BDBOYS...
BDBOYS...
সবচেয়ে সাম্প্রতিক খবর ও পোস্টসমূহ
মাল্যবান প্রাণধারণের ব্যাপারে কেমন যেন খারিজ হয়ে নিচে নেমে গেল। কিছুই ভালো লাগছিল না তার।স্ত্রীর গরজের কথা হচ্ছিল এতক্ষণ—মাল্যবান নিজের ঘরের চারদিকে তাকিয়ে দেখল, বাস্তবিক, বাড়ির গিন্নির স্পৃহার সম্পূর্ণ অভাবের জন্যেই এই ঘরটা একেবারে হতচ্ছাড়া হয়ে রয়েছে—ওপরের ঘরের পরিপাটির পাশে এ-ঘরটা কেমন থুবড়ি খেয়ে পড়ে আছে।মনটা তার সেকেন্ডখানেকের জন্যে একটা মোচড় দিয়ে উঠল, কেন সে এমন ঘরে পড়ে থাকবে? সমস্ত ঘরগুলোর ভাড়াই কি সে দেয় না? সমস্ত সংসারটাই তো তার টাকায় চলছে। কিন্তু তবুও–সে ঘর গোছাতে মন দিল।কেরোসিন-কাঠের টেবিলগুলো বাইরে বার করে দিল, আলমারিটা ঝেড়ে-মুছে পরিষ্কার করল, ঝাড় মেরে চারদিকের ঝুল ঝেড়ে নিল, মাকড়সার জলা সাফ করল, অনেক আরশোলা ঝেটিয়ে বার করলে, (ফ্লিট, ডিডিটি হাতের কাছে ছিল না কিছুই), পায়ে পিষে মেরে ফেলল, ধোপার জন্যে অপেক্ষা না করে কাপড়ের উঁই সে নিজে কাচবে ঠিক করে ফেলল, জরুলকাঠের ছোট্ট টেবিলটার ওপর পরিষ্কার খবরের কাগজ পাতল, ভাব বিকেলে একটা কালো জমকালো টেবিলক্লথ কিনে আনবে, একটা ফুলদানী আনবে, কতকগুলো ফুল, দেয়ালে টাঙানোর জন্যে একটি কি-দুটি ছিমছাম ছবি।তাড়াতাড়ি চান করে খেয়ে অফিসে গেল পরদিন সকালবেলা। অফিস থেকে ফিরে আসবার সময়ে দরকারী জিনিসগুলো কিনে আনল টেবিলের কাপড়, ফুলদানী—ঘরটাকে ঘণ্টা-দুই ধরে সাজাল সে। বাইরে তাকিয়ে দেখল, রাত বেশ অন্ধকার। এই শীতের ভেতর চান করার চৌবাচ্চাটা এখন কেউ ব্যবহার করতে আসে না। ওখানে গা ঢাকা দিয়ে যদি সে কাপড় কাচতে বসে, তাহলে বড় একটা কেউ টের পাবে না। রাত দশটা পর্যন্ত প্রায় কাপড় কাচা হল।উৎপলার ঘরে হিমাংশু, শ্রীরঙ্গ ইত্যাদি কয়েকজন এসেছিল; বেহালার গৎ বাজছিল; উৎপলা নিজে গান শোনাচ্ছে—আরো শোনাবে—বেহালা আরো বাজবে—ওরা (কোরাসে) গাইবে;–মাল্যবানের কাছে এ একটা নিস্তারের মতো মনে হল; গান-বাজনা যত রাত অব্দি চলে, ততই তার লাভ-কাপড়গুলো কেচে খাবার আগে সে একটু জিরিয়ে নিতে পারবে।কেচে, নিংড়ে কাপড়গুলো সে গোটা দুই বালতি ঠেসে রেখে দিয়ে, চান সেরে, টেরি কেটে, বিছানায় এসে শুল। একটা চুরুট দাঁতে আটকে নিয়ে সুশৃঙ্খল সংযমী জীবনের শান্তি ধীরে-ধীরে উপভোগ করছিল। কিন্তু একটা চুরুট—দুটো চুরুট ফুরোল–অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল সে, তবুও খাবারের ডাক পড়ল না। আরো অনেকক্ষণ চুপচাপ বিছানায় শুয়ে থাকতে হল। তারপর ঘুমিয়ে পড়ল। মাল্যবান ধড়মড় করে উঠে পড়ল তারপর, বিছানায় কাৎ হয়ে শুয়ে বসে রইল খানিকক্ষণ, উঠে বসল তারপর, ঠাকুরকে ঘরে ঢুকতে দেখে বললে, কৈ, এখনও গান চলছে যে—গান আমাদের বাড়িতে নয়।তবে?পাশের বাড়িতে কোথায়—মাল্যবান একটু কান পেতে শুনে বললে, ও, তাই তো, এ যে কলের গান।ওপরের ঘর নিথারপাথরের মতো চুপ হয়ে আছে বটে। মাল্যবান সিঁড়ি ভেঙে ওপরে যাচ্ছিল।ঠাকুর বললে, দিদিমণি আর মা ঘুমিয়েছেন।তাই নাকি? তুমি তো আজ অনেক রাত অব্দি আছ, ঠাকুর। ব্যাপার কী? ওরা খেল না?খেয়েছেন?কখন?দুটো বাবুর সঙ্গে খেয়ে নিয়েছেন—মাল্যবান একটু চুপ থেকে বললে, আমার ভাত আছে তো?তা আছে। আপনাকে এখানে এনে দিই?বেশি কিছু দিয়ো না। কেমন গা-বমি-বমি করছে—অল্প কয়েক গ্রাস খেয়ে সে উঠল। ঝি এঁটো নিকিয়ে থাকা বের করে চলে গেল। ঝি, ঠাকুর বাড়ি চলে গেল।মাল্যবানের কেমন উল্টে বমি আসছিল। সে দরজা বন্ধ করে কতকগুলো কাগজ পেতে অনেকক্ষণ ধরে হড়-হড় করে বমি করল, অনেক বমি।মাকে মনে পড়ছিল শুধু তার। অবাক হয়ে ভাবছিল এই ঘরেই আছেন তিনি—এই অন্ধকারের ভেতরেই দাঁড়িয়ে আছেন বোধ করি; হয়তো আমার বিছানার পাশে এসে বসেছেন; গায়ে বুকে পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন; দিচ্ছেন হয়তোমাল্যবানের মনে হল : উৎপলাও তো মনুর মামা তো সে; মাল্যবানের মায়ের মতন বড়ও হয়ে উঠবে এক দিন। নিজের মায়ের সঙ্গে এই মাকে মিলিয়ে ফেলে বৃষ্টির ছিপছিপে ছটফটে জল যেমন পুকুরের সমাহিত সঞ্চিত জলের শান্ত স্বরূপের ভেতর মিশে যায়, তেম্নি একটা অব্যাহত মাতৃত্বের সদাত্মাকে চাচ্ছিল যেন সে। তার নিজের মাযে নেই আজ, দশ-বারো বছর আগে নিমতলা ঘাটে যাকে ছাই হয়ে যেতে দেখেছিল মাল্যবান-মাল্যবানের মায়ের অব্যক্ত ইঙ্গিতের মৃত্যু হয়নি তো তবু—ধারণ বহন করবার জন্যে অপর নারী এসেছে এই ঘরে; মা হয়েছে; মনুর মা। মাল্যবান আজ মনুর মার স্বামী ঠিক নয়; মাল্যবানের সেই মৃত মা ও জীবিত উৎপলা—এই দুটি নারীকে একজনের মতন—মায়ের মতন—তার ঘরের ভেতর খুঁজে পাবার জন্যে কেমন অদ্ভুত বিশালাক্ষ অস্বস্তিতে সে চারিদিকে তাকাতে লাগল; —আসুক নিজের মায়ের মূর্তিতে, কিংবা আসুক উৎপলার বেশে-দুজনের ভেতরেই দুজনকে খুঁজে পাবে সে-পাবে এক জন মাকে—মাতৃত্ব : যা একক মাল্যবান পাবে তার কামস্পর্শহীন জায়াঘ্রাণহীন আনন্ত্যকে। মাল্যবান কয়েকবার ডাক ছেড়ে অস্পষ্ট ভাবে ডাকলও—মাকে, ঠাকুরকে, ঝিকে—মনুর মাকে, না, উৎপলাকে, ঠিক বোঝা গেল না।আস্তে আস্তে কমে গেল—থেমে গেল বমির চাড় মাল্যবানের।মাল্যবান একটু ভড়কে গিয়ে তাকিয়ে দেখল, উৎপলা এসে দাঁড়িয়েছে।ঠাকুর বাড়ি চলে যাবার সময়ে আমাকে বলল, তুমি বমি করছ। বমি হল কেন?কী জানি।কী খেয়ছিলে?কিচ্ছু না, শুধু ভাত।বাজারের খাবার-টাবার?না তো।উৎপলা বললে, আর বমি হবে বলে মনে হচ্ছে?না বোধ হয়।পেটে ব্যথা আছে?না, সে-সব কিছু নেই।আচ্ছা, শোও, শুয়ে পড়। আমি বাতাস করছি।মাল্যবান খানিকক্ষণ বালিশে মাথা রেখে বাতাস খেয়ে বলল, ভালো লাগছে। এখন।যে মা হয়েছে, মাল্যবান বললে, সে মানুষের শিয়রে না এসে পারে না। তুমি মনুর মা বটে, আমার স্ত্রী। কিন্তু সময়ের কোনো শেষ নেই তো, সেই সময়ের ভেতর আমাদের বাস; সময়ের হাত এসে এখানে এ-জিনিসটা মুছে দ্যায়—সেখানে সে জিনিসটা জাগিয়ে দ্যায়; মানুষের স্ত্রী তুমি; নিজেও তো মানুষের মা, মানুষ; সময়ের নিরবচ্ছিন্ন বহতার ভেতর তোমার মা-রূপ ফুটে উঠল তো; দেখছি। সময়ের দু-একটা ঘূর্ণিকে কেমন অভিরাম গ্রন্থির বলয়ে নিয়ে এসে গড়ে তুললে, দেখছি তো। এই তো নিচের নেমে এসে হাড়-এলিয়ে শীতের রাতে, সিঁড়ি বেয়ে না এলেও তো পারতে। আমি অনেকক্ষণ পর্যন্ত আশাও করিনি যে, তুমি আসবে। কিন্তু তবুও তো এলে—উৎপলার বাঁ-হাতের দুচারটে আঙুলের দিকে ঝোক গেল মাল্যবানের। কিন্তু সে-আঙুল কটি বিশেষ কোনো সাড়া দিল না। নিজের ভাবুকতা আন্তরিকতার আত্মম্মন্যতা নিয়ে মাল্যবান এত বেশি তলিয়ে গিয়েছিল যে, স্ত্রীর আঙুল কটির রহস্য ছাঁকবার জন্যে কোনো তাড়া ছিল না তার। রহস্যকে কঠিন আলোর মতো পরিষ্কার করে বুঝে দেখবার শক্তিও সময়পুরুষ তাকে দেয়নি; অনেক বিষয়েই বেচারী অন্ধ অবোধ বলে পোডড়া ঘরের চামচিকের মতো হৰ্ষকম্পাথিত। কিন্তু মাল্যবানের অবকল্পনা আছে, অবপ্রতিভাও; সে-জিনিসটা খুব নিয়ন্ত্রিত নয় যদিও। কাজেই চেতনার একটি সূর্যের বদলে অবচেতনার অন্তহীন নক্ষত্র পেয়েছে সে। পাঁচ ইন্দ্রিয়ের ওপর আরো একটি ইন্দ্রিয় আছে খুব সম্ভব মাল্যবানের। বিজ্ঞানে থাকে বলে চতুর্থ-বিস্তার, সেই চাতুর্যের দেশেও বাস করে। কাজেই মা ও মাতৃত্বের ঐ দিব্য কেন্দ্র তার নজরে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ও-সব শিখরে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না সে, শীগগিরই ধ্বসে ভেঙে পড়ে গেল সে তার ছোট সংস্কারের ছোট সংসারে স্বামী স্ত্রী কামনা লিপ্সা হতাশার ঘূর্ণিফেনার ভেতর।উৎপলার হাতপাখা আবেগে নড়েনি কখনো; সবেগে নড়ছিল কিছুক্ষণ আগে। এখন ক্রমে-ক্রমেই ঢিলে হয়ে আসছিল।মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, একা থাকলে বেশ হত। কেউ-কেউ একা থাকে বটে, যেমন আমাদের হেডমাস্টারমশাই চিরটা কাল কাটিয়ে গেলেন, কিন্তু শেষ বয়েসে তাকে বেগ পেতে হয়েছিল। মেয়েদের দর্শন দিতেন বটে, কিন্তু সাধুপুরুষ, স্ত্রীলোকের দর্শন পাবার জন্যেই ব্যাকুল হয়ে উঠতেন। লালসা জন্মাল। মেয়েরা ভালো মনে করে সেবা করবার জন্যে হেডমাস্টার মশাইর হাত-পা টিপে দিত রোজ, উনিও ক্রমে-ক্রমে গোপনে সুবিধে পেয়ে তাদের গলা টিপতে আরম্ভ করে দিলেন। গড়াল কেলেঙ্কারি অনেক দূর। বিয়ে হল না তবু ছেলে হল, মেয়ে হল। তবুও সিদ্ধপুরুষ রইলেন। হেডমাস্টারমশাইর চিতের ওপর ও অঞ্চলের সব চেয়ে বড় মঠ। নৌকোর ছইয়ের ওপর বসে কতো মাইল দূরের থেকে সে-মঠ দেখা যায়…মাল্যবান কথা বলে যাচ্ছিল গভীর বৃষ্টির রাত কিছুক্ষণের জন্যে বাতবর্ষণ হলে পাড়াগাঁর নালায় পুকুরে খালে কল-কল শব্দে চলে যেতে যেতে নিজের সাথে নিজে যেমন কথা বলে চলে জল।বাতাস করতে-করতে উৎপলার হাত ব্যথা হয়ে উঠল, কিন্তু মাল্যবানের দিক থেকে কোনো নিষেধ নেই। বেশি কথা বলে মাল্যবান বেশি ফেনিয়ে ওঠে, মাঝে-মাঝে গাজায়, নিজেকে নিয়ে নিজেকে উপভোগ করবার দুর্ভোগ ভোগাবার বেশ ক্ষমতা আছে; ধ্বেৎ, ভালো লাগে না আমার, এক-এক সময় অবিশ্যি আমাকেও অবশ করে ফ্যালে—যেমন মনু হবার আগে। কিন্তু ভালো লাগে না আর আজ-কাল পুৎ!পাখাটা বিছানার পাশে রেখে দিয়ে উৎপলা বললে, বমি তো করলে, কিন্তু এখন ওষুধের ব্যবস্থা কী করা হবে?সে-জন্যে তোমার কোনো ভাবনা নেই, পলা।ওষুধ আছে?না।তবে?ওষুধ আমার লাগবে না। কেমন পেটে মোচড় খেল, বমি হয়ে গেল, ব্যস। সে-রকম বেশি কিছু হলে শরীরের আক্ষেপটা এত তাড়াতাড়ি পড়ে যেত না।বলা যায় না কিছু। ওষুধ নেই। ডাক্তারের ব্যবস্থাই বা কে করবে।না, না, অসুখ নয় তো, একটু হায়রাণি হয়েছিল, মাল্যবান একটু আলোড়িত হয়ে উঠে বসবার চেষ্টা করে শেষমেশ শুয়ে থাকতে-থাকতেই বললে, সেরে গেছে। তোমার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই ঠিক হয়ে যাবে সব।এ-বাড়িতে কোনো পুরুষমানুষ নেই, টক বিরস মুখে উৎপলা বললে, অসুখ-বিসুখের সময়ে নানা রকম অসুবিধে। ডাক্তার ডাকে কেরাত জাগে কে।মাল্যবান স্ত্রীর মুখে খিঁচুনিটাকে ইস্ত্রি করে পালিশ করে দেবার জন্যে খুব স্নিগ্ধ ভাবে বললে, এবার একজন সরকারের মতন রাখব ভাবছি; মনুকেও পড়াবে; প্রাইভেট-মাস্টার বাজার সরকার ঘরের বাইরের দশ রকম ফাইফরমাস—সবই চলবে।কিন্তু, আজকের রাতে কে জাগে–বোসো, তুমি খানিকটা সময় বসে যাও; নিজের থেকেই ঘুমিয়ে পড়ব। উৎপলা হাত গুটিয়ে গুম হয়ে বসে রইল।কেটে গেল খানিকটা সময়। কেউ কোনো কথা বলছে না। কারু কোনো কাজ করতে হবে মনে হচ্ছে। ভালো লাগছে না কারুরই। কেমন অস্বস্তিবোধ হচ্ছে। সময় কেটে গেল আরো।চুপচাপ যে?কী করতে হবে?বাতাস করছিলে তো—উৎপলা উঠে দাঁড়াল। বাতি জ্বালিয়ে ঘরের চারিদিকে তাকিয়ে বললে, এ বালতি দুটো ভিজে কাপড়ে ঠেসে রেখেছে কে?একটা বালতি তুলে সমস্ত কাপড় মেঝের ওপর ঢেলে ফেলে দিয়ে চৌবাচ্চার দিকে চলে গেল।ওগুলো কাচা কাপড় ছিল, মাটিতে ফেলে দিলে— মাল্যবান তাকিয়ে দেখল ননাংরা কাদায় মাটিতে গড়াচ্ছে, কাপড়গুলো পায়ে মাড়িয়ে-মাড়িয়ে উৎপলা চলে গেছে। চৌবাচ্চার থেকে এক বালতি জল এনে হিসসো করে ছড়িয়ে ছিল উৎপলা; আরো এক বালতি ঢেলে ছড়িয়ে মরিয়া হয়ে তাকিয়ে দেখল, বমি সাফ করতে আরো অন্তত দু বালতি জলের দরকার। উৎপলার লোকায়ত মন, আর যা লোকয়ত নয়, অথচ গভীরতর যা—লোকায়েতকে চালাচ্ছে—এই শীতের দুপুর-রাতে হাত-পায়ের চেয়েও ঢের বেশি টনটন করে উঠল সেসব জিনিস।শেষ বালতি জল এনে ঘরের ভেতর ঢেলে দিল উৎপলা; তারপরে মাল্যবানের একটা সাবানে-কাচা ভিজে ধুতি নিয়ে জায়গাটা নিকোতে লাগল।কেন তুমি নিকোচ্ছ তোমার নিজের হাতে, আহা, থাক না! মাল্যবান বললে। আনাড়ি ছেলের হাতে কলাপাতার বাঁশীর মতো কেমন কাহিল ভাবে কেঁপে-কেঁপে চিরে গিয়ে বেজে উঠে মাল্যবান আবার বললে, ঠিক হল না, ঠিক হল না, আমার ধুতিটা তুমি রেখে দাও—আমি নোংরা মুছবার জন্যে তোমাকে জিনিস দিচ্ছি।কলাপাতার বাঁশী কেঁপে কেঁড়ে গিয়ে বললে, বাঃ, উৎপলা, আমার ধুতিটা লোপাট করলে–এই তো আজ সন্ধ্যেবেলা খিদিরপুরের সাবান দিয়ে কেচেছি।উৎপলা ঘাড় গুঁজে মেঝে পরিষ্কার করতে-করতে ঘরের কোণের একটা ড্রেনের দিকে সমস্ত বের করে দিচ্ছিল,—হাত দিয়ে নয়, মাল্যবানের ধুতিটা পায়ে খানিকটা জড়িয়ে নিয়ে পা চালিয়ে কাজ করছিল সে; কাজ করে যেতে লাগল কোনো জবাব দিল না। এ-রকম সব কাজ তার করবার কথা নয়, শীতের রাতে তো নয়ই, কিছুতেই করত না সে এ-কাজ। কিন্তু কেমন যেন ভূতে তাড়িয়ে এনেছে তাকে। তাই নিচে নেমে এসেছে সে, এমন একটা বিশ্রী ছোঁয়াছানার কাজ করছে—হোক না পা। দিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় যা মেরে পিটিয়েও কেউ করাতে পারত না তাকে দিয়ে। ভূতেই পেয়েছে তাকে, চিমড়ে ভূতে পেয়েছে: স্তম্ভিত হয়ে পা ডলছিল আর ভাবছিল উৎপলা।উৎপলার (মন্থনদণ্ডের মতো) পায়ে জড়ানোে ধুতিটার কাদা বমি লোকসানির দিকে তাকিয়ে মাল্যবান কী যেন কেমন যেন হয়ে গিয়ে বলতে লাগল, করিম ভাই মিলের সুন্দর ধুতিটা—এই দিন পনেরো আগে কিনেছি—তার তুমি এই অবস্থা করলে—এ তো পরাও যাবে না আর।কিন্তু ধুতি আরো একটা লাগল উৎপলার—সেটা ক্যালিকো মিলের। মাল্যবানের ভেতরের শাঁসটাই মোচড় দিয়ে উঠল। এক মাসের মাইনের চেয়ে যে-সব লোকের একটা ধুতি বা চাদরকে এক-এক সময়ে ঢের বেশি দামী, দরকারী মনে হয়, মাল্যবান সেই ধরণের মানুষ। কাজেই, অনেক কুণ্ঠা, আক্ষেপ, কাতরতার পরিচয় দিল সে, অনেক ছোট ছেদো কথা বললে; কিন্তু সব সময়েই গলা তার হেমন্তের দুপুরে একটা নিঃসঙ্গ উড়চুঙার মতো মিন-মিন ফির-ফির ঝিন-ঝিন করছিল, কাতর করুণ, ঝঝ নেই, উত্মা নেই।উৎপলার হাসি পাচ্ছিল—মাঝে-মাঝে দয়া হচ্ছিল তার লোকটার জন্যে, মানুষটাকে খানিকটা নিষ্পেষিত করবার জন্যেই তার ভালো-ভালো দুটো ধুতি দিয়ে নোংরা জায়গাটা সে নিকিয়েছে—এ-কথা মনে করে নির্যাতন করবার শখ এখন তার খানিকটা কমে গেল যেন—কাপড় দুটো লাথিয়ে লাগিয়ে ঘর থেকে বার করে দিল উৎপলা।যা হবার হয়ে গেছে, মাল্যবান মনে খুব বল, খুব সৎ সাহস সঞ্চয় করে নিয়ে বললে, এ নিয়ে তুমি মন খারাপ করতে যেয়ো না। যেন কঠিন যত্নে নিয়ন্ত্রিত জীবনের দীনতা ও আত্মশুদ্ধির গহুর থেকে (মনে হচ্ছিল উৎপলার) মাল্যবান কথা বলছে।কুলুঙ্গির থেকে সাবান নিয়ে উৎপলা হাত কচলাচ্ছিল—হাত পা ঘাড় মুখ ধুয়ে আসবে সে।কোথায় সরালে কাপড় দুটো? চুরি যাবে না তো?এ-দিককার দরজা তো বন্ধ; তবে পাশের বাড়ির ঝি-চাকর ছাদের সিড়ি দিয়ে উঠা-নামা করে সারারাত। দেখতে পেলে ওরা নিয়ে যাবে হয়তো।নিয়ে যাবে?—ঘরের ভেতর রেখে দেবে না তুমি ধুতিগুলো?কোনো কথা না বলে চৌবাচ্চার থেকে হাত পা ঘাড় মুখ খুব ভালো করে ধুয়ে এল উৎপলা। মাল্যবানের বাক্সের থেকে একটা ধোপাবাড়ির ফেরৎ তোয়ালে বের করে উৎপলা বেশ ভোয়াজ করে রগড়েরগড়ে হাত পা মুখ পিঠ মুছে ফেলতে লাগল। তারপর স্লিপার পায়ে গলিয়ে ওপরে যাবার উদ্যোগ করতে লাগল।আমর বিছানার পাশে এসে বোসো-না।না, আমি আর বসব না। এ কি, এ যে স্লিপার পায়ে দিয়েছি। আমার জুতো কোথায় গেল? ইশ, মশা কামড়াচ্ছে। যাক, চলি—উৎপলা বললে।আচ্ছা, এসো–ঘুমোও গিয়ে।শেষ রাতের একটা বসন্তবউরি পাখির মতো এক রাশ নক্ষত্র ও অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়বার আগে একটু চলকে উঠে হেসে জেগে উঠবার বেঁচে থাকবার ইচ্ছা অনিচ্ছা অতিক্রম করে (মাল্যবানের মনে হল) কে যেন উক্রান্ত হয়ে গেল। সে কি উৎপলা? একটা চুরুট জ্বালিয়ে মাল্যবান নিজেকে বললে, না, সে উৎপলা নয়; উৎপলাতে মাল্যবান যে-জিনিস আরোপ করেছে, সেই অশরীরী আত্মাটা—নেই; ছিল না; এই মুহূর্তেই সরে গেল তবু; ওপরের দিকে ওপরের ঘরে যাবার অছিলায় আরো ওপরে—বড় বাতাসে শীত রাতের ঘুরুনো সিঁড়ির শীর্ষে নক্ষত্রে মিশে গেল কোথায়।পর-দিন রাতে ওপরের ঘরে মাল্যবান বলছিল উৎপলাকে, তোমার এই খাটটা ঢের বড়।হ্যাঁ, বাবা দিয়েছিলেন আমাদের বিয়ের সময়ে। বরপক্ষকে ঠকাবার মতলব ছিল তো তাঁর।আমি তা বলছি না।উৎপলা ধোপদুরস্ত বিছানার পাট-পাট করে পাতছিল—কোনো কথা না বলে হাতের কাজ করে যেতে লাগল।আমি ভাবছিলাম, দুজন বাড়ন্ত লোক এ-খাটে বেশ এঁটে যায়।তা যায়, তাতে কী।আজ রাতে এখাটে আমি শুলেও তো পারি; পারি না?তাহলে আমাকে নিচের ঘরের খাটে যেতে হয়।কেন যাবে? মাল্যবান উৎপলাকে ভেদ করে কোনো শ্রেয়োতর আত্মার দিকে তাকিয়ে যেন বললে, আমার পাশে শুয়ে থাকবে।যা নয়, তাই। শান্ত দৃঢ়তায় বললে উৎপলা; কৃতী অভিভাবিকার মতো ঠোঁট চেপে, দাঁত চেপে।তোমার মেজদা আর বৌঠান তো এ-খাটেই শোবে। দু-জন।তা তারা শুয়ে শান্তি পায়।মাল্যবান একটা সিগারেট জ্বালিয়ে বললে, আমরা পাব না?চাইলেই ভোগে লাগে না। উৎপলা মনুকে নয়, মাল্যবানকেই বললে।তা বটে। মাল্যবান হাতের পানটা মুখে তুলবার ভরসা পেল না আর। সিগারেটটাও না খেয়ে জানালার ভেতর দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল—জ্বলন্ত সিগারেটটাবললে, এ-রকমই যদি হল, তাহলে ফুটপাথে গিয়ে শুয়ে পড়ে থাকলেই পারি।পরিপাটি বিছানাপাতা শেষ করে উৎপলা বললে, ফুটপাথে তুমি কোনো দিন শোবে না। তবে একদিন শুয়ে দেখলে পার। যাও-না, আজই যাও।আমি ফুটপাথে শুলে খুব উজ্জ্বল হয়ে উঠবে তোমার মুখ?তুমি তো নিজেই বলছ, ফুটপাথে আর ভদ্রলোকের বিছানায় কোনো তফাৎ নেই–দেখছি তো নেই। কেন নেই? কেন নেই সেটা তুমি আমাকে নিজের বুকের ওপর হাত রেখে বলবে?বলবার যখন, তখন বলা হবে, উৎপলা বললে, কিন্তু ফুটপাথে শোয়ার কী হল?যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাতে শুতে আমরা খুব আপত্তি নেই।উৎপলা মশারী টাঙিয়ে বাতি নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে বললে, আপত্তি নেই, ৩াহলে বাধাটা কীসের?মাল্যবান চকমকি ঠুকে আবার একটা সিগারেট জ্বেলে নিয়ে বলে, যাচ্ছি আমি শুতে—কোথায়? তোমার নিজের ঘরে?না–ফুটপাথে? যাও বললে উৎপলা ঘুমের লতায়-পাতায়-তন্তুতে জড়িয়ে যেতে-যেতে কাছের থেকে দূরে চলে যেতে-যেতে যেন।এসো, দেখে যাও। দেখবে না?সে আমার দেখা আছে, বলে পাশ ফিরল; ফিরে শুয়ে লেপটা ভালো করে জড়িয়ে নিতে-না-নিতেই ঘুমিয়ে পড়ল উৎপলা।নিঃশ্বাস পড়ার শব্দ শুনে মাল্যবান টের পেল একটা নিবিড় বেড়ালের চেয়েও গভীর আরামে ঘুমিয়ে পড়েছে মেয়েমানুষটি—তুলোর গরম আর শীতের ঠাণ্ডা খুব প্রবল ভাবে মিশ খেলেই হল—কেনো পুরুষমানুষের স্পর্শের দরকার নেই, উৎপলার–মাল্যবান নিচে চলে গেল।এক ঘুমের পর মাঝরাতের শীতে—গরমে–নিজের বিছানাটা মন্দ লাগছিল না তার। মাল্যবানের মনে হল, মানুষের মন সারাটা দিনরাতের প্রথম দিকটায়ও–বোকা হ্যাংলার মতো চায়—অপেক্ষা করে, সাধনা করে, যেন নিজের কিছু নেই তার, অন্যে .এসে দেবে তাকে, তবে হবে। কিন্তু গভীর রাতে বিছানায় শরীরই তো স্বাদ। শরীরটাই তো সব দেয়। মন কী? মন কে? মন কিছু নয়। বেশ নিবিড় শীতের রাতে চমৎকার শরীরের স্বাদ পাচ্ছিল মাল্যবান।পুরুষের সঙ্গে সংস্পর্শ ঘুচিয়েছে বটে উৎপলা, কিন্তু তাই বলে শরীরের স্বাদের সঙ্গে নয়। দোতলায় গভীর রাতে তার নিজের বিছানায় আশ্চর্য স্বাদ উপলব্ধি করছিল সে।
