থাকবেন।” দুর্ব্বাসার অভিশাপে তাই পৃথিবীর রাজা সব ভুলে রইলেন। বনপথে সোণার রথ আর ফিরে এল না। এদিকে দুর্ব্বাসাও চলে গেলেন আর তাতঃ কণ্ব তপোবনে ফিরে এলেন। সারা পৃথিবী খুঁজে শকুন্তলার মেলেনি। তিনি ফিরে এসে শুনলেন সারা পৃথিবীর রাজা বনে এসে তা’র গলায় মালা দিয়েছেন। তাতঃ কণ্বের আনন্দের সীমা রইল না, তখনি শকুন্তলাকে রাজার কাছে পাঠাবার উদ্যোগ করতে লাগলেন। দুঃখে অভিমানে শকুন্তলা মাটীতে মিশে ছিল, তা’কে কত আদর করলেন, কত আশীর্ব্বাদ করলেন! উপবনে দুই সখী যখন শুনলে শকুন্তলা শ্বশুরবাড়ি চল্লো, তখন তা’দের আর আহ্লাদের সীমা রইল না! প্রিয়ম্বদা কেশর ফুলের হার নিলে, অনসূয়া গন্ধফুলের তেল নিলে। দুই সখীতে শকুন্তলাকে সাজাতে বসল। তা’র মাথায় তেল দিলে, খোঁপায় ফুল দিলে কপালে সিদুঁর দিলে, পায়ে আল্তা দিলে, নতুন বাকল দিলে;—তবু ত মন উঠল না? সখীর এ কি বেশ করে দিলে? প্রিয়সখী শকুন্তলা পৃথিবীর রাণী, তা’র কি এই সাজ? হাতে মৃণালের বালা, গলায় কেশরের মালা, খোঁপায় মল্লিকার ফুল, পরনে বাকল?—হায়, হায়, মতির মালা কোথায়? হীরের বালা কোথায়? সোণার মল কোথায়? পরণে সাড়ী কোথায়? বনের দেবতারা সখীদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করলেন। বনের গাছ থেকে সোণার সাড়ী উড়ে পড়ল, হাতের বালা খসে পড়ল, মতির মালা ঝরে পড়ল, পায়ের মল বেজে পড়ল। বনদেবতারা পলকে বনবাসিনী শকুন্তলাকে রাজ্যেশ্বরী মহারাণীর সাজে সাজিয়ে দিলেন। তারপর যাবার সময় হ’ল। হায়, যেতে কি পা সরে, মন কি চায়? শকুন্তলা কোন দিকে যাবে,—সোণার পুরীতে রাণীর মত রাজার কাছে চলে যাবে—না—তিন সখীতে বনপথে আজন্ম—কালের তপোবনে ফিরে যাবে? এদিকে শুভলগ্ন বহে যায়, ওদিকে বিদায় আর শেষ হয় না। কুঞ্জবনে মল্লিকা মাধবী কচি কচি পাতা নেড়ে ফিরে ডাকছে, মা-হারা হরিণ-শিশু সোণার আঁচল ধরে বনের দিকে টানছে, প্রাণের দুই প্রিয়সখী গলা ধরে কাঁদছে। এক দণ্ডে এত মায়া এত ভালবাসা কাটান কি সহজ? মা-হারা হরিণ-শিশুকে তাতঃ কণ্বের হাতে, প্রিয় তরুলতাদের প্রিয়সখীদের হাতে সঁপে দিতে কত বেলাই হ’য়ে গেল। তপোবনের শেষে বটগাছ, সেইখান থেকে তাতঃ কণ্ব ফিরলেন। দুই সখী কেঁদে ফিরে এল। আসবার সময় শকুন্তলার আঁচলে রাজার সেই আংটী বেঁধে দিলে, বলে দিলে—“দেখিস্, ভাই, যত্ন করে রাখিস।” তারপর বনের দেবতাদের প্রণাম করে, তাতঃ কণ্বকে প্রণাম করে, শকুন্তলা রাজপুরীর দিকে চলে গেল। পরের মেয়ে পর হ’য়ে পরের দেশে চলে গেল, বনখানা আঁধার করে গেল! ঋষির অভিশাপ কখন মিথ্যা হয় না। রাজপুরে যাবার পথে শকুন্তলা একদিন শচীতীর্থের জলে গা ধুতে গেল। সাঁতার জলে গা ভাসিয়ে, নদীর জলে ঢেউ নাচিয়ে শকুন্তলা গা ধুলে। রঙ্গভরে অঙ্গের সাড়ি জলের উপর বিছিয়ে দিলে; জলের মত চিকণ আঁচল জলের সঙ্গে মিশে গেল, ঢেউয়ের সঙ্গে গড়িয়ে গেল। সেই সময়ে দুর্ব্বাসার শাপে রাজার সেই আংটী শকুন্তলার চিকণ আঁচলের এক কোণ থেকে অগাধ জলে পড়ে গেল, শকুন্তলা জানতেও পারলে না। তারপর ভিজে কাপড়ে তীরে উঠে, কালো চুল এলো করে, হাসিমুখে শকুন্তলা বনের ভিতর দিয়ে রাজার কথা ভাবতে ভাবতে শূন্য আঁচল নিয়ে রাজপুরে চলে গেল। আংটীর কথা মনেই পড়ল না।
দুর্ব্বাসার শাপে রাজা শকুন্তলাকে একেবারে ভুলে বেশ সুখে আছেন। সাত ক্রোশ জুড়ে রাজার সাত মহল বাড়ি; তা’র এক এক মহলে এক এক রকম কাজ চলছে। প্রথম মহলে রাজসভা;—সেখানে সোণার থামে সোণার ছাত, তা’র তলায় সোণার সিংহাসন; সেখানে দোষী নির্দ্দোষের বিচার চলছে। তারপর দেবমন্দির;—সেখানে সোণার দেওয়ালে মানিকের পাখী, মুক্তোর ফল, পান্নার পাতা; মাঝখানে প্রকাণ্ড হোমকুণ্ড,—সেখানে দিবাবাত্রি হোম হচ্ছে। তারপর অতিথি-শালা;—সেখানে সোণার থালায় দুসন্ধ্যা লক্ষ লক্ষ অতিথি খাচ্ছে। তারপর নৃত্যশালা;—সেখানে নাচ চলছে, সানের উপর সোনার নুপুর রুণুঝুনু বাজছে, ম্ফটিকের দেয়ালে অঙ্গের ছায়া তালে তালে নাচছে। সঙ্গীতশালায় গান চলছে, অন্তঃপুরে সংসারের কাজ চলছে, উপবনে উৎসব চলছে। সোণার পালঙ্কে পৃথিবীর রাজা দুষ্মন্ত বসে আছেন, দক্ষিণ-দুয়ারি ঘরে দক্ষিণের বাতাস আসছে;—শকুন্তলার কথা তাঁ’র মনেই নাই। হায়, দুর্ব্বাসার শাপে সুখের অন্তঃপুরে সোণার পালঙ্কে রাজা সব ভুলে রইলেন। আর শকুন্তলা কত ঝড় বৃষ্টিতে—কত পথ চলে—রাজার কাছে এল, রাজা চিনতেও পারলেন না; বললেন—“কন্যে, তুমি কেন এসেছ? কি চাও? টাকা কড়ি চাও,—না—ঘর বাড়ি চাও, কী চাও?’ শকুন্তলা বল্লে—“মহারাজ, আমি টাকাও চাই না, কড়িও চাই না, ঘর বাড়ি কিছুই চাই না, আমি চাই তোমায়। তুমি আমার রাজা, আমার গলায় মালা দিয়েছ, আমি তোমায় চাই।” রাজা বললেন—“ছি ছি, কন্যে, একি কথা! তুমি হলে বনবাসিনী তপস্বিনী, আমি হলেম রাজ্যেশ্বর মহারাজা, আমি তোমায় কেন মালা দেব? টাকা চাও টাকা নাও, ঘর বাড়ি চাও তাই নাও, গায়ের গহনা চাও তাও নাও। রাজ্যেশ্বরী হ’তে চাও—এ কেমন কথা?’ রাজার কথায় শকুন্তলার প্রাণ কেঁপে উঠল, কাঁদতে কাঁদতে বল্লে—“মহারাজ, সে কি কথা? আমি যে সেই শকুন্তলা—আমায় ভুলে গেলে? মনে নেই, মহারাজ, সেই মাধবীর বনে একদিন আমরা তিন সখীতে গুন্ গুন্ গল্প করছিলুম এমন সময় তুমি অতিথি এলে; সখীরা তোমায় পা-ধোবার জল দিলে, আমি আঁচলে ফল এনে দিলেম, তুমি হাসি মুখে তাই খেলে। তারপর একটা পদ্মপাতায় জল নিয়ে আমার হরিণ শিশুকে খাওয়াতে গেলে, সে ছুটে পালাল, তুমি কত ডাকলে, কত মিষ্টি কথা বল্লে, কিছুতে এল না। তারপর আমি ডাকতেই আমার কাছে এল, আমার হাতে জল খেল,তুমি আদর করে বল্লে—‘দুজনেই বনের প্রাণী কিনা তাই এত ভাব’—শুনে সখীরা হেসে উঠল, আমি লজ্জায় মরে গেলাম। তার পর, মহারাজ, তুমি কতদিন তপস্বীর মতো সে বনে রইলে; বনের ফল খেয়ে, নদীর জল খেয়ে, কতদিন কাটালে। তারপর একদিন পূর্ণিমা রাতে মালিনীর তীরে নিকুঞ্জ বনে আমার কাছে এলে, আমার গলায় মালা দিলে;—মহারাজ, সে কথা কি ভুলে গেলে? যাবার সময় তুমি, মহারাজ, আমার হাতে তোমার আংটী, পরিয়ে দিলে; প্রতিদিন তোমার নামের একটি করে অক্ষর পড়তে বলে দিলে, বলে গেলে—নামও শেষ হবে আর আমায় নিতে সোণার রথ পাঠাবে। কিন্তু মহারাজ, সোণার রথ কই পাঠালে, সব ভুলে রইলে? মহারাজ, এমনি করে কি কথা রাখলে?” বনবাসিনী শকুন্তলা রাজার কাছে কত অভিমান করলে, রাজাকে কত অনুযোগ করলে, সেই কুঞ্জবনের কথা, সেই দুই সখীর কথা, সেই হরিণ-শিশুর কথা,—কত কথাই মনে করে দিলে, তবু রাজার মনে পড়ল না। শেষে রাজা বল্লেন—“কই, কন্যে, দেখি তোমার সেই আংটী? তুমি যে বল্লে আমি তোমায় আংটী দিয়েছি, কই দেখাও দেখি কেমন আংটী?” শকুন্তলা তাড়াতাড়ি আঁচল খুলে আংটী দেখাতে গেল, কিন্তু হায়, আঁচল শূন্য,— রাজার সেই সাতরাজার ধন এক-মানিকের বরণ-আংটী কোথায় গেল! এতদিনে দুর্ব্বাসার শাপ ফল্লো। হায়, রাজাও তা’র পর হলেন, পৃথিবীতে আপনার লোক কেউ রইল না! ‘মা-গো’—বলে শকুন্তলা রাজসভায় সানের উপর ঘুরে পড়ল; তা’র কপাল ফুটে রক্ত ছুটল। রাজার সভায় হাহাকার পড়ে গেল। সেই সময় শকুন্তলার সেই পাষাণী মা মেনকা স্বর্গপুরে ইন্দ্রসভায় বীণা বাজিয়ে গান গাচ্ছিল। হঠাৎ তা’র বীণার তার ছিঁড়ে গেল, গানের সুর হারিয়ে গেল, শকুন্তলার জন্যে প্রাণ কেঁদে উঠল; অমনি সে বিদ্যুতের মত মেঘের রথে এসে রাজার সভা থেকে শকুন্তলাকে কোলে তুলে একবারে হেমকূট পর্ব্বতে নিয়ে গেল। সেই হেমকূট পর্ব্বতে কশ্যপের আশ্রমে স্বর্গের অপ্সরাদের মাঝে কতদিনে শকুন্তলার একটি রাজচক্রবর্ত্তী রাজকুমার হ’ল। সেই কোল-ভরা ছেলে পেয়ে শকুন্তলার বুক জুড়ল। শকুন্তলা তো চলে গেল। এদিকে রাজবাড়ির জেলেরা একদিন শচীতীর্থের জলে জাল ফেলতে আরম্ভ করলে। রূপলী রঙ্গের সরলপুটী, চাঁদের মত পায়রা-চাঁদা, সাপের মত বাণমাছ, দাঁড়াওয়ালা চিংড়ি, কাঁটাভরা বাটা, কত কি জালে পড়ল। সোণালি রূপলী মাছে নদীর পাড় মাছের ঝুড়ি যেন সোণায় রূপায় ভরে গেল। সারাদিন জেলেদের জালে কত রকমের কত যে মাছ পড়ল তা’র ঠিকানা নেই। শেষে ক্রমে বেলা পড়ে এল; নীল আকাশ, নদীর জল, নগরের পথ আঁধার হয়ে এল, জেলেরা জাল গুড়িয়ে ঘরে চল্লো। এমন সময় এক জেলে জাল ঘাড়ে নদীতীরে দেখা দিল। প্রকাণ্ড জালখানা মাথার উপর ঘুরিয়ে নদীর উপর উড়িয়ে দিলে; মেঘের মতো কাল জাল আকাশে ঘুরে, নদীর এ-পার ও-পার দু-পার জুড়ে জলে পরল। সেই সময় মাছের সর্দ্দার, নদীর রাজা, বুড়ো মাছ রুই অন্ধকারে সন্ধ্যার সময় সেই নদী ঘেরা কাল জালে ধরা পড়ল। জেলে পাড়ায় রব উঠল—জাল কাটবার গুরু, মাছের সর্দ্দার, বুড়ো রুই এতদিনে জালে পড়েছে। যে যেখানে ছিল নদীতীরে ছুটে এল। তারপর অনেক কষ্টে মাছ ডাঙ্গায় উঠল। এত বড় মাছ কেউ কখন দেখেনি। আবার যখন সেই মাছের পেট চিরতে সাত রাজার ধন এক-মানিকের আংটী জ্বলন্ত আগুণের মত ঠিক্রে পড়ল তখন সবাই অবাক্ হয়ে রইল। যা’র মাছ তা’র আনন্দের সীমা রইল না। গরীব জেলে যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেলে। মাছের ঝুড়ি, ছেঁড়া জাল জলে ফেলে মানিকের আংটী সেকরার দোকানে বেচতে চল্লো। রাজা শকুন্তলাকে যে আংটী দিয়েছিলেন—এ সেই আংটী, শচীতীর্থে গা-ধোবার সময় তা’র আঁচল থেকে যখন জলে পড়ে যায় তখন রুইমাছটা খাবার ভেবে গিলে ফেলেছিল। জেলের হাতে রাজার মোহর আংটী দেখে সেকরা কোটালকে খবর দিলে। কোটাল জেলেকে মারতে মারতে রাজসভায় হাজির করলে। বেচারা জেলে রাজদরবারে দাঁড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে কেমন করে মাছের পেটে আংটী পেয়েছে নিবেদন করলে। রাজমন্ত্রী দেখলেন সত্যই আংটীতে মাছের গন্ধ, জেলে ছাড়া পেয়ে মোহরের তোড়া বখশিশ নিয়ে নাচতে নাচতে বাড়ি গেল। এদিকে আংটী হাতে পড়্তেই রাজার তপোবনের কথা সব মনে পড়ে গেল। শকুন্তলার শোকে রাজা যেন পাগল হয়ে উঠলেন। বিনা দোষে তা’কে দূর করে দিয়ে প্রাণ যেন তুঁষের আগুণে পুড়তে লাগল। মুখে অন্য কথা নেই কেবল—‘হা শকুন্তলা—হা শকুন্তলা’। আহারে, বিহারে, শয়নে, স্বপনে, কিছুতে সুখ নাই; রাজ-কার্য্যে সুখ নাই, অন্তঃপুরে সুখ নাই, উপবনে সুখ নাই, কোথাও সুখ নাই। সঙ্গীতশালায় গান বন্ধ হ’ল, নৃত্যশালায় নাচ বন্ধ হ’ল, উপবনে উৎসব বন্ধ হ’ল। রাজার দুঃখের সীমা রইল না। একদিকে বনবাসিনী শকুন্তলা কোলভরা ছেলে নিয়ে হেমকূটের সোণার শিখরে বসে রইল, আর একদিকে জগতের রাজা রাজা দুষ্মন্ত জগৎজোড়া শোক নিয়ে ধূলায় ধূসর পড়ে রইলেন। কত দিন পরে দেবতার কৃপা হল। স্বর্গ থেকে ইন্দ্রদেবের রথ এসে রাজাকে দৈত্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করবার জন্যে স্বর্গপুরে নিয়ে গেল। সেখানে নন্দনবনে কত দিন কাটিয়ে, দৈত্যদের সঙ্গে কত যুদ্ধ করে, মন্দারের মালা গলায় পরে, রাজা রাজ্যে ফিরছেন—এমন সময় দেখলেন, পথে হেমকূট পর্ব্বত, মহর্ষি কশ্যপের আশ্রম। রাজা মহর্ষিকে প্রণাম করবার জন্য সেই