BDBOYS.TOP

গোঁয়াজেন্দা ও সামরিক গল্প

আরও দেখুন →

এই সাব-ক্যাটাগরিতে কোনো পোস্ট নেই।

হাসির গল্প

আরও দেখুন →

এই সাব-ক্যাটাগরিতে কোনো পোস্ট নেই।

জীবনের গল্প

আরও দেখুন →

এই সাব-ক্যাটাগরিতে কোনো পোস্ট নেই।

উপদেশমূলক গল্প

আরও দেখুন →

এই সাব-ক্যাটাগরিতে কোনো পোস্ট নেই।

ভালোবাসার গল্প

আরও দেখুন →
Loading...
নবধারার সেই ধ্রুবতারা

ভালোবাসা বা প্রেম কেবল কিছু শব্দে আবদ্ধ একটি পরিধি নয়। এটা অন্তর্নিহিত ব্যাপার। উপলব্ধির আস্তরণ দিয়ে যখন কোনো অন্তরসুধা উপলব্ধি করা যায়, আর একে যদি ভালোবাসা বলে, তাহলে আমি প্রগাঢ় উচ্চারণে সেই বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলতে চাই, আমি তোমাকে ভালোবাসি নবধারার সেতা (নীলবর্ণ) ...।বলতে ইচ্ছা করে—ফাগুনের এই গোধূলির ক্ষণেইচ্ছেডানা মেলে দিয়ে তেপান্তরের মাঠ পেরিয়েআসতে চাই যে তোমার কাছেকেন দাও বাধা মোরে?ফাগুনের এই আগুনে বসন্তের এই নবগগনেভুবনতলে হাতে হাত রেখে হাঁটতে চাই যে অচেনা পথেপুষ্পরথী ওই বেলি ফুল খোঁপায় গুঁজতে ইচ্ছা করে।অভিযোগ–অনুযোগের পর্দা সরিয়ে চলো একই আকাশ দেখি ওই মেঘটাকে সরিয়ে.... ।

AAkash
📅 ২০ মার্চ, ২০২৬
Loading...
তোমাকে কাছে পাওয়ার অজুহাত

তুমি মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে বলেই—আমি ইচ্ছা করেই আর সেরে উঠি না।লোকে বলে, জ্বর হলে শরীর পুড়ে যায়, কষ্ট হয়; কিন্তু আমার কাছে এই জ্বর যেন এক অদ্ভুত আশীর্বাদ। কারণ, আমি জানি, তুমি মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে বলেই আমার শরীরের জ্বরটা এভাবে বেড়ে যায়। শরীর খারাপটা আসলে একটা উসিলা মাত্র। আমার আসল অসুখ তো তোমাকে ঘিরেই।যখন তুমি কপালে হাত রেখে খুব আলতো করে জিজ্ঞাসা করো– ‘এখন কেমন লাগছে?’ তখন মনে হয়, ওইটুকু আদরের জন্য আমি দীর্ঘ এক জীবন জ্বরের ঘোরেই কাটিয়ে দিতে পারি।দুনিয়াতে কত রকমের ওষুধ আছে—কেউ বলে প্যারাসিটামল, কেউ বলে বিশ্রাম, কেউ বলে ডাক্তারের পরামর্শ। কিন্তু, তোমার হাতের ওই শীতল পরশটার চেয়ে বড় কোনো ধন্বন্তরী আজও কেউ আবিষ্কার করতে পারেনি।তুমি যখন কাছে থাকো, পরম মমতায় এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে দাও, তখন নিজের এই অসুস্থতাকেও খুব সুন্দর মনে হয়। মনে হয়, কষ্টেরও একটা কোমল রং আছে, আর তার নাম তুমি। সুস্থ হয়ে গেলে তুমি আবার ব্যস্ত হয়ে পড়বে, নিজের দুনিয়ায় হারিয়ে যাবে। আমার খবর নেবে না, জ্বর মেপে দেখবে না, কপালে হাত রাখবে না। তাই কখনো কখনো মনে হয়—এই জ্বর থাকুক না একটু, এই অজুহাতে যদি তোমাকে আরও কিছুটা সময় পাওয়া যায়!তবে জানো,সত্যি বলতে—আমি জ্বর চাই না,আমি চাই তোমাকে।আমি চাই,সুস্থ দিনের বিকেলে,কোনো অজুহাত ছাড়াই,তুমি এসে পাশে বসো,আর জিজ্ঞাসা করো—‘এখন কেমন লাগছে?’