মাল্যবানের ঘরের জিনিসপত্র ব্যবস্থা আবার আগের মতন দাঁত খিচিয়ে উঠল; নোংরা হলদে কাগজের স্তুপ চার দিকে, জানালার ভেতর দিয়ে ক্রমাগত রাস্তার ধুলো ধোঁয়, অঝোর গোলাপায়রার বাসা, মেঝের চার দিকে চুরুটের টুকরো খাতলানো চরুট তামাকপাতা ছাই দেশলাইয়ের কাঠি, পাখির পালক বিষ্ঠা, পুরোনো বাতিল লণ্ঠনের টুকরো-টাকরা, ভাঙা চিমনির কাচের রাশ; তেল, অ্যাসিড, ওষুধের নোংরা শিশি-বোতলের জাঙ্গাল, হাঁড়িকুড়ি কলসি, বস্তা ও ঝুড়ি একগাদা, আট-দশ জোড়া হেঁড়া থ্যাবড়া প্যানেলা আর ক্যাম্বিসের জুতো, ময়লা জামা মশারীর নুড়ি—আশ্চর্য দৈববলে কোনো শব্দ হচ্ছে না, কোনোকিছুকে নড়তেও দেখা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু সমস্ত ঘরের ভেতর সুটকি বুড়ি ডাইনি বুড়ি গুপী বুড়িদের কান্নাকাটি হামলা বলাৎকার চলছে যেন দিনরাত,–মাল্যবান টের পাচ্ছিল, উপলব্ধি করছিল।ফুলদানীটা সে ঘরের এক কোণে ফেলে রেখেছিল। উৎপলা যখন এ-জিনিসটাকে পছন্দ করল না, তখন থেকেই এটার ভেতর কেমন একটা শ্রীছাঁদের বাপান্ত গরমিল বেরিয়ে পড়েছে যেন—এক রাশ হাঁড়িকুড়ির ভেতর ফুলদানীটাও কানা ভেঙে গড়িয়ে পড়ে রইল।এই ঘরের ভেতরেই একদিন একটা বেড়ালের ছানা আশ্রয় নিল। রাত্রে ঘুমিয়েছিল, ঘরের ভেতর মড়াকান্না শুনে উঠতে হল, উঠে বসল। বুঝতে পারল, নিশ্চয়ই এই খোলা জানালার ভেতর দিয়ে বাচ্চাটাকে ছেড়ে দিয়ে গিয়েছে কেউ। মানুষ যে-জিনিস নিজে সহ্য করতে পারে না, পরের ঘাড়ে তা চাপাতে তার এত লোভ—এমন কৌশল; ভাবছিল মাল্যবান; কিন্তু বাচ্চাটাকে নিয়ে করা যায় কী? যে-রকম ভাবে বেনো হাওয়ার মুখে হাঁ করে কাঁদছিল বাচ্চাটা, তাতে ওপরের ঘরের মানুষেরও ঘুম ভেঙে যেতে পারে।রাস্তার দিকের জানালা দিয়েই এটাকে আবার ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারা যায়–তারপর জানালা দিয়ে পারা যায় বন্ধ করে বেড়ালের ছানাটার তারপরে কী হবে, সে-কথা ভেবে মাথা ঘামিয়ে কী দরকার। পৃথিবীতে বেড়াল-কুকুরের বাচ্চারা পথ কেটে নেয়—কিংবা যায় মরে। মৃত যে, তার তো রফা হয়ে গেল; গোলকধাঁধাটা সামনের থেকে সরে গেছে; নির্দেশ চাই না, সহানুভূতি সমাশ্রয়ের দরকার নেই আর; সব-চেয়ে শান্তি বেঁচে থাকার ব্যথা, বৈভব নেই। কিন্তু তবুও সে-রকম শান্তি বেড়াল-ছানাটাকে পাইয়ে দিতে ভরসায় কুলিয়ে উঠল না মাল্যবানের।রাত দুপুর : কোথাও কোনো দুধ নেই, খাবার নেই; বাচ্চাটাকে কিছুই দেওয়ার উপায় নেই এখন; বিছানায় বসে-বসে অনেকক্ষণ এর কান্না সহ্য করতে লাগল মাল্যবান। মাল্যবান-পর্বত যেন সহ্যাদ্রি হয়ে গেলে তবুও কান্না থামবে না—এমনই আনস্ত্য এর। একে-একে অনেক কথা ভেবে যাচ্ছিল মাল্যবান; ভাবছিল, এই বাচ্চাটার বাপ-মার কথা, কেমন হাত-পা ঝেড়ে জীবনকে ঝাড়ছে তারা; এই বাচ্চার ঝাড়টাকে জন্ম দেবার আগে কালোকিষ্টি রাতে আর জ্যোৎস্না-রাতে পরীতে পেয়ছিল সে ধাড়ি বেড়াল দুটোকে; কী না করেছিল তারা; কিন্তু আগামী ঋতুর ছানাগুলোকে জন্ম দেওয়ার আগে আবার তারা দুর্নিবার ভাবে জোড় মেলাবে এসে, কিন্তু এখন তারা গত ঋতুর সমস্ত বিগত ঋতুর কৃতকর্মের দায়িত্বের থেকে খালাস। জীবনকে তারা এ-রকম করে ফাকি দেয়, তবুও প্রশ্রয় পায় জীবনের কাছ থেকে নব-নব ঋতুসমাগম হলেই-বার-বার-বার-বার! মানুষকে তো এ-রকম আচার-ব্যবহারের জন্যে ঢের গভীর শাস্তি দিত জীবন। থাক, তবুও এর বাপ-মাকে কোনো শাস্তি দিতে চায় না সে।মাল্যবানের ভাবনার মোড় ঘুরে গেল, পরীতে-পাওয়া মিথুনের কথা ভুলে গেল সে; মনে-মনে বললে, কথায়ই বলে কুকুর-বেড়ালের জীবন-বাস্তবিক, সে-সব জীবের এমিই ঢের কষ্ট। হয়তো দুচার মাস বয়েস এই ছানাটির, মা নেই, ভাই-বোন কিছু নেই জবালার ছেলের পিতৃপরিচয় নেই বলে কোনো উদ্বেগও নেই বটে, মাল্যবান, একটা চুরুট জ্বালিয়ে নিয়ে ভাবছিল—কিন্তু, মড়াকান্নায় তোলপাড় হয়ে উঠছিল; চুরুটে কয়েকটা টান দিয়ে ভাবছিল : এমন শীতের দুর্বার রাতে কোথাকার একটা মিকড়ে হারামজাদা জানালার ভেতর দিয়ে অন্ধকার খুপরির ভেতর এটাকে সটকাল!সে এক সময় ছিল বটে, মাল্যবান উপলব্ধি করল, যখন মানুষের শিশুর এ-রকম ব্যাপার হলে এতক্ষণে কত দিক দিয়ে হৈ-চৈ পড়ে যেত, কিন্তু মানুষের পৃথিবী তো আজ-কাল পাগলাগারদ—সেখানে মানুষের শিশু আর বেড়ালের ছানার একই অবস্থা।মশা নেই ঘরে; ইঁদুরে কামড়াতে পারে সেই ভয়ে মশারী টানিয়ে শুয়েছিল মাল্যবান; মশারীটা তুলে বালিশে ঠেস দিয়ে চুরুট মুখে বসে রইল সে।একটু পরে উঠে গিয়ে বাতি জ্বালাল।মানুষের নড়াচড়ার শব্দে, আলো দেখে, ভয় পেয়ে বাচ্চাটা একটু থামল। কিন্তু মাল্যবান বিছানায় এসে বসতেই আবার সেই কান্না। সমস্ত ট্রাম-বাস-লরির নটখটি ঘড়ঘড়ির চেয়ে এ-কান্না ঢের আলাদা জিনিস; এ-জিনিস সহ্য করতে হলে সৃষ্টিটাকেই বুঝে দেখতে হবে, উপনিষদের ও আইনস্টাইন হোয়াইটহেডের ঈশ্বরের হিসেবের মিল-গরমিলটাকে; অনেক সহানুভূতি সহিষ্ণুতার দরকার।মাল্যবান কেমন অসময়ে তা হারিয়ে ফেলল।বিছানার থেকে লাফিয়ে উঠে তেরিয়া হয়ে সে বাচ্চাটাকে তাড়া করল। এত জঞ্জাল এই ঘরের ভেতর—এমন সব অসম্ভব জায়গায় লুকোয়—এমন ঘাপটি মেরে পড়ে থাকে—বিছানায় ফিরে আসতে না-আসতেই আবার ভরসা পেয়ে এমন প্যানপ্যানানি শুরু করে যে, মাল্যবানের ঘেন্না ধরে গেল একেবারে।এবার সে বাচ্চাটাকে ধরলই।ধরে এমন জোরে তাকে দেয়ালে আছড়ে মারল যে, দুই মুহূর্তের ভেতরেই সেটা কাৎরাতে-কাৎরাতে মরে গেল।এর পর পাঁচ-ছ দিন মাল্যবান কারুর সঙ্গে কথাও বলতে পারল না আর। স্ত্রীর কাছে, অফিসে চোর;—সংসারের সমাজের পৃথিবীর ডাঙার ওপর দিয়ে নৌকো চালিয়ে নেয় যে মনপবনের আশ্চর্য দেবতা, তার কাছে তামাকের হুঁকোর জলের ভেতর জোঁকের মতো যেন নিঃসাড় হয়ে পড়ে রইল মাল্যবানের মন।উৎপলা যে তাকে এত উপেক্ষা করে, এটা তার ভালো লাগে, বাঘের মাসি বেড়ালকে মেরে ফেলেছে মাল্যবান, ঘরের ভেতর নারী-সোনালিব্যাঘ্রের হিংস্রতায় হৃদয়হীনতায় কেমন একটা নিপট নিগুঢ় তৃপ্তি পায় সে। নিচের ঘরের সমস্ত বিশৃঙ্খলা ও দুর্গতির ভেতর স্ত্রী-পরিত্যক্ত নচ্ছার মানুষ বলে নিজেকে সে বার-বার প্রতিপাদন করে দেখতে চায়, এ তার ভালো লাগে; নিজেকে অবিচারিতঅভালোবাসিত—বিড়ম্বিত মানুষ বলে খতিয়ে নিতে-নিতে মনটা লঘু হয়ে ওঠে তার; জীবনের থেকে কুবাতাস দুর্ভাগ্য অবিচার অভালোবাসা যদি শুকিয়ে যায়, তাহলে পথ থাকে না আর।তুমি ক-দিন থেকে মাছ খাচ্ছ না যে?কেমন আঁশটে গন্ধ। মাল্যবান বললে।কেন, পেঁয়াজ-মশলা দিয়ে বেশ তো রাঁধে ঠাকুর।ভালো করে ভাজে না-বলে দিল একটা কথা মাল্যবান।তুমি কি পুড়িয়ে খেতে চাও?না, না——মাল্যবান আঙ্গুল ছড়িয়ে, হাত মুঠো করে, আঙ্গুল ছড়িয়ে, হাত মুঠে করে বললে, বরফ-দেওয়া মাছ কি-না, কেমন কাঠের মতন। খেতে ইচ্ছে করে না।বরফ-দেওয়া মাছ এ মোটেই নয়। বেশ তো জিনিস! টাটকা। পুকুরের। নিজে কিনে আন, অথচ নিজে বুঝতে পার না?মাল্যবান কোনো কথা বললে না।কই-মাছ খেতে পার। বেশ তো লাগে খেতে।কিন্তু মাল্যবান বিনে মাছেই চালাতে লাগল। কোনো দিন দই খায়; কোনো দিন খায় না; ফেলাছড়া করে খায়। বৌয়ের ন্যাওটা নয় আর। খুব কম কথা বলে। কোনো নালিশ নেই, আপত্তি নেই, মাথার চুলে তেল নেই, দেরি নেই। অন্য অনেকে হলে মাল্যবানকে চেপেই ধরত, খুলে বলো তো, হচ্ছে কী সব, টেসে গেলে কোথায়, সাপটে না খাবে তো জাপটে ধরব বলে তোলপাড় করে তুলত তাকে; কিন্তু উৎপলার চোখে কিছু পড়ল না যেন; ভালোই হল; মাল্যবানের রক্তের মনের শান্ত সাত্ত্বিকতা নষ্ট করবার জন্যে কেউ হাত কচলাল না; সে যা চাচ্ছিল, সেই পটনিশ্চয়তা বিনিঃশেষে দেওয়া হল তাকে; বিষদাঁত উপড়ে ফেলতে চায়? সাপুড়ের চুবড়িতে থাকতে চায়? থাকুক। কেউ বাধা দিতে গেল না। কোনো গোলমাল নেই।কিন্তু একটা বেড়ালছানা খুন-মাল্যবানের মতন মানুষের জীবনেও এ-ব্যাপারটার অখাদ্য অপরাধের তীক্ষ্ণতা দিনরাতের ঘষা খেতে খেতে নষ্ট হয়ে ক্ষয় পেয়ে গেল। সে তার আগের জীবন ফিরে পেল। বেড়ালছানাটার কথা মাঝে-মাঝে মনে হয় বটে, কিন্তু তার নিজের জীবনের আবেদন ঢের বিেশ। মাছ মাংস ডিম অফিস খবরের কাগজ টাকাকড়ির চিন্তা বৌয়ের এটা-ওটা-সেটা উনপঞ্চাশটা বাতাস গোলদীঘি চুরুট—নানা রকম স্রোতের ভেতর হারিয়ে গেল সে। সাধারণ সাংসারিক মানুষ হয়ে উঠল আবার। এক-একদিন খুব বেশি রাত বিছানায় জেগে থেকে-থেকে মাল্যবানের মনে হয়, কাদাপাঁকের ভেতরে একটু শূয়োরের মতো সমস্ত দিন জীবনটা যেন তার ঘোঁৎ-ঘোঁৎ করে বেড়ায়; বেড়ালের ছানার মৃত্যু তাকে বেশ একটা চমৎকার মুক্তি দিয়েছিল : স্ত্রীর মমতা বিমুখতার ঢের ওপরে চলে গিয়েছিল সে, অফিসের কাজে যে-কোনো মুহূর্তে ইস্তফা দিয়ে চলে যাবার মতো একটা সহজ স্বাধীনতা এসেছিল মনের ভেতর, রক্তমাংসের শরীরে পাখির মতো লঘুতা এসেছিল যেন তার, যেন সে অনেক ওপরে উড়ে চলে যেতে পারে, জীবনের উপেক্ষা আকাঙ্ক্ষা লোভ কিছুই যেন নাগাল পায় না তাকে আর; চোত-বোশেখে পাড়াগাঁর দুপুরে বিকেলের অনির্বচনীয়তার ভেতর প্যাট প্যাট করে ফাড়া ওড়া শিমুলের তুলোর মতন আশ্চর্য ধীমুক্তির স্বাদ পেয়েছিল সে নীলিমায়-নীলিমায় সুর্যে রৌদ্রে আকাশ-পথের পাখির পালকে–মউমাছির পাখনায়—তারপরে কোন্ নীলিম নিঃঝুম পরলোকের দেশে। কিন্তু দিনের বেলা এ-সব কথা মনে থাকে না বড় একটা তার মনে পড়লেও দাগ বসাতে পারে না তেমন।এই-ই হওয়া উচিত। মাল্যবানের মতন মানুষের পক্ষে সমস্তটা দিন অফিস বা সংসারের অন্য যে-কোনো মানুষের মতন জীবন কাটানোই স্বাভাবিক। রাতের বেলাটাও তার তাদের মতোই কেটে যেত, যদি উৎপলার মতো এক জন সত্তমা স্ত্রী এসে বাদ সাধত। উৎপলার সম্পর্কে এসে জীবন ধাক্কা আঘাত উপলব্ধির ভেতর দিয়ে চলেছে। এ না হলে সে তার অফিসের মাইতি-দে-গড়গড়ি-গুইবাবুদের মতো এড়িগেড়ি বাচ্চায় ঘর ভরে ফেলে সিঁদুর-ধ্যাবড়ানো ফোকলাদেতো শাকচুন্নীদের নিয়ে ঘর করত। কিন্তু উৎপলাকে নিয়ে তার জীবন সে-রকম নয় তো। উৎপলা ওদের মতন নয়—আর-এক রকম।রোববার সকালবেলা মাল্যবান ঝিকে বললে, মাকে একটু ডেকে আনো তো। তিন-চার বার ঝিকে ওপরে পাঠাতে হল।উৎপলা নিচে নেমে এল; বললে, তোমার লজ্জা করে না?কেন?ঝিকে দিয়ে আমাকে ডেকে পাঠাচ্ছিলে?তোমার কাছে লোকজন ছিল, আমি তো নিজে গিয়ে ডাকতে পারি না।লোকজন চলে যাওয়া পর্যন্ত তর সইল না? আমি ওপরের ঘরে কী করি-না করি, নিচের ঘরে বসে তুমি সে-সব গণেশ ওল্টাবে! আচ্ছা পেটোয়া গণেশ তো বাবা–যাক, ওরা তো চলে গেছে—তুমিই তো তাড়ালে—যে জন্যে তোমাকে ডেকেছিলাম—আমার এই ঘরটার কথা তোমাকে কদিন থেকেই বলব-বলব ভাবছি। ঘরটা কেমন থুবড়ি খেয়ে পড়ে আছে দেখছ তো।ঘরের দিকে না তাকিয়েই উৎপলা বললে, তার আমি কী করব।তোমাকে একটু গুছিয়ে দিতে বলছি—মাল্যবানের আতলস্পষ্ট বেকুবির দিকে তাকিয়ে উৎপলা কোনো কথা বললে না আর।ওপরে যারা ছিল, তারা চলে গেছে?এ-কথার জবাব না দিয়ে উৎপলা ওপরে চলে যাবার উপক্রম করছিল; পা বাড়াতেই কী যেন একটা জিনিস টপ করে টস করে উৎপলার পায়ের ওপর পড়ে ভেঙে ঝোল ছড়িয়ে দিল শ্লিপার বাঁচিয়ে উৎপলার পায়ের মাংসে চামড়ায়। দুহাত পেছিয়ে গিয়ে আলসের দিকে তাকাতেই পাখিটাকে চোখে পড়ল; মাল্যবানের জুড়ির মতোই বোকা বোকা বেকুব পাখিটার দিকে কেমন যেন থাকতে চায় চোখ; কেমন অদ্ভুত জায়গায় ডিম পেড়েছে, ডিমটাকে ফেলে দিয়েছে হয়তো নিজের অজান্তেই বেশি নড়াচড়া ঘোরাফেরা ডানা ঝাপটাতে গিয়ে পা নাড়া দিয়ে; কী যে হয়ে গেছে, ডিম যে পড়ে গেছে, ভেঙে গেছে, সেদিকে খেয়াল নেই পাখিটার, হারানো নষ্ট ডিম সম্বন্ধে কোনো চেতনা নেই। কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছে আলসের ওপর, গলা ফুলিয়ে বক-ব্রুকম-ব্রুকম-ব্রকম-ব্রুক ইর-র-রিরম-র-রুক করছে পাখিটা। উৎপলা জোরে-জোরে হাততালি দিতেই আরো একটা পাখি বেরিয়ে এল বীমের আড়াল থেকে; উড়ে চলে গেল পাখি দুটো।মেঝের ওপর পাখির বিষ্ঠা পালক ভাঙা ডিমের লালা নিজের আঁশটে এঁটো পায়ের দিকে তাকিয়ে উৎপলা বললে, খুব আগুনদার সোনার দরে গুদোম ভাড়া দিচ্ছে বুঝি জংলি পায়রার ঝাড়–তা দিচ্ছে, উৎপলার কথা ফুরোবার আগে মাল্যবান বললে; বেশ সমাহিত শান্তভাবে বললে, পাখিরা আর কদূর কী করবে; মানুষরা পাখিদের চেয়ে শয়তান; নাহলে পৃথিবীটা এরকম পৃথিবী হয়! নাঃ, ও-পাখিগুলোকে আমি কিছু বলি না।আমি জাল পেতে রাখব। এক-একটা করে ধরে ঠাকুরকে দেব। এ-সব কেঁদো পায়রার মাংস খেতে বেশএকটা বেড়ালের ছানা মেরে ফেলেছিলাম এক দিন, মাল্যবান বললে, উৎপলার কথা সে শুনেছে-কি-না-শুনেছে, বোঝা গেল না; সেই থেকেই এ-সব বিষয়ে খুব সাবধশনে চলতে আরম্ভ করেছি। এসব প্রাণীদের কিছু বলি না আমি।বেড়ালের ছানা কে মেরেছিল?আমি। মাল্যবানের চোখ খানিকটা বুজে এল।কবে?এই দিন পঁচিশেক আগে।কোথায়?এই ঘরেই।কৈ আমি দেখিনি তো।সে রাত-দুপুরে হয়েছিল; কে এক জন ক্যাঁক করে ছেড়ে দিয়ে গেল। বাচ্চার কান্নায় আমার ঘুম ভেঙে গেল। তারপর—বলে সে থামল।সেটাকে চাড় দিয়ে থেঁৎলে দিলে তুমি?মাল্যবান উৎপলার মুখের দিকে তাকাল একবার; পকেট থেকে একটা চুরুট বার করে নিয়ে চোখ বুজে ভেতরের দিকে তাকাল মাল্যবান; ভিজে পর্দার ওপর কামলণ্ঠনের ছবির মতো এসে পড়ল সব : সেই রাত্রি, সেই বেড়ালের ছানা, ছানাটাকে (ছবি চলতে আরম্ভ করল) কেমন বিশ্রী ও নিকষ অপকৌশলে ধরে ফেলেছিল সে—কেমন অন্ধ হয়ে দেয়ালে আছড়ে মেরেছিল, কেমন কাত্রাতে-কাত্রাতে মরে গেল বাচ্চাটা—সেই সবের দিকে আপ্রাণ করুণায় দাঁত-মুখ খিচিয়ে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাল্যবান বললে, মানুষ হওয়া হবে কবে, তাই ভাবছি; কোনো দিক দিয়েই হতে পারিনি তো আজো। চেষ্টা করছি; করছি? মুক্ষিদের কিছু বলি না আমি; ময়লার লপসি করছে ঘরদোর; খুব ভোগান্তি বটে, কিন্তু তাতে আর কী, আমি নিজের মনে থাকি; ওদের চাল-চিঁড়ে দিই, যব খেতে ভালোবাসে, মেঝের ওপর ছড়িয়ে রাখি, খায় আর হাগে, হাগে আর খায়; মানুষের ভেতর দু-চার জনকে ছেড়ে দিলে প্রায়-মানুষই এদের চেয়ে ঢের খারাপ কাজ করে। বলতে-বলতে মাল্যবান লজিকের সিড়ি ভেঙে-ভেঙে অবশেষে উৎপলার পায়ের দিকে না তাকিয়ে পারল না, পাখির ডিমের লালায় ঝোলে নষ্ট হয়ে গেছে পাটা—কিন্তু এই পাখিগুলো, উৎপলার আগাপস্তলায় চোখ দুটোকে বেশ খানিকক্ষণ পাক খাইয়ে নিয়ে মাল্যবান বললে, একেবারে বেহেড হয়ে ডিম পাড়ে। যেন পাবাদামের গাছ থেকে বাদাম টপাটপ করে ঝরে। দিন-দিন মাল লোকসান করে,মাল্যবান কিছুক্ষণ চুপ মেরে থেকে হাতের চুরুটটা জ্বালিয়ে নিয়ে আকাশ-পাতালের অনেক বিশৃঙ্খল ঢেউ গুনে দেখল, তাদের সাজিয়ে নিয়ে কোনো নির্দেশের মতো মুক্তোপ্রবাল দেখল যেন জ্বলে উঠে জলের শিখর-চুড়ো হয়ে যেতে, এবং বেশ খানিকক্ষণ পরে সেই অনলটিকেই ব্যাখ্যা করে বললে, কিন্তু, তাই বলে গুলতি ছুঁড়ে ওদের মারা উচিত কি? উচিত নয়।তারপরে স্পষ্ট হয়ে বললে, তোমার নীলাম্বরীটা ঠিক আছে তোত ভিজিয়ে দেয়নি তো?আহা, কী মানিয়েছে তোমাকে এই ময়ূরকণ্ঠী নীলে—মাল্যবান ভাবছিল, যেন উত্তরাকে নেত্য শেখাচ্ছেন বৃহন্নলা। নাচের ঘোরে মিলে-মিশে গেছে উত্তরা-বৃহন্নলাকে উৎপলা কে বৃহন্নলা–অনির্বচনীয় দেখাচ্ছে উৎপলাকে;–অথচ দাঁড়িয়ে আছে, সত্যিই তো আর নাচছে না, নড়ছেও না; অথচ দেখাচ্ছে উৎপলাকে যেন ক্ষুরধারের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—পুরুষের যে-তিলোত্তম পেলে মেয়েমানুষকে মহানারীর মতো দেখায়, সেই রকম।আমাকে কয়েকটা বালিশের ওয়াড় তৈরি করে দেবে? বলো তো কয়েকগজ মার্কিন নিয়ে আসি।উৎপলা যাবার জন্যে তৈরি হল, থাক, দর্জির বাড়িই দেওয়া যাবে।