আশ্রমে চল্লেন। এই আশ্রমে অনেক তাপস অনেক তপস্বিনী থাকতেন,অনেক অপ্সর অনেক অপ্সরা থাকত। আর থাকত—শকুন্তলা আর তা’র পুত্র রাজপুত্র সর্ব্বদমন। রাজা দুষ্মন্ত যেমন দেশের রাজা ছিলেন তাঁ’র সেই রাজপুত্র তেমনি বনের রাজা ছিল। বনের যত জীব জন্ত তাঁ’কে বড়ই ভালোবাসত। সেই বনে সাতক্রোশ জুড়ে একটা প্রকাণ্ড বটগাছ ছিল, তা’র তলায় একটা প্রকাণ্ড অজগর দিনরাত্রি পড়ে থাকত; এই গাছতলায় সর্ব্বদমনের রাজসভা বসত। হাতিরা তা’কে মাথায় করে নদীতে নিয়ে যেত, শুঁড়ে করে জল ছিটিয়ে গা ধুইয়ে দিত, তারপর তা’কে সেই সাপের পিঠে বসিয়ে দিত—এই তা’র রাজসিংহসন। দুদিকে দুই হাতি পদ্মফুলের চামর ঢোলাত, অজগর ফণা মেলে মাথায় ছাতা ধরত; ভালুক ছিল মন্ত্রী, সিংহ ছিল সেনাপতি, বাঘ ছিল চৌকিদার, শেয়াল ছিল কোটাল আর ছিল—শুক পাখী তা’র প্রিয়সখা, কত মজার মজার কথা বলত, দেশ বিদেশের গল্প করত। সে পাখীর বাসায় পাখীর ছানা নিয়ে খেলা করত, বাঘের বাসায় বাঘের কাছে বসে থাকত,—কেউ তাকে কিছু বলত না। সবাই তাকে ভয়ও করত, ভালও বাস্ত। রাজা যখন সেই বনে এলেন তখন রাজপুত্র একটা সিংহ-শিশুকে নিয়ে খেলা করছিল, তা’র মুখে হাত পুরে দাঁত গুনছিল, তা’কে কোলে পিঠে করছিল, তা’র জটা ধরে টানছিল। বনের তপস্বিনীরা কত ছেড়ে দিতে বলছিলেন, কত মাটীর ময়ূরের লোভ দেখাচ্ছিলেন, শিশু কিছুতে শুনছিল না। এমন সময় রাজা সেখানে এলেন, সিংহ-শিশুকে ছাড়িয়ে সেই রাজ-শিশুকে কোলে নিলেন; দুষ্ট শিশু রাজার কোলে শান্ত হ’ল। সেই রাজশিশুকে কোলে করে রাজার বুক যেন জুড়িয়ে গেল। রাজা তো জানেন না যে এ শিশু তাঁ’রই পুত্র; ভাবছেন—পরের ছেলেকে কোলে করে মন কেন এমন হল, এর উপর কেন এত মায়া হল? এমন সময় শকুন্তলা অঞ্চলের নিধি কোলের বাছাকে খুঁজতে খুঁজতে সেইখানে এলেন। রাজা রাণীতে দেখা হ’ল, রাজা আবার শকুন্তলাকে আদর করলেন, তাঁ’র কাছে ক্ষমা চাইলেন। দেবতার কৃপায় এতদিনে আবার মিলন হ’ল, দুর্ব্বাসার শাপান্ত হ’ল। কশ্যপ অদিতিকে প্রণাম করে রাজা রাণী রাজপুত্র কোলে রাজ্যে ফিরলেন। তারপর কত দিন সুখে রাজত্ব করে, রাজপুত্রকে রাজ্য দিয়ে রাজা রাণী সেই তপোবনে তাতঃ কণ্বের কাছে, সেই দুই সখীর কাছে, সেই হরিণ-শিশুদের কাছে, সেই সহকার এবং মাধবীলতার কাছে ফিরে গেলেন এবং তাপস তাপসীদের সঙ্গে সুখে জীবন কাটিয়ে দিলেন।সমাপ্ত।
পনের-ষোল বছর আগেকার কথা। বি.এ. পাশ করিয়া কলিকাতায় বসিয়া আছি। বহু জায়গায় ঘুরিয়াও চাকুরি মিলিল না।সরস্বতী-পূজার দিন। মেসে অনেক দিন ধরিয়া আছি তাই নিতান্ত তাড়াইয়া দেয় না, কিন্তু তাগাদার উপর তাগাদা দিয়া মেসের ম্যানেজার অস্থির করিয়া তুলিয়াছে। মেসে প্রতিমা গড়াইয়া পূজা হইতেছে-ধুমধামও মন্দ নয়, সকালে উঠিয়া ভাবিতেছি আজ সব বন্ধ, দু-একটা জায়গায় একটু আশা দিয়াছিল, তা আজ আর কোথাও যাওয়া কোনো কাজের হইবে না; বরং তার চেয়ে ঘুরিয়া ঘুরিয়া ঠাকুর দেখিয়া বেড়াই।মেসের চাকর জগন্নাথ এমন সময় একটুকরা কাগজ হাতে দিয়া গেল। পড়িয়া দেখিলাম ম্যানেজারের লেখা তাগাদার চিঠি। আজ মেসে পূজা-উপলক্ষে ভালো খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা হইয়াছে, আমার কাছে দু-মাসের টাকা বাকি, আমি যেন চাকরের হাতে অন্তত দশটি টাকা দিই। অন্যথা কাল হইতে খাওয়ার জন্য আমাকে অন্যত্র ব্যবস্থা করিতে হইবে।কথা খুব ন্যায্য বটে, কিন্তু আমার সম্বল মোটে দুটি টাকা আর কয়েক আনা পয়সা। কোনো জবাব না দিয়াই মেস হইতে বাহির হইলাম। পাড়ার নানা স্থানে পূজার বাজনা বাজিতেছে, ছেলেমেয়েরা গলির মোড়ে দাঁড়াইয়া গোলমাল করিতেছে; অভয় ময়রার খাবারের দোকানে অনেক রকম নতুন খাবার থালায় সাজানো-বড়রাস্তার ওপারে কলেজ হোস্টেলের ফটকে নহবৎ বসিয়াছে। বাজার হইতে দলে দলে লোক ফুলের মালা ও পূজার উপকরণ কিনিয়া ফিরিতেছে।ভাবিলাম কোথায় যাওয়া যায়। আজ এক বছরের উপর হইল জোড়াসাঁকো স্কুলের চাকুরি ছাড়িয়া দিয়া বসিয়া আছি-অথবা বসিয়া ঠিক নাই, চাকুরির খোঁজে হেন মার্চেণ্ট আপিস নাই, হেন স্কুল নাই, হেন খবরের কাগজের আপিস নাই, হেন বড়লোকের বাড়ি নাই-যেখানে অন্তত দশবার না হাঁটাহাঁটি করিয়াছি, কিন্তু সকলেরই এক কথা, চাকুরি খালি নাই।হঠাৎ পথে সতীশের সঙ্গে দেখা। সতীশের সঙ্গে হিন্দু হোস্টেলে একসঙ্গে থাকিতাম। বর্তমানে সে আলীপুরের উকিল, বিশেষ কিছু হয় বলিয়া মনে হয় না, বালিগঞ্জের ওদিকে কোথায় একটা টিউশনি আছে, সেটাই সংসারসমুদ্রে বর্তমানে তাহার পক্ষে ভেলার কাজ করিতেছে। আমার ভেলা তো দূরের কথা, একখানা মাস্তুল-ভাঙ্গা কাঠও নাই, যতদূর হাবুডুবু খাইবার তাহা খাইতেছি-সতীশকে দেখিয়া সে কথা আপাতত ভুলিয়া গেলাম। ভুলিয়া গেলাম তাহার আর একটা কারণ, সতীশ বলিল-এই যে, কোথায় চলেছ সত্যচরণ? চল হিন্দু হোস্টেলের ঠাকুর দেখে আসি-আমাদের পুরোনো জায়গাটা। আর ওবেলা বড় জলসা হবে- এসো। ওয়ার্ড সিক্সের সেই অবিনাশকে মনে আছে, সেই যে ময়মনসিংহের কোন্ জমিদারের ছেলে, সে যে আজকাল বড় গায়ক। সে গান গাইবে, আমায় আবার একখানা কার্ড দিয়েছে-তাদের এস্টেটের দু-একটা কাজকর্ম মাঝে মাঝে করি কিনা। এসো, তোমায় দেখলে সে খুশি হবে।কলেজে পড়িবার সময়, আজ পাঁচ-ছয় বছর আগে, আমোদ পাইলে আর কিছু চাহিতাম না-এখনো সে মনের ভাব কাটে নাই দেখিলাম। হিন্দু হোস্টেলে ঠাকুর দেখিতে গিয়া সেখানে মধ্যাহ্নভোজনের নিমন্ত্রণ পাইলাম। কারণ আমাদের দেশের অনেক পরিচিত ছেলে এখানে থাকে, তাহারা কিছুতেই আসিতে দিতে চাহিল না। বলিলাম-বিকেলে জলসা হবে, তা এখন কি! মেস থেকে খেয়ে আসব এখন।তাহারা সে কথায় কর্ণপাত করিল না।কর্ণপাত করিলে আমাকে সরস্বতী-পূজার দিনটা উপবাসে কাটাইতে হইত। ম্যানেজারের অমন কড়া চিঠির পরে আমি গিয়া মেসের লুচি পায়েসের ভোজ খাইতে পারিতাম না-যখন একটা টাকাও দিই নাই। এ বেশ হইল-পেট ভরিয়া নিমন্ত্রণ খাইয়া বৈকালে জলসার আসরে গিয়া বসিলাম। আবার তিন বৎসর পূর্বের ছাত্রজীবনের উল্লাস ফিরিয়া আসিল-কে মনে রাখে যে চাকুরি পাইলাম কি না-পাইলাম, মেসের ম্যানেজার মুখ হাঁড়ি করিয়া বসিয়া আছে কি না-আছে। ঠুংরি ও কীর্তনের সমুদ্রে তলাইয়া গিয়া ভুলিয়া গেলাম যে দেনা মিটাইতে না পারিলে কাল সকাল হইতে বায়ুভক্ষণের ব্যবস্থা হইবে। জলসা যখন ভাঙ্গিল তখন রাত এগারটা। অবিনাশের সঙ্গে আলাপ হইল, হিন্দু হোস্টেলে থাকিবার সময় সে আর আমি ডিবেটিং ক্লাবের চাঁই ছিলাম-একবার স্যর গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমরা সভাপতি করিয়াছিলাম। বিষয় ছিল, স্কুল-কলেজে বাধ্যতামূলক ধর্মশিক্ষা প্রবর্তন করা উচিত। অবিনাশ প্রস্তাবকর্তা আমি প্রতিবাদী পক্ষের নায়ক। উভয় পক্ষে তুমুল তর্কের পর সভাপতি আমাদের পক্ষে মত দিলেন। সেই হইতে অবিনাশের সঙ্গে খুব বন্ধুত্ব হইয়া যায়-যদিও কলেজ হইতে বাহির হইয়া এই প্রথম আবার তার সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ।অবিনাশ বলিল-চল, আমার গাড়ি রয়েছে-তোমাকে পৌঁছে দিই। কোথায় থাক?মেসের দরজায় নামাইয়া দিয়া বলিল- শোন, কাল হ্যারিংটন স্ট্রিটে আমার বাড়িতে চা খাবে বিকেল চারটের সময়। ভুলো না যেন। তেত্রিশের দুই। লিখে রাখ তো নোটবইয়ে।পরদিন খুঁজিয়া হ্যারিংটন স্ট্রিট বাহির করিলাম, বন্ধুর বাড়িও বাহির করিলাম। বাড়ি খুব বড় নয়, তবে সামনে পিছনে বাগান। গেটে উইস্টারিয়া লতা, নেপালি দারোয়ান, ও পিতলের প্লেট। লাল সুরকির বাঁকা রাস্তা- রাস্তার এক ধারে সবুজ ঘাসের বন, অন্য ধারে বড় বড় মুচুকুন্দ চাঁপা ও আমগাছ। গাড়িবারান্দায় বড় একখানা মোটর গাড়ি। বড়লোকের বাড়ি নয় বলিয়া ভুল করিবার কোনো দিক হইতে কোনো উপায় নাই। সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিয়াই বসিবার ঘর। অবিনাশ আসিয়া আদর করিয়া ঘরে বসাইল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পুরাতন দিনের কথাবার্তায় আমরা দুজনেই মশগুল হইয়া গেলাম। অবিনাশের বাবা ময়মনসিংহের একজন বড় জমিদার, কিন্তু সম্প্রতি কলিকাতার বাড়িতে তাঁহারা কেহই নাই। অবিনাশের এক ভগ্নীর বিবাহ উপলক্ষে গত অগ্রহায়ণ মাসে দেশে গিয়াছিলেন- এখনো কেহই আসেন নাই।এ-কথা ও-কথার পর অবিনাশ বলিল-এখন কি করছ সত্য?বলিলাম-জোড়াসাঁকো স্কুলে মাস্টারি করতুম, সম্প্রতি বসেই আছি একরকম। ভাবছি, আর মাস্টারি করব না। দেখছি অন্য কোনো দিকে যদি-দু-এক জায়গায় আশাও পেয়েছি।আশা পাওয়ার কথা সত্য নয়, কিন্তু অবিনাশ বড়লোকের ছেলে, মস্তবড় এস্টেট ওদের। তাহার কাছে চাকুরির উমেদারি করিতেছি এটা না-দেখায়, তাই কথাটা বলিলাম।অবিনাশ একটুখানি ভাবিয়া বলিল-তোমার মতো একজন উপযুক্ত লোকের চাকুরি পেতে দেরি হবে না অবিশ্যি। আমার একটা কথা আছে, তুমি তো আইনও পড়েছিলে-না?বলিলাম-পাশও করেছি, কিন্তু ওকালতি করবার মতিগতি নেই।অবিনাশ বলিল-আমাদের একটা জঙ্গল-মহাল আছে পূর্ণিয়া জেলায়। প্রায় বিশ-ত্রিশ হাজার বিঘে জমি। আমাদের সেখানে নায়েব আছে কিন্তু তার ওপর বিশ্বাস করে অত জমি বন্দোবস্তের ভার দেওয়া চলে না। আমরা একজন উপযুক্ত লোক খুঁজছি। তুমি যাবে?কান অনেক সময় মানুষকে প্রবঞ্চনা করে জানিতাম। অবিনাশ বলে কি! যে চাকুরির খোঁজে আজ একটি বছর কলিকাতার রাস্তাঘাট চষিয়া বেড়াইতেছি, চায়ের নিমন্ত্রণে সম্পূর্ণ অযাচিতভাবে সেই চাকুরির প্রস্তাব আপনা হইতেই সম্মুখে আসিয়া উপস্থিত হইল?তবুও মান বজায় রাখিতে হইবে। অত্যন্ত সংযমের সহিত মনের ভাব চাপিয়া উদাসীনের মতো বলিলাম-ও! আচ্ছা ভেবে বলব। কাল আছ তো?অবিনাশ খুব খোলাখুলি ও দিলদরিয়া মেজাজের মানুষ। বলিল- ভাবাভাবি রেখে দাও। আমি বাবাকে আজই পত্র লিখতে বসছি। আমরা একজন বিশ্বাসী লোক খুঁজছি। জমিদারির ঘুণ কর্মচারী আমরা চাই নে-কারণ তারা প্রায়ই চোর। তোমার মতো শিক্ষিত ও বুদ্ধিমান লোকের সেখানে দরকার। জঙ্গল-মহাল আমরা নূতন প্রজার সঙ্গে বন্দোবস্ত করব। ত্রিশ হাজার বিঘের জঙ্গল। অত দায়িত্বপূর্ণ কাজ কি যার-তার হাতে ছেড়ে দেওয়া যায়। তোমার সঙ্গে আজ আলাপ নয়, তোমার নাড়িনক্ষত্র আমি জানি। তুমি রাজি হয়ে যাও-আমি এখুনি বাবাকে লিখে অ্যাপয়েণ্টমেণ্ট লেটার আনিয়ে দিচ্ছি।কি করিয়া চাকুরি পাইলাম তাহা বেশি বলিবার আবশ্যক নাই। কারণ এ গল্পের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। সংক্ষেপে বলিয়া রাখি-অবিনাশের বাড়ির চায়ের নিমন্ত্রণ খাইবার দুই সপ্তাহ পরে আমি একদিন নিজের জিনিসপত্র লইয়া বি.এন.ডব্লিউ. রেলওয়ের একটা ছোট স্টেশনে নামিলাম।শীতের বৈকাল। বিস্তীর্ণ প্রান্তরে ঘন ছায়া নামিয়াছে, দূরে বনশ্রেণীর মাথায় মাথায় অল্প অল্প কুয়াশা জমিয়াছে। রেল-লাইনের দু-ধারে মটর-ক্ষেত, শীতল সান্ধ্য-বাতাসে তাজা মটরশাকের স্নিগ্ধ সুগন্ধে কেমন মনে হইল যে-জীবন আরম্ভ করিতে যাইতেছি তাহা বড় নির্জন হইবে, এই শীতের সন্ধ্যা যেমন নির্জন, যেমন নির্জন এই উদাস প্রান্তর আর ওই দূরের নীলবর্ণ বনশ্রেণী, তেমনি।