BDBOYS...
BDBOYS...
সবচেয়ে সাম্প্রতিক খবর ও পোস্টসমূহ
গল্পঃ আমৃত্যু ভালোবাসি তোকেলেখিকাঃ সালমা চৌধুরী..................................................................................................................................................................তানভির নিজের রুমে পড়তেছে, যদিও পড়াশোনার প্রতি তার প্রবল বিতৃষ্ণা কিন্তু কিছু করার নেই। আবিরের সাপোর্ট, মেঘের জেদ, বন্যাকে নিজের করে পাওয়ার ইচ্ছে, আর এই সবকিছু পূরণ করতে পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই। আগামী সপ্তাহে কোচিং এ ভর্তি হবে তাই আগে থেকেই বই গুলো একটু দেখে নিচ্ছে। হঠাৎ আবির দরজায় দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে বলল,“আসবো?”“আসো। তোমার আবার অনুমতি নিতে হয় নাকি!”আবির দরজা চাপিয়ে বিছানায় বসে গম্ভীর কন্ঠে প্রশ্ন করল,” এই পড়াশোনা কতদিন চলবে? ”তানভির চোখ নামিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,” আমি সরকারি চাকরি করতে চাই।”“চাকরি করতে তোকে বারণ করছি না। কিন্তু চাকরি পেতে গেলে যতটা শ্রম আর চেষ্টা করতে হবে, ততটা পরিশ্রম করার ধৈর্য কি তোর আছে?”“আমি চেষ্টা করব।”আবির চাপা স্বরে বলতে শুরু করল,“দেখ তানভির, আমি আজ পর্যন্ত তোকে কোনোকিছুতে বারণ করি নি। তুই যখন যা চেয়েছিস নিজের সামর্থ্য না থাকলেও কোনো না কোনোভাবে ম্যানেজ করে দিয়েছি। রাজনীতি করতে চেয়েছিস আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তোর খুশির জন্য রাজি হয়েছিলাম। ইদানীং তুই সিদ্ধান্ত নিয়েছিস রাজনীতি করবি না, আমি তাতেও সম্মতি দিয়েছি। এখন তুই পড়াশোনা করতে চাচ্ছিস, আমার এতেও কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু কথা হলো তোর নিজের উপর কনফিডেন্স আনতে হবে। যতবার ভেঙে পরবি ততবার নিজেকে নিজের সাহস দিতে হবে। পারি না, মনে থাকে না, পারবো না এগুলো কমন কথা কিন্তু এগুলোর সাথে আরেকটা কথা আছে,’ আমাকে পারতেই হবে’ যদি এই কথাটা মাথায় রাখিস তবেই তুই সফল হতে পারবি। ধৈর্য আর পরিশ্রম একদিন সফলতা এনে দিবেই। ”তানভির গুরুভার কন্ঠে বলল,” আমার সিদ্ধান্ত আর নড়চড় হবে না। আল্লাহ সহায় থাকলে আমি সরকারি চাকরি নিয়েই ছাড়বো, ইনশাআল্লাহ। ”“ইনশাআল্লাহ। আরেকটা কথা বলব?”“বলো।”“বন্যার প্রতি তোর ইমোশন কি সত্যি নাকি এতেও দুটানা আছে? এখনও সময় আছে তুই ভেবে দেখতে পারিস। পড়াশোনা, রাজনীতি, ক্যারিয়ার, জব এগুলো তোর মন পছন্দে পরিবর্তন করতে পারলেও ভালোবাসা, ইমোশন কখনো পরিবর্তন করা যায় না। বন্যার প্রতি প্রেমানুভূতি যদি না থাকে তাহলে আগেই দূরে সরে যা। নষ্ট করলে নিজের জীবনটায় নষ্ট করিস, আরেকটা নিষ্পাপ জীবনকে জরিয়ে তাকে কষ্ট দিস না। ”তানভির চিবুক নামিয়ে তপ্ত স্বরে বলল,“আমি সত্যি সত্যি বন্যাকে ভালোবাসি৷ তুমি বিশ্বাস করো। হয়তো তোমার মতো এত ভালোবাসতে পারি না কিন্তু আমার জায়গা থেকে আমি ওকে সবটুকু দিয়ে ভালোবাসতে চাই।”আবির কন্ঠ দ্বিগুণ ভারি করে বলল,” অতীত এসে মানসিকভাবে বিরক্ত করবে না তো?”“আমার জীবনে অতীত বলতে কিছু নেই। আমি বর্তমান নিয়ে ভালো আছি আর আমি বর্তমান নিয়েই ভালো থাকতে চাই। ”“গুড। শুনলাম সেদিন তোর এক্সকে থা*প্পড় মে*রেছিস। তারপর কি দেখা হয়েছিল?”তানভির আঁতকে উঠে বলল,“তুমি কিভাবে জানো? আমি তো বনুকে জানাতে বারণ করেছিলাম। বলে দিয়েছে তোমায়?”“ওহ আচ্ছা। তাহলে তোর বোনও জানে? এখন থেকেই আমার কাছে কথা লুকানো শেখাচ্ছিস?”“তুমি ভুল বুঝো না প্লিজ। ঐ মেয়ের কথা শুনলে তুমি রাগ করতা তাই বলি নি। আর আমি নিজেও এই বিষয়টাকে পাত্তা দিতে চায় নি। কিন্তু সেদিন হাসপাতালে বন্যার সামনে জান ডাকছিল, তাই রাগে থা*প্পড় মেরেছিলাম।”আবির ভ্রু কুঁচকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠল,“জান..! সম্পর্ক এতদূর চলে গেছিলো?”“ছিঃ নাহ। এই মেয়ে জীবনেও জান ডাকে নি আমায়। তুই তোকারি করেই সময় কাটতো না আবার জান৷। বন্যাকে দু’দিন আমার সাথে দেখেছে হয়তো সন্দেহ করছে তাই এমনভাবে কথা বলছিল। ”আবির শান্ত স্বরে বলল,“তুই কি জানিস বন্যাকে রাস্তায় ডেকে ঐ মেয়ে একদিন তোর সম্পর্কে কথা বলেছে?”“কি? কবে? আমি কিছু শুনি নি তো। বন্যাও কিছু বলে নি। তুমি কিভাবে জানো?”“বন্যা কেনো তোকে বলবে? বন্যা কি তোর গার্লফ্রেন্ড? প্রপোজ করেছিস ওকে?”“সাহস ই পায় না। যদি রিজেক্ট করে দেয়। কিন্তু তোমাকে ঐ কথা কে বলছে?”“সানি বলছে। সানির বাসার কাছেই বন্যা টিউশন পড়াতে যায়। বন্যার সাথে ঐ মেয়ে কথা বলার সময় সানি পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো তখন তোর কথা শুনে দাঁড়িয়েছে আর যতটা শুনেছে সবটায় আমায় বলেছে। ”“এটা তুমি আমায় আগে বললা না কেনো? ঐ মাইরারে এখন মাটিতে কু*পতে ইচ্ছে করছে। একেই বন্যাকে মানাতে পারছি না তারউপর আরেক যন্ত্রণা হাজির। আমি এখন কি বলবো?”“তোর এক্সের কথা জানে সে?”“বনু বলেছে কি না জানিনা কিন্তু আমি এখনও কিছু বলি নি।”“তোর উচিত বন্যাকে সবকিছু জানানো। তারপর তোর প্রতি তার কি অনুভূতি প্রকাশ পায় সেটায় দেখার বিষয়। ”“আচ্ছা, ঠিক আছে।”আবির উঠে যেতে যেতে আবারও বলল,“লাস্ট বার বলছি, ডিসিশন নেয়ার আগে আবারও ভাব। একটা মেয়ের জীবন সম্পূর্ণ তোর হাতে। তুই ভালো হলে মেয়েটা সুখী হবে আর তুই খারাপ মেয়ে দুঃখী। ভাব ভাব সারারাত ভাব, প্রয়োজনে দুরাত না ঘুমিয়ে তারপর ভাব।”আজ শনিবার, মোজাম্মেল খান বাসায় ফিরেছেন। চাচ্চুর সাথে দেখা করতে আবির আজ একটু তাড়াতাড়িই বাসায় ফিরেছে। মূলত চাচ্চুর মনের অবস্থা বুঝতেই আগেভাগে এসেছে আবির। কিন্তু মোজাম্মেল খান তেমন কোনো বিষয়ে আলোচনায় করেন নি। ওনার আলোচনার টপিক প্রজেক্ট, লাভ-লস আর সিফাত। চাচ্চুর সাথে কথা শেষ করে আবির নিজের রুমে চলে গেছে। এই সময়ে অফিসে গেলেও তেমন কোনো কাজে আসবে না তাই আর বের হয় নি। নিজের রুমে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিলো। কিছুক্ষণ কাজ করার পর বেশ ক্লান্ত লাগছে। তাই কফি করতে নিচে যাচ্ছিলো। মেঘের রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় মেঘের ফোনের রিংটোনের শব্দ শুনতে পায়। বিশেষ মনোযোগ না দিয়ে আবির নিচে চলে গেছে। কফি করে নিয়ে আসার সময় আবারও শুনতে পেল, মেঘের ফোনে কল বেজেই যাচ্ছে। আবির মেঘের রুম পেরিয়ে গেছে কিন্তু অনবরত ফোনের শব্দে আবির অবচেতন মনে ঘুরে আসলো। মেঘ রুমে আছে কি না দেখার জন্য উঁকি দিল৷ রুম সম্পূর্ণ ফাঁকা, টেবিলের উপর ফোনটা আপন গতিতে বেজেই চলেছে। আবির রুমে ঢুকে ফোনের দিকে তাকাতেই স্ক্রিনে বন্যার ছবি আর Baby লিখে সেইভ করা নাম্বারটা ভাসলো। আবির ভাবলো রিসিভ করে বলবে যে, মেঘ রুমে নেই। আবির স্বাভাবিক ভাবে কল রিসিভ করে বলতে নিলো তার আগেই বন্যা উত্তেজিত কন্ঠে বলতে শুরু করল,“হাই ননদীনি, কি করতেছো তুমি? কতগুলো কল দিচ্ছি রিসিভ করছিলা না কেনো? আমার ছোট ননদ আর দেবর কি করছে?”আবির উষ্ণ স্বরে বলল,“তোমার ননদীনি সম্ভবত ছাদে, আমি তোমার ভাসুর বলছি।”বন্যা থতমত খেয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল,“আ.. আবির ভাইয়া”“জ্বি।”বন্যা নিজের কপাল চাপড়াচ্ছে। মুখের উপর কল কাটতে পারছে না আবার কিছু বলতেও পারছে না। বন্যা উদাসীন কন্ঠে বলল,“আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া।”“ওয়ালাইকুম আসসালাম।”“ভালো আছেন ভাইয়া?”“আমি ভালো আছি তবে অন্য কারোর টা জানি না। ননদীনির খোঁজ খবর নেও ভালো কথা। কিন্তু মাঝে মাঝে নিজের বেপরোয়া জামাইয়ের খোঁজ খবরও একটু নিও।”বন্যা মনে মনে নিজেকে ইচ্ছেমতো বকছে। প্রকাশ্যে অত্যন্ত নমনীয় কন্ঠে বলল,” ভাইয়া আসলে ঐরকম কিছু না।”আবির শ্বাস ছেড়ে শান্ত কন্ঠে বলল,” ভালোবাসলে নিজের মানুষের যত্ন নিতে শিখতে হয়। আর হ্যাঁ তোমাদের ননদ-ভাবির সম্পর্কের মাঝে ঢুকে পড়ার জন্য সরি। আল্লাহ হাফেজ। ”“আল্লাহ হাফেজ। ”আবির কল কেটে সরাসরি ছাদে গেল। মেঘ গান গাইতে গাইতে গাছের ঘাস পরিষ্কার করছে। আবির কিছুটা পেছনে দাঁড়িয়ে আস্তে করে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,” কেউ একজন বলেছিল আমি ফিরলে আমাকে সারপ্রাইজ দিবে। কিন্তু আজও দিল না! সে কি ভুলে গেছে?”মেঘ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,“সে ভুলে যায় নি কিন্তু… ”“কিন্তু কি?”“আপনি যদি কিছু মনে করেন”“আমি কিছু মনে করব না। বলুন…”মেঘ চিন্তিত কন্ঠে শুধালো,“আগে এটা বলুন, ভাইয়া যে বন্যাকে পছন্দ করে এটা কি আপনি জানেন?”আবিরের চিরচেনা কন্ঠস্বরের জবাব,“জানি।”মেঘ আঁতকে উঠে প্রশ্ন করল,“কবে থেকে জানেন?”“প্রায় আড়াই বছর হতে চললো।”মেঘ হতবার হয়ে তাকিয়ে থেকে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,“ভাইয়া এতবছর যাবৎ বন্যাকে পছন্দ করে?”“হ্যাঁ। এখন বল কি করেছিস?”“আমি তেমন কিছু করি নি। ভাইয়া বন্যাকে পছন্দ করে এটা কয়েকমাস হলো আমি জানতে পেরেছি। তাই বোন হিসেবে আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি।”আবির রাশভারি কন্ঠে শুধালো,“কি দায়িত্ব? ”মেঘ আস্তে করে বলল,“আমি আর মীম বন্যাকে ভাবি হওয়ার জন্য প্রপোজ করেছি আর ভাগ্যক্রমে বন্যাও রাজি হয়ে গেছে। আপনাকে ভিডিও দেখাবো নে।”আবির নিরেট কন্ঠে বলল,“এজন্যই ফোনে এত যত্নের সহিত ননদীনি বলে ডাকছিল। ”মেঘ ভারী কন্ঠে বলল,“আপনি কিভাবে জানেন?”আবির স্ব শব্দে হেসে বলল,“তোকে কল দিয়েছিল। আমি কল রিসিভ করে শুধু বলতে চেয়েছিলাম, তুই ছাদে। কিন্তু তার আগেই সে সব বলে ফেলছে। ”“তারপর? ”“তারপর আর কি, সে যেহেতু ননদ-দেবরের খোঁজ নিচ্ছে তাই ভাসুর হিসেবে আমারও তো পরিচয় টা দিতে হয়। তাই দিয়ে আসছি পরিচয়। ”“এটা কি করলেন আপনি?”আবির ঠাট্টার স্বরে বলল,“আমি তো কিছু করলাম ই না।”মেঘ কপাল গুটিয়ে সূক্ষ্ম নেত্রে তাকাতেই আবির মুচকি হেসে নিচে চলে গেছে।দু’দিন কেটে গেছে। আবির বন্যার ব্যাপারে তানভিরকে কিছুই জানায় নি কারণ তানভিরকে ভাবার জন্য দুদিন সময় দিয়েছিল। তানভির দুদিন পর সুন্দর ভাবে তার মতামত জানিয়েছে, সে বন্যাকে ছাড়া সে আর কাউকে পছন্দ কিংবা ভালোবাসতে পারবে না। বন্যার জন্য সে সবকিছু করতে পারে আরও অনেক কিছু বলেছে। আবির সব শুনে শান্ত কন্ঠে বলল,” তুই চাইলে বন্যাকে তোর মনের কথা বলতে পারিস।”তানভিরকে বিস্তারিত কিছু না বললেও কিছু কথাতে টুকটাক বুঝিয়েছে।আজ সকাল থেকে খান বাড়ির পরিবেশ অন্যরকম। মোজাম্মেল খানের শরীর খারাপ তাই অফিসে যাবেন না। তানভির একটা কাজে বেড়িয়েছে। আবিরের আব্বুর অফিসে ছোটখাটো একটা মিটিং আছে তাই আবিরও দ্রুত রেডি হয়ে বেড়িয়ে গেছে। মেঘ খেতে গিয়ে দেখে টেবিল সম্পূর্ণ ফাঁকা তাই না খেয়ে আবিরকে দেখতে গেল। আবির রুমে নেই দেখে মেঘের মন কিছুটা খারাপ হয়ে গেছে। আজ সকালে কল পর্যন্ত দেয় নি আবির। আবিরের খোঁজ নিতে মেঘ বেলকনিতে দাঁড়িয়েই আবিরের নাম্বারে কল দিল। আচমকা রুমের ভেতর থেকে রিংটোন বাজছে।“পাগল তোর জন্যে রে পাগল এ মন, পাগলমুখে বলি, দূরে যা মন বলে, থেকে যাদূরে গেলে মন বোঝে তুই কত আপন।”কল বাজতে বাজতে কেটে গেছে। আবির রিসিভ করে নি। মেঘ দ্বিতীয়বার আবিরের নাম্বারে কল দিল। পূর্বের ন্যায় রুম থেকে একই গান বাজতেছে। মেঘ কপালে ভাঁজ ফেলে আনমনে রুমে দিকে এগিয়ে গেল। বিছানার উপর আবিরের ফোনটা পড়ে আছে। সেই ফোনেই এই গান বাজতেছে। মেঘ এগিয়ে গিয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই রীতিমতো আশ্চর্য বনে গেল। মেঘ আর আবির একসঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজছে এমন একটা ছবি ভাসছে সাথে 🖤Soulmate🖤 নামে সেইভ করা নাম্বার। মেঘ আশ্চর্যান্বিত হয়ে তাকিয়ে আছে। মস্তিষ্কের নিউরন গুলো ছুটছে দ্বিকবিদিক। বুকের বা পাশটা অদ্ভুত অনুভূতিতে মেতেছে। অনেকদিন আগে আবিরের ফোনে নিজের নাম দেখার ইচ্ছে হয়েছিল মেঘের তবে সেটা কেবলমাত্র ইচ্ছেই ছিল৷ এখন তার এক বিন্দুও মনে ছিল না। গত পরশুদিন রাতেও মেঘ বন্যাকে কল দিয়ে মন খারাপ করে বলছিলো, আবির ভাই দেশে ফিরেছে তবুও তাকে ভালোবাসার কথা বলছে না, প্রপোজ পর্যন্ত করছে না। বন্যা অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে ঘুমাতে বলেছে। আজ সেই আবির ভাইয়ের ফোনে নিজের নাম, ছবি আর গানের রিংটোন শুনে মেঘ নিজের চোখ আর কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না।আনন্দে মেঘের দুচোখ টলমল করছে, ভেতরটা আনন্দে ভরে গেছে। প্রকাশ করার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। আচমকা আবিরের বাইকের শব্দ শুনে ফোন ফেলে মেঘ দ্রুত নিজের রুমে গেছে। আবির নিজের রুম থেকে ফোন নিয়ে মেঘের রুমের সামনে এসে থমকালো। দরজা থেকে উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,“কল দিয়েছিলি কেনো?”মেঘের দুচোখ ভেজা, চিকচিক করছে পানি। মেঘ আবিরের দিকে না তাকিয়েই কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,” খেয়েছেন কি না জিজ্ঞেস করতে কল দিয়েছিলাম।”“সত্যি? নাকি অন্য কিছু বলতে কল দিয়েছিলি?”মেঘ স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,” এমনিতেই কল দিয়েছিলাম। অন্য কোনো কারণ নেই।”আবির মেঘের দিকে ভালোভাবে তাকালো। মাথায় ওড়না দিয়ে মুখ ঢেকে বসে আছে। আবির মৃদু হেসে বলল,“হঠাৎ লাজুকলতা সাজার কারণ কি?”“এমনি। আপনি অফিসে যান।”এদিকে আলী আহমদ খান বার বার কল দিচ্ছেন। ১১ টায় মিটিং টাইম। যত দ্রুত সম্ভব যেতে হবে। আবির মেঘের থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত চলে গেছে। আবির বাসা থেকে বের হতেই মেঘ বন্যার নাম্বারে কল দিলো। প্রথমবার রিসিভ হয় নি, এরপর থেকে নেটওয়ার্ক বিজি, ব্যস্ত বলছে৷ অনেকক্ষণ ট্রাই করার পর একবার কল ঢুকেছে। বন্যা কল রিসিভ করে উত্তেজিত কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,“বেবি, তুই জিতে গেছিস।”এপাশ থেকে মেঘও বলে উঠল,“বেবি, আমি ওনার ভালোবাসার প্রমাণ পেয়ে গেছি।”বন্যা আর মেঘ একসঙ্গে চিল্লাচিল্লি শুরু করেছে। মেঘ বলছে সে আগে বলবে ওদিকে বন্যা বলছে বন্যা আগে বলবে। বাধ্য হয়ে মেঘের কথায় আগে শুনতে হলো। মেঘের কথা শেষ হতেই বন্যা বলে উঠল,“তুই একবার বলছিলি না,হয়তো আবির ভাইয়া বিদেশে যাওয়ার আগে থেকে তোকে ভালোবাসে? এটা মিথ্যা না, একদম সত্যি। আবির ভাইয়া তোকে তখন থেকেই ভালোবাসেন।”“তোকে কে বলছে?”“তোর ভাই গতকাল রাতে কল দিয়েছিল। আপু বাসায় নেই তাই এই সুযোগে ওনার সাথে অনেকক্ষণ কথা বলতে পেরেছি। তোকে বিস্তারিত ঘটনা পরে বলল। সবচেয়ে বড় কথা হলো, তোর ভাই সবকিছু জানতো।”মেঘ শক্ত কন্ঠে বলল,” আমি এতদিন যে প্রমাণ খোঁজছিলাম আজ সেই সব প্রমাণ পেয়ে গেছি৷”“এখন কি করবি?”মেঘ একটু ভেবে শান্ত কন্ঠে বলল,” এই জীবনে ওনার প্রপোজ আশা করাটা বোকামি ছাড়া কিছুই হবে না। যেহেতু আমি প্রমাণ পেয়ে গেছি তাই আমি আজই ওনাকে প্রপোজ করব।”“কিভাবে?”মেঘ মুচকি হেসে বলল,“তুই একটা হেল্প করতে পারবি?”“কি হেল্প?”“আমার জন্য একটা নীল শাড়ি কিনে আনতে পারবি? ”“তুই ওনাকে প্রপোজ করতে যাবি?”“হ্যাঁ যাব। আমি এতদিন প্রমাণ খোঁজেছিলাম৷ কিন্তু শক্তপোক্ত কোনো প্রমাণ পায় নি তবে আজ পেয়েছি। তাই আর ছাড়তে পারবো না। ওনি বলেছিলেন, ওনি বাসায় ফিরলে আমি যা চাই তাই হবে। আমি আজ ওনাকে চাইবো। আশা করি ওনি আমাকে ফেরাবেন না। তুই শুধু শাড়িটা কিনে নিয়ে আয়, প্লিজ। ”“আচ্ছা, ঠিক আছে। আসতেছি।”“লাভ ইউ বেবি ”“লাভ ইউ আমায় না বলে আমার ভাসুর কে বলিয়ো।”মেঘ লাজুক হেসে বলল,“উফ! আমার না ভাবতেই লজ্জা লজ্জা লাগছে। ”বন্যা হেসে বলল,“তুই রেডি হ, আমি শাড়ি কিনে নিয়ে আসছি।”
গল্পঃ আমৃত্যু ভালোবাসি তোকেলেখিকাঃ সালমা চৌধুরী..................................................................................................................................................................মেঘের হৃদয়ের অন্তঃস্থল অনবরত কম্পিত হচ্ছে। হৃদপিণ্ডের দিগবিদিক ছুটাছুটিতে শরীর জুড়ে অস্থিরতা কাজ করছে। চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে আবিরের ফোনের স্ক্রিনে দেখা নাম আর শ্রাবণের বৃষ্টিতে জলসিক্ত দুজনার ছবিটা। গত দুবছরে জমে থাকা প্রেমানুভূতিগুলো আজ যেন স্বস্তি পেল। মেঘ ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আনমনে ভেবে যাচ্ছে, ঠোঁটজুড়ে তার লাজুক হাসি লেগেই আছে। বন্যা মেঘদের বাসায় আসতে আসতে দুপুর হয়ে গেছে । অনেক দোকান ঘুরে মেঘের জন্য একটা নীল রঙের শাড়ি নিয়ে আসছে। বন্যা আসতেই মেঘ হুটোপুটি করে শাড়ি বের করে দেখতে লাগলো। মূলত সেদিন পার্কে শাড়ি পড়া মেয়েটাকে দেখার পর থেকেই মেঘের মনে সেটা স্থির হয়ে আছে। মেয়েটা অন্য রঙের শাড়ি পড়লেও মেঘ নীল রঙের শাড়ি পড়ছে। কারণ সাদা, কালো ব্যতীত আবিরের প্রিয় রঙের তালিকায় নীল রঙটায় আসে। তাছাড়া মেঘ আগেও খেয়াল করেছে, সে নীল রঙের জামা পড়লে আবিরের অভিপ্রায় সম্পূর্ণ বদলে যায়, অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে৷ তাই আজ ইচ্ছে করে নীল রঙের শাড়ি পড়ছে যেন আবির ভাই মেঘকে দেখে ফিদা হয়ে যায় আর মেঘ যা বলে সব মেনে নেয়।বন্যায় মেঘকে সাজিয়ে দিচ্ছে বিশেষ করে শাড়িটা বন্যায় পড়িয়ে দিচ্ছে। খুব ভালো না পারলেও বন্যা টুকটাক শাড়ি পড়াতে পারে। মেঘ হঠাৎ প্রশ্ন করল,“ভাইয়া কল দিয়ে তোকে কি বলছে রে?”“তোর ভাই তো অনেককিছু বলতে চাইছিল কিন্তু আমি সেসবে পাত্তা দেয় নি।”“কেনো?”“সেদিন আমার কল আবির ভাইয়া রিসিভ করার পরেই বুঝেছিলাম, আবির ভাইয়া তোর ভাইকে বলবে আর তোর ভাই আমাকে কল দিবেই দিবে। তাই আমি মনে মনে প্রশ্ন সাজিয়ে রেখেছিলাম। তোর সঙ্গে এত বছর যাবৎ চলছি আমি, আজ পর্যন্ত তোর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত ওনাকে একা নিতে দেখি নি। প্রথম প্রথম ভাবতাম আবির ভাইয়া ওনার বেস্ট ফ্রেন্ডের মতো, বড় ভাইও তাই হয়তো বলেন বা জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা বাড়লো, আবির ভাইয়ার প্রতি তোর ক্ষোভ ছিল এতবছর তাই আমি তোকেও ঐভাবে কিছু বলি নি। তবে ইদানীং ওনার সাথে আমার বেশ কয়েকবার আলাদাভাবে দেখা হয়েছে, বিভিন্ন টপিকে কথা হয়েছে কিন্তু তোর টপিক আসলে ওনার মুখে আবির ভাইয়ার নাম এমনিতেই চলে আসে। ভাইয়া বলেছে এটা করতে, ভাইয়া এটা করতে বারণ করেছে, ভাইয়াকে বলে দেখি । হয়তো মুখ ফস্কে বলে ফেলেন পরে বুঝতে পেরে কথা কাটিয়ে বলেন, বাসায় কথা বলতে হবে। তুই একদিন আবির ভাইয়ার কলেজ ফ্রেন্ডদের বিষয়ে বলেছিলি এই সবগুলো বিষয়ই আমায় মাথায় ছিল। সবচেয়ে বড় বিষয় সেদিন হাসপাতালে তুই যখন অজ্ঞান ছিলি তখন আবির ভাইয়া ফোনে ওনাকে যেভাবে ঝারছে, তুই বিশ্বাস করবি না ওনার চোখ-মুখ একদম অন্ধকার হয়ে গেছিল। তারপরও ওনি একটা টু শব্দ পর্যন্ত করেন নি। সেদিন ই সিউর হয়েছিলাম ওনি কিছু না কিছু হলেও জানেন । আমি শুধু ওনাকে জিজ্ঞেস করার সুযোগ খোঁজছিলাম। গতকাল ওনি কল দিলেন, আপুও বাসায় নেই এই সুযোগে রাত ৩ টার উপরে পর্যন্ত শুধু তোর বিষয়েই কথা বলেছি। তোকে কথাগুলো জানানোর জন্য আমার ভেতরটা ছটফট করছিল, কিন্তু ঘুমে চোখও টানতেছিল। ওনার সাথে কথা বলতে বলতে কখন জানি ঘুমিয়ে পরছিলাম৷ সকালে সজাগ হয়েই আগে তোকে কল দিয়েছি।”মেঘ উত্তেজিত কন্ঠে শুধালো,“ভাইয়া কি বলছে?”“আমি প্রথমেই ওনাকে জিজ্ঞেস করেছি, সেদিন হাসপাতালে কি আবির ভাইয়া কল দিয়েছিলেন? ওনি উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বলেছেন। আমি আবারও জিজ্ঞেস করেছি, “আবির ভাইয়া কি মেঘকে পছন্দ করেন?”ওনি এর উত্তরেও “হ্যাঁ” ই বলেছেন। তখন আমি সরাসরি জিজ্ঞেস করি, ‘আবির ভাইয়া কি বাহিরে পড়তে যাওয়ার আগে থেকেই মেঘকে পছন্দ করেন? হ্যাঁ কি না৷’ ওনি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়েছেন ‘হ্যাঁ’ তারপর আরও কয়েকটা প্রশ্ন করেছি, ওনি সবগুলোতেই ঠিকঠাক উত্তর দিয়েছেন।”“তুই জিজ্ঞেস করিস নি ভাইয়া কবে থেকে জানে?”“জিজ্ঞেস করেছি, ওনি বলেছেন ওনি অনেক আগে থেকেই সবকিছু জানেন।”মেঘ চেঁচিয়ে উঠল,“হোয়াট? ভাইয়া আমার সাথে এত বড় ধোঁকাবাজি টা করতে পারলো?”বন্যা শান্ত স্বরে বলল,“গতকাল রাতে এই কথা শুনামাত্র আমিও চিৎকার করেছিলাম৷ রাগে কটমট করে বলেছিলাম, আপনি সবকিছু জানার পরও মেঘকে এত কষ্ট কেনো দিচ্ছেন? আপনি জানেন মেঘ আপনাকে পাগলের মতো ভালোবাসে তারপরও আপনি এটা কিভাবে করতে পারলেন? তখন ওনি বলছেন, ওনি আবির ভাইয়ার কথার উপর কিছু বলতে পারতেন না আর কখনো পারবেনও না। আমার মেজাজ আরও বেশি খারাপ হয়ে গেছিল, আমি মুখ ফস্কে বলে ফেলছিলাম,“আবির ভাইয়ার মধ্যে যদি বিন্দুমাত্র মনুষ্যত্ববোধ থাকতো তাহলে মেঘকে এত কষ্ট দিতো না। ”মেঘ শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,“ভাইয়া ধমক দেয় নি তোকে?”“না ধমক দেন নি তবে রাগে রাগে বলছেন, তুমি ভাইয়ার সম্পর্কে কতটা জানো যে ভাইয়াকে নিয়ে এসব কথা বলছো। ভাইয়া বনুকে যতটা ভালোবাসে আর বনুর ব্যাপারে যে পরিমাণ পসেসিভ আমি সারাজীবনেও তার একাংশ হতে পারব না।”মেঘ মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে বলল,” এই অফুরন্ত ভালোবাসা কোথায় ছিল এতদিন?”বন্যা মুচকি হেসে বলল,“তারথেকেও বড় শকিং নিউজ শুনবি?”“কি?”” আবির ভাইয়ার অবর্তমানে ৭ বছর তুই যে রিলাক্স জীবন কাটিয়েছিস সেই সবটায় ছিল আবির ভাইয়ার প্ল্যান। তুই হয়তো প্রকাশ্যে বা স্বইচ্ছায় আবির ভাইয়ার সঙ্গে কোনোদিন কথা বলিস নি কিন্তু ওনি ঠিকই তোর কথা শুনেছে। এমন একটা দিন বাদ যায় নি যে তোর কন্ঠ না শুনে ভাইয়া ঘুমিয়েছেন। তুই রাগ করলে মাঝরাতে তোর ভাই ঘুম থেকে ডেকে নিজে রান্না করে বা তোর পছন্দের খাবার এনে তোকে সামনে বসিয়ে খাইয়ে তোর রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করতো ঠিকই কিন্তু তখন ফোনের ওপাশে আবির ভাইয়া থাকতেন। শুধুমাত্র তোর কথা শুনার জন্য ওনি আলাদা ফোন ইউজ করতেন, ঘন্টার পর ঘন্টা তোর ভাইয়ের সঙ্গে অডিও কলে থাকতেন। তোর ভাইয়া আরও যা যা বলেছেন তা শুনে আমি রীতিমতো আকাশ থেকে পড়েছি। তোর অভিমানের তোপে পড়ে একপ্রকার বাধ্য হয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন ওনি, অথচ দূরে থেকেও পাগলের মতো ভালোবেসে গেছেন৷ তুই বোন অনেক লাকি। দোয়া করি, যেন সারাজীবন আবির ভাইয়ার স্প্যারো হয়ে থাকতে পারিস।”মেঘ মিষ্টি করে হেসে শাড়ির আঁচল ছড়িয়ে ড্রেসিং টেবিলের দিকে তাকিয়ে বলল,” ইনশাআল্লাহ। এখন বল আমায় কেমন লাগছে? ওনাকে পাগল করার জন্য যথেষ্ট না?”বন্যা হিজাব ঠিক করে দিতে দিতে বলল,” মাশাআল্লাহ, তোকে খুব সুন্দর লাগছে। আবির ভাইয়া ছাড়া আর কারো নজর যেন না লাগে।”দুপুরের পর থেকে ড্রয়িং রুম ফাঁকায় থাকে তবুওমেঘ আর বন্যা চুপি চুপি বাসা থেকে বেড়িয়েছে। মেঘের আব্বু আজ বাসায় আছেন। মেয়ে এত সেজেগুজে বের হচ্ছে দেখলে নিশ্চিত শখানেক প্রশ্ন করতে শুরু করবেন। মুহুর্তেই তানভির, আবির সবাইকে জড়ো করে ফেলবেন। এই ভয়ে লুকিয়ে বের হতে হয়েছে। বাসা থেকে বেড়িয়ে দুজন দুই রিক্সা নিয়ে আলাদা আলাদা গন্তব্যে রওনা দিল। বন্যা সরাসরি বাসায় যাচ্ছে। মেঘ পার্কে যাচ্ছে, যাওয়ার সময় একগুচ্ছ লাল আর হলুদ গোলাপও সঙ্গে নিয়েছে। জ্যাম পার করে পার্ক পর্যন্ত আসতে মেঘের অনেকটায় সময় লেগেছে। আজ অফিস ডে হওয়ায় পার্কে খুব বেশি মানুষের ভিড় নেই আবার একেবারে ফাঁকাও না। শাড়ি পড়ে একা একা হাঁটতেও খুব বিরক্ত লাগছে, কিছুদূর গিয়ে গাছের নিচে একটা ব্রেঞ্চে বসলো। ফুলগুলো পাশে রেখে ফোনটা হাতে নিলো। আবিরকে ফোন দেয়ার খুব চেষ্টা করছে কিন্তু ভয়ে হাত কাঁপছে। বাসা থেকে খুব সাহস নিয়ে বের হলেও পার্ক পর্যন্ত আসতে আসতে সাহসের ছিটেফোঁটাও বেঁচে নেই। হাতের কম্পনের কারণে কাঁচের চুড়ি গুলো একে অন্যের সঙ্গে বারি খাচ্ছে। মেঘ সঙ্গে সঙ্গে ফোন পাশে রেখে চুড়ি খুলতে শুরু করলো। নিজের উপর প্রচন্ড রাগ হচ্ছে, শরীর ঘামছে, লাল টকটকে রঙের লিপস্টিকে রাঙা ওষ্ঠদ্বয় তিরতির করে কাঁপছে। অকস্মাৎ বন্যার কল আসছে। কল রিসিভ করতেই বন্যা বলল,“আবির ভাইয়াকে কল দিয়েছিস?”“সাহস পাচ্ছি না ।”“আমি জানতাম তুই এমন কান্ড করবি। জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে কল দে ওনাকে। যা হওয়ার হবে।”মেঘ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,“ঠিক আছে, দেখছি।”মেঘ পার্কে এসেছে প্রায় ২০ মিনিট হয়ে গেছে। এখনও আবিরকে কলই দিতে পারছে না। বারবার ফোন হাতে নিচ্ছে আবার রেখে দিচ্ছে। সূর্য পশ্চিমা আকাশে অনেকটায় হেলে পড়েছে। পল্লবিত আঁখিতে তাকিয়ে সেই দৃশ্য দেখছে। মেঘ আচমকা নড়েচড়ে বসলো। এরমধ্যে মেঘের থেকে কিছুটা দূরে একটা বাইক এসে থামলো কিন্তু মেঘের সেদিকে নজর নেই। মেঘ দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে ফোন হাতে নিয়ে আবিরের নাম্বারে কল দিল। হাঁটুর উপর হাত রেখে ঝুঁকে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে মেঘ বারবার ঢোক গিলছে। আবির কল রিসিভ করলে কি বলবে মনে মনে তাই সাজাচ্ছে। অকস্মাৎ মেঘের ঠিক সামনে কেউ একজন দাঁড়াতেই মেঘ আঁতকে উঠল, নীল রঙের একটা আবছায়া চোখে লাগতেই মেঘ মেরুদণ্ড সোজা করে বসতে বসতে সূক্ষ্ম নেত্রে তাকাতে নিল। ততক্ষণে আবির মেঘের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পরেছে। আবিরকে দেখেই চমকে উঠল মেঘ। মেঘের অবিশ্বাস্য চাহনি দেখে আবির মুচকি হাসলো। আবিরের পড়নে নীল পাঞ্জাবি, সানগ্লাসটা বুকের উপর পাঞ্জাবিতে ঝুলানো, চুল দেখে বুঝায় যাচ্ছে বাইক থেকে নেমে হাতেই ঠিক করেছেন, ঠোঁটে লেগে আছে মায়াবী হাসি। আবির একমুহূর্ত দেরি না করে মেঘের সামনে একগুচ্ছ সাদা গোলাপ ধরে নেশাক্ত কন্ঠে বলতে শুরু করল,❝তুই আমার মন পিঞ্জরেনিপট অপ্রমাদীতে থাকাএক অন্ত:শীল ক্ষীণত্ব,অনুভূতির রাজ্যেরতৃষ্ণার্ত কাব্য।এলোকেশীর এলো চুল,উত্তাল উদধির তরঙ্গের ন্যায়কুহকিনী হাসি,প্রণয়ীনীর নিখুঁত আত্ততা,মৃগনয়নার মতো বিমুগ্ধ চোখেবারংবারহারিয়ে খোঁজেছি নিজেকে।তুই আমার প্রণয়ের প্রদাহের সেই পূর্ণতা,অপ্রমেয় নীলাম্বরের অসীমত্বছাড়ানো স্নিগ্ধতা।তুই কি আবিরের হৃদয় রাজ্যেররাজ্ঞী হবি?❞মেঘ দু’হাতে মুখ চেপে ডাগর ডাগর চোখে আবিরের অভিমুখে তাকিয়ে ছিল৷ হার্টবিট বেড়েছে কয়েকগুণ, সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। আবিরের প্রশ্নে চক্ষুদ্বয় প্রশস্ত করে অবচেতন মনে চেঁচিয়ে উঠল,“না। আমি মানি না। ”মেঘের চোখে মুখে অল্প বিস্তর ক্রোধের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আশেপাশে বসা ২-৪ জন মেঘ- আবিরের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন মেঘ আর একটা চিৎকার দিলেই ছুটে আসবে। আবির আশেপাশে তাকিয়ে পরিস্থিতি বুঝে নিল। মেঘের মায়াবী দুই আঁখি আবিরের চোখে মুখে নিবদ্ধ। সকাল থেকে নেয়া মানসিক প্রিপারেশন, সাজগোজ সব যেন বৃথা হয়ে গেল। মেঘ মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে বলল,” আপনি আমার সব প্ল্যান ধ্বংস করে দিতে পারলেন?”আবির তখনও হাঁটু গেড়ে বসে আছে। হাতে থাকা সাদা গোলাপগুলোর দিকে তাকিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে আস্তে করে আবারও বলল,❝ আমি রূপকথার রাজকুমার হতে চাই না,শুধুতোর মনের রাজ্যের রাজা হতে চাই।Will you be my queen? ❞মেঘ কাঁদো কাঁদো মুখ করে তাকিয়ে আছে। আবির বিরক্ত হয়ে ঠান্ডা কন্ঠে হুমকি দিল,” No problem. If you don’t take the flowers, I will give them to another girl. Will I?”কথাটা বলতে দেরি হয়েছে কিন্তু আবিরের হাত থেকে মেঘের ফুল টেনে নিতে দেরি হয় নি। ফুলগুলো আলতোভাবে জড়িয়ে ধরে মেঘ হুঙ্কার দিয়ে উঠল,“ফুলও আমার আর আপনি সহ আপনার রাজ্যও আমার। আপনার মনের রাজ্যে কেউ উঁকিও দিতে পারবে না। এই আমি বলে রাখলাম। ”মেঘ রাগে ফোঁস ফোঁস করছে, মাথা নিচু করে ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে। আবির নিঃশব্দে হেসে নিজের দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে মেঘের উরুতে মাথা রেখে মেঘের চোখের দিকে তাকালো। মুহুর্তেই মেঘের রাগ আর অভিমান উধাও হয়ে গেছে, মেঘের হৃদপিণ্ডের গতি অস্বাভাবিক, জোরালো হৃৎস্পন্দনের শব্দ বাহির থেকে শুনা যাচ্ছে। আনমনেই হাতের ফুলগুলো বুকের সঙ্গে চেপে ধরে আবিরের দিকে তাকালো। আবিরের নেশাক্ত হাসিতেই মন্ত্রমুগ্ধ মেঘ। আবির অত্যন্ত মায়াবী কন্ঠে বলল,” মনের রাজ্যে উঁকি দেয়া তো দূর, আমার দিকে কেউ তাকানোর আগেই বলে দিব,প্লিজ খালা, আমার দিকে তাকাবেন না। আমার ঘরে একটা পরী মতো বউ আছে। বউটা যেমন কিউট তেমন হিংসুটে৷”আবিরের মুখে বউ শব্দটা শুনে মেঘ আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে আছে। অজানা শিহরণে মন উড়ুউড়ু করছে।বার বার কানে বাজছে,“আমার ঘরে একটা পরীর মতো বউ আছে।” অদ্ভুত অনুভূতি মনকে রাঙিয়ে দিচ্ছে। লজ্জায় আবিরের চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে অনেক আগেই তবুও বক্ষস্থলের ইতস্ততা কাটাতে পারছে না। আবির মেঘের উরু থেকে উঠে মেঘের ডানহাতটা নিজের কাছে টেনে নিল। আবিরের অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে মেঘের হাত সহ সম্পূর্ণ শরীর কম্পিত হচ্ছে। আবির হাতটাকে শক্ত করে ধরে মৃদুভাবে চুমু খেয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,“আজ থেকে আমি শুধু তোর। আমার উপর তোর অধিকার সবচেয়ে বেশি। তুই যখন যা বলবি তাই হবে। খুশি?”আবিরের চুমুতে মেঘের শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠেছে। সেদিন অর্ধ ঘুমে থাকায় আবিরের কপালে দেয়া চুমুটা সেভাবে উপলব্ধি করতে পারে নি। তবে আজ মেঘ সম্পূর্ণ সজ্ঞানে আছে। মেঘ নির্বাক হয়ে বসে আছে, বহু চেষ্টা করেও গলা দিয়ে কথা বের করতে পারছে না। যেই আবির ভাইয়ের প্রণয়ের স্রোতে সর্বক্ষণ ভেসে যেতে চাই সেই আবিরের প্রেমিক সুলভ আচরণ, আবেগময় কথার কোনো প্রতিত্তোর করতে পারছে না। মেঘ আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো। চোখ নামাতেই নিজের কেনা লাল আর হলুদ গোলাপের দিকে নজর পরলো। সহসা মনে পড়ে গেছে নিজের করা পরিকল্পনার কথা। মেঘ গুরুতর কন্ঠে বলে উঠল,” আপনি এটা কেন করলেন? আমি সকাল থেকে প্ল্যান করে ভাবিকে দিয়ে শাড়ি কিনিয়ে সেজেগুজে আসছি আর আপনি আমার সব পরিকল্পনা নষ্ট করে দিয়েছেন। আপনি খুব পঁচা। ”আবির মেঘের হাত ছেড়ে বসা থেকে উঠে সরাসরি মেঘের দুপাশের ব্রেঞ্চে হাত রেখে মেঘের দিকে ঝুঁকে দাঁড়ালো। মেঘ ঠোঁট উল্টে মনমরা হয়ে আবিরের দিকে চেয়ে আছে। আবির প্রশস্ত আঁখিতে তাকিয়ে নিরেট কন্ঠে বলল,” আমার এতবছরের অনুভূতি, আসক্তি আর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা আপনি কেবল কয়েক ঘন্টায় তছনছ করে দিয়েছেন। তবুও আমি চুপচাপ বসে দেখবো? আপনি ভাবলেন কিভাবে?”মেঘ নিরেট দৃষ্টিতে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে শুধালো,” আমি এখানে আসছি এটা আপনি কিভাবে জানেন?”আবির মুচকি হেসে বলল,“সকালে আপনার হাবভাব দেখেই সন্দেহ হয়েছিল। তানভিরকে কলও দিয়েছিলাম কিন্তু ও ফোন রিসিভ করে নি। ২ বেজে ৩৭ মিনিটে আপনি শাড়ি পড়ে বাসা থেকে বের হতেই আমার কানে খবর চলে গেছিলো। তানভিরকে কল দিতে দিতে অতঃপর জানতে পারলাম যে, আমার সন্দেহ ঠিক ছিল। তানভির বন্যাকে বলে ফেলছে মানে আপনার কানে কথা চলে গেছে। ৩:১৬ তে ফুলের দোকানে ফুল কিনছিলেন আর আমি তখন শপিং মলে আপনার শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং পাঞ্জাবি খোঁজতে ব্যস্ত। আপনি এখানে এসে বসেছেন ঠিক ৪:২২ এ। তখন আমি রেডি হয়ে বেড়িয়ে ফুল কিনতে যাচ্ছি। ফুল নিয়ে আসতে আসতে তাই একটু দেরি হয়ে গেছে।”“আপনি এতকিছু কিভাবে জানেন?”“ম্যাম, আপনাকে আগেই বলেছিলাম, আপনাকে ছাড় দিয়েছি কিন্তু ছেড়ে দেয় নি। তাছাড়া আপনি যার তার মনের মানুষ না। মনে রাখবেন, আবিরের পৃথিবী আপনি। আর সেই পৃথিবীকে আগলে রাখতে আবির সবকিছু করতে পারে। খান বাড়িত চারপাশ ঘিরে এমন কিছু ব্যক্তি আছে যারা নিজের কাজের পাশাপাশি সর্বক্ষণ বাসার দিকে নজর রাখে। খান বাড়িতে কখন কে আসছে, কে যাচ্ছে, কেনো আসছে সব আপডেট আমাকে পাঠায়৷ এমনকি এইযে আমি আপনি এখানে আছি, এখানেও আমার লোক আছে।”মেঘ কপাল কুঁচকে বলল,“অ্যাহ! বললেই হলো। মজা করেন আমার সাথে?”আবির মেঘের চোখে চোখ রেখে বলল,“আমার ডানপাশে কিছুটা দূরে কালো টিশার্ট পড়া ছেলেটাকে দেখ, তার পেছন দিকে কফি কালার শার্টের ছেলে আর ঐদিকে বাইকে বসা ছেলেটাকে দেখ।”মেঘ তিনজনকে এক পলক দেখে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো,“তারা আপনার লোক?”“হুমমমমম। বিশ্বাস হয় না?”“না।”“ওকে, ওয়েট।”আবির ফোন বের করে মেসেজ পাঠাতেই ছেলেগুলো যে যার মতো চলে যাচ্ছে। মেঘ অবাক চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,“ওনারা সত্যি আপনার লোক? আপনার কথায় সেকেন্ডের মধ্যে চলে গেছে। কিভাবে সম্ভব?”“আপনার জন্য সব সম্ভব।”মেঘ চোখ বড় করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,” তারা এখানে কেনো আসছিল? ”“আমার অবর্তমানে কেউ যেন আমার স্প্যারোর দিকে চোখ তুলে তাকাতে না পারে তারজন্য।”“তাই বলে তিনজন? আর ওনারা আপনার কি হয়?”“দুজন ছোট ভাই, একজন ফ্রেন্ড। তিনজনের বাসা কাছাকাছি তাই বলেছিলাম আমি আসার আগ পর্যন্ত কেউ যেন আশেপাশে থাকে। এসে দেখি তিনজন ই উপস্থিত। ”মেঘ নিজের কেনা ফুল গুলোর দিকে তাকিয়ে শীতল কন্ঠে বলল,” ওনাদের জন্য আজ আমার সব শেষ হয়ে গেল।”আবির ব্রেঞ্চ থেকে মেঘের খুলে রাখা চুড়িগুলো তুলে মেঘের হাতে পড়াতে পড়াতে বলল,” আর আপনার জন্য আপনার সব পরিকল্পনা নষ্ট হয়ে গেছে।”“মানে?”“কিছু না। চলুন।”মেঘ নিজের ফুলগুলো আবিরের সামনে ধরে হিমশীতল কন্ঠে বলে উঠলো,” I Love You ”আবির ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,“লাল ফুল গুলো সরিয়ে শুধু হলুদ গোলাপগুলো দেন।”“কোনো?”“লাল গোলাপ ছুঁতে চাই না তাই।”মেঘ যথারীতি হলুদ গোলাপ গুলো আলাদা করে ধরতেই আবির ফুল গুলো হাতে নিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,“থ্যাংক ইউ।”মেঘ আহাম্মকের মতো তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,“কেউ আই লাভ ইউ বললে প্রতিত্তোরে থ্যাংক ইউ বলে না, আই লাভ ইউ টু বলতে হয়। ”আবির কথাটা শুনলো কি না কে জানে। কয়েকটা পিচ্চি ছেলেকে ডেকে লাল গোলাপ গুলো দেখিয়ে নিয়ে যেতে বলল। পরপর মেঘকে নিয়ে বাইক স্টার্ট দিল, নিরুদ্দেশের পথে ছুটলো। মেঘ দু একবার জিজ্ঞেস করেছে, কিন্তু আবির তেমন কিছুই বলে নি। সন্ধ্যে হয়ে গেছে, মেঘ চুপচাপ বাইকে বসে আছে। আবির বাইকের স্প্রীড কমিয়ে হঠাৎ ডেকে উঠল,” ম্যাম…! ”“জ্বি। ”“এত চুপচাপ কেনো?”“এমনিতেই।”আবির রাস্তার পাশে বাইক থামিয়ে ঘাড় কাত করে মেঘকে খানিক দেখে নিলো। আবির মেঘের দু’হাত এনে নিজের পেটের উপর রেখে রাশভারি কন্ঠে বলল,” আজ থেকে এই হাতের অবস্থান এখানে।”মেঘ আনমনে হেসে আবিরের গা ঘেঁষে বসলো৷ পেছন থেকে আলতোভাবে আবিরের পেট আঁকড়ে ধরল। আবির যথারীতি আবারও বাইক স্টার্ট দিল, শহর থেকে বেড়িয়ে অনেকটা রাস্তা গিয়ে আবির বাইক থামালো। আশেপাশে কয়েকটা দোকান ছাড়া তেমন বাড়িঘর নেই। একদম কোলাহল শূন্য পরিবেশ। আবির মৃদু হেসে বলল,” ৫ মিনিটের জন্য আপনার চোখ বেঁধে দিলে আপনি কি রাগ করবেন?”“চোখ কেনো বাঁধবেন?”“সেটা ৫ মিনিট পর বুঝবেন, প্লিজ।”মেঘ আশেপাশে তাকিয়ে দেখছে। একে অপরিচিত জায়গা, তারউপর আশেপাশে মানুষও তেমন নেই। আবিরের মুখের দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে বলল,“ঠিক আছে। ”আবির এক গাল হেসে মেঘের চোখ বেঁধে সঙ্গে সঙ্গে মেঘকে কোলে তুলে নিল। মেঘ আবিরের বুকে মাথা রেখে চুপ থেকে আবিরের হৃৎস্পন্দনের শব্দ শুনছে। ২-৩ মিনিট পর মেঘকে একটা জায়গায় নামালো।মেঘের চোখ তখনও বন্ধ। চোখ থেকে কাপড় সরতেই মেঘ আশ্চর্যান্বিত নয়নে তাকালো। এটা একটা বাসা, যার গেইটের উপরে লেখা,“Sparrow’s Dreamhouse.”আবির অনুচ্চ স্বরে বলল,” ম্যাম, আপনার গিফট। ”মেঘের বিষ্ময় যেন কমছেই না। আবির মেঘের হাত টা শক্ত করে ধরে দরজার সামনে দাঁড়ালো। আবির চোখের ইশারায় মেঘকে দরজা খুলতে বলল। মেঘ বাম হাতে আস্তে করে দরজা ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেছে। অকস্মাৎ বাড়ির ভেতরে সাউন্ড বক্সে গান বাজতে শুরু করল,”শোন বলি তোমায় না বলাকথাগুলো আজ বলে দিতে চাই,বল কি বলতে চাও,সারাটি জীবন ধরে শুনে যেতে চাইভালবাসি আমি যে তোমায়এই কথাটাই ছিল শুধু বলারভালবাসি আমিও তোমায়সব কথা কি মুখে বলে দিতে হয়”দরজা খুলামাত্র মেঘের চোখ পরে ড্রয়িং রুম সাথে বিশালাকৃতির সিঁড়ির দিকে যা গাদাঁ ফুলে সজ্জিত, ফ্লোর জুড়ে গাঁদা ফুলের পাপড়িতে ছেয়ে আছে। সিঁড়ির উপর জ্বলমল করছে আবির আর মেঘের একটা ছবি যেটা কোন এক রেস্টুরেন্টে তোলা। ছবি দেখে মনে হচ্ছে যেন দুজন দু’জনের চোখে চোখ রেখে নিজেদের অব্যক্ত অনুরক্তি জাহির করছে। মেঘ চারপাশে চোখ ঘুরাতেই এমন আরও কয়েকটা ছবি চোখে পড়লো। দেয়ালে ছবি লাগানো টা খান বাড়ির কেউ ই তেমন পছন্দ করে না, তাই শখেও কেউ কখনো নিজের ছবি ফ্রেমবন্দি করে নি। মেঘ অবাক চোখে ছবিগুলো দেখছে আর ঘটনাগুলো মনে করার চেষ্টা করছে। কারণ ছবিগুলোর প্রায় সবই মেঘের অগোচরে তোলা হয়েছে। আবির মোলায়েম কন্ঠে বলল,“চিন্তা করিস না, ছবিগুলো সরিয়ে দিব। এগুলো শুধু স্পেশাল দিনের জন্য করিয়েছি।”ছবিগুলোর থেকে মেঘের দৃষ্টি সরলো। আবির মেঘের হাতটা আর একটু শক্ত করে ধরে পা বাড়ালো। মেঘ আজ নির্বাক, এ জীবনের সেরা সারপ্রাইজটা পেয়েছে সে। বাকরুদ্ধ মেঘ এক হাতে আবিরের দেয়া গোলাপগুলো শক্ত করে ধরে আবিরের অভিমুখে চেয়ে তাকে অনুসরণ করল। সাউন্ডবক্সে তখন গান বাজছে,“আকাশের ঐ নীল ঠিকানায়মেঘেরা সাদা ডানা ছড়ায়ও দেরি সেই ভালবাসাএ মনে আজ পেয়েছে ঠাইজড়াবো আদুরেতোমাকে অনুভবেআকাশের চেয়ে বেশীতোমাকে ভালবাসি”কিছুটা সামনে এগুতেই সিঁড়ি উপরে প্রায় ২০-৩০ জন হাতে ফুলের পাপড়ি সমেত উপস্থিত হলো। সবাই একসঙ্গে বলে উঠল,“Welcome to your dreamhouse, Madam.”