AAkash
📅 ২০ মার্চ, ২০২৬

ভূতের গল্প

আরও দেখুন →
Loading...
শীতের এক রাতে – মঞ্জিল সেন

সে আজ অনেক বছর আগেকার ঘটনা। আমার এক ডাক্তার বন্ধু সদ্য মেডিকেল কলেজ থেকে বেরিয়ে উত্তর বাংলার এক শহরে প্র্যাকটিস শুরু করেছে, তখনকার কথা। আমার ডাক্তার বন্ধুর মুখেই শুনেছিলাম সেই কাহিনি।নতুন জায়গায়, নতুন পরিবেশে জমিয়ে বসতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়, সময় লাগে। আমার বন্ধুটির উৎসাহ বা ধৈর্যের অভাব ছিল না। নতুন ডাক্তারের কাছে চট করে কোনো রোগী আসে না, পুরোনো ডাক্তারদেরই সবার পছন্দ। তবে আমার বন্ধুটি শিশুচিকিৎসায় সসম্মানে পাশ করেছিল, সোনার মেডেল পেয়েছিল। সে বুদ্ধি করে তার নেমপ্লেটে নামের পাশে এম বি বি এস, ডি সি এইচ (গোল্ড মেডেলিস্ট) কথাটা জুড়ে দিয়েছিল, ফলে দু-চারজন করে রোগী আসতে শুরু করেছিল।এভাবে কিছুদিন কাটবার পর এল শীত। উত্তরবঙ্গের হাড়-কাঁপানো শীত। সন্ধের পর রাস্তা ফাঁকা, দরজা-জানালা বন্ধ করে সবাই আশ্রয় নিয়েছে ঘরের ভেতর। নেহাত দায় না ঠেকলে কেউ আর পথে বেরোয় না।সেদিন রাত তখন প্রায় দশটা। মফস্সল শহরে ওটা কম রাত নয়, তার ওপর ঠান্ডার জন্য শীতকালে সবাই তাড়াতাড়ি কাজকর্ম সেরে শুয়ে পড়ে। ডাক্তার ন-টার মধ্যে খাওয়া সেরে বিছানায় লেপের তলায় বেশ আয়েশ করে একটা মেডিক্যাল জার্নাল পড়ছিল। আমেরিকায় ফিলাডেলফিয়ায় একজন শল্যচিকিৎসক কেমন করে একটা দুরূহ অপারেশন করেছিলেন তার বিবরণ ছিল ওই জার্নালে, সেটা পড়তে পড়তে সে তন্ময় হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ বাইরের দরজায় ঘন ঘন কড়া নাড়ার শব্দে ডাক্তার চমকে উঠল। এই অসময়ে কে এল! নিশ্চয়ই জরুরি কেস।আগেই বলেছি, আমার ডাক্তারবন্ধু ছিল খুব করিতকর্মা, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য আলস্যকে সে কখনো প্রশ্রয় দিত না। তাড়াতাড়ি গায়ে একটা গরম চাদর জড়িয়ে সে সদর দরজা খুলল, তারপরই ভীষণ চমকে দু-পা পিছিয়ে এল। দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি সুন্দরী অল্পবয়সি বউ, মাথার সিঁদুর জ্বলজ্বল করছে। বউটির মুখ কিন্তু উৎকণ্ঠায় আর দুশ্চিন্তায় ভীষণ ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।‘ডাক্তারবাবু, আমার মেয়ের খুব অসুখ,’ বউটি ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠল, ‘আপনি শিগগির চলুন।’‘কোথায় আপনাদের বাড়ি?’ ডাক্তার জিজ্ঞেস করল।‘বেশি দূর নয়, আপনি আর দেরি করবেন না,’ বউটির গলা থেকে যেন কাকুতি ঝরে পড়ছে।