গোরুর গাড়িতে প্রায় পনের-ষোল ক্রোশ চলিলাম সারারাত্রি ধরিয়া-ছইয়ের মধ্যে কলিকাতা হইতে আনীত কম্বল র্যাগ ইত্যাদি শীতে জল হইয়া গেল-কে জানিত এ-সব অঞ্চলে এত ভয়ানক শীত! সকালে রৌদ্র যখন উঠিয়াছে, তখনো পথ চলিতেছি। দেখিলাম, জমির প্রকৃতি বদলাইয়া গিয়াছে-প্রাকৃতিক দৃশ্যও অন্য মূর্তি পরিগ্রহ করিয়াছে-ক্ষেতখামার নাই, বস্তি লোকালয়ও বড়-একটা দেখা যায় না-কেবল ছোটবড় বন, কোথাও ঘন, কোথাও পাতলা, মাঝে মাঝে মুক্ত প্রান্তর, কিন্তু তাহাতে ফসলের আবাদ নাই।কাছারিতে পৌঁছিলাম বেলা দশটার সময়। জঙ্গলের মধ্যে প্রায় দশ-পনের বিঘা জমি পরিষ্কার করিয়া কতকগুলি খড়ের ঘর, জঙ্গলেরই কাঠ, বাঁশ ও খড় দিয়া তৈরি-ঘরে শুকনো ঘাস ও বন-ঝাউয়ের সরু গুঁড়ির বেড়া, তাহার উপর মাটি দিয়া লেপা।ঘরগুলি নতুন তৈরি, ঘরের মধ্যে ঢুকিয়াই টাট্কা-কাটা খড়, আধকাঁচা ঘাস ও বাঁশের গন্ধ পাওয়া গেল। জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম, আগে জঙ্গলের ওদিকে কোথায় কাছারি ছিল, কিন্তু শীতকালে সেখানে জলাভাব হওয়ায় এই ঘর নতুন বাঁধা হইয়াছে, কারণ পাশেই একটা ঝরনা থাকায় এখানে জলের কষ্ট নাই।জীবনের বেশির ভাগ সময় কলিকাতায় কাটাইয়াছি। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গ, লাইব্রেরি, থিয়েটার সিনেমা, গানের আড্ডা-এ-সব ভিন্ন জীবন কল্পনা করিতে পারি না-এ অবস্থায় চাকুরির কয়েকটি টাকার খাতিরে যেখানে আসিয়া পড়িলাম, এত নির্জন স্থানের কল্পনাও কোনোদিন করি নাই। দিনের পর দিন যায়, পূর্বাকাশে সূর্যের উদয় দেখি দূরের পাহাড় ও জঙ্গলের মাথায়, আবার সন্ধ্যায় সমগ্র বনঝাউ ও দীর্ঘ ঘাসের বনশীর্ষ সিঁদুরের রঙে রাঙাইয়া সূর্যকে ডুবিয়া যাইতে দেখি-ইহার মধ্যে শীতকালের যে এগার-ঘন্টা ব্যাপী দিন, তা যেন খাঁ-খাঁ করে শূন্য, কি করিয়া তাহা পুরাইব, প্রথম প্রথম সেইটা আমার পক্ষে হইল মহাসমস্যা।কাজকর্ম করিলে অনেক করা যায় বটে, কিন্তু আমি নিতান্ত নব আগন্তুক, এখনো ভালো করিয়া এখানকার লোকের ভাষা বুঝিতে পারি না, কাজের কোনো বিলিব্যবস্থাও করিতে পারি না, নিজের ঘরে বসিয়া বসিয়া, যে কয়খানি বই সঙ্গে আনিয়াছিলাম তাহা পড়িয়াই কোনো রকমে দিন কাটাই। কাছারিতে লোকজন যারা আছে তারা নিতান্ত বর্বর, না বোঝে তাহারা আমার কথা, না আমি ভালো বুঝি তাহাদের কথা। প্রথম দিন-দশেক কি কষ্টে যে কাটিল! কতবার মনে হইল চাকুরিতে দরকার নাই, এখানে হাঁপাইয়া মরার চেয়ে আধপেটা খাইয়া কলিকাতায় থাকা ভালো। অবিনাশের অনুরোধে কি ভুলই করিয়াছি এই জনহীন জঙ্গলে আসিয়া, এ-জীবন আমার জন্য নয়।রাত্রিতে নিজের ঘরে বসিয়া এই সবই ভাবিতেছি, এমন সময় ঘরের দরজা ঠেলিয়া কাছারির বৃদ্ধ মুহুরী গোষ্ঠ চক্রবর্তী প্রবেশ করিলেন। এই একমাত্র লোক যাহার সহিত বাংলা কথা বলিয়া হাঁপ ছাড়িয়া বাঁচি। গোষ্ঠবাবু এখানে আছেন অন্তত সতের-আঠার বছর। বর্ধমান জেলায় বনপাশ স্টেশনের কাছে কোন্ গ্রামে বাড়ি। বলিলাম, বসুন গোষ্ঠবাবু-গোষ্ঠবাবু অন্য একখানা চেয়ারে বসিলেন। বলিলেন-আপনাকে একটা কথা বলতে এলাম নিরিবিলি, এখানকার কোনো মানুষকে বিশ্বাস করবেন না। এ বাংলা দেশ নয়। লোকজন সব বড় খারাপ--বাংলা দেশের মানুষও সবাই যে খুব ভালো, এমন নয় গোষ্ঠবাবু--সে আর আমার জানতে বাকি নেই, ম্যানেজার বাবু। সেই দুঃখে আর ম্যালেরিয়ার তাড়নায় প্রথম এখানে আসি। প্রথম এসে বড় কষ্ট হত, এ জঙ্গলে মন হাঁপিয়ে উঠত-আজকাল এমন হয়েছে, দেশ তো দূরের কথা, পূর্ণিয়া কি পাটনাতে কাজে গিয়ে দু-দিনের বেশি তিন দিন থাকতে পারি নে।গোষ্ঠবাবুর মুখের দিকে সকৌতুকে চাহিলাম-বলে কি!জিজ্ঞাসা করিলাম-থাকতে পারেন না কেন? জঙ্গলের জন্য মন হাঁপায় নাকি?গোষ্ঠবাবু আমার দিকে চাহিয়া একটু হাসিলেন। বলিলেন, ঠিক তাই, ম্যানেজার বাবু। আপনিও বুঝবেন। নতুন এসেছেন কলকাতা থেকে, কলকাতার জন্যে মন উড়ু উড়ু করছে, বয়সও আপনার কম। কিছুদিন এখানে থাকুন। তারপর দেখবেন।-কি দেখব?-জঙ্গল আপনাকে পেয়ে বসবে। কোনো গোলমাল কি লোকের ভিড় ক্রমশ আর ভালো লাগবে না। আমার তাই হয়েছে মশাই। এই গত মাসে মুঙ্গের গিয়েছিলাম মকদ্দমার কাজে-কেবল মনে হয় কবে এখান থেকে বেরুব।মনে মনে ভাবিলাম, ভগবান সে দুরবস্থার হাত থেকে আমায় উদ্ধার করুন। তার আগে চাকুরিতে ইস্তফা দিয়া কোন্কালে কলিকাতায় ফিরিয়া গিয়াছি!গোষ্ঠবাবু বলিলেন, বন্দুকটা রাত-বেরাত শিয়রে শিয়রে রেখে শোবেন, জায়গা ভালো নয়। এর আগে একবার কাছারিতে ডাকাতি হয়ে গিয়েছে। তবে আজকাল এখানে আর টাকাকড়ি থাকে না, এই যা কথা।কৌতূহলের সহিত বললাম, বলেন কি! কতকাল আগে ডাকাতি হয়েছিল?-বেশি না। এই বছর আট-নয় আগে। কিছুদিন থাকুন, তখন সব কথা জানতে পারবেন। এ অঞ্চল বড় খারাপ। তা ছাড়া, এই ভয়ানক জঙ্গলে ডাকাতি করে মেরে নিলে দেখবেই বা কে?গোষ্ঠবাবু চলিয়া গেলে একবার ঘরের জানালার কাছে আসিয়া দাঁড়াইলাম। দূরে জঙ্গলের মাথায় চাঁদ উঠিতেছে-আর সেই উদীয়মান চন্দ্রের পটভূমিকায় আঁকাবাঁকা একটা বনঝাউয়ের ডাল, ঠিক যেন জাপানি চিত্রকর হকুসাই-অঙ্কিত একখানি ছবি।চাকুরি করিবার আর জায়গা খুঁজিয়া পাই নাই! এ-সব বিপজ্জনক স্থান, আগে জানিলে কখনোই অবিনাশকে কথা দিতাম না।দুর্ভাবনা সত্ত্বেও উদীয়মান চন্দ্রের সৌন্দর্য আমাকে বড় মুগ্ধ করিল।কাছারির অনতিদূরে একটা ছোট পাথরের টিলা, তার উপর প্রাচীন ও সুবৃহৎ একটা বটগাছ। এই বটগাছের নাম গ্র্যান্ট সাহেবের বটগাছ। কেন এই নাম হইল, তখন অনুসন্ধান করিয়াও কিছু জানিতে পারি নাই। একদিন নিস্তব্ধ অপরাহ্নে বেড়াইতে বেড়াইতে পশ্চিম দিগন্তে সূর্যাস্তের শোভা দেখিতে টিলার উপরে উঠিলাম।টিলার উপরকার বটতলায় আসন্ন সন্ধ্যার ঘন ছায়ায় দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া কত দূর পর্যন্ত এক চমকে দেখিতে পাইলাম-কলুটোলার মেস, কপালীটোলার সেই ব্রিজের আড্ডাটি, গোলদিঘিতে আমার প্রিয় বেঞ্চখানা-প্রতিদিন এমন সময়ে যাহাতে গিয়া বসিয়া কলেজ স্ট্রিটের বিরামহীন জনস্রোত ও বাস মোটরের ভিড় দেখিতাম। হঠাৎ যেন কতদূরে পড়িয়া রহিয়াছে মনে হইল তাহারা। মন হু-হু করিয়া উঠিল-কোথায় আছি! কোথাকার জনহীন অরণ্যে-প্রান্তরে খড়ের চালায় বাস করিতেছি চাকুরির খাতিরে! মানুষ এখানে থাকে? লোক নাই, জন নাই, সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ-একটা কথা কহিবার মানুষ পর্যন্ত নাই। এদেশের এইসব মূর্খ, বর্বর মানুষ এরা একটা ভালো কথা বলিলে বুঝিতে পারে না-এদেরই সাহচর্যে দিনের পর দিন কাটাইতে হইবে? সেই দূরবিসর্পী দিগন্তব্যাপী জনহীন সন্ধ্যার মধ্যে দাঁড়াইয়া মন উদাস হইয়া গেল, কেমন ভয়ও হইল। তখন সঙ্কল্প করিলাম, এ-মাসের আর সামান্য দিনই বাকি, সামনের মাসটা কোনোরূপে চোখ বুজিয়া কাটাইব, তারপর অবিনাশকে একখানা লম্বা পত্র লিখিয়া চাকুরিতে ইস্তফা দিয়া কলিকাতায় ফিরিয়া গিয়া সভ্য বন্ধুবান্ধবদের অভ্যর্থনা পাইয়া, সভ্য খাদ্য খাইয়া, সভ্য সুরের সঙ্গীত শুনিয়া, মানুষের ভিড়ের মধ্যে ঢুকিয়া, বহু মানবের আনন্দ-উল্লাসভরা কণ্ঠস্বর শুনিয়া বাঁচিব।পূর্বে কি জানিতাম মানুষের মধ্যে থাকিতে এত ভালবাসি! মানুষকে এত ভালবাসি! তাহাদের প্রতি আমার যে কর্তব্য হয়তো সব সময় তাহা করিয়া উঠিতে পারি না-কিন্তু ভালবাসি তাহাদের নিশ্চয়ই। নতুবা এত কষ্ট পাইব কেন তাহাদের ছাড়িয়া আসিয়া?প্রেসিডেন্সি কলেজের রেলিঙে বই বিক্রি করে সেই যে বৃদ্ধ মুসলমানটি, কতদিন তাহার দোকানে দাঁড়াইয়া পুরোনো বই ও মাসিক পত্রিকার পাতা উল্টাইয়াছি-কেনা উচিত ছিল হয়তো, কিন্তু কেনা হয় নাই- সেও যেন পরম আত্মীয় বলিয়া মনে হইল-তাহাকে আজ কতদিন দেখি নাই!কাছারিতে ফিরিয়া নিজের ঘরে ঢুকিয়া টেবিলে আলো জ্বালিয়া একখানা বই লইয়া বসিয়াছি, সিপাহি মুনেশ্বর সিং আসিয়া সেলাম করিয়া দাঁড়াইল। বলিলাম-কি মুনেশ্বর?ইতিমধ্যে দেহাতি হিন্দি কিছু কিছু বলিতে শিখিয়াছিলাম।মুনেশ্বর বলিল-হুজুর, আমায় একখানা লোহার কড়া কিনে দেবার হুকুম যদি দেন মুহুরী বাবুকে।-কি হবে লোহার কড়া?মুনেশ্বরের মুখ প্রাপ্তির আশায় উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। সে বিনীত সুরে বলিল-একখানা লোহার কড়া থাকলে কত সুবিধে হুজুর। যেখানে সেখানে সঙ্গে নিয়ে গেলাম, ভাত রাঁধা যায়, জিনিসপত্র রাখা যায়, ওতে করে ভাত খাওয়া যায়, ভাঙবে না। আমার একখানাও কড়া নেই। কতদিন থেকে ভাবছি একখানা কড়ার কথা-কিন্তু হুজুর, বড় গরিব, একখানা কড়ার দাম ছ-আনা, অত দাম দিয়ে কড়া কিনি কেমন করে? তাই হুজুরের কাছে আসা, অনেক দিনের সাধ একখানা কড়া আমার হয়, হুজুর যদি মঞ্জুর করেন, হুজুর মালিক।একখানা লোহার কড়াই যে এত গুণের, তাহার জন্য যে এখানে লোক রাত্রে স্বপ্ন দেখে, এ ধরনের কথা এই আমি প্রথম শুনিলাম। এত গরিব লোক পৃথিবীতে আছে যে ছ-আনা দামের একখানা লোহার কড়াই জুটিলে স্বর্গ হাতে পায়? শুনিয়াছিলাম এদেশের লোক বড় গরিব। এত গরিব তাহা জানিতাম না। বড় মায়া হইল।পরদিন আমার সই করা চিরকুটের জোরে মুনেশ্বর সিং নউগচ্ছিয়ার বাজার হইতে একখানা পাঁচ নম্বরের কড়াই কিনিয়া আনিয়া আমার ঘরের মেজেতে নামাইয়া আমায় সেলাম দিয়া দাঁড়াইল।-হো গৈল, হুজুরকী কৃপা-সে-কড়াইয়া হো গৈল! তাহার হর্ষোৎফুল্ল মুখের দিকে চাহিয়া আমার এই একমাসের মধ্যে সর্বপ্রথম আজ মনে হইল-বেশ লোকগুলা। বড় কষ্ট তো এদের!