আকস্মিক ঘটনায় মেঘ কিছুটা ভড়কালো, সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠল মেঘের ছোট্ট দেহ। মেঘ কয়েকজনকে মোটামোটি চিনে তবে বেশিরভাগই আবিরের অফিসের স্টাফ। মেঘ আনমনেই রাকিব ভাইয়া,রাসেল ভাইয়াদের খোঁজলো কিন্তু তারা এখানে নেই। আবিরের কর্মকাণ্ডে মেঘ পদে পদে আশ্চর্যের চূড়ায় পৌছে যাচ্ছে। মনের ভেতর চলমান অস্থিরতা এখন আরও বেশি কাজ করছে। আবির মেঘের হাত থেকে ফুলগুলো নিয়ে সিঁড়ির পাশে রেখে অকস্মাৎ মেঘকে কোলে তুলে নিল। ওমনি মেঘের নিঃশ্বাস আঁটকে গেছে, আতঙ্কিত হয়ে মেঘ অতর্কিতেই আবিরের পাঞ্জাবির কলার খামচে ধরলো, শক্ত করে চোখ বন্ধ করে নিল। আবির মুচকি হেসে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো। মস্তিষ্ক ক্ষণিকের জন্য আবেগশূন্য হয়ে গেছে। গাঁদা ফুলের পাপড়ি মেঘের চোখে মুখে বারি খাচ্ছে, আকাশচুম্বী লজ্জা আর ইতস্তততায় মেঘ চোখ খুলতে পারছে না, ইচ্ছে করছে সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে কোনো এক অন্ধকারাচ্ছন্ন ভূখন্ডে পদার্পণ করতে। আবির যেতে যেতে তার পিএসকে উদ্দেশ্য করে থমথমে কন্ঠে বলল,“মিরাজ, সবার খাবারের ব্যবস্থা করো।”“জ্বি ভাইয়া।”মেঘের হুট করে নেয়া সিদ্ধান্তে আবিরের সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। না পারতেছিল মেঘকে আটকাতে আর না পারছিল নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে। তাই বাধ্য হয়ে অফিসের স্টাফদের দিয়েই সবকিছু গুছাতে হয়েছে। তাদের খুব ইচ্ছে ছিল মেঘকে ফুল ছিটিয়ে ওয়েলকাম করবে, তাই আবিরও তেমন আপত্তি করে নি। আবিরের নিষ্পলক দৃষ্টি আঁটকে আছে মেঘের লজ্জায় ললিত ধৃষ্টতায়। মেঘের চোখ তখনও বন্ধ, আবিরের উষ্ণ শ্বাস আঁচড়ে পড়ছে মেঘের গায়ে। আবির ছাদের দরজার পাশে এসে থামলো। মেঘকে নামিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,” চাইলে এবার তাকাতে পারেন।”মেঘ মিটমিট করে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে মেঘের আঁখি যুগল প্রশস্ত হয়ে গেছে। সম্পূর্ণ ছাদ লাইটিং করা, রঙবেরঙের আলোতে সজ্জিত সবকিছু। রাকিব এগিয়ে এসে মৃদু হেসে বলল,” সরি ভাবি, সময়ের অভাবে আজ ঠিকমতো সাজাতে পারি নি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনাদের বাসরঘর আমি নিজের হাতে সাজাবো। এমনভাবে সাজাবো যেন বাসরঘর দেখতে দেখতেই রাত পেরিয়ে যায়।”রাকিবের মুখে ভাবি ডাক শুনে মেঘ খুশি হবে নাকি বাকি কথার জন্য লজ্জা পাবে সেটাও বুঝতে পারছে না। আবির শক্ত কন্ঠে ধমক দিল,“শুধু শুধু আমার বউটাকে লজ্জা দিচ্ছিস কেনো?”“ওহ হো। আমরা কিছু বললেই লজ্জা দিচ্ছি। আর তুই যে এখানে বাসর করার প্ল্যান করছিলি এটা বললে কি হবে!”আবির চোখ রাঙিয়ে পরপর মেঘের দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,” বিয়ে করে রাকিবের মাথা নষ্ট হয়ে গেছে, তুই কিছু মনে করিস না। চল ঐদিকে ।”সাউন্ডবক্সে একই গান বার বার বাজতেছে,“সাত সাগর আর তের নদীপার হয়ে তুমি আসতে যদিরূপকথার রাজকুমার হয়েআমায় তুমি ভালবাসতে যদি”ছাদের একপাশে যেতেই মেঘ আরেক দফায় বিস্মিত হলো। লাইটিং করা ইংরেজি বড় বড় অক্ষরে লেখা,” Marry Me?”মেঘ দু’হাতে মুখ চেপে সেই লেখাটা দেখছে। রাসেল, লিমন, মোবারক ভাইয়া সহ আবিরের আরও ৪-৫ জন ফ্রেন্ড এখানে উপস্থিত। এই অপরূপ মুহুর্তের কথা মেঘ কল্পনাতেও ভাবতে পারে নি। ছাদের এই কর্ণার টা কাঁচা ফুল দিয়ে এমন সাজানো যা দেখে মেঘের চোখ ই সরছে না। রাসেলরা সবাই আতশবাজিসহ আরও কিছু জিনিসপত্র নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।মেঘ আবিরকে দেখার জন্য আলতোভাবে চোখ ঘুরালো। আবির হাঁটু গেড়ে বসে মেঘের দিকে একটা আংটি ধরে ক্ষীণ স্বরে বলল,“তুই আমার অবসন্ন হৃদয়েরঅস্ফুট প্রফুল্লতা,আমার প্রণয়ের একমাত্রপরিণীতা।”আবিরের ধারালো ছুরির ন্যায় চাহনি। পুনরায় নেশাক্ত কন্ঠে বলল,“Will you be my soulmate?”মেঘ আবেগময় কন্ঠে ঝটপট বলল,“Yes.”আশেপাশে রাকিব,রাসেলদের দিকে তাকানোর মতো অবস্থা নেই মেঘের। সে এখন অন্য দুনিয়ায় আছে। আজকের এই দিনটা মেঘের কাছে স্বপ্নের মতো।আবির হাত বাড়াতেই মেঘ নিজের ডানহাতটা আবিরের হাতের উপর রাখলো। আবির সেই হাত সরিয়ে মেঘের বামহাত সামনে এনে মৃদুগামী হস্তে খুব যত্ন নিয়ে আংটি টা পড়িয়ে দিল৷ মেঘ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, মনের ভেতর একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। গতবছর মেঘের জন্মদিনে আবির বামহাতের আঙ্গুলে আংটি পড়িয়ে দিয়েছিল বলে মিনহাজরা কত কি বলেছিল। মেঘও সেসব কিছু মেনে নিয়েছিল, ভেবে নিয়েছিল বিয়ের আংটি ডানহাতে পড়তে হয়,সেজন্য ই আজ ডানহাত বাড়িয়েছিল। আবির আংটি পড়িয়ে মেঘের হাতে চুমু খেয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,“লোকে বলে, বামহাতের অনামিকা আঙুলের সঙ্গে নাকি হৃদয়ের সরাসরি যোগ রয়েছে। তাই বিয়ের আংটি বামহাতে পড়াতে হয়। ”মেঘ আনমনে শক্ত কন্ঠে শুধালো,” আপনি গতবছরও আমার বাম হাতে আংটি পড়িয়েছিলেন। তখন লোকের কথা জানতেন না?”“জানতাম। আর জানতাম বলেই বাম হাতে পড়িয়েছিলাম। কারণ তুই আমার প্রেমিকা নস আমার বউ তুই।”মেঘ অপলক দৃষ্টিতে আবিরের মুখের পানে তাকিয়ে আছে। কতটা শক্ত কন্ঠে আবির বার বার মেঘকে বউ বলে সম্বোধন করছে অথচ গত দুই বছরে এই মানুষটার মুখ থেকে একটা টু শব্দ পর্যন্ত বের হয় নি।লিমন স্বাভাবিক কন্ঠে শুধালো,“এখন কি আতশবাজি ফুটাতে পারি?”আবির ঘাড় কাত করে সম্মতি দিল। পরপর মেঘের দিকে তাকিয়ে মেঘের হাতটা উপরে তুলে মৃদুস্বরে বলল,“আংটিটা পছন্দ হয়েছে? ”আংটির দিকে না তাকিয়েই মেঘ বলে দিল,“আপনার দেয়া প্রতিটা জিনিস আমার কাছে উত্তম আর অমূল্য।”আবির মুচকি হেসে বলল,” একটু দেখে তো নে।”মেঘ এবার আংটির দিকে তাকালো। স্বর্ণের আংটিটা খুব বেশি বড় না হলেও ডিজাইনটা খুব সুন্দর। আংটির ঠিক মাঝ বরাবর অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে A লেখা। আবির শান্ত কন্ঠে বলল,“আংটিটা সবসময় হাতে রাখবি।”মেঘ তৎক্ষনাৎ আংটিতে চুমু খেয়ে বলে উঠল,“আমি এই আংটি কখনো খুলবোই না।”মেঘের কান্ড দেখে আবিরের ঠোঁট চেপে হাসছে। রাকিবরা ছাদের অন্যপাশে গিয়ে আতশবাজি ফুটাচ্ছে। বাজির শব্দে মেঘ সেদিকে তাকিয়ে উত্তেজিত কন্ঠে বলল,“আমিও বাজি ফুটাবো।”“ওকে। ”মেঘ দু-একটা ফুটানোর চেষ্টা করেছে। অতঃপর দূরে সরে এসেছে। দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে তাদের হৈ-হুল্লোড় দেখছে আর হাসছে। এখনও আরও অনেক বাজি ফুটানো বাকি আবির আচমকা মুখ ফুলিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,“তোরা এখন নিচে যা। আমার ওর সঙ্গে কথা আছে। ”মোবারক হেসে বলল,” শেষ করেই চলে যাব।”” কয়টা বাজে দেখছিস? এক্ষুনি যা।”তারাও আর কোনো কথা বলে নি। জিনিসপত্র নিয়ে নেমে যাচ্ছে। আবির ছাদের দরজা লাগাতে গেল। রাকিব আচমকা ঘুরে দরজায় উঁকি দিয়ে বলল,” প্রয়োজনে রুম সাজিয়ে দিচ্ছি তবুও ছাদে বাসর করার প্ল্যান করিস না যেন!”আবির রাগান্বিত কন্ঠে চেঁচাল,” যাবি… ”রাকিব হাসতে হাসতে নেমে যাচ্ছে। আবির ছাদের দরজা বন্ধ করে মেঘের কাছে এগিয়ে আসলো। মেঘ ভ্রু কুঁচকে বলল,“ওনারা কত আনন্দ করছিল। আপনি ওনাদের ওভাবে তাড়িয়ে দিলেন কেনো?”আবির গম্ভীর কন্ঠে বলল,“ওদের আনন্দের থেকেও তোর সাথে কথা বলাটা জরুরি। ”মেঘ সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে শুধালো,“কি কথা?”ভয়ে মেঘের বুক কাঁপছে। বিকেল থেকে এখন পর্যন্ত ঘটা প্রতিটা দৃশ্য চোখের সামনে ভাসছে। আনমনে বলে উঠল,” আপনি আবারও আমায় ছেড়ে চলে যাবেন না তো?”আজকের এই স্পেশাল দিনে মেঘের মুখে এমন আজগুবি প্রশ্নে আবির খুব বিরক্ত হলো। কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে চোখ ছোট করে বলল,” তোর চোখের পাতায় কি লাগছে? দেখি, চোখটা বন্ধ কর তো।”মেঘ সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে শুধালো,“কি লাগছে?”আবির এক সেকেন্ড দেরি না করে মেঘের লাল রঞ্জকে সুশোভিত ওষ্ঠে নিজের অধর ছোঁয়াল। অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে সহসা চোখ মেলল মেঘ। স্বাভাবিকের তুলনায় দু’চোখ তিনগুণ প্রশস্ত হয়ে গেছে। মেঘের হৃদয়ে তোলপাড় করা রঙবেরঙের অনুভূতিগুলো নিস্তব্ধ হয়ে গেছে, শ্বাসনালীতে ভয়ানক ঝড় চলছে । আবিরের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির আমর্শে মেঘের শিরা-উপশিরার রক্ত সঞ্চালন পর্যন্ত বেড়ে গেছে। আবিরের উষ্ণ শ্বাস মেঘের নাকে-মুখে লাগছে। মেঘ দু’হাতে আবিরের বুকের ধাক্কা দিয়ে দূরে সরানোর চেষ্টা করলো। সরাতে তো পারলোই উল্টো আবির মেঘের উদর আঁকড়ে ধরে মেঘের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালো। আবিরের ঘনিষ্ঠতায় মেঘের প্রশস্ত আঁখি আরও বেশি প্রশস্ত হলো৷ আবির অন্য হাত দিয়ে মেঘের দু’চোখ বন্ধ করে দিল। আবিরের নিগূঢ় সংস্পর্শে মেঘের গায়ে কাটা দিয়ে উঠছে। ঘামে জবজবে মেঘের শরীর বেয়ে অনর্গল পানি পরছে। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টায় ব্যর্থ হচ্ছে বারবার, মেঘের এলোমেলো নিঃশ্বাস, কোনোকিছুই যেন আবিরের থেকে ছাড়াতে পারলো না মেঘকে। এভাবে কত মিনিট কেটেছে জানা নেই। আবির মেঘের অধর থেকে অধর সরিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল মেঘকে। মেঘের কানের লতিতে আলতোভাবে ঠোঁট ছুুঁয়ে ফিসফিস করে বলল,“এখন থেকে বাজে কথা বললে এভাবেই শাস্তি দিব। মনে থাকবে?”মেঘ কন্ঠ খাদে নামিয়ে আস্তে করে বলল,“হু।”
গল্পঃ আমৃত্যু ভালোবাসি তো।।লেখিকাঃ সালমা চৌধুরী.......................................................................................................................................................................অযাচিত পরিস্থিতিতে মেঘ সচকিত হয়ে আছে। নিষ্কলুষ মনে জমে থাকা ভয়, ভীতি আর অভিমানেরা অবিদিতে গুম হয়ে গেছে। আবির ভাইকে নিজের করে পাওয়ার যে উন্মাদনা এতদিন তাড়া করে বেড়াচ্ছিল সেই উন্মাদনার পরিসমাপ্তি ঘটেছে আজ। আবিরের অনুষঙ্গে নিজেকে হারাতে বসেছে। আবিরের অপলক দৃষ্টি, নেশাক্ত কন্ঠ, হাস্যোজ্জ্বল চেহারা আর অনভিলাষিত ঘনিষ্ঠতা অবসহন করতে অনল্পে হিমসিম খেতে হচ্ছে। আবির মেঘকে ছেড়ে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়িয়েছে ঠিকই তবে মেঘের মায়াবী আদলে নজর আঁটকে আছে, আবিরের অত্যুষ্ণ চাহনিতে মেঘের বুকের ভেতরটা লজ্জায় হাস ফাঁস করছে, অতর্কিতে চিবুক নামিয়ে নিলো। আবির সঙ্গে সঙ্গে দু আঙুলে পুনরায় মেঘের চিবুক উঠিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,” তুই জানিস তোকে আজ কতটা সুন্দর লাগছে?”মেঘ চোখ তুলে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,“কতটা?”” সমুদ্রের প্রভূত জলরাশিযতটা সুন্দর ঠিক ততটা।দেখতে প্রশান্ত হলেওসঙ্গিন।”মেঘ মলিন হাসলো। আবির পরপর শক্ত কন্ঠে শুধালো,” তোকে শাস্তিটা কেনো দিয়েছি জানিস?”“বাজে কথা বলেছি তাই।”“জ্বি না। আপনি আমার সাজানো পরিকল্পনা নষ্ট করেছেন তারজন্য৷ ”“আমি কি করেছি?”আবির শ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করল,” ২ টা বছর ধৈর্য রাখতে পারলেন অথচ আর ২ টা দিন ধৈর্য রাখতে পারলেন না। আমি বলেছিলাম, আপনাকে আমি কোনো প্রকার প্রতিশ্রুতি দিব না,সরাসরি বিয়ে করব। মানে আজ আপনাকে বলব, কাল বিয়ে করব এমনটায় ভেবে রেখেছিলাম। আমার সবকিছু প্ল্যান করা, আজ থেকে দুদিন পর আপনাকে প্রপোজ করতাম, তার পরদিন গায়ে হলুদ আর সবশেষে বিয়ে। কিন্তু আপনি অধৈর্য হয়ে আজ ই চলে আসছেন। আপনাকে ফিরিয়ে দেয়ার সাধ্য আমার ছিল না, তাই নিজের সাজানো পরিকল্পনার কথা ভুলে আপনার ইচ্ছেকে প্রায়োরিটি দিলাম। আমার প্ল্যান ধ্বংস করার শাস্তি তো আপনাকে পেতেই হতো।”মেঘের চোখ নামিয়ে নিয়েছে, এখন কথা বলতে একদম ইচ্ছে করছে না। এতদিন আত্মগোপনে থাকা অনুভূতিরা বার বার জানান দিচ্ছে, সম্মুখে দাঁড়ানো ব্যক্তির চোখে চোখ রাখলেই নিজের অস্তিত্ব বিলীন হতে বাধ্য। আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,” তুই আমায় ভালোবাসিস?”মেঘ ক্ষীণ স্বরে বলল,“হ্যাঁ, অনেক ভালোবাসি। আর আপনি?”আবির উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করল,“কতটা ভালোবাসিস?”“যতটা ভালোবাসলে আপনার হৃদয়ের প্রতিটা অনুনাদে আমার নাম শুনা যাবে ঠিক ততটা ভালোবাসি। ”” আমার জন্য সব করতে পারবি?”মেঘ কপাল কুঁচকে বলল,“সব পারবো কিন্তু আপনাকে ছাড়তে পারবো না। ”” আজ যদি আবির অথবা পরিবার দুটা থেকে যেকোনো একটাকে বেছে নিতে বলা হয়। তখন তুই কি করবি? বেছে নিতে পারবি আমাকে?”মেঘ শীতল চোখে তাকিয়ে ভেজা কন্ঠে বলল,” পারবো। ”আবির মলিন হেসে শুধালো,” যদি বলা হয় আবিরকে ছাড়তে হবে তখন?”মেঘ অতর্কিতে আবিরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,” আমি আপনাকে ছাড়তে পারবো না, প্লিজ। আর যাই বলেন আমি সব মেনে নিব, বাসায় মেনে না নিলে সারাজীবন আপনার সাথে থেকে যাব তবুও কারো কথায় আপনাকে ছাড়তে পারবো না৷”আবির মেঘের চোখ মুছে ধীর কন্ঠে বলল,” কাঁদতে বারণ করেছিনা তোকে?”মেঘ ভেজা কন্ঠে বলল,” বাসায় কি কোনোভাবেই আমাদের মেনে নিবে না?”আবির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করল,” শুধুমাত্র বাসায় মানানোর চেষ্টায় গত তিনবছর যাবৎ অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছি। আমি আমার বাবা মায়ের একমাত্র ভরসা৷ ওনারা আমাকে অনেক ভালোবাসেন, একজন দায়িত্বশীল ছেলে হিসেবে আমাকেও আজীবন ওনাদের পাশে থাকতে হবে। আমি স্বইচ্ছায় কোনোদিন আব্বু আম্মুর সাথে সম্পর্ক নষ্ট করব না। তিনবছরে আমি আমার সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছি এখনও করছি। শুধুমাত্র ওনাদের চোখে যোগ্য হওয়ার জন্য প্রাইভেট কার কিনেছি, আলাদা কোম্পানি দাঁড় করিয়েছি, বাসা পর্যন্ত করেছি। ওনারা যোগ্যতা চাইলে আমি আজ জোর গলায় বলতে পারব, হ্যাঁ আমি তোর জন্য যোগ্য। তোকে পাওয়ার জন্য ওনারা যদি শর্ত দেন, আমি আব্বু-চাচ্চুর দেয়া যেকোনো শর্ত মেনে নিতে রাজি। তবুুও তোকে আমার লাগবে। কিন্তু ওনারা যদি আমাদের সম্পর্ক মেনে না নেয় বা তোকে ছাড়ার কথা বলে তখন আমি চুপ থাকতে পারবো না। পরিস্থিতি যদি এমন হয় যে বাসা থেকে বেড়িয়ে আসতে হয় আমি চুপচাপ বাসা থেকে বেড়িয়ে আসবো কিন্তু তোকেও তখন আমার সঙ্গে বেড়িয়ে আসতে হবে। বিশ্বাস কর, আমি তোকে কষ্টে রাখবো না। আর তোকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নও করব না। কারণ আমি জানি আমার থেকেও তোর অনেক বেশি আবেগ জড়িয়ে আছে ঐ বাসায়। কিন্তু কি করব বল? আমার যে তোকে লাগবেই লাগবে। বাসায় মেনে না নিলে হয়তো কয়েকটা দিন একটু দূরে থাকতে হবে তারপর আমি সব ঠিক করে দিব। জাস্ট কয়েকটা দিন। ফুপ্পির মতো ২৮ বছর পরিবার ছেড়ে থাকতে হবে না তোকে। আব্বু ছাড়া বাকি সবাইকে মানিয়ে নিতে পারবো। হয়তো আব্বু একটু ঝামেলা করবেন। তবে যাই হোক, আজ তোকে আমার সাথে থাকতে হবে। থাকবি তো?”মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,“থাকবো।”প্রায় এক ঘন্টা সময় নিয়ে আবির মেঘকে বুঝিয়েছে। কি কি করতে হবে, কি বলতে হবে সব বুঝিয়ে দিয়েছে। ততক্ষণে এশার আজানের সময় হয়ে গেছে। আবির পকেট থেকে ফোন বের করে সময় দেখে নিল। বিকেল থেকে এই পর্যন্ত ২৪ টা কল আসছে। ফোন সাইলেন্ট থাকায় টের পায় নি, তানভির কলের পর কল দিচ্ছে। মেঘকে নিয়ে ফিরলে বাসায় যেতে হবে, এদিকে আলী আহমদ খান, মোজাম্মেল খান, ইকবাল খান তিনজন মিলে অনেকগুলো কল দিয়েছেন। দুপুরে মিটিং শেষে সিফাতের সঙ্গে আবিরের খুব রাগারাগি হয়েছে। আর একটুর জন্য হাতাহাতি হতে যাচ্ছিলো। সিফাতের চালচলন আবিরের একদম পছন্দ না, ছেলেটা যতই ভালো সাজার নাটক করুক না কেন, আবিরের সামনে বার বার ধরা পরেছে। কিন্তু আলী আহমদ খানের চোখে সিফাত খুবই ভদ্র ছেলে। আজ সকালেই আলী আহমদ খান ল্যাপটপে সিফাতকে ফ্যামিলি ফটো দেখাচ্ছিলেন। আবির অফিসে ঢুকতেই সিফাতের কন্ঠ কানে আসছে,” মেঘ তে মাশাআল্লাহ অনেক সুন্দর হয়েছে। বিয়ে দেন নি কেনো এখনও? একদিন সময় করে মেঘকে দেখতে যাব সাথে সবার সাথে পরিচয়ও হয়ে যাবে।”আলী আহমদ খান কথাটা তেমনভাবে গুরুত্ব না দিলেও আবিরের শরীর রাগে জ্বলছিল। আব্বুর সামনে কিছু বলতে পারছিল না আবার চুপ ও থাকতে পারছিল না। তারউপর মিটিং থেকে বের হতেই দেখল, সিফাতের ফোনের স্ক্রিনে আবিরদের ফ্যামিলি ফটোতে থাকা মেঘের ছবিটা বড় করে দেখছে। ঐ ছবি দেখে আবিরের মেজাজ তুঙ্গে। রাগে চিৎকার করতেই সিফাত ছবি কেটে দিয়েছে, ইকবাল খান দ্রুত ছুটে আসেন,ওনি কিছু না বুঝলেও আবিরের অগ্নিমূর্তি ধারণকৃত রূপ দেখে টেনে হিঁচড়ে আবিরকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আলী আহমদ খান তখনও নিশ্চুপ ছিলেন। সবকিছুতেই ওনার মনে হচ্ছিল, আবির সিফাতকে জব দিতে নিষেধ করেছিল আর সেই ক্ষোভেই সিফাতের সাথে রাগারাগি করে। তারউপর আলী আহমদ খান বলে বসেন, সিফাতকে বাসায় থাকার ব্যবস্থা করে দিবেন। এই কথা শুনে আবিরের রাগ তিনগুণ বেড়ে গেছিল। আলী আহমদ খানের সাথে রাগারাগি করে আবির তখনই অফিস থেকে বেড়িয়ে আসছিলো। নিজের অফিসে এসে কেবিনে বসার ১০ মিনিটের মধ্যে কল আসে, মেঘ শাড়ি পড়ে বাসা থেকে বেড়িয়েছে। একে আব্বুর উপর মেজাজ খারাপ, সবকিছু মিলিয়ে বিরক্ত তারউপর মেঘের আকস্মিক কর্মকাণ্ডে অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রেয়সীর কথা ভেবে বেড়িয়েছিল। আর এখনও হাসিমুখে মেঘকে সময় দিচ্ছে। তবে সেই বিকেল থেকেই ফোন সাইলেন্ট করে রেখেছে। আজ যা হবে খান বাড়িতেই হবে।আবির মেঘের সাথে কথা শেষ করে মেঘকে নিয়ে নিচে আসলো। ততক্ষণে স্টাফদের প্রায় সবাই চলে গেছে। মিরাজ আর তার দু-তিনজন ফ্রেন্ড বসে আছে। আবিরদের নামতে দেখে শান্ত কন্ঠে বলল,” ভাইয়া সবার খাওয়া শেষ। ওনারা যে যার মতো চলে গেছেন।”আবির ঠান্ডা কন্ঠে বলল,” আচ্ছা, কিন্তু রাকিবরা কোথায়?”মিরাজ রাশভারি কন্ঠে বলল,” রিয়া ভাবি কল দিয়েছিল, ওনি বোধহয় অসুস্থ। রাসেল ভাইয়াকে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে গেছেন, কল দিয়েছিলাম রিসিভ করেন নি। ”“ওহ। রাকিবরা খেয়েছে?”“হ্যাঁ হ্যাঁ, সবার খাওয়া হয়েছে। ”“তোমরা খেয়েছো?”“না ভাইয়া, তোমরা খাওয়ার পর খাবো।”আবির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,” খেয়ে নিলেই পারতে। ”আবির মেঘকে খাবার রেডি করে দিচ্ছে। আজকের সব খাবার রেস্টুরেন্ট থেকে আনানো৷ সন্ধ্যার দিকে মিরাজের ফ্রেন্ডরায় খাবার নিয়ে আসছে, সাথে ওয়ান টাইম প্লেট আর গ্লাসও নিয়ে আসছিল। মেঘকেও সেই প্লেটেই খাবার দিয়েছে আবির। মিরাজ আর ওর ফ্রেন্ডরা ছাদে গেছে। মেঘ জিজ্ঞেস করল,“আপনি খাবেন না?”“খেতে ইচ্ছে করছে না। যতক্ষণ না সবকিছু ঠিকঠাক হচ্ছে ততক্ষণ স্থির হতে পারছি না। ”মেঘ আবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,” যা হবার হবে। সারাদিন খান নি, আগে খেয়ে নিন।আমি খাইয়ে দেয়?”আবির আড়চোখে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,” বাব্বাহ! বউ বউ ফিল এসে গেছে নাকি?”মেঘ ভেঙচি কেটে বলল,“দেখি, হা করেন। ”আবির কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ খেয়ে নিল। খেতে খেতে তানভিরকে কল দিয়ে কথা বলে নিয়েছে। মিরাজকে আগেই বলেছিল আবির শার্ট আর প্যান্ট নিয়ে আসার জন্য। আবির পাঞ্জাবি, পায়জামা পাল্টে শার্ট প্যান্ট পড়ে মিরাজদের থেকে বিদায় নিয়ে রওনা দিল। আজ মিরাজরা এখানেই থাকবে আগামীকাল তানভির এসে সবকিছু গুছিয়ে রেখে যাবে। যাওয়ার আগে মেঘ হলুদ আর সাদা সবগুলো গোলাপ একসঙ্গে শপিং ব্যাগে করে নিয়ে গেছে৷ আসার সময় সময় কিছুটা দূরত্ব থাকলেও এখন বাইকে বসেই মেঘ পেছন থেকে আবিরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে৷ আবির মুচকি হেসে নিজের একহাত মেঘের দু’হাতের উপর রেখে উদ্বেলহীন কন্ঠে বলল,” বাসায় উল্টাপাল্টা কিছু বললে এভাবে জড়িয়ে ধরতে পারবেন তো?”মেঘ আস্তে করে বলল,“দেখা যাক। আপনি পারবেন?”আবির মৃদু হেসে বলব,” অবশ্যই, আমি একদম কোলে নিয়ে চলে আসবো।”মেঘ মেকি স্বরে বলে উঠল,“আমিও দেখব আপনার কেমন সাহস।”“ওকে।”আবির বাইক স্টার্ট দিল। মেঘ আবিরের প্রশস্ত পিঠে মাথা এলিয়ে আবিরের গায়ের গন্ধ উপলব্ধি করছে। অনেকটা পথ যাওয়ার পর মেঘ আচমকা ডাকল,“আবির ভাই… ”আবির তৎক্ষনাৎ ব্রেক কষল। বাইক থেকে নেমে মেঘের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গুরুতর কন্ঠে বলল,” কথায় কথায় ভাই বলার অভ্যাস টা ত্যাগ করুন। আমি আপনার ভাই না, ওকে?”মেঘ শান্ত স্বরে শুধালো,“ভাই না ডাকলে কি ডাকব?”“আবির ডাকবি।”মেঘ চোখ বড় করে তাকিয়ে বলল,“আমি পারব না।”“কেনো?”“স্বামীর নাম মুখে নিতে নেই আপনি জানেন না?”আবির হাসতে হাসতে বলল,” হায় রে কুসংস্কার। গত দুই বছরে আবির ভাই, আবির ভাই ডাকতে ডাকতে কান তব্দা করে ফেলছিল৷ এখন বলতেছিস স্বামীর নাম মুখে নিতে নেই। ”মেঘ মুখ চেপে শক্ত কন্ঠে বলল,“তখন আপনি আমার স্বামী ছিলেন না, চাচাতো ভাই ছিলেন। বুঝেছেন?”“বুঝেছি। কিন্তু আর একবার যদি আবির ভাই বলেছিস তাহলে বামহাতে কানের নিচে এমন থা*প্পড় দিব, তিনদিন বেহুঁশ থাকবি।”মেঘ হুঙ্কার দিয়ে উঠল,” তাহলে ডাকব কি আমি?”আবির নির্দ্বিধায় বলল,“আহিয়ার আব্বু।”মেঘ উদ্বেগপূর্ণ কন্ঠে প্রশ্ন করল,” আহিয়া কে? ”আবির মুচকি হেসে বলল,“আমার মেয়ে।”“হোয়াট? আপনার মেয়ে আসলো কোথা থেকে? ”আবির দুষ্টামীর স্বরে বলল,“মেয়ে আমার একার না, আমাদের দু’জনের মেয়ে আহিয়া৷”“মেঘ নিজের পেটে হাত রেখে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,“আমাদের মেয়ে মানে? আমার তো এখনও বিয়েই হয় নি। মেয়ে কোথা থেকে আসবে?”আবির নিঃশব্দে হেসে মেঘের মাথায় আস্তে করে গাট্টা দিয়ে বলল,“আরে বোকা মেয়ে, আমি আমাদের অনাগত সন্তানের কথা বলছি।”মেঘ আহাম্মকের মতো তাকিয়ে বলল,” ছিঃ আপনার কি লজ্জা লাগে না?”“ওমা, লজ্জা লাগবে কেনো?”“এইযে আজেবাজে কথা বলছেন। ”” হবু সন্তানের কথা বউকে বলতে গেলে যদি লজ্জা পেয়ে হয় তাহলে এ নির্লজ্জময় জীবন আমি রাখবো না।”মেঘ বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলল,” ফাজলামি রেখে তাড়াতাড়ি বাসায় চলুন। আজ বাসায় যে কি হবে! দেখা যাবে আমার, আপনার জীবনই ঘূর্ণিঝড়ে উড়ে যাবে। তখন এই আহিয়া, আবিহা হাজার কেঁদেও তার বাপকে পাবে না। ”আবির দু আঙুলে আলতোভাবে মেঘের নাক চেপে হেসে বলল,“তারমানে আপনি মেনে নিচ্ছেন, আহিয়া আমার মেয়ে আর আপনি তার মা। ”মেঘ ফোঁস করে উঠে আবিরের হাতে চিমটি কেটে বলল,“আপনি কি যাবেন?”আবির “উফফফ” করতে করতে বাইকে বসলো। বাইক স্টার্ট দিতে দিতে তপ্ত স্বরে বলল,” অবোধ জামাইকে চিমটি কাটা মোটেই ভালো লক্ষণ না। ”“আল্লাহ! বিয়ের খবর নাই আর ওনি জামাই জামাই করে বেহুঁশ হয়ে যাচ্ছেন। ”আবির গম্ভীর কন্ঠে বলল,“বাসায় মানলে বিয়ে দুই তিনদিন পরে হবে আর বাসায় না মানলে রাতেই আপনাকে নিয়ে পালাবো।”মেঘ আর কিছু না বলে আবারও আবিরকে জড়িয়ে ধরে বসলো। বুকের ভেতর চাপা কষ্টগুলো প্রকাশ করতে পারছে না, আজ বাসায় কি হতে চলেছে সেসব ভেবেই আঁতকে উঠছে বারবার। দীর্ঘসময় পর মেঘ আবিরের পিঠে মাথা রেখেই আস্তে করে ডাকল,“এইযে…”আবির নিরুত্তর। মেঘ আবারও ডাকল,“এইযে শুনছেন…”আবির এবারও নিরুত্তর। মেঘ গলা খাঁকারি দিয়ে মায়াবী কন্ঠে বলল,” আহিয়ার আব্বু…”“হুমমমম আহিয়ার আম্মু, বলো।”মেঘ উদাসীন কন্ঠে শুধালো,” আমার জন্য এতকিছু করলেন অথচ একবারের জন্যও I Love You বা ভালোবাসি বললেন না। কেনো?”“ভালোবাসি না বললে কি ভালোবাসা যায় না? দুজন দু’জনের অনুভূতি বুঝতে পারাটা কি ভালোবাসা নয়? দু’জন দু’জনকে পাগলের মতো ভালোবাসতে চাইলে ‘ভালোবাসি’ শব্দটা কি বলতেই হবে?”মেঘ উত্তর খোঁজে পেল না৷ সত্যি ই তো, একজন আরেকজনের অনুভূতি বুঝা, পাশে থাকা, চাওয়া পাওয়ার মূল্যায়ন করা, দু’জন দু’জনকে সম্মান করা এগুলোই তো ভালোবাসার প্রতীক। মুখ ফোটে ভালোবাসি না বলেও বাবা মায়েরা আমৃত্যু সন্তানদের নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে যান, স্বামী- স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক হিসেবে সারাজীবন পাশে থাকেন, ভাই-বোনের সম্পর্কেও কেউ কাউকে ভালোবাসি বলে না অথচ কারো কোনো সমস্যা হলে সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তবে কেনো ভালোবাসি কিংবা I Love You শোনার এত প্রবণতা সবার মাঝে। প্রতিনিয়ত ‘ভালোবাসি’ বললেই কি সত্যিকারের ভালোবাসা খোঁজে পাওয়া যায়?মেঘ আবিরকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল৷ আর কিছু বলার বা শুনার ইচ্ছে নেই মেঘের। বাসার কাছাকাছি আসতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছে। বাসা থেকে কিছুটা দূরে বাইক থামিয়ে দুজনেই নামল। পরপর কল দিল তানভিরকে। তানভির অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে কিছুক্ষণ হলো একটা কাজে গেছে। আসতে একটু সময় লাগবে। কয়েক ঘন্টা শাড়ি পড়ে হাঁটা চলা করায় শাড়ির যাচ্ছেতাই অবস্থা হয়ে গেছে। আবির মেঘের শাড়ির কুঁচি ঠিক করতে করতে বলল,“একা যেতে পারবি নাকি তানভির আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবি?”“যেতে পারব।”“শুন, কারো সঙ্গে কোনো কথা বলার প্রয়োজন নেই। সোজা নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নিবি।”“আচ্ছা। যাবো এখন ?”“হুমমমম।”মেঘ গোলাপগুলো হাতে নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে যাচ্ছে। আবির নিষ্পলক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে আছে। মেঘ কিছুদূর যেতেই আবির উচ্চস্বরে ডাকল,“মাহদিবা খান মেঘ”মেঘ সহসা থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরল। আবির পূর্বের ন্যায় আবারও বলল,” সাজ্জাদুল খান আবিরের মিসেস হবার প্রস্তুতি নিন। খুব শীঘ্রই আপনি আমার বেগম হচ্ছেন।”মেঘ অবাক লোচনে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসলো। হাত নেড়ে বিদায় দিয়ে সামনে ঘুরলো। একপা বাড়াতেই আবির উদ্ধত কন্ঠে আবার বলল,“I Love You Megh. I Love You Infinity. ”মেঘ অতর্কিতে ঘুরে দাঁড়ালো, আশ্চর্য নয়নে তাকালো আবিরের মুখের দিকে। I love you শুনার অণুমাত্র ইচ্ছেও মেঘের ছিল না। অনাঙ্ক্ষিত কথাটা শুনে নিজের আবেগ আঁটকে রাখতে পারলো না। এক ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো আবিরকে। আহ্লাদী কন্ঠে বলল,“I Love You Infinity.”আবির মেঘের মুখটা তুলে কপাল বরাবর চুমু খেয়ে শান্ত স্বরে বলল,” ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসিআমৃত্যু ভালোবাসি তোকে। ”মেঘের বিস্মিত আঁখি যুগল আবিরের চোখে নিবদ্ধ। ফাঁকা রাস্তা, কিছুটা দূরে থাকা ল্যামপোস্টের আলো আবিরের শ্যামলা চেহারায় পড়ছে মেঘ সেই মায়াময় আদলে তাকিয়ে থেকে আনমনে বলে উঠল,” আপনি এত কিউট কেন?”আবির মৃদু হেসে বলল,” এখন কিন্তু শাস্তি দিব।”মেঘ তৎক্ষনাৎ আবিরকে ছেড়ে কিছুটা সরে দাঁড়ালো। পরপর থমথমে কন্ঠে শুধালো,“ভালোবাসি বলবেন না তো এখন বললেন কেনো?”আবির তপ্ত স্বরে বলল,” আমি তোর কোনো ইচ্ছে অপূর্ণ রাখব না তাই।”মেঘ অত্যন্ত নমনীয় কন্ঠে বলল,” আমার খুব ভয় হচ্ছে। ”আবির হিজাবের উপর দিয়ে মেঘের দুগালে হাত রেখে চাপা স্বরে বলল,” আমি আছি তো তোর পাশে। ভয় কিসের? আমি বেঁচে থাকতে তোর উপর একটা আঁচড়ও পড়তে দিব না। ”মেঘ আবিরের থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছে। আবির কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলো। মেঘের সামনে কিছু প্রকাশ করতে না পারলেও আবিরের বুকের ভেতর ভয়ংকর তোলপাড় চলছে। কি হবে বা হতে চলেছে সেসব ভেবেই গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। মনে আতঙ্ক বাসা বেঁধেছে অনেক আগেই। তারউপর দুপুরে আব্বুর সাথে রাগারাগি করে অফিস থেকে বেড়িয়েছে, সারাদিন আব্বুর ফোনটা পর্যন্ত রিসিভ করে নি। মেঘ বাসায় ঢুকে গেছে। আবির পকেট থেকে ফোন বের করতেই দেখল আলী আহমদ খানের কল আসতেছে। আবির এবার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে কলটা রিসিভ করল,আবির কিছু বলার আগেই আলী আহমদ খান উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললেন,“আবির, তুমি কি শোধরাবে না? কলের পর কল দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি অথচ তোমার কোনো খবর নেই। এত কিসের রাগ তোমার?”আবির শান্তস্বরে বলল,“বলুন।”“আমি কি বলব? কি বলতে বাকি রাখছো তুমি? রাজশাহীর অফিসে সমস্যা হয়েছে। বিকেলের দিকে খুব মারামারি হয়েছে। এখনও পরিস্থিতি ভালো না। তোমার চাচ্চুর শরীর খারাপ অফিসেই আসে নি। এদিকে তুমি সারাদিন ধরে রাগ করে বসে আছো। বাধ্য হয়ে এখন আমাকেই যেতে হচ্ছে। ”আবির উত্তেজিত কন্ঠেে বলল,“আপনি যাচ্ছেন মানে? আপনাকে কোথাও যেতে হবে না। আমি এখনি আসছি। ”আলী আহমদ খান রাগান্বিত কন্ঠে বললেন,” ব্যবসা যেহেতু আমায় সব দায়ও তো আমার ই। মরি আর বাঁচি ব্যবসায় করে যাবো। তোমরা তোমাদের রাগ নিয়ে থাকো।”আবির কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,” আপনি কোথায় আছেন? ”“বাসস্ট্যান্ডে।”“আমি আসতেছি এখনি।”“আসতে হবে না। ”“আসতেছি আমি।”এদিকে মেঘ শাড়ির আঁচলের নিচে ফুল আর আংটি পরিহিতা হাত লুকিয়ে বাসায় ঢুকলো। রান্নাঘরে মালিহা খান আর আকলিমা খান কাজ করছেন। আর কেউ নেই। এই সুযোগে মেঘ দ্রুত চলে যাচ্ছে। মালিহা খান অকস্মাৎ মেঘকে দেখে ডেকে উঠলেন,” শাড়ি পরে কোথায় গিয়েছিলি তুই? এত রাত করে বাসায় আসছিস কেনো?”মেঘ ছোট করে বলল,“ঘুরতে গিয়েছিলাম।”মেঘ আর কোনো কথা না বলে দ্রুত নিজের রুমে চলে গেছে। একদম শাওয়ার শেষ করে বিছানায় শুয়েছে। বন্যার কথা মনে হতেৎ সঙ্গে সঙ্গে বন্যাকে কল দিল। আজকের সব ঘটনা একে একে বলছে।আবির দ্রুত বাসস্ট্যান্ড পৌছালো। আলী আহমদ খান ব্যাগ নিয়ে ব্রেঞ্চে বসে বসে চা খাচ্ছেন। আবির সামনে গিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,” আব্বু, আপনি বাসায় যান, আমি যাচ্ছি।”“এভাবে কিভাবে যাবে? বিকেল থেকে অনবরত কল দিচ্ছি তোমাকে, ইকবাল এমনকি মোজাম্মেলকে দিয়েও কল দেয়ালাম ৷ আর তুমি কি করলে? কল রিসিভ করার প্রয়োজন মনে করলে না। এখন এসে বলছো, তুমি যাবে৷ মজা করছো?”“সরি আব্বু, আর এমন হবে না।”আলী আহমদ খান রাগান্বিত কন্ঠে হুঙ্কার দিলেন,” এখন সরি বলতে হবে না। যাও রাগ করে গাল ফুলিয়ে বসে থাকো, প্রয়োজনে ৭ দিন বসে থাকো। আমি চলে যাচ্ছি, তোমাকে আর কেউ বিরক্ত করবে না। ”আবির শীতল কন্ঠে বলল,“সরি, আব্বু। আর এমন করবো না। রিয়েলি সরি। এই আমি কানে ধরছি..”আলী আহমদ খান চায়ের কাপ রেখে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আবিরের হাত আঁটকে বললেন,” কানে ধরতে হবে না। বাবা মায়ের কাছে সন্তানের হাজারটা ভুলও কিছুই না। ”আবির মলিন হেসে বলল,“রাজশাহী আমি যাচ্ছি, আপনার এই শরীর নিয়ে এতদূর যেতে হবে না।”“তুমি তো জামাকাপড় পর্যন্ত নিয়ে আসো নি। কিভাবে যাবে?”“দু একটা জামাকাপড় কিনে নিব। সমস্যা নেই।”“তোমার বাইক কি করবা?”“তানভির এসে বাইক আর আপনাকে নিয়ে যাবে। কোনো সমস্যা নেই। আমি ওকে কল দিচ্ছি।”“ঠিক আছে, যাও। কিন্তু আজকের ঘটনার মতো যদি ওখানেও কারো সাথে রাগারাগি করেছো আর আমার কানে খবর আসছে, তাহলে তুমি কানে ধরেও মাফ পাবে না। এই আমি বলে দিলাম।”আবির ধীর কন্ঠে বলল,“কারো সঙ্গে রাগারাগি করবো না কিন্তু আমি ফেরার পর আপনার সাথে আলাদাভাবে কথা বলতে চাই। ”আলী আহমদ খান ঠান্ডা কন্ঠে বললেন,“হ্যাঁ। কি বলবা এখনি বলো।”আবির মৃদুস্বরে বলল,” এখন না। রাজশাহী থেকে এসে বলল।”“আচ্ছা। তোমার ইচ্ছে । ওখানে যদি বেশি সমস্যা হয় তাহলে জানিয়ো। মোজাম্মেল এর শরীর ভালো হলে ওকে পাঠাবো । ”“আচ্ছা। ”বাস ছাড়ার সময় হয়ে যাচ্ছে। আবির টিকেট নিয়ে বাসে ওঠে বসেছে। তানভির এসেছে অনেকক্ষণ পর। আবির রাজশাহী যাচ্ছে দেখে তানভির থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। বড় আব্বুর সামনে মুখ ফোটে কিছু বলতেও পারছে না। কিছুক্ষণের মধ্যে বাস ছেড়ে দিয়েছে। আলী আহমদ খান তানভিরের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললেন,“চলো, এখন।”তানভির ভারী কন্ঠে বলল,“জ্বি। ”আবিরের বাস ছাড়ার কিছুক্ষণ পরেই আবির মেঘকে কল দিল। মেঘ বন্যার কল কেটে আবিরের কল রিসিভ করে চিন্তিত স্বরে জানতে চাইল,“কোথায় আপনি? আর কখন আসবেন?”আবির ধীর কন্ঠে বলতে শুরু করল,” আমাকে ইমার্জেন্সি কাজে রাজশাহী যেতে হচ্ছে, বাস অলরেডি ছেড়ে দিয়েছে। তোকে যা বলি একটু শুন, হাতের আংটি টা খুলে কোথাও লুকিয়ে রেখে দে। আমি আসলে আবার পড়িয়ে দিব। আর এই ২-৩ দিন খুব বেশি সাবধানে থাকবি৷ প্রয়োজনে সারাদিন ঘুমাস, তবুও বাসার কারো মুখোমুখি হোস না। বাসায় কোনো মেহমান আসলে বা তোকে দেখার নাম করে কেউ আসলে ভুলেও সামনে যাস না। আর অবশ্যই আমাকে জানাবি। সামান্য কোনো বিষয়েও বাড়াবাড়ি করতে যাস না, সামান্য কোনো কারণে তোর গায়ে যেন কোনো আঁচড় না পড়ে। যেভাবে রেখে গেলাম তিনদিন পর যেন সেভাবেই পায়৷ একটা কথা মনে রাখিস, তোর কিছু হলে আমি সত্যি মরে যাব। আমি তোকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি।”
ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে প্রদীপ্ত সড়ক বাতির অতিশয় আলোর ভিড়েও আবির অন্তর্জ্ঞানীয় মনে উদ্দীপ্ত চাঁদের পানে চেয়ে আছে। অদৃষ্ট অভিশঙ্কায় আবিরের ভ্রু যুগল কুঁচকে আছে, চেহারার লাবণ্য ফিকে হয়ে গেছে। আকাশের ঔজ্জ্বল্য চাঁদে আনমনেই নিজের চাঁদকে খোঁজছে। হৃদয়ের মনিকোঠায় সঙ্গোপনে আত্ততায় রাখা প্রিয়তমাকে মনের কথা জানিয়ে এখন নিজেই কুণ্ঠিত হচ্ছে। মেঘকে আংটি খুলে রাখতে বলেছে ঠিকই, কিন্তু মেঘ যে আংটি খুলে রাখার মেয়ে না এটাও আবিরের অজানা নয়। গতবছরের দেয়া ডায়মন্ড রিং টা প্রথম প্রথম আঙুল থেকে খুলতেই চাইতো না মেঘ। আকলিমা খান, হালিমা খানরা কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছেন এটা কিসের রিং, কে দিয়েছে, ডায়মন্ড কি না। আবির আর তানভির বহু কষ্টে ঐ সিচুয়েশন সামলেছিল। তখন অনেক মেঘকে বুঝিয়ে আংটি খুলিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল ঠিকই তবে এবার আর সেই সামর্থ্য নেই। মেঘের মনে এখন আর কোনো দ্বিধা নেই, নেই কোনো আতঙ্ক। অথচ আবিরের পরিশ্রান্ত মস্তিষ্কের আতঙ্ক ক্রমে ক্রমে বেড়েই চলেছে। ভেবেছিল আজ বাসায় কথা বলে যা হোক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিবে কিন্তু পরিস্থিতি যে তার অনুকূলে ছিল না। আবিরের এখন সবচেয়ে বড় ভয় সিফাত নামক ছেলেটাকে নিয়ে । নিজের গ্রামের ছেলে বলে আলী আহমদ খান তাকে একটু বেশিই প্রায়োরিটি দিচ্ছেন, তার ছোটখাটো ভুল, খারাপ দৃষ্টি, বাজে আচরণ কোনোকিছুই যেন চোখে পড়ে না ওনার। নির্ঘুম রাত কাটিয়ে ভোরের আলো ফুটতেই আবির রাজশাহী পৌঁছেছে। কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে ৯ টার পর পর মেঘকে কল দিতে দিতে রেডি হতে লাগলো। পরপর দু’বার কল করেছে কিন্তু রিসিভ হয় নি। এদিকে আবির এসেছে শুনে অফিস থেকে বার বার কল আসতেছে। আবির তাড়াহুড়োয় অফিসে চলে গেছে।তানভির সকাল সকাল উঠে ফ্রেশ হয়েই “Sparrow’s Dreamhouse” এর উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। গতকাল আবিররা যা কিছু অগোছালো রেখে আসছিল সব গুছাতে হবে, বাসা পরিষ্কার করাতে হবে তাছাড়া বাসার কিছু কাজও বাকি ছিল সেগুলোও করাতে হবে। কাজ শেষ করতে কমপক্ষে ১২-১ টা বেজে যাবে। এদিকে বন্যা ক্লাসে একা একা ঝিমাচ্ছে। মিষ্টি, সাদিয়া, মেঘ কেউ ই আজ ক্লাসে আসে নি তাই খুব বোরিং লাগছে। মিনহাজদের সাথে কথা বলতেও ইচ্ছে করছে না। ক্লাস শেষে সবার আগে বের হয়ে কিছুদূর এগোতেই একটা ছেলেকে দেখলো। পেছন থেকে দেখতে অবিকল তানভিরের মতো। বন্যা আনমনে হেসে এগিয়ে গেল সেদিকে।পরশুদিন রাতে প্রায় ৩ টা পর্যন্ত তানভিরের সাথে কথা হয়েছিল বন্যার, পুরোটা সময় মেঘ আর আবিরকে নিয়েই কথা হয়েছিল। ওদের কথা শেষ করে তানভির যেই বন্যাকে নিজের কথা বলতে যাবে ততক্ষণে বন্যা অর্ধ ঘুমে তলিয়ে গেছে। তানভির দুু একবার মৃদুস্বরে ডেকেছে, বন্যা ঘুমের ঘোরে শুধু হু হু করছিল। তারপর বন্যার আর কিছুই মনে নেই। গতকাল সারাদিনে একবার তানভিরের সাথে কথা হয়েছিল,সেটাও মেঘের ব্যাপারে। মেঘকে সবকিছু বলে দিয়েছে কি না সেটায় শুধু জিজ্ঞেস করেছিল। বন্যা “হ্যাঁ” বলায় তানভির রাগী স্বরে বলেছিল,” আমি শুধু তোমাকে জানিয়েছি আর তুমি না বুঝে সেটা বনুকে বলে দিলা? সকালে উঠে আমাকে একবার জিজ্ঞেস করতে পারতে। ”সেই যে কল কেটেছিল এখন অব্দি তানভিরের কোনো কল বা মেসেজ আসে নি। বন্যা ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেলেও সেটা প্রকাশ করতে পারছে না। তানভিরকে কল দেয়ার সাহসও পাচ্ছে না।বন্যা ছেলেটার কাছাকাছি গিয়ে পেছন থেকে ডাকল,“শুনছেন?”ছেলেটা পেছনে ঘুরতেই বন্যা রীতিমতো বিষম খেয়ে উঠেছে। ছেলেটা মলিন হেসে বলল,“জ্বি বলুন।”বন্যা কাশতে কাশতে বলে উঠল,” সরি ভাই, সরি সরি। আমি অন্য কেউ ভেবেছিলাম। ”সেই ছেলেটার পাশ থেকে আরেকটা ছেলে একটু রাগী স্বরে জিজ্ঞেস করল,” কোন ইয়ার? কোন ডিপার্টমেন্ট? বড় ভাইদের ডেকে আবার সরি বলছো? ”বন্যা ঠান্ডা কন্ঠে বলল,” বোটানি, সেকেন্ড ইয়ার৷ কোথাও কি লেখা আছে বড় ভাইদের ডাকা যাবে না? আমি অন্য একজন ভেবে ডেকেছিলাম যেহেতু ওনি সে না তাই সরি বলেছি। ইচ্ছেকৃত ভাই ডেকে সরি বলতে আসি নি।”“মুখে মুখে কথা বলছো আবার। এজন্যই বলি মেয়ে মানুষ আসলেই ভেজাল।”বন্যা একটু রাগী স্বরে বলল,” আজব মানুষ তো।”বন্যা যেই ছেলেকে ডেকেছিল ঐ ছেলে এবার দু’জনকে থামিয়ে বন্যাকে উদ্দেশ্য করে বলল,” সরি, ওর কথায় কিছু মনে করো না আপু। বেচারার তিনদিন হলো ব্রেকাপ হয়েছে সেই কষ্টে এমন করতেছে।”বন্যা মুখ ফস্কে বলে ফেলল,” ঠিকই আছে। মেয়েদের সাথে এমন আচরণ করলে ব্রেকাপ হবেই। ”দু’জনই কপাল কুঁচকে রাগী রাগী ভাব নিয়ে বন্যার দিকে তাকিয়ে আছে। বন্যার মনের কথা মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেছে এটা বুঝতে কিছুটা সময় লাগলো, সঙ্গে সঙ্গে বন্যা মুখ চেপে পালালো। মিনহাজ আর তামিম এগিয়ে এসে চিন্তিত স্বরে জানতে চাইল,” এভাবে ছুটছিস কেনো? আর ছেলেগুলোই বা কে?”বন্যা নিজের কপাল চাপড়ে থমথমে কন্ঠে বলল,“আমি ভাবছিলাম ওনি।”মিনহাজ কিছুটা ভাব নিয়ে জিজ্ঞেস করল,” ওনি টা আবার কে?”বন্যা লাজুক হেসে বলল,” আমার ননদের একমাত্র ভাই।”দু’জন মেকি স্বরে একসঙ্গে বলে উঠল,“ওওওওওওওওও”বন্যা রাগী স্বরে বলল,“ফাজলামো করিস না।”মিনহাজ হেসে জিজ্ঞেস করল,“তানভির ভাইয়াকে মিস করছিস?”বন্যা এপাশ ওপাশ মাথা নাড়ল, মুখে কিছুই বলল না। তামিম স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,” মিস করছিস না বলেই তো চোখের সামনে শুধু ভাইয়াকে দেখিস।”বন্যা আস্তে করে বলল,” আমার মনে হয়েছিল ওনি।”মিনহাজ ধীর কন্ঠে বলল,” প্যারা নিও না V2. ভাইয়া আসতেছে।”বন্যা উত্তেজিত কন্ঠে বলে উঠল,“ওনি আসবে, সত্যি? ”তামিম মিনহাজের দিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,” দেখছিস, এই বলছে মিস করে না। যেই আসছে শুনছে ওমনি লাফায় উঠছে। মেয়ে মানুষ, বুক ফাটবে তবুও মুখ ফুটবে না।”বন্যা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,” এখন বল ওনি সত্যি আসবেন কি না। ওনি না আসলে আমি বাসায় চলে যাব। বিকেলে টিউশন আছে ।”তামিম ঠোঁট বেঁকিয়ে নিরেট কন্ঠে বলল,” আমরা এতকিছু জানি না, নিজের দরকার নিজে কল দিয়ে দেখেন। আমাদের কাজ আছে, আসছি।”মিনহাজ আর তামিম চলে যাচ্ছে । বন্যা আশপাশ তাকিয়ে দেখল, ঐ ছেলেগুলোকেও আর দেখা যাচ্ছে না। এদিকে তানভির আসবে কি না এটাও বুঝতে পারছে না। বন্যা এক জায়গায় বসে সাহস করে তানভিরের নাম্বারে কল দিল। তানভির কল রিসিভ করে শান্ত কন্ঠে জানতে চাইল,” কি করছো?”বন্যা শীতল কন্ঠে বলল,“অপেক্ষা। ”তানভির হেসে বলল,“আর একটু অপেক্ষা করুন রাস্তায় আছি। ”বন্যা নিঃশব্দে হেসে কল কেটে দিয়েছে। প্রায় ৩০ মিনিট হয়ে গেছে বন্যা অপেক্ষায় করছে। বার বার ফোন বের করছে কিন্তু কল দিতে পারছে না। অকস্মাৎ আগে দেখা হওয়া দুটা ছেলের মধ্যে এক ছেলে হাতে জবা ফুল নিয়ে এসে বন্যার সামনে ধরলো। বন্যা কপাল কুঁচকে বলল,” আমাকে ফুল দিচ্ছেন কেনো?”ছেলেটার ঠোঁট খানিক প্রশস্ত হলো। মৃদুস্বরে বলল,” আগে নাও তারপর বলছি।”বন্যা রাগান্বিত কন্ঠে বলে উঠল,” আজব তো, আমি কোনো ফুল নিব”এরমধ্যে তানভির এসে ঐ ছেলের হাত থেকে ফুলটা টেনে নিয়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠল,” ওকে ফুল দেয়ার সাহস কিভাবে হলো আপনার?”ছেলেটা থতমত খেয়ে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়ালো। বন্যা নিভু নিভু চোখে তানভিরকে দেখছে, তানভিরের রাগান্বিত চেহারার পানে তাকানো যাচ্ছে না। বন্যা বার বার পল্লব ঝাপ্টে ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে। তানভিরের মতো দেখতে ছেলেটা কোথা থেকে দৌড়ে এসে বলল,” সরি ভাইয়া, কিছু মনে করবেন না প্লিজ। আসলে কিছুক্ষণ আগেই আপু আমার বন্ধুকে বদদোয়া দিয়েছিল৷ আপুর বদদোয়ার উল্টো ফলে গেছে এই খুশিতে ও ফুল দিতে আসছে।”তানভির কন্ঠস্বর তিনগুণ ভারী করে জানতে চাইল,” কিসের বদদোয়া?”ছেলেটা ধীর কন্ঠে বলল,” আপু বলছিল আমার আচরণের জন্য আমার ব্রেকাপ হবেই। আপু কথাটা বলছে এক ঘন্টাও হয় নি তারমধ্যে আমার গার্লফ্রেন্ড নিজে থেকে এসে আমার সাথে কথা বলছে। গত তিনদিনে যে মেয়ে আমার দিকে তাকিয়েও দেখে নি সে আজ নিজেই চলে আসছে। সেই খুশিতে আপুকে ধন্যবাদ দিতে আসছি। ঐ যে আমার গার্লফ্রেন্ড দাঁড়িয়ে আছে। ”তানভির অর্ধেক নষ্ট হওয়া ফুলটা ছেলেটার হাতে দিয়ে কটমট করে বলল,” ফুল দিতে মন চাইলে নিজের গার্লফ্রেন্ডকে দিন। অন্য কাউকে দিতে আসবেন না। ”তানভির বন্যার হাতটা শক্ত করে ধরে গম্ভীর কন্ঠে বলল,“চলো।”বন্যা অনিমেষ আঁখিতে একবার তানভিরকে দেখছে আবার নিজের হাতের দিকে তাকাচ্ছে। বাইকের সামনে গিয়ে থেমে বন্যার হাত ছেড়ে গুরুতর কন্ঠে বলল,” ভার্সিটিতে কি এসব করতে আসো? মানুষকে ব্রেকাপ নিয়ে বদদোয়া দাও?”“না। ওনি বাড়াবাড়ি করছিলেন তাই… ”তানভির অগ্নিদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,” কি করেছে তোমার সাথে?”বন্যা তড়িৎ বেগে বলে উঠল,“না না৷ ঐরকম কিছু না। ওনি মেয়েদের নিয়ে আজেবাজে কথা বলছিল তাই রাগ উঠে গেছিলো।”তানভির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,“তোমার রাগও হয়?”বন্যা নিরুদ্বেগ ভাব নিয়ে বলল,“নাহ। আমার আবার কিসের রাগ? রাগ তো সব আপনাদের। আপনার বোনের রাগ দেখতে এত বড় হয়েছি। তার মন মতো কিছু না হলেই ফোঁস করে উঠে। ইদানীং আপনাদের দেখছি।”তানভির গলা খাঁকারি দিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,” তুমি যেমন ভাবছো আসলে তেমন না। আমি খুব ভদ্র ছেলে।”কথাটা বলেই তানভির মৃদু হাসলো। বন্যা ভ্রু উঁচিয়ে ওষ্ঠ বেঁকিয়ে নিরেট কন্ঠে বলল,“ওহ আচ্ছা। তাই নাকি? আমি তো জানতাম ই না।”বন্যার ভাবভঙ্গি দেখে তানভির উদাসীন কন্ঠে বলল,” তুমি তো আমার সম্পর্কে কিছু জানোই না আর জানতে চাও ও না।”বন্যা বিপুল চোখে তাকিয়ে পরপর জিজ্ঞেস করল,” মেঘ কোথায়?”“এইযে দেখেছো? আমি বুঝাতে চাই ‘অ’ আর তুমি বুঝো ‘ক’।”তানভির অন্যদিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলল,” আমি শুধু শুধু এতটা পথ পেরিয়ে আসছি। ”বন্যা মুচকি হেসে বলল,“আসলেই। আপনি না আসলে কি সুন্দর জবা ফুলটা এখন আমার হাতে থাকতো।”তানভির কপাল কুঁচকে বাইকে বসে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,” বসো”“কেনো?”“বসতে বলছি।”বন্যা চুপচাপ উঠে বসলো। তানভিরের কাঁধে হাত রাখতে গিয়েও লজ্জায় হাত রাখতে পারল না। তানভির মিরবে সেই দৃশ্য দেখে মুচকি হাসলো। জনশূন্য একটা রোডে এসে বাইক থামালো৷ বন্যাকে দাঁড় করিয়ে তানভির একটা গলিতে ঢুকলো। পাঁচ মিনিটের মধ্যে জবা গাছের ঢাল সমেত অনেক গুলো লাল টকটকে জবা ফুল নিয়ে হাজির হলো। বন্যা বিপুল চোখে তাকিয়ে আছে, নিরুদ্বেগ সেই চাহনি, এই চোখের ভাষা বুঝার সাধ্যি কারো নেই, এভাবে তাকানোতে বন্যার থুঁতনিতেও ভাঁজ হয়ে আছে। তানভির গভীর নেত্রে বন্যার দিকে তাকিয়ে বরাবরের মতো ভারী কন্ঠে বলল,” এই নাও তোমার জবা ফুল।”বন্যার দৃষ্টি তখনও তানভিরের চোখের দিকে। বন্যা ভ্রু কুঁচকে বলল,“আমি কি আপনার কাছে ফুল চেয়েছি?”“চাও নি কিন্তু মানুষের থেকে নিতে পারো নি বলে আপসোস তো ঠিকই করছিলে।”” আমি তখন মজা করেছিলাম।”তানভির মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে তপ্ত স্বরে বলল,“এমন মজা কখনো করো না যেটা অপর মানুষের হৃদয়ে আঘাত করে।”তানভিরের হঠাৎ পরিবর্তন দেখে বন্যা সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে রইল৷ নিজেই হাত বাড়িয়ে ঢালগুলো হাতে নিলো। পরপর বাইকে বসে বরাবরের মতো সুপরিচিত জায়গায় এসে বসলো। তানভিরের সাথে একা বের হলে, তানভির সবসময় এখানেই নিয়ে আসে। দুজন মুখোমুখি বসা, কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। বন্যা শান্ত কন্ঠে শুধালো,” আপনি কি রেগে আছেন?”“না।”বন্যা ঠাট্টার স্বরে বলল,” মিথ্যা কথা বললে আপনাকে খুব সুন্দর লাগে।”তানভির ভ্রু কুঁচকে চোখ ছোট করে তাকিয়ে বললো,” ওহ। তারমানে এমনিতে ভালো লাগে না?”বন্যা ঢোক গিলে কথা কাটানোর জন্য উষ্ণ স্বরে জিজ্ঞেস করল,“মেঘ কোথায়?”“বাসায়। ”” কি করে?”“ঘুমাচ্ছে বোধহয়। ”“আবির ভাইয়া কোথায়?”“রাজশাহী। ”বন্যা আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করল,“রাজশাহী কেনো?”“অফিসে কিছু সমস্যা হয়েছে তাই যেতে হয়েছে। ”“একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”“করো।”“আবির ভাইয়া মেঘকে কবে বিয়ে করবেন?”তানভির উত্তর না দিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। বন্যা পরপর আবার প্রশ্ন করল,“কি হলো? বলুন”তানভির পকেট থেকে ফোন বের করে ধীর কন্ঠে বলল,“ভাইয়া কল দিচ্ছে, ওয়েট।”তানভির কল রিসিভ করে শান্ত কন্ঠে বলল,“হ্যাঁ ভাইয়া, বলো।”আবির শক্ত কন্ঠে শুধালো,” কোথায় আছিস?”“বন্যার সাথে দেখা করতে আসছিলাম।”“তোর বোন কোথায়? ভার্সিটিতে আসে নি?”“না। ”“কি করে ও? সারাদিনে কতগুলো কল দিলাম রিসিভ করার নাম নেই। নেটে পর্যন্ত আসছে না।”“ঘুমাচ্ছে বোধহয়। তুমি বলো, বড় আব্বু যে ঝগড়ার কথা বলছিল, সেটা কি মিটছে?”“ধ্যাত, কিসের ঝগড়া! দুই স্টাফে ঝগড়া লাগছে তাও আবার ফুটবল খেলা নিয়ে। আব্বুর কানে কে খবর পাঠাইছে যেন বিশাল কিছু হয়ে গেছে। ”তানভির মলিন হেসে জিজ্ঞেস করল,” কবে আসবে?”” আসছি যেহেতু এখন বললেও কাল চলে যেতে পারব না। চাচ্চু আগেই আসতে বলছিল আমায়। আমিই পাত্তা দেয় নি। এখন এমন সিচুয়েশনে আসতে হয়েছে, যে চাইলেও কিছু বলতে পারছি না। ২-৩ দিনের মধ্যেকাগজপত্রের ঝামেলা মিটিয়ে চলে আসবো।”“আচ্ছা, সাবধানে থেকো।”আবির শীতল কন্ঠে বলল,“তানভির শুন, বাসায় গিয়ে সবার আগে তোর বোনকে বলবি আমায় কল দিতে। রাত থেকে কথা বলতে পারছি না, কল রিসিভ করছে না, কষ্ট লাগতেছে ভাই। ”তানভির কিছু বলার আগেই আবির বলল,“তোদের বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত। ”তানভির বন্যার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে বন্যাকে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসছে। আজও মোখলেস মিয়ার সাথে দেখা হয়েছে। ইদানীং তানভিরকে গলিতে ঢুকতে দেখলেই ওনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে তানভিরের জন্য অপেক্ষা করেন। তানভির আসলে রাস্তা আঁটকে তানভিরকে নামিয়ে নিয়ে গিয়ে চা খেতে খেতে গল্প করেন। প্রথম প্রথম তানভিরের বিরক্ত লাগলেও এখন ব্যাপারটা বেশ ভালো লাগে।আবির সারাদিন অফিস শেষ করে টুকিটাকি শপিং করে বাসায় ফিরতে প্রায় ১০ টা বেজে গেছে। এরমধ্যে মেঘকে অনেকবার কল দিয়েছে কিন্তু মেঘ কল রিসিভ করছে না, তানভিরও বাহিরে। হালিমা খানকে কল দিয়ে কিছুক্ষণ কথা বলেছে, মেঘের কথা জিজ্ঞেস করায় ওনি শান্ত গলায় বলেছেন,” খেয়ে ঘুমিয়ে পরেছে।”কথাটা শুনামাত্র আবিরের মন আরও বেশি খারাপ হয়ে গেছে। একটা মানুষ সারাদিন কিভাবে ঘুমাতে পারে? আবির ফ্রেশ হয়ে শুয়ে মেঘের ছবি দেখছে আর একটু পর পর কল দিচ্ছে। এমন করতে করতে একসময় আবিরও ঘুমিয়ে পরেছে।গতকালের মতো আজও ঘুম ভাঙার পর মেঘের নাম্বারে কল দিল কিন্তু এবারও রিসিভ হলো না। বাসায় কল দিয়েও আশানুরূপ উত্তর পায় নি। হালিমা খান বলছেন জানেন না, মালিহা খান বলছেন হয়তো ভার্সিটিতে গেছে। এদিকে তানভিরকে কল দিচ্ছে, তানভির সকাল থেকেই ব্যস্ত। তানভিরের ফ্রেন্ডের আম্মু অসুস্থ সেখানেই দৌড়াদৌড়ি করছে।আবির রাজশাহী এসেছে ঠিকই কিন্তু তার মন পড়ে আছে খান বাড়িতে। মেঘের সঙ্গে কথা বলতে পারছে না, ও কি করছে, কেমন আছে কিছুই জানতে পারছে না দেখে আবিরের মনের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে আছে। অফিসের কাজেও বিশেষ মনোযোগ দিতে পারছে না,টেবিলে কাগজপত্র ছড়িয়ে আনমনে ভাবছে,” আমি এখানে আসায় মেঘ কি রেগে গেছে? এজন্যই কি আমার কল রিসিভ করে না? কিন্তু মেঘ তো এমন না। ও রাগ করলেও আমার কল টা তো রিসিভ করতো।”বিকেল দিকে অফিস থেকে বের হয়েই মেঘকে কল দিল। বরাবরের মতো এবারও রিসিভ হলো না। পরপর তানভিরকে কল দিল। তানভির কল রিসিভ করতেই আবির ঠান্ডা কন্ঠে শুধালো,” কোথায় তুই?”“বাহিরে। কেনো?”“বাসার কেউ কল রিসিভ করছে না, তোর বোনও রাগ করে বসে আছে, আব্বু পর্যন্ত রিসিভ করছেন না। আমি আর অপেক্ষা করতে পারতেছি না। আমি আব্বুকে ফোনেই সব বলে দিব। তুই বাসায় গিয়ে আব্বুকে ফোনটা দে।”তানভির রাশভারি কন্ঠে বলল,” বড় আব্বু এখন কথা বলার অবস্থায় নেই।”“কেনো? কি হয়েছে?”” সিফাত ভাইয়া বাসায় আসছেন।”” হোয়াট? হোয়াই?”“আমি জানি না।”আবির রাগে বলল,” আব্বু গিয়ে নিয়ে আসছে?”“না না। বড় আব্বু কিছু জানেন না। হুট করেই চলে আসছে। এখন আর কি, রান্না করা হচ্ছে খাইয়ে বিদায় দিবে বোধহয়। ”আবির কন্ঠ তিনগুণ ভারী করে বলল,” সিফাত বাসায় আসছে অথচ আমায় কেউ জানায় নি কিছু। তুই ই বা বাহিরে কি করছিস? মেঘ কোথায়?”“আমি বনুকে নিয়ে বের হয়ছি।”“বের হয়ছিস মানে? কোথায় বের হয়ছিস? আর ফোনটা ও কে দে।”“বনু আমার পাশে নেই। ও পার্লারে গেছে, আর আমি একটা কাজে একটু দূরে চলে আসছি।”“বাসার পরিস্থিতি কি? আর হঠাৎ ও কে নিয়ে বের হতে হলো কে? সব ঠিক আছে তো?”আবিরের একের পর এক প্রশ্নে নাজেহাল তানভির। ঢোক গিলে ছোট করে বলল,” সিফাত ভাইয়ার হাবভাব আমার সুবিধার লাগে নি। কি হয় বলা যায় না তাই আগেভাগেই বনুকে নিয়ে বাসা থেকে বেড়িয়ে আসছি। এখন ফোন সাইলেন্ট করে রেখে দিব।”আবির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,” তোর বোনের যেন কিছু না হয়।”“হু।”★আবির বাসায় নেই আজ তিনদিন হতে চলল। এই তিনদিনে মেঘের নিঃশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত শুনতে পায় নি আবির। তানভিরকে কল দিলে বেশির ভাগ সময় বাহিরেই পাওয়া যায়। আম্মুকে কল দিলে শুনে মেঘ ঘুমাচ্ছে, ছাদে, বাসায় নেই। মোজাম্মেল খানের সাথে টুকটাক কথা হলেও তেমন কিছুই বলেন না ওনি।এই তিনদিন কাটাতে আবিরের দম বন্ধ হয়ে আসছে। মেঘকে দেখার জন্য ভেতরটা ছটফট করছে। আবির এতদিন পর রাজশাহী আসায় গত ছয় মাসের জমে থাকা মিটিং, প্রজেক্ট সহ সব ফাইল দেখতে হচ্ছে। হুট করে চলেও যেতে পারছে না৷সবকিছু ঠিক থাকলে আজকে মেঘকে প্রপোজ করতো আবির। প্রপোজ করেই বাসায় সবার সামনে বিয়ের প্রস্তাব রাখতো। কিন্তু এগুলোর কিছুই হলো না। মেঘকে ছোটখাটো ভাবে প্রপোজ করতে পারলেও বাসায় এখনও কিছু বলে উঠতে পারে নি। এদিকে মেঘেরও কোনো খোঁজ পাচ্ছে না। সারাদিন কল দিতে দিতে আবির ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। গতকাল রাত থেকে তানভিরের সাথেও কথা হয় নি আবিরের। তানভিরের প্রচন্ড মাথা ব্যথা, ঔষধ খেয়ে সেই যে রাতে ঘুমিয়েছিল এখনও উঠে নি। সিফাত কেন আসছিল, কি বলেছে এগুলো জানতে আম্মু, মামনি,আব্বু, চাচ্চু সবাইকে কল দিচ্ছে আবির অথচ কেউ কিছু বলছে না। মালিহা খান বলেছেন, ওনি কিছু শুনেন নি। আলী আহমদ খানকে জিজ্ঞেস করায় ওনি বরাবরের মতো বেশ কিছুটা সময় নিয়ে সিফাতের প্রশংসা করেছেন। বাসার এলোমেলো অবস্থা দেখে আবির ফুপ্পিকে পর্যন্ত কল দিয়েছে।কিন্তু ওনিও বিশেষ কোনো সমাধান দিতে পারলেন না। কারণ সিফাত নামক ছেলের ব্যাপারে আলী আহমদ খানকে কিছু বললেই ওনি রেগে যান।আবির অফিস থেকে সন্ধ্যার পর পর রুমে আসছে। সকালে মেঘ কল ধরছিল না দেখে রাগে রুম তছনছ করে রেখে গেছিলো। সেসব ই এখন গুছাতে হচ্ছে। দিশাবিশা না পেয়ে কল দিল রাকিবকে। রাকিব কল রিসিভ করে শান্ত কন্ঠে বলল,” ঢাকা চলে আসছিস?”“না। ভাবছিলাম বিকেলে চলে যাব তারমধ্যে ৩-৪ টা পুরোনো ফাইল বের করে দিয়েছে। এখন এগুলো না দেখে চলে গেলে আব্বু আবার রেগে যাবেন। আসার সময় এমনিতেই সরি টরি বলে আসছি। তাই ওনাকে রাগানোর মতো কাজ আর করা যাবে না।”“ওহ আচ্ছা। ”“রাকিব, শুন”“হ্যাঁ বল।”“আমাদের বাসায় যাবি একটু? বাসার কি অবস্থা কিছু বুঝতে পারছি না। কারো সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলতে পারছি না। তুই যাবি একটু?”” আমি কিভাবে যাব? তোর আব্বুকে আমি এমনিতেই খুব ভয় পায়। গেলেই ১০ টা কথা জিজ্ঞেস করবে, উত্তর দিতে পারবো না তখন উল্টো বাঁশ খাবো। তার থেকে ভালো হয় তুই রাতটা কাটিয়ে ভোরে রওনা দিস। তুই বাসায় আসার আগেই আমি সেখানে উপস্থিত থাকব।”আবির কিছু বলতে পারল না। মুখের উপর কল কেটে দিয়েছে।★তিনদিন পর আবির ঢাকায় ফিরেছে। বেলা ১১ টা বেজে ৪৭ মিনিট। বাসার মানুষের সাথে ১৯ ঘন্টা যাবৎ কথা হয় না। আবির বাসস্ট্যান্ড থেকে রিক্সা নিয়ে সরাসরি বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। বাসার সামনে এসে রিক্সা থেকে নেমে বাড়ির দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়ালো। পুরো বাড়ি আলোকসজ্জায় সজ্জিত। ৪-৫ টা ছেলে খুব তাড়াহুড়োতে সেই সাজানো আলোকসজ্জা খুলতে ব্যস্ত। মাটিতে জিনিসপত্রের নাজেহাল অবস্থা। আবির গেইটের সামনে আসতেই দারোয়ান আংকেল মলিন হেসে জিজ্ঞেস করলেন,” বাবা, ভালো আছো?”আবির কোনোরকমে ‘ভালো’ বলেই ভেতরে চলে গেল।ড্রয়িং রুমে কোনো মানুষ নেই। হালিমা খান রান্নাঘরে কি যেন করছেন। আবির আশেপাশে কাউকে না পেয়ে ব্যাগ ফেলে ছুটলো মেঘের রুমের দিকে। ব্যস্ত হাতে ধাক্কা দিল মেঘের রুমের চাপানো দরজা। রুম সম্পূর্ণ ফাঁকা, বিছানা টানটান করে বিছানো, এত গুছানো মেঘের রুম কখনো দেখে নি আবির। আবির একে একে সবগুলো রুম দেখতে লাগলো। তানভির, মীম কেউ নেই। ছাদ পর্যন্ত ছুটে গেল আবির। কোথাও কারো অস্তিত্ব নেই। আবিরের নিঃশ্বাস এলোমেলো, চোখ জ্বলছে, ঠোঁট কাঁপছে। আবারও দৌড়ে নিচে আসলো। ততক্ষণে আলী আহমদ খান আর মোজাম্মেল খান সোফায় এসে বসেছেন। আলী আহমদ খান আবিরকে আড়চোখে দেখে স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,” কখন আসছো?”আবির কন্ঠ দ্বিগুণ ভারি করে উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,” মেঘ কোথায়?”আলী আহমদ খান কপাল কুঁচকে ভারী কন্ঠে বললেন,“তুমি কি আমার কথা বুঝো নি? আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি তুমি কখন আসছো?”আবিরের শরীর ঘামছে, সারাবাড়ি ছুটে এসে এখন স্থির হতে পারছে না। ঘনঘন শ্বাস ছেড়ে পূর্বের তুলনায় আরও ভারী কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,” আমি জিজ্ঞেস করছি মেঘ কোথায়?”” ও যেখানে থাকার সেখানেই আছে।”“মানে? কোথায় ও?”মোজাম্মেল খান এবার মৃদুস্বরে বললেন,” শ্বশুরবাড়িতে। ”কথাটা কর্ণকুহরে প্রবেশ মাত্রই আবিরের মাথা চক্কর দিয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে মাথায় পুরো আকাশ ভেঙে পরেছে। চোখে সবকিছু অন্ধকার দেখছে। আবির রাগান্বিত কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠল,” আপনারা কি ফাজলামি করছেন আমার সাথে?”মোজাম্মেল খান তপ্ত স্বরে বললেন,” গলা নামিয়ে কথা বলো, তোমার সাথে কি আমাদের ফাজলামো করার সম্পর্ক?”আবিরের কানে কিছুই ঢুকছে না। অনবরত মাথা ঘুরছে আবিরের। রাগে গজগজ করতে করতে বলল,” মেঘের বিয়ে হতে পারে না। আমার মেঘ কোথায়? ”মোজাম্মেল খান ধীর কন্ঠে বললেন,” কেন হতে পারে না? তুমি আমাকে ছয় মাস সময় দিয়েছিলে সেই ছয় মাস পেরিয়ে গেছে তাই আমি আমার মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিয়েছি।”আবিরের দু-চোখ টকটকে লাল হয়ে আছে, কান দিয়ে গরম বাতাস বের হচ্ছে, পড়নের শার্ট ভিজে একাকার অবস্থা। আবির দু’হাতে চোখ-মুখ মুছে গুরুতর কন্ঠে শুধালো,“তানভির কোথায়?”মোজাম্মেল খান ঠান্ডা কন্ঠে বললেন,” মেঘের সঙ্গে গেছে।”
গল্পঃ আমৃত্যু ভালোবাসি তোকেলেখিকাঃ সালমা চৌধুরী..................................................................................................................................................................আবির দু*র্বোধ্য দৃষ্টিতে আলী আহমদ খান ও মোজাম্মেল খানকে দেখছে। ওনাদের স্বাভাবিক মুখো ভঙ্গি দেখে আবিরের কৃশ লাল চোখ দুটা আ*গ্নে*য়গি*রির লা*ভা*র ন্যায় রক্তাভ বর্ণ ধারণ করেছে। বুকের বাম পাশে বক্ষপিঞ্জরে আবদ্ধ প্রায় ৩০০ গ্রামের হৃদপিণ্ডটা দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। আচমকা দুঃস্বপ্নগুলো মস্তিষ্কে হুমকি খেয়ে পরেছে, এলোপাতাড়ি ছুটছে ভয়ংকর সব নিষিদ্ধ চিন্তা। চোখের সামনে বারবার মেঘের আদুরে আদলখানা ভাসতেছে। ১৯ ঘন্টা ধরে ঠিকমতো খাওয়া নেই আবিরের, বাসার কারো সাথে কোনো যোগাযোগও ছিল না। তানভিরকে শ খানেক কল দিয়েছে কিন্তু রিসিভ হয় নি একটা কলও। বাসার এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি দেখে প্রচন্ড মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছে। আবির দুহাতে মাথা চেপে অগ্নি ঝরা কন্ঠে চিৎকার করল,” আমি কিচ্ছু বিশ্বাস করি না। সত্যি করে বলুন, মেঘ কোথায়?”মোজাম্মেল খান রাগী স্বরে বললেন,” এক কথা তোমাকে কতবার বলতে হবে?”হালিমা খান ডাইনিং টেবিলের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। বাড়িতে আর একটা মানুষও নেই। বাহিরে ডেকোরেশনের লোকজনদের হাউকাউ শুনা যাচ্ছে। আবির ঠিকমতো নিঃশ্বাস নিতে পারছে না, আশেপাশে তাকিয়ে জোরে শ্বাস টেনে শক্ত কন্ঠে বলল,” যতক্ষণ না আপনারা সত্যি কথা বলছেন ততক্ষণ আমি এক কথায় জিজ্ঞেস করবো।”” সত্যি এটায়, আমার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে আর আমার মেয়ে সুখে আছে। ”আবিরের হৃৎস্পন্দন থেমে গেছে, পরপর অপ্রতিভ কন্ঠে বলে উঠল,“কোন সুখে কথা বলছেন আপনি? ওর জীবনের সব সুখ জড়িয়ে আছে আমার সাথে৷ মেঘ শুধু আমার। ওকে আমার থেকে কেউ আলাদা করতে পারবে না। আপনারা যে মিথ্যা নাটক টা সাজিয়েছেন সেই নাটকের মঞ্চ ভেঙে আমি আমার মেঘকে ঠিক আমার করে নিব।”মোজাম্মেল খান আর কিছু বললেন না। ওনি সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছেন। আলী আহমদ গুরুভার কন্ঠে বলে উঠলেন,” কি সব আবোলতাবোল কথা বলছো। তোমার মাথা কি নষ্ট হয়ে গেছে? ”আবির ভেজা কন্ঠে বলে উঠল,” হ্যাঁ। আমার মাথা নষ্ট হয়ে গেছে। আপনাদের এই তালবাহানা আমি আর নিতে পারছি নি। আব্বু- চাচ্চু আমি আপনাদের দু’জনকেই বলছি, আমি মেঘকে ভালোবাসি, খুব বেশি ভালোবাসি। আমার জীবনের সবটুকু জুড়ে শুধু মেঘের অবস্থান। ও কে ছাড়া আমি আমার পৃথিবী কল্পনাও করতে পারবো না। আপনাদের কাছে আমার একটায় রিকুয়েষ্ট প্লিজ মেঘকে আমায় দিয়ে দেন। আমি ও কে রানী বানিয়ে রাখবো আমি, ওর গায়ে কোনোদিন কোনো আঁচড়ও পড়তে দিব না, প্লিজ।”আলী আহমদ খান কপাল গুটিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বললেন,“তুমি মেঘ মামনিকে ভালোবাসো এটা কোনোদিন বলেছো আমাদের? এখন এসব বলে কোনো লাভ নেই। তুমি তোমার জীবনে ফোকাস করো, মেঘ মামনি তার জীবন নিয়ে খুব ভালো আছে৷ ”প্রায় ৫-৭ মিনিট আবির আর আলী আহমদ খানের কথোপকথন চললো। আবিরের রাগ নিয়ন্ত্রণের বাহিরে তবুও বার বার নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, মন কে বুঝাচ্ছে, মেঘের কিছু হয় নি, সব ঠিক আছে, মেঘের বিয়ে হতেই পারে না, তানভির সবকিছু সামলে নিয়েছে। আবির শান্ত থাকলেও আলী আহমদ খান বেশ ক্ষুব্ধ। মোজাম্মেল খান ফোন হাতে নিয়ে নিশ্চুপ বসে আছেন। আলী আহমদ খান একায় আবিরের সাথে কথা কাটাকাটি করছেন। বাবা- ছেলের মাঝে হালিমা খানও কিছু বলতে পারছেন না। আবির এক পর্যায়ে হালিমা খানের কাছে ছুটে গেল। শীতল চোখে হালিমা খানের দিকে তাকিয়ে হিমশীতল কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,” মামনি, তুমি তো জানো, মেঘ কোথায় প্লিজ বলো। বিশ্বাস করো আমি তোমার মেয়েকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না।”আবিরের চোখে পানি জমে আছে, হালিমা খান আবিরের কব্জিতে হাত রেখে শীতল চোখে তাকালেন। কিছু বলার আগেই আলী আহমদ খান হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন,” তুমি কি আমাদের ম*রার ভয় দেখাচ্ছো? এক মেয়ের জন্য তুমি ম*রে যাবে?”আবির রাগান্বিত কন্ঠে চেঁচাল,” আব্বু, মেঘ এক মেয়ে না। ও আমার জীবনে আসা একমাত্র মেয়ে যার জন্য আমি যা খুশি করতে পারি। আজ আমি যে অবস্থানে আছি সবটায় তার জন্য। গত ৯ টা বছর বুকের উপর পাথর রেখে নিজের আবেগকে চেপে রেখে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছি শুধুমাত্র আপনাদের চোখে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করার জন্য । আর সেই যোগ্যতা দিয়ে মেঘকে আমার করে নেয়ার জন্য।”আলী আহমদ খান গম্ভীর কন্ঠে বললেন,” এখন এগুলো বললে আর কি হবে। তার থেকে বরং ফ্রেশ হয়ে খাওয়াদাওয়া করো। তোমার এই অবস্থা চোখে দেখা যাচ্ছে না।”আবির দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে চিৎকার করল,” আমি অন্যকিছু শুনতে চাচ্ছি না, শুধুু বলুন আমার মেঘ কোথায়?”আলী আহমদ খান রাশভারি কন্ঠে বললেন,” মেঘ এখন আর তোমার নেই।”কথাটা কানে ঢুকামাত্র আবির ডানহাতের কব্জি দিয়ে টেবিলের উপর থাকা কাঁচের জগে শক্ত করে ধাক্কা মেরে মাত্রাতিরিক্ত রাগে চিৎকার করল,” মেঘ আমার মানে আমার ই। আমৃত্যু মেঘ আমার ই থাকবে।”আবিরের শক্ত হাতের ধাক্কায় পানি ভর্তি কাঁচে জগ সাথে থাকা দুটা গ্লাস ফ্লোরে পড়ে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। আলী আহমদ খান ঠান্ডা কন্ঠে হুমকি দিলেন,” জিনিসপত্র ভাঙচুর করছো কেনো? তুমি কি..”আবিরের অগ্নি ঝরা দুচোখ দেখে থেমে গেলেন স্বয়ং আলী আহমদ খান।আবিরের হৃদয় ভেঙেচুরে তছনছ হয়ে যাচ্ছে। প্রথমদিকে বিষয়টা সেভাবে গুরুত্ব দেয় নি আবির। কিন্তু আব্বুর অনবরত অসন্তোষজনক কথায় আবির আর টিকতে পারছে না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, গতকাল থেকে খাওয়া নেই, শরীরে তেমন জোরও পাচ্ছে না। ঠিকমতো কথাও বলতে পারছে না। আবওর আলী আহমদ খান আর মোজাম্মেল খানের দিকে স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। মোজাম্মেল খান এখন নির্বাক, যেন এখানে কিছুই ঘটে নি বা ঘটছে না। ওনি গভীর মনোযোগ দিয়ে ফোন দেখছেন। আলী আহমদ খান কপালে ভাজ ফেলে আবিরকে দেখছেন।আবির কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। অকস্মাৎ এলোপাতাড়ি ছুটলো নিজের রুমের দিকে। ১ মিনিটের মধ্যে পুনরায় নিচে নামলো। দু’হাত পেছনে রেখে মেরুদণ্ড সোজা করে দাড়িয়ে গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলল,” আমি শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করছি, মেঘ কোথায় বলুন, নয়তো…”মোজাম্মেল খান ফোন থেকে চোখ সরিয়ে আবিরের দিকে তাকালেন। আলী আহমদ খান গম্ভীর কন্ঠে জানতে চাইলেন,” নয়তো কি? ম*রে যাবে?”“জ্বি।”মোজাম্মেল খান দীর্ঘসময় পর মুখ খুললেন। ছোট করে বললেন,” আবির, মাথা ঠান্ডা করো।”“আমি পারছি না, চাচ্চু। মেঘকে….”আবিরের কথা সম্পন্ন হবার আগেই আলী আহমদ খান রাগী স্বরে বললেন,” ঠিক আছে। ম*রে যাও। ”মোজাম্মেল খান তপ্ত স্বরে বলে উঠলেন,” কি বলছো কি ভাইজান।”আবির নিরেট দৃষ্টিতে আব্বুর মুখের পানে চেয়ে আছে। আলী আহমদ খানও বরাবরের ন্যায় কঠোর রূপে বসে আছেন। অপ্রত্যাশিতভাবে আবির পেছন থেকে হাত সামনে এনে কপালের প্বার্শদেশে রি*ভ*ল*ভর ধরে মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে তেজঃপূর্ণ কন্ঠে বলল,“১০ মিনিটের মধ্যে মেঘ আমার সামনে না আসলে….”বাকি কথা বলার আগেই আলী আহমদ খান আঁতকে উঠে বললেন,“কি হচ্ছে কি ! তুমি কি পাগল হয়ে গেছো?”আবিরের হাতে রি*ভ*ল*ভর দেখে আলী আহমদ খান, মোজাম্মেল খান আর হালিমা খান একসঙ্গে কেঁপে উঠলেন। সবার চোখে আতঙ্ক।“হ্যাঁ, আমি পাগল হয়ে গেছি। এতগুলো বছর যাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবেসেছি, যাকে নিজের সবটুকু সামর্থ্য দিয়ে আগলে রেখেছি তাকে ছেড়ে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না। হয় মেঘকে এনে দিবেন নয়তো আমার লা*শ দাফনের ব্যবস্থা করবেন।”মোজাম্মেল খান মেরুদণ্ড সোজা করে বসে চটজলদি তানভিরকে কল দিচ্ছেন আর উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলছেন,” আবির, প্লিজ, তুমি মাথা ঠান্ডা করো। মেঘ এখনি আসতেছে।”আলী আহমদ খান আবিরের কাছে যেতে নিলে আবির দু পা পিছিয়ে তপ্ত স্বরে বলল,” আমাকে আটকানোর চেষ্টা করবেন না, প্লিজ।”মোজাম্মেল খান আলী আহমদ খানকে টেনে সোফায় বসিয়ে অত্যন্ত নমনীয় কন্ঠে বললেন,” আবির, আমি জানি তুমি এত দূর্বল মনমানসিকতার ছেলে নও। ভাইজানের মতো তুমিও খুব বিচক্ষণ। তাই বোকার মতো এমন কোনো কাজ করো না যেটা তোমার সাথে সাথে এই পরিবারের সব সুখ-শান্তি নষ্ট করে দেয়।”আবিরের দুচোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরছে। গলা অব্দি শুকনো মুখ, তবুও জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজানোর চেষ্টা করল। মোজাম্মেল খানের দিকে অদম্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে সুস্থির কন্ঠে বলতে শুরু করল,“চাচ্চু,আপনি আমাকে যতই চতুর ভাবুন না কেন সত্যি এটায় আমি বড্ড বোকা। যখন ৬ বছরের অবুঝ মেয়েটা আকুল কন্ঠে আমায় বলেছিল ‘কখনো আমায় ছেড়ে যেতে পারবা না’ আমিও বোকার মতো তাকে ছুঁয়ে প্রমিস করেছিলাম যাই হয়ে যাক না কেনো আমি বেঁচে থাকলে কোনোদিনও ওকে ছেড়ে যাব না। আমি যদি বোকা না হতাম তাহলে সেদিন ওকে প্রমিস করতাম না। আর আজ আপনাদের সামনে চিৎকার করে বলতামও না যে, আমার ওকেই লাগবে। হয়তো আমার জীবনটা মেঘ কেন্দ্রিক হতোই না। আর আমার জন্য আপনাদের এত বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মানসম্মানও এভাবে নষ্ট হতো না।”আবির শ্বাস ছেড়ে আলী আহমদ খানের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল,“আব্বু, আমি সত্যি দুঃখিত। আপনার মতো একদম বিচক্ষণ মানুষের সন্তান হয়েও আমি এত বোকা হয়েছি, নয়তো একটা মেয়ের জন্য নিজের জীবন দিতে একবার হলেও ভাবতাম। সবসময় আপনিই বলে এসেছেন, কখনো কাউকে কথা দিলে নিজের জীবন থাকা পর্যন্ত সেই কথা রাখার চেষ্টা করতে হয়। যেই মেঘের মোহে জর্জরিত আবিরের হৃদয় সেই মেঘকে দেয়া কথা রাখতে না পারলে আমার এই জীবন রাখার কোনো প্রশ্নই আসে না। আমি না হয় বোকা হয়েই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করবো।”আবিরের দু’চোখ বেয়ে স্বচ্ছন্দগতিতে অশ্রু গড়িয়ে পরছে। আবিরের মুখের পানে তাকিয়ে হালিমা খানও নিরবে কাঁদছেন। আলী আহমদ খান অবাক লোচনে ছেলের মুখের পানে চেয়ে আছেন, এই আবিরকে ওনি চিনতে পারছেন না। বোধশক্তি হওয়ার পর থেকে আবিরকে কোনোদিনও এভাবে কাঁদতে দেখেন নি তিনি। আলী আহমদ খান নিজের বন্ধুমহলে বরাবরই নিজের ছেলেকে একজন সাহসী, বুদ্ধিমান, দৃঢ় মনমানসিকতার মানুষ হিসেবে পরিচয় দিয়ে এসেছেন। আজ আবিরের এই রূপ দেখে নিজেই আঁতকে উঠছেন। মোজাম্মেল খানের চোখ ছলছল করছে, অতি সন্তর্পণে নিজের চোখ মুছে নিয়েছেন। আবির চোখ ঘুরিয়ে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভেজা কন্ঠে বলল,” ১০ মিনিট সময় শেষ।”আলী আহমদ খান ও মোজাম্মেল খান একসঙ্গে ঘড়ির দিকে তাকালেন। মোজাম্মেল খান ব্যস্ত হাতে তানভিরকে কল দিচ্ছেন। আলী আহমদ খান আবিরকে বুঝাতে ব্যস্ত। আবির ঘড়ির দিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,” আমি এক থেকে তিন পর্যন্ত গুনবো এরমধ্যে মেঘ আমার চোখের সামনে না আসলে……“১”মোজাম্মেল খান উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললেন,” ওরা চলে আসছে প্লিজ, থামো।”“২”মোজাম্মেল খান আর্তনাদ করছেন, অকস্মাৎ আলী আহমদ খানের নজর মেইন গেইটের দিকে পরে। মেইন গেইট থেকে কিছুটা ভেতরে মেঘ নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, প্রশস্ত আঁখিতে উদ্বেগ স্পষ্ট, ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে। মেঘ এসেছে আরও কয়েক সেকেন্ড আগে। আবিরের মাথায় রি*ভ*ল*বার দেখে বক্ষপিঞ্জরে আবদ্ধ হৃদপিণ্ডটা প্রচন্ড বেগে দপদপ করে কাঁপছিল। কয়েক সেকেন্ডেই মস্তিষ্কে একেরপর এক ঘটনা ঘুরপাক খাচ্ছিলো। আজ থেকে আরও ৭-৮ মাস আগেই মিনহাজ বলেছিল আবিরের কাছে রি*ভ*লবা*র আছে। মেঘ তখন মিনজাজকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিল, ইচ্ছেমতো ঝেড়েছিল। আজ চোখের সামনে সেই দৃশ্য দেখে মেঘের দম বন্ধ হয়ে আসছে, মনে হচ্ছে কেউ শক্ত হাতে গলা চেপে ধরে আছে, নিঃশ্বাস ফেলতে পারছে না৷ এমনকি জোরে চিৎকার করে কিছু বলতেও পারছিল না। আলী আহমদ খানের নজর পড়তেই উত্তেজিত কন্ঠে বললেন,“ঐ তো মেঘ। ”আবির পূর্বের ন্যায় রি*ভ*ল*বার ধরে ঘাড় ঘুরালো। সহসা নজর আটকালো এক অপরূপার পানে। বিস্ময় সমেত তাকালো আবির, মোহনীয় সেই দৃষ্টি। মেঘের পড়নে গাঢ় হলুদ আর রানী গোলাপী পাড়ের শাড়ি, কাঁচা ফুলের গহনায় পুরো গা ভর্তি, কপালের ঠিক মাঝ বরাবর একটা গাঢ় গোলাপী রঙের জারবেরা ফুলের কারণে মেঘের মায়াবী আদল আরও বেশি রমণীয় লাগছে। মুখে বেশ ভারী মেকআপ, মনোমুগ্ধকর চোখ আর ঠোঁটের আর্ট দেখে আবির কয়েক মুহুর্তের জন্য অবিক্ষুব্ধ হয়ে রইলো।অন্যমনস্কতায় আবিরের দুচোখ বেয়ে তখনও নিরবধি অশ্রু ঝড়ছে। অলক্ষিতভাবে হাত থেকে রিভলবার পড়তেই আবির আত্মজ্ঞানে ফিরল। মেঘ তখনও পাথরের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। মোজাম্মেল খানের ঠোঁটে কিঞ্চিৎ হাসি ফুটলেও আলী আহমদ খান গম্ভীর মুখ করে দাঁড়িয়ে আছেন। আবির অব্যবহিতভাবে ছুটলো, মেঘের ঠিক সামনে গিয়ে দুই হাঁটুতে ভর ফেলে ধপ করে বসে পড়লো। অকস্মাৎ মেঘের পেট বরাবর বলিষ্ঠ হস্তে ঝাপটে ধরে উচ্চৈঃস্বরে কান্না শুরু করল। আবিরের নিরন্তর কান্না দেখে মেঘ অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। পর পর আব্বু, বড় আব্বু আর ঘাড় ঘুরিয়ে আম্মুর পানে তাকালো, সকলেই নির্বাক চোখে তাকিয়ে আবিরের কান্নার গভীরতা বুঝার চেষ্টা করছেন। মেঘের ভেতরে চলমান তোলপাড় সামলে, নিজেকে শান্ত করে চোখ নামিয়ে আবিরের পানে তাকিয়ে মোলায়েম হাতে আবিরের মাথা জড়িয়ে ধরলো। মেঘের আদুরে স্পর্শে আবির যেন কিছুটা স্বস্তি পেল। নিজের সর্বশক্তি দিয়ে মেঘকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। আবিরের কান্নার শব্দে মেঘের বুকের ভেতর ভয়ঙ্কর কম্পন শুরু হয়ে গেছে। মেঘ বুক ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে আকুল কন্ঠে বলল,” আপনি কাঁদবেন না, প্লিজ। ”আবিরের কান্না থামার নাম ই নিচ্ছে না। গত ৩-৪ দিনেবুকের ভেতর যে ঝড় চলছিল সেই ঝড়ের সমাপ্তি ঘটছে আজ। কাদম্বিনীকে দেখার প্রবল আকাঙ্ক্ষা, কন্ঠ শুনার প্রখরতা, ছুঁয়ে দেখার উমেদ আবিরের অস্তিত্বকে উধাত্ত করে তুলেছিল। তারউপর বাসার অবস্থা দেখে সারাজীবনের জন্য ইহজগতের সমস্ত মায়া ত্যাগ করতে বসেছিল। মেঘ বার বার ঢোক গিলছে, বুক খুঁড়ে কান্না বেড়িয়ে আসার উপক্রম হলো। অকস্মাৎ তানভির বাহির থেকে এসে মেঘের কাঁধে হাত রেখে উষ্ণ স্বরে বলল,” চোখ বেয়ে যদি এক ফোঁটা পানি পরে আর কিঞ্চিৎ মেকআপও নষ্ট হয় তাহলে তোর খবর ই আছে। দুই ঘন্টা রাস্তায় বসে থেকে তোকে সাজিয়ে নিয়ে আসছি, আমি কিন্তু আর পার্লারে নিয়ে যেতে পারব না। ”
Bhoot.com Episode 324 – কবরস্থানের অন্ধকার রহস্যহরর জগতের জনপ্রিয় সিরিজ Bhoot.com আবারও ফিরেছে এক নতুন ভয়ের গল্প নিয়ে।Episode 324 এইবার দর্শকদের নিয়ে যায় এক ভয়ঙ্কর কবরস্থানে, যেখানে প্রতিটি ছায়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে অজানা আতঙ্ক।গল্পের শুরু – মৃত্যুর নীরবতাএই এপিসোডের শুরুতেই দেখা যায় এক পুরনো কবরস্থান।চারপাশে কুয়াশা, শুকনো গাছ, আর নিস্তব্ধ পরিবেশ—যেন সময় থেমে আছে।একটি রহস্যময় কালো ছায়া ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে আসে…কে সে? মানুষ নাকি অন্য কিছু?কবরের ভেতরের গল্পEpisode 324-এর সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—এখানে মৃতরা শুধু স্মৃতি হয়ে থাকে না।গল্পের মাঝে এমন কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা বুঝিয়ে দেয় এই জায়গা অভিশপ্ত।কিছু অদ্ভুত শব্দ, হঠাৎ বাতাসের পরিবর্তন, আর অদৃশ্য উপস্থিতি—সব মিলিয়ে পরিবেশটা হয়ে ওঠে ভয়ংকর।ভয়, সাসপেন্স ও টুইস্টএই এপিসোডে suspense ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে।দর্শক বুঝতেই পারে না পরের মুহূর্তে কী ঘটবে।শেষে এমন একটি টুইস্ট আছে, যা পুরো গল্পের ধারণা বদলে দেয়।কেন শুনবেন Episode 324?কবরস্থান ভিত্তিক ইউনিক হরর থিমডার্ক ও cinematic ভিজ্যুয়ালভয় ধরানো সাউন্ড ডিজাইনঅপ্রত্যাশিত endingবাস্তব নাকি কল্পনা?অনেকেই মনে করেন, এই ধরনের গল্প বাস্তব ঘটনার ছায়া থেকে তৈরি।Episode 324-এও সেই রহস্য লুকিয়ে আছে।হয়তো সবটাই কল্পনা…অথবা, হয়তো সত্যি কিছু লুকিয়ে আছে এই কবরস্থানের অন্ধকারে।শেষ কথাBhoot.com Episode 324 শুধু একটি গল্প নয়—এটি একটি অনুভূতি, একটি ভয়ংকর অভিজ্ঞতা।যারা হরর ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি অবশ্যই মিস না করার মতো একটি এপিসোড।................................................................................................................................................................... ⬇ Download Now
বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় কমেডি নাটক **Bachelor Point** আবারও নতুন এপিসোড নিয়ে হাজির হয়েছে। দর্শকদের দীর্ঘ অপেক্ষার পর **Bachelor Point Season 5 (2025)** মুক্তি পেয়েছে এবং ইতিমধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেএই পোস্টে আপনি **Bachelor Point Season 5-এর সব নতুন এপিসোড BongoBD WEB-DL কোয়ালিটিতে ডাউনলোড বা অনলাইনে দেখার লিংক** পাবেন।The Meme Coin You’ve Been Waiting For!I am AdZilla. Buy my meme coin now!New memecoin is here! Buy now!I am AdZilla. Trade me on any Solana DEX!Bachelor Point Season 5Details.........Drama Name:** Bachelor PointSeason:** 05Release Year:** 2025Genre:** Comedy / DramaLanguage:** BanglaDirector:** Kajal Arefin OmeSource:** BongoBDQuality:** WEB-DLResolution:** 720p / 1080pCast......* Ziaul Hoque Polash (Kabila)* Mishu Sabbir* Chashi Alam (Habu Bhai)* Marzuk Russell* Faria Shahrin* Tasnia Farin* Parsa Evana* Shamim Hasan SarkarStory....Bachelor Point মূলত কয়েকজন ব্যাচেলর বন্ধুর দৈনন্দিন জীবন, মজার ঘটনা এবং বিভিন্ন সমস্যাকে ঘিরে তৈরি একটি কমেডি নাটক। কাবিলা, হাবু ভাই, অন্তরা, রাকিব এবং তাদের বন্ধুদের নিয়ে ঘটে যাওয়া নানা হাস্যরসাত্মক পরিস্থিতিই এই নাটকের মূল আকর্ষণ।Season 5-এ আগের সিজনের চেয়েও বেশি মজার ঘটনা, নতুন গল্প এবং চমক রয়েছে যা দর্শকদের দারুণভাবে বিনোদন দেবে।Disclaimer.....এই পোস্টটি শুধুমাত্র তথ্য প্রদানের জন্য করা হয়েছে। সব কন্টেন্ট তাদের নিজ নিজ মালিকের অধীনে রয়েছে। যদি কোনো কন্টেন্টের বিষয়ে সমস্যা থাকে তবে দয়া করে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।...............................................................................................................................................................⬇ Download 420p Quality ⬇ Download 720p Quality ⬇ Download 1080p Quality
