BDBOYS...
BDBOYS...
সবচেয়ে সাম্প্রতিক খবর ও পোস্টসমূহ
🎬 Prince (2026) — ঢাকার অন্ধকার জগতের নতুন অধ্যায়বাংলা সিনেমার জগতে ২০২৬ সালের সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর মধ্যে একটি হলো Prince: Once Upon a Time in Dhaka। বড় বাজেট, স্টাইলিশ অ্যাকশন, ৯০ দশকের ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড এবং সুপারস্টার Shakib Khan — সব মিলিয়ে সিনেমাটি মুক্তির আগেই দর্শকদের মাঝে ব্যাপক হাইপ তৈরি করেছিল।এই সিনেমার গল্প গড়ে উঠেছে পুরনো ঢাকার অপরাধ জগত, ক্ষমতার লড়াই, বিশ্বাসঘাতকতা এবং ভালোবাসাকে ঘিরে। নির্মাতা Abu Hayat Mahmud প্রথমবারের মতো বড় পর্দায় এমন এক ধামাকাদার প্রজেক্ট নিয়ে আসেন, যা দর্শকদের কাছে একদম নতুন অভিজ্ঞতা দেয়।🌆 গল্পের পটভূমি“Prince” মূলত ৯০ দশকের ঢাকাকে কেন্দ্র করে তৈরি একটি ক্রাইম-অ্যাকশন থ্রিলার। শহরের অন্ধকার দুনিয়ায় একজন প্রভাবশালী চরিত্র কীভাবে ক্ষমতা, ভয় আর ভালোবাসার মধ্যে নিজের রাজত্ব গড়ে তোলে — সেটাই সিনেমার মূল আকর্ষণ।সিনেমাটির ট্রেলার ও টিজারে দেখা যায় ধোঁয়াটে আলো, গ্যাংস্টার পরিবেশ, বন্দুকের যুদ্ধ এবং আবেগঘন কিছু মুহূর্ত। পরিচালক জানিয়েছেন, এটি কোনো বাস্তব গ্যাংস্টারের বায়োপিক নয়, বরং সম্পূর্ণ মৌলিক গল্প।⭐ অভিনয়ে যারা আছেনShakib KhanTasnia FarinNasir Uddin KhanDibyendu BhattacharyaJyotirmoyee Kunduবিশেষ করে শাকিব খানের লুক ও স্ক্রিন প্রেজেন্স দর্শকদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে। টিজারে তাকে একদম ভিন্ন স্টাইলে দেখা গেছে, যা তার আগের সিনেমাগুলোর তুলনায় আরও ডার্ক এবং পাওয়ারফুল।🎥 সিনেমাটির বিশেষ দিক🔥 ১. ৯০ দশকের ঢাকার আবহপুরনো ঢাকার রাস্তা, আন্ডারওয়ার্ল্ড কালচার এবং সেই সময়কার রাজনৈতিক ও অপরাধ জগতকে সিনেমাটিতে স্টাইলিশভাবে তুলে ধরা হয়েছে।🎶 ২. ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকমিউজিক ডিরেক্টর Arafat Mohsin সিনেমাটির জন্য ভিন্নধর্মী ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর তৈরি করেছেন, যা অ্যাকশন দৃশ্যগুলোকে আরও ইন্টেন্স করেছে।💥 ৩. বড় বাজেটের আয়োজনমিডিয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, এটি বাংলাদেশের অন্যতম ব্যয়বহুল সিনেমা। বিশাল সেট, সিনেমাটোগ্রাফি এবং অ্যাকশন সিকোয়েন্সে বড় বাজেটের ছাপ স্পষ্টভাবে দেখা যায়।🗣️ দর্শকদের প্রতিক্রিয়াসিনেমাটি মুক্তির পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। কেউ শাকিব খানের স্টাইল ও অ্যাকশন প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ গল্পের গভীরতা নিয়ে সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও Reddit আলোচনায় অনেকেই বলেছেন, সিনেমাটির ভিজ্যুয়াল এবং প্রেজেন্টেশন দারুণ হলেও স্টোরি আরও শক্তিশালী হতে পারত।............................................................................................................................................................................ ⬇ Download Now
রাক্ষস (Rakkhosh) (2026) – ভালোবাসা, প্রতিশোধ আর অন্ধকার এক মানসিক যুদ্ধবাংলাদেশি সিনেমার জগতে ২০২৬ সালের ঈদে মুক্তি পাওয়া সবচেয়ে আলোচিত সিনেমাগুলোর একটি হলো Rakkhosh। অ্যাকশন, থ্রিলার আর ইমোশনের মিশেলে তৈরি এই সিনেমাটি দর্শকদের মাঝে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সিনেমাটির পরিচালক মেহেদী হাসান হৃদয়, আর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন Siam Ahmed।সিনেমার গল্প“রাক্ষস” মূলত এমন একজন মানুষের গল্প, যে ভালোবাসা, লোভ আর প্রতারণার কারণে ধীরে ধীরে নিজের অন্ধকার দিকের মুখোমুখি হয়। সমাজের নিষ্ঠুরতা তাকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে যায়, যেখানে সে প্রতিশোধের জন্য ভয়ংকর রূপ ধারণ করে।সিনেমার গল্পে দেখা যায়, একজন সাধারণ মানুষ পরিস্থিতির শিকার হয়ে কিভাবে ধীরে ধীরে “রাক্ষস”-এ পরিণত হয়। গল্পের প্রতিটি ধাপে রয়েছে রহস্য, টুইস্ট এবং মানসিক দ্বন্দ্ব।অভিনয় ও চরিত্রএই সিনেমায় Siam Ahmed দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেছেন, যা দর্শকদের কাছে ছিল অন্যতম আকর্ষণ। তার অভিনয়ের মধ্যে রাগ, কষ্ট, প্রতিশোধ আর ভালোবাসার আবেগ খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।এছাড়াও অভিনয় করেছেন:Susmita ChatterjeeShataf FigarNazneen Hasan ChumkiAli Rajসিনেমাটির বিশেষ দিক“রাক্ষস” সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর ডার্ক ভিজ্যুয়াল, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এবং অ্যাকশন দৃশ্য। সিনেমার অনেক দৃশ্য দর্শকদের মানসিকভাবে নাড়া দেয়। পরিচালক সিনেমাটিকে শুধু অ্যাকশন ফিল্ম না বানিয়ে মানুষের ভেতরের “দানব”-কেও তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।অনেক দর্শক সিনেমাটির ভিজ্যুয়াল স্টাইলকে দক্ষিণ ভারতীয় কিছু সিনেমার সাথে তুলনা করলেও, অনেকে আবার এটিকে বাংলাদেশের সিনেমার নতুন যুগের অংশ বলেও প্রশংসা করেছেন।গান ও মিউজিকসিনেমাটির গানগুলোও দর্শকদের ভালো লেগেছে। বিশেষ করে “Shuddhotar Prem” এবং “Tumi Chara” গান দুটি মুক্তির পর সামাজিক মাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়।দর্শক প্রতিক্রিয়ামুক্তির পর সিনেমাটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ এর অ্যাকশন ও সিনেমাটোগ্রাফির প্রশংসা করেছেন, আবার কেউ গল্পে অন্য সিনেমার প্রভাব দেখেছেন। তবে প্রায় সবাই একমত যে Siam Ahmed এই সিনেমায় নিজের লুক ও অভিনয়ে নতুনত্ব দেখিয়েছেন।মুক্তি ও জনপ্রিয়তাসিনেমাটি ২১ মার্চ ২০২৬ সালে ঈদ উপলক্ষে বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। পরে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইতালিতেও মুক্তি দেওয়া হয়।................................................................................................................................................................... ⬇ Download Now
🎬 দম (Domm) ২০২৬ – বাংলা মুভি রিভিউ ও বিস্তারিত গল্পবাংলাদেশি সিনেমার জগতে ২০২৬ সালে সবচেয়ে আলোচিত সিনেমাগুলোর মধ্যে একটি হলো Domm। “Until The Last Breath” ট্যাগলাইন নিয়ে মুক্তি পাওয়া এই সারভাইভাল থ্রিলার সিনেমাটি দর্শকদের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। সিনেমাটির পরিচালক হলেন Redoan Rony এবং প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন Afran Nisho, Chanchal Chowdhury ও Puja Cherry।📖 সিনেমার গল্প“দম” মূলত একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত সিনেমা। গল্পটি এমন একজন সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে, যিনি অপহরণের পর কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে টিকে থাকার সংগ্রাম করেন। আফগানিস্তানে বন্দি অবস্থায় একজন মানুষের মানসিক শক্তি, বেঁচে থাকার ইচ্ছা এবং পরিবারের কাছে ফিরে আসার লড়াই—এই বিষয়গুলোই সিনেমার মূল আকর্ষণ।সিনেমার প্রতিটি দৃশ্যে টেনশন, আবেগ এবং বাস্তবতার মিশ্রণ দেখা যায়। বিশেষ করে মরুভূমির দৃশ্য ও বন্দি জীবনের মুহূর্তগুলো দর্শকদের ভেতর এক ধরনের চাপা অনুভূতি তৈরি করে।🌟 অভিনয় কেমন ছিল?🔥 আফরান নিশোAfran Nisho এই সিনেমায় নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স দিয়েছেন। তার চোখের অভিব্যক্তি, সংলাপ বলার ধরন এবং কষ্টের দৃশ্যগুলো অনেক বাস্তব লেগেছে। IMDb-তেও দর্শকরা তার অভিনয়ের বিশেষ প্রশংসা করেছেন।🎭 চঞ্চল চৌধুরীChanchal Chowdhury তার চরিত্রে রহস্য ও গভীরতা এনেছেন। নিশো এবং চঞ্চলের প্রথম বড়পর্দার জুটি দর্শকদের কাছে দারুণ লেগেছে।💖 পূজা চেরিPuja Cherry সিনেমায় আবেগঘন মুহূর্তগুলো আরও শক্তিশালী করে তুলেছেন।🎵 গান ও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকসিনেমার গানগুলোও বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। বিশেষ করে “এই মন তোমাকে দিলাম” গানটির নতুন ভার্সন দর্শকদের নস্টালজিক করে তুলেছে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক সিনেমার টেনশন ও আবেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।🎥 সিনেমাটির বিশেষ দিকবাস্তব ঘটনার উপর ভিত্তি করে তৈরিআন্তর্জাতিক মানের সিনেমাটোগ্রাফিআবেগ ও থ্রিলারের অসাধারণ মিশ্রণশক্তিশালী স্ক্রিপ্ট ও ডায়লগনিশোর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয়⭐ IMDb রেটিং ও দর্শক প্রতিক্রিয়াDomm: Until the Last Breath IMDb-তে প্রায় 7.5/10 রেটিং পেয়েছে এবং দর্শকদের কাছ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া অর্জন করেছে। অনেকেই এটিকে ২০২৬ সালের সেরা বাংলা সিনেমাগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করছেন।📝 শেষ কথাযদি আপনি থ্রিলার, সারভাইভাল ও আবেগপূর্ণ গল্পের সিনেমা পছন্দ করেন, তাহলে Domm অবশ্যই আপনার দেখা উচিত। সিনেমাটি শুধু বিনোদন নয়, মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছাশক্তি ও সাহসের এক অসাধারণ উদাহরণ তুলে ধরেছে।................................................................................................................................................................ ⬇ Download Now
গল্পঃ আমৃত্যু ভালোবাসি তোকেলেখিকাঃ সালমা চৌধুরী..................................................................................................................................................................আবিরের নিগূঢ় আঁখি যুগলে অসহায়ত্বের ছাপ। মেঘ অভিনিবিষ্টের ন্যায় আবিরের জলসিক্ত নয়নের পানে তাকিয়ে আছে। হৃদপিণ্ডের তীব্র কম্পনে মেঘের গায়ের রক্ত প্রবল বেগে টগবগ করছে। আবিরের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেছে, অনবরত তিরতির করে ঠোঁট কাঁপছে। মাথা থেকে ঘামের রেখা কপালের পাশ বেয়ে গড়িয়ে পরছে। আবিরের শীতল দুচোখ মেঘের অভিমুখে। মেঘ আনমনে কতকিছু ভেবে হঠাৎ পল্লব ঝাপ্টে প্রশ্ন করল,“কি স্বপ্ন দেখেছেন?”সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে মেঘের প্রশ্ন শুনে নড়ে উঠল আবির তবে তখনও গভীর দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। থমথমে গলায় উত্তর দিল,” দুঃস্বপ্নের কথা বলতে নেই। আর আমি ম*রে গেলেও এই স্বপ্ন সত্যি হতে দিব না। ”মেঘ ঠোঁট উল্টে চোখ গোল গোল করে অসহায় মুখ করে চেয়ে আছে। আবির পরক্ষণেই বলে উঠল,“আচ্ছা শুন”“জ্বি। ”“তোর শরীর কেমন এখন?”“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”“এখনও শ্বাসকষ্ট হয়? বা অন্য কোনো সমস্যা? ”“শ্বাসকষ্ট হয় না তবে অন্য সমস্যা আছে।”আবির উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,“কি সমস্যা? বলিস নি কেনো আগে?”একটু থেমে আবারও বলে উঠল,“আমি তানভিরকে বলে রাখবো কাল সকালে মামনিকে নিয়ে ডাক্তারের….”এরমধ্যে মেঘ আবেগময় কন্ঠে বলল,“কাউকে অতিরিক্ত মিস করার সমস্যা। কোন ডাক্তার দেখাবো বলুন..”আবিরের কথা বন্ধ হয়ে গেছে। মেঘের এমন কথায় আবিরের চোখে মুখে খানিক উজ্জ্বলতা ফুটে উঠেছে।নিদারুণ অনুভূতিরা বক্ষস্পন্দন বাড়াতে ব্যস্ত। আবির নিশ্চুপ হয়ে চেয়ে আছে অপরূপ সেই মুখমণ্ডলে। মেঘ আহ্লাদী কন্ঠে আবারও শুধালো,“বলুন না, কোন ডাক্তার দেখাবো?”আবির ভ্রু কুঁচকে গুরুভার কন্ঠে বলল,” সব বিষয় নিয়ে মজা করিস না, মেঘ। শারীরিককোনো সমস্যা মনে হলে ডাক্তার দেখাস প্লিজ। ”অভিমানের দমকা হাওয়া বয়ে গেল মেঘের মনে। মেঘ ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে জানতে চাইল,“মানসিক সমস্যা হলে কি করব?”“তোর মানসিক সমস্যা শুনার জন্য তো আমিই আছি। এই ডাক্তার চলবে না? ”মেঘ ফিক করে হেসে বলল,” আপনি ডাক্তার?সার্টিফিকেট টা দেখাবেন প্লিজ।”আবির চোখ সরু করে বলে উঠল,” সার্টিফিকেট টা না হয় দেশে ফিরেই দেখালাম।”টুকটাক কথা চলল কিছুক্ষণ। আবিরের মন ভালো করতে অল্পস্বল্প দুষ্টামিও করেছে মেঘ। কিন্তু আবিরের মন ভালো হওয়ার বিন্দুমাত্র লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এদিকে রাত গভীর হচ্ছে, ঘুমে মেঘের চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। মেঘ নিজের প্রতি খুব ক্ষুদ্ধ হচ্ছে। আবির আজ খুব মনোযোগী। মেঘ যা জিজ্ঞেস করছে সবেতেই তার আদরমাখা উত্তর রেডি। এই অপরুপ মুহুর্ত রেখে ঘুমানোর বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই মেঘের কিন্তু চোখ যেন মেঘের ইচ্ছেকে পাত্তায় দিচ্ছে না। আবিরের কথার মাঝে ঘুমের আবেশে বার বার চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টা খেয়াল করে আবির অত্যন্ত নমনীয় স্বরে জিজ্ঞেস করল,“ঘুম পাচ্ছে?”মেঘ চোখ বড় করে তাকিয়ে জবাব দিল,” কই না তো।”আবির মলিন হেসে বলল,“জোর করে কথা বলতে হবে না। আমি পালিয়ে যাচ্ছি না, ঘুমান।”” ঘুম চলে গেছে। ”“কে চলে গেছে কে যায় নি সেটা পরে দেখছি। আপাতত কল না কেটে ফোনটা পাশে রেখে চোখ বন্ধ করুন। ”মেঘ আঁতকে উঠে চাইল আবিরের অভিমুখে। হৃদপিণ্ড ছুটছে দ্বিকবিদিক, হৃদপিণ্ডের পিটপিট শব্দ বেড়েই চলেছে। “কল না কেটে” কথাটা যেন মস্তিষ্কে ঘুরপাক খাচ্ছে। মেঘ থমথমে কন্ঠে বলল,“কল না কাটলে ঘুম আসবে না।”আবির গুরুভার কন্ঠে জানাল,“সেটা আমি বুঝবো। এখন যা বলছি করুন।”আবিরের ক্ষিপ্ত নয়ন জোড়া দেখে মেঘ ঢোক গিলে বালিশের পাশে ফোন হেলান দিয়ে রেখে গায়ে পাতলা কাঁথা জরিয়ে শুয়ে পরেছে। মেঘ মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে শীতল কন্ঠে বলল,” কল কাটবেন কখন? আমার লজ্জা লাগছে।”আবিরের নিরুদ্যম কণ্ঠের জবাব,” লজ্জা লাগছে যেহেতু চোখ বন্ধ করে রাখ। বেশরমের মতো তাকিয়ে থাকতে কে বলছে? ”মেঘ চোখমুখ কুঁচকে কন্ঠ ভারী করে বলল,“আপনি এটা বলতে পারলেন!”আবির গম্ভীর গলায় বলল,“চোখ বন্ধ। আর একবার চোখ খুললে খবর আছে। ”মেঘ চোখ বন্ধ করে কাটকাট গলায় জানাল,“আপনি কিন্তু নিজ দায়িত্বে কল কেটে দিবেন।”আবিরের আর কোনো জবাব এলো না। বৈদ্যুতিক বাতির আলোতে আলোকিত রুমে ফ্যানের বাতাসে মেঘের চুলগুলো অনবরত উড়ছে, আবির অবাক লোচনে সেই দৃশ্য দেখতে ব্যস্ত । মেঘের মুখের প্রতিটা পশম সূক্ষ্ম নেত্রে পরখ করছে আবির৷ মেঘের ফর্সা কপোলের নিকষ কালো তিলটা খুব বেশি আকৃষ্ট করছে। আবিরের হৃদয় কেঁপে উঠেছে, শরীরজুড়ে অজানা শিহরণ। কিছু সময়ের মধ্যে মেঘের নিশ্বাসের শব্দ জোড়ালো হলো। রাত ২ টা বেজে ১৭ মিনিট, মেঘ গভীর ঘুমে নিমগ্ন আবির ফোনের অপর পাশ থেকে গভীর মনোযোগ দিয়ে তার প্রেয়সীকে দেখতে ব্যস্ত।ভোরের মৃদু আলো আর বৈদ্যুতিক বাতির আলোতে মেঘের রুম ঝলমল করছে। চোখে আলো লাগছে, মেঘ ঘুমের মধ্যেই ভ্রু কুঁচকে নড়ে উঠল। কপালে হাত রেখে চোখ ঢাকার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। দীপ্ত আলোর চিত্তদাহে বিরক্ত হয়ে কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে অল্পবিস্তর চোখ মেলল মেঘ। ঘুম ঘুম চোখের কোণে ফোনে নড়ে ওঠা কারো অবয়ব ভেসে উঠল। মেঘ তৎক্ষনাৎ ঘাড় কাত করে স্পষ্ট চোখে তাকালো সেদিক।সঙ্গে সঙ্গে মেঘের সমস্ত শরীর শিউরে উঠলো। বালিশে হাত রেখে তারউপর মাথা রেখে আবির নিগূঢ় দৃষ্টিতে মেঘের দিকে চেয়ে আছে, ঠোঁটে লেগে আছে মায়াবী হাসি। আবিরের উষ্কখুষ্ক চুল, গাল ভর্তি ছাপ দাঁড়ি আর নেশাক্ত দৃষ্টি দেখে শোভিত পুরুষের সুষুপ্ত আদলের মোহে ডুবে গেছে। আবির ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠে বলল,“Good Morning,Sparrow.”আবিরের ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠস্বর কানে বাজতেই দুর্ভেদ্য আবেশে চোখ বন্ধ করে ফেলল মেঘ। এই দৃষ্টি, কন্ঠস্বরে মেঘের অন্তরাত্মা পর্যন্ত কেঁপে উঠেছে। চোখ খুলে রাখার বিন্দু পরিমাণ শক্তি অবশিষ্ট নেই। আবির তখনও নিষ্পলক চোখে তাকিয়েই আছে। আবির একগাল হেসে শান্ত কন্ঠে শুধালো,“ঘুম ভালো হয় নি? আমি এসে পর্দা টেনে দিয়ে যাবো?”মেঘ এবার সর্বশক্তি দিয়ে সাফ তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,“আপনি কি সারারাত ঘুমান নি?”“না।”“কেনো?”“ঘুম আসছিল না।”মেঘ কন্ঠ খাদে নামিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,“কল কাটতে বলছিলাম কাটেন নি কেনো?”” কল কাটতে ইচ্ছে করে নি তাই কাটি নি।”মেঘ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,” অফিস নেই?”“আছে।”মেঘ সময় দেখে পুনরায় শক্ত কন্ঠে বলল,“সময় হয়ে যাচ্ছে। উঠছেন না কেনো এখনও?”“যেতে ইচ্ছে করছে না।”আবিরের নিরুদ্বেগ কন্ঠের একেকটা উত্তর শুনে মেঘ আশ্চর্য বনে যাচ্ছে। যে মানুষটাকে এতদিন গুরু-গম্ভীর,অনুভূতিহীন আর নিষ্ঠুর ভেবে এসেছে সেই আবির ভাইয়ের আকস্মিক পরিবর্তন মেঘের মনে বিশাল প্রভাব ফেলছে। মেঘ রাশভারী কন্ঠে শুধালো,“সমস্যা কি আপনার? ”আবির মুচকি হেসে উত্তর দিল,” বহুত সমস্যা। এদের কোনো সমাধানও নেই।”নিজের অজান্তেই মেঘের ঠোঁট জুড়ে ললিত হাসি ফুটলো। লজ্জায় লাল হওয়া দু গাল চিকচিক করছে। মেঘ শক্ত কন্ঠে বলল,” থাক ভাই বুঝছি আপনার সমস্যা। প্লিজ, এখন উঠে অফিসে যান।”“আমি তোর ভাই?”” ভাই না তো কি?”মেঘের মুখে এমন প্রশ্ন শুনে আবির ভেতরে ভেতরে জ্বলে উঠলো। গম্ভীর মুখ করে সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে অগ্নিকণ্ঠে বলল,“আমি তোর বাবার দাদুর নাতির ছেলে হতে পারি কিন্তু তোর ভাই না, বাই।”আবির কল কেটে দিয়েছে। মেঘ আহাম্মকের মতো বসে আছে। আবির যে ভাই ডাকার ক্ষোভে রাগ করে ফোন কেটেছে এটা বুঝতে সময় লাগলো না মেঘের। কিন্তু এটাও বুঝতে পারছে না, আবির ভাই আর শুধু ভাই এর মধ্যে পার্থক্য টা কি! বেশকিছুক্ষণ বসে থেকে চটজলদি উঠে রুম গুছিয়ে ফ্রেশ হতে চলে গেল। ওজু করে ফজরের নামাজ পড়ে ছাদে গিয়ে কিছুক্ষণ হাটাহাটি করে রুমে আসলো। এরমধ্যে আবিরের আর কোনো কল আসলো না। মেঘের মনে বেশকিছু প্রশ্ন উদ্গত হচ্ছে। রুমে কিছুক্ষণ পায়চারি করে এক বুক সাহস নিয়ে অডিও কল দিল ৷ কল বাজতে বাজতে কেটে গেছে। মেঘ এবার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ভিডিও কল দিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে রিসিভ হলো। দেখেই বুঝা যাচ্ছে সদ্য শাওয়ার নিয়ে বেড়িয়ে কোনোরকমে কল টা রিসিভ করেছে আবির । এখনও ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে। আবিরের জলসিক্ত উন্মুক্ত শরীর, কোমড়ে বাঁধা সাদা টাওয়েল। আবিরের ভেজা চুল, লোমশ বুকে আর নির্মেদ পেট দেখে মেঘ যত্রতত্র দৃষ্টি সরিয়ে নিল। ঢোক গিলে উষ্ণ শ্বাস ছেড়ে বলল,“সরি সরি। অসময়ে কল দিয়ে ফেলছি। ”আবির মেকি স্বরে বলল,” সরি বললেই কি আমার মানইজ্জত ফিরে পাবো? ”মেঘ চোখ নামিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,” আমি বুঝতে পারি নি, সরি। ”আবির মুচকি হেসে অন্য একটা টাওয়েল দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বলল,” দূর পাগলি, এসব কোনো ব্যাপার না। তাছাড়া আমি আপনার কলের অপেক্ষায় ছিলাম।”“কেনো?”“আজ প্রজেক্টের ফাইনাল মিটিং কি পড়ে যাব বুঝতে পারছিলাম না। আবার করেছি রাগ তাই নিজে থেকে কলও দিতে পারছিলাম না।”মেঘ লাজুক হেসে বলল,” আপনি এমন ঢং করা কোথা থেকে শিখছেন?”“আপনার থেকেই শিখেছি।”মেঘ ভেঙচি কাটলো। আবির মুচকি হেসে ২-৩ টা শার্ট ফোনের সামনে ধরে চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করল,“কোনটা পড়ব?”মেঘ কয়েক সেকেন্ডেই একটা শার্ট সিলেক্ট করে দিল, আবির ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে একদম ইন করে শার্ট পড়ে, ব্লেজার-টাই সঙ্গে সু জুতা পড়ে সম্পূর্ণ রেডি হয়ে গেছে। ফোন থেকে খানিকটা দূরে সরে উঁচু গলায় জিজ্ঞেস করল,“কেমন লাগছে?”মেঘ আপাদমস্তক দেখে মোলায়েম কন্ঠে বলল,“মাশাআল্লাহ কিন্তু… ”“কিন্তু কি?”“How do I bite the pinky finger now?”(আমি এখন কনিষ্ঠা আঙুলে কিভাবে কামড় দিব?)“In a dream” (স্বপ্নে)আবির টেবিল থেকে সানগ্লাস টা নিয়ে চোখে দিয়ে শেষবারের মতো ফাইল গুলো দেখে নিচ্ছে। এদিকে সানগ্লাস চোখে দেখায় মেঘ গুনগুন করে গান গাইতে শুরু করল,“কালো সানগ্লাসটাই কেন এতো সুখ,হে যুবক।”আবির ফোন কাছে নিয়ে বলল,“দৃষ্টিতে যেন সে রাসপুতিন,খু*ন হয়ে যাই আমি প্রতিদিন।এটা বলবেন না?”মেঘ নিজের মাথায় গাট্টা মেরে, মুখ চেপে ধরেছে। আবির জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে মলিন হেসে বলল,” শুনলাম আপনি ইদানীং খুব বেশি গান গাইতেছেন। কই আমাকে তো শুনালেন না!”মেঘ বিড়বিড় করে বলল,” আপনার অফিস কখন? যান না কেনো?”“যাবই তো। আগে কথা শেষ করি। ”“আপনার সাথে আর কোনো কথা নেই। গুরুত্বপূর্ণ মিটিং থাকা সত্ত্বেও সারারাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন। এখন আবার ঢং করতেছেন। এদিকে আব্বু শুধু আমার ভাইয়ের দোষ ই দেখে আপনার দোষ দেখে না। আপনি যে সারারাত ঘুমান নি এটা কি ঠিক করেছেন? এর প্রভাব মিটিং এ পড়বে না?”“জ্বি না ম্যাম। বরং আজকের মিটিং বেস্ট হবে। আপনি শুধু দোয়া করবেন। মিটিং শেষ করেই কল দিব। ঠিক আছে? ”“ফি আমানিল্লাহ। বেস্ট অফ লাক।”“থ্যাংক ইউ।”বিকেলের দিকে আবিরের সাথে কথা হয়েছে। আজকের মিটিং ঠিকঠাক মতো শেষ হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে প্রজেক্ট কমপ্লিট হয়ে যাবে। মোজাম্মেল খান আর আলী আহমদ খান আবিরকে বাসায় ফিরতে বলছেন। কিন্তু আবির বলেছে আরও ২ মাসের মতো সময় লাগবে। কারণ জিজ্ঞেস করায় বিস্তারিত কিছুই বলে নি। এদিকে মেঘও বেশ উদ্বিগ্ন। বন্যার সাথে আগে থেকে প্ল্যান করা ছিল আজ বিকেলে মেলায় যাবে। বন্যা রেডি হয়ে বিকেলের দিকে বেরিয়েছে ঠিকই কিন্তু মেঘ আবিরের উপর অভিমান করে ফোন বন্ধ করে ঘুমিয়ে পরেছে। বন্যা বেশ কয়েকবার কল দিয়েছে, বন্ধ পেয়ে একা একায় হাঁটছে। অন্যসময় হলে মেঘকে বাসা থেকে নিয়ে আসতো কিন্তু ইদানীং মেঘদের বাসায় যাওয়ার কথা মাথায় আসলেই লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে যায়। ঘন্টাখানেক পর তানভিরের কল আসছে। অসময়ে তানভিরের কল দেখে বন্যা খানিকটা অবাক হয়ে আশেপাশে তাকালো। কোথাও পরিচিত কাউকে নজর পড়ছে না। ভয়ে ভয়ে কল রিসিভ করল। তানভির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,” একা একা ঘুরছো কেনো?”” আপনার বোন আমাকে বাসা থেকে বের করে এখন ফোন বন্ধ করে ফেলেছে।”“তুমি আমাকে কল দিতে পারতা না?”“এত ইমার্জেন্সি ছিল না তাই দেয় নি।”“কোথায় আছো? বলো আমি আসতেছি।”“আপনার আসতে হবে না।”“বলো।”বন্যা জায়গার নাম বলতেই তানভির বলল,“আমি কাছেই আছি। ১০ মিনিট অপেক্ষা করো৷ ”৮ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে তানভির বাইক সমেত হাজির হলো। বন্যা তানভিরকে দেখে আস্তে করে বলল,“আপনার আসার কোনো দরকার ছিল না। আমি এখনি চলে যেতাম।”” রেগে আছো? ”বন্যা শ্বাস ছেড়ে শান্ত কন্ঠে বলল,“নাহ।”” বনু ঘুমাচ্ছে৷ তুমি বাসায় গেলে না কেনো? আর নয়তো আমাকে আগে কল দিতে। আমি বনুকে নিয়ে আসতাম।”“আমি বাহিরে আছি এটা আপনাকে কে বলছে?”“বনু কল দিয়েছিল। বলছে ওর বের হওয়ার মুড নেই। তোমাকে যেন মেলায় নিয়ে যায়।”বন্যা কপাল গুটিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,“আমি মেলায় যাব না।”মনে মনে মেঘকে কিছুক্ষণ বকে নিল। তানভির সবসময়ের মতো গম্ভীর কন্ঠে বলল,“বনুর কথা অমান্য করলে বাসায় তুলকালাম কান্ড করে ফেলবে। এমনিতেই বাসায় আমাকে কেউ সহ্য করতে পারে না এ অবস্থায় বনুকে রাগালে আমায় নিশ্চিত বাসা থেকে বের করে দিবে। ”বন্যা কিছু বলল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে পশ্চিমা আকাশের পানে তাকিয়ে আছে। সূর্য আপন গতিতে নিজ গন্তব্যে ছুটছে। আজকের আকাশ অন্যান্য দিনের থেকেও অনেক বেশি সুন্দর। তানভির বন্যার দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল,“যাবে না?”বন্যা রক্তিম আকাশের পানে তাকিয়ে থেকে উত্তর দিল,“আজকের আকাশটা খুব বেশি সুন্দর। কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। ”বন্যার দৃষ্টি লক্ষ্য করে তানভিরও আকাশের পানে তাকালো। গাঢ় নীল রঙের আকাশে মেঘেদের আনাগোনা, পাখিরা আপন গতিতে উড়ে যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে তাদের বাড়ি ফেয়ার বড্ড তাড়া। গোধূলি লগ্নের সূর্যটা বরাবরের মতোই রক্তিম। তানভির কয়েক মুহুর্ত আকাশ দেখে আচমকা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বন্যার কাছাকাছি স্টিলের বেষ্টনীতে মৃদুভাবে হেলান দিয়ে বন্যার অভিমুখে তাকালো। সূর্যের বিক্ষিপ্ত আলোকরশ্মিতে বন্যার মুখ লাল হয়ে আছে। তানভির বন্যার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বেশ সময় নিয়ে অত্যন্ত নমনীয় কন্ঠে বলল,“নীল অম্বরের ভাঁজে ভাঁজে,তোমার নামে সন্ধ্যা সাজে।”বন্যা অকস্মাৎ আড়চোখে তাকাতেই তানভির নড়ে উঠল। কাজল পরিহিতা টানাটানা চোখদুটা যেন দৃষ্টিতেই তানভিরের মতো শক্তপোক্ত ছেলের সত্তাকে বিলীন করে ফেলবে। বন্যা কোন কথা না বলে পরপর দুবার ভ্রু নাচালো। তানভির মুচকি হেসে এপাশ ওপাশ মাথা নেড়ে অন্যদিকে মুখ করে তাকালো। বন্যা তানভিরের দিকে লাজুক হাসলো। ফোন ভাইব্রেট হতেই বন্যা ফোনের দিকে তাকালো। মেঘের মেসেজ আসছে,“আমার ভাইকে দিয়ে দিলাম, দেখে রেখো।”বন্যা ছোট করে মেসেজ পাঠালো,” ওকে ননদিনী।”অকস্মাৎ পেছন থেকে একটা মেয়েলী কন্ঠস্বর কানে বাজলো। মায়াবী কন্ঠের ডাক,“তানভির। ”তানভিরের সঙ্গে সঙ্গে বন্যাও ঘুরে দাঁড়ালো। বোরকা পড়া এক মেয়ে। চোখ, হাত-পা ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বন্যা ভ্রুক্ষেপহীন, নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা একটু এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,“কেমন আছো?”তানভির কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে বন্যাকে এক পলক দেখে ভারী কন্ঠে প্রশ্ন করল,“কে আপনি?”