কিছুতেই কিন্তু এখানকার এই জীবনের সঙ্গে নিজেকে আমি খাপ খাওয়াইতে পারিতেছি না। বাংলা দেশ হইতে সদ্য আসিয়াছি, চিরকাল কলিকাতায় কাটাইয়াছি, এই অরণ্যভূমির নির্জনতা যেন পাথরের মতো বুকে চাপিয়া আছে বলিয়া মনে হয়।এক-একদিন বৈকালে বেড়াইতে বাহির হইয়া অনেক দূর পর্যন্ত যাই। কাছারির কাছে তবুও লোকজনের গলা শুনিতে পাওয়া যায়, রশি দুই-তিন গেলেই কাছারিঘরগুলা যেমন দীর্ঘ বনঝাউ ও কাশ জঙ্গলের আড়ালে পড়ে, তখন মনে হয় সমস্ত পৃথিবীতে আমি একাকী। তারপর যতদূর যাওয়া যায়, চওড়া মাঠের দু-ধারে ঘন বনের সারি বহুদূর পর্যন্ত চলিয়াছে, শুধু বন আর ঝোপ, গজারি গাছ, বাবলা, বন্য কাঁটাবাঁশ, বেত ঝোপ। গাছের ও ঝোপের মাথায় মাথায় অস্তোন্মুখ সূর্য সিঁদুর ছড়াইয়া দিয়াছে-সন্ধ্যার বাতাসে বন্যপুষ্প ও তৃণগুল্মের সুঘ্রাণ, প্রতি ঝোপ পাখির কাকলিতে মুখর, তার মধ্যে হিমালয়ের বনটিয়াও আছে। মুক্ত দূরপ্রসারী তৃণাবৃত প্রান্তর ও শ্যামল বনভূমির মেলা।এই সময় মাঝে মাঝে মনে হইত যে, এখানে প্রকৃতির যে-রূপ দেখিতেছি, এমনটি আর কোথাও দেখি নাই। যতদূর চোখ যায়, এসব যেন আমার, আমি এখানে একমাত্র মানুষ, আমার নির্জনতা ভঙ্গ করিতে আসিবে না কেউ-মুক্ত আকাশতলে নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় দূর দিগন্তের সীমারেখা পর্যন্ত মনকে ও কল্পনাকে প্রসারিত করিয়া দিই।কাছারি হইতে প্রায় এক ক্রোশ দূরে একটা নাবাল জায়গা আছে, সেখানে ক্ষুদ্র কয়েকটি পাহাড়ি ঝরনা ঝির্ ঝির্ করিয়া বহিয়া যাইতেছে, তাহার দু-পারে জলজ লিলির বন, কলিকাতার বাগানে যাহাকে বলে স্পাইডার লিলি। বন্য স্পাইডার লিলি কখনো দেখি নাই, জানিতামও না যে, এমন নিভৃত ঝরনার উপল-বিছানো তীরে ফুটন্ত লিলি ফুলের এত শোভা হয় বা বাতাসে তাহারা এত মৃদু কোমল সুবাস বিস্তার করে। কতবার গিয়া এখানটিতে চুপ করিয়া বসিয়া আকাশ, সন্ধ্যা ও নির্জনতা উপভোগ করিয়াছি।মাঝে মাঝে ঘোড়ায় চড়িয়া বেড়াই। প্রথম প্রথম ভালো চড়িতে পারিতাম না, ক্রমে ভালোই শিখিলাম। শিখিয়াই বুঝিলাম জীবনে এত আনন্দ আর কিছুতেই নাই। যে কখনো এমন নির্জন আকাশতলে দিগন্তব্যাপী বনপ্রান্তরে ইচ্ছামতো ঘোড়া ছুটাইয়া না বেড়াইয়াছে, তাহাকে বোঝানো যাইবে না সে কি আনন্দ! কাছারি হইতে দশ-পনের মাইল দূরবর্তী স্থানে সার্ভে পার্টি কাজ করিতেছে, প্রায়ই আজকাল সকালে এক পেয়ালা চা খাইয়া ঘোড়ার পিঠে জিন কষিয়া সেই যে ঘোড়ায় উঠি, কোনোদিন ফিরি বৈকালে, কোনোদিন বা ফিরিবার পথে জঙ্গলের মাথার উপর নক্ষত্র ওঠে, বৃহস্পতি জ্বলজ্বল করে; জ্যোৎস্নারাতে বনপুষ্পের সুবাস জ্যোৎস্নার সহিত মেশে, শৃগালের রব প্রহর ঘোষণা করে, জঙ্গলের ঝিঁ ঝিঁ পোকা দল বাঁধিয়া ডাকিতে থাকে।যে কাজে এখানে আসা তার জন্য অনেক চেষ্টা করা যাইতেছে। এত হাজার বিঘা জমি, হঠাৎ বন্দোবস্ত হওয়াও সোজা কথা নয় অবশ্য। আর একটা ব্যাপার এখানে আসিয়া জানিয়াছি, এই জমি আজ ত্রিশ বছর পূর্বে নদীগর্ভে সিকস্তি হইয়া গিয়াছিল-বিশ বছর হইল বাহির হইয়াছে-কিন্তু যাহারা পিতৃপিতামহের জমি গঙ্গায় ভাঙ্গিয়া যাওয়ার পরে অন্যত্র উঠিয়া গিয়া বাস করিয়াছিল, সেই পুরাতন প্রজাদিগকে জমিদার এইসব জমিতে দখল দিতে চাহিতেছেন না। মোটা সেলামি ও বর্ধিত হারে খাজনার লোভে নূতন প্রজাদের সঙ্গেই বন্দোবস্ত করিতে চান। অথচ যে-সব গৃহহীন, আশ্রয়হীন অতিদরিদ্র পুরাতন প্রজাকে তাহাদের ন্যায্য অধিকার হইতে বঞ্চিত করা হইয়াছে তাহারা বারবার অনুরোধ-উপরোধ কান্নাকাটি করিয়াও জমি পাইতেছে না।আমার কাছেও অনেকে আসিয়াছিল। তাহাদের অবস্থা দেখিলে কষ্ট হয়, কিন্তু জমিদারের হুকুম, কোনো পুরাতন প্রজাকে জমি দেওয়া হইবে না। কারণ একবার চাপিয়া বসিলে তাহাদের পুরাতন স্বত্ব তাহারা আইনত দাবি করিতে পারে। জমিদারের লাঠির জোর বেশি, প্রজারা আজ বিশ বৎসর ভূমিহীন ও গৃহহীন অবস্থায় দেশে দেশে মজুরি করিয়া খায়, কেহ সামান্য চাষবাস করে, অনেকে মরিয়া গিয়াছে, তাহাদের ছেলেপিলেরা নাবালক বা অসহায়-প্রবল জমিদারের বিরুদ্ধে স্রোতের মুখে কুটার মতো ভাসিয়া যাইবে।এদিকে নূতন প্রজা সংগ্রহ করা যায় কোথা হইতে? মুঙ্গের, পূর্ণিয়া, ভাগলপুর, ছাপরা প্রভৃতি নিকটবর্তী জেলা হইতে লোক যাহারা আসে, দর শুনিয়া পিছাইয়া যায়। দু-পাঁচজন কিছু কিছু লইতেছেও। এইরূপ মৃদু গতিতে অগ্রসর হইলে দশহাজার বিঘা জঙ্গলী জমি প্রজাবিলি হইতে বিশ-পঁচিশ বৎসর লাগিয়া যাইবে।আমাদের এক ডিহি কাছারি আছে-সেও ঘোর জঙ্গলময় মহাল-এখান থেকে উনিশ মাইল দূরে। জায়গাটার নাম লবটুলিয়া, কিন্তু এখানেও যেমন জঙ্গল, সেখানেও তেমনি, কেবল সেখানে কাছারি রাখার উদ্দেশ্য এই যে, সেই জঙ্গলটা প্রতিবছর গোয়ালাদের গোরু-মহিষ চরাইবার জন্য খাজনা করিয়া দেওয়া হয়। এ বাদে সেখানে প্রায় দু’তিনশ বিঘা জমিতে বন্যকুলের জঙ্গল আছে, লাক্ষা-কীট পুষিবার জন্য লোকে এই কুল-বন জমা লইয়া থাকে। এই টাকাটা আদায় করিবার জন্য সেখানে দশ টাকা মাহিনার একজন পাটোয়ারী ও তাহার একটা ছোট কাছারি আছে।কুল-বন ইজারা দিবার সময় আসিতেছে, একদিন ঘোড়া করিয়া লবটুলিয়াতে রওনা হইলাম। আমার কাছারি ও লবটুলিয়ার মাঝখানে একটা উঁচু রাঙামাটির ডাঙা প্রায় সাত-আট মাইল লম্বা, এর নাম ‘ফুলকিয়া বইহার’-কত ধরনের গাছপালা ও ঝোপজঙ্গলে পরিপূর্ণ। জায়গায় জায়গায় বন এত ঘন যে, ঘোড়ার গায়ে ডালপালা ঠেকে। ফুলকিয়া বইহার যেখানে নামিয়া গিয়া সমতল ভূমির সহিত মিশিল, চানন্ বলিয়া একটি পাহাড়ি নদী সেখানে উপলখণ্ডের উপর দিয়া ঝিরঝির করিয়া বহিতেছে, বর্ষাকালে সেখানে জল খুব গভীর-শীতকালে এখন তত জল নাই।লবটুলিয়ায় এই প্রথম আসিলাম। অতি ক্ষুদ্র এক খড়ের ঘর, তার মেজে জমির সঙ্গে সমতল, ঘরের বেড়া পর্যন্ত শুকনো কাশের, বনঝাউয়ের ডালের পাতা দিয়া বাঁধা। সন্ধ্যার কিছু পূর্বে সেখানে পৌঁছিলাম-এত শীত যেখানে থাকি সেখানে নাই, শীতে জমিয়া যাইবার উপক্রম হইলাম বেলা না পড়িতেই।সিপাহীরা বনের ডালপাতা জ্বালাইয়া আগুন করিল, সেই আগুনের ধারে ক্যাম্প-চেয়ারে বসিলাম, অন্য সবাই গোল হইয়া আগুনের চারিধারে বসিল।কোথা হইতে সের পাঁচেক একটা রুই মাছ পাটোয়ারী আনিয়াছিল, এখন কথা উঠিল, রান্না করিবে কে? আমি সঙ্গে পাচক আনি নাই। নিজেও রান্না করিতে জানি না। আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিবার জন্য সাত-আটজন লবটুলিয়াতে অপেক্ষা করিতেছিল-তাহাদের মধ্যে কণ্টুমিশ্র নামে এক মৈথিল ব্রাহ্মণকে পাটোয়ারী রান্নার জন্য নিযুক্ত করিল।পাটোয়ারীকে বলিলাম-এ-সব লোকেই কি ইজারা ডাকবে?পাটোয়ারী বলিল-না হুজুর। ওরা খাবার লোভে এসেছে। আপনার আসবার নাম শুনে আজ দু-দিন ধরে কাছারিতে এসে বসে আছে। এদেশের লোকের ওই রকম অভ্যেস। আরো অনেকে বোধ হয় কাল আসবে।এমন কথা কখনো শুনি নাই। বলিলাম- সে কি! আমি তো নিমন্ত্রণ করি নি এদের?-হুজুর, এরা বড় গরিব; ভাত জিনিসটা খেতে পায় না। কলাইয়ের ছাতু, মকাইয়ের ছাতু, এই এরা বারোমাস খায়। ভাত খেতে পাওয়াটা এরা ভোজের সমান বিবেচনা করে। আপনি আসছেন, ভাত খেতে পাবে এখানে, সেই লোভে সব এসেছে। দেখুন না আরো কত আসে।বাংলা দেশের লোকে বড় বেশি সভ্য হইয়া গিয়াছে ইহাদের তুলনায়, মনে হইল। কেন জানি না, এই অন্নভোজনলোলুপ সরল ব্যক্তিগুলিকে আমার সে-রাত্রে এত ভালো লাগিল! আগুনের চারিধারে বসিয়া তাহারা নিজেদের মধ্যে গল্প করিতেছিল, আমি শুনিতেছিলাম। প্রথমে তাহারা আমার আগুনে বসিতে চাহে নাই আমার প্রতি সম্মানসূচক দূরত্ব বজায় রাখিবার জন্য-আমি তাহাদের ডাকিয়া আনিলাম। কণ্টুমিশ্র কাছে বসিয়াই আসান কাঠের ডালপালা জ্বালাইয়া মাছ রাঁধিতেছে-ধুনা পুড়াইবার মতো সুগন্ধ বাহির হইতেছে ধোঁয়া হইতে-আগুনের কুণ্ডের বাহিরে গেলে মনে হয়, যেন আকাশ হইতে বরফ পড়িতেছে-এত শীত!খাওয়াদাওয়া হইতে রাত হইয়া গেল অনেক; কাছারিতে যত লোক ছিল, সকলেই খাইল। তারপর আবার আগুনের ধারে গোল হইয়া বসা গেল। শীতে মনে হইতেছে শরীরের রক্ত পর্যন্ত জমিয়া যাইবে। ফাঁকা বলিয়াই শীত বোধ হয় এত বেশি, কিংবা বোধ হয় হিমালয় বেশি দূর নয় বলিয়া।আগুনের ধারে আমরা সাত-আটজন লোক, সামনে ছোট ছোট দুখানি খড়ের ঘর। একখানিতে থাকিব আমি, আর একখানিতে বাকি এতগুলি লোক। আমাদের চারিদিকে ঘিরিয়া অন্ধকার বন ও প্রান্তর, মাথার উপরে নক্ষত্র-ছড়ানো দূরপ্রসারী অন্ধকার আকাশ। আমার বড় অদ্ভুত লাগিল, যেন চিরপরিচিত পৃথিবী হইতে নির্বাসিত হইয়া মহাশূন্যে এক গ্রহে অন্য এক অজ্ঞাত রহস্যময় জীবনধারার সহিত জড়িত হইয়া পড়িয়াছি।একজন ত্রিশ-বত্রিশ বছরের লোক এ-দলের মধ্যে আমার মনোযোগকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করিয়াছিল। লোকটির নাম গনোরী তেওয়ারী; শ্যামবর্ণ দোহারা চেহারা, মাথায় বড় চুল, কপালে দুটি লম্বা ফোঁটা কাটা, এই শীতে গায়ে একখানা মোটা চাদর ছাড়া আর কিছু নাই, এ-দেশের রীতি অনুযায়ী গায়ে একটা মেরজাই থাকা উচিত ছিল, তা পর্যন্ত নাই। অনেকক্ষণ হইতে আমি লক্ষ্য করিতেছিলাম, সে সকলের দিকে কেমন কুণ্ঠিতভাবে চাহিতেছিল, কারো কথায় কোনো প্রতিবাদ করিতেছিল না, অথচ কথা যে সে কম বলিতেছিল তা নয়।আমার প্রতি কথার উত্তরে কেবল সে বলে-হুজুর।এদেশের লোকে যখন কোনো মান্য ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তির কথা মানিয়া লয়, তখন কেবল মাথা সামনের দিকে অল্প ঝাঁকাইয়া সসম্ভ্রমে বলে-হুজুর।গনোরীকে বলিলাম-তুমি থাকো কোথায়, তেওয়ারীজি?আমি যে তাহাকে সরাসরি প্রশ্ন করিব, এতটা সম্মান যেন তাহার পক্ষে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত, এভাবে সে আমার দিকে চাহিল। বলিল-ভীমদাসটোলা, হুজুর।তারপর সে তাহার জীবনের ইতিহাস বর্ণনা করিয়া গেল, একটানা নয়, আমার প্রশ্নের উত্তরে টুকরা টুকরা ভাবে।গনোরী তেওয়ারীর বয়স যখন বারো বছর, তার বাপ তখন মারা যায়। এক বৃদ্ধা পিসিমা তাহাকে মানুষ করে, সে পিসিমাও বাপের মৃত্যুর বছর-পাঁচ পরে যখন মারা গেলেন, গনোরী তখন জগতে ভাগ্য অন্বেষণে বাহির হইল। কিন্তু তাহার জগৎ পূর্বে পূর্ণিয়া শহর, পশ্চিমে ভাগলপুর জেলার সীমানা, দক্ষিণে এই নির্জন অরণ্যময় ফুলকিয়া বইহার, উত্তরে কুশী নদী-ইহারই মধ্যে সীমাবদ্ধ। ইহারই মধ্যে গ্রামে গ্রামে গৃহস্থের দুয়ারে ফিরিয়া কখনো ঠাকুরপূজা করিয়া, কখনো গ্রাম্য পাঠশালায় পণ্ডিতি করিয়া কায়ক্লেশে নিজের আহারের জন্য কলাইয়ের ছাতু ও চীনা ঘাসের দানার রুটির সংস্থান করিয়া আসিয়াছে। সম্প্রতি মাস দুই চাকুরি নাই, পর্বতা গ্রামের পাঠশালা উঠিয়া গিয়াছে, ফুলকিয়া বইহারের দশ হাজার বিঘা অরণ্যময় অঞ্চলে লোকের বস্তি নাই-এখানে যে মহিষপালকের দল মহিষ চরাইতে আনে জঙ্গলে, তাহাদের বাথানে বাথানে ঘুরিয়া খাদ্যভিক্ষা করিয়া বেড়াইতেছিল-আজ আমার আসিবার খবর পাইয়া অনেকের সঙ্গে এখানে আসিয়াছে।আসিয়াছে কেন, সে কথা আরো চমৎকার।-এখানে এত লোক এসেছে কেন তেওয়ারীজি?-হুজুর, সবাই বললে ফুলকিয়ার কাছারিতে ম্যানেজার এসেছেন, সেখানে গেলে ভাত খেতে পাওয়া যাবে, তাই ওরা এল, ওদের সঙ্গে আমিও এলাম।-ভাত এখানকার লোকে কি খেতে পায় না?-কোথায় পাবে হুজুর। নউগচ্ছিয়ায় মাড়োয়ারীরা রোজ ভাত খায়, আমি নিজে আজ ভাত খেলাম বোধ হয় তিন মাস পরে। গত ভাদ্রমাসের সংক্রান্তিতে রাসবিহারী সিং রাজপুতের বাড়ি নেমন্তন্ন ছিল, সে বড়লোক, ভাত খাইয়েছিল। তারপর আর খাই নি।যতগুলি লোক আসিয়াছিল, এই ভয়ানক শীতে কাহারো গাত্রবস্ত্র নাই, রাত্রে আগুন পোহাইয়া রাত কাটায়। শেষ-রাত্রে শীত যখন বেশি পড়ে, আর ঘুম হয় না শীতের চোটে-আগুনের খুব কাছে ঘেঁষিয়া বসিয়া থাকে ভোর পর্যন্ত।কেন জানি না, ইহাদের হঠাৎ এত ভালো লাগিল! ইহাদের দারিদ্র্য, ইহাদের সারল্য, কঠোর জীবন সংগ্রামে ইহাদের যুঝিবার ক্ষমতা-এই অন্ধকার আরণ্যভূমি ও হিমবর্ষী মুক্ত আকাশ বিলাসিতার কোমল পুষ্পাস্তৃত পথে ইহাদের যাইতে দেয় নাই, কিন্তু ইহাদিগকে সত্যকার পুরুষমানুষ করিয়া গড়িয়াছে। দুটি ভাত খাইতে পাওয়ার আনন্দে যারা ভীমদাসটোলা ও পর্বতা হইতে ন’মাইল পথ হাঁটিয়া আসিয়াছে বিনা নিমন্ত্রণে-তাহাদের মনের আনন্দ গ্রহণ করিবার শক্তি কত সতেজ ভাবিয়া বিস্মিত হইলাম।