স্ত্রীর সঙ্গে সেও ওপরে চলল।গিয়ে চললে, আমাকে একটা পান দিতে পার? ভেবেছিলাম, ছেড়ে দেব। কিন্তু লোভ সামলাতে পারি না।কিন্তু, উৎপলা নড়ছিল-চড়ছিল না; ছাদের ওপর রোদে বাতাসে একটা ডেক চেয়ারে বসে ঘাড় কাৎ করে বেণী খসাতে লাগল! খুব আমেজ এসেছে উৎপলার শরীরের রসে উপলব্ধি করে নিজেরও গ্রন্থিতে-মাংসে একটা মন্থর, সুখ্যাত মদির সুখানুভব ছড়িয়ে পড়ছিল মাল্যবানের। কিন্তু, ওপরে থেকে লাভ নেই কোনো, মাল্যবানের মনে হল; এখন নিচে চলে যাওয়া উচিত। নিচে গিয়ে মাল্যবান ঠিক করল, ঘরদোর সে নিজেই গোছাবে। তারপর মনে হল, ঝিকে দিয়ে গুছিয়ে নেবে। ঝি রান্নাঘরের কাজে ব্যস্ত ছিল। মাল্যবান একটা বিড়ি জ্বালিয়ে ভাবল, গুছিয়ে কী লাভ!কিন্তু পরক্ষণে সে নিজেই গোছাতে লাগল। বিশৃঙ্খলা ও নোংরামির ভেতর মনটা কেমন রিচখিচ করে ওঠে; কিন্তু সেদিনকার মতন পর্বত ঝেড়ে নিখুঁত ভাবে গোছাতে গেল না; ঘরটা ঝাঁট দিয়ে, জিনিসপত্র ঠিকঠাক রেখে দিয়ে, বিছানার চাদর বদলে, নোংরা কাপড়গুলো কাছেই একটা লন্ড্রিতে ফেলে দিয়ে এসে কাজ সাঙ্গ হল তার।রাতের বেলা বড্ড শীত; মোজাগুলো সব ছেড়া, একটা পুলওভার কিছুতেই কেনা হয় না, গায়ের আলোয়ান তেলে জলে রোদে বাতাসে ছাই হয়ে ছিড়ে-ছিড়ে পড়ছে, কয়েকটা তালিও মেরেছে সে, বড় বিশ্রী লাগে, একটা নতুন আলোয়ান কিনতে ইচ্ছে করে, ডোরাকাটা কালো মশারীটার ছ্যাঁদার অন্ত নেই, নোংরা পচা ছারপোকা গুঁইগুই করছে, একটা মস্ত বড় ছিবড়ের জঙ্গল হয়েছে মশারীটা।রাতের খাওয়া-দাওয়ায় পর নিচের ঘরে একটা ঠাণ্ডা টিনের চেয়ারের বসে মাল্যবানের মনে হচ্ছিল, দূর, এ-রকম জোড়াতালি দিয়ে জীবন কাটিয়ে কী লাভ, কার লাভ!বিছানায় এসে বসে মনে হল, জীবনটা এই রকমই হ্যাচকা ব্যাপার। বিছানায় শুয়ে পড়ে কেই বা এখন শুতে যেত ভাবছিল মাল্যবান; বসে-বসে কথাবার্তা গল্প–তারপর শীতের রাতে—তারপর সারাটা শীতের রাত–এমন স্ত্রী কি আমি পেতে পারতাম না। হড়পা বানের ঠাণ্ডা স্রোতে যেন মুর্গি আমি হাঁসের মতো সাঁতার কাটতে চাচ্ছি, বাজপাখির মতো উড়ে যেতে চাচ্ছি। আমার জীবনের বানচালের ব্যাপারটা এই রকম। কিন্তু বড় বেশি আত্মপ্রেম হয়ে পড়েছে তো আমার : যেন একটি ব্যক্তি ছাড়া পৃথিবীতে আর কেউ নেই, যেন ব্যক্তিসমুদ্র নিয়ে যে মানুষের ও সময়ের ইতিহাস তৈরি হচ্ছে সেটা কিছু নয়। লেপ মুড়ি দিয়ে শীতের খুব গভীর রাতে আজকের আবহমানের ও ব্যক্তিসমুদ্রের রোল—যা নির্ব্যক্তিত্বে বিশোধিত হয়ে ফেণার কণার মতো তাকে টেনে নিয়ে চলেছে অন্ধকারের থেকে খুব সম্ভব আরো ব্যাপক অন্ধকারের ভেতর—সেই সুর শুনতে পেল সে; অতএব আলোকিত হয়ে উঠল যেন তার মন; আস্তে-আস্তে সময়ের আশ্চর্য সমগ্রতার কাছে আত্মসমর্পণ করে স্থির হয়ে উঠতে থাকল তার মন।…এত বেশি স্থির হল যে সে ঘুমিয়ে পড়ল।
পৌঁষ মাসের শেষাশেষি মেজদার পরিবার এল। মাল্যবান একটা মেসে গিয়ে উঠল। মেস ঠিক নয়-মাঝারি-গোছের একটা বোর্ডিং। একটা আলাদা কামরা বেশ গুছিয়ে নিল সে। মেজদা আর বৌঠান কিছুতেই ছাড়তে চায়নি মাল্যাবনকে, কিন্তু তবুও সব দিক ভেবে সুবিবেচনা করে মেসেই যেতে হল তাকে।মেসের লোকজনের সঙ্গে আলাপ করবার বিশেষ আগ্রহ ছিল না তার। অফিস থেকে এসে নিজের জীবনের বিপর্যয়ের কথাই সে ভাবত–যে পর্যন্ত না ব্যক্তিঅতিক্রমণার দূর সমুদ্রসুর শুনতে পেত সে : সে-শব্দ শুনতে গিয়ে রাত বেশি হয়ে যেত—ঘুম আসত তার আগে; সে-সুর প্রায়ই আজকাল শোনা যেত না, আসত না, স্পষ্ট করে ধরা দিতে চাইত না। গোলদীঘি কাছে ছিল–বেড়াতে যেত। এক-এক দিন নিজের বাড়িতে গিয়ে তত্ত্বতলব নিয়ে আসে—চার দিকে ঘুরে-ফিরে দ্যাখে মেজদা ও বৌঠানের অমায়িক নিয়ে আসে—চার দিকে ঘুরে-ফিরে দ্যাখে মেজদা ও বৌঠানের অমায়িক মুক্ষিমিষ্টত্ব উপভোগ করে। তারা এমন চমৎকার মানুষ হয়তো খুঁটিনাটি নিয়ে দুজনে বচসা করছেন, কিন্তু তার ভেতরেও পরস্পরের জন্যে এক নাড়িরই টান যেন, এক জোড়া বসন্ত বউরির মতো নীড়ের বাইরে, মুহূর্তেই নীড়ের ভেতরে যেন মানুষের মতো শরীর ও বোধ নিয়ে—প্রত্যেক কথার ভেতর দিয়েই যৌনসম্বন্ধের মিছরি মাখানো ভালোবাসার মর্ম ফটে উঠছে। দেখে মাল্যবানের লাগছে মন্দ না, মানে খারাপ লাগে, কেমন বিশ্রী লাগে যেন : ব্যক্তিজলরাশি ভুলে গিয়ে ব্যক্তিকে, নিজের কী হল না হল, সেটাকেই সব চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেয় বলে।এ-জিনিসটা উপলব্ধি করে ব্যক্তিজলরাশির নিশ্চিহ্ন জলরৌদ্ররাশির ভেতর মিলিয়ে যেতে চেয়ে ঈষৎ ভাঙ খেয়ে কেমন ভালো লাগছে যেন তার, এমনই একটা আস্বাদে মিষ্টি গলায় মাল্যবান বলে, মেজদা, আপনাদের শুতে তো কোন কষ্ট হয় না?না। এই তো বেশ বড় ছাপ্পর খাট হয়েছে।ওখানে একাই শোন বুঝি আপনি?না।ছেলেপুলেরা শোয় বুঝি আপনার সঙ্গে?ওরা নিচে শোয়—পিসির কাছে।মেজদা বললেন, উনি আর আমি শুই এখানে। একা-বিছানায় ঘুম হয় না—পাশে যা হোক অন্তত একটা শাড়ির খসখসানি উশখুশানি না থাকলে চলে না। বুঝলে কি না…মাল্যবান নিজের কপাল থেকে একটা ডাঁশ উড়িয়ে দিল।মেজদা গলা খাকরে বললেন, বিছানার চারদিকটা বেশ উম হয়ে থাকা চাই তো…হা হা…মেজ বৌঠান হামানদিস্তেয় পান ছেঁচতে-ছেঁচতে ঘরের ভেতরে ঢুকে হেঁচা পানের বড়ি পাকিয়ে বিরাজবাবুকে দিয়ে গেলেন। তার পর হাত ধুয়ে বিরাজবাবুর দাবনা ঘেঁষেই যেন বসলেন—কোনো সঙ্কোচ নেই। মাপলারটা বিরাজের গলায় ভালো করে জড়িয়ে দিলেন, বললেন, বড্ড শীত; বালিশের নিচের থেকে এক জোড়া চকোলেট রঙের মোজা বের করে বিরাজ মিত্তিরের বাঁ পায়ের গোদে, সরু ডান ঠ্যাঙে পরিয়ে দিলেন মাঝবয়েসী আঙুলের সুকুশল সক্রিয়তায়—মোমের ঝরানির থেকে বেশি মধুর ঝরানির থেকে উঠে এসে যেন!মেসে এসে মাল্যবান যেন ফঁপরে পড়ে গেল, কেউ নেই তার, কিছু নেই। এখানে ছোকরারা থাকে, আর থাকে এমন সব লোক—বিশেষ এক রকম শারীরিক সুখের জন্যে যাদের সব সময়েই লালা ঝরছে; রাতের বেলা বেরিয়ে যায় তারা কোথায় থাকে—কী করে? কোনো দিন শেষ-রাতে ফিরে আসে, কোনো দিন আসে না। মেসের যাদের এ-রকম রাত করা বাতিক নেই, তাদেরও লালা ঝরছে বিশেষ এক রকম শরীর গ্রন্থির সুখের জন্যে মেসের রাতের বিছানায় শুয়ে থেকে। বছরের-পর-বছর সারাটা জীবন এরা মেসেই কাটিয়ে দেয়। এছাড়া এদের গতি নেই—কিছু নেই—সংসার করবার শক্তি নেই।বিছানায় শুয়ে পড়ল সে; কিন্তু সেই মুহুর্তেই ওঠে বসল। বারান্দায় পায়চারি করতে লাগল। গোলদীঘিতে গেল। ফিরে এল সেখান থেকে। খবরের কাগজ নিল; রেখে দিল; চরুট জ্বালাল; নিভে গেল; ঠাকুর ভাত দিয়ে গেল।পরদিন সকালবেলা মাল্যবানের মেসের ঘরের কাছে রেলিং-এর ওপর কতকগুলো কাক এসে ডাকছিল। মাল্যবান তার স্ত্রীর মুক্ষি-ওড়ানোর মতো ঝটপট হাততালি দিয়ে হা-হা করতে-করতে উড়িয়ে দিল সেগুলোকে। পাশের ঘরের একজন ভদ্রলোক বেরিয়ে এসে বললেন, দেখলেন মশাই, কী-রকম বিরক্ত করে! কাল আট আনার কচুরি-হালুয়া এনে টেবিলে রেখে একটু মুখ ধুতে গেছি, এরই মধ্যে ঘরের ভেতর ঢুকে খাবারের ঠোঙা লোপাট—এই কাকগুলো?হ্যাঁ, স্যার।বড্ড বেয়াদব তো—কিন্তু মাল্যবানের ইচ্ছে হচ্ছিল, এই কাকগুলোকে ডেকে সে কিছু খেতে দেয়—এগুলোকে উড়িয়ে দিয়েছে বলে কেমন একট খালি-খালি লাগছিল তার। রোজ সকালে সে ঘুমের থেকে উঠবার ঢের আগেই পূবের দিকের এই রেলিং-এর ওপর বসে কাকগুলো ডাকতে থাকে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে তার পাড়াগাঁর কথা মনে পড়ে-মার কথা; সেই খড়ের ঘর—এম্নি শীতের ভোর—এম্নি কাকের ডাক। কোথায় গেল সে-সব!মাল্যবান ঘরের ভেতর ঢুকে টেবিলের কাছে বসে এই সব কথা ভাবছিল। এম্নি সময়ে কুয়াশার ভেতর দিয়ে একটা একা-কাক উড়ে এসে মাল্যবানের ঘরের পাশে ট্রামরাস্তার দিকের রোয়াকের রেলিংএর ওপর বসল আবার। মাল্যবান অনেকক্ষণ একঠাই বসে কাকটাকে দেখতে লাগল–তার ডাক শুনছিল। পাড়াগাঁয় দাঁড়কাক থাকে, পাতিকাক থাকে;-কলকাতায় পাতিকাক; দাঁড়কাক দেখছে না তো। অনেক দিন দাঁড়কাক দ্যাখেনি; একটা দাঁড়কাক দেখেছিল বড় রাস্তার একটা মস্ত বড় বিজ্ঞাপনের ছবিতে; একটা মদের বোতলের টাইট-ছিপি ঠুকরে খুলতে চাচ্ছে—ফ্রান্সের বিখ্যাত মদের গন্ধে এম্নি তোলপাড় হয়ে গিয়েছে প্রাণীটি। মদের বোতলের বিজ্ঞাপনের দাঁড়কাক, কিন্তু তবুও চোখ তুলে দেখবার মতো : এক ঝলকে জীবনের অনেক কটা বছরের আকাশ বাতাস পাখি প্রাণী সমাজ উপলব্ধি উজিয়ে দিয়ে গেছে।কাকটা উড়ে গেল কুয়াশার ভেতর দিয়ে—গোলদীঘির দিকে—একটা নিম গাছের ভেতর। এম্নি উড়ে যেতে ভালো লাগে।পাড়াগাঁর বাড়িতে প্রকাণ্ড বড় উঠোন ছিল তাদের, ঘাসে ঢাকা, কোথাও বা শক্ত শাদা মাটি বেরিয়ে পড়ছে, তারই ওপর সারাদিন খেলা করত রোদ ছায়া মেঘের ছায়া আকাশের চিলের ডানার ছায়া—রোদে দ্রুততায় চলিষ্ণু হীরেকষের মতো তার ছটকানো। শালিখ উড়ে আসত উঠোনে; খড়ের চালের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত বক—এই সরোবর থেকে সেই সরোবরে যাবার পথে, ডানায় তাদের জলের গন্ধ, ঠোঁটে রঙের আভা চকিত চোখ দুরের দিকে, নীলিমার দিকে। কত উঁচু-উঁচু গাছ ছিল উঠোন ঘিরে; সারাটা শীতকাল ঘুঘুর ডাকে জারুল ঝাউ পাবাদাম আমের বন নিম হিজলের জঙ্গল কেমন ফুকরে ফুকরে উঠত—রোদের দিকে পিঠ রেখে নিজের শরীরটাকে একটু এলিয়ে দিলে সমস্ত শরীর ঘুমে ভরে উঠত সেই পাখির ডাকে। মাঝে-মাঝে উঠোনে এসে পড়ত ঘুঘু, কেমন কলের মতো, পাখিদের দেশের ক্ষুদে পেঁকির পাড়ের মতো ঘুঘুদের লেজগুলো উঠত পড়ত উঠত পড়ত—ঘুর ঘুর ঘুর ঘুর করে ছুটে যেত তারা মাঠে ঘাসে-কী খুঁজত—কী চাইত? সেই পঁচিশ-তিরিশ বছর আগের শীতের ভোরের কুয়াশার ভেতর সেই সব পাখি যেন পৃথিবীর মনে কোনো দিন ছিল না; আজকের পৃথিবীটা কলকাতার বাণিজ্যশক্তির গোলকধাঁধা নিয়ে এম্নি অদ্ভুত অপৃথিবী। ফিকে কফির কোকোর মতো রঙের গলা ফুলিয়ে কত পাতিকাক উড়ে আসত খড়ের চালে, উঠোনে; শন-শন করে উড়ে যেত ঠাণ্ডা জলের ওপর দিয়ে ছুঁই-ছুই করে কোনো নদীকে কোনো দীঘিকেই না ছুঁয়ে, জলের ভেতর ঝাপসা প্রতিফলিত হয়ে, শাঁ-শাঁ করে কোথার থেকে উড়ে যেত তারা কোথায়; সকালের কুয়াশার দিক থেকে দুর বিদিকের পানে উড়ে যেত সেই কাকগুলো পৃথিবীটাকেই টেনে বার করবার জন্যে, উজ্জ্বল সূর্যটাকে সবাইকে পাইষয় দেবার জনে—যারা কাক নয়, পাখি নয়, তাদের জন্যেও কু-ক—কেমন শতচেতনার হাঁকডাক, সালিশি, নির্জনতা।
সরস্বতী পূজোর দিন মাল্যবানের ঘরের পাশেই বোর্ডিং-এর কয়েকজন জনে মিলে খুব মদ খেল। বোর্ডিং-এর একটা হলের মতো ঘরে বাঈনাচ হয়। বোর্ডিং-এর ঝি বাবুদের সঙ্গে পাশা-পাশি চেয়ারে বসে নাচগান দেখল-শুনল; মাল্যবান অবাক হয়ে দেখছিল, ঝি একটুও সঙ্কোচ বোধ করছে না—এ যেন তার পাকাপাকি অভ্যাস; বাবুদের মায়ের মতন কখনো তার ঠাট, কখনো কারু-কারু বিশেষ গিন্নি যেন সে, তেম্নি ভাবগতিক; কখনো-কখনো সকলের অন্তরঙ্গ বন্ধু যেন-নম্র অমায়িক, সকলকে হাতের ভেতর গুছিয়ে নেবার জন্যে ব্যস্ত, নানা রকম সহজ সুলভ ছেনালিতে সরস। কাল সকালেই গিয়ে তো আবার বাসন মাজতে বসবে। তখন এর ন্যালাভ্যালা মুখের দিকে মাল্যবান অন্তত তাকিয়েও দেখতে যাবে না। এই বাবুরাও কোনো তক্কা রাখবে কি? কিন্তু আজ রাতে একে দিয়েই আসর জমানো। আসর জমাচ্ছেও মন্দ না। পান চিবোয়-সিগারেট টানে—গালগল্পের পাট নিয়ে এর কাছে তার কাছে ফেরে—একে না পেলে কয়েকটি বাবুর অন্তত আজ রাতের অনেকখানি ফুর্তি মাটি হয়ে যেত।মাল্যবান সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে ভাবার-মাথায় ভাবছিল : সরস্বতী পূজোর সঙ্গে এ-সবের কী সম্পর্ক! মদ বাঈনাচ ঝি—এ-সবের কী দরকার। কিন্তু এ-আসরের মধ্যে এমন কথা সে হয়তো একাই ভাবছিল। একাই সে কেমন এক! নিস্তব্ধ-কেমন যেন ঝক মেরে গেছে অন্য সবাইয়ের হল্লা জৌলুশের তুলনায়। কিন্তু এ-কথা ঠিক, এদের কারুর ওপরই কোনো বিমুখ ভাব ছিল না তার।মদ খেল না অবিশ্যি, আজ কেন যেন সিগারেট টানতে গেল না, দুএকটা পান চিবুল মাত্র, কিন্তু আসর থেকে উঠে গেল না তো বসে-বসে নাচগান দেখছিল-শুনছিল। গয়মতী (মানে কী এ-নামের?) ঝিকে নিয়ে সবাই ফুর্তি করছিল, কিন্তু এই মাকরের ঠ্যাং ফিঙের ঠ্যাং, কাতলের মুখ ভেটকির মুখের মতো মেয়েমানুষটির দিকে তাকিয়ে মাঝে-মাঝে ভারি দুঃখ হচ্ছিল মাল্যবানের। ইলেকট্রিক লাইটের আলো মাঝে-মাঝে মেয়েটির টিমটিমে চোখে এসে পড়ে, বাতির কড়া কড়কড়ে ঝঝে সে কষ্ট পায়, এমন দুঃখ হয় মাল্যবানের; মাথার থেকে ঘোমটা খসে পড়ে মেয়েটির, ছোট্ট খুকিদের মতো এতটুকু একটা খোঁপা বেরিয়ে পড়ে—বড় কষ্ট লাগে মাল্যবানের; একটা ভাঙা চেয়ারের খোঁচা খেয়ে মেয়েটির শাড়ির অনেকখানি ছিড়ে যায়, নিজে সে তা বুঝতেও পারে না, কিন্তু মাল্যবানের সংবেদনায় গিয়ে লাগে খুব,—খুব; মেয়েটি সিগারেট টানতে-টানতে প্রায়ই বুকে হাত দিয়ে কাশে—সুবিধের লাগে না মাল্যবানের; কাশে যখন মেয়েটি, তখন তার চোখ দুটো মাছের মতো গোল হয়ে ওঠে—বড় বিশ্রী দেখায়—মাল্যবানের খারাপ লাগে, কেমন দুঃখ করে এই অদ্ভুত হাড্ডিসারের জন্যে, এই ব্যক্তিটির জন্যেই। মাল্যবান খুব ভালো বোধ করছিল না, অবাক হয়ে ভাবছিল, এত সিগারেট টানছে, এতে কি সুখ পাচ্ছে গয়মতী, টানছে। আর ক, এত কাশছে তবুও এরকম খিচে সিগারেট টানছে, খুবই অদ্ভুত ভারি মজার বোধ হত জিনিসটাকে, কিন্তু দুঃখ হতে লাগল মাল্যবানের।চার-পাঁচ জন বাবু মিলে ঝিকে আলাদা একটা কামরায় নিয়ে গেল। মাল্যবান নিজের ঘরে চলে যাচ্ছিল, তাকিয়ে দেখল ঝিকে সবাই মিলে মদ খাওয়াচ্ছে।মাল্যবান হাঁটতে-হাঁটতে ভাবল : এ কী-রকম ফুর্তি! কিন্তু তবুও প্রতিবাদ করতে গেল না; প্রতিবাদ করবার মতো চোপা নেই তার, সে-শক্তি ও ঐশ্বর্য নেই; সে তাগিদও নেই; সে জানে, পৃথিবীর অনেক দিকেই এ-রকম অনাচার অজাচার চলেছে, কেউ রোধ করতে পারে না, কারুর রোধ মানে না।তেতলায় উঠে অন্ধকারের মধ্যে বারান্দায় খানিকক্ষণ সে পায়চারি করল। তারপর রেলিং-এর কাছে এসে নিচের দিকে তাকাল একবার; দেখল, সেই ঝি কলতলার পাশে বসে মুখ থুবড়ে বমি করছে; তার আশে-পাশে দুজন সঙ্গী শুধু। মেসের ঠাকুর বামদেবলম্বা হিরগিরে মানুষ—মুখটা অনেকটা স্যর ত্রৈলোক্যের মতো—ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাং চড়িয়ে খানিকটা দুরে দেয়ালে ঠেস দিয়ে নিরাসক্ত ভাবে খইনি টিপছে—মাঝে-মাঝে মাকড়সার জালের মতো জড়িত চোখের দৃষ্টি তুলে ঝির দিকে তাচ্ছে; কি বসে পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ছাপরা জেলার পূর্ণ কুর্মি। লোটা বেঁটে, কালো, মুখে বসন্তের দাগ, উঁচু-উঁচু শাদা—খুব বেশি শাদা দাঁত থেকে তবুও বিশ্রী গন্ধ বেরোয়; কিন্তু হাসি-হাসি মানুষ; এই মেসে সব চেয়ে এই ঝিকেই ভালোবাসে সে। ঝি কাকে ভালোবাসে? পূর্ণকে নয়—ঠাকুরকে নয়, কাকে জানে না মাল্যবান। উঠে-পড়ে ভালোবাসার ব্যাপারে লেগে গেছে পূর্ণ আজ; ট্যাঁকে আজ কিছু টাকা আছে তার; ঝির সঙ্গে আজ রাতে কাজ হবে তার।ওপর থেকে হঠাৎ এক সঙ্গে কয়েকটা গলার রোশনচৌকি বেজে উঠল যেন পূর্ণ! পূর্ণ! পূর্ণ!ওপরে মাল খাস্ত পড়েছে হয়তো—মদের কিংবা মাংসের অথবা সোডা ওয়াটারের; এখুনি দোকানে ছুটতে হবে পূর্ণকে।গয়মতী বললে, তুই যা পূর্ণ, বামদেব আছে, হুই বসে আছে—ওই ওতেই হবে—দেড়টা নাগাদ আসিস তুই।পূর্ণ আড়ামোড়া ভাঙতে-ভাঙতে বসে বাঁকিয়ে নতুন মাটির কেঁচোর মতো শরীরটাকে পাক খাওয়াল কিছুক্ষণ। তার পরে ঠা করে হাওয়া দিল।বামদেব বললে, পরকাল ঝরঝরে করে রাঁড়ি তো হয়েছিস। কিন্তু আমি চক্কোত্তি বামুন, মনে রাখিস, পয়সা-টয়সা পূর্ণর মতো আমি দিতে পারব না।তুমি বামুন আছ, আমিও হাড়ির মেয়ে নই, আমার বাপের নাম সীধু—সরকার—গোবরার সেই সীধু না-কি রে? ওই যে আসত, আর তুই পাৎ পেড়ে দিতি।কসবার সীধু সরকার, তুমি দ্যাখোনি তাকে।সরকারও এক রকম কায়েত বটে, বামদেব একটা ঢেকুর তুলে বললে, যাক গে, শোন বলি কায়েতের মেয়ে, বমি করলি যে?ও-সব খাওয়ার অভ্যেস নেই আমার।একটু বেসামাল হয়ে গেছিস, গয়া; আর বমি করবি?না।বমি-বমি করে যদি বল আমাকে, আমি তো তোর পিঠে হাত দিলেই বেরিয়ে যাবে সব হড়-হড় করে—নাঃ। শান্তি হয়েছে। গয়মতী বললে, হাড় নড়ে ঠাণ্ডা হচ্ছে শরীলের ভেতর।তবে চ—কোথা?আর কোথা, বাবুদের খাওয়াদাওয়া হয়ে গেছে ই তো খেয়ে আঁশবটি হাতে করে উগড়ে ফেললি সব ভ্যাক-ভ্যাক করে দেখে-দেখে আমার হয়ে গেছে, আর খেয়েছি আমি।নাও, নাও, খেয়ে নাও গে। গয়া বললে খুব আত্তি দেখিয়ে, খইনি টিপছ তো টিপছই নাও ওঠো।পিবিত্তি নেই, মুখটা কেমন যেন ভেঙে-চুরে ফেলে বামদেব বললে, সারাদিন কড়া আগুনে রাঁধতে-রাঁধতে, তোর বমি দেখতে-দেখতে খাবার হাঁড়ি পেটের ভেতর শুকিয়ে আমার শালকাট হয়ে গেছে, গয়া!কলতলায় বসে ছিল এত-ক্ষণ, মাথায় একটা আলতো ঝাকুনি দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে গয়া বললে, এও বলি বাপু, ভালো ঠেকছে না আমার কেমন যেন ঠ্যাকার তোমার, বাপু, ভারি ঠ্যাকারে হয়েছ! তোমার নাম ধরেই ডাকছি তোমাকে, বামদেব—খাবে না? সত্যিই কিছুই খাবে না!নাঃ, অন্ন খাব না আজ আর, মেষ্টান্ন খাব!আচ্ছা! আচ্ছা! একটা মরুঞ্চে শ্যাওড়াগাছের মতো বাতাসের ঝাপটায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল যেন হাসতে-হাসতে গয়া। রোয়াকের ওপরে বামদেবের কাছেই এসে বসল সে।পূর্ণ কি দেড়টার সময়ে আসবে বলেছে?