“আমাকে চিনতে পারছো না?”“আপনাকে চেনার কথা ছিল নাকি?”মেয়েটা এবার চোখ নামিয়ে শীতল কন্ঠে বলল,“আমি আয়েশা। চিনতে পেরেছো?”অকস্মাৎ তানভিরের চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। কপালে আরও কয়েকটা ভাঁজ পড়লো, দুচোখ আগ্নেয়গিরির লাভার ন্যায় টগবগ করছে, অক্ষিপটে ব্যথা অনুভব হচ্ছে। বন্যা তখনও স্বাভাবিক দৃষ্টিতে তানভির আর সেই মেয়েকে দেখছে। বন্যা বুঝতেই পারছে না কে এই মেয়ে! সে ভেবেছে পরিচিত, বান্ধবী বা অন্য কেউ হতে পারে। আয়েশা কন্ঠ খাদে নামিয়ে নমনীয় কন্ঠে বলল,” তোমাকে অনেকদিন পর দেখলাম।”তানভির মুখ ফুলিয়ে ঘন ঘন শ্বাস ছাড়ছে। চোখ মুখে তীব্র আক্রোশ৷ আয়েশা আবারও বলল,“তোমার সাথে আমার কিছু কথা ছিল।”বন্যার দিকে তাকিয়ে বলল, “পার্সোনাল।”বন্যার এতক্ষণ কোনোকিছু অনুভব না হলেও এবার কিছুটা রেগে গেছে। মনের ভেতর প্রশ্ন জাগছে,“কে এই মেয়ে?”তানভির অন্যদিকে তাকিয়ে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,“কথা বলার মতো সময় আর ইচ্ছে কোনোটায় আমার নেই।”তানভির পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে হুঙ্কার দিল,“বন্যা, আসো। যেতে হবে।”বন্যা ঐ মেয়েকে দেখে দেখে এগুচ্ছে। তানভির বাইক পর্যন্ত যেতে যেতে ঐ মেয়ে উচ্চস্বরে বলে উঠল,“তানভির, আমি তোমাকে এখনও ভালোবাসি।”তানভির শুনেও যেন কথাটা শুনলো না। রাগে হাত-পা কাঁপছে। মেয়ে বলে পারছে না শুধু গায়ে হাত তুলতে। মেয়ের কথা শুনে বন্যা থমকে দাঁড়ালো। বুকের ভেতরটা অকস্মাৎ মোচড় দিয়ে উঠেছে। বুঝতে বাকি রইলো না যে এই মেয়েই তানভিরের এক্স গার্লফ্রেন্ড। তানভির বাইক স্টার্ট দিয়ে অগ্নি কন্ঠে চিৎকার করল,“বন্যা, আসতে বলছি তোমায়।”বন্যা থতমত খেয়ে ছুটে গেল। চুপচাপ বসে পড়ল বাইকের পেছনের সিটে। তবে বরাবরের মতো এবারও তানভিরের সঙ্গে দূরত্ব রেখে বসেছে। কিছুক্ষণ আগেও আকাশের পানে তাকিয়ে ভাবছিল, আজ থেকে বাইকে বসলে তানভিরকে ধরে বসবে কিন্তু তা আর হলো কই! দুজনের বুকের ভেতর যে ঘূর্ণিঝড় বয়ে যাচ্ছে সে খবর কেউ জানে না। মেলার কাছাকাছি এসে বাইক থামালো। বন্যার মেলায় যাওয়ার মতো বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই আর না আছে তানভিরের। তবুও মেঘের কথা মেনে ঢুকলো মেলায়। বন্যা চুপচাপ ঘুরে দেখছে। মেঘের সঙ্গে অনেককিছু কেনার প্ল্যান করেছিল ঠিকই তবে এখন আর ইচ্ছে নেই। কিছুক্ষণ ঘুরে বন্যা চাপা স্বরে বলল,” আমার বাসায় যেতে হবে।”তানভির ঘড়িতে সময় দেখে নিল। বন্যা দ্রুত হেঁটে গেইটের দিকে যাচ্ছে। বন্যা দু-তিনটা দোকান পেরিয়ে হঠাৎ খেয়াল করল আশেপাশে তানভির নেই। থমকে দাঁড়িয়ে পেছন তাকিয়ে দেখল তানভির দোকানে কি কিনতেছে। বন্যাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দ্রুত এগিয়ে এসে বলল,“তোমাকে ডাকছিলাম, তুমি শুনো নি। সরি।”বন্যা আবারও হাঁটা শুরু করল। তানভির ঠান্ডা কন্ঠে বলল,“এগুলো তোমার। ”“আমার কিছু লাগবে না, ধন্যবাদ।”বন্যা বেড়িয়ে পরেছে। অন্যান্য দিনের মতো তানভির আজ জোর গলায় কিছু বলতেও পারছে না। দ্রুত এগিয়ে গেল বন্যার কাছে। বন্যার চোখ মুখ স্বাভাবিক, যেন কিছুই হয় নি। শান্ত কন্ঠে বলল,” আমি এখান থেকে রিক্সা নিয়ে যেতে পারব।”“কিন্তু আমি তোমাকে একা ছাড়তে পারবো না।”বন্যা মলিন হেসে মনে মনে আওড়ালো,” আপনার অতীত বর্তমান হলে আপনার জীবনে এই বন্যার অস্তিত্ব থাকবে না।”তানভির বাইক স্টার্ট দিয়ে উঠতে বলল, বন্যাও বাধ্য হয়ে উঠে বসল। কারো মুখে কোনো কথা নেই। মোখলেস মিয়ার দোকানের সামনে আসতেই মোসলেম মিয়া বন্যাকে ডাকতে শুরু করলেন। বন্যা নামাতে বলায় তানভিরের অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাইক থাকালো। তানভিরের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে। তানভির শক্ত কন্ঠে বলল,“যদি গিফট না নাও তাহলে আমি এখানেই বসে থাকব।”বন্যা কিছু না বলে দোকানের দিকে এগিয়ে গেল। মোখলেস মিয়ার পাশের দোকানে বন্যার আব্বু কাপড় ইস্ত্রি করতে দিয়েছিল। ইমার্জেন্সি কাজে ওনাকে এক জায়গায় যেতে হয়েছে তাই ইস্ত্রি করে জামাকাপড় মোখলেস মিয়ার দোকানে রেখে গেছে। মোখলেস মিয়া কাপড় আর কিছু খাবার দিয়েছেন। বন্যা না করা সত্ত্বেও ওনি জোর করেই দিয়েছেন। বন্যারা সচরাচর বাসা থেকে বের হয় না, বন্যাদের কিছু খেতে ইচ্ছে হলে বন্যার ছোট ভাই রিদ ই নিয়ে যায়। মাস শেষে বন্যার আব্বু টাকা দিয়ে দেন। তানভির বাইক থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে রাগী চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ মোখলেস মিয়ার নজর পড়ে তানভিরের দিকে। তানভিরের তাকানো দেখে মোখলেস মিয়া বন্যাকে জিজ্ঞেস করলেন,” পোলায় এমনে তাকায় আছে কেন? ভাড়া দাও নি?”বন্যা কিছু বলার আগেই মোখলেস মিয়া দোকান থেকে বের হতে হতে উচ্চস্বরে শুধালো,“এই ছেলে তোমার ভাড়া কত? আমি ভাড়া দিয়ে দিচ্ছি তবুও আমার বউ এর দিকে এভাবে তাকায় থাইকো না।”তানভিরের মেজাজ চরম মাত্রায় খারাপ হয়ে গেছে। রাগে দাঁত কটমট করছে। দু’চোখ লাল হয়ে গেছে। বন্যা দ্রুত বেড়িয়ে যেতে যেতে বলল,“দাদা, আমি কথা বলছি।”বন্যা তানভিরের কাছে গিয়ে বিড়বিড় করে বলল,“এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বাসায় যান, প্লিজ।”“তুমি গিফট না নিলে আমি এক পাও নড়বো না।”বন্যা আস্তে করে কপাল চাপড়ালো। মেঘের ভাই বলে কথা, সে তো মেঘের মতোই জেদি হবে। এটা বন্যা ভুলে গেছিল ভেবেই রাগ লাগছে।মোখলেস মিয়া দোকান থেকে ডাকলেন,” সমস্যা কোনো?”“নাহ দাদা।”বন্যা তানভিরের হাত থেকে গিফটের ব্যাগটা নিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,“এবার এখান থেকে যান, প্লিজ। আব্বু দেখলে সমস্যা হবে।”তানভির কথা না বাড়িয়ে মোখলেস মিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে গলি থেকে বেড়িয়ে চলে গেছে। এদিকে মেঘ আবিরের উপর রাগ করে ফোন আর অন ই করে নি। আম্মুর ফোন থেকে তানভিরকে কল দিয়েছিল। সন্ধ্যার পর নিচে এসে নুডলসের পাকোড়া বানাতে শুরু করল। মীম আর আদি আগে থেকেই রেডি হয়ে বসে আছে। আবির বাসার সবার সঙ্গে কথা বলতে বলতে মেঘের কথাও জিজ্ঞেস করল। আকলিমা খান রান্নাঘরে এসে মেঘের দিকে ফোন ধরে একগাল হেসে বললেন,“সে এখন রেসিপি শিখতে ব্যস্ত। ৮-১০ পদের পাকোড়া বানানো শিখে ফেলছে। ”আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,“পাকোড়াতে লবণ দেয় তো?”মেঘ ফোঁস করে উঠল। আকলিমা খান কপট রাগী স্বরে বললেন,” মেয়েটাকে কেনো রাগাচ্ছো বলো তো।”আবির শান্ত কন্ঠে বলল,“কেউ যদি বিজ্ঞ হয়েও অজ্ঞের মতো আচরণ করে তো আমি কি করবো? রাখি।”কাকিয়া লবণের বিষয়ে আঁটকে থাকলেও আবিরের কথার মিনিং মেঘ ঠিকই বুঝেছে। তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করছে যেন রুমে গিয়ে আবিরকে কল দিতে পারে। এরমধ্যে তানভির বাসায় আসছে। চোখ-মুখ কালো হয়ে আছে। মেঘকে রান্নাঘরে দেখে শান্ত কন্ঠে বলল,“বনু, এককাপ কফি করে দিবি?”“আনছি ”মেঘ কফি আর পাকোড়া নিয়ে খুশিতে গদগদ হয়ে হাজির হলো। তানভির চোখ মুখ দেখে উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,“কি হয়েছে ভাইয়া? কোনো সমস্যা? ”“না।”মেঘের ভয়ে বুক কাঁপছে। বন্যার সাথে যদি ঝগড়া করে তাহলে কি হবে? মেঘ শক্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,“ভাইয়া বলো কি হয়েছে? বন্যা কোথায়?”“ওকে বাসার কাছে দিয়ে আসছি। ”“তাহলে আর কি হয়ছে? তুমি এত রেগে আছো কেনো?”তানভির কফির কাপে চুমুক দিয়ে কাপ সামনে রেখে আস্তে করে বলল,“আজ আয়েশার সঙ্গে দেখা হয়েছিল।”আয়েশা নাম শুনেই চমকে উঠল মেঘ। প্রশস্ত আঁখি যুগল আরও বেশি প্রশস্ত করে গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করল,” থা*প্পড় দিয়েছো? ”“না।”মেঘ অকস্মাৎ সোফায় ঘুষি শুরু করল। পরপর বেশ কয়েকটা ঘুষি দিতে দিতে চেঁচিয়ে উঠল,“তোমাকে আমি বলেছি সামনে পেলে চোখ বন্ধ করে থা*প্পড় দিবে। তুমি থা*প্পড় দিলে না কেনো?”তানভির তড়িৎ বেগে উঠে মেঘের দু-হাত শক্ত করে ধরে বলল,” একটু ঠান্ডা হয়ে কথা তো শুনবি।”“তুমি থা*প্পড় দাও নি কেনো?”“পাবলিক প্লেসে মেয়েদের গায়ে হাত তোলাটা শোভা পায় না। ”“ইসস আমি কেন গেলাম না আজ। ঐ মেয়েকে কয়েকটা থাপ্প*ড় দিয়েই আসতাম। বন্যা কোথায় ছিল? বন্যাও দেখেছে?”“বন্যা সাথেই ছিল। কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করে নি।”মেঘ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিড়বিড় করে বলল,” শেষ! আমার সব শেষ। ”তানভির সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,“বিড়বিড় করছিস কি?”“কিছু না। হাত ছাড়ো রুমে যাব।”“ঘুষাঘুষি করবি না তো?”“ঘুষাঘুষি করে নিজের হাত ভেঙে কি করব। যার নাকমুখ ভাঙা দরকার তার টায় যদি না ভাঙতে পারি। বুঝছি, তুমি কিছু পারবা না। আবির ভাই কে বলতে হবে।”তানভির হাত ছেড়ে ভীত কন্ঠে বলল,“প্লিজ, ভাইয়াকে এখন কিছু বলিস না। এই ঘটনা ভাইয়া শুনতে পারলে আমার কপালে বহুত দূর্গতি আছে। ”“ঠিক আছে বলবো না। ”মেঘ রুমে এসে ফোন অন করতেই বন্যার কল আসলো। বন্যা একে একে সব ঘটনা খুলে বললো। মেঘ যতটা সম্ভব বুঝানোর চেষ্টা করেছে। পর পর আবিরকে কল দিল। আবির কল রিসিভ করে শক্ত কন্ঠে ধমক দিল,“এই মেয়ে, এত নির্বোধ কেন তুই?”“আমি কি করেছি। ”“কথা না শুনে, না বুঝেই ফোন বন্ধ করে বসে আছিস।”“কি শুনবো আর কি বুঝবো? আপনি যেই কাজে গিয়েছিলেন সেই কাজ শেষ তবুও আপনি বাসায় ফিরবেন না। এটাতে কি বুঝবো আমি?”“আমি শুধুমাত্র প্রজেক্টের কাজে এতদিনের জন্য এতদূর আসি নি। বাংলাদেশে টানা তিন প্রজেক্ট করলেই এটার সমান বেনিফিট পেতাম। সব ছেড়ে এখানে এসে পড়ে থাকতাম না। আমি আমার প্রয়োজনে আসছি আর প্রজেক্টটা শুধুমাত্র আমার বাহানা ছিল। যে প্রজেক্ট ১৫ দিনে শেষ করতে পারতাম সেটা কমপ্লিট করতে ৩ মাসের উপরে সময় নিচ্ছি যেন আব্বু, চাচ্চু কিছু বুঝতে না পারে। ”“আপনি কেনো গিয়েছেন? কি প্রয়োজন আপনার?”“আমার টাকার প্রয়োজন।”মেঘ কপাল কুঁচকে বলল,“আপনার কত টাকা প্রয়োজন? আপনি আমাকে একটা ক্রেডিট কার্ড দিয়েছিলেন মনে নেই? ঐটাকে অনেক টাকা আছে। আপনি এখান থেকে টাকা নিতে পারতেন৷ আমার এত টাকা লাগেই না। ”আবির মুচকি হেসে বলল,“ঐটা শুধুমাত্র তোর আর ওখানে প্রতিমাসে একটা নির্দিষ্ট এমাউন্ট পাঠানো হচ্ছে শুধু তোর জন্য। তোর যা ইচ্ছে হয় তা কিনিস, আরও বেশি প্রয়োজন হলে একবার জানাস শুধু।”“আমার টাকার বিশেষ কোনো প্রয়োজন নেই। আপনি এগুলো নিয়ে যান৷ তবুও চলে আসেন প্লিজ।”আবির শ্বাস ছেড়ে শীতল কন্ঠে বলল,“কেনো বুঝতে পারছিস না, আমার লাখ টাকার প্রয়োজন না। আরও বেশি প্রয়োজন।”“তাহলে কত প্রয়োজন?”“কোটি।”“What? কোটি টাকা দিয়ে আপনি কি করবেন?”“দরকার আছে।”“এত টাকা কে দিবে আপনাকে?”“আমার টাকা আমি নিতে আসছি। কে দিবে আবার কি? এখানের স্থানীয় এক ফ্রেন্ডের বাবা বড় বিজনেসম্যান। ওনার কথা মতো আমরা দুজন স্টুডেন্ট থাকাকালীন ছোট ছোট বেশ কয়েকটা কোম্পানিতে শেয়ার কিনেছিলাম। যদিও সবকিছু ওনিই ম্যানেজ করে দিয়েছিল। আমি দেশে যাওয়ার আগে সবগুলো শেয়ারের এমাউন্ট একসাথে করে আংকেলের কোম্পানিতে কিছুটা শেয়ার কিনে গিয়েছিলাম৷ কারণ আমার কাছে ওনারায় একমাত্র বিশস্ত মানুষ ছিলেন। এখন আমার টাকার প্রয়োজন, আংকেলকে জানানোর পর আংকেল এখানে আসতে বলেন। কোম্পানির বেশকিছু কাজ প্যান্ডিং আছে সেগুলো কমপ্লিট করতে পারলে আমি যত আশা করেছি তার থেকেও অনেক বেশি দামে শেয়ারটা বিক্রি করতে পারবো। তানভির আর রাকিব ব্যতীত এই কথা আর কেউ জানে না। আজ তোকে বলছি। আব্বু- চাচ্চু এসব জানতে পারলে কিভাবে রিয়েক্ট করবেন আমি জানি না। তাই প্রজেক্টের নাম করে এখানে আসছি।”মেঘ সবকথা শুনে রাশভারি কন্ঠে বলল,“শেয়ারটা বিক্রি না করলে হয় না? আপনার এত কি প্রয়োজন?”” প্রতিনিয়ত মানুষকে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে বাঁচতে পারবো না। আমি সব মায়াজাল কাটিয়ে একটা স্বচ্ছ জীবন কাটাতে চাই। জীবন চালাতে ঠিক যতটা প্রয়োজন ততটা ইনকাম করতে পারলেই হবে। আমি শুধু মানসিক শান্তি চাই।”মেঘ চুপ করে বসে আছে। কিছু বলার মতো শব্দ খোঁজে পাচ্ছে না। আবির মোলায়েম কন্ঠে শুধালো,” রাগ করেছিস?”“না। রাগ করবো কেন! আপনি যা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তা অবশ্যই ভেবেচিন্তেই নিয়েছেন।”“বাসার কাউকে এ ব্যাপারে কিছু বলিস না ।”“আচ্ছা ঠিক আছে। রাখি এখন।”“আচ্ছা।”আজ সকাল থেকে আলী আহমদ খান ও মোজাম্মেল খানের মধ্যে মনোমালিন্য চলছে। সারাদিন খাওয়া নেই। যে যার রুমে শুয়ে আছেন। বাসার সবাই চেষ্টা করেও রাগ ভাঙাতে পারে নি। দুপুরের পর পর ফুপ্পি, জান্নাত আপু, আইরিন আর আসিফ ভাইয়া আসছে। আজ ইচ্ছে করেই আরিফ আসে নি। প্রতিনিয়ত মীমের সাথে ঝগড়া করতে ভালো লাগে না তার। মেঘের ফুপ্পি প্রথমেই মোজাম্মেল খানের রুমে গেলেন। মোজাম্মেল খান বোনকে দেখে শুয়া থেকে উঠে বসে ভারী কন্ঠে বললেন,“কেমন আছিস?”“কেমন থাকবো? এই বয়সে এসে তোমরা ভাইয়ে ভাইয়ে কোন দ্বন্দ্বে মেতেছো?”“আমি কি বলব, ভাইজানের যা মন চাই তাই করছেন। কিছু বললেও ওনি রেগে যান। বুঝার চেষ্টা পর্যন্ত করেন না। জানিস ই তো ওনার স্বভাব। যা বলবে তাই করবে।”“সমস্যা কি নিয়ে?”“সমস্যা তো অনেক কিছু নিয়েই। আমার ছেলেকে শাসন করলেও দোষ, না করলেও দোষ। মেয়েকে কিছু বললেও দোষ, না বললেও দোষ। আগে আবির অফিস সামলে নিতো তাই অফিসের বিষয়ে এত কথা আমায় শুনতে হতো না। এখন আবির নেই, কাজের একটু এদিকসেদিক হলেই রাগ। আমরা নাকি গুরুত্ব দেয় না, ওনি একা পরিশ্রম করে সবকিছু করেছেন। ওনি যা বলবেন তাই হবে। আরও অনেককিছু। ”“ভাইজান কি কোনোভাবে সংসার ভাঙার কথা বুঝাতে চাচ্ছেন?”“এই কথা ভুলেও ভাইজানের সামনে বলিস না। আমি সেদিন রাগে বলে ফেলছিলাম, তুমি বললে সংসার ভাগ করে ফেলি। বলেছি না মরেছি, আমার সাথে কথা তো বলেনই না এমনকি এটাও বলেছেন, আমার ছেলে, আমার মেয়ে দুজন ই ওনার। ছেলেমেয়ের ব্যাপারে কিছু বলার অধিকার পর্যন্ত আমার নেই। ইকবাল ই ভালো। তার এসব বিষয়ে কোনো চিন্তাভাবনায় নেই। ”“তানভির, আবির কি বলে?”“আবিরের সঙ্গেও ঝামেলা। ”মাহমুদা খান চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,“আবিরের সঙ্গে আবার কিসের ঝামেলা? ”” প্রজেক্ট শেষ তবুও আবির দেশে আসছে না। তাছাড়া সেদিন আবির আমার পক্ষে দুটা কথা বলেছিল সেই রাগে আবিরের সঙ্গেও কথা বলেন না।”“এখন করণীয় কি?”“দেখ তুই মানাতে পারিস কি না?”মাহমুদা খান মোজাম্মেল খানের রুম থেকে বেরিয়ে আলী আহমদ খানের রুমে গেলেন। রুমে ঢুকতেই আলী আহমদ খান গম্ভীর কন্ঠে বললেন,” তুই ও কি তার পক্ষে কথা বলতে আসছিস?”“নাহ ভাইজান। আমি আপনার মুখে শুনতে চাই। ঘটনা কি?”“ঘটনা কিছুই না। মোজাম্মেলের অত্যাচার আর সহ্য হচ্ছে না৷ ”“কেনো? ভাই কি করেছেন?”“তানভিরের সাথে ওর কি শত্রুতা আমি জানি না। কথায় কথায় ছেলেকে বকাবকি করে। আমি কিছু বলতে গেলে আমার ছেলের সাথে তুলনা দেয়। আমার ছেলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে ওর ছেলে বেকার। কিছুই ঠিকমতো করতে পারছে না। কোথায় আমি আমার ছেলে নিয়ে গর্ব করব উল্টো সে গর্ব করে। সে সারাক্ষণ আমার পিছনে লাগে। এই যে ছেলেমেয়ে গুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব লাগাচ্ছে ওরা কি সারাজীবন একসাথে থাকতে পারবে? আমি এজন্য সেদিন রাগে বলেছিলাম,ওর মতো চিন্তাভাবনা আমার থাকলে আমি একা এই সংসার টাকে এতদূর টানতে পারতাম না। এই সংসার আমার, এখানে আমার অধিকার সবচেয়ে বেশি, আমি যা বলবো তাই হবে। আমি বুঝাতে চেয়েছি, ওর উল্টাপাল্টা আচরণ গুলো যেন পরিবর্তন করে। অথচ সে বুঝেছে আমি সংসার ভাঙতে চাচ্ছি। এজন্য আমিও বলেছি ও যদি চায় বাড়ি থেকে চলে যেতে পারে। কিন্তু তানভির, মেঘ আর ওদের মা আমার বাড়িতেই থাকবে। ওদের উপর বাবার অধিকার খাটাতে যেন না আসে।”
গল্পঃ আমৃত্যু ভালোবাসি তোকেলেখিকাঃ সালমা চৌধুরী..................................................................................................................................................................আলী আহমদ খানের কথা শুনে মাহমুদা খান আনমনেই হেসে উঠলেন। বোনের হাসি দেখে আলী আহমদ খান রাগী স্বরে বললেন,“এভাবে হাসছিস কেনো? আমি কি হাসির কথা বলেছি?”মাহমুদা খান হাসি থামিয়ে মৃদুস্বরে বললেন,“তোমরা এখনও ছোটবেলার মতো অভিমান করো, এটা দেখেই হাসি পাচ্ছে। তোমার জায়গা থেকে তুমি নিজেকে ঠিক মনে করছো, ওদিকে ভাইয়ের জায়গা থেকে ভাই নিজেকে ঠিক মনে করছে। এসব দেখে ছোটবেলার একটা ঘটনা খুব মনে পড়ছে।”“কোন ঘটনা?”“একবার তোমার ক্রিকেট ব্যাট ভেঙ্গে ফেলায় তুমি আর ভাই বাড়িতে তুমুল ঝগড়া শুরু করেছিলে। তুমি বলছিলা মোজাম্মেল ভাই ভাঙছে আর ভাই বলছিল সে ভাঙে নি। সেই নিয়ে একপর্যায়ে তোমাদের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়ে গিয়েছিল, আমি আর আম্মা কোনোভাবেই তোমাদের থামাতে পারছিলাম না৷ আব্বা বাড়িতে এসে তোমাদের এই মারামারি দেখে রাগে কু*ড়াল নিয়ে মা* রতে আসছিল। দুই ভাই সেই যে পালিয়েছিলে, রাত ১০ টার উপরে বেজে গেছিলো বাড়িয়েই আসছিলে না৷ আমি আর আব্বা তোমাদের খোঁজতে খোঁজতে হয়রান হয়ে যাচ্ছিলাম। তারপর নদীর ধারে একটা গাছের নিচে পেয়েছিলাম তাও দুজন একসাথে। তুমি গাছে হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছিলে আর ভাই তোমার কোলে ঘুমাচ্ছিলো। মনে আছে ভাইজান? ”আলী আহমদ খান একগাল হেসে বললেন,” হ্যাঁ, মনে আছে। সেদিন বাড়ি থেকে পালিয়ে রাস্তার মাঝখানে গিয়ে দুই ভাই আবার ঝগড়া লাগছিলাম। বেশ কয়েকজন মিলে আমাদের থামিয়ে কি হয়েছে জিজ্ঞেস করেছিল, তখন আমরা সব ঘটনা খুলে বলছি। তারপর এক ছোটভাই বলছিল, ইকবাল আমার ব্যাট নিয়ে খেলত গেছিল আর ঐখানে গাছের সাথে বারি খেয়ে ব্যাট ভেঙে গেছে। আমরা দুই ভাই তখন অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিলাম। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত আমি ওর গায়ে হাত দেয় নি। আমি মোজাম্মেল কে অনেক ভালোবাসি, সে আমার ভাইয়ের থেকে বন্ধু বেশি। যখন গ্রাম ছেড়ে, সবকিছু ছেড়ে শহরে আসছিলাম তখন মোজাম্মেল ছাড়া আমার আর কেউ ছিল না। সে বন্ধুর মতো সবসময় আমার পাশে থেকে সাহস দিয়েছে। ওর সাথে আমার সম্পর্ক আজীবন এমনই থাকবে, ইনশাআল্লাহ। কিন্তু ওর কিছু কিছু কাজ আমার সত্যিই খারাপ লাগে। আমি মানছি তানভির একটু বেখেয়ালি, ওর নিজের লক্ষ্য স্থির করে তারপর কিছু করা উচিত। তাই বলে এটা না সারাক্ষণ উঠতে বসতে ছেলেকে বকবে। তারথেকেও বড় কথা তানভির কে বুঝানোর জন্য তানভিরের সামনে প্রতিনিয়ত আবিরের প্রশংসা করাটা আমার পছন্দ নয়। তানভিরের বয়স কম, রগচটা, জেদি সে একমাত্র আবিরের কথা একটু আধটু মানে। ওর মনে যদি একবার উল্টাপাল্টা কিছু ঢুকে যায় তখন কি আবিরের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটা থাকবে?”মাহমুদা খান চাপা স্বরে বললেন,“তানভির আর আবিরের সম্পর্ক তোমাদের থেকেও অনেক বেশি স্ট্রং। ওরা এসব সামান্য বিষয়ে মাথায় ঘামায় না। তারপরও আমি ভাইকে বলে দিব যেন তানভিরের সাথে বাজে ব্যবহার না করে। শুনলাম আবিরের সাথেও কথা বলছো না, কেনো? ও আবার কি করছে?”“অনেক কিছু করছে কয়টা শুনবি? আমার বাধ্য ছেলে অবাধ্য হয়ে গেছে এটায় মূল কথা। তার কাজ শেষ দেশে আসতে বলছি, এখন আসতে পারবে না। রমজানের আগে থেকে বিয়ের কথা বলতেছি কিন্তু সে বিয়েও করবে না। কি ভাবে, কি করে একমাত্র সে আর আল্লাহ ই ভালো জানেন। আমার ছেলে আগে এমন ছিল না৷ এতগুলো বছর যাবৎ আমি যা বলেছি তাই করেছে, এমনকি আবিরের কিছু লাগলে, কিছু চাওয়ার থাকলে দ্বিধাহীন ভাবে আমার কাছে চেয়েছে, ও যা বলেছে আমি তাতেই রাজি হয়েছি, সব অনুমতি দিয়ে দিয়েছি। তাহলে এখন এত দূরত্ব কেন হচ্ছে? গত তিনবছরে কি এমন হলো যে আমার ছেলের মধ্যে এত পরিবর্তন চলে এসেছে?”মাহমুদা খান শ্বাস ছেড়ে উষ্ণ স্বরে বললেন,“ছেলে বড় হচ্ছে, প্রতিনিয়ত মাথায় কত কত প্রেশার ঢুকছে। হয়তো আবেগের বশবর্তী হয়ে করা ভ্রান্তিগুলোর জন্য ভেতরে ভেতরে পুড়ছে, নিজেই নিজের বিবেকের সম্মুখীন হতে পারছে না।ভাইজান, এমনও হতে পারে আবির তোমাকে কিছু বলতে চায়। তুমি রাগারাগি না করে ওকে একটু সময় দিও, আবিরকে বুঝার চেষ্টা করো। ও কি বলতে চায় শুনো।”আলী আহমদ খান গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন,” আমার এখন আর কিছু শুনার নেই। অনেকবার তার মতামত জানতে চেয়েছি, ও কি চাই না চাই সব জানতে চেয়েছি, কোনো সমস্যা কি না তাও জানতে চেয়েছি, আমাকে কিছু বলতে চায় কি না সেটাও জিজ্ঞেস করেছি এমনকি তার মাকে দিয়েও জিজ্ঞেস করিয়েছি। কিন্তু আবির প্রতিবার আমার কথা এড়িয়ে গেছে, ওর মাকে পর্যন্ত কিছু বলে নি। এখন ওর মনের কথা জানার আর কোনো আগ্রহ আমার নেই। আলী আহমদ খান কাউকে কোনো ব্যাপারে এত সুযোগ দেন না, সে আমার ছেলে বলে আমি তাকে অনেক ছাড় দিয়েছি কিন্তু আর সম্ভব না।”এমন সময় মোজাম্মেল খান দরজায় দাঁড়িয়ে মোলায়েম কন্ঠে বললেন,“ভাইজান আসবো?”আলী আহমদ খান সেদিকে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বললেন,“চলে যাচ্ছিস নাকি?”” আমি কোথাও যাচ্ছি না৷ খিদা লাগছে খাবো তাই তোমাকে নিতে আসছি৷ আর হ্যা আমি সত্যি দুঃখিত ভাইজান। তোমাকে ঐভাবে কথাটা বলি নি। আমার মনে আসছিল তাই মুখ ফস্কে বেড়িয়ে গেছিল।”“খিদা লাগছে খেতে যা আমাকে বলার কি আছে?”“বলছি কারণ আজ দুপুরের রান্না স্পেশাল মানুষজন করেছেন। আসিফের বউ, আইরিন আর আমার মেয়ে তো আছেই। তোমাকে রেখে একা খেলে আবার দশটা কথা শুনাবা। তার থেকে বরং তুমিও চলো।”আলী আহমদ খান হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন,” আমি যেতে পারি তবে একটায় শর্তে, আজকে থেকে তানভির, মেঘ দু’জনের ব্যাপারে তুই আর কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবি না। আমি যা বলবো, যেভাবে বলবো কোনো দ্বিমত ছাড়ায় মেনে নিতে হবে। বল রাজি?”মোজাম্মেল খান একগাল হেসে বললেন,” আমি রাজি৷ তোমার প্রতি আমার অগাধ আস্হা আছে। আমি ভুল করলেও আমার ভাই কখনো ভুল করতে পারে না।আর হ্যাঁ আমি কিন্তু আমার চ্যালেঞ্জে জিতেই গেছি তাই বাসা ছাড়ার প্রশ্ন ই আসে না। ”আলী আহমদ খান গম্ভীর কন্ঠে বললেন,“তুই জিতেছিস ঠিকই তবে আমি হেরে যায় নি। কথাটা মাথায় রাখিস। এই বাড়িতে আমার কথায় শেষ কথা, এটা ভুলে যাস না।”“ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি আসো।”“যা আসছি।”মাহমুদা খান দীর্ঘ মনোযোগ দিয়ে দুই ভাইয়ের কথোপকথন শুনছিলো। মোজাম্মেল খান বেড়িয়ে যেতেই প্রশ্ন করলেন,” ভাই হার জিতের কথা বলছিল কেন?”” ওর তো সারাদিন কাজ ই এটা। আমার কোন কথা ঠিক হয়েছে কোনটা ঠিক হয় নি এসব নিয়েই তার গবেষণা। কয়দিন যাবৎ এক প্রজেক্ট নিয়ে লাগছে, আমি বলেছিলাম শেষ করতে পারবে না। এখন শেষ করে ফেলছে তাই জিতছে বলে খুশি হচ্ছে। অথচ সেই প্রজেক্টেও আমার ছেলেই হেল্প করেছে। এটা এখন বললে আবার রাগ করে বসে থাকবে। তার থেকে খুশি হচ্ছে হোক। তোরা আসছিস অনেকক্ষণ হয়েছে, চল খেতে যায়।”মাহমুদা খান বসা থেকে উঠতে উঠতে বললেন,“ভাইজান, আবিরের সাথে একটু কথা বলিয়েন।”“আচ্ছা।”ইদানীং বন্যার মন ভীষণ খারাপ। তানভিরের ফোন রিসিভ করে না বেশকিছুদিন হলো। তানভির প্রায় ই বন্যাদের বাসার এদিকে আসে। দু-একদিন মোখলেস মিয়ার সাথে দেখা হয়েছে ঠিকই কিন্তু বন্যার সাথে একদিনও দেখা হয় নি। তানভিরের ঘনঘন যাতায়াত মোখলেস মিয়া ভালোই পর্যবেক্ষণ করছেন।আজ বিকেলে মোখলেস মিয়া জোরপূর্বক তানভিরকে বাইক থামাতে বলেন। তানভিরও একপ্রকার বাধ্য হয়ে বাইক থামায়। তানভিরকে নিয়ে কাছেই এক চায়ের দোকানে বসে জিজ্ঞেস করলেন,“ঐ পোলা, তুমি কি আমার বউকে পছন্দ করো?”আচমকা মোখলেস মিয়ার এমন প্রশ্নে তানভির কিছুটা ইতস্তত বোধ করে। দৃষ্টি মাটিতে নামিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মোখলেস মিয়া আবারও বললেন,” দেখো ভাই, বয়স আমার কম হয়ছে না। চোখ দেইখা মানুষের মনের কথা বুঝবার পারি। সেদিন বন্যার সাথে তোমারে দেইখাই সন্দেহ হয়ছিল। আর ইদানীং তোমার এই গলিতে আসা যাওয়ায় নিশ্চিত হইয়া গেলাম। ”তানভির এখনও চুপ করে বসে আছে। বলার মতো কিছুই নেই তার। মোখলেস মিয়া তানভিরের কাঁধে হাত রেখে শান্ত কন্ঠে বললেন,” পছন্দ করো ভালো কথা কিন্তু শুধু বাইক চালাইয়া কি ঢাকা শহরে বউ পালতে পারবা? আর বন্যার আব্বা কিন্তু মোটরসাইকেলের ড্রাইভারের কাছে মেয়ে বিয়া দিতো না। সময় থাকতে ভাবো আর নাইলে আমার বউরে ভুইলা যাও। ”ভুইলা যাও শব্দটা যেন তানভিরের মস্তিষ্কে গুরুতরভাবে আঘাত করেছে। তানভির কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে বসা থেকে উঠে শক্ত হাতে চায়ের কাপ রাখতে রাখতে হুঙ্কার দিল,” ভুইলা যাইতে পারবো না। প্রয়োজনে আপনার এই বন্যা বউকে ভাগাইয়া নিয়ে যাবো৷ যেতে না চাইলে কি*ডন্যা*প করে নিয়ে যাব, তবুও ভুলতে পারব না৷ আর আপনি যদি উল্টাপাল্টা কথা বলেন তাহলে আপনাকেও কি*ডন্যাপ করে পঞ্চগড় পাঠায় দিব। ওখানে তিন নাম্বার বিয়ে করে সংসার কইরেন।”তানভির রাগে কটমট করতে করতে বাইকে উঠে গেছে। মোখলেস মিয়া হাসতে হাসতে বললেন,“সাব্বাস! ব্যাটার তেজ আছে ভালো।”আজ ভার্সিটির ক্লাস একটু তাড়াতাড়ি শেষ হয়েছে৷ তাই সবাই একসঙ্গে ঘুরতে বেড়িয়েছে। ড্রাইভারকে আগেই জানিয়ে দিয়েছে। পার্কে বসে সবাই আড্ডা দিচ্ছে। মিনহাজ হঠাৎ বলে উঠল,” সবাই শুন, মেঘ আর বন্যাকে ডাকতে গেলে আমাদের বেশ কিছু সমস্যায় পড়তে হয়। প্রথমত স্যার ম্যামদের সামনে ভাবি বলে ফেললে ১০ টা প্রশ্ন করে, শুধু শুধু বকাও খেতে হয়। তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে এখন থেকে ভাবি ডাকবো না। যেহেতু খান বাড়ির বড় ছেলে আবির ভাইয়া তাই স্বাভাবিক ভাবে মেঘ হবে সেই বাড়ির বড় বউ। আর বন্যা হবে মেজো বউ৷ তাই আমরা এখন থেকে সেই অনুসারে ডাকবো। মেঘকে ডাকবো V1 মানে ভাবি-১ আর বন্যাকে ডাকব ভাবি-২ মানে V2, ঠিক আছে?”