‘ঠিক আছে, আপনি ভেতরে এসে বসুন,’ ডাক্তার বলল, ‘আমি তৈরি হয়ে নিচ্ছি।’‘আমি এখানেই ভালো আছি, আপনি তাড়াতাড়ি করুন।’বউটি ভেতরে আসতে অনিচ্ছুক বলে মনে হল ডাক্তারের। ওই ঠান্ডায় তার গায়ে একটা সুতোর চাদর পর্যন্ত নেই, খালি পা, অথচ চেহারা দেখে মনে হয় ভালো ভদ্র পরিবারের বউ। ডাক্তার তবু ইতস্তত করছিল, ভাবছিল বউটিকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা ঠিক হবে কি না, কিন্তু বউটিই বলে উঠল, ‘আমার জন্য আপনি ব্যস্ত হবেন না, তাড়াতাড়ি চলুন।’অগত্যা ডাক্তার ভেতরে গিয়ে গায়ে একটা গরম ওভারকোট চাপিয়ে বেরিয়ে এল, হাতে ব্যাগ, তাতে কিছু দরকারি ওষুধপত্তরও আছে।‘আপনাকে একটা চাদর দেব?’ ডাক্তার আমতা আমতা করে বলল।‘বললাম তো, আমার জন্য আপনাকে ব্যস্ত হতে হবে না,’ একটু অসহিষু; কণ্ঠেই জবাব দিল বউটি, ‘চলুন।’দরজায় তালা লাগিয়ে ডাক্তার বেরিয়ে পড়ল। বউটি আগে আগে যাচ্ছে আর তার পেছনে ডাক্তার। বউটি খুব তাড়াতাড়ি হাঁটছে।রাস্তা নির্জন, অন্ধকার, গা ছমছম করে। বউটি এই রাতে একা ডাক্তারের খোঁজে বেরিয়েছে, বাড়িতে কি পুরুষমানুষ নেই! এই ঠান্ডার রাতে এমন একা কেউ ছেড়ে দেয় ঘরের বউকে! ডাক্তারের খুব খারাপ লাগছিল।যাহোক বেশ খানিকটা যাবার পর একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল বউটি, তারপর ডাক্তারকে লক্ষ করে বলল, ‘সদর দরজা খোলা আছে, আপনি ভেতরে যান, আমি আসছি।’সে গেটের পাশ দিয়ে অন্ধকারে কোথায় যেন গেল।বউটির কথাই ঠিক। সদর দরজা ভেজানো ছিল, ঠেলতেই খুলে গেল। প্রথমেই একটা ঘর, প্রায় অন্ধকার, তার পরের ঘরে আলো জ্বলছে। ডাক্তার এগিয়ে গেল। একটা খাটে বছর দেড়েকের একটি মেয়ে নিঃঝুমের মতো শুয়ে আছে। ফর্সা গায়ে রং, কোঁকড়ানো চুল, ভারি মিষ্টি মুখ কিন্তু জ্বরে বেঁহুশ, মুখ আগুনের মতো লাল।মেয়েটির মাথার সামনে একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক আর একজন বৃদ্ধা মহিলা বসে আছেন, বোধ হয় ওর দাদু-দিদিমা। বৃদ্ধা মেয়েটির কপালে জলপট্টি দিচ্ছেন আর ভদ্রলোক পাখার হাওয়া করছেন। দু-জনের মুখে ফুটে উঠেছে অসীম উৎকণ্ঠা। ডাক্তারের জুতোর শব্দে দু-জনেই মুখ তুলে তাকালেন।‘ডাক্তারবাবু এসে গেছেন!’ ভদ্রলোক উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, তাঁর মুখে ফুটে উঠল একটা নিশ্চিন্ততার ছাপ।ডাক্তার ব্যাগ থেকে স্টেথিসকোপ বের করে মেয়েটির বুক-পিঠ পরীক্ষা করল, জ্বর দেখল এক-শো পাঁচ। নিমুনিয়া, তবে ভাগ্য ভালো তখনও মারাত্মক আকার নেয়নি। মেয়েটিকে সে তক্ষুনি একটা ইঞ্জেকশন দিল। একটা প্রেসক্রিপশন লিখে বুড়ো ভদ্রলোকের হাতে সেটা দিয়ে বলল, ‘সকালে এই ইঞ্জেকশন আর ট্যাবলেটগুলো আনিয়ে রাখবেন। আমি আজ রাতের মতো ওষুধ দিয়ে যাচ্ছি, দু-ঘণ্টা অন্তর খাওয়াবেন। আমি সকালে আবার আসব।’