অনেক রাত্রে কিসের শব্দে ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল-শীতে মুখ বাহির করাও যেন কষ্টকর, এমন যে শীত এখানে তা না-জানার দরুন উপযুক্ত গরম কাপড় ও লেপ-তোশক আনি নাই। কলিকাতায় যে-কম্বল গায়ে দিতাম সেখানাই আনিয়াছিলাম-শেষরাত্রে সে যেন ঠাণ্ডা জল হইয়া যায় প্রতিদিন। যে-পাশে শুইয়া থাকি, শরীরের গরমে সে-দিকটা তবুও থাকে এক রকম, অন্য কাতে পাশ ফিরিতে গিয়া দেখি বিছানা কন্কন্ করিতেছে সে-পাশে-মনে হয় যেন ঠাণ্ডা পুকুরের জলে পৌষ মাসের রাত্রে ডুব দিলাম। পাশেই জঙ্গলের মধ্যে কিসের যেন সম্মিলিত পদশব্দ- কাহারা যেন দৌড়িতেছে-গাছপালা, শুকনো বনঝাউয়ের গাছ মট্মট্ শব্দে ভাঙিয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়িতেছে।কি ব্যাপারখানা, কিছু বুঝিতে না পারিয়া সিপাহী বিষ্ণুরাম পাঁড়ে ও স্কুলমাস্টার গনোরী তেওয়ারীকে ডাক দিলাম। তাহারা নিদ্রাজড়িত চোখে উঠিয়া বসিল-কাছারির মেঝেতে যে-আগুন জ্বালা হইয়াছিল, তাহারই শেষ দীপ্তিটুকুতে ওদের মুখে আলস্যসম্ভ্রম ও নিদ্রালুতার ভাব ফুটিয়া উঠিল। গনোরী তেওয়ারী কান পাতিয়া একটু শুনিয়াই বলিল-কিছু না হুজুর, নীলগাইয়ের জেরা দৌড়চ্ছে জঙ্গলে-কথা শেষ করিয়াই সে নিশ্চিন্ত মনে পাশ ফিরিয়া শুইতে যাইতেছিল, জিজ্ঞাসা করিলাম-নীলগাইয়ের দল হঠাৎ এত রাত্রে অমন দৌড়ুবার কারণ কি?বিষ্ণুরাম পাঁড়ে আশ্বাস দিবার সুরে বলিল-হয়তো কোনো জানোয়ারে তাড়া করে থাকবে হুজুর-এ ছাড়া আর কি।-কি জানোয়ার?-কি আর জানোয়ার হুজুর, জঙ্গলের জানোয়ার। শের হতে পারে-নয় তো ভালু-যে-ঘরে শুইয়া আছি, নিজের অজ্ঞাতসারে তাহার কাশডাঁটায় বাঁধা আগড়ের দিকে নজর পড়িল। সে আগড়ও এত হালকা যে, বাহির হইতে একটি কুকুরে ঠেলা মারিলেও তাহা ঘরের মধ্যে উল্টাইয়া পড়ে-এমন অবস্থায় ঘরের সামনেই জঙ্গলে নিস্তব্ধ নিশীথরাত্রের বাঘ বা ভালুকে বন্য নীলগাইয়ের দল তাড়া করিয়া লইয়া চলিয়াছে-এ সংবাদটিতে যে বিশেষ আশ্বস্ত হইলাম না তাহা বলাই বাহুল্য।একটু পরেই ভোর হইয়া গেল।দিন যতই যাইতে লাগিল, জঙ্গলের মোহ ততই আমাকে ক্রমে পাইয়া বসিল। এর নির্জনতা ও অপরাহ্নের সিদুঁর-ছড়ানো বনঝাউয়ের জঙ্গলের কি আকর্ষণ আছে বলিতে পারি না- আজকাল ক্রমশ মনে হয় এই দিগন্তব্যাপী বিশাল বনপ্রান্তর ছাড়িয়া, ইহার রোদপোড়া মাটির তাজা সুগন্ধ, এই স্বাধীনতা, এই মুক্তি ছাড়িয়া কলিকাতার গোলমালের মধ্যে আর ফিরিতে পারিব না!এ মনের ভাব একদিনে হয় নাই। কত রূপে কত সাজেই যে বন্যপ্রকৃতি আমার মুগ্ধ অনভ্যস্ত দৃষ্টির সম্মুখে আসিয়া আমায় ভুলাইল!-কত সন্ধ্যা আসিল অপূর্ব রক্তমেঘের মুকুট মাথায়, দুপুরের খরতর রৌদ্র আসিল উন্মাদিনী ভৈরবীর বেশে, গভীর নিশীথে জ্যোৎস্নাবরণী সুরসুন্দরীর সাজে হিমস্নিগ্ধ বনকুসুমের সুবাস মাখিয়া, আকাশভরা তারার মালা গলায়-অন্ধকার রজনীতে কালপুরুষের আগুনের খড়গ হাতে দিগ্বিদিক ব্যাপিয়া বিরাট কালীমূর্তিতে।একদিনের কথা জীবনে কখনো ভুলিব না। মনে আছে সেদিন দোলপূর্ণিমা। কাছারির সিপাহীরা ছুটি চাহিয়া লইয়া সারাদিন ঢোল বাজাইয়া হোলি খেলিয়াছে। সন্ধ্যার সময়েও নাচগানের বিরাম নাই দেখিয়া আমি নিজের ঘরে টেবিলে আলো জ্বালাইয়া অনেক রাত পর্যন্ত হেড আপিসের জন্য চিঠিপত্র লিখিলাম। কাজ শেষ হইতেই ঘড়ির দিকে চাহিয়া দেখি, রাত প্রায় একটা বাজে। শীতে জমিয়া যাইবার উপক্রম হইয়াছি। একটা সিগারেট ধরাইয়া জানালা দিয়া বাহিরের দিকে উঁকি মারিয়া মুগ্ধ ও বিস্মিত হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম। যে-জিনিসটা আমাকে মুগ্ধ করিল তাহা পূর্ণিমা-নিশীথিনীর অবর্ণনীয় জ্যোৎস্না।হয়তো যতদিন আসিয়াছি, শীতকাল বলিয়া গভীর রাত্রে কখনো বাহিরে আসি নাই কিংবা অন্য যে কোনো কারণেই হউক, ফুলকিয়া বইহারের পরিপূর্ণ জ্যোৎস্নারাত্রির রূপ এই আমি প্রথম দেখিলাম।দরজা খুলিয়া বাহিরে আসিয়া দাঁড়াইলাম। কেহ কোথাও নাই, সিপাহীরা সারাদিন আমোদ প্রমোদের পরে ক্লান্ত দেহে ঘুমাইয়া পড়িয়াছে। নিঃশব্দ অরণ্যভূমি, নিস্তব্ধ জনহীন নিশীথরাত্রি। সে জ্যোৎস্নারাত্রির বর্ণনা নাই। কখনো সে-রকম ছায়াবিহীন জ্যোৎস্না জীবনে দেখি নাই। এখানে খুব বড় বড় গাছ নাই, ছোটখাটো বনঝাউ ও কাশবন-তাহাতে তেমন ছায়া হয় না। চক্চকে সাদা বালি মিশানো জমি ও শীতের রৌদ্রে অর্ধশুষ্ক কাশবনে জ্যোৎস্না পড়িয়া এমন এক অপার্থিব সৌন্দর্যের সৃষ্টি করিয়াছে, যাহা দেখিলে মনে কেমন ভয় হয়। মনে কেমন যেন একটা উদাস বাঁধনহীন মুক্তভাব-মন হু-হু করিয়া ওঠে, চারিধারে চাহিয়া সেই নীরব নিশীথরাত্রে জ্যোৎস্নাভরা আকাশতলে দাঁড়াইয়া মনে হইল এক অজানা পরীরাজ্যে আসিয়া পড়িয়াছি-মানুষের কোনো নিয়ম এখানে খাটিবে না। এইসব জনহীন স্থান গভীর রাত্রে জ্যোৎস্নালোকে পরীদের বিচরণভূমিতে পরিণত হয়, আমি অনধিকার প্রবেশ করিয়া ভালো করি নাই।তাহার পর ফুলকিয়া বইহারের জ্যোৎস্নারাত্রি কতবার দেখিয়াছি-ফাল্গুনের মাঝামাঝি যখন দুধ্লি ফুল ফুটিয়া সমস্ত প্রান্তরে যেন রঙিন ফুলের গালিচা বিছাইয়া দেয়, তখন কত জ্যোৎস্নাশুভ্র রাত্রে বাতাসে দুধ্লি ফুলের মিষ্ট সুবাস প্রাণ ভরিয়া আঘ্রাণ করিয়াছি-প্রত্যেক বারেই মনে হইয়াছে জ্যোৎস্না যে এত অপরূপ হইতে পারে, মনে এমন ভয়মিশ্রিত উদাস ভাব আনিতে পারে, বাংলা দেশে থাকিতে তাহা তো কোনোদিন ভাবিও নাই! ফুলকিয়ার সে জ্যোৎস্নারাত্রির বর্ণনা দিবার চেষ্টা করিব না, সেরূপ সৌন্দর্যালোকের সহিত প্রত্যক্ষ পরিচয় যতদিন না হয় ততদিন শুধু কানে শুনিয়া বা লেখা পড়িয়া তাহা উপলব্ধি করা যাইবে না-করা সম্ভব নয়। অমন মুক্ত আকাশ, অমন নিস্তব্ধতা, অমন নির্জনতা, অমন দিগ্দিগন্ত-বিসর্পিত বনানীর মধ্যেই শুধু অমনতর রূপলোক ফুটিয়া ওঠে। জীবনে একবারও সে জ্যোৎস্নারাত্রি দেখা উচিত; যে না দেখিয়াছে, ভগবানের সৃষ্টির একটি অপূর্ব রূপ তাহার নিকট চির-অপরিচিত রহিয়া গেল।একদিন ডিহি আজমাবাদের সার্ভে-ক্যাম্প হইতে ফিরিবার সময় সন্ধ্যার মুখে বনের মধ্যে পথ হারাইয়া ফেলিলাম। বনের ভূমি সর্বত্র সমতল নয়, কোথাও উঁচু জঙ্গলাবৃত বালিয়াড়ি টিলা, তার পরই দুটি টিলার মধ্যবর্তী ছোটখাটো উপত্যকা। জঙ্গলের কিন্তু কোথাও কোনো বিরাম নাই-টিলার মাথায় উঠিয়া চারিদিকে চাহিয়া দেখিলাম যদি কোনো দিকে কাছারির মহাবীরের ধ্বজার আলো দেখা যায়-কোনো দিকে আলোর চিহ্নও নাই-শুধু উঁচুনিচু টিলা ও ঝাউবন আর কাশবন-মাঝে মাঝে শাল ও আসান গাছের বনও আছে। দুই ঘণ্টা ঘুরিয়াও যখন জঙ্গলের কূলকিনারা পাইলাম না, তখন হঠাৎ মনে পড়িল নক্ষত্র দেখিয়া দিক ঠিক করি না কেন। গ্রীষ্মকাল, কালপুরুষ দেখি প্রায় মাথার উপর রহিয়াছে। বুঝিতে পারিলাম না কোন্দিক হইতে আসিয়া কালপুরুষ মাথার উপর উঠিয়াছে-সপ্তর্ষিমণ্ডল খুঁজিয়া পাইলাম না। সুতরাং নক্ষত্রের সাহায্যে দিক্-নিরূপণের আশা পরিত্যাগ করিয়া ঘোড়াকে ইচ্ছামতো ছাড়িয়া দিলাম। মাইল দুই গিয়া জঙ্গলের মধ্যে একটা আলো দেখা গেল। আলো লক্ষ্য করিয়া সেখানে উপস্থিত হইয়া দেখিলাম, জঙ্গলের মধ্যে কুড়ি বর্গহাত আন্দাজ পরিষ্কার স্থানে একটা খুব নিচু ঘাসের খুপরি। কুঁড়ের সামনে গ্রীষ্মের দিনেও আগুন জ্বালানো। আগুনের নিকট হইতে একটু দূরে একটা লোক বসিয়া কি করিতেছে।আমার ঘোড়ার পায়ের শব্দ শুনিয়া লোকটি চমকিয়া উঠিয়া দাঁড়াইয়া বলিল-কে? তার পরেই আমায় চিনিতে পারিয়া তাড়াতাড়ি কাছে আসিল ও আমাকে খুব খাতির করিয়া ঘোড়া হইতে নামাইল।পরিশ্রান্ত হইয়াছিলাম, প্রায় ছ-ঘণ্টা আছি ঘোড়ার উপর, কারণ সার্ভে ক্যাম্পেও আমিনের পিছু পিছু ঘোড়ায় টো টো করিয়া জঙ্গলের মধ্যে ঘুরিয়াছি। লোকটার প্রদত্ত একটা ঘাসের চেটাইয়ে বসিলাম। জিজ্ঞাসা করিলাম-তোমার নাম কি? লোকটা বলিল-গনু মাহাতো, জাতি গাঙ্গোতা। এ অঞ্চলে গাঙ্গোতা জাতির উপজীবিকা চাষবাস ও পশুপালন, তাহা আমি এতদিনে জানিয়াছিলাম-কিন্তু এ লোকটা এই জনহীন গভীর বনের মধ্যে একা কি করে?বলিলাম-তুমি এখানে কি কর? তোমার বাড়ি কোথায়?– হুজুর, মহিষ চরাই। আমার ঘর এখান থেকে দশ ক্রোশ উত্তরে ধরমপুর, লছমনিয়াটোলা।– নিজের মহিষ? কতগুলো আছে?লোকটা গর্বের সুরে বলিল- পাঁচটা মহিষ আছে হুজুর।পাঁচটা মহিষ। দস্তুরমতো অবাক হইলাম। দশ ক্রোশ দূরের গ্রাম হইতে পাঁচটা মাত্র মহিষ সম্বল করিয়া লোকটি এই বিজন বনের মধ্যে মহিষচরির খাজনা দিয়া একা খুপরি বাঁধিয়া মহিষ চরায়-দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এই ছোট্ট খুপরিটাতে কি করিয়া সময় কাটায়-কলিকাতা হইতে নূতন আসিয়াছি, শহরের থিয়েটার-বায়োস্কোপে লালিত যুবক আমি- বুঝিতে পারিলাম না।কিন্তু এদেশের অভিজ্ঞতা আরো বেশি হইলে বুঝিয়াছিলাম কেন গনু মাহাতো ওভাবে থাকে। তাহার অন্য কোনো কারণ নাই ইহা ছাড়া যে, গনু মাহাতোর জীবনের ধারণাই এইরূপ। যখন তাহার পাঁচটি মহিষ তখন তাহাদের চরাইতে হইবে, এবং যখন চরাইতে হইবে, তখন জঙ্গলে আছে, কুঁড়ে বাঁধিয়া একা থাকিতেই হইবে। এ অত্যন্ত সাধারণ কথা, ইহার মধ্যে আশ্চর্য হইবার কি আছে!গনু কাঁচা শালপাতায় একটা লম্বা পিকা বা চুরুট তৈরি করিয়া আমার হাতে সসম্ভ্রমে দিয়া আমায় অভ্যর্থনা করিল। আগুনের আলোতে উহার মুখ দেখিলাম-বেশ চওড়া কপাল, উঁচু নাক, রং কালো- মুখশ্রী সরল, শান্ত চোখের দৃষ্টি। বয়স ষাটের উপর হইবে, মাথার চুল একটিও কালো নাই। কিন্তু শরীর এমন সুগঠিত যে, এই বয়সেও প্রত্যেকটি মাংসপেশী আলাদা করিয়া গুনিয়া লওয়া যায়।গনু আগুনে আরো বেশি কাঠ ফেলিয়া দিয়া নিজেও একটি শালপাতার পিকা ধরাইল। আগুনের আভায় খুপরির মধ্যে এক-আধখানা পিতলের বাসন চক্চক্ করিতেছে। আগুনের কুণ্ডের মণ্ডলীর বাহিরে ঘোরতর অন্ধকার ও ঘন বন। বলিলাম-গনু, একা এখানে থাক, জন্তু-জানোয়ারের ভয় করে না? গনু বলিল-ভয় ডর করলে আমাদের কি চলে হুজুর? আমাদের যখন এই ব্যবসা! সেদিন তো রাত্রে আমার খুপরির পেছনে বাঘ এসেছিল। মহিষের দুটো বাচ্চা আছে, ওদের ওপর তাক্। শব্দ শুনে রাত্রে উঠে টিন বাজাই; মশাল জ্বালি, চিৎকার করি! রাত্রে আর ঘুম হোলো না হুজুর; শীতকালে তো সারারাত এই বনে ফেউ ডাকে।-খাও কি এখানে? দোকানটোকান তো নেই, জিনিসপত্র পাও কোথায়? চালডাল--হুজুর, দোকানে জিনিস কেনবার মতো পয়সা কি আমাদের আছে, না আমরা বাঙালি বাবুদের মতো ভাত খেতে পাই? এই জঙ্গলের পেছনে আমার দু-বিঘে খেড়ী ক্ষেত আছে। খেড়ীর দানা সিদ্ধ, আর জঙ্গলে বাথুয়া শাক হয়, তাই সিদ্ধ, আর একটু লুন, এই খাই। ফাগুন মাসে জঙ্গলে গুড়মী ফল ফলে, লুন দিয়ে কাঁচা খেতে বেশ লাগে- লতানে গাছ, ছোট ছোট কাঁকুড়ের মতো ফল হয়; সে সময় এক মাস এ-অঞ্চলের যত গরিব লোক গুড়মী ফল খেয়ে কাটিয়ে দেয়। দলে দলে ছেলেমেয়ে আসবে জঙ্গলের গুড়মী তুলতে।