সাদিয়া, মিষ্টি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো,” একদম ঠিক আছে”মেঘের মুখে হাসি থাকলেও বন্যা মুখ ফুলিয়ে রাগী স্বরে বলল,“আমাকে ভাবি/ V2 / V3 কিছুই ডাকতে হবে না।”মেঘ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,“কি হয়েছে বেবি? এখনও রেগে আছো?”“না কিন্তু ভাবি ডাক শুনার ইচ্ছে নেই।”মেঘ ন্যাকামির স্বরে বলল,“না…. এ হতে পারে না। আমার হৃদপিণ্ড চিঁড়ে ছোট ছোট অনুভূতি একত্রিত করে তোমাকে ভাবি বানানোর জন্য প্রপোজ করলাম। আর তুমি এখন এসে নাটক করছো, ভাবি ডাক শুনার ইচ্ছে নেই? তাঁর ছিঁড়া মার্কা কথা বললে সত্যি সত্যি বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিয়ে যাব। আর ভাইয়াকে গিয়ে বলল, তোর এই জীবন ভালো লাগে না, তুই নিজের জীবনের প্রতি অতিষ্ঠ হয়ে বুড়িগঙ্গা ঝাপ দিয়েছিস৷ তখন কেমন হবে?”বন্যা মলিন হেসে বলল,” ভালোই হবে। তোর থেকে বেশি তোর ভাই খুশি হবে।”” খুশি হবে না ছাই! চোখ বন্ধ করে নিজেও বুড়িগঙ্গায় ঝাপ দিবে দেখিস। ”“বাজে কথা বলিস না মেঘ। ওনার অতীত ফিরে আসছে, ওনার জীবনে বন্যা এখন কেউ না। ”মেঘ রাগান্বিত কন্ঠে বলল,” শুন ভাইয়ার অতীত যদি ভাইয়ার জীবনে আবারও ফিরতে চায় আর আমার ভাই যদি নির্লজ্জের মতো ঐ মেয়েকে এক্সেপ্ট করে নেয় তাহলে তোকে কিছু করবো না৷ আবির ভাই আর আমি মিলে বাসার পেছনের বাগানে ভাইয়াকে কু*পে দিয়ে আসবো। ”বন্যার দুচোখ ছলছল করছে। ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে বসে বসে কান্না গিলছে। মেঘ শক্ত কন্ঠে শুধালো,“ভাইয়া তোকে ভালোবাসে, এটা কি তুই বিশ্বাস করিস?”বন্যা অসহায় দৃষ্টি তাকিয়ে আছে। মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,“আমি এখন ভাইয়াকে কল দিব। জাস্ট সামান্য একটা কথা বলব দেখবি ভাইয়া পাগলের মতো ছুটে আসবে।”“কোনো দরকার নেই।”“তোর দরকার না থাকলেও আমার দরকার আছে। আমি আমার ভাবির চোখে পানি দেখতে চাই না। ”মেঘ সঙ্গে সঙ্গে তানভিরের নাম্বারে কল দিল। লাউডস্পিকার দিয়ে রেখেছে। আশেপাশে সবাই বসা। তানভির পার্টি অফিসে মিটিং করছে। মিটিং প্রায় শেষ পর্যায়ে। সবার বুঝানোর পরও তানভির নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় কমিটি বাতিল করা ছাড়া আর কোনো অপশন নেই। এরমধ্যে মেঘের কল আসায় তানভির মিটিং থেকে বেরিয়ে কল রিসিভ করতেই মেঘ কাঁদো কাঁদো কন্ঠে ডাকল,“ভাইয়া..”তানভির আঁতকে উঠে বলল,“কি হয়েছে বনু? কোনো সমস্যা?”মেঘ নাক টানতে টানতে বলল,” আমার কোনো সমস্যা না কিন্তু বন্যা….. ”“কি হয়েছে বন্যার? ”“বন্যা…..” মেঘ আর কিছুই বলছে না। তানভির আতঙ্কিত কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,” বন্যার কি হয়েছে?”“জানি না। বন্যা কেমন জানি করছে।”“কোথায় আছিস তোরা?”মেঘ জায়গার নাম বলতেই তানভির ঝটপট বলল,“আমি এখনি আসতেছি।”“ভাইয়া শুনো”ততক্ষণে তানভির কল কেটে দিয়েছে। মেঘ বন্যার দিকে তাকিয়ে ভেঙচি কেটে বলল,” দেখ কেমনে আসতেছে। তুই বসে বসে দোয়া কর যেন দ্রুত আসতে গিয়ে কোনো সমস্যা না হয়।”তামিম প্রশ্ন করল,“এই V1, তুই গ্রুপ থেকে বেড়িয়ে গেলি কেন? তুই ছাড়া গ্রুপটা ভালো লাগে না। সবাই খুব বোরিং আর তোর ভাবি তো আরও বেশি বোরিং।”মেঘ হেসে উত্তর দিল,” আমার ওনি যদি গ্রুপের চ্যাটিং দেখে আমাকে সোজা চান্দে পাঠায় দিবে। তাছাড়া আমি যে কাজে গ্রুপ খুলতে বলছিলাম সেই কাজ শেষ তাই এখন আমার গ্রুপ আর প্রয়োজন নেই। ”সাদিয়া শান্ত কন্ঠে শুধালো,“তুই যে কিছুদিন গ্রুপে এত এত মেসেজ দিলি, নাটক করলি সেসব তোর ওনি দেখে নি?”“প্রথমত গ্রুপে কথা শেষে আমি সঙ্গে সঙ্গে গ্রুপ সমেত সব মেসেজ ডিলিট করে দিতাম। দ্বিতীয়ত আমি সারাক্ষণ আমার আইডির Login Activity চেক করতাম যেন আমার ওনি আমার আইডিতে লগ ইন করলেই আমি এলার্ট হতে পারি। আমার ওনি এই কয়দিনে আমার আইডিতে একবারের জন্যও ঢুকে নি তাই সুযোগের সৎ ব্যবহার করে গ্রুপ থেকে বেড়িয়ে পরেছি যাতে ওনি কিছুই বুঝতে না পারেন।”বন্যা মেঘের দিকে তাকিয়ে উদাসীন কন্ঠে শুধালো,“তুই এত চালাক হইলি কবে?”“কিছুদিন যাবৎ অনলাইনে চালাক হওয়ার ট্রেনিং করছি। বুঝলি?”বন্যা মলিন হাসলো সাথে বাকিরাও। হঠাৎ মেঘের নজর পড়ে কিছুটা দূরে দাঁড়ানো এক ছেলের দিকে। লম্বাচওড়া ছেলেটার দুহাত পেছনে হাতে বেশ কিছু ফুল৷ দেখেই বুঝা যাচ্ছে কাউকে প্রপোজ করতে এসেছে। কিন্তু আশেপাশে কোনো মেয়ে নেই। মেঘ স্থির দৃষ্টিতে ছেলেটার হাতের ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। বেশ কিছুক্ষণ পর শাড়ি পড়া এক মেয়ে আসলো, বেশ সুন্দর করে সেজেগুজে এসেছে। মেয়েটা এসে ছেলেটার সামনে দাঁড়াতেই ছেলেটা হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। পেছন থেকে ফুল গুলো বের কয়ে মেয়েটার সামনে ধরলো। এভাবে ফুল দেয়ার বিষয়টা কমন হলেও সবার আবেগ গুলো ভিন্ন ভিন্ন৷ সেদিন মেঘ নিজেই বন্যার জন্য কতটা আবেগ নিয়ে ঠিক এভাবে হাঁটু গেড়ে বসে প্রপোজ করেছিল তবে সেটায় অন্যরকম অনুভূতি ছিল। আজ এই দৃশ্য দেখে মেঘের বুকের ভেতরটা হাহাকার করছে। আচমকা আবিরকে বড্ড বেশি মিস করছে। লম্বাচওড়া আর দেখতে ছেলেটা অনেকটায় আবিরের মতো তাই হয়তো মেঘের একটু বেশিই মনে পড়ছে। মেঘ আনমনে ভাবছে,” আবির ভাই কি কখনো এভাবে প্রপোজ করবেন আমায়? সামান্য একটা লাল গোলাপ চেয়েছিলাম তবুও দেন নি, ওনার কাছে ফুল সমেত প্রপোজ আশা করা বড্ড বেমানান।”বন্যা ডাকতেই মেঘের হুঁশ ফিরলো৷ কোনো কথা না বলে ফেসবুকে ঢুকে পোস্ট করল,❝সাত সাগর আর তের নদীপার হয়ে তুমি আসতে যদিরূপকথার রাজকুমার হয়েআমায় তুমি ভালবাসতে যদি।❞পোস্ট আপলোড হওয়া মাত্রই তানভির উপস্থিত হলো। দ্রুত এগিয়ে এসে আতঙ্কিত কন্ঠে শুধালো,“কি হয়েছে তোমার?”বন্যা থতমত খেয়ে তানভিরের দিকে তাকালো। বন্যা একদম স্বাভাবিক, চোখে মুখে অসুস্থতার রেশ মাত্র নেই। বন্যা কি বলবে এটায় বুঝতে পারছে না। তানভির একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। বন্যা শুধু মেঘকে দেখছে কিন্তু মেঘের মনে যে রাজ্যের দুঃখ। মন খারাপের পাহাড় সরিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে মেঘ আস্তে করে বলল,“তেমন কিছু হয় নি ভাইয়া । বরই খেতে গিয়ে বরই এর একটা বিচি গিলে ফেলছিল। যদি পেটে গাছ হয়ে যায় এই আতঙ্কে বন্যা সহ আমরা সবাই ভয় পাচ্ছিলাম। তারপর এক আন্টি বলছে কোনো সমস্যা হবে না। ”তানভির হাতের উল্টোপিট দিয়ে নিজের চোখ মুখ মুছে আকাশের পানে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে অত্যন্ত নমনীয় কন্ঠে প্রশ্ন করল,“এটায় সত্যি ঘটনা? নাকি অন্য কোনো কারণ আছে যা কিন্তু এখন বলছিস না।”মেঘ ঘনঘন এপাশ ওপাশ মাথা নেড়ে বলল,“আর কোনো কারণ নেই। ”মেঘ একটু থেমে আবার বলল,“আসলে বন্যার কয়েকটা বই কেনা দরকার কিন্তু আমাদের কারো সেদিকে যেতে ইচ্ছে করছে না। তুমি যেহেতু চলেই আসছো, বন্যাকে নিয়ে যাবা, প্লিজ।”বন্যা অগ্নি চোখে মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ তানভিরের সঙ্গে একা কোথাও যাওয়ার বিন্দুমাত্র আগ্রহ বন্যার নেই। আয়েশাকে দেখার পর থেকে বন্যার আতঙ্ক কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। রাতবিরেতে ঘুম ভেঙে যায়, ঘন্টার পর ঘন্টা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে। প্রায় রাতেই আপু সজাগ হয়ে বন্যাকে ডেকে নিয়ে ঘুম পাড়ায়। তানভিরের কল রিসিভ করে না, বেশকিছু দিন ক্লাসে পর্যন্ত আসে নি। তানভির রাশভারি কন্ঠে শুধালো,“তুই কিভাবে যাবি?”“মিষ্টি ওর ফুপ্পির বাসায় যাবে। ওনাদের বাসা আমাদের বাসার এদিকে। আমি মিষ্টির সাথে চলে যাবো।”“ঠিক আছে। সাবধানে যাস।”“আচ্ছা। তুমি বন্যাকে নিয়ে যাও আর হ্যাঁ বন্যাকে মোখলেস দুলাভাই এর দোকান পর্যন্ত দিয়ে এসো।”তানভির নির্বাক চোখে মেঘকে দেখে নিল। মেঘের ঠোঁট জুড়ে হাসির ঝলক। তানভির চাইলেও বোনকে কিছু বলতে পারছে না। বন্যার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল,“চলো”বন্যা তখনও মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের ভাষায় বুঝাচ্ছে সে তানভিরের সঙ্গে যাবে না। কিন্তু মেঘ সেই ভাষাকে পাত্তা না দিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,“কিরে যাচ্ছিস না কেনো? ভাইয়া কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে বলতো! ”বন্যা বিড়বিড় করতে করতে উঠে গেল। মেঘ, মিষ্টি, সাদিয়া, মিনহাজ, তামিম তখনও বসা। তানভির যাওয়ার আগে বোনকে সতর্ক করে গেলো যেন তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যায়। মিষ্টিরা টুকিটাকি বিষয় নিয়ে দুষ্টামি করছে। অথচ মেঘের মনোযোগ কাপল টার দিকে৷ দু’জন পাশাপাশি বসে কি সুন্দর ভাবে গল্প করছে। আবিরের জন্য মেঘের মনটা খুব বেশি ছটফট করছে। আগপাছ না ভেবেই সবার মধ্যে থেকে উঠে গেলো৷ কিছুটা দূরে গিয়ে আবিরকে কল করল। এদিকে আবির অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে প্রেজেন্টেশন দিচ্ছে। সচরাচর দিনের বেলা আবিরকে কেউ কল দেয় না তাই ফোন সাইলেন্ট করতেও ভুলে গেছে। আচমকা কল বাজতেই একজন বয়স্ক ব্যক্তি বিরক্তির স্বরে বললেন,“Silence your phone.”আবির তড়িৎ বেগে ফোন সাইলেন্ট করতে টেবিলে কাছে এগিয়ে আসলো। ফোনের স্ক্রিনে নজর পড়তেই থমকালো। অসময়ে মেঘের কল দেখে ভেতরটা কেঁপে উঠলো। উপস্থিত সবার দিকে এক পলক তাকিয়ে বলল,“I’m Sorry. I can’t cut this call. Excuse me.”আবির কল রিসিভ করে কিছুটা সাইডে সরে দাঁড়িয়েছে। রিসিভ হওয়ামাত্রই মেঘ আর্তনাদ করে উঠল,“আবির ভাই…… ”আবির বরাবরের মতো শান্ত আর আবেশিত কন্ঠে জবাব দিল,“হুমমমমমম।”“আপনি কবে আসবেন?”“আসবো।”মেঘ শীতল কন্ঠে শুধালো,“কবে আসবেন?”আবির এবার আস্তে আস্তে বলল,“আমি কবে আসবো এটা তো আপনি তো খুব ভালোভাবে জানেন। আপনিই বলুন, আর কতদিন বাকি?”মেঘ মৃদু হেসে উত্তর দিল,“২৭ দিন। ”“Very Good. এখন বলুন আপনার কি হয়েছে?”“কিছু হয় নি। এমনিতেই ভালো লাগছিল না। খেয়েছেন আপনি?”“এখনও খাওয়া হয় নি একটু পর খাবো। আপনি খেয়েছেন?”” বাহিরে খেয়েছি। বাসায় যায় নি এখনও।”আবির ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,“এখনও বাসায় যান কি কেনো? সাথে কে?”“মিষ্টিরা সবাই আছে।”মেঘ আবারও ডাকল,“আবির ভাই…”আবির পূর্বের ন্যায় জবাব দিল,“হুমমমমমম।”মেঘ ঢোক গিলে উষ্ণ স্বরে বলল,“I Miss You Abir Vai. Miss You a lot. ”সহসা আবিরের ওষ্ঠ যুগল প্রশস্ত হলো। সবার দিকে এক নজর দেখলো৷ রুমে উপস্থিত সবার নজর আবিরের দিকে। আবির সঙ্গে সঙ্গে নজর সরিয়ে আস্তে করে গলা খাঁকারি দিয়ে মুচকি হেসে বলে উঠল,“আচ্ছা, তারপর। ”মেঘ এবার আহ্লাদী কন্ঠে বলে উঠল,“I Miss You Infinity. Do you miss me?”আবিরের মোলায়েম কন্ঠের ছোট জবাব,“হুম।”মেঘ এবার ঠোঁট উল্টালো। সবসময় মিস ইউ বলে মেঘ কল কেটে দিলেও আজ সে কল কাটছে বা বরং আবিরকে প্রশ্ন করছে অথচ আবির হুমম, আচ্ছা বলে কথা কাটাচ্ছে। মেঘ মনে মনে ক্ষুদ্ধ হলো। বুক ভরে শ্বাস টেনে রাশভারি কন্ঠে শুধালো,“আপনি কি ব্যস্ত?”“প্রেজেন্টেশন দিচ্ছিলাম। ”মেঘ আতঙ্কিত কন্ঠে বলতে শুরু করল,“সরি সরি সরি, আমি বুঝতে পারি নি। আপনি কল কেটে দিলেই পারতেন৷ রাখি এখন।”আবির শান্ত কন্ঠে বলল,“দ্রুত বাসায় যান। আমি প্রেজেন্টেশন শেষ করে কল দিচ্ছি। ওকে?”“আচ্ছা। ”মেঘ কল কেটে মোবাইল দিয়ে নিজের কপালে আস্তে করে গাট্টা দিতে দিতে নিজেকে বকতে লাগলো। মানুষ কল দিয়ে প্রথমে জিজ্ঞেস করে কেমন আছেন, কি করেন অথচ মেঘ সেই প্রশ্ন সবার শেষে জিজ্ঞেস করেছে। প্রথমে জিজ্ঞেস করলে এমন একটা ঘটনা কখনোই ঘটতো না। মেঘ নিজেকে বকতে ব্যস্ত। আবির ফোন সাইলেন্ট করে টেবিলের উপর রাখতে রাখতে বলল,“Sorry for wasting your time.”সবার মধ্য থেকে মোটামুটি বয়স্ক একজন জিজ্ঞেস করলেন,“Is she your lover?”আবির নিঃশব্দে হেসে মোলায়েম কন্ঠে উত্তর দিল,“She is my everything. I’m nothing without her. ”মধ্যবয়স্ক লোক এবার একগাল হেসে বললেন,“She is truly lucky to have a life partner like you. Best of luck.”আবির অনুষ্ণ কন্ঠে জানাল,“No,Sir. I am more lucky to have someone like her in my life. Pray for us & Again Sorry.”তানভির বন্যাকে নিয়ে একটা লাইব্রেরিতে গেল। বন্যা আশেপাশে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো। আপাতত কোনো বই কেনার ই প্ল্যান ছিল না তার, তবুও অনেক দেখেশুনে ২-৩ টা বই নিল। তানভির বন্যাকে কিছু বলতে চাচ্ছে কিন্তু বন্যা খুব ব্যস্ততা দেখাচ্ছে এমনকি তানভিরের দিকে তাকাচ্ছেও না। কাজ শেষে তানভিরকে উদ্দেশ্য করে বলল,“আপনি চলে যান আমার আরও কিছু কাজ আছে।”” কাজ অন্যদিন করো আজ চলো, একজায়গায় যাব। ”বন্যা ঠান্ডা কন্ঠে বলল,“আমার শরীর ভালো না।”তানভির মলিন হেসে বলল,“বরই এর বিচি খেলে কিছু হয় না বোকা। ”বন্যা তানভিরের দিকে স্পষ্ট চোখে তাকিয়ে বলল,“আমি বোকা না।”” তাহলে কি? চালাক? কতটা? ”বন্যা তখনও তানভিরের দিকে তাকিয়ে আছে। তানভির রাশভারি কন্ঠে বলল,“কল দিলে কল রিসিভ করো না কেনো?”বন্যা ঢোক গিলে ভেতরের কষ্ট চেপে রেখে আস্তে করে বলল,” সবসময় ফোনের কাছে থাকি না।”“পরে তো দেখো। তখন একটা কল দিতে পারো না?”বন্যা আর কিছু বলল না। তানভির এবার শক্ত কন্ঠে জানতে চাইলো,” তুমি কি আমার উপর বিরক্ত?”বন্যা এপাশ-ওপাশ মাথা নেড়ে নিচু স্বরে বলল,” আমি বাসায় যাব।”বন্যার ভেতরে ঠিক কতটা যন্ত্রনা হচ্ছে এটা সে তানভিরকে বুঝাতেই পারছে না। তানভির বন্যাকে নিয়ে একটা চায়ের দোকানে বসলো। যদিও বন্যার ইচ্ছে ছিল না, তানভির জোর করেই এনেছে। দু’জনে দু কাপ বুলেট চা নিয়েছে। বন্যা দ্রুত চা খাচ্ছে যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাসায় চলে যেতে পারে। তানভির বন্যার এমন কর্মকাণ্ড দেখে হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আচমকা বলে উঠল,“সেদিনের মেয়েটার কথা মনে আছে?”বন্যা বুঝেও অবুঝের মতো প্রশ্ন করলশ“কোন মেয়ে?”“আয়েশা।”নামটা কর্ণকুহরে প্রবেশ মাত্রই বন্যা বিষম খেয়ে উঠল। টক আর কাঁচা মরিচের ঝাঁজে কাশতে কাশতে বন্যার শ্বাস আঁটকে যাচ্ছে। দুচোখ বেয়ে পানি পরছে, তানভির তড়িঘড়ি করে এক গ্লাস পানি নিয়ে আসলো। শ্বাস আঁটকে যাওয়ায় পানিটা পর্যন্ত খেতে পারছে না। তানভির কি করবে বুঝতে না পেরে বন্যার মাথায় অনবরত ফুঁ দিচ্ছে। বন্যার স্বাভাবিক হতে বেশকিছুটা সময় লাগলো। তানভির তখনও বন্যা পাশে দাঁড়ানো। বিষয়টা খেয়াল করে বন্যা আস্তে করে বলল,“আমি ঠিক আছি। আপনি বসুন।”তানভির “সরি” বলে দূরে সরে বসেছে। বন্যা বলল,“তখন কি যেন বলছিলেন, বলুন।”তানভির মনে মনে বিড়বিড় করল,“যে শাঁকচুন্নির নাম নেয়াতে তোমার এই অবস্থা হয়েছে এই শাঁকচুন্নির নাম আর জীবনেও মুখে নিবো না। ”বন্যা আবারও বলল,“কি হলো, বলুন।”“কিছু না,চলো তোমাকে বাসা পর্যন্ত দিয়ে আসি।”আবির প্রেজেন্টেশন শেষ করেই মেঘকে কল দিয়েছে ততক্ষণে মেঘ বাসায় চলে গেছে। কথা শেষ করে ফেসবুকে ঢুকা মাত্র মেঘের পোস্ট সামনে আসছে৷ পোস্ট দেখে আবির জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে অনুগ্র কন্ঠে বলল,“রূপকথার রাজকুমার না হলেও মাহদিবার রাজকুমার হয়ে খুব শীঘ্রই আসবো, ইনশাআল্লাহ।”নিত্যদিনের মতো রাত ১০:৩০ নাগাদ আবিরের কল আসছে। মেঘ যেন প্রতিদিন এই সময় টায় জন্যই অপেক্ষা করে। আবির কল দিয়েই ধীর কন্ঠে শুধালো,“কি অবস্থা? ”“কিসের কি অবস্থা? ”“শপিং কতদূর?”“কিসের শপিং?”“বিয়ের।”“কার বিয়ে?”“তোর।”“আমার বিয়ে! কবে?”” সেসব জেনে তোর কাজ কি? তুই না বলছিলি বিয়ের জিনিসপত্র নিয়ে পালানোর শখ তোর। টাকা পাঠিয়েছি কি কি লাগে সব কিনে নিস। ”মেঘ আহাম্মকের মতো তাকিয়ে বলল,“আমি আপনাকে এটা বলি নি।”“সেসব বাদ দে, এখন বল তোর কি লাগবে?”মেঘ মনে মনে বিড়বিড় করল,“আপনাকে লাগবে। এখন দিয়ে দেন আমায়।”“কি হলো বল!”“আমার কিছু লাগবে না।”আবির গম্ভীর কন্ঠে বলল,“আগামীকাল শপিং এ যাব৷ সারারাত লিস্ট করে পাঠাবেন। মনে থাকবে?”“হুমমম।”তানভির রাজনীতি ছেড়ে পড়াশোনায় মনোযোগী হয়েছে। সেই সঙ্গে আপাতত আবিরের অফিসের টুকটাক দেখাশোনা করতে হচ্ছে। এছাড়াও আরও কিছু কাজ আছে। এরমধ্যে আয়েশার সঙ্গে আর দেখা হয় নি। তানভিরও ভুলে গেছে সেই মেয়ের কথা।বন্যা ইদানীং একটা টিউশন শুরু করেছে। মূলত বন্যার বড় আপু মেয়েটাকে পড়াতো৷ কিন্তু এখন চাকরির চাপে টিউশন পড়ানো টা কষ্ট হয়ে যায় তাই বন্যা পড়াচ্ছে। বিকেল দিকে বন্যা টিউশন থেকে বেড়িয়ে হেঁটে মেইনরোড পর্যন্ত যাচ্ছিলো। অনেকটা যাওয়ার পর হঠাৎ পাশ থেকে একজন ডাকলো,“বন্যা।”মেয়েলী কন্ঠস্বরে নিজের নাম শুনে বন্যা থমকে দাঁড়িয়ে পাশে তাকালো। থ্রিপিস পড়া এক মেয়ে মাথায় ওড়না দেয়া, এগিয়ে আসলো বন্যার কাছে। বন্যা সূক্ষ্ণ নেত্রে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,“কে আপনি? আমাকে কিভাবে চিনেন?”“আমি আয়েশা। সেদিন দেখা হলো মনে নেই? তানভিরের সাথে ছিলে তুমি।”বন্যা শ্বাস ছেড়ে শান্ত কন্ঠে বলল,“কিছু বলবেন?”“হ্যাঁ। তুমি মেঘের ফ্রেন্ড বন্যা না?”“জ্বি৷ কেনো?”“আসলে তোমাকে সেদিন তানভিরের সাথে দেখার পর কেন যেন মনে হচ্ছিল তুমি ওর গার্লফ্রেন্ড। অনেক ভাবার পর মনে হয়েছে। তুমি তো মেঘের ফ্রেন্ড। অনেক আগে তোমাকে দেখেছিলাম। তখন তোমরা অনেক ছোট ছিলে। ”বন্যা নিজের ভেতরে ক্রোধ চেপে রেখে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,“আমাকে কি কোনো দরকারে ডেকেছেন? আমার কিছু কাজ আছে, যেতে হবে৷ ”“তানভিরের বিষয়ে জিজ্ঞেস করতেই ডেকেছিলাম। তুমি জানো কি না জানি না, তানভিরের সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক ছিল৷ পারিবারিক সমস্যার কারণে অনেকদিন যোগাযোগ ছিল না। মূলত তানভিরের জন্য আমার ঢাকায় আসা। মাস্টার্স আর চাকরির প্রস্তুতি কেবল বাহানা। আচ্ছা, তানভির কি বর্তমানে কোনো সম্পর্কে আছে? জানো তুমি?”“আমি কিভাবে জানবো?”“তোমার সাথে কিছু নেই তো?”বন্যা কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,“থাকলে কি করবেন?”আয়েশা ফিক করে হেসে বলল,“মজা করতেছো? তোমাকে তানভির ছোট বোনের চোখে দেখে। তাই তোমার প্রতি ওর কোনো অনুভূতি আসবেই না।”বন্যা ফোঁস করে বলল,“তাহলে তো আপনি ই ভালো জানেন। আসছি”বন্যা চলে যাচ্ছে। মেয়েটা পেছন থেকে জিজ্ঞেস করল,“তোমার কাছে তানভিরের নাম্বার আছে?”বন্যা কোনো উত্তর দিল না। মেয়েটা আবারও বলল,“তানভিরের সাথে দেখা হলে আমার কথা বইলো।”ইদানীং আবিরের আব্বুর অফিসে বেশ চাপ যাচ্ছে। মোজাম্মেল খানও ঢাকায় নেই। আলী আহমদ খান একা সব সামলে হিমসিম খাচ্ছেন। তারমধ্যে কয়েকজন নতুন জয়েন করেছে। তাদেরকে সবকিছু বুঝিয়ে দিতে হচ্ছে। আবির সকাল থেকে বেশ কয়েকবার কল দিয়েছে, আলী আহমদ খান ফোনের কাছে নেই তাই রিসিভ করতে পারেন নি। অনেকক্ষণ পর ফোন দেখে আবিরকে কল ব্যাক করলেন। আবির সালাম দিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,“আব্বু, সিফাতের ব্যাপারে আপনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটা কি ভেবেচিন্তে নিয়েছেন?”“হ্যাঁ। কেনো?”“কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আপনার এই সিদ্ধান্তটা নিয়ে আবারও ভাবা উচিত।”“তোমার চাচ্চু তোমার কাছে বিচার দিয়েছে?”“না আব্বু। চাচ্চু শুধু জানিয়েছেন। এটা একান্ত ই আমার মতামত। তারপরও যদি মনে হয় আপনি তাকে জয়েন করাবেন, তাহলে অন্ততপক্ষে কিছুদিন সময় নিন। আমি কিছুদিনের মধ্যেই চলে আসবো। চাচ্চু, কাকামনি ঢাকায় ফিরলে সবার সাথে কথা বলে সিদ্ধান্তটা নিলে ভালো হতো না?”” কি বলতে চাচ্ছো, আমার নেয়া সিদ্ধান্ত ভুল? তোমরা যা ঠিক মনে করবে শুধুমাত্র তাই ঠিক?”“আব্বু প্লিজ আপনি মাথা ঠান্ডা করে একবার ভাবুন, যেখানে ২৫-৩০ বছর যাবৎ গ্রামের মানুষের সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই। ভুলকরেও কখনো গ্রামে যান না, সেখানে সেই গ্রামের এক ছেলেকে গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে জব দিচ্ছেন। সেটা কি আদোঃ যুক্তিপূর্ণ? ১৫ দিনের মধ্যে আমি চলে আসবো। তাছাড়া খুব সমস্যা হলে তানভিরকে বললেই অফিসে আসবে। এরপরও যদি নিতে চান আরও অনেক মানুষ আছে। প্লিজ একবার অন্তত ভাবুন।”আলী আহমদ খান গুরুতর কন্ঠে বলতে শুরু করলেন,“দেখো, মানুষ সারাজীবন খারাপ থাকে না। তার পরিবার আমাদের সাথে যে অন্যায় টা করেছে সেটা অনেক বছর আগের ঘটনা। এতবছর পর সে বিপদে পড়ে জবের জন্য আমার কাছে এসেছে। এখন আমিও যদি তাদের মতো খারাপ ব্যবহার করি তাহলে তাদের আর আমাদের মধ্যে কি পার্থক্য রইলো? দ্বিতীয়বার সুযোগ পেলে মানুষ নিজের প্রথম ভুলগুলোকেও শুধরাতে পারে। দেখা যাক সে কি করে!”আবির কন্ঠ দ্বিগুণ ভারি করে বলল,” আমার মন কোনোভাবেই সায় দিচ্ছে না। আপনার ভালোমানুষির সুযোগ নিয়ে অনেকেই অনেককিছু করতে পারে।”” তুমি দুশ্চিন্তা করো না। সাবধানে থেকো আর যত তাড়াতাড়ি চলে এসো। যদি তোমার ইচ্ছে হয়!”আবির মলিন হেসে বলল,“সরি, আব্বু।”“সরি বলছো কেনো?”“বলতে ইচ্ছে করলো তাই বললাম।”আরও এক সপ্তাহ কেটে গেছে। আবিরের বাড়ি ফেরার কেবল এক সপ্তাহ বাকি। খান বাড়ির আমেজ বদলে গেছে। মালিহা খান, হালিমা খান বিভিন্ন জাতের পিঠা তৈরিতে ব্যস্ত। আকলিমা খানও তাদের কাজে সহযোগিতা করছে। মেঘ সকাল থেকে আম্মুদের বিশাল আয়োজন দেখছে। আজ ভার্সিটি যেতে একদম ইচ্ছে করছে না। তারপরও কি মনে করে ভার্সিটিতে এসেছে। একটা ক্লাস শেষ হয়ে আরেকটা ক্লাস শুরু হয়েছে কেবল ১৫ মিনিট হবে। এরমধ্যে মেঘের মাথা ঘুরছে, চোখে অন্ধকার দেখছে। একবার ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি দিয়ে এসেছে তারপরও ঠিক হচ্ছে না। মেঘের অবস্থা দেখে বন্যাও ভয় পাচ্ছে তানভিরকে ফোন দিতে চাচ্ছে কিন্তু মেঘ বার বার আটকে দিচ্ছে । প্রায় ১০-১৫ মিনিট পর মেঘ আচমকা সেন্স হারিয়ে বন্যার গায়ের উপর ঢলে পড়েছে।
ঘটনাবলি১৫২৬ - মুঘল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দীন মোহাম্মাদ বাবর সিংহাসনে আরোহণ করেন।১৫৫৫ - জার্মানীর অগসবার্গ শহরের নামে সেখানে কংগ্রেস গঠিত হয়।১৭০১ - ব্রিটেনের জন মরিস মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।১৭৭০ - ক্যাপটেন কুক নিউ সাউথ ওয়েলসে পদার্পণ করেন।১৭৮৯ - ফ্লেচার ক্রিশ্চিয়ানের নেতৃত্বে ব্রিটিশ জাহাজ বাউন্টিতে নাবিক বিদ্রোহ সংঘটিত হয়।১৯১৫ - যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও রাশিয়া লন্ডনের গোপন চুক্তিতে ইতালিকে ব্রেনার গিরিপথ পর্যন্ত ত্রেন্তিনো, তিরোল, ইস্ত্রিয়া, ডালমাসিয়া, দোদেকানিজে দিতে সম্মত হয়।১৯১৯ - লীগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠিত হয়।১৯২০ - আজারবাইজানকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।১৯২০ - পোল্যান্ড ও রাশিয়া যুদ্ধ ঘোষণা করে।১৯৫২ - জাপান সার্বভৌমত্ব ফিরে পায় এবং গণতান্ত্রিক জাপান প্রতিষ্ঠিত হয়।১৯৬৫ - মার্কিন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের জনস্বার্থ রক্ষার অজুহাত দেখিয়ে ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রের ওপর সামরিক হামলা চালায়।১৯৬৯ - ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এর পদ থেকে দ্যগল ফ্যান্সের পদত্যাগ।১৯৭২ - বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় লাইবেরিয়া।১৯৯২ - রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবর্তনে বাংলাদেশ ও মায়ানমারের মধ্যে প্রথম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।১৯৯২ - সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোকে নিয়ে নতুন যুগোস্লাভিয়া ঘোষণা।১৯৯২ - সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আফগান যোদ্ধাদের ১৩ বছরের যুদ্ধের পর তারা বিজয়লাভ করে।১৯৯৫ - বাংলাদেশ সরকার হুমায়ুন আজাদের নারী বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।২০০১ - ডেনিশ টিটো পৃথিবীর সর্বপ্রথম মহাকাশ পর্যটকের মর্যাদা লাভ করেন।২০০৪ - একটি মার্কিন গবেষণা সংস্থা সার্স ভাইরাসের ওষুধ আবিষ্কার করে।জন্ম৩২ - ওঠো, রোমান সম্রাট।১৪৪২ - চতুর্থ এডওয়ার্ড, ইংল্যান্ড রাজা।১৭১২ - ফরাসি দার্শনিক জঁ-জাক রুসো।১৭৫৮ - জেমস মন্রো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম রাষ্ট্রপতি।১৭৭৪ - খ্রিস্টিয়ান লেওপোল্ড ফন বুখ, জার্মান ভূবিজ্ঞানী এবং জীবাশ্মবিদ।১৭৮৫ - জন জেমস আদোবান বা জঁ-জাক ওদিবোন, ফরাসি-আমেরিকান পক্ষীবিজ্ঞানী, প্রকৃতিবাদী, শিকারী এবং চিত্রকলাকার।১৭৯৫ - চার্লস স্টুর্ট, অস্ট্রেলিয়ার আবিষ্কারক।১৭৯৮ - ওজেন দ্যলাক্রোয়া, ফরাসি চিত্রকর।১৮৩৮ - টবিয়াস আসের, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ডাচ আইনজীবী ও পণ্ডিত।১৮৬৯ - দিনে ফ্রান্সিস মেরি হককিন, একজন নিউজিল্যান্ডের চিত্রশিল্পী।১৮৭৯ - ওয়েন উইলিয়ান্স রিচার্ডসন, ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী।১৮৮৪ - আয়েত আলী খাঁ, উপমহাদেশের প্রখ্যাত উচ্চাঙ্গ সংগীতশিল্পী, সেতার ও সুরবাহার বাদক।১৮৮৯ - লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন, অস্ট্রীয় দার্শনিক।১৮৮৯ - আন্টোনিও ডে অলিভেরা সালাজার, পর্তুগিজ অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ ও ১০০তম প্রধানমন্ত্রী।১৮৯৫ - খাজা হাবিবুল্লাহ, ঢাকার পঞ্চম ও শেষ নবাব।১৮৯৭ - নীতীন বসু, বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক।১৯০০ - ইয়ান হেন্ডরিখ ওর্ট, ওলন্দাজ জ্যোতির্বিদ।১৯০৬ - কুর্ট গ্যোডেল, মার্কিন যুক্তিবিদ, গণিতবিদ।১৯০৮ - জন জ্যাক হেনরি ওয়েব ফিঙ্গলটন, অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটার, সাংবাদিক ও ধারাভাষ্যকার।১৯২৪ - নারায়ণ সান্যাল, বাঙালি লেখক।১৯৩০ - আল্ফ ভ্যালেন্টাইন, বিখ্যাত ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেটার।১৯৩৩ - ক্যারল বার্নেট, মার্কিন অভিনেত্রী, কৌতুকাভিনেত্রী, গায়িকা ও লেখক।১৯৩৭ - সাদ্দাম হুসাইন, ইরাকের সাবেক রাষ্ট্রপতি।১৯৪১ - কার্ল ব্যারি শার্পলেস, পুরস্কার বিজয়ী আমেরিকান রসায়নবিদ।১৯৪৭ - হুমায়ুন আজাদ, ভাষাবিজ্ঞানী, কবি, ঔপন্যাসিক, সমালোচক, কিশোর সাহিত্যিক ও রাজনীতিক ভাষ্যকার লেখক।১৯৪৯ - জগৎজ্যোতি দাস, বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত বাংলাদেমি মুক্তিযোদ্ধা।১৯৬০ - ওয়াল্টার যেঙ্গা, সাবেক ইতালিয়ান ফুটবলার ও ম্যানেজার।১৯৬১ - জোয়ান চেন, চীনা বংশোদ্ভূত আমেরিকান অভিনেত্রী, পরিচালক, প্রযোজক এবং চিত্রনাট্যকার।১৯৬৩ - জেট লি, চীনা-সিঙ্গাপুরের মার্শাল শিল্পী, অভিনেতা এবং প্রযোজক।১৯৬৮ - অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, দক্ষিণ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ইংরেজ সাবেক ক্রিকেটার ও কোচ।১৯৭০ - মেলানিয়া ট্রাম্প, স্লোভেন-আমেরিকান ব্যবসায়ী ও ৪৫তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্ত্রী।১৯৭৪ - পেনেলোপে ক্রুজ সানচেস, স্প্যানিশ অভিনেত্রী ও প্রযোজক।১৯৮৮ - হুয়ান ম্যানুয়েল মাতা গার্সিয়া, স্প্যানিশ ফুটবলার।১৯৯৯ - লরা উলভার্ট, দক্ষিণ আফ্রিকান প্রমিলা ক্রিকেটার।মৃত্যু ১৭৪০ - প্রথম বাজিরাও, ভারতীয় সেনাপতি।১৮১৩ - মিখাইল কুটুযোভ, রাশিয়ান ফিল্ড মার্শাল।১৮৫৩ - লুডভিগ টিয়েক, জার্মান লেখক ও কবি।১৯২০ - শ্রীনিবাস রামানুজন, ভারতীয় গণিতবিদ।১৯৩২ - বিল লকউড, ইংরেজ ক্রিকেটার।১৯৩৬ - মিসরের বাদশাহ ফুয়াদের (প্রথম) ।১৯৪৫ - বেনিতো মুসোলিনি, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ কালে ইতালির সর্বাধিনায়ক।১৯৫১ - আর্নল্ড সমারফেল্ড, জার্মান পদার্থবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ।১৯৫৪ - লিওন জউহাউক্স, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ফরাসি ইউনিয়ন নেতা।১৯৫৭ - গিচিন ফুনাকোশি, জাপানি মার্শাল আর্টিস্ট এবং শোতোকান কারাতের প্রতিষ্ঠাতা।১৯৭০ - এড বেগ্লেয়, আমেরিকান অভিনেতা।১৯৭৮ - মোহাম্মদ দাউদ খান, আফগান কমান্ডার, রাজনীতিবিদ প্রথম রাষ্ট্রপতি।১৯৮৬ - ব্রডরিক ক্রফোর্ড, আমেরিকান অভিনেতা।১৯৮৯ - লুসিল বল, মার্কিন অভিনেত্রী, কৌতুকাভিনেত্রী, মডেল, চলচ্চিত্র-স্টুডিও নির্বাহী ও প্রযোজক।১৯৯৯ - আলফ রামসে, ইংরেজ ফুটবল খেলোয়াড় ও ম্যানেজার।১৯৯৯ - আর্থার লিওনার্ড শলো, নোবেল পুরস্কার বিজয়ী আমেরিকান পদার্থবিদ।২০০৩ - ইউন হিয়ন সক, দক্ষিণ কোরীয় সমাজকর্মী।২০০৫ - মারিয়া শেল, অস্ট্রিয়ান-সুইস অভিনেত্রী।২০১২ - মাটিল্ডে কামুস, স্প্যানিশ কবি।২০১৭ - জোনাথন ডেমি, আমেরিকান চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রযোজক এবং চিত্রনাট্যকার। ছুটি ও অন্যান্যবিশ্ব মেধা সম্পদ দিবস