‘ও ভালো হয়ে যাবে তো?’ বুড়ো ভদ্রলোক ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠলেন।‘হ্যাঁ,’ ডাক্তার হাসিমুখে জবাব দিল, ‘ঠিক সময়ে ওষুধ পড়েছে, আর দেরি হলেই ভয় ছিল।’ঠিক সেইসময় হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল একজন সুপুরুষ যুবক, উদ্ভ্রান্তের মতো তার চেহারা। ডাক্তারকে দেখে সে বলল, ‘ও আপনি এখানে, আমি আপনার ঘরে তালা দেখে ভাবলাম রোগী দেখতে গেছেন, আরও দু-জন ডাক্তারবাবুর কাছে ছুটে গেলাম, তাঁরা এই ঠান্ডায় আসতে রাজি হলেন না।’‘তুই ওঁকে খবর দিসনি!’ বুড়ো ভদ্রলোক এবার অবাক হয়ে বললেন, ‘তবে কে ওঁকে ডেকে আনল?’‘তাই তো!’ যুবক এবার বলল, ‘আপনাকে কে খবর দিল?’‘কেন, মেয়েটির মা,’ ডাক্তার জবাব দিল, ‘তিনি গিয়ে বললেন মেয়ের খুব অসুখ এখুনি যেতে হবে। এত রাতে উনি একা ছুটে এসেছেন দেখে আমিও কম অবাক হইনি, গায়ে একটা চাদর পর্যন্ত ছিল না।’‘ওর মা!’ অস্ফুট কণ্ঠে বললেন বুড়ো ভদ্রলোক।তখুনি ডাক্তারের চোখে পড়ল দেওয়ালে টাঙানো একটা ছবির দিকে। হাসি হাসি মুখে সেই বউটি তার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন খুব খুশি হয়েছে তার ওপর।‘ওই তো,’ ছবিটার দিকে আঙুল দেখিয়ে ডাক্তার বলে উঠল, ‘উনিই তো আমাকে নিয়ে এলেন, গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে বললেন, দরজা খোলা আছে ভেতরে যান, আমি আসছি।’ঘরে সবাই যেন স্তম্ভিত, যুবকটি হঠাৎ দু-হাতে মুখ ঢেকে ফেলেছে। ব্যাপার কী বুঝতে না পেরে ডাক্তার এর ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে।‘ওটা আমার পুত্রবধূর ছবি,’ বুড়ো ভদ্রলোক একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘গত বছর এই সময় আমাদের ছেড়ে স্বর্গে গেছে।’ডাক্তার হতভম্ব!মেয়ের কঠিন অসুখে মৃত মায়ের আত্মা স্থির থাকতে পারেনি, মানুষের দেহ ধরে এসেছিল সময়মতো চিকিৎসার জন্য ডাক্তারকে নিয়ে যেতে। সন্তানের প্রতি এমন ভালোবাসা মায়ের পক্ষেই সম্ভব।মেয়েটি ভালো হয়ে উঠেছিল। আর ওই ঘটনার পর ডাক্তারের পসার এত বেড়ে গিয়েছিল যে তাকে আর কখনো রোগীর জন্য বসে থাকতে হয়নি। তার নামই হয়ে গিয়েছিল ধন্বন্তরী ডাক্তার। অথচ তার মূলে ছিল এক মৃত মায়ের স্নেহ আর উৎকণ্ঠা, অসুস্থ মেয়েকে বাঁচাবার জন্য অন্য জগৎ থেকে ছুটে আসতেও তার আটকায়নি।