জিজ্ঞাসা করিলাম-রোজ রোজ খেড়ীর দানা সিদ্ধ আর বাথুয়া শাক ভালো লাগে?– কি করব হুজুর, আমরা গরিব লোক, বাঙালি বাবুদের মতো ভাত খেতে পাব কোথায়? ভাত এ অঞ্চলের মধ্যে কেবল রাসবিহারী সিং আর নন্দলাল পাঁড়ে খায় দুবেলা। সারাদিন মহিষের পেছনে ভূতের মতন খাটি হুজুর, সন্ধের সময় ফিরি যখন, তখন এত ক্ষিদে পায় যে, যা পাই খেতে তাই ভালো লাগে।গনুকে বলিলাম-কলকাতা শহর দেখেছ গনু?– না হুজুর। কানে শুনেছি। ভাগলপুর শহরে একবার গিয়েছি, বড় ভারি শহর। ওখানে হাওয়ার গাড়ি দেখেছি, বড় তাজ্জব চিজ হুজুর। ঘোড়া নেই, কিছু নেই, আপনা-আপনি রাস্তা দিয়া চলছে।এই বয়সে উহার স্বাস্থ্য দেখিয়া অবাক হইলাম। সাহসও যে আছে ইহা মনে মনে স্বীকার করিতে হইল।গনুর জীবিকানির্বাহের একমাত্র অবলম্বন মহিষ কয়টি। তাদের দুধ অবশ্য এ-জঙ্গলে কে কিনিবে, দুধ হইতে মাখন তুলিয়া ঘি করে ও দু-তিন মাসের ঘি একত্রে জমাইয়া ন-মাইল দূরবর্তী ধরমপুরের বাজারে মাড়োয়ারীদের নিকট বিক্রয় করিয়া আসে। আর থাকিবার মধ্যে ওই দু-বিঘা খেড়ী অর্থাৎ শ্যামাঘাসের ক্ষেত, যার দানা সিদ্ধ এ-অঞ্চলের প্রায় সকল গরিব লোকেরই একটা প্রধান খাদ্য। গনু সে-রাত্রে আমাকে কাছারিতে পৌঁছাইয়া দিল, কিন্তু গনুকে আমার এত ভালো লাগিল যে, কতবার শান্ত বৈকালে তাহার খুপরির সামনে আগুন পোহাইতে পোহাইতে গল্প করিয়া কাটাইয়াছি। ওদেশের নানারূপ তথ্য গনুর কাছে যেরূপ শুনিয়াছিলাম, অত কেউ দিতে পারে নাই।গনুর মুখে কত অদ্ভুত কথা শুনিতাম। উড়ুক্কু সাপের কথা, জীবন্ত পাথর ও আঁতুড়ে ছেলের হাঁটিয়া বেড়াইবার কথা, ইত্যাদি। ওই নির্জন জঙ্গলের পারিপার্শ্বিক অবস্থার সঙ্গে গনুর সে-সব গল্প অতি উপাদেয় ও অতি রহস্যময় লাগিত- আমি জানি কলকাতা শহরে বসিয়া সে-সব গল্প শুনিলে তাহা আজগুবী ও মিথ্যা মনে হইতে বাধ্য। যেখানে-সেখানে যে-কোনো গল্প শোনা চলে না, গল্প শুনিবার পটভূমি ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর উহার মাধুর্য যে কতখানি নির্ভর করে, তাহা গল্পপ্রিয় ব্যক্তি মাত্রেই জানেন। গনুর সকল অভিজ্ঞতার মধ্যে আমার আশ্চর্য বলিয়া মনে হইয়াছিল বন্যমহিষের দেবতা টাঁড়বারোর কথা।কিন্তু, যেহেতু এই গল্পের একটি অদ্ভুত উপসংহার আছে-সেজন্য সে-কথা এখন না বলিয়া যথাস্থানে বলিব। এখানে বলিয়া রাখি, গনু আমাকে যে-সব গল্প বলিত-তাহা রূপকথা নহে, তাহার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বিষয়। গনু জীবনকে দেখিয়াছে তবে অন্যভাবে। অরণ্য-প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আজীবন কাটাইয়া সে অরণ্য-প্রকৃতির সম্বন্ধে একজন রীতিমতো বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি। তাহার কথা হঠাৎ উড়াইয়া দেওয়া চলে না। মিথ্যা বানাইয়া বলিবার মতো কল্পনাশক্তিও গনুর আছে বলিয়া আমার মনে হয় নাই।
গ্রীষ্মকাল পড়িতে গ্র্যাণ্ট সাহেবের বটগাছের মাথায় পীরপৈঁতি পাহাড়ের দিক হইতে একদল বক উড়িয়া আসিয়া বসিল, দূর হইতে মনে হয় যেন বটগাছের মাথা সাদা থোকা থোকা ফুলে ভরিয়া গিয়াছে।একদিন অর্ধশুষ্ক কাশের বনের ধারে টেবিল-চেয়ার পাতিয়া কাজ করিতেছি, মুনেশ্বর সিং সিপাহী আসিয়া বলিল-হুজুর, নন্দলাল ওঝা গোলাওয়ালা আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।একটু পরে প্রায় পঞ্চাশ বছরের একটি বৃদ্ধ ব্যক্তি আমার সামনে আসিয়া সেলাম করিল ও আমার নির্দেশ মতো একটা টুলের উপর বসিল। বসিয়াই সে একটি পশমের থলে বাহির করিল। তাহার পর থলেটির ভিতর হইতে খুব ছোট একখানি জাঁতি ও দুইটি সুপারি বাহির করিয়া সুপারি কাটিতে আরম্ভ করিল। পরে কাটা সুপারি হাতে রাখিয়া দুই হাত একত্র করিয়া আমার সামনে মেলিয়া ধরিয়া সসম্ভ্রমে বলিল- সুপারি লিজিয়ে হুজুর।সুপারি ও-ভাবে খাওয়া অভ্যাস না-থাকিলেও ভদ্রতার খাতিরে লইলাম। জিজ্ঞাসা করিলাম- কোথা হতে আসা হচ্ছে, কি কাজ?তাহার উত্তরে লোকটি বলিল, তাহার নাম নন্দলাল ওঝা, মৈথিল ব্রাহ্মণ। জঙ্গলের উত্তর-পূর্ব কোণে কাছারি হইতে প্রায় এগার মাইল দূরে সুংঠিয়া-দিয়ারাতে তাহার বাড়ি। বাড়িতে চাষবাস আছে, কিছু সুদের কারবারও আছে-সে আসিয়াছে তার বাড়িতে আগামী পূর্ণিমার দিন আমায় নিমন্ত্রণ করিতে-আমি কি তাহার বাড়িতে দয়া করিয়া পদধূলি দিতে রাজি আছি? এ সৌভাগ্য কি তাহার হইবে?এগার মাইল দূরে এই রৌদ্রে নিমন্ত্রণ খাইতে যাইবার লোভ আমার ছিল না- কিন্তু নন্দলাল ওঝা নিতান্ত পীড়াপীড়ি করাতে অগত্যা রাজি হইলাম- তা ছাড়া এদেশের গৃহস্থসংসার সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিবার লোভও সংবরণ করিতে পারিলাম না।পূর্ণিমার দিন দুপুরের পরে দীর্ঘ কাশের জঙ্গলের মধ্যে দিয়া কাহাদের একটি হাতি আসিতেছে দেখা গেল। হাতি কাছারিতে আসিলে মাহুতের মুখে শুনিলাম হাতিটি নন্দলাল ওঝার নিজের- আমাকে লইয়া যাইতে পাঠাইয়া দিয়াছে। হাতি পাঠাইবার আবশ্যক ছিল না- কারণ আমার নিজের ঘোড়ায় অপেক্ষাকৃত অল্প সময়ে পৌঁছিতে পারিতাম।যাহাই হউক, হাতিতে চড়িয়াই নন্দলালের বাড়িতে রওনা হইলাম। সবুজ বনশীর্ষ আমার পায়ের তলায়, আকাশ যেন আমার মাথায় ঠেকিয়াছে- দূর, দূর-দিগন্তের নীল শৈলমালার রেখা বনভূমিতে ঘিরিয়া যেন মায়ালোক রচনা করিয়াছে- আমি সে-মায়ালোকের অধিবাসী- বহু দূর স্বর্গের দেবতা। কত মেঘের তলায় তলায় পৃথিবীর কত শ্যামল বনভূমির উপরকার নীল বায়ুমণ্ডল ভেদ করিয়া যেন আমার অদৃশ্য যাতায়াত।পথে চাম্টার বিল পড়িল, শীতের শেষেও সিল্লী আর লাল হাঁসের ঝাঁকে ভর্তি। আর একটু গরম পড়িলেই উড়িয়া পলাইবে। মাঝে মাঝে নিতান্ত দরিদ্র পল্লী। ফণীমনসা-ঘেরা তামাকের ক্ষেত ও খোলায় ছাওয়া দীনকুটির।সুংঠিয়া গ্রামে হাতি ঢুকিলে দেখা গেল পথের দু-ধারে সারবন্দি লোক দাঁড়াইয়া আছে আমায় অভ্যর্থনা করিবার জন্য। গ্রামে ঢুকিয়া অল্প দূর পরেই নন্দলালের বাড়ি।খোলায় ছাওয়া মাটির ঘর আট-দশখানা- সবই পৃথক পৃথক, প্রকাণ্ড উঠানের মধ্যে ইতস্তত ছড়ানো। আমি বাড়িতে ঢুকিতেই দুইবার হঠাৎ বন্দুকের আওয়াজ হইল। চমকাইয়া গিয়াছি- এমন সময়ে সহাস্যমুখে নন্দলাল ওঝা আসিয়া আমায় অভ্যর্থনা করিয়া বাড়িতে লইয়া গিয়া একটা বড়ঘরের দাওয়ায় চেয়ারে বসাইল। চেয়ারখানি এদেশের শিশুকাঠের তৈয়ারি এবং এদেশের গ্রাম্য মিস্ত্রির হাতেই গড়া। তাহার পর দশ-এগার বছরের একটি ছোট মেয়ে আসিয়া আমার সামনে একখানা থালা ধরিল-থালায় গোটাকতক আস্ত পান, আস্ত সুপারি, একটা মধুপর্কের মতো ছোট বাটিতে সামান্য একটু আতর, কয়েকটি শুষ্ক খেজুর; ইহা লইয়া কি করিতে হয় আমার জানা নাই- আমি আনাড়ির মতো হাসিলাম ও বাটি হইতে আঙুলের আগায় একটু আতর তুলিয়া লইলাম মাত্র। মেয়েটিকে দু-একটি ভদ্রতাসূচক মিষ্টকথাও বলিলাম! মেয়েটি থালা আমার সামনে রাখিয়া চলিয়া গেল।তারপর খাওয়ানোর ব্যবস্থা। নন্দলাল যে ঘটা করিয়া খাওয়াইবার ব্যবস্থা করিয়াছে, তাহা আমার ধারণা ছিল না। প্রকাণ্ড কাঠের পিঁড়ির আসন পাতা-সম্মুখে এমন আকারের একখানি পিতলের থালা আসিল, যাহাতে করিয়া আমাদের দেশে দুর্গাপূজার বড় নৈবেদ্য সাজায়। থালায় হাতির কানের মতো পুরী, বাথুয়া শাক ভাজা, পাকা শশার রায়তা, কাঁচা তেঁতুলের ঝোল, মহিষের দুধের দই, পেঁড়া। খাবার জিনিসের এমন অদ্ভুত যোগাযোগ কখনো দেখি নাই। আমায় দেখিবার জন্য উঠানে লোকে লোকারণ্য হইয়া গিয়াছে ও আমার দিকে এমনভাবে চাহিতেছে যে, আমি যেন এক অদৃষ্টপূর্ব জীব। শুনিলাম, ইহারা সকলেই নন্দলালের প্রজা।সন্ধ্যার পূর্বে উঠিয়া আসিবার সময় নন্দলাল একটি ছোট থলি আমার হাতে দিয়া বলিল-হুজুরের নজর। আশ্চর্য হইয়া গেলাম। থলিতে অনেক টাকা, পঞ্চাশের কম নয়। এত টাকা কেহ কাহাকেও নজর দেয় না, তা ছাড়া নন্দলাল আমার প্রজাও নয়। নজর প্রত্যাখ্যান করাও গৃহস্থের পক্ষে নাকি অপমানজনক- সুতরাং আমি থলি খুলিয়া একটা টাকা লইয়া থলিটা তাহার হাতে ফিরাইয়া দিয়া বলিলাম- তোমার ছেলেপুলেদের পেঁড়া খাইতে দিও।নন্দলাল কিছুতেই ছাড়িবে না- আমি সে-কথায় কান না-দিয়াই বাহিরে আসিয়া হাতির পিঠে চড়িলাম।পরদিনই নন্দলাল ওঝা আমার কাছারিতে গেল, সঙ্গে তাহার বড় ছেলে। আমি তাহাদিগকে সমাদর করিলাম- কিন্তু খাইবার প্রস্তাবে তাহারা রাজি হইল না। শুনিলাম মৈথিল ব্রাহ্মণ অন্য ব্রাহ্মণের হস্তের প্রস্তুত কোনো খাবারই খাইবে না। অনেক বাজে কথার পরে নন্দলাল একান্তে আমার নিকট কথা পাড়িল, তাহার বড় ছেলে ফুলকিয়া বইহারের তহসিলদারির জন্য উমেদার- তাহাকে আমায় বহাল করিতে হইবে। আমি বিস্মিত হইয়া বলিলাম- কিন্তু ফুলকিয়ার তহসিলদার তো আছে – সে পোস্ট তো খালি নেই। তাহার উত্তরে নন্দলাল আমাকে চোখ ঠারিয়া ইশারা করিয়া বলিল, হুজুর, মালিক তো আপনি। আপনি মনে করলে কি না হয়?আমি আরো অবাক হইয়া গেলাম। সে কি রকম কথা! ফুলকিয়ার তহসিলদার ভালোই কাজ করিতেছে- তাহাকে ছাড়াইয়া দিব কোন্ অপরাধে?নন্দলাল বলিল- কত রুপেয়া হুজুরকে পান খেতে দিতে হবে বলুন, আমি আজ সাঁজেই হুজুরকে পৌঁছে দেব। কিন্তু আমার ছেলেকে তহসিলদারি দিতে হবেই হুজুরের। বলুন কত, হুজুর। পাঁচ-শ’? এতক্ষণে বেশ বুঝিতে পারিলাম, নন্দলাল যে আমাকে কাল নিমন্ত্রণ করিয়াছিল তাহার প্রকৃত উদ্দেশ্য কি। এদেশের লোক যে এমন ধড়িবাজ, তাহা জানিলে কখনো ওখানে যাই? আচ্ছা বিপদে পড়িয়াছি বটে!নন্দলালকে স্পষ্ট কথা বলিয়াই বিদায় করিলাম। বুঝিলাম নন্দলাল আশা ছাড়িল না।আর একদিন দেখি, ঘন বনের ধারে নন্দলাল আমার অপেক্ষায় দাঁড়াইয়া আছে।কি কুক্ষণেই উহার বাড়িতে নিমন্ত্রণ খাইতে গিয়াছিলাম-দুখানা পুরী খাওয়াইয়া সে যে আমার জীবন এমন অতিষ্ঠ করিয়া তুলিবে-তাহা আগে জানিলে কি উহার ছায়া মাড়াই?নন্দলাল আমাকে দেখিয়া মিষ্টি মোলায়েম হাসিয়া বলিল-নোমোস্কার হুজুর।-হুঁ। তারপর, এখানে কি মনে করে?-হুজুর সবই জানেন। আমি আপনাকে বারো-শ’ টাকা নগদ দেব। আমার ছেলেকে কাজে লাগিয়ে দিন।-তুমি পাগল নন্দলাল? আমি বহাল করবার মালিক নই। যাদের জমিদারি তাদের কাছে দরখাস্ত করতে পারো। তা ছাড়া বর্তমানে যে রয়েছে-তাকে ছাড়ব কোন্ অপরাধে?বলিয়াই বেশি কথা না বাড়াইয়া ঘোড়া ছুটাইয়া দিলাম।ক্রমে আমার কড়া ব্যবহারে নন্দলালকে আমি আমার ও স্টেটের মহা শত্রু করিয়া তুলিলাম। তখনো বুঝি নাই, নন্দলাল কিরূপ ভয়ানক প্রকৃতির মানুষ। ইহার ফল আমাকে ভালো করিয়াই ভুগিতে হইয়াছিল।