মেষ রাশি: মন থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখুন। এই রাশির বিবাহিত ব্যক্তিরা শ্বশুরবাড়ির কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন। বাড়ির পরিবেশে আজ কোনও পরিবর্তন করার আগে সবার সম্মতি পেয়েছেন কিনা সেই বিষয়ে নিশ্চিত হন। সামগ্রিকভাবে দিনটি অত্যন্ত ব্যস্ততার মধ্যে অতিবাহিত হওয়ায় আপনি ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে সময় কাটাতে পারবেন না। আপনি আজ একটি বৈবাহিক অনুষ্ঠানে যেতে পারেন। মদ্যপান থেকে বিরত থাকুন। বিবাহিত জীবন নিঃসন্দেহে সুখের হবে।প্রতিকার: পারিবারিক জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে বাড়িতে নিয়মিত ধূপকাঠি জ্বালান।বৃষ রাশি: শরীরের প্রতি অবশ্যই যত্নশীল হন এবং নিজের ওজনকে নিয়ন্ত্রণে রাখুন। শরীরচর্চার প্রতি মনোযোগ দিন। একজন বন্ধু আজ আপনার কাছ থেকে ঋণ চাইতে পারেন। শিশুদের সঙ্গে অবশ্যই কিছুটা সময় অতিবাহিত করুন। এর ফলে আপনার মন ভালো হয়ে যাবে। আপনার ভালোবাসার মানুষ আজ আপনার কাজ থেকে কিছু চাইলেও আপনি তা দিতে পারবেন না। যেটি তাঁর খারাপ লাগতে পারে। ব্যস্ততার মধ্যেও আপনার কাছে আজ কিছুটা অবসর সময় থাকবে। এই সময় আপনি একটি সৃজনশীল কাজ করতে পারেন। আপনি নিজের ত্রুটিগুলি সংশোধন করে ঘাটতিগুলি পূরণ করার চেষ্টা করুন। বিবাহিত জীবন নিঃসন্দেহে সুখের হবে।প্রতিকার: আর্থিক দিক থেকে উন্নতির লক্ষ্যে সাধু অথবা প্রতিবন্ধীদের খাটিয়া অর্পণ করুনমিথুন রাশি: আপনার মধ্যে আজ ভরপুর আত্মবিশ্বাস বজায় থাকবে। তাই, এই দিনটিকে অবশ্যই সঠিকভাবে কাজে লাগান। আপনি আজ দ্রুত অর্থ উপার্জন করতে চাইবেন। তাড়াহুড়ো করে আজ কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন না। প্রেমের জীবনে আপনি আজ একটি চমকের সম্মুখীন হবেন। আপনার আজ কোথাও রোমান্টিক সকরের সম্ভাবনা রয়েছে। আপনার কাছে থাকা অবসর সময়টিকে সঠিকভাবে কাজে লাগান। প্রিয়জনদের সঙ্গে দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে। আজকের দিনটি আপনার বিবাহিত জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে বিবেচিত হবে।প্রতিকার: পারিবারিক জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে অবশ্যই ভগবান শিব ভৈরব এবং হনুমানজির আরাধনা করুন।কর্কট রাশি: শরীর এবং মনকে সুস্থ রাখার লক্ষ্যে নিয়মিতভাবে ধ্যান ও যোগ ব্যায়াম করুন। এর ফলে আপনার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে। অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে আজ আপনি কিছু ভালো পরামর্শ পেতে পারেন। প্রেমের জীবনে আজ আপনি একটি চমকের সম্মুখীন হবেন। কর্মক্ষেত্রে দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে। আজ কোথাও কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে পরামর্শ নিন। অলসতা ত্যাগ করুন।প্রতিকার: প্রেমের জীবন সুখকর করে তোলার লক্ষ্যে একদিন নুন ছাড়া খাবার খান।সিংহ রাশি: আপনি আজ একটি কাজে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে সমর্থন পেতে পারেন। যার ফলে আপনার আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে। আর্থিক দিক থেকে আজকের দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। সন্তানদের সঙ্গে অবশ্যই কিছুটা সময় অতিবাহিত করুন। প্রেমের জন্য এই দিনটি খুব একটা খারাপ নয়। আপনি আজ এমন একটি রেস্তোরাঁ যেতে পারেন যেখানে বিদেশি খাবার পাওয়া যায়। কোনও অপ্রয়োজনীয় কাজে অযথা সময় নষ্ট করা থেকে বিরত থাকুন। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: পারিবারিক জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় রাখার লক্ষ্যে পুরুষরা কপালে লাল রঙের তিলক এবং মহিলারা লাল রঙের সিঁদুর লাগান।কন্যা রাশি: শরীরের প্রতি অবশ্যই যত্নশীল হন। কোথাও অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে আপনার লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অবশ্যই কিছুটা সময় অতিবাহিত করুন। ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে দিনটি ভালোভাবে অতিবাহিত হবে। আপনার মূল্যবান জিনিসপত্রগুলির প্রতি অবশ্যই সতর্ক থাকুন। নাহলে, চুরি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একজন পুরনো বন্ধুর সঙ্গে আজ আপনার সাক্ষাৎ ঘটবে। যার ফলে কিছু পুরনো স্মৃতির রোমন্থন হবে। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে প্রতিদিন তুলসী পাতা খান।তুলা রাশি: মন থেকে অবশ্যই সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রাখুন। কোথাও কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে অবশ্যই পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে সাহায্য গ্রহণ করুন। অতিরিক্ত অর্থ আজ জমি বা বাড়ি কেনার কাজে ব্যবহার করুন। অন্যের সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকুন। পরিবারের সবথেকে ছোট সদস্যের সঙ্গে আজ আপনি অনেকটা সময় অতিবাহিত করবেন। এর ফলে আপনার মন ভালো হয়ে যাবে। আপনি আজ আপনার একটি গভীর অনুভূতি অথবা দুঃখ নিকট বন্ধু বা আত্মীয়ের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন। অর্ধাঙ্গিনীর একটি আচরণ আজ আপনার খারাপ লাগতে পারে।প্রতিকার: শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে অবশ্যই গুরুজন, শিক্ষক, আচার্য এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করুন। এটি আপনার উপকারে আসবে।বৃশ্চিক রাশি: মন থেকে সমস্ত নেতিবাচক চিন্তাকে দূরে সরিয়ে রেখে প্রতিটি কাজ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করুন। আপনি যদি পরিবারের কোনও সদস্যের কাছ থেকে অর্থ ধার নিয়ে থাকেন সেক্ষেত্রে আজ সেই অর্থ আপনাকে ফেরত দিতে হবে। নাহলে, তিনি আপনার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন। এই রাশির কিছু অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের একটি বিশেষ কৃতিত্বের মাধ্যমে অত্যন্ত গর্বিত হবেন। আপনি আজ দীর্ঘক্ষণ হাঁটাহাঁটি করতে পছন্দ করবেন। কোনও গোপন সম্পর্ক আজ আপনার সুনাম বিনষ্ট করতে পারে। তাই, এদিক থেকে অবশ্যই সতর্ক থাকুন। প্রিয়জনদের সঙ্গে অবশ্যই কিছুটা সময় অতিবাহিত করুন। বিবাহিত জীবনে কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে নিজেরাই তা মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন।প্রতিকার: প্রেমের জীবন সুখকর করে তোলার লক্ষ্যে অবশ্যই দরিদ্র এবং অভাবী ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে ছোলা বিতরণ করুন। এটি আপনার উপকারে আসবে।ধনু রাশি: কোথাও কোনও সমস্যার সম্মুখীন হলে ঠান্ডা মাথায় সেটিকে সমাধানের চেষ্টা করুন। বাবা-মায়ের স্বাস্থ্যের কারণে আজ আপনার বিপুল অর্থব্যয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে। অতীতের একটি সুখের স্মৃতির আজ আপনি রোমন্থন করতে পারেন। আপনি আজ অবসর সময়ে একটি সৃজনশীল কাজ করার পরিকল্পনা করলেও কোনও কারণবশত তা সম্ভব হবে না। প্রেমের জন্য এই দিনটি নিঃসন্দেহে ভালো। আপনি আজ আপনার একটি গভীর অনুভূতি এবং দুঃখ নিকট বন্ধু বা আত্মীয়ের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন।প্রতিকার: শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে সবুজ রঙের পোশাক বেশি করে পরুন।মকর রাশি: বাড়ির কাজগুলি আজ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করুন। নাহলে, আপনি কোনও সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। এই রাশির কিছু অভিভাবক তাঁদের সন্তানদের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা অর্জন করবেন। যার ফলে তাঁরা অত্যন্ত গর্বিত হবেন। আপনি আজ বিপুল অর্থব্যয় করতে চাইবেন। পরিবারের সদস্য এবং বন্ধুদের সঙ্গে আপনি সময় অতিবাহিত করবেন। কোনও কাজে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনের জন্য অবশ্যই কঠোর পরিশ্রম করুন। জীবনসঙ্গীর সঙ্গে অবশ্যই কিছুটা সময় কাটান। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে অবশ্যই দরিদ্র এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঙ্গে নিজের খাবার ভাগ করে নিন। এটি আপনার উপকারে আসবে।কুম্ভ রাশি: শরীরের প্রতি অবশ্যই যত্নশীল হন এবং শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে কিছুটা বিশ্রাম গ্রহণ করুন। অযথা অর্থব্যয় থেকে বিরত থাকুন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দিনটি দুর্দান্তভাবে অতিবাহিত হবে। প্রেমের জীবনে আজ আপনি একটি চমকের সম্মুখীন হবেন। প্রত্যেকের সঙ্গে আজ অবশ্যই সংযত হয়ে কথা বলুন। কোথাও সফরের সময় আজ আপনার একজন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাক্ষাতের সম্ভাবনা রয়েছে। বিবাহিত জীবনে সুখ এবং শান্তি বজায় থাকবে।প্রতিকার: আর্থিক দিক থেকে উন্নতির লক্ষ্যে বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহার করুন।মীন রাশি: শরীরের প্রতি অবশ্যই যত্নশীল হন এবং শারীরিক দিক থেকে সুস্থ থাকার লক্ষ্যে নিজের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। অযথা অর্থব্যয় থেকে বিরত থাকুন। কোনও ভুল যোগাযোগের কারণে আপনি একটি সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। আপনি আজ অবসর সময়ে একটি বই পড়তে পারেন। প্রত্যেকের সঙ্গে ঠান্ডা মাথায় কথা বলুন। আপনি আজ এমন একটি রেস্তোরাঁয় যেতে পারেন যেখানে বিদেশি খাবার পাওয়া যায়। অর্ধাঙ্গিনীর কারণে আজ আপনি কোনও সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। আপনি আজ একটি পারিবারিক জমায়েতে অংশগ্রহণ করতে পারেন। আপনি আজ খুব সহজেই সবাইকে আকৃষ্ট করতে পারবেন।প্রতিকার: প্রেমের জীবন সুখকর করে তোলার লক্ষ্যে দুর্গা মন্দিরে প্রসাদ অর্পণ করুন।
পিএসএল ও আইপিএলে আজ দুটি করে ম্যাচ। রাতে আছে এফএ কাপের ম্যাচ, মুখোমুখি চেলসি ও লিডস।পিএসএলহায়দরাবাদ-রাওয়ালপিন্ডিবেলা ৩-৩০ মি., টি স্পোর্টসইসলামাবাদ-মুলতানরাত ৮টা, টি স্পোর্টসআইপিএলচেন্নাই-গুজরাটবিকেল ৪টা, স্টার স্পোর্টস ১, ২লক্ষ্ণৌ-কলকাতারাত ৮টা, স্টার স্পোর্টস ১, ২লা লিগাভায়েকানো-সোসিয়েদাদসন্ধ্যা ৬টা, বিগিন অ্যাপওভিয়েদো-এলচেরাত ৮-১৫ মি., বিগিন অ্যাপওসাসুনা-সেভিয়ারাত ১০-৩০ মি., বিগিন অ্যাপভিয়ারিয়াল-সেল্তা ভিগোরাত ১টা, বিগিন অ্যাপএফএ কাপচেলসি-লিডসরাত ৮টা, সনি স্পোর্টস ২সিরি আতুরিনো-ইন্টার মিলানরাত ১০টা, ডিএজেডএনএসি মিলান-জুভেন্টাসরাত ১২-৪৫ মি., ডিএজেডএন
Bhoot.com Episode 325 – রক্ত লাল আকাশের নিচে এক অশুভ উপস্থিতিহরর সিরিজ Bhoot.com আবারও ফিরেছে নতুন আতঙ্ক নিয়ে।Episode 325 এইবার দর্শকদের নিয়ে যায় এমন এক অন্ধকার জগতে, যেখানে আকাশ পর্যন্ত যেন ভয় ছড়িয়ে দিয়েছে। শুরুতেই অশুভ সংকেতএপিসোড শুরু হয় এক ভয়ংকর দৃশ্য দিয়ে—লাল রঙে ঢেকে যাওয়া আকাশ, চারপাশে কবর, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক রহস্যময় ছায়া।তার মুখ দেখা যায় না…কিন্তু তার উপস্থিতিই যেন ভয় ছড়িয়ে দেয় চারদিকে।অজানা শক্তির আগমনগল্প যত এগোয়, ততই পরিষ্কার হয়—এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।এই জায়গায় এমন কিছু আছে, যা মানুষের বাইরে।কবরের চারপাশে অদ্ভুত নড়াচড়া, বাতাসের হঠাৎ পরিবর্তন, আর দূরে শোনা যায় অজানা শব্দ…সব মিলিয়ে পরিবেশ হয়ে ওঠে ভয়ংকর।ভয় ও সাসপেন্সের খেলাEpisode 325-এর সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো এর tension build-up।প্রতিটি মুহূর্তে মনে হবে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।দর্শককে একদম শেষ পর্যন্ত ধরে রাখে এই এপিসোড।কেন এই এপিসোড শুনবেন?ইউনিক horror atmospherecinematic red lighting effectintense suspensemind-blowing twist endingবাস্তব নাকি কল্পনা?এই গল্প কি শুধুই বানানো?নাকি এর পেছনে আছে কোনো বাস্তব ঘটনার ছায়া?এই প্রশ্নই দর্শকদের মনে ভয় আর কৌতূহল দুটোই তৈরি করে।শেষ কথাBhoot.com Episode 325 শুধু একটি হরর এপিসোড নয়—এটি এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা, যা আপনাকে রাতের অন্ধকারে একা থাকতে ভয় পাইয়ে দেবে।...................................................................................................................................................................... ⬇ Download Now
পদ্মজার মৃদু আর্তনাদ শুনে আমিরের রক্ত ছলকে উঠে। সে দ্রুত তার শার্টের বুক পকেট থেকে লাইটার বের করে,আগুন জ্বালাল। হলুদ আলোয় পদ্মজার মুখখানা ভেসে উঠে। মাথা দুই হাতে ধরে রেখেছে। ভ্রুযুগল কুঁচকানো। আমির অস্পষ্ট কণ্ঠে উচ্চারণ করলো, ‘পদ্মজা!’সে পদ্মজাকে ছোঁয়ার জন্য হাত বাড়ায়। তখন পদ্মজা বললো, ‘দূরে সরুন।’পদ্মজার কণ্ঠে একটু তেজের আঁচ টের পাওয়া যায়। আমির কথা বাড়ালো না। সোজা লতিফার ঘরের দিকে গেল। লতিফা,রিনুকে ডেকে নিয়ে আসে। রিনুর হাতে হারিকেন। লতিফা,রিনু পদ্মজাকে উঠতে সাহায্য করে। পদ্মজার মাথা ফুলে গেছে। ভনভন করছে। পদ্মজা লতিফাকে ধরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠার চেষ্টা করে। শেষ ধাপে গিয়ে একবার পিছনে ফিরে তাকাল। হারিকেনের হলুদ আলোয় আমিরের জীর্ণশীর্ণ মুখটা দেখে পদ্মজার বুকটা হাহাকার করে উঠে। কোথায় ছুড়ির আঘাত পেয়েছে কে জানে! পদ্মজা দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। আমির রিনুকে বললো, ‘উপরে যা। লতিফা বুবুকে সাহায্য করিস।’রিনু নতজানু হয়ে ভয়ার্ত কণ্ঠে বললো, ‘তোমার ঘাড় দিয়া রক্ত আইতাছে ভাই।’আমির হাসলো। সিঁড়ি ভেঙে নামার সময় পা ফসকে যায়। আমির কুঁজো হতেই পদ্মজার আক্রমণ! এক জায়গায় বার বার আঘাত পেতে হচ্ছে! আমির রিনুকে বললো, ‘ঘাড়টা পঁচে যাওয়া বাকি! যা,উপরে যা।’আমির অন্দরমহলের বাইরে পা রেখে ঠান্ডা বাতাসে কেঁপে উঠে। শীতের প্রকোপ তীব্র! মাথায়,ঘাড়ে তীব্র ব্যাথা। ঠান্ডা বাতাসে আরো ভয়াবহ যন্ত্রনা হচ্ছে! সবকিছু ছাপিয়ে হৃদয়ের ব্যথাটা দ্বিগুণ আকারে বেড়ে চলেছে। পদ্মজার ঘৃণাভরা দৃষ্টি আমির আর নিতে পারছে না। প্রথম দিকের মতো শান্ত থাকা যাচ্ছে না। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সে পঙ্গু হওয়ার পথে। শরীরের রক্ত আর হৃদয়ের যুদ্ধ আমিরের শ্বাস-প্রশ্বাসে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। আমির নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করে। দুই হাতে চুল ঠিক করে অন্দরমহলের পিছন দিকে হেঁটে আসে। তিন-চারটে কুকুর দেখতে পেল। ভাঙা প্রাচীর দিয়ে হয়তো প্রবেশ করেছে। আমির কুকুরগুলোর দিকে এক ধ্যাণে তাকিয়ে থাকে। কুকুরগুলোও তাদের হিংস্র চোখ দিয়ে আমিরকে দেখছে। আমির দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো।রাতের নিস্তব্ধতায় সেই দীর্ঘশ্বাসের শব্দ দুরন্ত বাতাস ভাসিয়ে নিয়ে গেল অনেকদূর পর্যন্ত। বেওয়ারিশ কুকুরগুলো সেই শব্দ শুনে চমকে উঠল।নড়েচড়ে দূরে সরে গেল। আমির হেসে তাদের বললো, ‘ বুকের যন্ত্রনার এক অংশও দীর্ঘশ্বাসের সাথে বের হয়নি! আর এতেই ভয় পেয়ে গেলি তোরা?’একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠলো। আমির এগিয়ে যেতেই কুকুরগুলো ছুটে পালায়। আমির অপলক চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইলো। অকারণেই হাসলো। তারপর গভীর জঙ্গল পেরিয়ে পাতালঘরে প্রবেশ করে। রাফেদ আমিরকে দেখে আঁতকে উঠলো। বললো, ‘স্যার,কীভাবে হলো এসব?’আমির চেয়ার টেনে বসে বললো, ‘দ্রুত পরিষ্কার করো।’রাফেদ আমিরকে পরিষ্কার করে দিলো। আমির শার্ট পাল্টে পাঞ্জাবি পরলো। তার আর কোনো কাপড় এখানে নেই। সব অন্দরমহলে নিয়ে গিয়েছিল। সাদা পাঞ্জাবি রয়ে গেছে। পাঞ্জাবিটা পরতে গিয়ে মনে পড়ে পদ্মজার কথা। পদ্মজার সাদা রঙ পছন্দ। প্রতি শুক্রবারে আমির সাদা পাঞ্জাবি পরে জুম্মায় যেতো। জুম্মায় যাওয়ার পূর্বে পদ্মজা খুব যত্ন করে পাঞ্জাবির তিনটে বোতাম লাগিয়ে দিতো। লাগানো শেষে বলতো, ‘ আমার সুদর্শন স্বামী।’পদ্মজা যতবার এ কথা বলতো,ততবার আমির প্রাণখুলে হেসেছে। সে জানে না পদ্মজার চোখে সে কতোটা সুন্দর! কিন্তু পদ্মজার দৃষ্টি ছিল মুগ্ধকর! মুগ্ধ হয়ে সে আমিরকে দেখতো। আমির পাঞ্জাবির বোতামে চুমু দেয়। তখনই কানে বেজে উঠে, ‘ছুঁবেন না আমায়!,দূরে সরুন!,আমি আপনাকে ঘৃণা করি!’কথাগুলো তীরের মতো আঘাত হানে মস্তিষ্কে! আমির নিজের চুল খামচে ধরে। রাগে চিৎকার করতে করতে এওয়ানের পালঙ্কে লাথি দিতে থাকে। পালঙ্ক ভেঙে যায়। রাফেদ দৌড়ে আসে। কিন্তু আমিরকে ধরার সাহস হয় না। আমিরকে আর যে যাই ভাবুক! রাফেদ জানে,আমির পাগল। একটা সাইকো সে। যখন রেগে যায় সবকিছু তছনছ করে ফেলে। আমিরের এই রাগের স্বীকার যে মেয়ে হয়েছে,সে মেয়ে নিঃশ্বাসে,নিঃশ্বাসে নিজের মৃত্যু কামনা করেছে।রাফেদ দূরে দাঁড়িয়ে থাকে। সে মনে মনে,এই হিংস্র মানুষটার মৃত্যু কামনা করে। কত মেয়ে আমিরকে বাবা,ভাই ডেকেছে ছেড়ে দেয়ার জন্য। আমির ছাড়েনি। মুখের উপর লাথি দিয়ে ছুঁড়ে ফেলেছে মেঝেতে। রাফেদ বাধ্য হয়ে এই জগতে প্রবেশ করেছে। অর্থের অভাবে! ভাবেনি,এতোটা পাশবিক, নির্মম এরা! কিন্তু আর বের হওয়ার উপায় ছিল না। বের হতে চাইলেই,মৃত্যু অনিবার্য। তাই সে এই নৃশংসতার সাথে তাল মিলিয়েছে। পরিবারের দুর্দশা তাকে জ্ঞানহীন করে দিয়েছিল। এক কথায় গ্রহণ করে নিয়েছিল এই পথ! যখন একেকটা মেয়ের কান্না সে শুনে, মনে হয় তার বোন কাঁদছে,আকুতি করছে! প্রথম প্রথম সেও কান্না করতো। এখন মানিয়ে নিয়েছে। কিন্তু মনের কোণে মুক্তির আশা এখনো আছে। তলোয়ারের আঘাতের চেয়েও ধারালো কাছের মানুষের দেয়া আঘাত! যেদিন রাফেদ বুঝতে পেরেছে আমিরের দূর্বলতা পদ্মজা,সেদিন থেকে সে দোয়া করছে, আমির যেন এই দূর্বলতার ভার সহ্য করতে না পেরে দূর্বল হয়ে পড়ে। হাঁটুগেড়ে পড়ে যায় মাটিতে। নিঃস্ব হয়ে যেন দিকদিশা হারিয়ে ফেলে। আমিরের ছটফটানি, অস্থিরতা রাফেদের মনে আনন্দের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। আমির শান্ত হয়! রাফেদকে বললো, ‘পানি আনো।’রাফেদ পানি নিয়ে আসে। আমির পানি পান করে ধ রক্তে এসে প্রবেশ করে। বিথ্রিতে আমির পা রাখতেই মেয়েগুলোর চোখেমুখে স্পষ্ট ভয় জমে। রাফেদ চেয়ার নিয়ে আসে। আমির চেয়ারে বসলো না। মেয়েগুলোকে দেখে বেরিয়ে আসলো। বিওয়ানে গেল। সেখানে একটা মেয়েও নেই! শুকনো রক্ত পড়ে আছে। সবকয়টি মেয়ে কুরবান হয়ে গেছে। নদীর স্রোতে ভেসে গেছে। এই ঘরের দেয়ালে দেয়ালে শত শত মেয়ের আর্তনাদ বাজে। আমির পুরো ঘরটা ঘুরে ঘুরে দেখলো। বিশ বছর আগে সে এই পাতালঘরে প্রথমবার এসেছিল। তখন তার বয়স পনেরো। তার বয়সী একটা মেয়েকে সে প্রথম আঘাত করেছিল এই ঘরেই! মেয়েটা আমিরের পায়ে ধরে মুক্তি ভিক্ষা চায়। আমির মুখের উপর লাথি মারে। সঙ্গে,সঙ্গে মেয়েটার নাক,মুখ ফেটে রক্ত বেরিয়ে আসে। মনে পড়তেই আমিরের শরীরটা কেমন করে উঠে। তার ভেতরে অদৃশ্য কী যেন প্রবেশ করছে! ভেতরটা খুঁড়ে, খুঁড়ে খেয়ে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। এক কোণে সুন্দর নকশায় তৈরি করা,সিংহাসনের মতো চেয়ার রয়েছে। আমির সেখানে বসলো। এই চেয়ারে বসে কত নগ্ন মেয়ের, তীব্র যন্ত্রনার আর্তনাদ সে উপভোগ করেছে! আমির এক হাতে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুজে। চোখের পর্দায় পদ্মজার রাজত্ব! তাদের ঢাকার বাড়িতে কোনো এক বর্ষায়,পদ্মজা তার শাড়ি দুই হাতে গোড়ালির উপর তুলে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। পিছনে ধাওয়া করেছে,আমির। পদ্মজার কলকল হাসিতে যেন পুরো বাড়ি নৃত্য করছিল। বাইরে ঝমঝম বৃষ্টি! কী অপূর্ব সেই মুহূর্ত। আমির চোখ খুলে ছাদের দিকে তাকায়। তারপর রাফেদকে ডাকলো, ‘রাফেদ?’রাফেদ দৌড়ে আসে। আমির রাফেদকে মিনিট তিনেক সময় নিয়ে দেখলো। তার চোখের দৃষ্টি শীতল। রাফেদের বুক দুরুদুরু করছে। আমির বললো, ‘কেমন আছো?’রাফেদ চমকে যায়। সে হতভম্ব। বেশ খানিক সময় নিয়ে উত্তর দিল, ‘ ভালো স্যার।’‘তোমার বোনের ছেলে হয়েছিল নাকি মেয়ে?’রাফেদের মনে হচ্ছে,তার কলিজা এখুনি ফেটে যাবে। তার চোখ দুটি মারবেলের মতো গোল,গোল হয়ে যায়। সে কণ্ঠে বিস্ময়তা নিয়ে বললো, ‘ছেলে-মেয়ে দুটোই।’‘জমজ?’‘জি,স্যার।’‘তুমি মুক্তি চাও?’রাফেদ বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে। আমির বললো, ‘ যদি চাও,তাহলে আজ থেকে তুমি মুক্ত।’রাফেদের মাথায় যেন আসমান ভেঙে পড়ে। সে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়লো। অস্থির হয়ে পড়ে। তার অনুভূতি এলোমেলো হয়ে যায়। সে আমিরের দুই পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিল। বললো, ‘স্যার,স্যার আমি মারা যাচ্ছি।’আমির আদেশের স্বরে বললো, ‘পা ছাড়ো রাফেদ। ত্রিশ মিনিটের মধ্যে জায়গা না ছাড়লে,আর যেতে পারবে না।’রাফেদ ঝরঝর করে কাঁদতে থাকল। যেন পাহাড় ভেঙে ঝর্ণার পানি ঝরছে। আমির বললো, ‘উঠো তারপর দৌড়াও।’রাফেদ দ্রুত উঠে দাঁড়ালো। সে তার ব্যাগ গুছিয়ে দ্রুত এই অন্ধকার ছেড়ে হারিয়ে যায়, আলোর সন্ধানে। আমিরের বুকটা খাঁখাঁ করছে। রাফেদের চোখেমুখে মুক্তির যেই আনন্দ সে দেখেছে,সেই আনন্দের তৃষ্ণায় তার কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে। কবে এই তৃষ্ণা মিটবে? কবে?আমিরের বুকে জ্বালাপোড়া শুরু হয়,মনে হচ্ছে কোনো ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসছে। যে ঘূর্ণিঝড় চোখের পলকে সব লণ্ডভণ্ড করে,স্তব্ধ করে দিবে।.লতিফা,রিনু চলে যেতেই পদ্মজা বিছানা ছেড়ে টেবিলে বসলো। হাতে তুলে নিলো কলম-প্রিয়তম,আমার প্রতিটি রজনী যেন বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। আমি আপনাকে ভুলে যেতে চাই। কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না! বিছানার চাদরে আপনার শরীরের ঘ্রাণ। শরীরের প্রতিটি লোমকূপ বার বার জানান দেয়,তারা আপনাকে ভালোবাসে। আমার অস্তিত্বের পুরোটা জুড়ে আপনার বিচরণ। বুকের ভেতরটা দগ্ধ হয়ে খানখান। আপনার উন্মুক্ত বুকের সাথে চেপে ধরে বলেছিলেন, আপনার তেঁতো জীবনের মিষ্টি আমি। আপনার মুখে ছিলহাজার,হাজার শুকরিয়া।অথচ,এই সময়ে এসে আপনি আপনার তেঁতো জীবনটা বেছে নিয়েছেন। ছুঁড়ে ফেলেছেন আমাকে! এ কোন গভীর সমুদ্রের অতলে আমাকে ছুঁড়ে দিলেন? আপনার পাপের শাস্তি কেন আমি পাচ্ছি? আবেগ-বিবেকের যুদ্ধে আমি বার বার আহত হয়ে পিছিয়ে যাচ্ছি। নিজের সবটুকু আপনার নামে দলিল করে দিয়ে,আমি ভুল করেছি। এখনো আপনার শরীরের একেকটা আঘাত আমাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। কিন্তু আমি আপনাকে আঘাত করতে চাই। আমার ভেতরের জ্বলন্ত আগুন নেভাতে, আপনার এবং আপনার দলের প্রতিটি নরপশুর রক্তের ভীষণ প্রয়োজন!——এতটুকু লিখে পদ্মজা থামলো। তার দুই চোখ বেয়ে জল পড়ছে। আর লেখার শক্তি পাচ্ছে না। ডায়রির পৃষ্ঠাটি ছিঁড়ে, দিয়াশলাইয়ের আগুনে জ্বালিয়ে দিলো। আলমারি খুলে আমিরের দেয়া তলোয়ারটি হাতে নিল। তলোয়ারের দিকে দৃষ্টি রেখে বললো, ‘আপনার বুকের হৃদয়ে আমি আজীবন রানি হয়ে থাকতে চেয়েছিলাম। সেই বুকে আমি কী করে আঘাত করব?’শেষ কথাটি বলার সময় পদ্মজার দুই চোখ বেয়ে নোনাজল নামে। সে তলোয়ার মেঝেতে রেখে,বিছানায় আছড়ে পড়ে কাঁদতে থাকলো। আমির যে পাশে সবসময় শুতো,সে জায়গাটা জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে। কিন্তু হায়! কোথায় মানুষটার উষ্ণ বুক? যে বুকে মুখ গুঁজে পদ্মজা তার সব কষ্ট ভুলে যেত!