AAkash
📅 ২০ মার্চ, ২০২৬
Loading...
চা-বাগানের শীতল রহস্য

চা-বাগানের শীতল রহস্যলেখক : নুরচা বাগানের সেই রাস্তাটা সবসময়েই আমার কাছে কেমন যেনো অদ্ভুত অদ্ভুত লাগে। দিনের বেলা যতটা শান্ত আর সবুজ, রাতের বেলা ঠিক ততটাই শীতল, ফাঁকা আর অচেনা মনে হয়। সে রাতে আমি শিলচরের দিকে যাচ্ছিলাম। নভেম্বরের শেষ দিক। আকাশে চাঁদ নেই, চারপাশে শুধু গভীর কুয়াশা। বাস থেকে নেমে একটি সরু কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করি। রাস্তার দুইপাশে উঁচু উঁচু চা গাছের সারি, গাছের পাতায় রাতের শিশিরের ফোঁটা জ্বলজ্বল করছে। দূরে কোথাও শ্রমিকদের কলোনির আলো দেখা যায়, কিন্তু এখানে শুধু এক গাড় অন্ধকার আর কুয়াশা। বাতাসে এক ধরনের ঠান্ডা গন্ধ, যেন ভেজা মাটি, শুকনো পাতার ধোঁয়া আর পুরনো কাঠের ঘ্রাণ মিশে আছে। পায়ের নিচে নুড়িপাথরের কড়মড় শব্দ, আর মাঝে মাঝে ঝিঁঝি পোকার একটানা ডাক। কিন্তু হঠাৎই বুঝলাম—ঝিঁঝি পোকার ডাকটা কিছুক্ষণ আগে থেকে নেই! চারদিকে নিস্তব্ধ, যেন কেউ শ্বাস বন্ধ করে শুনছে আমি কী করছি। হঠাৎ বাঁদিকের চা গাছের সারির ভেতর থেকে নরম একটা আওয়াজ পেলাম, যেন পাতার ফাঁকে কেউ ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে। “কেউ কি আছেন ওখানে!!” ভয় মিশ্রিত কন্ঠে জিগ্যেস করলাম।কোনো উত্তর নেই। বরং পাতার নড়াচড়া আরও কাছে আসছে। আমি হাঁটতে শুরু করলাম, কিন্তু অনুভব করলাম আমার পায়ের সঙ্গে পায়ের শব্দ মিশে আরেকটা ভারী, ধীর শব্দও আসছে। যেন কারও পা মাটিতে টেনে টেনে হাঁটার শব্দ। বাগানের মাঝখানে একটা পুরনো কাঠের সেতু আছে। এই সেতুর নিচে শুকনো নালা, বর্ষাকালে এখানে পানি বইত। আমি সেতুর দিকে এগোতেই কুয়াশার ভেতর থেকে ম্লান একটা লণ্ঠনের আলো ভেসে উঠল। কেউ একজন দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। সাদা ধুতি, মাথায় সাদা পাগড়ি কিন্তু মুখটা পুরোপুরি অন্ধকারে ঢাকা। আমি সাথে সাথে সেখানেই দাঁড়িয়ে গেলাম। আলোটা যেন আমার দিকে এগিয়ে এলো, কিন্তু মানুষটা নড়ছে না—শুধু আলোটাই এগোচ্ছে। আমার বুক ধড়ফড় করছে। সেতুর নিচ থেকে হঠাৎ শোঁ শোঁ ঠান্ডা বাতাস ভেসে এলো আর তখনই দেখলাম, সেই মানুষেটার পা নেই। লণ্ঠন হাতে ধরা অবয়বটা ধীরে ধীরে সেতুর ওপর ভেসে উঠল, আর তার লণ্ঠনের আলোয় এক মুহূর্তের জন্য দেখলাম মুখটা যেন পোড়া, কালচে, আর চোখের জায়গায় শুধু ফাঁকা গর্ত। আমি চিৎকার করার আগেই আলোটা নিভে গেল।