👻 Bhoot.com Episode 323 – ভয়ের এক নতুন অধ্যায়হরর প্রেমীদের জন্য আবারও ফিরে এসেছে জনপ্রিয় সিরিজ Bhoot.com, আর এর Episode 323 যেন ভয় আর রহস্যের এক নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। এই এপিসোডে এমন কিছু ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে যা আপনার মনে প্রশ্ন জাগাবে—ভূত কি সত্যিই আছে?🔥 গল্পের শুরুEpisode 323 শুরু হয় এক ভয়ঙ্কর পরিবেশ দিয়ে—ঘন জঙ্গলের মাঝে এক অদ্ভুত নীরবতা। রাতের অন্ধকারে হঠাৎ করে কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটতে শুরু করে। একজন রহস্যময় ব্যক্তির উপস্থিতি পুরো গল্পটিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।😱 ভয় আর রহস্যের মিশ্রণএই এপিসোডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর সাসপেন্স। প্রতিটি দৃশ্য এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন দর্শক শেষ পর্যন্ত না দেখে থাকতে না পারে।হঠাৎ শব্দ, অদৃশ্য উপস্থিতি, আর অজানা শক্তির খেলা—সব মিলিয়ে এটি একদম থ্রিলিং অভিজ্ঞতা।🎧 কেন এই এপিসোডটি আলাদা?গল্পের গভীরতা অনেক বেশিভয় পাওয়ার মতো বাস্তবসম্মত পরিবেশচমৎকার সাউন্ড ইফেক্টশেষে রয়েছে টুইস্ট, যা আপনাকে অবাক করে দেবে🧠 কি সত্যিই বাস্তব ঘটনা?অনেকেই মনে করেন, এই ধরনের গল্প বাস্তব ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত। Episode 323-তেও সেই ছাপ স্পষ্ট।এটি শুধুই কল্পনা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে সত্যি কিছু—সেটা ভাবার বিষয়।🎯 শেষ কথাBhoot.com Episode 323 শুধু একটি হরর গল্প নয়, এটি একটি অভিজ্ঞতা।যারা ভয় পেতে ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি অবশ্যই দেখার মতো একটি এপিসোড।....................................................................................................................................................................... ⬇ Download Now
বাংলাদেশ ফুটবল লিগে আজ আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ। রাতে লা লিগায় মাঠে নামবে রিয়াল মাদ্রিদ, প্রতিপক্ষ জিরোনা।বাংলাদেশ ফুটবল লিগআবাহনী-মোহামেডানবেলা ৩-৩০ মি., টি স্পোর্টসপিএসএলকোয়েটা-রাওয়ালপিন্ডিরাত ৮টা, টি স্পোর্টসআইপিএলরাজস্থান-বেঙ্গালুরুরাত ৮টা, স্টার স্পোর্টস ১, ২লা লিগারিয়াল মাদ্রিদ-জিরোনারাত ১টা, বিগিন অ্যাপইংলিশ প্রিমিয়ার লিগওয়েস্ট হাম-উলভারহ্যাম্পটনরাত ১টা, স্টার স্পোর্টস সিলেক্ট ১
গল্পঃ আমৃত্যু ভালোবাসি তোকেলেখিকাঃ সালমা চৌধুরী..................................................................................................................................................................খান বাড়িতে খনিকের নিস্তব্ধতা বিরাজমান। সবাই এতক্ষণ আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে মোজাম্মেল খানের কথাগুলো শুনছিল৷ মেঘ আবিরের মুখের পানে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে, কিন্তু আবিরের অভিব্যক্তি ঠিক বুঝা যাচ্ছে না। ইকবাল খান আর মোজাম্মেল খান টুকটাক কথা বলছেন বাকিরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ডেকোরেশনের জন্য আসা ৩-৪ জন ছেলে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে ছাদে যাচ্ছে, সিঁড়ির কাছাকাছি যেতেই আলী আহমদ খান হুঙ্কার দিলেন,” তোমাদের আর কতক্ষণ লাগবে? বাসায় মেহমান আসার সময় হয়ে গেছে অথচ তোমাদের কাজ ই শেষ হচ্ছে না।”“বেশিক্ষণ লাগবে না আংকেল।”” এই কথা সকাল থেকে শুনে আসছি। এমন তাড়াহুড়োতে কাজ করেছো যে বিয়ে বাড়িকে পুরো স্বাধীনতা দিবসের সাজে সাজিয়ে ফেলছো। শুধু লাল সবুজ দিয়ে কেউ বিয়ে বাড়ি সাজায়?”“সরি, আংকেল। সত্যি বলতে, তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে আগে চেক করতে মনে ছিল না। এখন আর ভুল হবে না।”” শুনো, আমার একমাত্র ছেলের বিয়ে বলে কথা৷ এমনভাবে সাজাবে যেন বাড়ির সাজ দেখেই এলাকার মানুষ তাক লেগে যায়। টাকা নিয়ে একদম ভেবো না।’” জ্বি আংকেল। ”ছেলেগুলো ছাদে চলে যাচ্ছে। মোজাম্মেল খান আচমকা ধীর কন্ঠে বললেন,“ভাইজান, একটা কথা বলি?”“হ্যাঁ”মোজাম্মেল খান শীতল কন্ঠে বললেন,“আমি একবছর যাবৎ ওদের বিয়ের কথা বলতেছি তবুও তুমি রাজি হলে না। হঠাৎ কি এমন হলো যে হুট করে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলে তাও আবার আগামীকালই বিয়ে।”আলী আহমদ খান মলিন হেসে বললেন,“তোর ছেলের জন্য।”“মানে?”“তানভির বলছে, মেঘকে আবিরের কাছে বিয়ে না দিলে আবির নাকি ম* রে যাবে।”সবাই অতর্কিতে আবিরের দিকে তাকালো। অথচ আবির রুষ্ট চোখে তানভিরের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,“শালা, ম*রে যাওয়ার কথা বলতে বলছি তোকে?”তানভির ঠোঁট চেপে ডানহাতের দু আঙুলে কান ধরে বিড়বিড় করে বলল,“সরি, মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেছিলো।”“দূর, শালা।”তানভির কপট রাগী স্বরে বলল,“শালা না সম্বন্ধী।”আবির ঠোঁট বেঁকিয়ে রাগী স্বরে বলল,“তোকে আমি দেখে নিব।”মাহমুদা খান বললেন,“আবির, রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে খাওয়াদাওয়া করে নে। রেডি হতে হবে তো। ”আবির ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,“এই ভরদুপুরে রেডি হয়ে কি করবো?”আলী আহমদ খান মেঘকে ইশারা করে গম্ভীর কন্ঠে বললেন,“আমার বৌমার শহর ঘুরে গায়ে হলুদের ফটোশুট করার ইচ্ছে। যাও শাওয়ার নিয়ে ঝটপট রেডি হও।”আবির মেঘের দিকে একবার তাকালো পরপর সবার দিকে এক নজর তাকিয়ে আচমকা মেঘকে কোলে তুলে নিল। আলী আহমদ খান সহ উপস্থিত সবাই আঁতকে উঠল। মেঘ অস্পষ্ট গলায় আর্তনাদ করে উঠল। আলী আহমদ খান তপ্ত স্বরে বললেন,“তোমাকে রুমে গিয়ে শাওয়ার নিতে বলছি। তুমি ও কে কোলে নিয়েছো কেনো?”আবির রাশভারি কন্ঠে বলল,“আমি আপনাদের কাউকে বিশ্বাস করি না। কোন ভরসায় রেখে যাব এখানে? যদি আবার লুকিয়ে ফেলেন? আমি আর কোনো রিস্ক নিতে পারব না, সরি।”আবির মেঘকে কোলে নিয়ে নিরুদ্বেগ ভঙ্গিতে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। তানভির হাত দিয়ে মুখ চেপে হাসছে। আলী আহমদ খান, মোজাম্মেল খান, ইকবাল খান স্তব্ধ চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছে। বাড়ির মহিলারাও থম মেরে দাঁড়িয়ে আছেন।তিনদিন আগে-সন্ধ্যার অনেক পরেও আলী আহমদ খান অফিসে নিজের কেবিনে বসে কাজ করছিলেন। মোজাম্মেল খান আজ অফিসে আসেন নি, আবির সিফাতের উপর রাগ করে দুপুরের দিকেই অফিস থেকে চলে গেছে। ইকবাল খান সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিলেন হঠাৎ বাসা থেকে কল আসছে, বাজার নিয়ে যেতে হবে তাই ওনিও সন্ধ্যার দিকে চলে গেছেন। সিফাত কাজ শেষ করে অনেকক্ষণ এমনিতেই বসে বসে আলী আহমদ খানের সাথে গল্প করছিলো। রাত বেশি হওয়ায় সিফাত কেও ছুটি দিয়ে দিয়েছেন। সিফাত অফিস থেকে বের হবার ১০ মিনিটের মধ্যে রাকিব আর রাসেল আলী আহমদ খানের কেবিনের সামনে উপস্থিত হলো।।রাকিব সালাম দিয়ে মৃদুস্বরে বলল,“আংকেল ভেতরে আসতে পারি?”আলী আহমদ খান কপালে ভাজ ফেলে বললেন,” আরে রাকিব যে, আসো ভেতরে আসো।”রাসেলকে খানিক দেখে কিছুটা চিন্তিত স্বরে জানতে চাইলেন,“কি ব্যাপার, তোমরা হঠাৎ আমার কাছে কি মনে করে?”রাকিব পেছনে ঘুরে কিছুটা তপ্ত স্বরে ডাকল,“এই তানভির, ভেতরে আয়।”তানভির গুটি গুটি পায়ে রুমে এসে মাথা নিচু করে দাঁড়ালো। রাকিবদের সাথে তানভিরকে দেখে আলী আহমদ খান একটু বেশিই অবাক হলেন। তানভিরের দিকে তাকিয়ে গুরুগম্ভীর কন্ঠে শুধালেন,“কি হয়েছে?”রাকিব শ্বাস ছেড়ে বুকে সাহস নিয়ে বলল,” আংকেল, আপনার কাছে একটা রিকুয়েষ্ট ছিল।”“বলো।”“প্লিজ, না করবেন না।”“ঠিক আছে, বলো।”রাসেল এবার সাহস করে বলল,” আংকেল আবির একজনকে খুব বেশি পছন্দ করে। তাকে বিয়ে করতে চাই, এখন আপনার সমর্থন প্রয়োজন। প্লিজ, না করবেন না।”আলী আহমদ খান রাগী স্বরে বললেন,” আবির তোমাদের পাঠিয়েছে?”তানভির চটজলদি উত্তর দিল,” না না। ভাইয়া কিছু জানে না। আমরা নিজে থেকে আসছি।”রাকিব ঠান্ডা কন্ঠে বলতে শুরু করল,” আংকেল এখানে আসার ব্যাপারে আবিরকে আমরা কিছুই জানায় নি। আবির জানলে কখনো আসতে দিতো না। কিন্তু চোখের সামনে আবিরের এত কষ্ট দেখে আমাদের সহ্য করতেও কষ্ট হয়। আবির আপনাকে খুব সম্মান করে, শুধুমাত্র আপনাদের কথা ভেবে নিজের মনের আবেগ প্রকাশ করতে পারে না। সত্যি বলতে আবির মেঘকে অনেক বেশি ভালোবাসে, মেঘকে বিয়ে করতে চায় কিন্তু আপনারা রাজি হবেন কি না সেই ভয়ে এতদিন আপনাদের কিছু করতে পারছিল না, আর না মেঘকে কিছু বলছে। এখন মেঘও আবিরকে খুব পছন্দ করে। আপনি ওদের সম্পর্কটা প্লিজ মেনে নিন।”“এখন আমার কি করতে হবে?”” আবির আজ বাসায় নিজের মনের কথা জানাবে মানে মেঘকে বিয়ে করার কথা বলবে। আপনি প্লিজ রাজি হয়ে যাবেন। একমাত্র আপনি বললে বাসার সবাই মেনে নিবে। ”” যদি আমিই মেনে না নেয়। তখন?”রাকিব আঁতকে উঠে বলল,” আংকেল এমন কিছু করবেন না, প্লিজ।”“কেনো করব না? আমার ছেলের জন্য বউ খোঁজার অধিকার কি আমার নেই? সে নিজে কিছু বলতে সাহস পাচ্ছে না বলে তোমাদের পাঠিয়েছে, আর তোমরাও আমাকে মানাতে চলে আসছো। শুনো তোমাদের বন্ধুকে বলে দিও আমি ওর সম্পর্ক মানবো না।”তানভির ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,” কেনো মানবেন না, বড় আব্বু?”“আমার ইচ্ছে আমি ছেলেকে দেখেশুনে বিয়ে করাবো।তোমার কোনো আপত্তি আছে?”“জ্বি।”“কি ? ”” বনু আর ভাইয়া দু’জন দু’জনকে ভালোবাসে সেখানে অন্য কাউকে দেখার প্রশ্নই আসে না। তাছাড়া আপনি ভাইয়ার জন্য অন্য কোনো মেয়ে দেখলেও বিশেষ কোনো লাভ হবে না কারণ ভাইয়া আমার বোন ছাড়া কারো দিকে তাকিয়েও দেখবে না।”আলী আহমদ খান গম্ভীর কন্ঠে বললেন,” তানভির তুমি কি জানো না, খান বাড়িতে প্রেম নিষিদ্ধ? ”” প্রেম নিষিদ্ধ বলেই ভাইয়া বনুর সাথে প্রেম করার চিন্তাও করে নি । সরাসরি বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আপনি কি চান না ভাইয়া ভালো থাকুক?”“হ্যাঁ চাই কিন্তু আমার নিয়মনীতি ভেঙে নয়।”তানভির রাগে ফোঁস করে বলে ফেললো,” কোন নিয়মনীতি ভাঙার কথা বলছেন? যেই নিয়মনীতি সন্তানের খুশি সহ্য করতে পারে না সেই নিয়মনীতি চিরতরে ভেঙে দেয়া উচিত। আপনাদের নিয়মনীতি কি সন্তানের জীবনের থেকেও বেশি দামী?”” মানে?”তানভির চুপ হয়ে গেছে।আলী আহমদ খান পুনরায় বললেন,‘কি বলতে চাচ্ছো?’তানভির গম্ভীর কন্ঠে বলল,” মেঘকে না পেলে ভাইয়া সুসা*ইড করবে। ”আলী আহমদ খান বসা থেকে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলেন,“হোয়াট?”রাকিব শীতল কন্ঠে বলল,“জ্বি আংকেল। আর বিষয়টা এখন মজার জায়গাতেও নেই। আবিরের সাথে আমি পার্সোনাললি অনেকবার কথা বলেছি তার ঘুরেফিরে এই এক কথায়। ”প্রায় ৩০ মিনিটের মতো তানভির, রাসেল, রাকিব আর আলী আহমদ খানের আলাপচারিতা চলল। একদম শেষ পর্যায়ে আলী আহমদ খান শর্ত সাপেক্ষে আবিরদের সম্পর্কটা মোটামুটি ভাবে মেনে নিয়েছেন৷ রাকিবদের বিদায় দিয়ে তানভিরের সাথে আরও প্রায় ৪০ মিনিটের মতো কথা বলেছেন। সেখানে বসেই আবিরকে রাজশাহী পাঠানোর পরিকল্পনা করেন। আবিরকে একেবারে বাসে উঠিয়ে তারপর মাহমুদা খানের সাথে দেখা করতে যান। ওনার সাথে আলোচনা শেষ করে আলী আহমদ খান বাসায় ফিরে সরাসরি মেঘের রুমে যান। মেঘ তখন বিছানার বসে বসে আবিরের দেয়া আংটি টা দেখছিল আর আনমনে কত কি ভাবছিল। হঠাৎ আলী আহমদ খান রুমে ঢুকতেই মেঘ থতমত খেতে হাত পেছনে লুকানোর চেষ্টা করল কিন্তু আলী আহমদ খানের হুঙ্কারে সঙ্গে সঙ্গে হাত সামনে এনে আংটি দেখাতে বাধ্য হলো।আলী আহমদ খান গুরুভার কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,” তুমি আবিরকে ভালোবাসো?”মেঘ অবাক লোচনে তাকিয়ে আবিরের শিখিয়ে দেয়া কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করলো কিন্তু আলী আহমদ খানের সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যা বলার মতো সাহস মেঘের নেই তাই বাধ্য হয়ে বলল,“জ্বি ”“বিয়ে করতে চাও?”মেঘ আঁতকে উঠে শীতল চোখে তাকালো। কিছুক্ষণ নীরব থেকে ধীর কন্ঠে বলল,“আপনারা রাজি থাকলে….”আলী আহমদ খান গুরুভার কন্ঠে বলে উঠলেন,” তুমি সত্যি সত্যি আবিরকে ভালোবাসলে আর বিয়ে করতে চাইলে আমি যা বলব তা মানতে হবে। যদি রাজি থাকো তাহলে তিনদিন পর ই তোমাদের বিয়ে দিয়ে দিব। বলো রাজি আছো?”মেঘ আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে রইলো। আলী আহমদ পুনরায় বললেন,” আবারও বলছি যদি আবিরকে নিজের করে পেতে চাও তাহলে আমার শর্ত মানতে হবে। আবিরকে চাও কি না?”মেঘ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,“চাই।”“ঠিক আছে৷ তোমার ফোনটা আগামী তিন-চারদিন আমার কাছে জমা থাকবে। আর তুমি কোনো ভাবে আবিরের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টাও করবে না। আমার সিদ্ধান্ত ছাড়া বাসার বাহিরে পাও রাখবে না।”মেঘ শক্ত কন্ঠে জানতে চাইল,” এগুলো কোনো করতে হবে, বড় আব্বু?”আলী আহমদ খান মেঘের মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করলেন,” তুমি আবিরের বউ হলে সম্পর্কে আমি তোমার কি হবো?”আলী আহমদ খানের মুখে এমন প্রশ্ন শুনে মেঘ বিস্ময় সমেত তাকিয়ে রইলো। মনের ভেতর উত্তর থাকা সত্ত্বেও দেয়ার মতো শক্তি পাচ্ছে না।আলী আহমদ খান ভারী কন্ঠে বললেন,” শ্বশুর আব্বু হবো তো নাকি?”শ্বশুর আব্বু কথাটা শুনেই মেঘ লজ্জায় নুইয়ে পড়েছে। কান দিয়ে অনবরত উষ্ণ ভাপ বের হচ্ছে। আলী আহমদ খান মুচকি হেসে বললেন,” আমার তো মেয়ে নেই তাই আমার অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল, আমার ছেলের বউ মানে আবিরের বউ আমাকে আব্বাজান বলে ডাকবে। আজ আমি আমার ছেলের বউকে পেয়েছি তাই আজ থেকে তুমি আমায় আব্বাজান ডাকবে। ”এই অনীস্পিত, শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে মেঘ কি করবে বুঝতে পারছে না। হঠাৎ কি ভেবে, ওড়না টেনে মাথায় দিয়ে তৎক্ষনাৎ পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। আলী আহমদ খান সালামি দিতে দিতে বললেন,” আব্বাজান বলো শুনি একটু। ”মেঘের বুকের ভেতর উতালপাতাল ঢেউ শুরু হয়ে গেছে। ইদানীং আবিরের সামনেও এতটা লজ্জা পায় না যতটা লজ্জা বড় আব্বুকে সামনে পাচ্ছে। মেঘ নিজের সাথে যুদ্ধ করে বুকে সাহস নিয়ে আস্তে করে বলল,” আব্বাজান। ”“মাশাআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ। আমার মনের আশা আজ পূরণ হলো। এখন বলো, তুমি কি তোমার আব্বাজানের জিত দেখতে চাও না? তোমার আব্বু প্রতিনিয়ত আমার সাথে খোঁচাখুঁচি করে অথচ আমি কিছুই বলি না। তুমি যদি আমার কথা মানো তাহলে এবার আমিই জিতবো। তুমি কি চাও না আমি জিতি?”“জ্বি চাই। ”“ঠিক আছে, আমাদের মধ্যকার আলোচনা যেন তোমার আব্বুর কানে না যায়। এখন বলো তুমি কি আমার শর্তে রাজি আছো?”“জ্বি। আমি সব শর্তে রাজি কিন্তু…. ”আলী আহমদ খান জিজ্ঞেস করলেন,“কিন্তু কি? কিছু লাগবে?”মেঘ মাথা নিচু করে শক্ত কন্ঠে বলল,” আমার শুধু আবির ভাইকেই লাগবে।”“তোমার আবির ভাইকে তুমি ঠিক সময় পেয়ে যাবে, চিন্তা করো না।”সেদিনের পর থেকে তানভির আর মেঘ দু’জনকে আলী আহমদ খান যা বলেন তারা তাই করে। মেঘকে নিয়ে শপিং এ যাওয়া, ফেসিয়াল করতে পার্লারে নিয়ে যাওয়া। এমনকি তানভির এলাকার স্পাইগুলোকে পর্যন্ত আবিরের কল ধরতে নিষেধ করে দিয়েছে।সবই আলী আহমদ খানের কথায় করেছে। ওনার কথা না মানলে ওনি মেঘ আবিরের বিয়ে মানবে না এই আতঙ্কে তানভির সব মেনে নিয়েছে।প্রথম দু’দিন বাসার কেউ ই কিছু জানতে পারে নি। কিন্তু একদিন সিফাত কাউকে না জানিয়ে বাসায় চলে আসায় কিছুটা এলোমেলো হয়ে গেছিলো। সিফাতের চালচলন খুব একটা সুবিধাজনক মনে হয় নি তাই আলী আহমদ খান পরিকল্পনা করে তানভিরকে দিয়ে মেঘকে বাহিরে পাঠিয়ে দিয়েছিল। সিফাত বাসা থেকে যাওয়ার পর থেকে বাসায় সিফাতকে নিয়ে টুকটাক আলোচনা শুরু হচ্ছিলো। মেঘের কানে এসব গেলে মেঘ কষ্ট পাবে তাই ওনি একদিনের মধ্যে সবকিছু রেডি করে বাসার সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে। মোজাম্মেল খান আগে থেকেই রাজি ছিলেন তাছাড়া মেঘদের ব্যাপারে ওনার সিদ্ধান্ত তেমন কার্যকর নয় সেজন্য আলী আহমদ খানের কথায় শেষ কথা ছিল।
গল্পঃ আমৃত্যু ভালোবাসি তোকেলেখিকাঃ সালমা চৌধুরী..................................................................................................................................................................” চোখ বেয়ে যদি এক ফোঁটা পানি পরে আর কিঞ্চিৎ মেকআপও নষ্ট হয় তাহলে তোর খবর ই আছে। দুই ঘন্টা রাস্তায় বসে থেকে তোকে সাজিয়ে নিয়ে আসছি, আমি কিন্তু আর পার্লারে নিয়ে যেতে পারব না। ”মেঘ তানভিরের মুখের পানে চেয়ে মৃদু হাসার চেষ্টা করল। তানভির সামনে গিয়ে যেই ফ্লোর থেকে রি*ভ*ল*বার উঠাতে যাবে ওমনি আলী আহমদ খান হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন,“এটা আমায় দাও, এইটুকু ছেলের হাতে এসব থাকতে হয় না। আজ থেকে এটা আমার কাছেই থাকবে।”তানভির রি*ভ*লবা*র উঠিয়ে আবিরকে একপলক দেখে নিল। তার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সে এখন এই জগতে নেই। বড় আব্বুর কথামতো তানভির রি*ভল*বার বড় আব্বুর হাতে দিয়ে দিল।মোজাম্মেল খান কপট দুষ্টামির স্বরে বললেন,” ভাইজান, তুমি যেন কেন কিনছিলা? আর কত বছর বয়সে কিনছিলা?”” আমি রাজনীতি করতাম অনেকের সাথে শত্রুতা ছিল তাই নিজের নিরাপত্তার জন্য কিনেছিলাম। বয়স যতই হোক সেটা বড় বিষয় না।”মোজাম্মেল খান হেসে বললেন,” তোমার নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে আর আমার মেয়ের জামাইয়ের কি নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই? আমার একমাত্র মেয়েকে দিয়ে দিচ্ছি, নিরাপদে রাখতে না পারলে বুঝাবো পরে।”তানভির দুই ভাইয়ের কথা শুনে মুখ চেপে হাসছে। আবির তখনও মেঘকে জড়িয়েই বসে আছে। মোজাম্মেল খানের কন্ঠে আমার জামাই শব্দটা কানে বাজতেই আবিরের কান্না কমে এসেছে। আলী আহমদ খান চাপা স্বরে বললেন,” আজ ই আমার ছেলেকে নিজের জামাই বলতে শুরু করে দিয়েছিস! ”মোজাম্মেল খান স্ব শব্দে হেসে বললেন,” আমার আরও আগে থেকেই জামাই ডাকা উচিত ছিল। শুধুমাত্র তোমার মন খারাপ হবে ভেবে এতদিন ডাকি নি। চ্যালেঞ্জে তো সেই কবেই জিতে গেছি আমি। ”আলী আহমদ খান গুরুগম্ভীর কন্ঠে বললেন,” চ্যালেঞ্জে জিতেছিস বলেই তো এতদিন এত খোঁচা দিয়েছিস আমায় আর আমি চুপচাপ সহ্য করেছি। কিন্তু তোকে আমি আগেই বলেছিলাম, চ্যালেঞ্জে তুই জিতলেও আমি হার মানবো না।দেখলি তো, আমি হার মানি নি আর মানবোও না। আর একটা কথা, খুশি হইতেছিস হ, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই কিন্তু আমাকে আর খোঁচাতে আসিস না। দোয়া কর যেন তোর জিত হারে পরিণত না হয়। ”আলী আহমদ খান পুনরায় গিয়ে সোফায় বসলেন, মোজাম্মেল খান পেছন পেছন যেতে যেতে শুধালেন,” তুমি কি বলতেছো ভাইজান? বুঝিয়ে বলো।”তানভির কিছু বলতে যাবে তখনি মীম, আদি, আইরিন, আরিফ, জান্নাত, আসিফদের হৈচৈ শুনতে পেল। আকলিমা খান, মাহমুদা খান, ইকবাল খান একসঙ্গে বাসায় ঢুকেন। ইকবাল খান প্রথমে ঢুকে আবির মেঘকে দেখেই গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,” আবির, আশেপাশে ছোট ভাই বোনেরা আছে। ”মীমদের হৈ-হুল্লোড়ের শব্দ কানে ঢুকতেই আবির মেঘকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। জান্নাত, আসিফ, আরিফ মিটিমিটি হাসছে। তারাও যে দেখেছে চোখ মুখের ইশারায় সেটায় বুঝাচ্ছে। ওদের সবার হাতে বেশ কয়েকটা করে শপিং ব্যাগ। মালিহা খান সবার পেছনে ছিলেন, ওনি ভেতরে এসে আবিরের চোখে পানি দেখে এগিয়ে গেলেন, ছেলের চোখ মুছতে মুছতে ঠান্ডা কন্ঠে বললেন,” কাঁদছিস কেনো?”আলী আহমদ খান সবাইকে একপলক দেখে মালিহা খানকে উদ্দেশ্য করে বললেন,” তোমরা এত দেরি করে আসলে কেনো? আর কিছুক্ষণ আগে আসলেই ছেলের করুণ পরিণতি দেখতে পারতে। তখন তুমিও ছেলের মতো বসে বসে কান্না করতে।”আবির শীতল কন্ঠে বলল,” আম্মু, তুমিও কি জানতে? ”“জানতাম, তবে এতকিছু জানতাম না। গতকাল সন্ধ্যার পর তোর আব্বু সবাইকে ডেকে হুট করে তোর আর মেঘের বিয়ের কথা বলে বসলেন। কারো কোনো আপত্তি আছে কি না জিজ্ঞেস করলেন, যেখানে তোর আব্বু নিজে থেকে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আর ঘরের মেয়ে ঘরে থাকবে এতে আমাদের তো খুশিই হওয়ার কথা। তারপরও আমার তোকে নিয়ে একটু ভয় ছিল, তুই রাজি হবি কি না! তখন তোর আব্বু বললো তোর মতামত জেনেই ওনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাই আমিও রাজি হয়ে যায়। তোর আব্বু সবাইকে শর্ত দেন, যেন তুই আসার আগ পর্যন্ত বাসার কেউ কোনোভাবে তোকে কিছু না জানায়। তুই তো জানিস, ওনার কথা অমান্য করা আমার পক্ষে সম্ভব না, তাই তোকে কিছু জানাতে পারি নি।”মালিহা খান শ্বাস ছেড়ে নিজেকে ধাতস্থ করে আবিরকে আবারও জিজ্ঞেস করলেন,” তুই মেঘকে বিয়ে করতে রাজি তো? নাকি অন্য কাউকে পছন্দ করিস?”আবির শীতল চোখে মালিহা খানের মুখের পানে তাকিয়ে রইলো। মালিহা খান যে এসবের কিছুই জানেন না এটা বুঝতে সময় লাগল না। আবির কিছু বলার আগেই আলী আহমদ খান পকেট থেকে একটা ফোন বের করে টেবিলের উপর রাখতে রাখতে মেকি স্বরে বলে উঠলেন,” যে ছেলে ৫১৪৬ মিনিটে ৫৭৩৮ বার কাউকে কল দিতে পারে তাকে তুমি জিজ্ঞেস করছ সে বিয়ে করতে রাজি আছে কি না! কি সুন্দর দৃশ্য! ”মালিহা খান কপাল গুটালেন। মোজাম্মেল খানও আশ্চর্য নয়নে তাকালেন। আবির ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে গেল সোফার কাছে, পিছু পিছু মেঘও এগিয়ে গেল। মালিহা খান চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,” কিসের ৫ হাজার কত মিনিট আর ৫ হাজার কত কলের কথা বলছেন। কি হয়েছে?”আলী আহমদ খান ফোনটা হাতে নিয়ে সবাইকে দেখিয়ে বললেন,” এই যে ফোনটা, এটা মেঘ মামনির ফোন। গত তিন-চারদিন যাবৎ আমার কাছে রেখেছিলাম। একবার ভেবেছিলাম বন্ধ করে রাখব কিন্তু ছেলেকে পরীক্ষা করতে ফোনটা ইচ্ছে করেই খুলে রেখেছিলাম। বিশ্বাস করবা না, মিনিটে ২-৩ বার করে কল দেয়। আর আমি ফোনের দিকে তাকিয়ে কেবল ভাবছিলাম, এই পাগল ছেলে আমার হতে পারে না। ”সবার নজর আবিরের দিকে। আবির কিছুটা লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিয়েছে। মেঘ ফিসফিস করে বলল,” আমি ভাবতেও পারি নি, আপনি এত কম কল দিবেন। অন্ততপক্ষে ১০ হাজার কল আশা করেছিলাম।”আবির ভ্রু কুঁচকে ভারী কন্ঠে বলল,” মুখ টা বন্ধ রাখুন নয়তো আপনার কপালে দুঃখ আছে।”মালিহা খান উত্তেজিত কন্ঠে বললেন,” আবির তাহলে মেঘকে আগে থেকেই পছন্দ করে।”মোজাম্মেল খান ঠাট্টার স্বরে বললেন,“ভাবি, আমি এই কথাটায় ভাইজানকে গত এক বছর যাবৎ বুঝাচ্ছিলাম। কিন্তু ওনি কিছুতেই বুঝতে চাইছিলেন না, ওনার একটায় কথা ওনার ছেলে এমন কাজ করতেই পারে না। ভাইজান কেমন মানুষ এটা তো আপনার অজানা নয়।”আবির-মেঘ দুজনেই আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে আছে। বাকিরা সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। মালিহা খান অবাক চোখে তাকিয়ে বলে উঠলেন,“এক বছর?”মোজাম্মেল খান তপ্ত স্বরে বলতে শুরু করলেন,” আমি এক বছরের আরও ৩-৪ মাস আগে জানতে পেরেছি। আমার এক বন্ধু একদিন আমাকে আবির আর মেঘের একটা ছবি পাঠিয়েছিল, সে আবিরকে চিনতে পারে নি। মেঘকে এক ছেলের সাথে দেখে আমাকে জানানোর জন্য ছবিটা পাঠিয়েছিল। ছবিটা দেখে আমার অবশ্য ঐরকম কিছু মনে হয় নি। কিন্তু মেয়ের বাবা যেহেতু তাই মনে একটু সন্দেহ ঢুকেছিল।যেখানে আবির বাসায় মেঘের সাথে ঠিকমতো কথা বলে না, যতটুকু বলে সেটাও বড় ভাইয়ের মতো, ফরমাল কথাবার্তা সেখানে আড়ালে সে আমার মেয়েকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেই থেকে আমি পর্যবেক্ষণ শুরু করলাম, আবিরের হালচাল বুঝতে বেশি সময় লাগলো না। মেঘ, মীম দুজনের প্রতি আবির যথেষ্ট পসেসিভ কিন্তু মেঘের প্রতি একটু বেশিই। সারা দুনিয়ার খবরেও তার বিশেষ মনোযোগ নেই যেই মেঘের বিষয়ে কথা উঠে ওমনি সে মনোযোগী শ্রোতা হয়ে যায়। আজ পর্যন্ত আবির হাতে গুনা দু একদিন মেঘকে বাসা থেকে বাইকে নিয়ে বেড়িয়েছে অথচ সে প্রায় ই মেঘকে নিয়ে শহরে ঘুরে। দু-একবার আমি নিজের চোখে দেখেছি। তাদের রাস্তায় দেখে, আমি বাসায় এসে তাদের জন্য অপেক্ষা করতাম কিন্তু মেঘ আসলেও সাথে আবির থাকতো না। আমার বন্ধু, ছোট ভাই, বড় ভাই যারা আমার মেয়েকে চিনে তাদের সাথে দেখা হলেই বলতো, তোর মেয়েকে এখানে দেখেছি, ওখানে দেখেছি সাথে তোর ভাইপো ছিল। ভাইজানকে বলায় ওনি বিষয়টা পাত্তায় দেন নি উল্টো আমায় যা খুশি বলেছেন। ঐরকম শক্ত প্রমাণ ছিল না বলে আমিও অনেকদিন ভাইজানকে কিছু বলতে যায় নি। হঠাৎ একদিন আমি অফিস থেকে ফিরছিলাম, সন্ধ্যার পর হয়ে গেছিল। দেখলাম আমাদের বাসা থেকে কিছুটা দূরে মেঘ আবিরের বাইক থেকে নামছে। আমি আনমনেই সেখানে দাঁড়িয়ে পড়লাম। সামনেই বাসা এখানে নামার কারণ খোঁজে পেলাম না তবুও তাকিয়ে রইলাম। মেঘ বাসার গেইট পর্যন্ত ঢুকতেই আবির বাইক স্টার্ট দিয়ে চলে গেছে৷ আমাকে দেখেছে কি না জানি না কিন্তু সেদিন আমি আমার সন্দেহের সত্যি প্রমাণ পেয়ে গিয়েছিলাম । বাধ্য হয়ে ভাইজানকে বিস্তারিত ঘটনা খুলে বললাম কিন্তু ওনি পূর্বের ন্যায় একই আচরণ করলেন। ওনার চোখে ওনার ছেলে নিষ্পাপ। ওনার একটায় কথা আবির এমন ছেলে ই না। ”আলী আহমদ খান এবার ঠান্ডা কন্ঠে বলতে শুরু করলেন,” কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। আমি আবিরকে চিনতে বা বুঝতে ভুল করেছিলাম। আবিরের এত বছর বয়সে আমি কোনোদিনও কোনো বিষয়ে তাকে নিষেধাজ্ঞা দেয় নি। রাজনীতি করতে নিষেধ করেছিলাম কিন্তু সেটা আমার নিষেধাজ্ঞা ছিল না, আমি আবিরকে সবটা বুঝিয়ে বলেছিলাম তারপর সে নিজেই ছেড়ে দিয়েছিল। দেশের বাহিরে গেছে তার ইচ্ছায়, দেশে আসছে তার ইচ্ছায়, বাইক কিনা, বিজনেস স্টার্ট করা, ব্যাংক থেকে টাকা তুলা এছাড়াও বাকি যা কিছু করেছে তার কোনোকিছুতেই আমি আবিরকে নিষেধাজ্ঞা দেয় নি। আমি শুধু কারণ জানতে চেয়েছি। কোনো কিছু করতে বারণ করলেও কেনো বারণ করি সবসময় সেটায় বুঝাতে চাইতাম। হঠাৎ কোনো কারণে রাগ দেখালেও অফিসে বসে চা খেতে খেতে ছেলেকে ঠান্ডা মাথায় সব বুঝিয়ে বলতাম, এগুলো তোমরা জানো? না, জানো না।ছেলেদের বয়স ২০-২৫ বা তার উপরে গেলেই বাবা ছেলের সম্পর্কে বিশাল ফাটল ধরে যায়। সেই ফাটলের কেন হয় তা জানা নেই। আমাদের সম্পর্কে আমি সেই ফাটলটা ধরাতে চায় নি। আমি সবসময় একজন দায়িত্বশীল, নিষ্ঠাবান আর ভালো বাবা হবার চেষ্টা করতাম। আমি নিজের নীতি নৈতিকতায় যতই কঠোর থাকি না কেন, আবিরের জন্য সবসময় নিজের বেস্টটায় করেছি। আমার ছেলে আমাকে তার বন্ধু ভাববে, তার মনের কথা বলবে, কাউকে ভালো লাগার কথা আমাকে জানাবে। আমি কি সেটা আশা করতে পারি না? আবিরের যখন যা প্রয়োজন ছিল সে নির্দ্বিধায় চেয়েছে, তাহলে মেঘকে কেনো চাইতে পারল না? আমার ছেলের ভালোবাসার কথা অন্য কারো মুখে কেনো শুনতে হলো আমায়? আমার বার বার মনে হতো আবির মেঘকে পছন্দ করলে নির্দ্বিধায় আমাকে বলবে। আমি আমার জায়গায় কনফিডেন্ট ছিলাম। ওটায় কি আমার ভুল ছিল?”মাহমুদা খান, মালিহা খান, হালিমা খান সবাই নিশ্চুপ। মেঘ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আবির কন্ঠ দ্বিগুণ ভারি করে বলতে শুরু করল,” সরি আব্বু। আপনি আপনার জায়গাতে ঠিক থাকলেও আমার মনে ভয় ছিল। একটা সময় পর্যন্ত আপনি সত্যি আমার বন্ধুর মতো ছিলেন, কখনো কিছু চাইতে গেলে বা বলতে গেলে দ্বিধা বোধ করি নি। এমনকি আম্মুর সাথেও এত কথা শেয়ার করি নি যত কথা আপনার সাথে শেয়ার করেছি। কিন্তু ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিলাম আর না চাইতেও দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছিল। ছোটখাটো কোনো বিষয় নিয়ে আপনাদের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি টা মনে প্রতিনিয়ত দাগ কাটছিল। আপনাদের ব্যবসা, সমাজ আর পরিবারের মানসম্মান আপনাদের কাছে এটায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে বাড়ির সন্তানদের সঠিক মূল্যায়ন দিতে ভুলে যাচ্ছিলেন। আশেপাশের মানুষ কি বলল, সমাজ আপনাদের কতটা মূল্যায়ন করলো, কোথায় আপনাদের স্ট্যাটাস ভালো সেসব নিয়ে এতটায় ব্যস্ত হয়ে পরেছিলেন যে বাসায় কোন ছেলেটার মন খারাপ, কোন মেয়েটার মন খারাপ, ঠিক কি কারণে মন খারাপ সেটা জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করতেন না। ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়লো, মনের টান কমলো। তবুও বলব আপনি সত্যি একজন দায়িত্বশীল বাবা ছিলেন এবং আছেন৷ আমার পড়াশোনা চলাকালীন সময়ে আপনি সব ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিদিন আমায় কল দিয়েছেন, খোঁজ নিয়েছেন। আপনার আশেপাশে মানুষের ভিড় থাকলেও আমার কলটা রিসিভ করে বাবার দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনি বাবা হিসেবে বেস্ট ছিলেন আছেন এবং থাকবেন। কিন্তু ঐ যে বললাম বন্ধুর মতো, ঐ বন্ধুর মতো সম্পর্কটা হারিয়ে ফেলেছিলাম। মন খুলে কিছু বলতে ভয় পেতাম। তবুও সাহস নিয়ে নিজেকে গোছাচ্ছিলাম, বাসায় মেঘেকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার জন্য যতটা সম্ভব মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ দেশে ফেরার এক বছর আগে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ফুপ্পির সাথে আমার পরিচয় হলো। ফুপ্পির সম্পর্কে, এই বাসার নিয়ম নীতি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে আমি দিশা হারিয়ে ফেলেছিলাম। কি করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। যেখানে একমাত্র বোনের ভালোবাসার সম্পর্ক মেনে না নিয়ে ২৭ বছর সম্পর্ক ছিন্ন রাখতে পারেন সেখানে আমি কে? আপনার নিয়মনীতি আর মানসম্মানের জন্য আপনি সব করতে পারেন৷ মেঘকে না জোর করে আমার থেকে আলাদা করে দেন সেই ভয়ে বাসায় ফিরে মেঘের কথা আপনাদের বলা তো দূর মেঘের সাথেইঠিকমতো কথা বলতে সাহস পেতাম না। মেঘের থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখতাম, ওর চোখে চোখ রাখতে পারতাম না৷ প্রতিনিয়ত ভয় হতো,আপনাদের নিয়মনীতির ভিড়ে এই বুঝি আমি ও কে হারিয়ে ফেলব।”আলী আহমদ খান গম্ভীর কন্ঠে বললেন,” তারমানে তোমার ফুপ্পির সাথে তোমার আগে থেকেই পরিচয় ছিল? অবশ্য এটা আমি আগেই সন্দেহ করেছিলাম। রাকিব তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড, তার বোনকে তানভিরের মাধ্যমে বাসায় আনিয়েছো। রাকিবের বোনের বিয়ের খবর তোমার অজানা থাকার কথা না আর সেখানে তার শ্বশুর শ্বাশুড়ির সাথে পরিচিত হওয়াটাও অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু তুমি যেসব ভেবে ভয় পেয়েছিলে সেটা নিতান্তই তোমার ভুল ধারণা ছিল। তোমার ফুপ্পির ঘটনা আজ থেকে বহু বছর আগে, তখনকার পরিস্থিতি বর্তমানের মতো ছিল না। তখন সমাজ প্রেমের বিয়েকে এত সহজ ভাবে মেনে নিতোও না। কোনো বাড়ির মেয়ে পালিয়ে গেলে বা নিজের মতো বিয়ে করলে ঐ এলাকায় সেই মেয়ের আর তার পরিবারের নামে দুর্নাম ছড়িয়ে পড়তো। সমাজের চোখে সেই পরিবার বিষাক্ত হয়ে যেত। বর্তমানে যুগ পাল্টে গেছে, প্রেমের সম্পর্ক মেনে নিতে পরিবার আর আগের মতো দ্বিধা করে না। ”ইকবাল খান শান্ত স্বরে বললেন,” সব ই বুঝলাম কিন্তু তোমরা যেহেতু সব জানতে আর মেনেই নিয়েছিলে তাহলে এতদিন কেন কিছু বললে না।”মোজাম্মেল খান ধীর কন্ঠে বললেন,” বললাম না, আমি মানলেও ভাইজান মানতে চান নি।”“তারপর কি হয়েছে? কাল ই বা হঠাৎ ভাইজান মেনে নিলেন কিভাবে?”“কাল হঠাৎ মানলেন কেন এটা আমিও জানি না। কিন্তু ভাইজান এমনিতেই মেনে নেন নি এটা সিউর। একবছর আগে আমি যখন ভাইজানকে বিস্তারিত বলেছিলাম তখন ভাইজান বিশ্বাস করেন নি, তখন আমি বলেছিলাম যেন আবিরকে ওনি পরীক্ষা করেন। আবিরকে বিয়ের কথা বললে আবির কিভাবে রিয়েক্ট করে সেটায় বুঝতে চাইছিলাম। আবির স্পষ্টবাদী ছেলে তাই ভেবেছিলাম সে মেঘের কথা বলে দিবে কিন্তু সে বলল না। ভাইজান খাবার টেবিলে বসে আমার দিকে তখন অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। তাই আমিও আবিরকে রাগানোর জন্য অন্য মেয়ের কথা বলেছিলাম, যেন মনের কথা বলে দেয়। আবির এমনভাবে রিয়েক্ট করল, সাথে ১ বছরের জন্য বিয়ে স্থগিত করে দিল। সবার সামনে কিছু না বললেও ভাইজান আড়ালে আমায় যাচ্ছেতাই কথা শুনিয়েছে। আবির মেঘকে ঐ নজরে দেখে না, পছন্দ করে না হেনতেন আরও অনেক কিছু। তখন আমার ভেতরেও জেদ ঢুকে। আমিও ভাইজানের সাথে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম, আবির মেঘকে পছন্দ করে এটা আমি প্রমাণ করেই ছাড়বো। তারপর শুরু হলো মেঘের জন্য ছেলে দেখা। আমার খুব কাছের বন্ধু দেশে ফেরায় এমনিতেই তাকে আর তার বিবাহিত ছেলেকে বাসায় দাওয়াত দিলাম। আবিরকে শুনিয়ে বললাম মেঘকে দেখতে আসবে। ভেবেছিলাম আবির রিয়েক্ট করবে। কিন্তু না, আবির কোনো প্রকার রিয়েক্ট করল না, মুখ ফুটে কিছু বললও না। তানভির একায় রাগারাগি করল। ভাইজানের সামনে আবারও প্রমাণ হয়ে গেল আমি ভুল ওনি ঠিক। ভাইজানের কাছে ভুল প্রমাণিত হলেও বিকেলে যখন বন্ধু আর তার ছেলে বাসায় না আসায় আমি আমার সত্যতার প্রমাণ পেয়েছিলাম। দ্বিতীয়বার তানভির, আবিরকে না জানিয়ে ছেলে আনার সিদ্ধান্ত নেয়, সেবারও আবির কোনো না কোনোভাবে খবর পেয়ে গেছিল হয়তো খবর টা বাসা থেকেই কেউ দিয়েছিল। তখন ভাইজান আমাকে বলছিলেন, আমি ছেলে বাসায় এনে তারপর যেন ওনাকে জানায়। ওনার কথার আসল মিনিং এটায় ছিল, মেঘের বিয়ে ভাঙার ব্যাপারে আমি শুধু শুধু আবিরকে সন্দেহ করছি, আবির এসবের কিছুই জানে না, পারলে ওনার সামনে প্রমাণ করতাম নয়তো আবিরকে দোষারোপ না করতে। আমিও সেই কথা মাথায় রেখে ছেলে নিয়ে বাসায় আসলাম। হুট করে আবির বাসায় এসে চিৎকার করলো, নিজের ভালোবাসার কথা প্রকাশ না করে উল্টো ছয়মাস বিয়ে বন্ধের হুঙ্কার দিল। আমি মেনে নিয়েছিলাম, কারণ আমি সেদিন জিতে গিয়েছিলাম। ভাইজানের সামনে প্রমাণ করে দিয়েছিলাম মেঘের প্রতি আবিরের অন্যরকম টান আছে। কিন্তু ভাইজান মানতে পারলেন না। ওনি আমার কাছে হেরে গেছেন এটা ওনি মানতেই পারছিলেন না৷ আমার জেতার খুশি সহ্য করতে না পেরে ভাইজান আবিরের উপর ইচ্ছেমতো রাগ ঝাড়লেন, আবিরও রাগ করে বাসা ছেড়ে চলে গেল। দুতিনদিন পর ভাইজানের রাগ কিছুটা কমেছে, তখন নিজের হার মেনে নিয়ে আবিরকে বাসায় আনার চেষ্টা করেছেন। তবে এটা ঠিক ভাইজান বহুবার চেষ্টা করেছেন, আবির যেন মেঘের কথা ভাইজানকে জানায় তারজন্য ভাবি কে দিয়েও চেষ্টা করিয়েছেন৷ আবির বাহিরে যাওয়ার আগের দিন সকালেও ভাইজান আবিরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আবির কিছু বলতে চায় কি না! কিন্তু আবির কিছু না বলেই চলে গিয়েছিল, এদিকে ভাইজান নিজের হার মন থেকে মানতে পারছিলেন না তাই প্রতিনিয়ত আমার সাথে ফোঁস ফোঁস করতেন৷”