রবিবার। তীব্র শীতের সকাল। সময় তখন আটটা। বাড়িজুড়ে সবার ছোটাছুটি। পদ্মজা বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করছে। সে পাতালঘরের চাবি খুঁজছে। হাতে সময় নেই। আজ রাতের মধ্যে জীবন বাজি রেখে হলেও কিছু করতে হবে। আলগ ঘরের সামনে খলিল দাঁড়িয়ে রয়েছেন। মাথায় উলের টুপি। লম্বা গোঁফ। মগাকে ধমকে কাজ বুঝাচ্ছেন। চারিদিকে উৎসব উৎসব আমেজ! দুপুরের নামাযের পর স্কুলের মাঠে সমাবেশ। আলগ ঘরে এবং বাইরে শত-শত কম্বল আর শীতবস্ত্র। হাওলাদাররা হারাম টাকায় লোক দেখানো নাটক করতে চলেছে! পদ্মজা মনে মনে ব্যঙ্গ করে হাসলো। রিদওয়ান অন্দরমহল থেকে বের হয়ে খলিলের পাশে এসে দাঁড়াল। তার পরনে কালো রঙের পাঞ্জাবি। গায়ের রঙ ফর্সা। তাই কালো রঙের পাঞ্জাবিতে সুদর্শন দেখাচ্ছে। পদ্মজা লতিফার কাছে শুনেছে,কয়দিনের মধ্যে নাকি রিদওয়ানের বিয়ে! কার সাথে বিয়ে কেউ জানে না। তবে এটা নিশ্চিত, কোনো অভাগীর জীবন দুর্বিষহ হতে চলেছে! রিদওয়ান, খলিল কী বিষয়ে কথা বলছে তা পদ্মজার কানে আসার কথা নয়। তবুও সে সেদিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর সেখানে উপস্থিত হয় আমির। আমির এদিক-ওদিক দেখে খলিলকে বললো, ‘আমি বেরিয়ে যাচ্ছি। ফিরতে আগামীকাল ভোর হয়ে যাবে। আবারো বলে যাচ্ছি, পদ্মজার গায়ে হাত তো দূরে থাক,কারো চোখও যেন না পড়ে।’রিদওয়ান নির্বিকার কণ্ঠে বললো, ‘তোর দুই চামচারে বলে যা,পদ্মজার উপর ভালো করে খেয়াল রাখতে। পাতালে তো কোনো মেয়ে নাই। তাই চিন্তাও নাই। তবে,কাউকে যেন কিছু না বলে। আর আমাদের উপর তেড়ে না আসে।’‘তেড়ে আসলেও কিছু বলবি না। সুন্দর করে সামলাবি।’রিদওয়ান তীব্র বিরক্তি নিয়ে বললো, ‘ধুর! এই মাইয়ারে কতদিন এভাবে রাখবি? হুদাই ভেজাল।’আমির রেগে রিদওয়ানের দিকে এক পা বাড়ালো। খলিল পরিস্থিতি পাল্টাতে দ্রুত রিদওয়ানের বুকে ধাক্কা দিয়ে বললো, ‘যা কইতাছে হুন। বাবু তুই যা,তোর বউরে কেউ কিচ্ছু করব না।’আমির রিদওয়ানের চোখের দিকে তাকালো। চোখের দৃষ্টি দিয়ে সে রিদওয়ানকে সাবধান করে দিল। তারপর জায়গা ছাড়ল। অন্দরমহলে ঢোকার পূর্বে চোখ পড়ে দ্বিতীয় তলার বারান্দায়। পাংশুটে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে পদ্মজা। এক মুহূর্তের জন্য হলেও ভেতরের অনুভূতিগুলো পাল্টে যায়। সে দৃষ্টি সরিয়ে দ্রুত অন্দরমহলে প্রবেশ করলো। পদ্মজা ঠায় সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। আমির ঘরে এসে শার্ট,জ্যাকেট খুলে গোসলখানায় ঢুকে। তাকে ঢাকা যেতে হবে। হাতে সময় আছে, তবুও সে আজই মেয়েগুলোকে সরিয়ে দিচ্ছে। সে নিশ্চিত, পদ্মজা চেষ্টা করবে মেয়েগুলোকে বাঁচাতে। আবার মুখোমুখি হতে হবে দুজনকে। একত্রিশটা মেয়ে যোগাড় হয়ে গেছে যখন আর রাখার মানে নেই। সে ঝুঁকি নিতে চায় না। পদ্মজা কী মনে করে দ্রুতপায়ে ঘরে আসলো। বিছানায় আমিরের শার্ট দেখে বুঝতে পারে আমির গোসলখানায় আছে। তাৎক্ষণিক পদ্মজা ভাবলো,আমিরের শার্টের পকেটে তল্লাশি চালাবে। যদি চাবি পাওয়া যায়! যেমন ভাবা তেমন কাজ।চাবির কথা মনে পড়তেই আমির গোসলখানার দরজা খুললো। পদ্মজা শার্টের পকেটে একটা চাবি খুঁজে পায়। তার মুখে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। পুরোটা দৃশ্য আমিরের চোখে পড়ে। সে দরজা বন্ধ করে দেয়। পদ্মজার হাত থেকে চাবি ছিনিয়ে নেয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই তার। এই চাবি আর পদ্মজার কাজে লাগবে না! সে পাতালঘরে গিয়ে কিছু খুঁজে পাবে না। আমির নিশ্চিন্তে গোসল শেষ করলো। পদ্মজা চাবি নিয়ে রান্নাঘরে চলে আসে। সেখানে লতিফা, রিনু,আমিনা সহ আরো তিন-চারজন রান্না করছে। সমাবেশ শেষে আলগ ঘরে ভোজ আয়োজন হবে,তারই প্রস্তুতি চলছে। খলিল হাওলাদারের দুই মেয়ে শাহানা,শিরিনও আজ আসবে। পদ্মজা কাজ করার বাহানায় লতিফার কাছে গিয়ে বসলো। লতিফা পদ্মজাকে দেখে হাসলো তারপর কাজে মন দিল। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর পদ্মজা সুযোগ বুঝে লতিফাকে ফিসফিসিয়ে বললো, ‘উনি বেরিয়ে গেলে আমাকে বের হতে সাহায্য করো বুবু।’লতিফা চোখ বড় বড় করে তাকায়। চাপাস্বরে প্রশ্ন করে, ‘কই যাইবা?’পদ্মজা পিছনে ফিরে তাকায়। আমিনা থালাবাসন পরিষ্কার করছেন। পদ্মজা আমিনার দিকে তাকিয়ে হাসলো। তারপর লতিফাকে বললো, ‘ পাতালে যাবো।’লতিফার হাত থেকে চামচ পড়ে যায়। ঝনঝন শব্দ হয়। শব্দ শুনে উপস্থিত সবাই উৎসুক হয়ে তাকায়। লতিফা দ্রুত চামচ তুলে নিলো। সবার দিকে চেয়ে হাসি বিনিময় করে পদ্মজাকে চাপাস্বরে বললো, ‘ চাবি কই পাইবা?’পদ্মজা বললো, ‘পেয়ে গেছি। তুমি শুধু সুযোগ করে দাও।’লতিফার চোখেমুখে ভয় বাসা বাঁধে,যা স্পষ্ট। সে ভয় পাচ্ছে,আমির জেনে গেলে তার জীবন শেষ! পদ্মজা সবাইকে আরো একবার এক নজর দেখে নিয়ে লতিফাকে বললো, ‘ভালো কাজের জন্য জীবন উৎসর্গ করা সম্মানের বুবু।’লতিফা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলো। সে রাজি। পদ্মজা তার ঘরে ফিরে আসে। সিঁড়ি দিয়ে উঠার সময় আমির নিচে নামছিল। দুজন কেউ কারোর দিকে তাকায়নি। যেন কেউ কাউকে চিনে না। পদ্মজা ঘরে প্রবেশ করে দ্রুত দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপর হাতে তুলে নিল ছুরি।লতিফা আলগ ঘরে গিয়ে খোঁজ নেয়। আমির,মজিদ,রিদওয়ান কেউ বাড়িতে নেই। খলিল আলগ ঘরের বারান্দায় তিন জন লোকের সাথে কোনো বিষয়ে আলোচনা করছে।লতিফা দ্রুত এসে পদ্মজাকে পরিস্থিতি জানায়। পরিস্থিতি গুছানো। এবার পদ্মজার পিছনে আঠার মতো লেগে থাকা দুজন লোককে সরানোর পালা। পদ্মজা আবার রান্নাঘরে আসে। দুজন লোক সদর ঘরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের উপস্থিতি দেখে কেউ ভাববে না, এরা কাউকে নজরে রাখার জন্য পিছু,পিছু ঘুরে! পদ্মজা লতিফাকে ইশারা করতেই,লতিফা দুজন লোককে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘আপনেরা খাইবেন না?’তারা সত্যি অনেক ক্ষুধার্ত। আবার রান্নাঘর থেকে মাংসের ঘ্রাণ আসছে। সেই ঘ্রাণে ক্ষিধে যেন বেড়ে যাচ্ছে। দুজন সম্মতি জানায়,তারা খাবে। লতিফা চোখের ইশারায় পদ্মজাকে বেরিয়ে যেতে বলে। তারপর দুজন লোককে খেতে দিল। দুজন ক্ষুধার্ত পাহারাদার কব্জি ডুবিয়ে খেতে থাকে। পদ্মজা তাদের অগোচরে বেরিয়ে পড়ে। বাইরের চারপাশ দেখে দ্রুত জঙ্গলে ছুটে আসে। জঙ্গলের পথ তার চেনা। তাই পাতালঘরের কাছে আসতে বেশি সময় লাগেনি। আল্লাহর নাম নিয়ে সে পাতালে প্রবেশ করে। তার হাতের চাবি প্রবেশদ্বার খুলতে সক্ষম হয়।পদ্মজা এক হাতে শক্ত করে ধরে ছুরি। ধ-রক্ত ও স্বাগতম দরজার মাঝ বরাবর এসে সে থমকে যায়। কেউ নেই! সবকিছু চুপচাপ,নির্জন। সে এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তার পাশের দেয়ালে চাবুক ছিল। তাও নেই! পদ্মজা থম মেরে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। মেয়েগুলো আছে তো? প্রশ্নটা মাথায় আসতেই, পদ্মজার বুকে ধড়াস করে কিছু যেন পড়ে। সে দৌড়ে ধ-রক্তে প্রবেশ করলো। উন্মাদের মতো প্রতিটি ঘর দেখলো। কেউ নেই! তার শরীর বেয়ে ঘাম ছুটে। ধ-রক্তের কোথাও কোনো চাবুক,ছুরি,রাম দা,কুড়াল কিছু নেই! এখানে যে অনাচার-ব্যভিচার হতো তার কোনো প্রমাণই নেই। পদ্মজা স্বাগতম দরজা পেরিয়ে সবকটি ঘরে তন্নতন্ন করে অসহায় মেয়েগুলোকে খুঁজে। কিন্তু কোথাও কেউ নেই। যখন নিশ্চিত হলো,এখানে কেউ নেই,তার হাত থেকে ছুরি পড়ে যায়। দুই হাতে মাথা চেপে ধরে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ে। চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে। আমির তার চোখে ধুলো দিয়ে প্রতিটি মেয়েকে সরিয়ে দিয়েছে। পদ্মজার তীব্র যন্ত্রণা হতে থাকে। সে মেয়েগুলোকে বাঁচাতে পারেনি। আফসোস আর আত্মগ্লানি তাকে চেপে ধরে। মেয়েগুলোর ছটফটানি,বাঁচার অনুরোধ কানে বাজতে থাকে। দাঁতে দাঁত চেপে বসে থাকে পদ্মজা। তার মনে হচ্ছে,তার মাথায় অনেক ভারি একটা বোঝা। নিজের প্রতি খুব রাগ হয়। সে কাঁদতে থাকলো। শাড়ি খামচে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললো, ‘আমি পারিনি! আমি এই ব্যর্থতা কোথায় লুকাবো আল্লাহ!’পদ্মজার কান্না দেয়ালে দেয়ালে বারি খেয়ে পুরো পাতালপুরীতে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।সমাবেশে বাড়ির মেয়ে-বউদের যাওয়া আবশ্যক। এটা হাওলাদার বংশের আরেক রীতি। পরিবারের সবাই সেখানে উপস্থিত থাকবে। শাহানা,শিরিন তৈরি। তারা নিচ তলায় অপেক্ষা করছে। পদ্মজা তার ঘরে স্তব্ধ হয়ে পালঙ্কে বসে আছে। লতিফা হন্তদন্ত হয়ে ঘরে প্রবেশ করলো। বললো, ‘ও পদ্ম,বোরকা পিন্দো নাই ক্যান? জলদি করো।’পদ্মজা লতিফার দিকে তাকালো। তার চোখের চারপাশ লাল। চোখে ফোলা ফোলা ভাব। সে আত্মগ্লানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। বার বার মনে হচ্ছে, সে চাইলে পারতো মেয়েগুলোকে বাঁচাতে। সুযোগ ছিল। সত্যিকার অর্থে, তার সুযোগ ছিল না। পেছনের প্রতিটি নিঃশ্বাস সাক্ষী,সে প্রতি মুহূর্তে মেয়েগুলোর কথা ভেবেছে। আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। হন্ন হয়ে চাবি খুঁজেছে। ভেবেছিল,আরো দুই-তিন হাতে আছে। আমির এতো দ্রুত একত্রিশটা মেয়ে অপহরণ করে ঢাকা নিয়ে চলে যাবে সে ভাবেনি! ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি। ভাবলেও কাজ হতো না! কিন্তু এসব কিছুই পদ্মজার মাথায় আসছে না। সে সমানতালে নিজেকে দোষী ভেবে যাচ্ছে। মানসিক যন্ত্রনায় হারিয়ে যাচ্ছে অন্য জগতে। রিদওয়ান ঘরে এসে উঁচু গলায় বললো, ‘কি হলো? পদ্মজা এখনো তৈরি হয়নি কেন? আমাদের তো বের হতে হবে।’পদ্মজার আচমকা মনে হলো,আমির মেয়েগুলোকে আজ রাতটা গোডাউনে অথবা অফিসে রাখতে পারে। আর নয়তো বাসায়। এর মধ্যে যদি কিছু করা যায়! কিন্তু কার সাহায্য নিবে সে? এখানে ঢাকার কে আছে? সেকেন্ড তিনেক ভাবার পর তার মাথায় লিখনের নাম আসে। লিখন চাইলে আমিরকে থামাতে পারবে। অবশ্যই পারবে! এতে আমিরের সম্পর্কে সব জেনে যাবে লিখন। বলি হবে আমির! এটা ভাবতে পদ্মজার কষ্ট হয়। সে ঢোক গিলে নিজের আবেগ,অনুভূতি সামলায়। সে আমিরকে মনে মনে বলি দিল। এখন লিখনই একমাত্র আশা। শুনেছে,শুটিং এখনো চলছে। পদ্মজা সিদ্ধান্ত নেয়,সে যেভাবেই হউক লিখনের সাথে আজ যোগাযোগ করবে। রিদওনের দিকে আগুন দৃষ্টি নিক্ষেপ করে পদ্মজা বললো, ‘আসছি।’রিদওয়ান তাড়া দিয়ে বললো, ‘জলদি।’তারপর বেরিয়ে গেল। রিদওয়ান বের হতেই পদ্মজা বিড়বিড় করলো, ‘বেজন্মা!’তারপর দ্রুত বোরকা,নিকাব পরে নিল।.মৃদুল তার মা-বাবাকে নিয়ে হাওলাদার বাড়িতে পা রাখে। তার বুকের গোপন কুঠুরিতে থাকা হৃদয়টা খুশিতে নৃত্য করছে। যখন সে তার মা বাবাকে বললো,সে বিয়ে করতে চায়। আর মেয়েও পছন্দ করেছে। তখনি তার মা-বাবা দুজনই খুশিতে আটখানা হয়ে যায়। মিয়া বাড়ির সবাই খুশিতে ভোজ আয়োজন করে। তাদের আদরের দুলাল মৃদুল। মৃদুল এতদিন অলন্দপুরে ছিল বলে,তার মা জুলেখা বানু অসুস্থ হয়ে পড়ে। ছয় বিঘা ভূমির উপর কাঠের বাড়ি আর নব্বই বিঘা জমির একমাত্র উত্তরাধিকারী মৃদুল! তার অনুপস্থিতিতে বাড়ির প্রতিটি মানুষ মৃতের মতো হয়ে গিয়েছিল। এমতাবস্থায়,মৃদুলের বিয়ের সিদ্ধান্ত তাদের মাঝে ঈদের আনন্দ নিয়ে এসেছে। তাই এতো দ্রুত তাদের আগমন। মৃদুলের বাবা গফুর মিয়ার মাথায় টুপি,গায়ে দামী পাঞ্জাবি। শরীর থেকে আতরের ঘ্রাণ ভেসে আসছে। জুলেখা নিকাব তুলে মৃদুলকে বললেন, ‘ বাড়িত কী কেউ নাই?’মৃদুল জুলেখাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে বললো, ‘অন্দরমহলে গেলেই মানুষ পাইবেন। একটু ধৈর্য্য ধরেন আম্মা।’জুলেখা বানু কপাল কুঁচকালেন। তিনি স্বাস্থ্যবান একজন মহিলা। বাচাল প্রকৃতির মানুষ। রূপ এবং সম্পদ নিয়ে অহংকারের শেষ নেই। তিনি সরু চোখে চারপাশ দেখতে দেখতে অন্দরমহলে আসেন। অন্দরমহলের সামনে রিনু ছিল। রিনু মৃদুলকে দেখে দাঁত বের করে হাসলো। এগিয়ে এসে বললো, ‘মৃদুল ভাইজান আইয়া পড়ছেন?’‘হ আইছি,দেখা যাইতাছে না?’রিনু বোকার মতো হাসে। জুলেখা বানু আর গফুর মিয়ার পা ছুঁয়ে সালাম করে। মৃদুল বললো, ‘ফুফিআম্মা ঘরে আছে?’‘না ভাইজান। বাড়ির সবাই স্কুলঘরে গেছে।’মৃদুলের পূর্বে জুলেখা প্রশ্ন করলেন, ‘কেরে? ওইহানে কী দরহার(দরকার)?’রিনু বিস্তারিত বললো। গফুর মিয়া সন্তুষ্টির সাথে বললেন, ‘মনডা জুরায়া গেলো। হাওলাদার বাড়ির আত্মীয় যে হইবো হেরই সাত জন্মের কপাল।’গফুরের প্রশংসা জুলেখা বানুর ভালো লাগেনি। অন্যের প্রশংসা তিনি সহ্য করতে পারেন না। হাতের ব্যাগটা রিনুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ঝাঁঝালো স্বরে বললেন, ‘এই ছেড়ি,ধরো ব্যাগডা।’রিনু হাত বাড়িয়ে ব্যাগ নিল। জুলেখা বানু বললেন, ‘আমরা কোন ঘরে থাকমু? লইয়া যাও।’‘আপনেরা আলগ ঘরে থাকবেন।’ বললো রিনু।জুলেখা পিছনে ফিরে আলগ ঘরের দিকে ইশারা করে বললেন, ‘এই টিনের ঘরডাত?’জুলেখার প্রশ্নে অবজ্ঞা। তিনি টিনের ঘরে থাকতে আগ্রহী নয় বুঝাই যাচ্ছে। রিনু কিছু বললো না। মৃদুল জুলেখাকে আদুরে স্বরে বললো, ‘আম্মা,কম কথা কন। আমরা মেহমান।’রিনু জুলেখার কথাবার্তায় বুঝে গেছে,এই মহিলা কোন প্রকৃতির। সে মনে মনে ভাবে,পূর্ণার কপালে ঝাটা আছে! জুলেখা আলগ ঘরে থাকবে না,এটা নিশ্চিত। রিনু জুলেখাকে অন্দরমহলে নিয়ে আসে। রানি-লাবণ্যর খালি ঘরটা দেখিয়ে বললো, ‘এই ঘরে থাকবেন।’জুলেখা ব্যাগপত্র রেখে বিছানায় টান,টান হয়ে শুয়ে পড়ে। হাত-পা ম্যাজম্যাজ করছে। একবার ভাবলেন,রিনুকে বলবেন পা টিপে দিতে। কী মনে করে যেন বললেন না। মৃদুল গফুর মিয়াকে বললো, ‘আব্বা,আমি গোসল কইরা,খাওয়াদাওয়া কইরা স্কুলঘরে যাইতাছি। আপনি যাইবেন?’‘হ যামু। মহৎ কাজ নিজের চোক্ষে দেখাও ভাগ্যরে বাপ।’মৃদুল জুলেখার উদ্দেশ্যে বললো, ‘আম্মা,আপনি যাইবেন?’জুলেখা ক্লান্ত। তিনি মিনমিনিয়ে বললেন, ‘না আব্বা,আমি যামু না।’মৃদুল ব্যাগ থেকে লুঙ্গি,গামছা বের করলো। জুলেখা উঠে বসেন। রিনুকে ডেকে বললেন, ‘এই ছেড়ি,কলডা কোনদিকে? আমারে দেহায়া দেও।’জুলেখা আদেশ করলো নাকি হুমকি দিলো রিনু বুঝতে পারছে না। সে চুপচাপ জুলেখাকে নিয়ে কলপাড়ে গেল। লতিফা থাকলে ভালো হতো। নতুন কোনো মেহমান এসে তেড়িবেড়ি করলে লতিফা শায়েস্তা করতে পারে!মাথার উপর সূর্য। মাঠভর্তি মানুষ। একপাশে মহিলা ও বাচ্চারা,অন্যপাশে পুরুষরা। শৃঙ্খলা বজায় রাখছে রিদওয়ান। উপর থেকে দেখলে,রিদওয়ান একজন মহৎ, ভদ্র,শান্ত ব্যাক্তি। যাকে সবমসময় দেখা যায় না। সবাই জানে,রিদওয়ান জ্ঞানী মানুষ। সারাক্ষণ বইপত্র নিয়ে থাকে। তাই তার দেখা পাওয়া যায় না। ভেতরে খবর যদি নিষ্পাপ মনের মানুষগুলো জানতো! হায় আফসোস! উপস্থিত প্রতিটি মানুষ খুব খুশি। এত এত মানুষকে শীতবস্ত্র দেয়া কম কথা নয়! সে কাজটা যখন হাওলাদার বাড়ির মানুষেরা করে,সবার কাছে তখন তারা ফেরেশতা হয়ে উঠে। ফেরেশতার সাথে তুলনা করা হয়। মজিদ হাওলাদার ও খলিল হাওলাদার শীতবস্ত্র বিতরণ করছেন। পদ্মজা একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। পদ্মজার সাথে আঠার মতো লেগে আছে দুটি লোক। দুজন দুই দিকে দাঁড়ানো। তাদের চোখ সর্বক্ষণ পদ্মজার উপর। পদ্মজার চোখ দুটি লিখনকে খুঁজছে। লিখন এখানে আসবে নাকি সে জানে না। তবে প্রার্থনা করছে,সে যেন আসে। আজ তার উপস্থিতি অনেকগুলো মেয়েকে বাঁচাতে পারে। লিখন নিঃসন্দেহে একজন ভালো মানুষ। সবকিছু শোনার পর সে কোনো ব্যবস্থা অবশ্যই নিবে।লিখন ভীড় ঠেলে প্রান্তর পাশে এসে দাঁড়ালো। প্রান্ত লিখনকে দেখে অবাক হলো। তারপর হেসে করমর্দন করলো। বললো, ‘কেমন আছেন ভাইয়া?’‘ভালো,তুমি কেমন আছো?’‘ভালো ভাইয়া।’‘পূর্ণা,প্রেমা আসেনি?’‘আসছে। ওদিকে আছে।’ প্রান্ত স্কুলের ডানদিকে ইশারা করে বললো।তৃধা লিখনকে প্রশ্ন করলো, ‘কে ও? ‘লিখন চাপাস্বরে বললো, ‘পদ্মজার ভাই।’তৃধা তাৎক্ষণিক প্রান্তকে প্রশ্ন করলো, ‘তোমার পদ্মজা আপা কোথায়?’প্রান্ত সোজা আঙুল তাক করে বললো, ‘ ওইযে।’তৃধা চোখ ছোট,ছোট করে সেদিকে তাকায়। প্রান্তকে আবার প্রশ্ন করে, ‘সবার তো মুখ ঢাকা। পদ্মজা কে?’প্রান্তের আগে লিখন বললো, ‘লম্বা মেয়েটা।’তৃধা আড়চোখে লিখনের দিকে তাকালো। বললো, ‘মুখ না দেখে চিনলে কী করে?’‘জানি না, মনে হলো। প্রান্ত ঠিক বলেছি?’প্রান্ত হেসে সম্মতিসূচক মাথা নাড়াল। তৃধার খুব মন খারাপ হয়। প্রান্ত বললো, ‘ভাইয়া,আপা আপনাকে খুঁজছিল।’‘কোন আপা?’‘পদ্মজা আপা।’মুহূর্তে লিখনের কী হয়ে যায়,সে নিজেও জানে না। তার বুকে অপ্রতিরোধ্য তুফান শুরু হয়! পদ্মজা তাকে খুঁজছে! এ যে অসম্ভব! লিখন চকিতে পদ্মজার দিকে তাকালো। পদ্মজার মুখ দেখা যাচ্ছে না। হাত-পা ঢাকা। তবুও মনে হচ্ছে,সে পদ্মজাকে দেখতে পাচ্ছে। ছয় বছর পূর্বে পদ্মজাকে যে রূপে প্রথম দেখেছিল। সে দৃশ্য ভেসে উঠে। তাদের প্রথম কথা! টমেটো আছে নাকি জিজ্ঞাসা করা! কত সুন্দর সেই মুহূর্ত।লিখন পদ্মজার কাছে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। লিখনের চোখেমুখে আনন্দ স্পষ্ট! পদ্মজা খুঁজছে শুনে এতোই আনন্দিত হয়েছে মানুষটা! ব্যাপারটা তৃধাকে কষ্ট দিচ্ছে। তার বুকে চিনচিন ব্যাথা শুরু হয়।শাহানার অনেকক্ষণ ধরে মাথা ঘুরাচ্ছে। সে বেশি মানুষের মাঝে থাকতে পারে না। শরীর দূর্বল লাগছে। পদ্মজার এক হাত ধরে দূর্বল কণ্ঠে বললো, ‘পদ্ম,আমার মাথা ঘুরাইতাছে।’পদ্মজা বিচলিত হয়ে বললো, ‘বেশি খারাপ লাগছে?’শাহানার চোখ বুজে আসছে। সে অনেক কষ্টে বললো, ‘মাথাত পানি দেও আমার। দেও বইন,দেও!’স্কুলের পিছনে ঝোপঝাড় আর মাদিনী নদী আছে। একটা ঘাটও আছে। পানির ব্যবস্থা আছে। পদ্মজা শাহানার এক হাত শক্ত করে ধরে ঘাটে নিয়ে আসে। দুজন লোকও সাথে সাথে যায়। শাহানা নিকাব খুলার আগে দুজন লোককে উদ্দেশ্য করে বললো, ‘এই তোমরা আইছো কেরে? নিকাব খুইললা পানি দিমু মাথাত। যাও তোমরা।’দুজন লোক নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে চলে যায়। এদিকে কেউ নেই। কেউ আসতে চাইলেও তাদের সামনে দিয়ে আসতে হবে। তাই ভয় নেই।শাহানা নিকাব খুলে মাথায় পানি দিল। শাহানা মাথা ঝুঁকে রাখে। আর পদ্মজা দুইহাতে পানি নিয়ে শাহানার মাথায় ঢালে। কিছুক্ষণ পানি দেয়ার পর শাহানা সুস্থবোধ করে। বিশ্রাম নেয়ার জন্য সে একটু দূরে একটা গাছের গোড়ায় বসলো। পদ্মজা চারপাশ দেখে নিজের নিকাব খুললো। চোখ দুটি জ্বলছে। পানি দেয়া প্রয়োজন।পদ্মজা যেখানে ছিল সেখানে নেই! লিখন চারপাশে চোখ বুলিয়েও পদ্মজার দেখা পেলো না। এখানে আসতে আসতে কোথায় চলে গেল?তৃধাও খুঁজলো। স্কুলে একবার শুটিং হয়েছিল। তাই লিখন জানে স্কুলঘরের পিছনে একটা ঘাট আছে। পদ্মজা সেখানে থাকতে পারে ভেবে,সেদিকে গেলো লিখন। দুজন লোক নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে তার পাশ কেটে ভীড়ের দিকে যায়। লিখন ঘাটে এসে থামে। কারো উপস্থিতি টের পেয়ে শাহানা পিছনে ফিরে তাকায়। আবার চোখ সরিয়েও নেয়। পদ্মজা মুখ ধুয়ে পিছনে ফিরতেই দূরে লিখনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো। পদ্মজার গলার দুটো ঘাঢ় কালো-খয়েরি দাগ,মুখের ক্ষত,চোখের-মুখের অবস্থা দিনের আলোর মতো লিখনের চোখের সামনে ভেসে উঠে। শাহানা পদ্মজার এমন অবস্থা দেখে চমকে যায়। সে শ্বশুরবাড়ি থেকে বাপের বাড়ি এসেই সমাবেশে চলে এসেছে! পদ্মজার সাথে নিকাব পরা অবস্থায় কথা হয়েছে। তাই পদ্মজার এই অবস্থা সে দেখেনি। লিখনের কথা হারিয়ে যায়। বাকহারা হয়ে পড়ে সে। একেই বোধহয় বলে,পৃথিবী থমকে যাওয়া। পদ্মজা দ্রুত নিকাব পরে নিল।
পদ্মজা এক পা,এক পা করে উপরে উঠে আসে। পদ্মজার প্রতিটি কদম লিখনের হৃৎপিণ্ডে কাঁপন ধরায়। সে কথা বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। শাহানা পদ্মজার এক হাত ধরে বিচলিত হয়ে প্রশ্ন করলো, ‘ও পদ্ম,তোমার এই অবস্থা কেমনে হইলো?’পদ্মজা চাপা স্বরে বললো, ‘বাড়িতে গিয়ে সব বলবো আপা।’শাহানা চোখ দুটি বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। পদ্মজার শরীরে যে দাগ সে দেখেছে,এতে নিশ্চিত কেউ পদ্মজাকে মেরেছে। গলা চেপে ধরেছে! গালে নখের আঁচড়ও রয়েছে। শাহানা স্তব্ধ হয়ে যায়। আমির পদ্মজার জন্য কতোটা পাগল সবাই জানে। আমির-পদ্মজার ভালোবাসা গল্প সবার মুখেমুখে। শাহানা,শিরিন দুজনই তাদের শ্বশুর বাড়িতে আমির-পদ্মজার ভালোবাসার গল্প করে। সেই পদ্মজার গায়ে মারের দাগ! আমিরের তো মারার কথা না,অন্য কেউও পারবে না। তাহলে কীভাবে কী হলো? শাহানার মাথায় কিছু ঢুকছে না। পদ্মজা লিখনের দিকে তাকাতেই লিখন নিঃশ্বাস ছাড়লো। নিঃশ্বাসের শব্দ উপস্থিত তৃধা,শাহানা,পদ্মজা তিন জনই শুনতে পায়। পদ্মজা তার রিনঝিনে মিষ্টি কণ্ঠে বললো, ‘ আপনার সাথে আমার কথা ছিল।’লিখন ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে স্পষ্ট স্বরে বললো, ‘কী হয়েছে তোমার সাথে?’লিখনের চোখের কার্নিশে জল জমে। পদ্মজা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। কেউ তার মুখ দেখলে তাকে অনেক রকম প্রশ্নের সম্মূখীন হতে হবে। তাই সে মুখ দেখাতে চায়নি কাউকে। পূর্ণা-প্রেমার সাথে যখন দেখা হয়, তখনও সে নিকাব খুলেনি। লিখন এক পা এগিয়ে এসে আবার প্রশ্ন করলো, ‘ কে মেরেছে?’পদ্মজা বুক ধুকপুক করছে। তার মিথ্যে বলায় অভ্যেস নেই। আবার সত্যটাও বলা সম্ভব নয়। পরিস্থিতি সেরকম নয়। পদ্মজা লিখনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তৃধার দিকে তাকালো। পুতুলের মতো সুন্দর মেয়েটা। উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে। তৃধা পদ্মজার শরীরের দাগ নিয়ে চিন্তিত নয়। সে আগ্রহ নিয়ে পদ্মজার চোখ দেখছে। কাঁদার কারণে ফুলে থাকলেও সৌন্দর্য হারিয়ে যায়নি। অসম্ভব সুন্দর চোখ। টানা টানা চোখ বোধহয় একেই বলে! তৃধা ঈর্ষান্বিত। পদ্মজা লিখনের প্রশ্নে বললো, ‘মারের দাগ হতে যাবে কেন?’লিখন রুদ্ধশ্বাসে বললো, ‘মুখে দাগ,গলা চেপে ধরার দাগ,চোখ ফুলে আছে। কে বলবে এটা মারের দাগ না? আমির হাওলাদার মেরেছে?’শাহানা চমকে যায়। রাগ হয়। শাহানা-শিরিন আমিরকে অনেক ভালোবাসে। আমিরকে নিয়ে এত বড় কথা কী করে বলতে পারে লিখন? শাহানা তেড়ে এসে রাগী স্বরে বললো, ‘বাবু মারবো কেরে? তুমি কিতা কও?’পদ্মজা দ্রুত লিখনকে বললো, ‘সব বলব। আপনার সাথে আমার গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। আপনার সাহায্য প্রয়োজন। অনুগ্রহ করে শুনুন।’শাহানা পদ্মজার এক হাতে ধরে নিজের দিকে ফিরিয়ে বললো, ‘ পর পুরুষের কাছে কিতার সাহায্য তোমার পদ্ম?’পদ্মজা বললো, ‘আপা,আমি আপনাকে সব বলব। একটু সময় দিন।’পদ্মজাকে পাহারা দেয়া দুজন লোকের নাম হাবু আর জসিম। হাবু-জসিমকে একা একা দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে,রিদওয়ান পদ্মজাকে খুঁজতে থাকলো। খুঁজতে খুঁজতে ঘাটে এসে উঁকি দেয়। লিখনের সামনে পদ্মজাকে দেখে ভয়ে হয় রিদওয়ানের। লিখন দেশের একজন খ্যাতিমান অভিনেতা। সে যদি পদ্মজার মুখ থেকে সব জেনে যায়,যে কোনো মূল্যে তাদের ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লাগবে। আর সফলও হতে পারবে। পদ্মজা পারে না,কারণ তার স্বামী এতে জড়িত। তার দুই বোনকে নিয়ে ভয় আছে। সর্বোপরি সে একজন নারী! রিদওয়ান দূর থেকে ডাকলো, ‘পদ্মজা।’রিদওয়ানের কণ্ঠ শুনে পদ্মজা আশাহত হয়। লিখনের সাথে কথা যে আর দীর্ঘ হওয়া সম্ভব নয় তা স্পষ্ট। পদ্মজা তাকালো। রিদওয়ান এগিয়ে এসে বললো, ‘চাচা যেতে বলেছেন।’শাহানা রিদওয়ানকে বললো, ‘মাথাডা ঘুরতাছিল। পদ্ম আমারে ঘাটে আইননা পানি দিছে।’রিদওয়ান আড়চোখে লিখনকে দেখলো। লিখনের প্রতিক্রিয়া দেখলো। লিখন তাকাতেই সে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। রিদওয়ানের দৃষ্টি দেখে লিখনের বিচক্ষণ মস্তিষ্ক বুঝে যায়, এই দৃশ্যে ঘাপলা আছে। পদ্মজা ভালো নেই,তার সাথে খারাপ কিছু হচ্ছে। আর রিদওয়ান সব জানে। সে জড়িত। রিদওয়ান শাহানাকে বললো ‘এখন ঠিক আছো?’শাহানা এক হাতে নিজের কপাল চেপে ধরে বললো, ‘ হ ভাই।’রিদওয়ান হেসে লিখনের দিকে তাকালো। করমর্দন করে বললো, ‘ কী খবর?’