সেই পোড়া-মুখো, শূন্য-চোখের অবয়বটা যখন লণ্ঠন হাতে সেতুর মাঝ বরাবর এসে থামল, আমার গা-হাত একসঙ্গে ঠান্ডা হয়ে গেল। মনে হচ্ছে যেন বুকের ভেতরের রক্ত জমে বরফ হয়ে গেছে। আমার শ্বাস-প্রশ্বাস একেবারে বন্ধ হয়ে আসছিল আর গলায় যেন কেউ অদৃশ্য হাতে শক্ত করে চেপে ধরে আছে। সেতুর নিচ থেকে আবার শোঁ শোঁ হাওয়া উঠল, আর হাওয়ার সঙ্গে কানে ভেসে এলো কর্কশ একটা ফিসফাস—“তুই… চলে যা..”কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। চোখের সামনে সবকিছু কুয়াশার মতো মিলিয়ে যাচ্ছিল।লণ্ঠনের সেই ম্লান আলো হঠাৎ তীব্র হয়ে চোখে লাগল, তারপর আবার নিভে গেল।অন্ধকার… আর অন্ধকার!! শেষবার যা মনে আছে, তা হলো সেই পোড়া মুখটা আমার দিকে ঝুঁকে আসছে, আর তার গন্ধ… যেন পুরনো পোড়া কাঠ আর পচা মাটির মিশ্রণ। তারপর কিছুই মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন আমি একটা মাটির ঘরের ভেতরে শুয়ে আছি। মাথার পাশে কেরোসিনের লণ্ঠন জ্বলছে। ঘরের কোণে বসে আছেন তিন-চারজন স্থানীয় শ্রমিক।তাদের চোখে কৌতূহল, ভয় আর অবিশ্বাস একসঙ্গে জমে আছে।“বাবু, আপুনি ভাগ্যবান… অনেকেই ওই সেতুর ধারে গিয়ে ফেরে নাই,” - বলে এক বৃদ্ধ শ্রমিক, যার গলার স্বর কর্কশ হলেও চোখে ছিল এক ধরনের উদ্বেগ। আরেকজন বলল, “ওইটা বহু পুরনো ঘটনা বাবু… এই বাগানের মালিকের খুন হওয়া, আগুনে পুড়ে মরার কথা… অনেক কাহিনি আছে। কিন্তু রাতের বেলায় কেউ সেতুর ওধারে গেলে…”। সে বাকিটা আর বলল না, শুধু মাথা নিচু করে নিঃশ্বাস ফেলল। আমার পুরো শরীর তখনো ঠান্ডায় কাঁপছে। বুকের ভেতরে ধকধক শব্দ যেন কান ফাটিয়ে দিচ্ছে। আমি বুঝলাম, আমি যেটা দেখেছি, সেটা স্বপ্ন বা মায়া নয়… বরং এই চা-বাগানের এক কালো সত্য। আমি উঠে বসলাম। মাথাটা এখনো ঝিমঝিম করছে। আমার পোশাক ভিজে গেছে, যেন গভীর কুয়াশার ভেতর থেকে আমি এইমাত্র বেরিয়ে এসেছি। লণ্ঠনের ম্লান আলোয় আমি দেখতে পেলাম, ঘরের কোণে বসে থাকা শ্রমিকদের চোখ যেন আমার দিকেই। আমি জানতে চাইলাম, “কে… কে ছিলেন উনি? সেতুর নিচে… আর পোড়া মুখ…?” বৃদ্ধ শ্রমিকটি গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বাবু, উনি হলেন এই বাগানের মালিক। নাম সুরেশ রায়। বহু বছর আগে, এই চা-বাগান যখন তৈরি হয়, তখন সুরেশবাবু একজন সৎ এবং দয়ালু মানুষ ছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তার ভেতরে লোভ আর হিংসা বাসা বাঁধল। শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার শুরু করলেন, তাদের পাওনা টাকা দিতেন না, আর যারা প্রতিবাদ করত, তাদের মারধর করতেন। একটা সময় তার এই অত্যাচার এতটাই চরমে পৌঁছালো যে শ্রমিকরা আর সহ্য করতে পারল না।”