উনিশ মাইল দূরবর্তী ডাকঘর হইতে ডাক আনা এখানকার এক অতি আবশ্যক ঘটনা। অতদূরে প্রতিদিন লোক পাঠানো চলে না বলিয়া সপ্তাহে দুবার মাত্র ডাকঘরে লোক যাইত। মধ্য-এশিয়ার জনহীন, দুস্তর ও ভীষণ টাক্লামাকান মরুভূমির তাঁবুতে বসিয়া বিখ্যাত পর্যটক সোয়েন হেডিনও বোধ হয় এমনি আগ্রহে ডাকের প্রতীক্ষা করিতেন। আজ আট-নয় মাস এখানে আসিবার ফলে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত এই জনহীন বন-প্রান্তরে সূর্যাস্ত, নক্ষত্ররাজি, চাঁদের উদয়, জ্যোৎস্না ও বনের মধ্যে নীলগাইয়ের দৌড় দেখিতে দেখিতে যে বহির্জগতের সঙ্গে সকল যোগ হারাইয়া ফেলিয়াছি-ডাকের চিঠি কয়েকখানির মধ্য দিয়া আবার তাহার সহিত একটা সংযোগ স্থাপিত হইত।নির্দিষ্ট দিনে জওয়াহিরলাল সিং ডাক আনিতে গিয়াছে-আজ দুপুরে সে আসিবে। আমি ও বাঙালি মুহুরীবাবুটি ঘন ঘন জঙ্গলের দিকে চাহিতেছি। কাছারি হইতে মাইল দেড় দূরে একটা উঁচু ঢিবির উপর দিয়া পথ। ওখানে আসিলে জওয়াহিরলাল সিংকে বেশ স্পষ্ট দেখা যায়।বেলা দুপুর হইয়া গেল। জওয়াহিরলালের দেখা নেই। আমি ঘন ঘন ঘর-বাহির করিতেছি। এখানের আপিসের কাজের সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। বিভিন্ন আমিনের রিপোর্ট দেখা, দৈনিক ক্যাশবই সই করা, সদরের চিঠিপত্রের উত্তর লেখা, পাটোয়ারী ও তহসিলদারের আদায়ের হিসাব-পরীক্ষা, নানাবিধ দরখাস্তের ডিগ্রি-ডিস্মিস্ করা, পূর্ণিয়া মুঙ্গের ভাগলপুর প্রভৃতি স্থানে নানা আদালতে নানাপ্রকার মামলা ঝুলিতেছে-ঐ সকল স্থানের উকিল ও মামলা-তদ্বিরকারকদের রিপোর্ট পাঠ ও তার উত্তর দেওয়া-আরো নানা প্রকার বড় ও খুচরা কাজ প্রতিদিন নিয়ম-মতো না করিলে দু-তিনদিনে এত জমিয়া যায় যে, তখন কাজ শেষ করিতে প্রাণান্ত হইয়া ওঠে। ডাক আসিবার সঙ্গে সঙ্গে আবার একরাশি কাজ আসিয়া পড়ে। শহরের নানা ধরনের চিঠি, নানা ধরনের আদেশ, অমুক জায়গায় যাও, অমুকের সঙ্গে অমুক মহালের বন্দোবস্ত কর, ইত্যাদি।বেলা তিনটার সময় জওয়াহিরলালের সাদা পাগড়ি রৌদ্রে চক্চক্ করিতেছে দেখা গেল। বাঙালি মুহুরীবাবু হাঁকিলেন- ম্যানেজারবাবু, আসুন, ডাকপেয়াদা আসছে- ঐ যে-আপিসের বাহিরে আসিলাম। ইতিমধ্যে জওয়াহিরলাল আবার ঢিবি হইতে নামিয়া জঙ্গলের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িয়াছে। আমি অপেরাগ্লাস আনাইয়া দেখিলাম, দূরে জঙ্গলের মধ্যে দীর্ঘ দীর্ঘ ঘাসের ও বনঝাউয়ের মধ্যে সে আসিতেছে বটে। আর আপিসের কাজে মন বসিল না। সে কি আকুল প্রতীক্ষা! যে জিনিস যত দুষ্প্রাপ্য মানুষের মনের কাছে তাহার মূল্য তত বেশি। এ কথা খুবই সত্য যে, এই মূল্য মানুষের মনগড়া একটি কৃত্রিম মূল্য, প্রার্থিত জিনিসের সত্যকার উৎকর্ষ বা অপকর্ষের সঙ্গে এর কোনো সম্বন্ধ নাই। কিন্তু জগতের অধিকাংশ জিনিসের উপরই একটা কৃত্রিম মূল্য আরোপ করিয়াই তো আমরা তাকে বড় বা ছোট করি।জওয়াহিরলালকে কাছারির সামনে একটা অপরিসর বালুময় নাবাল জমির ও-পারে দেখা গেল। আমি চেয়ার ছাড়িয়া উঠিলাম। মুহুরীবাবু আগাইয়া গেলেন। জওয়াহিরলাল আসিয়া সেলাম করিয়া দাঁড়াইল এবং পকেট হইতে চিঠির তাড়া বাহির করিয়া মুহুরীবাবুর হাতে দিল।আমারও খান-দুই পত্র আছে-অতি পরিচিত হাতের লেখা। চিঠি পড়িতে পড়িতে চারিপাশের জঙ্গলের দিকে চাহিয়া নিজেই অবাক হইয়া গেলাম। কোথায় আছি, কখনো ভাবি নাই আমি এখানে কোনোদিন থাকিব, কলিকাতার আড্ডা ছাড়িয়া এমন জায়গায় দিনের পর দিন কাটাইব। একখানা বিলাতি ম্যাগাজিনের গ্রাহক হইয়াছি, আজ সেখানা আসিয়াছে। মোড়কের উপরে লেখা “উড়ো জাহাজের ডাকে”। জনাকীর্ণ কলিকাতা শহরের বুকে বসিয়া বিংশ শতাব্দীর এই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সুখ কি বুঝা যাইবে? এখানে-এই নির্জন বন-প্রদেশ- সকল বিষয়েই ভাবিবার ও অবাক হইবার অবকাশ আছে-এখানকার পারিপার্শ্বিক অবস্থা সে-অনুভূতি আনয়ন করে।যদি সত্য কথা বলিতে হয়, জীবনে ভাবিয়া দেখিবার শিক্ষা এইখানে আসিয়াই পাইয়াছি। কত কথা মনে জাগে, কত পুরোনো কথা মনে হয়-নিজের মনকে এমন করিয়া কখনো উপভোগ করি নাই। এখানে সহস্র প্রকার অসুবিধার মধ্যেও সেই আনন্দ আমাকে যেন একটা নেশার মতো পাইয়া বসিতেছে দিন দিন।অথচ সত্যই আমি প্রশান্ত মহাসমুদ্রের কোনো জনহীন দ্বীপে একা পরিত্যক্ত হই নাই। বোধ হয় বত্রিশ মাইলের মধ্যে রেলস্টেশন। সেখানে ট্রেনে চড়িয়া এক ঘণ্টার মধ্যে পূর্ণিয়া যাইতে পারি-তিন ঘণ্টার মধ্যে মুঙ্গের যাইতে পারি। কিন্তু প্রথম তো রেলস্টেশনে যাইতেই বেজায় কষ্ট-সে-কষ্ট স্বীকার করিতে পারি, যদি পূর্ণিয়া বা মুঙ্গের শহরে গিয়া কিছু লাভ থাকে। এমনি দেখিতেছি কোনো লাভই নাই, না আমাকে সেখানে কেউ চেনে, না আমি কাউকে চিনি। কি হইবে গিয়া?কলিকাতা হইতে আসিয়া বই আর বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে গল্প ও আলোচনার অভাব এত বেশি অনুভব করি যে কতবার ভাবিয়াছি এ জীবন আমার পক্ষে অসহ্য। কলিকাতাতেই আমার সব, পূর্ণিয়া বা মুঙ্গেরে কে আছে যে সেখানে যাইব? কিন্তু সদর-আপিসের বিনা অনুমতিতে কলিকাতায় যাইতে পারি না- তা ছাড়া অর্থব্যয়ও এত বেশি যে দু-পাঁচ দিনের জন্য যাওয়া পোষায় না।কয়েক মাস সুখে-দুঃখে কাটিবার পর চৈত্র মাসের শেষ হইতে এমন একটা কাণ্ডের সূত্রপাত হইল, যাহা আমার অভিজ্ঞতার মধ্যে কখনো ছিল না। পৌষ মাসে কিছু কিছু বৃষ্টি পড়িয়াছিল, তার পর হইতে ঘোর অনাবৃষ্টি দেখা দিল। মাঘ মাসে বৃষ্টি নাই, ফাল্গুনে না, চৈত্রে না, বৈশাখে না। সঙ্গে সঙ্গে যেমন অসহ্য গ্রীষ্ম, তেমনি নিদারুণ জলকষ্ট।সাদা কথায় গ্রীষ্ম বা জলকষ্ট বলিলে এ বিভীষিকাময় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের স্বরূপ কিছুই বোঝানো যাইবে না। উত্তরে আজমাবাদ হইতে দক্ষিণে কিষণপুর- পূর্বে ফুলকিয়া বইহার ও লবটুলিয়া হইতে পশ্চিমে মুঙ্গের জেলার সীমানা পর্যন্ত সারা জঙ্গল-মহালের মধ্যে যেখানে যত খাল, ডোবা, কুণ্ডী অর্থাৎ বড় জলাশয় ছিল- সব গেল শুকাইয়া। কুয়া খুঁড়িলে জল পাওয়া যায় না- যদি বালির উনুই হইতে কিছু কিছু জল ওঠে, ছোট এক বালতি জল কুয়ায় জমিতে এক ঘণ্টার উপর সময় লাগে। চারিধারে হাহাকার পড়িয়া গিয়াছে। পূর্বে একমাত্র কুশী নদী ভরসা-সে আমাদের মহালের পূর্বতম প্রান্ত হইতে সাত আট মাইল দূরে বিখ্যাত মোহনপুরা রিজার্ভ ফরেস্টের ওপারে। আমাদের জমিদারি ও মোহনপুরা অরণ্যের মধ্যে একটা ছোট পাহাড়ি নদী নেপালের তরাই অঞ্চল হইতে বহিয়া আসিতেছে-কিন্তু বর্তমানে শুধু শুষ্ক বালুময় খাতে তাহার উপলঢাকা চরণচিহ্ন বিদ্যমান। বালি খুঁড়িলে যে জলটুকু পাওয়া যায়, তাহারই লোভে কত দূরের গ্রাম হইতে মেয়েরা কলসি লইয়া আসে ও সারা দুপুর বালি-কাদা ছানিয়া আধ-কলসিটাক ঘোলা জল লইয়া বাড়ি ফেরে।কিন্তু পাহাড়ি নদী- স্থানীয় নাম মিছি নদী- আমাদের কোনো কাজে আসে না- কারণ আমাদের মহাল হইতে বহু দূরে। কাছারিতেও কোনো বড় ইঁদারা নাই-ছোট যে বালির পাতকুয়াটি আছে, তাহা হইতে পানীয় জলের সংস্থান হওয়াই বিষম সমস্যার কথা দাঁড়াইল। তিন বালতি জল সংগ্রহ করিতে দুপুর ঘুরিয়া যায়।দুপুরে বাহিরে দাঁড়াইয়া তাম্রাভ অগ্নিবর্ষী আকাশ ও অর্ধশুষ্ক বনঝাউ ও লম্বা ঘাসের বন দেখিতে ভয় করে- চারিধার যেন দাউ দাউ করিয়া জ্বলিতেছে, মাঝে মাঝে আগুনের হল্কার মতো তপ্ত বাতাস সর্বাঙ্গ ঝলসাইয়া বহিতেছে- সূর্যের এ রূপ, দ্বিপ্রহরের রৌদ্রের এ ভয়ানক রুদ্র রূপ কখনো দেখি নাই, কল্পনাও করি নাই। এক-এক দিন পশ্চিম দিক হইতে বালির ঝড় বয়- এ সব দেশে চৈত্র-বৈশাখ মাস পশ্চিমে বাতাসের সময়- কাছারি হইতে একশ’ গজ দূরের জিনিস ঘন বালি ও ধূলিরাশির আড়ালে ঢাকিয়া যায়।অর্ধেক দিন রামধনিয়া টহলদার আসিয়া জানায়- কুঁয়ামে পানি নেই ছে, হুজুর। কোনো-কোনো দিন ঘণ্টাখানেক ধরিয়া ছানিয়া ছানিয়া বালির ভিতর হইতে আধ বালতি তরল কর্দম স্নানের জন্য আমার সামনে আনিয়া ধরে। সেই ভয়ানক গ্রীষ্মে তাহাই তখন অমূল্য।একদিন দুপুরের পরে কাছারির পিছনে একটা হরীতকী গাছের তলায় স্বল্প ছায়ায় দাঁড়াইয়া আছি- হঠাৎ চারিধারে চাহিয়া মনে হইল দুপুরের এমন চেহারা কখনো দেখি তো নাই-ই, এ জায়গা হইতে চলিয়া গেলে আর কোথাও দেখিবও না। আজন্ম বাংলা দেশের দুপুর দেখিয়াছি-জ্যৈষ্ঠ মাসের খররৌদ্রভরা দুপুর দেখিয়াছি কিন্তু এ-রুদ্রমূর্তি তাহার নাই। এ ভীম-ভৈরব রূপ আমাকে মুগ্ধ করিল। সূর্যের দিকে চাহিয়া দেখিলাম, একটা বিরাট অগ্নিকুণ্ড- ক্যালসিয়াম পুড়িতেছে, হাইড্রোজেন পুড়িতেছে, লোহা পুড়িতেছে, নিকেল পুড়িতেছে, কোবাল্ট পুড়িতেছে- জানা অজানা শত শত রকমের গ্যাস ও ধাতু কোটি যোজন ব্যাসমুক্ত দীপ্ত ফার্নেসে একসঙ্গে পুড়িতেছে- তারই ধূ-ধূ আগুনের ঢেউ অসীম শূন্যের ইথারের স্তর ভেদ করিয়া ফুলকিয়া বইহার ও লোধাইটোলার তৃণভূমিতে বিস্তীর্ণ অরণ্যে আসিয়া লাগিয়া প্রতি তৃণপত্রের শিরা উপশিরায় সব রসটুকু শুকাইয়া ঝামা করিয়া, দিগ্দিগন্ত ঝলসাইয়া পুড়াইয়া শুরু করিয়াছে ধ্বংসের এক তাণ্ডব লীলা। চাহিয়া দেখিলাম দূরে দূরে প্রান্তরের সর্বত্র কম্পমান তাপ-তরঙ্গ ও তাহার ওধারে তাপজনিত একটি অস্পষ্ট কুয়াশা। গ্রীষ্ম-দুপুরে কখনো এখানে আকাশ নীল দেখিলাম না- তাম্রাভ, কটা- শূন্য, একটি চিল-শকুনিও নাই- পাখির দল দেশ ছাড়িয়া পালাইয়াছে। কি অদ্ভুত সৌন্দর্য ফুটিয়াছে এই দুপুরের! খর উত্তাপকে অগ্রাহ্য করিয়া সেই হরীতকীতলায় দাঁড়াইয়া রহিলাম কতক্ষণ। সাহারা দেখি নাই, সোয়েন হেডিনের বিখ্যাত টাক্লামাকান্ মরুভূমি দেখি নাই, গোবি দেখি নাই- কিন্তু এখানে মধ্যাহ্নের এই রুদ্রভৈরব রূপের মধ্যে সে-সব স্থানের অস্পষ্ট আভাস ফুটিয়া উঠিল।কাছারি হইতে তিন মাইল দূরে একটি বনে-ঘেরা ক্ষুদ্র কুণ্ডীতে সামান্য একটু জল ছিল, কুণ্ডীটাতে গত বর্ষার জলে খুব মাছ হইয়াছিল বলিয়া শুনিয়াছিলাম- খুব গভীর বলিয়া এই অনাবৃষ্টিতেও তাহার জল একেবারে শুকাইয়া যায় নাই। কিন্তু সে জলে কাহারো কোনো কাজ হয় না- প্রথমত, তার কাছাকাছি অনেক দূর লইয়া কোনো মানুষের বসতি নাই- দ্বিতীয়ত, জল ও তীরভূমির মধ্যে কাদা এত গভীর যে, কোমর পর্যন্ত বসিয়া যায়- কলসিতে জল পুরিয়া পুনরায় তীরে উত্তীর্ণ হবার আশা বড়ই কম। আর একটি কারণ এই যে, জলটা খুব ভালো নয়- স্নান বা পানের আদৌ উপযুক্ত নয়, জলের সঙ্গে কি জিনিস মিশানো আছে জানি না- কিন্তু কেমন একটা অপ্রীতিকর ধাতব গন্ধ।একদিন সন্ধ্যায় পশ্চিমে বাতাস ও উত্তাপ কম পড়িয়া গেলে ঘোড়ায় বাহির হইয়া ঐ কুণ্ডীটার পাশের উঁচু বালিয়াড়ি ও বনঝাউয়ের জঙ্গলের পথে উপস্থিত হইয়াছি। পিছনে গ্র্যাণ্ট সাহেবের সেই বড় বটগাছের আড়ালে সূর্য অস্ত যাইতেছিল। কাছারির খানিকটা জল বাঁচাইবার জন্য ভাবিলাম, এখানে ঘোড়াটাকে একবার জল খাওয়াইয়া লই। যত কাদা হোক, ঘোড়া ঠিক উঠিতে পারিবে। জঙ্গল পার হইয়া কুণ্ডীর ধারে গিয়া এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়িল। কুণ্ডীর চারিধারে কাদার উপর আট-দশটা ছোট-বড় সাপ, অন্য দিকে তিনটি প্রকাণ্ড মহিষ একসঙ্গে জল খাইতেছে। সাপগুলি প্রত্যেকটি বিষাক্ত, করাত ও শঙ্খচিতি শ্রেণীর, যাহা এদেশে সাধারণত দেখা যায়।