কে জানে কী বলেছে, ভারি বিপদে গণে বামদেবকে সালিশ মেনে ক্লান্ত মলিন চোখ দুটো বামদেবের চেনা চাওয়া-রসে খানিকটা স্পষ্ট করে তুলে গয়া বললে, বড্ড হুজ্জোৎ করে পূর্ণ। ও-সব দেইজিপণা হবে না আজ।বাঃ, কী করে হবে, তোমার তো একটা মেয়েমানুষের গতর, গয়া। ও চায় সেটাকে পাঁচখানা করে নিতে।বামদেব শিবিরাজার আশ্রিত পাখিকে ভরসা দিয়ে বললে, ও-সব কালকেউটের জন্যে বেউলার রাত জাগতে হবে না, গয়া। আমি তোমাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাব, ও বিষদাঁত সেঁধোতেই পারবে না।শুনতে-শুনতে মাল্যবান নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকল। বোর্ডিং-এর খাওয়াদাওয়া মাল্যবানের ভালো লাগছিল না। কী কতকগুলো ভঁটা খোসা চোকলা-চাকলা দিয়ে একটা ঘাট বানায়—রাঁধতে পারে না—তেল-মসলা খরচ করে না—বাজারের থেকে ভালো মাছ-তরকারি আনতে পারে না; এ-রকম হলে এ-বোর্ডিং ছেড়ে যাব আমি।একদিন বোর্ডিং-এর ম্যানেজার গোটা তিনেক পাঁঠা এনে নিচের ঘরের একটা গুদামে বেঁধে রাখল। সারাদিন পাঁঠাগুলো চাচায়, মাল্যবান কেমন একটু অস্পষ্ট অমানবসাধারণ ভাবে চিন্তা করে ভাবে এই যবক্ষার শীতে বেচারিদের কী কষ্ট! হয়তো এরা টের পেয়েছে, মরতে হবে শীগগিরই; আমিষ গন্ধ যেন পেয়েছে, নিজেদের মৃত্যুর; মানুষের হাতে তৈরি যে সেটা, তাও বুঝেছে। সৃষ্টি, মাল্যবান ভেবে যেতে লাগল, প্রকৃতি এদের এত মোক্ষম কাম প্রবৃত্তি দিল কেবলি সন্তান বানিয়ে কেবলি সেগুলোকে ধ্বংস করবার জন্যে। এদের লালসার বাড়াবাড়ির সুবিধে নিয়ে এদের দিয়ে কেবলি এদের ঝাড়বংশ বাড়াচ্ছে কাটছে—খাচ্ছে মানুষ। মানুষের চেয়ে বড় শয়তান কে আছে এই সৃষ্টির ভেতর! শয়তান। শয়তান।মাল্যবানের মন বেঁকে দুমড়ে গেল কেমন যেন, ইচ্ছে হচ্ছিল ম্যানেজারকে গিয়ে বলে, এগুলোকে আপনি ছেড়ে দিন, আচায্যিমশাই, টাকাটা আপনাকে দিয়ে দেব আমি। কিন্তু, ছেড়ে দিলে কী হবে, অন্য-কেউ ধরে খাবে। নিজেদের সুমাংস নিয়ে এরা মানুষ-সমাজ থেকে অক্ষত হয়ে এড়িয়ে যাবে? কোথায়? কোন অজব্রহ্মাণ্ডে? তা তো নেই।ম্যানেজার মনোহর আচায্যি তিনটি বেশ পুরুষ্টু তেলচুকচুকে পাঁঠা এনেছে। বোর্ডিং-এর সকলেই পাঁঠার মাংস খাবার জন্যে খুব ব্যস্ত, কবে পাঁঠা কাটা হবে এ নিয়ে চারদিকে এমন একটা প্রবল তাগিদ, সব্বায়েরই জিভে এত জল যে মাল্যবান এদেরি মধ্যে এক জন মানুষ, ভাবতে গিয়ে মনে হল, সহজ বিবেকেই মাংস খায় মানুষ, যেমন ফল-ফসল খায় সহজ বিবেকে; কেবলমাত্র তার মতন এক-আধ জন মানুষের বিবেকে এসে খোঁচা লাগে; মানুষ হিসেবে সেটা হয়তো অস্বাভাবিক; নিজেকে খানিকটা অস্বাভাবিক মনে হল তার—মানুষ হিসেবে। মাল্যবান ঠিক করল; এ-পাঁঠার মাংস সে খাবে না।কিন্তু চার পাঁচ দিন পরে ম্যানেজার পাঁঠা তিনটি বিক্রি করে ফেলল; ঠাকুর পলতার তরকারি ট্যাংরা মাছের ঝোল আর কলাইয়ের ডাল দিয়ে সাজিয়ে ভাত নিয়ে এল। মাল্যবানের মনটা কেমন একটু বিরস হয়ে উঠল, বললে, ঠাকুর, মাংস আর আমাদের কপালে জুটল না। কিন্তু, খেতে-খেতে মাল্যবান নিজেকে ধিক্কার দিতে-দিতে বলল : ছি, তিনটে প্রাণীর জীবনের চেয়ে আমার মাংস খাওয়া হল বেশি।পর-দিনই গুদামঘরে দুটো পাঁঠা দেখা গেল আবার; মাল্যবান একটু ধাক্কা খেল; ভাবল : এ আবার কী। ভাত খেতে-খেতে ভাবল : ও মাংস আমাদের খাবার জন্যে নয়, হয়তো পাঁঠার ব্যবসা ধরেছে ম্যানেজার। ভেবে—খানিকটা টেসে গেল তার সাত্ত্বিক উপলব্ধির সমস্ত তোড়জোড়।সন্ধ্যের সময় ম্যানেজার নিকুঞ্জ পাকড়াশিকে বলছিল, না, না, এ-পাঁঠা আমি কালই কাটব।শুনে কেমন একটু ভরসা পেল যেন মাল্যবান। গোলদীঘিতে ঘুরতে ঘুরতে ভাবল; জীবন এমনি নোংরা হয়ে পড়েছে আজ-কয়েক টুকরো তো মাংস, সে-জন্যে দুটো প্রাণীর মৃত্যু আমার কাছে এমন আশা-ভরসার জিনিস হয়ে দাঁড়াল! কিন্তু, এ তো স্বাভাবিকতা, শেয়াল বেড়াল চিতে-বাঘ কেঁদো-বাঘের মতো মানুষ হিংসাত্মক তো। মানুষ হয়ে স্বাভাবিক ভাবে অহিংসা করে বেড়াবার পথ নেই তো তার। কিন্তু, তবুও মাল্যবান সংকল্প করল, এ-মাংস সে খাবে না।এবং খেল না বটে, কিন্তু মাংসের বাটি ফিরিয়ে দিতে ভারি বেগ পেতে হল তার, রাবড়ির তিন চামচে ঝোল মোটেই সরস লাগল না, খুব সক্রিয় আক্রোশে ম্যানেজার ঠাকুরের ওপর মারমুখো হয়ে উঠল তার মন। মানুষের জীবন সহজ সুন্দর মোটেই নয়, মাল্যবানের নিজের জীবনটাও সরল নয়, সত্য নয়, অনুভব করছিল সে।
মেসের বিছানায় শুয়ে সমস্ত লম্বা শীতের রাত এক-এক দিন বেশ ঘুম হয় তার। এক এক দিন ঘুম তেমন হয় না–বারান্দায় পায়চারি করতে থাকে। ইচ্ছে হয়, পরের দিনই বাড়িতে চলে যাবে সে; সকালবেলাও সেই ইচ্ছে থাকে। কিন্তু বেলা যত বাড়তে থাকে, ততই সেই ইচ্ছের অস্বাভাবিকতা বুঝতে পারে সে, মেসের জীবনের থোড়-বড়ির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়।।এক-এক দিন শেষ-রাতে গভীর অন্ধকার ও শীতের ভেতর ঘুমের বিছানা এত ভালো লাগে, জীবনের হৈ-হুটপাট রলরোল এত নিরর্থক মনে হয় যে, ভোরের আলোর কথা মনে করে ভয় করে তার।মাঝে-মাঝে সে খুব সুন্দর স্বপ্ন দ্যাখে।বোর্ডিং-এর অনেকগুলো রাত তার বেশ চমৎকার কেটে গেল। একটা জিনিস খুব ভালো লাগে এক জন ছিপছিপে লম্বা সুন্দর যুবক রোজ শেষ-রাতে নানারকম ইংরিজি বাংলা কবিতা আওড়াতে-আওড়াতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়; মাল্যবান আলোড়িত হয়ে ভাবে; এর জীবনে সমারোহ আছে বটে, কিন্তু সেটা ফিচেল জিনিস নয়, সত্যিই গভীর; ওর মতন জীবন পেলে হত।সকালবেলা কুয়াশার ভেতর দিয়ে এক-একটা কাক মাল্যবানের বারান্দার রেলিং-এর ওপর উড়ে আসে, কুয়াশার এলোমেলো ছেড়া-ছেড়ার ভেতর দিয়ে ডানা মেলে গোলদীঘির দেবদারু নিমগাছের দিকে মিলিয়ে যায়; প্রকৃতির দিঙনির্ণয়ী মন নড়ে ওঠে যেন। কুহক অনুভব করে মাল্যবান। কিন্তু তবুও অতিপ্রাকৃত নয়—কী স্বাভাবিক ভাবে নিবিদ এই আলো পাখি আকাশের ভাষা।একদিন সকালে একটা কাক মাল্যবানের রেলিং-এর ওপর এসে বসল। কাকটা ঘুরে বসে মাল্যবানের দিকে তাকিয়ে অনেক বার ডাকবার চেষ্টা করল, কিন্তু কিছুতেই গলার ভেতর দিয়ে আওয়াজ বেরোল না পাখিটার। গলায় হিম লেগে স্বর বসে গেছে। আবার যে আওয়াজ ফিরে পাবে পাখিটা হয়তো তা বোঝে না। নিজের গলার আওয়াজ হারিয়ে না জানি কী সে ভাবছে। মাল্যবান তাকে একটা বিস্কুটের টুকরো ছুঁড়ে দিল। কাকটা ঘরের ভেতর ঢুকে বিস্কুটের টুকরো-টাকরা খাচ্ছে, কাগজপত্রের ভেতর খচখচ করে লাফাচ্ছে। মাল্যবানের ঘরে অনেকক্ষণ রইল কাকটা-কয়েক টুকরো বিস্কুট খেল।হপ্তাখানেক পরে বোর্ডিং-এর বারান্দায় পায়চারি করতে-করতে মাল্যবান দেখল, গাঁটরি-বোঁচকা নিয়ে একজন ভদ্রলোক বোর্ডিং-এর একটা বড় অন্ধকার দুর্গন্ধ কামরায় চুপচাপ বসে আছে। যেমন কামরা, তেমন তার মানুষ—এ-দুজনের দিকে তাকালে জীবনের প্রত্যাশা ভরসা ভুইপটকা হয়ে ফুরিয়ে যায়। মাল্যবান কয়েকদিন দেখল, ভদ্রলোক চুপচাপ বসেই থাকেন শুধু, কারুর সঙ্গে কথা বলেন না, কিছু না। মাঝে-মাঝে চশমা এঁটে এক-আধটা বই তুলে নেন, কিন্তু পড়া যে বেশি দূর এগোয়, তা মনে হয় না।একদিন ভদ্রলোকটির ঘরের ভেতর ঢুকে মাল্যবান বললে, কেমন আছেন?নাকের ডগা থেকে চশমাটা কেমন একটা এলোমেলো টুনটুনির ঠ্যাঙের মতো খসিয়ে নিয়ে বাঁ হাতের আঙুল দিয়ে দুটো চোখ কচলাতে কচলাতে বললেন ভদ্রলোক, আমার শরীর বিশেষ ভালো নেই।কী হয়েছে?এই কদিন থেকেই জ্বর—তা, এ-ঘরে থাকেন কেন—কোথায় থাকব আর?পকেট থেকে জড়িবড়ি একটা ন্যাকড়ার নুড়ি বার করে চোখের পিচুটি পরিষ্কার করতে করতে ভদ্রলোকটি বললেন, স্ত্রী মারা যাবার পর থেকেই বাসা ছেড়ে দিয়েছি–ওঃ!এই মাস-পাঁচেক হল মারা গেছেন। পঁচিশ-তিরিশ বছর এক নাগাড়ে ঘর-সংসার করেছি। ছেলেপুলে নেই। এখন আর পোডড়া বাড়িতে মন টেকে না। পয়মন্তদের মুখ দেখতে চলে এলুম তাই—আপনাদের পাঁচজনের।মাল্যবানকে শুধোলেন, আপনার স্ত্রী বেঁচে আছেন তো?আছেন—আছেন—মাল্যবান কেঁপে-কেঁপে মন্ত্ৰপড়ার মতো করে বললে।বাপের বাড়ি গেছেন বুঝি? মাল্যবান একটু থতমত খেয়ে বারান্দার রেলিং-এর দিকে, যেখানে কাকগুলো এসে বসত সে-দিকে; কুয়াশার যে শুড়িপথের ভেতর দিয়ে গোলদীঘির নিমগাছে উড়ে যেত তারা সে-দিক পানে, তাকিয়ে রইল।বাস্তবিক, আমাদের অবস্থা আপনি বুঝবেন না,ভদ্রলোক কঁচাপাকা দাড়ির ওপর হাত রেখে বললেন, কেউ বোঝে না। আমার স্ত্রী একটা শাদা উলের গোলা হাতে করে হাসতে-হাসতে চলে গেলেন—উলের পেটি?হ্যাঁ, ভেস্ট বুনছিলেন আমার জন্যে—ওঃ!বুনছিলেন আশ্বিন মাসে দেশে শীত পড়বার আগে! গ্যালো শীতে গরম জামার অভাবে খুব কুঁদেছিলুম; না, তত বেশি কুঁদিনি বটে, আমি তো ছেলেমানুষ নই; তবে কোঁ-কোঁ করতুম খুব, সত্যিই ভারি শীতকোঁৎকা হয়ে গেছলুম, টের পেয়েছিলেন উনি। কাজেই এবারে উলের জামা বানিয়ে দিচ্ছিলেন—ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আমাকে বলেছিলেন যে তোমাকে দুদিনেই ভেস্ট বুনে দোব; বলে দিনরাত কুরুচ কাঁটা চালিয়ে যেতে লাগলেন। একুনে চারটে হাত, বুঝলেন মশাই, দুহাতে ভেস্ট বোনো, দুহাতে সংসারের ব্যাগার ঠ্যালো; বাটনা কুটনো রান্না, আমার চানের জন্যে গরম জল, আমার বাতকোমরে তেল মালিশ,ধনেশ পাখির তেল, আমার নাম বিপিন ঘোষবিপিনবাবু বললেন, সে আর এক হিস্ট্রি, আপনাকে পরে বলব কী করে ধনেশপাখির তেল জোগাড় হল; রাস্তায় যে ফিরি করে, বেড়ায়, সে-জিনিস নয়, খাঁটি মাল, এতেও আমার গিন্নির হাত ছিল—গিন্নি বটে, বিপিন ঘোষের দিকে তাকাতে-তাকাতেই মাল্যবান তার চোখ দুটোকে হোঁৎ করে কড়িকাঠ ঘুরিয়ে এনে খুব একটা সার্থকতা বোধ করে বললে, এখেনে-সেখেনে পাঁচি খেদি, এর বউ ওর বউ—সব ভঁটো তোতাপুরি তো। আপনি হাড়েমাসে কিষেণভোগটা পেয়েছিলেন, দাদা, আহা-হা, চলে গেলেন!আপনাদের পাঁচজনের আশীবাদে পেয়েছিলুম, বিপিনবাবুর কঁচা ঘায়ে খোচা লাগলেও নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি বললেন, চলে গেছেন আপনাদের আশীর্বাদ মাথায় করে—মাল্যবান অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল, এ-কথা বলতে গিয়ে বিপিনবাবু একটুও টসকালেন না, কারখানার থেকে শিরা, গ্রন্থি, হৃৎপিণ্ড তৈরি করে এনেছে যেন লোকটা।উলের জামা দু দিনেই শেষ করে এনেছিলেন প্রায়—এই এত বড় প্রমাণ-সাইজের ভেস্ট, দেখছেন তো আমার কেমন দশাসই চেহারা–বিপিন ঘোষ পকেট থেকে এক বাক্স কাঁচি-সিগারেট বার করে মাল্যবানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, নিন, স্যার–নিজে একটা জ্বালিয়ে নিয়ে বললে, ভেস্ট বোনা শেষ হয়ে এসেছে, এমন সময় আমি তাকে সাত-পাঁচ একটু বিশেষ ঘরোয়া আলাপ—মানে, আমিই তাকে সেদিনকার রাত্তিরটার জন্যে আগের থেকে বায়না দিয়ে রাখছিলাম; কথায়-কথায় ওঁর কেমন বুননের ঘর ভুল হয়ে গেল—সমস্ত জামাটাকে খুলে ফেলতে হল আবার—আহা!আবার মরিয়া হয়ে আরম্ভ করলেন। তার ওপর রাতে কিছুটা অত্যাচার হলে সেই বায়নার কাজে; কাজটা একটু বাড়াবাড়িই হয়ে গেল—প্রায় শেষ-রাত অব্দি। রক্তের চাপ বেড়ে গেল খুব। সকালবেলা একটু দেরিতে উঠে রোদে গিয়ে দাঁড়ালেন সেই উল আর কুরুচ কাঁচা নিয়ে। আমি একটা জলচকিতে বসেছিলুম মুখোমুখি। আমার সঙ্গে হেসে-হেসে কথা বলতে-বলতে, ব্যাস, ভিরমি খেয়ে পড়ে গেলেন। তখুনি হয়ে গেল—বিপিন ঘোষ আর কোনো কথা বললেন না। একটা সিগারেট—দুটো সিগারেট—তিনটে সিগারেট শেষ করলেন তিনি। তারপরে মাল্যবানের দিকে তাকিয়ে নিজের গলার কণ্ঠাটার ওপর হাত রাখলেন বিপিন ঘোষ। চোখ দুটো অনবরত নাচতে লাগল তার। একটা জহরকোট গায়ে এঁটে তাড়াতাড়ি নিচে নেমে গেলেন তারপর।
মাল্যবান অবিশ্যি সেই দিনই অফিস থেকে ফিরে উৎপলার কাছে গেল।গিয়ে বললে, না, মেসে আর না।কেন?আমি আজই চলে আসছি।কোথায় থাকবে, শুনি।যে জায়গায় ছিলাম—নিচের তলা—সেখানে জায়গা নেই।মাল্যবান বললে, এ-বাড়ির কোনো ঘাপটিতে পড়ে থাকব, সে-জন্যে ভাবতে হবে না–ক্ষেপেছ? উৎপলা একটু মেজাজে-মেজাজে বললে, আড়ি পাতবার জায়গা নেই বাড়িতে; তুমি বেশ রঙে আছ খুব যা হোক। সঙ্কুলান হবে না, তোমার মেসেই থাকতে হবে; ওদের তো আমি তাড়িয়ে দিতে পারি না।কিন্তু, এটা তো আমার বাড়ি।তা যদি বললো, তাহলে মেজদাকে নিয়ে আমরা অন্য ফ্ল্যাট ভাড়া করি—না, না, সে-কথা আমি বলছি না—একটু বলার বাড়াবাড়িই হয়ে গেছে অনুভব করে মাল্যবান বললে, তুমি চলে গেলে এ-বাড়িতে এসে কী হবে আর। সে তো মেসের মতনই হয়!একটা কথা বলতে হবে বলে মাল্যবান বললে, মেসের বিছানায় শুয়ে থেকে এক-এক দিন রাতে বড় ভরসা হারিয়ে ফেলি। আমার মনে হয়, যদি মরে যাই, তাহলে তোমার সঙ্গে আর কোনো দিন দেখাউৎপলার মুখের দিকে তাকিয়ে মাল্যবানের জুৎ লাগল না তেমন; যে-কথাটা পেড়েছিল, সেটা শেষ করতে গেল না আর বললে, ঐ যা, আমার লাইফ-ইনসিয়োরেন্সের প্রিমিয়ামগুলো দিয়ে দিয়েছ তো। টাকাকড়ি তো তোমার কাছে রেখে গিয়েছিলাম—খরচ হয়ে গেছে।খরচ হল! তা হবেই তো, আজকাল তো রাবণের চিতে জ্বলছে কিনা এই বাড়িতে।মেজদা বলেছেন তোমাকে আর-একটা পলিসি নিতে।তা আর হয় না।কেন, বয়েস তো তোমার আছে।না, বয়েসের জন্যে নয়।মেজদা বলেছেন, মেডিকেল টেস্টে ঠেকবে না, তিনি পাশ করিয়ে দিতে পারবেন।তিনি এজেন্ট, তাঁর গরজ ঢের, মাল্যবান এঁচড়ে পাকা ছেলের মতো একটু ঠাট্টা অমান্যির হাসি (মনে হচ্ছিল উৎপলার) ছড়িয়ে বললে। কেমন সেয়ানার মতো মুখ করে বসে রইল, আসল জায়গায় মাল্যবানকে ধরা যতো সহজ মনে করেছিল উৎপলা, তা নয় যেন।মেজদার কম্প্যানিতেই তোমার করা দরকার।তা জানি জানি। করবার সাধ্যি থাকলে করতাম বৈকি। যে—দুটো আছে, তা ল্যাপস না করলেই আমাদের কুলিয়ে যাবে–না, না, করে ফ্যালো।টাকা নেই।সে আমি বুঝব।তা দেখো। কিন্তু আমি যা বলছিলাম, মেসে থেকে কেমন ঢল শুকিয়ে যায়–এক-এক দিন রাতে; বিয়ে করবার আগে তো মেসে থাকতাম, কিন্তু এখন পারছি না, কিছুতেই পারছি না। মেসের বাবুরা বলে, বেশ বনে-জঙ্গলে তো চরছেন দাদা হাতির মতো, আবার খেদার হাতি হবার সাধ।বলে নাকি?আমি তো বাড়ির হাতি, মাল্যবান বললে, বন দিয়ে আমি কী করব?বল নাকি তুমি? রাজবাড়ির হাতি বল নাকি নিজেকে?বলি শিববাড়ির হাতি—কেন, শিব বাড়ির কেন?ঐ যা মুখে আসে, তাই বলি। আমি কাল মেস থেকে উঠে আসব।মেসে গিয়ে তোমার শরীর সেরেছে, উৎপলা বললে, হুট করে কিছু করে বোসো না। থাকো মেসে কিছুদিন। মেসেই তো বরাবর ছিলে, মেস-মেস ধাত হয়ে গেছে তোমার, ঘর-সংসার মানাচ্ছে না ঠিক। সেদিন আমার ভাইপো-ভাইঝিদের জন্যে নিচের ঘরটা গোছাচ্ছিলাম, মেজবৌঠান বললে, ঘরটাকে শালগ্রামটি মেসের কামরার মতোই করে রেখেছে দেখছি—তাই নাকি? তুমি কী বললে?বলব কী আর। বুদ্ধি খরচ করে কথা বলতে হলে চুপ করে থাকতে হয়।মাল্যবান চারদিকে চোখ পাকিয়ে তাকালে, একটা ঢেঁকুর তুলল, গোঁফের কোণায় একটা মোচড় দিয়ে বলল, মেজ বৌঠান যা খুশি তা বলুন। আমার স্ত্রী-সন্তান নিয়ে নিজের মনের ভাবে থাকবার অধিকার আমার রয়েছে। আমার যা খাসদখল, তা ফেলে মেসে গিয়ে আমি থাকব?মাল্যবান একটা চুরুট জ্বালিয়ে নিয়ে বললে, স্বামীকে কি মেজ বৌঠান মেসে পাঠিয়ে সুখ করেছেন?উৎপলা ঢিলে খোঁপা খসিয়ে ফেলে চুলের গোছা হাতে তুলে আঁট করে খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে বললে, ওদের তো আর আমাদের মতো নয়—হয়েছে, হয়েছে, মাল্যবান শিংশপা রাক্ষসীকে কাছে না পেয়ে দাঁত দিয়ে কামড়ে চুরুটটাকে সেপাট করতে-করতে বললে, পাঁচ রকম দশ রকম, সব রকম জানা আছে আমার। ল্যা-ল্যা করতে-করতে আমি পরের বাড়ি চড়াও করতে যাই না তোমার ভাজের ভাতারের মতো। আমার নিজের রকম নিয়ে আমি নিজের বাডি থাকব—শালগ্রাম হব, শিবলিঙ্গ হব—যা খুশি হব—ওদের কী—উৎপলা মেজাজ না চড়িয়ে ঠাণ্ডা ভাবেই বললে, ঠিক কথাই তো। তবে কালকে হবে না। আট-দশটা দিন পরে এসো, নিচের ঘরটা তোমাকে ছেড়ে দেবার ব্যবস্থা হচ্ছে—শুনে মাল্যবানের মনের গরমটা স্নিগ্ধ হয়ে এলো আট-দশ দিন পরে?হ্যাঁ।নিচের ঘরটা খালি করে দেবার ব্যবস্থা হচ্ছে?তা হচ্ছে।কে করছে ব্যবস্থা?আমরাই।ব্যবস্থা তো হচ্ছেই তার জন্যে, উৎপলাই ব্যবস্থা করছে, মিছেই চুরুটাকে কামড়ে ছিড়ে ফেলেছে সে। লোকসানি চুরুটটাকে ফেলে দিয়ে পকেট থেকে একটা টাটকা চুরুট বের করে মাল্যবান বললে, আমি ও-সব তেমন মানি-টানি না, তবে তথ্য হিসেবে জিনিসটা মন্দ নয়—কোন জিনিসটা?ঐ যে—আমাদের রাজযোেটকে বিয়ে হয়েছিল-তোমার মেজদা ঠোঁট ওল্টালেও তোমার বড়দা সেজদা খুশি হয়েছিলেন——তোমার বাবা তো খুবই–মাল্যবান খুব গনগনে, আগুনে বেশ বানিয়ে ফেলল চুরুটটাকে কথা বলার ফাঁকে-ফাঁকে চুরুটটাকে বেশ প্যাঁচ মেরে টেনে-টেনে। কড়া গলায় একটু চাপা হাসি হেসে উৎপলা বললে, কে, বলেছিল তো পরেশ ঘটক।হ্যাঁ, তিন রাত্তির মাথা ঘামিয়ে তিনি স্থির করেছিলেন।রাজযোটক, উৎপলা ফিক করে হেসে উঠল শঙ্খিনীর মতো চনমনে গলায়; রাজযোটক-বিয়ের ফলাফল ফ্যাকড়া টেংড়ি বোলো গিয়ে পরেশ ঘটককে তার নিবন্ধের বাইরে।তুমি পণ্ডিতকে উড়িয়ে দিতে চাও।পাণ্ডিত্য দিয়ে আমার কোনো দরকার নেই, আমি যা অনুভব করি, তাই বলি।কী কর তুমি—অনুভব?কথা বাড়াতে পারি না। উৎপলা তুষের আগুনে যেন বাতাস লাগিয়ে একটু ধিক-ধিক করে উঠে বললে, এখন তোমাকে মেসে থাকতে হবে। আট-দশ দিনে নিচের ঘরটা খালাস করে দেয়া যাবে হয়তো, বলেছিলাম; কিন্তু তা হবে বলে মনে হয় না, মাস দেড়েক তো লাগবেই।