গল্পঃ আমৃত্যু ভালোবাসি তোকেলেখিকাঃ সালমা চৌধুরী..................................................................................................................................................................বন্যা ভ্রু গুটিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,“আপনার কোনো দোষ নেই। আপনি তো অপাপবিদ্ধ। সব দোষ আমার, আমি কেন এত ভাবি?”“তুমি দায়িত্বশীল, বিনম্র একটা মেয়ে। তুমি ভাববে না তো কে ভাববে বলো। তাছাড়া তুমি সেদিন বনুকে কথাগুলো না বললে বনু আর ভাইয়ার অসাধারণ মোমেন্টগুলো মিস হয়ে যেত আর সবাইকে বিয়েতে রাজি করানোর জন্য ভাইয়াকে যেকোনো পর্যায়ে যেতে হতো। এখন আলহামদুলিল্লাহ সবকিছু আমি সামলে নিয়েছি, যা ঝড় গিয়েছে সব আমার উপর দিয়েই গিয়েছে। ভাইয়ার খুব বেশি ফাইট করতে হয় নি। আর বনুর কথা কি বলল, ও তো গত তিনদিন সারাটাক্ষন শুধু বন্যা আর বন্যায় করে যাচ্ছিল। আজ সকালে আমাকে রীতিমতো থ্রেট দিয়েছে, বিকেলের মধ্যে তোমাকে যেভাবেই হোক বাসায় নিয়ে যেতে হবে। বনুর ভাইয়াকে পাওয়ার খুশির থেকেও বেশি কষ্ট লাগছিল তোমাকে ওর মনের কথাগুলো বলতে না পারাতে। বাসায় তো সেভাবে কথা বলতে পারতাম না, কিন্তু বনুকে নিয়ে বের হলেই তোমার সাথে দেখা করতে পাগলা হয়ে যেতো। কিন্তু কি করতাম বলো, বড় আব্বু একদম সময় বেঁধে কোনো কাজে পাঠাতেন। তুমি তো জানোই ওনি এক কথার মানুষ, কাজে এদিক সেদিক হলে খবর আছে। বাই চান্স আমার কারণে ভাইয়ার বিয়ে আঁটকে গেলে আমি সারাজীবনেও নিজেকে মাফ করতে পারতাম না। ভাইয়ার সামনে দাঁড়ানোর যোগ্যতা হারিয়ে ফেলতাম। আমার মুখের সামান্য একটা কথাতে ভাইয়া যে মস্ত বড় ভুল সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল আমি চাই নি সেই সিদ্ধান্তের জন্য বর্তমানে ওদের উপর কোনো প্রভাব পড়ুক। তাই ভাইয়াকে সারপ্রাইজ দিতে নিজেকেই বলির কুমড়ো হতে হয়েছে। সেই সাথে ভাইয়ার সারপ্রাইজের কিছুটা প্রভাব তোমার উপরও পড়ে গেছে। তারজন্য আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। এখন কি কানে ধরতে হবে?”বন্যা থতমত খেয়ে বলল,” না, কানে ধরতে হবে না। আপনি একটু অপেক্ষা করুন আমি রেডি হয়ে আসছি।”“আচ্ছা। ”তানভির নিচে চলে আসছে। বন্যার বোন চা নাস্তা দিয়ে মেঘের বিয়ের বিষয়ে কথা বলছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে বন্যা নিচে এসে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,“আব্বু আম্মু আসে নি এখনও?”“না। আমি আব্বুকে আগেই বলে রাখছি, তুই যা সমস্যা নেই।”তানভির ধীর কন্ঠে বলল,” আমি ভাবছিলাম রিদকে নিয়ে যাব।”” রিদ যাবে না। বিয়েতে ওর ইন্টারেস্টি কম, ও শুধু ঘুরতে পছন্দ করে। এখন যদি বলা হয় চল সিলেট যায়, দু মিনিটও লাগবে না সে ব্যাগ নিয়ে হাজির। আর যদি মুখ ফস্কেও বলে ফেলি বিয়েতে যেতে হবে। তাহলে ওর তালবাহানা শুরু হয়ে যাবে। ওর আশা করে লাভ নেই তার থেকে বরং বন্যাকে নিয়ে যাও।”“আচ্ছা আপু। কাল- পরশু দু’দিনের ই দাওয়াত রইলো। অবশ্যই আসবেন, প্লিজ।”“আচ্ছা, ঠিক আছে। সাবধানে যেও।”“বন্যা, তুই ও সাবধানে থাকিস।”“আচ্ছা।”তানভির বন্যাকে নিয়ে বেড়িয়ে মোখলেস মিয়ার দোকান পর্যন্ত আসতেই মোখলেস মিয়াকে নজরে পড়লো। ওনি ওদের দেখে বসা থেকে দাঁড়িয়ে পরেছেন। তানভির একটু সামনে গিয়ে বাইক থামিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,“আমি আসছি এখুনি। ”তানভির মোখলেস মিয়ার সামনে এসে ভ্রু নাচাতেই, মোখলেস মিয়া ভারী কন্ঠে বললেন,” কি হইতাছে?”তানভির তপ্ত স্বরে বলল,” আপনার বউরে আমার বাড়িত লইয়া যাইতাছি।”“কেরে?”“আর কত বাপের বাড়িত থাকবো। শ্বশুরবাড়ির হাওয়া-বাতাসেরও তো দরকার আছে নাকি?”“আমার বউয়ের কিছু হইলে আমি কিন্তু তোমারে ছাইড়া দিতাম না।”“অ্যাহ! আসছে। নিজের দুইটাকে সামলান আমার টা আমি বুঝে নিব। আপনাকে শুধু জানাতে আসছিলাম, এখন আসি।”বন্যাকে নিয়ে বাসায় আসতে আসতে সন্ধ্যার পর হয়ে গেছে। আবিরদের পুরো বাড়ি লাল, গোল্ডেন, বেগুনি, সবুজ, নীল রঙের আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে।বাসার সামনে বিশালাকৃতির গেইটে বড় করে আবির-মেঘের নাম লেখা। বন্যা মন্ত্রমুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে। মেঘের দুই বছরের অনাবিল ভালোবাসার পূর্ণতা পেতে যাচ্ছে। গেইট পার হতেই মোজাম্মেল খান আর আলী আহমদ খানের সাথে দেখা। বন্যা সালাম দিতেই ওনারা একসঙ্গে সালামের উত্তর দিলেন। বন্যার ব্যাগের দিকে এক নজর তাকিয়ে মোজাম্মেল খান ঠান্ডা কন্ঠে হুঙ্কার দিলেন,“তানভির, ব্যাগ টা কি তুমি নিতে পারো না?”তানভির মাথা নিচু করে হাত বাড়িয়ে ব্যাগ টা নিতে নিতে বিড়বিড় করল,“আমি আগেই নিতে চেয়েছিলাম, দেয় নি৷”মোজাম্মেল খান শুনলো কি না কে জানে। বন্যা ওনাদের সাথে অল্পস্বল্প কথা বলে ভেতর চলে গেছে। ড্রয়িংরুম ভর্তি আত্মীয়স্বজন। মেঘের মামা বাড়ির মানুষজনও ততক্ষণে চলে আসছে। মীমের মামা বাড়ি, খালার বাড়ি থেকেও অনেকেই আসছে। তাছাড়া এলাকার মানুষ তো আছেই। এত এত মেহমান দেখে বন্যা মাথা নিচু করে দ্রুত মেঘের রুমে চলে আসছে। মেঘ লেহেঙ্গা পড়ে পুরোপুরি রেডি হয়ে বিছানায় বসে বসে বন্যাকে একের পর এক মেসেজ দিচ্ছে, বার বার কল দিচ্ছে। অকস্মাৎ বন্যা কোমল কন্ঠে ডাকল,“ননদীনি”মেঘ চোখ তুলে তাকিয়ে বন্যাকে দেখেই ছুটে গিয়ে বন্যাকে জড়িয়ে ধরে আবেগ জড়িত কন্ঠে বলতে শুরু করল,“আমার খুব কান্না পাচ্ছিলো, তোকে বার বার কল দিচ্ছি, মেসেজ করছিলাম তুই রেসপন্স করছিলি না। আমি ভাবছিলাম তুই বোধহয় আসবিই না। এই আনন্দের দিনে তুই আমার পাশে না থাকলে আমার সব আনন্দ মাটি হয়ে যেতো। তুই বিশ্বাস করবি না, বড় আব্বু আমার ফোন নেয়ার পর থেকে তোর সাথে একটু কথা বলার জন্য আমি কি পরিমাণ ছটফট করেছি৷ অন্য কারো ফোন দিয়ে কল দেয়ার মতোও অবস্থা ছিল না। বড় আব্বু এই তিনদিন অফিসেও যান নি, সারাক্ষণ বাড়িতে ছিলেন। ফেসিয়াল করতে পাঠানো, শপিং এ পাঠানো থেকে শুরু করে আমার খাওয়া, রেস্ট সবেতেই ওনি নজরদারি করেছেন। আমি সুযোগ পেলেই ভাইয়াকে তোর কথা জিজ্ঞেস করতাম। ভাইয়া কবে নিজের মনের কথা আমাকে বলবে আমি সেই আশা পর্যন্ত করি নি। সকালে ভাইয়াকে বলেছি, যদি তোকে আনতে না পারে তাহলে যেন আজ বাসায় না আসে।”বন্যা মোলায়েম কন্ঠে বলল,” আমি সবই বুঝতে পেরেছি। কোনো সমস্যা নেই। তুই যে বিপদে ছিলি এটা ঠিকই বুঝতে পারছিলাম কিন্তু আমার রাগ উঠেছিল তোর ভাইয়ের উপর৷ ওনি মেসেজের রিপ্লাই করে না, ফোন নাম্বার ব্লক করে রেখেছিল হুট করে আজ কল দিয়ে বলল আগামীকাল বনুর বিয়ে। এই কথা শুনামাত্র আমার মেজাজ মাত্রাতিরিক্ত খারাপ হয়ে গেছিলো সেই যে ফোন সাইলেন্ট করেছিলাম এখনও ওভাবেই আছে।সেসব ভেবে এখন মন খারাপ করে সাজ নষ্ট করতে হবে না, বেবি।”মেঘ বন্যাকে ছেড়ে আদুরে কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,” আমাকে কেমন লাগছে বেবি?”” আমি আর উত্তর দিব না। আজ থেকে যত কমপ্লিমেন্ট দেয়ার সব আমার ভাসুর দিবে। ”” ওনার নির্লজ্জ মার্কা কমপ্লিমেন্ট শোনার কোনো ইচ্ছে নেই আমার। ওনি এখন আর আগের মতো নেই। ”তানভির গলা খাঁকারি দিয়ে আস্তে করে বলল,“এইযে ব্যাগ টা। মামা মামীদের সাথে কথা বলতে বলতে দেরি হয়ে গেছে।”মেঘ আহ্লাদী কন্ঠে বলল,“ধন্যবাদ ভাইয়া, লাভ ইউ।”” থাক, এখন আর ভালোবাসা দেখাতে হবে না৷ দিছিলি তো বাসা থেকে বের করে, তোর বান্ধবীর রাগ না কমলে আমি এখন মোখলেস দাদার দোকানে সিঙ্গারা বেঁচতাম।”মেঘ ফিক করে হেসে উঠল। তানভির বন্যার দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,” শাড়ি পড়ে তাড়াতাড়ি রেডি হও।”যেতে যেতে আবার থামলো, ঘাড় ঘুরিয়ে হাসিমুখে বলল,“লাভ ইউ টু। ”মেঘ চাপা স্বরে বলে উঠল,” কাকে বলছো?”বন্যা মেঘের দিকে তাকিয়ে রাগে কটমট করছে। তানভির ভারী কন্ঠে জানতে চাইল,” কিছু বলছিস?”“না। ”বন্যা শাড়ি পড়ে মেঘের রুমেই সাজুগুজু করছে। ধীরে ধীরে মেঘের মামীরাও মেঘকে দেখতে আসছে। জান্নাত আর আইরিন মিলে মীমকে জোর করে শাড়ি পড়াচ্ছে। সব মিলিয়ে মোটামুটি ৮-১০ জন মেঘের রুমে উপস্থিত। লেহেঙ্গা পড়ার কারণে মেঘ ঠিকমতো নড়াচড়া করতে পারছে না তাই চুপচাপ বিছানায় বসে বসে সবার সাজগোছ দেখছে। আবির মেঘকে দেখতে মেঘের রুমের দরজায় এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। রুম ভর্তি এত মানুষ দেখে সঙ্গে সঙ্গে কপাল কুঁচকালো। ঘাড় কাত করে মেঘকে দেখার চেষ্টা করবো। লেহেঙ্গা পড়ে রাজরানী সেজে বিছানার ঠিক মাঝ বরাবর বসে আছে মেঘ৷ মেঘকে দেখেই আবিরের হৃৎস্পন্দন জোরালো হচ্ছে, কেউ দেখার আগে আবির দরজা থেকে সরে কিছুটা দূরে গিয়ে উচ্চস্বরে ডাকল,“মেঘ..”মেঘ বিছানা থেকে নামতে নামতে উত্তর দিল,“জ্বি”আবির পুনরায় ডাকল,“মেঘ..”মেঘ দু’হাতে লেহেঙ্গা কিছুটা উঠিয়ে দরজা পর্যন্ত ছুটে গেল। দরজার সামনে আবিরকে না পেয়ে ভ্রু কুঁচকে আবির কোথায় আছে দেখার জন্য বেলকনির দিকে ঝুঁকল৷ আচমকা মেঘের স্নিগ্ধ গালে ঠোঁট ছোঁয়াল আবির। মেঘ পূর্ণব্যাদিত আঁখিতে তাকানোর পূর্বেই আবির দ্রুত স্থান ত্যাগ করল। মেঘ গালে হাত রেখে থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা পিটপিট করছে৷ আবিরের অযাচিত কর্মকাণ্ড গুলো মেঘকে নাজেহাল করে দিচ্ছে। মেঘ পুনরায় রুমে চলে গেছে। আবির সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ব্যস্ত কন্ঠে বলল,“প্রোগ্রাম কখন শুরু হবে?”আলী আহমদ খান ছেলের দিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বললেন,” একটু ধৈর্য রাখো।”” ১৪ মিনিট ২৩ সেকেন্ড যাবৎ ধৈর্য ধরে বসে আছি আর কত? আপনাদের বেশি দেরি হলে আমি কি মেঘকে নিয়ে পোগ্রাম শুরু করে দিব?”আলী আহমদ খান গুরুগম্ভীর কন্ঠে বললেন,” ১০ মিনিটের মধ্যে পোগ্রাম শুরু হবে যাও এখন।”আবির বিড়বিড় করতে করতে যাচ্ছে,” ৫ মিনিট হলে ভালো হতো।”আলী আহমদ খান আবিরের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে হঠাৎ তপ্ত স্বরে মোজাম্মেল খানকে ডাকলেন। মোটামুটি ৫ থেকে ৭ মিনিটের মধ্যেই পোগ্রাম শুরু হয়েছে। সম্পূর্ণ ছাঁদ জুড়ে লাইটিং, বিশালাকৃতির স্টেজ করা হয়েছে। ক্যামেরাম্যানরা আবির মেঘের ছবি তোলায় ব্যস্ত। আইরিন, মীম নাচের প্রিপারেশন নিচ্ছে। তানভির, সাকিব সবাইকে ঠিকঠাক মতো বসাচ্ছে, গানের লিস্ট ঠিক করছে।নিচে মেইনগেইটের বাহিরে বিরিয়ানি রান্না হচ্ছে। মোজাম্মেল খান নিচ থেকে তানভিরকে কল দিচ্ছেন। তানভির কল রিসিভ করে ‘আসছি’ বলে দ্রুত নামতে গেল। আচমকা বন্যাকে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে দেখে থামার চেষ্টা করলো। বন্যার পড়নে waterworld রঙের শাড়ি, প্রথমবারের মতো চুল ছেড়ে গর্জিয়াছ লুকে সেজেছে। অনাড়ম্বর মেয়েটার এই চোখ ধাঁধানো সাড়ম্বর সাজে বিমোহিত তানভির । বন্যার দিকে তাকিয়ে থেকেই উদাসভাবে সিঁড়ির প্বার্শ ঘেঁষে পা রাখতেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়তে নিলো। আপতিত ঘটনায় তানভিরকে থামাতে উপায় না পেয়ে বন্যা দু’হাতে তানভিরের বুক বরাবর হাত রেখে আটকানোর চেষ্টা করলো। তানভির নিজের উপর বল প্রয়োগ করে থামতে পারলেও বন্যার হাতের কব্জিতে চাপ খেয়েছে। তানভিরের ভেজা গাত্র সেই সাথে ত্রৈমাত্রিক উদ্ধত হৃৎস্পন্দন উপলব্ধি করতেই বন্যা উদ্বেগপূর্ণ কন্ঠে জানতে চাইল,“আপনি ঠিক আছেন?”তানভির সহসা এক সিঁড়ি পেছাতেই বুকের উপর থাকা বন্যার হাতগুলোর অচিরেই সরে গেল। বন্যা আস্তে করে নিজের হাত ঝেড়ে পুনরায় জিজ্ঞেস করল,” আপনি ব্যথা পান নি তো?”তানভির মুচকি হেসে উত্তর না দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। বন্যা কর্কশ কন্ঠে ডাকল,” এইযে ভিলেন ”তানভির আড়চোখে তাকিয়ে মুচকি হেসে শম্বুকগতিতে বলল,” ব্যথা তো পেয়েছি কিন্তু এই ব্যথা যে… ”বন্যার ভ্রু কুঁচকানো দেখে তানভির থমথমে কন্ঠে“সরি সরি সরি সরি” বলতে বলতে দৌড়ে নিচে চলে যাচ্ছে। তানভির চলে যেতেই বন্যা শব্দহীন হাসলো।স্টেজে আবির-মেঘ পাশাপাশি বসা। আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে ডাকল,“শুন।”“বলুন।”“তোকে আজ লাবণ্যময়ী লাগছে, আমার কি ইচ্ছে করছে জানিস?”মেঘ সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে বিড়বিড় করল,” না, আমি কিছু জানতে চাই না।”আবির মুচকি হেসে বলল,” কিন্তু আমি তো জানাতে চাই। ”মেঘ আড়চোখে তাকাতেই আবির ভ্রু নাচালো। বরাবরের ন্যায় আজও আবিরের হাসিতেই ঘায়েল হলো মেঘ। মুগ্ধ চোখে আবিরকে দেখছে, গত দুই বছর যার চিন্তায় দিন-রাত ভুলে থাকতো সেই মানুষটার সাথে তার বিয়ে হতে যাচ্ছে। হৃদয়ে অধৃষ্য হাওয়ারা তোলপাড় চালাচ্ছে। রাকিব গলা খাঁকারি দিতেই মেঘ দৃষ্টি সরালো সাথে আবিরও। রাকিব অনেকক্ষণ আগে আসলেও আবিরের সামনে আসার সাহস পাচ্ছিলো না এতক্ষণ। এখন সবার উপস্থিতিতে বুকে সাহস নিয়ে সামনে আসছে। আবিরের কানে কানে ফিসফিস করে কিছু বলে আবারও সরে গেছে। এদিকে আইরিন, মীম আর আরিফের অনবদ্য নাচ দেখে সবার চোখ কপালে উঠে গেছে। তানভির কিছুক্ষণের মধ্যেই উপরে আসছে। বন্যা কিছুটা পেছন দিকে চেয়ারে বসে বসে মেঘ আর আবিরের ছবি তুলছিল, আশেপাশে তেমন কেউ নেই। তানভির অকস্মাৎ কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,” একটু সাইডে আসা যাবে?”বন্যা আঁতকে উঠে ঘাড় ঘুরালো। তানভিরকে দেখেই আতঙ্কিত কন্ঠে বলল,” আপনি?”“সাইডে আসো।”“কেনো?”“আরে আসো তো।”বন্যা তানভিরকে ফলো করে ছাদের এক পাশে গেল। তানভির শান্ত গলায় বলল,” শাড়ির সাথে ফাঁকা হাত ঠিক মানাচ্ছে না। ”বন্যা আস্তে করে বলল,” চুড়ি পড়তে খুব একটা ভালো লাগে না।”তানভির মৃদু হেসে পকেট থেকে দুটা গাজরা বের করে তপ্ত স্বরে বলল,” এখন আশা করি এটা বলবে না যে গাজরা পড়তেও ভালো লাগে না। ”“তেমন না। ”“তোমার যদি কোনো আপত্তি না থাকে আমি কি তোমার হাতে এগুলো পড়িয়ে দিতে পারি?”“আমাকে পড়াতে হবে না। মেঘ না পড়লে ওর হাতে পড়িয়ে দেন তাহলে ছবি সুন্দর আসবে।”“তোমার কি মনে হয়, ভাইয়া থাকতে বনুকে আমার পড়িয়ে দিতে হবে? বনু ছাদে আসার পরপরই ভাইয়া নিজের দায়িত্ব পালন করে ফেলেছে। ”“তাহলে মীম বা অন্য কাউকে দিয়ে দেন। আমার ফাঁকা হাত ই ভালো লাগে। ”“কিন্তু আমার ভালো লাগে না।”“মানে?”“তুমি সবার হাতের দিকে তাকিয়ে দেখেছো একবার? প্রত্যেকের হাতে চুড়িও আছে গাজরাও আছে। আর তোমার হাতে কিছুই নেই। আমি এতগুলো গাজরা এনেছি, এনে রাখতে পারি নি যে যার মতো নিয়ে গেছে। অনেক কষ্টে তোমার জন্য দুটা রেখেছি। এখন কথা না বলে হাত দাও। ”বন্যা ধীর কন্ঠে বলল,” আমাকে দিন আমি পড়ে নিব।”“আমি পড়িয়ে দিলে কোনো সমস্যা হবে? নাকি এখনও আমার উপর রেগে আছো?”“তেমন না।”“তাহলে কেমন?”তানভির গম্ভীর মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। বন্যা ভ্রু কুঁচকে সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে কিছু না বলেই হাত বাড়ালো। কারো সাথে কথার তর্কে জড়ানোর থেকে আগেভাগে কেটে পড়ায় ভালো। গাজরা পড়িয়ে দেয়ামাত্রই বন্যা স্থান ত্যাগ করে পুনরায় স্টেজের কাছে আসছে। মেঘ বন্যাকে দেখেই হাতে ইশারা করল। মিনহাজ, তামিম, মিষ্টি আর সাদিয়া কিছুক্ষণ আগেই আসছে। এসেই মেঘ আর আবিরের সাথে ছবি তুলে ফেলেছে। কিন্তু বন্যা লজ্জায় যেতেই চাইছিল না। বন্যা স্টেজে উঠতেই আবির ব্যস্ত কন্ঠে তানভিরকে ডাকল। আম্মুরা বা মামী, খালাদের নজর এড়াতে তানভির স্টেজে উঠতেই কানে কানে ফিসফিস করে কিছু বলল যেন সবাই মনে করে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে ডেকেছে। তানভির নামতে নিলে আবির কিছুটা উঁচু স্বরে বলল,“কিরে কোথায় যাচ্ছিস? ছবি তুলবি না? দাড়াঁ।”পাশ থেকে রাকিব, রাসেল আর সাকিব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলছে,“একমাত্র বোনের বিয়ে অথচ বোনের সাথে তানভিরের এখনও কোনো ছবিই নেই। তাড়াতাড়ি দাঁড়া তোদের ছবি তুলে দেয়। ”তানভির হাত দিয়ে মুখের ঘাম মুছার নাম করে ঠোঁটের হাসি আড়াল করে বন্যার পাশাপাশি দাঁড়ালো। ৩-৪ ক্যামেরাম্যান ঝটপট কতগুলো ছবি তুলে ফেলল। সবার মন মতো ছবি তুলা শেষে ছেলেমেয়ে সবাই একসঙ্গে স্টেজে উঠেছে। প্রায় ১৫-২০ জন ছেলে waterworld রঙের পাঞ্জাবি পড়েছে সাথে ২০-২২ জন মেয়ের পড়নে waterworld রঙের শাড়ি । যেই মীম আজ পর্যন্ত কোনোদিন শাড়ি পড়ে নি সেই মীমও আজ শাড়ি পড়েছে। অল্প বয়স্ক মেয়েদের মধ্যে একমাত্র মালা ব্যতীত সবাই শাড়ি পড়েছে। মালাকে জোর করেও শাড়ি পড়ানো যায় নি। গ্রুপ ছবি তোলার এক পর্যায়ে গুরুজনেরা চলে যেতে শুরু করেছেন। ছাদ মোটামুটি ফাঁকা হতেই কাপল ডান্স শুরু হয়েছে যার সূচনায় ছিল রাকিব-রিয়া আর আসিফ-জান্নাত। গুরুজনদের সামনে ওরা এতক্ষণ ভদ্র থাকলেও এখন সব ভুলে নাচতে শুরু করেছে। টানা ৩ টা গানে নাচ শেষে আবির- মেঘকে টেনে এনেছে। সবার রিকুয়েষ্টে শুরুর দিকে মেঘ আর আবির ২ টা গানে পারফর্ম করেছিল কিন্তু আচমকা মোজাম্মেল খান আসতেই মেঘ লজ্জায় সেই যে বসেছে আর উঠে নি। এখন ছাদের দরজা বন্ধ করে মেঘকে উঠিয়েছে তারপরও যেন লজ্জা না পায়। একদম লাস্টে আবির-মেঘ, রাকিব-রিয়া, আসিফ-জান্নাত, তানভির-বন্যা, আরিফ-মীম, মিনহাজ-মিষ্টি, তামিম-সাদিয়া, রাসেল-সোনিয়া, সাকিব-আইরিন সহ বাকি যারা ছিল সবাই একসঙ্গে Hawa Hawa গানে পারফর্ম করেছে। আইরিন ভালো ডান্স পারে শুধুমাত্র সেই কারণে সাকিব আইরিনের সাথে ডান্স করতে রাজি হয়েছে কিন্তু শুরুতেই করুণ কন্ঠে বলে নিয়েছে,“আমার গ্রামে একটা নিরীহ গার্লফ্রেন্ড আছে, ও রেগে গেলে একটু বলে দিও আমার কোনো দোষ নাই৷” সাকিবের এমন কথা শুনে আইরিন রাগে কটমট করে বলেছে, “আমার সাথে ডান্স করতে বলেছে কে আপনাকে? আপনি আপনার কাজিনের সাথে ডান্স করেন।”সাকিব সহাস্যে বলে,“মালা করবে ডান্স! আর মানুষ পেলে না৷ এই মেয়ে আসছেই শুধু দেখতে আর নিজে জ্বলতে। আমি বার বার বলেছি নিজের কষ্ট বাড়াতে শুধু শুধু যাস না। কে শুনে কার কথা, মন ভরে দেখতে আসছে দেখুক। তোমাকে যেটা বলেছি সেটা করবা, ঠিক আছে?”“আচ্ছা। ”এদিকে আরিফ আর মীমের একটু পর পর ঝগড়া লাগা দেখে তানভির দুটাকে শাস্তিস্বরূপ কাপল ডান্স করতে বলেছে। অনুষ্ঠান প্রায় শেষ পর্যায়ে, যে যার মতো গল্প করতে করতে নিচে চলে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে মেহেদী দেয়া শুরু করতে হবে। আবির আর তানভির বিয়ের কেনাকাটা করতে মার্কেটে যাবে তাই একটু তাড়াহুড়োতেই পোগ্রাম শেষ করতে হয়েছে। বন্যা আর আইরিন গল্প করতে করতে নেমে গেছে। মীম হুট করে ওদের দেখতে না পেয়ে দৌড়ে নিচে নামতে গিয়ে ছাদের দরজায় হোঁচট খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে বসে পড়েছে। দু’হাতে পা চেপে কান্না করছে। ছাদে সাউন্ড বক্সের শব্দের কারণে মীমের অল্পবিস্তর কান্নার শব্দ কেউ শুনতে পায় নি। আরিফ দরজা পর্যন্ত এসে মীমের কান্নার শব্দ শুনে কিছুটা চিন্তিত স্বরে জানতে চাইল,” কি হয়েছে ?”মীম কাঁদতে কাঁদতে বলল,“হোঁচট খেয়েছি।”আরিফ সঙ্গে সঙ্গে ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে মীমের পায়ের কাছে ধরলো। বৃদ্ধাঙ্গুল থেকে অনর্গল রক্ত বের হচ্ছে, মীমের দু’হাতে রক্ত লেগে আছে। আরিফ নিবিষ্ট কন্ঠে বলতে শুরু করল,” শাড়ি পড়ে এই ভাবে কেউ ছুটাছুটি করে? দেখি হাতটা ধরো।”মীম কাঁদতে কাঁদতে আরিফের হাতটা শক্ত করে ধরে বসা থেকে উঠল। কিন্তু ব্যথার চোটে পা ফেলতে পারছে না। আরিফ মীমের এক হাতে ধরে আস্তে আস্তে নামাচ্ছে। কোনোমতে নিচ পর্যন্ত গিয়েই মীম হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেছে৷ কি হয়েছে, কি হয়েছে বলে আশেপাশে সবাই জড়ো হয়ে গেছে। আরিফ দৌড়ে ফাস্ট এইড বক্স আনতে চলে গেছে। মীমের কান্নার শব্দে তানভির ছুটে এসে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,” এভাবে কাঁদছিস কেনো? কি হয়েছে? ”মীম কাঁদতে কাঁদতে নিজের পা বাড়ালো। তানভির রক্তাক্ত আঙুল দেখেই কপাল কুঁচকে গম্ভীর দৃষ্টিতে আরিফের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করল,” এই আরিফ, তুইও কি ছোট মানুষ? এভাবে ব্যথা দিয়েছিস কেন?”জান্নাত ফ্রিজ থেকে বরফ এনে দিল। মীম কাঁদতে কাঁদতে বলল,” আরিফ ভাইয়া কিছু করে নি। আমিই হোঁচট খেয়ে পড়ে গেছিলাম।”তানভির ঘাড় ঘুরিয়ে আরিফের দিকে এক নজর তাকালো। আরিফ ফাস্ট এইড বক্স হাতে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তানভির হাত বাড়িয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,“দে”পরপর মীমের দিকে তাকিয়ে তপ্ত স্বরে বলল,” তুই কি হাঁটতে পারিস না? কথায় কথায় দৌড় দিতে বলে কে তোকে? কালকে বনুর বিয়ে আর তুই ব্যান্ডেজ বেঁধে ঘুরবি এটা কি ভালো লাগবে?”মীম কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলল,” আর এমন করবো না। ”ছাদে মেঘ, রিয়া, আবির, রাকিব, রাসেল, লিমন দাঁড়িয়ে গল্প করছে। মালা বরাবরের মতো দূরে একটা চেয়ারে নির্বাক ভঙ্গিতে বসে আছে। সবার হাসাহাসির মাঝে মেঘ হুট করে নিজের মাথা চেপে ধরে নিচে বসে পরেছে। আবির সঙ্গে সঙ্গে মেঘকে ধরে উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,“এই কি হয়েছে তোর?”” মাথা ব্যথা করছে।”মেঘের অল্প চাপেই মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যায়। সেখানেসকাল থেকে ঠিকমতো খাওয়া নেই, সারাদিন বাহিরে বাহিরে ঘুরে ফটোশুট করেছে, সন্ধ্যা থেকে ভারী লেহেঙ্গা পড়ে বসে আছে তারউপর এতক্ষণ নাচানাচি করলো সব মিলিয়ে মাথায় প্রচন্ড ব্যথা শুরু হয়ে গেছে। আবির মেঘকে নিয়ে রুমে চলে গেছে। মেঘের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,” তুই ফ্রেশ হয়ে আয়, আমি খাবার নিয়ে আসছি।”“আমি নিচে গিয়ে খেতে পারবো।”“তোকে ফ্রেশ হতে বলছি।”আবির নিচ গিয়ে মীমের অবস্থা থেকে কিছুক্ষণ দাঁড়ালো। উপরে মেঘের মাথা ব্যথা নিচে মীমের পা কাটা এ অবস্থায় কাকে কি বলবে বুঝতে পারলো না। মেঘের জন্য খাবার নিয়ে আবারও উপরে আসছে। অতিমাত্রায় ব্যথা সহ্য করতে না পেরে মেঘ মাথায় ওড়না বেঁধে রেখেছে। আবির অল্প অল্প করে মেঘকে খাইয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ দরজা থেকে এক অপরিচিত কন্ঠস্বর কানে আসলো,“আসবো?”আবির তেমন গুরুত্ব দেয় নি, মেঘ তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,“মুন্নি আপু, আসুন।”মেঘের খাওয়া প্রায় শেষ, আবির প্লেট হাতে নিয়ে মাথা নিচু করে বেড়িয়ে গেছে। মুন্নি মেঘের দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললেন,” মাথায় ওড়না বেঁধে রেখেছো কেনো? মাথা ব্যথা?”“হ্যাঁ, সারাদিন ঘুরতে ঘুরতে আর পারছি না। আপু, আপনি এত দেরি করে আসলেন কেনো? আপনাকে না বলেছিলাম সন্ধ্যায় আসতে।”“কিভাবে আসবো বলো, রান্না করে বাবুকে খাইয়ে, ঘুম পাড়িয়ে রেখে আসছি। এখন বলো, মেহেদী দেয়ার মতো ধৈর্য আছে তোমার?”মেঘ মাথায় হাত চেপে ধরে শক্ত কন্ঠে বলল,” না থাকলেও ধৈর্য রাখতে হবে। কাল যে আমার বিয়ে। ”মুন্নি মুচকি হেসে মেহেদী দেয়া শুরু করলো। মেঘদের এলাকায় মুন্নি এখন সুপরিচিত মুখ। বউ সাজাতে যেমন এক্সপার্ট তেমনি মেহেদী দিতেও এক্সপার্ট। ওনার নিজস্ব পার্লার আছে প্রায় অনেক বছর হবে। মেঘদের বাসার সবার সাথেই মোটামুটি ভালো সম্পর্ক, আগে একসময় ঈদে বাসায় এসে মীম, মেঘকে মেহেদী দিয়ে যেতো। এখন কয়েক বছর যাবৎ আসতে পারেন না কারণ ওনার বাবুর ৫-৭ বছর বয়স। তাছাড়া পার্লারের চাপেও তেমন সুযোগ পান না। মেঘের মাথা ব্যথা শুনে কেউ আর মেঘের রুমে আসার সাহস করে নি। সবাই মীমের রুমের বসে মেহেদী দিচ্ছে। আবির ফ্রেশ হয়ে একটা ফুলহাতা টিশার্ট পড়ে মোটামুটি রেডি হয়ে ঔষধ নিয়ে মেঘের রুমে আসছে। ততক্ষণে মেঘের এক হাতে অর্ধেক মেহেদী দেয়া হয়েছে। আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে শীতল কন্ঠে বলল,“ঔষধ খেয়েছিস?”“না।”আবির কপালে আলতোভাবে হাত রেখে উষ্ণ স্বরে জানতে চাইল,” ব্যথা বেশি?”“হুম।”আবির একটা ঔষধ খুলে মেঘকে খাইয়ে আকুল কন্ঠে বলল,” টেনশন করিস না, কিছুক্ষণের মধ্যেই কমে যাবে।”মুন্নি আপু দুই-তিনবার আবিরের দিকে তাকিয়েছে। আবির গ্লাস টেবিলে রাখতে রাখতে শান্ত স্বরে বলল,“আমি শপিংয়ে যাচ্ছি, তোকে ছবি পাঠাবো। ফোন কাছে রাখিস। ”“আচ্ছা। ”আবির যেতে নিয়ে আবারও থমকালো। মেঘের হাতের দিকে তাকিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,” আপু নামের জায়গাটা ফাঁকা রাখবেন, আমি এসে নাম লিখে দিব। ”মুন্নি আবিরের দিকে স্পষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে হেসে বলল,” ঠিক আছে ভাই, তোমার নাম তুমিই লিখে দিও।”আবির রুম থেকে বেড়িয়ে গেছে। মুন্নি মিটিমিটি হাসছে আর মেঘকে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে। মেঘ কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,” আপু, আপনি হাসছেন কেনো?”” এমনিতেই হাসি পাচ্ছে।”“আপনি কি আবির ভাইকে নিয়ে হাসছেন?”” মাত্র যে আসছিলো তার নাম কি আবির?”“জ্বি। ”মুন্নি কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে গুরুতর কন্ঠে বলে উঠল,” ওর অন্য একটা নাম আছে না?”” আছে কিন্তু সবাই এই নামেই চিনে। ”“অন্য নামটা কি?”“সাজ্জাদুল খান”“ইয়েস, সাজ্জাদ। মনে পড়েছে।”“কি হয়েছে আপু? আপনি কি ওনাকে আগে থেকে চিনেন? কিন্তু ওনি তো এত বছর দেশের বাহিরে ছিল। আপনি কিভাবে চিনবেন?”মুন্নি মলিন হেসে জিজ্ঞেস করল,” সে তোমাকে খুব ভালোবাসে তাই না?”“অনেক ভালোবাসে।”” তোমাদের রিলেশনের বিয়ে?”“জ্বি, মোটামুটি। ”“কতবছরের রিলেশন?”“জানি না। আমি ওনাকে দুই বছর যাবৎ পছন্দ করি। কিন্তু ওনার টা জানি না। ”” আমি যদি ভুল না করি, সাজ্জাদ মানে তোমার আবির ভাই তোমাকে কমপক্ষে ১৫ বছর ধরে পছন্দ করে। আর সেটা শুধু পছন্দ না যাকে বলে পাগলের মতো ভালোবাসা। ”মেঘ নির্বাক চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,“আপনি কিভাবে জানেন?”” একটা গল্প শুনবে?”“জ্বি ”“আজ থেকে প্রায় ১৫-১৬ বছর আগের কথা। তখন আমার নতুন বিয়ে হয়েছে, বছরখানেক হবে হয়তো। আমি আগে থেকেই পার্লারের কাজ টুকটাক জানতাম তাই আমার হাসবেন্ড বাসাতেই পার্লার খুলে দিয়েছিল। তখনও আমাকে তেমন কেউ চিনতো না। হালকাপাতলা মেকাপ, ফেসিয়াল আর টুকিটাকি মেহেদী দিয়ে দিতাম। হঠাৎ একদিন খেয়াল করলাম একটা ছেলে আমাদের বাসার অপর পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের বাসার দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলের বয়স ১২-১৩ বছরের বেশি হবে না। আমি তেমন একটা গুরুত্ব দিলাম না। টানা ৫-৭ দিন খেয়াল করে দেখলাম ছেলেটা প্রতিদিন প্রায় ঘন্টা দুয়েক বাসার অপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। সপ্তাহখানেক পর আমি একদিন আমার শ্বাশুড়িকে ছেলেটার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। তখন আমার শ্বাশুড়ি বললেন, ঐ ছেলেটা আমার সাথে দেখা করার জন্য প্রতিদিন ঘন্টার ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকে। যেহেতু আমি তখন নতুন বউ তাই আমার শ্বাশুড়ি কোনোভাবেই ছেলেকে আমার সাথে দেখা করতে দিতেন না। আর ছেলেও এত ভদ্র যে আমার শ্বাশুড়ি না করার পর কোনোদিন দ্বিতীয়বার কিছু বলতো না। আমি আমার হাসবেন্ডকে বিষয়টা জানায়। তারপর আমার হাসবেন্ডকে নিয়ে একদিন ঐ ছেলেটার কাছে যাই। ছেলেটা আমাকে দেখেই আকুল কন্ঠে জিজ্ঞেস করেছিল,” আপু আপনি কি মেহেদী দিতে পারেন?”আমি তার কথা শুনে কিছুটা বিরক্ত হয়েছিলাম। একটা ছেলে এক সপ্তাহ ধরে দাঁড়িয়ে থাকার পর জিজ্ঞেস করছে আমি মেহেদী দিতে পারি কি না। তারপরও আমি ঠান্ডা কন্ঠে উত্তর দিলাম,“মোটামুটি পারি৷ কেনো?”” দু’জনকে মেহেদী দিয়ে দিতে পারবেন?”“হ্যাঁ, পারবো। কিন্তু মেয়ে হতে হবে আর আমার পার্লারে আসতে হবে।”ছেলেটা নরম স্বরে বলেছিল,“তারা আসতে পারবে না, আপনি বাসায় গিয়ে মেহেদী দিয়ে আসবেন, প্লিজ।”আমার হাসবেন্ড কিছুটা রেগেই বলেছিল,” এই ছেলে তুমি কি ফাজলামো করতে আসছো? আমার ওয়াইফ কোথাও যাবে না। তুমি যাও এখান থেকে। ”আমার হাসবেন্ডের ধমক খেয়ে ছেলেটার চোখে পানি চলে আসছিল। আমি অবাক চোখে ছেলেটাকে দেখছিলাম। ছেলেটা তার ব্যাগ থেকে কতগুলো ২০, ৫০,১০০ টাকার নোট বের করে আমার হাসবেন্ডকে দিয়ে বার বার রিকুয়েষ্ট করছিল যেন আমি বাসায় যেতে রাজি হয়। আমি কৌতূহল বশতই জিজ্ঞেস করি,” কোথায় যেতে হবে?”” আমার বাসায়। আমার দুটা বোন আছে ঈদে তাদের মেহেদী দিয়ে দিবেন, প্লিজ।”আমি ছেলেটার কথাতে আরও বেশি বিস্মিত হলাম। এইটুকু একটা ছেলে তার বোনদের কত ভালোবাসে যে পার্লার থেকে টাকা দিয়ে তার বোনদের মেহেদী পড়াতে নিতে চাচ্ছে। আমার মন কিছুটা গললেও আমার হাসবেন্ড ছিল শক্ত মনের মানুষ। সে এত সহজে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তাছাড়া আমরা যেহেতু শহরে নতুন ছিলাম তাই সেভাবে কাউকে বিশ্বাসও করতে পারতাম না। আমার হাসবেন্ড অনেক জোরাজোরি করার পর ছেলের মুখ থেকে সত্যি কাহিনী টা বের করতে সফল হয়। আর সেই কাহিনী কোনো রূপকথার গল্প থেকে কম না।”মেঘ এতক্ষণ পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে গল্প শুনছিল। মুন্নি আপু থেমে যাওয়ায় মেঘ কপালে কিঞ্চিৎ ভাঁজ ফেলে জানতে চাইল,” রূপকথার গল্প টা কি আপু?”“তিন-চার বছরের এক রাজকন্যা খেলতে গিয়ে তার খেলার সঙ্গীদের হাতে মেহেদী দেখে বাসায় এসে ঠোঁট ভেঙে মেহেদীর জন্য কান্না করছিলো। রাজকন্যার আম্মুরা মেহেদী দিতে পারতো না, কিন্তু রাজকন্যা ছিল খুব জেদি আর অভিমানী। মেহেদী না দিয়ে দিলে খাবে না বলে কান্না করছিলো। রাজপুত্র ছিল বাবামায়ের একমাত্র ছেলে। বোন না থাকায় রাজকন্যাকে নিজের বোনের মতো ভালোবাসতো। ছোট্ট বয়স থেকেই বোনকে আগলে রাখার গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছিল। সবকিছু সহ্য করতে পারলেও রাজকন্যার চোখের পানি সহ্য করতে পারতো না রাজপুত্র। বাড়ি ফিরে বোনের চোখে পানি দেখে আঁতকে উঠেছিল। কারণ জানার পর সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গিয়ে মেহেদী কিনে নিয়ে আসছিলো৷ কাঁপা কাঁপা হাতে সেই রাজকন্যার কনুই অব্দি মেহেদী দিয়ে দিয়েছিল। তখন থেকে কিছুদিন পর পর মেহেদীর জন্য বায়না ধরতো রাজকন্যা আর সেই বায়না পূরণ করতে রাজপুত্র মেহেদী দেয়ার প্র্যাক্টিস শুরু করে। কিছুদিনের মধ্যে ভালোই শিখে ফেলেছিল। দু’ বছর ঈদে রাজকন্যাকে হাতে পায়ে মেহেদী দিয়ে দিলো। বিপত্তি ঘটলো তৃতীয় বছর, রাজকন্যা একটু একটু বড় হচ্ছিল সেই সাথে তার হিংসুটে মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছিলো। তৃতীয় বার ঈদে পাশের বাসার একটা পিচ্চি মেয়েকে মেহেদী দেয়ার অপরাধে রাজকন্যা কাঁদতে কাঁদতে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলেছিল। রাজপুত্র রাজকন্যা ব্যতীত অন্য কাউকে মেহেদী দিয়ে দিয়েছে এটা সে মেনেই নিতে পারছিল না। অবুঝ রাজকন্যার পাগলামিতে রাজপুত্র যে কিভাবে পাগল হয়েছে সে নিজেও বুঝতে পারে নি। হঠাৎ রাজপুত্র গুরুতর অসুস্থ হয়ে গেল তখন রাজকন্যার আবেগ জড়ানো কান্না আর নিষ্পাপ হৃদয়ের প্রতিজ্ঞায় রাজপুত্র নিজের কল্পনায় অন্য এক জগৎ তৈরি করলো। যেই জগতে রাজকন্যাকে বোন নয় বরং প্রিয়তমার আসনে বসালো। রাজকন্যার প্রতি মনোভাব বদলাতে শুরু করলো সেই সাথে বাড়তে লাগলো আতঙ্ক। কারণ রাজপুত্রের বাসায় তখন ছোট আরেকটা বোন ছিল যার বয়স ২ কি ৩ । রাজকন্যার এই হিংসুটে মনোভাবের জন্য সবসময় আতঙ্কে থাকতো রাজপুত্র। রাজপুত্রকে কারো সাথে মিশতে দিতে না চাওয়া, কোমল মনের আকুতি, রাজপুত্রের প্রতি তীব্র অধিকারবোধ সবেতেই ভীত হতো রাজপুত্র। সামনে ঈদ ঘনিয়ে আসছিলো, প্রতি বছরের মতো মেহেদী দেয়ার গুরু দায়িত্ব তার উপর ই পড়তো। কিন্তু সে ভীত ছিল, আগের বছর পাশের বাসার পিচ্চিকে মেহেদী দেয়া অপরাধে কান্না করায় বাসার কেউ সেভাবে গুরুত্ব দেয় নি কিন্তু এ বছর নিজের বাসার, চাচাতো বোনকে মেহেদী দেয়ার অপরাধে যদি আবারও একই কাজ করে তখন কি হবে। আগের বছর পর্যন্ত রাজকন্যা শুধু তার বোন থাকলেও পরের বছর নাগাদ রাজকন্যার প্রতি নতুন অনুভূতি জন্মেছিল। ভয়ে সে আশেপাশে খোঁজ নেয়। আমার কথা জানতে পেরে আমাকে রিকুয়েষ্ট করতে আসে। আমি আর আমার হাসবেন্ড প্রথমদিকে পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও শুধুমাত্র রাজপুত্রের রিকুয়েষ্টে সেই বাসায় যায়। অভিমানী রাজকন্যা রাজপুত্র ছাড়া কারো থেকে মেহেদী পড়তে রাজি নয়। দীর্ঘ সময় বুঝিয়ে আমি তাকে মেহেদী পড়াতে সফল হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটা ঈদে আমিই তাকে মেহেদী পড়িয়ে দেয়। ”মেঘ আশ্চর্য নয়নে চেয়ে আছে। মুন্নি আপু মুচকি হেসে ফের বললেন,” আশা করি বুঝেছো যে সেই রাজকন্যাটা তুমি আর রাজপুত্রটা তোমার আবির ভাই।”আমৃত্যু ভালোবাসি তোকেলেখনীতেঃ সালমা চৌধুরী(বিয়ে স্পেশাল) বাকি অংশ......................................................................................................................আইরিনদের ডিমান্ড শুনে রাকিব আবিরের দিকে তাকিয়ে মজার ছলে বলে উঠল,” নিজের বউ নিজে নিবি তাও এত ডিমান্ড।”আবির পাশ ফিরে রাকিবের দিকে ক্ষুদ্র চোখে তাকিয়ে অত্যন্ত মোলায়েম কন্ঠে বলল,” ও চাইলে হাসিমুখে জীবনটাও দিয়ে দিতে পারবো সেখানে তাকে পাওয়ার জন্য এই সামান্য ডিমান্ড আর এমন কি!”রাকিব তপ্ত স্বরে বলল,” আবেগ ছেড়ে বিবেক দিয়ে কথা বলল। বুঝছি তুই বউ পাগল, বউয়ের জন্য যা খুশি করতে পারিস তাই বলে যে যা বলবে তাই?”“ও শুধু আমার আবেগ না, আমার চিত্ত চাঞ্চল্যের এক ফালি সুখের আভাস।”” হয়েছে, বুঝেছি। বজ্জাত ছেলে, তোর জন্য একটু মজাও করতে পারবো না। ”আবির আড়চোখে তাকিয়ে মলিন হাসলো। আবির কানে কানে রাকিবকে কিছু বলতে চেয়েছে কিন্তু রাকিব সে কথা না শুনে আবিরের থেকে কিছুটা দূরে সরে রাগী স্বরে বলতে শুরু করল,” তোর আর কোনো কথায় শুনছি না আমি…!”তানভির মুচকি হেসে বলে উঠল,“রাকিব ভাইয়া, তোমার যা মজা করার ইচ্ছে আমার বিয়েতে করো। তোমার বন্ধুর বিয়েতে মজা করার আশা ছেড়ে দেও।”“তুইও যে তোর ভাইয়ের মতো আচরণ করবি না তার কি গ্যারেন্টি আছে? শত হোক তোদের রক্ত তো এক।”আলী আহমদ খান ভেতর থেকে হুঙ্কার দিলেন,” গেইট থেকে ভেতর পর্যন্ত আসতে এতক্ষণ সময় লাগে তোমাদের?”আবির তৎক্ষনাৎ চোখে ইশারা দিল, রাকিব টাকা বের করেও দিতে চাচ্ছে না। আইরিন, মীম, রিয়ারা জোরজবরদস্তি করে নিয়েছে। আবিরকে মালা পড়িয়ে, সাদা গোলাপ দিয়ে ভেতরে নেয়া হয়েছে। আলী আহমদ খান, মোজাম্মেল খান সহ আরও কয়েকজন একসঙ্গে বসে আছেন। আবির ঢুকতেই আলী আহমদ খান ডাকলেন,“আবির, একটু এদিকে আসো।”আবির তটস্থ হয়ে বলল,” জাস্ট এক মিনিট আব্বু। এখুনি আসছি।”আবির সবাইকে ফেলে চটজলদি মেঘের সাথে দেখা করতে চলে গেছে। কমবেশি সবাই গেইটের কাছে ছিল তাই মেঘের আশেপাশে তেমন বড় কেউ নেই। আদি সহ আরও কয়েকটা পিচ্চি ছুটাছুটি করছে। আবির মেঘের কাছাকাছি এসে কোমল কন্ঠে সালাম দিল, মেঘও মোলায়েম কন্ঠে সালামের উত্তর দিল। আবির মেঘের সামনে এসে দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে কিছুটা ঝুঁকে ঘোমটার আড়ালে থাকা মেঘকে একপলক দেখে নিল। আবিরের অনভিপ্রেত কাণ্ড দেখে মেঘ অলক্ষিতভাবে হেসে ফেলল। আবির মেঘের মুখের পানে গভীর মনোযোগে চেয়ে ঠোঁট কামড়ে হেসে নেশাক্ত কন্ঠে বলল,“একটু ভয়ে ছিলাম তাই দেখতে আসছি, কিছু মনে করিস না৷ কেমন!”মেঘ তপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,” আপনাকে রেখে পালাবো না, আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।”আবির চটজলদি মেঘের হাতে আলতোভাবে চুমু খেয়ে তটস্থ কন্ঠে বলল,” আব্বু ডাকছে, এখন যায়।”আবির সামনে যেতেই আলী আহমদ খান জিজ্ঞেস করলেন,” কোথায় গিয়েছিলে?”আবির মাথা নিচু করে বিড়বিড় করল,“মেঘকে দেখতে।”“৫ মিনিট কথা বলার জন্য ডেকেছিলাম, এটাও সহ্য হয় নি তোমার?”আবির নিরুদ্বেগ ভঙ্গিতে বলল,“আসলাম তো, এখন বলুন।”আবিরের নিরুদ্বেগ ভাবভঙ্গি দেখে মোজাম্মেল খান ঠোঁট চেপে হাসলেন, সাথে আবিরের বড় মামাও মৃদু হাসলেন। তবে আলী আহমদ খান ছেলের কর্মকাণ্ডে বেশ ক্ষুদ্ধ। আবির ২-৪ মিনিট কথা বলে আবারও মেঘের কাছে চলে গেছে কিন্তু ততক্ষণে মেঘের চারপাশে সবাই জড়ো হয়ে গেছে। আবিরের আব্বু, রাকিব, মেঘের আব্বু, তানভির কাজীর সাথে কথা বলে সবকিছু ঠিকঠাক করছে। মেঘ আবিরের উপস্থিতিতে, তাদের সম্মতি নিয়ে মৌখিকভাবে বিয়ের কাজ শেষ হয়েছে। বিয়ের যাবতীয় কাজ শেষে খাওয়াদাওয়ার পর্ব শুরু হয়েছে। মেঘ, আবির, বন্যা, তানভির, রাকিব, সাকিব সবাই একসঙ্গে বসেছে, খেতে খেতে টুকটাক খুনসুটি করছে। মিনহাজরা এসেছে অনেকক্ষণ হবে কিন্তু মেঘের জন্য বন্যা ওদের সাথে ঠিকমতো কথাও বলতে পারছে না। এর কিছুক্ষণ পরেই সিফাত আসছে, আলী আহমদ খান সিফাতকে দেখেই এগিয়ে গিয়ে হাসিমুখে কথা বলতে শুরু করেছেন। এদিকে মোজাম্মেল খান বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ চিন্তিত। সিফাত কিছুটা দূরে যেতেই মোজাম্মেল খান কিছুটা চিন্তিত স্বরে ডাকলেন,“ভাইজান”“হ্যাঁ, বল।”“আবির আর মেঘের বিয়ের কাজ কি শেষ?”“হ্যাঁ, কেনো?”“না মানে কাবিনের কাজ টা বাকি রয়ে গেল না?”আলী আহমদ খান গুরুভার কন্ঠে বললেন,” ছেলে আমার মেয়ে তোর, সবচেয়ে বড় কথা তারা দু’জন দু’জনকে মন থেকে ভালোবাসে। তুই কাবিন দিয়ে কি করবি? তারপরও যদি তোর মনে হয় তাহলে ঘরোয়াভাবে বসে সেটার সমাধান করা যাবে। ”” আমি ঐভাবে বলতে চাই নি।”আলী আহমদ খান কপাল গুটিয়ে ধীর কন্ঠে বললেন,“বিবাহ সম্পাদনের জন্য বা বিবাহ বৈধ হওয়ার জন্য ‘কাবিননামা’ অপরিহার্য না। কাবিননামা একটা আইনি বাধ্যবাধকতা মাত্র। প্রাপ্তবয়স্ক দুজন ছেলে মেয়ের সম্মতি নিয়ে, সব নিয়মকানুন মেনেই বিয়ে হয়েছে এতে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই।”আলী আহমদ খান একগাল হেসে ফের বললেন,” এখন খেতে চল।”“চলো।”মেঘ আর আবিরের ফটোশুট চলছে। বন্যা কাছেই দাঁড়িয়ে আছে যেন মেঘের কোনো সমস্যা হলে ঝটপট যেতে পারে। বন্যার আব্বু, আম্মু, ভাই আর বোন এসেছিলো, খাওয়াদাওয়া করে মেঘ আবিরের সাথে কয়েকটা ছবি তুলে কিছুক্ষণ আগেই বেড়িয়েছে। ওনারা চলে যাওয়ার খানিক বাদে আচমকা তানভির এসে বন্যার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালো। তানভিরকে দেখেই বন্যা কিছুটা সরে যাওয়ার চেষ্টা করলো। তানভির সহসা শীতল কন্ঠে বলল,” তারপর বলো, তুমি কবে বিয়ে করবে। ”বন্যা ভ্রু কুঁচকে বলে উঠল,“মানে?”“বিয়ে করবে না?”” আগে আপুর বিয়ে হোক তারপর ভেবে দেখবো।”তানভির মনমরা হয়ে বলল,” ওহ।”বন্যা ভণিতা ছাড়াই প্রশ্ন করল,“কেনো বলুন তো..”“তোমার বেস্ট ফ্রেন্ডের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, তোমার খারাপ লাগছে না?”“খারাপ কেনো লাগবে? মেঘ তার প্রিয়মানুষকে বিয়ে করতে পেরেছে, এতে আমি খুব খুশি। ”” তোমার প্রিয়…” বলতেই মোজাম্মেল খান দূর থেকে উচ্চস্বরে ডাকলেন,“তানভির”তানভির ভয়ে আঁতকে উঠে,” ও বাবা ”বলে তড়িৎ বেগে বন্যার পাশ থেকে সরে গেছে। বন্যা উদ্বেগহীন চোখে তাকিয়ে আনমনে হাসলো। বাহিরে তানভির যতই রাগী রাগী ভাব নিয়ে থাকুক না কেনো, বাসার ভেতরে সে আপাদমস্তক ভীতু একটা ছেলে। মীম টেবিলে মাথা রেখে মুগ্ধ চোখে চেয়ে আবির আর মেঘকে দেখছে। মেঘের চোখে মুখে লজ্জা লজ্জা ভাব থাকলেও আবিরের চোখে লজ্জার ছিটেফোঁটাও নেই। নতুন জামাইয়ের যেসব গুণাবলি থাকা প্রয়োজন তার একটাও আবিরের মধ্যে নেই। এই একবার মেঘের সাথে দুষ্টামি করছে, আবার তানভির, রাকিবের সঙ্গে দুষ্টামি করছে, ছবি সুন্দর না হলে ফটোগ্রাফারের মাথায় গাট্টা দিয়ে স্টাইল শিখিয়ে দিচ্ছে। মীম সেগুলোই মনোযোগ দিয়ে দেখছে। আরিফ একটা আইসক্রিম মীমের সামনে রেখে মৃদুস্বরে বলল,“খেয়ে নাও”মীম মাথা তুলে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,” আমি কেনো খাবো?”” গরমের মধ্যে আইসক্রিম টা খেলে তোমার ভালো লাগবে তাই নিয়ে আসছি।”মীম গম্ভীর মুখ করে বলে উঠল,” আমার ভালো কবে থেকে চিন্তা করা শুরু করেছো তুমি?”“যেভাবে এদিক সেদিক হোঁচট খাচ্ছো, চিন্তা না করে উপায় আছে?”মীম মুচকি হেসে আস্তে করে বলল,” তুমি ধাক্কা না মারলেই হলো।”শেষ বিকেলের দিকে হালিমা খানরা বাসায় চলে আসছেন। মেঘ আর আবিরকে বরণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কাজের ফাঁকে মাহিলা খান অকস্মাৎ প্রশ্ন করে বসলেন,” তোর মেয়ের বিয়েতে তুই খুশি তো বোন?”হালিমা খান মুচকি হেসে বললেন,“একটা কথা বলবো আফা?”” বল।”“আবিরের সাথে মেঘের বিয়ের ব্যাপারে আমি আরও অনেকদিন আগেই ভেবেছিলাম। ”“সত্যি? আমাকে বলিস নি কেনো?”