মহিষ দেখিয়া মনে হইল এ ধরনের মহিষ আর কখনো দেখি নাই। প্রকাণ্ড একজোড়া শিং, গায়ে লম্বা লোম-বিপুল শরীর। কাছেও কোনো লোকালয় বা মহিষের বাথান নাই-তবে এ মহিষ কোথা হইতে আসিল বুঝিয়া উঠিতে পারিলাম না। ভাবিলাম, চরির খাজনা ফাঁকি দিবার উদ্দেশ্যে কেহ লুকাইয়া হয়তো জঙ্গলের মধ্যে কোথাও বা বাথান করিয়া থাকিবে। কাছারির কাছাকাছি আসিয়াছি মুনেশ্বর সিং চাকলাদারের সহিত দেখা। তাহাকে কথাটা বলিতেই সে চমকিয়া উঠিল-আরে সর্বনাশ! বলেন কি হুজুর! হনুমানজী খুব বাঁচিয়ে দিয়েছেন আজ! ও পোষা ভঁইস নয়, ও হোলো আড়ন্, বুনো ভঁইস হুজুর, মোহনপুরা জঙ্গল থেকে এসেছে জল খেতে। ও অঞ্চলে কোথাও জল নেই তো। জলকষ্টে পড়ে এসেছে।কাছারিতে তখনই কথাটা রাষ্ট্র হইয়া গেল। সকলেই একবাক্যে বলিল- উঃ, হুজুর খুব বেঁচে গিয়েছেন। বাঘের হাতে পড়লে বরং রক্ষা পাওয়া যেতে পারে, বুনো মহিষের হাতে পড়লে নিস্তার নেই। আর এই সন্ধ্যাবেলা নির্জন জায়গায় যদি একবার আপনাকে ওরা তাড়া করত, ঘোড়া ছুটিয়ে বাঁচতে পারতেন না হুজুর।তার পর হইতে জঙ্গলে-ঘেরা ওই ছোট কুণ্ডীটা বন্য জানোয়ারের জলপানের একটা প্রধান আড্ডা হইয়া দাঁড়াইল। অনাবৃষ্টি যত হইতে লাগিল, রৌদ্রের ক্রমবর্ধমান প্রখরতায় দিক্দিগন্তে দাবদাহ যত প্রচণ্ড হইয়া উঠিতে লাগিল- খবর আসিতে লাগিল-সেই জঙ্গলের মধ্যে কুণ্ডীতে লোকে বাঘকে জল খাইতে দেখিয়াছে, বন-মহিষকে জল খাইতে দেখিয়াছে, হরিণের পালকে জল খাইতে দেখিয়াছে, নীলগাই ও বুনো শুয়োর তো আছেই- কারণ শেষের দুই প্রকার জানোয়ার এ জঙ্গলে অত্যন্ত বেশি। আমি নিজে আর একদিন জ্যোৎস্নারাত্রে ঘোড়ায় করিয়া কুণ্ডীতে যাই শিকারের উদ্দেশ্যে-সঙ্গে তিন-চার জন সিপাহী ছিল- দু-তিনটি বন্দুকও ছিল। সে যা দৃশ্য দেখিয়াছিলাম সে রাত্রে, জীবনে ভুলিবার নয়। তাহা বুঝিতে হইলে কল্পনায় ছবি আঁকিয়া লইতে হইবে এক জনহীন জ্যোৎস্নাময়ী রাত্রি ও বিস্তীর্ণ বনপ্রান্তরের! আরো কল্পনা করিয়া লইতে হইবে সারা বনভূমি ব্যাপিয়া এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতার, অভিজ্ঞতা না থাকিলে যদিও সে নিস্তব্ধতা কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব।উষ্ণ বাতাস অর্ধশুষ্ক কাশ-ডাঁটার গন্ধে নিবিড় হইয়া উঠিয়াছে, লোকালয় হইতে বহু দূরে আসিয়াছি, দিগ্বিদিকের জ্ঞান হারাইয়া ফেলিয়াছি।কুণ্ডীতে প্রায় নিঃশব্দে জল খাইতেছে এক দিকে দুটি নীলগাই, অন্য দিকে দুটি হায়েনা; নীলগাই দুটি একবার হায়েনাদের দিকে চাহিতেছে, হায়েনারা একবার নীলগাই দুটির দিকে চাহিতেছে- আর দু’দলের মাঝখানে দু-তিন মাস বয়সের এক ছোট নীলগাইয়ের বাচ্চা। অমন করুণ দৃশ্য কখনো দেখি নাই-দেখিয়া পিপাসার্ত বন্য জন্তুদের নিরীহ শরীরে অতর্কিতে গুলি মারিবার প্রবৃত্তি হইল না।এদিকে বৈশাখও কাটিয়া গেল। কোথাও একফোঁটা জল নাই। এক বিপদ দেখা দিল। এই সুবিস্তীর্ণ বনপ্রান্তরের মাঝে মাঝে লোকে দিক হারাইয়া আগেও পথ ভুলিয়া যাইত- এখন এইসব পথহারা পথিকদের জলাভাবে প্রাণ হারাইবার সমূহ আশঙ্কা দাঁড়াইল, কারণ ফুলকিয়া বইহার হইতে গ্র্যাণ্ট সাহেবের বটগাছ পর্যন্ত বিশাল তৃণভূমির মধ্যে কোথাও একবিন্দু জল নাই। এক-আধটা শুষ্কপ্রায় কুণ্ড যেখানে আছে, অনভিজ্ঞ দিগ্ভ্রান্ত পথিকদের পক্ষে সে সব খুঁজিয়া পাওয়া সহজ নয়। একদিনের ঘটনা বলি।সেদিন বেলা চারটার সময় অত্যন্ত গরমে কাজে মন বসাইতে না পারিয়া একখানা কি বই পড়িতেছি, এমন সময় রামবিরিজ সিং আসিয়া এত্তেলা করিল, কাছারির পশ্চিমদিকে উঁচু ডাঙার উপরে একজন কে অদ্ভুত ধরনের পাগলা লোক দেখা যাইতেছে-সে হাত-পা নাড়িয়া দূর হইতে কি যেন বলিতেছে। বাহিরে গিয়া দেখিলাম সত্যই দূরের ডাঙাটার উপরে কে একজন দাঁড়াইয়া- মনে হইল মাতালের মতো টলিতে টলিতে এদিকেই আসিতেছে। কাছারি সুদ্ধ লোক জড়ো হইয়া সেদিকে হাঁ করিয়া চাহিয়া আছে দেখিয়া আমি দুজন সিপাহী পাঠাইয়া দিলাম লোকটাকে এখানে আনিতে।লোকটাকে যখন আনা হইল, দেখিলাম তাহার গায়ে কোনো জামা নাই- পরনে মাত্র একখানা ফর্সা ধুতি, চেহারা ভালো, রং গৌরবর্ণ। কিন্তু তাহার মুখের আকৃতি অতি ভীষণ, গালের দুই কশ বাহিয়া ফেনা বাহির হইতেছে, চোখদুটি জবাফুলের মতো লাল, চোখে উন্মাদের মতো দৃষ্টি। আমার ঘরের দাওয়ায় একটা বালতিতে জল ছিল- তাই দেখিয়া সে পাগলের মতো ছুটিয়া বালতির দিকে গেল। মুনেশ্বর সিং চাকলাদার ব্যাপারটা বুঝিয়া তাড়াতাড়ি বালতি সরাইয়া লইল। তাহার পর তাহাকে বসাইয়া হাঁ করাইয়া দেখা গেল জিভ ফুলিয়া বীভৎস ব্যাপার হইয়াছে। অতি কষ্টে জিভটা মুখের এক পাশে সরাইয়া একটু একটু করিয়া তার মুখে জল দিতে দিতে আধ ঘণ্টা পরে লোকটা কথঞ্চিৎ সুস্থ হইল। কাছারিতে লেবু ছিল, লেবুর রস ও গরম জল এক গ্লাস তাহাকে খাইতে দিলাম। ক্রমে ঘণ্টাখানেক পরে সে সম্পূর্ণ সুস্থ হইয়া উঠিল। শুনিলাম তাঁর বাড়ি পাটনা। গালার চাষ করিবার উদ্দেশ্যে সে এ অঞ্চলে কুলের জঙ্গলের অনুসন্ধান করিতে পূর্ণিয়া হইতে রওনা হইয়াছে আজ দুই দিন পূর্বে। তারপর দুপুরের সময় আমাদের মহালে ঢুকিয়াছে, এবং একটু পরে দিগ্ভ্রান্ত হইয়া পড়িয়াছে, কারণ এ রকম একঘেয়ে একই ধরনের গাছে-ভরা জঙ্গলে দিক্ ভুল করা খুব সোজা, বিশেষত বিদেশী লোকের পক্ষে। কালকার ভীষণ উত্তাপে ও গরম পশ্চিমে বাতাসের দমকার মধ্যে সারা বৈকাল ঘুরিয়াছে-কোথাও একফোঁটা জল পায় নাই, একটা মানুষের সঙ্গে দেখা হয় নাই- রাত্রে অবসন্ন অবস্থায় এক গাছের তলায় শুইয়া ছিল- আজ সকাল হইতে আবার ঘোরা শুরু করিয়াছে- মাথা ঠাণ্ডা রাখিলে সূর্য দেখিয়া দিক্ নির্ণয় করা হয়তো তার পক্ষে খুব কঠিন হইত না- অন্তত পূর্ণিয়াও ফিরিয়া যাইতে পারিত- কিন্তু ভয়ে দিশাহারা হইয়া একবার এদিক একবার ওদিক ছুটাছুটি করিয়াছে আজ সারা দুপুর, তাহার উপর খুব চিৎকার করিয়া লোক ডাকিবার চেষ্টা করিয়াছে-কোথায় লোক? ফুলকিয়া বইহারের কুলের জঙ্গল যেদিকে, সেদিক হইতে লবটুলিয়া পর্যন্ত দশ-বারো বর্গমাইলব্যাপী বনপ্রান্তর সম্পূর্ণ জনমানবশূন্য, সুতরাং আশ্চর্যের বিষয় নয় যে, তাহার চিৎকার কেহ শোনে নাই। আরো তাহার আতঙ্ক হইবার কারণ, সে ভাবিয়াছিল, তাহাকে জঙ্গলের মধ্যে জিনপরীতে পাইয়াছে-মারিয়া না ফেলিয়া ছাড়িবে না। তাহার গায়ে একটা জামা ছিল, কিন্তু আজ অসহ্য পিপাসায় দুপুরের পরে এমন গা-জ্বলুনি শুরু হইয়াছিল যে, জামাটা খুলিয়া কোথায় ফেলিয়া দিয়াছে। এ অবস্থায় দৈবক্রমে আমাদের কাছারির হনুমানের ধ্বজার লাল নিশানটা দূর হইতে তাহার চোখে না পড়িলে লোকটা আজ বেঘোরে মারা পড়িত।একদিন এই ঘোর উত্তাপ ও জলকষ্টের দিনে ঠিক দুপুরবেলা সংবাদ পাইলাম, নৈর্ঋত কোণে মাইলখানেক দূরে জঙ্গলে ভয়ানক আগুন লাগিয়াছে এবং আগুন কাছারির দিকে অগ্রসর হইয়া আসিতেছে। সবাই মিলিয়া তাড়াতাড়ি বাহির হইয়া দেখিলাম প্রচুর ধূমের সঙ্গে রাঙা অগ্নিশিখা লক্লক্ করিয়া বহুদূর আকাশে উঠিতেছে! সেদিন আবার দারুণ পশ্চিমে বাতাস, লম্বা লম্বা ঘাস ও বনঝাউয়ের জঙ্গল সূর্যতাপে অর্ধশুষ্ক হইয়া বারুদের মতো হইয়া আছে, এক-এক স্ফুলিঙ্গ পড়িবামাত্র গোটা ঝাড় জলিয়া উঠিতেছে- সেদিকে যতদূর দৃষ্টি যায় ঘন নীলবর্ণ ধূমরাশি ও অগ্নিশিখা- আর চটচট শব্দ। ঝড়ের মুখে পশ্চিম হইতে পূর্ব দিকে বাঁকা আগুনের শিখা ঠিক যেন ডাকগাড়ির বেগে ছুটিয়া আসিতেছে আমাদের কয়খানা খড়ের বাংলোর দিকেই। সকলেরই মুখ শুকাইয়া গেল, এখানে থাকিলে আপাতত তো বেড়া-আগুনে ঝলসাইয়া মরিতে হয়- দাবানল তো আসিয়া পড়িল!ভাবিবার সময় নাই। কাছারির দরকারি কাগজপত্র, তহবিলের টাকা, সরকারি দলিল, ম্যাপ, সর্বস্ব মজুত- এ বাদে আমাদের নিজেদের ব্যক্তিগত জিনিস যার যার তো আছেই। এ সব তো যায়! সিপাহীরা শুষ্কমুখে ভীতকণ্ঠে বলিল- আগ তো আ গৈল, হুজুর! বলিলাম – সব জিনিস বার কর। সরকারি তহবিল ও কাগজপত্র আগে।জনকতক লোক লাগিয়া গেল আগুন ও কাছারির মধ্যে যে জঙ্গল পড়ে তাহারই যতটা পারা যায় কাটিয়া পরিষ্কার করিতে। জঙ্গলের মধ্যে বাথান হইতে আগুন দেখিয়া বাথানওয়ালা চরির প্রজা দু-দশ জন ছুটিয়া আসিল কাছারি রক্ষা করিতে, কারণ পশ্চিমা-বাতাসের বেগ দেখিয়া তাহারা বুঝিতে পারিয়াছে কাছারি ঘোর বিপন্ন।কি অদ্ভুত দৃশ্য! জঙ্গল ভাঙ্গিয়া ছিঁড়িয়া ছুটিয়া পশ্চিম হইতে পূর্বদিকে নীলগাইয়ের দল প্রাণভয়ে দৌড়িতেছে, শিয়াল দৌড়িতেছে, কান উঁচু করিয়া খরগোশ দৌড়িতেছে, একদল বন্যশূকর তো ছানাপোনা লইয়া কাছারির উঠান দিয়াই দিগ্বিদিক্ জ্ঞানশূন্য অবস্থায় ছুটিয়া গেল- ও অঞ্চলের বাথান হইতে পোষা মহিষের দল ছাড়া পাইয়া প্রাণপণে ছুটিতেছে, একঝাঁক বনটিয়া মাথার উপর দিয়া সোঁ করিয়া উড়িয়া পলাইল, পিছনে পিছনে একটা বড় ঝাঁক লাল হাঁস। আবার এক ঝাঁক বনটিয়া, গোটাকতক সিল্লি। রামবিরিজ সিং চাকলাদার অবাক হইয়া বলিল- পানি কাঁহা নেই ছে…. আরে এ লাল হাঁসকা জেরা কাঁহাসে আয়া, ভাই রামলগন? গোষ্ঠ মুহুরী বিরক্ত হইয়া বলিল-আঃ বাপু রাখ্। এখন প্রাণ নিয়ে টানাটানি, লাল হাঁস কোথা থেকে এল তার কৈফিয়তে কি দরকার?আগুন বিশ মিনিটের মধ্যে আসিয়া পড়িল। তার পরে দশ-পনের জন লোক মিলিয়া প্রায় ঘণ্টাখানেক আগুনের সঙ্গে সে কি যুদ্ধ! জল কোথাও নাই-আধকাঁচা গাছের ডাল ও বালি এইমাত্র অস্ত্র। সকলের মুখচোখ আগুনের ও রৌদ্রের তাপে দৈত্যের মতো বিভীষণ হইয়া উঠিয়াছে, সর্বাঙ্গে ছাই ও কালি, হাতের শিরা ফুলিয়া উঠিয়াছে, অনেকেরই গায়ে হাতে ফোস্কা- এদিকে কাছারির সব জিনিসপত্র, বাক্স, খাট, দেরাজ, আলমারি তখনো টানাটানি করিয়া বাহির করিয়া বিশৃঙ্খলভাবে উঠানে ফেলা হইতেছে। কোথাকার জিনিস যে কোথায় গেল, কে তার ঠিকানা রাখে! মুহুরীবাবুকে বলিলাম-ক্যাশ আপনার জিম্মায় রাখুন, আর দলিলের বাক্সটা।কাছারির উঠান ও পরিষ্কৃত স্থানে বাধা পাইয়া আগুনের স্রোত উত্তর ও দক্ষিণ বাহিয়া নিমেষের মধ্যে পূর্বমুখে ছুটিল-কাছারিটা কোনোক্রমে রক্ষা পাইয়া গেল এযাত্রা। জিনিসপত্র আবার ঘরে তোলা হইল, কিন্তু বহু দূরে পূর্বাকাশ লাল করিয়া লোলজিহ্বা প্রলয়ঙ্করী অগ্নিশিখা সারা রাত্রি ধরিয়া জ্বলিতে জ্বলিতে সকালের দিকে মোহনপুরা রিজার্ভ ফরেস্টের সীমানায় গিয়া পৌঁছিল।দু-তিন দিন পরে খবর পাওয়া গেল কারো ও কুশী নদীর তীরবর্তী কর্দমে আট-দশটা বন্য মহিষ, দুটি চিতা বাঘ, কয়েকটা নীলগাই হাবড়ে পড়িয়া পুঁতিয়া রহিয়াছে। ইহারা আগুন দেখিয়া মোহনপুরা জঙ্গল হইতে প্রাণভয়ে নদীর ধার দিয়া ছুটিতে ছুটিতে হাবড়ে পড়িয়া গিয়াছে-যদিও রিজার্ভ ফরেস্ট হইতে কুশী ও কারো নদী প্রায় আট-ন’ মাইল দূরে।