উৎপলা এক পাটি সুন্দর দাঁত বের করে হাসবার মতো মুখ করে তবুও না হেসে গম্ভীর ভাবেই বললে। দেখতে-দেখতে দাঁতের পাটি অদৃশ্য হয়ে গেল তার। ঠোঁটের ওপর ঠোঁট মিশ খেয়ে কঠিন হয়ে রইল খুব আঁট সিঁদুরের কৌটোর মতো।মেসে কদিন থাকব?যদ্দিন দরকার।মেজদারা কবে যাবেন?তা আমি কী করে জিজ্ঞেস করব তাঁদের?তাঁদের নিজেদেরও তো একটা বিবেচনা থাকা দরকার।উৎপলা মাল্যবানের থেকে কয়েক ধাপ ওপরে দাঁড়িয়ে থেকে যেন বললে, সেটা কি তুমি তাদের শিখিয়ে দেবে?হাতের চুরুটটার দিকে চোখ পড়ল মাল্যবানের। চুরুটটা দাঁতে আটকে নিয়ে টানতে লাগল। টেনে-টেনে বেশ ছাই জমেছে যখন চুরুটের মুখে তখনও সে কী করবে আর—চুরুটটা টানতে লাগল। কয়েক মুহূর্ত কেটে গেলে মনে পড়ল মাল্যবানের। বিপিন ঘোষের গল্পটা উৎপলাকে বলতে শুরু করল! মুখবন্ধ শুনেই উৎপলা বললে, দুধপোড়া গন্ধ বেরুচ্ছে না?কৈ, না তো।না, না, গল্পটা শোনো : ও, পাশের বাড়িতে দুধ উথলে পড়েছে হয়তো—পাশের বাড়িতে যে, তার টের পেল উৎপলা; নাক আছে তার, কান আছে, আরো নানা রকম সূক্ষ্ম পক্ষী সংস্কার পশু অনুভূতি রয়ে গেছে তার, পাশের বাড়ির ঠাকুরটা যে হেঁসেল থেকে সরে গিয়ে পানের দোকানে গল্প করছে, তাত চোখ কান খাড়া করে টের পেয়ে নিচ্ছিল সে, তবুও একটা খিচ রয়ে গিয়েছিল উৎপলার মনে। আমাদের দুধ পুড়লে সব্বোনাশ—মেজদার—তোমার উনুনে দুধ নেই। আমি জানি। এই তো হেঁসেল থেকে ঘুরে এলাম রাঙী ছাঁচড়া রাঁধছে—মাল্যবান চুরুট নামিয়ে বললে।উৎপলা তার ঘন কালো চুলের (বেণীর ভেতরে কোনো ট্যাসেল জড়ানো নেই) মস্ত বড়ো আবদ্ধ খোঁপার ওপর হাত রেখে চাপ দিতে দিতে বললে, না রে বাপু, তোমার বিপিন ঘোষের কেচ্ছা শোনবার সময় নেই আমার। তুমি নিড়বিড়ে বলেই ও-সব বিশ্বেস করো। খুব ভোগা দিয়েছে বিপিন ঘোষ; কিছু টাকা খসিয়েছে নিশ্চয়।মাল্যবান বিক্ষুব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললে, টাকা যদি কিছু চাইত আমার কাছে, আমি দিতাম বৈকি। কিন্তু টাকা চাইবার লোক বিপিন ঘোষ! তা নয়। তুমি তার সঙ্গে কথা বললে বুঝতে পারতে। লোকটার বাস্তবিকই সব গেছে। দশ মিনিট বসে পর-পর তিনটে সিগরেট খেল—আমার সঙ্গে একটা কথাও বললে না—তারপর একটু গলার কণ্ঠায় হাত দিতেই চেখ মুখ একেবারে পাঁশগাদার কুকরোটাকে কোথাও দেখতে না পেয়ে মোচলমানের ধেড়ে মোরগের মতো ভেঙে পড়ল যেন বিপিন ঘোষের। কোনো কথা না বলে একটা জহরকোট গায়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল।মাল্যবান বিপিন ঘোষের সঙ্গে একশোয়াসে হয়ে গেছে; যেন তারই স্ত্রী মরেছে, ঘর ভেঙে গেছে, কিন্তু তবু ত অন্তর থেকে সহ্য করবার শক্তি শানিয়ে নিতে হচ্ছে তার, এমনই একটা ভাঙা কাসি জোড়া দেবার মতো ভরাট, সাহসিক মুখে উৎপলার দিকে তাকাল তার স্বামী।এমন উল্লুকও থাকে তোমার ঐ বিপিন ঘোষের মতো।উল্লুক বললে, উৎপলা?তোমার ট্যাক থেকে খসায়নি তো কিছু?কেন খসাবে? তুমি ভেবেছ কী বলো তো দিকি—ভোগা দিয়ে খসায়নি তো কিছু তোমার মতন ঢ্যাপঢেপে মানুষের কাছে থেকে? উৎপলা চেখে-মুখে চিনি মিছরির দানা ছড়িয়ে মাল্যবানের কোমরে একবার নিজের হাতটা জড়িয়ে নিয়ে বললে; ভালোই করেছে তাহলে। কিছু লাগবে আমার কাজ। কত আছে সঙ্গে! মাল্যবানের গলায় একবার হাতটা জড়িয়ে নিয়ে মিষ্টিমুখে একটা হ্যাচকা টান দিয়ে বললে, যা আছে, তাই দাও।মাল্যবান গড়িমসি করতে-করতে বললে, দিচ্ছি। কিন্তু আজ আর মেসে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না। এখানে একটা রাতের ব্যবস্থা হতে পারে।টাকা হাতে নিয়ে উৎপলা বললে, খেতে তো পারো এখানে এ-বেলা।না, না, খাওয়ার কথা নয়; একটু ঘুমোবার ব্যবস্থা হতে পারে। কোথায় শোও তুমি?আমার পঞ্চাশটা টাকার দরকার।আচ্ছা, ধার করে দেব।–কবে!কালই। আজ পঁচিশ টাকা দিচ্ছি। কোথায় ঘুমোয় মনু?—আর তুমি— পরদিন মাল্যবান এসে বললে, ভেবেছিলাম, শীগগির এদিকে আসব না আর।উৎপলা কোনো কথা বলছিল না।কৈ, না এসে পারলাম না তো তবু। মাল্যবান একটা চেয়ার টেনে বসল।ওখানে বসলে যে?কেন কী হয়েছে?দেখলে, আমি নিরিবিলি একটু কাজ করছি।শুনে মাল্যবান একটু তাড়া দিয়ে বললে, তা কাজ করো—কাজ করো—আমি তো বাধা দিতে আসিনি। কার জন্যে ব্লাউজ সেলাই করছ?সেলাই-এর কলের হাতলটা আগলা মঠোয় ধরে ঘোরাবে কিনা ভাবছিল উৎপলা। জামাটাকে কলের সঁচে ঠিক করে গুছিয়ে নিয়ে উৎপলা কল চালাতে লাগল।সেলাইএর কল তোমার লক্ষ্মী। কেমন বন বন করে ঘুরছে তোমার হাতে বিষ্ণুর চাকার মতো একেবারে সতীদেহ কেটে ফেলে বাঃ! বাঃ! বললে মাল্যবান; সতীদে কেটে ফেলার কথা বলে সুভাষিতই বলেছে মনে হল মাল্যবানের; নিজের মনের বিজ্ঞান নির্জনে যে অপর—উৎপলাকে কাঁধে নিয়ে ফিরছে সে টুকরো-টুকরো করে কেটে দিচ্ছে এ-উৎপলাকে।উৎপলা বেশ কল নিয়ে থাকতে পারে, এস্রাজ সেতার নিয়েও। বড্ড একঘেয়ে লাগে রাতের বেলা মেসে; এস্রাজ শিখে নিলে হত।তুমি বাজারে এস্রাজ?কেন, হবে না আমার?বলে হরিকাকা কাছা দাও; হরিকাকা বলে, কাছা আমার খসল কোথায় যে দেব–উৎপলা কল ঘোরাতে ঘোরাতে ঘুরিয়েই চলল, পট করে সুতো কেটে যাওয়ায় একটু থেকে নেড়ে-চেড়ে বললে, না, কাটেনি, ঠিকই আছে।ববিনে সুতো আছে?আছে, ঠিক আছে, হাওড়া ব্রিজ হয়ে আছে; নাও, সরো—দিক কোরো না।মাল্যবান উৎপলার হাতের চাকা-ঘুরুনিব দিকে তাকিয়েছিল বটে, কিন্তু মনটা চোত মাসের ফলকাটা তুলোর মতো কত শত বাতাসে—শতধা নীলিমায় যে উড়ছিল।ছেলেরা রাস্তায় সাইকেল হাঁকিয়ে যায় বেনেটোলা, নবীন পালের লেন, পটলডাঙা, কলেজ স্ট্রিট, কলাবাগান, হাতিবাগান, গোয়াবাগান—চৌরঙ্গীর চৌমাথা। ভারি রগড়, কিন্তু এক-একটা জিনিস কিছুতেই শিখতে পারলাম না–বাইক করা, উর্দু বলা, পায়জামা চপ্পল শেরওয়ানী কিংবা সায়েবী স্যুটে পাড়ায়-পাড়ায় ল-ল করে বেড়ানো—উৎপলা চুপচাপ কল ঘোরাতে-ঘোরাতে আরো বেশি নিঃশব্দ নিঃসম্পর্ক হয়ে পড়ল।কেরানীর চাকরি আমাকে জুতিয়ে মারল। ইচ্ছে করে এই সব ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে একটু নিজের ভাবে থাকি, তুমি সেতার বাজাও, আমি শুনি—সারাটা দিন এইরকম।উৎপলা কলের দাঁতের ভেতর থেকে ব্লাউজটাকে বের করে এনে একবার চোখের সামনে ছড়িয়ে দেখছিল; সেলাইএর এখনো ঢের বাকি। মাল্যবান যে অনর্গল পাঁচালী পেড়ে চলেছে, সে-দিকে কান না দিলেও অবচেতনার পথ দিয়ে মনের কানে কিছু কিছু শুনেছিল।ধরো, আর কুড়ি-পঁচিশটা বছর তো সামনে রয়েছে। জীবনের একটা রকমারি হবে নাকি এর মধ্যে? কী বলো তুমি রকমারি হবে তো বটে? ভালো হবে-সুভালাভালি কেটে যাবে? কী বলল গো?আরো কুড়ি বছর বাঁচবে বলে আশা কর?বেঁচেও তো যেতে পারি।অত বেশি বেঁচে কী লাভ? উৎপলা ব্লাউজের দিকে মন রেখে তবুও নিজের কথার দিকে মন দিয়ে শান্তভাবে; আমার নিজের কথাও বলছি—জীবনে আমাদের কী সম্ভব অসম্ভব বুঝলাম তো অনেক দিন বসে; এখন শান্তিতে সরে পড়লেই তো বেশ–উৎপলার কথা শুনে মাল্যবান খানিকটা বিরক্ত বিচলিত হলপকেট থেকে মনের ভুলে বিড়ি বের করে জ্বালিয়ে ফেলছিল, প্রায়, কিন্তু স্ত্রীর সুমুখে বিড়ি সে আজকাল খায় না, সিগারেটও বার করলে না, বললে, বিদায় নিলে আমিই নেব, বেঁচে থাকে তোমার ঢের লাভ আছে। আমি এক-এক দিন রাতে মেসের বিছানায় শুয়ে ভাবি; ভাবি তোমার কথা। বাস্তবিক বেশ পড়তা নেই বটে কি তোমার জীবনে? কত লোকজনের সোরগোল তোমার ঘরে দিনরাত। তুমি নরকে বসলেও আশে-পাশে একশোটা নষ্ট চন্দ্র। তোমার মেজদা আর বৌঠান—এঁরা তোমার কাছে থেকে যত সুখী, তুমি নিজে তার চেয়ে ঢের বেশি সুখী এঁদের পেয়ে। কি বলো?মাল্যবান চোখ বুজে কথা বলছিল। চোখ মেলে উৎপলার দিকে তাকাল। কাজ করছিল, কথা বলবার কিংবা মুখ তুলে তাকাবার সময় ছিল না উৎপলার।সত্যিই, তোমার জিনিস ছিল ঢের, সদ্ব্যবহারও ছিল—বলতে-বলতে মাল্যবানের মনে হল নিজের বলিয়ে মুখটাকে দেখতে পেয়েছে সে; নিজের মুখটার মুখোমুখি এসে পড়েছে, মুখটা মুখ নেড়ে চলেছে শুধু উৎপলার হৃদয়ে প্রতিফলিত হতে গিয়ে প্রতিহত হয়ে ফিরে এসে কী ভীষণ মুখ নেড়ে চলেছে সে চিড়িয়াখানার একটা বানরের আকচার ছোলাভাজা চিবোবার মতো। এই হল তার কথা বলা? ভাব প্রকাশ করা?উৎপলা এক মনে কল চালাচ্ছিল। এর যে টনক না নড়ে, তা নয়, কিন্তু অন্য-কোনো যৌন পরিস্থিতিতে অন্য কোনো মানুষের সঙ্গে? আচ্ছন্ন সারস বকের মতো নিজের বুকের পালকে মুখ গুঁজে সমাধান খুঁজছিল মাল্যবান, কিন্তু কিছু বের করতে পারল না সে।বুকের পালক মাংসের ভেতর থেকে মুখটা খসিয়ে এনে যেন মাল্যবান বললে, থাক, মৃত্যুর কথা আমরা কেউই না বলি যেন আর। বেঁচে থাকা যাক যতদিন সময় বাঁচিয়ে রাখে। দেখা যায় কী হয়। ভরসা রাখাই ভালো। আমাকে একটা বাজনা শিখিয়ে দাও-না–এই এস্রাজ—।হিমাংশুবাবু বেশ ভালো এস্রাজ বাজাতে পারেন, তাকে ধোররা।হ্যাঁকে ধরব? আমি কি হিমাংশুবাবুর ঘাড়ে এস্রাজ শিখতে চেয়েছি?কেন, খুব তো সহজ, তিনি তো প্রায়ই আসেন।মাল্যবান, উৎপলার হাত, পেট্রোলিয়ামের গন্ধ, সেলাইএর কলের ঢাকা, ব্লাউজ তৈরির দিকে কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থেকে শেষে বললে, নাঃ, বাজাতে কি সবাই পারে। মিছিমিছি বলছিলাম।এস্রাজের কথা সে আর তুলতে গেল না। মনু রীর কেমন দড়ি পাকিয়ে যাচ্ছে দেখলাম! কী হচ্ছে?দড়ি পাকিয়ে যাচ্ছে। উৎপলা বললে।কী খায়?কী জানি।পেটে সয় না হয়তো যা খায়, পেটের রোগ হয়েছে, শুকিয়ে যাচ্ছে তাই। না কি কিছু খেতেই পারে না, ভালো কিছু খেতে পায় না?উৎপলা একটা সেলাই-এর বই খুলে কতকগুলো নক্সার দিকে মন নিবিষ্ট করে ছিল, মাল্যবান কী বলেছে না বলেছে তা সে শুনেছে কী না বোঝা যাচ্ছিল না, কোন উত্তর দিল না উৎপলা।মনুর শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে।হচ্ছে না কি।আদ্ধেক হয়ে গেছে টের পাচ্ছ না তুমি?রোগে ধরেছে হয়ত, উৎপলা বললে, হয়তো ওর বাপের মনের রোগে ধরেছে ওকে–মাল্যবান তাকিয়ে দেখল সেলাইএর বইটা ইংরেজি; বই নয়-একটা জর্নাল হয়তো; জর্নালের পাতা নেড়ে-চেড়ে দেখছে উৎপলা। একেবারে ঝুঁকে পড়েছে। পত্রিকাটার ওপর। উৎপলা সেলাইএ এম.এ. পাশ করবে, ডক্টরেটও পাবে হয়তো, কিন্তু মনু তো সুতো শাঁখ সাপ হয়ে যাচ্ছে—কেমন সরু—কী ভীষণ সিটে—মরুঞ্চে। এই হালে চললে মাল্যবান মেসে থাকতে থাকতেই—এ বাড়ির হালচালের ভেতর মনুকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। কঠিন হবে।মিনুর লিভার খারাপ—সেই পিলগুলো দাও লিভারের?না।কেন।কোথায় হারিয়ে গেছে ওষুধটা।হারিয়ে গেল। তাহলে তো আজই কিনে নিতে হয়।তা দিয়ো।মাল্যবান কথাবার্তায় রকম-সকমে একটু নষ্টামির আঁচ ধরতে পেরে বললে, মিছিমিছি কিনে দিয়ে কী লাভ-যদি না খাওয়ানো হয়।তাও তো বটে।এ-পথ নয়, ও-পথ নয়, ঠিক পথটা ধরা দরকার অনুভব করে মাল্যবান বললে, তুমি তো বলছ এ-বাড়িতে কোনো জায়গা নেই।তাই তো জানি।ছাদে একটা ক্যাম্পখাট ফেলে শুয়ে থাকলে কেমন হয়?তা তুমি নিজে বুঝে দ্যাখো।তোমার কী মত?আমরা বাড়ি দেখছি।কেন?কিছুকাল বাপের বাড়ি থাকব গিয়ে। বড়দা আসছেন কলকাতায়—সেজদা আসছেন।বাড়িও দেখা হচ্ছে না, কেউই আসছেন না জানে মাল্যবান। বিচিত্র জ্ঞানপাপের বোঝাটা পিঠে-ফেলে সে উঠে দাঁড়াল। উৎপলা ব্যস্ত হয়ে কল চালচ্ছিল।মাল্যবান চলে গেল।
মাল্যবান গোলদীঘিতে গেল। গোলদীঘিতে অনেকক্ষণ ঘুরল। তারপরে মেসে এসে দেখল। খাওয়াদাওয়ার পর বিছানায় শুতে গিয়ে মাল্যবানের মনে হল মনুর জন্যে পিল কিনে দেওয়া হয়নি তো।রাত কম নয়। তখনো দু-একটা ফার্মাসী খোলা ছিল। এক ফাইল লিভারের পিল কিনে নিয়ে উৎপলাকে দেবার জন্যে একেবারে ওপরের ঘরে গিয়ে উঠল। গিয়ে দেখল মেজদা মেজবৌঠান আর উৎপলা তিনজনেই খাওয়াদাওয়ার পর ছাপখাটের ওপর পা ছড়িয়ে হাসি তামাশ দোক্তা পানের মজলিশ বসিয়ে দিয়েছে। ওষুধের ফাইলটা উৎপলাকে দিয়ে মাল্যবান নিচে নেমে যাচ্ছিল। মেজদা বললেন, ও জামাই, পালালে যে—ও জামাই!মাল্যবান একেবারে নিচের ঘরে নেমে এল। দেখল ছেলেমেয়েরা সব ঘুমুচ্ছে। মনুর খাটের কাছে এসে দাঁড়াল; ছোট্টো মেয়েটার ধঞ্চের কাঠির মতো শরীরটা পড়ে আছে—ফু দিলে উড়ে যাবে যেন-এ-শরীরে মাংস লাগবে এসে কোনো প্রক্রিয়ায় কোনো রকম প্রক্রিয়ারই—সেটা সম্ভব বলে মনে হয় না; ওষুধে ভালো জায়গায় চেঞ্জে গেলে যে—কাঠামোর শরীর সারতে পারে আশা করা যায়, মেরে শণীরে সে-কাঠামোটুকুই নেই। হাড়ের মতন নয়—শুকনো সেলাহীকাঠির মত কয়েকখানা হাড় আছে শুধু।মশায় খাচ্ছে; বাতাস করে মশারীটা ফেলে দিল মাল্যবান। মনুর বুকের ওপর কম্বলটা টেনে দিল।মাল্যবানের মন শুকিয়ে যেতে-যেতে ভরে উঠল—কী জিনিসে? তা কামনা নয়—স্ত্রীলোকের জন্যে পুরুষের ভালোবাসাও নয়; মনুর জন্যেও–তার এই একমাত্র সন্তানটির জন্যেই একটা নির্বিশেষ পিতৃস্নেহ শুধু নয়, কেমন একটা সর্বাত্মক করুণা এসেছে—মনুর জন্যে, যে-সব ছেলেমেয়েরা এখানে ঘুমিয়ে আছে, বিপিন ঘোষের স্ত্রী, বিপিন ঘোষ, মেজদা, বৌঠান, এমনকি নিজের স্ত্রীর জন্যেও। এ-মুহূর্তে কোনো তিক্ততা বিরসতা বোধ করল না সে, কোনো যৌন আকর্ষণ বা যৌনাতীত গভীর ভালোবাসা–নারীকে ভালোবাসা—এ-সব স্তর ও ফাঁদ উৎরে গিয়ে একটা নির্জন অন্তর্ভেদী সমভিব্যাপী দয়ার উজ্জ্বলতায় কয়েক মুহূর্তের জন্যে যেন অতিমানুষের মতো হয়ে উঠল মাল্যবান।রাস্তায় নেমে মাল্যবানের মহাপুরুষদের মতো মনে হল ভালোবাসা বা কামনা নয়, করুণাই মানুষকে সমস্ত সৃষ্টির অগ্নিকারুকার্যের ভেতরে আপতিত শিশিরফোঁটার মতো খচিত করে রাখে।প্রেম খুব বড়ো জিনিস বটে, নটীর প্রেমের চেয়ে নারীর প্রেম বড়ো, নারীর প্রেমের চেয়ে বড়ো সব্বায়ের জন্যে ভালোবাসা, পুরাণপুরুষের জন্যে নিবিড় আকর্ষণ। কিন্তু করুণা? একটা কীট, সেই মড়া বেড়াল-ছানাটা, মনু, বিপিন ঘোষের স্ত্রী, বিপিনবাবু নিজে, এমন-কি মাল্যবানের নিজের স্ত্রী-সকলেই তো মাল্যবানের হৃদয়ের করুণায় অভিষিক্ত হয়ে পুরাণ-পুরুষের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠবে।মাল্যবান মেসের দিকে হাঁটতে-হাঁটতে থমকে দাঁড়িয়ে বললে, ছি ছি, এ-জন্যে অভিমান জেগেছে নাকি আমার হৃদয়ে? আমার প্রাণে সৃষ্টির বড়ো করুণা এসেছে বলে অহঙ্কার বোধ করছি? না, না,করুণার সঙ্গে অভিমানের কোনো সম্পর্কই নেই; এ প্রেম নয় তো,—এ সবচেয়ে দীনতম জিনিস—তুচ্ছতম। আমি সবচেয়ে নিকৃষ্টতম—সব চেয়ে নিকৃষ্টতম—আমি সবাইর কৃপার পাত্র, সকলেই পরমপুরুষের করুণাভাজন, অতএব সকলেই সেই পুরুষের প্রিয়পাত্ৰ-এই যে অনুভাব, এটা করুণা।কিন্তু মেসের বিছানায় শুয়ে করুণা শীতের রাতের তুলোওঠা গরম লেপের ভেতর স্খলিত হতে-হতে যখন নারীপ্রেম নাগরীপ্রেম এমন-কি গ্রন্থি-মাংসে গিয়ে আঘাত করতে লাগল, তখন মাল্যবান পাড়াগাঁর ছেলেবেলার কত ছোলার ক্ষেত, বড়ো দীঘি, চাচের বেড়ার ঘর, শীতের রাতে পোয়ালের গরম খড়ের গাদি ফোড়নের মতো চারিদিকে শিশির ভেজা মাঠ, পেঁচার পাখার খসখসানি, দুরে সুভাবনীয়তম কালো পাখির ডাক—সময়ের ভাড়ার ভেঙে-ভেঙে মাল্যবান বার করতে লাগল এই সব। মিনিট দশ-পনেরো পরে মনে হল মাল্যবানের অনেক মুখের হামলা, অনেক ঝামেলা, কী ভীষণ ওতপ্রােত ভাব—কী হট্টগোল!আরো কয়েক মিনিট পরে : যদিও আর কয়েকটি মুখের দাবিও কম নয়, তবুও আজকের নিতান্তই সাময়িক প্রয়োজনের জন্যে নেহাতই আকস্মিক ঘটনার মতো একটি মুখ রয়ে গেল তার বুকের ভেতর; সে-মুখ তার স্ত্রীর নয়।রাত তিনটের সময় মেসের চৌবাচ্চার থেকে ফিরে এসে হি-হি করে কাপতে-কাপতে মাল্যবান ভাবছিল : তার জীবনের সারাৎসার মুহূর্তে তার স্ত্রী কোনো কাজে লাগে না।