“কিভাবে বলতাম বলো, এই বাড়ির পুরুষদের কিছু বলতে গেলে ভয় লাগে অন্ততপক্ষে বিয়ের বিষয়ে। প্রথমে মেঘের আব্বুকে বলতে চেয়েছি কিন্তু ওনার ছেলে দেখার তোরজোর দেখে আর বলতে পারি নি, তারপর একদিন আকলিমাকে কথার কথা এমনিতেই বললাম, সে তো ভয়ে শেষ। আমাকে সঙ্গে সঙ্গে বারণ করেছে যেন তোমাকে কিছু না বলি। আমি সব ভুলে একদিন তোমাকে বলে ফেলতে চেয়েছিলাম তৎক্ষনাৎ তোমার অতীতের ঘটনা মনে পড়ে গেছিলো। আমার উল্টাপাল্টা চিন্তার জন্য বাসায় যেন নতুন কোনো অশান্তি সৃষ্টি না হয় এজন্য আর কিছুই বলি নি৷ ”আবিরের আম্মু শীতল কন্ঠে জানালেন,” যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। ছেলেমেয়ে পছন্দ করেছে, তারা ভাইয়ে ভাইয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এতে আমাদের কোনো হাত নেই ”মেঘের আম্মু মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে মৃদুস্বরে বললেন,” আমার মেয়েটার জন্য একটু ভয় হচ্ছে, আফা।”“কেনো?”” আমি জানি আবির মেঘকে অনেক পছন্দ করে, সারাজীবন আগলে রাখবে কিন্তু সবকিছুর পরেও আবিরের শরীরে ভাইজানের রক্তই বইছে তাছাড়া ওর রাগটাও বেশি। রাগের মাথায় মেঘের সাথে যদি খারাপ আচরণ করে। ”মালিহা খান মলিন হেসে বললেন,” এখনই এত ভয় পাচ্ছিস কেনো, ওরা তো আমাদেরচোখের সামনেই থাকবে। যা হবে দেখা যাবে। ”সন্ধ্যার আগে আগে আবির-মেঘ বাসায় আসছে। ওদের বরণ করে, দুধ, মিষ্টি খাইয়ে বাকি নিয়মকানুন শেষ করে মেঘকে নিয়ে মালিহা খান ভেতরে চলে যাচ্ছেন। এদিকে আবির ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে নির্বাক চোখে তাকিয়ে আছে। সবার পূর্ণ মনোযোগ মেঘের দিকে দেখে আবির ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,” আমি এখন কি করবো?”মালিহা খান তপ্ত স্বরে বললেন,” তোর যা ইচ্ছে কর গিয়ে।”আবির দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল,“বউটাকে দিয়ে গেলে অন্তত দেখতে তো পারতাম। ”বন্যারা পরের গাড়ি দিয়ে আসছে তাই একটু দেরি হয়েছে। মীম, আইরিন আর বন্যা গেইটের কাছে আসতেই তানভির গুরুভার কন্ঠে ডাকল,” বন্যা। ”বন্যা সহ আইরিন আর মীম স্পষ্ট চোখে তাকিয়েছে। তানভির তৎক্ষনাৎ বলে উঠল,“আমি বন্যাকে ডেকেছি, তোদের নাম বন্যা?”“না।”“তাহলে এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো?”বন্যা মৃদুস্বরে বলল,“কিছু বলবেন?”সঙ্গে সঙ্গে মীম, আইরিন একসঙ্গে বলে উঠলো,“কিছু বলবা?”তানভির মুখ ফুলিয়ে রাগী স্বরে বলল,“না।”মীম আর আইরিন বন্যাকে নিয়ে চলে যাচ্ছে। তানভির কয়েক মুহুর্ত তাকিয়ে থেকে আবিরের কাছে গেল। তানভির কপাল কুঁচকে এক দৃষ্টিতে বন্যার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,” ভাইয়া, তোমার বিয়ে টা তো শেষ হলোই এবার আমার টা নিয়ে একটু ভাবো।”আবির চোখ ঘুরিয়ে তানভিরের দিকে তাকিয়ে রাশভারি কন্ঠে বলল,” আগামী দু’বছর এই বাড়িতে আর কোনো বিয়ে হবে না।”“আমি চাকরি নিলেও না?”“না”“কোনো? ”“আমার বউ অন্ততপক্ষে দু’বছর এই বাড়ির একমাত্র বউ হয়ে রাজত্ব করবে। তোর বোনের বউ বউ ফিল শেষ হলেই তার ভাবিকে নিয়ে আসবো ততদিনে তুই নিজেকে গুছা।”“তাই বলে দুই বছর?”“দেখ তানভির, তুই আমার থেকে বয়সে দুই বছরের ছোট তাই বিয়েটাও দু’বছর পর করা উচিত। তাছাড়া আমি তোর বোনের মানসিক শান্তিতে ব্যাঘাত দিব না। তোকে ছয় মাসের মধ্যে বিয়ে করালাম সবকিছু ঠিকঠাক চললো। কোনো এক দিন, হয়তো আজ থেকে ১০ বছর পর মেঘ আমার কাছে এই অভিযোগটা করল তখন আমি কি করবো? ও কে কি এই দিনগুলো ফিরিয়ে দিতে পারবো?”তানভির মন মরা হয়ে বলল,” থাক, আমি আর কিছু বলব না।”তানভির মন খারাপ করে চলে যাচ্ছে। আবির মৃদু হেসেফের ডাকল, কিন্তু তানভির আর তাকালো না। অবশ্য তাকালেও বিশেষ কোনো লাভ হবে না কারণ আবির যা ভেবে রেখেছে তাই হবে, তানভির জোরপূর্বক কোনোকিছু পরিবর্তন করতে পারবে না আর করতে চাইও না। আগামীকাল আবিরদের বাসায় অনুষ্ঠান হবে, একেবারে কাছের মানুষজন ছাড়া অতিরিক্ত কোনো মানুষ থাকবে না। আবিরের আব্বু চেয়েছিলেন একদিনেই অনুষ্ঠান শেষ করতে কিন্তু মোজাম্মেল খানের এতে দ্বিমত ছিল। ওনি মেয়ের বিয়ের জন্য এত বছর যাবৎ স্বপ্ন দেখেছেন তাই আলী আহমদ খান ওনার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার সুযোগ দিয়েছেন। আবির আর রাকিব সন্ধ্যার পর পর ই বেড়িয়েছে, ফিরেছে প্রায় ১১ টা নাগাদ। ততক্ষণে বাড়ি মোটামুটি শান্ত হয়ে গেছে। আবির নিজের রুমে যেতে যেতে মেঘের রুমটা দেখে গেছে, রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। সন্ধ্যার পর থেকে মেঘের সাথে আবিরের আর কোনো কথায় হয় নি। আবির দু’তিনবার ডাকতেও গিয়েছে কিন্তু আজ কেনো জানি সাহস পাচ্ছে না তাই রুমে এসে মেঘের নাম্বারে কল দিল, সারাদিনের ক্লান্তিতে মেঘ গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। আবিরের কল বেজেই যাচ্ছে। মেঘের পাশ থেকে মাহমুদা খান ঘুম ঘুম কন্ঠে মেঘকে ডেকে বললেন,“মেঘ, ফোনটা সাইলেন্ট কর।”মেঘ ঘুমের মধ্যেই নড়ে উঠলো কিন্তু ফোন ধরলো না। গতকাল রাতে আবিরের রুমে আসার ঘটনা ছড়াতে ছড়াতে বড়দের কান পর্যন্ত চলে গিয়েছে। তাই মাহমুদা খান ইচ্ছে করেই আজ মেঘের রুমে শুয়েছেন। মেঘের একপাশে মাহমুদা খান অন্যপাশে বন্যা শুয়েছে। দু’বার কল কেটে পুনরায় কল বাজতে শুরু করেছে। বন্যা মেঘের পাশ থেকে ফোনটা একটু তুলতেই আবিরের ছবি ভেসে উঠেছে। বন্যা আস্তে করে বলল,“ঐ মেঘ, ভাইয়া কল দিচ্ছে।”ভাইয়া নামটা শুনতেই মেঘের গভীর ঘুম কেটে গেছে। ঘুম ঘুম চোখে পিট পিট করে কল রিসিভ করে কানে ধরল। ফোনের ওপাশ থেকে আবিরের মোলায়েম কন্ঠস্বর শুনা গেল,“আমার বউটা এখন কি করছে?”মেঘ ঘুম ঘুম কন্ঠে বলল,“ঘুমাচ্ছে”আবির মুচকি হেসে বলল,” কিন্তু আমার যে তার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে।”“সকালে বলব।”“না, এখনি বলতে হবে। ”মাহমুদা খান আস্তে করে বললেন,” মেঘ, ফোনটা রেখে ঘুমা।”মেঘ ফিসফিস করে রেখে দেয়ার কথা বলছে কিন্তু আবির নাছোড়বান্দা, কথা তার বলতেই হবে। আবির তপ্ত স্বরে বলল,“চল ছাদে যায়।”“কেনো?”“আমার চাঁদটাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। ”“এখন ছাদে যেতে পারবো না।”ছাদের কথা শুনে মাহমুদা খান রাগী স্বরে বলে উঠলেন, “এই আবির, ফোনটা রাখবি তুই? আর একটা রাত সহ্য করতে পারছিস না?”
গল্পঃ আমৃত্যু ভালোবাসি তোকেলেখিকাঃ সালমা চৌধুরী..................................................................................................................................................................মেঘ বিমোহিত নয়নে মুন্নি আপুর মুখের পানে চেয়ে আছে। রূপকথার গল্পের মুগ্ধতায় ডুবে নিজের মাথা ব্যথার কথা বেমালুম ভুলে গেছে। যেখানে দুই বছরের প্রণয়ের পূর্ণতা পেতে, আবিরের মুখ থেকে ভালোবাসি শুনতে মেঘ উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল সেখানে আবির ১৫ বছর যাবৎ পাগলের মতো এক তরফা ভালোবেসে গেছে এটা ভেবেই আঁতকে উঠছে মেঘ। ছোটবেলার এত এত স্মৃতির ভিড়ে মেঘের মনে আবিরের স্মৃতি খুব কমই আছে। আবিরকে নিয়ে অতীত ভাবতে গেলে মেঘের সর্বপ্রথম মনে পড়ে জয়ের কারণে থাপ্পড় খাওয়ার ঘটনাটা যেখান থেকে আবিরের প্রতি ঘৃণা আর বিরক্তি জন্মেছিল যার দরুন এক বাসায় থেকেও আবিরের সাথে দুই বছরে একটা সামান্যতম কথাও বলে নি এমনকি আবির চলে যাওয়ার পর ৭ বছরে একবার হ্যালো পর্যন্ত বলে নি। অথচ আজ সেই কথাগুলো মনে করে আনমনে হেসে ফেললো, ভেতরে ভেতরে নিজের প্রতি বেশ ক্ষুব্ধও হচ্ছে। যেখানে এমপির মেয়ের দুই চারটা কমেন্টস সহ্য করতে পারে নি, আবিরের অনুমতি না নিয়েই ব্লক করে দিয়েছিল, মালার দুদিনের আলগা ভালোবাসা সহ্য করতে পারে নি সেখানে জয়ের সাথে বন্ধুত্বের কারণে আবিরের থাপ্পড় মারাটা মেঘের কাছে আজ অযৌক্তিক মনে হচ্ছে না। মুন্নি আপু আনমনে হেসে বললেন,‘জানো মেঘ, তোমাকে যতবার আমি মেহেদী পড়িয়ে দেয় ঠিক ততবারই সাজ্জাদের কথা মনে পড়ে। হয়তো নাম খেয়াল ছিল না কিন্তু বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পিচ্চি ছেলেটার মুখটা সবসময় ভাসতো। অনেকবার তোমাকে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছি কিন্তু সাজ্জাদের নিষেধ অমান্য করে জিজ্ঞেস করার সাহস করে উঠতে পারি নি। কাল যেহেতু তোমাদের বিয়ে তাই আজ নিশ্চিন্তমনে কথাগুলো বলতে পারছি। মেঘ, তুমি খুব ভাগ্যবতী যে সাজ্জাদের মতো একজন জীবনসঙ্গী পেতে যাচ্ছো। বড় বোন হিসেবে সাজেশন দিচ্ছি যাই হয়ে যাক না কেন, সবসময় ওর পাশে থেকো।”মেঘ সদাশয় হেসে উত্তর দিল,“ইনশাআল্লাহ আপু, আমি আমৃত্যু ওনার পাশে থাকবো একদম ওনার লক্ষ্মী বউ হয়ে।”মুন্নি আপু নিঃশব্দে হেসে মেহেদী পড়াতে ব্যস্ত হয়ে গেছেন। এরমধ্যে আবির ভিডিও কল দিয়েছে, মেঘ কল রিসিভ করেই স্পষ্ট চোখে তাকালো, মুগ্ধতায় মেঘের দুচোখ চিকচিক করছে, ঠোঁটে লেগে আছে নিকষিত হাসি। মেঘের কোমলপ্রাণ হৃদয়ের প্রাণোচ্ছল হাসিতে আবির বরাবরের মতো মোহিত হলো, বুকের ভেতরটা নিখাদ ভালোলাগায় ছেয়ে গেছে। আবিরের হৃদয়ের গহীনে চলমান উত্তাল টেউ সামলে অনুষ্ণ কন্ঠে প্রশ্ন করল,“মাথা ব্যথা কমেছে?”” হুম, কিছুটা। ”“মেহেদী দেয়া শেষ?”“এক হাত বাকি।”আবির কিছুটা তটস্থ হয়ে জানতে চাইল,” নাম লিখে নি তো?”“না।”আবির মৃদু হেসে বলল,” আচ্ছা, নাম কিন্তু আমি এসে লিখবো। কালকের জন্য দুটা শাড়ি পছন্দ করেছি কোনটা নিব বল।”মেঘ ঠোঁট বেঁকিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,” আপনার যেটা ভালো লাগে সেটায় নিন। ”“আমার তো দুটায় ভালো লাগছে। আমি ভেবেছিলাম দুটায় নিয়ে নিব কিন্তু সাকিব বলতাছে বিয়ের শাড়ি নাকি একটায় নিতে হয়। এজন্য কনফিউশানে পড়ে গেছি৷”মেঘ ভ্রু গুটিয়ে ধীর কন্ঠে জানতে চাইল,“আপনি আবার কবে থেকে কুসংস্কার মানতে শুরু করেছেন?”” তোর সাথে মিশতে মিশতে আমিও কেমন যেন হয়ে যাচ্ছি। কথায় আছে না, সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে। ”মেঘ ক্ষুদ্র চোখে তাকিয়ে আস্তে করে বলল,” দেখান শাড়ি। ”আবির ক্যামেরা ঘুরিয়ে শাড়ি দেখাচ্ছে। মুন্নি আপুর এক হাতে মেহেদী দেয়া শেষ। এরমধ্যে আকলিমা এসে খাওয়ার জন্য ডেকে নিয়ে গেছেন। এই সুযোগে মেঘ ঝটপট বিয়ের শাড়ি, বউভাতের লেহেঙ্গা পছন্দ করে দিয়েছে। মুন্নি আপু খাওয়া শেষ করে আসতেই মেঘ কল কেটে আরেক হাত বাড়ালো। দু’হাতে মেহেদী দেয়া শেষে মুন্নি আপু চলে গেছেন, আসিফ আর আরিফ ওনাকে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসছে। মীমের রুমে মেহেদী দেয়ার ধুম লেগেছে, বন্যা অল্পস্বল্প মেহেদী দিতে পারে তাই যত পিচ্চি ছিল সবাইকে এক নাগাড়ে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে। মীমকেও বন্যায় মেহেদী দিয়ে দিয়েছে। জান্নাত সহ ওর ২-৩ জন মেহেদী আর্টিস্ট ফ্রেন্ড আসছে যারা রিয়া, সোনিয়া আরও কয়েকজনকে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে। বন্যা মেহেদী দেয়ার ফাঁকে একবার মেঘের রুমে এসে দেখে গেছে, তখনও মেঘের মেহেদী দেয়া শেষ হয় নি। মেঘের মেহেদী দেয়া শেষ অনেকক্ষণ হলো, এক হাত পুরোপুরি শুকালেও অন্যহাত এখনও শুকায় নি। কথার কথা মানুষজন বলে, মেহেদীর রঙ যত গাঢ় হয় জামাই তত বেশি ভালোবাসে এছাড়া মুন্নি আপুও বলেছেন, মেহেদী যত বেশি সময় রাখবে রঙ তত গাঢ় হবে। এজন্য মেঘ চিন্তা করেছে আজ সারারাতেও মেহেদী তুলবে না। মেঘ ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আপন মনে ভাবছে, আবিরের দেশে ফেরা, প্রথম দেখা, গান গাওয়া, বাইকে উঠা, কাশবনে যাওয়া, আবিরের জন্মদিন পালন করা, মাইশা আপুর বিয়ে, নিউ ইয়ার, ভ্যালেনটাইন সহ প্রতিটা ঘটনায় মেঘের চোখে স্পষ্ট ভাবছে সেই সাথে বার বার মনে তোলপাড় চালাচ্ছে মুন্নি আপুর বলা রাজপুত্র আর রাজকন্যার কাহিনীটা। একটা মানুষের ভালোবাসা ঠিক কতটা নিখুঁত হলে ছোট বয়স থেকেই এত বিচক্ষণ চিন্তাভাবনা করতে পারে। এরমধ্যে আবির, তানভিররা শপিং শেষ করে বাসায় আসছে। আবির গেইট দিয়ে ঢুকে নিচ থেকেই কিছু সময়ের জন্য মেঘের দিকে তাকিয়ে রইলো। আলোকসজ্জার লাল,নীল, সবুজ, গোল্ডেন, বেগুনি রঙের আলোতে মেঘের মায়াবী আদলখানাও বারংবার রঙ পাল্টাচ্ছে তাই দেখেই আবির খেই হারালো। তানভির ডাকতেই মনোযোগ সরে গেছে, সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো। ড্রয়িং রুমে বিয়ের কেনাকাটা দেখতে সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে, বন্যা, জান্নাত, মীমরাও উপর থেকে ছুটে আসছে, কিন্তু মেঘের কোনো হদিস নেই। মালিহা খান প্রশ্ন করলেন,” মেঘ কোথায়? যার জিনিসপত্র তার ই হদিস নেই। এই মীম, মেঘকে ডেকে নিয়ে আয়।”আবির তৎক্ষনাৎ বলে উঠল,” আমি যাচ্ছি।”এত এত মুরুব্বিদের ভিড়ে আবিরের অনাকাঙ্ক্ষিত কথা শুনে মালিহা খান কপাল কুঁচকালেন, আবির কারো উত্তরের প্রতীক্ষা না করেই দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে৷ মেঘের মামীরা সহ আরও অনেকেই সেদিকে তাকিয়ে আছে৷ মালিহা খান তানভিরের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙালেন। তানভির সঙ্গে সঙ্গে বলল,” এইযে বিয়ের শাড়ি খুলছি, সবাই শাড়ি দেখুন।”এদিকে আবির মেঘের রুমে ঢুকে সরাসরি ব্যালকনিতে আসছে। আবিরের পায়ের শব্দেও মেঘের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। আবির আচমকা মেঘকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো, মেঘের পড়নের জলপাই রঙের শাড়ির পাড় বিদীর্ণ করে আবিরের শক্তপোক্ত হাত মেঘের নিভাঁজ উদর আঁকড়ে ধরেছে, অন্যহাতে কানের পাশের চুলগুলো সরিয়ে ঘাড়ে মাথা রাখলো৷ আকস্মিক ঘটনায় মেঘ ভীতিগ্রস্ত হয়ে ঘাড় ঘুরালো, আবিরের উপস্থিতি টের পেরে পুনরায় মাথা সোজা করে ফেলেছে। আবিরের গাঢ় নিঃশ্বাস মেঘের ঘাড়ে পড়ছে। আবির মেঘের মসৃণ গলায় মৃদু চুমু খেয়ে অত্যন্ত নমনীয় কন্ঠে বলল,“আড়াল থেকে অপেক্ষার দিন তোর ফুরিয়ে আসছে,এখন সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করার অনুমতি পেতে যাচ্ছিস।”আবির শ্বাস ছেড়ে পুনরায় বলতে শুরু করল,“গত দুই বছর তোকে দেখেও না দেখার মতো চলেছি, কথায় কথায় রাগ দেখিয়েছি, তোর অনুভূতি উপলব্ধি করার চেষ্টা করি নি, সবকিছুতেই ব্যস্ততা দেখিয়ে তোকে কষ্ট দিয়েছি। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি এই সবকিছু করেছি তোকে হারানোর ভয়ে। আমি এখনও আতঙ্কে আছি, কালকের দিন টা পার করার অপেক্ষায় আছি। অপ্রকাশিত আনন্দের অন্তরালে আমার এক নভস্থল ভয় জমে আছে, তোকে পূর্ণাঙ্গরূপে আমার করে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আমার মস্তিষ্ককে স্থির হতে দিচ্ছে না। আমি তোকে বড্ড বেশি ভালোবাসি মেঘ। ছোটবেলা থেকে নিজেকে একটা কথায় সবসময় বলতাম,‘মেঘ আবিরের হাসির কারণ,মেঘকে কষ্ট দেয়া ভীষণ বারণ।’অথচ দেখ, গত দুই বছরে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তোকে কতবার কষ্ট দিয়েছি, কতভাবে কাঁদিয়েছি। যারজন্য আমি নিজেকে আজও ক্ষমা করতে পারি না। গত দুই বছরে যা ঘটেছে সব ভুলে যা, প্লিজ। আজ এই মুহুর্ত থেকে আমরা নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছি, যেই জীবনে কেউ কাউকে ইচ্ছেকৃত কাঁদাবো না, কষ্ট দিব না। প্রতিনিয়ত নবরূপে একে অন্যের প্রেমে পড়বো আর নতুনভাবে ভালোবাসার সূচনা হবে। তুই রাজি তো?”আবির থামতেই মেঘের নাক টানার শব্দ কানে বাজলো। মেঘ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে। আবির মেঘকে ছেড়ে আতঙ্কিত কন্ঠে বলে উঠল,“এই মেঘ, কাঁদছিস কেনো?”আবিরের হাত থেকে মুক্তি পেতেই মেঘ অকস্মাৎ আবিরের দিকে ঘুরে আবিরকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে করতে বলছে,” আপনিও আমাকে মাফ করে দেন, প্লিজ। আমি জেনেবুঝে আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি, স্বার্থপরের মতো সবসময় শুধু নিজের দিকটায় চিন্তা করেছি। একটা বারের জন্যও আপনার আবেগ, অনুভূতি, কষ্ট, খুশি নিয়ে ভাবি নি। আমি মাত্র দুই বছরেই আপনাকে পেতে পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিলাম, অথচ আপনি ১৫ বছর আমার দেয়া কষ্ট নিরবে সহ্য করে গেছেন। আপনার নিগূঢ় প্রেমানুভূতির সামনে আমার দু বছরের ভালোবাসা আজ ফিকে হয়ে গেছে। আপনাকে যে পরিমাণ কষ্ট দিয়েছি সেই কষ্ট আমি আজীবন ভালোবেসেও পরিশোধ করতে পারবো না।আমি আপনাকে ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি কিন্তু সেটা আপনার ভালোবাসার কেবলমাত্র ১% আপনি আমাকে প্লিজ মাফ করে দেন।”আবির মেঘকে আলতোভাবে জড়িয়ে ধরে মৃদুস্বরে বলল,” আপু সব বলে দিয়েছে তোকে?”“হ্যাঁ”“এজন্যই বলি, মেয়েদের পেটে আসলেই কোনো কথা থাকে না। ”মেঘ আর কিছু বলছে না, আবিরের বুকে মুখ গুঁজে একমনে কেঁদেই যাচ্ছে, মেঘের চোখের পানিতে আবিরের টিশার্ট ভিজে গায়ের সঙ্গে লেপ্টে গেছে। মেঘের দু’হাত আবিরের পিঠে থাকায় মেঘের মেহেদী রাঙা হাতের মেহেদী ডিজাইনের অল্পস্বল্প দাগ আবিরের পিঠে লেগে গেছে। মেঘকে কয়েকবার থামতে বলাতেও মেঘ যখন থামছে না তখন আবির বাধ্য হয়ে উষ্ণ স্বরে মেঘের কানে কানে বলতে শুরু করল,” সমস্যা নেই, তোর ১% আর আমার ৯৯% ভালোবাসার ফলস্বরূপ আমাদের আহিয়ার আগমন ঘটবে। তবুও তুই এভাবে কাঁদিস না প্লিজ।”আহিয়ার কথা শুনেই মেঘ লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে আবিরকে ছেড়ে দূরে সরে দাঁড়ালো। আবির তপ্ত স্বরে পুনরায় বলল,” তুই বললে কাল থেকেই প্ল্যানিং শুরু করি? ”মেঘ ফোঁস করে বলল,“না।”আবির সহাস্যে বলে উঠল,“আজকের পর তুই কান্না করলে তোর কোলে আরেকটা কাঁদুনে বাবু ধরিয়ে দিব, তারপর দু’জনে মিলে কান্না করিস। ঠিক আছে? ”মেঘ লজ্জায় চিবুক নামিয়ে গলায় ঠেকিয়েছে। আবির মেঘের চোখ মুছে মেঘকে নিয়ে নিচে আসছে। ততক্ষণে তানভির, সাকিব আর আসিফ মিলে মোটামুটি সব কিছু দেখিয়ে ফেলেছে। মেঘ আসতেই মেঘকে পুনরায় দেখানো শুরু করলো। আবির স্থির দৃষ্টিতে মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে। আচমকা রিয়া এসে বিড়বিড় করে ডাকল,“ভাইয়া..”আবির নড়েচড়ে উঠে উত্তর দিল,“জ্বি ”“ভাবি হিসেবে বলছি, আপনার বউয়ের ভালোবাসার নিশান আপনার পিঠে লেগে আছে। অন্য কেউ দেখার আগে টিশার্ট টা পাল্টিয়ে আসুন।”আবির চোখ নামিয়ে ভীরু হেসে চটজলদি উপরে চলে গেছে। মেঘ সব জিনিসপত্র মোটামুটিভাবে দেখে নিয়েছে। অল্পস্বল্প মাথা ব্যথা নিয়ে আবার কান্না করায় মেঘের মাথা ব্যথা বাড়তে শুরু করেছে, ঘুমে চোখ টানছে। মেঘ তড়িঘড়ি করে ঘুমাতে চলে গেছে। আবির ফ্রেশ হয়ে টিশার্ট পাল্টিয়ে যেতে যেতে শুনে মেঘ ঘুমিয়ে পরেছে। মীম, আইরিন আর বন্যা মেঘের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। আবির ভেতরে যেতে চাইলে ওরা শক্ত কন্ঠে বাঁধা দেয়। আবির নির্বাক চোখে তাকিয়ে ভাবছে কারণ তখনও মেঘের হাতে নিজের নাম লেখা বাকি। মীম আর আইরিন আবিরকে কোনোভাবেই রুমে ঢুকতে দিবে না। তাদের শর্ত একটায় আবির যদি মেঘের হতে নিজের নাম লিখে তাহলে আবিরের হাতেও তারা মেঘের নাম লিখে দিবে। আবিরের মেহেদী দেয়ার কোনো ইচ্ছে ছিল না কিন্তু মেঘের হাতে নাম লিখতে হবে শুধুমাত্র সেই কারণে তাদের শর্ত মেনে নিয়েছে। আবির ঘুমন্ত মেঘের দু’হাতে অতি সন্তর্পণে নিজের নাম লিখে দিয়েছে। তারপরই আইরিন আর বন্যা আবিরের দু’হাতে মেঘের নাম লিখতে শুরু করেছে। বিছানায় মেঘ ঘুমাচ্ছে তাই ওরা সবাই ফ্লোরে চাদর বিছিয়ে বসেছে। তানভির আবিরের রুমে যাচ্ছিল, আচমকা মেঘের রুম থেকে আবিরের কন্ঠস্বর শুনে থমকে দাঁড়ালো। দরজা থেকে উঁকি দিয়ে বলল,“আমি কি আসতে পারি?”আইরিন বন্যার দিকে একপলক তাকিয়ে হেসে বলল,“কাউকে না জ্বালালে আসতে পারো।”তানভির ভেতরে ঢুকেই আইরিনের মাথায় একটা গাট্টা দিল। আবিরের হাতের দিকে তাকিয়ে উদাস ভঙ্গিতে বলল,“আজ আমার বিয়ে নয় বলে কেউ একবারের জন্যও মেহেদী দিব কি না জিজ্ঞেস করছে না। পোড়া কপাল আমার। ”বন্যা মাথা নিচু করে মৃদু হাসলো। মীম পাশ থেকে আহ্লাদী কন্ঠে বলল,“দেখো, বন্যা আপু দিয়ে দিয়েছে।”তানভির ঠোঁট বেঁকিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,” বুঝলাম না, যে কয়জনের হাত দেখলাম সবাই একজনের নাম ই বলছে। সেই একজন কি পুরো বাড়ির দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে নাকি। ঠিক আছে, দায়িত্ব যখন নিয়েছে আমাকেও দিয়ে দিতে হবে।”বন্যা মাথা নিচু করে মনোযোগ দিয়ে মেহেদী দিচ্ছে, তানভিরের কথা শুনেও না শুনার মতো ভান করছে। আইরিন কপাল গুজিয়ে রাগী স্বরে বলল,” তানভির ভাইয়া, তোমাকে আগেই সাবধান করেছি। কাউকে জ্বালাতে পারবে না।”তানভির ভারী কন্ঠে বলল,” আমি কি মেহেদী দিব না? আমাকে কি মেহেদী দিয়ে দিবে না?”আবির অকস্মাৎ গুরুভার কন্ঠে বলে উঠল,“এই আইরিন, তানভিরের হাতে একটা ব্যাঙের ছাতা এঁকে দে তো আর হ্যাঁ ছাতার নিচে একটা ব্যাঙ ও দিস।”বন্যা, মীম, আইরিন তিনজন একসঙ্গে হেসে উঠল। তানভির মুখ ফুলিয়ে রাগী চোখে তাকিয়ে বলল,” অভদ্র জামাই, বউ এর বড় ভাইকে যথাযথ সম্মান দেয় না।”আবির শক্ত কন্ঠে বলল,“পার্সোনালি দেখা করবেন ভাইজান, আপনাকে একদম সম্মানের চূড়ায় পৌঁছে দিব।”আবিরের মেহেদী দেয়া শেষ আবির উঠে যেতে যেতে বন্যাকে উদ্দেশ্য করে বলল,“এই অবুঝ ছেলেটাকে একটু মেহেদী দিয়ে দিও। ”আবিরের কথাটা বলতে দেরি হলেও তানভিরের হাত বাড়াতে দেরি হলো না। বন্যা তপ্ত স্বরে জানতে চাইল,” কি লিখবো?”তানভির ভাবছে, মীম পাশ থেকে বলল,“A B C D E পর্যন্ত লিখে দাও।”তানভির চোখ ঘুরাতেই বন্যা আবারও জিজ্ঞেস করল,” আপনার নাম লিখে দিব?”“হাতে কেউ নিজের নাম লিখে?”“তাহলে কি লিখবো?”“তোমার ইচ্ছে। ”জান্নাত আইরিনকে ডাকছে, আইরিন ওদের টা টা দিয়ে চলে গেছে। মীমের ঘুম পাচ্ছে তাই মীমও গিয়ে মেঘের পাশে শুয়ে পরেছে। বন্যা তানভিরের হাতে ছোটখাটো একটা ডিজাইন করে দিচ্ছে। প্রায় শেষদিকে তানভির হাতের একটা অংশ দেখিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,“এখানে B লিখে দাও।”বন্যা সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে স্পষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,” B কেনো লিখবো?”“আমার ইচ্ছে তাই।”“আমি পারব না।”“কেনো পারবে না?”“এমনি।”“লিখতে বলেছি লেখো।”“B মানে কি?”“Busy.”“What?”” আমি খুব ব্যস্ত তাই হাতে Busy লিখতে রাখবো। তাতে তোমার কোনো সমস্যা? ডিজাইনারের কাজ ডিজাইন করা, এত কথা বলা নয়।”বন্যা একদম ছোট করে B লিখে দিয়েছে যাতে স্পষ্ট না ভাসে। তানভির নিজের হাতটা ভালোভাবে দেখে আকুল কন্ঠে বলল,“বাহ! তুমি তো খুব বুদ্ধিমতী।”বন্যা মনে মনে আওড়ালো,” নিজের নামের অক্ষর বড় করে লিখে নিজে ফাঁসার কোনো ইচ্ছে নেই আমার। ”তানভির চলে গেছে। বন্যা দরজা বন্ধ করে মেঘের পাশে গিয়ে শুয়েছে।আজ ৩রা ফেব্রুয়ারী, আবির মেঘের বিয়ের দিন। বিয়ে উপলক্ষে শহরের প্রথম সারির একটা কমিউনিটি সেন্টার বুকিং দেয়া হয়েছে। সকালের খাওয়াদাওয়া শেষে আবির মেঘকে পার্লারে নিয়ে গেছে। যদিও মোজাম্মেল খান চেয়েছিলেন তানভির যেন মেঘকে নিয়ে যায়। কিন্তু আবির সেসবে পাত্তা না দিয়ে নিজেই নিয়ে গেছে। মেঘ আজ তেমন কথা বলছে না, বার বার শুধু হাতের দিকে তাকাচ্ছে। একহাতে বাংলায় লেখা “আবিরের মেঘ”আরেকহাতে লেখা ” Sazzadul Khan Abir”আবির যেতে যেতে মেঘকে কিছু কাজ আর দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে। মেঘকে নামিয়ে দিয়ে বাসায় ফিরে শাওয়ার নিয়ে আবির রেডি হতে শুরু করলো। আবির কেবল শেরওয়ানিটা পড়েছে এরমধ্যে আইরিন আর মীম তাদের সাজুনি নিয়ে হাজির। গতকাল রাতের মতো আজও তারা আবিরকে সাজাতে চলে আসছে। নামাজের পরপর আবিররা রওনা দিয়েছে, এ পর্যায়ে এক বাড়ির মানুষজন দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। মেঘকে নিয়ে মোজাম্মেল খান, হালিমা খান, মেঘের মামা বাড়ির আত্মীয় স্বজন, তানভির, বন্যা, মীম এমনকি ফুপ্পিরাও কমিউনিটি সেন্টারে পৌঁছে গেছে। বিয়ের গেইটে দুপক্ষ মুখোমুখি হয়েছে। রাকিব, রাসেল, সাকিব, লিমনরা সবাই আবিরের পাশে। অন্যদিকে তানভিরের কয়েকজন বন্ধু, আরিফ, আসিফ, মীম, বন্যা,আইরিন ওরা গেইট আঁটকে দাঁড়িয়েছে । আইরিনদের ডিমান্ড শুনে রাকিব আবিরের দিকে তাকিয়ে মজার ছলে বলে উঠল,” নিজের বউ নিজে নিবি তাও এত ডিমান্ড।”আবির পাশ ফিরে রাকিবের দিকে ক্ষুদ্র চোখে তাকিয়ে অত্যন্ত মোলায়েম কন্ঠে বলল,” ও চাইলে হাসিমুখে জীবনটাও দিয়ে দিতে পারবো সেখানে তাকে পাওয়ার জন্য এই সামান্য ডিমান্ড আর এমন কি!”রাকিব তপ্ত স্বরে বলল,” আবেগ ছেড়ে বিবেক দিয়ে কথা বলল। বুঝছি তুই বউ পাগল, বউয়ের জন্য যা খুশি করতে পারিস তাই বলে যে যা বলবে তাই?”“ও শুধু আমার আবেগ না, আমার চিত্ত চাঞ্চল্যের এক ফালি সুখের আভাস।”” হয়েছে, বুঝেছি। বজ্জাত ছেলে, তোর জন্য একটু মজাও করতে পারবো না। ”আবির আড়চোখে তাকিয়ে মলিন হাসলো। আবির কানে কানে রাকিবকে কিছু বলতে চেয়েছে কিন্তু রাকিব সে কথা না শুনে আবিরের থেকে কিছুটা দূরে সরে রাগী স্বরে বলতে শুরু করল,” তোর আর কোনো কথায় শুনছি না আমি…!”তানভির মুচকি হেসে বলে উঠল,“রাকিব ভাইয়া, তোমার যা মজা করার ইচ্ছে আমার বিয়েতে করো। তোমার বন্ধুর বিয়েতে মজা করার আশা ছেড়ে দেও।”“তুইও যে তোর ভাইয়ের মতো আচরণ করবি না তার কি গ্যারেন্টি আছে? শত হোক তোদের রক্ত তো এক।”আলী আহমদ খান ভেতর থেকে হুঙ্কার দিলেন,” গেইট থেকে ভেতর পর্যন্ত আসতে এতক্ষণ সময় লাগে তোমাদের?”আবির তৎক্ষনাৎ চোখে ইশারা দিল, রাকিব টাকা বের করেও দিতে চাচ্ছে না। আইরিন, মীম, রিয়ারা জোরজবরদস্তি করে নিয়েছে। আবিরকে মালা পড়িয়ে, সাদা গোলাপ দিয়ে ভেতরে নেয়া হয়েছে। আলী আহমদ খান, মোজাম্মেল খান সহ আরও কয়েকজন একসঙ্গে বসে আছেন। আবির ঢুকতেই আলী আহমদ খান ডাকলেন,“আবির, একটু এদিকে আসো।”আবির তটস্থ হয়ে বলল,” জাস্ট এক মিনিট আব্বু। এখুনি আসছি।”আবির সবাইকে ফেলে চটজলদি মেঘের সাথে দেখা করতে চলে গেছে। কমবেশি সবাই গেইটের কাছে ছিল তাই মেঘের আশেপাশে তেমন বড় কেউ নেই। আদি সহ আরও কয়েকটা পিচ্চি ছুটাছুটি করছে। আবির মেঘের কাছাকাছি এসে কোমল কন্ঠে সালাম দিল, মেঘও মোলায়েম কন্ঠে সালামের উত্তর দিল। আবির মেঘের সামনে এসে দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে কিছুটা ঝুঁকে ঘোমটার আড়ালে থাকা মেঘকে একপলক দেখে নিল। আবিরের অনভিপ্রেত কাণ্ড দেখে মেঘ অলক্ষিতভাবে হেসে ফেলল। আবির মেঘের মুখের পানে গভীর মনোযোগে চেয়ে ঠোঁট কামড়ে হেসে নেশাক্ত কন্ঠে বলল,“একটু ভয়ে ছিলাম তাই দেখতে আসছি, কিছু মনে করিস না৷ কেমন!”মেঘ তপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,” আপনাকে রেখে পালাবো না, আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।”আবির চটজলদি মেঘের হাতে আলতোভাবে চুমু খেয়ে তটস্থ কন্ঠে বলল,” আব্বু ডাকছে, এখন যায়।”আবির সামনে যেতেই আলী আহমদ খান জিজ্ঞেস করলেন,” কোথায় গিয়েছিলে?”আবির মাথা নিচু করে বিড়বিড় করল,“মেঘকে দেখতে।”“৫ মিনিট কথা বলার জন্য ডেকেছিলাম, এটাও সহ্য হয় নি তোমার?”আবির নিরুদ্বেগ ভঙ্গিতে বলল,“আসলাম তো, এখন বলুন।”আবিরের নিরুদ্বেগ ভাবভঙ্গি দেখে মোজাম্মেল খান ঠোঁট চেপে হাসলেন, সাথে আবিরের বড় মামাও মৃদু হাসলেন। তবে আলী আহমদ খান ছেলের কর্মকাণ্ডে বেশ ক্ষুদ্ধ। আবির ২-৪ মিনিট কথা বলে আবারও মেঘের কাছে চলে গেছে কিন্তু ততক্ষণে মেঘের চারপাশে সবাই জড়ো হয়ে গেছে। আবিরের আব্বু, রাকিব, মেঘের আব্বু, তানভির কাজীর সাথে কথা বলে সবকিছু ঠিকঠাক করছে। মেঘ আবিরের উপস্থিতিতে, তাদের সম্মতি নিয়ে মৌখিকভাবে বিয়ের কাজ শেষ হয়েছে। বিয়ের যাবতীয় কাজ শেষে খাওয়াদাওয়ার পর্ব শুরু হয়েছে। মেঘ, আবির, বন্যা, তানভির, রাকিব, সাকিব সবাই একসঙ্গে বসেছে, খেতে খেতে টুকটাক খুনসুটি করছে। মিনহাজরা এসেছে অনেকক্ষণ হবে কিন্তু মেঘের জন্য বন্যা ওদের সাথে ঠিকমতো কথাও বলতে পারছে না। এর কিছুক্ষণ পরেই সিফাত আসছে, আলী আহমদ খান সিফাতকে দেখেই এগিয়ে গিয়ে হাসিমুখে কথা বলতে শুরু করেছেন। এদিকে মোজাম্মেল খান বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ চিন্তিত। সিফাত কিছুটা দূরে যেতেই মোজাম্মেল খান কিছুটা চিন্তিত স্বরে ডাকলেন,“ভাইজান”“হ্যাঁ, বল।”“আবির আর মেঘের বিয়ের কাজ কি শেষ?”“হ্যাঁ, কেনো?”“না মানে কাবিনের কাজ টা বাকি রয়ে গেল না?”আলী আহমদ খান গুরুভার কন্ঠে বললেন,” ছেলে আমার মেয়ে তোর, সবচেয়ে বড় কথা তারা দু’জন দু’জনকে মন থেকে ভালোবাসে। তুই কাবিন দিয়ে কি করবি? তারপরও যদি তোর মনে হয় তাহলে ঘরোয়াভাবে বসে সেটার সমাধান করা যাবে। ”” আমি ঐভাবে বলতে চাই নি।”আলী আহমদ খান কপাল গুটিয়ে ধীর কন্ঠে বললেন,“বিবাহ সম্পাদনের জন্য বা বিবাহ বৈধ হওয়ার জন্য ‘কাবিননামা’ অপরিহার্য না। কাবিননামা একটা আইনি বাধ্যবাধকতা মাত্র। প্রাপ্তবয়স্ক দুজন ছেলে মেয়ের সম্মতি নিয়ে, সব নিয়মকানুন মেনেই বিয়ে হয়েছে এতে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই।”আলী আহমদ খান একগাল হেসে ফের বললেন,” এখন খেতে চল।”“চলো।”মেঘ আর আবিরের ফটোশুট চলছে। বন্যা কাছেই দাঁড়িয়ে আছে যেন মেঘের কোনো সমস্যা হলে ঝটপট যেতে পারে। বন্যার আব্বু, আম্মু, ভাই আর বোন এসেছিলো, খাওয়াদাওয়া করে মেঘ আবিরের সাথে কয়েকটা ছবি তুলে কিছুক্ষণ আগেই বেড়িয়েছে। ওনারা চলে যাওয়ার খানিক বাদে আচমকা তানভির এসে বন্যার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালো। তানভিরকে দেখেই বন্যা কিছুটা সরে যাওয়ার চেষ্টা করলো। তানভির সহসা শীতল কন্ঠে বলল,” তারপর বলো, তুমি কবে বিয়ে করবে। ”বন্যা ভ্রু কুঁচকে বলে উঠল,“মানে?”“বিয়ে করবে না?”” আগে আপুর বিয়ে হোক তারপর ভেবে দেখবো।”তানভির মনমরা হয়ে বলল,” ওহ।”বন্যা ভণিতা ছাড়াই প্রশ্ন করল,“কেনো বলুন তো..”“তোমার বেস্ট ফ্রেন্ডের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, তোমার খারাপ লাগছে না?”“খারাপ কেনো লাগবে? মেঘ তার প্রিয়মানুষকে বিয়ে করতে পেরেছে, এতে আমি খুব খুশি। ”” তোমার প্রিয়…” বলতেই মোজাম্মেল খান দূর থেকে উচ্চস্বরে ডাকলেন,“তানভির”তানভির ভয়ে আঁতকে উঠে,” ও বাবা ”বলে তড়িৎ বেগে বন্যার পাশ থেকে সরে গেছে। বন্যা উদ্বেগহীন চোখে তাকিয়ে আনমনে হাসলো। বাহিরে তানভির যতই রাগী রাগী ভাব নিয়ে থাকুক না কেনো, বাসার ভেতরে সে আপাদমস্তক ভীতু একটা ছেলে। মীম টেবিলে মাথা রেখে মুগ্ধ চোখে চেয়ে আবির আর মেঘকে দেখছে। মেঘের চোখে মুখে লজ্জা লজ্জা ভাব থাকলেও আবিরের চোখে লজ্জার ছিটেফোঁটাও নেই। নতুন জামাইয়ের যেসব গুণাবলি থাকা প্রয়োজন তার একটাও আবিরের মধ্যে নেই। এই একবার মেঘের সাথে দুষ্টামি করছে, আবার তানভির, রাকিবের সঙ্গে দুষ্টামি করছে, ছবি সুন্দর না হলে ফটোগ্রাফারের মাথায় গাট্টা দিয়ে স্টাইল শিখিয়ে দিচ্ছে। মীম সেগুলোই মনোযোগ দিয়ে দেখছে। আরিফ একটা আইসক্রিম মীমের সামনে রেখে মৃদুস্বরে বলল,“খেয়ে নাও”মীম মাথা তুলে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,” আমি কেনো খাবো?”” গরমের মধ্যে আইসক্রিম টা খেলে তোমার ভালো লাগবে তাই নিয়ে আসছি।”মীম গম্ভীর মুখ করে বলে উঠল,” আমার ভালো কবে থেকে চিন্তা করা শুরু করেছো তুমি?”“যেভাবে এদিক সেদিক হোঁচট খাচ্ছো, চিন্তা না করে উপায় আছে?”মীম মুচকি হেসে আস্তে করে বলল,” তুমি ধাক্কা না মারলেই হলো।”শেষ বিকেলের দিকে হালিমা খানরা বাসায় চলে আসছেন। মেঘ আর আবিরকে বরণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কাজের ফাঁকে মাহিলা খান অকস্মাৎ প্রশ্ন করে বসলেন,” তোর মেয়ের বিয়েতে তুই খুশি তো বোন?”হালিমা খান মুচকি হেসে বললেন,“একটা কথা বলবো আফা?”” বল।”“আবিরের সাথে মেঘের বিয়ের ব্যাপারে আমি আরও অনেকদিন আগেই ভেবেছিলাম। ”“সত্যি? আমাকে বলিস নি কেনো?”“কিভাবে বলতাম বলো, এই বাড়ির পুরুষদের কিছু বলতে গেলে ভয় লাগে অন্ততপক্ষে বিয়ের বিষয়ে। প্রথমে মেঘের আব্বুকে বলতে চেয়েছি কিন্তু ওনার ছেলে দেখার তোরজোর দেখে আর বলতে পারি নি, তারপর একদিন আকলিমাকে কথার কথা এমনিতেই বললাম, সে তো ভয়ে শেষ। আমাকে সঙ্গে সঙ্গে বারণ করেছে যেন তোমাকে কিছু না বলি। আমি সব ভুলে একদিন তোমাকে বলে ফেলতে চেয়েছিলাম তৎক্ষনাৎ তোমার অতীতের ঘটনা মনে পড়ে গেছিলো। আমার উল্টাপাল্টা চিন্তার জন্য বাসায় যেন নতুন কোনো অশান্তি সৃষ্টি না হয় এজন্য আর কিছুই বলি নি৷ ”আবিরের আম্মু শীতল কন্ঠে জানালেন,” যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। ছেলেমেয়ে পছন্দ করেছে, তারা ভাইয়ে ভাইয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে এতে আমাদের কোনো হাত নেই ”মেঘের আম্মু মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে মৃদুস্বরে বললেন,” আমার মেয়েটার জন্য একটু ভয় হচ্ছে, আফা।”“কেনো?”” আমি জানি আবির মেঘকে অনেক পছন্দ করে, সারাজীবন আগলে রাখবে কিন্তু সবকিছুর পরেও আবিরের শরীরে ভাইজানের রক্তই বইছে তাছাড়া ওর রাগটাও বেশি। রাগের মাথায় মেঘের সাথে যদি খারাপ আচরণ করে। ”মালিহা খান মলিন হেসে বললেন,” এখনই এত ভয় পাচ্ছিস কেনো, ওরা তো আমাদের চোখের সামনেই থাকবে। যা হবে দেখা যাবে। ”সন্ধ্যার আগে আগে আবির-মেঘ বাসায় আসছে। ওদের বরণ করে, দুধ, মিষ্টি খাইয়ে বাকি নিয়মকানুন শেষ করে মেঘকে নিয়ে মালিহা খান ভেতরে চলে যাচ্ছেন। এদিকে আবির ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে নির্বাক চোখে তাকিয়ে আছে। সবার পূর্ণ মনোযোগ মেঘের দিকে দেখে আবির ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,” আমি এখন কি করবো?”মালিহা খান তপ্ত স্বরে বললেন,” তোর যা ইচ্ছে কর গিয়ে।”আবির দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল,“বউটাকে দিয়ে গেলে অন্তত দেখতে তো পারতাম। ”বন্যারা পরের গাড়ি দিয়ে আসছে তাই একটু দেরি হয়েছে। মীম, আইরিন আর বন্যা গেইটের কাছে আসতেই তানভির গুরুভার কন্ঠে ডাকল,” বন্যা। ”বন্যা সহ আইরিন আর মীম স্পষ্ট চোখে তাকিয়েছে। তানভির তৎক্ষনাৎ বলে উঠল,“আমি বন্যাকে ডেকেছি, তোদের নাম বন্যা?”“না।”“তাহলে এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো?”বন্যা মৃদুস্বরে বলল,“কিছু বলবেন?”সঙ্গে সঙ্গে মীম, আইরিন একসঙ্গে বলে উঠলো,“কিছু বলবা?”তানভির মুখ ফুলিয়ে রাগী স্বরে বলল,” না। ”মীম আর আইরিন বন্যাকে নিয়ে চলে যাচ্ছে। তানভির কয়েক মুহুর্ত তাকিয়ে থেকে আবিরের কাছে গেল। তানভির কপাল কুঁচকে এক দৃষ্টিতে বন্যার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,” ভাইয়া, তোমার বিয়ে টা তো শেষ হলোই এবার আমার টা নিয়ে একটু ভাবো।”আবির চোখ ঘুরিয়ে তানভিরের দিকে তাকিয়ে রাশভারি কন্ঠে বলল,” আগামী দু’বছর এই বাড়িতে আর কোনো বিয়ে হবে না। ”“আমি চাকরি নিলেও না?”“না”“কোনো? ”“আমার বউ অন্ততপক্ষে দু’বছর এই বাড়ির একমাত্র বউ হয়ে রাজত্ব করবে। তোর বোনের বউ বউ ফিল শেষ হলেই তার ভাবিকে নিয়ে আসবো ততদিনে তুই নিজেকে গুছা৷”“তাই বলে দুই বছর?”“দেখ তানভির, তুই আমার থেকে বয়সে দুই বছরের ছোট তাই বিয়েটাও দু’বছর পর করা উচিত । তাছাড়া আমি তোর বোনের মানসিক শান্তিতে ব্যাঘাত দিব না। তোকে ছয় মাসের মধ্যে বিয়ে করালাম সবকিছু ঠিকঠাক চললো। কোনো এক দিন, হয়তো আজ থেকে ১০ বছর পর মেঘ আমার কাছে এই অভিযোগটা করল তখন আমি কি করবো? ও কে কি এই দিনগুলো ফিরিয়ে দিতে পারবো?”তানভির মন মরা হয়ে বলল,” থাক, আমি আর কিছু বলব না।”তানভির মন খারাপ করে চলে যাচ্ছে। আবির মৃদু হেসে ফের ডাকল, কিন্তু তানভির আর তাকালো না। অবশ্য তাকালেও বিশেষ কোনো লাভ হবে না কারণ আবির যা ভেবে রেখেছে তাই হবে, তানভির জোরপূর্বক কোনোকিছু পরিবর্তন করতে পারবে না আর করতে চাইও না। আগামীকাল আবিরদের বাসায় অনুষ্ঠান হবে, একেবারে কাছের মানুষজন ছাড়া অতিরিক্ত কোনো মানুষ থাকবে না৷ আবিরের আব্বু চেয়েছিলেন একদিনেই অনুষ্ঠান শেষ করতে কিন্তু মোজাম্মেল খানের এতে দ্বিমত ছিল। ওনি মেয়ের বিয়ের জন্য এত বছর যাবৎ স্বপ্ন দেখেছেন তাই আলী আহমদ খান ওনার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার সুযোগ দিয়েছেন।আবির আর রাকিব সন্ধ্যার পর পর ই বেড়িয়েছে, ফিরেছে প্রায় ১১ টা নাগাদ। ততক্ষণে বাড়ি মোটামুটি শান্ত হয়ে গেছে। আবির নিজের রুমে যেতে যেতে মেঘের রুমটা দেখে গেছে, রুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। সন্ধ্যার পর থেকে মেঘের সাথে আবিরের আর কোনো কথায় হয় নি। আবির দু’তিনবার ডাকতেও গিয়েছে কিন্তু আজ কেনো জানি সাহস পাচ্ছে না তাই রুমে এসে মেঘের নাম্বারে কল দিল, সারাদিনের ক্লান্তিতে মেঘ গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। আবিরের কল বেজেই যাচ্ছে। মেঘের পাশ থেকে মাহমুদা খান ঘুম ঘুম কন্ঠে মেঘকে ডেকে বললেন,“মেঘ, ফোনটা সাইলেন্ট কর।”মেঘ ঘুমের মধ্যেই নড়ে উঠলো কিন্তু ফোন ধরলো না।গতকাল রাতে আবিরের রুমে আসার ঘটনা ছড়াতে ছড়াতে বড়দের কান পর্যন্ত চলে গিয়েছে। তাই মাহমুদা খান ইচ্ছে করেই আজ মেঘের রুমে শুয়েছেন। মেঘের একপাশে মাহমুদা খান অন্যপাশে বন্যা শুয়েছে। দু’বার কল কেটে পুনরায় কল বাজতে শুরু করেছে। বন্যা মেঘের পাশ থেকে ফোনটা একটু তুলতেই আবিরের ছবি ভেসে উঠেছে। বন্যা আস্তে করে বলল,“ঐ মেঘ, ভাইয়া কল দিচ্ছে।”ভাইয়া নামটা শুনতেই মেঘের গভীর ঘুম কেটে গেছে। ঘুম ঘুম চোখে পিট পিট করে কল রিসিভ করে কানে ধরল। ফোনের ওপাশ থেকে আবিরের মোলায়েম কন্ঠস্বর শুনা গেল,“আমার বউটা এখন কি করছে?”মেঘ ঘুম ঘুম কন্ঠে বলল,“ঘুমাচ্ছে”আবির মুচকি হেসে বলল,” কিন্তু আমার যে তার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে।”“সকালে বলব।”“না, এখনি বলতে হবে। ”মাহমুদা খান আস্তে করে বললেন,” মেঘ, ফোনটা রেখে ঘুমা।”মেঘ ফিসফিস করে রেখে দেয়ার কথা বলছে কিন্তু আবির নাছোড়বান্দা, কথা তার বলতেই হবে। আবির তপ্ত স্বরে বলল,“চল ছাদে যায়।”“কেনো?”“আমার চাঁদটাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। ”“এখন ছাদে যেতে পারবো না।”ছাদের কথা শুনে মাহমুদা খান রাগী স্বরে বলে উঠলেন,“এই আবির, ফোনটা রাখবি তুই? আর একটা রাত সহ্য করতে পারছিস না?”