রিদওয়ানের জবাব না দিয়ে লিখন বললো, ‘আমি পদ্মজার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলতে চাই।’রিদওয়ান পদ্মজার চোখের দিকে তাকায়। তারপর লিখনের দিকে। বললো, ‘কী কথা?’‘ব্যাক্তিগত। দয়া করে সুযোগ করে দিলে খুশি হবো।’ লিখনের সোজাসুজি কথা।রিদওয়ান দূরে সরে দাঁড়ালো। বললো, ‘পদ্মজা আমাদের বাড়ির বউ। সে যার তার সাথে বাইরে নির্জনে কথা বলতে পারে না।’লিখনের হাঁসফাঁস লাগছে। সে জ্ঞানহীন হয়ে পড়ছে। নিজেকে ঠিক রাখতে পারছে না। মন বার বার বলছে,পদ্মজা ভালো নেই! সত্যিই তো ভালো নেই। লিখন বললো, ‘পদ্মজা আমাকে কিছু বলতে চায়।’রিদওয়ান পদ্মজার দিকে তাকিয়ে আদেশের স্বরে বললো, ‘পদ্মজা চলো।চাচা ডাকে।’পদ্মজা রিদওয়ানকে মোটেও ভয় পায় না। রিদওয়ানের আদেশ শোনা তো দূরের কথা। তবে এই মুহূর্তে কিছুতেই লিখনের সাথে কথা বলা সম্ভব নয়। তাই সে চলে যাওয়ার কথা ভাবে। চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই লিখন পথ আটকে দাঁড়ায়। তার গলার স্বর চড়া হয়, ‘ আমাকে বলে যাও তোমার গলায় কীসের দাগ? মুখে কীসের দাগ? কে মেরেছে?’‘কে মেরেছে?’ প্রশ্নটা কানে আসতেই রিদওয়ানের গলা শুকিয়ে যায়। এতকিছু কী করে লিখন দেখলো? পদ্মজা দেখিয়েছে? এভাবে বাইরের পুরুষ মানুষকে নিজের গলা দেখিয়েছে! রিদওয়ান তার আসল রূপ,ভাষা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না। পদ্মজার উদ্দেশ্যে বললো, ‘ তুমি না সতীসাবিত্রী! পর-পুরুষকে গলা দেখিয়ে বেড়াও আমির জানে?’লিখনের মাথা চড়ে যায়। সে শেষ কবে নিজের ব্যক্তিত্বের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে সে জানে না। তবে আজ হারিয়েছে। তার কাছে পরিষ্কার, পদ্মজা অত্যাচারিত! তার উপর জুলুম করা হয়। লিখন রিদওয়ানের শার্টের গলা চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বললো, ‘মুখ সামলিয়ে কথা বলুন।’রিদওয়ান লিখনকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল। লিখনের ঝাঁকরা চুল কপালে ছড়িয়ে পড়ে। রিদওয়ান বললো, ‘ অন্যের বউয়ের উপর নজর দেয়া বন্ধ করুন। পদ্মজা চলো।’ রিদওয়ান পদ্মজার হাত চেপে ধরে। পদ্মজা এক ঝটকায় রিদওয়ানের হাত সরিয়ে দিয়ে ঝাঁঝালো স্বরে বললো, ‘ আমি একাই যেতে পারি।’তারপর লিখনকে বললো, ‘কথা বাড়াবেন না। আমাকে যেতে দিন।’লিখন কারো কথা শুনতে রাজি নয়। সে তার ধৈর্য্য,ব্যাক্তিত্ব থেকে সরে এসেছে। লিখন আবারও পদ্মজার পথ আটকালো। প্রশ্ন করলো, ‘কাকে ভয় পাচ্ছো তুমি? আমাকে বলো।’শাহানা নিজেও অবাক পদ্মজার অবস্থা দেখে। কিন্তু লিখনের পদ্মজাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি তার ভালো লাগছে না। অন্য পুরুষ কেন তাদের বাড়ির বউয়ের জন্য এতো আকুল হবে? শাহানা কর্কশ কণ্ঠে লিখনকে বললো, ‘আপনে পথ ছাড়েন না ক্যান? অন্য বাড়ির বউরে এমনে আটকানি ভালা মানুষের কাম না।’লিখনের চোখেমুখে অসহায়ত্ব স্পষ্ট! অন্য বাড়ির বউ! অন্যের বউ! এই শব্দগুলো কেন পৃথিবীতে এসেছে? সহ্য করা যায় না। রিদওয়ান লিখনকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে চাইলো। লিখন রিদওয়ানের হাতে ধরে ফেলে। রিদওয়ানের মুখের কাছে গিয়ে চাপাস্বরে বললো, ‘পদ্মজা আমার হৃদয়ে যত্নে রাখা জীবন্ত ফুল। তার গায়ে আঘাত করার সাহস যে করেছে তাকে আমি টুকরো টুকরো করবো।’লিখনের হুমকি রিদওয়ানের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। সে আমিরকে সহ্য করে, কারণ আমির ঠান্ডা মাথার খুনী। চোখের পলকে যে কাউকে ধ্বংস করে দিতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা,পাতালঘর, বাড়ি,অফিস,গোডাউন সবকিছুর একমাত্র মালিক আমির। তাই রিদওয়ান রাগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। তাই বলে সাধারণ জগতের একজন অভিনেতার হুমকি সহ্য করবে? কিছুতেই না। রিদওয়ান লিখনের চোখে আগুন চোখে তাকিয়ে বললো, ‘ এসব সিনেমায় গিয়ে বলুন। নাম বাড়বে।’লিখন রিদওয়ানকে ছেড়ে পদ্মজার দিকে মুখ করে দাঁড়াল। বললো, ‘ পদ্মজা তুমি তো ভীতু না। ভয় পেয়ো না। আমাকে বলো কী হয়েছে তোমার সাথে?’পদ্মজা বললো, ‘আমি কাউকে ভয় পাচ্ছি না। আপনার সাথে পরে কথা বলব।’রিদওয়ান পদ্মজার দিকে তেড়ে এসে বললো, ‘পরে কীসের কথা?’রিদওয়ান পদ্মজার মুখের উপর ঝুঁকেছে বলে লিখনের রাগ বাড়ে। সে রিদওয়ানের পিঠের শার্ট খামচে ধরে। সঙ্গে,সঙ্গে রিদওয়ান লিখনের মুখ বরাবর ঘুষি মারলো। তৃধা,পদ্মজা,শাহানা চমকে যায়। তৃধা আতঙ্কে লাল হয়ে যায়। সে দৌড়ে এগিয়ে আসে। লিখন তার ঘোলা চোখ দিয়ে রিদওয়ানের উপর অগ্নি বর্ষিত করে। রিদওয়ানকে তার ঘুষি ফিরিয়ে দেয়। দুজন মারামারির পর্যায়ে চলে যায়। তৃধা,পদ্মজা কেউ থামাতে পারে না। আর কিছু সময় এভাবে চললে,কেউ একজন খুন হয়ে যাবে। শাহানা চিৎকার করতে করতে স্কুলের সামনে ছুটে যায়। তার চিৎকার শুনে উপস্থিত মানুষদের মাঝে হট্টগোল শুরু হয়। শৃঙ্খলা ভেঙে যায়। মজিদ,খলিল ছুটে আসে স্কুলের পিছনে। পরিচালক আনোয়ার হোসেন লিখনকে মারামারি করতে দেখে খুব অবাক হোন। সবাই মিলে লিখন ও রিদওয়ানকে থামালো। তারপর দুজনকে নিয়ে স্কুলের সামনে আসে। উপস্থিত মানুষরা উৎসুক হয়ে তাকিয়ে আছে। গুরুজনরা জিজ্ঞাসা করে,তারা কেন মারামারি করছিল? মজিদ হাত তুলে সবাইকে থামালেন। তারপর রিদওয়ানের দিকে তাকালেন। রিদওয়ান চোখের ইশারায় কিছু বলছে। কিন্তু মজিদ বুঝতে পারেননি। তিনি রিদওয়ানকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ কী সমস্যা রিদওয়ান? এমন অসভ্যতামির মানে কী?’রিদওয়ান বাঁকা চোখে উপস্থিত মানুষদের দেখলো। সবাই তাকিয়ে আছে। আজ কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে নিশ্চিত! রিদওয়ান মাথা নীচু করে বললো, ‘লিখন শাহ পদ্মজার পথ আটকাচ্ছিল।’রিদওনায়ের কথা শুনে মানুষদের মুখ থেকে লিখনের উদ্দেশ্যে ছিঃ,ছিঃ বেরিয়ে আসে। লিখন হতবাক হয়ে যায়। হতবাক হয় পূর্ণা,প্রেমা,প্রান্ত, পদ্মজা। মজিদ লিখনকে প্রশ্ন করলেন, ‘রিদওয়ান যা বলছে সত্য?’লিখন পদ্মজার চোখের দিকে তাকালো। তারপর বললো, ‘ সত্য। কিন্তু আমি পদ্মজার গলায়,মুখে দাগ দেখেছি। গলায় যে দাগ সেই দাগ দেখে বুঝা যায় তার গলা কেউ চেপে ধরেছিল। মুখে ক্ষত,নখের আঁচড়। চোখ ফোলা। আমি শুধু জানতে চাচ্ছিলাম এসব কী করে হয়েছে? কে মেরেছে?’লিখনের কথা শুনে মজিদের মাথা ঘুরে যায়। আমির বলেছিল,পদ্মজাকে সমাবেশে না আনতে। এতে সমস্যা হতে পারে। মজিদ আমিরের কথায় গুরুত্ব দেননি। ভেবেছেন,পদ্মজা গ্রামে আছে সবাই জানে। আর গত সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, পরবর্তী সমাবেশে আমির বা পদ্মজা বিতরণ করবে শীতবস্ত্র। আমির তো চলে গেল। তাই পদ্মজাকে এনেছেন। আর এই সমাবেশে বাড়ির মেয়ে-বউরা অসুস্থ থাকলেও উপস্থিত থাকে। যদি কেউ প্রশ্ন করে,আমিরের বউ কোথায়? প্রশ্নটা সহজ,উত্তরও বানিয়ে দেয়া যেত। তবুও মজিদ হাওলাদার প্রশ্ন এড়াতে পদ্মজাকে নিয়ে এসেছেন। তিনি প্রশ্ন শুনতে পছন্দ করেন না।মজিদের মুখের রঙ পাল্টে যাওয়াটাও লিখনের চোখে পড়ে। সে ভেবে নেয়,এ সম্পর্কে মজিদও জানে। সে সবার সামনে প্রশ্ন করে, ‘আপনার বাড়ির বউয়ের শরীরে মারের দাগ কী করে এলো?’মজিদের কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হয়। তিনি কাঠ কাঠ স্বরে বললেন, ‘তুমি কী করে দেখেছো?’‘পদ্মজা ঘাটে নিকাব খুলে মুখে পানি…’মজিদ লিখনের কথায় বাঁধা দিয়ে বললেন, ‘তুমি বাড়িতে এসো এ নিয়ে কথা হবে।’মজিদ ভেতরে ভেতরে ভয়ে জমে গিয়েছেন। পদ্মজা যদি মুখ খুলে কী হবে? এখানে মজিদের প্রতিপক্ষরাও রয়েছে। তারা সুযোগ নিবে। লিখন কিছু একটা বলতে চেয়েছিল। তার পূর্বে মজিদের নতুন প্রতিপক্ষ ইয়াকুব আলী বললেন, ‘বাড়ির বউয়ের গায়ে মারের দাগ! এটা তো ভালো কথা না। মাতব্বর কি ছেলের বউয়ের উপর অত্যাচার করে?’মজিদ ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়েন! পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেছে। যে করেই হউক পরিস্থিতি হাতে আনতে হবে। মজিদ ইয়াকুব আলীকে হেসে বললেন, ‘ অহেতুক কথা বলবেন না। আমাদের বাড়িতে বউরা রানির মতো থাকে। গায়ে হাত তোলার প্রশ্নই আসে না। কথা বলার পূর্বে বিবেচনা করে বলবেন।’ইয়াকুব আলী হাসলেন। বললেন, ‘তাহলে কী নায়ক সাহেব মিথ্যা বলছেন?’ইয়াকুব আলীর সাথে আরো দুজন তাল মিলিয়ে বললো, ‘আমরা সত্যটা জানতে চাই।’হাওলাদারদের অবস্থায় দরজার চিপায় পড়ার মতো। পদ্মজা তাদের অবস্থা দেখে মুচকি হাসে। পদ্মজার শরীরে মারের দাগ আছে! এ কথা শুনে পূর্ণা মানুষজনের মাঝখান থেকে বেরিয়ে উঁচু মাটির টিলার উপর উঠলো। পদ্মজার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালো। বললো, ‘আপা? লিখন ভাই কী বলছে?’পদ্মজা নিরুত্তর। খলিল উত্তেজিত হয়ে পড়েছে। সব না সবাই জেনে যায়! আতঙ্কে তিনি সবার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘লিখন শাহ মিছা কথা কইতাছে।’খলিলের কথা শুনে মজিদের ইচ্ছে হয় খলিলকে জুতা দিয়ে পিটাতে। লিখন বললো, ‘এইটুকুও মিথ্যা না। দাগগুলো এখনো তাজা। পদ্মজা তো সামনেই আছে।’একজন বয়স্ক মহিলা বললেন, ‘পদ্ম মার নিকাবডা সরাইলেই হাচামিছা জানা যাইবো।’মজিদ জানতেন কেউ এরকম কিছুই বলবে। এখন প্রমাণিত হয়ে যাবে খলিল মিথ্যা বলেছে! মজিদের ভেতরটা থরথর করে কাঁপছে। তিনি কী করবেন? কী বলবেন? বুঝতে পারছেন না। পদ্মজা চেয়েছিল অন্যভাবে এই অধ্যায়ের সমাপ্তি করতে। যেহেতু সবার সম্মূখে সব প্রকাশ করার সুযোগ এসেছে সেহেতু উচিত সব ফাঁস করে দেয়া। এতে সব শুনে কেউ না কেউ মেয়েগুলোকে উদ্ধার করতে পদক্ষেপ নিতে পারবে। সে পুরো নিকাব না খুলে শুধু মুখটা উন্মুক্ত করলো। তার মুখের স্পষ্ট,কালসিটে দাগগুলো দেখে মানুষজনের কোলাহল বেড়ে যায়। সবাই ফিসফিসিয়ে কথা বলতে থাকে। পূর্ণা পদ্মজার গালের একটা ক্ষত দেখেছে। শুনেছিল তো দূর্ঘটনায় এমন হয়েছে। নখ ডেবে যাওয়া দুটো দাগ আর চোখের অবস্থা দেখে তার বুক ছ্যাঁত করে উঠে। সে পদ্মজার সামনে এসে দাঁড়ায়। নিকাব তুলে গলা দেখে চমকে যায়। অশ্রুসজল চোখে পদ্মজা দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে ডাকে, ‘আপা!’ইয়াকুব আলী খুব অবাক হয়েছেন এরকম ভান করে বললেন, ‘মেয়েটার কী অবস্থা! মাতব্বর এভাবেই কী বউদের রানী করে রাখেন?’মজিদের বুকের ব্যাথা বাড়ে। এক পা পিছিয়ে যান। কী হচ্ছে এসব! রিদওয়ান জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভেজায়। সে পদ্মজার ভাব দেখে ধারণা করছে,পদ্মজা এখুনি সব বলে দিবে। আর সব শোনার পর এত মানুষের সাথে তাদের পেরে উঠা সম্ভব নয়। রিদওয়ান ঢোক গিলে আচমকা বলে উঠলো, ‘আমির মেরেছে। এমনি এমনি মারেনি! পদ্মজার লিখন শাহর সাথে ছয় বছর আগে সম্পর্ক হয়েছিল। বিয়ের পরও লুকিয়ে ঢাকা অবৈধ মেলামেশা করে গেছে। আমির কয়দিন আগে হাতেনাতে ধরেছে। আর তাই মেরেছে।’রিদওয়ানের কথা শুনে পদ্মজা ও লিখনের মাথায় যেন বাজ পড়ে। মজিদের চোখ দুটি জ্বলজ্বল করে উঠে। রিদওয়ান বাঁচার পথ খুঁজে দিয়েছে! মানুষজনের কোলাহল দ্বিগুণ হয়। মজিদ কখনো ভাবেননি,তার পরিবার নিয়ে আবারো এমন সভা হবে! যা হওয়ার হয়ে গেছে,পদ্মজার সম্মান উৎসর্গ করে হলেও তাদের সম্মান রক্ষা করতে হবে। লিখন ক্রোধে-আক্রোশে রিদওয়ানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হাবু,জসিম সহ আরো কয়েকজন লিখনকে আটকায়। লিখন চেঁচিয়ে বললো, ‘মিথ্যাবাদী।’কেউ একজন বললো, ‘মাতব্বর সাহেব,সত্যিডা খুলে বলেন।’মজিদ হাওলাদার কেশে সবার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আমি চাইনি,আমার বউয়ের কোনো দূর্নাম হউক। হাজার হউক সে আমার একমাত্র ছেলের বউ। কিন্তু পরিস্থিতি যখন বাধ্য করছে তখন না বলে উপায় নেই। আপনারা অনেকেই জানেন,মোড়ল বাড়িতে লিখন শাহ একবার শুটিং করতে এসেছিল। তখন পদ্মজা আর লিখন শাহর মধ্যে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠে। তারপর আমার ছেলে আমিরের সাথে পদ্মজার বিয়ে হয়। আমির পদ্মজাকে নিয়ে ঢাকা চলে যায়। ঢাকা লিখন শাহের সাথে পদ্মজার অবৈধ সম্পর্ক চলতে থাকে। আমার বোকা ছেলে কখনো ধরতে পারেনি। গ্রামে আসার পর লিখন শাহ দুইবার আমাদের বাড়িতে গিয়েছিল। প্রমাণ আছে কিন্তু। অনেকেই দেখেছেন। দেখেছেন তো?’কয়েকজন বলাবলি করলো, তারা দেখেছে! মজিদ বললেন, ‘ লিখন শাহ কিন্তু পদ্মজার জন্য যেত। একদিন রাতেও যায়। তখন আমির হাতেনাতে ধরে দুজনকে। তাই আমির পদ্মজার গায়ের উপর হাত তুলে। রাগে একটু মার দেয়। এতে কী কোনো দোষ হয়ে গেছে আমার ছেলের?’পদ্মজা ক্ষুধার্ত বাঘিনীর মতো চিৎকার করে উঠে, ‘মিথ্যা কথা। আপনি বানিয়ে কুৎসা রটাচ্ছেন।’মজিদ হাওলাদার বুকভরা নিঃশ্বাস নেন। তিনি জানেন,এই গ্রামবাসী তাকে কতোটা বিশ্বাস করে। আর লিখনকেও অনেকে বাড়িতে যেতে দেখেছে। পদ্মজার নামে একবার সালিশ বসেছিল। যদিও সেটা তার ছেলের সাথে তবে মেয়ে নির্দোষ হলেও তার একবারের বদনাম সারা জীবন রয়ে যায়! তিনি সবার সামনে দুই হাত তুলে নরম স্বরে বললেন, ‘আমার আর কিছু বলার নেই। বিশ্বাস, অবিশ্বাস আপনাদের উপর।’লিখন হাবু ও জসিমকে আঘাত করলো। রিদওয়ান লিখনকে চেপে ধরে। রিদওয়ানের ইশারায় আরো কয়েকজন লিখনকে জাপটে ধরে। পরিচালক আনোয়ার হোসেন মাথা নিচু করে ফেলেন। মজিদ হাওলাদার মিথ্যা বলবেন না! তিনি মহৎ মানুষ। লিখন একটা মেয়ের জন্য পাগল সেটা তিনিও জানতেন। মজিদের কথা অবিশ্বাস করার কারণ নেই। তবে তিনি লিখনকে সৎ চরিত্রের ছেলে ভাবতেন। মুহূর্তে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। দ্বিতীয়বারের মতো পদ্মজার চরিত্রে ছিঃ,ছিঃ ধিক্কার ছুঁড়ে মারে গ্রামবাসী। কেউ যেন গায়ে হাত না দিতে পারে,আত্মরক্ষার জন্য পদ্মজা কোমরে ছুরি খুঁজলো! ছুরি নেই। সে অসহায় হয়ে পড়ে। চিৎকার করে সবার উদ্দেশ্যে বললো, ‘সবাই আমার কথা শুনুন।’কেউ পদ্মজার কথা শুনলো না। সবার চেঁচামিচিতে তার গলার স্বর কারো কানেই যায় না। মজিদ হাওলাদারকে তারা অন্ধের মতো বিশ্বাস করে। নিয়তি পদ্মজার সম্মানে দ্বিতীয়বারের মতো আঘাত হানে!
মজিদ হাওলাদার দুই হাত তুলে সবাইকে শান্ত হতে বললেন। তাৎক্ষণিক কোলাহল কমে আসে। তিনি সবার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আমার ঘরের বিচার আমার ঘরে হবে। আমি আর এ বিষয়ে কথা বাড়াতে চাই না। রিদওয়ান, পদ্মজাকে বাড়ি নিয়ে যাও।’রিদওয়ান পদ্মজাকে ছুঁতে উদ্যত হতেই লিখন চেঁচিয়ে বললো, ‘পদ্মজা যাবে না।’লিখন পদ্মজার জন্য ভয় পাচ্ছে। হাওলাদার বাড়ির মানুষগুলো কত বড় মিথ্যাবাদী সে আজ টের পেয়েছে। এতো বড় মিথ্যে চাপিয়ে দিলো, নিজেদের কুকর্ম লুকোতে! মজিদ হাওলাদারের মিথ্যা অভিনয় তাকে অবাক করেছে খুব। এরা পদ্মজাকে বাড়ি নিয়ে কী করে কে জানে! রিদওয়ান লিখনের কথা শুনলো না। সে পদ্মজাকে ধমকের স্বরে বললো, ‘বাড়ি চলো।’তারপর হাত ধরলো। সঙ্গে সঙ্গে পদ্মজাও রিদওয়ানের হাত চেপে ধরলো। চাপাস্বরে বললো, ‘ছয় বছর আগের অপবাদ আবার আমার জীবনে নিয়ে আসার জন্য আপনার মতো নরপশুদের অভিশাপ! কিন্তু এবার না আমাকে না আমার বোনদের, কাউকে ছোঁয়ার সাহস কেউ দেখাতে পারবে না।’পদ্মজা রিদওয়ানের মুখের উপর থুথু ছুঁড়ে মারে। উপস্থিত মানুষজন চমকে যায়। কোলাহল দ্বিগুণ হয়। রিদওয়ান পদ্মজার দিকে আগুন চোখে তাকায়। তার উপর হাত তোলার জন্য প্রস্তুত হয়। পদ্মজার পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল পূর্ণা। সে আর রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না। রিদওয়ানের পূর্বে রিদওয়ানের গালে শরীরের সব শক্তি দিয়ে থাপ্পড় বসিয়ে দিল। পূর্ণার আকস্মিক ব্যবহারে সবাই চমকে যায়। চারিদিকে চেঁচামিচি শুরু হয়ে যায়। বিশৃঙ্খলা বেড়ে যায়। রিদওয়ান রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। সে পূর্ণার গলা চেপে ধরে। শিরিন ভয়ে চিৎকার করে উঠে, ‘ও আল্লাহ! আল্লাহর গযব পড়ছে এইহানে! গযব পড়ছে!’তারপর দ্রুত সরে যায়। শাহানা,খলিল রিদওয়ানকে আটকানোর চেষ্টা করে। রিদওয়ান রাগে কিড়মিড় করছে। খলিল চাপাস্বরে রিদওয়ানের কানে কানে বললেন, ‘রিদু পূর্ণারে ছাড়,মানুষ দেখতাছে।’রিদওয়ান ছাড়লো না। পদ্মজা জানে,এই মুহূর্তে সে হাওলাদার বাড়ির মানুষদের আঘাত করলে গ্রামবাসী ভালো চোখে দেখবে না। তবুও রিদওয়ানকে আঘাত করার জন্য বাধ্য হতে হয়। পদ্মজা রিদওয়ানের পেট বরাবর জোরে লাথি বসায়। রিদওয়ান ছিটকে সরে যায়। দুই হাতে পেট চেপে ধরে। শাহানা ‘ও মাগো’ বলে চেঁচিয়ে উঠলো। পূর্ণা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।মৃদুল গফুর মিয়াকে নিয়ে স্কুলের দিকে আসছিল। দূর থেকে দেখতে পেল মাঠের মানুষজন অস্থির হয়ে আছে। সে গফুর মিয়াকে বললো, ‘আব্বা, আপনি আসেন। আমি আগে যাইতাছি।’তারপর দৌড়াতে থাকে। স্কুলমাঠে পৌঁছাতেই উঁচু টিলায় রিদওয়ানকে পূর্ণার গলা চেপে ধরতে দেখলো। তার রক্ত মাথায় উঠে যায়। শরীরে যেন কেউ আগুন ধরিয়ে দেয়। এদিকওদিক খুঁজে একটা মাঝারি আকারের বাঁশ পেল। সে দ্রুত বাঁশ নিয়ে দৌড়াতে থাকে। এক হাতে লুঙ্গি ধরে, যা হাঁটু অবধি উঠে আসে। মৃদুলের দৌড়ের গতিতে অনেক মানুষ ধাক্কা খেয়ে উল্টে পড়ে। মৃদুলের চোখের দৃষ্টি রিদওয়ানের দিকে। তার মস্তিষ্ক এলোমেলো। মজিদ দ্রুত পদ্মজা-রিদওয়ানের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালেন। চিৎকার করে বললেন, ‘কী হচ্ছে? কী হচ্ছে? থামো সবাই।’কিন্তু কোনোকিছুই থামলো না। মৃদুলের উপস্থিতি সব লণ্ডভণ্ড করে দিল। সে বাঘের মতো লাফিয়ে উঠে টিলার উপর। বাঁশ দিয়ে রিদওয়ানকে আঘাত করতে গিয়ে শাহানা,খলিলসহ আরো দুজন লোককে আঘাত করে বসে। মজিদ দ্রুত টিলা ছেড়ে সরে যান। মৃদুল খুব রাগী! মৃদুলের এলাকার অনেকে মৃদুলকে মাথা খারাপ বলে। সে কখনো বুদ্ধি দিয়ে কিছু করে না। সবসময় ক্রোধকে মূল্য দেয়। রাগের বশে কখন কী করে নিজেও জানে না। মানুষজন ছোটাছুটি করে পালাতে থাকে। শুধু মৃদুলের হুংকার শোনা যায়। ক্রোধ থাকে উন্মাদ করে দিয়েছে। সে রিদওয়ানকে বলছে, ‘জার*** বাচ্চা,তুই কার গায়ে হাত দিছস! তোরে আজ আমি মাটির ভিত্রে গাঁইথা ফেলমু।’আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা মজিদ হাওলাদারের লোকেরা মৃদুলকে ধরতে দৌড়ে আসে। তৃধা ভয়ে দূর থেকে দুই হাতে মুখ ঢেকে ফোঁপাচ্ছে। আনোয়ার হোসেন তৃধার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। তৃধার মাথায় হাত রাখলেন। আনোয়ার হোসেনের দিকে তাকিয়ে তৃধা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। বললো, ‘লিখনকে কেন ছাড়ছে না ওরা?’আনোয়ার হোসেন টিলার উপর চোখ রেখে বললেন, ‘জানি না মা। কী হচ্ছে বুঝতে পারছি না। কেউ খুন হয়ে যাবে এখানে। লিখন যে কেন এসবে জড়িয়ে পড়লো!’আনোয়ার হোসেনের কণ্ঠে আফসোস। তৃধা মাটিতে বসে। তার কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে। চার-পাঁচজন লোক লিখনকে জাপটে ধরে রেখেছে। লিখন ছটফট করছে ছোটার জন্য। এই দৃশ্য সে সহ্য করতে পারছে না।পদ্মজা পূর্ণাকে বুকের সাথে চেপে ধরলো। পূর্ণা ভালো করে নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। পদ্মজার বুক জ্বলছে। পূর্ণার কষ্ট তাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে। মৃদুল রাগে আকাশ কাঁপিয়ে চিৎকার করছে। রিদওয়ানকে ধরতে পারলে,সে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। কিন্তু পারছে না। টিলার উপর পনেরো-বিশ জনের একটা জটলা লেগে যায়। হাতাহাতি,ধ্বস্তাধস্তি চলে বিরতিহীনভাবে। মজিদ চোখের চশমাটা ঠিক করে ঠান্ডা মাথায় ভাবলেন। এই মুহূর্তে পরিস্থিতি হাতে আনা ভীষণ জরুরি! নয়তো অনেক বিপদ ঘটে যেতে পারে। তিনি তার ডান হাত রমজানকে ডেকে ফিসফিসিয়ে কিছু বললেন। মিনিট দুয়েকের মধ্যে জটলার মাঝখান থেকে একটা আর্তচিৎকার ভেসে আসে। শব্দ তুলে লিখন শাহর দেহ লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। তার পিঠ থেকে রক্তের ধারা নামছে। মৃদুল আকস্মিক লিখনকে এভাবে পড়তে দেখে চমকে যায়। রিদওয়ান লিখনকে আহত হতে দেখে মজিদের দিকে তাকালো। তার মুখ রক্তাক্ত। মৃদুল এতজনকে উপেক্ষা করেও তাকে আঘাত করতে সক্ষম হয়েছে! মজিদ ইশারায় রিদওয়ানকে কিছু একটা বুঝালেন। রিদওয়ান তাৎক্ষণিক পদ্মজাকে খুঁজলো। দেখলো,পদ্মজা মাটিতে পড়ে আছে। তার চোখ দুটি বোজা। মজিদের একটা পদক্ষেপ পুরো পরিস্থিতি পাল্টে দিল! লিখন হয় মারা যাবে,নয়তো অনেকদিন হাসপাতালে পড়ে থাকবে। আর পদ্মজাকে একবার বাড়ি নিয়ে যেতে পারলেই হলো। আর মুক্তি পাবে না! রমজান সবার আড়ালে দ্রুত ঘাটে গেল। রক্তমাখা ছুরি আর হাতের রুমাল নদীতে ছুঁড়ে ফেললো।.এশারের আযান পড়ছে। পদ্মজা ধীরে ধীরে চোখ খুললো। নিজেকে নিজের ঘরে আবিষ্কার করলো। মাথা ব্যথা করছে খুব। সে এক হাতে কপাল চেপে ধরে। তখনই দুপুরের সব ঘটনা মনে পড়ে যায়। পূর্ণার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল সে, তখন কে যেন পিছন থেকে মুখে কিছু একটা চেপে ধরে। তারপর আর কিছু মনে নেই! পদ্মজা দ্রুত উঠে বসে। জুতা না পরেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে। সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় লতিফার দেখা পেল। লতিফা পদ্মজাকে দেখে বললো, ‘কই যাইতাছো?’‘পূর্ণা কোথায়? পূর্ণার কাছে যাব।’‘পূর্ণা তো উপরে।’পদ্মজা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, ‘উপরে মানে? তিন তলায়?’‘হ।’‘এখানে কে নিয়ে আসলো?’পদ্মজা প্রশ্ন করলো ঠিকই,উত্তরের আশায় থাকলো না। দৌড়ে তিন তলায় চলে গেল। তিন তলার একটা ঘরেই পালঙ্ক আছে। রুম্পা যে ঘরে ছিল! পদ্মজা সেই ঘরে এসে মৃদুলকে দেখতে পেল। মৃদুল চেয়ারে বসে আছে। বিছানায় শুয়ে আছে পূর্ণা। পদ্মজা উল্কার গতিতে পূর্ণার মাথার কাছে গিয়ে বসলো। মৃদুল পদ্মজাকে দেখে সংকুচিত হয়। বললো, ‘ পূর্ণা ভালা আছে ভাবি।’‘ও কি অজ্ঞান?’‘না,ঘুমাইতাছে। কিছুক্ষণ আগে সজাগ ছিল।’‘খেয়েছে? ‘‘হুম। আপনার ধারে অনেক্ষন বইসা ছিল।’পদ্মজা পূর্ণার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তারপর পূর্ণার গালে,কপালে চুমু দিল। মৃদুলকে প্রশ্ন করলো, ‘প্রেমা,প্রান্ত কোথায়?’‘বাড়িত গেছে।’‘ঠিক আছে ওরা?’‘জি ভাবি।’‘আর লিখন শাহ?’লিখন শাহর কথা শুনে মৃদুল চুপ হয়ে যায়। পদ্মজা উৎকণ্ঠিত হয়ে প্রশ্ন করলো, ‘ উনি কোথায়? কেমন আছেন?’মৃদুল মাথা নত করে বললো,’ভাবি,ভীড়ের মাঝে কেউ একজন ভাইরে ছুরি মারছে!’পদ্মজা এক হাতে নিজের মুখ চেপে ধরে। তারপর কাঁপা স্বরে বললো, ‘বেঁচে আছে?’‘জানি না ভাবি। হাসপাতালে নিয়া গেছে সবাই। পুলিশ আইছিল বিকালে।’পদ্মজার চোখে জল টলমল করে উঠে। মানুষটা এতদিন তাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে গেছে। ধৈর্য্য ধরে থেকেছে। কঠিন ব্যক্তিত্বের আড়ালে তার জন্য ভালোবাসা যত্ন করে রেখেছে। পদ্মজা সবকিছু জানে। সব জেনেও সে কিছু করতে পারেনি। ভালো তো করতে পারলো না উল্টে তার জন্য ক্ষতি হয়ে গেল! পদ্মজার চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। দ্রুত সে জল মুছে ফেললো। আফসোস হচ্ছে! ঘাটে কথা বলা একদম ঠিক হয়নি! মেয়েগুলো হাতছাড়া হয়ে গেছে ভেবে,সে চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। আর লিখনও আজ এতো উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল!সব ভাগ্যে লেখা ছিল। তাই হয়তো হয়েছে। কখনো হায়-হুতাশ করতে নেই। তাই পদ্মজা সিদ্ধান্ত নিল,সে লিখনের জন্য দুই রাকাত নফল নামায আদায় করবে। যেন সে সুস্থ হয়ে উঠে। লিখনের জন্য পদ্মজার প্রার্থনা করা দায়িত্ব! পদ্মজার কাছে এইটুকু অধিকার লিখনের আছে! পদ্মজা মৃদুলকে বললো, ‘পূর্ণা ঘুমাক তাহলে। দেখে রাখবেন। আমি আসছি।’‘আচ্ছা ভাবি।’