কথাটা শেষ না করে বৃদ্ধ একটু থামল, যেন কোনো স্মৃতি তাকে কষ্ট দিচ্ছে। এরপর সে আবার বলতে শুরু করল, “একদিন রাতে, শ্রমিকরা তাকে এই সেতুর নিচেই আটকে ফেলে। তারা তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। সুরেশবাবু বাঁচার জন্য চিৎকার করছিলেন, কিন্তু কেউ তাকে সাহায্য করতে আসেনি। সেদিন থেকেই শোনা যায়, সুরেশবাবুর অতৃপ্ত আত্মা প্রতি রাতে ওই সেতুতে ফিরে আসে। সে তার পোড়া মুখ আর শূন্য চোখে সেইসব মানুষ খোঁজে, যারা তার এই পরিণতি ঘটিয়েছিল। আর মাঝে মাঝে যে কোনো অপরিচিত মানুষ যারা এই রাত গভীর রাতে এই পথ দিয়ে যায় তাদের সে তার কাছে টেনে নিয়ে যায়।”বৃদ্ধের কথাগুলো আমার বুকে একটা কাঁটার মতো বিঁধছিল। তার চোখে ভয় আর দুঃখের এক অদ্ভুত মিশ্রণ দেখা যাচ্ছিল। আমি উঠে দাঁড়ালাম। বাইরে তখনো অন্ধকার। কুয়াশা আরও ঘন হয়েছে। “আমি… আমি চলে যেতে চাই,” কোনোমতে বললাম। শ্রমিকরা আমাকে বাগান থেকে বের হওয়ার রাস্তা দেখিয়ে দিল। আমি তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে বেরিয়ে আসলাম। হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো যেন কেউ আমাকে পেছন থেকে অনুসরণ করছে। আমি বারবার পেছনে ফিরে তাকালাম, কিন্তু কাউকে দেখতে পেলাম না। শুধু সেই পচা গন্ধটা, সেই পোড়া কাঠের গন্ধটা এখনো আমার নাকে লেগে আছে। আমি যখন চা বাগান পেরিয়ে বড় রাস্তায় এসে পৌঁছালাম, তখন ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। আমি একটা খালি বাস পেলাম আর তাতে উঠে বসলাম। বাস যখন চলতে শুরু করল, আমি জানালার পাশে বসে বাইরের দিকে তাকালাম। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলাম, এই দুঃস্বপ্নটা শেষ হলো। কিন্তু হঠাৎই বাসের আয়নায় আমার প্রতিফলন দেখতে গিয়ে চমকে উঠলাম। আমার মুখটা কালচে আর ঘোলাটে লাগছিল। আর আমার চোখের জায়গায় যেন শুধু দুটি শূন্য গর্ত…বাসটা তখনো রাস্তা দিয়ে চলছিল। আমি বুঝতে পারলাম, আমার এই চা-বাগান থেকে পালানো সম্ভব না। আমি কেবল একটা গল্পের সাক্ষী হয়ে গেলাম আর সেই গল্পের, যার নাম 'চা-বাগানের শীতল রহস্য'।

AAkash
📅 ১৯ মার্চ, ২০২৬১০