গল্পঃ আমৃত্যু ভালোবাসি তোকেলেখিকাঃ সালমা চৌধুরী.................................................................................................................................................................মাহমুদা খানের ধমক খেয়ে মেঘ কেঁপে ওঠে, ভয়ে সঙ্গে সঙ্গে কল কেটে দিয়েছে৷ মেঘ ভয় পেলেও আবিরের মনে কিঞ্চিৎ ভয় বলতে নেই। ফুপ্পির ঝা*ড়ি খেয়েও আবির কল দিয়েই যাচ্ছে। মেঘ ফোন সাইলেন্ট করে রেখেছে ঠিকই কিন্তু আবিরের অনাবশ্যক কলে বুকের ভেতরটা অবিচ্ছিন্নভাবে কম্পিত হচ্ছে। বাহির থেকে আলোকসজ্জার ঝলমলে আলো রুমে প্রবৃত্ত হচ্ছে। মেঘ ঘাড় ঘুরিয়ে বন্যার দিকে একপলক তাকালো, বন্যা গভীর ঘুমে নিমগ্ন পরপর তাকালো ফুপ্পির দিকে, ফুপ্পির ভারী নিঃশ্বাসের শব্দে বুঝা যাচ্ছে ওনিও ঘুমে। মেঘ বুকের উপর ফোন চেপে অতি সন্তর্পণে বন্যার পাশ দিয়ে নেমে উদগ্রীব পায়ে বারান্দায় গিয়ে কল রিসিভ করল। আবির তৎক্ষনাৎ অনচ্ছ কন্ঠে শুধালো,” তোর কি আমার জন্য একটু মায়াও হয় না?”আবিরের কথা শুনে মেঘ বিহ্বল, ভড়কে গেছে কিছুটা। কপাল কুঁচকে ভারী স্বরে বলল,” আমি কি করলাম!”” সন্ধ্যা থেকে কেউ আমাকে একটা কল পর্যন্ত দিল না। কেউ না দিলেও তুই তো একটা কল দিতে পারতি নাকি?”” আমি তো আপনার কলের অপেক্ষায় ছিলাম। অপেক্ষা করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পরেছি বুঝতেই পারি নি।”“বাহ! কি দায়িত্বশীল বউ আমার। ”মেঘ সহসা ঠোঁট বাঁকালো, সদাজাগ্রত চোখে আলোকসজ্জার লাল, নীল আলোর পানে তাকিয়ে মোলায়েম কন্ঠে শুধালো,” বাসায় কখন আসছেন? খেয়েছেন?”“কিছুক্ষণ আগে। আমার শ্বশুর বিয়েতে যে পরিমাণ জামাই আদর করেছে রাতে আর কিছু খেতে হবে না।”“কোথায় গিয়েছিলেন?”“এখন বলবো না। ”“আচ্ছা, ঘুমান তাহলে। ”“শুন”“জ্বি”“চল ছাদে যাই।”“না।”“কেনো?”” আম্মুরা বলেছে বিয়ের রাতে বড় জামাইয়ের মুখ দেখতে নেই, এতে নাকি জামাইয়ের অমঙ্গল হয়।”” ঠিক আছে, দেখলাম না মুখ। একটু কথা তো বলতে পারি। ”“আব্বাজান নিষেধ করেছেন, দেখাসাক্ষাৎ ও করা যাবে না। ”আবির ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,“কেউ আমাকে কিছু বলতে পারছে না তাই তোকে কুসংস্কার বুঝাচ্ছে আর তুইও বোকার মতো সেসব মানতেছিস।”মেঘ নিশ্চুপ, আবির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করে আহ্লাদী কন্ঠে বলল,” চল না ছাদে।”মেঘ অত্যন্ত ধীর কন্ঠে বলল,” একটু বুঝার চেষ্টা করুন,আমি যেতে পারবো না। আপনি যেন রুমে না আসেন তারজন্য আব্বাজান ফুপ্পিকে আমার সাথে থাকতে বলেছেন। এখন আমি বের হলে খবরই আছে। আপনি ঘুমান, প্লিজ।”আবির ঢোক গিলে ভ্রু বাঁকিয়ে আবেগতাড়িত কন্ঠে বলল,“I miss you. I need you. Believe me, I badly want you, Sparrow.”আবিরের কন্ঠে আবেগপ্রবণ, অস্বাচ্ছন্দ্যকর কথাগুলো শুনে মেঘের গা শিউরে উঠছে। এ যাবৎ কালে আবিরকে এতটা ব্যাকুল হতে কখনো দেখেনি সে। মেঘ নিস্পৃহায় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঠোঁট কামড়ে বিড়বিড় করল,“আমাকে তো খুব বলতেন সহিষ্ণু হতে হবে, ধৈর্যশীল হতে হবে তাহলে আজ আপনার এই অবস্থা কেনো?এত অধৈর্য হয়ে উঠেছেন কেনো আপনি?”” আর কত ধৈর্য ধরবো? এতদিন যাবৎ অফিসিয়াল বিয়ের অপেক্ষায় ছিলাম, করলাম তো অফিসিয়াল বিয়ে। আত্মীয় স্বজন, এলাকাবাসী সবাই জানলো তো। তাহলে এখন আমার বউ আমাকে দিচ্ছে না কেনো? মানলাম কাল অনুষ্ঠান শেষে বাসর হবে। কিন্তু দেখা তো করতে দিবে! কথা তো বলতে দিবে! আমাদের মাঝে কংক্রিটের দেয়াল সৃষ্টির কি দরকার ছিল? ”“জানি না। আমার ঘুম পাচ্ছে, ঘুমাবো। আপনিও ঘুমান।”“বুকের ভেতর আগুন জ্বললে ঘুমাবো কিভাবে?”মেঘ মুচকি হেসে বলল,” এক বোতল ঠান্ডা পানি খেয়ে ঘুমিয়ে পরেন ।”মেঘ কল কেটে রুমে চলে গেছে। আবির কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে বিড়বিড় করল,” এত কাহিনী করবে জানলে কমিউনিটি সেন্টার থেকেই পালাতাম৷ ”মেঘ ভোরবেলা উঠে আবারও ঘুমিয়েছে তাই সকালে ঘুম একটু দেরিতে ভেঙেছে। আশেপাশে বন্যা, ফুপ্পি কেউই নেই। আবিরের কথা মনে পড়তেই সঙ্গে সঙ্গে ফোন হাতে নিল। মেঘ আনমনেই নেট অন করে ফেসবুকে ঢুকলো। অকস্মাৎ আবিরের পোস্ট দেখে চমকে উঠল। গতকাল বিয়ের বেশকয়েকটা ছবি আবির রাতেই তার আইডি থেকে পোস্ট করে ক্যাপশন লিখেছে,প্রিয় সহধর্মিণী,আমার অলীক কল্পনার সঙ্গী তুমি, গোধূলি লগ্নে বাড়ি ফেরার একান্ত অভিপ্রায়। তুমি আমার স্নিগ্ধ সকালের সুললিত গন্ধরাজ, পড়ন্ত বিকেলের একগুচ্ছ বাগানবিলাস। আমার শূন্য হৃদয়ের পূর্ণতা তুমি, ব্যাকুল হৃদয়ের নির্জন নির্মলা। নীল দিগন্তের উড়ন্ত মেঘেরা জানে, কত স্বপ্ন উড়িয়েছি বেনামি খামে। তোমার মায়াবী মুখের পানে চেয়ে, ভুলেছি সব যাতনা আনমনে। তোমার ঠোঁটের ঐ স্নিগ্ধ হাসি দেখে, আমার হৃদয়ের অন্তরালে নিরবচ্ছিন্ন বিক্ষোভ চলে। তুমি আমার অবসন্ন মস্তিষ্কের প্রবলতা, নব্য স্বপ্ন দেখার অদম্য স্পৃহা। তোমাকে হাসাতে চেয়ে, বহুবার কেঁদেছি আড়ালে। তুমি আমার অপেক্ষার শেষ প্রহর, ১৬ বছরের প্রতীক্ষার অমূল্য পুরস্কার। তোমাকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয় নি আমি, দিয়েছি আবিরের বউয়ের স্বীকৃতি। আমি তোমাকে ভালোবেসেছি, ভালোবাসি আর আমৃত্যু ভালোবেসে যাব।ইতি,তোমার আকাঙ্ক্ষিত স্বামীমেঘ ক্যাপশন পড়ে ৫ মিনিটের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। ৫ মিনিট পর মনোযোগ দিয়ে ছবিগুলো দেখতে লাগল। গতকাল পার্লার থেকে সেজে যাওয়ার পর থেকে নিজেকে কেমন লাগছে সেটা দেখার সুযোগ ই পায় নি, বিয়ের ছবি পর্যন্ত দেখে নি তবে কয়েক ঘন্টায় আবিরের মুখ থেকে হাজারখানেক প্রশংসা সহ আবিরের দুর্বৃত্ত কথা শুনতে হয়েছে। সুযোগ পেলেই মেঘের কানের কাছে ফিসফিস করে নিজের অব্যক্ত অনুভূতি জাহির করেছে আর মেঘ শুধু আবিরের পাগলামিই দেখে গেছে। এমনকি কবুল বলার সময় আবিরের অস্থিরতা দেখে মেঘ নির্বাক ছিল, নিষ্পলক চোখে কেবল তাকিয়েই ছিল। মিনিমাম লাজলজ্জা বিসর্জন দিয়ে আবির উচ্চশব্দে বলছিল,“পৃথিবীর যা কিছুর বিনিময়েই হোক, আমি সবকিছু দিতে রাজি হয়েই মেঘকে বউ হিসেবে কবুল করলাম।আলহামদুলিল্লাহ কবুল, কবুল কবুল।”যেখানে একবার কবুল করলাম কিংবা আলহামদুলিল্লাহ কবুল বললেই বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায় সেখানে আবির বলেই যাচ্ছিলো। আবিরের কাণ্ড দেখে কাজী সাহেবও না হেসে পারলেন না। কাজীর মুখে হাসি দেখে আবির পরপর উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,” আমাদের বিয়ে হয়েছে তো?”কাজী সাহেব উঠে যেতে যেতে বললেন,” আলহামদুলিল্লাহ, এতদিনে পরিপূর্ণ হয়েছে।”“আলহামদুলিল্লাহ। ”কাজী চলে যেতেই আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠল,“এই ভরাট মজলিসে সবাইকে সাক্ষী রেখে আমি আবির তার মেঘকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছি। মেঘ কি আবিরকে স্বামী হিসেবে কবুল করছে?”মেঘ আবিরের ঝলমলে চোখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে হেসে মোলায়েম কন্ঠে জবাব দিয়েছিল,” কবুল করলাম, আলহামদুলিল্লাহ কবুল, কবুল কবুল।”আবিরের পাগলামি সেখানেই থামেনি। গতকাল বাসায় ফেরার সময় আবির হঠাৎ ই মেঘের কানে ফিসফিস করে বলছিল,” চিরদিনের জন্য শ্বশুর বাড়িতে চলে যাচ্ছিস এবার একটু কান্না কর। মানছি একই বাড়িতে যাচ্ছিস তাই বলে কাদঁবি না?”মেঘ ভেঙচি কেটে বলেছিল,“আপনার যদি এতই শখ থাকে তাহলে আপনি কান্না করেন।”প্রতিত্তোরে আবির বলেছিল,“তুই নববধূর মতো কান্নায় ভেঙে পড়বি, নতুন জামাইদের মতো আমি তোকে সান্ত্বনা দিব। এটা আমার জীবন থেকে মিস হয়ে গেল। এক কাজ করি, চল দুজন একসঙ্গে কান্না শুরু করি।”গতকাল আবিরের আজগুবি কথা শুনে মেঘ কপাল কুঁচকালেও আজ কথাগুলো মনে করে আনমনে হেসে ফেলল। পুনরায় ছবি দেখায় মনোযোগ দিল। নিজের পড়নের মেরুন রঙের বিয়ের বেনারসি, গা ভর্তি ভারী গহনা, মাথায় ঘোমটা সহ চোখধাঁধানো আড়ম্বরপূর্ণ সাজসজ্জা দেখে মেঘ নিজেই লজ্জায় পড়ে যাচ্ছে। সেই সাথে রাজোচিত শেরওয়ানিতে আবিরকে যেন রাজপুত্রের মতো লাগছে। গতকাল আবিরের অযাচিত দুষ্টামির জন্য সামনাসামনি ঠিকমতো দেখতেই পারে নি তবে আজ ছবিগুলো খুব ভালো করে দেখছে। আয়নায় দু’জনের মুখ দেখা, মেঘের কপালে আবিরের চুমু দেয়া, একে অপরের চোখে চোখ রেখে নিগূঢ় ঘোরে বন্দি থাকা, বরণের ছবি সহ আরও ২-৩ টা ছবি আপলোড করেছে। মেঘ সবগুলো ছবি দেখা শেষে কৌতূহল বশত কমেন্টস দেখতে গেল। আবিরের বন্ধু, ছোট ভাই, বড় ভাই, রাকিব, সাকিব, তানভির, মাইশা আপু সহ সবাই নিজেদের মতো অভিনন্দন জানানোর পাশাপাশি উস্কানিমূলক মন্তব্যও করেছে। কারো কারো মন্তব্য দেখে মেঘ বেশ বিস্মিত হচ্ছে। এরমধ্যে বন্যা আসছে। মেঘের লাজুক হাসি দেখে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল,“হাসছিস কেন? ভাইয়ার পোস্ট দেখে?”মেঘ কপাল কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,” তুই কিভাবে জানিস?”” শুধু আমি না বাড়ির সবাই এখন ভাইয়ার পোস্ট নিয়ে গবেষণা করছে, নিচে গেলেই বুঝতে পারবি।”মেঘ শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,” তুই খেয়েছিস?”“না। তোকে ডাকতেই আসছিলাম, তুই ফ্রেশ হয়ে আয় একসাথে খাব।”“আচ্ছা। ”বন্যা মীমের রুমে চলে গেছে। ইদানীং মেঘ ব্যস্ত থাকায় বন্যার মীম আর আইরিনের সাথে খুব ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে। দু’জনেই তানভিরের কথা জানে তাই তানভিরের হাত থেকে বন্যাকে সবসময় প্রটেক্ট করে। ড্রয়িং রুমে সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে আবির। রান্না ঘরে রান্নার আয়োজন চলছে, ইকবাল খান ছাদ থেকে নেমে আবিরকে এভাবে বসে থাকতে দেখে কিছুটা উদ্বিগ্ন কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,“কিরে আবির, এভাবে বসে আছিস কেন?”আবির চোখ খুলে কাকামনিকে একপলক দেখে পূর্বের অবস্থায় থেকে উত্তর দিল,” আমার মনটা খুব খারাপ। ”ইকবাল খান নেমে এসে আবিরের পাশে বসতে বসতে শুধালেন,” মন খারাপ কেনো? বিয়ে তো সবাই মেনেই নিয়েছে। তাহলে মন খারাপ কেনো থাকবে?”আবির তপ্ত স্বরে বলতে শুরু করল,” মন খারাপ থাকবে না কেন? মানুষ এলাকা ছেড়ে দু-এক বছর বাহিরে থাকলেই কথা,আচরণ, চলাফেরা সব বদলে যায় সেখানে ২০-৩০ বছর ঢাকা শহরে থেকে এখনও গ্রামের কি সব আজগুবি নিয়মনীতি পালন করছে। বিয়ের পর বউ আলাদা কেনো থাকবে? এতবছর অপেক্ষা করে, নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করে, আল্লাহ র কাছে চাইতে চাইতে মেঘকে পেয়েছি, কেউ কি জানে সেটা? কিছুদিন যাবৎ এই বাড়ির প্রতিটা মানুষ আমার ইমোশন নিয়ে প্রতিনিয়ত খেলতেছে তারপরও আমি চুপ করে আছি। আমি যদি ঘুনাক্ষরেও এসব টের পেতাম তাহলে মেঘকে নিয়ে আগেই পালিয়ে যেতাম। তোমরা যা করছো তা আমি কখনো ভুলবো না৷ আমি এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।”ইকবাল খান শীতল কন্ঠে বললেন,” এভাবে বলছিস কেনো, একেক এলাকার একেক রীতি। একটু আধটু মেনে নিতেই হবে।”আবির কিছু বলার আগেই পেছন থেকে আলী আহমদ খান গুরুগম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেন,” তোমার নিন্দা জানানো শেষ হলে বাহিরে আসো, কাজ আছে।”আলী আহমদ খানের কন্ঠ শুনে আবির চমকে উঠে পেছনে তাকালো। আব্বুর রাগী রাগী চোখমুখ দেখে নিজের মুখ চেপে ধরল। আলী আহমদ খান কখন এসেছে আর ঠিক কতটুকু কথা শুনেছে এটা ভেবেই আঁতকে উঠছে আবির। ইকবাল খানের সাথে আবিরের ফ্রেন্ডলি সম্পর্ক হওয়ায় যা ইচ্ছে বলে দিতে পারে কিন্তু আব্বুর সামনে সে যথাসাধ্য ভদ্র থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু আজ এভাবে ধরা পড়ে যাবে সেটা কল্পনাও করতে পারে নি। আবির মাথা নিচু করে দাঁত দিয়ে জিভ কামড়ে বাসা থেকে বেড়িয়ে গেছে। ইকবাল খান আলী আহমদ খানের মুখের পানে চেয়ে মলিন হাসলেন আলী আহমদ খানও নিঃশব্দে হেসে বেড়িয়ে গেছেন।কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘ নিচে নামলো। মেঘকে দেখেই রাকিব অকস্মাৎ বলে উঠল,“এইযে ভাবি, আমার বন্ধুর ১৬ বছরের অব্যক্ত অনুভূতির বহিঃপ্রকাশে লেখা খোলা চিঠি পড়ে আপনার অনুভূতি কি?”মেঘ শাড়ির আঁচল টেনে মাথায় দিয়ে চিবুক নামিয়ে লাজুক হাসলো। রিয়া রাকিবকে উদ্দেশ্য করে বলল,” ভাইয়া সবেত প্রকাশ করেছে, মেঘকে অনুভব করার সময় দাও। বিয়ের ঘোরটা আগে কাটুক তারপর জিজ্ঞেস করো।”” ঠিক আছে জান। তুমি যা বলবে তাই হবে৷ ”রিয়া ঠোঁট বেঁকিয়ে রাগী স্বরে বলল,” হঠাৎ এত ভালোবাসা কোথা থেকে আসছে?”“রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের পানে তাকিয়ে কল্পনা করে আবির যেভাবে চিঠিটা লিখছিল সেটা দেখে আমারও খুব ইচ্ছে হয়েছিল তোমাকে নিয়ে একটা চিঠি লেখার। কিন্তু বিশ্বাস করো‘তুমি ফাল্গুনের সেই রক্তিম শিমুল ফুল, আমার হৃদয়ের..’এরপর আর কিছু ভেবেই পাচ্ছিলাম না। ৩০ মিনিট ভেবেছি, তানভিরকে নিয়ে গবেষণা করেছি কিন্তু লাইনটা আর সম্পূর্ণ করতে পারি নি। তারপর মনে হলো, কবিতা আর চিঠি লেখার থেকে সকাল সন্ধ্যা ‘বাবু খাইছো?’ জিজ্ঞেস করাটা খুব সহজ সমাধান। ”রিয়া বিরক্ত হয়ে বলল,” তুমি আসলেই একটা আনরোমান্টিক।”রাকিব হেসে উত্তর দিল,” বিয়ে করেছি ৬ মাস হতে চলল, এখনও আমি কত রোমান্টিক দেখেছো? তুমি বললে শিমুল ফুল না দিতে পারলেও কচুরিফুল ঠিকই দিতে পারবো। আর কি চাও? ”রিয়া রাগান্বিত কন্ঠে হুঙ্কার দিল,” তুমি আপাতত চোখের সামনে থেকে যাও।”“আজকাল ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই। নিজের বিয়ে করা বউও বলে আমি নাকি আনরোমান্টিক। ধিক্কার জানায়। ”“কাকে ধিক্কার জানাচ্ছো?”“নিজেকেই।”রিয়া সহসা হাসতে শুরু করেছে, সেই সাথে মেঘও হাসছে। আবির এসে রাকিবের কাঁধে হাত রেখে ধীর কন্ঠে জানতে চাইল,” কি হচ্ছে এখানে?”আবিরের কন্ঠ শুনে মেঘ আড়চোখে তাকালো।আবিরকে এক পলক দেখেই লজ্জায় নুইয়ে পড়েছে। গতকালও এত লজ্জা পায় নি যতটা লজ্জা আজ পাচ্ছে, অবিলম্বে ঘোমটা টেনে মুখ ঢাকার চেষ্টা করল।রাকিবের সাথে দু একটা কথা বলে, আবির মেঘের সামনে এসে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত কোমল কন্ঠে বলল,“আসসালামু আলাইকুম। ”লজ্জায় আড়ষ্ট মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,“ওয়ালাইকুম আসসালাম। ”“শুভ সকাল, বউ।”“শুভ সকাল। ”রাকিব গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,” তোর বউ এটা আমরা সবাই জানি তাই বলে সারাদিন বউ বউ করবি?”” ভাবছি, কিছুদিন দিনরাত এক করে শুধু বউ ই ডাকব।”মাহমুদা খান মালিহা খানের রুম থেকে বেড়িয়ে আসতে আসতে ভারী কন্ঠে বললেন,” আবির তোর কি কোনো কাজ নেই? সকাল সকাল মেঘকে জ্বালাচ্ছিস কেনো?”আবির কপাল কুঁচকে, ঠোঁট বেঁকিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,” আমি কোথায় জ্বালিয়েছি? এতক্ষণ কাজ করে কেবল ই আসলাম। ফুপ্পি তোমার আমার সাথে কিসের শত্রুতা বলো তো, আব্বুর সাথে তুমিও এমন আচরণ শুরু করেছো কেনো? তোমাদের থেকে তো আমার শ্বশুরই ভালো, মেয়ে খেয়েছে কি না দেখতে আমাকে জোর করে পাঠিয়েছেন। আর তোমরা?”মাহমুদা খান রাশভারি কন্ঠে বললেন,” ভাইজান খুব সহজে মেনে নিয়েছে তো তাই কিছু বুঝতে পারছিস না, ভাইজানের ধমক না শুনা পর্যন্ত শান্তি পাচ্ছিস না। তাই না? তোর আচরণে কোনো কারণে ভাইজান যদি রেগে যান, বাড়ি ভর্তি মেহমানের সামনে চিৎকার চেঁচামিচি করেন বিষয়টা কি ভালো লাগবে? তার থেকে ওনি শান্ত আছেন তুইও একটু শান্ত থাক। ”“ঠিক আছে, থাকলাম শান্ত।”আবির মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে মেঘের দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত কন্ঠে বলল,” বউ তুমি খেয়ে নেও হ্যাঁ, তোমার ফুফু শ্বাশুড়িটা ভালো না। একদম মহিলা হি*টলা*রের মতো আচরণ করছেন। আমি এখন পালায়। ”আবির এক দৌড়ে বাসা থেকে বেড়িয়ে গেছে, রাকিবও হাসতে হাসতে চলে গেছে। মাহমুদা খান হেসে বললেন,” মেঘ, খেতে বস। আমি ওদের ডেকে নিয়ে আসি।”একটু পরেই সবাই খেতে নেমেছে। মেঘকে দেখেই জান্নাত বলে উঠল,“তুমি আমার স্নিগ্ধ সকালের সুললিত গন্ধরাজ, পড়ন্ত বিকেলের একগুচ্ছ বাগানবিলাস।”পাশ থেকে আইরিন বলল,” ভাবি এইটা না, আমার ঐ লাইনটা বেশি ভালো লেগেছে।নীল দিগন্তের উড়ন্ত মেঘেরা জানে, কত স্বপ্ন উড়িয়েছি বেনামি খামে।”রিয়া মৃদুহেসে বলল,” তোমরা শুধু শুধু মেঘকে জ্বালিয়ো না। মেঘ আমি তোমাকে ভালোবেসেছি, ভালোবাসি আর আমৃত্যু ভালোবেসে যাব। তুমি একদম মন খারাপ করবে না কেমন!”ওদের দুষ্টামিতে মেঘ চোখ তুলে তাকাতেই পারছে না। এরমধ্যে মালা এসে একটা চেয়ার টেনে বসলো। আইরিন মজার ছলে জিজ্ঞেস করল,” মালা আপু, আপনার কোন ডায়লগ টা ভালো লেগেছে?”“কিসের ডায়লগ?”” আবির ভাইয়া মেঘ ভাবিকে নিয়ে ফেসবুকে খোলা চিঠি লিখেছে। আপনি দেখেন নি?”মালা আইরিনকে দেখে পরপর মেঘের লজ্জামাখা আদলের পানে তাকালো। মনে মনে বিড়বিড় করল,“আমাকে ব্লক করে রাখলে কিভাবে দেখবো।”আইরিন আবার জিজ্ঞেস করল,“দেখেন কি?”মালা বিরক্ত হয়ে বলল,” খেয়াল করি নি।”আবারও মনে মনে বিড়বিড় করল,” এসব আজাইরা ভালোবাসা দেখলেই শরীর টা জ্বলে। ”বউভাত উপলক্ষে মেঘ আজ অফ হোয়াইট রঙের মধ্যে গোল্ডেন স্টোনের একটা গর্জিয়াছ লেহেঙ্গা পড়েছে। আবির মেঘের সাথে ম্যাচিং করে অফ হোয়াইট রঙের স্যুট পড়েছে। বাকিরাও যে যার মতো সেজেছে। মালা আজ হুট করে একটা গর্জিয়াছ শাড়ি পড়েছে। মালার সাজ দেখে সাকিব মেকি স্বরে বলল,“ছ্যাঁকা খেয়ে মানুষকে ঘরের দরজা বন্ধ করে সপ্তাহব্যাপী বা মাসব্যাপী কাঁদতে দেখেছি অথচ তুই তা না করে নাচতে নাচতে বিয়ে খেতে চলে আসছিস। তোর কি মিনিমাম লজ্জা নেই?”“লাজ লজ্জা ধুয়ে কি শরবত খাবো নাকি? আর একটা কথা শুনে রাখ, আমি চাইলেই আবির ভাইয়াকে বিয়ে করতে পারতাম কিন্তু আমি মেঘের মতো এত উন্মাদ না যে আমার আবির ভাইকেই লাগবে। ”সাকিব ফিক করে হেসে বলল,“কথায় আছে, পাগলের সুখ মনে মনে। আর কি কি বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছিস জানাইস আমাকে। প্রয়োজনে আমি আরও কিছু এড করে দিব। আর রইল বাকি মেঘবতীর পাগলামির কথা, আবির ভাইয়া দেশে আসছেই মেঘকে পাগল করতে। ১৪ বছর তো একায় পাগলামি করে গেল। ভাইয়ার কি ইচ্ছে হয়না মেঘবতী তার জন্য একটু পাগলামি করবে, বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকবে, তাকে দেখার জন্য বা একটু কথা বলার জন্য উতলা হয়ে থাকবে, তার দিকে কেউ তাকালে অগ্নিকন্যার রূপ নিবে, মূল কথা ভাইয়াকে পাগলের মতো ভালোবাসবে। মেঘবতীর মনে প্রবল প্রমত্ততা জাগাতে ভাইয়া ই সব করেছে। তাই তোর চোখে মেঘবতী উন্মাদ হলে আবির ভাইয়া তার গুরু।”মালা রাগে কটমট করে চলে যেতে নিলে অলক্ষিতভাবে লিমনের সাথে ধাক্কা খেল। মালা মাথায় হাত দিয়ে রাগান্বিত কন্ঠে হুঙ্কার দিল,” আপনি কি চোখে দেখেন না?”লিমন মালার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল” মাঝে মাঝে একটু কম ই দেখি। ”মালা রাগে ফোঁস ফোঁস করে চলে গেছে। মাইশা আপু আর ওনার হাসবেন্ড আজ দুপুরেই আসছেন। আবির কল দিতে দিতে অনেক কষ্টে আপুকে রাজি করিয়েছে। মেঘ আপুকে দেখেই আহ্লাদী কন্ঠে বলল,” আপু মনে আছে তো, বাবুকে কিন্তু সর্বপ্রথম আমার কোলে দিতে হবে।”“হ্যাঁ গো মনে আছে। দোয়া করো, বাবু সুস্থভাবে হলে তোমার কোলেই প্রথমে দিব।”মেঘ এক গাল হেসে বলল,“ঠিক আছে।”আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে কিছু ভেবে আনমনে হাসলো। মেঘ বিষয়টা খেয়াল করে জিজ্ঞেস করল,“হাসছেন কেন?”” এমনিতেই। ”“বলুন।”“রাতে বলব।”“না, এখনই বলুন।”“I love you. I want to hug you. I wanna kiss you.”মেঘ সঙ্গে সঙ্গে আবিরের হাতে চিমটি কেটে ব্যস্ত কন্ঠে বলল,” চুপ করুন।”” এখন তো চুপ করতেই বলবি। অফিসিয়াল বিয়ের ২৪ ঘন্টা পেরিয়ে গেছে অথচ এখনও অফিসিয়াল আলিঙ্গনটায় করতে পারলাম না।”মেঘ নিজের কপাল চাপড়ে বিড়বিড় করল,” এত নির্লজ্জ কবে হলেন আপনি?”” তোকে বিয়ে করার পর । ”সারাদিনের অনুষ্ঠান শেষে বিকেলের দিকে অনেক আত্মীয় স্বজনই চলে গেছেন। এশা পর্যন্ত সবাই মোটামুটি ব্যস্ত ছিল। এশার নামাজ পড়ে মোজাম্মেল খান আর আলী আহমদ খান একসাথে চা খেতে বসেছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে আবির আর ইকবাল খানও এসেছেন। তানভির, সাকিব,রাকিব, আরিফ মিলে বাসরঘর সাজাচ্ছে। গতকাল তানভির বোনের পক্ষে থাকলেও আজ সে আবিরের পক্ষে। আবির নামাজ থেকে এসেই নিজের রুমে চলে গেছে। ভুল করেও কেউ যেন লাল গোলাপ না লাগায় তারজন্যই মূলত দেখতে গেছে। ফুল কিনতে যাওয়ার আগেই তানভিরদের বার বার বলে দিয়েছে ভুলেও যেন লাল গোলাপ না আনে। মিনহাজ মেঘকে লাল গোলাপ দেয়ার মতো বিশাল অপরাধের শাস্তিস্বরূপ আবির সেই রাগ মিনহাজের উপর না দেখিয়ে গোলাপের উপর দেখাচ্ছে। বিয়ে উপলক্ষে আবিরের রুম সম্পূর্ণ পরিষ্কার করা হয়েছে। আবিরের শৈশব-কৈশোরের যত স্মৃতি ছিল, সব সরিয়ে একদম ফাঁকা করে দিয়েছে৷ বিয়ের ঝামেলা মিটলে প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র এনে রুম সাজানো হবে। গায়ে হলুদের দিন থেকে আবির আব্বু চাচ্চুর মুখোমুখি বসে নি। অবশেষে আজ আবির আব্বুর চাচ্চুর পাশে গিয়ে বসেছে।মোজাম্মেল খান চিন্তিত স্বরে বললেন,” কিছু বলবে?”“জ্বি।”“বলো।”” আপনাদের পরিকল্পনার বাহিরে আমি যে কাজগুলো করতে বলেছিলাম সেগুলোর খরচ জানতে চাচ্ছিলাম। আমি পেমেন্ট দিয়ে দিচ্ছি সম্ভব হলে রাতে বা সকালের মধ্যে পরিশোধ করে দিবেন। ”আলী আহমদ খান ঠান্ডা কন্ঠে বললেন,” তোমার দিতে হবে না।”” আব্বু, আমি আগেই বলে রেখেছিলাম। অন্ততপক্ষে আমার পরিকল্পনাগুলোর টোটাল পেমেন্ট আমি করব।”মোজাম্মেল খান আস্তে করে বললেন,” আচ্ছা তুমিই করো। কিন্তু এত তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই। ইমারজেন্সি সবার পেমেন্ট করে ফেলেছি। আর যারা নেয় নি তাদের কাল পরশুর মধ্যে দিয়ে দিব।”“আমি হিসাবটা দেখতে চাচ্ছিলাম, চাচ্চু।”” আমার কি কপাল, মেয়ের জামাই কত সুন্দর করে চাচ্চু বলে ডাকছে।”আবির মৃদু হেসে মেকি স্বরে বলল,“মেঘের মতো আমিও কি আব্বাজান বলে ডাকবো?”আলী আহমদ খান, মোজাম্মেল খান এবং ইকবাল খান তিনজনেই একসঙ্গে হেসে উঠলেন। প্রায় এক ঘন্টা যাবৎ চারজন মিলে হিসাব করছে। এদিকে জান্নাত আর রিয়া মিলে মেঘকে সাজাচ্ছে আর বাসরের নিয়মকানুন শিখিয়ে দিচ্ছে। মেঘের মনে ভয়, লজ্জা, আতঙ্কের সাথে সাথে এক অজানা ভালোলাগাও কাজ করছে। রাত ১০ টার পর পর ওদের সাজানো শেষ হয়েছে। আবিরের নিষেধাজ্ঞা থাকায় লাল গোলাপ ছুঁয়েও দেখেনি। গাদা, বেলি, কাঠগোলাপ, ৩-৪ রঙের জারবেরা, জিনিয়া সহ যে যে ফুল পেয়েছে সব দিয়েই সাজিয়েছে। সাজানো শেষেই মেঘকে নিয়ে বিছানার মাঝ বরাবর বসিয়েছে। মেঘের সামনে ফুলের পাঁপড়ি দিয়ে একটা লাভ এঁকে তাতে A আর M লিখেছে। তারপর শুরু হয়েছে দল ভাগাভাগি, কয়েকজন আবিরের পক্ষে থাকলেও বেশিরভাগই মেঘের পক্ষে। তানভির আজ আবিরের পক্ষে শুনে বন্যা রাগী রাগী মুখ করে বলল,” আপনি দু’মুখো সাপের মতো আচরণ করছেন কেনো?”তানভির হেসে বলল,” বোনের বিয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই বোন শ্বশুরবাড়িতে চলে যায়। ভাগ্য ভালো আমার বোন আমার চোখের সামনে আছে। বনুর শ্বশুর বাড়ি অন্য কোথাও হলে আজকের বাসরঘর সাজানো অসম্ভব ছিল। তাছাড়া বড় ভাই হয়ে ছোট বোনের বাসর আটকানো টা তেমন শোভা পায় না।”বন্যা আর কিছু বলে নি। এদিকে আবিরদের হিসাব নিকাশের এক পর্যায়ে মোজাম্মেল খান বললেন,” অনেক তো হিসেব দেখলে এখন বরং যাও তুমি। ”আবির ঘাড় ঘুরিয়ে মালিহা খানকে উদ্দেশ্য করে বলল,” আম্মু, তোমাদের যা যা নিয়মকানুন আছে তাড়াতাড়ি শেষ করো। আমার ঘুম পাচ্ছে। ”মোজাম্মেল খান অকস্মাৎ কাশতে শুরু করলেন।ইকবাল খান আবিরের হাত চেপে বিড়বিড় করে বলল,“বাবা-চাচারা আছে, কথাবার্তা একটু সাবধানে বল।”আবির ভ্রু কুঁচকে মনে মনে বিড়বিড় করল,” গত দু’রাতে একফোঁটাও ঘুমাতে পারি নি। এখন বিয়ে করেছি বলে কি ঘুম পেলেও বলা যাবে না?”আবির নিশ্চুপ দেখে মোজাম্মেল খান স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,” বাকিগুলো সকালে দেখে নিও।”আবির তপ্ত স্বরে বলল,“আর কিছু দেখতে হবে না। যা লাগবে তানভিরকে বললেই হবে। ”মাহমুদা খান এসে মৃদুস্বরে বললেন,” আবির, তুই এখন রুমে যেতে পারিস।”আবির হঠাৎ ই কেমন যেন লজ্জা পাচ্ছে। লজ্জায় উঠে যেতে পারছে না। আলী আহমদ খান অকস্মাৎ বকে উঠলেন,” এত লজ্জা পেতে হবে না, যাও। ”আবির মাথা নিচু করে উঠে রুমের দিকে চলে গেছে। রুমের সামনে যথারীতি দু’দল মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তানভির আবিরের দলের হওয়া স্বত্তেও ওরা জোরপূর্বক তানভিরকে রুমের ভেতরে রেখেছে। আবির দরজা থেকে উঁকি দিয়ে বিছানাটা দেখে নিল। মাথায় ঘোমটা দিয়ে নববধূ বিছানায় বসে আছে। আবির বাকিদের উদ্দেশ্যে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,“কি চাই?”“তেমন কিছু না। ”রাকিব আবিরের পাশ থেকে বলে উঠল,” আজ যত ইচ্ছে দে আমি বারণ করব না। কারণ, বাসর আমিও সাজিয়েছি তাই ভাগ আমিও পাবো। ”আবির রাকিবের দিকে তাকিয়ে হাসলো। আইরিন অকস্মাৎ বলে উঠল,” ভাইয়া তাড়াতাড়ি টাকা দিয়ে আমাদের বিদায় করো।”আবির শান্ত কন্ঠে বলল,“তোরা কত চাস সিদ্ধান্ত নিয়ে তানভিরের কানে কানে বল।”আইরিন, জান্নাত, রিয়া, মীম, বন্যা ফিসফিস করে কিছুক্ষণ ভেবে চিন্তে তানভিরকে জানালো। আবির সঙ্গে সঙ্গে বলল,” সিদ্ধান্ত ফাইনাল?”“হ্যাঁ।”“এখন সামনে থেকে সরো।”” কেনো সরবো? আগে টাকা দিবে তারপর যাব।”আবির তপ্ত স্বরে বলল,“আমি যেতে বলি নি আপু, সরতে বলেছি। বউ না দেখে আমি তোমাদের কিছু দিতে পারছি না ।”“বউ দেখে ফেললে তো শেষ ই।”“তোমরা যেমন আমাকে বিশ্বাস করতে পারছো না তেমন আমিও পারছি না। আমার বউ এর জায়গায় অন্য কাউকে যে বসিয়ে রাখো নি তার কি গ্যারেন্টি আছে? তোমাদের সহজ সমাধান দিয়েছি, তোমাদের এমাউন্ট আমি না জানলেও তানভির জানে। আমার বউ ঠিকঠাক থাকলে তোমরা তোমাদের প্রাপ্য পেয়ে যাবে। আগে বউ দেখব তারপর টাকা দিব। এখন তোমরা ভেবে দেখো। ”“ঠকাবে না তো?”” তোমরা আমাকে না ঠকালে আমিও তোমাদের ঠকাবো না। ”“ঠিক আছে। ”ওরা এক প্রকার বাধ্য হয়েই আবিরকে রুমে ঢুকতে দিয়েছে। আবির রুমে ঢুকেই মেঘকে উদ্দেশ্য করে সালাম দিলো। মেঘ কাঁপা কাঁপা গলায় সালামের উত্তর দিয়েছে। এতক্ষণ যাবৎ মেঘ শান্ত থাকলেও এখন আর শান্ত থাকতে পারছে না, আবির যত কাছাকাছি আসছে মেঘের শরীরের প্রতিটা শিরা-উপশিরার রক্ত সঞ্চালন তত বেড়ে যাচ্ছে, ঢোক গিলে বার বার নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। আবির কিছুটা ঝুঁকে খুব যত্নসহকারে আস্তেধীরে মেঘের ঘোমটা উঠালো, লজ্জায় রাঙা মেঘের নামানো চিবুক দেখে কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকালো। আবির সহসা দু’আঙুলে মেঘের চিবুক উঠালো। আবিরের শক্ত হাতের কোমল স্পর্শে মেঘের শীর্ণ অধর থরথর করে কাঁপছে, হৃদয়ের তোলপাড়ে নিঃশ্বাস এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে, ঘন ঘন পল্লব ঝাপ্টে নিভু নিভু চোখে আবিরের দিকে তাকাতেই আবির সহসা বুকের বা পাশে হাত রেখে নেশাক্ত কন্ঠে বলল,“হায়! মাশাআল্লাহ। ”সঙ্গে সঙ্গে বিছানার উপর লাভ লেখা অংশে ধপ করে পড়ে গেছে। মীম, আদি,আইরিন কিছুটা আতঙ্কিত হলেও বাকিরা আবিরের কাণ্ড দেখে মুচকি মুচকি হাসছে। মেঘ কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকে আবিরের মুখের দিকে তাকালো। আবির আচমকা কাত হয়ে মেঘের দিকে ঘুরে হাতের উপর মাথা রেখে মৃদুগামী কন্ঠে বলল,“অবশেষে, আবিরের একান্ত চাঁদআবিরের রুমে দীপ্তি ছড়াচ্ছে।”মেঘ লজ্জায় চোখ সরিয়ে করে ফেলেছে। আবির পকেটে হাত দিয়ে যতগুলো ৫০০ আর ১০০০ টাকার নোট পেয়েছে সব মেঘের হাতে মুষ্টিবদ্ধ করে দিয়েছে। রিয়া হাসিমুখে বলল,” ভাইয়া আপনার চাঁদকে সারাজীবনের জন্য আপনার রুমে রেখে গেলাম। আপাতত আমাদের দিক টা একটু ভাবুন।”আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,” ওরা কিছু চাচ্ছে, দিব?”মেঘ কিছুই বলছে না, চুপচাপ বসে নিজের হৃৎস্পন্দন গুনছে। আইরিন সঙ্গে সঙ্গে বলল,” এটা কিন্তু কথা ছিল না। তুমি বলেছো ভাবিকে দেখেই দিয়ে দিবে। ”আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে থেকেই ঠান্ডা কন্ঠে বলে উঠল,” আমি আমার বউয়ের অনুমতি ব্যতীত কিছু দিতে পারছি না, সরি। ”সবাই মেঘকে রিকুয়েষ্ট করছে কিন্তু মেঘ মুখ ফুটে কিছু বলতেই পারছে না। আবির মৃদু হেসে পুনরায় প্রশ্ন করল,” কি হলো? দিয়ে দিব?”মেঘ ঘাড় কাত করে সম্মতি জানালো। আবির সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকে উঠে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,” তোমাদের এমাউন্ট কত ছিল আমি জানি না আর জানতেও চাই না। আমার বউ যেহেতু সম্মতি দিয়েছে তাই তোমরা যা চেয়েছো তার ডাবল পাবে। ”তানভিরের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল,” তানভির, ওদের এমাউন্ট বুঝিয়ে দিবি।”“জ্বি ভাইয়া।”জান্নাত, রিয়া একসঙ্গে বলে উঠল,“ইসস, এত বড় মিস্টেক কিভাবে করলাম। আগে জানলে আরও বেশি চাইতাম। ”আইরিন বলল,” আমরা এখন নতুন করে এমাউন্ট চাইবো।”আবির মুচকি হেসে বলল,” সুযোগ একবার ই দিয়েছি সেই সুযোগ আর পাবে না। এখন সবাই যাও এখান থেকে।”রাকিব আবিরের কানে কানে ফিসফিস করে কিছু বলেই দৌড়ে বেড়িয়ে গেছে। বাকিরাও যে যার মতো চলে গেছে। বন্যা মেঘের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বেড়িয়েছে। তানভির আগেই বেড়িয়ে গিয়েছিল, আবির দরজা বন্ধ করতে যাবে অকস্মাৎ তানভির হাজির হলো। আবির শক্ত কন্ঠে বলল,“আবার কি?”তানভির মেঘকে এক পলক দেখে নিল। মেঘ মাথা নিচু করে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। তানভির গলা খাঁকারি দিয়ে অত্যন্ত কোমল কন্ঠে বলল,” ভাইয়া, আমার বোনটা কিন্তু এখনও ছোট। তোমার অনাবশ্যক ভালোবাসাকে একটু কন্ট্রোলে রেখো, প্লিজ।”