পদ্মজা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। মৃদুল দরজার বাইরে তাকিয়ে রইলো। পদ্মজাকে তার অনেক প্রশ্ন করার আছে। লিখন-পদ্মজার নামে যে অপবাদ দেয়া হয়েছে সেটা যে মিথ্যা মৃদুলের চেয়ে ভালো কে জানে! সে নিজের চোখে দেখেছে লিখন শাহর কষ্ট,পদ্মজার সম্মান রক্ষার্থে নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা,একটু কথা বলার আশায় ছটফট করা! এতো বড় মিথ্যা অপবাদ হাওলাদার বাড়ির মানুষেরা কেন দিল? আর পদ্মজার গায়ের দাগগুলো সেগুলোই কীসের? আমির হাওলাদার কোথায়? মৃদুলের ভাবনার সুতো ছিঁড়ে যায় লতিফার আগমনে। লতিফা খাবারের প্লেট টেবিলের উপর রাখলো। তারপর বললো, ‘পূর্ণার খাওন দিয়া গেছি। আর আপনের আম্মা কইছে নিচে যাইতে।’মৃদুল বললো, ‘একটু পরে যামু। আম্মা-আব্বায় খাইছে?’‘হ,খাইছে।’‘অন্যরা খায় নাই?’‘সবাই খাইছে। রিদু ভাইজানে বাড়িত নাই।’‘কু** বাচ্চা লুকাইছে।’লতিফা আড়চোখে মৃদুলকে দেখলো। মৃদুল রাগে ছটফট করছে। এক হাত দিয়ে আরেক হাত খামচে ধরে রেখেছে। লতিফা বললো, ‘আপনের আম্মার মেজাজ ভালা না।’‘কেন? কী অইছে?’‘কইতে পারি না। আপনের আব্বার লগে চিল্লাইতে হুনছি।’মৃদুলকে চিন্তিত হতে দেখা গেল না। তার আম্মা একটু বদরাগী। সব সময় চেঁচামেচি করে। এতে সে অভ্যস্ত। মৃদুল লতিফাকে বললো, ‘ আমির ভাই কই আছে?’‘ঢাকাত গেছে। কুনদিন আইবো জানি না।’‘আচ্ছা,যাও এহন।’লতিফা জায়গা ত্যাগ করলো। মৃদুল ধীরে ধীরে হেঁটে জানালার কাছে গেল। জানালার কপাট খুলে দিল। আজ চাঁদ উঠেছে। জ্যোৎস্না রাত। সে পূর্ণাকে ভালোবাসার কথা বলার জন্য এমন একটা রাতের অপেক্ষা করেছিল। জানালা খুলে দেয়াতে চাঁদের আলো পূর্ণাকে ছুঁয়ে দেয়ার সুযোগ পায়। চাঁদ তার নিজস্ব মায়াবী আলো নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে পূর্ণার সারামুখে। পূর্ণার চোখমুখ সেই আলোয় চিকচিক করে উঠে। অন্যরকম সুন্দর দেখায়। মৃদুল পূর্ণার পাশে এসে বসলো। পূর্ণার মুখের দিকে তাকাতেই, মৃদুলের চোখে ভেসে উঠে,রিদওয়ান কীভাবে পূর্ণার গলা চেপে ধরেছিল! মৃদুলের মেজাজ চড়ে যায়। রিদওয়ানকে সে যতক্ষণ ইচ্ছামত পেটাতে না পারবে শান্তি মিলবে না! মৃদুল অনেকক্ষণ রিদওয়ানকে খুঁজেছে। পেল না। মৃদুল ছটফট করতে করতে বিড়বিড় করলো, ‘হারামির বাচ্চা!’পূর্ণা ঘুমের মধ্যে নড়েচড়ে উঠে। একপাশ হয়। পূর্ণার দেহ নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। প্রান্ত পূর্ণাকে বাড়ি নিয়ে যেতে বলে। বাসন্তী বাড়িতে একা। তিনি কিছুই জানেন না। তখন মজিদ বললেন,পূর্ণাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গেলে বেশি ভালো হবে। পদ্মজা সেখানে আছে। মৃদুলও রাজি হয়ে যায়। তার কাছাকাছি থাকবে পূর্ণা এর চেয়ে আনন্দের কী হতে পারে! প্রান্ত মেনে নিল। এই মুহূর্তে মৃদুলই পূর্ণার অভিভাবক। মৃদুল বুঝতে পারেনি,মজিদ হাওলাদার ভালো মানুষি দেখাতে এই প্রস্তাব দিয়েছেন। যাতে গফুর মিয়া বা মৃদুল অথবা গ্রামবাসী কেউই মজিদকে দোষী না ভাবে। মজিদ সবাইকে নিজের উদারতা দেখিয়েছেন। গ্রামবাসীর উদ্দেশ্যে বলেছেন,পদ্মজা দোষী হলেও তার বোন দোষী নয়। রিদওয়ান পূর্ণার সাথে অন্যায় করেছে। এজন্য রিদওয়ানের শাস্তি হবে। তিনি রিদওয়ানকে সবার সামনে থাপ্পড় দিয়েছেন। আর বলেছেন,পূর্ণা সুস্থ হলে পূর্ণার কাছে ক্ষমা চাইবে রিদওয়ান।মৃদুল কল্পনা থেকে বেরিয়ে পূর্ণার এক হাত মুঠোয় নিয়ে হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে উচ্চারণ করলো, ‘তাড়াতাড়ি সুস্থ হইয়া যাও। আমি তোমারে নিয়া যাইতে আইছি।’মৃদুল পূর্ণার হাতে আলতো করে স্পর্শ করতে করতে তার মায়াবী মুখখানা মুখস্থ করে নিল। মৃদুলের ইচ্ছে হচ্ছে,পদ্মজার মতো পূর্ণার কপালে চুমু এঁকে দিতে। কিন্তু সেই বৈধতা বা সাহস তার নেই। সে পূর্ণার এক হাত শক্ত করে ধরে রাখলো।পদ্মজা ঘরে প্রবেশ করতেই মৃদুল বিজলির গতিতে পূর্ণার হাত ছুঁড়ে ফেলে। তারপর নিঃশ্বাসের গতিতে দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণার ঘুম ভেঙে যায়। মৃদুল এতো জোরে হাত ছুঁড়েছে, ঘুম তো পালানোরই কথা! পদ্মজা অবাক হয়ে মৃদুলকে দেখলো। এতো ভয় পাওয়ার কী হলো! পূর্ণা চোখ খুলে পদ্মজাকে দেখে খুব খুশি হয়। সে দ্রুত উঠে বসলো। পদ্মজা পূর্ণার পাশে গিয়ে বসে। পূর্ণা শক্ত করে পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরে বললো, ‘আপা।’পদ্মজা মৃদু হেসে বললো, ‘বোন আমার!’তারপর পূর্ণার দুই গালে হাত রেখে বললো, ‘কষ্ট হচ্ছে?’পূর্ণা মৃদুলকে দেখলো তারপর পদ্মজাকে বললো, ‘ না আপা।’মৃদুল উসখুস করতে করতে বললো, ‘আমি তাইলে যাই ভাবি। ওইখানে পূর্ণার খাবার আছে।’পদ্মজা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। মৃদুল দরজার বাইরে গিয়ে পূর্ণার দিকে তাকালো একবার। পূর্ণার বদলে সে পদ্মজাকে তাকিয়ে থাকতে দেখলো। মৃদুল জোরপূর্বক হেসে জায়গা ছাড়লো।
রাতের আঁধারে চারদিকে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। শাহানা ঘুমানোর চেষ্টা করছে, পারছে না। মৃদুলের অনিচ্ছাকৃত আঘাতে ডান হাতের বাহু ফুলে গেছে। হাড়ে তীব্র ব্যাথা। হাত নাড়ানো যাচ্ছে না। শাহানা বিড়বিড় করে বিলাপ করছে, ‘আল্লাহগো, আল্লাহ এত্ত বেদনা ক্যারে দিছো তুমি? কমায়া দেও আল্লাহ।’ঘুমের ঘোরে শিরিন শাহানার হাতের উপর উঠে পড়ে। শাহানা ‘আল্লাহগো’ বলে চিৎকার করে উঠলো। শিরিনের ঘুম ভেঙে যায়। সে লাফিয়ে উঠে বসে। তার চোখেমুখে ভয়। শাহানার হাত ধরতে চাইলে শাহানা চিৎকার করে বললো, ‘ছুঁবি না আমারে! ডাইনি,মাইরা দিছে আমারেগো।’শিরিন অপরাধী স্বরে বললো, ‘আমি দেখছি না আপা।’‘তুই কথা কইবি না।’শাহানার চোখমুখ কুঁচকানো। সে প্রচণ্ড রেগে আছে। ধীরে,ধীরে বিছানা থেকে নামলো। শিরিন প্রশ্ন করলো, ‘কই যাও?’শাহনা পূর্বের স্বরেই বললো, ‘মুততে যাই।’শাহানার ঝাড়ি খেয়ে শিরিন আর কথা বললো না। সে অন্যদিকে ফিরে শুয়ে পড়লো। শাহানা টয়লেটে যাওয়ার পথে অন্দরমহলের ফাঁকফোকর দিয়ে আসা জ্যোৎস্নার আলোয় একটা পুরুষ অবয়বকে হাঁটতে দেখলো। শাহানা ভয় পেয়ে যায়। পুরুষ অবয়বটি শাহানাকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ে। শাহানার দিকে এগিয়ে আসে। শাহানা ভয়ার্ত স্বরে প্রশ্ন করলো, ‘তুমি কেলা?’মৃদুলের মুখটা ভেসে উঠে। সে হেসে বললো, ‘আপা,আমি।’মৃদুলকে দেখেই শাহানার মেজাজ তুঙ্গে উঠে। সে চোখ রাঙিয়ে বললো, ‘ কুত্তার বাচ্চা,তুই আমার সামনে আইবি না। লুলা(পঙ্গু) বানায়া দিছস আমারে!’মৃদুল কাতর স্বরে বললো, ‘ছুডু ভাইয়ের লগে এমন করবা? আমি তো তোমারে দেখি নাই। ইচ্ছা কইরা মারি নাই।’‘এই তুই যা। সামনে থাইকা সর।’শাহানা গজ গজ করতে করতে টয়লেটের দিকে চলে যায়। মৃদুল ঠোঁট উল্টে শাহানার যাওয়া দেখে। তারপর সিঁড়ির দিকে তাকালো। তার ঘুম আসছে না একটুও। পূর্ণার কথা খুব মনে পড়ছে। ইচ্ছে হচ্ছে জ্যোৎস্নার আলো সারাগায়ে মেখে অনেকক্ষণ গল্প করতে। কোনো এক অদৃশ্য যন্ত্রনা বুকে হেঁটে বেড়াচ্ছে। অন্যদিনের তুলনায় পূর্ণাকে একটু বেশিই যেন মনে পড়ছে। বুকটা ফাঁকা,ফাঁকা লাগছে। অস্থিরতায় রুহ ছটফট করছে। মৃদুল তিনবার বিসমিল্লাহ বলে,তিনবার বুকে ফুঁ দিল। তারপর আর কিছু না ভেবে তৃতীয় তলায় উঠে আসে। শেষ সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকে। বুকের ভেতর কেউ বুঝি ঢোল পিটাচ্ছে! সে শুনতে পাচ্ছে। মিনিটের পর মিনিট সে এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর কবুতরের মতো ডাকলো! মৃদুল যে কবুতরের মতো ডাকতে পারে, পূর্ণা আর মৃদুলের পরিবার ছাড়া কেউ জানে না। পূর্ণা যদি জেগে থাকে তাহলে মৃদুলের নকল ডাক সে চিনতে পারবে। তারপর নিশ্চয় সাড়া দিবে! মৃদুল পূর্ণার জন্য আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলো। পূর্ণার দেখা নেই। মৃদুল ভাবলো,পূর্ণা ঘুমে বোধহয়। তাই সে আর অপেক্ষা করার কথা ভাবলো না। চলে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ালো। তখন দরজা খোলার শব্দ কানে আসে। মৃদুল পিছনে তাকাতে গিয়েও তাকালো না। যদি পদ্মজা হয়! মৃদুল দ্রুত চলে যেতে উদ্যত হয়। তখন পূর্ণা ডাকলো, ‘দাঁড়ান।’মৃদুল ঘুরে দাঁড়ালো। সাদা রঙের উপর নীল সুতোর কাজের নকশিকাঁথাগায়ে জড়িয়ে পূর্ণা হেঁটে আসছে। মৃদুল পূর্ণার সাক্ষাৎ -এর আশায় ছিল।।যখন পূর্ণার সাক্ষাৎ পাওয়া গেল,বুঝতে পারলো তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। অস্বস্তি হচ্ছে। অদ্ভুত এক যন্ত্রণা হচ্ছে! তবে সেই যন্ত্রণা প্রাপ্তির! পূর্ণা সামনে এসে দাঁড়ালো। বললো, ‘ছাদে চলুন। তারপর কথা বলবো।’দুজন একসাথে ছাদে উঠে আসে। ছাদে উঠতেই রাতের পৃথিবীর সৌন্দর্যের ঐশ্বর্যময় সমারোহ চোখে পড়ে। আকাশে ইয়া বড় চাঁদ। দুজন মুগ্ধ নয়নে চাঁদের দিকে তাকালো। সৌন্দর্যের মাদকতা ছড়িয়ে পড়ে দুজন প্রেমীর মনে। মৃদুল পূর্ণার দিকে তাকালো। পূর্ণাও তাকালো। চোখাচোখি হতেই দুজন হেসে ফেললো। মৃদুল প্রশ্ন করলো, ‘ঘুমাও নাই?’‘না। ঘুম আসছিল না।’‘একটু ভালা লাগতাছে?’‘হুম।’‘ভাবি ঘুমে?’‘হুম।’‘ভাবি কিছু কইছে?’পূর্ণা মুখ ভার করে বললো, ‘না। অনেকবার প্রশ্ন করেছি,ভাইয়ার সাথে কী হয়েছে? মুখে,গলায় কীসের দাগ? আপা উত্তর দেয়নি। আপার মুখের উপর কথা বলার সাহসও হয়নি।’মৃদুল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, ‘কিছু একটা তো হইছেই।’আচমকা মনে পড়েছে এমনভাবে পূর্ণা বললো, ‘তবে আমি ঘুমের ভান ধরে ছিলাম। তখন টের পেয়েছি আপা নীরবে কাঁদছে। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে আপার জন্য। আপার কীসের কষ্ট না জানা অবধি আমি শান্তি পাবো না।’‘আমির ভাইয়ের সাথে কিছু হইছে।’‘ভাইয়ার দেখা পেলেই হতো।’ বললো পূর্ণা। তার দৃষ্টি আকাশের দিকে। তারপর আবার বললো, ‘কাল লিখন ভাইয়ের খবর এনে দিতে পারবেন?’‘পারব। চিন্তা কইরো না। লিখন ভাইয়া ঠিক হইয়া যাইব।’পূর্ণা আর কিছু বললো না। সে চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইলো। মৃদুল বললো, ‘রাতের আকাশ তোমার কেমন লাগে?’পূর্ণা খোশ মেজাজে জবাব দিল, ‘অনেক ভালো লাগে! আমার আম্মা,আপা,প্রেমা সবাই জ্যোৎস্না রাত পছন্দ করে। আমাদের অনেক মুহূর্ত আছে জ্যোৎস্না রাত নিয়ে। আপনার কেমন লাগে?’মৃদুল হাসলো। তারপর বললো, ‘ রাতের আকাশ কুনোদিন(কোনদিন) আমার দেখার ইচ্ছা হয় নাই। এমনি রাইতে বার হইলে বার হইতাম। আকাশ দেখার লাইগগা বার হইতাম না। প্রথম তোমার সাথে দেখতে আইলাম।’পূর্ণা মৃদুলের দিকে তাকালো। তারপর চাঁদের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘এত্ত সুন্দর মানুষের পাশে আমার মতো কালো মানুষকে দেখে চাঁদ কী লজ্জা পাচ্ছে না?’মৃদুল বললো, ‘চান্দের কীসের এত্ত দেমাগ যে,পূর্ণার গায়ের রঙ নিয়া লজ্জা পাইবো?’পূর্ণা ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকালো। জ্যোৎস্নার রূপ-মাধুরী নিজ চোখে অবলোকন করার সৌভাগ্য পূর্ণার বহুবার হয়েছে। কিন্তু আজকের সময়টা অন্যরকম লাগছে। মায়াবী এক অনুভূতি সর্বাঙ্গে শীতল বাতাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। মৃদুল বললো, ‘বইসা কথা বলি।’‘কোথায় বসবো? ছাদ তো কুয়াশায় ভেজা।’মৃদুল চট করে তার লুঙ্গি খুললো। পূর্ণা শুরুতে চমকে যায়। পরে দেখলো,মৃদুলের পরনে প্যান্ট আছে! মৃদুল তার লুঙ্গি ছাদের মেঝেতে বিছিয়ে বললো, ‘বইসা পড়ো।’পূর্ণা মনে মনে,আসতাগফিরুল্লাহ, আসতাগফিরুল্লাহ বলে লুঙ্গির উপর বসলো। কিছুটা দূরত্ব রেখে মৃদুল বসলো। বললো, ‘প্যান্টের উপর লুঙ্গি পরার সুবিধা হইলো এইডা। যেকোনো দরকারে কামে লাগে। একবার টুপি ছাড়া রাইতে মাছ ধরতে গেছিলাম। ঠান্ডা বাতাসে মাথা সেকি বেদনা! এরপর করলাম কী….’পূর্ণা বাঁধা দিয়ে বললো, ‘লুঙ্গি দিয়ে টুপি বানিয়েছেন তাই তো?’মৃদুল গর্বের সাথে বললো, ‘হ। উপস্থিতি বুদ্ধি এইডা।’পূর্ণা হাসলো। মৃদুল অনেক রাগী,অহংকারী। তবুও সে মুগ্ধ করার মতো একটা মানুষ। সবসময় ঠোঁটে হাসি থাকে। এই মুহূর্তে রেগে, ওই মুহূর্তে সব ভুলে যায়। পূর্ণা ছাদের মেঝেতে তাকালো। চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় ছাদের মেঝেতে থাকা শিশির চকচক করছে। স্বচ্ছ রূপালি ঝরনার মতো চাঁদের আলো যেন চারপাশ ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে! কুয়াশা ভেদ করে চাঁদ উঁকি দিচ্ছে বারংবার। দুজনের মাঝে পিনপতন নিরবতা নেমে আসে । নিরবতা ভেঙে মৃদুল ডাকলো, ‘পূর্ণা?’‘হু।’‘আমার কাঁনতে ইচ্ছা হইতাছে।’পূর্ণা হৃদয় কেঁপে উঠলো। সে মৃদুলের দিকে মুখ করে বসলো। বললো, ‘কেন?’‘জানি না। আমি যখন যেইডা চাইছি, পাইছি। এই প্রথম কিছু পাইতে গিয়া ভয় করতাছে।’‘কী সেটা?’মৃদুল সরাসরি পূর্ণার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘তোমারে! তোমারে পূর্ণা।’নিস্তব্ধ প্রহরে, জ্যোৎস্নাময় রাতে একাকী দুজনের মাঝে প্রেমিক যখন বিভ্রম নিয়ে উচ্চারণ করে ভালোবাসার কথা প্রেমিকার হৃদয়ে কী হয়? জানে না পূর্ণা। তবে তার বেলা সে দমবন্ধকর এক অনুভূতির স্বাদ পেয়েছে। সব পাখপাখালি তাদের নীড়ে ঘুমাচ্ছে শীতে। শুধু পেঁচারা জেগে আছে। থেমে থেমে তারা ডাকছে। কনকনে শীতল হাওয়া বইছে। পূর্ণা মৃদুলের এক হাত ধরে বললো, ‘আপা সবসময় বলে, ভাগ্যে যা আছে তাই হয়। আল্লাহ কপালে যা লিখে রাখেন তাই হয়। তাই চিন্তা করবেন না।’‘তুমি আপনি করে আর কথা কইবা না। তুমি কইবা।’পূর্ণা চট করে অন্যদিকে ফিরলো। বললো, ‘পারব না।’‘যা কইছি হুনো। নইলে কিন্তু?’‘কী করবেন?’‘ছাদ থাইকা ঝাঁপ দিয়া মইরা যামু।’পূর্ণা ভ্রু কুঁচকাল। বললো, ‘এসব কী কথা?’‘দেখাইতাম ঝাঁপ দিয়া?’মৃদুল গুরুতর ভঙ্গিতে কথা বলছে। এই ছেলে দেখানোর জন্য ঝাঁপ দিয়ে দিতেও পারে! পূর্ণা বললো, ‘আচ্ছা থাক,লাগবে না। আমি তুমিই বলবো।’মৃদুল হেসে বললো, ‘তাইলে কও।’‘কী বলব?’‘তুমি।’‘তুমি।’মৃদুল হাসলো। হাসলো পূর্ণাও। আকাশের বিশাল উজ্জ্বল চাঁদটি আর তার সাথি তারাদের নিয়ে পূর্ণা,মৃদুলের প্রেমকথন চলে সারারাত। দুজন মুঠো,মুঠো চাঁদের আলোকে স্বাক্ষী রেখে কাটিয়ে দেয় মুহূর্তের পর মুহূর্ত। দিনে একটা অঘটন ঘটে যাওয়ার পরও প্রকৃতি তাদের মনেপ্রাণে প্রেম নিয়ে আসে গোপনে। এ যেন কোনোকিছুর ইঙ্গিত! নয়তো অসময়ে কেন এমন সু-সময় দেখা দিল?.কাকডাকা ভোরে আমির হাওলাদার বাড়িতে পা রাখলো। সে সবেমাত্রই ফিরেছে। মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। ঢাকা থেকে নিয়ে এসেছে নতুন বোঝা। যে বোঝা তাকে নুইয়ে রেখেছে। যখনি সে গোপন যুদ্ধে জয়ী হলো, দেখতে পেলো আলোর রেখা,তখনই সামনে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকারের দেয়াল। সুখ নামক বস্তুটি নিমিষে আড়াল হয়ে গেল। এই পৃথিবী যেন তার বিরুদ্ধে চলছে। সে অনুভব করছে,এই পৃথিবী আর তার নয়। বিষের বাতাস ছড়িয়ে আছে চারদিকে। পায়ের নিচের জমিন আর তাকে চায় না। শত,শত অভিশাপের বুলি কানে বাজে। অভিশাপগুলোকে তো সে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। তাহলে তারা জীবনে ফিরে এলো কী করে? আমির জানে না। লতিফা অন্দরমহলের দরজা খুলে,আমিরকে দেখতে পেল। আমির লতিফাকে দেখে মাথা উঁচু করে। ঢোক গিলে বললো, ‘ভাত আছে? ঠান্ডা হলেও চলবে।’লতিফার শরীর কেঁপে উঠে। আমিরের এরকমভাবে ভাত খোঁজাতে সে কেন যেন চমকে যায়! আমিরকে সে যমের মতো ভয় পায়। তাই কোনো প্রশ্ন করলো না। লতিফা অস্থির হয়ে পড়ল। বললো, ‘আনতাছি আমি। আনতাছি।’সৌভাগ্যক্রমে আমিরের ভাগ্যে গরম ভাতই জুটে। ফজরের আযানের সাথে সাথে লতিফা রান্না বসিয়েছিল। ভাতের পাতিল নামিয়েই আমিরকে ভাত দিয়েছে। আমির প্রথম লোকমা মুখে দেয়ার পূর্বে লতিফাকে প্রশ্ন করলো, ‘পদ্মজা ভালো আছে?’লতিফা গতকালের ঘটনা বলতে গিয়েও বললো না। বললো, ‘হ,ভালা আছে।’আমির গাপুসগুপুস করে ভাত খেলো। সারা রাত্রি সে শীতবস্ত্র ছাড়া ছিল। ফলে শরীর মৃত মানুষের মতো ঠান্ডা হয়ে যায়। তাই সদ্য রান্না হওয়া গরম ভাত খুব উপভোগ করে খেয়েছে। খাওয়া শেষে ২য় তলায় উঠলো। পদ্মজা কোরঅান শরীফ পড়ছে। তার মধুর সুর মনপ্রাণ জুড়িয়ে দেয়ার মতো। আমির ঘরে প্রবেশ করার পূর্বে দরজার পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো। তারপর ঘরে ঢুকে পদ্মজার দিকে তাকালো না। আলমারি খুলে জ্যাকেট,মোজা,টুপি বের করলো। পদ্মজা আড়চোখে আমিরকে দেখে,পড়ায় মনোযোগ দিল। আমির তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে যায়। সিঁড়ির কাছে এসে আবারও থম মেরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। দৃষ্টি রয়ে যায় পদ্মজার ঘরের সামনে।পাতালঘরের এওয়ানে রিদওয়ান শুয়ে ছিল। তার সাথে একজন সুন্দরী নারী। দুজনের অপ্রীতিকর অবস্থা। হঠাৎ আমিরের আগমনে রিদওয়ান চমকে যায়। তারপর হেসে আমিরকে বললো, ‘ সব ঠিক আছে?’আমির এক হাতে কপাল চেপে ধরলো। তারপর সেই নারীর উদ্দেশ্যে বললো, ‘এই শালী,শরীর ঢাক।’আমিরের কণ্ঠে তীব্র ঘৃণা। অশুভ সুন্দরী নারীটি দ্রুত চাদর গায়ে জড়িয়ে নিল। রিদওয়ান বললো, ‘ওরে বকতাছস কেন?’আমির একটা খাম রিদওয়ানের মুখের উপর ছুঁড়ে দিল। তারপর এটুতে চলে গেল।
গল্পঃ আমৃত্যু ভালোবাসি তোকেলেখিকাঃ সালমা চৌধুরী..................................................................................................................................................................মেঘের অসুস্থতার কথা শুনামাত্র তানভির আঁতকে উঠে। তার অক্লিষ্ট মন দৌর্মনস্যে ছেয়ে গেছে। দ্রুত রওনা দিল। ততক্ষণে বন্যারা মেঘকে নিয়ে হাসপাতালে চলে গেছে। তানভিরকেও জানিয়ে দিয়েছে। ডাক্তার মেঘকে চেক করছেন, বন্যা মেঘের পাশে বসে আছে। তারমধ্যে তানভির ছুটে এসে রুমে ঢুকে ডাক্তারকে দেখেই থমকালো। দরজার সামনে মিনহাজরা থাকায় রুমটা চিনতে অসুবিধা হয় নি। ডাক্তার বেরিয়ে যেতেই তানভির মেঘের কাছে বসে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে শীতল কন্ঠে আর্তনাদ করে বোনকে ডাকতে শুরু করল। বন্যা চোখ নামিয়ে চুপচাপ বসে আছে। অকস্মাৎ তানভিরের ফোনে কল আসছে। তানভির পকেট থেকে ফোন বের করে আঁতকে উঠে বলল,“সর্বনাশ!”বন্যা চোখ সরু করে তানভিরের দিকে তাকালো। তানভির নিজের চোখমুখ মুছে গলা খাঁকারি দিয়ে কল রিসিভ করে কানে ধরলো। ওপাশ থেকে আবির উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,“আমার বউ কোথায়? কতগুলো কল দিচ্ছি, কল রিসিভ করছে না কেনো?”তানভির কি বলবে বুঝতে পারছে না। চোখের সামনে বোনের নিথর দেহ পড়ে আছে এ অবস্থায় ফোনের অপর পাশের মানুষটাকে মিথ্যা বলার সাধ্যও তার নেই। আগের বার অসুস্থতার কথা লুকাতে গিয়ে বড়সড় ধাক্কা খেতে হয়েছে। এবার সে সত্যি নিরুপায়। তানভির অত্যন্ত নমনীয় কন্ঠে আস্তে করে জবাব দিল,“বনু আমার সামনেই আছে।”আবির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,“ফোনটা ও কে দে। ”পরপর ঢোক গিলে তানভির শীতল কন্ঠে বলল,” বনু কথা বলার অবস্থাতে নেই। ”আবির আর্তনাদ করে উঠল,“কেনো? কি হয়েছে ওর?”“সেন্স হারিয়ে ফেলছিল। এখনও….”এটুকু বলার আগেই আবিরের হুঙ্কার শুরু হলো। মুহূর্তেই মাত্রাতিরিক্ত রেগে গেছে, আবিরের মেজাজ তুঙ্গে। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। তানভির কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে, শক্ত করে চোখ বন্ধ করে নাকে মুখে হাত চেপে আবিরের ঝারি খাচ্ছে। বন্যা নির্বাক চোখে তানভিরের অভিমুখে তাকিয়ে আছে। ফোনের অপর পাশের মানুষটা আবির ভাইয়া এটা বুঝতে বন্যার খুব বেশি সময় লাগলো না । মেঘের অসুস্থতার কথা শুনে টানা ১৭ দিন মেঘের সাথে কোনো কথা বলেনি। অনেক চেষ্টার পর সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে এখন আবারও অসুস্থতার কথা শুনলে, আবির ঠিক কি করবে এটা ভেবেই বন্যা ভয় পাচ্ছে। আবির যদি আবারও কথা বন্ধ করে দেয় তখন মেঘের ই বা কি হবে! তানভির আর একটা শব্দও বলে নি। আবির নিজের মতো বেশকিছুক্ষণ চেঁচিয়ে কল কেটে দিয়েছে। এ অবস্থায় আবিরের করণীয় কিছুই নেই। তানভির চোখ মুখ মুছে স্বাভাবিক কন্ঠে শুধালো,“বনুর কি হয়েছিলো? ”বন্যা শান্ত স্বরে সব বলল। কিছুক্ষণ পর মেঘের জ্ঞান ফিরেছে। চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে দেখে নিল। তবে তানভিরকে দেখেই আতঙ্কিত হলো। তানভির আবিরকে বললে আবির আর কথা বলবে না এই ভয়ে মেঘও সিঁটিয়ে গেছে। তানভির কন্ঠ খাদে নামিয়ে শুধালো,“এখন শরীর কেমন? ঠিক আছিস?”মেঘ আস্তে করে বলল,“হ্যাঁ”কিছুক্ষণের মধ্যে মিনহাজ রিপোর্ট নিয়ে আসছে। তানভির রিপোর্ট টা হাতে নিয়ে ভালোভাবে পড়তে লাগলো। প্রেশার স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কমে গেছে। সিস্টোলিক রক্তচাপ ১২০ মিলিমিটার মার্কারি থাকার জায়গায় ১০০ তে নেমে গেছে অন্যদিকে ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ ৮০ মিলিমিটার মার্কারির পরিবর্তে ৬০ এ চলে আসছে। শরীরে হিমোগ্লোবিনও স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা কমে গেছে। খাওয়া দাওয়ার অনিয়ম, শরীরের প্রতি অযত্ন তার সাথে অতিরিক্ত মানসিক চাপ তো লেগেই আছে। সবকিছুর চাপেই সেন্স হারিয়ে ফেলেছিল। তানভির মেঘকে এক পলক দেখে গম্ভীর কন্ঠে বলল,” তোকে আমার আর কিছুই বলার নেই।”মেঘ ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদো কাঁদো মুখ করে তাকিয়ে আছে। মেঘ শান্ত কন্ঠে বলল,“বাসায় কাউকে কিছু বলো না, প্লিজ।”তানভির রাগী স্বরে বলল,” আমার তো ইচ্ছে করছে….”এটুকু বলেই থেমে গেল। সামান্য কথাতেই মেঘের দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরছে। তানভির মেঘের চোখ মুখে তপ্ত স্বরে বলল,“ঠিক আছে। বাসায় বলবো না। কিন্তু তোকেও ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করতে হবে। করবি তো?”“করবো।”মেঘের শরীর কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর মেঘকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেছে। তানভির আর বন্যা দুজন মেঘের দু’পাশে হাঁটছে। মিনহাজ, তামিম আর সাদিয়া তাদের পেছনে। ক্লিনিকের সামনে এসে তানভির মিনহাজ আর তামিমকে উদ্দেশ্য করে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,“বাইকটা বাসায় দিয়ে আসতে পারবে?”“জ্বি ভাইয়া।”তানভির পকেট থেকে চাবি বের করে মিনহাজকে দিয়ে দিল৷ বন্যা উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,“আপনারা কিভাবে যাবেন?”“আমরা রিক্সায় চলে যাব, সমস্যা নেই। ”আচমকা আয়েশার সঙ্গে দেখা। আয়েশা এদিকেই যাচ্ছিল। তানভিরের কন্ঠ শুনে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল,“কি হয়েছে তানভির? ”মিনহাজরা বাইকের কাছে যেতে গিয়েও থমকালো৷ মেঘ কপাল গুটিয়ে মেয়েটাকে দেখছে। প্রথমদিন কেবল চোখ আর হাত-পা দেখা গেলেও আজ তার মুখও খোলা। অনেক বছর পর দেখায় আয়েশাকে চিনতে মেঘের বেশ কিছুটা সময় লাগলো। বন্যা নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে, মুখে গাম্ভীর্যের ভাব। আয়েশা নিজের মতো কত কি বলছে, মেঘের খোঁজ নিচ্ছে। এদিকে মেঘ তেলে বেগুনে জ্বলছে। গায়ের জোরের অভাবে কিছু করতেও পারছে না। আয়েশা ধীর কন্ঠে বলল,“কার কি হয়েছে?”তানভির গম্ভীর কণ্ঠে বলল,“বনু অসুস্থ।”এই কথা শুনে মেয়েটা একদম উতলা হয়ে গেছে। মেঘের কাছে এগিয়ে আসতে আসতে বলল,“হায় হায়, আমার ননদের আবার কি হয়েছে?”মেঘ রাগে ফোঁস করে উঠল,“আমাকে একদম ননদ বলবেন না। এর পরিণাম ভালো হবে না বলে দিলাম। ”মেয়েটা আর একটু এগুতেই তানভির হুঙ্কার দিল, “আমার বোনকে ছোঁয়ার চেষ্টাও করবে না। ”বন্যা মুখ গোমড়া করে নিরেট দৃষ্টিতে দুই ভাই বোনের কর্মকাণ্ড দেখছে। আয়েশা এবার মোলায়েম কন্ঠে বলে উঠল,” আমি মেঘকে ধরলে কি হবে? জান…….!”শব্দটা বলতে দেরি হয়েছে আয়েশার গালে তানভিরের শক্তপোক্ত হাতের থা*প্পড় পড়তে দেরি হয় নি। থা*প্পড়ের শব্দে উপস্থিত সবাই খানিকটা কেঁপে উঠেছে। তানভির রাগান্বিত কন্ঠে চিৎকার করল,” আজকের পর আর কোনোদিন আমার সামনে নাটক করতে আসবা না। শুধুমাত্র মেয়ে বলে আর আমি মেয়েদের সম্মান করি বলে আজ পর্যন্ত তোমার কোনো ক্ষতি করি নি, নয়তো বহু আগেই তানভিরের ভয়ঙ্কর রূপ দেখিয়ে দিতাম। আমায় খারাপ হতে বাধ্য করো না।”