মেজদারা যতদিন রইলেন শরীর ও মনের নানা রকম অরুচি ও অস্বস্তি নিয়ে মাল্যবানকে মেসে থাকতেই হল।এই রকম করে সাত মাস কেটে গেল। তারপর মেজদারা চলে গেলেন। কিন্তু বাড়িতে ফিরে এসেও মাল্যবান বিশেষ সুবিধে পেল না এবার আর। কোনো ওষুধপথ্য কিছুই গায়ে লাগে না, মনুর শরীর দিনের-পর-দিন কেমন যে হয়ে যাচ্ছে—এ-কথা ভেবে মাঝে-মাঝে দাম্পত্যজীবনের অমৃত যে বিষফল কিংবা বিষফল নয় বঁইচির ফল; বঁইচির ফল—তা যে বিষফল নয় কিংবা বিষফল, এ-ধোঁকাটা ভুলে যেতে হয়; —প্রণয় আশঙ্কার চেয়ে দয়া জিনিসটাকে ঢের বড়ো বলে মনে হয় আবার।অমরেশ বলে একটি মানুষ—মধ্যবিত্ত বা হয়তো আর-একটু ওপরের সমাজের প্রায়ই আসছিল উৎপলার কাছে আজকাল। অমরেশের রং ফর্সা বলতে পারা যায় না—লম্বা চেহারায় ঠাট আছে বেশ, মনের উৎকর্ষ তার শরীরের প্রতিভার মতো অতটা চোখে না পড়লেও সাংসারিক বুদ্ধিতে সে কৃতীকুশল—প্রায় সিদ্ধির স্তরে পৌঁছেছে। বয়স পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ বছর হবে। বিয়ে করেছে আট-দশ বছর হল—তিনটি ছেলেপুলে আছে। উৎপলার সঙ্গে কবে কোথায় তার পরিচয় হয়েছিল—হয়তো এখানেই এখনই প্রথম পরিচয়, জানা নেই মাল্যবানের কিছু। অমরেশ ও উৎপলা দুজনে মিলে অনেকটা সময় গান-বাজনা নিয়ে থাকে—দু-জনের মেলামেশা শালীন স্বাভাবিক কিনা এই বিতর্কে অফিসে বাসায় অনেকটা সময় মাল্যবানের মন অভিভূত হয়ে থাকে—মনুর কথা ভুলে যায় সে-দয়া জিনিসটাকে ঢের অকিঞ্চিৎকর বলে মনে হয়।এই রকম ভাবে দিন কাটছিল। মনু আজকাল নিচের ঘরে মাল্যবানের সঙ্গেই শোয়। অমরেশ সাইকেলে চড়ে আসে। সাইকেলটা নিচের রেখে ওপরে চলে যায়; রাত নটা সাড়ে-নটা দশটার সময় বেরিয়ে যায়। তারপর মাল্যবান ওপরে খেতে যায়। গিয়ে দ্যাখে উৎপলা এমনই নিজের ভাবে বিভোর হয়ে আছে যে কথা বলে তাকে বাধা দিতে ভয় করে। খেতে-খেতে মাল্যবান ভাবে উৎপলার অন্য-সমস্ত চেনা-পরিচিত লোকের চেয়ে এই অমরেশ ঢের আলাদা জীব : অন্য সবাই যেখানে হাৎড়েছে, ঘাঁৎঘোঁৎ খুঁজে ফিরেছে, অমরেশ সেখানে ঠিক শাদা-ওয়ালা পিলাগের ওপর হাত রেখেছে পাকা মিস্ত্রির মতো।ভাবতে-ভাবতে থালার ভাতগুলো নোংরা কড়কড়ে শুকনো চিড়ের মতো মনে হয় যেন মাল্যবানের; ইচের কুচির মতো চিড়ে খেতে হবে ডাল দিয়ে মাছের-ঝোল দিয়ে; সব মিলে-মিশে সুরকি হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তবুও কী যেন কীসের একটা ভয়ে—কাকে ভয়, কেন ভয় ঠিক উপলব্ধি করতে পারে না সে আস্তে আস্তে চিবুতে-চিবুতে নিঃশব্দে গলার ভেতর দিয়ে চালিয়ে নেয় সব। কিন্তু তবুও অমরেশ সম্বন্ধে একটা কথাও স্ত্রীর কাছে জিজ্ঞেস করতে ভরসা পায় না মাল্যবান।বুঝতে পারল,নিজের মনটা তার স্বাতীর শিশির হলেও শরীরটা তার শুক্তি নয়, কিন্তু শামুক-গুগলীর মতো ক্লেদাক্ত জিনিস। শরীরটার খাঁজে-খাঁজে যে রয়েছে মাংস—মাংসপিণ্ড, সেগুলোকে অনুভব করে মাল্যবান। একটা অদ্ভুত গলগণ্ডের মতন যেন শরীর-তার মন এক চিমটে সময়ের কিণার থেকে দু-দিনের জন্যে ঝুলে আছে। এই সৃষ্টির ভেতরে।মনু খাচ্ছে; কিন্তু খেতে-খেতেই টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। মনুকে জাগিয়ে দেবে কিনা ভাবছিল মাল্যবান, না উৎপলা মানুকে কানে ধরে ঘুমের মিথ্যের থেকে ঘরের সংসারের গুমোট মিথ্যের ভেতর জাগিয়ে দেবে?মনু ঘুমিয়ে আছে, কেউ তার দিকে নজর দিচ্ছে না।অপরুপ চিত্রিনী যেন আজ শঙ্খিনী হয়ে উঠেছে—টেবিলের এক কিণারে বসেখাচ্ছে না কিছু উৎপলা; চিনে মাটির ডিশ একটা সমানে রয়েছে তার, কিন্ত তাতে ভাত নেই, চোখ তার ছাদের ওপারে অনেকখানি ভোলা পৃথিবীর দিকে ফেরাতে পারত সে, কিন্তু ছাদের দিকে পিঠ রেখে দেয়ালের পানে তাকিয়ে আছে সে—কিন্তু তবুও দৃষ্টি তার অনেক দূরে চলে গেছে—মাঝখানে দেয়ালটা কোনো বাধা নয়—চোখে তার ব্যথা নেই—উদ্দীপ্তিও নেই কিছু—আছে কেমন আলোর, প্রতিফলনের থেকে টের পাওয়া যায় যে—আলোর উৎসকে সে-সবের আসা-যাওয়ার মতো একটা ঠাণ্ডা নিঃশব্দ ভাবনাময়তা; মনের এ-রকম আশ্চর্য পরিণতির ভেতর নিশ্ৰুপ হয়ে থাকতে উৎপলাকে তো দ্যাখেনি কোনো দিন মাল্যবান। এ কি ভালো, না মন্দ?এর মানে কী?তুমি খাবে না, উৎপলা? মাল্যবান গলা পরিষ্কার করে নিয়ে বললে। তুমি খাবে? এবার একটু জোরে বলতে হল তাকে।ঈষৎ নড়ে উঠে উৎপলা বসবার ভঙ্গি একটু ঠিক করে নিতে গেল। সে কী ভাবে বসেছিল? ধরণটা তো ঠিক মুহূর্তের উপযুক্ত নয়। ঘণ্টাখানেক আগে এ-রকম ভাবে বসলেও চলত; কিন্তু এখন তো এরকম ভঙ্গি চলে না। তা ছাড়া শাড়িটা কোমরে কেমন ঢিলে হয়ে আছে—খুবই ঢিলে—একেবারেই খুলে গেছে। তো-উৎপলা দাঁড়াতে গেলেই সমস্ত শাড়িটাই খসে মাটিতে লুটিয়ে পড়বে।এখন কটা রাত?বেশ রাত হয়েছে, দশটার কম তো নয়। মাল্যবান বললে।আজ খেতে দেরি হয়ে গেল।না, এমন কিছু নয়, আমার ক্ষিদে ছিল না।শীতের রাত—দশটা কম নয় তো।তুমি কার সঙ্গে কথা বলছিলে? এতক্ষণ? কে? আস্তে-আস্তে একটার-পর একটা প্রশ্ন পেড়ে উত্তরের জন্যে থেমে রইল মাল্যমান।ও এক জন লোক। উৎপলা কোমরে হাত দিয়ে শাড়ি ঠিক করে নিচ্ছিল।মাল্যবান না দেখল যে তা নয়, খানিকটা রাতের ঠাণ্ডা টেনে নিতে নিতে দেখল আর-এক বার; উৎপলা দেখল যে মাল্যবান দেখল; মাল্যবানের টনটনে জ্ঞান নেই; বৌ তা জানে; কিন্তু তবু মাজার কাপড় আঁটসাঁট করে নিতে-নিতে উৎপলার মনে হল : মানুষটা তো ঘোরেল কম নয়, আমার দিকে নজর পড়েছে তার; কিন্তু আমি কী করেছি! আমি তো কিছু করিনি।ও একজন তোক যে, তা তো আমিও দেখেছি–তবে আর কী-দেখেই তো ফেলেছ।হ্যাঁ, যখন ওপরে উঠছিল, দেখেছিলাম মানুষটিকে। নিচে সাইকেল রেখে গেল।তারপর?আমি ওকে চিনি না তো। এ-বাড়িতে দেখিনি কোনো দিন এর আগে।উৎপলা নিজের ডিশের ওপর খানিকটা জল ছিটিয়ে হাত বুলিয়ে নিয়ে দুচামচে ভাত রেখে বললে, আমার কাছে যারা আসে, সকলকেই কি তুমি চেন?অল্পবিস্তর মুখচেনা হয়ে গেছে।কারা আসে বলো তো?তাদের নাম বলতে পারব না, তবে রাস্তায় দেখা হলে ভুল হবে না।চেনা আছে বুঝি সকলের—তা আছে। মাল্যবান আসল কথার দিকে ঝুঁকে পড়ে বললে, কিন্তু, এ কে?ভাতের সঙ্গে অল্প মাখন মেখে নিয়ে একটু নুন আর কাঁচা লঙ্কা ঘষতে-ঘষতে উৎপলা বললে, কী উদ্দেশ্য নিয়ে আসে তারা?তা আমি কী করে বলব। সেটা তোমার নিজের নির্বন্ধের কথা। সেখানে তো আমি হাত দিতে যাইনি কোনো দিন।উৎপলা কাঁচা লঙ্কার বিচিগুলো বেছে-বেছে ফেলে দিচ্ছিল, বললে, ভালোই করেছ, কিন্তু আজ হাত বাড়াচ্ছ কেন?মনু ঘুমিয়ে পড়েছে।তা তো দেখছি।জাগিয়ে দেব?এখন না।ভাতগুলো তো চিঁড়ের মতো।ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, কড়কড়ে লাগছে তাই।ঠাকুর এ-রকম বেলাবেলিই বেঁধে চলে যায় কেন?শীতের রাত, কতক্ষণ বসে থাকবে; হাতের আরো দু-পাঁচটে কাজ সেরে বাড়ি যেতে চায়—সেই চেলায়— বলতে-বলতে খেতে আরম্ভ করল উৎপলা এবার; কাঁচা লঙ্কার কিছু কিছু বিচি আছে এখনও ভাতের ভেতর; অনেকগুলোই সে বেছে ফেলে দিয়েছে।আমি অবিশ্যি বসিয়ে রাখিনি তাকে।আমি তোমাকে বলিনি তো যে তুমি দায়ী—মাল্যবানের মনে হল উৎপলার কথাবার্তায় আগের সেই খড়খড়ে ভাবটা কেটে গেছে যেন, কথা স্বাভাবিক, গলা নরম, আলাপচারি তাৎপর্যে মমতা না থাকলেও ভাবগ্রহণ আছে, আছে ষত্ব-ণত্বের চেতনা—মাল্যবানের সৌকর্যের জন্য।পরদিনও সন্ধ্যের সময় অমরেশ এলো। অমরেশ তার সাইকেলটা মাল্যবানের ঘরের এক কোণায় তালা মেরে আটকে রেখে গেল। মাল্যবান অফিস থেকে ফিরে বিছানায় শুয়ে ছিল। তার দিকে একবার ফিরে তাকিয়ে অমরেশ বললে, কী করছেন আপনি।শুয়ে আছি।অফিস থেকে এলেন?এই এলুম।আপনার স্ত্রী আছেন?হ্যাঁ, ওপরে আছে উৎপলা।অমরেশ ওপরে চলে গেল। মাল্যবান ঘরের বাতি নিভিয়ে দিল।কিন্তু বাইরের একটা আলো ঘরের ভেতর ঠিকরে পড়ছে, অমরেশের সাইকেলটা ঝিক-ঝিক করে উঠছে তাই। যখনই সাত-পাঁচ ভাবে মাল্যবান—অন্ধকারের ভেতর চলে যায়; সুফলা ফলার মতো। অন্ধকারটা কেটে সাইকেলটা ঝলসে ওঠে আবার; মাল্যবানের মনে হল এ হচ্ছে উপচেতনার সঙ্গে চেতমার ঝগড়া; অবচেতনা ঘুমের দিকে টানে—মৃত্যুর দিকে; চেতনা অবহিত হতে বলে, ঢেলে সাজাতে বলে; আচ্ছা, ঢেলেই সাজাবে সে।চা খাওয়া হয়নি তো। চা খাবে কি? ঠাকুর এসে জিজ্ঞেস করে গিয়েছিল বাবু চা-জলখাবার খাবেন কিনা—তাকে না করে দিয়েছে মাল্যবান।গোলদীঘিতে যাবে কি? না, কৈ যাওয়া হচ্ছে কোথায়? মাল্যবান শুয়েই ছিল। ওপরে এক-আধটা গান হয়ে গেছে। এস্রাজও বেজে গেছে কিছুটা সময়। গান সহজে আসে—শীতের শেষে পাতা যেমন আসে শিমুলের জারুল পিয়ালের ডালে—ছেলেটির গলায়; খুব স্বাভাবিক ভাবে খুব ভালো গাইতে পারে সে; কোনো এক জায়গায় গিয়ে তারপর ব্যক্তিত্বের দিব্য স্পষ্টতা আছে ছেলেটির (ছেলেটি কেন বলছে অমরেশকে সে? চেহারায় সকালবেলায় সরসতা এখনও খানিকটা লেগে আছে বলে?);—সে কি স্বরকৌশলের সিদ্ধি শুধু? আন্তরিকতা? আত্মা? বুঝতে পারছিল না মাল্যবান। অমরেশের চেয়ে ভালো গান শুনেছে সে অবিশ্যি, কিন্তু এটাও আঘাত করে এসে—দুরকম ভাবে যদিও-শিল্প শেফালীর আঘাতটাই তবুও নিবিড়তর যেন। এস্রাজ বাজাল কি উৎপলা? তারপর একঘণ্টা দেড় ঘণ্টা চুপ মেরে আছে সব—ওপরে কোনো লোকজন আছে বলেই তো মনে হয় না।সাইকেলটা খুব বেশি ঝিকঝিক চিকঝিক করছে; এবং মালিকও আঁশটে দুধরাজের মতো ঝিকিয়ে উঠছে দোতলার ঘরে? সাইকেলের তালা খসিয়ে রাস্তায় নামিয়ে প্যাডেল ঘুরিয়ে ছুটে যেতে ইচ্ছে করে মাল্যবানের-এর মালিক যেমন সন্ধ্যে না হতেই দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে বত্রিশ নম্বর বাড়িতেই উপস্থিত হয় তবু–ছায়া যেমন সারাদিন দেহের আগে-পিছে ছুটে নাগাল পায় না, রাতের অন্ধকারে শরীরের সঙ্গে বিনিঃশেষে মিশে যায় তবু, তেম্নি ভাবে এসে পড়ে অমরেশ; তেম্নি ভাবে কোনো বত্রিশ বত্রিশ-শো বত্রিশ-শো-অনন্তের দিগন্তে চলে যাবে নাকি মাল্যবান।বত্রিশ-শো-অনন্তের দিগন্তে না গিয়ে শেষ পর্যন্ত গোলদীঘিতে বেড়াতে গেল; বেড়িয়ে যখন ফিরছে তখন প্রায় সাড়ে-নটা—এসে দ্যাখে অমরেশের সাইকেল তখনো দেয়ালে কাৎ হয়ে রয়েছে।বাবু, আপনাকে ভাত এনে দিই?কেন?মা দিতে বলেছেন।দাও। মাল্যবান ঠাকুরকে বললে।ভাত খেয়ে নিজের ঘরের ভেতর অনেকক্ষণ পায়চারি করল সে, কিন্তু সাইকেল গেল না।মনু বিছানার এক পাশে ঘুমিয়ে আছে। মাল্যবান ঘড়িতে দেখল প্রায় এগোরাটা বেজেছে; ওপরে গানবাজনা এক-আধবার দু-চার মিনিটের জন্যে তড়পে উঠে অতলে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে যেন।মাল্যবান একটা চুরুট জ্বালিয়ে বিছানায় এসে বসল। ঢং করে একটা শব্দ হল, পাশের বাড়ির ঘড়িতে সাড়ে-এগারোটা। এই বারে হয়তো ছেলেটি নেমে চলে যাবে। কিন্তু, কৈ, নামল না তো সে। মাল্যবান ভাবল, গানবাজনা আবার শুরু হবে। হয়তো কিন্তু, তাও তো হল না। যতক্ষণ গান সরোদ হাসি তামাশা চলছিল অন্ধকারে ঢিল মেরে নিজেকে তবুও খানিকটা ব্যস্ত রাখা চলে। কিন্তু সব থেকে গেছে তো এখন—বেশি রাত বেশি অন্ধকার বেশি শীত : এখন কী? কী হচ্ছে এখন। যা হচ্ছে, তা হচ্ছে : মনের হেঁয়ালির কাছে মার খেয়ে কোনো লাভ নেই। মনটাকে সে খুব হাল্কা করে নিল; যেন খুব মজাই হয়েছে ওপরের ঘষর, মনে করে হাসতে লাগল সে; সাইকেলটাকে মনে হল অমরেশের নেপালী বয়ের মতো, সাইকেলের ঝিকমিকানিটাকে ভোজালির ঝলসানির মতো; কোমরে ভোজালি গুঁজে অমরেশের নেপালী চাকরটা যেন বেশি রাতের নিরেট শীতে থুপী বুড়ির মতো বসে আছে, মনিব ওপরের থেকে না নামলে রক্ষা নেই তার, কিছু নেই; কিন্তু তবুও একটা আশ্চর্য প্রতীকের মতো যেন এই নেপালী, এই বোকা নেপালী ভোজালি—আজকের পৃথিবীর। স্ত্রী-পুরুষের সম্পর্ক, মানুষ-মানুষে সম্পর্ক, মানুষ ও প্রকৃতির সম্বন্ধে সূক্ষ্মতা হারিয়ে ফেলেছে-সফলতাও সরলতাও; হারিয়ে ফেলেছে সরসতা; আজকের বিমূঢ় পৃথিবীতে সমস্ত পরিচ্ছন্ন সম্পর্ক-গ্রন্থিকে ছেদ করে অপরিমিত গন্ডমুখের অপরিমেয়। মনোবল পথ কেটে চলেছে একটা বোকা নেপালী ভোজালির মতো। সময়কে প্রকৃতিকে পুরাণপুরুষকে (যদি থেকে থেকে কেউ) তবে কী হিসেবে ধ্যান করা যাবে আজ? প্রভু হিসেবে? সখা হিসেবে? পত্নী হিসেবে? না, তা নয়। স্বামী স্ত্রী বা সখা ভাবে নয়, সাধা হবে নেপালী ভোজালিভাবে; ঘুম আসছে না মাল্যবানের।মাল্যবানের নিজের দোষ নয়; ঘুমেরও দোষ নয়; এই পৃথিবীরই দোষ, শতাব্দীর দোষ; কিন্তু তবুও রাত তিনটের সময় জেগে উঠল যখন সে, তাহলে ঘুমিয়ে পড়েছিল কোনো এক সময়।সাইকেলটা নেই।রাস্তার দিকের খোলা দরজা দিয়ে হু-হু করে শীত আসছে। উঠে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল মাল্যবান।
পরের দিন সন্ধ্যেরাতেই বেড়িয়ে ফিলে মাল্যবান ঠাকুরের কাছে শুনল যে অমরেশবাবু ওপরে বৌঠাকরুণের ঘরে ঢুকেছেন।মাল্যবান খেল-দেল, খবরের কাগজ পড়ল, চুরুট টানল; তারপর কথা ভাবল সে; ভাবতে-ভাবতে কথাই ভাবল দু-তিন ঘণ্টা।রাত বারোটার সময় অমরেশ নিচে নেমে এল।আপনি এখনও জেগে আছেন চাঁদমোহনবাবু—–মাল্যবানকে একটা হ্যাচকা ডাক দিয়ে লেপের নিচের আড়ষ্ট অবস্থার থেকে জাগিয়ে তুলে বললে অমরেশ। মাল্যবানের নাম চাঁদমোহন নয় তো। অমরেশ একটু জিভ নেড়ে লাট মারতে চাইছে নামটা নিয়ে, সেই নামে মাল্যবানকে ডেকে। তা হোক।মাল্যবান মুখের থেকে লেপ সরিয়ে নিয়ে বললে, ঘুমিয়ে পড়ছিলুম।তারপর? সাইকেলের তালা খুলতে খুলতে অমরেশ বললে।কোথায় যাচ্ছেন?আহিরিটোলা।এত রাতে?আহিরিটোলার গঙ্গায় নামতে হবে।এত রাতে?সাঁতার কাটব।মাল্যবান এবার আর কিছু বললে না। বালিশে শিরদাঁড়াটা ঠেস দিয়ে একটু উঁচু হয়ে বসল।সে আমাদের একটা দঙ্গল আছে। চার হাত পায়ে নিমকের বস্তার মতো ভুশ করে পড়ে এক-একটা সাঁতারু মুনিষ আহিরিটোলার গঙ্গায়।মুনিষ কেন বললে অমরেশ মানুষ না বলে ভাবতে-ভাবতে মাল্যবান বললে, এত রাতে গঙ্গায় নাওয়া হবে?নাওয়া না, মশাই। গঙ্গামৃত্তিকার তেলক কাটবার জন্যে আমাদের জন্ম হয়নি, দাদা। সাঁতার কাটব—দেখি কে কত দূর যেতে পারে, কার আগে যেতে পারে—ওঃ, মাল্যবান বললে।ছেলেটি সাইকেলটি খুলে রেখে মাল্যবানের টেবিলের এক কিনারে বসল।চেয়ারে বসুন।এই বেশ বসেছি। আমাদের সাঁতার দেখতে যাবেন, চাঁদমোহনবাবু?এখন? এত রাতে?আচ্ছা, বেশ, বুড়োমানুষ আপনি, তাহলে বারুণী স্নানের সময় যাবেন। তখন গরম পড়ে যাবে।মাল্যবান বললে, কিন্তু, সত্যিই কি আহিরিটোলার ঘাটে সাঁতার কাটা হবে আজ।কী বলছি তবে আপনাকে। মেয়েরা অব্ধি দেখতে যাবে–নিজের ডান পায়ের কড়া পালিশের নিউকাট উঁচিয়ে নিয়ে অমরেশ বললে, এই ভগবতীর চামড়া ছুঁয়ে বলছি ভদ্দরলোকের মেয়েরা যাবে সব গুল বেঁধে আমাদের খেলা দেখতে, বেশ্যেরা যাবে, ওদিককার পাড়ায়-পাড়ায় যেখানে যত বেশ্যে আছে—মাল্যবান চুরুট জ্বালাল।রাঁড়েদের সঙ্গে ভদ্রঘরের মেয়েদের কোনো মামলা হবে না, সার, কেউ কাউকে দুর-দুর বলে তাড়িয়ে দেবে না। এরাও যে মানুষ, ওরাও তা অকপটে স্বীকার করবে, সার।মাল্যবান অবাক হয়ে ভাবছিল, এই সেই সমাবেশ? একে নিয়ে উৎপলার রাত বারোটা বাজে? থুতু না ছিটোলেও—কথা বলতে-বলতে জিভে-দাঁতে থুতু জমে যায় যাদের—সত্যি-সত্যি না অবিশ্যি, রূপক হিসেবে—সেই রকমই অসার, অবুদ্ধিমান, উচ্ছ্বাস-সর্বস্ব তত এই ছেলেটি; চেহারা লম্বা; গড়ন-পেটন ভালো; মুখ সুন্দর পুরুষ মানুষের মতো; এসব বলে ভুশি হীরে হয়ে গেল উৎপলার কাছে। তাই তো হয়। সৃষ্টিটা সংখ্যানবিশ বটে কিন্তু হিসেবতন্ত্রী নয়, কী রকম মারাত্মক ভুল বিষের মতন মিশে রয়েছে নিখিলের রক্তের ভেতর, তার নিরবচ্ছিন্ন মন্ত্রণার প্রবাহের মধ্যে!কিন্তু, স্বীকার করলেই তো শুধু হবে না, মাল্যবান বললে, ওদের মানুষ করবার পথ বলে দিতে হবে তো।সে একটা মস্ত সামাজিক সমস্যার কথা হল—মাল্যবান চুরুট টানতে-টানতে বললে, সবই সব হল। তা বটে, সাঁতার কাটা দেখতে গিয়ে কি আর সামাজিক হেঁয়ালি মেটে। তবে হ্যাঁ, আপনি যা বলেছেন বেশ একটু ভ্রাতৃপ্রেম-ভগ্নাপ্রেম-ভাইব্রাদারি—কিন্তু ওদের তো ঢের খারাপ লোগ আছে।আছে বটে, কিন্তু মেয়েরা তো মেয়েদের রোগ দিতে পারে না। খুব হৃদ্যতার সঙ্গে মেলামেশা, কিন্তু মেয়েরা তো পুরুষ নয়—মাল্যবান মুখের থেকে চুরুটটা নামিয়ে কিছুক্ষণ চর্মচক্ষে এবং মনশ্চক্ষে—চার চোখ মিলিয়ে নিয়ে অমরোশের দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর বললে, ওখানে ছোকরাদের দলও তো বেশ ভারি।তাদের ভেতর দুকানকাটা খুব কম।শুনে মাল্যবান ঘাড় বাঁকাল; ঘাড় সোজা করে চুরুট টেনে-টেনে ঘাড় বাঁকিয়ে অমরেশের দিকে তাকাল একবার। কিন্তু যে-কথাটি বলবে ভেবেছিলে তা বললে না, বাজে কথা পেড়ে মাল্যবান বললে, এত ঠাণ্ডায় সাঁতার কেটে নিমোনিয়া হবে না তো।হবে—সেরে যাবে। না হয় মরে যাব।আরে কী বলে! মরে যাবার কী আছে! তা, আমার স্ত্রীকে কী করে চিনলেন? মাল্যবান বেড়ালের থেকে চিতে বাঘ, চিতে বাঘ থেকে বেড়াল সত্তায় আসা-যাওয়া করতে করতে বললে।এখন চলি, মাল্যবানবাবু, রাত হয়ে গেছে।মাল্যবান চুরুটটা নিভে গিয়েছে টের পেল। দেশলাই জ্বালিয়ে চুরুট ধরিয়ে মাল্যবান একটা বড়ো হুড়াড়ের ছানার মতো হঠাৎ উজিয়ে উঠে বললে, সাইকেল এনে সটান যে ওপরে চলে গেলেন, আমার স্ত্রীর সঙ্গে কবে কোথায় পরিচয় ছিল আপনার, বলবেন না?খুব সোজা কথা জিজ্ঞেস করেছে মাল্যবান, সহজ উত্তর, এক্ষুনি স্বাভাবিকভাবেই উত্তর না দিতে পারে যে অমরেশ তা নয়, কিন্তু তবুও সে বললে, আমি আরও তো আসব আপনাদের এখানে। আর একদিন না হয় বলব। অমরেশ ওভারকোটের পকেট থেকে সিগারেটের টিন বার করল। একটা সিগারেট জ্বালিয়ে নিয়ে বললে, সেই যে সামাজিক সমস্যার কথা বলছিলেন, সেটার বিশেষ কিছুই করা যাবে না আমাদের সকলের আর্থিক জীবনের সুবিধে না এলে। এদিক দিয়েই প্রথমে চেষ্টা করা দরকার। অবিশ্যি সমাজ-ভাবনা সম্বন্ধেও অন্ধ থাকলে চলবে না।মাল্যবান নিজের অনুভূতি ও উপলব্ধির নিচে অমরেশের কথাগুলো পুরোনো নোংরা খবরের কাগজের মতো চেপে রেখে দিয়ে বললে, আপনি নিজে তো খুব সচ্ছল—আপনার স্ত্রীও তো খুব। দেখছি তো। বলে অমরেশ যেন কোনো ইঙ্গিত করেনি, কোনো খারাপ ইঙ্গিত করেই নি এমনই স্নিগ্ধ নির্দোষভাবে হাসল। কিন্তু হাসিটা কেটে গেল, অমরেশের মুখের চেহারা হল আরেক রকম যেন; অনুধাবন করে অস্পষ্টতার ভেতর থেকে তবুও কোনো স্পষ্টতা খুঁজে পেল না মাল্যবান, হাতের চুরুটের আগুন অঙ্গারের দিকে তাকিয়ে রইল। ঘরটা নিস্তব্ধ হয়েছিল। দুজনের চুরুট সিগারেটের ধোঁয়া পরস্পরকে কাটাকাটি করে কথা বলছিল শুধু।আমার স্ত্রীটি তৃতীয়পক্ষের, আমার চেহারা দেখে তা মনে হয়, মাল্যবানবাবু? অমরেশ বললে, প্রথম পক্ষের স্ত্রীটি এখনো আছে, বাপের বাড়িতে থাকে, আমি তাকে নিয়ে ঘর করব না। দুনম্বরের কাত্যায়নী মরে গেছে। এই তিন নম্বর। এ স্ত্রীর ছেলেপুলে তিনটি। আর একটি এই মাঘে হচ্ছে।মাল্যবানের মনে হল অমরেশের গলার সুর, শরীরের বাঁধ, সমস্ত, অন্তরাত্মার থেকেই কেমন একটা সুদৃঢ় (কিন্তু) সুলভ আত্মতুষ্টি চুইয়ে পড়ছে। আজকালকার। এই শিশ্নোদরতন্ত্রী এবং যা শিশ্নোদর নয় কিন্তু তবুও উচ্চুঙ্খল—এই সব মূল্যবিশৃঙ্খলার পৃথিবীতে অমরেশের এই কথাগুলো বেশ স্বাভাবিক; স্বাভাবিক অতএব ভালো? ভালো না মন্দ? সে নিজে কী রকম? মাল্যবান নিজের চুরুটের ছাইচাপা আগুনের। এক-আধটা কণিকার দিকে তাকিয়ে ভাবছিল। মূল্যবিশৃঙ্খলা? বিশৃঙ্খলরা একেই শৃঙ্খলা মনে করে। মূল্যশৃঙ্খলা কী? কী জিনিস মাল্যবানের মতে? সে নিজে যদি মুল্যশঙ্খলা চায়, তাহলে তার নিজের বাড়িতেই সে জিনিস এ-রকম সুসদৃশ ভাবে অনুপস্থিত?