গল্পঃ আমৃত্যু ভালোবাসি তোকেলেখিকাঃ সালমা চৌধুরী..................................................................................................................................................................আবির ভ্রু গুটিয়ে সরাসরি তানভিরের চোখের দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বিড়বিড় করল,” তুই না আমার সম্বন্ধী?”তানভির নিঃশব্দে হেসে অত্যন্ত ধীর কন্ঠে বলল,“তুমি না আমার ভাই? তাছাড়া পুরো পৃথিবী জানে তুমি আমার বন্ধু টাইপের ভাই তাই আমার সবদিক থেকে পারমিশন আছে।”আবির দাঁতে দাঁত চেপে বলল,” জ্বি ভাই, বুঝতে পেরেছি। বলছিলাম কি ভাই আপনি পারমিশন দিলে আমি আপনার বোনের সাথে একান্তে কিছুটা সময় কাটাতাম। পারমিশন দিবেন, ভাই?”“জ্বি ভাই, আপনার জন্যই এত আয়োজন। বেস্ট অফ লাক, বাই। ”তানভির চলে যাচ্ছে, আবির মুচকি হেসে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। দরজা বন্ধের শব্দে মেঘের শরীর ঝাঁকি দিয়ে উঠেছে, মাথা নিচু করে জোরে নিঃশ্বাস ছাড়লো। আবির আড়চোখে মেঘের দিকে তাকালো, ঠোঁটে লেগে আছে দুষ্টু হাসি। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল মেঘের কাছে, আবিরের তৃপ্ত দুচোখ চকচক করছে। উৎকণ্ঠায় মেঘের চিবুক নেমে গলায় ঠেকেছে, ক্ষীণ বক্ষের তীব্র কম্পনে শরীর ঘেমে একাকার অবস্থা। আবির আগপাছ না ভেবেই আচমকা মেঘের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পরেছে। অপ্রত্যাশিত ঘটনায় মেঘ চমকে উঠে, বুকের ভেতর পর্যন্ত স্তব্ধ হয়ে গেছে। মেঘ সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে, হাত-পা সহ সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। আবির অকস্মাৎ জামা-কাপড়ের উপর দিয়ে মেঘকে জড়িয়ে ধরে পেটে মুখ গুঁজল। আবিরের অবাঞ্ছিত স্পর্শে মেঘের জোড়াল বক্ষস্পন্দন আরও বেশি জোড়ালো হতে শুরু করেছে, নিরবে ঢোক গিলে এলোমেলো নিঃশ্বাস ছাড়ছে। আবির ভয়ঙ্কর আবেশে আবদ্ধ, সুদীর্ঘ অবকাশের অস্ফুট প্রণয়ের অফিসিয়াল অনুমোদন পেয়েছে আজ। মেঘের শরীর থেকে আসা বিমুগ্ধকারী ঘ্রাণটা আবিরের নাসারন্ধ্রের সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ে তোলপাড় চালাচ্ছে, আবির এক মনে সেই ঘ্রাণটা উপলব্ধি করছে। মেঘের অভিমানে নাক ফুলানো, গায়ের তীব্র গন্ধ, দরদী স্পর্শ, আহ্লাদী কন্ঠের আবদার পূরণের পরিপূর্ণ অধিকার পেয়েছে আজ। এই মেঘ একান্ত আবিরের, পৃথিবীর আর কারো সাধ্য নেই যে আবিরের কাছ থেকে তার মেঘকে দূরে সরাবে। আজ ছোট্ট মেঘের আদুরে কন্ঠে বলা কথাগুলো আবিরের খুব মনে পড়ছে, অকস্মাৎ পেট থেকে মুখ সরিয়ে ঘাড় কিছুটা ঘুরিয়ে মেঘের অভিমুখে তাকালো। মেঘের বন্ধ চোখের পাতা আর কম্পিত অধর দেখে আবির আনমনে হেসে অত্যন্ত মোলায়েম কন্ঠে বলল,” তুমি আমার বহু প্রতীক্ষিত একান্ত অভিলাষ,হৃদয়ের মনিকোঠায় সঙ্গোপনে রাখার নির্মম প্রয়াস। আমার অবিচ্ছেদ্য প্রণয়ের উত্তাপ তুমি,সকাল- সন্ধ্যা সর্বনাশের কারণটাও শুধু তুমি।”মেঘের সংকোচ কোনোভাবেই কাটছে না, চোখ খুলে আবিরের দিকে তাকাতেও পারছে না। আবির মুচকি হেসে ডাকল,“ওগো অপরূপা,চেয়ে দেখো না মনোরমা। ”মেঘ কিংকর্তব্যবিমুঢ়, আবিরের একের পর এক ভাবপ্রবণ কথা শুনে মেঘের অস্থিরতা বেড়েই চলেছে। বুকের ভেতরে চলমান ইতস্ততা কাটিয়ে চোখ পিটপিট করে তাকাল । আবিরের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই আবির অকস্মাৎ স্ব শব্দে হেসে উঠল। আবিরের প্রাণোচ্ছল হাসি দেখে মেঘ না হেসে পারল না। আবির হাসি থামিয়ে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে তপ্ত স্বরে শুধালো,” আমাকে পেয়ে খুশি তো?”মেঘ মাথা দুলিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,” আলহামদুলিল্লাহ, অনেক খুশি। আপনি?”আবির আবারও মৃদু হাসলো। মেঘের কোল থেকে উঠে মুখোমুখি বসল। লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে মেঘের হাতটা শক্ত করে ধরে কোমল কন্ঠে বলতে শুরু করল,” আলহামদুলিল্লাহ আজ আমি খুব খুশি। কারণ আমার স্পেরোকে দেয়া কথা আজ পরিপূর্ণভাবে রাখতে পেরেছি। ছোট্ট স্পেরোর সেই আহ্লাদী কন্ঠে বলা কথাটা, “আমাকে ছেড়ে যেতে পারবে না” স্পেরো ভুলে গেলেও আমি ভুলতে পারি নি। গত ১৬ টা বছর আমি শুধু এই একটা কথার জোরেই সব বিপত্তিতে টিকে ছিলাম। আজ আমার স্পেরোকে আবারও বলতে চাই, আমি ছেড়ে যায় নি কোথাও যায় নি। তোমার আবির তোমারই আছে। তুমি সেদিন শুধু বলেছিলে, “ছেড়ে যেও না” অথচ আমি বুঝেছিলাম “তোমাকে ছেড়ে বাঁচতে পারবো না”। শেষ বিকেলে পাখিদের বাড়ি ফেরার তাড়া দেখে তুমি আবেগী কন্ঠে বলেছিলে, ” ওদের মতো আমারও যদি আলাদা একটা বাড়ি থাকতো৷” আর আমি ভেবেছিলাম, “যেকোনো মূল্যেই হোক তোমাকে তোমার স্বপ্নের বাড়ি উপহার দিব” একবার খেলতে গিয়ে পায়ে ব্যথা পেয়েছিলাম বলে তুমি শীতল কন্ঠে বলেছিলে, “খেলতে না গেলে তো ব্যথা পেতে না” আমি মনে মনে বলেছিলাম, ” আজকের পর খেলতে যাব না” । জ্বরের ঘোরে আমার হাতটা আঁকড়ে ধরে তুমি বলেছিলে, “আমার কাছে থাকো” “আমিও থেকে গেলাম”। কোনো একদিন কোনোকারণে বাসায় আমাকে বকা দিচ্ছিলো দেখে তুমি সবার সামনে আমার হাতটা শক্ত করে ধরে বলেছিলে, ” আবির ভাইয়া শুধু আমার তোমরা কেউ কিছু বলতে পারবে না।”“আমি আবির সেদিনই তোমার হয়ে গিয়েছিলাম”নিজের সাথে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম বাঁচলে তোমার সাথেই বাঁচবো। ”মেঘ অবিশ্বাস্য চোখে আবিরের অভিমুখে চেয়ে আছে, অতর্কিতেই বেড়েছে বুকের ভেতরের ধুকপুক শব্দ। আবিরের কথাগুলো শুনে মেঘের চক্ষুদ্বয় কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে চাইছে। ফর্সা,লাজুক আদল মুহুর্তেই পরিবর্তন হয়ে গেছে, নাকের ডগায় মুক্তোর মতো বিন্দু বিন্দু ঘাম চিকচিক করছে। মেঘের উদ্বেজিত মনোভাব চোখে মুখে ফুটে উঠছে। যেই আবিরের প্রণয়ে আসক্ত মেঘ, সেই আবির মেঘের কাছেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল এতগুলো বছর। এটা ভেবেই মেঘের মস্তিষ্কের নিউরনে অনুরণন শুরু হয়েছে। মেঘ অসহায় মুখ করে আবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,” আমি আপনাকে এতকিছু বলেছিলাম?”আবির মেঘের দু’হাত নিজের দু গালে রেখে নিঃশ্বাস টেনে বলল,“হুমমমমমমম”“আমার মনে নেই কেনো?”” কারণ তখন তুমি অনেক ছোট ছিলে। ”” আপনি কখনো বলেন নি কেনো?”” ভালোবাসা মুখে বলে হয় না পাগলি, তোমাকে নিজ থেকে অনুভব করতে হতো। আর আমি সেই অপেক্ষাতেই ছিলাম। ”মেঘ কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,” আপনি আমাকে তুমি করে বলছেন কেনো?”” শুনতে খারাপ লাগছে?”“কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। আপনার মুখে তুই টায় মানায়। ”” অভ্যাস করো, এখন থেকে তুমিটায় বেশি শুনতে হবে।”“কেনো?”আবির মৃদুস্বরে বলল,” আমার সম্বন্ধী আমাকে ভয়ঙ্করভাবে ওয়ার্নিং দিয়েছে, বিয়ের পর তোমার সাথে তুই তুকারি করলে আমার নামে মা*ম*লা দিবে। তানভিরের এসব তুই তুকারি একদম পছন্দ না, ওর সাথে কথা বললে সচরাচর তোমাকে তুই বলে সম্বোধন করি না তারপরও ভুলে যদি বলে ফেলি তখন দেখা যায় রাগে সারাদিন আমার সাথে কথায় বলে না। গতকাল রাতে আমাকে লাস্টবারের মতো ওয়ার্ন করেছে যেন কোনোভাবেই তুই না বলি। পার্সোনালি ঘরে দরজা বন্ধ করে তুই বললেও আমার সম্বন্ধী,বাবা মা, শ্বশুর- শ্বাশুড়ি কিংবা কোনো আত্মীয়ের সামনে কোনোভাবেই তুই বলতে পারবো না। ”মেঘ অভিনিবিষ্টের ন্যায় চেয়ে থেকে শান্ত কন্ঠে শুধালো,” আপনি ভাইয়াকে ভয় পান?”“না। তোমাকে ভয় পায়। ”“মানে?”আবির মেঘের হাত গাল থেকে নামিয়ে বুকের উপর রেখে বলতে শুরু করল,” তোমাকে হারানোর ভয়ে আমার এইযে এইখানটা বারংবার কেঁপে উঠে। আবিরকে ধ্বংসের একমাত্র অস্ত্রই মেঘ। তানভির সহ আমার কাছের মানুষজন খুব ভালোভাবে জানে আমার জীবনে তোমার অস্তিত্ব ঠিক কতোখানি জুড়ে। আমাকে কোনোকিছুতে রাজি করাতে ব্যর্থ হলেই ইচ্ছেকৃত তোমার নাম নেয়। কারণ তারা জানে, তুমি আমার একমাত্র দূর্বলতা। এইযে তুমি কতশত কুসংস্কার মানো, কিছু হবে না জেনেও আবেগে নাচো। আমিও ঠিক তেমন, তোমার নামে কিছু শুনলে বুঝে না বুঝে রিয়েক্ট করি, নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। অন্ততপক্ষে তোমাকে নিয়ে তানভিরের সাথে আমি কোনোরকম অসদ্ভাবে জড়াতে চাই না তাই ও যা বলেছে আমি মেনে নিয়েছি।”আবিরের উৎকণ্ঠা দেখে মেঘ প্রতিনিয়ত আশ্চর্যের চূড়ায় পৌছে যাচ্ছে। মেঘ নির্বাক চোখে তাকিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে আবিরকে দেখছে। আবির কয়েক মুহুর্ত মেঘের মায়াবী আদলে চেয়ে থেকে আনমনে হেসে বলল,” ম্যাম, এভাবে তাকিয়ে আমাকে আগেভাগেই দূর্বল করে দিবেন না। আপনার সাথে আমার অনেক কথা আছে। ”আবিরের কথায় মেঘের ভাবনার সুতো ছিঁড়েছে, কপালে ভাঁজ ফেলে মৃদুস্বরে বলল,” কি কথা?”“আগে নামাজ পড়ে রবের কাছে শুকরিয়া আদায় করি তারপর বলবো। যাও, ফ্রেশ হয়ে ওজু করে আসো।”আবির মেঘের হাত ছেড়ে বিছানা থেকে নামছে। এত কথোপকথনের ভিড়ে রিয়া আর জান্নাতের শিখিয়ে দেয়া নিয়মকানুনের কথা মেঘ ভুলেই গিয়েছিল। মেঘ ঝটপট বিছানা থেকে নেমে আবিরের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে নিল কিন্তু সালাম করার আগেই আবির মেঘের দুই বাহু ধরে উঠিয়ে আলতোভাবে বুকে জড়িয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,“তোমার অবস্থান আমার পায়ে নয় হৃদয়ে। আজকের পর কোনোদিন পায়ে হাত দিয়ে সালাম করার চেষ্টাও করবে না। মনে থাকবে?”“জ্বি।”আবির মেঘকে ছেড়ে ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে ব্যালকনির দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কিছু একটা করছে। এদিকে মেঘ মনে মনে হাবিজাবি ভাবছে আর ব্যস্ত হাতে গহনা খুলছে। গলার একটা গহনাকে খুলতে গিয়ে চুলে টান পড়তেই মেঘ ব্যথায় ‘উফফ’ করে উঠেছে। আবির সহসা ফোন টেবিলের উপর রেখে মেঘের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল,” কি হয়েছে?”” চুলে টান লাগছে। ”” হাত সরাও, আমি দেখছি। ”মেঘ ভ্রু কুঁচকালো, তবে নিষেধ করল না। আবির খুব মনোযোগ দিয়ে মেঘের চুল সরিয়ে গহনা খুলে দিয়েছে। মাথায় লাগানো ক্লিপগুলো খুলতে খুলতে কর্কশ কন্ঠে বিড়বিড় করল,” আগেই বলেছি রাতে এত সাজগোছ করতে হবে না তারপরও কেউ কথা শুনে না। ”আবিরের ঠান্ডা কন্ঠের অভিযোগে সম্বিত ফিরল মেঘের। চোখ ঘুরিয়ে আবিরকে এক পলক দেখে হালকা করে কেশে শীতল কন্ঠে ডাকল,” আবির ভাই..”অকস্মাৎ আবিরের সুপ্ত ক্রোধ চোখে ভেসে উঠেছে, মেঘের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙাতেই মেঘ দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল,” মজা করেছি। ”আবির প্রতিত্তোরে কিছুই বলল না। মেঘ ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসতেই আবির চুপচাপ ওয়াশরুমে চলে গেছে। যথারীতি দু’জন একসঙ্গে দু রাকাত নফল নামাজ পড়ে নিয়েছে। নামাজ শেষ করে আবির মেঘের কপালে দীর্ঘ চুমু খেয়ে মেঘকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। আবিরের সারাদিনের সব দুষ্টামি, খুনসুটি হঠাৎ ই পরিবর্তন হয়ে গেছে। কেমন যেন নিশ্চুপ হয়ে গেছে। আবিরের বুকের উপর মাথা থাকায় মেঘ স্পষ্টভাবে আবিরের হৃৎস্পন্দন টের পাচ্ছিল। মেঘ হঠাৎ ই তটস্থ কন্ঠে শুধালো,” কি হয়েছে আপনার? আপনি কি কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তিত?”আবির ঘন ঘন ঢোক গিলছে, মেঘকে বিছানার পাশে বসিয়ে আবির ফ্লোরে বসল । মেঘ ব্যাকুল কন্ঠে বার বার প্রশ্ন করছে, আবির উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো। আবির আচমকা বসা থেকে উঠে ওয়ারড্রব থেকে একটা ছোট বক্স বের করল। ‘Abir’ নাম লেখা একটা ডিজাইনিং লকেট বের করে মেঘের গলায় পড়িয়ে দিতে দিতে মৃদু স্বরে বলল,” এটা বাসর রাতের গিফট।”মেঘ তৎক্ষনাৎ লাফিয়ে উঠে বালিশের নিচ থেকে একটা ঘড়ির বক্স বের করে আবিরকে দিয়ে বলল,” এটা আপনার জন্য। ”আবির কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,” বাসর রাতে গিফট দিতে হয় এটা তোমাকে কে বলেছে?”“রিয়া আপু , জান্নাত আপু তাছাড়া আমার বান্ধবীরাও বলেছে। ”“আর কি কি বলেছে? ”” আরও অনেক কিছু ।”আবির ভ্রু গুটিয়ে ধীর হস্তে কপাল চাপড়ে শক্ত কন্ঠে বলল,” ইসস! আমার বউটাকে ওরাই নষ্ট করছে।”মেঘ ঠোঁট কামড়ে বিড়বিড় করল,” মোটেই না।”আবির ঘড়িটা দেখে মুচকি হেসে বলল,” পড়িয়ে দাও।”“এখন?”“হুমমমম।”মেঘ ঘড়িটা পড়িয়ে দিয়ে আহ্লাদী কন্ঠে শুধালো,“পছন্দ হয়েছে?”” হুমমমমমমম। আমার একমাত্র বউয়ের দেয়া গিফট পছন্দ তো হবেই। ”আবির তপ্ত স্বরে ফের বলল,“তোমার জন্য আরও সারপ্রাইজ আছে।”“কি?”আবির একটা অ্যালবাম বের করে মেঘের হাতে দিল। অ্যালবামের সর্বপ্রথম ছবিটা আবির আর মেঘের বিয়ের। দু’জন পাশাপাশি বসা, মেঘ ঘাড় কাত করে আবিরের বাইসেপে রেখেছে আবির মেঘের মাথায় উপর নিজের মাথা কাত করে রেখেছে। দু’জনের এক হাত সামনের দিকে । আবিরের হাতের তালুতে মেহেদী দিয়ে লেখা ‘মেঘের আবির’ আর মেঘের হাতে লেখা ‘আবিরের মেঘ’। মেঘ ছবিটা দেখে মৃদু হেসে অ্যালবাম খুলেছে। মেঘের জন্মের পর আবিরের প্রথম কোলে নেয়ার ছবি, মেঘের ছয় মাস, এক বছর, দুই বছর বয়স থেকে শুরু করে বিয়ে পর্যন্ত আবিরের সাথে যতছবি ছিল সবই অ্যালবামে আছে। মেঘ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ছবিগুলো দেখছে, আবির পাশে দাঁড়িয়ে ছবিগুলোর বর্ণনা দিচ্ছে। ছোটবেলার ছবিগুলো ফ্যামিলি অ্যালবাম থেকে সংগ্রহ করা। কোন ছবি কখন, কি অবস্থায় কাকে দিয়ে উঠিয়েছিল সবই আজ নির্দ্বিধায় বলছে। মেঘ নিস্তব্ধ হয়ে ছবিগুলো দেখছে আর আবিরকে দেখছে। মাঝখানে ৯ বছরের একসাথে ছবি না থাকলেও লাস্ট ২ বছরের ছবিতেই তার উসুল তুলে ফেলেছে। যার মধ্যে হাতে গুনা কয়েকটা ছবি মেঘ নিজের ইচ্ছেতে তুলেছিল বাকি সব আবিরের পার্সোনাল ফটোগ্রাফার তুলে দিয়েছে। অ্যালবাম দেখা শেষ হতেই মেঘ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো। আবির মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল,“রাগ করেছো?”মেঘ ঠোঁট ফুলিয়ে চেয়ে আছে। আবির নিরেট কন্ঠে বলল,” রাগ করো না, প্লিজ। এটা দেখে রেগে গেলে পরের গুলো তো বলতেই পারব না।”” পরে কি?”আবির একটা চাবির গোছা মেঘের হাতে দিয়ে বলতে শুরু করল,” আজ থেকে এই চাবির গোছাটা তোমার। এখানে আমার রুমের প্রতিটা তালাবদ্ধ জিনিসের চাবির পাশাপাশি আমার অফিসের সব চাবি আছে। তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী তাই আজ থেকে আর কোনো লুকোচুরি নয়। আমার যা কিছু আছে সবকিছুতে তোমার অধিকার আছে।”মেঘ আজ হতবিহ্বল। যে আবির নিজের জিনিসপত্র কখনো কাউকে ছুঁতে দেয় না, রুমে ঢুকতে দেয় না, সব কিছুতে তালা দিয়ে রাখে সে আজ নিজের হাতে সব দায়িত্ব মেঘকে দিয়ে দিচ্ছে। আবিরের এত পরিবর্তন মেঘ স্তব্ধ চোখে কেবল দেখেই যাচ্ছে। আবির অকস্মাৎ মেঘের মুখোমুখি দাঁড়ালো। আচমকা ধপ করে মেঘের পায়ের কাছে বসে পরেছে, আবিরের গায়ে যেন পা না লাগে তারজন্য মেঘ সঙ্গে সঙ্গে পা সরিয়ে থমথমে কন্ঠে শুধালো,“কি হয়েছে আপনার?”আবির পেছন থেকে একটা সুন্দর গিফট বক্স বের করে মেঘের হাতে দিল। মেঘ ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,” কি এটাতে?”“দেখো।”বক্স খুলতেই ২ টা ব্যাংক চেক চোখে পরেছে, মেঘ এমাউন্টও ঠিকমতো খেয়াল করে নি। কৌতূহল বশত চেক তুলে বিস্ময় সমেত তাকালো । বক্সে স্বর্ণের বেশ কিছু গহনা। মেঘ বার বার আবিরের দিকে তাকাচ্ছে, আবিরের ঠোঁটে মলিন হাসি। মেঘ গহনা গুলো তুলে বিছানার পাশে রাখছে। কাগজের মতো কিছু লাল ফিতা দিয়ে প্যাঁচানো দেখে মেঘ স্বাভাবিকভাবে খুলতে নিল, খুলতেই দেখল এটা একটা দলিল। কিছুটা পড়ার পড় বুঝতে পারলো কোনো একটা জায়গা আবির মেঘের নামে করে দিয়েছে। মেঘ আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,” এসবের মানে কি?”আবির মুচকি হেসে বলল,” Sparrow’s Dreamhouse তোমার বাড়ি, একান্তই তোমার। সেখানে আমার কোনো অধিকার নেই।”মেঘ কিঞ্চিৎ রাগী স্বরে বলল,” অধিকার যদি না ই থাকবে তাহলে আমার বাড়ি আপনি আমাকে না জানিয়ে কেনো করেছেন? আগে আমাকে বললেন না কেনো?”” শুরুতে জানানোর মতো পরিস্থিতি ছিল না।”“কেনো?”” সময় টা ছিল ডিসেম্বর মাস, মাইশা আপুর বিয়ে থেকে মালার কারণে তোমাকে জোর করে নিয়ে আসছিলাম। আমি অফিস থেকে এসে তোমাকে সময় নিয়ে বুঝাতে চেয়েছিলাম মালার সাথে আমার কিছুই নেই অথচ তুমি আমার আসা পর্যন্ত জাস্ট ১০ মিনিট অপেক্ষা করতে পারলে না। আমাকে গুরুত্ব না দিয়ে মিনহাজদের গুরুত্ব দিয়েছিলে। তারজন্য তোমার প্রতি অভিমান হয়েছিল। সেই অভিমান তোমার আব্বুর কথায় জেদে পরিণত হয়েছিল। ওনার মেয়েকে রাণীর মতো রাখতে গেলে আগে রাণীর স্বপ্নগুলো পূরণ করা জরুরি ছিল। সেই রাতেই ৩-৪ দিনের জন্য চলে গেলাম, দিনরাত এক করে সবকিছু রেডি করে আসছি। যেদিন বাসার কাজ শুরু করব তার আগের দিন থেকে আপনাকে এতমতে রিকুয়েষ্ট করলাম কিন্তু তুমি এতটায় জেদি যে কোনোভাবেই যেতে রাজি হলে না। তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েও দিতে পারলাম না তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বাসার কাজ পুরোপুরি শেষ করেই জানাবো।”মেঘ শক্ত কন্ঠে বলল,” ইশশ! মিস করলাম।”“বাকিগুলো দেখে শেষ করো।”মেঘ আবারও বক্স হাতে নিল। কিছু চিরকুট, আবিরের অফিসের কিছু ডকুমেন্টসের সাথে কয়েকটা ৫০০ আর ১০০০ টাকার বান্ডিল। এত এত টাকার বান্ডিল দেখে মেঘ আশ্চর্যান্বিত নয়নে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে শুধালো,“এত টাকা কার?”আবির মোলায়েম কন্ঠে বলল,“তোমার। ”“মানে? এত টাকা দিয়ে আমি কি করব?”” এগুলো সব কাবিনের।”মেঘ ধীর কন্ঠে বলতে শুরু করল,” আমি যতদূর শুনেছি, কাবিন বউয়ের পরিবার অথবা বউয়ের ইচ্ছে অনুযায়ী দিতে হয়। আমি বউ হয়ে বলছি, আমার কাবিনের কোনো প্রয়োজন নেই। আমি আপনাকে চেয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ আপনাকে পেয়ে গেছি। আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই। আপনার এত এত গিফট, টাকা, ব্যাংক চেক এসবের কোনো কিছুই চাই না। বিয়েতে কাবিন যদি আবশ্যক হয় তবে আমি কাবিন হিসেবে আপনাকে চাইব, আমৃত্যু শুধু আপনাকেই চাইব।”মেঘের দুচোখ ছলছল করছে, নিজেকে সংযত করতে তাড়িত শ্বাস টানলো। আবির দুর্বোধ্য নেত্রে মেঘের মায়াবী আননে চেয়ে আছে। অল্পতে লজ্জায় আড়ষ্ট হওয়া মেয়েটার অদম্য কন্ঠের আকাঙ্ক্ষা শুনে আবির শীতল চোখে চেয়ে মুচকি হাসলো। মেঘ এতক্ষণ কি বলেছে নিজেও জানে না, আবিরের অন্যরকম চাহনিতে কিছুটা লজ্জা পেয়েছে। আবির চোখমুখ গুটিয়ে শান্ত কন্ঠে শুধালো,” যা দিয়েছি সবকিছু সহ আবির যদি তোমার হয় তাহলে কাবিন নিয়ে কি তোমার আর কোনো আপত্তি আছে?”মেঘ সঙ্গে সঙ্গে আবিরের দিকে তাকিয়ে শ্বাস ছেড়ে ঠোঁট ফুলিয়ে নিষ্পাপ কন্ঠে বলে উঠল,” আমার আবির হলেই হবে।”আবির ভ্রু উঠাতেই মেঘ থতমত খেয়ে বলল,” সরি সরি সরি, আপনাকে হলেই হবে। ”“আমি তো তোমার ই। বাকি যা দিয়েছি ঐ সবও তোমার। এগুলোর পর কাবিন হিসেবে তোমার কি আমার কাছে আর কিছু চাওয়ার আছে? ”মেঘ সাবলীল ভঙ্গিতে বলল,” আমার আর কিছুই লাগবে না।”“মনে কষ্ট থাকবে না তো?”মেঘ একগাল হেসে বলল,” আমার মনে কষ্টের ছিটেফোঁটাও নেই কারণ আপনাকে পেয়ে গেছি যে।”আবির অনুগ্র হেসে টেবিলের উপরে রাখা একটা বই থেকে কাগজ এনে মেঘের হাতে দিল। তেমন একটা গুরুত্ব না দিয়েই মেঘ জিজ্ঞেস করল,” কি এগুলো?”“পড়ো।”মেঘ বিড়বিড় করে পড়ছে, কিছুটা পড়তেই বুঝতে পারলো এটা কাবিননামার কপি। মেঘ সঙ্গে সঙ্গে নিচে তাকালো। বরের স্বাক্ষরের জায়গায় ‘সাজ্জাদুল খান আবির’ লেখা আর কন্যার স্বাক্ষরের জায়গায় ‘মাহদিবা খান মেঘ’ বিবাহ রেজিস্ট্রী করার তারিখ: ০৩/০২/২০– যা আজ থেকে আরও তিন বছর আগের। এটা দেখে মেঘ বিস্তীর্ণ চোখে তাকিয়ে এক হাতে নিজের মুখ চেপে ধরেছে। মেঘের হাত থরথর করে কাঁপছে, কান দিয়ে গরম হাওয়া বের হচ্ছে, মস্তিষ্কে বিদ্যমান স্নায়ুগুলো ধপধপ করে কাঁপছে, বুকের ভেতরটা দুরু দুরু কেঁপেই চলেছে, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। মেঘ শশব্যস্ত চোখে আবিরের দিকে তাকালো। আবির নিরুদ্বেগ ভঙ্গিতে মেঘকে দেখছে আর নিজের বুকে হাত রেখে অনুচ্চ স্বরে দোয়া পড়ছে। মেঘের গলায় আটকানো নিঃশ্বাস টা অতি সন্তর্পণে বেড়িয়ে আসছে, মুখ ফুলিয়ে শ্বাস টেনে জিভ দিয়ে ঠোট ভিজিয়ে থমথমে কন্ঠে প্রশ্ন করল,” এগুলো কি সত্যি? ”আবির ঢোক গিলে ধীরস্থির কন্ঠে বলল,“হুমমমমমমম। আইনের চোখে আমাদের বিয়ের তিনবছর পূর্ণ হয়ে গেছে, গতকাল চতুর্থ বছরে পদার্পণ করেছি। তোমাকে আগেই বলেছিলাম, তুমি আমারই। কেউ তোমাকে আমার থেকে আলাদা করতে পারবে না। কেউ যদি আমার সাথে ঝামেলা করতেও চাইতো, আমি সরাসরি কাবিননামা দেখিয়ে দিতাম।”মেঘ ভাবনাচিন্তা ছাড়াই আচমকা বলে উঠল,” এটা কিভাবে সম্ভব?”আবির শক্ত কন্ঠে বলতে শুরু করল,” আমি দেশ ছাড়ার মাসখানেক আগে তানভিরকে তোমার ব্যাপারে সব বলেছিলাম। সে আমার আবেগ, অনুভূতি দেখে প্রথমদিকে মেনে নিলেও পরবর্তীতে ওর মনে কিছুটা খটকা সৃষ্টি হয়েছিল কারণ শত হলেও সে তোমার আপন ভাই। তোমার প্রতি তার দায়িত্ব, ভালোবাসা অন্য লেবেলের যেটা আমার প্রতি হাজার থাকলেও তোমার সমান নয়। বলতে গেলে তানভির, আমি দুজনেই তখন অপ্রাপ্তবয়স্ক। মজার ছলেই হোক কিংবা গভীর চিন্তা থেকেই, তানভির একদিন হুট করে বলে বসে,” ভাইয়া, তুমি বনুকে এখন পছন্দ করো মানলাম, আমি ওকে দেখেও রাখলাম কিন্তু ৭ বছর পর তোমার মন মানসিকতা যে এরকম থাকবে তার কি গ্যারেন্টি আছে? তখন যদি বনুর প্রতি এখনকার মতো অনুভূতি না থাকে?”তানভিরের কথা শুনে আমার মনে চিন্তন জাগে৷ আমি নিজেও কখনো সেভাবে ভেবে দেখি নি তাই ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিলাম তোমাকে বিয়ে করব। কেনো সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমি নিজেও জানি না শুধু মনে হয়েছিল তানভির যা বলেছে একদম ঠিক বলেছে। তানভির মজার ছলে বললেও আমি দুশ্চিন্তায় ঘুমাতে পারছিলাম না। তানভিরকে জানানোর পর সে খুব রিকুয়েষ্ট করেছে যেন বিয়ের ঝামেলা না করি, ও এমনিতেই এসব বলেছিল আরও অনেককিছু। আমার মাথায় তখন কিছুই ঢুকছিল না, আমার কাছের বন্ধুর বাবা কাজী তাই তৎক্ষনাৎ খোঁজ নিলাম। তোমার বয়স অনেক কম ছিল, তখন তোমার আমার প্রতি তীব্র ঘৃণাও ছিল সব মিলিয়ে তখন বিয়ে সম্ভব ছিল না৷ তাছাড়াও কিছু নিয়মনীতি ছিল যার কারণে আংকেল কোনোভাবেই রাজি হয়তেছিল না৷ কিন্তু তখন আমার একটায় জেদ ছিল যেভাবেই হোক বিয়ে আমার করতেই হবে। আংকেলকে বিস্তারিত বুঝিয়ে খুব কষ্টে রাজি করিয়ে, রাকিব, তানভির আর সুজনের উপস্থিতিতে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করে দেশ ছাড়ি।”আবির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে পুনরায় বলতে শুরু করল,” বিশ্বাস করো, আমি তখন কোনোকিছু ভাবি নি, এতকিছু বুঝি নি। শুধু বুঝেছিলাম তোমাকে আমার লাগবে সেটা যেকোনো মূল্যেই হোক। মস্তিষ্কে শুধু একটা চিন্তায় ঘুরপাক খাচ্ছিল, তোমাকে বৈধতার চাদরে মোড়ানো। পাওয়া না পাওয়ার মাঝে আমি তখন বাস্তবিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম, ভবিষ্যতে কি হবে বা হতে পারে সব ভুলে গিয়েছিলাম। বিয়ে পরিপূর্ণ হবে না জেনেও আবেগের তাড়নায় বিয়ে করেছিলাম৷”নিশ্চুপ মেঘ এবার মুখ খুলল। কিছুটা বিস্মিত হয়ে জানতে চাইল,” আমার সাইন কে দিয়েছিল?”“তুমি। ”“কিভাবে? আমি তো এসবের কিছুই জানতাম না।”“মনে আছে তানভির একদিন ঘুরতে নিয়ে তোমাকে বিয়ের কথা বলেছিল?”“হ্যাঁ, মনে আছে৷ আমাকে এমন ই একটা কাগজে সাইন করতে বলেছিল। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম এটা কিসের কাগজ? ভাইয়া বলেছিল বিয়ের। আমি তখন সেভাবে গুরুত্ব ই দেয় নি, ভেবেছিলাম ভাইয়া মজা করছে।”আবির কপাল গুটিয়ে জানতে চাইল,” কেনো আমার নাম বলেছিল মনে নেই?”“হ্যাঁ, এটাও মনে আছে। বিয়ের কথা বলায় আমি যখন হাসছিলাম তখন ভাইয়া জিজ্ঞেস করছিল আমাকে যার তার কাছে বিয়ে দিলে আমার আপত্তি আছে কি না। আমিও সুন্দর করে বলেছিলাম, কোনো আপত্তি নেই তুমি যাকে বলবা তাকেই বিয়ে করে নিব। আমার সত্যি ই তখন কোনো আপত্তি ছিল না কারণ তখন আমার জীবনে আপনি ছিলেন না। আমার চোখে আমার ভাই ই সবার সেরা ছিল, সে যা বলতো আমি সবকিছু মেনে নিতাম। ভাইয়া তখন আপনাকে বিয়ে করার কথা বলেছিল আর আমি ভাইয়ার কথায় আপনাকে বিয়ে করতেও রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম ভাইয়া মজা করছে তাই যা বলেছিল সবেতেই হ্যাঁ হ্যাঁ করে সাইনও করে দিয়েছিলাম। তারপর ভাইয়ার সাথে এ বিষয়ে আমার আর কোনোদিন কথা হয় নি। ভাইয়া কিছু বলে নি আর আমি তো সেই ঘটনা বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলাম। ”আবির মলিন হেসে বলল,” ঐদিন ই তোমার আমার সাথে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তানভিরের সাথে সাথে সেখানে কাজী সাহেব, সুজনরাও উপস্থিত ছিল তাছাড়া ফোনে আমিও ছিলাম।”মেঘ হা হয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। আবির গলা খাঁকারি দিয়ে আবারও বলতে শুরু করল,” আমি সাইন করায় দিনই তোমাকে বউ হিসেবে কবুল করেছিলাম কিন্তু তোমারটা বাকি ছিল। তোমাকে বিস্তারিত বুঝানোর পরিস্থিতি ছিল না তাই তানভির যেভাবে পেরেছে ম্যানেজ করেছে। আমার কথা ছিল, যেহেতু তোমার সাথে তখন মানসিক বা শারীরিক কোনো সম্পর্কে আমি জড়াবো না তাই শুধু আইনী কাজ টা সম্পন্ন করে রাখবো। বাসায় এসে যেভাবেই হোক তোমাকে পটিয়ে, বাসার সবার অনুমতি নিয়ে তোমাকে বিয়ে করব। আমি নির্বোধ ছিলাম কারণ আমি তখনও আবেগে গা ভাসাচ্ছিলাম। আমাদের বিয়ে আইনী ভাবে নিবন্ধিত হয়ে গিয়েছিল, আমার এত বছরের ভালোবাসাকে আইনী স্বীকৃতি দিতে পেরে মনে সুখের হাওয়া বইছিল। আমার আকাশে বাতাসে বিয়ের আমেজ ছিল কিন্তু সেই আমেজ বেশিদিন থাকলো না। মাস তিনেকের মধ্যে ফুপ্পির কথা জানতে পারি আর তখনই আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তানভিরের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনায় ভীত হয়ে আমি আইনী স্বীকৃতির জন্য জোরাজোরি করেছিলাম কিন্তু ফুপ্পির কথা শুনে সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। যেখানে ফুপ্পির প্রেমের সম্পর্ক জেনেও মানে নি সেখানে আমি কাউকে না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলেছি। আমার বিয়েটা কোন লেবেলের অপরাধের কাতারে পড়বে সেটা ভেবেই আঁতকে উঠছিলাম। এত বছরে নিজের মনে জমে থাকা স্বপ্নগুলোকে পিণ্ডীভূত করে যে কাঁচের বাড়িটা বানিয়েছিলাম সেই বাড়িটা মনের ভেতরে ঘটে যাওয়া আকস্মিক ভূমিকম্পে তছনছ হয়ে গিয়েছিল। নিজের সাজানো স্বপ্ন ভাঙার সাথে সাথে ভেঙেছিল তোমাকে দেখার সব আকাঙ্ক্ষা। নিজের আক্ষেপে নিজেই পুড়ছিলাম। কিছু সময়ের জন্য মনে হয়েছিল পৃথিবী ছেড়ে চলে যায় কিন্তু শেষ সময়েও তোমাকে দেয়া কথাটা আমার কানে বাজছিলো, “আমাকে ছেড়ে যেতে পারবে না” সেই আদুরে আনন আমাকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত থেকে টেনে এনেছিল। শুধুমাত্র তোমার কথা ভেবে নতুনভাবে নিজেকে তৈরি করছিলাম, কিন্তু বুকে ছিল আকাশ সমান ভয়। বাসায় বিয়ের কথা জানলে তোলপাড় শুরু হবে এটা খুব ভালোই বুঝেছিলাম, তোমাকে নিয়ে আলাদা থাকার যোগ্যতাও আমার ছিল কিন্তু তুমিই যে আমার ছিলে না। তুমি এমনিতেই ৭-৮ বছর যাবৎ আমার সাথে কথা বলছিলে না। ঐ অবস্থায় কোনোক্রমে যদি শুনতে পারতে যে তোমার সাথে আমার বিয়ে হয়ে গেছে তখন আব্বু চাচ্চু কি করতো জানি না কিন্তু তুমি হয় আমাকে খু*ন করতে, নয়তো নিজে সু*ই*সাই*ড করতে আর না হয় লাস্ট অপশন ছিল ডি*ভো*র্স। তোমার জেদকে আমি বরাবর ই ভয় পায়, তখনও খুব ভয় পেয়েছিলাম। তুমি ভুলক্রমে কিছু বললেও সেটা তুমি করেই ছাড়তে৷ বাসায় ফিরে ৩ মাস কিংবা ৬ মাসের মধ্যে বিয়ে করার স্বপ্ন আড়ালেই হারিয়ে গেল। সেই থেকে আমার আতঙ্ক শুরু হলো, তানভির, রাকিব দু’জনকে খুব জোর করে বললাম ভুল করেও যেন বিয়ের টপিক না উঠায়, বিয়ের কথা যেন মন থেকে ভুলে যায়। অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে ৬ মাস আগে দেশে ফিরলাম, তখন সব ভুলে তোমাকে আমার প্রেমে পড়তে বাধ্য করলাম। প্রতিনিয়ত নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে তোমাকে অনুভব করাতে লাগলাম। আলহামদুলিল্লাহ বছরখানেকের মধ্যে আমি সফলও হয়ে গেলাম। আমার এক্সিডেন্টের পর তোমার আবেগ জড়ানো কথাগুলো শুনে তোমার ভালোবাসার পুরোপুরি নিশ্চয়তা পেয়েছিলাম। বাসার পরিস্থিতি, তোমার পরিস্থিতি দেখে তখন দ্বিতীয়বার উপলব্ধি করেছিলাম আমি আবেগের বশে ঠিক কত বড় ভুলটা করেছিলাম। আম্মুর বার বার জানতে চাওয়া, আমার কোনো পছন্দ আছে কি না, আব্বুর একই প্রশ্ন পরোক্ষভাবে জিজ্ঞেস করা সেই সাথে তোমার অতিরিক্ত যত্নে আমি পাগলপ্রায় হয়ে উঠেছিলাম৷ তখন বুঝেছিলাম, আমার বাবা মা আমাকে খুব ভালোবাসে, তাদের ইচ্ছাশক্তি এতটায় প্রবল যে আমি চাইলে তারা পৃথিবীর সবকিছু আমার সামনে হাজির করতে পারে সেখানে তোমাকে আমার সাথে বিয়ে দেয়া তেমন কোনো বিষয় ই না। বরং তোমাকে চাইলে আব্বু আম্মু খুশিই হতো। কিন্তু ওনারা তো জানতো না যে আমি ওনাদের হৃদয় আগেই ভেঙে ফেলেছি আর না তুমি কিছু জানতে। ঐ পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আমার বিয়ের কথা বলাটা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না আর না সম্ভব ছিল বিয়ের ঘটনা লুকিয়ে নতুন করে বিয়ে করা। তাছাড়া তখনও তোমার স্বপ্নের বাড়ি গিফট করা বাকি, তোমাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করাটাও বাকি ছিল। গত রমজানের আগে হুট সবার সামনে একদিন আমার বিয়ের কথা উঠল, তোমার আব্বু আগুনে ঘি ঢালার মতো কোথাকার কোন মেয়ের কথা বলল। আমি মেজাজ হারিয়ে বললাম ১ বছর বিয়েই করব না। আমি তাদের কিভাবে বুঝাতাম আমি যে তোমাকে বিয়ে করে ফেলেছি। তারপর রাকিবের বিয়ে ঠিক হলো, তখনও আব্বু আমাকে কথা শুনালো। এমনকি আমার নিজেরও খারাপ লাগছিল কারণ আমি যখন থেকে তোমাকে ভালোবাসি তারপর থেকেই বলছিলাম আমি যেভাবেই হোক রাকিবের আগে বিয়ে করব৷ বিয়ে করেও ছিলাম কিন্তু কাউকে বলতে পারছিলাম। আবেগ আর কষ্টগুলো নিজের ভেতর চাপিয়ে রাখতে রাখতে আর পারছিলাম না। রাকিবের গায়ে হলুদের রাতে ফুপ্পিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে শুধু একটা কথায় বলছিলাম,‘আমি ভুল করেছি, খুব বড় ভুল করেছি। সেই ভুলের শাস্তিস্বরূপ মেঘকে আমার থেকে কেড়ে নিও না। আমি মেঘকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না।’ফুপ্পি নিরূপায় ছিল, আমার কান্না দেখে তবুও কয়েকবার আব্বুকে বলার চেষ্টা করেছে কিন্তু সাহস করে বলে উঠতে পারে নি। তারপর শুরু হলো তোমার আব্বুর ছেলে দেখা, বাধ্য হয়ে বাসায় রাগারাগি করলাম। তোমার বাসার কাজ শেষ করতে প্রজেক্টের দায়িত্ব নিয়ে দেশের বাহিরে গেলাম। বিয়ের কথা বাসায় বলার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমার পুরোপুরি টার্গেট ছিল ১ তারিখ তোমাকে প্রপোজ করবো, রাতে বাসায় বিয়ের কথা বলব, বাসায় মানলে ২ তারিখ ধুমধাম করে গায়ে হলুদ হবে, না মানলে তোমাকে নিয়ে বাড়ি ছাড়বো। মাঝখান থেকে তুমি ৩ দিন আগে প্রপোজ করতে বের হয়ে সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছিলে। তবে যাই হোক রবের কাছে হাজারো শুকরিয়া যে কোনো ঝামেলা ছাড়ায় তোমাকে পেয়ে গেছি।”মেঘ হতবিহবল, পাথরের মতো বসে আবিরের মুখের পানে চেয়ে আছে। কিছু জিজ্ঞেস করা বা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। আবির দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখল। মেঘের হাত থেকে কাগজ নিতে নিতে মেঘের মসৃণ গালে চুমু খেয়ে হঠাৎ ই পুরু কন্ঠে বলে উঠল,” বউ, আমি তোমাকে ৫ মিনিট দিচ্ছি। এরমধ্যে টাশকি খাওয়া মুড থেকে বেড়িয়ে রোমান্টিক মুডে আসো। আমার বুকের ভেতর প্রেম ভালোবাসা ফুটন্ত গরম পানির মতো টগবগ করতেছে। তুমি রোমান্টিক মুডে না আসলে আমার অন্তর পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। তুমি কি তাই চাও?”মেঘ নির্বাক চোখে আবিরের দিকে তাকালো। আবির নিঃশব্দে হেসে চোখ টিপলো। আবিরের নির্লজ্জ মার্কা কথা আর কাণ্ড দেখে মেঘ না পারতেও কিঞ্চিৎ হাসল।★সকালে নাস্তার টেবিলে আবির আর মেঘ ব্যতীত সকলেই উপস্থিত, বন্যাও আজ সবার সাথে খেতে বসেছে। ইকবাল খান ধীর কন্ঠে শুধালো,“আবির আর মেঘ কি এখনও উঠে নি?”মালিহা খান মীমকে উদ্দেশ্য করে বলল,” মীম, দেখে আয় তো।”মীম সঙ্গে সঙ্গে উঠে গেল। আবিরের রুমের দরজায় ডাকতে গিয়ে খেয়াল করল দরজা খোলা, রুমে মেঘ আবির কেউ নেই। মীম রুমের ভেতরে ঢুকে ভালোভাবে দেখল। সহসা বাহিরে এসে উচ্চস্বরে বলল,” ভাইয়া, আপু কেউ ই রুমে নেই।”আলী আহমদ খান সঙ্গে সঙ্গে তানভিরের দিকে তাকালেন। তানভির আতঙ্কিত কন্ঠে বলল,” আমি সত্যিই কিছু জানি না। ”