আয়েশার গালে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ হয়ে গেছে। গালে হাত ঘষতে ঘষতে মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছে। তামিম মিনহাজের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল,” মেয়েটার আজ খবর আছে। তানভির ভাইয়ার হাতের থা*প্পড় যে একবার খেয়েছে একমাত্র সেই বুঝে। তুই কি বলিস?”মিনহাজ কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে তপ্ত স্বরে বলল,“অতীত খুব ভয়ানক জিনিস, মনে করাতে যাস না। তার থেকে বরং চল।”তানভির রিক্সার জন্য কিছুটা সামনে চলে গেছে। মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,” খুব তো গাল ফুলাইয়া রাখছিলি, এখন দেখছিস আমার ভাইকে? ভাইয়ার জীবনে জলজ্যান্ত এক ডানাকাটা পরী থাকতে ভাইয়া ডানাকাটা পেত্নীর প্রেমে পড়বে? জীবনেও না।”বন্যা মুচকি হেসে বলল,“এখন এত কথা না বলে নিজের যত্ন নিয়েন৷ আবির ভাইয়া কিন্তু ওনাকে খুব ঝাড়ছে।”মেঘ আতঙ্কিত কন্ঠে শুধালো,” আমার অসুস্থতার কথা আবির ভাই শুনে ফেলছেন? আমি আরও না করছি যেন বাসার কাউকে না বলে। ”“আবির ভাইয়া যখন কল দিয়েছে তখন তোর সেন্স ছিল না। ”“আমি শেষ। আর একটা সপ্তাহ পরে সেন্স হারালে কি এমন ক্ষতি হতো। উফফফ! ভালো লাগে না।”এরমধ্যে তানভির রিক্সা নিয়ে হাজির। বন্যার থেকে বিদায় নিয়ে তানভিরের সাথে বাসার দিকে চলে গেছে। মালিহা খানরা তখনও ড্রয়িংরুমে বসে পিঠা বানাতে ব্যস্ত। মেঘকে দেখে হাসিমুখে বললেন,“মেঘ, ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি নিচে আয়। পিঠা বানাতে হবে। ”মেঘ কিছু বলার আগেই তানভির পেছন থেকে বলল,“বনুকে পিঠা বানাতে বলো না বড় আম্মু। ওর এখন ঘুমানো প্রয়োজন। ”আকলিমা খান প্রশ্ন করলেন,“তোমার হাতে কি তানভির? ”তানভির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,” তেমন কিছু না। ফল আর কিছু খাবার।”“ফল তো বাসায় আছে।”“এগুলো শুধু বনুর। এখানে কেউ যেন হাত না দেয়। আর হ্যাঁ এগুলো যেন দুদিনের মধ্যে শেষ হয়।”শেষ কথাটা মেঘের দিকে তাকিয়ে বলেছে। মেঘ চোখ সরিয়ে নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়েই শুয়ে পরেছে। শরীর এখনও বেশ দূর্বল। সারাক্ষণই মাথা ঘুরাচ্ছে। ফোন হাতে নিয়ে আবিরকে কল দিতে গিয়েও থেমে গেছে। ২-৩ ঘন্টা ঘুমিয়ে প্রায় ৪ টার দিকে সজাগ হয়েছে। ঘুম ভাঙতেই সবার আগে ফোন চেক করল কিন্তু আবিরের মেসেজ,কল কিছুই আসে নি। মেঘ বুক ফুলিয়ে শ্বাস টেনে ভয়ে ভয়ে কল দিল। ১০ থেকে ১২ সেকেন্ড রিং হওয়ার পর আবির কল রিসিভ করল। মেঘ অত্যন্ত মৃদু স্বরে বলল,“আসসালামু আলাইকুম। ”“ওয়ালাইকুম আসসালাম।”“কি করছেন?”“কিছু না।”“খেয়েছেন?”“না।”“কেনো?”“খেতে ইচ্ছে হয় নি।”“আপনি কি রাগ করেছেন?”“জানি না।”” বিশ্বাস করুন, আমি ইচ্ছে করে সেন্স হারায় নি। ”“জানি।”“তাহলে এমন করছেন কেনো?”“এমনি।”মেঘ এবার শীতল কন্ঠে শুধালো,“আবির ভাই, আপনি কবে আসবেন?”“জানি না।”মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,“ঠিক আছে, রাখি।”আবিরের নিরুদ্বেগ জবাব,“ইচ্ছে।”বন্যা বিকেলে টিউশন শেষ করেই তানভিরকে কল দিল। অনেকদিন যাবৎ তানভিরের সাথে ঠিকমতো কথায় হয় না বন্যার। দেখা হলেও রেগে থাকে সবসময়। আজ আয়েশার প্রতি তানভিরের এমন আচরণ দেখে বন্যার মনে কিছুটা আশার আলো ফুটেছে। বন্যা এতদিন পর নিজে থেকে কল দিয়েছে এই খুশিতে তানভির শুয়া থেকে লাফিয়ে উঠেছে। তৎক্ষনাৎ কল রিসিভ করল। বন্যা স্বাভাবিক কন্ঠে প্রশ্ন করল,“এইযে ভিলেন, আপনি কি ফ্রী আছেন?”তানভির নিঃশব্দে হেসে বলল,“৫০০% ফ্রী আছি। বলো..”বন্যা মুচকি হেসে বলল,” আপনার বোনকে ফোনে পাচ্ছি না। তার খোঁজ নিতে কল দিয়েছি।”তানভিরের হাসিমুখ পুনরায় গম্ভীর হয়ে গেছে। শ্বাস ছেড়ে বলল,” এজন্যই কল দিয়েছো?”বন্যা ঠোঁটে হাসি রেখে উল্টো প্রশ্ন করল,” কল দেয়ার আর কোনো কারণ আছে নাকি?”তানভির গুরুতর কন্ঠে জবাব দিল,“না, আচ্ছা বাদ দাও। ওয়েট বনুকে ডেকে দিচ্ছি।”“আপনি কি করছিলেন?”তানভির মৃদু হেসে ঠাট্টার স্বরে বলল,” কল্পনা করছিলাম।”“কি?”” বলা যাবে না। নাও বনুর সাথে কথা বলো।”মেঘকে ফোন দিয়ে তানভির চলে গেছে।২-৩ দিন যাবৎ আবিরের সঙ্গে মেঘের তেমন কথায় হয় না। মেসেজ দিলে আবির হ্যাঁ,হু, আচ্ছা, জানি না বলেই রিপ্লাই করে। কল দিলে এমনভাবে কথা বলে যেন তার কথা বলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। মন খারাপ করে মেঘও তেমন কল দেয় না। সারাদিন খাওয়া আর ঘুম ছাড়া মেঘের আর কোনো কাজ ই নেই। মাঝে মাঝে বন্যার সাথে একটুআধটু দুষ্টামি করে। সন্ধ্যার দিকে তানভির বাসা থেকে বের হলেই মেঘ রান্না করতে চলে যায়। টুকটাক রেপিসি ট্রাই করে আর মীম, আদিকে নিয়ে খায়।আজ সকাল থেকে আবিরকে বেশ কয়েকবার কল দিয়েছে কিন্তু আবির নেটে নেই, ফোনও বন্ধ। এদিকে তানভিরও বাসায় নেই। মেঘ একে একে সবার নাম্বার থেকেই চেষ্টা করেছে কিন্তু আবিরের নাম্বার বার বার বন্ধ বলছে।ঘড়িতে তখন বিকেল ৪ টা বেজে ২৬ মিনিট। মেঘ গভীর ঘুমে নিমগ্ন, নিঃশ্বাস এলোমেলো। বুকের উপর রাখা ফোনটাকে জড়িয়ে ধরে স্বপ্নদেশে পারি দিয়েছে। মলিন চেহারা, চোখের কার্নিশে স্পষ্ট পানির দাগ দেখা যাচ্ছে। আবির মায়াবী দৃষ্টিতে মেঘের ঘুমন্ত আদলে চেয়ে আছে, বুকের ভেতর অনবরত ধ্রিম ধ্রিম কম্পন হচ্ছে। প্রায় পাঁচ মাস পর আবিরের বক্ষপিঞ্জরে আবদ্ধ হৃদয়টা স্বস্তি পেয়েছে। এতদিন পর নিজের প্রেয়সীকে এত কাছে পেয়েছে। আবির এক দৃষ্টিতে মেঘকে পরখ করছে, আপাদমস্তক দেখে ঘুমন্ত মেঘের পাশে বসে অতি সন্তর্পণে বুকের উপর থেকে আলতোভাবে ফোনটা তুলে নিল। হোম স্ক্রিনে নিজের ছবিটা দেখে মলিন হেসে ফোনটা এক পাশে রেখে দিয়েছে। চোখের কার্নিশে জমে থাকা অশ্রু মোলায়েম হাতে মুছে পরপর মেঘের কপালে, গলায় হাত রেখে জ্বর পরীক্ষা করছে। কিছুটা সময় নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। হৃদয়ের অন্তঃস্থলে জাগ্রত প্রেমানুভূতিতে আর চাপিয়ে রাখতে পারছে না। আনমনে মেঘের অদৃষ্টে ঠোঁট ছোঁয়াল। গাল ভর্তি আবিরের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির স্পর্শে মেঘের ঘুমন্ত শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠেছে। সদ্য শাওয়ার নিয়ে আসায় আবিরের গা থেকে এক অন্যরকম সুঘ্রাণ মেঘের নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করছে। মেঘ ঘুমের মধ্যেই নড়েচড়ে উঠল। আবির সঙ্গে সঙ্গে সরে গেছে, বসা থেকে উঠে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়ালো। আবির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে সুস্থির কন্ঠে ডাকল,“মেঘ…”মেঘের উত্তর না পেয়ে আবির ঠোঁট কামড়ে হেসে আবারও ডাকল,” স্প্যারো….”ঘুমন্ত মেঘ আদো আদো কন্ঠে বলল,“হুমমম!”আবিরের আঁখি যুগল প্রশস্ত হলো। ঠোঁটে হাসি রেখে এবার শক্ত কন্ঠে বলল,” এইযে ম্যাডাম….!”মেঘ ঘুম ঘুম চোখে তাকাতেই তার স্বপ্নের রাজকুমারকে চেখের সামনে আবিষ্কার করল।আবিরকে দেখেই স্তব্ধ হয়ে গেছে। দু-চোখ যেন এখনি কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে আসবে। মেঘ মুগ্ধ আঁখিতে প্রিয়মানুষটার মুখের পানে তাকিয়ে আছে। বরাবরের মতো হৃদয়ে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। সত্যি কি কল্পনা বুঝার আগেই শুয়া থেকে এক লাফে উঠে বসলো।অকস্মাৎ এমন কান্ডে আবিরের নিঃশ্বাস আঁটকে গেছে, পরপর বুকটান করে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। ঘুমের ঘোরে মেঘ অবাক চোখে আবিরকে দেখছে। আচমকা বসা থেকে এক লাফে আবিরকে জড়িয়ে ধরলো। ঠিক জড়িয়ে ধরা বলেনা এটাকে। মেঘের দু পা মাটি থেকে প্রায় এক হাত উপরে। আকস্মিক ঘটনায় আবির এক পা পিছিয়ে সহসা সর্বশক্তি দিয়ে মেঘকে আঁকড়ে ধরল। আবিরের একহাত মেঘের পিঠে আরেক হাত কোমড়ের উপরে, শক্ত করে ধরে আছে। মেঘ অর্ধ ঘুমে থাকলেও আবির পুরোপুরি সজ্ঞানে আছে। আবিরের শিরা-উপশিরায় তুফান চলছে, উষ্ণ শ্বাস মেঘের উন্মুক্ত ঘাড়ে পড়ছে। দু’জনের হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি তীব্র থেকে তীব্র হতে শুরু করেছে, গাত্র জুড়ে অদ্ভুত শিহরণ জাগছে। মেঘের দুচোখ ছলছল করছে। ঘন ঘন শ্বাস ছেড়ে অকস্মাৎ কাঁদতে শুরু করেছে। আবির তখনও শক্ত হস্তে মেঘকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। মেঘ কোন ঘোরে আঁটকে আছে সে নিজেও বুঝতে পারছে না। কাঁদতে কাঁদতে নিজের মনিকোঠায় জমে থাকা অভিযোগগুলো ব্যস্ত কন্ঠে জাহির করছে। মেঘ কাঁদতে কাঁদতে আর্তনাদ করে উঠল,” আপনি এত নিষ্ঠুর কেনো?”মেঘ কি ভেবে হঠাৎ আবিরকে ছেড়ে দিয়েছে। আবিরও আস্তে আস্তে ছাড়লো। মেঘের দুপা আবিরের বৃহৎ পদযুগলের উপর পরলো। আবির মেঘকে জড়িয়ে ধরে রেখেই সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে মেঘকে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড় করালো। তাৎক্ষণিক ঘটনায় মেঘের মস্তিষ্ক পর্যন্ত এলোমেলো হয়ে গেছে। আবির ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে মেঘের চোখের পানি মুছে কন্ঠ খাদে নামিয়ে আস্তে করে বলল,” সরি, আর কখনো নিষ্ঠুরের মতো আচরণ করব না।”কাঙ্খিত ব্যক্তি কোমল কন্ঠের জবার শুনে মেঘ নিশ্চুপ হয়ে গেছে। মেঘের পা তখনও আবিরের পায়ের উপর। আবির এগুতেই মেঘ পেছাতে চেষ্টা করল। কিন্তু কয়েক ইঞ্চির গ্যাপ মুহুর্তেই ফুরিয়ে গেল। আবির মাথা নিচু করে মেঘের কানের কাছে মুখ নামিয়ে এনে পাতলা অধর নেড়ে বিড়বিড় করে বলল,” খুব তো মিস ইউ, মিস ইউ করছিলেন । তা ঠিক কতটুকু মিস করেছেন দেখি?”মেঘের ঠোঁট কাঁপছে ফিনফিন করে, মুখ দিয়ে কোনো কথায় বের হচ্ছে না। ক্ষণিকের জন্য ভেতরটা অনুভূতিশূন্য হয়ে গেছে। আবিরের উষ্ণ শ্বাস প্রশ্বাস মেঘের ঘাড়ে পড়ছে। আবির মুখ তুলে মেঘের নিরুদ্বেগ চেহারার পানে তাকালো। আবিরের এক হাত তখনও মেঘের পিঠ আঁকড়ে ধরে আছে। অন্য হাতে দিয়ে মেঘের এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে, মেঘের ডানহাতটা আবিরের বুকের বা পাশে শক্ত করে চেপে ধরে বলল,” তোর শূন্যতায় আমার অনুভূতির দেয়াল ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে গেছে। আমার ভগ্ন হৃদয়ের কম্পন কি তুই টের পাচ্ছিস? বুঝতে পারছিস কতটা মিস করেছি তোকে?”আবিরের হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিক তীব্র, আবিরের বক্ষঃস্থলে হাত রাখায় মেঘের সর্বাঙ্গে কম্পন শুরু হয়ে গেছে। চিরচেনা মানুষটার গায়ের গন্ধ, স্পর্শ, মায়াবী কন্ঠ, নেশাক্ত দৃষ্টি সবেতে মেঘ মাতাল প্রায়। কয়েক মুহুর্তের মধ্যে ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের হাহাকার অশ্রু রূপে গড়িয়ে পরলো। মেঘের হাত আর পিঠ ছেড়ে আবির এবার শান্ত হস্তে মেঘের দু’চোখ মুখে কন্ঠ দ্বিগুণ ভারি করে বলল,“আজকের পর আমার কারণে তোর চোখ থেকে এক ফোঁটা পানিও পড়তে দিব না আমি, প্রমিস।”কথাটা বলতে বলতে মেঘের কপালে দীর্ঘ এক চুমু দিল। ওমনি মেঘ পাথর বনে গেছে। আবিরের পায়ের উপর থেকে মেঘের পা সরে গেছে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় মেঘের শ্বাসনালীতে তুফান শুরু হয়ে গেছে। দুচোখ পূর্বের তুলনায় দ্বিগুণ প্রশস্ত হয়ে গেছে। প্রায় দুই বছরের জমে থাকা অনুভূতিগুলো এলোপাতাড়ি ছুটছে। মেঘের এলোমেলো নিঃশ্বাস আবিরের বুকে লাগছে। প্রায় মিনিট খানেক পর আবির কিছুটা সরে দাঁড়ালো। মেঘ নিস্তব্ধ হয়েই দাঁড়িয়ে আছে। আবির শেষবারের মতো মেঘের চোখ মুখ মুছতে মুছতে শক্ত কন্ঠে বলল,” আজ এই মুহুর্ত থেকে তোর চোখে সুখের অশ্রু ব্যতীত আমি আর কিছুই দেখতে চাই না। ”মেঘকে ছেড়ে চলে যেতে নিয়ে আবার থমকালো। কোমল কন্ঠে বলল,“তোর গিফট টেবিলে রাখা আছে।”আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে গুনগুন করতে করতে বেড়িয়ে গেছে,“সাত সাগর আর তের নদীপার হয়ে তুমি আসতে যদিরূপকথার রাজকুমার হয়েআমায় তুমি ভালবাসতে যদি।”মেঘ নির্বাক চোখে আবিরের পানে তাকিয়ে আছে। মেঘ দেয়ালে গা এলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো স্বপ্ন, কল্পনা নাকি বাস্তব কিছুই বুঝতে পারছে না। কয়েক মুহুর্ত হতবাক থেকে আচমকা বিছানায় শুয়ে পরলো। শরীরের দূর্বলতার কারণে কিছু সময়ের মধ্যে আবারও ঘুমিয়ে পরেছে।ঘন্টাখানেক পর হঠাৎ হৈচৈ এর শব্দে মেঘের ঘুম ভাঙে। শুয়া থেকে উঠে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে চোখ পরে টেবিলের দিকে। টেবিলের উপর একটা গিফ্ট বক্স রাখা। মেঘ হকচকিয়ে উঠে বক্সটার কাছে এগিয়ে গেল। তৎক্ষনাৎ এক ঘন্টা আগের ঘটনাগুলো মনে পড়তে লাগলো। মেঘ আনমনে বলে উঠল,“আবির ভাই কি সত্যি চলে আসছেন?”এক দৌড়ে ওয়াশরুম থেকে চোখে মুখে পানি দিয়ে, মুখ ঠিকমতো না মুছেই ছুটলো। আশপাশ না তাকিয়ে অন্তহীন পায়ে ছুটে আচমকা সিঁড়ি এসে থামলো।আবির নিচ থেকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আবিরের এমন দৃষ্টি দেখে মেঘ হতভম্ব হয়ে গেছে। চোখ নামিয়ে ধীর গতিতে নামতে শুরু করল।মীম আর আদি গিফট নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে।মেঘ কাছাকাছি আসতেই আবির সস্নেহে জিজ্ঞেস করল,” কেমন আছিস?”কিছুটা দূরেই হালিমা খান আর মালিহা খান দাঁড়ানো। মেঘ চোখ তুলে তাকাতেই চোখাচোখি হলো দুজনের। আবিরের দুচোখে শাণিত প্রেমানুভূতি, যা লুকাতে অক্ষম সে। মেঘ মায়াবী দৃষ্টিতে তাকিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি কেমন আছেন?”“আলহামদুলিল্লাহ। ”হালিমা খান বলে উঠলেন,“সেই কখন আসছিস, এখনও কিছু খাস নি। আগে থেকে জানিয়েও আসিস নি।। কি খাবি বল”আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে থেকেই শান্ত স্বরে বলল,” শুনলাম তোমার মেয়ে পাকোড়া বানাতে এক্সপার্ট। জিজ্ঞেস করো আমাকে বানিয়ে খাওয়াবে কি না!”হালিমা খান হেসে বললেন,“এ আবার কেমন কথা, তোকে খাওয়াবে না কেনো! এই মেঘ আয়।”মালিহা খান তপ্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,” রাতে কি খাবি?”আবির সরল কন্ঠে বলল,“তোমার যা ইচ্ছে তাই রান্না করো। ”মালিহা খান আবারও বললেন,“তুই আসবি এটা আগে জানাস নি কেনো?তোর রুমটা পরিষ্কার করা হয় নি৷ সেদিন তানভির দেখলাম কোনোমতে পরিষ্কার করেছে।”আবির মলিন হেসে বলল,“সমস্যা নেই। আমি সবকিছু পরিষ্কার করেছি।”আবির সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে। মেঘকে পাকোড়া নিয়ে আসতে দেখে ইচ্ছেকৃত গান শুরু করল,“সাত সাগর আর তের নদীপার হয়ে তুমি আসতে যদি…”মেঘ মুখ ফুলিয়ে সূক্ষ্ম নেত্রে তাকাতেই আবির অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। মেঘ মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে বলল,” আজ আসবেন এটা আগে জানালেন না কেনো?”“জানালে কি সারপ্রাইজ থাকতো?”মেঘ ভেঙচি কেটে বিড়বিড় করে বলল,” সারপ্রাইজ দিতে কে বলছিল আপনাকে?”আবির গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,“দুদিন পর পর অসুখ বাঁধাতে কে বলছিল আপনাকে?”এরমধ্যে আলী আহমদ খান বাসায় আসছেন৷ ওনাকে দেখেই মেঘ দ্রুত রান্নাঘরে চলে গেছে। আবির এগিয়ে গিয়ে আব্বুকে সালাম করল। ঘন্টাখানেক পর তানভির আসছে। আবিরকে দেখেই জড়িয়ে ধরে বলল,“ভাই আমি ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। ”আবির মুচকি হেসে জানাল,” অফিসিয়ালি দায়িত্ব নেয়ার আগ পর্যন্ত আর একটু সহ্য করে নে।”আজ অনেকদিন পর সবাই একসঙ্গে খেতে বসেছে। যদিও মোজাম্মেল খান বাসায় নেই। ইকবাল খান আজই বাসায় এসেছেন। আলী আহমদ খান ভারী কন্ঠে প্রশ্ন করলেন,“তোমার না আরও তিনদিন পর আসার কথা ছিল?”“জ্বি আব্বু। কিন্তু কাজ শেষ হয়ে গেছে তাই চলে আসছি। ”“সব কাজ শেষ নাকি আবারও যেতে হবে?”“শেষ।”আবির প্রশ্ন করল,“সিফাতের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?”” আগামীকাল জয়েন করবে৷ ”আবির উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,” আপনি কি আপনার সিদ্ধান্তে অটল থাকবেন?”কাকামনি আবিরের দিকে একপলক তাকিয়ে শান্তস্বরে বললেন,“ভাইজান, আমারও মনে হচ্ছে এই কাজটা করা ঠিক হচ্ছে না৷ ”আলী আহমদ খান খাওয়া শেষ করে উঠে যেতে যেতে বললেন,” মানুষকে ভালো হওয়ার সুযোগ করে দিতে হয়।”আবির এবার ঠান্ডা কন্ঠে হুঙ্কার দিল,” যদি তার কারণে কখনো কোম্পানির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তখন কেউ আমাকে বাঁধা দিতে আসবেন না। ”আলী আহমদ খান চলে গেছেন। ইকবাল খান দু একটা কথা বলে নিজেও ওঠে গেছেন। আবির আর তানভির নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথা বলছে। মেঘ খেতে খেতে বার বার আবিরকে দেখছে। আগের তুলনায় আবির একটু মোটা হয়েছে। দেখতেও কিছুটা ফর্সা লাগছে। মেঘ মিটিমিটি হাসছে আর খাচ্ছে। হঠাৎ আবিরের নজর পড়তেই ভ্রু নাচালো। মেঘ থতমত খেয়ে চোখ নামিয়ে নিল। খাওয়াদাওয়া শেষ করেই আবির ঘুমাতে চলে গেছে।আজ সিফাত নামক ছেলেটা জয়েন করবে। আবির, আলী আহমদ খান আর ইকবাল খান তিনজন ই অফিসে আছে। সিফাত এসে আলী আহমদ খান আর ইকবাল খানের সাথে কথা বলে আবিরের মুখোমুখি হলো। আবির কপাল কুঁচকে সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে আছে। সিফাত গুরুগম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করলো,“আপনি ই তাহলে সাজ্জাদুল খান আবির?”“জ্বি। কোনো সমস্যা? ”সিফাত হেসে বলল,” না৷ আংকেলের মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি তাই জিজ্ঞেস করলাম।”আবির গম্ভীর কন্ঠে বলল,“অফিসে স্যার বলতে শিখুন।”“সরি, স্যার।”আবির ভ্রু কুঁচকে বলল,” নিজের কাজে মনোযোগ দেন।”আবির চলে গেছে। সিফাত নিরেট দৃষ্টিতে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। এদিকে মোজাম্মেল খান একের পর এক কল দিয়েই যাচ্ছেন। আবির নিজের কেবিনে গিয়ে কল রিসিভ করতেই মোজাম্মেল খান রাশভারি কন্ঠে শুধালেন,“আটকাতে পেরেছো?”“না।”“আমি জানতাম। তোমার আব্বুকে আমি খুব ভালোভাবে চিনি। ওনি যা বলবেন তাই করবেন। কিন্তু তাই বলে শত্রুর সাথে হাত মেলাবেন?”আবির নিরুদ্বেগ কন্ঠে জবাব দিল,“কিছু করার নেই চাচ্চু। এখন আমাদেরকেই সাবধানে থাকতে হবে। ”আবির বিকেল দিকে নিজের অফিসে আসছে। রাকিব, রাসেলের সাথে অনেকদিন পর দেখা। অফিসের কাজ শেষে সবাইকে ছুটি দিয়ে তিন বন্ধু গল্প করতে বসেছে। অনেকদিনের জমানো কথা, অফিসের বিভিন্ন কাজ, পার্সোনাল লাইফ সব বিষয়েই গল্প চলছে। রাসেল হঠাৎ প্রশ্ন করল,“আবির, বিয়ে কবে করছিস?”আবির মলিন হেসে জবাব দিল,” করবো করবো।”“সেটা কবে? আর তোর শ্বশুর আসবে কবে?”“আমার শ্বশুর আসলেই ধামাকা হবে।”“কোনো? ”“৬ মাস সময় যে ঘনিয়ে আসছে।”রাকিব উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,“তুই কি ভেবেছিস? বাসায় আগে কথা বলবি? নাকি মেঘকে আগে জানাবি?”” মেঘকে জানিয়ে তারপর বাসায় বলব। তবে সেটা একই দিনে। আমি ওকে কোনো প্রতিশ্রুতি দিব না। ডিরেক্ট বিয়ের অফার দিব আর ঘুম থেকে উঠলেই বাড়িতে বিয়ের আমেজ থাকবে। ”এরমধ্যে মেঘের কল আসছে। রাসেল উঁকি দিয়ে নামটা দেখে একগাল হেসে বলল,“ওনার নাম নিতেই কল চলে আসছে। ওনি অনেকদিন বাঁচবেন। ”আবির মুচকি হেসে উত্তর দিল,“বাঁচতে তো হবেই। ওর কিছু হলে আমি যে বেঁচে থেকেও ম*রে যাব। ”আবির কল রিসিভ করে মৃদুস্বরে বলল,“সারাদিনে এই মনে পড়ল?”মেঘ গাল ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে বলল,“আপনিও তো কল দেন নি। ফুপ্পিরা বাসায় এসে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন। আপনার কি আসতে দেরি হবে?”“না। এখনি আসতেছি।”আবির তাদের থেকে বিদায় নিয়ে যেই উঠতে যাবে রাকিব আনমনে ডাকল,“আবির..”“বল”“তোর আব্বু যদি সত্যি সত্যি মেনে না নেয় তখন কি করবি?”আবির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রাশভারি কন্ঠে জবাব দিল,” ম*রে যাব।”রাসেল বলল,“ফাজলামি করিস না। সিরিয়াসলি বল”আবির অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,“তোদের কি মনে হচ্ছে আমি ফাজলামি করতেছি? আব্বু চাচ্চু সহজে মেনে নিলে ভালো, যদি বলে মেঘকে নিয়ে বাড়ি থেকে চলে যেতে তাহলে আরও ভালো। কিন্তু যদি বলে মেঘকে রেখে একা বেড়িয়ে যেতে তারপর কি হবে আমি জানি না। তবে এটায় সত্যি যে মেঘকে না পেলে, আমি ম*রে যাব।”আবির বাসায় ফিরতেই আবিরের ফুপ্পি আবিরকে ডেকে নিয়ে গেছেন। মাহমুদা খান চিন্তিত স্বরে জানতে চাইলেন,“কি সিদ্ধান্ত নিয়েছিস? বাসায় কবে বলবি?”“৮-১০ দিনের মধ্যেই বলল।”“তোর আব্বু কিন্তু তোর উপর ভীষণ রেগে আছেন। সেদিন অনেককিছু বলতেছিল, সাবধান।”“তুমি কিসের জন্য এত ভয় পাচ্ছো? বাড়ি থেকে বের করে দিবে এই ভয়?”“সম্পর্ক ছিন্ন করার ভয় পাচ্ছি।”আবির মলিন হেসে বলল,” ওনি যতবার সম্পর্ক ছিন্ন করবেন আমি ততবার নতুন করে সম্পর্ক মজবুত করব। প্রয়োজনে সুপার গ্লু দিয়ে সম্পর্ক জোড়া লাগাবো। যাই হয়ে যাক না কেন, গ্লু নষ্ট হবে না।”“সিরিয়াস বিষয় নিয়েও তুই মজা করছিস?”আবির ফুপ্পির দিকে তাকিয়ে গুরুভার কন্ঠে ডাকল,“ফুপ্পি”“হ্যাঁ বল।”“আমি যদি মা*রা যায় তুমি কি আমায় মিস করবা?”মাহমুদা খান আবিরের কান চেপে ধরে রাগান্বিত কন্ঠে বললেন,“তোর সাহস কতটুকু হয়ছে যে তুই আমার সামনে দাঁড়িয়ে মরা*র কথা বলিস।”আবির আর্তনাদ করে উঠল,“সরি ফুপ্পি, সরি। আর বলবো না।”★★আবির বাসায় ফিরেছে তিনদিন হলো। মোজাম্মেল খান এখনও বাসায় ফিরেন নি। আজ শুক্রবার হওয়ায় তানভির, আবির দু’জনেই বাসায়। গত ৫ মাসে মেঘের সাথে কথা বলতে বলতে বৃহস্পতিবারের রাত জাগার অভ্যাস টা একদম কেটে গেছে। আবির সকালের নাস্তা করে সেই যে রুমে গেছে, আর বের হওয়ার নাম নেই৷ বাড়িতে আসার পর থেকে মেঘের সাথে কথাও কমে এসেছে। চোখের ইশারায় টুকটাক দুষ্টামি করলেও মুখে কিছুই প্রকাশ করে না। ১১ টার দিকে মেঘ আবিরের রুমের সামনে আসছে। আবির দুচোখ বন্ধ চুপচাপ শুয়ে আছে। মেঘ পা টিপে টিপে রুমে ঢুকে আবিরের বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে আবিরকে দেখছে। অকস্মাৎ আবির বলে উঠল,” একটা অবোধ বালকের দিকে কুনজর দিতে আপনার লজ্জা লাগে না?”মেঘ ভেঙচি কেটে জবাব দিল,“কে অবোধ? আপনি?”“তা নয়তো কে? কেনো আসছিলেন?”মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,” আসার পর থেকে দেখছি যতক্ষণ বাসায় থাকেন ততক্ষণ আপনি রুম থেকে বের ই হোন না, কারো সাথে কথা পর্যন্ত বলেন না। কি হয়েছে আপনার?”আবির শুয়া থেকে উঠে বসে মুচকি হেসে বলল,” ভাবছি ঘরে বসে থেকে কয়েকদিনেই আপনার মতো একটু সুন্দর হয়ে যাব।”মেঘ স্ব শব্দে হেসে বলল,” পারবেন না। ”“কেনো?”“এমনি।”আবির বসা থেকে উঠে রুম থেকে বের হতে হতে বলল,“ওয়েট, আজ রূপচর্চা করে হলেও সুন্দর হয়েই ছাড়বো । ”মেঘ হাসতে হাসতে বলল,“আপনাকে সুন্দর হতে হবে না। আপনি এমনেই সুন্দর আছেন।”আবির ঠোঁট চেপে হেসে বেড়িয়ে গেছে। তানভিরের রুম থেকে তানভিরকেও টেনে নিয়ে গেছে। ফ্রিজ থেকে দুটা শসা বের করে ঠান্ডা শসায় কেটে চোখে দিয়ে বসেছে। সাথে একটা ন্যাচারাল প্যাক বানিয়েও মুখের লাগিয়েছে। সামনে প্লেটে আবির আরও কিছু শসা কেটে রেখেছে। তানভির চোখের শসা রেখেই হাত বাড়িয়ে একটা একটা করে সব খেয়ে ফেলছে।ওদের কান্ড দেখে মেঘ আর মীম হাসতে হাসতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। ভিডিও করে বন্যাকেও পাঠিয়েছে। এরমধ্যে আদি আসছে। ওদের চোখ মুখ দেখে আদিও উত্তেজিত কন্ঠে বলল,“ভাইয়া তোমরা কি দিয়েছো? আমিও দিব।”মেঘ শান্ত কন্ঠে বলল,“আয়, আমি তোকে দিয়ে দিচ্ছি।”আবির উদাসীন কন্ঠে বলল,“আজ আমাদের যত্ন নেয়ার কেউ নেই বলে। ”মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,” আপনারা চাইলে আমি আপনাদের ফেসিয়াল করে দিতে পারি। ”হঠাৎ বাহিরে আলী আহমদ খানের কন্ঠ শুনে আবির আর তানভির উঠে যে যার মতো দৌড়। যেতে যেতে তানভির বলল,” থাক বাবা, আরেকদিন। আজকের মতো পালায়।”