রাত তো কম হয়নি।বারোটা বেজে গেছে। অমরেশ বললে।শীতের রাত বারোটা….আমার স্ত্রীর কাছে কী দরকার ছিল আপনার?কথা বলতে বলতে রাত তো হবেই—দেখছি তো হচ্ছে। এতদিন তো আপনাকে দেখিনি এখানে।সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ার ধোঁয়া ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা নেড়ে চেড়ে নিয়ে অমরেশ বললে, আপনারা যে এখানে আছেন তা তো জানতুম না আমি।কী করে জানতে পারলেন তবে?চাঁদমোহনদা, চিনি তো পিঁপড়ের গন্ধ পায় না। পিঁপড়েকেই খুঁজে পেতে বার করতে হয়, অমরেশ খুব উল্লাস বোধ করে বললে, আপনারা বেশ ঝাড়াঝাপটা থাকতে চান, ছোঁয়াছানা বাঁচিয়ে খুব যা হোক; কিন্তু তা নয় না; পিঁপড়েতে চিনিতে ধুল পরিমাণ হয়ে যায়, চিনি পিঁপড়েকে বেছে খায়, দেখেছেন?মাল্যবানের মনে হচ্ছিল, অমরেশের কথার কোনো ঝাঁজ নেই, যেন দুটো ঠ্যাঙের বদলে আটটা ঠ্যাং অমরেশের, মাকড়সার মতো, কেমন ল্যাং-ল্যাং ল্যাং-ল্যাং করছে সব সময়েই কখনো গাঢ় সবুজ, কখনো গাঢ় লাল মাকড়সানীদের দেখছে বলে—সমস্ত জীবন ভরে। চেহারার চেকনাই আছে, টাকা আছে বলে বিগড়ে গেছে সে—অনেক মেয়ের হাতেই।উৎপলাও ইন্ধন দিচ্ছে?মাল্যবান মুখের থেকে চুরুটটা নামিয়ে আন্দাজ করছিল ইন্ধনটা কত দূর—কী ধরনের–ভাবতে ভাবতে কেমন যেন সমাধিভূত হচ্ছিল; মুখে সে বলছিল, বসুন, বসুন, অমরেশবাবু, বসুন। কিছু অনেকক্ষণ হল ঠোঁট জিভ নাড়া স্তব্ধ করে দিয়েছিল তার মন; নিমেষনিহত হয়ে ছিল; চুরুট নিভে গেছে–চলি, মাল্যবানবাবু।আচ্ছা–কাল আসব।আসবেন। আসবেন। দিন সাতেক পরে রাত দশটার কিছু আগেই অমরেশ বেরিয়ে গেলে পরে মাল্যবান খাবার জন্যে ওপরে চলে গেল।ওপরে উঠে সে দেখল উৎপলা খাবার টেবিলের এক কিনারে নিঃসাড় হয়ে বসে আছে; টেবিলের ওপর মাথা রেখে মনু ঘুমোচ্ছে।আজকাল খেতে বড্ড দেরি হয়ে যায়। মাল্যবান বললে।কটা বেজেছে?দশটা।দশটা কি বেশি রাত?সকলের কাছে বেশি নয়, মাল্যবান বললে, মনু তো না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। বেশি রাত হয়েছে বলে ঘুমোয়নি, খুব শীতে কারে ঘুমিয়েছে হয়তো।উৎপলা বললে, তুমি তো আগে খেলেই পার। রান্নাঘর তত তোমার নিচের ঘরের লাগাও। খাবার সময় মনুকে নিয়েও তো বসতে পার–হ্যাঁ, কাল থেকে একটা অবস্থা করে নিতে হবে। যে লোকটি তোমার কাছে আজকাল খুব ঘন ঘন আসছেন তার জন্যেই খানিকটা বিশৃঙ্খলা এসে পেড়েছে পরিবারের ভেতর। ও কে?চিনি না।মানে যে— উৎপলার কথা কপচাবার ইচ্ছে ছিল না, বললে, চিনি না। এই মানে। মানে—কোচড় ভরে নিয়ে যাও, চিবিয়ে খাও মানে। এই মনু! মনু! বলে ডাক পেড়ে উঠল উৎপলা।ওকে তুমি জাগিয়ো না, থাক–তুমি জাগিয়ো না ওকে।খাবে না?না।রোজই তো না খেয়ে ঘুমুচ্ছে।ওকে এখন জাগিয়ে খাওয়াতে গেলে খাবে না কিছু, আমাদেরও খেতে দেবে না। মাল্যবান মনুকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় রেখে এল।উৎপলা একটা তোয়ালে দিয়ে টেবিলটা মুছে নিয়ে দুটো চিনেমাটির ডিশ, কাচের গেলাস, একটা বড়ো পিরিচে নুন লেবু কাঁচালঙ্কা সাজিয়ে নিচ্ছিল। একটা পারুল ফুলের মতো প্রকৃতির থেকেই যেন উৎপন্ন জমিনের তাঁতের শাড়ি সে পরেছিল—চওড়া লাল পাড়ের। আশাতিরিক্ত ভাবে পরিতৃপ্ত কেমন একজন সীতা সরমা দ্রৌপদী চিত্রসেনীর মতন অপরূপ দেখাচ্ছিল তাকে।এসো—খেতে এসো–উৎপলা বললে।মাল্যবান চেয়ারে বসে বললে, অমরেশ কখন এসেছিল?সন্ধ্যের সময়।আমি অফিস থেকে ফেরবার আগেই?তুমি কখন ফিরেছ, তাতে আমি জানি না।হ্যাঁ, অফিস ফিরেই ওর সাইকেলটা আমার ঘরে দেখলাম।সাইকেলে আসে না কি? উৎপলা বললে, জানি না তো।আজ রাত দশটার আগেই চলে গেল। একদিন তো দেখলাম এগারোটা বারোটা বাজলে নড়ে-চড়ে না। কে লোকটা?আমি চিনি না ওকে।উৎপলা খান-সাতেক লুচি মাল্যবানের পাতে দিল, খান-তিনেক নিজে নিল। দুতিনটে বাটিতে বেগুনভাজা, ছোলার ডাল আর আলুর তরকারী ছিল। একটি সপ্যানে দুধ ছিল—ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। সবই মিইয়ে গেছে, লুচি কড়কড় করছে; কারুরই পেটে ক্ষিদে ছিল না যেন, কিন্তু তবুও এ জিনিসের কিনার ভেঙে, ও-জিনিসটা খুঁটে, সে-জিনিসটা টিপে খুব গাফিলতি গড়িমসি করে খেতে হচ্ছিল—খেতে খেতে দু-একটা কথা বলবার জন্যে থেমে পড়েছিল।চেন না—তাহলে কি করে ও তোমার ঘরের ভেতর ঢোকে?এটা কি আমার বাড়ি?মাল্যবান বললে, এতদিন তাই তো জেনে এসেছি। আজ অমরেশ এখানে আসছে যাচ্ছে বলে আমার ঘাড়ে মালিকানার বোঝা ঠেলে তুমি ওর গতিবিধির কৈফিয়ৎ আমার কাছ থেকেই নেবে ঠিক করেছ?উৎপলা তিনখানা লুচির আধখানা খেয়েছিল এতক্ষণে, বাকি আড়াইটে দিয়ে কী করবে ঠিক করতে না পেরে আপাতত হাত গুটিয়ে মাল্যবানের দিকে তাকিয়ে বললে, আমার বাড়ি হোক, তোমার বাড়ি হোক, তোমার নাকের ওপর দিয়েই তো আমার ঘরে পাত্তা পাচ্ছে রোজ অমরেশ। কী করতে পেরেছ তুমি তার। কী করতে পারবে।মাল্যবান দুখানা লুচি শেষ করেছিল, কিছু ছোলার ডাল, একখানা বেগুন-ভাজা। জলের গেলাসে চুমুক মেরে ঠোঁট জিভ ভিজিয়ে দাঁত ঠাণ্ডা করে নিয়ে বললে, আমি তো জানতাম না যে ওকে তুমি চেন না।কী মনে করেছিলে তুমি?ওকে তুমি চেন না?চিনি না বলেছি তো।তোমার বাপের বাড়ির কেউ না?না।কলেজে তোমার সঙ্গে পড়েছিল?আমি তো মেয়েদের কলেজে পড়েছি—সেকেন্ড ইয়ার অব্দি। তুমি দিশে হারিয়ে ফেলছ।কেউই না-কোনোদিনই দেখনি ওকে এর আগে আর? স্তম্ভিত হয়ে মাল্যবান বললে, তবে?তবে মানে? ভ্রূকুটি করে উৎপলা মাল্যবানের দিকে তাকাল।তবে তোমার দিনের পর দিনই খুব খুলছে মনে হচ্ছে, মাল্যবান কোমলকঠিন চোখে উৎপলার দিকে তাকাল; কী একটা দাবি জানিয়ে অথচ তা প্রত্যাহার করে তাকিয়ে রইল অনড়, অক্লান্ত চোখে কিছুক্ষণ। বললে, ও আসার পর থেকেই তোমার চেহারার ভেতর এমন একটা সরম সরসতা—যা আগে আমি দেখিনি বড়ো-একটা। তোমার কথাবার্তা ব্যবহার বিয়ের জল পেয়েছিল কি একদিন? মেঘের জল পাচ্ছে কি আজ? এখনকারটাই তো ভালো মনে হচ্ছে।গড়িমসি করছিল এতক্ষণ, উৎপলা এবার খেতে শুরু করল। ঠোঁট একটু নড়ল কি নড়ল না, হাসি ফুটে উঠতেই মিলিয়ে গেল মুখে, সে হাসিটা আমোদের–ব্যথার—হয়তো গ্রন্থিমাংসপেশীর কেমন একটা অচেতন আক্ষেপের–আধখানা লুচি খাওয়া হয়েছিল উৎপলার, বাকি আধখানা খাচ্ছিল।অমরেশ তত দিন পনেরো হল আমার কাছে আসছে। চার পাঁচ ছ ঘণ্টা রাত কাটিয়ে যায়; বাতি জ্বলে ঘরে; বাতি নিভেও থাকে অনেকক্ষণ; আমরা মাঝে-মাঝে ভাবি তুমি হয়তো ওপরে আসছ; ওপরে এলে একটা কাণ্ডই বাধাতে তুমি—লুচির বাকি টুকরোটুকু খেয়ে ফেলে উৎপলা বললে, তুমি বাধাতে কি না জানি না, তবে মানুষ তো মানুষ, ঝামেলা না হয়ে যায় না; বেধে যেতো এত দিনে; অমরেশও চুপ করে থাকত না।কেন কী হয় ওপরে?আমি কেন তা বলব?তাহলে পরের ছেলেকে জিজ্ঞেস করতে যাব আমি?কেন তুমি নিজে ওপরে এসে নিজের চোখে দেখে যেতে পারবে না? পনেরো দিন তো হল। নিচের থেকে তরতর করে লোকটাকে ওপরে উঠে যেতে দেখছ তো রোজই। নিচের ঘরে বসে মাঝে-মাঝে কথাও বলেছে তোমার সঙ্গে। কথাবার্তা শুনে কেমন মনে হয়েছে অমরেশকে তোমার?মাল্যবান কিছু খেতে গেল না আর। এঁটো হাতে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে বললে, লুচি খেলে না যে—ক্ষিদে নেই।অমরেশ কাল আসবে?আসবে বৈ-কি, উৎপলা আর একখানা লুচির কিনার ভেঙে ক্ষিদে জাগিয়ে তুলবার সাহসিক চেষ্টায় নিজেকে আলোড়িত করে তুলে বললে।ওকে এ-বাড়িতে আসতে নিষেধ করে দিতে পারবে তুমি?উৎপলা উঠে দাঁড়াল।কী হল?ঘুম পেয়েছে।বোস, বোস, কথা আছে—না, না, বসতে পারছি না, দুটো পায়ের গিঁটে গিঁটে ব্যথা করছে।কী বলবে বল, আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনছি—মাল্যবান সিগারেটটা টানতে গেল না আর। জলের গেলাসের ভেতর সেটা ফেলে দিয়ে বললে, অমরেশের সম্বন্ধে কী ব্যবস্থা করবে বল।উৎপলা নিজের জলের গেলাসটা মুখে নিয়ে খানিকটা জল খেল, বাকি কুলকুচো করে ছাদের দিকে ফেলে দিল। টেবিলে ছোটো পিরিচে কয়েকটা পান ছিল। দুটো পান মুখে দিয়ে মাল্যবানের দিকে বিলোড়িতক্রমে-ক্রমে শান্তি মণ্ডিত কেমন একটা স্থির মমতায় তাকিয়ে হেসে বললে, কোনো কিছু ব্যবস্থা করবার নেই?কী বলছ তুমি! উৎপলার দৃষ্টিশক্তির ওপর একটা পাখশাট মেরে যেন মাল্যবান বললে, খেয়াল আছে, কী বলছ তুমি!যা বলছি, তাই বলছি, তেমনই দৃষ্টিতৃপ্তিতে মাল্যবানের দিকে তাকিয়ে একটুও ঝক না মেরে উৎপলা বললে, তুমি না হয় কাল ওপরে এসে একটা বিহিত করে যেয়ো—মাল্যবান উৎপলার মুখের ওপর থেকে চোখ নামিয়ে মনের ঢের বেশি চোখের আলোকপাতের কড়া ঝাঝ দিয়ে সমস্ত ঘরটা ভরে ফেলতে লাগল; ধীরে-ধীরে মনে আলো এল তার; দেখল, আলোটা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে; মাল্যবান ভাবছিল, সে নিজে বিহিত কিছু করতে পারবে না; অন্ধকার রাতে পাঁচিল ডিঙিয়ে নিজের গাছেরও ফল চুরি করা বা যে চুরি করেছে তাকে ঠ্যাঙানো তার ধাতে নেই; ভালো হোক মন্দ হোক, কেমন একটা ধাত যেন তার; বন্ধুবান্ধব ডেকে হামলা করবার রুচি নেই; রটে যাবে সব, যেটুকু বা সাংসারিক শান্তি আছে তাও ছটকে ছত্রিশখান হবে। কিন্তু উৎপলা কি তাকে সাহায্য করবে না?মাল্যবান গেলাসটার জল ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নোটার থেকে খানিকটা জল গড়িয়ে নিয়ে ঢক ঢক করে গিলে খেল—হাত মুখ ধুয়ে ফেলল। ভালো লাগল, খানিকটা ঈশার শান্তি সংস্থাপিত হল পৃথিবীতে যেন, কিন্তু তবুও বিজ্ঞানের ঘোড়া ডিঙিয়ে সান্ত্বনার ঘাস খাবার প্রবৃত্তি মাল্যবানের ছিল না, সে ভেবে দেখল, উৎপলা আর অমরেশের সম্পর্ক সম্বন্ধে যা সন্দেহ করেছে স্বামীর চল্লিশ বছর পেরিয়ে গেলে—আজকালকার পৃথিবী যা তাতে আটাশ বছরের রুপসী শঙ্খিনী স্ত্রী সম্পর্কে সে রকম সন্দেহ সে না করতে পারে যে তা নয়। কিন্তু উৎপলা মোটেই সে জাতের মেয়ে নয়, তাকে অবিশ্বাস করা ঠিক নয়। অমরেশ আসে রোজই বটে, কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে যায়, কিন্তু ওরা বোন-ভাইয়ের মতো; বড়ো জোর জামাই-শালীর মতো সম্বন্ধ ওদের, এর চেয়ে বেশি কিছু নয়—জীবনের সৎ ও অসৎকে নিয়ে মাল্যবানের নিরবচ্ছিন্ন বিশ্লেষণ ঘিরে মাক্রোপোলো সিগারেটের নীল ধূসর ধোঁয়ার নীলাঞ্জন মাল্যবানকে কেমন একটা আশ্চর্য নিশ্চিন্তার ভেতর সমাধিপ্রীত করে রেখে দিল, কোনো কথা.ভাববার দরকার বোধ করল না সে আর।অমরেশের খুব টাকা আছে?না। বিশেষ কিছু নেই।তবে,—আমাদের চেয়ে বড়োলোক?উৎপলা অত্যন্ত ছাড়া গাছাড়া ভাবে বললে, বলতে পারছি না। তা হতে পারে।দেখে তো মনে হয় বনেদি ঘরের ছেলে।উৎপলা টেবিলের ও-কিনারে দাঁড়িয়েছিল, এ-কিনারে এসেছিল, কখন ও-দিককার কিনারে চলে গিয়েছে আবার, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ছিল, বসছিল না, বললে, ও, তুমি কেবল টাকা আর বংশের কথাই ভাবছ। আমি ওসব নিয়ে মাথা ঘামাতে যাই না। ওদের খুব বড়ো জমিদারি ছিল অনেক শরিক হয়ে পড়েছে। জমিদারিতে ভাঙন ধরেছে—এখন বিশেষ-কিছু নেইবয়স কত অমরেশের?এই ছত্রিশ-সাঁইত্রিশ হবে—স্ত্রী কেমন?সেকেলে জমিদারদের যে রকম হয়— যেন বার্তা বহন করছে, আর-কিছু নয়, শান্ত ঠাণ্ডা ভাবলেশহীনতায় উৎপলা বললে, এক আধ ফোঁটা রক্ত কণিকায় তবু নিজেকে নিজের কথাকে চারদিককার শীত রাতের আবহকে কেমন একটা বার্তাতীততা দান করে।ও তো সেকেলে নয়—ও তো এখনকার—হ্যাঁ, ও নিজে মনে ভাবে যে ও আগামী যুগের, উৎপলা ঢিলে হাসি হেসে খানিকটা গ্রন্থিমাংসপেশীর আক্ষেপে কেঁপে উঠে অবিশ্বাসে অথচ শিশুকে প্রশ্রয় দেবার মতো একটা হতবল অকপট হাসিতে কাতর হয়ে উঠে বললে, ওর মাথায় অনেক বিদ্যে। কিন্তু ওর পরিবারটা ওকে পিছে টানছে, ওর ছেলেপিলে তিনটে, এই মাঘে আর একটি হবে।এত কথা তুমি জানতে পেরেছ, অন্ধকারের ভেতর কেউটের মতো নড়ছে একটা মহিষের লেজ, তার মুখোমুখি যেন এসে পড়ে বললে মাল্যবান।উৎপলা পানের পিরিচের থেকে একটা পান তুলে নিয়ে অন্যমনস্কভাবে রেখে দিল আবার। পিরিচে মশলা ছিল, আঙুল দিয়ে সেগুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘেঁটে একটা লবঙ্গ তুলে নিল। লবঙ্গটা দাঁত দিয়ে কাটতে কাটতে বললে, অমরেশ তো আমার এখানে রোজ আসে। আমার এখানে অনেক রাত অব্দি থেকে। সব কথাই বলে আমাকে। কেন জানতে পারব না সব?মাল্যবান চিতাবাঘের মতো মুখ খিচোতে গিয়ে গৃহবলিভুকের মতো ক্লান্ত ক্লিষ্ট চোখে বললে, ও কি নিজেই সব বলে—সব করে? তুমিই তো ওকে দিয়ে বলাচ্ছ। রাত বারোটা-একটা অব্দি ও এখানে থাকে—তুমি আছ, তাই, তুমি ওকে থাকতে দিচ্ছ বলে। এর কোনো বিহিত করবে না?এর কোনো বিহিত নেই।নেই?নেই। কোনো নালিশ কোরো না তুমি।উৎপলা অন্তর্ভেদী অনিমেষ দৃষ্টিতে মাল্যবানের দিকে তাকাল, এমন মমতার সঙ্গে তাকাল সে-ভালোবাসার এমন গভীর আবেশে!-মাল্যবান উৎপলার চোখের দিকে তাকিয়েছিল—তাকাতে-তাকাতে তাকাতে পারল না সে আর।শোনো।মাল্যবান উৎপলার চোখের দিকে ফিরে তাকাল আবার। কিন্তু তাকিয়েই রইল সে। উৎপলাও মাল্যবানের চোখে চোখে রেখে দাঁড়িয়ে রইল। দুজনেরই খুব ভালো লাগল। কিন্তু এ তো পরলোকের এঁয়োতি নিবিড়তা-জীবন নদীর ওপারে—হয়তো হবে কোনো দিন হয় তো হবে না।বলো।বলেছিই তো। বললে উৎপলা।অমরেশের মতন একটা অচ্ছুৎ—অচ্ছুৎ মানে? ও তো বামুনের ছেলে—বেশ্যাটা এখনও আসবে তোমার কাছে?তুমি বড়ো বিশ্রী কথা বল, কোথাও আগুন নেই যেন ছাই-এর ভেতর, তবুও সর্বব্যাপ্ত আঁচ রয়েছে সেই নিশ্চল উনুনের মতো তাপ ছড়িয়ে উৎপলা বললে। শীতের রাতে তাপটা খারাপ লাগছিল না মাল্যবানের। উৎপলা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাপ বিকীরণ করে কোনো-একটা অপরিচিত অন্যতর কুহর থেকে তাপ সঞ্চয় করে নিয়ে বললে, ওতত দশটা-এগারোটা অব্দি থাকে। এখন দুটো। শীতের রাতটা পেকেছে এখন—পেকেছে? উৎপলার ইচ্ছুক অনুগত শরীরের দিকে তাকিয়ে মাল্যবান নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললে, কাকে বলে পাকা শীত রাত?এই তো এই সময়টা—কিন্তু, এই সময়টা তো সব সময় থাকবে না, ভেঙে যাবে তো সব কালকে ভোর বেলা।ভোর হবে না আর।কী করে বলছ তুমি?মাল্যবান উঠে দাঁড়াল। স্লিপারের ভেতর পান গলিয়ে গায়ের চাদর আঁট করে নিয়ে ঘরের চারদিকের অন্ধকারের দিকে চোখ বুলিয়ে নিতেই দেখল উৎপলা তার আরো অনেক কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।দুজনে বিছানায় শুল গিয়ে। উৎপলা মাল্যবানকে বললে, ভোর হবে না আর, জানতে হবে না। দেখো শীতের রাত কী রকম শীত, খড়ের বিছানায় হাঁস-হাঁসিনের মতো কী রকম উম আমাদের দুজনের। আবার দেখবে কী রকম লম্বা এ-সব রাত, শীতের রাত সত্যিই কী যে চমৎকার, লম্বা বলে আরো ভালো। সত্যি, কোনোদিন শেষ হবে না আর।মাল্যবানের আশ্চর্য লাগছিল। কোনোদিনও যে জেগে উঠতে হবে না আর, শীত যা সবচেয়ে ভালো, এই বিশৃঙ্খল অধঃপতিত সময়ে সমাজে রাতের বিছানা যা সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ, সেই শীত রাতের কোনোদিন শেষ হবে না আর, উৎপলা সব সময়ই মাল্যবানের সময় ঘেঁসে থেকে যাবে অনিঃশেষ শীত ঋতুর ভেতর। এইসব অপরুপ লাগল তার। কিন্তু লুও কী করে তা হয়? ইতিহাস নেই? বিভেদ করে চলে যেতে দিয়েছে মাল্যবানকে নিয়ে উৎপলাকে? সময় তো আছে? সময় নেই? ছেদ করে চলে গেছে তাকে নিয়ে সকল সময়কে উৎপলা? গভীর গভীর এই শীতের রাত। অনির্বচনীয়—যখন নদীর থেকে নয়, শুকনো শক্ত চুনী পান্নার ভেতর থেকে জল ঝরছে; সেই জলদেবীকে নিয়ে এ-রকম শীতের রাতে শুয়ে থাকা।কোনোদিন শেষ হবে না রাতের?না।কোনোদিন শেষ হবে না আমাদের রাতের, উৎপলা?হবে না। হবে না।শীতের রাত ফুরুবে না কোনোদিন?না।কোনোদিন ফুরুবে না শীত, রাত, আমাদের ঘুম?না, না, ফুরুবে না।কোনোদিন ফুরুবে না শীত, রাত আমাদের ঘুম?ফুরুবে না। ফুরুবে না।কোনোদিন ফুরুবে না শীত, রাত, আমাদের ঘুম?না, না, ফুরুবে না।কোনদিন ফুরুবে না শীত, রাত, আমাদের ঘুম?ফুরুবে না। ফুরুবে না। কোনোদিন–আলোড়িত হয়ে কথা বলতে-বলতে কেমন আলো-অন্ধকার, সুর্য, শিকরে রাজ, বড়ো বাতাস, মাতৃগণ, গণিকাগণ, উৎপলার অট্টহাসি, সমুদ্ৰশব্দ, রক্তশব্দ, মৃত্যুশব্দ, অফুরন্তশীত রাতের প্রবাহের রোল শুনতে শুনতে মাল্যবানের ঘুম ভেঙে গেল। টেবিলের ওপর মাথা রেখে ঘুমুচ্ছিল সে। তাকিয়ে দেখল ঘর অন্ধকার; টেবিলের থালা বাসন সমস্ত সরিয়ে এঁটো পরিষ্কার করা হয়েছে কখন যে সে তা টেরও পায়নি; টেবিল ফিটফাট পরিচ্ছন্ন—কালো সরীসৃপের পিঠের মতো চকচক করছে। মাল্যবান বুঝতে পারছিল না কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল। এই যে এইমাত্র উৎপলাকে দেখছিল, বিছানায় শুয়েছিল, কথা শুনছিল—এ সব তাহলে ঘুমের ভেতর দেখা, নির্জ্ঞান পরলোকের কণ্ঠে শোনা? জেগে থেকে তাহলে সে কোন অব্দি শুনেছিল। মাল্যবান ঘাড় হেঁট করে অন্ধকারে বুঝে নিতে চেষ্টা করছিল।…মনে পড়ল তার। মনটা তার বড় খারাপ হয়ে গেল। কিছু হবে না, কিছু সে করতে পারবে না বলে উৎপলা তারপর মাল্যবানকে এঁটো টেবিলে ঘুমিয়ে পড়তে দেখল; এঁটো পরিষ্কার করল; মশারী ফেলল; বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়েও পড়ল;—কিন্তু মাল্যবানকে জাগিয়ে দেওয়াও উচিত মনে করল না?
দেখে নিন আজকের রাশিফল মেষ রাশি: আপনার মধ্যে আজ ভরপুর আত্মবিশ্বাস বজায় থাকবে। তাই, এই দিনটাকে সঠিকভাবে কাজে লাগান। আর্থিক দিক থেকে আজকের দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঠান্ডা মাথায় কথা বলুন প্রেমের জীবনে আজ আপনি একটি চমকের সম্মুখীন হবেন। আপনি আজ এমন একটি বৈঠকে অংশগ্রহণ করতে পারেন যেখান থেকে কিছু ভালো ধারণা পাবেন। কোথাও কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে আপনি দ্রুত সেটিকে সমাধান করতে পারবেন। কর্মক্ষেত্রের অতিরিক্ত চাপের কারণে আজ আপনার মেজাজ খিটখিটে হয়ে উঠতে পারে। বিবাহিত জীবন নিঃসন্দেহে সুখের হবে।প্রতিকার: পারিবারিক জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে ছিঁড়ে যাওয়া এবং পুরনো কাপড় ও খবরের কাগজ বাড়ি থেকে দূরে সরিয়ে দিন।বৃষ রাশি: এই রাশির কিছু অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের মাধ্যমে আজ আর্থিক সুবিধা অর্জন করতে পারেন। যার ফলে তাঁরা অত্যন্ত গর্বিত হবেন। বাবা-মায়ের স্বাস্থ্যের কারণে আজ আপনার চিন্তা বৃদ্ধি হতে পারে। ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে আজ আপনার কোথাও বেড়াতে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও সেই পরিকল্পনা ব্যাহত হতে পারে। অংশীদারদের সঙ্গে অবশ্যই ঠান্ডা মাথায় কথা বলুন। আপনি আজ মোবাইল চালিয়ে অনেকটা সময় অতিবাহিত করতে পারেন। আপনি আজ সন্ধ্যা নাগাদ সিনেমা অথবা থিয়েটারে যেতে পারেন। বিবাহিত জীবনে কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে নিজেরাই তা মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন।প্রতিকার: পারিবারিক জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে গম, বাজরা, গুড় মিশিয়ে গরুকে খেতে দিন।মিথুন রাশি: আপনার ভদ্র এবং মার্জিত ব্যবহার আজ সর্বত্র প্রশংসা পাবে। এমনকি, অনেকে আপনার সামনেই প্রশংসা করবেন। আর্থিক দিক থেকে আজকের দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। শুধু তাই নয়, পূর্বে আপনার কাছ থেকে অর্থ ধার নিয়েছিলেন এমন একজন ব্যক্তি আজ সেই অর্থ আপনাকে ফেরত দিতে পারেন। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে আজকের দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে। ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে ঠান্ডা মাথায় কথা বলুন। কর্মক্ষেত্রে দিনটি খুব একটা খারাপ কাটবে না। অযথা সময় নষ্ট করা থেকে বিরত থাকুন। জীবনসঙ্গীর সঙ্গে দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে।প্রতিকার: প্রেমের জীবন সুখকর করে তোলার লক্ষ্যে গরুকে হলুদের গুঁড়ো মিশিয়ে আলু সেদ্ধ খেতে দিন।কর্কট রাশি: শরীরের প্রতি অবশ্যই যত্নশীল হন এবং শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে নিজের ওজনকে নিয়ন্ত্রণ রাখুন। খাওয়া-দাওয়ার বিষয়ে আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। অতিরিক্ত অর্থ আজ জমি বা বাড়ি কেনার কাজে ব্যবহার করুন। এই রাশির কিছু অভিভাবকের তাঁদের সন্তানদের পড়াশোনার পরিবর্তে অন্যান্য কাজকর্মে জড়িত থাকার কারণে চিন্তা বৃদ্ধি হতে পারে। কোনও ব্যবসায়িক বা আইনি কাগজপত্র ভালো করে না পড়ে তাদের সই করবেন না। আপনি আজ কোথাও ভ্রমণের সুযোগ খুঁজতে পারেন। বাবা-মায়ের সঙ্গে অবশ্যই কিছুটা সময় অতিবাহিত করুন। বিবাহিত জীবন নিঃসন্দেহে সুখের হবে।প্রতিকার: পারিবারিক জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে বাবার কথা মেনে চলুন।সিংহ রাশি: সামগ্রিকভাবে আজকের দিনটি খুব একটা খারাপ কাটবে না। বিবেচনা না করে আজ কাউকে ঋণ দেওয়া থাকে বিরত থাকুন। নাহলে, আপনি সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। আপনি আপনার বুদ্ধিতে কাজে লাগিয়ে একটি পারিবারিক সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারেন। ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে ঠান্ডা মাথায় কথা বলুন। কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি কাজ সতর্কতার সঙ্গে করুন। আপনি আজ রাতে বাড়ির ছাদে বা একটি পার্কে একাকী হাঁটাহাঁটি করতে পছন্দ করবেন। অর্ধাঙ্গিনীর একটি আচরণ আজ আপনার খারাপ লাগতে পারে।প্রতিকার: প্রেমের জীবন সুখকর করে তোলার লক্ষ্যে ভগবান ভৈরবের উদ্দেশ্য প্রসাদ অর্পণ করুন।কন্যা রাশি: মন থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রেখে প্রতিটি কাজ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করুন। কোথাও অর্থ বিনিয়োগ করার আগে অবশ্যই সেই বিষয়ে সমস্ত তথ্য ভালোভাবে জেনে নেওয়ার চেষ্টা করুন। আত্মীয়দের সঙ্গে আজ আপনার কোথাও ছোট সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রেমের জীবনে আজ আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। একটি নতুন অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আজ আপনি লাভবান হতে পারেন। আপনি আজ নিজের জন্য কিছুটা সময় পাবেন। আজ আপনি অর্ধাঙ্গিনীর জন্য একটি চমকের আয়োজন করতে পারেন।প্রতিকার: প্রেমের জীবন সুখকর করে তোলার লক্ষ্যে ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার আগে মিছরি খান এবং জল পান করুন।তুলা রাশি: আপনি আজ একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তির কাছ থেকে আশীর্বাদ লাভ করবেন। যার ফলে আপনার মন ভালো হয়ে যাবে। আপনি আজ একটি ধর্মীয় স্থান পরিদর্শন করতে পারেন। আর্থিক দিক থেকে আজকের দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। আপনি আজ একটি কাজে ভাইয়ের কাছ থেকে সাহায্য পেতে পারেন। প্রেমের জন্য দিনটি খুব একটা খারাপ নয়। আজ আপনার জীবনে একটি আকর্ষণীয় ঘটনা ঘটতে পারে। কর্মক্ষেত্রে প্রতিটি কাজ সর্তকতার সঙ্গে করুন। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: কর্মজীবনে উন্নতির লক্ষ্যের রোদে লাল অথবা কমলা রঙের কাঁচের বোতলে পানীয় জল রেখে সেই জল পান করুন।বৃশ্চিক রাশি: ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে অযথা অর্থব্যয়ের বদভ্যাস পরিত্যাগ করে সঠিকভাবে অর্থ সঞ্চয়ের প্রতি মনোযোগী হন। আবেগপ্রবণ হয়ে আজ কোনও কাজ করবেন না। ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে ঠান্ডা মাথায় কথা বলুন। আপনার কাছে আজ কিছুটা অবসর সময় থাকলেও আপনি সেটি একাকী অতিবাহিত করতে পছন্দ করবেন। বিবাহিত জীবনে কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে নিজেরাই তা মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন।প্রতিকার: শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে দুধ মেশানো জলে স্নান করুন।ধনু রাশি: আপনার মধ্যে আজ ভরপুর আত্মবিশ্বাস বজায় থাকবে। তাই, এই দিনটিকে অবশ্যই সঠিকভাবে কাজে লাগান। আপনি আগে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমস্ত কাজ শেষ করে ফেলতে পারবেন। একজন পুরনো বন্ধু আজ আপনার কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য চাইতে পারেন। আত্মীয়দের সঙ্গে আজ আপনার যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে। প্রেমের জন্য এই দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। কর্মক্ষেত্রে দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে। আপনার কাছে আজ কিছুটা অবসর সময় থাকবে। সেই সময়ে আপনি মোবাইলে একটি ওয়েব সিরিজ দেখতে পারেন। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: আর্থিক দিক থেকে উন্নতির লক্ষ্যে বিবাহ বা অন্য কোনও শুভ অনুষ্ঠানে বাধা সৃষ্টি করবেন না।মকর রাশি: আবেগপ্রবণ হয়ে আজ কোনও কাজ করবেন না। আপনার একগুঁয়ে মনোভাবকে নিয়ন্ত্রণ রাখুন। অতিরিক্ত অর্থ আজ জমি বা বাড়ি কেনার কাজে ব্যবহার করুন। প্রত্যেকের সঙ্গে ঠান্ডা মাথায় কথা বলুন। আপনি আজ কিছু নতুন বন্ধু তৈরি করতে সক্ষম হবেন। কোনও ধর্মীয় কাজকর্ম করার ক্ষেত্রে এই দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। কোনও নতুন ব্যবসায়িক অংশীদারিতে অংশগ্রহণ করার আগে সমস্ত তথ্য ভালোভাবে জেনে নেওয়ার চেষ্টা করুন। আপনি আজ একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তির কাছ থেকে আশীর্বাদ লাভ করবেন। যার ফলে আপনার মন ভালো হয়ে যাবে। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে সাদা রঙের ফুল এবং কিছু অর্থ জলে নিক্ষেপ করুন।কুম্ভ রাশি: বিবেচনা না করে আজ কাউকে ঋণ দেবেন না। নাহলে, আপনি বড় সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। বন্ধুদের সঙ্গে আজ আপনি কোথাও বেড়াতে যেতে পারেন। কর্মক্ষেত্রে দিনটি খুব একটা খারাপ কাটবে না। আপনি আজ একটি কাজে আত্মীয়দের কাছ থেকে সমর্থন পাবেন। মোবাইল চালিয়ে আজ আপনি অনেকটা সময় অতিবাহিত করতে পারেন। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে একটি পবিত্র অথবা ধর্মীয় স্থানে সাদা এবং কালো রঙের কম্বল অর্পণ করুন।মীন রাশি: মন থেকে অবশ্যই সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখুন। নাহলে, আপনার শরীর প্রভাবিত হবে। আর্থিক দিক থেকে আজকের দিনটি খুব একটা খারাপ নয়। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঠান্ডা মাথায় কথা বলুন। প্রেমের জীবনে আজ আপনাকে সতর্ক থাকতে হবে। কর্মক্ষেত্রে দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে। আপনি আজ কোথাও সমস্যার সম্মুখীন হলে অর্ধাঙ্গিনীর কাছ থেকে সাহায্য পাবেন।প্রতিকার: শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে অবশ্যই একটি অকার্যকর মুদ্রা স্রোতযুক্ত জলে নিক্ষেপ করুন।
কালের গহ্বরে হারিয়ে যায় সময়। আর এই সময়ে ঘটে চলে নানা ঘটনা। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ইতিহাস চিন্তা, চেতনা ও প্রেরণার উৎস। ইতিহাসই আমাদের পথ দেখায় নতুন নতুন দিগন্তের। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পৃথিবীকে আলোকিত করেছেন অনেক জ্ঞানী-গুণী। বিশ্বজুড়ে ঘটেছে গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনা। তবে সব ঘটনার ইতিহাসে ঠাঁই হয় না।আজ মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক ইতিহাসের এই দিনে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য ঘটনা, বিশিষ্টজনের জন্ম-মৃত্যুদিনসহ গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু বিষয়।ঘটনাবলি৬৩৬ - রোমানদের পরাজয়ের পর মুসলমানরা বায়তুল মোকাদ্দাস জয় করে।১০৯৭ - খ্রিস্টানরা বায়তুল মোকাদ্দাস দখলের জন্য ক্রুসেডের যুদ্ধ শুরু করে।১৭৬৯ - বাংলার তাঁত ও মসলিন শিল্প ধ্বংসের উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ রাজের নির্দেশে বাংলার তাঁতিদের হাতের বুড়ো আঙুল কাটা শুরু হয়।১৯৪৪ - মার্কিন বিমান বাহিনী ভিয়েনায় বোমাবর্ষণ করে।১৯৪৮ - ব্রিটেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, হল্যান্ড এবং লুক্সেমবার্গের প্রতিনিধিরা বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রুাসেলসে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করে।১৯৫৫ - ভারতে ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড ইন্সটিটিউশন আইএসআই মার্ক চালু করে।১১৯০ - ইংল্যান্ডের ইয়র্কে ৫ শতাধিক ইহুদিকে হত্যা করা হয়।১৯৯২ - দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ অবসানের জন্য শ্বেতাঙ্গ ভোটাররা সংস্কারের পক্ষে গণভোট দেন।১৯৯৪ - এল সালভাদরে গৃহযুদ্ধের খবর সংগ্রহকালে ৪ ডাচ সংবাদিক নিহত হন। মিসরে ৯ ইসলমাপন্থির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।১৯৯৬ - পাকিস্তানের লাহোরে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ক্রিকেট ফাইনালে শ্রীলঙ্কা অস্ট্রেলিয়াকে পরাজিত করে।২০০০ - উগান্ডায় গির্জায় অগ্নিকাণ্ডে ৫৩০ জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত হন এবং পরবর্তীকালে আরও ৩৯৪টি মরদেহ উদ্ধার হয়।২০০১ - চীনে বোমা বিস্ফোরণে ৪টি হোটেল বিধ্বস্ত হয়। এতে ১০৮ জন নিহত হন।২০০৪ - কসোভোতে সার্ব ও আলবেনীয়দের জাতিগত দাঙ্গায় ২২ জন নিহত এবং ৫০০ জন আহত হন।২০০৭ - ত্রিনিদাদ এবং টোবাগোর কুইন্স পার্ক ওভালে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের গ্রুপ পর্বের খেলায় বাংলাদেশ ভারতকে পরাজিত করে।জন্ম৭৬৩ - হারুনুর রশিদ, আব্বাসীয় খলিফা।১০৭৮ - আব্দুল কাদের জিলানী, ইসলাম ধর্মে অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ত্ব ও ধর্মপ্রচারক।১৪৭৩ - চতুর্থ জেমস, স্কটল্যান্ডের রাজা।১৮৩৪ - গোটলিব ডেইমলার, জার্মান মোটর গাড়ির পুরোধা।১৮৫৬ - মিখাইল ভ্রুবেল, রাশিয়ান চিত্রশিল্পী।১৮৭৩ - মার্গারেট বন্ডফিল্ড, ইংল্যান্ডের প্রথম নারী কেবিনেট মন্ত্রী।১৮৮১ - ওয়াল্টার রুডলফ হেস, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী সুইস শারীরবিজ্ঞানী।১৯১২ - মনোহর আইচ, ভারতীয় বাঙালি বডি বিল্ডার।১৯৩৮ - রুডলফ নুরেয়েভ, রাশিয়ান বংশোদ্ভূত ফরাসি নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার।১৯৪২ - সংগীতশিল্পী পূরবী দত্ত, ভারতীয় বাঙালি নজরুলগীতি বিশেষজ্ঞ।১৯৪৫ - এলিস রেজিনা, ব্রাজিলিয়ান গায়িকা।১৯৫৫ - গ্যারি অ্যালান সিনিস, মার্কিন অভিনেতা, পরিচালক ও খাদ প্লেয়ার।১৯৬২ - কল্পনা চাওলা, ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন প্রকৌশলী ও মহাকাশচারী।১৯৭৫ - পুনীত রাজকুমার, ভারতীয় অভিনেতা, গায়ক ও প্রযোজক।১৯৭৬ - আলভারো রেকোবা, সাবেক উরুগুয়ের ফুটবলার।১৯৮২ - স্টিভেন পিএনার, দক্ষিণ আফ্রিকান ফুটবলার।১৯৮৩ - রাউল মেইরেলেস, পর্তুগিজ ফুটবলার।১৯৮৬ - এডিন জেকো, বসনীয় ফুটবলার।১৯৮৯ - শিনজি কাগওয়া, জাপানি ফুটবলার।১৯৯০ - সাইনা নেহওয়াল, ভারতীয় ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়।মৃত্যু১০৪০ - হ্যারল্ড হারেফোট, ইংরেজি রাজা।১৭৮২ - দানিয়েল বার্নুয়ি, ডাচ সুইস গণিতবিদ ও পদার্থবিজ্ঞানী।১৮৪৬ - ফ্রিডরিশ ভিলহেল্ম বেসেল, জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং গণিতবিদ।১৯৩৭ - অস্টিন চেম্বারলেইন, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ইংরেজ রাজনীতিবিদ।১৯৫৬ - আইরিন জোলিও-কুরি, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ফরাসি পদার্থবিদ।১৯৫৭ - রামোন ম্যাগসেসে, ফিলিপিনো জেনারেল, রাজনীতিবিদ ও ৭ম প্রেসিডেন্ট।১৯৮৩ - হ্যাল্ডান কেফার হার্টলাইন, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মার্কিন শারীরবিজ্ঞানী।১৯৯৩ - হেলেন হায়েজ, মার্কিন অভিনেত্রী।১৯৯৬ - অনিল চট্টোপাধ্যায়, প্রখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেতা। রেনে ক্লিমেন্ট, ফরাসি পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার।২০০৭ - জন বাকাস, মার্কিন কম্পিউটার বিজ্ঞানী। সর্বপ্রথম উচ্চপর্যায় প্রোগ্রামিং ভাষা ফোরট্রান, বাকাস-নর আকার ও ফাংশান-পর্যায় প্রোগ্রামিং ধারণা উদ্ভাবন করার কারণে তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন।২০১৫ - বব এপলইয়ার্ড, ইংরেজ ক্রিকেটার।২০১৯ - কৌতুক চলচ্চিত্র অভিনেতা চিন্ময় রায়।২০২৫ - হরিমাধব মুখোপাধ্যায়, বাংলা থিয়েটারের নট, নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক ও সংগঠক।
আজ মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ ২০২৬ ইং, ৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, দিনের শুরুতেই জেনে নিন আগামী ২৪ ঘন্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাস সহ কেমন থাকবে আজকের আবহাওয়া। প্রবাসীর দিগন্ত সংবাদের দৈনিক আপডেট, 'আজকের আবহাওয়ার খবর'-এ আপনি ঢাকা ও সারা দেশের বর্তমান আবহাওয়া, বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড় এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস সহ বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ আবহাওয়ার বুলেটিন সম্পর্কে জানতে পারবেন।আজকের আবহাওয়ার পূর্বাভাসআজকের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আজ ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দু’এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎচমকানোসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সারাদেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।তাপমাত্রা: সারাদেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।বৃষ্টিপাত: ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দু’এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎচমকানোসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।আবহাওয়ার খবরগত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল মোংলা, সব্বোর্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৩.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এবং দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল সিলেট, সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২৪.০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।সিনপটিক অবস্থা: লঘুচাপের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে।সামুদ্রিক সতর্কবার্তা: কোন সতর্কবার্তা নেই এবং কোনো সংকেত দেখানো হয়নি।নদীবন্দর সমূহের জন্য সতর্কবার্তা: ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং সিলেট অঞ্চল সমূহের উপর দিয়ে পশ্চিম অথবা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘন্টায় ৪৫-৬০ কি.মি. বেগে অস্থায়ীভাবে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রবৃষ্টি হতে পারে। এসব এলাকার নদীবন্দর সমূহকে ১ নম্বর, পুনঃ ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।গত ২৪ ঘন্টার সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা:সব্বোর্চ তাপমাত্রা: মোংলা - ৩৩.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।সর্বনিন্ম তাপমাত্রা: সিলেট - ১৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।আজকের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত (ঢাকা):আজকের সূর্যোদয় ভোর ৬:০৫ মিনিটে।আজকের সূর্যাস্ত সন্ধ্যা ৬:০৯ মিনিটে।বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যগণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র, ই-২৪, আগারগাঁও, ঢাকা-১২০৭
ক্রিকেট২য় নারী টি-টোয়েন্টিনিউজিল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকাসকাল ৭টা ৪৫ মিনিট, সনি স্পোর্টস ১২য় টি-টোয়েন্টিনিউজিল্যান্ড-দক্ষিণ আফ্রিকাদুপুর ১২টা ১৫ মিনিট, সনি স্পোর্টস ১ফুটবলনারী এশিয়ান ফুটবলঅস্ট্রেলিয়া-চীনবিকেল ৪টা, টি স্পোর্টস ও ট্যাপম্যাডউয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগস্পোর্তিং-বোডো/গ্লিমটরাত ১১টা ৪৫ মিনিট, সনি স্পোর্টস ২চেলসি-পিএসজিরাত ২টা, সনি স্পোর্টস ১ম্যান সিটি-রিয়াল মাদ্রিদরাত ২টা, সনি স্পোর্টস ২আর্সেনাল-লেভারকুসেনরাত ২টা, সনি স্পোর্টস ৫
1️⃣ ৮ টাকা → ১২ মিনিটমেয়াদ: ১২–২৪ ঘণ্টাকোড: *121*08#2️⃣ ১৪ টাকা → ২২ মিনিটমেয়াদ: ১ দিনকোড: *121*014#3️⃣ ১৮ টাকা → ২৮ মিনিটমেয়াদ: ১ দিনকোড: *121*18#4️⃣ ২৩ টাকা → ৩৫–৪০ মিনিটমেয়াদ: ২ দিনকোড: *121*23# বা *123*23# 📞 ৭ দিনের মিনিট অফার৭৮ টাকা → ১০০ মিনিট৯৭ টাকা → ১৩০ মিনিট১২৯ টাকা → ১৮০ মিনিট১৩৯ টাকা → ২২০ মিনিট 📞 ৩০ দিনের মিনিট অফার১৬৯ টাকা → ২০০ মিনিট২০৯ টাকা → ২৫০ মিনিট৩১৯ টাকা → ৫০০ মিনিট৫০৯ টাকা → ৮০০ মিনিট৬২৯ টাকা → ১০০০ মিনিট ✅ সব এয়ারটেল অফার দেখতে ডায়াল করুন:*121#✅ মিনিট চেক কোড:*778*5#
1️⃣ ধাঁধা:কোন জিনিসটা কাটলে সবাই খুশি হয়?উত্তর: কেক 🎂2️⃣ ধাঁধা:কোন জিনিসটা যতই ধোও ততই কালো হয়?উত্তর: ব্ল্যাকবোর্ড 🧑🏫3️⃣ ধাঁধা:একটা গাছ আছে, কিন্তু ফল নেই, ফুল নেই, তবু সবাই বসে থাকে। সেটা কী?উত্তর: চেয়ার (কারণ চেয়ারেরও “পা” থাকে) 🪑4️⃣ ধাঁধা:কোন জিনিসটা নিজের জায়গা থেকে না নড়েও সারা পৃথিবী ঘুরে আসে?উত্তর: ডাকটিকিট ✉️5️⃣ ধাঁধা:কোন জিনিসটা ভাঙলে শব্দ হয় না?উত্তর: প্রতিজ্ঞা / প্রতিশ্রুতি 🤫6️⃣ ধাঁধা:কোন জিনিসটা সকালে ৪ পা, দুপুরে ২ পা, আর রাতে ৩ পা?উত্তর: মানুষ (শিশু অবস্থায় হামাগুড়ি, বড় হলে হাঁটে, বুড়ো হলে লাঠি নেয়) 👴